আর্কাইভপ্রচ্ছদ রচনা

উজান স্রোতা সওগাত : আপেল মাহমুদ

প্রচ্ছদ রচনা : বাংলা ভাষার ঐতিহ্যবাহী সাহিত্যপত্র

চাঁদপুরে সুপারি ব্যবসা, বীমা কোম্পানির এজেন্ট আর স্টিমার কোম্পানির টিকিট বেচার অভিজ্ঞতা পুঁজি করে সোজা গিয়ে ডেরা বাঁধলেন মহানগরী কলকাতায়। সাহেবদের রাজধানী―যেখান থেকে পুরো ভারতবর্ষ নিয়ন্ত্রিত হতো। সেই মহানগরীর জোড়াসাঁকোতে ছিল কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাড়ি। সওগাত নামে একটি মাসিক পত্রিকা বের করে সেই জোড়াসাঁকোর বাড়িতে গিয়ে তিনি কবিগুরুর সামনে দাঁড়ালেন। হাতে তুলে দিলেন প্রথম সংখ্যাটি।

চেনা নেই জানা নেই, অপরিচিত ও খ্যাতিহীন এক মুসলমান যুবক পত্রিকা প্রকাশ করেছেন। সওগাত নাড়াচাড়া করে তিনি বিস্মিত হলেন। প্রথমেই নামের প্রশংসা করলেন। সওগাত একটি তুর্কি শব্দ। যার অর্থ উপঢৌকন বা উপহার। কবিগুরু তাঁর কাছে জানতে চাইলেন ‘এমন সুন্দর নাম কোথায় পেলে?’ জবাব দিলেন―‘আমি নিজেই এই নামকরণ করেছি। চিন্তা-ভাবনা করে সবার গ্রহণযোগ্য হবে ভেবে সেটা করেছি।’

কবিগুরু বললেন―‘তোমার রুচিবোধ আছে। মুসলমান সমাজের বর্তমান অবস্থায় তাদের মধ্য থেকে যে এরূপ সুন্দর একখানা মাসিক পত্রিকা বের হতে পারে, এটা আমার ধারণায় ছিল না।’ শুধু প্রশংসাই নয়, এই ঘটনার ৪/৫ দিন পর তিনি কবিগুরুর নিজ হাতে লেখা একটি কবিতা পেয়েছিলেন। বিশ্বভারতীর মনোগ্রাম আঁকা খামটি পেয়েই বুঝতে পেরেছিলেন এটা নিশ্চয় কবিগুরুর তোহফা।

উল্লেখ্য, সে সময় কবিগুরু বিশ্বভারতী গড়ে তোলার জন্য প্রচুর পরিশ্রম করছিলেন। এর তহবিল সংগ্রহের জন্য ভারতবর্ষের ধনাঢ্য ব্যক্তিবর্গ, জমিদার, তালুকদার, আমলা ছাড়াও পৃথিবী চষে বেড়াচ্ছিলেন। তখন তিনি কোনও দক্ষিণা ছাড়া কোনও পত্রপত্রিকা, জার্নাল কিংবা স্মরণিকায় লেখা দিতেন না। এমন কি অটোগ্রাফ দিয়েও তহবিল সংগ্রহ করতেন।

সেই সময় কবিগুরু ভালোবেসে মন থেকেই ডাকযোগে কবিতাটি পাঠিয়েছিলেন। সঙ্গে একটি চিঠিও পাঠিয়েছিলেন। চিঠির ভাষাটি ছিল নিম্নরূপ : ‘বিশ্বভারতীকে টাকা দিয়ে আমার লেখা নেয়া সম্ভব নয় বলে সেদিন তুমি খুব নিরাশ হয়ে ফিরে গিয়েছিলে। তাই একটা কবিতা পাঠালাম। আশা করি তোমার ভালো লাগবে।’ কবিতাটি সওগাত-এর দ্বিতীয় সংখ্যায় ছাপা হয়েছিল। কবিগুরুর সেই কবিতাটির নাম ছিল ‘পথের সাথি’।

কবিতাটি গীতালি কাব্যগ্রন্থে সংকলিত হয়েছিল। পথচারী হিসেবে জীবনের পথে চলতে চলতে পথের সঙ্গীকে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা প্রকাশ করেছেন। কবিতাটি নিম্নরূপ :

পথের সাথি, নমি বারম্বার।

পথিকজনের লহো নমস্কার।

ওগো বিদায়, ওগো ক্ষতি,

ওগো দিনশেষের পতি,

ভাঙা বাসার লহো নমস্কার।

ওগো নব প্রভাত-জ্যোতি,

ওগো চিরদিনের গতি,

নূতন আশার লহো নমস্কার।

জীবন-রথের হে সারথি,

আমি নিত্য পথের পথী,

পথে চলার লহো নমস্কার।

কবিতাটি কবিগুরু রেলযাত্রার সময় লিখেছিলেন। সময়  ১৩২১ বঙ্গাব্দের ২৫ আশ্বিন। যা গীতালি কাব্যগ্রন্থে ১৯১৪ খ্রিষ্টাব্দে স্থান পায়, তাহলে বলা যায় সওগাতে ছাপা হওয়া ‘পথের সাথি’ কবিগুরুর নতুন কোনও কবিতা ছিল না। মূলত সওগাত সম্পাদককে উৎসাহ দেওয়ার জন্যই তিনি কবিতাটি গীতালি কাব্যগ্রন্থ থেকে কপি করে পাঠিয়েছিলেন।

কবিগুরুর আশীর্বাদপুষ্ট এই সৌভাগ্যবান মুসলমান সম্পাদক ছিলেন মোহাম্মদ নাসির উদ্দীন (১৮৮৮-১৯৯৪)। বাংলার  মফসসল চাঁদপুর থেকে কলকাতা গিয়ে তিনি শুধু কবিগুরুর মন জয় করেননি, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামকে পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন। বিদ্রোহী কবির লেখা প্রথম ছাপার অক্ষরে দেখা যায় সওগাত-এর পাতায়। পরবর্তীকালে এই পত্রিকায় নিয়মিত লেখক হয়ে উঠেছিলেন তিনি। তখন তিনি সাধারণ হাবিলদারের চাকরি নিয়ে পল্টনে যোগ দিয়েছিলেন। ৪৯ নম্বর বেঙ্গল  রেজিমেন্টের সদর দপ্তর ছিল পাকিস্তানের করাচিতে। সেখানে বসেই লেখেন জীবনের প্রথম লেখা ‘বাউণ্ডেলের আত্মকাহিনী’, যা সওগাত-এর প্রথম বর্ষ সপ্তম সংখ্যায় ছাপা হয়। এতে খুশিতে আত্মহারা হন কাজী নজরুল। এর পর আরও বেশি করে লিখতে শুরু করেন। একই সঙ্গে সম্পাদক মোহাম্মদ নাসির উদ্দীনের সঙ্গে শুরু হয় পত্র বিনিময়। লেখা ছাপানোর জন্য কাজী নজরুল তাঁকে এক দীর্ঘ চিঠি লিখেন। সেখানে কবি নজরুল মুসলিম সমাজের দুরবস্থা তুলে ধরার পাশাপাশি প্রগতিশীল সাহিত্যের প্রয়োজনীয়তার যুক্তি তুলে ধরেন।

কাজী নজরুলের লেখা দ্বিতীয় গল্প ‘স্বামীহারা’। ছাপা হয় সওগাত-এর প্রথম বর্ষ একাদশ সংখ্যায়। দ্বিতীয় কবিতা ‘সমাধি’, প্রথম প্রবন্ধ ‘তুর্ক মহিলার ঘোমটা খোলা’ ছাড়া আরও অনেক কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ ছাপা হতে থাকে উক্ত পত্রিকায়। নজরুলের লেখা প্রথম কবিতা ‘মুক্তি’ ছাপা হয়েছিল বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকার শ্রাবণ সংখ্যায় (১৩২৬ বঙ্গাব্দ)। প্রথম কবিতা ছাপা হওয়ার পর বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদককেও কাজী নজরুল দীর্ঘ এক চিঠি লিখেন। সে চিঠিতে নজরুল প্রথমলেখা ছাপানোর জন্য নাসির উদ্দীনকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। করাচিতে উর্দিপরা নজরুল সওগাতে চারটি লেখা পাঠালে তা ছাপা হয়।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলে ১৯২০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে ৪৯ নম্বর রেজিমেন্ট ভেঙে দেওয়া হলে কাজী নজরুল বেকার অবস্থায় কলকাতায় ফিরে আসেন। বন্ধু শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের বোর্ডিংয়ে এসে ওঠেন। বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা অফিসে গিয়ে সশরীরে পরিচিত হন। তারপর সওগাত পত্রিকা দপ্তরে গিয়ে নাসির উদ্দীনের সঙ্গেও দেখা করেন। তখন সেখানে এক অভূতপূর্ব ঘটনা ঘটেছিল। সেনাবাহিনীর পোশাকপরা বিদ্রোহী কবিকে দেখে সওগাত সম্পাদক চমকে উঠেছিলেন। সেদিনের স্মৃতি মোহাম্মদ নাসির উদ্দীনের লেখায় এসেছিল এভাবে―

‘আমি অফিসে বসে কাজ করছি। এমন সময় সৈনিকের পোশাক পরিহিত এক যুবক আমার সামনে এসে দাঁড়াল। আমি তাঁকে দেখে চমকে উঠলাম। ভাবলাম, সেনার লোক কেন আবার আমার অফিসে এসে ঢুকল। আমার উৎকণ্ঠা অনুভব করে হেসে ওঠে আগন্তুক বললেন, আমি কাজী নজরুল ইসলাম। বাঙ্গালি পল্টন ভেঙে  দিয়েছে, তাই করাচি ছেড়ে চলে এলাম। আপনি সওগাতে আমার প্রথম লেখা ছেপেছেন, সেকথা ভুলিনি। সকালের আগে আপনার সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছে হলো। এখন লিখবো, অনেক লেখা দেবো সওগাতে।’

সেই থেকে সওগাত পত্রিকার সঙ্গে কবি নজরুলের সখ্য। শুধু লেখালেখি নয়, চাকরিও করেছেন উক্ত পত্রিকায়। আর্থিক সংকটে পড়ে সওগাত ভবনে বাসও করেছেন কিছুদিন, ১১ নম্বর ওয়েলেসলি স্ট্রিট (রফি আহমদ কিদোয়াই রোড) ছিল ঠিকানা। এই স্মৃতিকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য নজরুল-জীবনানন্দ জন্মশতবর্ষ উৎসব সম্মিলনীর পক্ষ থেকে একটি স্মারক প্রতিষ্ঠা করা হয় ১৯৯৯ খ্রিষ্টাব্দের ২ মে। সেই স্মারকে বলা হয়, এই বাড়ি থেকে সওগাত পত্রিকা প্রকাশিত হতো। এখানে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম ১৯২৯ খ্রিষ্টাব্দে বসবাস করতেন।

মেধা আর সৃজনশীলতায় মোহাম্মদ নাসির উদ্দীন যেমন এগিয়ে ছিলেন―তেমনি কঠোর পরিশ্রম, অসাম্প্রদায়িকতা এবং প্রগতিকে সামনের দিকে এগিয়ে নেওয়ার সংগ্রাম চালিয়ে গিয়েছিলেন।

বিশেষ করে মুসলিম সমাজের দুর্দশা, কুসংস্কার, ধর্মান্ধতার গ্লানি দূর করার জন্য তিনি চির সংগ্রাম চালিয়ে গেছেন। সঙ্গী হিসেবে পেয়েছিলেন কাজী নজরুলকে। এমন কি তাদের প্রভাবে প্রমীলা নজরুল পর্যন্ত কবি হয়ে উঠেছিলেন। সওগাতে তাঁর লেখার নজির পাওয়া যায়। তবে সে লেখায় প্রমীলা নজরুল নামটি ব্যবহৃত হয়নি। ১৩৩৬ বঙ্গাব্দের ভাদ্র সংখ্যায় ‘শঙ্কিতা’ নামে একটি কবিতা লিখেন প্রমীলা নজরুল, যা মিসেস কাজী নজরুল ইসলাম নামে ছাপা হয়। সেখানে প্রমীলার একটি ছবিও ছাপা হয়। কবিতাটি নিম্নরূপ―

কেন আজি প্রাণ মম বেদনা বিহ্বল,

কেন আজি অকারণে চোখে আসে জল!

সন্ধ্যায় সমীরণ হু হু করে বয়ে যায়!

রয়ে রয়ে মোর প্রাণ করে কেন হায় হায়!

কোন বেদনায় মম বুক আজি কম্পিত,

কে জানে গো হিয়া মাঝে কত ব্যথ সঙ্গীত!

বেলা শেষে নীলিমায় চেয়ে আছি অনিমিখ,

কে ছড়ালো বিদায়ের সিন্দুর চারদিক!

কিছুই বুঝি না হায় কেন প্রাণ ভয়াতুর

কে দিল হৃদয়ে বেঁধে মল্লার রাগ সুর?

মনে হয়, এ নিখিলে কেহ নাই নাই মোর,

তুমিও কি বল সন্ধ্যা কেহ নাই নাই তোর?

সুপারির ব্যবসায়ী জাহাজ কোম্পানির টিকিট বিক্রেতা ও ইন্সুরেন্স কোম্পানির কমিশন এজেন্ট থেকে কেন তিনি পত্রিকার ব্যবসায় চলে এলেন? এমন প্রশ্ন অনেকের মনে ঘুরপাক খায়। অনেকের কাছে এই প্রশ্ন করার পর সঠিক জবাব পাওয়া যায়নি। তবে সাময়িকপত্র গবেষক এবং এ সংক্রান্ত বেশ কয়েকটি বইয়ের প্রণেতা ড. ইসরাইল খান জানান, কোনও কারণ ছাড়াই তিনি অন্যান্য ব্যবসা ছেড়ে দিয়ে পত্রিকা প্রকাশনায় আসেননি। তিনি যখন স্কুলে পড়েন তখন বইপুস্তক ও পত্রপত্রিকা পড়ার দিকে ঝোঁক হয়। তিনি লাইব্রেরিতে নিয়মিত যেতেন। কিন্তু সেসব বই কিংবা পত্রিকায় মুসলমানদের কোনও লেখা পাওয়া যেত না। লাইব্রেরিয়ানকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলতেন মুসলমানরা এক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে আছে। তারা খুবই কম সাহিত্যচর্চা করে। তখন তিনি হিন্দু সহপাঠীদের সহযোগিতায় প্রবাসী, ভারতবর্ষ, মানসী প্রভৃতি হিন্দু সম্পাদকদের পত্রিকা পড়তে শুরু করেন। অনেক হিন্দু বন্ধু-বান্ধবদের কাছ থেকে তিরস্কারমূলক কথাবার্তাও শোনেন। মুসলমানরা সাহিত্য পত্রিকা বা বইপুস্তক পড়ে না কি! এতে নাসির উদ্দীনের মন ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে। তখনই তিনি মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেন সময় হলে তিনি দেখিয়ে দেবেন, মুসলমানরাও সাহিত্যচর্চা কিংবা পত্রিকা সম্পাদনায় পিছিয়ে পড়ার মতো নয়। কোনও কোনও অংশে মুসলমানরা অন্যদের চেয়ে এগিয়েও যেতে পারে।

এক সাক্ষাৎকারে নাসির উদ্দীন স্বীকার করেছেন তাঁর স্কুল জীবনে কোনও পাঠ্যবইয়ে মুসলমানদের লেখা স্থান পেত না। পত্র-পত্রিকা ঘেঁটে মুসলমান লেখক খুঁজে হয়রান হতে হতো। এতে তিনি মনোপীড়ায় ভুগতেন। সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন―‘এত বড় একটা জাতি, এত বড় একটা সময়, তারা বাংলা ভাষায় কথা বলেন, অথচ তাদের বাংলা কোনও পত্রপত্রিকা নেই। এ নিয়ে ভাবতে গিয়ে মনটা ভয়ানক খারাপ হয়ে গেল। মাথায় কেবলই ঘুরপাক খেত ব্যাপারটা। ওই বয়সেই ছবির বই কিংবা পত্রপত্রিকা প্রকাশ করার স্বপ্ন দেখতাম। রাতে ঘুম হতো না।’

তাঁর এই স্বপ্নটায় হঠাৎ করেই ছেদ পড়ল। ম্যাট্রিক পরীক্ষার আগে বাবা মারা যাওয়ার পর সংসারের সব দায়িত্ব এসে পড়ল তাঁর মাথার ওপর। ভেবেছিলেন চাঁদপুর থেকে ম্যাট্রিক পাস করে কলকাতায় গিয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের পাশাপাশি পত্রিকা প্রকাশ করবেন। কিন্তু সংসারের হাল তাঁকে সাময়িকভাবে সে পথ থেকে সরিয়ে রাখল। পরিবারের জ্যেষ্ঠ সন্তান হিসেবে তাঁকে বাবার দায়িত্ব গ্রহণ করতে হলো। তিনি মাত্র স্কুলের ছাত্র। না আছে ব্যবসার অভিজ্ঞতা, না আছে চাকরির অভিজ্ঞতা। এমন দোটানার মধ্যে তিনি চাঁদপুরে মৌসুমি ব্যবসা শুরু করলেন। তখন ধান, পাট, সুপারির ব্যবসা ছিল রমরমা। ইলিশের ব্যবসাও মন্দ নয়। কিন্তু তিনি বেছে নিলেন সুপারির ব্যবসা। কাঁচা সুপারি কিনে শুকিয়ে তা স্টক করে রাখতেন। দাম চড়া হলে সেটা বিক্রি করে দিতেন। পাঁচ ভাইবোন ও মা নিয়ে তখন তিনি জীবনসংগ্রাম করে যাচ্ছিলেন। কিন্তু সংসারটা তিনি ঠিকমতো টানতে পারছিলেন না। কারণ মৌসুমি সুপারি ব্যবসার কোনও ভবিষ্যৎ ছিল না। কাঁচা সুপারি কিনে ৬ মাস পর তা বেচতে হতো। কখনও লাভ হতো―আবার লোকসানেরও ঝুঁকি ছিল। তাই তিনি বিকল্প কাজ খুঁজছিলেন।

চাঁদপুরের একটি স্টিমার স্টেশন, নাম ছিল নরসিংহপুর। নদীভাঙ্গনের কারণে স্টেশনটি এখন আর নেই। মনে  নানা হতাশা নিয়ে নাসির উদ্দীন সেই স্টিমার ঘাটে হাঁটাহাঁটি করতেন। স্টেশন মাস্টার তাঁকে চিনতেন। ভালো ছেলে হিসেবে জানতেন। একদিন মাস্টার তাঁকে ডেকে বললেন―এভাবে অযথা ঘোরাফেরা না করে স্টেশনের টিকিট বিক্রিতে লেগে যাও। তিনি মৌসুমি সুপারি ব্যবসার পাশাপাশি স্টেশন মাস্টারের সহকারী হিসেবে কাজ শুরু করলেন। মেসফিল ও আরএসএল অ্যান্ড আইজিএন কোম্পানির জাহাজগুলো তখন এখান দিয়ে যাতায়াত করত। মাইনে পেতেন ২০ টাকা। সে সময় এটা নেহায়েত কম টাকা ছিল না। দুই টাকায় এক মণ চাল পাওয়া যেত। তিনি স্টিমার ছাড়ার আগে টিকিট বিক্রি করতেন এবং আগত স্টিমারযাত্রীদের কাছ থেকে টিকিট সংগ্রহ করে সেগুলো অফিসে জমা দিতেন। যাতে কোনও যাত্রী বিনা টিকেটে স্টিমার চড়তে না পারেন। প্রতিদিন দুইবার নরসিংহপুর ঘাটে স্টিমার আসত―সকালে আর বিকালে।

সুপারি ব্যবসা আর স্টিমার স্টেশন মাস্টারের সহকারীর কাজ করার পরও তাঁর মন ভরছিল না। কেমন জানি বেকার বেকার মনে হচ্ছিল। এর চেয়ে কঠিন আর ব্যস্ত কাজ খুঁজছিলেন। স্টেশন ঘাটেই একদিন পরিচয় হয়ে যায় চায়না মিউচ্যুয়াল লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির কর্মকর্তা এমসি দত্তের সঙ্গে। দুজন একই স্কুলের ছাত্র। তাই পরিচয়টা আন্তরিক হয়ে ওঠে। ইন্সুরেন্স কোম্পানির কাজ ছিল অনেকটা চ্যালেঞ্জিং। তাই এই কাজটা পছন্দ হলো নাসির উদ্দীনের। বিনা বাধায় বিনা পুঁজিতে চাকুরি হয়ে গেল। এমসি দত্ত বললেন, ‘ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির চাকরিতে মূল পুঁজি হলো সুন্দরভাবে কথা বলতে পারা। মানুষকে বুঝিয়ে পলিসি করতে হয়। তাহলে তুমি ভালোভাবে চলতে পারবে।’

তখন ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিতে মুসলমানরা চাকরি করতেন না। পলিসি গ্রহণের ক্ষেত্রেও তারা মুখ ফিরিয়ে রাখতেন। পির-মাশায়েখ মৌলবিরা ইন্স্যুরেন্স ও ব্যাংককে খারাপ মনে করতেন। এগুলোর সঙ্গে লেনদেনকে হারাম হিসেবে ঘোষণা দিয়েছিলেন তারা। যার কারণে এমসি দত্ত তাঁকে বুঝিয়ে দেন কোনও পলিসি গ্রহণের সময় কাউকে সুদ বলবে না। বলবে প্রফিট হয়েছে। ইন্স্যুরেন্সের কাগজপত্রেও সুদের পরিবর্তে প্রফিট লেখা হতো। তিনিও এই কৌশল গ্রহণ করে এগিয়ে গেলেন। তখন অনেক ধনাঢ্য হিন্দু ব্যবসায়ী ও জমিদার বিনা প্রশ্নে ইন্স্যুরেন্স গ্রহণ করলেও মুসলমানরা একে গুনাহর কাজ মনে করতেন। তাছাড়া মুসলমান সম্প্রদায় ছিল গরিব।

নাসির উদ্দীন যখন চাঁদপুরে ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির শাখা খুলে বসলেন তখন সেখানে রেলওয়ের জমজমাট জংশন হয়ে ওঠেছে। সিলেট, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, কুমিল্লা, ত্রিপুরার মানুষজন চাঁদপুর হয়ে কলকাতায় আসা-যাওয়া করতেন। তাছাড়া রেলস্টেশনে অনেক কর্মকর্তা ছিলেন। তাদের সঙ্গে পরিচয় হওয়ার পর অনেক প্রগতিশীল মুসলমানই পলিসি গ্রহণ করলেন। তবে তাদেরকে নানাভাবে বুঝাতে হতো। ২০ জন মুসলমানকে বুঝালে হয়তো একজন পলিসি গ্রহণ করতেন। তবে তিনি কঠোর পরিশ্রম এবং বুঝানোর ক্ষমতা দেখিয়ে সফল হলেন। প্রথম মাসেই তিনি ইন্সুরেন্স কোম্পানি থেকে কমিশনসহ বেতন পেলেন ৩০০ টাকা। যা আজকের দিনে ৩০ হাজার টাকা। সেসময় একজন ম্যাজিস্ট্রেট বেতন পেতেন ১৫০ টাকা আর একজন সাব-রেজিস্ট্রার পেতেন ৬০ টাকা।

৭ টাকা ভাড়া দিয়ে একটি অফিসঘর নিলেন। ঘরটা সাজিয়ে গুছিয়ে রাখতেন। সুন্দরভাবে একটি সাইনবোর্ড টাঙিয়ে দেন। চাঁদপুরের শিক্ষিত লোকজন, উকিল, মোক্তার, রেল কর্মকর্তা অনেকেই সেখানে আসতেন। নাসির উদ্দীন তাঁদেরকে আপ্যায়ন করতেন, চা-নাস্তার ব্যবস্থা করতেন। এভাবে তিনি মানুষের মনে ঢুকে যান। একদিন ম্যাজিস্ট্রেট জহুরুল কাইয়ুম চৌধুরী সে অফিসে এসে তাঁর সঙ্গে পরিচিত হলেন। তিনি মুসলমান সমাজে ইন্স্যুরেন্সের প্রসারের ওপর গুরুত্ব দিয়ে নাসির উদ্দীনের কাজের প্রশংসা করলেন। তিনি একজন মুসলমান আড়তদারকে ডেকে এনে ইন্স্যুরেন্সের পলিসি করতে সহযোগিতাও করলেন। মুসলমানদের ইন্সুরেন্স করতে কোনও বাধা নেই বুঝানোর পর আড়তদার ৫০০০ টাকার ইন্সুরেন্স করেন। এভাবে তাঁর হাতে  বেশ কিছু টাকা এলে সাহিত্যচর্চার সেই পুরোনো পোকাটি নাড়াচাড়া দিয়ে উঠল।

ঘুমন্ত মুসলমানদের জাগিয়ে তুলতে হলে একটি পত্রিকা প্রকাশ করতে হবে। সেজন্য তিনি ১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতা চলে এলেন। সেই মহানগরীতে কোনও আত্মীয়-স্বজন কিংবা শুভাকাক্সক্ষী নেই। পত্রিকা প্রকাশের পৃষ্ঠপোষকও খুঁজে পাননি। সেখানে গিয়ে খুঁজে পান ফরিদপুরের আমির হোসেন খানকে। তিনি মেছুয়াবাজার থাকতেন। পারফিউমের ব্যবসা ও চায়ের স্টক বিজনেস করতেন। সাহিত্যচর্চা না করলেও সাহিত্যের সমঝদার ছিলেন। তাই পত্রিকা প্রকাশের কথা শুনে তিনি উৎসাহ দিলেন। একই সঙ্গে আশ্রয় দিলেন। আমির হোসেন খান কিছু লোকের নাম-ঠিকানা দিয়ে ওদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বললেন। ওরা সবাই ছিলেন অবস্থাসম্পন্ন মুসলমান। পত্রিকা বের করার কথা শুনেই তারা বলতে থাকলেন, হিন্দুদের মতো ছবি দিয়ে পত্রিকা ছাপাবেন। তওবা, তওবা! এটা কেমন কথা। আপনি ইসলামি কাগজ বের করুন। আমরা যত টাকা লাগে দেব।’ এসব কথা শুনে তিনি সোজা চাঁদপুরে চলে এলেন। মন খারাপ। তাঁর আদর্শের সঙ্গে এসব কথাবার্তার কোনও মিল নেই। কিছুদিন হতাশার মধ্যে কাটিয়ে পুনরায় মনোবল চাঙ্গা করলেন। যে কোনও মূল্যে পত্রিকা প্রকাশ করতে হবে―সেটা মহানগরী কলকাতাতেই। সঙ্গী হিসেবে পেলেন মওলানা সাহাদাত হোসেনকে। তিনি ছিলেন আঞ্জুমানে ওলামায়ে বাংলা সংগঠনের প্রচারক। প্রচার কাজ করতে গিয়ে কলকাতায় অনেক মুসলমান কবি, সাহিত্যিক, সম্পাদক ও ব্যবসায়ীর সঙ্গে তাঁর পরিচয়। সেটা তিনি কাজে লাগানোর জন্য নাসির উদ্দীনকে অনুরোধ করলেন। তাঁর কথামতো তিনি চট্টগ্রামের মানুষ মওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী, হাকিম মশিউর রহমান, ব্যারিস্টার আমিনুর রহমান ও ব্যারিস্টার আব্দুল রসুলসহ আরও অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তির কাছে নিয়ে গেলেন। সবাই তাঁকে পত্রিকা বের করার জন্য উৎসাহ দিলেন। এর মধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়া নাসিরনগরের লোক ব্যারিস্টার আব্দুল রসুলের কথা বেশ মনে ধরলো। রসুল ছিলেন তেজী, দৃঢ়চেতা এবং কংগ্রেসের একজন বড় নেতা। অসাম্প্রদায়িক হিসেবে কুসংস্কারমুক্ত চিন্তা-ভাবনা করতেন। তাই ঘুণেধরা মুসলিম সমাজে আঘাত করার মতো একটি পত্রিকা না থাকায় তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ৫০ বছর আগেই এই ধরনের একটি পত্রিকা প্রকাশ করা উচিত ছিল। তাই নাসির উদ্দীনকে একটি পরিকল্পনা হাতে নিয়ে পত্রিকা প্রকাশ করার উপদেশ দেন ব্যারিস্টার আব্দুল রসুল।

আব্দুল রসুলের কথামতো পত্রিকা প্রকাশের একটি লিখিত পরিকল্পনা করেন তিনি। তা দেখানোর জন্য পুনরায় ব্যারিস্টার রসুলের কাছে যাওয়ার চিন্তা করেন। কিন্তু তিনি হঠাৎ করে হার্টফেল হয়ে মারা যান। ফলে তাঁর লেখা আর পত্রিকায় ছাপানো সম্ভব হয়নি। তবে তাঁর উপদেশমতো পত্রিকা প্রকাশ করার চেষ্টা চালাতে থাকেন। একটি আধুনিক, বিজ্ঞানসম্মত, কুসংস্কার ও সাম্প্রদায়িক বিরোধী সচিত্র পত্রিকা বের করার জন্য উপযুক্ত লেখা সংগ্রহের ক্ষেত্রে তিনি বাধার সম্মুখীন হন। বড় বড় মুসলমান লেখকদের কাছে গিয়ে লেখা চাইলে কেউ বলেন আমি হযরত ওমরের ওপর, আবার কেউ বলেন আমি হজরত রাবেয়ার ওপর একটি লেখা দেব। অথচ এসব নিয়ে লেখা পত্রপত্রিকা ও বইপুস্তক বাংলা, উর্দু, হিন্দি ভাষায় কোনও অভাব নেই।

তবে তিনি যে ভালো লেখক ও লেখার সন্ধান পাননি, তেমন নয়। আব্দুল করিম সাহিত্য বিশারদ প্রাচীন বাংলা সাহিত্য নিয়ে একটি মূল্যবান লেখা দিলেন এবং সওগাত নামটির প্রশংসা করে এর দীর্ঘায়ু কামনা করলেন। একই সঙ্গে কবি শাহাদাৎ হোসেন লেখা পাঠালেন। আব্দুল করিম সাহিত্য বিশারদ সম্পর্কে একটি অভিনব তথ্য দিলেন সময়িকপত্রের গবেষক ড. ইসরাইল খান। তিনি বলেন ‘মোহাম্মদ নাসির উদ্দীন ও সাহিত্য বিশারদ খুবই কাছের লোক ছিলেন। মুসলমানদের হাত দিয়ে একটি ভালো কাগজ প্রকাশিত হোক সেটা মনেপ্রাণে চাইতেন। তাই সওগাতকে তিনি অভিনন্দন জানিয়ে লেখা পাঠিয়েছিলেন। একই সঙ্গে নাসির উদ্দীন সাহেব সম্মান প্রদর্শন করে সওগাতের কয়েকটি সংখ্যায় সম্পাদক হিসেবে আব্দুল করিম সাহিত্য বিশারদের নাম ছাপতে থাকেন। এভাবে তিন সংখ্যায় তাঁর নাম ছাপা হয়। মোহাম্মদ নাসির উদ্দীনের নাম ছাপা হয় ম্যানেজার হিসেবে। এর কারণ তখন অবিভক্ত বাংলায় আব্দুল করিম সাহিত্য বিশারদ বেশ পরিচিত ছিলেন। কলকাতার বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় তাঁর অনেক লেখা ছাপা হতো। কিন্তু তিনি থাকতেন চট্টগ্রামে। তাই নাসির উদ্দীনকে অনুরোধ করেন সম্পাদক হিসেবে তাঁর নাম না ছাপাতে। এর পর থেকে সম্পাদক হিসাবে নাসির উদ্দীন নিজ নাম ছাপতে থাকেন।’

ব্যারিস্টার আব্দুল রসুলের কথামতো মোহাম্মদ নাসির উদ্দীন সওগাতের একটি লিখিত নীতিমালা ও লেখক তালিকা তৈরি করলেন। কোন কোন লেখকের লেখা প্রথম সংখ্যায় থাকবে তারও একটি লিস্ট করে সবাইকে চিঠি লিখলেন। কবিগুরু থেকে শুরু করে সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত ও কুমুদরঞ্জন মল্লিক কেউই বাদ যাননি। অনেক মুসলমান লেখকের লেখাও পেয়ে যান। তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলে হিন্দু-মুসলমান লেখকদের সম্মিলিত চেষ্টায়ই সওগাত দাঁড় করানো হবে। সঙ্গে হাফ টান ছবি থাকবে। বিশেষ করে প্রথা ভেঙে মুসলিম মেয়েদের ছবিও থাকবে। আর সেই কুসংস্কার ভাঙার জন্যই তো তিনি পত্রিকা প্রকাশ করতে এসেছেন।

প্রথম সংখ্যা ছাপার জন্য তিনি কলকাতায় ভালো একটি ছাপাখানার সন্ধান করছিলেন। বিশেষ করে মুসলমান মালিকানাধীন প্রেস হলে ভালো হয়। মওলানা সাহাদাত হোসেনকে নিয়ে কয়ড়া রোডের ইসলামিয়া আর্ট প্রেসে গেলেন। এর মালিক ইমদাদ আলী। দুজন কম্পোজিটার বসে বসে কাজ করছেন। ম্যানেজার বসে ঝিমুচ্ছেন। ছাপার কথা তুলতেই তিনি সাফ জানিয়ে দেন, এখানে বই বা পত্রিকার ফর্মা ছাপা হয়। কোনও ছবিটবি থাকলে সেটা ছাপা হয় না। ছবি ইসলামে হারাম। নিরাশ হয়ে সেখান থেকে যখন ফিরছিলেন, তখন এক ভদ্রলোক বললেন, আপনারা বরং কালী সিংহের প্রেসে যান। সেখানে গিয়েও হোঁচট খেতে হলো। ম্যানেজার বললেন―আপনাদের কাগজ আমরা ছাপতে পারবো না। কারণ মুসলমানদের পত্রিকার অর্ধেকেই থাকে আরবি-ফারসি ভাষার লেখা। এসব টাইপ তো এই প্রেসে নেই। তখন ম্যানেজারকে বুঝানো হলো সওগাত সেই ধরনের পত্রিকা নয়। এটা প্রবাসী ও ভারতবর্ষের মতো পত্রিকা হবে। এ কথা শুনে ম্যানেজার খুব খুশি হয়ে কাজ করতে রাজি হলেন। বেশ সাফল্যের সঙ্গেই সওগাত ছাপা হলো। মুসলমানদের হাতে এমন সাজানো গোছানো পত্রিকা প্রকাশ পাওয়ায় সর্বমহলে হৈ-হল্লা হলো। সেই শুভ দিনটি ছিল ১৯১৮ খ্রিষ্টাব্দের ২ ডিসেম্বর। বাংলা তারিখ ১৩২৫ এর ১৬ অগ্রহায়ণ। মোহাম্মদ নাসির উদ্দীন বোধকরি বেগম রোকেয়ার আদর্শটা বুকে লালন করতেন। মুসলমান সমাজের কুসংস্কার, ধর্মীয় গোঁড়ামি ও সামাজিক অপশাসন থেকে মুক্ত হওয়ার সংগ্রামের হাতিয়ার বানাতে চেয়েছেন সওগাতকে। সেটা তিনি এক স্মৃতিচারণে এভাবে উল্লেখ করেন। ‘কট্টর গোঁড়া ধর্মাবলম্বীরা কতগুলো নিষেধের বেড়াজালে সমাজকে আটকে রেখে সবকিছু পঙ্গু করে দিচ্ছিল। যেমন মুসলমানরা ইংরেজি পড়তে পারবে না। হিন্দুদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখা যাবে না। গল্প-উপন্যাস পড়া, গান শোনা, ছবি আঁকা, খেলাধুলা করা কিংবা বিনোদন করা সম্পূর্ণ হারাম। মুক্তচিন্তা নিয়ে কেউ লেখালেখি করলে তাকে নিয়ে নিন্দা-বিদ্রƒপ করা হতো। মূলত এমন কুপ্রথা ভাঙার জন্যই আমি সওগাত পত্রিকা প্রকাশ করি।’

তাই বেগম রোকেয়ার লেখা কবিতা ‘সওগাত’ দিয়েই প্রথম সংখ্যা শুরু করেছিলেন। কবিতাটি নিম্নরূপ :

    জাগো বঙ্গবাসী!

    দেখ, কে দুয়ারে

অতি ধীরে ধীরে করে করাঘাত!

    ঐ শুন শুন!

কেবা তোমাদের

সুমধুর স্বরে বলে, ‘সুপ্রভাত’!

    অলস রজনী

    তবে পোহাইল

আশার আলোকে হাসে দিননাথ!

   শিশির সিক্ত

   কুসুম তুলিয়ে

ডানা ভরে নিয়ে এসেছে ‘সওগাত’।

প্রথম সংখ্যায় রায়বাহাদুর জলধর সেন, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, কুমুদরঞ্জন মল্লিক, বেগম রোকেয়ার মতো খ্যাতিমান লেখকরা লিখেছিলেন। তবে এর পূর্ণাঙ্গ একটি বিবরণ দেওয়া আবশ্যক মনে করছি। তাতেই বুঝা যাবে মুসলমান সম্পাদিত প্রথম সচিত্র পত্রিকা সওগাতের শুরুটা কেমন হয়েছিল। কবিতা ছাপা হয়েছিল বেগম রোকেয়া, শাহাদাৎ হোসেন, ফজলুর রহিম চৌধুরী, কায়কোবাদ, মানকুমারী বসু, কুমুদরঞ্জন মল্লিক, জীবেন্দ্রকুমার দত্ত, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, ভুজঙ্গধর রায় চৌধুরী, চণ্ডীচরণ মিত্রের। গল্প লিখেছিলেন জলধর সেন, ব্রজমোহন দাস ও পাঁচগোপাল দাস। প্রবন্ধ লেখেন মওলানা মনিরুজ্জামান এসলামাবাদী, মোহাম্মদ কে, চাঁদ, ওসমান আলী, ইসমাইল হোসেন সিরাজী, ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, শাহাদাৎ হোসেন, এস হোসেন এবং আবদুল গফুর।

প্রথম সংখ্যায় ২৬টি হফ টান ছবি ছাপিয়ে গোঁড়া মুসলমানদের ভিত কাঁপিয়ে দেন। প্রগতিশীল মুসলিম সমাজ এমন সুন্দর ছিমছাম পত্রিকা লুফে নিলেন। অপরদিকে মোল্লা-মৌলভি গোষ্ঠী ক্ষিপ্ত হলেন ছবি দেখে। তাদের ধর্মীয়বিষয়ক লেখা না থাকায় কেউ কেউ মনোক্ষুন্ন হলেন, কোনও কোনও মোল্লা ফতোয়া দিয়ে বললেন মুসলমান হয়ে তিনি পত্রিকায় ছবি-টবি ছাপলেন কীভাবে? তা নিয়ে রীতিমতো হৈচৈ পড়ে গেল। মওলানা ইসলামাবাদীসহ প্রগতিশীল মুসলিম সমাজ তখন তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। আরও এসে যোগ দিলেন মোহাম্মদ বরকতুল্লাহ, মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী, কবি শাহাদাৎ হোসেন, আবুল মনসুর আহমদ। বরকতুল্লাহ ছিলেন দার্শনিক ধরনের লেখক। তিনি মুসলমানদের ইতিহাস ও দর্শন নিয়ে লিখতে গিয়ে সৃষ্টি আর সৃষ্টিকর্তার বিষয়ে প্রশ্ন থাকায় কেউ ভয়ে তাঁর লেখা ছাপাতো না। কিন্তু নাসির উদ্দীন নির্ভয়ে তাঁর সব লেখা ছেপেছিলেন। পারস্য প্রতিভা বইয়ের সব লেখা সওগাতে ছাপা হয়েছিল।

কলকাতায় সওগাত পত্রিকার দুই পর্বের ইতিহাস রয়েছে। প্রথম পর্ব ছিল ১৯১৮ থেকে ১৯২১ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ-এপ্রিল।  আর্থিক কারণে পত্রিকাটি সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেন নাসির উদ্দীন। তিন বছর পর তিনি বুঝতে পারলেন যেরকম লেখক ও লেখার উপকরণ সংগ্রহ করা দরকার ছিল, তেমন কিছু করতে পারেননি। কলকাতার বনেদি পত্রিকার সঙ্গে টেক্কা দিয়ে পত্রিকা প্রকাশ করতে গিয়ে অনেক খরচা হয়ে গেছে। বিক্রি আশাব্যঞ্জক ছিল না। তাই তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন নতুন করে পত্রিকা সাজানো দরকার। আর সেজন্য কিছুটা সময় দরকার। এই সময় পত্রিকা প্রকাশ না করে অর্থ রোজগার করতে হবে। আর সেটা সওগাতের জন্যই।

সাময়িক সময়ের জন্য তিনি ফিরে গেলেন পুরোনো পেশায়। যে পেশার টাকায় তিনি সওগাত প্রকাশ করেছিলেন। এই প্রসঙ্গে এক স্মৃতিচারণে তিনি বলেন―‘ইচ্ছার রাশ কিছুটা টেনে ধরি। তারপর আমি আমার সেই ওরিয়েন্টাল লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির অফিসে ফিরে গেলাম। তখনও তারা মুসলমান এজেন্ট পাননি। আমি বললাম আমি কাজ করব। সেখানে আমার কাজ হয়ে গেল। এখন মুসলমানরা কিছু কিছু চাকুরি পাচ্ছে। আমি বেশ কিছু লাইফ পলিসি করিয়ে দিলাম। এভাবে কিছু কাজ করে অর্থ উপার্জন করে সওগাত-এর দেনাটেনা শোধ করলাম। তার পরও আমার হাতে কিছু পয়সা থেকে গেল। তখন আবার সওগাত বের করার চিন্তা পেয়ে বসলো আমাকে। ভাবলাম, এমন লেখকদের আমার সাথে নেব, যারা সমমনা। আমার এই চিন্তার ভালো ফল পেলাম আমি।’

সওগাত পত্রিকার শুরুটা হয়েছিল কলকাতার কলুটোলায়। পরে সেটা চলে আসে ওয়েলেসলি স্ট্রিটে। দ্বিতীয় পর্বে এসে অফিসে লেখকদের আড্ডা শুরু হলো। নতুন করে নিয়োগ পেলেন মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী। তিনি একসময় মওলানা আকরাম খাঁর মোহাম্মদী পত্রিকায় লেখালেখি করতেন। কিন্তু মুক্তমনা হওয়ায় সেখানে টিকতে পারেননি। সেখান থেকে বিতাড়িত হয়ে তিনি আর্থিক কষ্টে দিনাতিপাত করছিলেন। ঠিক তখনই নাসির উদ্দীন তাঁকে টেনে নিলেন। এই টিমে যোগ দিলেন আবুল মনসুর আহমদ ও কবি শাহাদাৎ হোসেন। আবুল মনসুর বিকেলে পার্টি টাইমে যোগ দেন সওগাতে। আরও কয়েকজন এই দলে যোগদান করলে লেখকগোষ্ঠী বেশ শক্তিশালী হয়ে ওঠে। কিন্তু মোল্লা-মওলানারা সওগাতের পিছু ছাড়েনি। এবার স্বয়ং মোহাম্মদী সম্পাদক আকরাম খাঁ সওগাতের বিরোধিতা শুরু করলেন। প্রকাশ্যে বলতে থাকলেন―সওগাত মুসলমানদের জাত মেরে দিচ্ছে। মুসলমান সম্পাদিত পত্রিকায় তখন কবিতা, ছড়া ছাপাতো না। ছবি ছাপার তো প্রশ্নই উঠত না। তাই সওগাতের উপর মোল্লাদের রাগ ছিল। কিন্তু সওগাত গোষ্ঠী এসবের ভ্রুক্ষেপ করত না। বরং মোল্লাদের গালিগালাজের একটা লাভ হলো। কলকাতার তরুণ সম্প্রদায় সওগাতের পাশে এসে দাঁড়াল। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা আধুনিক চিন্তা-ভাবনার হওয়ায় সওগাতের পাঠক হয়ে গেল। এমন কি বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামও এই দলে ভিড়ে গিয়েছিলেন।

তবে সওগাতে যোগদান করার আগে নজরুলের একটি করুণ ঘটনা ঘটে। তখন তিনি কংগ্রেস রাজনীতির কাছাকাছি। একসময় কমিউনিস্ট পার্টির সংস্পর্শেও ছিলেন। সন্ত্রাসবাদী বিপ্লবীমনাও ছিলেন কখনও কখনও। সেটা তাঁর লেখায় সুস্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। সওগাত নবপর্যায়ে প্রকাশিত হতে থাকলে একদিন খান মুহাম্মদ মঈনুদ্দীন সওগাত অফিসে এসে নাসির উদ্দীনকে খবর দেন কাজী নজরুল কৃষ্ণনগরে গুরুতর অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়ে আছেন। ঔষধপত্র ও খাবার কেনার কোনও টাকা নেই। কংগ্রেসের হয়ে গান লেখা, গান গাওয়ার জন্য তিনি সেখানে যান। কিছুদিন তাঁর খরচ দেওয়ার পর সেটা বন্ধ হয়ে যায়। কবির এমন করুণ কাহিনি শুনে নাসির উদ্দীন টাকা বের করে দিয়ে নজরুলকে কলকাতায় নিয়ে আসতে মঈনুদ্দীনকে কৃষ্ণনগর পাঠিয়ে দেন। মঈনুদ্দীন ছিলেন কাজী নজরুলের ভাবশিষ্য। কবির মতো তিনি চুল রাখতেন, পোশাক-পরিচ্ছদ পরতেন। সঙ্গে সঙ্গে কৃষ্ণনগর গিয়ে অসুস্থ নজরুলকে সওগাত অফিসে নিয়ে এলেন। এসেই হৈচৈ করে বাড়ি মাথায় তুলে নিলেন। বলতে লাগলেন―‘ভালো অফিস করেছেন। কাগজ তো বেশ ভালো চলছে।’

এমন হৈচৈ-এর মধ্যে নাসির উদ্দীন ও কাজী নজরুলের মধ্যে একটা রফাদফা হয়ে গেল। নওরোজ পত্রিকায় কাজ করে নজরুল মাসিক বেতন পেতেন ১০০ টাকা। সওগাতে কাজ করলে পাবেন ১৫০ টাকা।

তবে শর্ত একটাই―আপনি সওগাত অফিসে থাকবেন, খাবেন। একই সঙ্গে সাহিত্য মজলিশে আড্ডা দিবেন। গল্প, কবিতা, উপন্যাস লেখার পাশাপাশি হলঘরে হারমোনিয়াম বাজিয়ে স্বরচিত গান গাইবেন। তবে কৃষ্ণনগর থেকে নজরুল প্রথমে সওগাত অফিসে না ওঠে সপরিবারে নলিনীকান্ত সরকারের বাসায় উঠেছিলেন। নলিনীকান্ত ছিলেন নজরুলের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। কিন্তু তাঁর স্ত্রী গোঁড়া হিন্দু হওয়ায় সে বাড়িতে বেশিদিন থাকতে পারেননি। তখনই নজরুল স্ত্রী প্রমীলা দেবীকে নিয়ে সওগাতের ভবনে এসে উঠলেন। তাঁর আগমনে সওগাত অফিস প্রাণচাঞ্চল্যে ভরে উঠল। সুযোগ পেলেই হারমোনিয়াম নিয়ে গান গাইতে শুরু করতেন। এই গান নিয়ে সওগাত অফিসে একটা ঘটনা ঘটে যায়।

একদিন পাশের মসজিদ থেকে ইমাম সাহেব অভিযোগ নিয়ে এলেন। নজরুলের গানের কারণে তারা ঠিকমতো নামাজ পড়তে পারছেন না। এলাকার পরিবেশ ঠিক রাখতে চাইলে এসব গানটান বন্ধ করতে হবে। তখন নাসির উদ্দীন ইমাম সাহেবকে বললেন―‘এখান দিয়ে যে ট্রাম যায়, এর আওয়াজে কান একেবারে বন্ধ হয়ে যায়। এটা কি বন্ধ করতে পারেন না? নামাজ পড়েন কীভাবে? গান তো ভালো সুরে হয়। ঐরকম শব্দ হয় না। আপনি কেন ট্রাম চলাচল বন্ধ করেন না? ট্রাম গাড়ির শব্দ যদি বন্ধ করতে পারেন, তাহলে আমিও এই গানবাজনা বন্ধ করে দেব।’ এর পর ইমাম সাহেব আর নজরুলের সঙ্গীতচর্চার বিরোধিতা করে অভিযোগ নিয়ে আসেননি।

সওগাত অফিসে লেখকদের যে মজলিশ বসত তার মধ্যমণি ছিলেন কবি নজরুল। তাঁর নতুন নতুন গান লেখা আর শ্রোতাদের সামনে তা পরিবেশন করে তিনি রীতিমতো হিরো হয়ে উঠেছিলেন। অনেক সময় হাস্যরসের কবিতা ও গান গেয়ে শ্রোতাদের মনোরঞ্জন করতেন। সে আসরে প্রায়ই আসতেন হাসির রাজা শরৎচন্দ্র পণ্ডিত আর নলিনীকান্ত সরকার। তাঁদের একটি বিখ্যাত গান ছিল―

‘মরি হায় কলিকাতা কেবল ভুলে ভরা। উল্টা ডিঙ্গির খালে গিয়া দেখি সোম ডিঙ্গি ভরা, শ্যামবাজারে গিয়ে দেখি শ্যাম গেছেন অনেক দূর…।’

এসব আসরে সম্পাদক নাসির উদ্দীন সবসময় হাজির থাকতে পারতেন না। পত্রিকার কাজে সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকতে হতো। লেখা সংগ্রহ, কম্পোজ, প্রুফ, কাগজ, ব্লক, ছবির বিষয় নিয়ে তাঁকে নানা জায়গায় দৌড়াদৌড়ি করতে হতো। সওগাতের আসর সামলাতেন নজরুল। তাঁকে ঘিরে জমজমাট আড্ডা জমত সেখানে প্রতিদিনই নতুন লেখকের আগমন হতো। তাদেরকে উৎসাহ দেওয়া হতো। অনেকের প্রথম লেখা সওগাতে ছাপা হয়েছে। এতে  তারা উৎসাহ পেতো। পরবর্তীকালে এদের অনেকেই বাংলা সাহিত্যের নামকরা লেখক হয়েছিলেন।

এক্ষেত্রে বেগম সুফিয়া কামালের নাম সর্বাগ্রে আসে। কবি নজরুলের মতো তাঁরও প্রথম লেখা সওগাতে ছাপা হয়েছিল। তখন অনেক খোঁজাখুঁজি করে সম্পাদক নাসির উদ্দীন লেখিকা পাচ্ছিলেন না। ঠিক সেই সময় এক আত্মীয়ের মাধ্যমে সুফিয়া কামাল একটি কবিতা পাঠিয়েছিলেন সওগাত অফিসে। তবে তখন তাঁর নাম ছিল সুফিয়া এন. হোসেন। ঘরে বসে কবিতা লিখতেন। পরিবারের ভয়ে সে কবিতা বাইরে পাঠাতে পারতেন না। কোনও মেয়ের হাতের লেখা পরপুরুষে দেখলে নাকি সে মেয়ের পর্দা নষ্ট হয়ে যায়। কবিতাটি সম্পাদক নাসির উদ্দীন ও কবি নজরুল ঠিকঠাক করে ছেপে দিলেন। কবিতার নাম―‘আমার এ বনের পথে ভুলে করতো না কেউ আসা যাওয়া।’ সুফিয়া কামালের এই কবিতা দেখে কাজী নজরুল রীতিমতো লাফিয়ে উঠলেন। বললেন―‘আমি আগেই ওর নাম শুনেছি। বলে দিচ্ছি ও মস্ত বড় কবি হবে। বাংলাদেশের মস্ত বড় একজন মহিলা কবি হবে সে। আপনি ওর লেখা আনেন।’

নজরুলের মুখে প্রশংসা শুনে নাসির উদ্দীন বিষয়টি গুরুত্ব দিলেন। সুফিয়া কামালের কবিতা ছাপা হওয়ার পর কলকাতার আরও অনেক কবি-সাহিত্যিক প্রশংসা করতে লাগলেন। এর পর সুফিয়া কামালের পুরো খাতাটি এনে কবিতাগুলো নজরুলের হাতে সংশোধিত হয়ে সওগাতে ছাপা হতে থাকে। পাঠকদের মনে আগ্রহ সৃষ্টি হয় তাঁকে নিয়ে। মুসলমান নারী হয়ে কবিতা লিখতে পারে এমন মহিলা কি বাংলাদেশে আছেন ? আর কেইবা এই সুফিয়া? কে এই সুফিয়া এন. হোসেন? এভাবে দুই বাংলার কবি সুফিয়া কামালকে নিয়ে রীতিমতো হৈচৈ শুরু হয়। অবশ্য শায়েস্তাগঞ্জের জমিদার তনয়া সুফিয়া কামালের প্রথম লেখালেখি শুরু হয়েছিল বরিশালে। তখন অবশ্য তিনি তেমন পরিচিত কেউ ছিলেন না। কলকাতা এসে অনেকটা অন্তরালে থেকেই তিনি লেখালেখি করতেন। বোরকা পরে চলাফেরা করতেন। সওগাতে কবিতা ছাপা হওয়ার পর একজন সঙ্গী নিয়ে তিনি বোরকা পরেই সওগাত অফিসে হাজির হলেন। তখন নাসির উদ্দীন বললেন, ‘তুমি কবি হয়ে বোরকা পড়লে কেমন দেখায়।’ এ কথা শুনে তিনি সঙ্গে সঙ্গে বোরকা খুলে সঙ্গীর হাতে দেন। এর পর থেকে অনেকবার তিনি সওগাত অফিসে আসা-যাওয়া করেছেন। পারিবারিক ও সামাজিক কারণে বাসা থেকে বোরকা পরে বের হলেও সওগাত অফিসে এসে তা খুলে ফেলতেন।

সমাজকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সুফিয়া কামাল সওগাতে একটার পর একটা কবিতা লিখে যান। তাঁর পথ ধরে তখন অনেক নারী লেখালেখির সাহস করেন। অনেকে সওগাতে কবিতা লেখা শুরু করেন। এদের মধ্যে নুরুন্নেসা বিদ্যাবিনোদিনী ও আয়েশা আহমদ অন্যতম ছিলেন। বেগম রোকেয়া তো ইতোমধ্যে বিভিন্ন পত্রিকায় লেখালেখি করে দুঃসাহসিকতার স্বাক্ষর রেখেছিলেন। তিনি ভাই গিরিশচন্দ্র সেন (প্রথম বাংলায় কোরান অনুবাদক) সম্পাদিত মহিলা পত্রিকায় নিয়মিত লিখতেন। ১৮৯৫ থেকে ১৮৯৬ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে পত্রিকাটি প্রকাশিত হয়। গিরিশচন্দ্র স্নেহ করে রোকেয়াকে ‘মা’ বলে সম্বোধন করতেন। বেগম রোকেয়ার নারীবাদী হয়ে উঠার পিছনে ভাই গিরিশচন্দ্রের অবদান অনেক। এই বিষয়ে অনুসন্ধানী গবেষকরা খোঁজ খবর নিলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ উপাত্ত বের করতে পারবেন। সওগাতে নারী লেখিকাদের অধ্যায়টি কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। তখন ৮/১০ জন নারী লেখক সওগাত মাতিয়ে রাখতেন।

বেগম পত্রিকা সম্পাদক নূরজাহান বেগমের স্মৃতিচারণ থেকে জানা যায়, ১৯২৬ খ্রিষ্টাব্দ থেকে সুফিয়া কামাল সওগাতে লিখতে শুরু করেছিলেন। সামাজিক ও ধর্মীয় গোঁড়ামির জন্য তিনি পত্রিকায় কোনও ছবি ছাপতে পারেননি। এমন কি ১৯২৯ খ্রিষ্টাব্দে সওগাতের প্রথম মহিলা সংখ্যায়ও সুফিয়া কামাল ছবি দেননি, ১৯৩০ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর ছবি প্রথম সওগাত মহিলা সংখ্যায় ছাপা হয়। মোহাম্মদ নাসির উদ্দীন স্বয়ং সুফিয়া কামালকে স্টুডিওতে নিয়ে গিয়ে ছবি তুলেছিলেন। সওগাত মহিলা সংখ্যায় পাতাজুড়ে মেয়েদের ছবি ছাপার ফলে ধর্মান্ধদের কাছে বিষয়টি মারাত্মক বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। তারা হুমকি ধামকি দিয়ে এর পদযাত্রা বিঘ্নিত করার চেষ্টা চালায়। কিন্তু নাসির উদ্দীন সব উজান স্রোতকে পায়ে সরিয়ে সমাজকে আলোকিত করার পথে এগিয়ে যান।

মোহাম্মদ নাসির উদ্দীন সম্পাদক হিসাবে সওগাতকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি সওগাতের মহিলা সংখ্যা প্রকাশ করে রীতিমতো তোলপাড় সৃষ্টি করে দিয়েছিলেন। অনেক হিন্দু সম্পাদক পর্যন্ত সেটা করার সাহস পাননি। এটা করতে গিয়ে তাঁকে রীতিমতো যুদ্ধ করতে হয়েছিল। মোহাম্মদ নাসির উদ্দীন তাঁর স্মৃতিকথায় উল্লেখ করেন―‘মহিলা সওগাত বের করব দেখি তারা কি করে? কিন্তু কাজটা করতে গেলে তো মহিলাদের লেখা আর তাদের ছবি লাগবে। তখনকার সময় ছবি যোগাড় করা ছিল বেশ মুশকিলের বিষয়। একজন এসে বললেন, ব্যাটা তো বড় বদমাশ, পরের বউয়ের ছবি ছাপায়, নিজের বউয়ের ছবি ছাপিয়ে দেখুক না। দেখা যাবে কত বড় তার বুকের পাটা। তখন আমি আমার স্ত্রীকে নিয়ে গেলাম ফটো তুলতে। ওরও ছবি ছাপলাম। তারপর মহিলা সংখ্যা বের হলো, কিন্তু বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একটা ভারী মজার ব্যাপার ঘটলো, সেটা নিয়ে আমার এখনো মনে হাসির উদ্রেক হয়। মহিলা সংখ্যা যেদিন বের হয়, সেদিন সওগাত অফিসে সবচেয়ে বেশি ভিড় করেছিলেন মোল্লারাই। তাদের প্রত্যেকের মাথায় সাদা টুপি। এই রকম একটা অদ্ভুত জিনিস মুসলমান সমাজে বেরিয়েছে, মেয়েদের ছবি ছাপা হয়েছে, আর আমরা দেখবো না। একদিকে ধর্মের কথা বলে, আর অন্যদিকে মেয়েদের ছবি না দেখলে তাদের চলবে না।’

সওগাত গোষ্ঠীর অন্যতম সদস্য আবুল মনসুর আহমদ লিখেছেন, ‘মুসলমানদের কোনো কাগজের অফিসে হকারদের এরকম ঠেলাঠেলি এর আগে কখনো দেখিনি। আমি দোতলা থেকে দেখতাম আর হাসতাম। এ কী কাণ্ড, এরা যে ধর্মের কথা বলে সেটা তাহলে ধর্মের কথা নয়, এরা তাহলে ওটা নিয়ে ব্যবসা করে।’ তখন আবুল মনসুর আহমদ ছাড়াও সহকারী সম্পাদক হিসাবে মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী, আবুল কালাম শামসুদ্দীন প্রমুখ ছিলেন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব নিয়ে। সওগাত গোষ্ঠীতে যুক্ত ছিলেন হবীবুল্লাহ বাহার, খান মুহাম্মদ মঈনুদ্দীন প্রমুখ। তবে ওদেরকে পিছনে ফেলে দিয়ে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম সওগাত জুড়ে বিচরণ করতে থাকেন। বিশেষ করে ১৯২৬ খ্রিষ্টাব্দে গড়ে ওঠা সওগাত সাহিত্য মজলিশ কবি নজরুলের কবজায় চলে যায়। তাঁর আগমনে সওগাত দপ্তরে তরুণ লেখকরা মৌচাকের মতো ভিড় করতে থাকেন। দল ভারী হলেও ধর্মান্ধরা সুযোগ পেলেই নাসির উদ্দীন আর তাঁর পত্রিকা সওগাতের উপর চড়াও হতো। একবার ফরিদপুরের হাজী শরীয়তুল্লাহর পুত্র পীর বাদশা মিয়া (১৮৮৪-১৯৫৯) ফতোয়া জারি করলেন―‘পত্রিকায় মুসলমান মেয়েদের ছবি ছেপে মোহাম্মদ নাসির উদ্দীন ধর্ম অবমাননা করছেন।’ অবশ্য নাসির উদ্দীন এর পাল্টা ফতোয়া দিয়েছিলেন এভাবে―‘টাকা-পয়সায় ব্রিটেনের রানির ছবি পকেটে নিয়ে নামাজ পড়াও জায়েজ নয়। কেউ টাকা-পয়সা বাইরে রেখে নামাজ পড়েন না।’ এই কথা শুনে পীর বাদশা মিয়া আর কোনও কথা না বলে সোজা সচিত্র সওগাত পত্রিকার গ্রাহক হয়েছিলেন।

কলকাতা পর্বে সওগাত সম্পাদক নাসির উদ্দীন আর বিদ্রোহী কবি নজরুলের অনেক স্মৃতি রয়েছে। যা বর্ণনা করতে গিয়ে নাসির উদ্দীন একটি আস্ত বই লিখেছিলেন। বইটি এখন আর সুলভ নয়। তাই কিছু ঘটনা এখানে বর্ণনা করা প্রাসঙ্গিক মনে করছি। নজরুল কবিতা লিখতে গিয়ে কীভাবে গজল লেখায় আসক্ত হয়েছিলেন, এর চমৎকার একটি বিবরণ নাসির উদ্দীন দিয়েছিলেন। স্মৃতিকথায় তিনি উল্লেখ করেন, কবি নজরুল এখন সওগাতে লেখালেখি নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত। এক পর্যায়ে তিনি নাসির উদ্দীনের কাছে এসে বললেন মিশর থেকে ফৌজিয়া নাম্মী একজন শিল্পী কলকাতায় এসেছেন। তিনি আলফ্রেড মঞ্চে আরবি সঙ্গীত পরিবেশন করবেন, তিনি গানের পাশাপাশি ভালো নাচও করেন। তাই তার অনুষ্ঠান দেখা উচিত। এই সংবাদ শুনে নাসির উদ্দীন তখন খান মুহাম্মদ মঈনুদ্দীনকে টাকা দিয়ে তিনটি আপার ক্লাসের টিকিট আনালেন। তিনজন আলফ্রেড মঞ্চে মিশরীয় শিল্পীর নাচ ও আরবি গান শুনলেন। কিন্তু আরবি ভাষা দুর্বোধ্য হওয়ায় তাদের মন ভরল না। এরপর শিল্পী যখন একটি উর্দু গজলে টান দিলেন তখন সবাই যেন বিমোহিত হয়ে গেলেন। কবি নজরুল এই গজলে যেন ডুবে যান। সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলেন―‘এই মুহূর্তে  আমার একটি গজল লিখতে ইচ্ছে করছে। আমি একটি গজল লিখব, এই মাসের সওগাতে তা ছাপতে হবে।’ ঠিকই তিনি গজল লেখা শুরু করলেন। সওগাতে প্রথম ছাপা গজলের দুই লাইন ছিল―

‘আছি এ বসন্ত ফুলবনে

সাজে বনভূমি সুন্দরী’

এই গজলটি ছাপার পর নজরুল শুধু গজল লিখেই যাচ্ছেন। ফৌজিয়ার উর্দু গজলের ঘোর যেন তাঁর কাটছিলই না। সওগাতের জন্য একটার পর একটা গজল লিখে যাচ্ছিলেন। গজল লেখায় যেন তাঁর কোনও ক্লান্তি নেই। গজলে আলাদা একটা সাহিত্য গন্ধ থাকায় তা সওগাতে ছাপা হতে থাকে। পাঠক সমাজ সেটা লুফেও নেয়। সঙ্গত কারণে কবিতা লেখার দিকে তাঁর মন যেন যেতে চায় না। কবিতা লিখতেন খেয়ালখুশি মতো। ঢাকায় ফজিলাতুন্নেসার প্রেমে পড়ার পর কবি নজরুল লিখলেন ‘রহস্যময়ী’ কবিতা। সওগাতের জন্য তিনি অনেক লিখতেন। কিন্তু মোহাম্মদ নাসির উদ্দীন তাঁর সব লেখা ছাপতেন না। তবে কবি নজরুলকে তিনি মন থেকে খুবই পছন্দ করতেন। ১৯২৭ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ মাসে কলকাতা অ্যালবার্ট হলে তিনি নজরুলকে আর্থিক সাহায্য দেওয়ার জন্য ‘নজরুল সাহায্য রজনী’ আয়োজন করেছিলেন। সওগাতে নজরুলের ৮০টি কবিতা, গজল, গল্প প্রভৃতি ছাপা হয়েছিল। শুধু কবি নজরুলকেই নয়, মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলীকে সওগাতে চাকুরি দেওয়া ছাড়াও তাঁকে বড় ধরনের বিপদ থেকে রক্ষা করেছিলেন নাসির উদ্দীন। একবার কোনও এক প্রকাশক মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলীর একটি ইসলামি বই ছাপার ইচ্ছা প্রকাশ করে। পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে গ্রাহকদের কাছ থেকে মিনার কোম্পানি নামে সেই প্রকাশক অনেক টাকা সংগ্রহ করে আর বইটি প্রকাশ করেনি। ফলে গ্রাহকদের কেউ থানায় অভিযোগ করেন, লেখক ওয়াজেদ আলী বই না লিখে তাদের টাকা আত্মসাৎ করেছেন। অথচ গ্রাহকের টাকা আত্মসাতের কথা লেখক জানতেন না। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে লেখককে পুলিশ গ্রেফতার করল। তখন বিষয়টি মওলানা আকরম খাঁকে জানানো হলে তিনি ওয়াজেদ আলীর জামিন করাতে থানায় যেতে অস্বীকার করেন। খবরটি শুনে সঙ্গে সঙ্গে থানায় গিয়ে নাসির উদ্দীন তাঁর জামিন প্রার্থনা করেন। অনেক দূর থেকে একজন মুসলমান উকিল সংগ্রহ করেছিলেন।

কলকাতায় সওগাত বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। অনেকেই মনে করেছিলেন গোঁড়া মুসলমানদের বিরোধিতায় কিছুদিন পর তা বন্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু নাসির উদ্দীন তাঁর কঠোর পরিশ্রম, মেধা আর যোগ্যতায় পত্রিকাটিকে হিন্দু-মুসলিম সবার প্রিয় পত্রিকায় পরিণত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। সে সময় মুসলমান সম্পাদিত কোনও কাগজের গ্রাহক ৫০০ হলেই সন্তুষ্টি প্রকাশ করা হতো। কিন্তু সওগাত সে রের্কড ভাঙতে সক্ষম হয়। তিনি এক হাজার দুই হাজার করে পত্রিকার সার্কুলেশন ১৭ হাজার পর্যন্ত নিয়ে গিয়েছিলেন। যার অধিকাংশই ছিল বাৎসরিক গ্রাহক। তাদের ঠিকানায় ডাকযোগে সওগাত পাঠানো হতো। এত বিপুল পরিমাণ সওগাত নিয়ে ডাক বিভাগ রীতিমতো বিপাকে পড়ে যেত। কারণ নির্দিষ্ট কর্মচারী দিয়ে সওগাত ডাকে পাঠাতে তাদের খুবই সমস্যায় পড়তে হতো। তাই ডাক বিভাগ থেকে সওগাত সম্পাদক বরাবর চিঠি দেওয়া হতো যেদিন পত্রিকা পাঠানো হবে এর ২/৩ দিন আগে যেন ডাক বিভাগকে জানানো হয়। সেদিন তারা প্রস্ততি গ্রহণ ছাড়াও অতিরিক্ত লোক নিয়োগ নিয়ে রাখবেন।

সওগাতের নতুন ও সৃজনশীল দৃষ্টিভঙ্গি পাঠকদের কাছে বেশ গ্রহণযোগ হয়ে উঠেছিল। বিশেষ করে মুসলমান ঘুণে ধরা সমাজকে আঘাত করার শক্তি সওগাত পত্রিকার চলার পথকে মসৃণ করে দিয়েছিল। কাজী নজরুল, আবুল মনসুর আহমদ, মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী, আবুল কালাম শামসুদ্দীন, কাজী আবদুল ওদুদ, আবুল ফজল, মোহাম্মদ বরকতুল্লাহ, শামসুন্নাহার মাহমুদ, শাহাদাৎ হোসেন, বেগম রোকেয়া, সুফিয়া কামাল, সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখায় সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছিল সওগাত। এই জনপ্রিয়তার আরেকটি কারণ ছিল বাৎসরিক সওগাত প্রকাশ। যাতে ভলিউম হিসেবে পুরো বছরের সব সংখ্যা বাঁধাই করা থাকত। অন্যান্য পত্রিকা বাজারে মাসের পর মাস থাকলেও সওগাত দুই তিন সপ্তাহের মধ্যে শেষ হয়ে যেত। পাঠকরা পত্রিকা স্টলে বার্ষিক সওগাত না পেয়ে অফিসে হানা দিতো। তখন পাঠকের চাহিদা মেটানোর জন্য নাসির উদ্দীনকে বার্ষিক সওগাত দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় সংস্করণ ছাপাতে হতো।

বার্ষিক সওগাত প্রকাশ করে সফল হওয়ার পর ১৯৩০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে নাসির উদ্দীন বার্ষিক মহিলা সওগাত প্রকাশ করতে শুরু করেন। যা ১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। এই মহিলা সওগাত নারীদের লেখা ও ছবিতে পরিপূর্ণ ছিল। বেগম সুফিয়া কামাল ও নূরজাহান বেগম এতে সার্বিক সহযোগিতা করতেন। মহিলা সওগাতে লেখার জন্য বেগম রোকেয়া, সৈয়দা মোতাহেরা বানু, নুরুন্নেসা খাতুন, মাহমুদা খাতুন সিদ্দিকা, শামসুন নাহার মাহমুদ প্রমুখ এগিয়ে এসেছিলেন। নূরজাহান বেগমের স্মৃতিচারণ থেকে জানা যায়, ১৩৩৬ বঙ্গাব্দের ভাদ্র মাসে ৩০ জন নারীর বিভিন্ন লেখা ছাপা হয় প্রথম সওগাতের মহিলা সংখ্যায়। এতে ৮৩টি হাফটোন ছবি ছাপা হয়েছিল। সে যুগে এমন দুঃসাহসিক পদক্ষেপ কোনও মুসলিম সম্পাদক করার সাহস না পেলেও নাসির উদ্দীন সেটা করার দুঃসাহস করেছিলেন। সওগাতের সাফল্যে নাসির উদ্দীন আরও উৎসাহিত হোন। তিনি সাপ্তাহিক সওগাতের পাশাপাশি বেগম নামে একটি পত্রিকা প্রকাশের উদ্যোগ নেন। সওগাতকে সর্বজনীন করে শুধু নারীদের নিয়ে একটি আবহ গড়ে তোলার জন্যই তিনি কলকাতার বুকে বসে ১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দের ২০ জুলাই বেগম পত্রিকা প্রকাশ করেন। প্রথম সম্পাদক করা হয় বেগম সুফিয়া কামালকে। প্রথম সংখ্যা ছাপা হয় ৫০০ কপি। প্রতি কপির মূল্য চার আনা। বেগম রোকেয়ার ছবি দিয়ে প্রচ্ছদ করা হয়েছিল।

প্রথম সংখ্যা বেগমের সম্পাদকীয়তে সুফিয়া কামাল  লেখেন―‘সুধী ব্যক্তিরা বলেন, জাতি গঠনের দায়িত্ব প্রধানত নারীসমাজের হাতে, কথাটা অনস্বীকার্য, এবং এই গুরুদায়িত্ব পালন করতে হলে পৃথিবীর কোনও দিক থেকেই চোখ ফিরিয়ে থাকলে আমাদের চলবে না, এ কথাও মানতে হবে। শিল্প বিজ্ঞান থেকে আরম্ভ করে গৃহকর্ম ও সন্তান পালন সর্বক্ষেত্রে আমরা সত্যিকার নারীরূপে গড়ে উঠতে চাই।’

সচিত্র নারী সাপ্তাহিক কলকাতায় শুরুর কিছু দিন পর বেগম সুফিয়া কামাল ঢাকায় চলে আসেন। তখন বেগমের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হন নূরজাহান বেগম। ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতায়ই বেগম পত্রিকার প্রথম ঈদসংখ্যা প্রকাশিত হয়। ২ টাকা দামের এই সংখ্যায় ৬৩ জন নারী লেখকের লেখা স্থান পেয়েছিল, যা রীতিমতো তোলপাড় সৃষ্টি করে। নারীদেরকে প্রকৃত ইসলাম জানানোর জন্য নাসির উদ্দীনের পরিকল্পনায় ১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দে বেগম ‘বিশ্বনবী’ সংখ্যা প্রকাশিত হয়। এতে ২৪টি প্রবন্ধ, ২টি সচিত্র প্রতিবেদন ও ৪টি কবিতা স্থান পেয়েছিল। ১৯৫০ খ্রিষ্টাব্দে বেগম ঢাকায় স্থানান্তরিত হয়। নূরজাহান বেগম এর সর্বসর্বা হয়ে ওঠেন।

কলকাতায় সওগাত জনপ্রিয়তার শীর্ষে ওঠার পর আরও কিছু বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করেছিল। এর মধ্যে অন্যতম বিশ্বযুদ্ধ সংখ্যা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পৃথিবীকে পরিবর্তন করে দিয়েছিল। যার প্রভাব পড়েছিল অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে। যুদ্ধপূর্ব আর পরবর্তী পৃথিবী ভিন্নরূপে দেখা দেয় মানুষের কাছে। সেই চিন্তাভাবনা থেকে নাসির উদ্দীন ১৩৪৯ বঙ্গাব্দের অগ্রহায়ণ মাসে সওগাত যুদ্ধ সংখ্যা প্রকাশ করেন। যার মূল্য রাখা হয় এক টাকা, বিদ্রাহী কবি কাজী নজরুলের ‘মহা-সমর’ কবিতা দিয়ে সংখ্যা শুরু করা হয়। সেই কবিতার কয়েক চরণ নিম্নরূপ―

তৌহীদ আর বঙ্গত্ববাদ বেধেছে আজিকে মহা-সমর,

লা-শরীক ‘এক’ হয়ে জয়ী কহিছে ‘আল্লাহু আকবর।’

জাতিতে জাতিতে মানুষে মানুষে অন্ধকারের এ ভেদ-জ্ঞান,

অভেদ ‘আহদ’ মন্ত্রে টুটি যে, সকলে হইবে এক সমান।

এক সূর্যের মাঝে রহে দেখ অনন্ত রং-তবু তারা

পরম  শুভ্র এক রঙে হয় একাকার, হয় রং হারা।

যুদ্ধ সংখ্যায় সম্রাট ষষ্ঠ জর্জের চাররঙা ছবি ছাড়াও চার্চিলের প্রথম মন্ত্রিসভার ছবি ছাপা হয়। ব্রিটেনে রাজা-রানি যুদ্ধে নিহত আহতদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলছেন এমন একটি ছবিও ছাপা হয়।

এতে স্থান পায় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের যুদ্ধ প্রচেষ্টা, প্রথম মহাযুদ্ধের পরবর্তী বিশ বছর, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের গোড়ার কথা, সংগ্রামের সূচনা, কিরূপে যুদ্ধ আরম্ভ হলো, ব্রিটেন ও ফ্রান্সের যুদ্ধায়োজন, সংগ্রামবিধ্বস্ত পোল্যান্ড, হিটলারের শান্তি প্রস্তাব, নিরপেক্ষ রাষ্ট্রসমূহের অবস্থা, রুশ-ফিনিশ সংগ্রাম, জার্মানির ডেনমার্ক ও নরওয়ে অভিযান, নার্ভিকের যুদ্ধ, লুক্সেমবার্র্গ আক্রমণ, হল্যান্ড অধিকার, বেলজিয়ামের পতন, ফ্লান্ডার্সের সংগ্রাম, ফ্রান্সের সংগ্রাম, যুদ্ধ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ফরাসি নৌবহর নিরস্ত্রীকরণ, ইতালির সংগ্রাম, যুদ্ধবিরতির  চুক্তি,  ব্রিটেন ও জার্মানির সংগ্রাম, তুরস্ক ও মুসলিম জগৎ, চীন-জাপান সংগ্রাম, যুদ্ধের ডায়েরি প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ লেখা। এর সঙ্গে শত শত ছবি ও যুদ্ধবিষয়ক কার্টুন ছাপা হয় সওগাতের যুদ্ধসংখ্যায়। এই সংখ্যাটি এক অমূল্য দলিল।

এই বিশেষ সংখ্যাটির পেছনে বাংলার বাঘ খ্যাত এ কে ফজলুল হকের উৎসাহ ও আর্থিক সহযোগিতা ছিল। নাসির উদ্দীন ও ফজলুল হক কলকাতায় তালতলা এলাকায় বাস করতেন। দুজনের বাসস্থান প্রায় কাছাকাছি ছিল। পত্রিকা প্রকাশ করার সময় নাসির উদ্দীন বড় বড় নেতাদের এড়িয়ে চলতেন।

কিন্তু শেরে বাংলা ফজলুল হক একই এলাকায় বাস করতেন বলে হঠাৎ করেই দেখা হয়ে যেত। একদিন পথে দেখা হলে ফজলুল হক তাঁকে বলেন―‘পাশের বাড়িতে আপনি থাকেন। আমার স্ত্রী জিনাতুন্নেসা আপনার পত্রিকার নিয়মিত পাঠিকা। সওগাত আমার ঘরে এখনো বাঁধাই করা আছে। আর আপনি কি না আমার বাড়িতে একদিনও এলেন না। দেখাও করলেন না! এটা কী রকম ব্যাপার বলুন তো!’

নাসির উদ্দীন এর জবাবে বললেন ‘আমি তো একজন ব্যস্ত মানুষ, আর আমি সাধারণত বড়লোকদের বাড়িতে যাই না।’

এ কথা শুনে শেরে বাংলা বললেন ‘মনে কষ্ট পেলাম আপনার কথা শুনে। এই দুঃখ আমার মনে থেকে যাবে। এই পৃথিবীতে আমার চেয়ে গরিব আর কেউ নেই।’

সন্ধ্যার পর দাওয়াত দিলেন শেরে বাংলা। সে দাওয়াত ফেলার ক্ষমতা শুধু সওগাত সম্পাদক নাসির উদ্দীন কেন, বাংলার কোনও সিংহের পক্ষেও সম্ভব নয়। রাতে দাওয়াত খেতে গেলে তিনি নাসির উদ্দীনকে কথা প্রসঙ্গে বললেন, ‘জানেন, আমার নামে কয়টা মামলা আছে? কয়টা ওয়ারেন্ট আছে? আমি দেনার দায়ে ডুবে রয়েছি। বাড়ি থেকে পালিয়ে বেড়াই। আমার নামে কোর্ট থেকে ওয়ারেন্ট আসে। রাতের বেলায় আমি ঘুমাই না। একটা টেবিলের ওপর কোনও মতে মাথা রেখে সারারাত আমি কাত হয়ে পড়ে থাকি।’ মূলত প্রথম স্বায়ত্তশাসনের ওপর ভোটাভুটি হলে শেরে বাংলার সঙ্গে খাজা নাজিমউদ্দিনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয় বরিশালে। তখনই শেরে বাংলাকে দমানোর জন্য নাজিমউদ্দিনের কারসাজিতে হয়রানিমূলক মামলা-মোকদ্দমা আর ওয়ারেন্ট আসে শেরে বাংলার ওপর, কিন্তু বাংলার বাঘকে কি কেউ ঠেকিয়ে রাখতে পারে সেই ভোটে তিনি ১২/১৩ হাজার ভোটে জয়ী হলেন।

যুদ্ধসংখ্যা সম্পর্কে নাসির উদ্দীন সম্পাদকের নিবেদন কলামে লেখেন―‘বর্তমান মহাযুদ্ধের কারণ এবং চাঞ্চল্যকর ইতিহাসের সহিত পরিচিত হইবার জন্য প্রত্যেকেই সবিশেষ আগ্রহশীল। সেই আগ্রহ ও কৌতূহল চরিতার্থের অভিপ্রায় লইয়া আমরা সওগাতের বিশেষ যুদ্ধ সংখ্যা প্রকাশে অগ্রসর হই।

‘এই দুর্দিনে এরূপ ব্যয়বহুল ও শ্রমসাধ্য ব্যাপারের প্রথম প্রচেষ্টা হইতেই বাংলার প্রধানমন্ত্রী মি. এ কে ফজলুল হক আমাদেরকে আন্তরিক উৎসাহ প্রদান এবং শেষ পর্যন্ত সর্বতোভাবে সাহায্য করিয়াছেন। তাঁহার উৎসাহ ও সাহায্য না পাইলে আমাদের এ প্রয়াস কতখানি সার্থক হইত বলা যায় না। তাই আজ সর্ব প্রথম আমরা মাননীয় হক সাহেবকে এবং আরও যেসব উদারচেতা ব্যক্তি নানারূপে আমাদেরকে সাহায্য করিয়াছেন, তাহাদিগকে আন্তরিক ধন্যবাদ জ্ঞাপন করিতেছি।’

কলকাতায় সওগাত অনেকটা অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছিল। অসাম্প্রদায়িক ও কুসংস্কারমুক্ত মানুষের ভরসাস্থল হয়ে উঠেছিল পত্রিকাটি। কিন্তু সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা আর দেশভাগের অস্থিরতায় মোহাম্মদ নাসির উদ্দীনের সব স্বপ্ন ভেস্তে যায়। তাঁর পক্ষে আর কলকাতায় পত্রিকা প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি। গাট্টি-বোচকা বেঁধে শিয়ালদহ থেকে গোয়ালন্দ ঘাট পেরিয়ে তাঁকে ঢাকায় আশ্রয় নিতে হয়। কিন্তু মূল বাধা হয়ে দেখা দেয় যেখানে সচিত্র সওগাত নির্বিঘ্নে ছাপানো যেত সেই ছাপাখানাটি কীভাবে কলকাতা থেকে ঢাকায় তুলে আনবেন? এরও একটি ব্যবস্থা হলো। সওগাত প্রেসটি ঢাকার পাটুয়াটুলীতে অবস্থিত বিজয়া প্রেস-এর সঙ্গে তিনি বিনিময় করলেন। কিন্তু বিজয়া প্রেসের যন্ত্রপাতি তেমন উন্নত ছিল না। লেটার প্রেস মেশিন, টাইপ ব্লক অধিকাংশই ভাঙ্গা ছিল, অন্যান্য সরঞ্জাম ছিল নষ্ট। ছাপাখানার স্থাপনা ছিল টিনের ছাপড়াঘর। ফলে সবকিছু নতুন করে শুরু করতে হয় তাঁকে।

এভাবেই সওগাতের ঢাকা পর্ব শুরু হয়। ৬৬ নম্বর পাটুয়াটুলী হয়ে ওঠে ১১ নম্বর ওয়েলেসলি স্ট্রিটের বিকল্প। ঢাকার মুক্তমনা সাংবাদিক, কবি, লেখক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিরা নাসির উদ্দীনের আগমনকে অভিনন্দন জানান। তাঁরা সওগাত কার্যালয়ে এসে আড্ডা জমাতে থাকেন। দেশভাগের কারণে অনেক কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক কলকাতা থেকে ঢাকায় এসে বসতি স্থাপন করেন। তাঁদের বড় একটি অংশ সওগাতের সঙ্গে যুক্ত হন। কিন্তু বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের কারণে সওগাতের কাজকর্মে ভাটা পড়ে।

মুসলিম লীগারদের বড় একটা অংশ নাসির উদ্দীনকে সন্দেহ করতে থাকে। তারা ধারণা করতে থাকে, ভাষা আন্দোলনকারীদের একটি অংশকে তিনি উসকে দিচ্ছেন। কলকাতায় তো তাঁকে কিছু করা যায়নি। ঢাকায় ঠিকমতো ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। এসব কারণে নাসির উদ্দীন সওগাত প্রকাশ করা নিয়ে দোদুল্যমান হয়ে পড়েন।

এমতাবস্থায় সওগাত কার্যালয়ে হাজির হন একদল তরুণ-যুবক সাংস্কৃতিক কর্মী। যাদের নেতৃত্ব দেন হাসান হাফিজুর রহমান। যারা পকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই ঢাকার সাহিত্যসংস্কৃতিতে অসাম্প্রদায়িক ও মানবিক কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন। তারা নাসির উদ্দীনকে অভিনন্দন জানান। একই সঙ্গে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। এতে তিনি মানসিকভাবে শক্তি অর্জন করেন। নতুন করে সওগাতের ঢাকা পর্ব শুরু করার চিন্তা-ভাবনা করেন। ১৩৬০ বঙ্গাব্দের (১৯৫৩) অগ্রহায়ণে ঢাকায় সওগাতের প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হয়। কলকাতায় যেমন সওগাত শীর্ষে আরোহণ করেছিল, ঢাকা পর্বে সেটা সম্ভব হয়নি। দেশভাগের কারণে তিনি সেই লেখকগোষ্ঠী ফিরে পাননি। সওগাতের প্রাণ কাজী নজরুল ইতঃপূর্বে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন। কলকাতার লেখকদের লেখা সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়ে। তাছাড়া কলকাতার মতো ঝকঝকে ছাপা মেশিন ঢাকায় ছিল না। সঙ্গত কারণে সওগাত আগের মতো জমজমাট হয়ে দাঁড়াতে পারেনি।

কলকাতায় যেমন সওগাত সাহিত্য মজলিশ-এর মাধ্যমে অসংখ্য কবি-সাহিত্যিক জড়ো করেছিলেন, তেমনি ঢাকায় পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সংসদের মাধ্যমে একই প্রচেষ্টা চালান। সেই সাহিত্য সংসদের সভাপতি ছিলেন কাজী মোতাহার হোসেন ও ফয়েজ আহমদ ছিলেন সাধারণ সম্পাদক। সেই সাহিত্য আড্ডায় শওকত ওসমান, আবুল হোসেন, মুনীর চৌধুরী, শামসুর রাহমান, খালেদ চৌধুরী, আল মাহমুদ, আলাউদ্দিন আল আজাদ, সরদার জয়েন উদ্দিন, ফজলে লোহানী, কামাল লোহানী, বদরুদ্দীন উমর, আনিসুজ্জামান, আশরাফ সিদ্দিকী ও সৈয়দ শামসুল হকসহ দুই শতাধিক সদস্য হাজির হতেন।

ঢাকায় সওগাত পত্রিকার নিয়মিত লেখক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন কাজী মোতাহার হোসেন, আবুল হোসেন, সুফিয়া কামাল, শামসুন নাহার মাহমুদ, মাহমুদা খাতুন সিদ্দিকা, আবদুল গনি হাজারী, সরদার জয়েনউদ্দীন, কামরুল হাসান, মুস্তফা নূর উল ইসলাম, ফজলে লোহানী, শামসুর রাহমান, শহীদুল্লা কায়সার, আবদুল্লাহ আল মুতী, ফয়েজ আহমদ, লায়লা সামাদ, ওমর আলী, আল মাহমুদ, হাসান হাফিজুর রহমানসহ আরও অনেক তরুণ কবি ও লেখক।

সওগাত নির্জীব হয়ে পড়লেও সওগাত কার্যালয় জমজমাট হয়ে ওঠে সচিত্র বেগম পত্রিকা ও বেগম ক্লাব-এর কল্যাণে। কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত বেগম ঢাকায় নবরূপে আবির্ভূত হয়। নাসির উদ্দীনের কন্যা নূরজাহান বেগম শক্ত হাতে এর সম্পাদনার ভার তুলে নেন। তাঁর সহযোগিতায় এগিয়ে আসেন বেগম-এর প্রথম সম্পাদক কবি সুফিয়া কামাল, শামসুন নাহার মাহমুদ প্রমুখ। বেগম ক্লাবের সভাপতি করা হয় শামসুন নাহার মাহমুদকে। বেগম সুফিয়া কামালকে প্রধান উপদেষ্টা করা হয়। ১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ ডিসেম্বর বেগম ক্লাবের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়। নূরজাহান বেগম ঢাকায় সব মহিলা লেখকদের জড়ো করে বেগম যুগের সূচনা করেন। সচিত্র বেগম পারিবারিক কাগজ হয়ে ওঠে। বিশেষ করে ‘ঈদসংখ্যা’ বেগম অভিজাত শিক্ষিত মহলের ড্রয়িংরুমে জায়গা করে নেয়। মিঠাই-সেমাইয়ের মতো বেগম ঈদের সদাই হিসাবে আবির্ভূত হয়। তবে এসব কিছুর নেপথ্য নায়ক ছিলেন মোহাম্মদ নাসির উদ্দীন। তাঁর পরিকল্পনা ও নির্দেশে ঢাকায় সওগাত কার্যালয় আর বেগম পত্রিকা টিকে ছিল দীর্ঘদিন। বয়োবৃদ্ধ নাসির উদ্দীন মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ১০৩ বছর বয়স পর্যন্ত সক্রিয় ছিলেন। আমন্ত্রণ পেলে কোনও অনুষ্ঠান বাদ দিতেন না। শেষ বয়সে চোখে দেখতেন না। মোটা পাওয়ার লেন্সের সাহায্যে বক্তব্য পড়তেন। সাদা কাগজে বড় বড় অক্ষরে বক্তব্য লিখে নিয়ে যেতেন। হাজার হাজার মানুষ এই বটবৃক্ষের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতেন। তিনি পিছিয়ে পড়া মুসলিম সমাজকে জাগিয়ে তোলার জন্য সর্বদা জাগ্রত ছিলেন। কাঠমোল্লাদের ধর্মব্যবসায় আঘাত করে মনে সান্ত্বনা পেতেন। সেজন্য তিনি শতবর্ষী জীবনে অনেক হুমকি-ধামকি, গালিগালাজ ও নাস্তিক আখ্যা পেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি নিজ আদর্শ থেকে একচুলও নড়েননি।

তিনি সওগাত চালাতে গিয়ে একটি নীতিমালা তৈরি করে তা বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছিলেন। এই নীতিমালা নিম্নরূপ―

 ১.           লেখককে স্বাধীন মতপ্রকাশের সুযোগ এবং মুক্তবুদ্ধি ও স্বাধীন চিন্তাসমৃদ্ধ রচনাকে অগ্রাধিকার প্রদান করা হবে।

২.           প্রথম শ্রেণির মাসিকের (পরে সাপ্তাহিক) আদর্শ প্রবন্ধ, গল্প, উপন্যাস প্রভৃতি ছবি দ্বারা পত্রিকার অঙ্গসৌষ্ঠব বৃদ্ধি করা হবে।

৩.           সমাজের অজ্ঞতা ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে আন্দোলন পরিচালনা করা হবে।

৪.           নারীশিক্ষা ও নারী জাগরণমূলক প্রবন্ধাদি এবং চিত্র মহিলা জগৎ বিভাগে অন্তর্ভুক্ত করে মহিলাদেরকে সাহিত্য সাধনা ও সমাজসেবামূলক কাজে উৎসাহিত করা হবে।

৫.           নতুন সাহিত্যিক সৃষ্টির উদ্দেশ্যে তরুণ লেখকগণদের রচনা প্রকাশ করে তাঁদের উৎসাহিত করা হবে।

৬.           নির্ভীক ও নিরপেক্ষ সম্পাদকীয়- নীতি গ্রহণ করতে হবে।

মোহাম্মদ নাসির উদ্দীন ও সওগাত পত্রিকার নিরপেক্ষতা ও সাহসিকতা নিয়ে প্রখ্যাত সাহিত্যিক সাংবাদিক আবুল কালাম শামসুদ্দীন অতীত দিনের স্মৃতি গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন―

১.            সৈয়দ এমদাদ আলী তখনকার মুসলিম বাংলা সাহিত্যের দিকপাল হওয়াতে আবুল কালাম শামসুদ্দীন বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকায় প্রতিবাদ প্রবন্ধ পাঠানোর সাহস পেলেন না। কিন্তু সওগাত বরাবর পাঠিয়ে দিলেন। এখানে বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা এবং সওগাতের মধ্যকার সাহিত্য প্রাধান্যতার পার্থক্য স্পষ্ট লক্ষ করা যায়।

২.           নবনূর পত্রিকার সম্পাদক সৈয়দ এমদাদ আলী তখনকার ‘মুসলিম বাংলা সাহিত্যের দিকপাল’ হওয়া সত্ত্বেও তাঁর সমালোচনার বিরুদ্ধে এক আনাড়ি সাহিত্যিকের প্রতিবাদ প্রবন্ধ দীর্ঘ ৯ পৃষ্ঠা জুড়ে প্রকাশ করে সওগাত।

৩.           সৈয়দ এমদাদ আলী, আবুল কালাম শামসুদ্দীন, নলিনীকান্ত ভট্টশালী এবং মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী প্রত্যেকের লেখাই সওগাত প্রকাশ করে। আমরা অত্যন্ত আশ্চর্য হয়ে লক্ষ করছি, কবি কায়কোবাদের মহাশ্মশান নিয়ে  বিতর্কে প্রতিবাদ পাল্টা প্রতিবাদ, মধ্যস্থতা সকল প্রবন্ধ প্রকাশ করে সওগাত। এখানে সওগাতের পক্ষপাতমুক্ত সাহিত্য মানস প্রকটরূপে ধরা পড়ে যে পক্ষপাতমুক্ত সাহিত্যমানস বর্তমান সময়েও দুর্লভ।

৪.           কয়েক মাস ধরে সওগাতে আমার ‘কাব্য সাহিত্য বাঙালি মুসলমান’ শীর্ষক লেখাটি প্রকাশিত হয়। এ প্রবন্ধে আমি পুঁথি সাহিত্যের যুগ থেকে নজরুল ইসলাম পর্যন্ত বাংলায় মুসলমান কবিদের কাব্য-সাধনার সংক্ষিপ্ত আলোচনা করেছিলাম। সেকালে এ লেখাটি মুসলিম সাহিত্যিক মহলে যথেষ্ট আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। অনেক বিরূপ মন্তব্যও এজন্য আমাকে সহ্য করতে হয়েছিল বৈকি! কবি শেখ হাবিবুর রহমান আমাকে তীব্র আক্রমণ করেছিলেন এবং আমি তার যথাযথ উত্তরও দিয়েছিলাম। সওগাতে এই বাদ-প্রতিবাদ প্রকাশিত হয়েছিল।

কলকাতায় সওগাতের যে সূর্য উদিত হয়েছিল, ঢাকায় তা অস্তমিত হয়। ১৯৯৪ খ্রিষ্টাব্দের ২১ মে মোহাম্মদ নাসির উদ্দীনের মৃত্যুর পর সওগাত প্রেস ও বেগম পত্রিকা প্রকৃতই অভিভাবক হারায়। বেগম সম্পাদক নূরজাহান বেগম ২০১৬ খ্রিষ্টাব্দের ২৩ মে মারা গেলে প্রতিষ্ঠানটির উপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানটির হাল ধরার জন্য উপযুক্ত কোনও নাবিক না থাকায় জরাজীর্ণ হয়ে পড়ে।  নূরজাহান বেগমের মৃত্যুর পর সওগাত প্রেসটি তদারকির অভাবে বন্ধ হয়ে যায়। ফলে ইতিহাসের গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়টি পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে। সিসার টাইপের কেসে ধুলার আস্তর জমে। ছাপাযন্ত্র, বাঁধাই আর কাটিং মেশিন অলস পড়ে থাকতে থাকতে অকেজো হয়ে পড়ে। দেওয়াল খসে পড়ে। ধসে যায় টিনের ছাদ।

সওগাতের সর্বশেষ সংখ্যা বের হয় ১৯৮৭ খ্রিস্টাব্দে নাসির উদ্দীন সংবর্ধনা অনুষ্ঠান উপলক্ষে সংখ্যাটি ছাপা হয়। তখন সাপ্তাহিক বিচিত্রায় নাসির উদ্দীনকে প্রচ্ছদ করে একটি বিশেষ সংখ্যা প্রকাশিত হয়।

নূরজাহান বেগমের বড় মেয়ে ফ্লোরা নাসরিন সওগাত ও বেগমের হাল ধরার চেষ্টা করেন। তিনি প্রতিষ্ঠানের ব্যয় সংকোচনের জন্য ২০১৭ খ্রিষ্টাব্দের দিকে সওগাত প্রেস বন্ধ করে দেন। অনিয়মিত বেগম পত্রিকার ছাপাও বন্ধ হয়ে যায়। অবশ্য ফ্লোরা নাসরিন তখন আশার বাণী শুনিয়েছিলেন―একটু গুছিয়ে এনে প্রতিষ্ঠানটি পুরোদমে চালু করা হবে। ৫/৬ বছর পেরিয়ে গেলেও তা শুরু করা যায়নি। ৬৬ নম্বর পাটুয়াটুলী সওগাত বেগম কার্যালয় আরও মলিন হয়ে পড়েছে। থেমে যাওয়া সওগাত প্রেস, পত্রিকা কিংবা বেগম পুনরায় চালু হবে কিনা সেটা কেউ বলতে পারে না।

উল্লেখ্য, মোহাম্মদ নাসির উদ্দীন নারিন্দার ৩৮ শরৎগুপ্ত রোডের যে বাড়িতে বাস করতেন সেটা ‘নাসির স্মৃতি ভবন’ নামে পরিচিত। ভবনটির বয়স প্রায় ১৩৫ বছর। এই বাড়িতে অনেক বিখ্যাত লোকের চরণধূলি পড়েছিল। তাই ভবনটি রক্ষার জন্য সাহিত্যিক রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই ও নূরজাহান বেগমের মেয়ে ফ্লোরা নাসরিন আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন। ১৮৯০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে বাড়িটি কিশোরগঞ্জের এক জমিদার নির্মাণ করেছিলেন। পরে সেটা নাসির উদ্দীন কিনে নেন।

নাসির উদ্দীন জন্মগ্রহণ করেছিলেন চাঁদপুরের ইব্রাহিমপুর ইউনিয়নস্থ পাইকারদী গ্রামে, ১৮৮৮ খ্রিষ্টাব্দের ২০ নভেম্বর। তাঁর শৈশবে পাইকারদী বাড়ি নদীতে বিলীন হলে পাশে চালতাতলী গ্রামে আশ্রয় নেন। গ্রামের চন্দ্রকুমার পালের পাঠশালায় পড়াশোনা শুরু করেন। তাঁর বাবা আবদুর রহমান তাঁকে মাদ্রাসায় ভর্তি না করে পাঠশালায় ভর্তি করায় পরিবারকে সমাজ থেকে অনেক কটু কথা শুনতে হয়েছিল। পরে হরিনাথ হাইস্কুলে ইংরেজি পড়ার জন্য ভর্তি হলে তাঁর বাবাকে কথা শুনতে হয়েছিল। কিন্তু ছেলেকে প্রকৃত শিক্ষা দেওয়ার জন্য তিনি দৃঢ় ছিলেন। কারও কথায় কান দেননি। তিন-চার মাইল রাস্তা হেঁটে চাঁদপুরের কাছে ইংরেজি স্কুলে পড়াশোনা শুরু করেন। তখন থেকে পড়াশোনার পাশাপাশি নাসির উদ্দীন বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ ও পত্রপত্রিকা পড়া শুরু করেন। শারদীয় পূজার সময় ‘সোহরাব রোস্তম’ নাটক মঞ্চস্থ হলে তিনি অভিনয়ও করেন। সে সময় মাইকেল মধুসূদন দত্তের মেঘনাদবধ কাব্যর পুরোটা তিনি মুখস্থ করে ফেলেছিলেন। স্কুলজীবনে বাবার মৃত্যু তাঁর জীবন ভিন্নপথে নিয়ে গিয়েছিল। সংসারের হাল ধরতে গিয়ে পড়াশোনাটা আর এগোয়নি। কিন্তু তিনি তাঁর অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছে গিয়েছিলেন কঠোর পরিশ্রম আর সঠিক পরিকল্পনায়।

তিনি একজন প্রকৃতই কর্মযোগী পুরুষ ছিলেন। উদার মানবিক দৃষ্টিতে সমাজকে মেপেছিলেন। নিজে বিদ্যাশিক্ষায় কোনও সনদ লাভ করতে না পারলেও কাকে দিয়ে কী কাজ করানো যাবে সেটা বেশ বুঝতেন। সেটা না জানলে আরেক সনদবিহীন নজরুলকে তিনি চিনে নিতে পারতেন না। তিনি যে একেবারে লেখালেখি করেননি তাও নয়। বাংলা সাহিত্যে সওগাত যুগ তাঁর অমর কীর্তি। কয়েকটি উপন্যাস তিনি কলকাতায় বসে লিখেছিলেন। এর মধ্যে শিরি ফরহাদ উল্লেখযোগ্য। তাছাড়া তিনি আস্থার নবী মোহাম্মদ দ. নামে একটি ধর্মীয় বই লিখে লেখক হিসেবে সুনাম অর্জন করেন। কলকাতায় সওগাত সম্পাদনার পাশাপাশি লেখালেখি করার খুব একটা সময় বের করতে পারেননি নাসির উদ্দীন।

বাংলাদেশ পর্বে অর্থাৎ বয়সের শেষ দিকে তিনি বেশ কিছু সাহিত্য-সংস্কৃতি ধাঁচের সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি নজরুল ইনস্টিটিউট-এর বোর্ড অব ট্রাস্টির চেয়ারম্যান, জাতীয় জাদুঘরের বোর্ড অব ট্রাস্টির সদস্য ছিলেন। সৃজনশীল লেখক ও সাংবাদিকদের মূল্যায়ন করার জন্য নাসির উদ্দীন ১৯৭৬ খ্রিষ্টাব্দে নিজ নামে নাসির উদ্দীন স্বর্ণপদক প্রবর্তন করেন। তিনি বাংলা একাডেমি, একুশে পদক ও স্বাধীনতা পুরস্কার অর্জন করেছিলেন।

তথ্যসূত্র :

১.            সওগাত যুগে নজরুল ইসলাম, মোহাম্মদ নাসির উদ্দীন, নজরুল ইনস্টিটিউট, ১৯৮৮।

২.           বাংলা সাহিত্যে সওগাত যুগ, মোহাম্মদ নাসির উদ্দীন, সওগাত প্রেস, ১৯৮৬।

৩.           মোহাম্মদ নাসির উদ্দীন ও সওগাত যুগ, আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী, জ্যোৎস্না পাবলিশার্স, ২০১৩।

৪.           সওগাত ও আমার জীবনকথা, মোহাম্মদ নাসির উদ্দীনের সাক্ষাৎকার, অনুলিখন রীতা ভৌমিক, প্রতিচিন্তা, ৫ এপ্রিল, ২০১৭।

৫.           পাথর চাপা সময়ে সওগাত ও কালোত্তীর্ণ নাসির উদ্দীন, ইমরান মাহফুজ, দ্য ডেইলি স্টার বাংলা, ২ ডিসেম্বর, ২০২০।

৬.           চমকে উঠলেন সম্পাদক, নাসির ও আলম, আনন্দবাজার, ২৮ আগস্ট, ২০১৮।

৭.           বিরুদ্ধ স্রোতের মোহাম্মদ নাসির উদ্দীন, সম্পাদনা কাদের পলাশ ও মুহাম্মদ ফরিদ হাসান, পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স, ২০২০।

৮.           সওগাত মুসলিম মানস ও রবীন্দ্রনাথ ড. দিলীপ মজুমদার, পেজ ফোর, ২৫ এপ্রিল, ২০২৩।

৯.           মুসলিম সম্পাদিত ও প্রকাশিত বাংলা সাহিত্য পত্রিকা, ইসরাইল খান, বাংলা একাডেমি, ২০০৫।

১০.         শতবর্ষের সেরা সওগাত, সম্পাদনা সফিউন্নিসা, মিত্র ও ঘোষ পাবলিশার্স, ২০১৮।

১১.         কলকাতায় নজরুল, শঙ্কর কুমার নাথ ও তারক নাথ ঘোষ, পত্রলেখা, ২০২৪।

১২.         সওগাত প্রকাশের নেপথ্য স্মৃতিকথা, মোহাম্মদ নাসির উদ্দীন, মাওলা ব্রাদার্স, ২০১৭।

১৩.        প্রগতিশীলতায়, অভিভাবকত্বে মোহাম্মদ নাসির উদ্দীন ও তাঁর সওগাত, আবু সাঈদ নয়ন, পরস্পর, ২১ জুন, ২০২০।

১৪.         সওগাত, মোহাম্মদ নাসির উদ্দীন জাতীয় সম্বর্ধনা সংখ্যা, অগ্রহায়ণ-পৌষ, ১৩৮৬।

১৫.        আমাদের আলোকবর্তিকা, মালেকা বেগম, প্রথম আলো, ৯ অক্টোবর ২০২৩।

১৬.        ছাপাখানার আড্ডা ইতিহাস ও সংস্কৃতি, আপেল মাহমুদ, ঐতিহ্য, ফেব্রুয়ারি ২০২৪।

১৭.         নূরজাহান বেগম : এক বিজয়লক্ষ্মী নারীর সঙ্গে, মতিন রায়হান, কালি ও কলম, ফেব্রুয়ারি ২০২২।

১৮.        অতীত দিনের স্মৃতি, আবুল কালাম শামসুদ্দীন, খোশরোজ কিতাব মহল, ১৯৬৮।

১৯.         সওগাত সম্পাদক মোহাম্মদ নাসির উদ্দীনের গ্রামের বাড়ি, কাদের পলাশ, জনকণ্ঠ, ১৬ নভেম্বর ২০১৮।

২০.        চরিতাভিধান, সম্পাদক সেলিনা হোসেন ও নুরুল ইসলাম, বাংলা একাডেমী, ১৯৮৫।

২১.         সওগাত, সৈয়দ আবুল মকসুদ, মাসিক উত্তরাধিকার, শ্রাবণ ১৪২২, বর্ষ ৪৩, সংখ্যা ৪, নবপর্যায় ৭৩।

 লেখক : উয়ারী বটেশ্বর সাহিত্যপত্রের সম্পাদক ও গবেষক

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button