আর্কাইভকবিতা

কবিতা

মঈনউদ্দিন মুনশী

ঘরের ঋষি

আমি সেই অলৌকিক চাই যা আমাকে অসাধারণ বানাবে,

পুনর্জীবিত করবে এক বাঁকা নদীতে।

পাহাড়ের ঋষিরা গত হয়েছে,

এটা একটা নতুন দেশ।

নারীরা মরুভূমি ভাঁজ করে কম্বল বানিয়েছে।

আড়াআড়ি সেলাই আকারে উড়ন্ত পাখিদের ঝাঁক মহার্ঘ।

শূন্য-সংযোজনের সিদ্ধপুরুষ মহার্ঘ।

গুল্ম ও সাদা পদক্ষেপ মহার্ঘ।

সীমান্ত ও এর ৭টি নাম,

আশু প্রত্যাবর্তন; কলের পানি এবং পুণ্য নামে শুরু।

আমি সেই অলৌকিক চাই যা আমাকে অসাধারণ বানাবে,

তাঁর হাতের উল্টো পিঠে চুমু দিতে।

আমি বৃষ্টির কাছে প্রার্থনা করি

সব উন্মুক্ত করতে এবং ভূপৃষ্ঠের নামকরণ করতে।

আমার প্রিয় আশ্রয় হচ্ছে আমার মা।

হৃদয় শব্দ চাপা দেয় বাগ্মীর মতো।

এখানে কোনও বাগান নেই, শুধু ভিন্ন সময়।

গাছের পাতাগুলো খোলা হাতের মতো

সময়োচিত সমর্থনের জন্য প্রস্তুত।

আমি সেই অলৌকিক চাই যা আমাকে অসাধারণ বানাবে,

কালো পাখিদের সাথে উড়ে যেতে।

ভূমধ্যসাগর এক বলিষ্ঠ উচ্চারণ।

নীলনদ এক বলিষ্ঠ উচ্চারণ।

আমার পিতা এক বলিষ্ঠ উচ্চারণ,

তাঁর শ্যামল দেশ এক গীতিনাট্য।

……………….

নাসরীন নঈম

শুধু খেলা

পথও তাদের মতো যেন কী গভীর এই খেলা

বউপাগলা ভাব দেখালে হয় না কিছুই

শক্তির ভারে অবনত হয় ভাষা

আমাকে নিয়ে নিরুদ্দেশ যাচ্ছে।

চতুর্থীর চাঁদ সরে যায়

অন্ধকারে শুরু হয় অলৌকিক খেলা

মুঠোর মধ্যে চলে আসে আলস্যের প্রহর

সেই মেয়েটির বুকে এখন রাত্রি খেলা করে।

আর কেন অপেক্ষায় থাকো

নেভা উনানের ম্লান ছায়া সারা মুখে

নিঝুম নির্জন গলি, অনেক রাত হলো দোর দাও,

কেন আর অপেক্ষার লুকোচুরি খেলা।

………………………………..

সোহরাব পাশা

যে তুমি অন্য বাড়ি

গন্তব্যে নিয়তই নির্জন বিভ্রম-একা

মানুষের ছায়াসঙ্গী নেই

পথগুলি তার প্রিয় নাম ভুলে যায়,

ওই শূন্য পবনের বৈঠা জলের তর্জমা করে―

উজানের স্রোতে যায় শব্দহীন ঢেউ;

তোমাকে আঁকতে গিয়ে এঁকেছি

মেঘের নারী মধুর ভুল,

বসন্ত দুপুর ওড়ে

পাতা ঝরে

স্বপ্ন পোড়ে

ছাই ওড়ে যায় শ্মশানের;

সন্ধে নামে খুচরো জীবনের ভিড়ে

দাঁড়িয়ে থাকে না কেউ নিঃশ্বাসের পাশে

পৃথিবীতে কেবল মানুষই কষ্ট পায়

ভালোবেসে,

গূঢ় নিঃশ্বাসের লতাগুল্ম ভাঙা আলো

বিষাদের নির্জন আঙুল

একজোড়া চোখ গভীর সমুদ্রভাষা―

ক্ষিপ্র নদী

খেয়ার রসিক মাঝি হেঁটে হেঁটে অন্য ঘাটে যায়

প্রাচীন আঁধারে তোমার ছায়ার স্নিগ্ধ

শব্দ-ঘ্রাণ

মুগ্ধতামুখর হাসি ভেঙে পড়ে

ওপারে জলের গভীরে।

……………………………………..

রেহমান সিদ্দিক

কবিজীবন

এ কবিজীবন আমি কুড়িয়ে পেয়েছি      

অবজ্ঞার পথ ধরে হাঁটতে-হাঁটতে

কালের ধুলোয় তাকে কুড়িয়ে পেয়েছি                                     

একটি সিকিতে ছিল গোপনে লুকিয়ে            

আর এক আধুলিতে-ধুলোয় গড়াতো!                                    

ঝেড়ে-মুছে যত্ন করে পকেটে রেখেছি            

একদিন পাখি হয়ে উড়ে যায় বনে…

অক্ষরের তৃণ নিয়ে ফের ফিরে আসে                      

আর বোনে বাসা এই শরীরের গাছে         

দিনে-দিনে বড় হয় ভাবের চারাটি:          

দেয় ফুল, দেয় ফলÑতবু বেহুঁশ…                

দু হাতে খরচ করি, করি অপচয়!              

মাতাল হয়েছি বলে কেবল ওড়াই…      

Ñএভাবেই কেটে যায় কবির জীবন         

……………………………………………..

সরকার মাসুদ

অরুন্তুদ সময়

বড় বড় দেশগুলো শান্তিসম্মেলনে যায়

মোড়লের মতো চিৎকার করে বড় বড় দেশ

তারা আবার যুদ্ধ লাগিয়ে দেয়

গোলা-বারুদ বিক্রি করবে বলে!

এটা এমন এক সময়

যখন গানের পাখির কণ্ঠে শেয়ালের ডাক

আর আমরা চাঁদের লুকানো ক্ষত দেখে ফেলি

এটা এমন এক পরিস্থিতি

যখন মৃত বদমাশের চোখ এসে বসে

জীবিত সন্তের চোখে!

এখন অদ্ভুত গরম হাওয়া আসে

গোপন ধুলায় ভরে দিতে আমাদের বুক।

…………………………………………………..

শশিভূষণ

টিথোনাস, অরোরার প্রতি

অমরত্ব চাই না; ফিরিয়ে দাও আমার যৌবন।

বার্ধক্যের নিষ্ঠুর পীড়নে ক্লিষ্ট এ জীবন;

রুগ্ণ-জীর্ণ পরমায়ুর চেয়েও লক্ষ গুণ শ্রেয়

যৌবনের ক্ষণিক অগ্নিসিনান।

ভুল আমিও করেছি; সাজাতে চেয়েছি বাসর-বিছানা অমরায়।

কিন্তু যে-আলোতে সাজাবো সে-ঘর তারও তো শেষ আছে;

তারও-যে দিনশেষে চলে যেতে হয়।

তখন শুনিনি কারও নিষেধ-বারণ;

এতটাই উদ্ধত ছিলাম, একগুঁয়ে।

ভুলে গেছি প্রতিজ্ঞা আমার; তার শাস্তি

দিতেছেন বিধি।

এ জীবন মানুষের―দেবতার নয়।

মৃত্যুই অমোঘ, একমাত্র সত্য জীবনের;

নশ্বর মাটির দেহ মাটিতে মিলাবে, এটাই নিয়ম।

ভাবিনি কখনও―তুমি দেবী, অসম্ভব এ মিলন;

কী করে মিশবে মনুষ্য-স্বভাব তোমাদের সাথে।

ছিলো লোভ, আমিও অমর হবো―

অশেষ জীবন পাবো তোমাদের মতো।

মৃত্যু থেকে চেয়েছি পালাতে;

কী নির্বোধ আমি, চেয়েছি অন্যরকম হতে।

আজ মৃত্যু ফিরায়ে নিয়েছে মুখ―নিয়তি ছাড়েনি তার পথ!

মৃদু নরম বাতাসে মেঘ সরে গেলে নিচের আঁধার ভূমি চোখে পড়ে;

ডানা মেলে উড়ে আসে সুদূর অতীত।

দেখি, ফেলে আসা স্বর্গরাজ্য পৃথিবী আমার

সবুজ মাঠেতে যার স্বর্ণশস্য ফলে।

সেখানে রয়েছে কত সুখী মানুষেরা;

সুখী তারা, কারণ তাদের মৃত্যু আছে―আছে মরবার অধিকার।

মৃতেরাও কত সুখী; শান্ত শিশুটির মতো

সমাধিতে শুয়ে থাকে।

অথচ আমার মৃত্যু নেই―আছে শুধু 

দুর্বিষহ বেঁচে থাকার যন্ত্রণা।

প্রেমে অন্ধ ছিলে তুমিও অরোরা;

অমরত্ব করলে প্রার্থনা জিউসের কাছে―

এনে দিলে প্রেম-উপহার।

বেমালুম ভুলে গেলে সেই কথা :

সূর্যের অস্তিত্ব ছাড়া পৃথিবীর কী আছে গৌরব―

মানবজীবনে আর কিছু অবশেষ যৌবনবিহীন ?

প্রণয়-আবেগে আমাকে জড়ালে―

ছিনিয়ে আনলে এক মর্ত্যের যুবক মেঘালয়ে;

বাজপক্ষি যেমন ছোঁ-মেরে তুলে নেয় শিকারকে তার।

তোমাদের হাতের খেলনা মানুষ পুতুল

ইচ্ছেমতো খেলো নিয়ে―হাসাও, কাঁদাও।

পরিণাম না ভেবে অদূরদর্শী

আপন খেয়ালে তুমিও করেছো ভুল।

তাহলে তুমিও অতি সামান্য রমণী, দেবী নও―

স্বার্থপর, লোভী অন্য সব নারীদের মতো ?

প্রতিক্ষণ আমি ক্ষয়ে ক্ষয়ে যাই; নিষ্ঠুর নিয়তি

হায়, কেমন জীবন পেলাম, কীসের জীবন;

কেবলই ঝরে যায়, ক্ষয়ে যায়―ফুরায় না তবু।

নীরবে তুমিও কাঁদো;

জানি, কেন তুমি বার বার অশ্রুবিন্দু দিয়ে

আশঙ্কায় ভরে তোলো বেদনার ভার।

দেবতারা বর দিতে পারে;

তূণ থেকে উৎক্ষিপ্ত তিরের মতো

পারে না ফিরায়ে নিতে সেই বর―

তুমি জানতে সে কথা।

একদা মানুষ ছিলাম―ছিলাম রূপবান;

আজ নিত্য-নবীনার পাশে মূর্তমান ধূসরিত ছায়া

দুঃস্বপ্নের মতো করি পায়চারি তোমার প্রাসাদে।

আর তুমি প্রতিদিন উজ্জ্বল প্রভাতে রূপৈশ্বর্যে নিজেকে সাজাও

ছুটে যাও অন্য কোনও প্রণয়ীর কাছে।

আমি শুধু চেয়ে দেখি―অসহায়; প্রতিবাদহীন

তোমার কোনও দোষ নেই; দুর্ভাগ্য আমার―

বরফের কারাগারে জ্বলন্ত উনুনে

জ্বলছে, পুড়ছে উদোম বাসনা।

তাই আজ নতশিরে করি একান্ত প্রার্থনা―

এ দুঃসহ ভার কিছুতে সহে না আর;

এবার ফিরে যেতে দাও

ধরার ধুলায়; আবার মাটিতে যাই মিশে―

মৃত্যুর অমৃত স্বাদ করি পান।

(আলফ্রেড লর্ড টেনিসন-এর ‘টিথোনাস’ কবিতার আলোকে লেখা)

……………………………………………………………………………..

মুস্তফা হাবীব

বিকল্প স্বপ্নের জাল

কখনও ভাবিনি দিনের আলোয়ে দেখতে পাব

দূর অরণ্যে ফুটে থাকা চাঁদফুলের সৌরভ!

বিনামেঘে বৃষ্টি, বৃক্ষের শাখায় শাখায় বৈশাখী হিন্দোল

আমার শিল্পবাড়িতে ফুটছে কবিতার ফুল।

রাত নিশীথ ঘুমঘোরে দেখি নদীর ভরা যৌবন 

মরা নদীগুলো হয়ে যায় তীরহারা ঢেউয়ের সমুদ্র

এবং রাজপরির শরীর থেকে ঝরে তারার দ্যুতি,

ঘুম ভাঙার পর কর্পূরের মতো উড়ে যায় রাতের আনন্দ।

তুমি অসম্ভবকে জয় করে দেখেছো বাংলাদেশের রূপ

আমার পাশে বসে দেখেছো আমাকে

তুমি চলে গেলে, যেতে হলো নৈর্ব্যক্তিক জীবনের আহ্বানে 

রেখে গেলে কিছু স্নিগ্ধ পরশ, নতুনভাবে ফেরার অঙ্গীকার।

তারপর বহু বছর কেটে গেল অনন্ত অপেক্ষায়

একাকিত্বের রুমালে মুখ ঢেকে

তোমার অবর্তমানে খুঁজিনি কোনও দুধেলা গন্ধরাজ

মনের গভীরে বপন করিনি কোনও বিকল্প স্বপ্নের জাল।

…………………………………………………………….

আমিনুল ইসলাম

প্রেয়সীর মুখ

পাকা ধান ছুঁয়ে ফোটা হেমন্ত প্রভাত বাসা বেঁধে আছে দিয়ার মুখে

নাকি তারই মুখের আলো মিশে আছে সোনালি ধানের শীষে,

সেই ধাঁধা ভেঙে নিতে যদি মেলে রাখি চোখ,

বেলা বেড়ে যায়Ñ, ছুটে আসে সোনারঙ রেণু

মুসার চোখের মতো বিদ্ধ হতে বসি; কিন্তু হায়,

এত এত দুর্বলতা নিয়ে আমি কী করে স্পর্শ করবো ওই ঠোঁট!

ভাঙা দাখিল দরওয়াজা দিয়ে আজ যতটুকু ঢোকা যায় গৌড়ের

রাজধানীতে, ওই দুটি চোখ দিয়ে আমি ততটুকুও

ঢুকতে পারি না হৃদয়ের বাইতুল হিকমাহতে তোমার;

আহ্নিক গতির ট্রেনের হুইসেল বাজিয়ে দিন যায় রাত আসে

অন্ধকারে দিন হয়ে ওঠা আমার গহনে ডেকে ওঠে পাখি,

হেসে ওঠে গাছ..

মৃত্তিকার অনুভবে শিহর জাগিয়ে বয়ে যায় ফল্গুধারা…

জান্নাতের সুখ এসে আস্তিকতার স্পর্শ ছোঁয়ায়

সংশয়দীর্ণ আবেগে আমার: তুমি কি তাহলে মিথ্যা নও প্রভু?

হে কবি, বলোÑ,  দুলে ওঠা অস্তিত্বে তুমি

তোমার প্রিয়তমার কোন কোন অবদানকে অস্বীকার করবে?

……………………………………………………………

মেহেদী ইকবাল

যে বৃষ্টি সহজে থামে না

জানালায় বৃষ্টি এসে টোকা দিচ্ছে

বাইরে তুমুল বৃষ্টি

বৃষ্টিতে নৃত্যপর হাওয়া

যে বৃষ্টি সহজে থামে না

তার ভেতরে লুকিয়ে থাকে গান।

টিভিতে গান গাইছে হাসান

মিহি চিকন গলা হাসান আর মাকসুদের

অনেকটা বৃষ্টির মতো

প্রিয় শিল্পী, দুজনেই প্রিয় আমার।

কাপে চা নিয়েছি সবুজ

চিনি ছাড়া চা খুব তিক্ত

খুবই তিক্ত মিথ্যা কথা শোনা

যারা সুন্দর করে মিথ্যা বলে

তারা অন্যদের ভাবে বোকা, উজবুক!

উজবেকিস্তানের বন্ধুরা

দয়া করে একটু হাসুন

আমরা নিজেদের জ্ঞানী ভাবি

আর আপনাদের ভাবি বোকা!

বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে

তুমুল বৃষ্টি

এই বৃষ্টি হয়তো সহজে থামবে না!

যে বৃষ্টি সহজে থামে না

তার ভেতরে লুকিয়ে থাকে গান

বেদনার চে সুন্দর

আশ্চর্য সেই গান!

……………………………………………………

রাহনুমা খান কোয়েল

সন্ধ্যা এখনও বাকি আছে ঢের

তোমার প্রিয় ঋতু কি বর্ষা ছিল ?

মনে করতে পারছি না, নাকি শরৎকাল ?

শিউলি ফুল খুব প্রিয় ছিল, তাই না ?

উঁহু, শিউলি নয়, অপরাজিতা ॥

কার্নিশ ঘেঁষে চড়ুইয়ের ছানার ডাক

কিংবা পূর্ণিমার রাতে লোডশেডিং ? 

কখনও ইমন কল্যাণ, না হয় মেঘমল্লার

ঝুম বৃষ্টিতে হুডফেলা রিক্সাবিলাস ॥

পথের ধারের নাম না জানা ফুল কুড়ানো

পকেটে টুকরো কাগজে লিখে রাখা কবিতা

অভিমানে ভীষণ চুপ করে যাওয়া, না হয়

সিগারেটের ধোঁয়ায় নিজেকে লুকানো ॥

নীল রঙ পাঞ্জাবি, আর সেই প্রিয় হাতঘড়ি

পড়ার টেবিলে রাখা অসমাপ্ত পাণ্ডুলিপি

হাতের মুঠোয় লুকানো রুপার কানের দুল

সোনালু ঝরা পথে আমাদের হেঁটে যাওয়া ॥

দেখ আবারও উথাল-পাতাল বর্ষা এল ফের

চলে এসো, সন্ধ্যা এখনও বাকি আছে ঢের ॥

………………………………………………….

আশফাকুজ্জামান

জীবনের জন্য জীবন

সেদিন উত্তরার আকাশ জ্বলছিল―

আগুন নেমেছিল মাটিতে

থরথর করে কাঁপছিল ভূমি।

সেই ভয়ংকর দুঃসময়ে অমরত্বের খাতায় নাম লেখান―

মেহরীন-মাসুকারা।

মেহরীন-মাসুকা, তোমরা কি শুধুই নাম ?

না, তোমরা  প্রেম, তোমরা ভালোবাসা―

তোমরা মানবতার প্রতীক।

তোমরা মৃত্যুর মাঝে জীবনের গান।

এক হাতে শিশুর কান্না, আর হাতে আগুন,

যেখানে তোমরা দাঁড়িয়েছো হিমালয় হয়ে

নিদারুণ দহন থেকে দিয়েছো জীবনের ঠিকানা,

আর নিজেরা গিয়েছো হারিয়ে মৃত্যুর শীতল ছায়ায়।

এই যে কান্না, এই যে আর্তনাদ,

এই যে শহরজুড়ে নিঃশব্দ হাহাকার,

এ শুধু শোক নয়, এ ইতিহাস―

যেখানে আছে স্বপ্ন, আছে ভালোবাসা…

এসো, কাঁদি, কিন্তু গর্বে,

এসো, স্মরণ করি, একাত্ম হয়ে―

মেহরিন, মাসুকা―তোমাদের জন্যই

আজও মানবতা আছে পৃথিবীতে।

আজ আকাশ কাঁদে।

বাতাসে ভাসে নিঃশব্দ দীর্ঘশ্বাস

হৃদয়ে ধরে রাখি তোমাদের মহানুভবতা।

তোমাদের নামে লেখা থাকবে

ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ পঙ্ক্তি।

এভাবেই রচিত হয় আত্মদানের কিংবদন্তি,

যেখানে প্রেম মানে প্রাণ, শিক্ষক মানে ত্যাগ,

মানবতা মানে―

জীবনের জন্য জীবন।

………………………………………………………

মুক্তিপিয়াসী

আমারও এক নদী আছে

এক আজন্ম সখ্য; সে হলো জল,

তপ্ত বালুচর; সেও সরব থেকে থেকেই।

কখন যেন পা ছুঁয়ে যায় সাগরের ঢেউ, তুমুল আবেগে ঢেউয়ের লুসিফেরিনে বিলাসী স্বপ্নমন এঁকে চলে আলো-আঁধারে সাজানো রেমব্রান্ট, আর ঢেউয়ে ঢেউয়ে জল ভেঙে আসা ধ্রুপদী সুরটুকু ;

বুকটাকে অথৈ করে তোলে!

ভালোবাসা ? 

রোদে, দহনে বসে থাকে সি-বিচ আমব্রেলায়।

পরিযায়ী আকাশ;

রোদচশমার আড়ালে একবার দেখি, তারপর সামনে জলের পৃথিবী।

এভাবে ‘প্রিয়তম’ হয়ে ওঠে জল।

তামাদি স্নায়ু ছেঁকে হৃদ-অলিন্দ হয়ে প্রবাহিত। দু তীরে মায়াকাজল;

তাপে-দহনে, ঘামে নোনাজলে মাঝখানে পাথুরে চর।

শিমুল, পলাশ আর কৃষ্ণচূড়ার আলতার ঘ্রাণে,

আমারও এক নদী আছে ।

আখর হাতে যদি কোনওদিন বিষাদ ভালোবাসো ;

ঘৃতকুমারির ঠান্ডা ঘ্রাণে সোনালি ফোরাতে, আমায় খুঁজে নিও;

ওহে দজলা নদী!

…………………………………………………………….

সাইদুল হাসান

আরিয়ান

পুড়ে যায় চোখ। পুড়ে যায় নাক।

পুড়ে যায় মুখ। পুড়ে যায় বুক।

পুড়ে যায় ঠোঁট। পুড়ে যায় শরীর।

পুড়ে যায় চুল। পুড়ে যায় মেধা। পুড়ে যায় মগজ। উদ্ধারকারীর হাতে গলে গলে খসে পড়ে মাসুম শিশু।

আগুনে অর্ধেক সেদ্ধ হওয়া শিশু।

পুড়ে গেছে শার্ট। পুড়ে গেছে প্যান্ট।

পুড়ে গেছে বেল্ট। পুড়ে গেছে জুতো।

বেঁচে আছে স্কুল ড্রেসের অংশবিশেষ।

বেঁচে আছে শ্বাস। বেঁচে আছে নিঃশ্বাস।

বুকে বেঁধে আশ। বাঁচবে বিশ্বাস।

হেঁটে আসে। হেঁটে হেঁটে আসে।

বাঁচার তাগিদে।

আগুন ভেদ করে বেরিয়ে আসে।

দুর্নিবার আত্মবিশ্বাস শিশুর বুকে।

সবুজ পৃথিবী দেখবে সুখে।

ক্লাসরুমে পড়বে ম্যামের সাথে। বসবে বন্ধু পাশে। বোনকে ডাকবে আপু। ভাইকে ডাকবে ভাইয়া।

পিতাকে ডাকবে বাবা।

মাকে ডাকবে মা।

আমরা বাঁচাতে পারি না।

আরিয়ান, আমরা তোমাকে বাঁচাতে পারি না।

ক্ষমা করো আমাদের ক্ষমা করো!

অক্ষম লজ্জায় নতজানু

ক্ষমা করো আমাদের ক্ষমা করো!

পুড়ে যায় স্বপ্ন, পুড়ে যায় সাজানো বাগান।

পুড়ে যায় সূর্য। পুড়ে যায় সবুজ মাঠ।

পুড়ে যায় মাইলস্টোন। পুড়ে যায় বাংলাদেশ।

আমরা বাঁচাতে পারি না।

আরিয়ান আমরা তোমাকে বাঁচাতে পারি না।

ক্ষমা করো আমাদের ক্ষমা করো!

অক্ষম লজ্জায় নতজানু

ক্ষমা করো আমাদের ক্ষমা করো!

……………………………………………………

শামীম রফিক

সময়ের অস্থিরতা

থামবার জন্য শক্ত মাটি দরকার। পায়ের নিচে কেবলই

আলু-থালু সমুদ্র। কোথায় দাঁড়াই, এ আমার বিস্ময়।

নিঃসঙ্গতা ঢেকে সম্মুখে বাড়াই পা। ঢাকে না একাকীত্ব।

সম্ভবত একাকীত্বই মানুষের সবচেয়ে কাছের ঠিকানা।

জীবন থেকে যখন দিয়েছি ছেড়ে সময় ও নারী যৌনতার

তখন কি আর আছে মিছিমিছি অসুখ!

দিনভর হাওয়ার মাতলামি দেখি। রোদ উঠবার কী যে কৌশল।

রোজকার টিফিন বক্সে থাকে লড়াকু পৃথিবী। তার সাথে জীবনের

অত্যাশ্চর্য লেনদেন। কাটে না সময় কিছুতেই। রোজ অনাচার

দেখি ইঁদুর আর বিশ্বাসের। অতটা সহজ নয় জীবন।

সময়, শ্রম ও নিঃশ্বাস বিসর্জন দিলে কী থাকে জীবনের ?

গৃহ যখন গৃহ নয়। বেড়ে যায় জীবনের কৌশলী লেনদেন।

যোনির অন্ধকারে থাকে মাতালের সুখ। জেনেছি জীবন অত নয়

বড়, মানুষ যেভাবে বিলায়। সব জীবনেরই থাকে আলাদা গল্প।

সমান্তরাল পৃথিবীকে অতীত করে দিয়ে অন্ধকারে হারাবার

ভয় আজকাল আমাকে ভীষণ অস্থির করে। বাতাসে ভেসে

বেড়ায় কেবলই নিস্তব্ধতা। তারা মানুষের গন্ধ খুঁজে ফেরে।

আর নিঃসঙ্গ করে দেয় নানাবিধ ছলনায়। মানুষেরা বোঝে।

উত্তেজনায় বাড়ে ব্যস্ততা। মানুষের মুখোমুখি দাঁড়ায় একমাত্র

মানুষ। তাদের বাহির বা ভেতর বলে কিছু থাকে না। সম্মিলিত

উষ্ণায়নের বিপরীত রসায়ন প্রেতাত্মার মতো কেড়ে নেয়

প্রিয়তম ঘুম। গানের বদলে সেখানে ঘুমায় বরফের ঠান্ডা অসুখ।

যদিও একটাই জীবন। সেখানে দরকার উঁচু নাক আর ঠকবার

মতো বিশুদ্ধ প্রাণ। উঁচু চিন্তাগুলো তর্কের মতো সস্তা রসদের

অন্ধকারে সহজেই হারিয়ে যায়। তবু বাঁচতে হবে। এই সহজ

সত্যগুলো কেবলই হারিয়ে যাচ্ছে।

বুঝতে পারি, ঘড়ির কাঁটায় আটকে যাচ্ছে চোখ। রাত্রি গলে গলে

পুরুষ্ট করছে তাদের বিশুদ্ধতা। এখানে হারিয়ে যাবার মতো

কৌশলে মুখোমুখি দাঁড়ায় কিছু কিছু নির্জনতা। তারা প্রশ্ন খোঁজে।

তারা আস্তাবল থেকে খুঁজে নেয় ব্রাউন সওয়ার।

নামহীন যাযাবর পুড়ুক স্বপ্নের জলে। আমি জানি, যা চাই তা

কখনও পাব না। যা পেয়েছি তা হৃদস্পন্দনের চেয়ে হালকা।

আমি কল্পনাকে চিত্রিত করে স্বপ্নকে পেতে চাই। স্বপ্নহীন

ভালোবাসার কাছে আমার আর কোনও প্রার্থনা নেই।

এখানে আমি, জীবন আর সময়ের যুগপৎ বিন্যাস খুঁজে পাই।

…………………………………………………………………….

অনার্য নাঈম

জল ও জলাশয়

জলের সন্ধান পেয়ে মুখ খুলে দেয় জলাশয়

শতাব্দী শতাব্দী ধরে এই জল

ছুটে যায় জলাশয় অভিমুখে।

প্রকরণগত গতিময়তার নাম মহাকাল।

জলমগ্ন এই মহাকালের নাম ‘আমি’।

‘আমি’ একবিন্দু জল গড়িয়ে পড়ি জলাশয়ে।

গ্রহ-নক্ষত্র, আকাশ-বাতাশ, মৃত্তিকাসহ

একটি লাটিম-সদৃশ ঘূর্ণায়মান সকল অসুখ

আমাদের দেহময় আমৃত্যু ঘুরতে থাকে।

অসুখ সেরে গেলে সকল সৌরগোলকের দেহ

নিজ নিজ আঁতুড়ঘরে ফিরে আসে;

পৃথিবীর সকল ‘অনুসন্ধান’ ছুটতে থাকে―

শতাব্দী শতাব্দী ছুটতে থাকে, অবিরাম;

আহা! জল, আহা! জলাশয়

কেন অমঙ্গলের চিরায়ত ধ্বনি

বয়ে নিয়ে চলো কাল-মহাকাল অবধি।

……………………………………………………….

আমেনা তাওসিরাত

দিবস

রেলগাড়ি,

শাবক শীত,

সচন্দন প্রথম দিন।

চলে গেছে

রাজার ঘোড়ায় চড়ে।

রেখে নদী

কাজললতার শিশি।

যাক।

বিবরণে ব্যথা কই ?

সৈন্যের সারি বলেনি ডেকে :

‘দিবস বাঁধিয়া রাখো’।

…………………………………………..

সচিত্রকরণ : রজত

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button