শনিবারের চিঠি : নিছক সমালোচনা ? : নাকি চাবুকের জ্বালা ধরানো প্রহার! : সুশীল সাহা
প্রচ্ছদ রচনা : বাংলা ভাষার ঐতিহ্যবাহী সাহিত্যপত্র

বাংলা সাময়িকপত্রের ইতিহাসে শনিবারের চিঠির একটি উল্লেখযোগ্য জায়গা রয়েছে। বাংলা সাহিত্য সমালোচনার ধারার এমন ব্যঙ্গ-বিদ্রƒপে শাণিত কটাক্ষভরা পত্রিকা আর বিশেষ দেখা যায়নি। একশো এক বছর আগে যাত্রা শুরু করে মাঝে মাঝে কিছুটা অনিয়মিত হলেও সুদীর্ঘ চারটি দশক ধরে এর প্রকাশ ঘটেছে। সাধারণ পাঠকের আনুকূল্য তথা বিশিষ্টজনের প্রশ্রয় ছাড়া এমন সংঘটন কিছুতেই সম্ভব ছিল না। এই সাহিত্য সাময়িকীর মূল স্বত্বাধিকারী ছিলেন সেই যুগের বিশিষ্ট সম্পাদক রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের পুত্র অশোক চট্টোপাধ্যায়। প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদকের নাম যোগানন্দ দাস। তবে এর সত্যিকারের প্রাণপুরুষ ছিলেন সেই সময়কার উল্লেখযোগ্য সাহিত্যব্যক্তিত্ব সজনীকান্ত দাস।
শনিবারের চিঠি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৩৩১ বঙ্গাব্দের শ্রাবণ তথা ১৯২৪ খ্রিষ্টাব্দের জুলাই মাসে। এই সাপ্তাহিক পত্রিকার একাদশ সংখ্যা থেকে সজনীকান্ত দাস সম্পাদকের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। তারপর থেকেই এই পত্রিকায় প্রকাশিত সাহিত্য সমালোচনাগুলো ক্ষুরধার ব্যঙ্গে শাণিত হয়ে ওঠে। রবীন্দ্রনাথ-শরৎচন্দ্র-প্রমথ চৌধুরী-কাজী নজরুল ইসলাম থেকে শুরু করে সেই আমলের বাঘা বাঘা লেখকেরা এই পত্রিকার তীব্র সমালোচনার লক্ষ হয়েছিল। ফলে বাঙালি পাঠকমহলে বিপুল সাড়া জাগিয়ে একই সঙ্গে নন্দিত ও নিন্দিত হয়ে ওঠে এই পত্রিকা। সেই সময়ে প্রকাশিত কল্লোল, প্রগতি, কালিকলম, পরিচয়, পূর্বাশা, কবিতা, চতুরঙ্গ ইত্যাদির পাশে পত্রিকাটি আপন বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জ্বল হয়ে পাঠকমহলের পরম আদরনীয় হয়। এতে যাঁরা লিখেছেন তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, মোহিতলাল মজুমদার, নীরদচন্দ্র চৌধুরী, পরিমল গোস্বামী প্রমুখ। এই পত্রিকায় কবিতা গল্প উপন্যাস প্রকাশিত হলেও এর প্রধান আকর্ষণ ছিল ‘সংবাদ সাহিত্য’। এতে তখনকার দিনে প্রকাশিত নানাবিধ সাহিত্যের খবর ইত্যাদি প্রকাশিত হতো। রম্য রচনার আঙ্গিকে সেগুলো লেখা হলেও তার ভাষা ছিল তীব্র ব্যঙ্গাত্মক। তাই এতে বিপুল পরিমাণে সৃজনশীল সাহিত্যের প্রকাশ ঘটলেও এই পত্রিকার গায়ে সমালোচনা সাহিত্যের এক কঠিন তকমা এঁটে যায়। তবে সেই সমালোচনা ছিল সুতীব্র জ্বালা ধরানো।
শনিবারের চিঠি প্রথমে সাপ্তাহিক পত্রিকা হিসেবে প্রকাশিত হতো। পরে মাসিকপত্র হিসেবে প্রকাশিত হতে থাকে। প্রথম পর্যায়ে এটির সাতাশটা সংখ্যা সাপ্তাহিক হিসেবে একটানা প্রকাশিত হয়েছিল। তার কিছুদিন পরে মাসিকপত্র হিসেবে কয়েকটি সংখ্যা প্রকাশ করে এটি সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। দশ মাস পরে ১৩৩৪ বঙ্গাব্দের ভাদ্র মাস থেকে আবার এটা প্রকাশিত হতে থাকে। কিছুদিন পরে এর সম্পাদক হন নীরদচন্দ্র চৌধুরী। কিন্তু নতুন প্রকাশক সজনীকান্তের সঙ্গে মতানৈক্য হওয়ায় তিনি পদত্যাগ করলে সজনীকান্ত নিজেই সম্পাদক হন। ১৩৩৬ বঙ্গাব্দের কার্তিক মাসে পত্রিকাটি তৃতীয়বারের মতো বন্ধ হয়ে যায়। পরে আবার ১৩৩৮ বঙ্গাব্দের আশ্বিন মাস থেকে শুরু করে সজনীকান্ত দাসের মৃত্যু পর্যন্ত (১৩৭৭ বঙ্গাব্দ) পত্রিকাটি নিয়মিত প্রকাশিত হয়েছিল।
হাস্যকৌতুক ও তীর্যক মন্তব্যের মাধ্যমে তীব্র সমালোচনার সাময়িকপত্র হিসেবে শনিবারের চিঠি ইতিহাসে এক বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে আছে। সমকালীন পত্রিকায় প্রকাশিত লেখা যা ওঁদের পছন্দ হতো না, তাকে ঘিরেই নানা রকম প্যারোডি ও কার্টুনের মাধ্যমে ব্যঙ্গ-বিদ্রƒপ করাই ছিল সেই সব লেখার প্রধান বৈশিষ্ট্য। আক্রমণের লক্ষ থেকে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ এবং কাজী নজরুল ইসলাম পর্যন্ত রেহাই পাননি, এ কথা আগেই জানিয়েছি। নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতার মতো কালজয়ী কবিতাও সেই আক্রমণ থেকে বাদ যায়নি। ওই কবিতা নিয়ে শনিবারের চিঠিতে প্রকাশিত প্যারোডিটি ছিল এইরকম―
‘…ওগো বীর ফেলে দিয়ে কাঁথা আর খাটিয়া তাকিয়া ওঠো, জাগ, গা ঝাড়িয়া, চুল রগড়িয়া তবু উচ্চশির… হে সাহিত্য শিরোরত্ন আনিয়াছ টানি মগজের কোন কেন্দ্র হতে ? বল বীর, কোন ব্যাধি তোমারে করেছে এমন অস্থির ? হে কবি ‘কেমিস্ট’ প্রেম রসায়নে পকস্ফ পণ্ডিত ‘প্রেমিস্ট’ তব্য কাব্য ‘রি-এজেন্ট’ রসে সর্ব প্রেম মূর্ত হয় সর্ব হুরী আসে তব বশে…
কবিতার শুরুটা ছিল আরও তীক্ষè। ‘ব্যাঙ’ শিরোনামের সেই কবিতাটির প্রথম কয়েকটি পঙ্ক্তি ছিল এইরকম―
‘আমি ব্যাঙ লম্বা আমার ঠ্যাং ভৈরব রভসে বরষা আসিলে ডাকি গ্যাঙ্গোর গ্যাঙ। আমি ব্যাঙ আমি সাপ, আমি ব্যাঙ্গেরে গিলিয়া খাই, আমি বুক দিয়া হাঁটি ইঁদুর ছুঁচোর গর্তে ঢুকিয়া যাই। আমি ভীমভুজঙ্গ ফণিনী দলিত ফণা, আমি ছোবল মারিলে নরের আয়ু মিনিটে যায় গণা। আমি নাগশিশু, আমি ফণিমনসার জঙ্গলে বাসা বাঁধি, আমি ‘বে অফ বিস্কে’ সাইক্লোন, আমি মরু সাহারার আঁধি…
বিদ্রোহী কবিতার এই প্যারোডি শনিবারের চিঠিতে প্রকাশিত হওয়া মাত্র অনেকেই মনে করেন এটি মোহিতলাল মজুমদারের রচনা। কেননা এর আগে মোহিতলালের ‘আমি’ কথিকার বিষয়বস্তু অনেকটাই ‘বিদ্রোহী’ কবিতার মতো। অনেকেই মনে করেছিলেন নজরুল ওই লেখা থেকেই অনুপ্রাণিত হয়ে এই কবিতাটি লিখেছেন। কিন্তু ব্যাপারটা আদৌ সত্য নয়। এই সব এক ধরনের অপপ্রচার ছাড়া আর কিছু নয়। কিন্তু তাৎক্ষণিকভাবে উত্তেজিত হয়ে নজরুল ‘সাবধানী ঘণ্টা’ শিরোনামে একটি কবিতা লিখে ১৩৩১ বঙ্গাব্দের কল্লোল পত্রিকায় প্রকাশ করেন। সেটা ছিল এইরকম―
‘রক্তে আমার লেগেছে আবার সর্বনাশের নেশা। রুধির-নদীর পার হতে ঐ ডাকে বিপ্লব হ্রেষা। হে দ্রোণাচার্য, আজি নব জয়যাত্রার আগে, দ্বেষ পঙ্কিল হিয়া হতে দাও তব রূপ-মসি খানি, অঞ্জলি ভরি শুধু কুৎসিত কদর্যতার গ্লানি। তোমার নীচতা, ভীরুতা তোমার, তোমার মনের কালি উদ্গার গুরু শিষ্যের শিরে; তব বুক হোক খানি।’
বলা বাহুল্য এই কবিতা পড়ে মোহিতলাল প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। ক্রোধের বশে এর প্রত্যুত্তরে অত্যন্ত কদর্য ভাষায় একটি কবিতা লেখেন। শিরোনাম দেন ‘দ্রোণ-গুরু’। ১৩৩১ বঙ্গাব্দের ৮ কার্তিক সংখ্যা শনিবারের চিঠিতে সেটা প্রকাশিত হয়। কবিতাটি এইরকম―
‘আমি ব্রাহ্মণ, দিব্য চক্ষে দুর্গতি হেরি তোর, অধঃপতনের দেরী নাই আর ওরে হীন জাতি চোর। আমার গায়ে যে কুৎসার কালি ছড়াইলি দুই হাতে, সব মিথ্যের শাস্তি হবে সে এক অভিসম্পাতে। গুরু ভার্গব দিল যা তুহারে! ওরে মিথ্যার রাজা! আত্ম পূজার ভণ্ড পূজারী! যাত্রার বীর সাজা ঘুচিবে তোমার―মহাবীর হওয়া মর্কট সভাতলে! দু’দিনের এই মুখোশ-মহিমা তিতিবে অশ্রু জলে! অভিশাপ রূপী নিয়তি করিবে নিদারুণ পরিহাস― চরম ক্ষণে মেদিনী করিবে রথের চক্র গ্রাস।’
এমন অজস্র উদাহরণ পত্রিকার পাতায় পাতায় ছড়ানো রয়েছে। সেগুলো থেকে একটু একটু করে বিবৃত করা যাবে এই সব ব্যঙ্গ বিদ্রƒপের মাত্রা এবং আক্রমণের তীব্রতা বোঝাবার জন্যে। বলা বাহুল্য এই সব লেখা ছাপা হতো নানান ছদ্মনামে। আরও অনেকের সঙ্গে স্বয়ং সজনীকান্তই সব বিচিত্র নামের আড়ালে এমন অনেক বিদ্রƒপাত্মক লেখার জনক।

এই পত্রিকার বেশ কয়েকটি বিভাগ ছিল। ‘সংবাদ সাহিত্য’ বিভাগে সমকালীন সাহিত্য সংবাদ প্রকাশ করা হতো। সেই সময়ের সাহিত্য নিয়ে নানারকম তীর্যক মন্তব্য ও বিদ্রƒপাত্মক টিপ্পনী থাকত। ‘প্রসঙ্গ কথা’ নামে একটি নিয়মিত বিভাগে সমসাময়িক পরিস্থিতি নিয়ে নীরদচন্দ্র নিয়মিত লিখতেন। বুদ্ধিদীপ্ত ব্যঙ্গচিত্র বা কার্টুন ছিল এই পত্রিকার এক অন্যতম আকর্ষণ। এছাড়া এতে নিয়মিত প্যারোডি ও স্যাটায়ারধর্মী কবিতা ও ছড়া ছাড়া গল্প, নাটক, কবিতা ও উপন্যাস ছাপা হতো। তবে শুধু সমসাময়িক সাহিত্যকৃতির সমালোচনা নয়, ব্রিটিশ রাজশক্তির দমননীতি ও অত্যাচারের কঠোর সমালোচনা, বিবিধ কুসংস্কারের প্রসারের বিরুদ্ধতা, ধর্মের নামে উগ্রপন্থা এবং দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের ‘স্বরাজ্য’ পার্টির সমালোচনাও এতে থাকত। আর ঠিক এইভাবেই সেই সময়ে এক ধরনের ‘কাউন্টার লিটারেচার’-এর মূল প্রবক্তা হয়ে ওঠে এই পত্রিকা। ব্যতিক্রমধর্মী সমালোচনামূলক সাময়িক পত্র হিসেবে শনিবারের চিঠির তাই এক স্থায়ী আসন রয়ে গেছে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে। প্রসঙ্গত সজনীকান্ত দাসের ‘ছবিতা’ শীর্ষক একটি ব্যঙ্গকবিতা এখানে উদ্ধৃত করছি।
‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য উচ্চ যেথা শির’ বীর্য দেহ, চিত্তেরে একাকী প্রত্যহের তুচ্ছতায় উর্ধ্বে দিতে রাখি’ ‘বাজালে যে সুর প্রভাত-আলোরে সেই সুরে মোরে বাজাও’ ‘এস দাড়ি নাড়ি কলিমুদ্দি মিয়াঁ’
বলা বাহুল্য এই কবিতার লক্ষ রবীন্দ্রনাথ। সজনীকান্ত দাস একজন কবি এবং গদ্যলেখকই ছিলেন না, ছিলেন দক্ষ সম্পাদকও। শুধু শনিবারের চিঠিই নয় তিনি একদা প্রবাসী, বঙ্গশ্রী। এবং দৈনিক বসুমতী পত্রিকারও সম্পাদক ছিলেন। শনিবারের চিঠির কাজে তিনি যখন লিপ্ত হন তখন তাঁর ভরা যৌবনকাল। সেই বয়সের চাপল্য কিংবা নতুন কিছু একটা করার ইচ্ছায় তিনি পত্রিকাটিকে সেই সময়ের এক বিশেষ উল্লেখ্য সংযোজন হিসেবে দাঁড় করান। অবশ্য পরিণত বয়সে তিনি অনেকটাই সংহত ও সংযত হয়েছিলেন। সেই প্রসঙ্গে পরে আসব। তবে বিগত শতাব্দীর দ্বিতীয় থেকে চারটি দশক ধরে বাংলা সাময়িকপত্র হিসেবে রীতিমতো এক চাঞ্চল্যকর অবদান রাখতে সক্ষম হয়েছিল। আগেই জানিয়েছি পত্রিকাটি টানা চার দশক ধরে নিয়মিত বেরোয়নি। নানা কারণে এটি সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে গেলেও পূর্ণোদ্যমে পুনঃপ্রকাশ ঘটেছে কয়েকবার। আর যখনই প্রকাশিত হয়েছে, তখনই রীতিমতো আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
সজনীকান্ত শুরু থেকেই কল্লোল গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সরব হয়ে ওঠেন। মনে রাখা দরকার, সৃষ্টির আনন্দে একদল তরুণ কল্লোল পত্রিকাটি ওই সময়ে প্রকাশ করতে থাকেন। নিজেদের আত্মপ্রকাশের মুখপত্র হিসেবে সেটি অচিরেই পাঠকনন্দিত হয়। এই তরুণদের মধ্যে ছিলেন প্রেমেন্দ্র মিত্র, শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়, কাজী নজরুল ইসলাম, মুরলীধর বসু, নীলিমা বসু, অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত, নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায়, মণীশ ঘটক, বুদ্ধদেব বসু, জীবনানন্দ দাশ, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়, জগদীশ গুপ্ত, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ দিকপাল লেখক। যদিও তখনও তাঁরা কেউই খ্যাতির আলোকবৃত্তে সেইভাবে আসতে সক্ষম হননি। কিন্তু কেউ কেউ প্রথম আবির্ভাবেই পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে ফেলেন। এইসব তরুণ লেখকদেরই লক্ষ করে সজনীকান্ত ছদ্মনামে নানারকম ব্যঙ্গ-বিদ্রƒপাত্মক ছড়া কবিতা লিখতে শুরু করেন। সঙ্গে থাকত নানারকম ব্যঙ্গচিত্র বা কার্টুন। সজনীকান্তের ছদ্মনামগুলোও ছিল বিচিত্র। সেগুলো হলো, রাম গাজনদার, গোলকচন্দ্র ধাঁধা, ক্ষীণবেন্দ্র রায়, অনুপ্রাসরঞ্জন সেন, কুডুল বাম, অরসিক রায়, গণদাস বণিক, নিখিল প্রিয়া সেন, নব বিষ্ণূশর্মা, বটুকলাল ভট্ট, বন্তি সুন্দর ব্যথিক প্রভৃতি। এছাড়া গাজী আব্বাস বিটকেল ছদ্মনামে সজনীকান্তসহ আরও অনেকে সেই সময়ে লিখতেন। এইসব ব্যঙ্গ-বিদ্রƒপের কিছু নমুনা তো আগেই দিয়েছি। এবার আরও কয়েকটি উল্লেখ করে লেখাগুলোর মান সম্পর্কে কৌতূহলী পাঠকদের অবহিত করাতে চাই।
১৩৩৩ বঙ্গাব্দের জৈষ্ঠ্য সংখ্যায় কাজী নজরুল ইসলামের ‘মাধবী প্রলাপ’ নামে একটি কবিতা প্রকাশিত হলে শুচিবায়ুগ্রস্ত বহু পাঠকের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। কবিতাটির প্রথম কয়েকটি পংক্তি এইরকম―
‘আজ লালসা-আলস-মদে বিবসা রতি শুয়ে অপরাজিতার ধনী স্মরিছে পতি তার নিধুবন উন্মন ঠোঁটে কাঁপে চুম্বন বুকে পীন যৌবন উঠিছে ফুঁড়ি মনে কাম-কণ্ঠ ব্রণ মহুয়া কুঁড়ি।’
কবিতাটি দীর্ঘ। ছত্রে ছত্রে শরীরী প্রেমের স্পষ্ট আভাস। বলা বাহুল্য এটি শুচিতাকামী পাঠকদের মনে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়। সজনীকান্ত ব্যাপারটিকে লুফে নেন এবং খুবই ব্যঙ্গাত্মক ভাষায় নজরুলকে তীব্র আক্রমণ করেন। মনে রাখা দরকার সেই সময়ে নজরুলের লেখার বিরুদ্ধতা কেবল এক শ্রেণির লেখকেরাই করেছেন, তা নয়। কট্টর ইসলামি চিন্তার ধারক বেশ মানুষও ছিলেন এই দলে। ফলে শনিবারের চিঠিতে প্রকাশিত এই ধরনের লেখাগুলো তাঁরা পরমাদরে গ্রহণ করেছেন। আগেই জানিয়েছি একদা কবি মোহিতলাল মজুমদারও শনিবারের চিঠির কোপে পড়েন। পরে অবশ্য তিনিও ওই পত্রিকায় যোগ দেন। তিনিও নানাভাবে নজরুলের বিরুদ্ধাচারণ করতে থাকেন। কল্লোল পত্রিকায় কবি বুদ্ধদেব বসুর ‘রজনী হলো উতলা’ প্রকাশিত হওয়া মাত্র সজনীকান্ত ওই কবিতার বিরূপ সমালোচনা করে লেখেন, ‘নতুন বছরের গোড়া হইতেই জল কল্লোল হঠাৎ যৌন কল্লোল হইবার সাধনায় মগ্ন হইল।’ একই পদ্ধতিতে সজনীকান্ত তরুণ লেখক অন্নদাশঙ্কর রায়কেও আক্রমণ করেন। ১৩৩৫ সালের ফাল্গুন সংখ্যায় তাঁর ‘নতুন’ নামের প্রবন্ধে শ্রী রায় তখনকার চালু অনেক ধ্যান-ধারণাকে নস্যাৎ করে দিয়ে লেখেন, ‘প্রেম একটা কথার কথা, সতীত্ব একটা ন্যাকামী, দয়া একটা দুর্বলতা, ক্ষমা একটা ভণ্ডামি, বীরত্ব একটা ভড়ং, পরোপকার একটা নিগূঢ় স্বার্থপরতা।’ অন্নদাশঙ্কর তখন সদ্য বিলেত প্রত্যাগত। তাই তাঁর চিন্তা-চেতনায় পশ্চিমের অনেক ছোঁয়া ছিল। সজনীকান্ত তাঁর লেখায় এইসব সংজ্ঞাকে তুলোধোনা করেন তাঁর লেখায়। এই ধরনের লেখাপত্রের জন্য একটা সময়ে অনেক লেখক সজনীকান্তকে সন্তুষ্ট রাখতে চেষ্টা করেছেন। এই তালিকায় রবীন্দ্রনাথও ছিলেন। সাহিত্যের ইতিহাসে এ একরকম নজিরবিহীন ঘটনা। সজনীকান্ত কবিগুরু রবীন্দ্রনাথকেও ব্যঙ্গ-বিদ্রƒপ করতে কুণ্ঠিত ছিলেন না। এতে রবীন্দ্রনাথ একসময় এতই অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন যে, ডাকযোগে পাঠানো শনিবারের চিঠি তিনি ফেরতও পাঠিয়েছিলেন। এমনকী ‘প্রবাসী’ প্রেস থেকে ওই পত্রিকা না ছাপানোর জন্যেও তিনি পত্রিকাসংশ্লিষ্ট সম্পাদককে জানিয়েছিলেন। না হলে তিনি ওই পত্রিকায় লিখবেন না বলেও জানান। মনে রাখা দরকার সজনীকান্ত মূলত যে লেখকদের লেখা নিয়ে ব্যঙ্গ বিদ্রুপ করতেন সেই কল্লোল বা কালিকলম পত্রিকার লেখকবৃন্দ ছিলেন তাঁর সমবয়েসী বা সামান্য বড়ো কিংবা ছোট। কিন্তু তাঁদের তুলনায় রবীন্দ্রনাথ ছিলেন বয়সে অনেক বড়ো। তাছাড়া ১৯১৩ সালে তাঁর নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির কারণে এই উপমহাদেশে তো বটেই, সমগ্র বিশ্বের নানা দেশে তিনি তাঁর লেখার গুণে সুপরিচিত হয়ে ওঠেন। বহির্ভারতের নানা ভাষায় তাঁর গ্রন্থাবলি অনূদিত হয়ে বৃহত্তর এক পাঠকসমাজ তৈরি করে ফেলে। এতদসত্ত্বেও সজনীকান্ত তাঁর বিরুদ্ধে নানাসময়ে কলম ধরেছেন। তবে ক্রমশ তিনি তাঁর আক্রমণাত্মক মনোভাব থেকে সরে আসেন। ধীরে ধিরে তিনিও পরম রবীন্দ্রভক্ত হয়ে পড়েন। তাঁর ‘আত্মস্মৃতি’তে তিনি স্পষ্ট ভাষায় নিজের কৃতকর্মের কথা স্বীকার করে গেছেন। সময় যত গড়িয়েছে, রবীন্দ্রনাথের প্রতি সজনীকান্ত ততই আকৃষ্ট হয়েছেন। কীভাবে যেন আগেকার সমস্ত গ্লানি ও তিক্ততাগুলো ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে গিয়েছে। একসময় যিনি রবীন্দ্রনাথের অনেক লেখার কঠোর সমালোচনা করেছেন সেই তিনিই কবিগুরুর শেষ জীবনের সমস্ত লেখার অকুণ্ঠ প্রশংসা করেছেন। তখন সজনীকান্তের আচরণে রবীন্দ্রনাথ এতটাই সন্তুষ্ট হন যে, একসময় তাঁকে রবীন্দ্র-রচনাবলীর সম্পাদক মণ্ডলীর অন্তর্ভুক্ত করেন। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে সজনীকান্তের এই মধুর সম্পর্ক আমৃত্যু ছিল। সজনীকান্ত তাঁর শেষ জীবনে রবীন্দ্রনাথের শতবার্ষিকী উপলক্ষে শনিবারের চিঠির একটি সংখ্যা সম্পাদনাও করেন।
একসময় শনিবারের চিঠির নেতিবাচক লেখাপত্রের জন্যে রবীন্দ্রনাথ বিরক্তি প্রকাশ করলেও পরবর্তীকালে ওই পত্রিকার রঙ্গব্যঙ্গ করার ক্ষমতার প্রশংসাও করেন। শনিবারের চিঠির পাতায় নানারকম অঘটন ঘটাবার জন্যে সজনীকান্ত একরকম আত্মতৃপ্ত ছিলেন। তাঁর আত্মস্মৃতি থেকে জানা যায়, ‘শনিবারের চিঠি যাহারা দেখিবার সুযোগ পাইবেন তাহারাই লক্ষ করিবেন, কী প্রচণ্ড বিস্ফোরণই না আমরা তিন চারজনে ঘটাইয়াছিলাম।… চারিদিকে ত্রাহি ত্রাহি রব উঠিয়াছিল।’
শনিবারের চিঠির বিভিন্ন সংখ্যায় (১৩৩৩ বঙ্গাব্দের আষাঢ় থেকে ১৩৩৪ বঙ্গাব্দের সালের কার্তিক সংখ্যা পর্যন্ত) নজরুলের বিভিন্ন লেখাকে ব্যঙ্গ করে বেশ কয়েকটি প্যারোডি মুদ্রিত হয়। ভাদ্র সংখ্যায় নজরুলকে ‘বাংলার আধুনিক বরপুত্র নবযুগ ধুরন্ধর সাহিত্য সারথি’ আখ্যা দেওয়া হয়। এইসব ব্যঙ্গ রচনার মূল উদ্দেশ্য ছিল নজরুলের চরিত্র হনন। প্রমিলা দেবীকে বিয়ে করার পর থেকে যার শুরু। শুধু কবিতায় নয়, ১৩৩৪ বঙ্গাব্দের ভাদ্র সংখ্যা থেকে পৌষ অব্দি নজরুলের গণবাণী পত্রিকাকে ব্যঙ্গ করে ‘কচি ও কাঁচা’ নামে একটি পঞ্চাঙ্ক নাটক ধারাবাহিকভাবে বের হয়। নাটকের পাত্র-পাত্রীরা ছিলেন সম্পাদক, কার্ল মার্কস, শেলি, লেনিন, ট্রটস্কি, হুইটম্যান, প্রলেতারিয়েত বায়রন, বৌদি খেঁদি, ছেঁড়া ন্যাকড়া, ভাঙ্গা চুড়ি, ছেঁড়া চুল ইত্যাদি। চরিত্রগুলো আসলে হল কার্ল মার্কস (মুজফ্ফর আহমদ), ট্রটস্কি (সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুর)। প্রলেতারিয়েত বায়রন (নজরুল ইসলাম)। এই নাটকের সময় খ্রিষ্টীয় বিংশ শতাব্দী, স্থান কলকাতা মহানগর। নাটকে ‘ঢেঁকির গান’, ‘কুলোর গান’, ‘চায়ের গান’ অর্থাৎ নজরুলের ‘কৃষাণের গান’, ‘জেলেদের গান’-এর প্যারোডি ছিল। দ্বিতীয় দৃশ্যের পরিচয়লিপিটি ছিল আসলে গণবাণী অফিসের ব্যঙ্গচিত্র, হ্যারিসন রোডের ওপরে একটি গৃহের দ্বিতলে সাপ্তাহিক বোলশেভিকী কার্যালয়। গেরুয়া খদ্দর পরিহিত সৌম্যদর্শন সুশ্রী একটি ছোকরা সেই চাদরের উপর বসিয়া নিবিষ্ট চিত্তে প্রুফ দেখিতেছেন, তাঁহার আকৃতি ও সাজসজ্জার সহিত এই ঘরের কিছুই খাপ খায় না, ইনি ট্রটস্কি (সৌমেন ঠাকুর)। পশ্চাতের অন্ধকার দিয়া ‘আর পারি না সাধুতে লো সই’ এই গাহিতে গাহিতে ঝাঁকড়া চুলওয়ালা ঘাড়ে গর্দানে এক হৃষ্টপুষ্ট কৃষ্ণকায় যুবকের প্রবেশ, ইনি প্রলেতারিয়েত বায়রন (নজরুল)। ইহার পিছনে কার্ল মার্কস (মুজফ্ফর আহমদ), লেনিন প্রভৃতি গণতন্ত্র দরদীদের প্রবেশ। বায়রন সজোরে ট্রটস্কির পিঠে থাবা মারিয়া চিৎকার করিয়া বলিয়া উঠিলেন হুররে থ্রি চিয়ার্স ফর ‘বোলশিভিক’…। এইটুকুতেই আশাকরি বুঝতে পারা যায় কতখানি ঝাঁজ ছিল ওঁদের আক্রমণে! আসলে সজনীকান্ত ছাড়া আর যাঁরা লিখতেন, তাঁরাও প্রত্যেকেই ছিলেন ক্ষমতাধর। প্রকাশভঙ্গি ছিল আক্রমণাত্মক। তাই লেখার ভাষাও ছিল ক্ষুরধার। তবে এ নিয়ে নজরুলের প্রতিক্রিয়া বিশেষ জানা যায়নি। কিন্তু তাঁর যে প্রতিবাদী স্বভাব ছিল তাতে এইরকম কুৎসা বা চরিত্রহননের মতো বিষয়কে তিনি বিনা প্রতিবাদে মেনে নেবেন, এটাও অবিশ্বাস্য মনে হয়। তাঁর ‘আমার কৈফিয়ত’ কবিতাটার এক জায়গায় তিনি খুব স্পষ্টভাবে লিখেছিলেন,
“…গুরু কন, তুই করেছিস শুরু তলোয়ার দিয়ে দাড়ি চাঁছা! প্রতি শনিবারী চিঠিতে প্রেয়সী গালি দেন, ‘তুমি হাঁড়িচাচা!’ আমি বলি প্রিয়ে হাঁটে ভাঙ্গি হাঁড়ি! অমনি বন্ধ চিঠি তাড়াতাড়ি। সব ছেড়ে দিয়ে করিলাম বিয়ে, হিন্দুরা ক’ন ‘আড়ি চাচা!’ যবন না আমি কাফের ভাবিয়া খুঁজি টিকি দাড়ি, নাড়ি কাছা!
মৌ-লোভী যত মৌলবী আর ‘মোল্লারা ক’ন হাত নেড়ে’ ‘দেব-দেবী নাম মুখে আনে, সবে দাও পাজিটার জাত মেরে! ফতোয়া দিলাম―কাফের কাজী ও, যদিও শহীদ হইতে রাজিও! ‘আমপারা’-পড়া হাম বড়া মোরা এখনো বেড়াই ভাত মেরে! হিন্দুরা ভাবে, পার্শি-শব্দে কবিতা লেখে ও পা’ত নেড়ে!”
এখানে ‘গুরু’ আসলে গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ। কবিতাটি দীর্ঘ। তবে উল্লিখিত অংশটুকুতেও নজরুলের দৃঢ় চরিত্রের একটি স্পষ্ট আভাস রয়েছে। শনিবারের চিঠির লেখকবৃন্দসহ কাউকেই তিনি ছেড়ে দেননি। হিন্দু এবং মুসলমান দুই শ্রেণির মৌলবাদীদের তিনি এক হাত নিয়েছেন এই কবিতায়। তাঁর হিন্দু মেয়েকে বিয়ে করা অনেকের গাত্রদাহের কারণ হয়ে উঠেছিল। এখানে সেই প্রসঙ্গটাও এসেছে হাল্কাভাবে।
তবে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ একসময় এই পত্রিকার ব্যঙ্গ-বিদ্রƒপের অন্তর্নিহিত শক্তি সম্পর্কে সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়কে লেখা একটা চিঠিতে জানিয়েছিলেন, ‘শনিবারের চিঠিতে ব্যঙ্গ করবার ক্ষমতার একটা অসামান্যতা অনুভব করছি। বোঝা যায় যে এই ক্ষমতাটা আর্ট-এর পদবীতে পৌঁছেচে। আর্ট পদার্থের একটা গৌরব আছে―তার পরিপ্রেক্ষিতে খাটো করলে তাকে খর্বতার দ্বারা পীড়ন করা হয়। ব্যঙ্গ সাহিত্যের যথার্থ রণক্ষেত্র সর্বজনীন মনুষ্যলোকে, কোনও একটা ছাতাওয়ালা-গলিতে নয়। পৃথিবীতে উন্মার্গযাত্রার বড় বড় ছাঁদ আছে, তার একটা না একটার মধ্যে প্রগতির গতি আছে, যে-ব্যঙ্গের বজ্র আকাশচারীর অস্ত্র তার লক্ষ্য এইরকম ছাঁদের পরে। …ব্যঙ্গরসকে চিরসাহিত্যের কোঠায় প্রতিষ্ঠিত করবার জন্যে আর্টের দাবি আছে। শনিবারের চিঠির অনেক লেখকের কলম সাহিত্যের কলম, অসাধারণ তীক্ষè, সাহিত্যের অস্ত্রশালায় তার স্থান,―নব-নব হাস্যরসের সৃষ্টিতে তার নৈপুণ্য প্রকাশ পাবে, ব্যক্তিবিশেষের মুখ বন্ধ করা তার কাজ নয়।’
শনিবারের চিঠি সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের এই সদর্থক উক্তির রেশ ধরে বলা যায়, বাংলা সাহিত্যের সমৃদ্ধির মূলে এই পত্রিকার অবদান কিছুতেই অস্বীকার করা যাবে না। এক পর্যায়ে বাংলা সাহিত্যের প্রখ্যাত অনেক লেখক লেখিকাদের স্মরণীয় লেখা শনিবারের চিঠির পাতায় ছাপা হয়েছিল। আর মনে রাখা দরকার সজনীকান্তের লেখালেখি শুধুমাত্র ব্যঙ্গ-বিদ্রƒপেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি ছিলেন একজন নিষ্ঠাবান গবেষক এবং সৃজনশীল লেখক। তাঁর আক্রমণাত্মক চরিত্রের আড়ালে ঢাকা পড়ে গেছে তাঁর ওইসব বিদগ্ধ পরিচয়। বলা যায় তাঁর পরিহাসপ্রিয়তাই একটা বড় পরিচয় হয়ে দেখা দিয়েছিল ওই সময়ে। এই ব্যাপারটা কিন্তু তাঁর সৃজনকর্মের মূল্যায়নে একটা বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তবে তাঁর গবেষকসত্তা, অনুসন্ধিৎসু মন এবং সাহিত্যকর্মের নিষ্ঠা ও দক্ষতার জ্বলন্ত প্রমাণ হিসেবে তাঁর দুটি গ্রন্থের নামোল্লেখ করা যায়। সেগুলো হলো (১) রবীন্দ্রনাথ : জীবন ও সাহিত্য, (২) বাংলা গদ্য সাহিত্যের ইতিহাস। প্রথম গ্রন্থটি রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবর্ষের প্রাক্কালে প্রকাশিত হয়। মনে রাখা দরকার তার পরের বছরেই (১৯৬২) সজনীকান্ত প্রয়াত হন। জীবন সায়াহ্নে তিনি কিন্তু রবীন্দ্রবিরোধিতার খোলস ভেঙ্গে পরম রবীন্দ্রভক্ত হয়ে পড়েন। দ্বিতীয় গ্রন্থটি বাংলা সাহিত্যের একটি অমূল্য দলিল হিসেবে স্বীকৃত। এর ভূমিকায় প্রখ্যাত গবেষক সুশীলকুমার দে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে এই পরিশ্রমী কাজের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছিলেন।
সজনীকান্ত তাঁর আত্মস্মৃতি গ্রন্থে অকপটে নিজের আত্মোপলব্ধি এবং আগাগোড়া সত্যভাষণ করে গেছেন। আমরা জানি শনিবারের চিঠির লেখক হিসেবে অমন কামস্কাটিয় ছন্দে ব্যঙ্গ-বিদ্রƒপাত্মক লেখা তাঁর সৃজনশীল পরিচয়কে ঢেকে দিয়েছে। তিনি একসময় রবীন্দ্রসাহিত্যের পরম অনুরাগী ছিলেন। তাঁর সেই মেধা ও মননের পরিচয় পেয়ে বিশিষ্ট পরিসংখ্যানবিদ প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশ তাঁকে রবীন্দ্র-গবেষণায় আত্মনিয়োগ করতে বলেন। কিন্তু তখন তিনি ওই কাজটা না করে তরুণ বয়সের চাপল্যে কিংবা খ্যাতির শীর্ষে ওঠার এক নেতিবাচক পন্থা বেছে নেন।
বিগত শতাব্দীর বিশ দশক থেকে একটানা ত্রিশ বছর সজনীকান্ত সাহিত্য রচনায় ব্যাপৃত ছিলেন। অবশ্য তার একটা বড়ো অংশ তিনি ব্যয় করেছেন শনিবারের চিঠির জন্যে। ওই সময়ে পরিহাস, রঙ্গব্যঙ্গমূলক যাই রচনা করে থাকুন না কেন, তাঁর লেখার নিবিড় অবলোকনে বোঝা যায় তাঁর সমস্ত সাহিত্য সাধনার মূলে ছিল কবিতার প্রতি গভীর অনুরাগ। তাঁর আত্মস্মৃতির নানা অংশে স্বরচিত অনেক কবিতার নানারকম উল্লেখ আছে। তিনি কিন্তু শুধু শনিবারের চিঠির সম্পাদকই ছিলেন না। বিভিন্ন সময়ে নানা পত্রিকায় নিয়মিত লিখেছেন। অন্যান্য অনেক পত্রিকা সম্পাদনার কাজও করেছেন। সেই সব পত্রিকায় কিন্তু শনিবারের চিঠির দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়নি। সজনীকান্ত বিশিষ্ট অধ্যাপক সুকুমার সেনকে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস লিখতে অনুপ্রাণিত করেন। একসময় তিনি সুরেশচন্দ্র সমাজপতির যোগ্য উত্তরাধিকার হিসেবে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ পত্রিকাকে নতুন ধারায় স্নাত করেন। সমকালীন সাহিত্যিকদের যতই ব্যঙ্গ-বিদ্রƒপ করে থাকুন না কেন, কালের ব্যবধানে প্রেমেন্দ্র মিত্র, শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়, এমনকী কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গেও নিবিড় সখ্য গড়ে তোলেন। সমালোচক সজনী এবং বন্ধু সজনী যেন দুই আলাদা মানুষ, এ কথা এক সময় বলেছেন স্বয়ং প্রেমেন্দ্র মিত্র। অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তের ভাষায়, ‘আসলে সজনীকান্ত তো কল্লোলেরই লোক, ভুল করে অন্য পাড়ায় ঘর নিয়েছে। এই রোয়াকে না বসে বসেছে অন্য রোয়াকে।’
সজনীকান্তের আরেকটি বড় অবদান বাংলা সিনেমায়। তিনি একসময় বাংলা সিনেমার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন মূলত কাহিনি রচয়িতা, চিত্রনাট্যকার, সংলাপ লেখক ও গীতিকার হিসেবে। বাংলা সিনেমায় যেটুকু অবদান তিনি রেখেছিলেন, তাতেই তাঁর সৃজনশীলতা ও মেধার পরিচয় পাওয়া যায়। প্রমথেশ বড়ুয়া পরিচালিত ‘মুক্তি’ ছবিটি মুক্তি পায় ১৯৩৭ সালে। নিউ থিয়েটার্সের এই ছবিটি সেই আমলে দারুণভাবে দর্শকনন্দিত হয়েছিল। এই ছবির অন্যতম কাহিনিকার হিসেবে সজনীকান্তের কৃতিত্ব অনস্বীকার্য। এই ছবির একটি গান, ‘ওগো সুন্দর মনের গহনে তোমার মুরতিখানি’ লিখেছিলেন সজনীকান্ত দাস। অনেকেই এই গানটির অসামান্য উচ্চতা দেখে মনে করেছিলেন এটি রবীন্দ্রনাথেরই রচনা। এতে সুরারোপ করেছিলেন পঙ্কজকুমার মল্লিক। পরবর্তীকালে সজনীকান্ত বিখ্যাত লেখকদের কাহিনির চিত্রনাট্য লিখতে শুরু করেন। বম্বে টকিজের ব্যানারে তখন কলকাতায় ছবি নির্মাণ সবে শুরু হয়েছে। সে যুগের বিখ্যাত চিত্র পরিচালক নীতিন বসুর পরিচালনায় ১৯৪৭ সালে রবীন্দ্রনাথের ‘নৌকাডুবি’ অবলম্বনে যে ছবিটি নির্মিত হয়েছিল, তার চিত্রনাট্যকার ছিলেন সজনীকান্ত। নীতিন বসুর পরের ছবি ‘দৃষ্টিদান’ (১৯৪৮)-এরও চিত্রনাট্য করেছিলেন সজনীকান্ত। এই ছবিতে উত্তমকুমার প্রথম ছায়াছবিতে অভিনয় করেন অরুণকুমার নামে । বঙ্কিমচন্দ্রের ‘রাধারানী’ নির্মাণ করেছিলেন সুধীশ ঘটক ১৯৫০ সালে। এই ছবির চিত্রনাট্যকার, সংলাপ ও গীত রচয়িতা ছিলেন সজনীকান্ত। ওই বছরেই বঙ্কিমচন্দ্রের ‘রজনী’ অবলম্বনে বম্বে টকিজের ‘সমর’ ছবিটি করেন নীতিন বসু। এরও চিত্রনাট্য ও সংলাপ রচনা তাঁর। এরপর কানন দেবীর শ্রীমতী পিকচার্সের ব্যানারে সে যুগের বিখ্যাত ছবি মেজদিদি (১৯৫০) ছবির সংলাপ রচনা করেন তিনি। এই ছবির গানও তাঁর লেখা। ওই ছবিতে ব্যবহৃত ‘প্রণাম তোমায় ঘনশ্যাম’―সেই আমলের একটি বিখ্যাত গান। ওই শ্রীমতী পিকচার্সেরই আরেকটি ছবি দর্পচূর্ণর (১৯৫২) কয়েকটি গান তাঁরই লেখা। ওই বছরেই মুক্তিপ্রাপ্ত নীরেন লাহিড়ীর পল্লীসমাজ-এর (শরৎচন্দ্র) চিত্রনাট্য ও সংলাপ রচনাও তাঁর। ১৯৫৪ সালে শ্রীমতী পিকচার্সের ব্যানারে নির্মিত শরৎচন্দ্রের নববিধান-এর চিত্রনাট্য ও সংলাপ রচনা তাঁরই। ওই ব্যানারেই নির্মিত দেবত্র (১৯৫৫) ছবির চিত্রনাট্য ও গীত রচনা তিনিই করেন। সিনেমা জগতে বেশিদিনের বিচরণ নয় তাঁর। তবে যেটুকু ছিল তাতেই তাঁর ক্ষমতার পরিচয় মেলে।
অতি আধুনিক ধারার সাহিত্যিকদের প্রতি সজনীকান্তের উষ্মা এবং বিরূপতা ক্রমে প্রশমিত হলেও তিরিশ দশকে কবিতা এবং পরিচয় পত্রিকার প্রতি তাঁর মনোভাব মোটেই ভালো ছিল না। মজার কথা হলো সজনীকান্ত জীবনানন্দ দাশের কবিতার কঠোর সমালেচনা করলেও তিনি কিন্তু ওঁর কবিতার অনুরাগী পাঠক ছিলেন। শ্রী দাশের অকাল প্রয়াণ ঘটলে তিনি জীবনানন্দের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করেছিলেন শনিবারের চিঠির পাতায়। তিনি লিখেছিলেন, ‘কবি জীবনানন্দের কাব্যের প্রতি আমরা যৌবনে যথেষ্ট বিরূপতা দেখাইয়াছি, তাহার দুর্বোধ্যতাকে ব্যঙ্গ করিয়া বহু পংক্তি উদ্ধৃত করিয়া তাহাকে হাস্যাস্পদ করিবার চেষ্টা করিতেও ছাড়ি নাই।’
সজনীকান্তের তীব্র সমালোচনায় শনিবারের চিঠির বিপরীত ধারায় প্রগতিবাদী লেখকেরা নিজস্ব সৃষ্টিকর্মে অনেক বেশি যত্নবান ছিলেন। ওই সব বিদ্রƒপাত্মক সমালোচনার এটাই হয়তো একটা যোগ্য জবাব কিংবা অন্যভাবে বলা যায়, ওই বিরূপতাই এই সব লেখককে স্বধর্মে অবিচল থেকে নিত্যনতুন সৃজনশীল সাহিত্যরচনায় উদ্বুদ্ধ করেছে। পরবর্তীকালে এই লেখকেরাই বাংলা সাহিত্যকে নানাভাবে সমৃদ্ধ করে গেছেন। এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে শনিবারের চিঠির এক সদর্থক ভূমিকা স্বীকার করতেই হবে। আসলে নেতিবাচক সমালোচনারও একটা বাড়তি প্রাপ্তি হলো, লেখকদের সতর্ক করা, আরও আরও সৃজনমূলক কাজে লিপ্ত হতে সাহায্য করা। যাঁরা সত্যিকারের সাহিত্য সৃজনের মনোভাব নিয়ে লেখালেখিতে মনোনিবেশ করেন, ওই সব নেতিবাচক সমালোচনা সাময়িকভাবে মনকে বিষিয়ে তুললেও শেষ পর্যন্ত তাঁদেরকে সৃষ্টিকর্মে প্রবলভাবে উদ্বুদ্ধ করে। সমালোচনার কালিমা তাঁদের সেইভাবে স্পর্শ করতে পারে না শেষ পর্যন্ত। তার প্রমাণ আমাদের চারপাশে অজস্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে।
নানারকম বিচিত্র ও অদ্ভুত ছদ্মনামে শনিবারের চিঠিতে অজস্র লেখা লিখে সজনীকান্ত সেই যুগে ‘নিন্দা বিশারদ’ হিসেবে বিখ্যাত বা কুখ্যাত হন। এই নিন্দুক পরিচয়ের আড়ালে ঢাকা পড়ে গেছে তাঁর অন্যান্য ক্ষমতাগুলো। মাত্র ৬২ বছরের জীবনে যে মানুষটি সেই যুগে বহু মানুষের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছিলেন সেই মানুষটার ১২৫ জন্মবার্ষিকী চলে গেছে এই বছরের ২৫ আগস্ট। নিন্দা, অপবাদ, ব্যঙ্গ এবং কড়া সমালোচকের নির্মোকে যে মানুষটি সৃজনশীলতার এক বহুমাত্রিক ক্ষমতা নিয়ে বাংলা সাহিত্যের অঙ্গনে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন, তাঁর জন্মদিনকে মনে রেখে তাঁকে একটি ব্যর্থ নমস্কার জানিয়ে এই লেখা শেষ করছি।
তথ্যঋণ :
সংসদ বাংলা চরিতাভিধান, কল্লোল যুগ―অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত, কল্লোলের কাল-জীবেন্দ্র সিংহ রায়, আমি যাঁদের দেখেছি―পরিমল গোস্বামী, আত্মস্মৃতি―সজনীকান্ত দাস, নানা প্রসঙ্গে নজরুল―বাঁধন সেনগুপ্ত এবং অথ পথ (১১শ বর্ষ, প্রথম সংখ্যা) পত্রিকায় প্রকাশিত প্রবন্ধ ‘বৃহস্পতি ‘গুরু’ রবীন্দ্রনাথ ও রাবণ ‘ভক্ত’ সজনীকান্ত’―রঞ্জন পরামাণিক।
লেখক : প্রাবন্ধিক, গবেষক



