অনুবাদ গল্পআর্কাইভবিশ্বসাহিত্য

অভিনেত্রী : মূল : মুন্সি প্রেমচাঁদ

বিশ্বসাহিত্য : অনূদিত গল্প

বাংলা অনুবাদ : এলহাম হোসেন

[মুন্সি প্রেমচাঁদ আধুনিক হিন্দি ভাষা ও উর্দু ভাষার অন্যতম সফল লেখক। প্রেমচাঁদ ভারতের উত্তর প্রদেশে ১৮৮০ সালের ৩১ জুলাই জন্মগ্রহণ করেন। ৮ অক্টোবর, ১৯৩৬ ভারতের বারানসিতে তাঁর মৃত্যু হয়। মুন্সি প্রেমচাঁদ উর্দু ও হিন্দি সাহিত্যের স্বনামধন্য কথাশিল্পী। তার আসল নাম ধনপত রায়। তবে মুন্সি প্রেমচাঁদ নামেই তিনি পরিচিত। তাকে জীবনবাদী সাহিত্যিক বলা হয়। হিন্দি সাহিত্যে ‘উপন্যাস-সম্রাট’ হিসেবে খ্যাত প্রেমচাঁদকে আধুনিক হিন্দি সাহিত্যের জনক বলেও অভিহিত করা হয়। বাংলা সাহিত্যের বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সাথে তুলনা করে তাঁকে ‘হিন্দি সাহিত্যের বঙ্কিম’ বলা হয়। ১৯১০ সালে বড়ে ঘরকি বেটি প্রকাশিত হলে উর্দু সাহিত্যে তিনি স্থায়ী আসন লাভ করেন। তার সর্বশ্রেষ্ঠ উপন্যাস গোদান। তাঁর প্রায় যাবতীয় সাহিত্যকর্ম বাংলা ভাষায় অনূদিত ও বহুল পঠিত। তাঁর রচিত উল্লেখযোগ্য রচনাগুলো হলো প্রেম পঁচিশি, প্রেম বত্তিশি, খাক পরোয়ানা, খোয়াব ও খেয়াল, ফেরদৌসে খেয়াল, প্রেম চল্লিশি, আখেরি তোফাহ, যাদরাহ, নির্মলা ইত্যাদি।]

মঞ্চের পর্দা নামলো। শকুন্তলার ভূমিকায় অভিনয় করে তারা দেবী দর্শকদের অভিভূত করেছেন। শকুন্তলার অভিনয় করার সময় রাজা দুষ্মন্তের সামনে তার হৃদয় নিংড়ানো আবেগ, বেদনা, ভর্ৎসনা প্রকাশ করেছেন এতটাই মর্মস্পর্শীভাবে যে, দর্শক থিয়েটারের নিয়মকানুন ভেঙে মঞ্চে উঠে গেছে। সবাই তারা দেবীর ভূয়সী প্রশংসা করছে। অনেকে মঞ্চে উঠে তারা দেবীর পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়ে। পুরো মঞ্চ ফুলে ফুলে, গহনায়, অলংকারে ভরে গেছে। যদি সে সময় মেনেকার উড়োজাহাজ না নামত এবং তাঁকে নিয়ে উড়াল না দিত, তাহলে পাঁচ-দশজন মানুষ এই জনসমুদ্রে চিঁড়েচ্যাপ্টা হয়ে যেত। তড়িঘড়ি করে নাটকের ম্যানেজার বেরিয়ে এলেন। মঞ্চে দাঁড়িয়ে বিচক্ষণ দর্শকদের ধন্যবাদ দিলেন। বললেন, আগামীকালও শো চলবে। এই ঘোষণার পরই কেবল মানুষের মধ্যকার উন্মাদনা প্রশমিত হলো। কিন্তু তখনও এক যুবক মঞ্চ থেকে নামলেন না। লম্বা ছিপছিপে তাঁর দেহ। চোখেমুখে সৌম্য ভাব। গায়ের রং সোনার মতো। দেখতে সাক্ষাৎ দেবতার মতো। সুঠামদেহী। চোখে-মুখে আলোর আভা ছড়িয়ে আছে। রাজপুত্রের মতো দেখতে।

সব দর্শক চলে যাওয়ার পর তিনি ম্যানেজারকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আমি কি একটু তারা দেবীর সঙ্গে দেখা করতে পারি ?’

ম্যানেজার তাচ্ছিল্য প্রকাশ করে বললেন, ‘দেখুন, এ ব্যাপারটি আমাদের নিয়মের মধ্যে পড়ে না।’ যুবক আবারও জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনি কি আমার চিঠিটা তাকে পৌঁছে দেবেন ?’

ম্যানেজার আগের মতোই তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বললেন, ‘দুঃখিত। নাহ। এটিও আমাদের নিয়মের বাইরে।’ এরপর যুবক আর কিছু না বলে হতাশ হয়ে মঞ্চ থেকে নেমে চলে যেতে উদ্যত হলেন। যেইমাত্র তিনি থিয়েটার থেকে বের হবেন, ঠিক তখনই ম্যানেজার তাঁকে পেছন থেকে ডেকে বললেন, ‘এক মিনিট দাঁড়ান।’

‘আমাকে কি আপনার একটি ভিজিটিং কার্ড দেবেন ?’

যুবক পকেট থেকে এক টুকরো কাগজ বের করে নিলেন। এতে কিছু একটা লিখলেন। তারপর তা ম্যানেজারের হাতে তুলে দিলেন। ম্যানেজার এক নজর তাকিয়ে দেখলেন। কুনওয়ার নির্মলকান্ত চৌধুরী, ও.বি.ই.। এবার ম্যানেজার নরম হলেন। কুনওয়ার নির্মলকান্ত এই শহরের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি। তাঁর জমিদারি আছে। বুদ্ধিদীপ্ত সাহিত্যিক। উচ্চমার্গের গায়ক, উচ্চ মেধাসম্পন্ন পণ্ডিত ব্যক্তি। বছরে আট থেকে দশ লক্ষ টাকা তাঁর আয়। তাঁর অনুদানে দেশের অনেক প্রতিষ্ঠান চলে। সেই ব্যক্তি এখন একজন সাধারণ প্রার্থীর মতো দাঁড়িয়ে আছেন। পূর্বে তাঁর প্রতি উদাসীনতা প্রদর্শনের জন্য ম্যানেজার ঘাবড়ে গেলেন। নম্রভাবে বললেন, ‘আমাকে ক্ষমা করবেন, প্লিজ। বড় একটা ভুল করে ফেলেছি। এক্ষুনি তারা দেবীর কাছে আপনার কার্ড পৌঁছে দিচ্ছি।’

কুনওয়ার সাহেব তাকে ইশারায় থামতে বললেন। বললেন, ‘এখনকার মতো ব্যাপারটি বাদ দিন। আমি বরং আগামীকাল বিকেল পাঁচটায় আসব। তারা দেবী বিরক্ত হবেন। এখন তার বিশ্রামের সময়।’

ম্যানেজার বললেন, ‘আমি নিশ্চিত সে আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করাকে বিরক্ত মনে করবে না। আপনাকে সাদরে গ্রহণ করবে। আপনি একটু দাঁড়ান। আমি এক মিনিটের মধ্যে ফিরে আসছি।’ কিন্তু পরিচয় প্রকাশ করার পর কুনওয়ার সাহেব আর জোরাজুরি করছেন না। ম্যানেজারকে তাঁর প্রতি ভদ্রতা প্রদর্শনের জন্য ধন্যবাদ দিয়ে তিনি আগামীকাল আসবেন বলে চলে গেলেন।

তারা দেবী টেবিলের সামনে বসে আছে। কোনও এক ভাবনার রাজ্যে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছে। ঘরটাও বেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, সুসজ্জিত। গতরাতের দৃশ্য এখনও তার চোখের সামনে জ্বলজ্বল করছে। এমন দিন কি কারও জীবনে বারবার আসে ? কত মানুষেরই না ঘুম হারাম হয়েছে তাকে দেখে! এরা একে অপরের সঙ্গে হুড়োহুড়ি করছে। সে অনেককেই প্রত্যাখ্যান করেছে। কিন্তু একজন মাত্র লোক যিনি জনতার ভিড়ের মধ্যে অনড় দাঁড়িয়ে ছিলেন। স্বয়ং দেবতার মতো দেখতে। তাঁর চোখেমুখে সৎ প্রত্যয় আর দৃঢ় সংকল্প। তাঁর তীক্ষè দৃষ্টি যেন তারা দেবীর হৃদয়ের গভীরে গেঁথে গেছে। কে জানে, হয়তো তাঁর সঙ্গে আজ আবার দেখা হবে। আবার না-ও হতে পারে। তবে দেখা হলে আজ সে তাঁর সঙ্গে কথা বলবে। তাঁকে যেতে দেবে না। এসব ভাবতে ভাবতে আয়নায় তাকায়। যেন পদ্ম ফুটলো। কে বলবে যে, এই কোমল পুষ্প পয়ঁত্রিশটি বসন্ত পেছনে ফেলে এসেছে ? তার সৌন্দর্যের সেই আভা, সেই পেলবতা, সেই চাঞ্চল্য এবং সেই মাধুর্য যে কোনও তরুণীকে লজ্জায় ফেলতে পারে। তারা দেবী আবারও তার হৃদয় মন্দিরে প্রেমের প্রদীপ জ¦ালালো। বিশ বছর আগে প্রেম সম্বন্ধে তার প্রচণ্ড বাজে অভিজ্ঞতা হয়েছে। তখন থেকে সে বৈধব্য বরণ করে আছে। কত যুবকই না তাকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়েছে। কিন্তু সে কারও দিকে চোখ মেলে তাকায়নি পর্যন্ত। বিশ বছর আগে প্রেমের যে মিষ্টি যাতনা অনুভব করত, আজ বিশ বছর পরে সে আবারও সেই মিষ্টি যাতনা অনুভব করতে লাগল। লোকটির সৌম্য অবয়ব তার মনে গেঁথে গেছে। মনের আয়নায় আটকে গেছে। সে আর তাকে কোনওভাবেই ভুলতে পারছে না। ঐ একই লোককে যদি সে গাড়িতে চেপে চলে যেতে দেখত তবে সে তার সঙ্গে কথা বলত। কিন্তু আজ তাঁকে তার সামনে প্রেমের উপহার হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সে বিচলিত হয়ে পড়ল।

হঠাৎ কাজের মেয়েটা এসে বলল―‘বাঈজি, গতরাতের সব উপকরণ সরিয়ে রাখা হয়েছে। আপনি চাইলে নিয়ে আসব।’

তারা বলল, ‘নাহ, ওগুলো আনার দরকার নেই। কিন্তু দাঁড়াও, কী ওগুলো ?’

‘অনেক বড় স্তূপ। গণনা করা কঠিন। ওগুলোর মধ্যে স্বর্ণমুদ্রাও আছে। চুলের ক্লিপ, কাঁটা, বোতাম, লকেট, আংটি―সবই আছে।’

‘ছোট্ট একটা বাক্সে সুন্দর একটা গলার হার। এমন নেকলেস আগে কখনও দেখিনি গো। সবগুলো একটা সিন্দুকে তুলে রেখেছি।’

‘ঠিক আছে। বাক্সটা নিয়ে এসো।’ কাজের মেয়ে বাক্সটা একটা টেবিলের ওপর রাখল। ইতিমধ্যে একটি ছেলে এসে তারার হাতে একটি চিঠি ধরিয়ে দিল। আগ্রহ ভরে তারা চিঠিটার দিকে তাকালো―কুনওয়ার নির্মলকান্ত ও. বি.ই.। তারা ছেলেটাকে জিজ্ঞেস করল, ‘কে তোমার হাতে এই চিঠি ধরিয়ে দিয়েছে ? পশমি পাগড়ি পরা ঐ লোকটি ?’

ছেলেটি বলল, ‘ম্যানেজার সাহেব।’ এরপর চলে গেল। সিন্দুকে প্রথমে বাক্সটা পাওয়া গেল। বাক্সটা খুলে পাওয়া গেল আসল মতির একটা নেকলেস। বাক্সে একটা কার্ডও ছিল। তারা কার্ডটি বের করে নিয়ে পড়ে ফেলল―কুনওয়ার নির্মলকান্ত … কার্ডটা হাত থেকে পড়ে গেল। চেয়ার থেকে উঠে বেশ কয়েকটা রুম, বারান্দা পার হয়ে ছুটে ম্যানেজারের কাছে চলে এল। সামনে দাঁড়াল। ম্যানেজারও দাঁড়িয়ে গেলেন। বললেন―তোমার শোর সাফল্যে অভিনন্দন।

তারা বসল না। জিজ্ঞেস করল, ‘কুনওয়ার নির্মলকান্ত কি বাইরে ? ছেলেটা আমার হাতে চিঠিটা ধরিয়ে দিয়ে দৌড় দিয়েছে। ওকে কোনও কিছুই জিজ্ঞেস করতে পারিনি।’

‘কুনওয়ার সাহেবের চিঠি রাতে এসেছে। তুমি তখন ছিলে না।’

‘তাহলে সঙ্গে সঙ্গে কেন আমাকে চিঠিটা দিলেন না ?’

ম্যানেজার আস্তে আস্তে বললেন, ‘ভেবেছিলাম, তুমি বিশ্রাম নিচ্ছো। তাই বিরক্ত করতে চাইনি। সত্য কথা হলো যে, কুনওয়ার সাহেবের সঙ্গে দেখা হলে তোমাকে হারাতে পারি, সেই ভয়ে বলিনি। আমি মহিলা হলে তখনই প্রেমে পড়ে যেতাম। এমন লোক আমি জীবনে দেখিনি। সেই একই লোক, মাথায় একই রকম পশমি পাগড়ি পরা। তুমিও তো তাঁকে দেখেছ।’

তারা ম্যানেজারের কথা পুরোপুরি শুনছিল না। বলল, ‘হ্যাঁ, আমি তাঁকে দেখেছি। উনি কি আবার আসবেন ?’

‘হ্যাঁ, বিকেল পাঁচটায়। খুব শিক্ষিত মানুষ। শহরের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তিও বটে।’

‘আজ আমি রিহার্সালে আসব না।’

কুনওয়ার সাহেব হয়তো আসবেন। তারা আয়নার সামনে বসা, আর তার কাজের মেয়ে তাকে সুন্দর করে সাজিয়ে দিচ্ছে। আজকের যুগে পোশাক-আশাক পরতে বিশেষজ্ঞ জ্ঞানের প্রয়োজন হয়। আগে তো ট্র্যাডিশন মেনে পোশাক পরতে হতো। কবি, চিত্রকর এবং কিছু লোক এটিকে নির্দিষ্ট গৎবাঁধা ছকে আটকে ফেলেছেন। চোখে কাজল, হাতে মেহেদি, আর পায়ে আলতা। শরীরের এক এক অঙ্গে এক এক রকমের অলংকার। এখন তো ট্র্যাডিশন উল্টে গেছে। আজকাল প্রত্যেক মহিলা নিজের রুচি অনুযায়ী পোশাক পরে। বুদ্ধি আর প্রতিযোগিতামূলক সহজাত প্রবৃত্তি তাদের এ কাজে সাহায্য করে। তার লক্ষ্য তার সৌন্দর্যকে একেবারে শিখরে নিয়ে যাওয়া। তারা অবশ্য এই শিল্পকর্মে দক্ষ। এই কোম্পানির সঙ্গে সে আছে প্রায় পনের বছর। এতগুলো বছর সে পুরুষমানুষের হৃদয় নিয়ে খেলেছে। কীভাবে আড়চোখে তাকিয়ে, মুচকি হেসে, হাতের ইশারায় পুরুষমানুষকে কুপোকাত করতে হয়, সেটি সে ভালোই রপ্ত করেছে। এই সবগুলো অস্ত্র নিয়ে যখন সে তার ড্রয়িংরুমে এল তখন পৃথিবীর সব সৌন্দর্য যেন তার উপর এসে আছড়ে পড়ল। টেবিলের পাশে দাঁড়িয়ে কুনওয়ার সাহেবের কার্ডের দিকে তাকাল। মোটরগাড়ির শব্দ শোনার জন্য ওর কান খাড়া হয়ে রইল। মনে মনে কামনা করে, কুনওয়ার সাহেব এই মুহূর্তে তার কাছে এসে তার অপরূপ রূপ দেখুক। এমন ভঙ্গিমায় কুনওয়ার তার পুরো সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবে। পোশাক-আশাক পরার কৌশলের দিক থেকে সে বয়সকে জয় করেছে। কে বলবে, যে বয়সে মহিলারা একটু প্রশান্তি খোঁজে, আশ্রয় চায় এবং বিনয়ী হয়, সেই বয়সে সে একজন চপলা রমণী। তারা দেবীকে বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো না। সম্ভবত কুনওয়ার সাহেব তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করার অপেক্ষায় অধীর হয়ে ছিলেন। মাত্র দশ মিনিট বাদেই গাড়ির শব্দ শোনা গেল। তারা নিজেকে ঠিকঠাক করে নিলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই কুনওয়ার সাহেব ঘরে প্রবেশ করলেন। তারা তাঁর সঙ্গে করমর্দন করতে ভুলে গেলেন। এ বয়সেও প্রেমে পড়লে সে কম বিহ্বল হয় না। একজন নম্র-ভদ্র মহিলার মতো তারা মাথা নত করে দাঁড়িয়ে রইল।

কুনওয়ার সাহেব ঘরে প্রবেশ করতে করতেই তারা দেবীর গলার দিকে তাকালেন। গত রাতে যে মতির হার পাঠিয়েছিলেন সেটি তার গলায় জ¦লজ¦ল করছে। তিনি অত্যন্ত খুশি হলেন। কিছু সময়ের জন্য তাঁর মনে হলো, যেন তার সব ইচ্ছা পূরণ হয়েছে। বললেন, ‘এত সকাল সকাল তোমাকে বিরক্ত করার জন্য দুঃখিত। এ সময়টাতে তুমি শুয়ে বিশ্রাম নাও।’ শাড়িটা ঠিক করে নিয়ে, যা মাথা থেকে একটু সরে গেছে, তারা দেবী বলল, ‘আপনার আগমনের চাইতে আনন্দের আর কী হতে পারে। এমন চমৎকার উপহারের জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। এখন থেকে আমরা মাঝে মাঝেই সাক্ষাৎ করতে পারি।’

হাসিমুখে নির্মলকান্ত বললেন, মাঝে মাঝে নয়, প্রতিদিন। তুমি আমাকে দেখতে না চাইতে পারো, ‘কিন্তু আমি অন্তত দিনে একবার হলেও তোমার কাছে আসব।’

তারাও সহাস্যে উত্তর দেয়, ‘অন্ততপক্ষে আমার চেয়ে আরও বেশি কিছু মনোরঞ্জনের অনুষঙ্গ পাওয়ার আগ পর্যন্ত, তাই না ?

‘আমার কাছে এটি কোনও বিনোদন নয়। বরং জীবন-মরণ প্রশ্ন। অবশ্য তুমি এটাকে হালকাভাবে নিতে পারো। কিন্তু সেটা কোনও ব্যাপার নয়। তোমার আনন্দের জন্য যদি আমার জীবন দিয়ে দিতে হয়, সেটি হবে আমার জন্য একটি বড় অর্জন।’

উভয় পক্ষ থেকে প্রেমকে দীর্ঘস্থায়ী করার প্রতিজ্ঞার বাণী ধ্বনিত হলো। এরপর কিছুক্ষণ আমোদ-প্রমোদ করে কুনওয়ার সাহেব আগামীকাল তাকে ডিনারের নিমন্ত্রণ জানিয়ে চলে গেলেন।

এক মাস কেটে গেল। কুনওয়ার সাহেব এখন দিনে কয়েকবার আসেন। বিরহ তাঁর কাছে অসহনীয় মনে হয়। মাঝে মাঝে দু’জনে নদীতে নৌবিহার উপভোগ করতে যায়। কখনও কখনও পার্কের সবুজ ঘাসে বসে গল্প করে। মাঝে মাঝে সঙ্গীতানুষ্ঠানে যায়। প্রতিদিন কোনও না কোনও নতুন প্রোগ্রাম থাকেই। গোটা শহরে সবার মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ল যে, তারা দেবী কুনওয়ার সাহেবকে বশ করে ফেলেছে। দু হাতে তার সম্পদ লুটপাট করছে। কিন্তু কুনওয়ার সাহেবের কাছে তারা দেবীর প্রেমের চাইতে পৃথিবীর যে কোনও ধনসম্পদই তুচ্ছ। সে তাঁর সঙ্গে থাকলে তিনি আর কিছুই চান না।

কিন্তু প্রায় এক মাস এখানে-সেখানে ঘোরাঘুরির পরও তারা দেবী কুনওয়ার সাহেবের কাছ থেকে তা পেল না, যা সে চেয়েছিল। সে কুনওয়ার সাহেবকে দৈনিক প্রেমের ব্যাপারে কথা বলতে শোনে। এ প্রেমের কোনও সীমা-পরিসীমা নেই। সত্যিকারের, নিঃস্বার্থ প্রেম। কিন্তু তিনি কখনও বিয়ের কথা বলেন না। তাঁর অবস্থা পিপাসার্ত মানুষের মতো। বাজারে সবই আছে। শুধু পানি নেই। এমন মানুষের পিপাসা মেটাবে কী ? তৃষ্ণা মেটার পর তিনি নতুন কিছু খুঁজবেন। তারা দেবী জানে, কুনওয়ার সাহেব তার জন্য জীবন দিয়ে দেবেন। কিন্তু তাহলে তিনি ‘বিয়ে’ শব্দটা মুখে আনছেন না কেন ? তার মনে যা চলছে সে-কথা কি তাহলে সে কুনওয়ার সাহেবকে চিঠি লিখে জানাবে ? তিনি কি তাকে শুধুই আনন্দ-ফুর্তির উপকরণ হিসেবে রাখতে চান ? সে আর এ অপমান সহ্য করবে না। কুনওয়ারের ইশারা পেলে সে আগুনেও ঝাঁপ দিতে প্রস্তুত। কিন্তু এই অপমান তার জন্য অসহনীয়। পূর্বে সে কোনও ধনী লোকের সঙ্গে দু-এক মাস কাটিয়ে তাকে ছেড়ে দিতে পারত। ভুলে যেতে পারত। কিন্তু প্রেমের পিপাসা তো কেবল প্রেম দিয়েই মেটে। অন্য কিছুতে নয়। কুনওয়ার সাহেবের সঙ্গে আগের মতো লজ্জাজনক জীবন সে আর কাটাতে চায় না।

অপরদিকে, কুনওয়ার সাহেবের আত্মীয়-স্বজন ওদের মেলামেশার ব্যাপারে লা-ওয়াকিফ নয়। ওরা কুনওয়ারকে তারা বাঈয়ের খপ্পর থেকে রক্ষা করতে চেষ্টা করে। অন্য কোথাও কুনওয়ার সাহেবের বিয়ে দিলে ভালো হয়। সেটাতে তারা সফল হবেন বলেও ভাবছেন। কুনওয়ার সাহেব এই মহিলাকে বিয়ে করতে পারেনÑসেটা নিয়ে ওরা ভয় পায়নি। কিন্তু ওরা ভয় পেল যে, কুনওয়ার এই মহিলাকে তার সম্পত্তির একটা অংশ লিখে দিতে পারেন বা তার সন্তানদের তাঁর উত্তরাধিকারী ঘোষণা করে ফেলতে পারেন। সবদিক থেকে কুনওয়ার সাহেব চাপে পড়ে গেলেন। এমনকি ইংরেজ সাহেবরাও তাঁকে বিয়ে করার পরামর্শ দিলেন।

সেদিন সন্ধ্যায় কুনওয়ার সাহেব তারা বাঈয়ের কাছে চলে গেলেন! বললেন, ‘তারা, শোনো, তোমাকে কিছু একটা বলতে চাই। তুমি কিন্তু না বলো না।’

তারার হৃদয়-মন খুশিতে নেচে উঠল, বলল, ‘বলুন, কী ব্যাপার ? আমি আপনার জন্য কী করতে পারি ?’

সে এই কথাগুলো শোনার জন্যই অপেক্ষা করছিল। কথাগুলো শুনে তারা কুনওয়ার সাহেবের পায়ের কাছে পড়ে কাঁদতে লাগল।

একটু পর তারা বলল, ‘আমি তো আশাই হারিয়ে ফেলছিলাম। আপনি আমাকে একটা দীর্ঘ পরীক্ষায় ফেলে দিয়েছিলেন।’ কুনওয়ার সাহেব দাঁত দিয়ে জিভ কাটলেন। যেন অনভিপ্রেত কিছু একটা শুনেছেন।

‘এ কথা সত্য নয়, তারা। আমি যদি বুঝতে পারতাম যে, তুমি আমার অনুরোধ রাখবে তাহলে তো প্রথম দিনেই আমি তোমাকে অনুরোধ করতাম। কিন্তু আমি নিজেকে তোমার যোগ্য মনে করিনি। তুমি তো গুণের ভাণ্ডার। আমি কী―তা তো তুমি জানোই। সারাটা জীবন তোমার পূজা করব বলে ঠিক করেছি। সম্ভবত প্রশ্ন না করে তুমি সে বর আমাকে দেবে। আমার এই একটাই ইচ্ছা। আমার যদি কোনও গুণ থেকেই থাকে, তবে সেজন্য আমি তোমাকে ভালোবেসেছি। আমার দুর্বলতার জন্য আমি লজ্জিত। আমার কাছে তুমি এ জগতের বাসিন্দা নও। তুমি স্বর্গের অপ্সরী। আমি অবাক হই এই ভেবে যে, এখনও আনন্দে আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি না কেন।’

কুনওয়ার সাহেব তাঁর অনুভূতির কথা অনেকক্ষণ ধরে বললেন। আগে কখনও তিনি এমন বাগ্মী হয়ে ওঠেননি।

তারা মাথা নিচু করে নীরবে তাঁর কথা শুনে গেল। কিন্তু আনন্দের পরিবর্তে তার মধ্যে বেদনা-যাতনা মিশ্রিত লজ্জা কাজ করতে লাগল। লোকটা এত সৎ, এত নিষ্পাপ, এত ভদ্র, এত উদার!

হঠাৎ কুনওয়ার সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, ‘তাহলে কবে আমার ইচ্ছা পূরণ হবে ? আমার প্রতি দয়া করো। বেশিদিন ঝুলিয়ে রেখ না কিন্তু।’

কুনওয়ার সাহেবের সারল্যে মুগ্ধ হয়ে তারা উদ্বিগ্ন কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, ‘আইনের বিষয়টি কীভাবে দেখবেন ?’ কুনওয়ার সাহেব সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিলেন, ‘এ ব্যাপার নিয়ে একদম ভাববে না, তারা। আমি উকিলদের সঙ্গে কথা বলেছি। একটা আইন আছে। সেই আইনের আওতায় আমরা আমাদের প্রেমের বাস্তবায়ন করতে পারি। এটিকে সিভিল ম্যারেজ বলে। এ কাজ আজই করতে পারি, তুমি কী বলো ?’

তারা মাথা নিচু করে রইল। কথা বলতে পারল না।

‘আমি কাল সকালে এসে পড়ব। প্রস্তুত থেকো।’

তারা ঐ একই অবস্থায় জমে রইল। একটা কথাও ওর মুখ থেকে বেরুল না।

কুনওয়ার সাহেব চলে গেলেন। তারা ওখানে  মূর্তিবৎ বসে রইল। যে চালাক মহিলা পুরুষ মানুষের হৃদয় নিয়ে ছিনিমিনি খেলে, তাকে আজকে কেন বিচলিত দেখাচ্ছে ?

বিয়ের আর মাত্র একদিন বাকি। সবাই তারাকে অভিনন্দন জানাচ্ছে। থিয়েটারের সব কর্মকর্তা-কর্মচারী তাদের স্ট্যাটাস অনুযায়ী তারাকে উপহার দিচ্ছেন। কুনওয়ার সাহেবও তাকে একটা ভ্যানিটি ব্যাগভর্তি গহনা উপহার পাঠিয়েছেন। তাঁর কিছু ঘনিষ্ঠ বন্ধুবান্ধবও উপহার পাঠিয়েছেন। কিন্তু তারার সুন্দর মুখে আনন্দের কোনও ছাপ নেই। তাকে বিচলিত ও বিমর্ষ দেখাচ্ছে। গত চারদিন ধরে একটা প্রশ্ন তার মনের মধ্যে খোঁচাচ্ছে। তার কি কুনওয়ার সাহেবকে প্রতারিত করা ঠিক হবে ? যে লোকটি প্রেমের সাক্ষাৎ দেবতা, যিনি তার জন্য পরিবারের সকল বন্ধন ছিন্ন করেছেন, যার হৃদয় তুষারের শুভ্র, পর্বতের মতো বিশাল, তাকে সে কীভাবে প্রতারিত করবে ? নাহ, সে এতটা নীচ হতে পারে না। জীবনে অনেক তরুণের প্রেমিকার অভিনয় সে করেছে। অনেক প্রেমিক যুবককে স্বপ্ন দেখিয়েছে। কিন্তু কখনও সে দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়েনি। বিবেক কখনও তাকে দংশন করেনি। এবার এমন হবার কারণ কি তাহলে আগে কখনও কারও কাছ থেকে সে এমন ভালোবাসা পায়নি ?

সে কি কুনওয়ার সাহেবকে সুখী করতে পারবে ? অবশ্যই পারবে। এ ব্যাপারে তার সামান্যতম সন্দেহ নেই। মানুষের জীবনে অসম্ভব বলে কি কিছু আছে ? কিন্তু সে কি স্বাভাবিকতাকে প্রতারিত করতে পারবে ? অস্তায়মান সূর্য কি মধ্যাহ্নের আলো বিকিরণ করতে পারে ? অসম্ভব। সেই শক্তি সে পাবে কোত্থেকে ? সেই ক্ষিপ্রতা, উচ্ছ্বাস, সারল্য, ধ্যান, আত্মবিশ্বাস―এই সব কিছুর সমন্বয়কেই তো বলা হয় যৌবন। যতই চেষ্টা করুক, কুনওয়ার সাহেবকে সে সুখী করতে পারবে না। বুড়ো ষাঁড় কখনও বাছুরের সঙ্গে দৌড়ে জিততে পারে না।

আহ, ব্যাপারটাকে সে কেন এতদূর গড়াতে দিল ? কুনওয়ার সাহেবকে কেন সে কৃত্রিম সাজগোজ দেখিয়ে প্রতারিত করল ? এত কিছু ঘটার পর সে আর মুখ দেখাবে কীভাবে ? এখন কীভাবে বলবে যে, সে শুধুই একটি রং করা পুতুল ? অনেক আগেই ওর যৌবন বিদায় নিয়েছে। এখন যেটুকু বাকি রয়েছে, তা হলো শুধুই বিগত যৌবনের ফেলে আসা অপস্রিয়মাণ পদচিহ্ন।

তখন মধ্যরাত। তারা একটা টেবিলের সামনে বসে আছে। অনেক ভাবনায় নিমজ্জিত। টেবিলে উপহারের স্তূপ জমে গেছে। সেগুলোর দিকে একদম তাকাচ্ছে না। মাত্র চারদিন আগেও এই জিনিসগুলোকে সে প্রাণের চাইতেও বেশি ভালোবাসত। সে শুধু এখন কালক্ষেপণ করতে চাচ্ছে। এখন এই উপহারসামগ্রীকে ঘৃণা করে। প্রেমই সত্য। এতে মিথ্যার কোনও প্রশ্রয় নেই। তারা ভাবলো, সে এখনও এখান থেকে পালিয়ে যাচ্ছে না কেন ? এমন কোথাও সে চলে যাবে যেখানে কেউ তাকে চিনবে না। তারপর কিছুদিন পর কুনওয়ার যখন বিয়ে-শাদি করবেন, তখন সে ফিরে এসে তাঁকে বলবে আসলে কী ঘটেছে এবং কেন ঘটেছে। এই মুহূর্তে কুনওয়ার এসব শুনলে বজ্রাহত হবেন। আহা, কী অবস্থা যে হবে বেচারার! কিন্তু তারার জন্য আর কোনও পথ খোলা নেই। এখন থেকে তার দিন কাটবে শুধুই অশ্রুপাত করে। তার যতই কষ্ট হোক, সে তার প্রেমিককে ঠকাতে পারবে না। তার জন্য এই স্বর্গীয় প্রেমের স্মৃতি, এর বেদনাই যথেষ্ট। এর বেশি কিছুতে তার কোনও অধিকার নেই।

বাড়ির কাজের মহিলা এসে বলল, ‘বাঈজি, আসুন, কিছু খেয়ে নিন। এখন রাত বারোটা বাজে।’

তারা বলল―‘নাহ, আমার একদম খিদে পায়নি। তুই যা, খেয়ে নে।’ কাজের মহিলা বলল, ‘দিদি, আমার কথা কিন্তু ভুলে যাবেন না। আমিও আপনার সঙ্গে যাব।’

তারা, ‘তুই কি ভালো কাপড়-চোপড় কিনেছিস ?’

কাজের মহিলা, ‘বাঈজি, ভালো কাপড়-চোপড় দিয়ে আমি কী করব ? আপনার ব্যবহার করা কিছু কাপড়-চোপড় আমাকে দিয়ে দিন।’

কাজের মহিলা চলে গেল। তারা ঘড়ির দিকে তাকাল। এখন সত্যিই রাত বারোটা বাজে। আর মাত্র ছয় ঘণ্টা বাকি আছে। সকাল হলেই কুনওয়ার সাহেব তাকে মন্দিরে নিতে আসবেন। ওখানেই বিয়ে হবে। ‘হায় ভগবান! এত বছর যা আমাকে দাওনি, আজকে কেন তা তুমি দিচ্ছো ? এই কি তোমার লীলা ?’

তারা একটি সাদা শাড়ি পরল। সব গহনা খুলে ফেলল। উষ্ণ পানি প্রস্তুত। সাবান জলে মুখটা ধুয়ে নিল। তারপর আয়নার সামনে দাঁড়াল। সৌন্দর্য কোথায় ? যে চাকচিক্য সবাইকে আকর্ষণ করে, তা এখন কোথায় ? চেহারা তো একই রয়ে গেছে। কিন্তু জৌলুস কোথায় ? সে কি এখনও তরুণী হওয়ার ভান করে যাবে ? আর এক মুহূর্তও ওখানে থাকা ওর জন্য কঠিন হয়ে গেল। যে গহনা আর প্রসাধনসামগ্রী টেবিলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল, সেগুলো ওকে কটাক্ষ করতে লাগল। কৃত্রিম জীবনটা ওর কাছে অসহনীয় হয়ে উঠল। শীতল বাড়িটা পর্দায় সাজানো হয়েছে। এখন ইলেক্ট্রিক ফ্যান ওর কাছে চুল্লির মতো মনে হচ্ছে।

ভাবলো, সে কোথায় পালাবে ? ‘যদি ট্রেনে রওনা দিই, তো বেশিদূর যেতে পারব না। সকাল হতে না হতেই কুনওয়ার সাহেব আমাকে খুঁজে আনার জন্য তাঁর লোক লস্কর পাঠিয়ে দেবেন।’ তাকে এমন একটা পথ বেছে নিতে হবে যেটার কথা কেউ ভাবতেই পারে না।

তারার হৃদয় গর্বে ভরে উঠল। এখন আর সে অসুখীও নয়, হতাশও নয়। সে আবার কুনওয়ার সাহেবের সঙ্গে দেখা করবে। তবে সে সাক্ষাতের কোনও উদ্দেশ্য থাকবে না। প্রেমের পথে যেটুকু দরকার সেটুকু পথ সে পাড়ি দেবে। সে কেন অসুখী, হতাশ হবে ?

হঠাৎ তার মনে পড়ে গেল―এখানে তাকে দেখতে না পেয়ে কুনওয়ার সাহেব বেপরোয়া কিছু একটা কি করে ফেলবেন ? এ কথা ভেবে তার মনটা ভয়ে জড়সড় হয়ে গেল। মুহূর্তের জন্য তার সংকল্পে তাকে দুর্বল মনে হলো। এবার টেবিলে বসে চিঠি লিখতে শুরু করল :

প্রিয়তম,

আমাকে মাফ করে দিও। আমি তোমার দাসী হবারও যোগ্য নই। তুমি আমাকে যে প্রেম দিয়েছো, এ জনমে আমি তা আশা করিনি। এটিই আমার জন্য যথেষ্ট। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আমি এই প্রেম লালন করব। আমার মনে হয়, প্রেমের স্মৃতি মধুর। এটির পূর্ণতায় যে আনন্দ পাওয়া যায়, তার চাইতে এর স্মৃতিই বেশি আনন্দের। আমি আবার এসে তোমার সঙ্গে দেখা করে যাব। তবে এখন নয়। যখন তুমি কাউকে বিয়ে করে ঘরে তুলবে, তখন। আমার ফেরার শর্ত এটাই।

প্রিয়তম, আমার ওপর রাগ করো না। যে গহনাগুলো তুমি আমাকে পাঠিয়েছ সেগুলো তোমার হবু স্ত্রীর জন্য রেখে গেলাম। তোমার প্রথম উপহার মুক্তার হারটা আমি রেখে দিলাম আমার জন্য। তোমাকে হাতজোড় করে অনুরোধ করি, আমাকে আর খোঁজার চেষ্টা করো না। আমি তো তোমারই। তোমারই থাকব চিরকাল।

ইতি

তোমার তারা

লেখার পর তারা চিঠিটি টেবিলে রাখল। মুক্তার হারটা পরে বেরিয়ে এল। থিয়েটার হল থেকে সঙ্গীতের সুর ভেসে এল। মুহূর্তের জন্য তার পা থমকে দাঁড়াল। পনেরো বছরের সম্পর্ক আজ ভেঙ্গে যাচ্ছে। ঠিক ঐ সময় সে ম্যানেজারকে এদিকে আসতে দেখে। হৃৎযন্ত্রটা যেন থেমে যায়। একটা দেয়ালের পেছনে লুকিয়ে পড়ে। ম্যানেজার চলে যাওয়া মাত্রই সে বেরিয়ে আসে। কয়েকটা গলি পেরিয়ে গঙ্গা নদীর দিকে চলে যাওয়া পথটি ধরে এগিয়ে চলে।

নদীর ধারে তখন সুনসান নিস্তব্ধতা। পাঁচ-দশজন পুরোহিত ধোঁয়া উঠতে থাকা আগুনের পাশে শুয়ে আছে। কয়েকজন তীর্থযাত্রী কম্বল বিছিয়ে ঘুমাচ্ছে। বিশাল এক সাপের মতো গঙ্গা অনবরত বয়ে চলেছে। নীরবে। ছোট্ট একটা নৌকা তীরে ভীড়ানো ছিল। মাঝি নৌকায় বসা।

তারা মাঝিকে ডাকে, ‘ও মাঝি ভাই, আমাকে কি নদী পার করে দেবে ?’ মাঝি বলে, ‘এত রাতে নৌকা চলবে না।’

দ্বিগুণ ভাড়ার কথা শুনে মাঝি বৈঠা হাতে নেয়। নৌকার দাড় খুলতে খুলতে জিজ্ঞেস করে, ‘মহাশয়া, ওপারে কোথায় যাবেন ?’

‘নদীর ওপারে একটা গ্রামে যেতে হবে।’

‘কিন্তু এত রাতে তো কোনও যানবাহন পাবেন না।’

‘কোনও ব্যাপার নয়। তুমি শুধু আমাকে ওপারে নিয়ে চলো।’

মাঝি নৌকা ছেড়ে দেয়। তারা নৌকায় চুপচাপ বসে থাকে। ধীরে ধীরে নৌকা এগিয়ে চলে। তারা দেবীও যেন স্বপ্নের দোলায় ভেসে চলে।

সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button