আর্কাইভপ্রচ্ছদ রচনা

সমকাল পত্রিকার সাহিত্যিক অবদান : রবিউল হোসেন

প্রচ্ছদ রচনা : বাংলা ভাষার ঐতিহ্যবাহী সাহিত্যপত্র

বিশ শতকের প্রথমার্ধে কলকাতা থেকে প্রকাশিত বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য-পত্রিকা (১৯১৮), সওগাত (১৯১৮), বুলবুল (১৩৪০), ধূমকেতু (১৯২২), জয়তী (১৯২২) এবং ঢাকা থেকে প্রকাশিত তরুণপত্র (১৯২৫), অভিযান (১৯২৬), শিখা (১৯২৭), জাগরণ (১৯২৮) প্রভৃতি পত্রিকা বাঙালি মুসলমানের মানসমুক্তির ক্ষেত্রে সক্রিয় ভূমিকা রাখার প্রয়াস চালিয়েছিল। কিন্তু এ প্রচেষ্টা ব্যাহত হয় হিন্দু-মুসলমানের বিরোধ, কংগ্রেস-মুসলিম লীগ-এর রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব প্রভৃতি কারণে। এদিকে ১৯৪৭ সালের মধ্য আগস্টে ভারতবর্ষ বিভক্ত হয়ে জন্ম নেয় ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি রাষ্ট্র। বর্তমান স্বাধীন বাংলাদেশ পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, পূর্ব-বাংলা তথা পূর্ব-পাকিস্তান পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের একটি আধা-উপনিবেশে পরিণত হতে চলেছে। সংকট আরম্ভ হয় রাষ্ট্রভাষা কেন্দ্রিক তর্ক-বিতর্ক শুরু হলে। জাতীয়তাবাদের প্রশ্নে ভাষা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ভাষার প্রশ্নে দুর্বল বাঙালি ন্যাশনালিটি প্রবল পাঞ্জাবি ন্যাশনালিটির বন্ধনে বাধা পড়তে থাকলে বাঙালির স্বাতন্ত্র্য ও আত্মপ্রতিষ্ঠার প্রশ্ন দেখা দেয়। এমতাবস্থায় পূর্ব-বাংলায় একটি অসাম্প্রদায়িক, মানবিক, অসাম্যবিরোধী এবং স্বাধীন ও মুক্তচিন্তার সংগ্রামে ব্রতী সাহিত্য প্রতিষ্ঠান ‘পাকিস্তান সাহিত্য সংসদ’ (১৯৫১) প্রতিষ্ঠা সহজ হয়। সমাজ ও সংস্কৃতিভাবনায় ‘সাহিত্য সংসদ’ ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজে’র অনুসৃত নীতি অনুসরণ করে। শিখার (১৯২৭) অন্যতম সম্পাদক কাজী মোতাহার হোসেন-এর (১৮৯৭-১৯৮১) সভাপতিত্বে ও নেতৃত্বে বাংলার তরুণ সাহিত্যিকগোষ্ঠী ‘পাকিস্তান সাহিত্য সংসদ’ গড়ে তুলেছিলেন। কিছুদিনের মধ্যে ‘সাহিত্য-সংসদ’-এর কার্যক্রম স্তিমিত হয়ে এলে এঁরাই আবার ১৯৫৭ সালে সিকান্দার আবু জাফর-এর (১৯১৮-১৯৭৫) নেতৃত্বে ও সম্পাদনায় মাসিক সাময়িকপত্র সমকাল প্রকাশ করেন। যে মানবিক মূল্যবোধ বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য-পত্রিকা, শিখা, সওগাত প্রভৃতি সংবাদ-সাময়িকপত্রে ভিত্তি পেয়েছিল―সমকাল-এ তা নতুন সম্ভাবনা খুঁজে পায়।১

সমকাল সম্পাদক সিকান্দার আবু জাফর বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী ছিলেন। কথাসাহিত্য, কবিতা, নাটক, সঙ্গীত, প্রবন্ধ প্রভৃতি রচনায় এবং অনুবাদে তাঁর প্রতিভার বহুমুখিতা প্রকাশ করে। আবার পত্রিকা স¤পাদনায় তাঁর সাহসিকতা প্রশংসাযোগ্য। তিনি মিল্লাত পত্রিকার স¤পাদক, ইত্তেফাক-এর সহকারী স¤পাদক এবং রেডিও পাকিস্তানের স্টাফ আর্টিস্ট ছিলেন। কিন্তু তাঁর কর্মময় জীবনের শ্রেষ্ঠ অবদান সমকাল সম্পাদনা। পাকিস্তান সৃষ্টির দশ বছর পর মাসিক সমকাল-এর আবির্ভাব ঘটে। পূর্ব-পাকিস্তানের আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় দেশের অভ্যন্তরীণ অবস্থার যে পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠেছিল তা বুকে ধারণ করে সমকাল। ১৯৫২-র ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪-র নির্বাচন প্রভৃতি এ পরিবর্তন আরও স্পষ্ট করে তোলে। পাশাপাশি রাজনৈতিক সংকট, সাংস্কৃতিক বিপর্যয়, সাহিত্যের লক্ষ্যহীনতা, সাহিত্যিক ঐতিহ্য নিয়ে বিভ্রান্তি, ভৌগোলিক অবস্থান প্রভৃতি বিবেচনায় এ দেশে একটি স¦তন্ত্র সাহিত্যধারা গড়ে ওঠার প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হচ্ছিল। আবার দেশভাগের কারণে বাংলা সাহিত্যের মূলধারাটি পশ্চিম-বাংলায় প্রতিষ্ঠিত থাকার কারণও পত্রিকা প্রকাশের পশ্চাতে ক্রিয়াশীল ছিল। এসব প্রয়োজনীয়তা পৃষ্ঠে ধারণ করে সমকাল-এর দীপ্ত পদচারণা শুরু হয়। আবদুল হক বলেন :

পূর্ব-পাকিস্তানের সাহিত্যের লক্ষ্য কী হবে এই নিয়ে তখন নানা জনে নানা কথা বলছিলেন। কারো কথা ছিল এ দেশের লেখকদের অবশ্যকরণীয় মহৎ কাজ হচ্ছে সাহিত্যে পাকিস্তানি আদর্শ রূপায়িত করা। দু’একজন শক্তিমান কবি সেটাই করেছিলেন। কেউ বলেছিলেন―যেহেতু পূর্ব-পাকিস্তানিদের শতকরা ৮০ জনেরও বেশী কৃষক, অতএব এ-দেশের লেখকদের কর্তব্য হচ্ছে কৃষক-জীবন প্রতিফলিত করা। এই মতাদর্শের একটা কৌতুককর ফল হয়েছিল যে, কৃষক-জীবন নিয়ে সংগ্রামী সমাজ সচেতন সাহিত্যের পরিবর্তে কেউ কেউ নূতন করে পল্লী-সাহিত্য রচনা করেছিলেন। সাহিত্যিক ঐতিহ্যের প্রশ্নটাও ছিল বেশ বড়। কেউ বলতেন ‘মুসলিম বাংলা সাহিত্য’ অর্থাৎ মুসলিম রচিত বাংলা সাহিত্যই পূর্ব-পাকিস্তানের ঐতিহ্য। কিন্তু এ সাহিত্যের কতখানি পাকিস্তানি আদর্শের অনুকূল এবং কতখানি প্রতিকূল সে স¤¦ন্ধে কারো পরিষ্কার ধারণা ছিল না। কেউ কেউ পুথি সাহিত্যকেই বলতেন সে-ঐতিহ্যের  শ্রেষ্ঠতম অংশ, অথবা খনিস¦রূপ, যেখান থেকে সাহিত্যের অনেক অমূল্য কাঁচামাল সংগ্রহ করা সম্ভব। …এরূপ অনুপ্রেরণায় কোনো কোনো কবি পৌত্তলিক আরবকেও মুসলমান বলে বিবেচনা করেছিলেন। একজন খ্যাতনামা লেখক বলেছিলেন সাতচল্লিশের আগেকার সমগ্র বাংলা সাহিত্যকেই ভুলে গিয়ে পূর্ব-পাকিস্তানের নিজস¦ সাহিত্য গড়ে তুলতে হবে।

পাকিস্তানের অংশরূপে পূর্ব-পাকিস্তানের সৃষ্টির পরিপ্রেক্ষিতে এইসব কথা উঠেছিল।…একই সঙ্গে অসাম্প্রদায়িক এবং আন্তর্জাতিক চেতনাও ছিল। পূর্ব-পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় অবস্থানের পরিপ্রেক্ষিতে এখানকার লেখক সমাজে একটা স¦তন্ত্র সত্তাবোধ আন্তর্জাতীয় চেতনা এবং আধুনিকতার পরিণত রূপ লাভে বিল¤¦ ঘটেনি। বাহান্নর ভাষা-আন্দোলন এবং চুয়ান্নর নির্বাচনে ব্যাপকতর সমাজ-মানসের অনুরূপ রূপান্তরের ইঙ্গিত ছিল।

পূর্ব-পাকিস্তানের সাহিত্যে ঐসব লক্ষণকে যাঁরা রূপায়িত করেছেন সমকাল ছিল তাঁদের মুখপত্রস¦রূপ।২

সমকাল-এর বিষয়বৈচিত্র্য লক্ষ্যণীয়। স্থাপত্য, শিল্পকলা, সিনেমা, নাটক, সঙ্গীত, সমাজতত্ত্ব, রাষ্ট্রাদর্শ, ইতিহাস, অর্থনীতি, রাজনীতি, ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি, চিন্তাধারার ঐতিহ্য বা বিবর্তনের ইতিহাস―এক কথায় জাতিগঠনের জন্যে আবশ্যকীয় সকল বিষয় নিয়ে লেখা রচনা এতে প্রকাশিত হয়েছিল। বাহান্নর ভাষা-আন্দোলনের  চেতনা পত্রিকাটির মূল প্রেরণা হওয়ায় বাংলাদেশের আধুনিক সাহিত্যসৃষ্টিতে সমকাল-এর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হতে পেরেছিল। চল্লিশের দশকের প্রগতিশীল লেখকবৃন্দ, পঞ্চাশের দশকের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক প্রতিভা আর ষাটের দশকের তরুণেরা ছিলেন সমকাল-এর লেখক। এদের কণ্ঠ থেকেই নিসৃত হয়েছে ‘বর্ণমালা, আমার দুঃখিনী বর্ণমালা’, ‘সংগ্রাম চলবেই’ ইত্যাদি অসংখ্য কালজয়ী কবিতা ও গান।৩ এছাড়া গল্প, উপন্যাস, নাটক, অনুবাদ-সাহিত্য, প্রবন্ধ, পুস্তক-সমালোচনা, গ্রন্থ-পরিচয় প্রভৃতি পত্রিকাটির নিয়মিত বিষয়ভুক্ত ছিল। এসবের অধিকাংশ রচনাতেই বাংলার সাহিত্যিক-সাংস্কৃতিক-সামাজিক- রাজনৈতিক বন্ধ্যাত্ব মোচনে উচ্চারিত হয়েছে স্বাদেশিকতার মন্ত্র। বাঙালিকে নিয়ে গেছে জাগরণের দিকে।৪ সমকাল-এর অবদান সম্পর্কে পত্রিকাটির পাতাতেই ‘খাম্বুরাবি’ ছদ্মনামে জনৈক লেখক লিখেছেন :

সমকালই একমাত্র কাগজ যাকে ঘিরে এই হতাশাপ্লাবিত, ক্লান্তিভরা, উদ্দেশ্যবিহীন দেশে চলেছে কিছু সাহিত্যচর্চা। এছাড়া সমকালের পাতায় সম্প্রতি আমরা দেখতে পাচ্ছি আমাদের জাতীয় ইতিহাসকে, সমাজসংগঠন ও রাজনীতির ধারাকে বুঝে দেখবার, বিষয়গত আলোচনা করবার একটা প্রচেষ্টা। এটা সৃজনী সাহিত্য না হলেও এর প্রয়োজন আজ অপরিসীম। কারণ এই পথেই ঘটতে পারে আমাদের আত্মজ্ঞান।৫

খাম্বুরাবির উপরোক্ত মন্তব্য থেকে সমকাল পত্রিকার সাহিত্যিক-সামাজিক অবদান বিষয়ে আমরা একটি স্পষ্ট ধারণা নিতে পারি। আলোচ্য নিবন্ধে আমাদের উদ্দেশ্য কেবল সমকাল পত্রিকার সাহিত্যিক অবদান বিচার করা। এজন্য প্রবন্ধের শিরোনাম অনুযায়ী আলোচনা এগিয়ে নিতে আমরা কেবল সমকাল-এ প্রকাশিত সাহিত্যবিষয়ক প্রবন্ধসমূহ ব্যবহার করব; তবে প্রয়োজন হলে অন্যান্য রচনার সাহায্যও গ্রহণ করা হবে। 

উনিশ শতকের শেষ চতুর্থাংশে বাঙালি মুসলমান সমাজে যখন জাগরণ প্রচেষ্টা শুরু হয় তখন তাদের নিজেদের ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি, দেশ-জাতি ইত্যাদি নিয়ে দ্বিধা-সংশয় দেখা দেয়। তাদের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দেয় নিজেদের জাতিগত পরিচয় কোনটি―‘ভারতীয়, বাঙালি না মুসলমান’। এ বিতর্কের সঙ্গে অনিবার্যভাবে যুক্ত হয় ভাষা ও সাহিত্যে সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি। এসব বিষয় নিয়ে যুক্তিপূর্ণ আলোচনা-সমালোচনার পরিপ্রেক্ষিতে তর্ক-বিতর্ক ক্রমশ কমে এলেও ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাব বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করে। বিতর্ক তীব্র আকার ধারণ করে ‘পূর্ব পাকিস্তান রেনেসাঁ সোসাইটি’ (১৯৪২) ও ‘পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সংসদ’ (১৯৪২)-এর সাহিত্য-সংস্কৃতিবিষয়ক মতাদর্শ প্রচারের মধ্য দিয়ে।

১৯৪৭ সালে সাম্প্রদায়িক বাটোয়ারার ভিত্তিতে বাংলা ভাগ হবার কারণে পূর্ব-পাকিস্তানের ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃৃতির স¦রূপ এবং ভিত্তি কীরূপ হবে তা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক দেখা দেয়।৬ দেশভাগের পর মুসলিম লীগ সরকার এ বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট দিক-নির্দেশনা না দিলেও সাহিত্য-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে রেনেসাঁ সোসাইটি ও সাহিত্য সংসদের প্রদর্শিত নীতি গ্রহণ করে।৭ আবার আবুল মনসুর আহমদ (১৮৯৭-১৯৭৯), সৈয়দ আলী আহসান (১৯২২-২০০২), গোলাম মোস্তফা (১৮৯৭-১৯৬৪) প্রমুখ স¦ঘোষিত পাকিস্তানবাদী তাত্ত্বিকেরাও প্রচলিত সাহিত্যাদর্শ থেকে পৃথক অর্থাৎ স্বতন্ত্র সাহিত্য সৃষ্টির লক্ষ্যে নানামুখী আলোচনা-সমালোচনার মাধ্যমে আমাদের সাহিত্য ও সংস্কৃতির অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করেন।৮

মূলত সমাজতাত্ত্বিক কিছু কারণের সঙ্গে বাঙালি মুসলমানের প্রবল ধর্মীয় ভাবাবেগ-আশ্রিত চেতনা যুক্ত হয়ে স্বদেশ ও ভাষা সম্পর্কে উপর্যুক্ত লেখকদের মানসে যে-সাংস্কৃতিক সংকটের জন্ম দিয়েছিল তা লক্ষ করা যায় সাহিত্যের আদর্শ, উদ্দেশ্য ইত্যাদি সম্পর্কে তাদের মতামতের বিভিন্নতার মধ্যে। আরও অনেক সত্যের মতো যখন থেকে তারা এ সত্যও উপলব্ধি করেছিলেন, তাদের সমাজকে অধঃপতন থেকে বাঁচাতে হলে মাতৃভাষা বাংলায় সাহিত্যচর্চার কোন বিকল্প নেই, তখন থেকেই তাদের মধ্যে মতভেদ দেখা দিয়েছিল কোনো ধরনের সাহিত্য সৃষ্টি মুসলমানদের জন্যে মঙ্গলদায়ক হবে তা নিয়ে। মুসলিম লেখকদের প্রধানতম অংশ মনে করতেন, মুসলমানদের উন্নতির জন্যে তাদের ‘জাতীয় সাহিত্য’ সৃষ্টি করা দরকার। এই সাহিত্যকেই কেউ কেউ ইসলামি বা মুসলিম সাহিত্য বলতেন। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এরূপ স্বতন্ত্র সাহিত্য সম্পর্কিত মতাদর্শের সমর্থকগোষ্ঠী ‘স্বাতন্ত্র্যবাদী’ হিসেবে চিহ্নিত হন।৯    

স্বাতন্ত্র্যবাদী লেখকদের সাহিত্য ও সংস্কৃতিবিষয়ক চিন্তা-চেতনার জন্ম বিভাগপূর্বকালে হলেও বিভাগোত্তর পূর্ব-পাকিস্তানের লেখক-সমাজের এক অংশ এ থেকে বের হতে পারেননি।১০ ফলে পূর্ব-পাকিস্তানে সাহিত্যের আদর্শবিষয়ক নানা মতাদর্শের সৃষ্টি হয়। সমকাল এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপক্ষের উদ্দেশ্যকে অযৌক্তিক ও অবাস্তব বিবেচনা করে অসাম্প্রদায়িক ও ধর্মনিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে রচনা প্রকাশ করে এবং জাতীয়তার প্রশ্নে প্রগতিশীল ভূমিকা গ্রহণ করে। বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে মধ্যযুগীয় মানসিকতা মুক্ত করে আধুনিক ও ভবিষ্যৎমুখী করে তোলে।১১ এ পর্যায়ে পত্রিকাটির সাহিত্যিক ভূমিকা নির্ণয়ের সুবিধার্থে বিষয়টিকে আমরা নিম্নোক্তভাবে পর্যায়ক্রমে তুলে ধরতে চাই।

ক. সাহিত্যসম্পর্কিত মতাদর্শিক আলোচনা, খ. সাহিত্যের শৈলী বিচার এবং গ. সমালোচনা-সাহিত্যে সমকাল-এর অবদান।

ক. সাহিত্যসম্পর্কিত মতাদর্শিক আলোচনা

সাহিত্যকে সংস্কৃতির সর্বশ্রেষ্ঠ নিদর্শন হিসেবে উল্লেখ করা হয়ে থাকে।১২ অথচ দেশভাগের পর পূর্ব-পাকিস্তানে সাহিত্যের ঐতিহ্য নিয়ে নানা মতাদর্শের সৃষ্টি হয়। কেউ কেউ সাহিত্যের ঐতিহ্য হিসেবে হাজার বছরের বাংলা সাহিত্যের প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করেন। অন্যপক্ষ বলেন, বাঙালি মুসলমানের সাহিত্যিক প্রেরণা হবে আরবি-ফারসি-উর্দু শব্দবহুল পুথিসাহিত্য, মুসলিম আদর্শ ও ঐতিহ্য। এমনকি এঁরা বাংলা সাহিত্যকে মুসলমানি রূপ দিতে প্রয়োজনে ভাষা সংস্কারের পক্ষে মত দেন। কেউবা আবার উভয় ধারার মধ্যে সমন্বয় সাধনের উপর জোর দেন। বাংলা সাহিত্যের ঐতিহ্য, আদর্শবিষয়ক সংকট ও সম্ভাবনা নিয়ে যাঁরা সমকাল-এ মতামত রাখেন তাঁদের মধ্যে আবদুল হক (১৯১৮-১৯৯৭), আবুল ফজল (১৯০৩-১৯৮৩), হাসান হাফিজুর রহমান (১৯৩২-১৯৮৩), কবীর চৌধুরী (১৯২৩-২০১১), আবুল কালাম মোহাম্মদ শামসুদ্দীন (১৮৯৭-১৯৭৯), আবু জাফর শামসুদ্দীন (১৯১১-১৯৮৯), শাহেদ সোহরাওয়ার্দী (১৮৯০-১৯৬৫), সৈয়দ আলী আহসান, আবদুল মান্নান সৈয়দ (১৯৮৩-২০১০), আবদুল গনি হাজারী (১৯২১-১৯৭৬), দ্বিজেন শর্মা (১৯২৯-২০১৭), এবনে গোলাম সামাদ (১৯২৯-২০২১) প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। এঁদের রচিত প্রবন্ধসমূহে প্রকাশিত অভিমত পূর্ব-পাকিস্তানের সাহিত্যস¤পর্কিত মতাদর্শিক আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আলোচনার সুবিধার্থে বিষয়টিকে আমরা নিম্নোক্তভাবে পর্যায়ক্রমে তুলে ধরতে চাই।

এক. বাঙালির সাহিত্যিক ঐতিহ্য নির্ধারণে সমকাল ও

দুই. বিকাশমান বাংলা সাহিত্যের স্বরূপ নির্ধারণে সমকাল।

এক : বাঙালির সাহিত্যিক ঐতিহ্য নির্ধারণে সমকাল

ঐতিহ্যের (Tradition) অর্থ―পরম্পরাগত কথা, পুরুষানুক্রমিক ধারা, কিংবদন্তি, লোকপ্রসিদ্ধি প্রভৃতি। যে স্টাইল, প্রথা, রীতি, বিশ্বাস বা দৃষ্টিভঙ্গি অতীত থেকে বর্তমানে কার্যত অব্যাহত পরম্পরার মতো চলে আসে তাকে ‘ঐতিহ্য’ বলে।১৩ সমকাল-এ সাহিত্যের ঐতিহ্যবিষয়ক আলোচনায় অংশ নেন আবুল ফজল, কবীর চৌধুরী, আবদুল হক এবং আবুল কালাম শামসুদ্দীন।

সাহিত্য চর্চার প্রথম পাঠ ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচয়। অথচ দেশভাগের পর পূর্ব-পাকিস্তানের লেখক-সম্প্রদায় সাহিত্যের ঐতিহ্যের প্রশ্নে বিভক্ত হয়ে পড়েন। কেউ ইসলামে অর্থাৎ ‘মুসলিম সাহিত্য’ ও পাকিস্তানবাদী রাষ্ট্রীয় আদর্শে, কেউ হাজার বছরের সাহিত্যিক ঐতিহ্যে ও সাম্যবাদে, আবার কেউবা উভয়ের সমন্বয়ে অন্য কিছুতে আশ্রয় নিতে চান। আবুল ফজলের মতে, আমাদের জাতীয় সাহিত্যের ক্ষেত্রে এরূপ মনোভঙ্গি মোটেও স্বাস্থ্যকর নয়। এ প্রসঙ্গে আবুল ফজল লিখেছেন:

সাহিত্যিক শিল্পীর জন্য এর কোনোটাই নিরাপদ আশ্রয় নয়। ধর্মের কাজ সামাজিক নীতিবোধ জাগিয়ে তোলা ও মানুষের মনে আধ্যাত্মিক খোরাক পরিবেশন করা। সীমাবদ্ধ ক্ষেত্র ছাড়া শাস্ত্রীয়-ধর্ম কখনো সাহিত্যের পথ ও পাথেয় হতে পারে না। ধর্ম ব্যাপারটি অত্যন্ত অনড়, যাকে বলে তাতে পান থেকে চুন খসবার উপায় নেই। তেমনি রাষ্ট্র, রাজনৈতিক মতবাদ বা নানা ইন্দ্রগুলিও তাই। এসবের কোনো একটাকে সাহিত্যের প্রতিষ্ঠাভূমি করতে গেলে বনের বাঘকে খাঁচায় বন্দী করলে যে দশা হয় সাহিত্য-শিল্পেরও সে দশা ঘটে।১৪

প্রাবন্ধিকের বিবেচনায়, ঐতিহ্য কখনও কখনও সীমাবদ্ধ ক্ষেত্রে ধর্মভিত্তিক হতে পারে। তবে দেশ ও দেশের ঐতিহ্যভিত্তিক ‘স্মৃতি’ ও ‘কল্পনার’ ক্ষেত্র ব্যাপক ও সর্বজনীন। সাহিত্যের একটি চিরন্তন নীতি ও নিজস্ব চরিত্র আছে। এ নীতি বা চরিত্র কোনও ক্রমেই সাম্প্রদায়িক বা দলীয় নয়।

অন্যদিকে কবীর চৌধুরী ‘পূর্ব-পাকিস্তানের সমকালীন সাহিত্যে ঐতিহ্যের ভূমিকা’ শীর্ষক প্রবন্ধে বাংলা সাহিত্যের ঐতিহ্য নির্ধারণে স্বাতন্ত্র্যবাদী লেখকগোষ্ঠীর গৃহীত দর্শন প্রসঙ্গে সমন্বয়বাদী দৃষ্টিকোণ থেকে বলেন―‘ঐতিহ্য হচ্ছে বেঁচে থাকবার একটি প্রক্রিয়া মাত্র এবং এই প্রক্রিয়া অবশ্যই পরিবর্তনশীল।’১৫

বিভাগ-উত্তর পূর্ব-পাকিস্তানে সাহিত্যের ভাষা ও আদর্শ নিয়ে পরস্পরবিরোধী মতামত প্রচারিত হলে বাঙালি জাতীয়তাবাদের অন্যতম প্রবক্তা প্রগতিশীল লেখক-চিন্তক আবদুল হক ‘সাহিত্যের দিগন্ত’ শীর্ষক প্রবন্ধে বলেন―বিষয়টি প্রাসঙ্গিক। তবে এ দেশে কিছু মতামত প্রায় ধর্মবিশ্বাসের মতো, অলঙ্ঘনীয় রাষ্ট্রীয় আদর্শের মতো চালাবার চেষ্টা চলছে। যদিও মতামতগুলো উদ্ভট, তথাপি ক্রমাগত প্রচার করতে থাকলে তা আমাদের জন্যে ক্ষতিকর হয়ে উঠতে পারে। প্রাবন্ধিক প্রতিক্রিয়াশীলদের মতামতগুলোর বিবরণ দিয়েছেন এভাবে :

পূর্ব-পাকিস্তানের সাহিত্যের ভাষায় প্রচুর আরবি-ফারসি শব্দ অনুপ্রবিষ্ট করতে হবে, সংস্কৃত (তৎসম) শব্দ বর্জন করতে হবে, পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্যের ভাষা যেমন কলকাতা-কেন্দ্রিক তেমনি পূর্ব-পাকিস্তানের সাহিত্যের ভাষাকে করতে হবে ঢাকা-কেন্দ্রিক, পুঁথি সাহিত্যের ভাষা বর্জন করা অত্যন্ত অসংগত কাজ হয়ে গেছে, ইসলাম এবং ইসলামী তমদ্দুনই হবে এদেশের সাহিত্যের একমাত্র আদর্শ ও বিষয়বস্তু (কেন না আমাদের রাষ্ট্র ইসলামী আদর্শ ভিত্তিক), স¦াধীনতাপূর্ব বাংলা সাহিত্যকে ভুলে যেতে হবে এবং পশ্চিমবঙ্গীয় সাহিত্যের আমদানি বন্ধ করে দিতে হবে, ইত্যাদি।১৬

আবদুল হক প্রতিক্রিয়াশীলদের উপর্যুক্ত মতামতসমূহের বিরোধিতা করে বলেন:

পাকিস্তান কায়েম হওয়ার দরুন অঢেল আরবি-ফারসি-উর্দু শব্দ আমদানির যৌক্তিকতা বৃদ্ধি পেয়েছে এরূপ মনে করার কোনো কারণ নেই, কিন্তু আমি সাহিত্যিকদের স¦াধীনতায় বিশ্বাসী, যে-কোনো ভাষার শব্দ এনে বাংলা ভাষাকে সমৃদ্ধ করার এবং তার প্রকাশ ক্ষমতাকে প্রসারিত করার অধিকার তাঁদের আছে।… যে সব শব্দ অপরিহার্য নয় এবং আমরাও বুঝি না সে সব শব্দের বিশাল বোঝা যদি আমাদের মাথায় চাপিয়ে দেওয়া হয় তাহলে প্রতিবাদ না করে উপায় নেই, কেননা তাতে ঘাড়ে ব্যথা হয়। (পৃ. ৬২৭)

যাঁরা বলেন পুঁথিসাহিত্যের ভাষায় আমাদের সাহিত্য রচনা করা উচিত, এ প্রদেশের আঞ্চলিক ভাষাই হওয়া উচিত আমাদের সাহিত্যের ভাষা এবং পশ্চিমবঙ্গীয় সাহিত্যের আমদানি বন্ধ করে দেওয়া উচিতÑ তাদের প্রত্যাশার উত্তরে প্রাবন্ধিক অভিমত দেন:

স¦াদেশিকতা এবং স¦াজাত্য খুব প্রশংসনীয় মনোভাব, কিন্তু জাতীয় বিকাশের পরিপ্রেক্ষিতে কোথাও একটা সীমারেখা টানতেই হবে। স¦াজাত্যের প্রেরণায় এবং বৈদেশিকতা বর্জনের জন্যই যদি উল্লিখিত দাবিগুলি জানানো হয়ে থাকে তবে আমাদের বর্জন করা উচিত ষ্টিমার, ট্রেন, এরোপ্লেন, বর্জন করা উচিত যাবতীয় বিদেশি সামরিক অস্ত্র, কেননা এ-সবই বিদেশি সভ্যতার অবদান। আমাদের থাকা উচিত কেবল নৌকা, গরুর গাড়ি এবং বাঁশের লাঠি, কেননা এগুলিই সত্যিকারের স¦দেশী বস্তু। ভারত, ইউরোপ, আমেরিকা সর্বত্র যাতায়াতও বন্ধ করে দেওয়া উচিত। কেননা ওই সব ভূভাগে যাতায়াতের ব্যবস্থা থাকায় আমাদের মধ্যে বিদেশি ভাবধারা অনুপ্রবেশের সুযোগ পাচ্ছে। (পৃ. ৬২৯)

সাহিত্য চিরন্তনের সাধনাক্ষেত্র। এখানে সংকীর্ণ সাম্প্রদায়িকতার স্থান নেই। অর্থাৎ লেখক মুসলমান না হিন্দু, সাহিত্যে চিত্রিত সমাজ ও ভাষা বিশেষ সম্প্রদায়ের অনুকূলে যায় কি না―তা নির্ণয় করে সাহিত্যকর্ম মূল্যায়ন করা অর্থহীন। অথচ আমাদের সাহিত্য বিচারে এ ত্রুটিও প্রশংসিত হয়। বাংলা সাহিত্য ও তার ভাষাকে পশ্চিম বাংলা থেকে পৃথক করার চেষ্টা চলে। পূর্ব-পাকিস্তানের সাহিত্যভাণ্ডার থেকে অমুসলমান লেখকদের রচনা পরিত্যাজ্য হিসেবে বিবেচনার চেষ্টা করা হয়। আবুল কালাম মোহাম¥দ শামসুদ্দীন-এর মতে, সাহিত্য বিচারে এরূপ দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণযোগ্য নয়। এক শ্রেণির লেখক আছেন যাঁরা সাহিত্যকে ‘মুসলমানী রূপ’ দিয়েই ক্ষান্ত হন না বরং তা একালের ‘মুসলমান সাহিত্য’ বানাতে চান। এক্ষেত্রে শামসুদ্দীন-এর অভিমত হলো―‘আমরা জানি’, ভাষার নাম অনুসারে সাহিত্যের নামকরণ হয়ে থাকে, কিন্তু ধর্মের নামে সাহিত্যের নামকরণ অসম্ভব। কেননা এরূপ হলে সাহিত্য সাম্প্রদায়িক হয়ে পড়বে। লেখক এ অবস্থা থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে ‘সাহিত্যে সাম্প্রদায়িকতা’ শীর্ষক প্রবন্ধে বলেন :

অতীত ইসলামের দানে যে বিশ্ব সমৃদ্ধ হইয়াছে, তাহা হইতেই এখন আমাদিগকে রসদ সংগ্রহ করিয়া যুগের সহিত পা রাখিয়া চলিতে হইবে। তাহা হইলেই আমাদের চলা সার্থক হইবে―আমরা আবার গৌরবের উচ্চ শিখরে উঠিতে সমর্থ হইব। যিনি সাহিত্যে ইহার যুগোপযোগী চলার মন্ত্র দিতে পারিবেন, তিনিই জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ উপকার করিবেন―তাঁহারই সাহিত্য সাধনার সঞ্জীবনী মন্ত্রে এ জাতি আবার জাগিয়া উঠিবে।১৭

দুই : বিকাশমান বাংলা সাহিত্যের স্বরূপ নির্ধারণে সমকাল

পূর্ব-পাকিস্তানের সাহিত্যের পশ্চাদগতি অবলোকন করে সমকাল সম্পাদক তাঁর পত্রিকায় বিষয়টি নিয়ে লেখক-সমাজের কাছে বিস্তারিত আলোচনার আহ্বান জানান। তিনি বলেন―‘একটা শ্রদ্ধেয় সাহিত্য গড়ে তুলতে না পারলে পাকিস্তানে অথবা পাকিস্তানের বাইরে কোথাও আমরা সম্মানের আসন পাব না। অতএব আমাদের সাহিত্যের সম্পর্কিত সমস্যাসমূহের কারণগুলো খুঁজে বার করতেই হবে।’১৮ এ কাজে তিনি দেশের সকল সুধীজনের সহযোগিতা কামনা করে প্রশ্নমালা উত্থাপন করেন। অবশ্য সম্পাদকীয়তে সম্ভাব্য আলোচকদের প্রশ্নমালা সম্পর্কে আলোচনার স্বাধীনতা দিয়ে বলা হয়―তাঁরা নিম্নোক্ত প্রশ্নমালার বাইরেও ‘তাঁদের ইচ্ছানুযায়ী অন্য যেকোনও প্রশ্নের সূত্র ধরে পূর্ব-পাকিস্তানের বর্তমান সাহিত্য পরিস্থিতি সম্বন্ধে আলোচনা’ করতে পারবেন।১৯ সম্পাদকীয় আহ্বানে সাড়া দিয়ে পূর্ব-পাকিস্তানের সাহিত্য-সমস্যা নিয়ে সমকাল-এ প্রকাশিত প্রবন্ধসমূহ আমাদের সাহিত্যের ত্রুটিসমূহকে চিহ্নিত করে সঠিক পথ নির্দেশে যথার্থ ভূমিকা পালনে সহায়তা করেছে।

 পূর্বেই বলা হয়েছে, পাকিস্তান নামক নতুন ভাবাদর্শিক রাষ্ট্রে লেখক-বুদ্ধিজীবীরা তাঁদের সৃষ্টিকর্মে কোন দর্শন অনুসরণ করবেন এ নিয়ে স্বাতন্ত্র্যবাদী ও প্রগতিবাদীদের মধ্যে মতভেদ ছিল। সাহিত্য সৃষ্টির ক্ষেত্রে এ প্রতিবন্ধকতা দূর কল্পে সমকাল-এ উভয় ধারার রচনা প্রকাশ করলেও দ্বিতীয় পক্ষকে সমর্থন করে।    

সমকাল-এর পাতাতেই আমরা দেখি পাকিস্তানবাদী চিন্তক শাহেদ সোহরাওয়ার্দী অভিমত দিয়েছেন, প্রয়োজনের অতিরিক্ত স্বাধীনতা লেখককে বিভ্রান্ত করতে পারে। এজন্যে পূর্ব-পাকিস্তানে লেখকদের রাষ্ট্রীয় নীতি-দর্শন মেনে চলতে হবে এবং সমাজের রীতি-নীতি স¤পর্কে সচেতন হতে হবে। কারণ হিসেবে প্রাবন্ধিক লিখেছেন :

পাকিস্তানী লেখকের জন্য এই সচেতনতার বিশেষ কারণ রয়েছে। আমরা এখনও সাধারণভাবে গৃহীত মূল্যবোধের কতগুলি বিধি মেনে থাকি যা পশ্চিমা দেশে নেই। পশ্চিমা স¦াতন্ত্র্যবাদ জাতীয়তাবাদ এবং যুক্তিবাদ যদিও অনেক আগেই আমাদের ধাওয়া করেছে, কিন্তু মানুষ স¤পর্কে আমাদের মূল ধারণা তেরশত বৎসর আগে স্থাপিত আদর্শকে ঘিরেই টিকে আছে।২০

আবার প্রগতিপন্থি তাত্ত্বিক এবনে গোলাম সামাদ ‘রাষ্ট্র ও সাহিত্য’ শীর্ষক প্রবন্ধে অব্যাখ্যাত পাকিস্তানবাদী আদর্শের পরিবর্তে লেখকদের গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার অনুসারী হতে বলেছেন। গোলাম সামাদ-এর মতে, রাষ্ট্র ও সাহিত্য একে অপরের পরিপূরক। রাষ্ট্রে বিপ্লব আনতে সাহিত্য বড় ভূমিকা রাখে। দর্শন-বিজ্ঞান যা পারে না, সাহিত্য সেটি করে দেখায়। কারণ, সাহিত্য যুক্তির নয়, আবেগের। সেজন্যে রাষ্ট্রনায়করা সাহিত্যিকদের হাতে রাখতে চান, সাহিত্যকে নিয়ন্ত্রণ করতে চান। কিন্তু সাহিত্যের উপর এই রাষ্ট্রিক নিয়ন্ত্রণ ভীতিকর। পরিকল্পনা অনুযায়ী পণ্য তৈরির মতো সাহিত্য সৃষ্টির চেষ্টা করা অগ্রহণযোগ্য। কেননা এর সমাপ্তি হবে সর্বগ্রাসী ‘সাংস্কৃতিক একনায়কত্বে’। চিন্তাশীল লেখকগণ এক্ষেত্রে ভিন্ন পথ সন্ধান করেন। এজন্যে বর্তমান প্রবন্ধে প্রাবন্ধিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় পাকিস্তানবাদী কিংবা একনায়কতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার বিরোধিতা করে গণতন্ত্রের মধ্যে সাহিত্যমুক্তির পথ খোঁজেন। প্রাবন্ধিক বলেন :

যে রাষ্ট্রে সব কিছুই রাষ্ট্রের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, ব্যক্তিগত মুদ্রাযন্ত্রের প্রতিষ্ঠা সেখানে সম্ভব নয়, সম্ভব নয় স¦াধীন সাহিত্য চক্র সৃষ্টি―সেখানে সাহিত্যিকদের স¦াধীনতা থাকাও সম্ভব নয়। রাষ্ট্রের ফরমান অনুসারে সাহিত্যিকদের দল সেখানে সাহিত্য সৃষ্টি করতে বাধ্য।… সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে চিন্তার স¦াধীনতা একান্তভাবেই প্রয়োজনীয় কিন্তু যে কোন প্রকারে একনায়কত্ববাদের আওতায় সেটা সম্ভব নয়।…একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জনমত সংগঠনের মাধ্যমে যেমন রাজনৈতিক চেতনাকে নিয়ন্ত্রিত করা চলে, সাহিত্য চেতনাকেও সেভাবে নিয়ন্ত্রিত করা অসম্ভব নয়। স¦াধীনতাকামী সাহিত্যিকদের তাই গণতান্ত্রিক আদর্শবাদের প্রতি নূতন করে ঝুঁকে পড়া ছাড়া গতি থাকছে না। ২১

তৎকালীন সাহিত্য-ভাবনায় মতাদর্শিক সংকটের প্রধানতম কারণ ছিল সাহিত্য সৃষ্টি ও বিচারে ধর্ম এবং রাজনীতির অপপ্রয়োগ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল সাহিত্যের আদর্শ ও উদ্দেশ্য নিয়ে সাহিত্যিকদের নানামুখী চিন্তা-দর্শন, সাহিত্যের ঐতিহ্য সংক্রান্ত বিরোধ, পৃষ্ঠপোষকের অভাব, লেখকদের পারস্পরিক সহনশীলতার অভাব, লেখকের স্বাধীনতা-হীনতা, জীবন-জীবিকার অনিশ্চয়তা, নবীন-প্রবীণের বিরোধ, ভাষা বিষয়ে উন্নাসিকতা, প্রকাশক-সম্পাদকদের অসহযোগিতামূলক মনোভাব, সাহিত্য-আঙ্গিকের রচনাশৈলী মূল্যায়নগত দুর্বলতা প্রভৃতি প্রসঙ্গে লেখক-বুদ্ধিজীবীদের চিন্তা-চেতনার বিরোধ।

বাংলা সাহিত্যে বাঙালি মুসলমানের অনগ্রসরতার কারণ হিসেবে ধর্ম ও রাজনীতির অপপ্রয়োগ চিহ্নিত করে সমকাল-এ আলোচনায় অংশ নেন দ্বিজেন শর্মা, আবদুল হক, হাসান হাফিজুর রহমান এবং আবুল ফজল। স্বাতন্ত্র্যবাদী লেখক-বুদ্ধিজীবী সমাজের কারও কারও অভিমত, বাংলা সাহিত্যে বাঙালি মুসলমানের অনগ্রসরতার মূলে রয়েছে ধর্মীয় সীমাবদ্ধতা। আবার প্রগতিশীল সাহিত্যকর্মীদের একদল ভাবতেন, বাংলা সাহিত্যে বাঙালি মুসলমানের অনগ্রসরতার কারণ ধর্ম নয়, রাজনীতি। অন্যদল দায়ী করতেন ধর্ম এবং রাজনীতি উভয়কেই। বাংলা সাহিত্যে বাঙালি মুসলমানের দান অপেক্ষাকৃত কম হবার কারণ হিসেবে যাঁরা ধর্মকে দায়ী করেন তাঁদের সম্পর্কে প্রগতিবাদী-চিন্তক দ্বিজেন শর্মার বক্তব্য হলো―বাংলা সাহিত্যে মুসলমানের অনগ্রসরতার মূলে ধর্ম নয়, রাজনীতিই বেশি সক্রিয় হয়েছে। রাজনীতির কারণে বাঙালি মুসলমান নিজেকে প্রত্যাহার করেছে এবং সাহিত্য-চর্চায় গণতান্ত্রিক চেতনা প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। অন্যদিকে বঙ্কিম-রবীন্দ্রনাথ-শরৎচন্দ্র প্রমুখ লেখকবৃন্দ আধুনিক সাহিত্যে অবদান রাখলেও রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থানের কারণে জন-সংস্কৃতি স¤পৃক্ত হতে পারেননি। ‘বাংলা সাহিত্যে সাম্প্রদায়িকতার বিচার’ শীর্ষক প্রবন্ধে শর্মা বলেন :

যে অর্থে বঙ্কিম সাম্প্রদায়িক সে অর্থে তিনি গণ-বিরোধীও। তাঁর সাহিত্যে সাধারণের ভূমিকাই শুধু অনুপস্থিত নয়, তাঁর নায়করাও সকলেই অভিজাত এবং সেই অর্থে শোষক। সুতরাং সাহিত্যে সাম্প্রদায়িকতার প্রশ্নটি আসলে ধর্মীয় বিষয় নয়―স্পষ্টতঃই  সেটি গণতন্ত্রের সংগে সংশ্লিষ্ট।…

ধর্মগত বৈষম্য বাংলা সাহিত্যে সাম্প্রদায়িকতার কারণ বলে চিহ্নিত হলে রবীন্দ্র-শরৎ সাহিত্যের অসাম্প্রদায়িকতার বিচার এই মানদণ্ডে অসম্ভব হয়ে পড়ে। এদের সাহিত্যে মুসলিম চরিত্রের সংখ্যানুপাতিক দৈন্য থাকলেও তারা নিন্দিত নয়। অথচ বঙ্কিম যুগের চেয়ে হিন্দু-মুসলিম সম্প্রদায়গত মনোমালিন্য তখন অনেক তীব্র। এর একমাত্র বাস্তবানুগ ব্যাখ্যা বাংলা সাহিত্যে গণতান্ত্রিক চেতনার ক্রমপরিস্ফুরণেই নিহিত।২২

প্রাবন্ধিক মনে করেন, যে গোষ্ঠীগত স¦ার্থের কারণে হিন্দু সাহিত্যিকগণ ব্যাপক গণসাহিত্য সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হয়েছে সেই একই কারণে মুসলমান লেখকবৃন্দের সংখ্যা বাড়লেও সমাজ-পটভূমি ও জীবনদৃষ্টি অপরিবর্তিত থাকায় তাঁদের সাহিত্যকে গণতান্ত্রিক বলা যাবে না। সাহিত্য ক্ষেত্রে এ বাধা দূর করতে হলে আমাদের রাজনীতি, ধর্ম, আচার ও সংস্কারগত সকল প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করতে হবে। আবার মননশীল লেখক আবদুল হক মনে করেন, পূর্ব-পাকিস্তানের সাহিত্যের অনগ্রসরতার কারণ কেবল রাজনীতি নয়; ধর্ম, আত্ম-সমালোচনা এবং সমৃদ্ধ সমালোচনা-সাহিত্যের অভাব প্রভৃতি এক্ষেত্রে বড় বাধা।২৩

বাংলা সাহিত্যের লেখকদের করণীয় সম্পর্কে দিক-নির্দেশনা দিয়ে সমকাল-এ মতামত রেখেছেন আবদুল গনি হাজারী, বুলবন ওসমান, সৈয়দ আলী আহসান, আবদুল হক, আহসান হাবীব এবং কবীর চৌধুরী। ’৪৭-উত্তর পূর্ব-পাকিস্তানে আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক টানাপোড়েন আমাদের সমাজ-প্রগতির ধারাকে বাধাগ্রস্ত করে। দেশের অধিকাংশ মানুষ জীবনের প্রয়োজনে সুবিধার পূজারিতে পরিণত হয়। আবদুল গনি হাজারী (১৯২১-১৯৭৬) পূর্ব-পাকিস্তানে লেখক-বুদ্ধিজীবী সমাজের চারিত্রিক স্খলনের এ দিকটি চিহ্নিত করেছেন ‘বন্দী-বিবেক সমাজ ও কবিমানস’ শীর্ষক প্রবন্ধে। তাঁর মতে, সর্বকালে সাহিত্যিক-দার্শনিক ও অধ্যাপকরাই সত্যের পূজারী। কিন্তু আর্থনীতিক কারণে এখন আমরা সুবিধার পূজারীতে পরিণত হয়ে ‘বন্দী-বিবেক বুদ্ধিজীবী সমাজের সাক্ষাৎ প্রতিনিধি’২৪ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছি। এরূপ পরিস্থিতিতে প্রত্যাশিত লেখকের করণীয় সম্পর্কে প্রাবন্ধিকের অভিমত:

কবি যদি আত্ম-প্রতারণায় নিমজ্জমান না হয়ে থাকেন, যদি এই বন্দী সমাজের মানব-বিরোধী শক্তির সঙ্গে আপোষ না করে বসেন, কিংবা হতাশায় লীনচৈতন্য হয়ে ভবিষ্যতের হাতে আপন জনসমাজের কল্যাণচিন্তা না ছেড়ে দেন তবে এক কঠিন আপোষহীন বিবেকচৈতন্যে উত্তীর্ণ হতে তিনি বাধ্য। (পৃ. ৩৫২)

আবদুল গনি হাজারীর মতো বুলবন ওসমানও ‘আধুনিক বাংলা কাব্যে চাঁদের জন্ম ও মৃত্যু’ শীর্ষক প্রবন্ধে   অনুরূপ মন্তব্য করেন।

বাংলা সাহিত্যের আশানুরূপ অগ্রগতি না হবার একটি কারণ―নবীন ও প্রবীণ লেখকদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব। এঁদের মধ্যকার পারস্পরিক আস্থাহীনতা আমাদের সাহিত্যের প্রত্যাশিত অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করেছে। স্বাতন্ত্র্যবাদী তাত্ত্বিক সৈয়দ আলী আহসান ‘সাহিত্যে পূর্বসূরী’ শীর্ষক প্রবন্ধে লেখক-সমাজে এরূপ ঘটনা ঘটার কারণসমূহ চিহ্নিত করেছেন। প্রবীণদের দেওয়া অভিযোগ সম্পর্কে প্রাবন্ধিক বলেন :

১। তরুণদের কোন আদর্শ নেই, তাঁরা আদর্শ বিশিষ্ট অনুচিত সাহিত্যকর্মে লিপ্ত।

২। পূর্বতন সমস্ত কিছুর প্রতি তরুণদের অশ্রদ্ধা।

৩। ভাষার ঐতিহ্য ও শালীনতা এঁদের হাতে রক্ষিত হচ্ছে না।২৫

আবার প্রবীণদের স¤পর্কে তরুণদের অভিযোগ সম্পর্কে লিখেছেন:

১। প্রবীণদের আদর্শ প্রমাদপূর্ণ, তাই অনুসৃত হবার যোগ্য নয়।

২। সাহিত্যের ঐতিহ্যই তরুণদের পূর্বসূরী―ব্যক্তিবিশেষ নয়।

৩। বয়স বেশি হলেই কেউ সম্মানের যোগ্য হয় না, তাকে উপযুক্ত হতে হয়।

৪। পূর্বতন সকল কিছুকে অস্বীকার করাই বর্তমানের ধর্ম। (পৃ. ৪১৯)

নবীন ও প্রবীণদের দ্বন্দ্বের কারণ স¤পর্কে তিনি বলেন:

এ  প্রকৃতির বিরোধ সব দেশেই আছে। কিন্তু যে-ক্ষেত্রে অন্যান্য দেশে সাহিত্যসাধকগণ, প্রবীণ বা নবীন উভয়েই, অনুক্ষণ সমৃদ্ধ সাহিত্যকর্মে রত, আমরা সে ক্ষেত্রে পরীক্ষিত সাহিত্যকীর্তির দ্বারা প্রতিষ্ঠা অর্জনের দিকে মনোযোগ দিচ্ছি না। কোনও কিছু উল্লেখযোগ্য না করেই তরুণ সম্প্রদায় যেমন পূর্বতন সমস্ত কিছুকেই গ্রহণের অযোগ্য বলছেন, তেমনি আবার স্থায়ীমূল্যের কোন সাহিত্য সৃষ্টি না করেই প্রতিষ্ঠার দাবি জানাচ্ছেন প্রাচীন লেখক সম্প্রদায়। (পৃ. ৪২১)

পূর্ব-পাকিস্তানে বাংলা সাহিত্যের গতি-প্রকৃতি নিয়ে আবদুল হকের একাধিক প্রবন্ধ সমকাল-এ প্রকাশিত হয়েছে। ‘পূর্ব পাকিস্তানের সাহিত্যিক’ শীর্ষক প্রবন্ধে পূর্ব-পাকিস্তানে সাহিত্য বিকাশের অন্তরায় অনুসন্ধানে আবদুল হক বলেন, এ দেশে সাহিত্যিকরা তাঁদের প্রতিভার যথাযথ স¦ীকৃতি বা সম্মান পান না বিধায় বাংলা সাহিত্য যথাযথ ধারায় বিকশিত হয়নি। তাঁর মতে, অন্যেরা:

তাঁর (লেখকের) উপর নির্ভর করলেও, অন্যের উপরই তাঁকে নির্ভর করতে হয় বেশি; যেখানে প্রীতি নয়, শ্রদ্ধা নয়, অনুক¤পাই তাঁর প্রাপ্য। আজও এ সমাজে সাহিত্যিক বলতে বোঝায় লক্ষ্মীছাড়া, খামখেয়ালী, দারিদ্র্যপীড়িত এক শ্রেণীর মানুষ, সময়ে-অসময়ে নির্জনে মসীচর্চা যার নেশা। তিনি গ্রন্থকীট, অসামাজিক এবং বৈষয়িক ব্যাপারে অপদার্থ। কর্মকুশল ও সামাজিক ব্যক্তিদের থেকে তিনি স¦তন্ত্র, অতএব সমাজের ধর্তব্যের বাইরে।২৬

‘সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতা’ শীর্ষক অপর প্রবন্ধে আবদুল হক পূর্ব-পাকিস্তানে মানস¤পন্ন সাহিত্য সৃষ্টি না হবার কারণ এবং সংকট থেকে উত্তরণে যুক্তিপূর্ণ মতামত দিয়েছেন। সংকটের কারণ সম্পর্কে তিনি ‘সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতা’ শীর্ষক প্রবন্ধে বলেন:

১। আমাদের সমাজ সাহিত্য স¤পর্কে উদাসীন। সাহিত্য অবিমিশ্রভাবে লেখকের পরিশ্রম হওয়া সত্ত্বেও তা পাঠকের যথাযথ সমাদর পায় না। তাঁদের ধারণা ‘পূর্ব-পাকিস্তানে পড়বার মতো এবং পয়সা খরচ করে কিনবার মতো বই লেখা হয়না।’ (প্রাবন্ধিক অবশ্য বিষয়টিকে অযৌক্তিক হিসেবে মত দিয়েছেন।)

২। শক্তিমান লেখকের অভাব।

৩। উদ্যমী, সৎ, রুচিবান ও নিষ্ঠাবান প্রকাশক ও স¤পাদকের অভাব। কেবল প্রতিভাসম্পন্ন লেখক-স¤পাদক, প্রকাশক ও সমালোচক পাঠক সমাজকে গ্রথিত করতে পারেন। যতক্ষণ সেটি সম্ভব না হয় ততক্ষণ সাহিত্যের মান-উন্নয়নের জন্য আমাদের কাজ করে যেতে হবে।২৭ 

সংকট উত্তরণে লেখক সমাজের করণীয় সম্পর্কে প্রাবন্ধিক লিখেছেন :

১। সাহিত্যের সমালোচনা যথাযথ হতে হবে। দলীয় এবং ব্যবসাগত সমালোচনা পরিত্যাগ করতে হবে। কেননা তা পাঠক সমাজের রুচি বিভ্রান্ত ও মনকে সন্দিগ্ধ করে তোলে।

২। মাঝে-মধ্যে পুস্তক-প্রদর্শনী, সাহিত্য আসর ও পুরস্কার প্রদানের ব্যবস্থা করে যোগ্য লেখককে সম¥ানিত করে পাঠক সমাজে আলোড়ন সৃষ্টি করতে হবে।

৩। ভালো বই কিনতে পাঠককে উৎসাহিত করতে হবে। ফলে প্রকাশক নতুন বই প্রকাশ করতে দ্বিধা করবে না।

৪। সরকারও সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতা করতে পারে। প্রকাশিত প্রতিটি বইয়ের উল্লেখযোগ্য অংশ ক্রয় করে সরকারী-বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে সরবরাহ করে পাঠক সৃষ্টি ও প্রকাশকদের সাহায্য করতে পারে। এছাড়া সরকারীভাবে মানস¤পন্ন ও জনপ্রিয় সাহিত্যের পুরস্কার প্রদান করে সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতা করতে পারে। (পৃ. ৪২৮)

কবীর চৌধুরী ‘যান্ত্রিক সমাজে লেখকের ভূমিকা’ শীর্ষক প্রবন্ধে তৎকালীন সমাজে লেখকের দায়-দায়িত্বের প্রকৃতি সম্পর্কে তাৎপর্যপূর্ণ মতামত রেখেছেন। তাঁর মতে, লেখক তাঁর উপর অর্পিত সামাজিক দায়িত্ব অস¦ীকার করতে পারেন না। তিনি যেমন সমসাময়িক জীবন লেখনীর বিষয়বস্তু হিসেবে বেছে নেন, তেমনি দূর অতীত ও অনাগত ভবিষ্যতও তাঁর লেখার বিষয়বস্তু হয়। প্রাবন্ধিক বলেন:

সমসাময়িক জীবন স¤পর্কে তাঁকে (লেখককে) অবহিত হতে হবেই। যদি তিনি সচেতন না হন, তা’হলে তাঁর পাঠকদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন ব্যর্থ হতে বাধ্য। ভাষা ও রীতি বিষয়ে দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও তিনি বড়ো লেখক হতে পারেন না। টেকনোলজিক্যাল সমাজে লেখকের এই সচেতনতা অবশ্যম্ভাবী।২৮

কেননা প্রত্যাশিত দায়িত্বের ভার যদি লেখকরা নিতে অপারগ হন, তাহলে বিজ্ঞানী ও কারিগরদের রাজত্ব দেখা দেবে, সমাজে লেখকরা হয়ে পড়বেন অপাঙক্তেয়। আবুল ফজলও ‘লেখকের স্বাধীনতা ও সামাজিক দায়িত্ব’ শীর্ষক প্রবন্ধে লেখক-সমাজের সামাজিক দায়িত্ব ও স্বাধীনতা সম্পর্কে অনুরূপ মতামত রেখেছেন।

খ. সাহিত্যের শৈলী বিচার

সাহিত্যস¤পর্কিত মতাদর্শিক আলোচনার পাশাপাশি সাহিত্যের আঙ্গিক বিচার তথা শৈলীগত দিক, সাহিত্য-শিল্পের ধারা, সাহিত্যের সমস্যা ও সম্ভাবনা, সাহিত্য-শিল্পে লেখক বা শিল্পীর ভূমিকা, সাহিত্যে আধুনিকতার স্বরূপ প্রভৃতি বিষয়ক রচনা প্রকাশে সিকান্দার আবু জাফরের শিল্পী মনের পরিচয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আবার পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের প্রায় সকল লেখকের সৃজনশীল রচনা সমকাল ধারণ করেছে। পত্রিকাটিতে সাহিত্যের শৈলীবিষয়ক আলোচনায় যাঁরা অংশ নেন তাঁদের মধ্যে আবু জাফর শামসুদ্দীন, আবদুল মান্নান সৈয়দ, হাসান হাফিজুর রহমান, আবদুল গনি হাজারী, বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, শাহাবুদ্দীন আহমাদ, এবনে গোলাম সামাদ, রফিকুল ইসলাম, আবদুল হক, আলাউদ্দিন আল আজাদ, আহমদ শরীফ, আবুবকর সিদ্দিক প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। সাহিত্যের শৈলী বিচারে সমকাল-এর ভূমিকা নির্ণয়ের সুবিধার্থে বিষয়টিকে আমরা নিম্নোক্তভাবে পর্যায়ক্রমে তুলে ধরতে চাই।

এক. কবিতা, দুই. নাটক এবং তিন. কথাসাহিত্য। 

এক : কবিতা

কবিতার সংজ্ঞায়ন কঠিন। তাত্ত্বিকেরা বিভিন্নভাবে কবিতার সংজ্ঞায়নের চেষ্টা করেছেন। কোলরিজ কবিতার সংজ্ঞায়ন প্রসঙ্গে বলেন―‘অপরিহার্য শব্দের অবশ্যম্ভাবী বিন্যাস’ হলো কবিতা।২৯ কবিতার শৈলীবিষয়ক যে সমস্ত রচনা সমকাল-এ প্রকাশিত হয় সেগুলোতে কবিতার সংজ্ঞা, স্বরূপ, বৈশিষ্ট্য, উৎপত্তি ও বিষয়বস্তু আলোচনার পাশাপাশি ইতিহাস-চেতনা, সমকাল-সংলগ্নতা ও মূল্যচেতনার প্রয়োগ সম্পর্কে দিক-নির্দেশনা পাওয়া যায়। এছাড়াও পূর্ব-পাকিস্তানে বাংলা কবিতার সংকট ও সম্ভাবনা নিয়ে প্রাবন্ধিকদের সুচারু মতামত অনেক প্রবন্ধের বিষয়বস্তু হয়েছে। পত্রিকাটিতে কবিতাবিষয়ক আলোচনায় অংশ নিয়েছেন বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, হাসান হাফিজুর রহমান, শাহাবুদ্দীন আহমাদ, এবনে গোলাম সামাদ প্রমুখ।

হাসান হাফিজুর রহমানের কবিতাবিষয়ক প্রবন্ধসমূহে কবিতার স¦রূপ ও বৈশিষ্ট্য, আধুনিক কবিতার লক্ষণ, বাংলা কবিতার অবনতির বিভিন্ন দিক ও উন্নতির পথ এবং কবিতার বিষয়বস্তু প্রভৃতি দিক আলোচিত হয়েছে।৩০ কাব্যের বাস্তবতা সম্পর্কে ‘কবিতার বিষয়বস্তু’ শীর্ষক প্রবন্ধে তিনি বলেন :

আমার বলে মনে হয় অথচ ঠিক যেন আমার না, পরের কিন্তু স¤পূর্ণ পরেরও তাকে বলা যায় না।… ঘনীভূত বাস্তব নিয়েই ধ্রুপদী কাব্যের ব্যাপৃতি, কিন্তু সেখানেও কাব্যের মৌলিক বোধ রক্ষিত। অর্থাৎ বস্তু থেকে বক্তব্যের রসায়ন ছেনে তোলা হয়েছে, সেখানে রস রয়েছে; বন্ধ চোখের মণির ছোঁয়া লেগে মণ্ডিত হয়ে উঠেছে, কাব্যিক অভিব্যক্তির ধারক হয়ে উঠেছে প্রায় প্রতিক্ষেত্রেই, যদিও নিজের অবয়ব ছাড়িয়ে উত্তরণের উদ্বোধন ঘটায়নি কবির মনে কখনও।৩১

কবির কাছে সময় অনন্ত। বর্তমান একদিন অতীত হয়। কবি-মনে অতীত এবং ভবিষ্যৎ একত্র হলে বর্তমান সার্থক হয়। কবিতার আবেদন চিরন্তন হওয়ায় কবিকে ত্রিকালের বাসিন্দা হতে হয়। কবিতা যেমন বস্তুনিরপেক্ষ নয়, তেমনি বস্তুর কাছে এ উৎসর্গিতপ্রাণও নয়। বস্তুত কবিতার বিষয়বস্তু হলো, জাগতিক আবর্তের স¦রূপ, আর কবির মন।

দুই : নাটক

নাটক বাংলা সাহিত্যের অধুনাতম আঙ্গিক। বিভাগ-পূর্বকালে আমাদের জীবন ও ঐতিহ্যের অনুসারী কোনও নাটক না থাকায় ’৪৭ উত্তরকালে বাংলা নাটকের পথচলা শুরু হয় ধীরগতিতে। আবার সে শুরুটাও অনেকটা গিরিশচন্দ্র ঘোষের অনুকরণে। অর্থাৎ আমাদের চলমান জীবনের সঙ্গে নাটকের কোনও যোগ স্থাপিত হয়নি। পরিবেশনার ক্ষেত্রেও সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনার অভাব দেখা গেছে। এর উপর ছিল মাতৃভাষা কেন্দ্রিক সংকট। এ সম্পর্কে সমকাল-এ ইসমাইল মোহাম্মদ-এর ‘নাট্যকলার ক্রমবিকাশ’, রফিকুল ইসলাম-এর ‘পূর্ব-পাকিস্তানের সমকালীন মঞ্চ ও অভিনয়’ এবং আবদুল হক-এর ‘নাটক ও সাহিত্য’ শীর্ষক ৩টি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। এসব প্রবন্ধে নাটকের ইতিহাস, জীবনের সঙ্গে নাটকের সংযোগশূন্যতা ও নাটকের মানদণ্ড নিয়ে যুক্তিপূর্ণ আলোচনা স্থান পেয়েছে। তৎকালীন বাংলা নাটকের ভাষা সংকট সম্পর্কে রফিকুল ইসলাম বলেন :

আমরা মাতৃভাষার জন্য প্রাণ দিতে সক্ষম কিন্তু মাতৃভাষায় ভালোভাবে কথা বলতে অক্ষম, যেখানে আমরা ভালো করে কথা বলতে পারিনে, সেখানে কথার মালা সাজিয়ে অভিনয় করবো কি করে? পুরুষকে মেয়ে মানুষ সাজিয়েও হয়তো ভালো নাটক করা যেতে পারে কিন্তু ভালো করে কথা বলতে না পারলে―সংলাপ জীবন্ত না হলে মঞ্চে ঘটনা চরিত্র প্রকাশ পেতে পারে না―তাই আমাদের এখানে অভিনয়ের সবচেয়ে বড় বাধা মাতৃভাষা, সুষ্ঠু কথনে আমাদের আড়ষ্ঠতা।৩২    

তিন : কথাসাহিত্য

সমকাল-এ প্রকাশিত কথাসাহিত্যবিষয়ক প্রবন্ধসমূহে কথাসাহিত্যের উদ্ভব, ক্রমবিকাশ ও পূর্ব-পাকিস্তানের কথাসাহিত্যের গতি-প্রকৃতি, সমস্যা এবং করণীয়বিষয়ক বিভিন্ন দিক আলোচিত হয়েছে। একজন গবেষকের মতে, বাঙালি মুসলমানের জাগরণ কামনাকালে যে ধরনের সাহিত্য রচনার উপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছিল তার সঙ্গে শিল্পদৃষ্টির ততখানি সম্পর্ক ছিল না, যতখানি ছিল মুসলমানের ধর্মতত্ত্ব, ইতিহাস, গৌরবগাথা, ঐতিহ্য ইত্যাদি রূপায়ণের উপর। যে কারণে আমরা লক্ষ করি, মুসলিম লেখকদের অনেকেই সৃজনধর্মী সাহিত্যচর্চার বিরোধিতা করেছিলেন। বিরোধিতাকারীদের একটি দল চালিত ছিলেন ধর্মীয় নীতিবোধের দ্বারা এবং সেই মাপকাঠিতেই তারা সাহিত্য বিচারে অগ্রসর হয়েছিলেন। উপন্যাসবিরোধীদের ধারণা ছিল, এ সাহিত্য মুসলমানদের উন্নতির বদলে আরও অবনতি ডেকে আনবে।৩৩ ’৪৭-উত্তর কালেও বাঙালি মুসলমান সমাজে উপন্যাস সম্পর্কে এরূপ দ্বিধাবিভক্তি দেখা গেলে আলাউদ্দিন আল আজাদ (১৯৩২-২০০৯) ‘উপন্যাসে জীবন-চিত্রণ’ শীর্ষক প্রবন্ধে উপন্যাসের উৎপত্তি, বিষয়বস্তু ও ঔপন্যাসিকের করণীয় সম্পর্কে দিক-নির্দেশনা দেন। তাঁর মতে, ঔপন্যাসিকের প্রধান গুণ বাস্তবতার চিত্রণ। সেজন্য ঔপন্যাসিককে সমাজ সম্পর্কে নিখুঁত ধারণা অর্জন করতে হবে। কেননা এ গুণই হলো উপন্যাস রচনার ভিত্তিভূমি। অজিতকুমার গুহও ‘সমকালীন কথাসাহিত্যের ধারা’ শীর্ষক প্রবন্ধে বাংলা উপন্যাস সাহিত্যে মুসলিম জীবন চিত্রণের অনুপস্থিতির কারণ ও পূর্ব-পাকিস্তানের ঔপন্যাসিকদের করণীয় সম্পর্কে দিক-নির্দেশনা দিয়েছেন। অন্যদিকে আহমদ শরীফ পূর্ব-পাকিস্তানের কথাসাহিত্যের যথাযথ বিকাশ না হবার পিছনে কিছু কারণ চিহ্নিত করেছেন :

১. আমরা কি লিখব আর কেমন করে লিখব তার সৃষ্টি-সম্ভব ধারণা আমাদের মনে গড়ে ওঠেনি। অথচ, সাহিত্য-শিল্প হচ্ছে কি ভাবছি তা নয়, ভাব কি ভাবে প্রকাশ করছি তা-ই।…

২. মানুষের প্রতিমুহূর্তের বাহ্যাচরণ ও জীবন প্রচেষ্টার মধ্যে মনুষ্যজীবনের বৃত্তি-প্রবৃত্তির যে অদৃশ্য প্রভাব রয়েছে, তার যথার্থ স্বরূপ না জানলে বা কার্য-কারণ জ্ঞান না জন্মালে কোন রচনাই শিল্পায়ত্ত হবে না।… এদুটো অভিজ্ঞতার অভাবেই মুখ্যত আমাদের ছোটগল্প সার্থক হচ্ছে না আর লেখকরা উপন্যাস রচনায় সাহস পাচ্ছেন না।৩৪ ইত্যাদি।

সৃজনী গদ্যসাহিত্যের সর্বাপেক্ষা জনপ্রিয় শিল্পরূপ হলো ছোটগল্প। ছোটগল্প একই সঙ্গে ছোট এবং গল্প; আকৃতি এবং প্রকৃতি মিলিয়ে এই এক ও অদ্বিতীয় শর্ত তাকে পূরণ করতে হয়।৩৫ আবুবকর সিদ্দিক (১৯৩৪-২০২৩) ‘সোনা রূপা নহে বাপা এ বাঙা পিতল’ শীর্ষক প্রবন্ধে ছোটগল্পের বৈশিষ্ট্য আলোচনা প্রসঙ্গে পূর্ব-পাকিস্তানের ছোটগল্পের গতি-প্রকৃতি আলোচনা করেছেন।৩৬

গ. সমালোচনা-সাহিত্যে সমকাল-এর অবদান

সমালোচনা এক ধরনের রসসৃষ্টি। সমালোচক বা রসস্রষ্টা কোনো না কোনো মূল্যমানের সাহায্যে সাহিত্য সমালোচনা করে থাকেন। সমালোচক কেবল ব্যাখ্যাকার নন, স্রষ্টাও। সমালোচক যখন লেখককে তাঁর সৃষ্টির ব্যাপারে দিক-নির্দেশনা দেন―তখন তিনিও স্রষ্টার ভূমিকা পালন করেন। এজন্যে তাঁকে অবশ্য অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন হতে হয়।৩৭ সমালোচনা-সাহিত্যের ইতিহাস অতি প্রাচীন (প্লেটো এর আদি পুরুষ) হলেও বাংলা সমালোচনা-সাহিত্য সাম্প্রতিক কালের সৃষ্টি। এ কারণে সেখানে বৈচিত্র্য ও সমৃদ্ধির অভাব দৃষ্টিগোচর হয়।৩৮ অনেকে মনে করেন, বাংলা সাহিত্যের আশানুরূপ উন্নতি না হবার অন্যতম কারণ সমালোচনা-সাহিত্যের দুর্বলতা। আমরা জানি, যথার্থ সমালোচনা সাহিত্যকে সঠিক পথে চলতে সাহায্য করে। অথচ পূর্ব-পাকিস্তানের সাহিত্যে সমালোচনার যথার্থ রূপ চোখে পড়ে না। বাংলা সাহিত্যের মননশীল এ ধারাটির সমৃদ্ধি সাধনে সমকাল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। পত্রিকাটিতে সমালোচনা সম্পর্কিত শৈলীগত আলোচনা ও বাংলা সমালোচনা-সাহিত্যের গতি-প্রকৃতি নির্ণয়ের পাশাপাশি কবিতা, প্রবন্ধ, কথাসাহিত্যবিষয়ক বহুবিধ মূল্যায়নধর্মী প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। এ সকল প্রবন্ধ প্রকাশে সমকাল-এর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল নির্মোহ এবং প্রগতিশীল। অর্থাৎ প্রবন্ধসমূহে জাতীয় আদর্শ এবং রাজনীতির সঙ্গে সাহিত্যকে যুক্ত করে বিচার করার প্রবণতা প্রায় চোখেই পড়ে না। বরং সাহিত্য সমালোচনার ক্ষেত্রে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য রীতির মেলবন্ধন ঘটানোর চেষ্টা দেখা যায়।৩৯ 

বাংলা সমালোচনা-সাহিত্যে সমকাল-এর ভূমিকার স্বরূপ নিরূপণ করতে আলোচ্য বিষয়কে কয়েকটি উপ-শিরোনামে ভাগ করে পর্যায়ক্রমে তুলে ধরতে চাই :

এক. রবীন্দ্র-সাহিত্য মূল্যায়নে সমকাল

দুই. নজরুল-সাহিত্য মূল্যায়নে সমকাল

তিন. লোক-সাহিত্য মূল্যায়নে সমকাল

চার. অন্যান্য সাহিত্যিকদের রচনাকর্ম মূল্যায়নে সমকাল।

এক : রবীন্দ্র-মূল্যায়নে সমকাল-এর অবদান

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর পূর্ব-বাংলার মানুষের ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির স্বরূপ কী হবে, সামগ্রিক বাংলা সাহিত্যের কতটুকু পূর্ব-পাকিস্তানে গৃহীত ও বর্জিত হবে―তা নিয়ে বুদ্ধিজীবী মহলে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়।৪০ শাসকগোষ্ঠীর পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা না এলেও পাকিস্তানপন্থি লেখক-সমাজ পাকিস্তানি আদর্শের ভিত্তিতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১) রচিত সাহিত্যের প্রয়োজনীয়তা ও প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।৪১ সৈয়দ আলী আহসান ‘পূর্ব-পাকিস্তানের বাংলা সাহিত্যের ধারা’ (১৯৫১) শীর্ষক প্রবন্ধে     পাকিস্তানি সাহিত্যের গতি-প্রকৃতির দিকনির্দেশনা দিয়ে বলেন―‘আমাদের সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখবার এবং হয়তো বা জাতীয় সংহতির জন্য যদি প্রয়োজন হয়, আমরা রবীন্দ্রনাথকেও অস্বীকার করতে প্রস্তুত রয়েছি।’৪২ গোলাম মোস্তফা ‘ইকবাল ও রবীন্দ্রনাথ’ (১৯৬০) শীর্ষক প্রবন্ধে বলেন―‘রবীন্দ্র-কাব্যের যে প্রেরণা ও দর্শন তা মধ্যযুগীয়; প্রগতিশীল বিশ্বমানুষের কাছে তার কোনো আবেদন নেই।’৪৩ স্বাতন্ত্র্যপন্থি তাত্ত্বিকদের এসব বক্তব্য নিয়ে পূর্ব-পাকিস্তানে তীব্র বাগ-বিতণ্ডার সূত্রপাত হয়। পাকিস্তানি ধারার অর্থাৎ স্বতন্ত্র ধারার সাহিত্যিক ঐতিহ্য সৃষ্টিতে এ সময় দৈনিক আজাদ পত্রিকায় বেশ কিছু সম্পাদকীয় ও প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়।৪৪ আজাদ-এ প্রকাশিত মতামতের বিরোধিতা করে অবশ্য দৈনিক ইত্তেফাক ও দৈনিক সংবাদ-এ সামগ্রিক বাংলা সাহিত্যের ধারণা নিয়ে প্রগতিপন্থিদের রচিত প্রবন্ধ প্রকাশিত হতে থাকে। এঁদের কারো কারো বক্তব্য ছিল―বাঙালির সংস্কৃতি হবে জাতিভিত্তিক, ধর্ম থাকতেও পারে―নাও পারে।৪৫ শুধু তা-ই নয়, বাঙালির যা কিছু সাংস্কৃতিক অর্জন তার সবকিছুকেই নিজেদের ঐতিহ্য হিসেবে গ্রহণ করতে এঁরা ছিলেন দ্বিধাহীন। তাই সরকার ১৯৬১ সালে ‘রবীন্দ্র-জন্ম-শতবার্ষিকী’ অনুষ্ঠান প্রতিহত কিংবা ১৯৬৭ খ্রিষ্টাব্দে বেতার থেকে রবীন্দ্র সঙ্গীতের প্রচার হ্রাস বা বর্জন করতে চাইলেও সফল হতে পারেনি।৪৬ বরং রবীন্দ্রনাথেরই গান পরিণত হয় বাঙালি জাতীয়তাবাদের বাহনে, যা পরে বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীতের মর্যাদা পেয়েছে।৪৭ রবীন্দ্র-সঙ্গীত চর্চার অন্যতম প্রতিষ্ঠান ‘ছায়ানট’ (১৯৬১) প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। পূর্ব-পাকিস্তানের সংস্কৃতিতে রবীন্দ্রনাথ চর্চা অব্যাহত থাকবে কি না―এ নিয়ে তুমুল তর্ক-বিতর্ক চলাকালেই সিকান্দার আবু জাফরের সমকাল ১৯৬১ সালে ‘রবীন্দ্র-জন্ম-শতবার্ষিকী সংখ্যা’ (৪ বর্ষ, ৯ম সংখ্যা, বৈশাখ ১৩৬৮) প্রকাশ করে সাহসী ভূমিকা পালনের ক্ষেত্রে আরও একধাপ এগিয়ে যায়। সংখ্যাটিতে রবীন্দ্রসাহিত্যের মূল্যায়ন, রবীন্দ্র সঙ্গীত, নাটক, কথাসাহিত্য, রবীন্দ্রনাথের ধর্ম ও সম্প্রদায় ভাবনা, শিক্ষা-ভাবনা, অনুবাদ সাহিত্যে তাঁর অবদান, পূর্ব-পাকিস্তানে রবীন্দ্রনাথের প্রাসঙ্গিকতা, মানবতাবোধ, বাংলা ভাষায় রবীন্দ্রনাথের অবদান মূল্যায়ন, সাহিত্যবিচারে রবীন্দ্রনাথের দান, চিত্রকলায় রবীন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথ ও মুসলমান সমাজ প্রভৃতি বিষয়ক প্রবন্ধ এবং রবীন্দ্রনাথকে নিবেদিত কবিতা প্রকাশিত হয়। এছাড়াও কবির জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে বিভিন্ন সময় তাঁর সৃষ্টিজগৎ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা সমকাল প্রকাশ করে। অর্থাৎ সমকাল-এর রবীন্দ্রচর্চা বাংলাদেশে রবীন্দ্রচর্চার ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করেছে। রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে সমকাল-এর লেখকদের বিচিত্র দৃষ্টিভঙ্গিসমূহকে আমরা নিম্নোক্ত ভাবে ভাগ করতে পারি।

এক. পাকিস্তান সৃষ্টির পরিপ্রেক্ষিতে রবীন্দ্রনাথ। সাহিত্যক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের প্রতিভা বহুমাত্রিক। কবি, গল্পলেখক, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, প্রাবন্ধিক, তাত্ত্বিক এমনকি সংগঠক হিসেবেও তাঁর খ্যাতি সর্বজনবিদিত। তারপরও বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্র-বিতর্ক নতুন নয়। সাহিত্যজগতে রবীন্দ্রনাথের আবির্ভাবের পর থেকেই কবিকে নানামুখী সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়। কিন্তু জাতীয় আদর্শের প্রসঙ্গ তুলে পূর্ব-পাকিস্তানে রবীন্দ্র-সাহিত্যের বিরোধিতা প্রবল হয়ে উঠলে পূর্ব-পাকিস্তানের বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথের অপরিহার্য অবদানের স্বীকৃতি ও পাকিস্তানি ভাবাদর্শের সঙ্গে রবীন্দ্র-ভাবনার সম্পর্ক ও সাদৃশ্য আবিষ্কার করে এ অংশে আলোচনায় অংশ নিয়েছেন জ্যোতির্ময় গুহ ঠাকুরতা, সাজ্জাদ হোসায়েন, ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ প্রমুখ।

দুই. সমাজ-ভাবনা। রবীন্দ্রনাথ জীবন ও জগৎ সম্পর্কে সর্বদা সজাগ থাকতেন। সাম্প্রদায়িক চেতনা, হিন্দু-মুসলমান সম্পর্ক, দেশভাগ প্রভৃতি প্রশ্নে তিনি সচেতনভাবে মতামত রেখেছেন। সমকাল-এ রবীন্দ্রনাথের সমাজ-ভাবনার এসব দিক নিয়ে আলোচনা করেছেন মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী ও আবুল ফজল।

তিন. শিক্ষা-দর্শন। রবীন্দ্রনাথকে জানতে হলে তাঁর শিক্ষা ও সংস্কৃতি ভাবনার মূল উৎসের দিকে দৃষ্টি দিতে হবে। বর্তমানকালে যে কয়জন চিন্তাবিদ শিক্ষাক্ষেত্রে মৌলিক অবদান রেখে পৃথিবীকে সমৃদ্ধ করেছেন―রবীন্দ্রনাথ তাঁদের অন্যতম। সমকাল-এ রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাভাবনা সম্পর্কে তাৎপর্যপূর্ণ মতামত রেখেছেন এস. এন. কিউ. জুলফিকার আলী ও ডক্টর মুহম্মদ কুদরত-ই খুদা।

চার. ধর্ম-ভাবনা। রবীন্দ্রনাথের ধর্ম-ভাবনা মানবসম্পৃক্ত। সমকাল-এ তাঁর ধর্ম-ভাবনা ও মানবতাবোধের স্বরূপ নিয়ে আলোচনা করেছেন আবুল ফজল, শওকত ওসমান, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী ও সৈয়দ নুরুদ্দিন। আদর্শ বা ধর্মের ক্ষেত্রে আমরা রবীন্দ্র-বিশ্বাসের ক্রমোন্নতি লক্ষ করি। আচার-পরায়ণতা ও আনুষ্ঠানিকতার শৃঙ্খল কেটে তাঁর ধর্মবিশ্বাস আপন পথ তৈরি করে নিয়েছে। হার্বার্ট বক্তৃতায় রবীন্দ্রনাথ ‘ধর্ম’ কথাটির অর্থ করেছেন ‘এসেনশিয়াল কোয়ালিটি অব এ থিং’ বলে। এর অর্থ হিসেবে সৈয়দ নুরুদ্দিন ‘রবীন্দ্রনাথ’ শীর্ষক প্রবন্ধে বলেন, মনুষ্যত্বই মানুষের ‘এসেনশিয়াল কোয়ালিটি’ এবং মানবতাবাদই রবীন্দ্রনাথের ধর্ম।৪৮

পাঁচ. সাহিত্য বিচারে রবীন্দ্রনাথ। সাহিত্য, দর্শন, সমাজ, বিজ্ঞান প্রভৃতি বিষয় নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ভেবেছেন এবং সেই ভাবনা-চিন্তার ফল তাঁর বিভিন্ন রচনায় ব্যক্ত হয়েছে। সাহিত্যবিচারে রবীন্দ্র-ভাবনার স্বরূপ উদঘাটন করেন ফখরুজ্জামান চৌধুরী ‘সাহিত্য-বিচারে রবীন্দ্রনাথ’ শীর্ষক প্রবন্ধে।

ছয়. রবীন্দ্রনাথ ও বাংলা কবিতা। ‘বাংলা কাব্যে মূল্যবোধের বিবর্তন : রবীন্দ্রনাথ’ শীর্ষক প্রবন্ধে হাসান হাফিজুর রহমান আধুনিক বাংলা কবিতার ইতিহাসে রবীন্দ্রনাথের অবস্থান মূল্যায়ন করেছেন।

সাত. কাব্যভুবনের শেষ অধ্যায়ে রবীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্রনাথের শেষ পর্বের সাহিত্যকর্মের মূল্যায়ন করেছেন শ্রী অরুণ কুমার তালুকদার ও মির্জা হারুণ-অর-রশিদ। আমরা জানি, সময়ের সাথে সাথে রবীন্দ্রনাথের কাব্যবোধের স্বরূপ পরিবর্তন হতে থাকে। পুনশ্চর যুগ থেকেই রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিভঙ্গির এ পরিবর্তন দেখা যায়। এ পর্যায়ে কবি তাঁর ভাবাদর্শ ও স্বপ্ন-কল্পনা-রাজ্য ছেড়ে পৃথিবীর বাস্তব অভিজ্ঞতার মধ্যে নেমে আসেন এবং বিষয়বস্তুর অভিজ্ঞতার পরিবর্তে পৃথিবীর অকিঞ্চিৎকর সামান্য ঘটনার মধ্যে দেখেন অনির্বচনীয় সৌন্দর্য সুষমা।

আট. অনুবাদ ও গদ্যসাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ। আবু রুশদ অনুবাদ কর্মে ও গদ্য রচনায় রবীন্দ্রনাথের অবদান মূল্যায়ন করেছেন।

দুই : নজরুল মূল্যায়নে সমকাল-এর অবদান

রবীন্দ্র-চর্চায় গুরুত্বপূর্ণ অবদানের পাশাপাশি নজরুল-চর্চায়ও সমকাল উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে সক্ষম হয়েছিল। ’৪৭-উত্তর পূর্ব-পাকিস্তানে নজরুল ইসলামের সাহিত্যের প্রাসঙ্গিকতা ও পরিপ্রেক্ষিত নিয়ে অনাবশ্যক তর্ক-বিতর্কের সূচনা হয়। শাসকগোষ্ঠী এবং স্বাতন্ত্র্যবাদী সংস্কৃতিসেবীদের একাংশ রবীন্দ্র-বর্জন এবং নজরুলকে ‘জাতীয় কবি’র সম্মান দিয়ে রবীন্দ্রনাথের প্রতিপক্ষ বা বিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করাবার প্রচেষ্টা চালায়।৪৯ আবার কবি গোলাম মোস্তফা ১৯৫০ সালে নজরুলের কবিতায় ইসলামি গুণের অনুপস্থিতির কারণে তাঁকে আক্রমণ করেন। তিনি কাব্যবিচারের ক্ষেত্রে ইসলামি ভাবাদর্শ অনুসরণকে পাকিস্তানি আদর্শ হিসেবে অভিহিত করে নজরুল সাহিত্যের হিন্দু ভাবধারার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অংশটুকু বর্জন করতে বলেন।৫০ এ সময়পর্বে নজরুল সাহিত্যের পক্ষে-বিপক্ষে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় আলোচনা-সমালোচনার পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৬৪ সালে ‘নজরুল একাডেমি’ প্রতিষ্ঠিত হয়।৫১ সংগঠনটি পাকিস্তান রাষ্ট্রের পরিপ্রেক্ষিতে নজরুল মূল্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।৫২ সমকাল এক্ষেত্রে সদ্য স্বাধীন দেশে নজরুল সাহিত্যের অপরিহার্য দিকসমূহ নির্মোহ দৃষ্টিভঙ্গিতে তুলে ধরেছে। ‘জাতীয় কবি’ বিতর্কে না জড়িয়ে নজরুল-প্রতিভার যথাযথ স্বীকৃতি দিয়েছে। পত্রিকাটি রবীন্দ্রনাথের জন্ম-শতবর্ষ উপলক্ষে যেমন বিশেষ সংখ্যা (৪ বর্ষ, নবম সংখ্যা) প্রকাশ করেছে, অনুরূপভাবে নজরুলের জন্ম-জয়ন্তী (হীরক জয়ন্তী) উপলক্ষে নজরুল সম্পর্কিত একাধিক প্রবন্ধ নিয়ে (পরবর্তী ৪ বর্ষ, দশম সংখ্যা) সংখ্যা বের করেছে। এছাড়া প্রায় প্রতিবছর নজরুল জন্ম-জয়ন্তী উপলক্ষে সমকাল প্রবন্ধ ছেপেছে। সমকাল-এ নজরুলবিষয়ক প্রকাশিত প্রবন্ধে একদিকে নজরুল সাহিত্যের সমগ্র অংশের মূল্যায়নের চেষ্টা আছে, অন্যদিকে তাঁর কবিতার আবেদনের সঙ্গে পাকিস্তান আন্দোলন ও পাকিস্তান রাষ্ট্রের আন্তঃসম্পর্ক নির্ণয়ের চেষ্টা আছে।

সমকাল-এ নজরুলকে নিয়ে যাঁরা লিখেছেন তাঁদের মধ্যে আনিসুজ্জামান, মাইজুদ্দিন আহাম্মদ, কবীর চৌধুরী, হাসান হাফিজুর রহমান, আবদুস সাত্তার, আবদুল মান্নান সৈয়দ, বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, সিদ্দিকুর রহমান, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। এছাড়া পত্রিকাটির বিভিন্ন সংখ্যায় নজরুলের কবিতার পুনর্মুদ্রণ এবং তাঁকে নিবেদিত কবিতা ও প্রমীলা নজরুলের মৃত্যুতে শ্রদ্ধা জানিয়ে বিশেষ নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। নজরুল মূল্যায়নে এঁদের তিনটি প্রবণতা চোখে পড়ে।

এক. পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রেক্ষাপটে নজরুল সাহিত্যের প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে বিতর্ক। তৎকালীন সময়ে অনেকে সাহিত্যকর্মের চেয়ে ধর্মের মূল্যবোধ সংরক্ষণে নজরুলের অবদান কতটুকু তা পর্যালোচনায় প্রবৃত্ত হন। ফলে অনিবার্যভাবেই কবি স¤পর্কে বিতর্কের সৃষ্টি হয়। যাঁরা কবির সৃষ্টিকে মূল্যায়ন না করে এরূপ বিতর্ক তৈরিতে ভূমিকা রেখেছেন তাঁরা কতগুলো অপ্রিয় বিষয়ের অবতারণা করেন। যেমন:

১. নজরুল কবিমানস কী এবং কিসের পটভূমিকায় এর বিকাশ ও সম্প্রসারণ তা উপেক্ষা করে সমকালীন প্রয়োজনের প্রশ্নে নিত্য নতুন রূপ ও অভিনব উপায়ে বিশ্লেষণ;

২. মননশীলতার চিহ্নিত অভিব্যক্তি অনুধাবনের প্রয়াস এড়িয়ে গিয়ে কবির কাব্যসৃষ্টির সামগ্রিকরূপ বিখণ্ডিতকরণ;

৩. ভাবালুতা ও সে¦চ্ছাচারের আতিশয্যে কাব্য বিচারের স¦নির্ধারিত গতি, ধারা ও আঙ্গিকের প্রতি উদাস থেকে কবি ও তাঁর কাব্যকে সংকীর্ণতার বেড়াজালে আবদ্ধ করার সচেতন প্রয়াস;

৪. কবির জীবনধর্ম বিশিষ্টার্থে সর্ব মানুষের জীবনধর্ম ও তার সমি¥লিত প্রতিধ্বনি; আর সে প্রতিধ্বনিকে নির্দিষ্ট গণ্ডির সমীকরণের আপত্তিকর অন্তর্দাহ;

৫. যে সাম্প্রদায়িকতাবোধ কবির জীবনদর্শনের অস্পৃশ্যবস্তু তাকে জোর করে তাঁর সাহিত্যে উপস্থাপনের বিরামহীন সাধনা।৫৩ সমকাল-এ পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রেক্ষাপটে নজরুল সাহিত্যের প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে বিতর্কে অংশ নেন সিদ্দিকুর রহমান এবং মাইজুদ্দিন আহাম্মদ।

দুই. নজরুল সাহিত্যে কালের প্রভাব বিচার। প্রগতিবাদী তাত্ত্বিক আনিসুজ্জামান এবং আবদুল কাদির নজরুলের কবিতার সমকাল-সংলগ্নতা, বিষয়, কবি-প্রতিভার স্বরূপ ও জনপ্রিয়তার কারণ বিশ্লেষণ করেছেন।

তিন. নজরুল সাহিত্যের আঙ্গিক ও উপাদান বিচার এবং জনপ্রিয়তার কারণ সন্ধান। নজরুল বিদ্রোহী এবং প্রেমিক। তাঁর কবিতার মধ্যে এ দুয়ের সমান্তরাল ও দ্বন্দ্বমুখর প্রকাশ ঘটেছে। নজরুল সৃষ্টিসম্ভারের মনোভঙ্গি, উপাদান নিয়ে জনপ্রিয়তার কারণ সম্পর্কে আলোচনা করেছেন হাসান হাফিজুর রহমান, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, আবদুল মান্নান সৈয়দ এবং আবদুল হক। 

তিন : লোকসাহিত্য মূল্যায়নে সমকাল-এর অবদান

লোকসাহিত্য প্রাকৃতজনের সাহিত্য। শিক্ষা-সভ্যতার বিকাশ আমাদের সমাজ-জীবন থেকে লোকসাহিত্যসমূহকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে। অথচ এসবের মধ্য দিয়ে আমরা আমাদের অতীত ঐতিহ্য এবং সামাজিক, সাংস্কৃতিক, আর্থনীতিক ও নৃতাত্ত্বিক ইতিহাসের পরিচয় পাই। এ কারণে ‘জাতীয় গরজে’ই এসবের সংগ্রহ, পঠন-পাঠন ও গবেষণা জরুরি।৫৪ বাংলা লোকসাহিত্যের মধ্যে ছড়া, রূপকথা, গান, গাথাকাব্য, প্রবাদ-প্রবচন, হেঁয়ালি, বাউলগান, সারি, ভাটিয়ালি প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। সমকাল বাঙালির সচেতন অংশে সামাজিক-সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে তথা লোকসাহিত্যকে পরিচয় করিয়ে দিতে এবং বিদ্বৎসমাজে লোকসাহিত্যের চর্চা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। পত্রিকাটিতে যাঁদের লোকসাহিত্যবিষয়ক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছিল তাঁদের মধ্যে আহমদ শরীফ, মুহম্মদ মনসুর উদ্দীন, আবুল আহাদ, বযলুর রহমান, ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, আবদুল কাদির, এস. এম. লুৎফর রহমান, শাহ্ লতীফ আফীআন্হু প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। লোকসাহিত্যবিষয়ক প্রবন্ধ-নিবন্ধ প্রকাশ করে সমকাল বাংলা সাময়িকপত্রের ইতিহাসে বিশেষ মর্যাদার অধিকারী হয়েছে। পত্রিকাটিতে লোকসাহিত্যবিষয়ক আলোচনায় দুটি দিকের প্রতি দৃষ্টি আরোপ করা হয়েছে।

এক. জাতীয় জীবনে লোকসাহিত্য। জাতীয় জীবনে লোকসাহিত্যের গুরুত্ব উপলব্ধি করে আহমদ শরীফ, মুহম্মদ মনসুর উদ্দীন, আবদুল আহাদ প্রমুখ এর তাৎপর্য তুলে ধরেছেন। 

দুই. বাংলা লোকসাহিত্যে বাউল গান। বাউলবিষয়ক বেশ কিছু প্রবন্ধ সমকাল-এ প্রকাশিত হয়েছে। প্রবন্ধসমূহে বাউলদের পরিচয়, বাউল গানের উৎস, বাউল-দর্শনের স্বরূপ, বাউলদের ভাব-সাধনার প্রকৃতি প্রভৃতি আলোচনা স্থান পেয়েছে। ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, আবদুল কাদির, বযলুর রহমান, এস. এম. লুৎফর রহমান, শাহ্ লতীফ আফীআন্হু প্রমুখ এ অংশে আলোচনায় অংশ নিয়ে বাঙালির জীবনে লোকসাহিত্যের অবদান ও প্রভাব আলোচনা করেছ্নে।

চার : অন্যান্য সাহিত্যিকদের রচনাকর্ম মূল্যায়নে

সমকাল-এর অবদান

সমকাল-এ রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলবিষয়ক আলোচনা-সমালোচনার বাইরেও লেখকদের কবিতা, প্রবন্ধ, কথাসাহিত্য, পুথি-সাহিত্য, অনুবাদ-সাহিত্য প্রভৃতিবিষয়ক মূল্যায়নধর্মী প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। এসব সাহিত্য-সমালোচনমূলক প্রবন্ধ রচনায় অংশ নেন আনিসুজ্জামান, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, আবদুল কাদির, কবীর চৌধুরী, হাসান হাফিজুর রহমান, আবদুল মান্নান সৈয়দ, বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, এবনে গোলাম সামাদ, আবদুল হক, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, আবুল ফজল, শওকত ওসমান, আবু রুশদ, ডক্টর সাজ্জাদ হোসায়েন, মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, ডক্টর মুহম্মদ কুদরত-ই-খুদা, সৈয়দ আলী আহসান, আবু জাফর শামসুদ্দিন, সনজীদা খাতুন, বুলবন ওসমান, মোহাম্মদ আবদুল আওয়াল, মোবাশ্বের আলী, আবুল হাসানাত, বশীর আল হেলাল প্রমুখ প্রথিতযশা স্বাতন্ত্র্যবাদী, সমন্বয়বাদী ও প্রগতিশীল লেখক-সমালোচকবৃন্দ। সাহিত্যের মূল্যায়নে এঁদের দেওয়া মতামত ও বিতর্ক পত্রিকাটিতে প্রকাশিত হয়েছে অবাধে। ফলে বাংলা সমালোচনা-সাহিত্য একটি দৃঢ় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। 

বাংলা প্রগতিশীল সাময়িকপত্রের ইতিহাসে সমকাল-এর ভূমিকা পথিকৃতের। পথিকৃৎ এই অর্থে, সমকাল তার পাতায় গোত্র বিচার না করে লেখকদের সৃষ্টিধর্মী রচনা প্রকাশের পাশাপাশি তাঁদের রচনাকর্মের নিরপেক্ষ ও যথার্থ মূল্যায়নধর্মী প্রবন্ধ এবং গ্রন্থালোচনা প্রকাশ করে বাংলা সাহিত্যকে একটি উন্নত স্তরে উন্নীত করতে সক্ষম হয়েছে। সমকাল কোনো মতবাদপন্থি পত্রিকা ছিল না। লেখকদের মতভেদ সত্ত্বেও সাহিত্যের আদর্শ ও উদ্দেশ্য নিয়ে লেখা অসংখ্য রচনা প্রকাশ করে পত্রিকাটি বাংলাদেশের সাহিত্যের গতি-প্রকৃতি নির্ণয়ে তথা বাঙালির সাংস্কৃতিক গতিপথ নির্ধারণে সচেষ্ট থেকেছে। তবে সমকাল-এর মূল কৃতিত্ব হলো―জাতীয়তাবাদী ধারার রচনা প্রকাশ করা। এ পথেই বাঙালি জনগোষ্ঠী লড়াই-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অর্জন করেছে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ।

তথ্যনির্দেশ ও টীকা

১. হাসান হাফিজুর রহমান, ‘সওগাত থেকে সমকাল’, হাসান হাফিজুর রহমান রচনাবলী (দ্বিতীয় খণ্ড), রফিকউল্লাহ খান

(সম্পাদিত), বাংলা একাডেমি, ঢাকা ১৯৯৫, পৃ. ২১০

২. আবদুল হক,  ‘সমকাল-এর ভূমিকা’, বাঙালির জাগরণ, অনুপম প্রকাশনী, ঢাকা ২০০১, পৃ. ২২৯-২৩০  

৩. ইসরাইল খান, বাংলা সাময়িকপত্র : পাকিস্তান পর্ব, বাংলা একাডেমি, ঢাকা ২০০৪, পৃ. ৩৫১

৪. সমকাল-এর এ অভিযাত্রা সহজ ছিল না। শিল্প-সংস্কৃতির সকল ক্ষেত্রে সমকাল-এর অগ্রযাত্রায় ভীত হয়ে পত্রিকাটির সম্পাদক এবং লেখকগোষ্ঠীর উপর পূর্ব-পাকিস্তান সরকারের হোম ডিপার্টমেন্ট, ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চ এবং পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর ইন্টেলিজেন্স বিভাগ কঠোর নজরদারি আরম্ভ করে। হোম ডিপার্টমেন্ট সমকাল মুদ্রায়ণ, বাংলা উন্নয়ন বোর্ড এবং পত্রিকাটির লেখকদের বাড়িতে ও কর্মক্ষেত্রে যুগপৎ হানা দিয়ে পত্রিকা এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের ফাঁসানোর চেষ্টা করে। সমকাল-এর কার্যালয়ে ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চ-এর লোক বসানো হয়। পত্রিকাটির অন্তত চারটি সংখ্যা সরকার কর্তৃক বাজেয়াপ্ত হয় এবং আরও দুটি সংখ্যা বাজেয়াপ্ত করার চেষ্টা চলে। কিন্তু সম্পাদকের প্রখর ব্যক্তিত্ব, সরকারের উচ্চ পর্যায়ে যোগাযোগ তথা ‘পাকিস্তান রাইটার্স গিল্ডে’-র সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা প্রভৃতি সমকাল ও এর লেখকবৃন্দকে আসন্ন বিপদ থেকে রক্ষা করে। এভাবে নানাবিধ সম্পর্ক ও বিরোধিতার মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদ স্থায়ী হয়।

৫. খাম্বুরাবি, ‘পাঠকের প্রতিক্রিয়া’, সমকাল, ৯ বর্ষ, ৯-১২ সংখ্যা, বৈশাখ-শ্রাবণ ১৩৭৩, পৃ. ২৩০

৬. সাঈদ-উর-রহমান, পূর্ব বাংলার রাজনীতি-সংস্কৃতি ও কবিতা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা ১৯৮৩,  পৃ. ৩

 ৭. সাঈদ-উর-রহমান, পূর্ব বাংলার সাংস্কৃতিক আন্দোলন, ডানা প্রকাশনী, ঢাকা ১৯৮৩ পৃ. ১৪। ঢাকায় অনুষ্ঠিত ‘পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সম্মেলন’-এ (১৯৫৩) ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ তাঁর ভাষণে মুসলিম লীগ সরকারের সাহিত্য-সংস্কৃতি ক্ষেত্রে অনুসৃত ভ্রান্তনীতি ও ষড়যন্ত্রের কথা খোলাখুলিভাবে উল্লেখ করে বলেন―‘১৯৪৭ সালের ১৪ই আগস্ট বহুদিনের গোলামীর পর যখন আযাদীর সুপ্রভাত হল, তখন প্রাণে আশা জেগেছিল যে, এখন স্বাধীনতার মুক্ত বাতাসে বাংলা সাহিত্য তার সমৃদ্ধির পথ খুঁজে পাবে। ১৯৪৮ সালের ডিসেম্বর মাসে ঢাকায় যে সাহিত্য সম্মিলনীর অধিবেশন হয়েছিল, তাতে বড় আশাতেই বুক বেঁধে আমি অভিভাষণ দিয়েছিলুম। কিন্তু তারপর যে প্রতিক্রিয়া হয় তাতে হাড়ে-হাড়ে বুঝেছিলুম, স্বাধীনতার নূতন নেশা আমাদের মতিচ্ছন্ন করে দিয়েছে।… ফলে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের চর্চা, রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র এবং অন্যান্য পশ্চিমবঙ্গের কবি ও সাহিত্যিকগণের কাব্য ও গ্রন্থ আলোচনা, এমনকি বাঙ্গালী নামটি পর্যন্ত যেন পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র বলে কেউ কেউ মনে করতে লাগলেন।… তারাই পাকিস্তান ধ্বংস করবে।’ (উদ্ধৃত, সাঈদ-উর রহমান, পূর্ব বাংলার সাংস্কৃতিক আন্দোলন, পূর্বোক্ত, পৃ. ৩১-৩২)   

৮. আনিসুজ্জামান, স¦রূপের সন্ধানে, সাহিত্য প্রকাশ, ঢাকা ১৯৯১, পৃ. ৬৮-৬৯। আবুল মনসুর আহমদ বলেন―‘পূর্ব-পাকিস্তান অর্থাৎ বাঙলা ও আসামের সাহিত্য বলতে আজ আমরা যা বুঝি তা বিদ্যাসাগর-বঙ্কিমচন্দ্র থেকে রবীন্দ্র-শরৎচন্দ্র যুগের সাহিত্যিকদের সাহিত্য। এটা খুবই উন্নত সাহিত্য। … তবু এ সাহিত্য পূর্ব পাকিস্তানের সাহিত্য নয়। কারণ এটা বাঙলার মুসলমানের সাহিত্য নয়। …এ সাহিত্যের স্রষ্টাও মুসলমান নয়; এর বিষয়বস্তুও মুসলমান নয়। এর স্পিরিটও মুসলমান নয়; এর ভাষাও মুসলমানের ভাষা নয়। …বাঙালি মুসলমানের সাহিত্যের প্রাণ হবে মুসলমানেরই মুখের ভাষা। এই দুই দিকেই আমরা পুথিসাহিত্য থেকে প্রচুর প্রেরণা ও উপাদান পাব।’ (আবুল মনসুর আহমদ, বাংলাদেশের কালচার, আহমদ পাবলিশিং হাউস, ঢাকা ২০০৪,  পৃ. ১০০-১০৪) সৈয়দ আলী আহসান অভিমত দেন―‘প্রাক্তন স¤পূর্ণ বাংলার সাহিত্যের ভাণ্ডার কখনও নিঃশেষিত হবে না। সেগুলোর উপর উভয় বাংলারই পূর্ণ অধিকার আছে, কিন্তু এই অধিকার থাকার অর্থ এই নয় যে, এই সাহিত্যের ট্রেডিশনও আমরা গ্রহণ করবো। নতুন রাষ্ট্রের স্থিতির প্রয়োজনে আমরা আমাদের সাহিত্যে নতুন জীবন ও ভাবধারার প্রকাশ খুঁজবো। সে সঙ্গে একথাও সত্য যে, আমাদের সাংস্কৃতিক স¦াতন্ত্র্য বজায় রাখবার এবং হয়তো বা জাতীয় সংহতির জন্য যদি প্রয়োজন হয়, আমরা রবীন্দ্রনাথকেও অস¦ীকার করতে প্রস্তুত রয়েছি। সাহিত্যের চাইতে রাষ্ট্রীয় সংহতির প্রয়োজন আমাদের বেশি। … পূর্ব বাংলার সাহিত্য ক্ষেত্রে আমাদের উত্তরাধিকার হল ইসলামের প্রবহমান ঐতিহ্য, অগণিত অমার্জিত পুথিসাহিত্য, অজস্র গ্রাম্যগাথা, বাউল ও অসংস্কৃত বঙ্গের পল্লীগান।’ (উদ্ধৃত, আনিসুজ্জামান, প্রাগুক্ত, পৃ. ৭২) ‘পূর্ব পাকিস্তানের বাংলা সাহিত্যের ধারা’ শীর্ষক প্রবন্ধে (মাহে নও, ৩ বর্ষ, ৫ সংখ্যা, আগস্ট ১৯৫১) সৈয়দ আলী আহসান এ অভিমত দেন।] গোলাম মোস্তফা লিখেছেন―‘… অতীত যুগের মুসলিম জ্ঞান-কর্ষণার যে আদর্শ ও লক্ষ্য ছিল, আমাদিগকেও সেই আদর্শে ও লক্ষ্যে চলিতে হইবে। আমাদের জাতীয় সাহিত্যের দুইটি দিক থাকিবে, একদিকে ‘দীন’ আর একদিকে ‘দুন্য়া’।’ (উদ্ধৃত, আনিসুজ্জামান, মুসলিম বাংলার সাময়িকপত্র, বাংলা একাডেমি, ঢাকা ১৯৬৯, পৃ. ৫০৭; ‘মুসলিম সাহিত্যের গতি ও লক্ষ্য’ শীর্ষক প্রবন্ধে (মাসিক মোহাম্মদী, ১ বর্ষ, ৪ সংখ্যা, মাঘ ১৩৩৪) কবি গোলাম মোস্তফা এ অভিমত দেন।

৯. হাবিব রহমান, বাঙালি মুসলমান সমাজ ও বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন, মিত্রম, কলকাতা ২০০৯, পৃ. ১৬০-১৬১। কিন্তু ইসলামি বা মুসলিম সাহিত্য বস্তুটি আসলে কীÑ তা নিয়ে তাঁদের মধ্যে সংশয়-সন্দেহ ছিল। তাই অনেকেই এই সাহিত্যের স্বরূপ চিহ্নিত করার প্রয়োজন বোধ করেছিলেন। ডক্টর সাজ্জাদ হোসায়েন-এর মতে, জাতীয় সাহিত্য হলো কোন দেশের নাগরিকদের দ্বারা সৃষ্ট সাহিত্য। (‘রবীন্দ্রনাথ ও পূর্ব-পাকিস্তান’, সমকাল, ৪ বর্ষ, ৯ সংখ্যা, বৈশাখ ১৩৬৮, পৃ. ৬৭৩); ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ জাতীয় সাহিত্যের স্বরূপ বর্ণনায় মুসলিম সাহিত্য সমাজের বার্ষিক অধিবেশনের (১৯২৭) প্রদত্ত অভ্যর্থনা সমিতির সভাপতির অভিভাষণে বলেন―‘…একটু খোলসা করে বলা দরকার―মুসলিম সাহিত্য বলতে কি বুঝি। আমাদের ঘর ও পর, আমাদের সুখ ও দুঃখ, আমাদের আশা ও ভরসা, আমাদের লক্ষ্য ও আদর্শ নিয়ে যে সাহিত্য, তাই আমাদের সাহিত্য। কেবল লেখক মুসলমান হলেই মুসলমান সাহিত্য হয় না। হিন্দু সাহিত্য অনুপ্রেরণা পাবে বেদান্ত ও গীতা, হিন্দু ইতিহাস ও হিন্দু জীবনী থেকে। আমাদের সাহিত্য অনুপ্রেরণা পাবে কুরআন ও হাদীস, মুসলিম ইতিহাস ও মুসলিম জীবনী থেকে। হিন্দুর সাহিত্য রস সংগ্রহ করে হিন্দু সমাজ থেকে, আমাদের সাহিত্য করবে মুসলিম সমাজ থেকে।’ (মুসলিম সাহিত্য সমাজ-এর বার্ষিক অধিবেশন: সভাপতিদের অভিভাষণ, হাবিব রহমান (সম্পাদিত), বাংলা একাডেমি, ঢাকা ২০০২, পৃ. ৬৯); আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সম্মেলনের (১৩৬৪) মূল সভাপতির অভিভাষণে বলেন―“বাঙ্গালা সাহিতের যে অংশে মুসলমানের ধর্ম্ম, সংস্কৃতি, সভ্যতা ও আচার-ব্যবহারের সুন্দর দিক ফুটিয়ে উঠে, তাহাই ‘মুসলিম সাহিত্য”’। (উদ্ধৃত, হাবিব রহমান, বাঙালি মুসলমান সমাজ ও বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন, প্রাগুক্ত, পৃ. ৫৬) অবশ্য তিনি এও বলেন যে, আমাদের সাহিত্যে অবশ্যই বাঙালির প্রাণের স্পন্দন থাকবে। মুসলিম সাহিত্য বা জাতীয় সাহিত্য সম্পর্কে দেওয়া তাত্ত্বিকদের এসব মতামতের বাইরেও অন্য মতামত প্রচলিত ছিল। এঁদের একজন আবুল কালাম মোহাম্মদ শামসুদ্দীন ‘সাহিত্যে সাম্প্রদায়িকতা’ (বার্ষিক সওগাত) শীর্ষক প্রবন্ধে বলেন―‘ভাষা অনুসারে সাহিত্যের নামকরণ হয় বলিয়া আমরা জানি,… ধর্মানুসারে সাহিত্যের নামকরণের কথা আমরা এ যাবত শুনি নাই। সুতরাং ‘মুসলমান সাহিত্য’ কথাটা বুঝিতে পারা গেল না। তবে কথাটার অর্থ যদি হয় মুসলমানী রূপযুক্ত বাঙ্গালা সাহিত্য, তাহা হইলে আমরা তাহা বুঝিতে পারি।… কিন্তু ইহাদের কথার ভাবে বোধহয়, ইহারা শুধু মুসলমানী রূপের কথাই বলেন না, সাহিত্যের অন্তরটাকেও ইহারা মুসলমান করিয়া লইবেন। কিন্তু তাহা হয় না। কারণ তাহা করিতে গেলে সাহিত্য ‘মুসলমানীতে’ পূর্ণ হইতে পারে, কিন্তু তাহাতে ‘সাহিত্য’ টিকিয়া থাকিতে পারে না। (মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন, বাংলা সাহিত্যে সওগাত যুগ, ঢাকা ২০০৬, পৃ. ৩৮১-৩৮২। প্রবন্ধটি সমকাল, ২ বর্ষ, ৫ সংখ্যায় পুনর্মুদ্রিত হয়।) ‘মুসলিম সাহিত্য’ সম্পর্কে লেখকদের মধ্যে মতপার্থক্য খাকলেও অনেকেই এরূপ সাহিত্য সৃষ্টির পক্ষে মত দিয়েছিলেন। গোলাম মোস্তফার উল্লিখিত অভিমত এক্ষেত্রে স্মরণযোগ্য।

আর একপক্ষ ছিলেন সমন্বয়বাদী। সমন্বয়বাদী লেখক- সমালোচকগণ বাংলা সাহিত্যে হিন্দু-মুসলমানের মিলনকে সমর্থন করে সাহিত্যের সাম্প্রদায়িক নামকরণ, প্রচার ও বিচারের বিরোধিতা করেন। এঁরা হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে লেখকদের সৃষ্টিকর্ম মূল্যায়নে সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তে বৈচিত্র্য সন্ধান করেন। সমন্বয়বাদী তাত্ত্বিক মোতাহের হোসেন চৌধুরী ‘সাহিত্য সম্বন্ধে নানা কথা’ (বুলবুল, ১ বর্ষ, ২ সংখ্যা, ভাদ্র-অগ্রহায়ণ ১৩৪০) শীর্ষক প্রবন্ধে ‘মুসলমানী সাহিত্য’ প্রসঙ্গে বলেন―‘যাঁরা মুসলমানী সাহিত্য চান তাঁরা আসলে কি বস্তু চান ঠিক বুঝিয়া উঠতে পারেন না। মুসলমানী সাহিত্য বলতে তিনটি জিনিষ বোঝায়; মুসলমান রচিত সাহিত্য, মুসলমান সমাজ নিয়ে লেখা সাহিত্য, আর মুসলমান ধর্ম্ম-প্রধান সাহিত্য। মুসলমান রচিত সাহিত্যে মুসলমানের সমস্ত লেখাই স্থান পায়। এমনকি যাকে আমরা অনৈসলামিক সাহিত্য বলি, তাও।… সাহিত্যকে হিন্দু সাহিত্য, মুসলমান সাহিত্য, খ্রিষ্টান সাহিত্যÑ এভাবে ভাগ করে দেখা ভুল।… ধর্মের চাইতে দেশ-প্রকৃতির, মানে, জাতীয় স্বভাবের প্রভুত্বই জীবনে ও সাহিত্যে বেশি। তাই বাঙ্গালী মুসলমানের সাহিত্য-সাধনা বাঙ্গালী হিন্দুর সাহিত্য-সাধনার সঙ্গে যতটা নিকট-সম্বন্ধযুক্ত হবে, অন্য দেশীয় মুসলমানের সাহিত্য-সাধনার সঙ্গে ততটা নিকট-সম্বন্ধযুক্ত হতে পারে না।’ (উদ্ধৃত, মুস্তাফা নূরউল ইসলাম, সাময়িকপত্রে জীবন ও জনমত (প্রথম খণ্ড), বাংলা একাডেমি, ঢাকা ২০০৫, পৃ. ৩৭২।) অন্যপক্ষে ছিলেন প্রগতিশীল সংস্কৃতিকর্মীরা। এঁরা সামাজিক পশ্চাদমুখীতা ও রাজনৈতিক পরাধীনতার মতো সমাজের মূল সমস্যাকে বিষয়বস্তু করে সাহিত্যকে প্রগতিশীল খাতে এগিয়ে নেবার কথা বলেছিলেন। এঁরা বাঙালির সাহিত্যিক ঐতিহ্য হিসেবে হাজার বছরের বাংলা সাহিত্যের প্রতি দৃষ্টি দিয়েছিলেন। (সাঈদ-উর-রহমান, পূর্ব বাংলার সাংস্কৃতিক আন্দোলন, প্রাগুক্ত, পৃ. ১১।) অভিমতটি নেপাল মজুমদারের ‘প্রগতি  লেখক আন্দোলনের সূচনাপর্ব’ শীর্ষক প্রবন্ধের অন্তর্গত। ধনঞ্জয় দাশ (সম্পাদিত)-এর মার্কসবাদী সাহিত্য বিতর্ক (তৃতীয় খণ্ড, কলকাতা ১৯৭৮) গ্রন্থে সংকলিত। এক্ষেত্রে ‘পাকিস্তান তমদ্দুন মজলিশ’ (১৯৪৭), ‘সংস্কৃতি সংসদ’ (১৯৫১), ‘পাকিস্তান সাহিত্য সংসদ’ (১৯৫২) প্রভৃতি সংগঠন মানবতাবাদী ধারার সাহিত্য সৃষ্টি ও সংস্কৃতির ভিত্তি নির্মাণে দৃঢ় ভূমিকা রাখে। প্রগতিশীল সাহিত্যকর্মীদের আয়োজনে অনুষ্ঠিত ‘পূর্ব পাকিস্তান সাংস্কৃতিক সম্মেলনে’র (১৯৫১) মূল প্রস্তাবনায় বলা হয়―‘মানুষের কল্যাণের জন্য যে-সাহিত্য, সমাজের গতিশীলতাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য যে-সাহিত্য, আমরা সে সাহিত্যের প্রতি আস্থাশীল।’ (উদ্ধৃত, পূর্বোক্ত, পৃ. ২৬। ধনঞ্জয় দাশ আমার জন্মভূমি স্মৃতিময় বাংলাদেশ শীর্ষক (কলকাতা ১৯৭১) গ্রন্থের ৮৩ পৃষ্ঠায় এ মন্তব্য করেন।)

১০. মোরশেদ শফিউল হাসান, পূর্ব বাঙলায় চিন্তাচর্চা ১৯৪৭-১৯৭০: দ্বন্দ্ব ও প্রতিক্রিয়া, অনুপম প্রকাশনী, ঢাকা ২০০৭,

    পৃ. ৫৬৫ 

১১. আবদুল হক, ‘সমকাল’-এর ভূমিকা, বাঙালির জাগরণ, আহমদ মাযহার (সম্পাদিত), অনুপম প্রকাশনী, ঢাকা ২০০১,

     পৃ. ২৩১

১২. আবদুল গনি হাজারী, ‘সংস্কৃতি-চিন্তা’, সমকাল, ৮ বর্ষ, ৪ সংখ্যা, অগ্রহায়ণ ১৩৭১, পৃ. ২৭২

১৩. সুরভি বন্দ্যোপাধ্যায়, সাহিত্যের শব্দার্থকোশ, পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি, কলকাতা ১৯৯৯, পৃ. ৩২ 

১৪. উদ্ধৃত, আবুল ফজল, ‘আমাদের সাহিত্যের ঐতিহ্য’, সমকাল, ৫ বর্ষ, ৬-৮ সংখ্যা, মাঘ-চৈত্র ১৩৬৮, পৃ. ২৭০

১৫. কবীর চৌধুরী, ‘পূর্ব-পাকিস্তানের সমকালীন সাহিত্যে ঐতিহ্যের ভূমিকা’, সমকাল, ৪ বর্ষ, ৮ সংখ্যা, চৈত্র ১৩৬৭, পৃ. ৫৬৩

১৬. আবদুল হক, ‘সাহিত্যের দিগন্ত’, সমকাল, ১ বর্ষ, ১১-১২ সংখ্যা, আষাঢ়-শ্রাবণ, ১৩৬৫, পৃ. ৬২৬

১৭. আবুল কালাম মোহাম¥দ শামসুদ্দীন, ‘সাহিত্যে সাম্প্রদায়িকতা’, সমকাল, ২ বর্ষ, ৫ সংখ্যা, পৌষ ১৩৬৫, পৃ. ৩২৫।

     প্রবন্ধটি ১৩৩৪ সালের বার্ষিক সওগাতে প্রথম প্রকাশিত হয়। কবি গোলাম মোস্তফা প্রবন্ধটির সমালোচনা করে ‘সাহিত্যে অসাম্প্রদায়িকতা’ শীর্ষক অপর একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করেছেলেন ১৩৩৫ সালের আষাঢ় সংখ্যা মাসিক মোহাম্মদী’তে। কবি শাহাদৎ হোসেন লেখেন ‘সাহিত্য বনাম সাম্প্রদায়িকতা’ শীর্ষক আরেকটি প্রবন্ধ (মাসিক সওগাত, ভাদ্র ১৩৩৫)।

১৮. ‘দ্বিতীয় চিন্তা (সম্পাদকীয়)’, সমকাল, ৫ বর্ষ, ৯-১১ সংখ্যা, বৈশাখ-আষাঢ় ১৩৬৯, পৃ. ৩৩৮ 

১৯. সম্পাদকীয়তে পূর্ব-পাকিস্তানের সাহিত্য সম্পর্কিত সমস্যাবলি নিয়ে যে সব প্রশ্ন উত্থাপন করা হয় গুরুত্ব বিবেচনায় নিম্নে তা উল্লেখ করা হলো :

১. সাহিত্যিক মূল্যবোধ, মানবিক মূল্যবোধ, সাহিত্যিক সততা―এইসব আমাদের সাহিত্যে কতখানি অভিব্যক্তি লাভ করছে অথবা করছে না?

২. রাজনৈতিক, আর্থিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ সাহিত্যের উপর বিপুল প্রভাব বিস্তার করে থাকে এবং সাহিত্যের বিকাশকে সমৃদ্ধ বা ব্যাহত করে। এইসব পরিবেশ আমাদের সাহিত্যের উপর কিরূপ প্রভাব বিস্তার করছে?

৩. সাহিত্যের উৎকর্ষ অনেকটাই নির্ভর করে লেখকের ব্যক্তিত্বের উপরে। আমাদের সাহিত্যিকদের সাহিত্যিক-সততা ও সাহিত্যনিষ্ঠা সম্বন্ধে আপনার অভিমত কী? আমাদের সাহিত্যিকরা আদর্শবাদী অথবা সুযোগ-সন্ধানী? তাঁরা কি একশ্রেণীর রাজনীতিকের মত সুযোগ বুঝে আদর্শ বিসর্জন দেন? সবাই অবশ্য দেন না, তবে সাধারণভাবে এ-ব্যাপারে আমাদের সাহিত্যিক-সমাজ সম্বন্ধে আপনার মতামত কী? (দয়া করে এই প্রশ্নগুলোর আলোচনায় কোনো লেখকের নামোল্লেখ করবেন না।)

৪. সৃষ্টিমূলক রচনার বাইরে মননমূলক (সমাজ, দর্শন, রাজনীতি ইত্যাদি সম্পর্কিত) এবং জীবনীমূলক রচনার দিকে আমাদের লেখকরা সাধারণত আকৃষ্ট হন না। এর কারণ কী?

৫. আমাদের সাহিত্যে বৈচিত্র্য, বিস্তৃতি ও গভীরতার অভাব সুস্পষ্ট। আপনার কি মনে হয় আমাদের লেখকরা যথেষ্ট পড়াশোনা করেন না, কঠোর সাধনায় তাঁরা বিমুখ এবং তাঁরা সস্তায় বাজিমাৎ করতে চান?

৬. আপনি কি মনে করেন, আমাদের লেখকদের কল্পনা ও চিন্তাধারা এমন কোনো শৃঙ্খলে বন্দী, যে জন্যে প্রতিভার মুক্তি ও অবাধ সঞ্চরণ সম্ভব হচ্ছে না? তেমন কোনো শৃঙ্খল থাকলে তার স্বরূপ বিশ্লেষণ করুন।

৭. আপনার কি মনে হয় যে, আমাদের সমাজ, সংস্কৃতি ও সাহিত্যচিন্তার মধ্যে এমন কোনো মৌলিক গলদ আছে, যার দরুন আমাদের সাহিত্য-প্রয়াস খণ্ডিত ও বিক্ষিপ্ত থেকে যাচ্ছে? তেমন কোনো গলদ থাকলে তার স্বরূপ বিশ্লেষণ করুন।

৮. উপন্যাস, নাটক, জীবনী, সমালোচনা-গ্রন্থ, বিশেষ করে এই কয়েকটি বিভাগে পূর্ব পাকিস্তানী লেখকরা ব্যর্থতা দেখাচ্ছেন কেন? (পৃ. ৩৩৮) 

২০. শাহেদ সোহরওয়ার্দী, ‘সমাজ-সচেতনতা ও লেখকের ওপর তার প্রভাব’, সমকাল, ৪ বর্ষ, ১১ সংখ্যা, আষাঢ়, ১৩৬৮,   

     পৃ. ৮৮৬ 

২১. এবনে গোলাম সামাদ, ‘রাষ্ট্র ও সাহিত্য’, সমকাল, ১ বর্ষ, ৭-৮ সংখ্যা, ফাল্গুন-চৈত্র, ১৩৬৪, পৃ. ৪২৩-৪২৫  

২২. দ্বিজেন শর্মা, ‘বাংলা সাহিত্যে সাম্প্রদায়িকতার বিচার’, সমকাল, ১ বর্ষ, ৩ সংখ্যা, কার্তিক ১৩৬৪, পৃ. ২১০-২১১  

২৩. আবদুল হক ‘সাহিত্যিক মূল্যবোধ’ (সমকাল, ৪ বর্ষ, ১০ সংখ্যায় প্রকাশিত) শীর্ষক প্রবন্ধে এরূপ অভিমত দেন। আবুল ফজলও ‘সাহিত্যের সংকট’ (সমকাল, ২ বর্ষ, ৬ সংখ্যায় প্রকাশিত) শীর্ষক প্রবন্ধে বাংলা সাহিত্যের অনগ্রসরতার জন্যে   পাকিস্তানের রাজনীতিতে চলমান নৈরাজ্যকর অবস্থাকে দায়ী করেন।

২৪. আবদুল গনি হাজারী, ‘বন্দী-বিবেক সমাজ ও কবিমানস’, সমকাল, ৮ বর্ষ কবিতা সংখ্যা (৫-৮ সংখ্যা), পৌষ-চৈত্র ১৩৭১, পৃ. ৩৩৭

২৫. সৈয়দ আলী আহসান, ‘সাহিত্যে পূর্বসূরী’, সমকাল, ৫ বর্ষ, ১২ সংখ্যা, শ্রাবণ ১৩৬৯, পৃ. ৪১৯

২৬. আবদুল হক, ‘পূর্ব পাকিস্তানের সাহিত্যিক’, সমকাল, ৩ বর্ষ, ১ সংখ্যা, ভাদ্র ১৩৬৬, পৃ. ৪৬

২৭. আবদুল হক, ‘সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতা’, সমকাল, ১ বর্ষ, ৭-৮ সংখ্যা, ফাল্গুন-চৈত্র, ১৩৬৪ পৃ. ৪২৬-৪২৮

২৮. কবীর চৌধুরী, ‘যান্ত্রিক সমাজে লেখকের ভূমিকা’, সমকাল, ৪ বর্ষ, ১১ সংখ্যা, আষাঢ় ১৩৬৮, পৃ. ৮৮৮-৮৮৯

২৯. কোলরিজ প্রদত্ত সংজ্ঞাটি হলো―Best words in the best order. শ্রীশচন্দ্র দাশ (অনূদিত), সাহিত্য-সন্দর্শন, সুচয়নী পাবলিশার্স, ঢাকা ১৯৯৭, পৃ. ২৯

৩০. হাসান হাফিজুর রহমান, ‘পাকিস্তানের কবিতা : কাব্য বিচার’, সমকাল, ৮ বর্ষ, ৫-৮ সংখ্যা (কবিতা সংখ্যা), পৌষ-চৈত্র,      ১৩৭১, পৃ. ৬৩৭। আলোচ্য প্রবন্ধে কবিতার সংজ্ঞায়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন―‘মহাকালের ধোপে যে কবিতা টিকে যায়, তাই সফল কাব্য।’ প্রাবন্ধিক সফল কাব্যের অপরিহার্য ৭টি বিষয়ের উল্লেখ করেছেন। যথা:

১। সুকুমার রূপ ও শিল্পবিন্যাস;

২। কাব্যের বিষয় : জীবন ও জগৎ চেতনা; আত্মসমিধ ও উপজীব্য সংবিধান;

৩। সত্য-অনে¦ষা তথা অভিনিবেশের প্রকৃতি ও কবির মানসস¦রূপ ও মনোভংগী;

৪। বোধের গভীরতা ও ভংগীর বিশিষ্টতা এবং রুচি মেজাজ তথা স্টাইল, লাবণ্য এবং কবির স¦ভাব;

৫। কবির হৃদয় সংবেদ্যতা তথা আন্তরিকতা, ঐকান্তিকতা, অকৃত্রিমতা, সারল্য এবং আত্মপ্রকাশের অনিবার্যতা;

৬। ঐতিহ্য বা শিকড়গ্রন্থি;

৭। রসভিত্তি তথা দেশজ ও মানবিক সংযোগ। (পৃ. ৬৪৭-৬৪৮)

৩১. হাসান হাফিজুর রহমান, ‘কবিতার বিষয়বস্তু’, সমকাল, ২ বর্ষ, ৩ সংখ্যা, কার্তিক ১৩৬৫, পৃ. ১৩৪-১৩৫। ‘সাম্প্রতিক কবিতা : কতিপয় প্রবণতা’ (সমকাল, ৭ বর্ষ, ১ সংখ্যায় প্রকাশিত) শীর্ষক অপর প্রবন্ধে হাফিজুর রহমান সমকালীন বাংলা কবিতার ৩০টি ত্রুটি নির্দেশ করেছেন। এছাড়া বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, শাহাবুদ্দীন আহমাদ, এবনে গোলাম সামাদ প্রমুখের কবিতাবিষয়ক আলোচনা বাংলা কবিতার গতি-প্রকৃতির দিক নির্দেশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

৩২. রফিকুল ইসলাম, ‘পূর্ব-পাকিস্তানের সমকালীন মঞ্চ ও অভিনয়’, সমকাল, ২ বর্ষ, ৩ সংখ্যা, কার্তিক ১৩৬৫, পৃ. ১৯১

 ৩৩. হাবিব রহমান, বাঙালি মুসলমান সমাজ ও বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন, প্রাগুক্ত, পৃ ৬১। আল-এসলাম জ্যৈষ্ঠ ১৩২৭ সংখ্যায় প্রকাশিত ‘উপন্যাস’ শীর্ষক প্রবন্ধে জনৈক নজির আহমদ উপন্যাস পাঠকে মাদকের নেশার সঙ্গে তুলনা করেন। (পূর্বোক্ত, পৃ. ৬১) সৈয়দ আবু মোহাম্মদ এসমাইল হোসেন-এর (ইসমাইল হোসেন সিরাজী) কাছে উপন্যাস হলো―‘গাঁজায় দম দিয়া একটি গল্পের গ্রোত’ বইয়ে দেবার মতো। যা সমাজের জন্যে কোন প্রকার কল্যাণ করে না। (উদ্ধৃত, মুস্তাফা নূরউল ইসলাম, সাময়িকপত্রে জীবন ও জনমত (প্রথম খণ্ড), প্রাগুক্ত, পৃ. ২৯৭) অবশ্য অনেকে উপন্যাসের পক্ষে মতামত দিয়েছিলেন। তৃতীয় বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সম্মিলনে-এ সভাপতির অভিভাষণে মোহাম্মদ আকরম খাঁ বলেন (বঙ্গীয়-মুসলমান-সাহিত্য-পত্রিকা, ১ বর্ষ, ৪ সংখ্যা, মাঘ ১৩২৫) ―হিন্দু-সমাজের ন্যায় আমাদেরও সাহিত্যিক জাগরণ উপন্যাসের মাধ্যমে আসবে।  (মুস্তাফা নূরউল ইসলাম, সাময়িকপত্রে জীবন ও জনমত (প্রথম খণ্ড), প্রাগুক্ত, পৃ.২৯৭-২৯৮) গোলাম মোস্তফা নজিবর রহমানের (১৮৭৮-১৯২৩) আনোয়ারা উপন্যাস (বঙ্গীয়-মুসলমান-সাহিত্য-পত্রিকা, ২ বর্ষ, ১ সংখ্যা, বৈশাখ ১৩২৬) মূল্যায়ন প্রসঙ্গেও অনুরূপ মন্তব্য করেন। (উদ্ধৃত, হাবিব রহমান, প্রাগুক্ত, পৃ. ৬২)     

৩৪. আহমদ শরীফ, ‘কথাসাহিত্য সমস্যা ও এর বিষয়বস্তু’, সমকাল, ২ বর্ষ, ৪ সংখ্যা, অগ্রহায়ণ ১৩৬৫, পৃ. ২১০-২১১

৩৫. কুন্তল চট্টোপাধ্যায়, সাহিত্যের রূপ-রীতি ও অন্যান্য প্রসঙ্গ, রত্নাবলী, কলকাতা ২০০৪, পৃ. ২৬৬

৩৬. ছোটগল্পের বৈশিষ্ট্য ও সাম্প্রতিক বাংলা ছোটগল্পের চালচিত্র সম্পর্কে আবুবকর সিদ্দিক বলেন:

১. ছোটগল্প জীবনের প্রসারিত পট ও অতল গুহারন্ধ্রআবহে যথেচ্ছ অভিসঞ্চারী।

২. জীবনের চূড়ান্ত রচনার কুণ্ডপতি ছোটগল্প।…

৩. ছোটগল্প একটি নিপুণ কলাকার্য।…

৪. সাহিত্যের অত্যাধুনিক বৈচিত্র্যবিলাসী ও ব্যবসায়ীদের হাত ঘুরে ঘুরে ছোটগল্প আজ সংগীন, সন্ত্রস্ত, সততা রহিত, সংকর, সর্বগামী। কাঁচাপাকা তরোবেতরো হাতের চাপে সে আজ কিম্ভুদাকার। … নতুন পরীক্ষার নামে উদ্ভট উৎকট ত্রিশংকুলে পড়ে টলটলায়মান।

৫. … বাঁচার নামে নানা ফাঁদে পড়ে প্রশ্নে প্রশ্নে বিক্ষত। তবু প্রত্যয়ীরা উদ্যমী। নতুন কোনো ধ্রুবের পাদমূলে তারা জোট বাঁধা সুখের উত্তরাধিকার তুলে দিয়ে যেতে চায় বংশধরদের হাতে। আধুনিক সাহিত্য তাদের এই ধ্বনিগুচ্ছের আরেক বাহন। ছোটগল্প সেই বিশ্বাসের নামাংকিত এক উদ্ধত  নির্ভীক নিশান। …

৬. ছোটগল্পের প্রাণ স্বদেশের নামগানে মুখর।

৭. … ছোটগল্পের লেখক সত্যি ভাল গল্প লেখেন তখন, যখন কলম ধরেন পবিত্র দায়িত্বজ্ঞানে। (আবুবকর সিদ্দিক, ‘সোনা রূপা নহে বাপা এ বাঙা পিতল’, সমকাল, ১১ বর্ষ, ১০-১২ সংখ্যা, জ্যৈষ্ঠ-শ্রাবণ ১৩৭৫, পৃ. ২৭৭)

৩৭. অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, সমালোচনার কথা, মডার্ণ বুক এজেন্সী প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা ২০০১-২০০২, পৃ. ৭৮

৩৮. কুন্তল চট্টোপাধ্যায়, সাহিত্যের রূপ-রীতি ও অন্যান্য প্রসঙ্গ, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩১৩

৩৯. আবদুল হক সমকাল-এর সম্পাদক ও সমালোচনা-সাহিত্যে পত্রিকাটির অবদান মূল্যায়ন প্রসঙ্গে বলেন―‘বিশুদ্ধ সাহিত্য শিল্প সংস্কৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বাংলা ভাষার প্রকাশন ও ধারণ-ক্ষমতাকে তিনি সমাজের যাবতীয় মৌলিক দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় বিদ্যা অবধি ব্যাপ্ত করতে চেয়েছিলেন। এক্ষেত্রে সাফল্য আসেনি, তবে সমকাল-এর ভূমিকা এদেশে কবিতা প্রবন্ধ কথাসাহিত্য সমালোচনার অপরিমেয় সম্ভাবনা আবিষ্কার―এতটা আর কোনো পত্রিকা করে নি।… প্রবাসী, সওগাত এবং আরো অনেক প্রবীণ পত্রিকা এক্ষেত্রে যা দিয়েছে তা হচ্ছে শুধু গ্রন্থ-পরিচয়। পরিচয় (পঞ্চাশের কিছু অংশ অবধি), কবিতা এবং চতুরঙ্গ, দিয়েছে গ্রন্থ-সমালোচনা, যা সাহিত্য-সমালোচনারই অন্তর্গত। ইংল্যান্ডে টি. এস. এলিয়টের সম্পাদনায় ক্রাইটেরিয়ন, এফ. আর. লিভিসের সম্পাদনায় স্ক্রুটিনি এবং ইংল্যান্ডে ও আমেরিকায় আরো অনেক অভিজাত সাহিত্য-পত্রিকা অনেক বছর আগেই এ-রূপ সমালোচনা দিয়েছে (এবং এখনো দিয়ে যাচ্ছে) যা মৌলিক প্রবন্ধের মতোই সাহিত্য হয়ে উঠেছে। এরূপ সমালোচনা ঠিক সমালোচিত লেখক ও গ্রন্থের পরিচয় দেয় না, ঐ লেখক এবং গ্রন্থের মূল্যায়নকে উপলক্ষ করে নিজেই সাহিত্য হয়ে ওঠে। সমকাল গ্রন্থ-সমালোচনাকে ঐসব বিদেশি পত্রিকার সমপর্যায়ে উন্নীত করতে পেরেছে বলা যায় না; কোনো সাহিত্যের সমালোচনা বিভাগ কতটা উন্নত হবে তা নির্ভর করে সেই সাহিত্য নিজে সমগ্রভাবে কতটা উন্নত তার উপর। বাংলাদেশের সাহিত্য পরিমাণ এবং গুণগতভাবে এখনো দ্বিতীয় পর্যায়েই উন্নতি হতে পারেনি, অতএব এদেশের সমালোচনা সাহিত্যের খুব উল্লেখনীয়ভাবে উন্নত হওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু সমালোচনা সাহিত্যকে গ্রন্থ-পরিচয় অপেক্ষা উন্নততর পর্যায়ে উন্নীত করার প্রথম কৃতিত্ব সমকাল-এর।’ (আবদুল হক, ‘সমকাল-এর ভূমিকা’, প্রাগুক্ত, পৃ. ২৩১)

৪০. রেজোয়ান সিদ্দিকী, পূর্ব-বাংলার সাংস্কৃতিক সংগঠন ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন, বাংলা একাডেমি, ঢাকা ১৯৯৬, পৃ. ৩৪৭

৪১. পূর্বোক্ত, পৃ. ৩৪৮

৪২. উদ্ধৃত, আনিসুজ্জামান, ‘স্বরূপের সন্ধানে’, স্বরূপের সন্ধানে, প্রাগুক্ত, পৃ.৭২। প্রবন্ধটি মাহে নও পত্রিকার ৩ বর্ষ, ৫ সংখ্যা, আগস্ট ১৯৫১ সালে প্রকাশিত হয়। রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে সৈয়দ আলী আহসান এরূপ মতামত দিলেও প্রকৃতপক্ষে বিশ্বকবিকে স্বীকৃতি না দিয়ে তাঁর আর অন্য কোনো উপায় ছিল না। এজন্যে আমরা দেখি সমকাল-এর ‘রবীন্দ্র-জন্ম-শতবার্ষিকী সংখ্যা’য় ‘রবীন্দ্রনাথকে’ শিরোনামে কবিতা লিখে বিশ্বকবিকে ‘তুমি শেষহীন আকাশ/ এবং অনেক সজীবতায় হৃদয়ের নীলাম্বর।’ বলে তিনি শ্রদ্ধা জানান। (সৈয়দ আলী আহসান, ‘রবীন্দ্রনাথকে’ সমকাল, ৪ বর্ষ, ৯ সংখ্যা/‘রবীন্দ্র-জন্ম-শতবার্ষিকী’ সংখ্যা, বৈশাখ ১৩৬৮, পৃ. ৭১৭) আবার বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর রবীন্দ্রনাথ : কাব্যবিচারের ভূমিকা শীর্ষক একটি আলোচনা গ্রন্থও তিনি লিখেছিলেন। অর্থাৎ বাংলাদেশে রবীন্দ্রচর্চার প্রশ্নে স্বাতন্ত্র্যবাদীদের অনেকেই প্রগতিবাদীদের সঙ্গে ঐক্যমত পোষণ করেছিলেন।

৪৩. উদ্ধৃত, মোরশেদ শফিউল হাসান, পূর্ব বাঙলায় চিন্তাচর্চা ১৯৪৭-১৯৭০: দ্বন্দ্ব ও প্রতিক্রিয়া, প্রাগুক্ত, পৃ. ৫৮৬। বিভাগ-পূর্ব কালে গোলাম মোস্তফা আমার চিন্তাধারা (১৯৬৮) গ্রন্থের ‘ইসলাম ও রবীন্দ্রনাথ’ এবং ‘রবীন্দ্রনাথের অতীন্দ্রিয়বাদ’ প্রভৃতি প্রবন্ধে রবীন্দ্র-সাহিত্যের স্বপক্ষে মতামত দিয়েছিলেন। কিন্তু পাকিস্তান সৃষ্টির পর তিনি তাঁর অবস্থান থেকে সরে আসেন। আবার ১৯৪৮ সালে জিন্না পূর্ব পাকিস্তান সফরে এলে রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদের পক্ষ থেকে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানিয়ে যে স্মারকলিপি দেওয়া হয় তাতে মুসলমান কবি-সাহিত্যিকদের নামোল্লেখ থাকলেও রবীন্দ্রনাথের নাম কৌশলে এড়িয়ে যাওয়া হয়।

৪৪. সাঈদ-উর রহমান, পূর্ব বাংলার রাজনীতি-সংস্কৃতি ও কবিতা, প্রাগুক্ত, পৃ. ৭৯। ১ বৈশাখ দৈনিক আজাদ-এ প্রকাশিত ‘রবীন্দ্রনাথ ও মওলানা আজাদ’ শীর্ষক সম্পাদকীয়তে উভয়কেই সমালোচনা করে বলা হয়Ñ ‘রবীন্দ্রনাথের দোহাই পাড়িয়া অখণ্ড বাংলার আড়ালে আমাদের তামুদ্দনিক জীবনে বিভেদ ডাকিয়া আনার সুযোগ দেওয়া চলিবে না। একদল লোক পশ্চিম বাংলার সাহিত্যের অন্ধ অনুসারী ও ভক্ত। তাদের রবীন্দ্র-ভক্তি বিপদের কারণ হতে পারে এবং বাইরের যারা পাকিস্তানকে দ্বিধাহীন মনে গ্রহণ করেন নাই, তারা এই সুযোগে তামুদ্দনিক অনুপ্রবেশের খেলায় নামিতে পারে।’ (দৈনিক আজাদ, ১ বৈশাখ ১৩৬৮/১৯৬১; উদ্ধৃত, রেজোয়ান সিদ্দিকী, পূর্ব বাংলার সাংস্কৃতিক সংগঠন ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৪৮-৩৪৯) অবশ্য দৈনিক ইত্তেফাক এবং দৈনিক সংবাদ এ সময় ধারাবাহিকভাবে রবীন্দ্র-সাহিত্যের অপরিহার্যতার স্বপক্ষে প্রচার-প্রচারণা চালাতে থাকে। ‘রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী’র (১৯৬১) উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ভাষণদানকালে সুফিয়া কামাল বলেন―‘রবীন্দ্রনাথ শুধু বাঙ্গালীর কবি ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন বিশ্বকবি। রবীন্দ্র প্রতিভা লইয়াই আমরা বাঁচিয়া আছি।… রবীন্দ্রনাথ পূর্ব ও উত্তর বাংলারই কবি। তাহার সোনার তরী পূর্ব বাংলায় পদ্মা ও মেঘনাতেই বাহিত হইয়াছিল।’ (দৈনিক ইত্তেফাক, ২৩ এপ্রিল ১৯৬১; উদ্ধৃত, রেজোয়ান সিদ্দিকী, পূর্বোক্ত, পৃ. ৩৫০)

৪৫. আবদুল হক, সাহিত্য ঐতিহ্য মূল্যবোধ, মুক্তধারা, ঢাকা ১৯৭৬, পৃ. ১৪৯

৪৬. সাঈদ-উর-রহমান, পূর্ব বাংলার সাংস্কৃতিক আন্দোলন, প্রাগুক্ত, পৃ. ৫৩-৫৭ ও ৬৩-৬৪। ১৯৬১ সালে ‘রবীন্দ্র-জন্ম-শতবার্ষিকী’ পালন করা পূর্ব-পাকিস্তানের বাঙালিদের সামনে এক চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছিল। কেননা সরকার এবং কোনো কোনো স্বাতন্ত্র্যবাদী বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের রবীন্দ্র-বিরোধী তৎপরতা থেমে থাকে নি। এ সময় সমকাল ‘রবীন্দ্র-জন্ম-শতবার্ষিকী’ সংখ্যা (শতবার্ষিকী পালন উপলক্ষে গঠিত কেন্দ্রীয় কমিটির অনুষ্ঠানের সভাপতি বিচারপতি এস. এম. মুর্শেদের ভাষণ, ঐ অনুষ্ঠানে পঠিত বেশ কিছু প্রবন্ধ এবং কবিতাসহ) প্রকাশিত হয়। সংখ্যাটিতে যেসব লেখকের রচনা প্রকাশিত হয় তাঁদের মধ্যে―ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, আবুল ফজল, শওকত ওসমান, হাসান হাফিজুর রহমান, আবু রুশ্দ, এস. এন. কিউ জুলফিকার আলী, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, ডক্টর সাজ্জাদ হোসায়েন, জ্যোতির্ময় গুহ ঠাকুরতা, মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, আখতার হামিদ খান, ড. মুহম্মদ কুদরত-ই খুদা, সৈয়দ আলী আহসান, শামসুর রাহমান প্রমুখ উল্লেখযোগ্য।    

৪৭. হাবিব রহমান, বাঙালি মুসলমান সমাজ ও বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৭৭। কায়েমী শাসকগোষ্ঠীর রবীন্দ্র-বিরোধী মনোভাবের পরিচয় পাওয়া যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের উদ্যোগে গঠিত রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন কমিটির চেয়ারপারসন সুফিয়া কামালের একটি স্মৃতিচারণ থেকে। রবীন্দ্র-বিরোধীদের ধারণা ছিল―এদেশে যাঁরা রবীন্দ্র-চর্চা করেন তারা ভারতের চর। তদানীন্তন পূর্ব-পাকিস্তানের গভর্নর মোনায়েম খান বুদ্ধিজীবীদের ডেকে বলেছিলেন―‘আপনারা কি করছেন? আপনারা রবীন্দ্রসঙ্গীত লিখতে পারেন না, কেন ওপার থেকে রবীন্দ্রসঙ্গীত এনে এখানে চর্চা করা হবে।’ (শাহীন রহমান সম্পাদিত, অন্তরঙ্গ সুফিয়া কামাল, স্টেপস টুয়ার্ডস ডেভেলপমেন্ট, ঢাকা ২০০১, পৃ. ৭৬) মোনায়েম খানের এ উক্তির মধ্য দিয়ে বাঙালি সংস্কৃতি সম্পর্কে শাসকগোষ্ঠীর অজ্ঞতারই পরিচয় বহন করে। ঢাকায় রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনের জন্যে তিনটি কমিটি গঠিত হয়। ১. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের উদ্যোগে গঠিত কমিটি। ২. ঢাকা হাই হাইকোর্টের বিচারপতি এস. এম. মুর্শেদের নেতৃত্বে একটি কমিটি এবং ৩. ঢাকার প্রেসক্লাবে তরুণ শিল্পী-সাহিত্যিক- সাংবাদিক- শিক্ষার্থীদের সমন্বয়ে ‘রবীন্দ্র-জন্মশতবার্ষিকী উৎসব কমিটি’। (দৈনিক আজাদ, মার্চ ২৯, এপ্রিল ২৩-২৪, মে ৮, ১৯৬১; উদ্ধৃত, রেজোয়ান সিদ্দিকী, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৫২)

৪৮. সৈয়দ নুরুদ্দিন, ‘রবীন্দ্রনাথ’, সমকাল, ৪ বর্ষ, ৯ সংখ্যা, বৈশাখ ১৩৬৮, পৃ. ৭৩৩

৪৯. মোরশেদ শফিউল হাসান, পূর্ব বাংলায় চিন্তাচর্চা ১৯৪৭-১৯৭০: দ্বন্দ্ব ও প্রতিক্রিয়া, প্রাগুক্ত, ঢাকা ২০০৭, পৃ. ৫৯৯

৫০. উদ্ধৃত, আনিসুজ্জামান, ‘স্বরূপের সন্ধানে’, স¦রূপের সন্ধানে, প্রাগুক্ত, ১৯৯১, পৃ. ৭৩। আসলে মুসলিম জাতীয়তাবাদী চেতনায় আচ্ছন্ন তৎকালীন সমাজে বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের কথা বলাই ছিল দুঃসাধ্য ব্যাপার। মাসিক মোহাম্মদী  পত্রিকায় ১৩৫৮ সালের আষাঢ় সংখ্যার আলোচনা বিভাগে ‘তামুদ্দনিক সংকট’ শীর্ষক লেখা থেকে সেদিনের অবস্থা অনেকটাই অনুধাবন করা যায়। যেখানে নববর্ষ, বসন্তোৎসব, রবীন্দ্র-নজরুল জয়ন্তী প্রভৃতি উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠান সমূহকে পাকিস্তান বিরোধী অর্থাৎ ‘গয়ের এছলামী ভাবধারা’ প্রচারের প্রচেষ্টা হিসেবে দেখানো হয়। এসবের পেছনে ভারতের হিন্দু মহাসভার ইসলামি তমদ্দুন ধ্বংসের ষড়যন্ত্র বা কমিউনিস্ট ভাবধারা প্রচারের চেষ্টা আলোচক লক্ষ করেছেন। (উদ্ধৃত, হাবিব রহমান, বাঙালি মুসলমান সমাজ ও বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৭২-১৭৩। সমালোচক বলেন, ‘বস্তুত এ ধরনের বক্তব্য কেবল মোহাম্মদী কর্তৃপক্ষের ছিল না, ছিল স্বয়ং সরকারেরও।’ (হাবিব রহমান, পূর্বোক্ত, পৃ. ১৭৩)                                                 

৫১. রেজোয়ান সিদ্দিকী, পূর্ব বাংলার সাংস্কৃতিক সংগঠন ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫১

৫২. সাঈদ-উর-রহমান, পূর্ব বাংলার রাজনীতি-সংস্কৃতি ও কবিতা, প্রাগুক্ত, পৃ. ১০৩

৫৩. সিদ্দিকুর রহমান, ‘সাম্প্রতিক দৃষ্টিকোণ ও নজরুল কাব্যমানসের পুনর্নিরীক্ষা’, সমকাল, ১২ বর্ষ, ১০-১২ সংখ্যা, জ্যৈষ্ঠ-

     শ্রাবণ ১৩৭৫, পৃ. ৩৪৮ 

৫৪. আহমদ শরীফ, ‘বাঙলা ভাষা ও সাহিত্যের খসড়াচিত্র’, বিচিত চিন্তা, চৌধুরী পাবলিশিং হাউস, ঢাকা ১৯৬৮, পৃ. ১৫০

 লেখক : প্রাবন্ধিক

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button