অনুবাদ গল্পআর্কাইভবিশ্বসাহিত্য

৬ এপ্রিলের মিছিল : মূল : স্টেলা গাইটানো

বিশ্বসাহিত্য : অনূদিত গল্প

বাংলা অনুবাদ : ছন্দা মাহবুব

[স্টেলা গাইটানো দক্ষিণ সুদানের একজন সাহিত্যিক। তিনি ১৯৭৯ সালের ১৭ নভেম্বর খার্তুমে জন্মগ্রহণ করেন। গাইটানো মূলত আরবি ভাষায় লেখেন, যদিও তার শৈল্পিক কাজগুলোতে সুদানের দক্ষিণ অঞ্চলের মানুষদের সমস্যা, যুদ্ধ, অবক্ষয়, স্থানচ্যুতি ও বৈষম্যবিষয়ক বিষয়বস্তু অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উঠে আসে। ২০১১ সালে দক্ষিণ সুদান স্বাধীনতার পর, তিনি নতুন দেশের জীবনেরও গল্প বলতে শুরু করেন। তার জনপ্রিয় রচনা-সংগ্রহগুলোর মধ্যে আছে Withered Flowers, The Return এবং উপন্যাস EdoÕs Souls যা সমালোচকদের কাছেও ভালো প্রতিক্রিয়া পায়। বর্তমানে তিনি জার্মানিতে নির্বাসিত অবস্থায় রয়েছেন।

 [সুদানের বিপ্লবে ৬ এপ্রিল, ২০১৯ একটি ঐতিহাসিক দিন হিসেবে চিহ্নিত। এই দিনে সুদানি পেশাজীবী সংস্থার (Sudanese Professionals Association) আহ্বানে হাজার হাজার মানুষ রাজধানী খার্তুমে রাস্তায় নামে এবং সামরিক সদর দফতরের সামনে বিশাল সিট-ইন আন্দোলন (sit-in) শুরু করে। আন্দোলনকারীরা শান্তিপূর্ণভাবে ‘স্বাধীনতা, শান্তি ও ন্যায়’―এই স্লোগান তুলে ধরেন। এই সিট-ইন দ্রুত বিপ্লবের মোড় ঘুরিয়ে দেয়; দেশের সব স্তরের মানুষ এতে যোগ দেয় এবং সেনাবাহিনীর ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করে। এর ফলেই মাত্র কয়েক দিন পর, ১১ এপ্রিল, ২০১৯-এ, সেনাবাহিনী প্রেসিডেন্ট ওমর আল-বশিরকে ক্ষমতাচ্যুত করতে বাধ্য হয়। ৬ এপ্রিলের আন্দোলন তাই সুদানের বিপ্লবের টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে বিবেচিত হয়।]

আর দশটা দিনের মতো খুব স্বাভাবিক ছিল না আজকের সকাল…এক বিভ্রান্তিকর নীরবতা বাতাসকে ভারী করে রেখেছিল। এ এমন এক পরিস্থিতি যাকে বলা যায় সঠিক মুহূর্তটির জন্য অপেক্ষায় থাকা। শিকারি এবং শিকার যেমন সতর্ক দৃষ্টিতে পরস্পরের দিকে তাকিয়ে থাকে, আক্রমণের উপযুক্ত মুহূর্তটির অপেক্ষায়, ঠিক তেমন। হুসাম ব্যস্তভাবে খুঁজছিল কোন অ্যাঙ্গেল থেকে নিখুঁত ছবি তোলা যেতে পারে। সউক আরাবি এলাকার একটা বিল্ডিঙের ছয় তলার মানুষে ঠাসা রুমের ভেতরে ছোট্ট একটা জানালার সামেন দাঁড়িয়ে ছিল সে। খুব সাবধানে যন্ত্রপাতিগুলো ঠিকঠাক করা শুরু করল। ক্যামেরাকে তাক করল খার্তুম শহরের কেন্দ্র বরাবর, যেখানে এখন সর্বোচ্চ নিরাপত্তা জারি করা হয়েছে। সকাল দশটা থেকে গ্রেফতার শুরু হয়েছে, অর্থাৎ মিছিল শুরু হওয়ার পূর্বনির্ধারিত সময়ের পাক্কা তিন ঘণ্টা আগে। অনেকেই শহরের এই কেন্দ্রস্থল থেকে চলে যেতে বাধ্য হয়েছিল, কারণ জনসমাবেশ ঠেকাতে পুলিশ, সাদা পোশাকের নিরাপত্তাকর্মীরা মানুষদের পিটিয়ে ছত্রভঙ্গ করছিল।

হুসাম তার প্রথম ছবি তুলল, স্নাইপারের মতো নিখুঁতভাবে ক্যামেরা ফোকাস করে। এক ছবিতে দেখা গেল, এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে, রাস্তার কফিবিক্রেতা মেয়েটির দেওয়া কফির কাপে প্রথম চুমুক দেওয়ার আগেই। কফি বিক্রেতা মেয়েটির কফির ফ্লাক্স আর সব জিনিসপাতি লাথি দিয়ে চারদিকে ছড়িয়ে দেওয়া হলো, আর তাকেও বাধ্য করা হলো এই জায়গা থেকে চলে যেতে। আরেকটি ছবিতে দেখা গেল―তিন তরুণীকে জোর করে তুলে নেওয়া হচ্ছে, একটি নম্বরবিহীন গাড়িতে। গাড়িটা রওনা হয়ে গেল অজানা গন্তব্যের উদ্দেশ্যে। কিছু মানুষ শূন্যে হাতের লাঠি উঁচু করে ধরে আছে আর কিছু লাঠি তাদের পিঠে পড়ছে বৃষ্টির মতো।

‘এইবার আমরা শুরু করেছি, হ্যাঁ, এটাই লক্ষ লক্ষ মানুষের মিছিলের আগের দৃশ্য। এইবার দুনিয়া দেখুক আমাদের কারাগারের জেলাররা কীভাবে কাঁপছে।’ ‘মার্চেস উইদাউট বর্ডারস’ নামের একটি পেজের পোস্ট বাটনে ক্লিক করতে করতে হুসাম বলল। সে তার ছবির উপরে শিরোনাম যোগ করে দিল, ‘সউক আরাবি এলাকায় এই মুহূর্তে একজন তরুণ এবং তিন তরুণীকে গ্রেফতার করা হলো।’ খবর ছড়াতে খুব বেশি সময় লাগল না। এই খবর আর ছবি বিপ্লবীদের আরও সংঘবদ্ধ আর দৃঢ় করে তুলল যেন।

হুসামের বয়স বিশের কোঠায়। তীক্ষè চেহারা, বুদ্ধিদীপ্ত চোখ জ্বলজ্বল করছে বিদ্রোহের আগুনে। ব্যক্তিগত স্বাধীনতাকে বাধা দেয় এমন অনেক পারিবারিক আইন, নিয়মকানুনকে সে তুচ্ছ বলে অবজ্ঞা করে বেরিয়ে এসেছে। তার কাপড়চোপড়, সাজ পোশাক সবই তার বাবার কাছে খুব বিরক্তিকর বিষয় ছিল। ঢোলা গেঞ্জি, কোমরের কাছ থেকে ঝোলা ঢিলেঢালা প্যান্ট হাঁটুর কাছে এসে চাপা হয়ে গেছে, ঘন চুল খুব যত্ন করে সময় নিয়ে এলোমেলো স্টাইল করে রাখা। এখন তার মাথার চুল দেখতে লাগছে যেন শুকনো কোনও প্রবাল প্রাচীর, মনে হচ্ছে শুকনো বাতাসের ঝড় বয়ে গেছে চুলের মধ্য দিয়ে।

তার মা মাঝে মাঝেই খুব রাগ করতেন। মাথা নিচু করে ফোন টিপতে টিপতে হুসাম শুনে যেত―দীর্ঘক্ষণ ফোনের দিকে তাকিয়ে থাকার কিংবা রাত জেগে কি-বোর্ডে টাইপ করার ক্ষতিকর প্রভাবের দীর্ঘ বক্তৃতা। কিন্তু হুসাম তার নিজস্ব জগতেই থেকে যেত, যে জগৎ পুরোপুরি আটকে গিয়েছিল বিপ্লবের মধ্যেই। বিপ্লব হয়ে উঠেছিল তার একমাত্র আবেগ আর আকাক্সক্ষা। নিজেকেই ফিসফিস করে সে শোনাতো, ‘বিপ্লব মহান, বিপ্লবই মুক্তি। বিপ্লব প্রতিশ্রুতি দেয় যা কিছু সুন্দর আর ভালো তার।’ মজার বিষয় হলো তার এইসব কাজের জন্য সে কারও কাছে দায়বদ্ধ ছিল না কিংবা কারও দ্বারা নির্দেশিত হয়েও কিছু করত না।

যেসব কাজকে তার ন্যায় মনে হতো, মনে হতো করলে বিপ্লবের জন্য ভালো হবে, সে সেগুলোই করত। বিভিন্ন লোকেশন থেকে ছবি তুলত সে। যে ছবিগুলো আন্দোলনকে বেগবান করতে পারে, উৎসাহ বাড়াতে পারে এমন ছবি। তার একটা ছবি ছিল আন্দোলনের এক নারীর, যিনি টিয়ার গ্যাস গ্রেনেডকে তুলে লঞ্চারে রাখছিলেন। ক্ষোভকে উস্কে দেওয়ার মতো ছবিও ছিল। যেমন একদল মুখোশ পরা এজেন্ট ছোট এক বাচ্চাকে চাবুক দিয়ে মারছে। ব্যথা এবং রাগ জাগানো ছবিও ছিল। যেমন রক্তের মধ্যে পড়ে থাকা শহিদের দেহ। বিরক্তি এবং ঘৃণা বাড়ানোর মতো ছিল বেশ কিছু ছবি। যেমন নিরাপত্তাকর্মীরা বিপ্লবীদের খোঁজে বাড়ি বাড়ি তল্লাশি করছে, বাড়িঘরের জিনিসপত্র আছড়ে ফেলছে, তাদের প্রতি অসম্মান করছে, বাড়িঘরের পবিত্রতা নষ্ট করছে। আবার মজার, আনন্দের ছবিও ছিল, যেমন ছোট একটা বাচ্চা মেয়ে একজনের কাঁধে বসা, চিৎকার করছে ‘খুনির শাসন ধ্বংস হোক’। অনেক ছবি ছিল খুব হাসির, যেমন নিরাপত্তাকর্মীদের দুটো গাড়ি পরস্পরকে ধাক্কা লেগে অচল হয়ে গেছে আর নিরাপত্তাকর্মীরা পালাচ্ছে। আবার বন্দিদের নিয়ে যাওয়া প্রিজন ভ্যানের ছোট্ট জানালা দিয়ে বন্দি বিপ্লবীর বিজয়চিহ্ন দেখানোর মতো দারুণ উৎসাহের ছবিও ছিল।

হুসামের মনে হতো ছবির মাধ্যমে মানুষের মধ্যে বিপ্লবের আগুন জ্বালিয়ে দিয়েই সে বিপ্লবের পক্ষে কাজ করতে পারবে। তার প্রতিটি ছবিই তার সমস্ত দিনকে আনন্দে ভরিয়ে তুলত। ‘সুদানিজ বিদ্রোহী’ এই নামেই সে পরিচিত ছিল, যদিও হুসামের নিজের কাছে অন্য বিপ্লবী থেকে ভিন্ন কিছু ছিল না সে। সকল বিপ্লবীর চোখেই নিজেকে দেখতে পেত হুসাম। নিজে কখনও গ্রেফতার না হলেও অসংখ্য বন্দির সাথে অসংখ্যবার জেলে যেতে হয়েছিল তাকে। তার বাড়ি কখনও তল্লাশি করা হয়নি, তবু যে কারও বাসায় তল্লাশির নামে পুলিশের ঢুকে পড়াকে সে নিজেরও অপমান বলেই মনে করত। নিজের গায়ে গুলি লাগেনি কখনও, তবু প্রতিটি শহিদের মৃত্যুর সাথে সাথে প্রতিদিনই মৃত্যু হতো তার। 

মুক্তির উচ্ছ্বাসকে সে অনুভব করেছিল বলেই মন থেকে ভয় মুছে গিয়েছিল। পুলিশ কিংবা মুখোশ পরা নিরাপত্তাকর্মী কাউকেই সে আর ভয় পেত না। ছবি তোলার সব সরঞ্জাম আর স্মার্ট ফোন নিয়ে প্রতিদিন রাতে যখন সে বাসায় ফিরত তার মনে হতো এই যে বেঁচে আছে এই তো বড় পাওয়া। প্রতিদিন বেঁচে থাকাই তো উৎসব করে উদযাপন করার মতো বিষয়। তার গ্রেফতার কিংবা মৃত্যুর খবরে তার মা ভেঙে পড়তে পারেন―এমন চিন্তাতেও তার ভয় হতো না। ‘সকল মায়ের ব্যথা সমান, সকল মানুষের অপমান সমান, এবং সকল মানুষের ভয়ও সমান হওয়া উচিত যাতে করে আমরা নির্দ্বিধায় বৃহত্তর স্বার্থে কাজ করতে পারি।’ নিজেকে এইসব বলেই বোঝাত সে।

এই যে সকলের চোখের আড়ালে লুকিয়ে কাজ করা―এর জন্য হুসামের প্রায়ই মনে হতো সে তার সাইজের থেকে ছোট আঁটসাঁট কোনও পোশাক পরে আছে, যা তার বিপ্লবী সত্তার সাথে যায় না। তবে সেই পোশাকের চারদিকে ছিঁড়ে গেছে এখন, ঠান্ডা বাতাস ঢুকছে ফুটো দিয়ে, তার মনে হচ্ছে যে কোনও মুহূর্তে উড়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে সে। ভয় আর সীমাবদ্ধতার আঁটসাঁট অনুভূতি থেকে মুক্ত হয়ে বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে সে। আন্দোলনে তার অংশগ্রহণের প্রভাব কী হতে পারে, কিংবা ‘সুদানিজ প্রফেশনালস অ্যাসোসিয়েশনের’ শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য ডাকা সমস্ত বিক্ষোভ এবং মিছিলে তার অংশগ্রহণের প্রমাণ মুছে ফেলার বা লুকিয়ে ফেলার চাপ ঝেড়ে ফেলেছে সে। মায়ের বাজপাখির মতো দৃষ্টি থেকে সে এখন মুখ ভয়ে ফিরিয়ে নেয় না। যে দৃষ্টি নিশ্চিত ভাবেই বলে দেয় যে তিনি কোনও না-কোনও প্রমাণ পেয়ে গেছেন―হয়তো কোনও বিপ্লবী কবিতা, আসন্ন বিপ্লবের তারিখ ঘোষণা করা পোস্টার। কিংবা হয়তো কিছু খুব আধুনিক রেকর্ডিং সরঞ্জাম, বিভিন্ন ধরনের এবং আকারের ক্যামেরা, হালকা স্পোর্টস জুতা, ব্যাকপ্যাক, জিন্স, টিয়ার গ্যাসের গন্ধ দূর করার জন্য ভিনেগার, স্প্রে পেইন্টের ক্যান এবং তার শরীর থেকে আসা পোড়া টায়ারের গন্ধ।

তাকে নিয়ে পরিবারের হতাশা, সমালোচনাকে সে এড়াতে শুরু করেছিল। নানাভাবেই তার পরিবার তাকে আন্দোলন  থেকে সরাতে চেষ্টা করেছিল, কখনও ভয় দেখাতো এই বলে যে বিক্ষোভ সমাবেশে বড় ধরনের গ্যাঞ্জাম হবে। কখনও আবার তার এই অনুভূতিকে খাটো করেও দেখত তারা, বলত এই সবই যৌবনের পাগলামি। কখনও কখনও পরিবার চেষ্টা করত তার দুর্বল জায়গায় আঘাত দিয়ে নিবৃত্ত করতে, বলত তার বাবা-মায়ের মৃত্যুর কারণ হবে এই ছেলে, নিশ্চিতভাবেই তাদের একজনের হার্ট অ্যাটাক ঘটাবে হুসাম। হুসাম জানত রাস্তায় শুধু মিলিটারির সহিংসতা না, বরং পরিবারের চাপও তাকে মোকাবিলা করতে হবে। সে খুব সতর্কভাবে চেষ্টা করত গ্রেফতার এড়ানোর। কারণ গ্রেফতার হলে হয়তো খুনি শাসক খুশি হবে কিন্তু তার পরিবার চিন্তায় পড়ে যাবে, বিপদে পড়ে যাবে। তাই খুব গোপন রেখেছিল সে তার কাজকর্ম।

অনেক ক্লান্তি আর অনেক রাত জাগার পর এপ্রিলের ছয় তারিখের সকাল এসেছিল। আন্দোলন ততদিনে অনেক জোরদার আর সুপরিকল্পিত হয়েছে। গোপন এবং চোরাগোপ্তা কাজ অনেক বেড়ে গেছে ফেসবুক আর হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপগুলোতে। ছয়তলার ছোট্ট ঘরে জানালার সামনে দাঁড়িয়ে হুসাম স্মৃতি হাতড়ানো ভুলে ফের বাস্তবে ফিরে এল, বাজপাখির মতো প্রস্তুত, সামনের চত্বরে যা কিছু ঘটতে যাচ্ছে তা দেখার জন্য, বিশেষ করে ১:৩০ মিনিটে যে সমাবেশ হওয়ার কথা তার জন্য। চারপাশ থেকে চলে আসা মানুষের ভিড় সে অনুভব করছিল, যদিও ৬ তলা বিল্ডিং এর উপরে এই মুহূর্তে সে একা। বাতাসে এক অদ্ভুত শক্তি ভরে আছে, সেই শক্তিই মনে হয় সকল মানুষকে যুক্ত করছিল। জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তার নিঃশ্বাস দ্রুত হতে থাকে। প্রতিটি মুহূর্ত গুনছে সে, সাথে সাথে তার হৃদস্পন্দনও। তারপর তীক্ষè এক কণ্ঠস্বর ভেসে আসে, যেন শ্বাসরুদ্ধকর বাতাসকে ছিন্ন করে কোনও তরবারি বিক্ষোভ শুরুর ইঙ্গিত দিল। উৎসাহী জনতা উজ্জীবিত হয়ে ওঠে। গাড়ির উপর দাঁড়িয়ে থাকা এক যুবক চিৎকার করে বলে ওঠে : ‘মুক্তি, শান্তি, ন্যায়বিচার! বিপ্লবে আস্থা সবার!’

সমস্ত চত্বর মানুষে ভরে গেল। অথচ একটু আগেও সকলে ভাব করছিল যেন কোনও কাজে এই চত্বরে এসেছে। মানুষের সম্মিলিত চিৎকারে রাস্তার নীরবতা খানখান হয়ে ভেঙে পড়ছে। ঘূর্ণি বাতাসের মতো স্লোগান উঠছে আকাশ জুড়ে, তারপর ঘুরে ঘুরে আঘাত করছে প্রতিটা দরজায়, জানালায়, ভেদ করে যাচ্ছে দেয়াল, লাফিয়ে উঠছে বিল্ডিঙের উপর, ঝড়ের মতো ঢুকে পড়ছে ঘরে, অফিসে, ঢুকে পড়ছে মানুষের চামড়ার ছিদ্র দিয়ে, শিরার রক্ত দিয়ে বয়ে চলছে, যতক্ষণ না হৃদয়ে গিয়ে স্থির হয়, একদম হৃদয়ের মাঝখানে। 

ক্যামেরার পিছনে হুসামের চোখে পানি টলমল করছে। ফিসফিস করে নিজেকেই সে বলল, ‘কী সাংঘাতিক সাহস, কী সাহস।’

পটাপট ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে এবং বিভিন্ন চ্যানেলে সে তার ছবি আর ভিডিও পোস্ট করা শুরু করল। কখনও ক্যামেরার লেন্স দিয়ে দেখছে, তো কখনও খালি চোখে দেখছে। আন্দোলনকারীদের সাথে মাঝে মাঝে স্লোগান দিচ্ছে অসম্ভব উৎসাহ নিয়ে, ‘মুক্তি, শান্তি, ন্যায়বিচার! বিপ্লবে আস্থা সবার!’

দাঙ্গা পুলিশ পাগল হয়ে গেছে। লাঠিচার্জ, গুলি, টিয়ার গ্যাস, গ্রেফতার সব চলছে। সমস্ত মানুষ হাঁটু গেড়ে বসে পড়েছে, হাতে তালি দিচ্ছে, আকাশের দিকে হাত তুলে ঢেউয়ের মতো নাড়ছে, প্রতিজ্ঞা তাদের চোখে মুখে। সকলে একসাথে স্লোগান দিচ্ছে, ‘আমাদের বিক্ষোভ শান্তিপূর্ণ, আমরা শান্তি চাই!’ তাদের সাথে সাথে হুসামও স্লোগান দেওয়া শুরু করল ‘শান্তি চাই, শান্তি চাই।’ মনে হলো তাদের এই শান্তি আহ্বান নিরাপত্তা বাহিনীকে আরও উসকে দিল। তারা বিক্ষোভকারীদের উপর চড়াও হলো, স্টান গ্রেনেড, স্নাইপারদের গুলি, গ্রেপ্তার, মারধর, লাঠিচার্জ নিয়ে। মুহূর্তের মধ্যে বিদ্রোহীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল, ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। হুসামের মন ভেঙে গেল। ‘ঈশ্বর, আজকের দিনকে ব্যর্থ হতে দিও না।’ দুর্বল মুখ হাতের উপরে রেখে বলল সে। হতাশা গ্রাস করতে শুরু করেছে তাকে।

তারপর সহসাই আরও জোরে চিৎকার শোনা গেল। এবারে অনেক জোরে, অনেক শক্তিশালী। হুসাম ফের তার ক্যামেরার পিছনে সরে এল। পুলিশের গাড়ি, নিরাপত্তাকর্মীরা ঘিরে ধরেছে মানুষদের। প্রায় অচল করে দিয়েছে তাদের, যেন এক অসহায় গ্রামে আছড়ে পড়ছে শক্তিশালী ঢেউ। অসংখ্য মানুষের চিৎকার, সম্মিলিত স্লোগানে থমকে গেছে বন্দুকের গুলি। সবকিছু ছাপিয়ে শোনা যাচ্ছে বধির করে দেওয়া চিৎকার―‘মুক্তি, শান্তি, ন্যায়বিচার! বিপ্লবে আস্থা সবার!’

আনন্দে লাফিয়ে উঠল হুসাম। সকলে, সবকিছু তাল মিলালো তাদের সাথে―মানুষ, উঁচু বিল্ডিং, গাছ, কুকুর-বিড়াল, রাস্তাঘাট, সেতু, টু নাইলস, রাস্তার পিচ, মাটি, শহিদ ও আক্রান্তরা, আহতরা, সবাই এক হয়ে চিৎকার করে উঠল : ‘মুক্তি, শান্তি, ন্যায়বিচার! বিপ্লবে আস্থা সবার!’

ক্যামেরার লেন্সের মধ্য দিয়ে হুসাম দেখতে পাচ্ছিল জনতা কীভাবে সেনাবাহিনীর প্রধান কার্যালয়ের দিকে ছুটে চলছে―মিছিলের পূর্বনির্ধারিত পথ। জনগণের কাছে অবিলম্বে ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবিতে একটি বিবৃতি প্রদান করার কথা ছিল। সে দেখল জনতার সেই বিশাল ঢেউয়ের কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হচ্ছে চত্বরের নিরাপত্তা বাহিনী।  রাস্তা, অলি-গলি উপচে পড়ছিল মানুষের ভিড়ে। মাথা উঁচু করে, শিরদাড়া খাঁড়া করে দাঁড়িয়েছে জনগণ এবং তাদের চোখ শুধু সেনাবাহিনীর প্রধান কার্যালয়ের দিকে―তাদের লক্ষ্যবস্তু। তারা এগিয়ে চলছে একসাথে, পাশাপাশি, হাতে হাত রেখে, তাদের আত্মা আজ একসুরে বাঁধা। অবশেষে যখন প্রধান কার্যালয় তাদের নজরে এল, তারা তার দিকে দৌড়াতে শুরু করল। একটি গাড়ি প্রধান রাস্তার মাঝখানে এসে থেমে গেল। ইঞ্জিন বন্ধ করে বেরিয়ে এল একজন তরুণী। পুলিশের গাড়ির পথ আটকে দিয়েছে সে। অন্যরাও এগিয়ে এল একই কাজ করতে। দ্রুতই রাস্তায় অনেক গাড়ি থেমে গেল, পুলিশের পথ আটকে দিয়, যেন এটি আগে থেকেই পরিকল্পিত ছিল। মেয়েটি এবার তার গাড়ি থেকে সুদানের পতাকা বের করে বাতাসে নাড়তে শুরু করল আর চিৎকার করে বলল, ‘পদত্যাগ… পদত্যাগ।’ তারপর সেও ভিড়ের সাথে উড়ে চলল প্রাধান কার্যালয়ের দিকে।

সমস্ত এলাকা থেকে বের হয়ে এসেছে সুদানের মানুষ―তাদের বাসা থেকে, অফিস থেকে, আকাশ থেকে, পৃথিবীর ভেতর থেকে, জঙ্গল থেকে, নদী, মরুভূমি, গুহা এবং পাহাড় থেকে; এমনকি শহিদরাও হাঁটছে তাদের সাথে। ঢেউয়ের পর ঢেউ, হালকাভাবে হাঁটছে সবাই, ছায়াহীন, সুন্দর মুখে হাসি ফুটিয়ে। সকলের গন্তব্য সেনাবাহিনীর প্রধান কার্যালয়―আর্মি জেনেরাল কমান্ড।

ক্যামেরা এবং অন্যান্য যন্ত্রপাতি পিঠের ব্যাগে ভরে হুসামও নেমে এল নিচে। ভিড়ের মধ্যে একজন হয়ে গেছে সে। তাকে আগলে আছে ফুঁসে উঠা মানুষের ভিড়। সে দেখতে পাচ্ছিল মানুষের এতদিনের ভয় কীভাবে আজ এই রাস্তায় মরে যাচ্ছে, এতদিনের অপমান কীভাবে জনগণের পায়ের তলায় পিষ্ট হয়ে যাচ্ছে, মৃত্যু নম্রভাবে দাঁড়িয়ে আছে বন্দুকের পাশে। বন্দুকধারী নিরাপত্তাকর্মীরা ধীরে ধীরে খাটো হয়ে যাচ্ছে জনগণের ফুলে ফেঁপে উঠা মূর্তির সামনে, ধীরে ধীরে তারা সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে তাদের নিজেদের বুটের নিচে।

হুসাম নিজেকে আড়াল না করে, কোনও বিল্ডিং-এ লুকিয়ে না থেকেই ছবি তোলা শুরু করল। স্বাধীনতা পৃথিবীর সব থেকে সুন্দর বিষয়, শৃঙ্খল ভেঙে ফেলা সব থেকে সুন্দর। তার নিজেকে অনেক বড়, বিশাল মনে হচ্ছিল, যেমনটা হয়তো অন্য বিপ্লবীদেরও মনে হচ্ছিল। সে ছবি তুলছিল―জনগণের কাফেলা পেরিয়ে যাচ্ছে, ব্রিজ, গ্রাম, শহর আর সমগ্র দেশ, এগিয়ে চলছে সেনাবাহিনীর প্রধান কার্যালয়ের দিকে।

সেনাবাহিনীর প্রধান কার্যালয়ের সামনে, জনতা চিৎকার করছিল সামাজিক কাঠামো পুনরুদ্ধারের দাবিতে। তারা স্লোগান দিচ্ছিল ‘অহংকারী বর্ণবাদী তুমি, দারফুর করেছো পুরো জন্মভূমি!’ জনতা প্রথমবারের মতো দেশের হারানো দক্ষিণ অর্ধেকের (দক্ষিণ সুদান) জন্য চিৎকার করছিল, বলছিল : ‘বর্ণবাদী খুনি জবাব দাও, দক্ষিণ সুদান কই গেল ?’ শহিদদের ভাই এবং বন্ধুরা চিৎকার করে বলছিল : ‘শহিদের রক্ত আমার রক্ত। শহিদের মা আমার মা।’ এবং তারা সকলেই, অহিংসার স্বার্থে চিৎকার করে বলেছিল : ‘খুনি তুমি, দশজন কিংবা একশজনকে হত্যা করলেও আমাদের বিপ্লব শান্তিপূর্ণই থাকবে।’

হুসামের পিপাসা পেয়েছিল খুব, ক্ষুধাও পেয়েছিল। তার মনে হচ্ছিল এখনই মাথা ঘুরে পড়ে যাবে। সেই সময়ই সে শুনতে পেল তার মা তার নাম ধরে ডাকছেন। মা মাথার উপরে ছোট্ট একটা পতাকা তুলে নাড়াচ্ছেন, যেন চাইছেন পুরোনো সেই সব করুণ দিনের স্মৃতি মুছে ফেলতে। তার এক হাতে ছোট একটা ঝুড়িতে খাবার আর পানির বোতল। হুসামের বাবা খুব সতর্কভাবে চোখের পানি মুছে ফেললেন, ছেলের জন্য গর্বের অশ্রু। ছেলের দিকে তাকিয়ে বিজয়চিহ্ন দেখালেন। হুসাম তার ক্যামেরাটি তাদের দিকে তাক করল। একটি দুর্দান্ত কিন্তু ক্লান্তিকর দিনের শেষ ছবি তোলার জন্য। সবাই তখন সবেমাত্র ঘোষিত অবস্থান কর্মসূচির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল।

সচিত্রকরণ : রজত

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button