ভ্রমণ : অতলান্তের ওপারের স্বর্গ : কামরুল হাসান

ভিসা কাহিনি
ভিসা অফিসার আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি আমেরিকা যেতে চাও কেন ?’
বললাম, ‘আমি একজন ভ্রামণিক এবং ভ্রমণকাহিনি লেখক, আমেরিকা ভ্রমণ করে একটি ভ্রমণকাহিনি লিখতে চাই।’
ভিসা অফিসার কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করেন, ‘তুমি ভ্রমণকাহিনি লেখো ?’
তখন আমার বিলেতের দিনলিপি ও মহাদেশের মতো এক দেশে বই দুটো পুরু কাচের এপাশ থেকে তুলে ধরি। দুটো বই-ই ৪০০ পৃষ্ঠার। তিনি বাংলা পড়তে পারেন না। কিন্তু দেখলেন বই দুটির একটির প্রচ্ছদে লন্ডনের পার্লামেন্ট হাউজের জগদ্বিখ্যাত ঘড়ি বিগ বেন, অন্যটির প্রচ্ছদে জগদ্বিখ্যাত স্থাপত্য নিদর্শন সিডনি অপেরা হাউসের ছবি। দুটিই শিল্পী দেওয়ান মিজানের তুলিতে আঁকা। দুটি দেশের দুটি আইকনিক স্থাপনা চিনে নিতে আমেরিকান ভিসা অফিসারের ভুল হলো না। ভিসার ব্যাপারে পজিটিভ সাড়া মিলল।
আমাকে ভিসা দেবার ব্যাপারে দূতাবাসের দৃষ্টিভঙ্গি পজিটিভ হলেও সমস্যা ছিল দুটো। আমার পুরোনো পাসপোর্টটির মেয়াদ ছিল মাত্র ছয় মাস। আমেরিকান ভিসা অফিসারের মুখোমুখি হবার আগে একজন বাংলাদেশি নারী কর্মকর্তা আমাকে বলেছিল নতুন পাসপোর্ট ইস্যু করে নিতে। কারণ যে সময়ে আমি আমেরিকা যাবার পরিকল্পনা করছিলাম সে সময়ে আমার পাসপোর্টের মেয়াদ থাকবে না। দ্বিতীয় সমস্যা হলো আমার তুরস্ক ভ্রমণ। সে সময়ে তুরস্কে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ছিল আমার বন্ধু মসয়ূদ মান্নান। তার আমন্ত্রণে আমি আগেই ঠিক করে রেখেছিলাম তুরস্ক যাব। তুরস্কের ভিসাও ছিল। আমি চলে গেলাম তুরস্ক। আমি খেয়াল করিনি যে তুরস্ক হলো ইসলামিক স্টেটে যাওয়ার গেটওয়ে। এক, আমার নামে মোহাম্মদ ও হাসান আছে, তাদের সন্দেহ হলো আমার কোনও জঙ্গি ইতিহাস বা সম্পৃক্ততা রয়েছে কিনা। দূতাবাস থেকে একগাদা প্রশ্ন এল যার ভেতর ছিল গত ১৫ বছরে আমি যেসব ঠিকানায় থেকেছি, যে কটি টেলিফোন ব্যবহার করেছি, অতীতে ব্যবহৃত পাসপোর্টসমূহের নাম্বার, আমার কর্মস্থলের বিবরণ, আমার সন্তানদের বিবরণ, আমার বিদেশভ্রমণের বৃত্তান্ত ইত্যাদি লিখিতভাবে জানানো। আমি যথারীতি সব উত্তর সুবোধ বালকের মতো লিখে পাঠিয়ে দিই।
মাসের পর মাস যায়, একটা বছর গড়িয়ে গেল, কোনও সাড়া পাই না। দশ বছর মেয়াদি নতুন ই-পাসপোর্ট দূতাবাসে পড়ে আছে দীর্ঘদিন। আমি কোথাও যেতেও পারি না। ২০২৩ সালের প্রথম দিকে ভারতে দুটো সাহিত্য উৎসবের আমন্ত্রণ পাই, কিন্তু বাধা হয়ে দাঁড়ায় পাসপোর্ট আটকে থাকা। তখন কিছুটা বাধ্য হয়েই আমেরিকান দূতাবাসের হেল্প ডেস্কে আমার পাসপোর্ট ফেরত চাই। বলি তোমাদের অনুসন্ধান বা প্রক্রিয়া তোমরা চালিয়ে যাও, পাসপোর্ট ফেরত দাও। ওরা বলে, তুমি কি নিশ্চিত যে পাসপোর্ট ফেরত নেবে ? দৃঢ়ভাবে বলি, হ্যাঁ। পাসপোর্ট হাতে নিয়ে পাতা খুলে আমি যুগপৎ বিস্মিত ও আনন্দিত। আমেরিকার ভিসা জ্বলজ্বল করছে। পাঁচবছর মেয়াদি মাল্টিপল এন্ট্রি ভিসা।
ভিসা তো পেলাম, টিকেটের টাকা কোথায় পাই ? আটলান্টিকের ওপারে যেতে কড়ি লাগবে লক্ষ টাকার উপরে। কী ভেবে ফেসবুকে একটা খোলা চিঠি লিখি, যে আমার টিকেট স্পন্সর করবে আমেরিকা ভ্রমণকাহিনি তাকে উৎসর্গ করব। ফেয়ার ডিল। অনেক মানুষের কাছে এক লক্ষ টাকা হলো এক হাজার টাকার মতো, কারও কারও কাছে একশ টাকার মতো। আর জগৎ চলছে স্পন্সরশিপে। ফেসবুকে আমার এ পোস্ট দেখে আমার বন্ধু, আত্মীয় ও শুভানুধ্যায়ীদের কেউ কেউ বলল, তাদের টাকা থাকলে তারাই আমাকে আনন্দের সাথে স্পন্সর করত। কেউ কেউ, দূরের যারা, আমাকে আক্রমণ করল আমি কেন সাহায্য চাইছি বলে। হয়তো তারাও আমাকে ভালোবাসে, আমার প্রস্তাব তাদের কাছে আত্মমর্যাদার জন্য ক্ষতিকর মনে হয়েছে। আমি কলম্বাস কিংবা ইবনে বতুতা নই, কিন্তু কেবল ওই দুজন নয়, জগতের অসংখ্য অভিযাত্রা সংঘটিত হয়েছে অনুদানে। আমি আমেরিকা আবিষ্কার করব না সত্যি, কিন্তু আমেরিকাকে আবিষ্কার করব আমার গদ্যে। পুষ্পবৃষ্টি ও বিষাক্ত তীরের যুগপৎ বরণ ও বর্জনের সেই প্লাবনে আমি দ্রুত ফেসবুক থেকে পোস্টটি মুছে ফেলি।
পোস্টটি যাদের নজরে পড়ে তাদের একজন ড. ফজলুজ জামান আরমান আমার শিক্ষকতা জীবনের প্রথম দিককার, আমি যখন ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটিতে পড়াতাম, তখনকার একজন ছাত্র। মেধাবী আরমান বিদেশ থেকে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করে কালক্রমে ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটিতে আমার সহকর্মী হিসেবে যোগদান করেছিল। আরও উচ্চতর পড়াশোনা ও অভিবাসনের জন্য সে চলে যায় অস্ট্রেলিয়া। আরমানের কিছু বকেয়া পাওনা ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ে। সে আমাকে অনুরোধ করল টাকাটা তুলে আমেরিকার টিকেট কিনে নিতে। আমি রাজি হই না, কিন্তু আরমান নাছোড়বান্দা। কী করে যেন কথাটা চাউর হয়ে যায়। বেশির ভাগ বাঙালির যা স্বভাব বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু কর্মচারী কী করে টাকাটা আটকানো যায় সে ফন্দিফিকির করতে থাকে। মাস গড়ায়, টাকাটা রিলিজ হয় না। আরমান তখন ক্ষিপ্ত হয়ে একটি চিঠি লেখে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে। তখন টনক নড়ে এবং টাকাটা রিলিজ হয়, কিন্তু পুরো টাকা নয়, কিছু টাকা কর্তিত হয় ‘আগে ছিল না, পরে ব্যবহৃত’ নিয়ম দেখিয়ে। যা হোক টাকা হাতে পেয়েই আমি ছুটি প্লেনের টিকেট কাটতে।
প্রতিটি এয়ারলাইন্স আমেরিকা যাবার পথে যার যার বাড়ি (হাব) ঘুরে যায়। এমিরেটস হলে দুবাই, কাতার এয়ারওয়েজ হলে দোহা, টার্কিস এয়ারওয়েজ হলে ইস্তাম্বুল। আমি অপেক্ষাকৃত সাশ্রয়ী টার্কিশ এয়ারওয়েজের টিকেট কাটি। এতে আগেও কয়েকবার চড়েছি, এয়ারলাইন্সটি আমার চেনা। আর চেনা জগতের অন্যতম আকর্ষণীয় বিমানবন্দর ইস্তাম্বুল, নেপোলিয়ন যে নগরীকে বলেছিলেন দুনিয়ার রাজধানী।

প্রস্তুতির কাল
বসন্তকালীন আর গ্রীষ্মকালীন দুটো সেমিস্টারের মধ্যে পড়েছে যে আম পাকার মৌসুম ও কোরবানি ঈদের উৎসব সে সময়টাকে বেছে নিই মার্কিন মুলুকে যাবার সময় হিসেবে। ৩ জুন যাত্রা শুরু আর ২১ জুন ফিরে আসা। সেমিস্টার ব্রেক বলে আমার কোনও ক্লাস মিস হবে না, ছুটিও নিতে হবে না। এই প্রথম পৃথিবীর এক নম্বর দেশ (তার টেলিফোন কোডও ১) আমেরিকা যাচ্ছি। যাচ্ছি যখন আমার অপরাহ্নবেলা, যেতে পারতাম সাত সকালেই, যখন আমার বয়স ছিল কুড়ির কোঠায়। আমেরিকার কোনও একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে বৃত্তি নিয়ে উচ্চতর পড়াশোনার যোগ্যতা আমি অর্জন করেছিলাম স্কুল ও কলেজ লেভেলে জাতীয় পর্যায়ে ফলাফল করে। কিন্তু তখন আমি জড়িয়ে আছি এমন এক প্রেমে যাকে মনে হতো আমেরিকা যাওয়ার চেয়ে চিত্তাকর্ষক! ছলনাময়ীর মায়ায় রয়ে গেলাম স্বমৃত্তিকায় প্রোথিত বটের মতো। দ্বিতীয়বার আমেরিকা যাবার সুযোগ তৈরি হলো আইআইটি খড়গপুর থেকে বিমানপ্রকৌশল বিদ্যায় স্নাতক ডিগ্রি লাভের পর। মা ও ছোট ভাইটিকে দেখভালের দায়িত্ব নিতে বাংলাদেশে ফিরে এসেছিলাম। ভেবেছিলাম কিছুটা গুছিয়ে শ্যাম চাচার দেশে যাব। সে গোছানো আর হলো না। তৃতীয়বার সুযোগ এল বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সে চাকরি নেবার পরে যখন প্রায় নিখরচায় বিমানের টিকেট পাওয়া যেত। চতুর্থ সুযোগ ছিল ১৯৯২ সালে আমি যখন প্রথমবারের মতো বিলেতে যাই। ফেরার আগে মার্কিন মুলুকে একবার ঢুঁ মেরে আসা যেত হয়তো। হয়নি কোনওটাই, যখন হলো তখন আমার বেলা যে যায়…
যাইনি সত্যি, কিন্তু আমেরিকা যাওয়ার আকাক্সক্ষা আমার বরাবরই প্রবল ছিল। প্রবল বলা বোধহয় সঠিক হলো না। কেননা, প্রবল হলে তো আমি চলেই যেতাম। আমি চেয়েছি সুবিধামতো যেতে। সেই সুবিধা আমার বহু বছরে হয়নি। না হওয়ার দুটো কারণ। এক মার্কিন ভিসা পাওয়ার জটিলতা আর যাত্রার খরচ। দীর্ঘ সময় ধরে আমি যৎসামান্য যা উপার্জন করেছি তা ব্যয় হয়েছে আমার চার সন্তানের শিক্ষায়। আমার বেশির ভাগ বিদেশভ্রমণ মূলত ঘটেছে প্রতিষ্ঠানের অর্থে। তিনবার বিলেতে গিয়েছি―দুবার ব্রিটিশ কাউন্সিল, একবার ওয়ার্ল্ড ব্যাংক অর্থ জুগিয়েছে। ইস্টওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির বিতর্কদল নিয়ে গিয়েছি ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ড। আরেকবার থাইল্যান্ড ও শ্রীলঙ্কা গিয়েছিলাম ইউএনডিপির টাকায়। কাফকোর অর্থায়নে পাকিস্তান, ব্রিটিশ কাউন্সিলের অর্থায়নে ব্রিটেন ও ভারত, সোনারগাঁও হোটেলের অর্থায়নে সিঙ্গাপুর গিয়েছি। আমার ছোট ভাই নিয়ে গিয়েছিল উজবেকিস্তান। সর্বশেষ সৌদি আরব ভ্রমণও স্পন্সরড। নিজের টাকায় আমি গিয়েছি তুরস্ক, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, নেপাল ও ভারত। তবে সেসবেও আংশিক স্পন্সরশিপ ছিল। দিল্লিতে সার্ক সাহিত্য উৎসবে যোগ দিতে গিয়েছি বিমানের টিকেট কিনে কিন্তু লোকাল হসপিটালিটি পেয়েছি, নেপালেও তাই। একবার পরিবারের সবাইকে নিয়ে ভ্রমণ করেছি মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর। আমরা ভারতেও গিয়েছি একসঙ্গে। এই হলো আমার ভ্রমণ ইতিহাস, উড়ে উড়ে পৃথিবী দেখার আকাক্সক্ষা থেকে অধ্যয়ন করেছিলাম বিমান প্রকৌশল শাস্ত্র। কিন্তু আমার বিমানটি খুব বেশি উড়তে পারেনি।
আমেরিকা যাব জুনে, টিকেট কিনে রেখেছি তিন মাস আগে মার্চে, যাতে সাশ্রয়ী মূল্যে টিকেট পাই। উড্ডয়নের দিন যত এগোয়, সিট যত ভরতে থাকে তত চড়তে থাকে টিকেটের দাম। সে চক্করে পড়তে চাইনি। আর টিকেট কেটে রাখা মানে কথা ফাইনাল, আর কোনও নড়নচড়ন হবে না। আমি হলাম সেই ভ্রামণিক যে খুব একটা পরিকল্পনা করে বেড়ায় না, এলোমেলো ভাবটিই ভালো লাগে, আর ভ্রমণ হলো উপন্যাস লেখার মতো। লিখতে বসলে কত সব চরিত্র আর ঘটনা এসে যে জড়ো হয়! কিন্তু মার্কিন দেশটি এত বিশাল যে সঠিক পরিকল্পনা না হলে হয়তো তার এক কোনাও ভালো করে দেখা হবে না, কিংবা ঘুরতে হবে এক রাধাচক্করে। তাই পরিকল্পনা করি কোথায় কোথায় যাওয়া যায়।
আমেরিকাতে আমার রয়েছে একগাদা বন্ধুবান্ধব। তারা কেউ কৈশোরের, কেউ প্রথম যৌবনের। সহপাঠীদের সংখ্যাই বেশি। এরপরে বড় দলটি হলো কবি-লেখকগণ। আত্মীয়স্বজন কিছু আছেন আর আছে আমার ছাত্রছাত্রীদের একাংশ। উচ্চচাপ অঞ্চল থেকে বায়ু যেভাবে নিম্নচাপ অঞ্চলে চলে যায়, তেমনি গোটা পৃথিবীর মানুষ গিয়ে জড়ো হচ্ছে মার্কিন মুলুকে। বাংলাদেশ বা পার্শ্ববর্তী ভারতে এই উচ্চচাপটি প্রবল।
আমাকে আমেরিকায় আগেভাগেই বুক করে রেখেছিলেন ঘুংঘুর সম্পাদক, কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন কবির। বুক অর্থ আমি যখনি আমেরিকায় যাব টেনেসির জেরিকো শহরে তার অতিথি হবো। আর আমন্ত্রণ জানিয়ে রেখেছে আমার ছাত্রী মারিয়া সাইনা, যে থাকে পোর্টল্যান্ডে। নিউ ইয়র্ক থেকে দুটোই ঢের ঢের দূরে। আমার শখ হলো নিউ ইয়র্কেই থাকা, হাডসন নদীতে ভেসে স্ট্যাচু অব লিবার্টি দেখতে যাওয়া আর প্রকৃতির অনুপম বিস্ময় নায়াগ্রা জলপ্রপাত দেখা।
একদিন দেখা হলো আমার নতুন তিন আত্মীয়বাড়ির একটি বাড়ির এক সদস্যের সাথে। আমার যমজ পুত্রদের একজনের শাশুড়ির বড় বোন তিনি। আমি আমেরিকা যাব শুনে লায়লা আপা বললেন তিনিও যাচ্ছেন আমেরিকায় তার একমাত্র মেয়ের কাছে। আমাকে আমন্ত্রণ জানালেন বাল্টিমোর যেতে। নি উইয়র্ক থেকে সে নাকি বেশি দূরে নয়। যদি যাই তবে বাল্টিমোর থেকে আমেরিকার রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে একচক্কর ঘুরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতিও দিলেন। লোভনীয় মনে হলো সে প্রস্তাব। ওয়াশিংটন ডিসি যাব শুনে ডা. হুমায়ূন কবির বললেন রিচমন্ড যেতে, কেননা রিচমন্ড সুন্দর আর ডিসির নিকটেই। সবচেয়ে বড় কথা সেখানে তার এক বোন থাকে যে আমাকে আতিথ্য দেবে। পরে আমি দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে যাব টেনিসির জেরিকো শহরে।
ইতিমধ্যে যোগাযোগ হয়েছে কলেজ জীবনের তিন বন্ধুর সাথে। আমাদের সময়কার ঢাকা বোর্ডে ফার্স্ট ড. গোলাম সামদানী, ডা. জুবায়দুর রহমান শিবলী ও আওয়াম চৌধুরীর সাথে। তবে এরা কেউই নিউ ইয়র্কে থাকে না, সামদানী নিউ হ্যাভেনে, শিবলী ফ্লোরিডায় আর আওয়াম আটলান্টায়। সম্প্রতি আমাদের ঢাকা মেডিকেল কলেজের কে-৩৭ ব্যাচের সহপাঠীদের ছবি ও বায়োডাটাসহ একটি চমৎকার ই-বুক তৈরি করেছে ড. সৌদ আনোয়ার। তাতে পেয়ে গেলাম আমেরিকা প্রবাসী সকল বন্ধুর টেলিফোন নাম্বার, এমনকি বাড়ির ঠিকানা। আমার ধারণাই ছিল না যে আমেরিকায় সেটেল করেছে আমাদের ব্যাচের পঁচিশজন চিকিৎসক বন্ধু। আমি একটি স্ট্যান্ডার্ড চিঠি লিখে সবাইকে ই-মেইল করি, চিঠি একই, নাম আর ই-মেইল অ্যাড্রেস আলাদা। এই পঁচিশজনের ভেতর এমন সহপাঠীর সংখ্যা কম নয় যাদের সাথে সেই মেডিকেল কলেজ ছাড়ার পরে অর্থাৎ গত চল্লিশ বছরে দেখা হয়নি, যোগাযোগও হয়নি। না-দেখার, কথা না-বলার ধুলো এতটা পুরু হয়েছে যে নাম-চেহারা বিস্মৃত হয়ে যাওয়াও অলীক নয়। বেশির ভাগ নিরুত্তর রইলে আমি যে আঁধারে সেই আঁধারেই রয়ে গেলাম।
অন্ধকারে প্রথম যে দুজন আলো জ্বালাল তাদের একজন ডা. আশরাফুল হান্নান শাহীন। আমার বেশ ঘনিষ্ঠ বন্ধু, যদিও তার সাথে, আমারই অবহেলায়, সংযোগ ছিল না। শাহীন জানাল সে পুরো পরিবার নিয়ে মক্কায় হজ করতে যাচ্ছে, নইলে আমেরিকার পুরো সময়টা আমি তার সাথেই কাটাতে পারতাম। কথা সত্যি, শাহীন যখন ইংল্যান্ডে ছিল তখনও আমি তার সান্নিধ্যে থেকেছি। দ্বিতীয়জন গোলাম কিবরিয়া, আমরা বলি বড় কিবরিয়া, চিকিৎসাশাস্ত্রে অনেক উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেও থেমে নেই, এই অগ্রগামী বয়সে পিএইচডি করছে। আগস্টে তার থিসিস সাবমিশন, প্রফেশনাল সার্ভিসের পাশাপাশি ওই চাপে সে দিশেহারা।
ই-মেইল অনেক সময় চোখ এড়িয়ে যায় ভেবে আমি সহপাঠীদের হোয়াটসঅ্যাপে দ্বিতীয়বার নক করি। সমস্যা হলো সকলে হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহার করে না। যারা করে তাদের একজন ডা. নাফিজ আহমেদ খান, আমাদের সময়কার তুমুল বিতার্কিকদের অন্যতম, চিঠির উত্তর নয়, টেলিফোন তুলেই জিজ্ঞেস করল, ‘কামরুল, তুই কবে আসবি আমেরিকা ? কোনও সমস্যা নেই, পুরো সময়টা আমার কাছে থাকবি।’ দেখলাম বন্ধুত্ব হলো পুরোনো মদের মতো, বাসি হয় না কখনও। সমস্যা দুটো, নাফিস থাকে লং আইল্যান্ডে, বড়লোকদের অঞ্চল সেটা আর সে কারণে পাবলিক ট্রান্সপোর্ট নেই। দ্বিতীয় সমস্যা, জুনের প্রথম দিকটায় নাফিস নিউ ইয়র্কে থাকবে না।
কোথায় উঠব আর কে আমাকে এয়ারপোর্ট থেকে তুলে নিয়ে ফেলবে তার ডেরায় যখন ভাবছি তখন অভাবিত ঘটনা ঘটল। সম্প্রতি কাশবন সাহিত্য পত্রিকা পুরস্কার গ্রহণ করতে গোপালগঞ্জ শহরে গিয়েছিলাম। সে ভ্রমণ অভিজ্ঞতা নিয়ে লিখেছিলাম একটি সিরিজ। তা নজরে পড়ল গোপালগঞ্জের সন্তান কথাসাহিত্যিক কুলদা রায়ের। তার সাথে মেসেঞ্জারে কথা বলতে গিয়ে যখন জানালাম আমি নিউ ইয়র্ক যাচ্ছি, আমার আকাশতরী নামবে জন এফ কেনেডি (জেএফকে) এয়ারপোর্টে, তখন কুলদা রায় বলল, তার বাড়ি জেএফকে থেকে কুড়ি মিনিট ড্রাইভিং দূরত্বে। সে আমাকে সহজেই রিসিভ করতে পারবে। কখনও সাহায্য আসে অভাবিত সব দিক থেকে―এ হলো তার উদাহরণ।

যাইব আমেরিকা, ঘুরিব সুখে
‘আমেরিকা প্রবাসী’ বলা আর ঠিক হবে না। কেননা তারা দীর্ঘকাল ধরেই বসবাস করেন আমেরিকায়, তারা পুরোদস্তুর আমেরিকার নাগরিক। এ যেমন সত্যি আমার পঁচিশজন চিকিৎসক বন্ধুর বেলায়, তেমনি সত্যি নিউ ইয়র্ক নিবাসী কবি-লেখক বন্ধুদের জন্য। আমাকে নিউ ইয়র্কে স্বাগত জানাতে সদাই প্রস্তুত কবি ও সম্পাদক ফারুখ ফয়সাল। তিনি দৈনিক প্রথম আলোর উত্তর আমেরিকা সংস্করণের সাহিত্য পাতাটির সম্পাদক, যে পাতায় আমি মাঝেমধ্যে লিখি। আমি নিউ ইয়র্ক যাব শুনে তিনি আহ্লাদিত, পুরো একটি দিন আমাকে নিয়ে ঘোরার পরিকল্পনা করে ফেললেন। কেবল হাডসন নদী পেরিয়ে স্ট্যাচু অব লিবার্টি দেখা নয়, আমাকে নিয়ে যাবেন ভাটির এক দ্বীপে। কবি কাজী জহিরুল ইসলাম পরিকল্পনা করলেন জাতিসংঘ সদর দপ্তর দেখানোর। কথা হলো প্রাবন্ধিক ও গবেষক আহমাদ মাযহারের সাথে, মেসেজ পাঠালাম প্রাবন্ধিক আবেদীন কাদেরের কাছে। কবি হাসানআল আব্দুল্লাহ নিউ ইয়র্কে স্বাগত জানালেন। এরা সকলেই বললেন, আসুন দেখা হবে, আড্ডা হবে।
ধীরে জেগে উঠতে শুরু করলেন আমার চিকিৎসক বন্ধুরা। সাঈদা রহমান, সানজিদা জাফর বাবলি, চৌধুরী হাফিজুল আহসান, জাকিয়া নুরুদ্দিন, বজলুর রশীদ, আতিয়ার রহমান বনি, আফরোজা বেগম মিনি। শেষোক্ত দুজন স্বামী-স্ত্রী, তারা থাকেন হিউস্টনে। হিউস্টনে আরও থাকেন আমারই মতো দলছুট জামালউদ্দিন মনজুর। মেডিকেল ছেড়ে মনজুর চলে গিয়েছিল সৌদি আরব পেট্রোলিয়াম ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে। তেলসমৃদ্ধ আমেরিকার দক্ষিণের ওই অঞ্চলে এ যাত্রায় বেড়ানোর কোনও পরিকল্পনা নেই আমার। সানজিদা লন্ডন যাবে জুনে, বাকিরা শববঢ় রহ ঃড়ঁপয বলল। সাঈদা রহমান থাকে বোস্টনে, শুধাল আমি বোস্টন যাব কিনা। ম্যাপে দেখি খুব দূরে নয়, বাসে বা ট্রেনে সাড়ে তিন ঘণ্টা লাগে। আরেক চিকিৎসক বন্ধু রুহুল আবিদ লেখনও থাকে বোস্টনে। সে হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের অধ্যাপক। আমেরিকায় আমি যা কিছু দেখতে চাই তার ভেতর রয়েছে জগতের দুই শ্রেষ্ঠ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান―হার্ভার্ড ও এমআইটি, দুটোই ওই বোস্টনে। ঠিক হলো একদিনের জন্য হলেও আমি বোস্টন যাব।
সব ঠিক হলো ৪ তারিখে স্ট্যাচু অব লিবার্টি, ৫ তারিখে জাতিসংঘ সদর দপ্তর, ৬ তারিখে সাহিত্যসভা, ৭ তারিখে বাল্টিমোর। কিন্তু নিউ ইয়র্কে আমি থাকব কোথায় ? কেউ বলে হোটেলের কথা, কেউ বলে অরৎনহন, আর যারা জানে আমার সঙ্গতির কথা তারা বলে, এখন উপায় ? আমার স্ট্রাটেজি হলো আত্মীয়-বন্ধুদের সাথে থাকা, আমেরিকায় আমার ধপপড়সসড়ফধঃরড়হ নরষষ শূন্য করে রাখা। আমার আইআইটি খড়গপুরের বন্ধু, অনিকেত, পরমেশ গোস্বামী চিঠি লিখল সিনিয়র আইআইটিয়ান ইন্দ্রজিৎ দত্তকে, ‘কামরুল তো অতলান্তিক পাড়ি দিচ্ছে, ওকে ডাঙায় তোলো।’ ইন্দ্রজিৎদা বার্তা পাঠালেন কয়েকজন নিউ ইয়র্কবাসীকে যারা বাঙালি ও আইআইটি খড়গপুরের এলামনাই। এদেরই একজন হলেন অপূর্ব কুমার সাহা। তিনিও সিনিয়র, কিন্তু মনটা উদার। তিনি সব ভার নিতে চাইলেন। কিন্তু ততদিনে আমার পরিকল্পনা পুরোটাই পাল্টে গেছে।
আমি আমেরিকা যাব শুনে আমাদের ঠিক পরের ব্যাচের দেশসেরাদের একজন, তুখোড় মেধাবী, ড. কবির হাসান আমাকে প্রস্তাব পাঠাল নিউ অরলিয়ন্সে যাবার। সেখানকার বিশ্ববিদ্যালয়ে সে বহু বছর ধরেই অধ্যাপনা করছে। আমি বলি, সে তো অন্য প্রান্তে; কোথায় নিউ ইয়র্ক আর কোথায় নিউ অরলিয়ন্স। কবির যখন আমার পাসপোর্টের স্ক্যান কপি পাঠাতে বলল, তখুনি অনুমান করলাম কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে। ঘটল ঠিকই, কবির নিউ অরলিয়ন্সে যাবার এয়ারটিকেট পাঠিয়ে দিয়েছে। ঘনিষ্ঠরা বলল, দারুণ হলো। নিউ অরলিয়ন্সে গেলে ফরাসি সৌরভ পাবেন। কেননা, ওটা ছিল ফ্রান্সের কলোনি।
আমি একটি ভ্রমণ কর্মসূচি তৈরি করে বন্ধুদের পাঠালাম। তাতে দেখা যাচ্ছে যাত্রার ষধংঃ ষবম-এ আমার নিউ ইয়র্ক অবস্থান এত বেশি জ্যামপ্যাকড যে আদৌ স্ট্যাচু অব লিবার্টি দেখতে পাব কি না সন্দেহ। আমার চাচা জনাব জিয়াউল কুদ্দুস পই পই করে বলে দিয়েছেন আমি যেন স্ট্যাচু অব লিবার্টিকে তার সালাম পৌঁছে দিয়ে আসি। আমার অকৃত্রিম সুহৃদ ফারুখ ফয়সাল প্রস্তাব করলেন শেষ পর্বটি আমি যেন তার আবাসেই থাকি। তিনি অফিস থেকে ছুটি নিয়ে রাখবেন, আর পুরো চারদিন আমাকে নিয়ে নিউ ইয়র্কের অলিতে গলিতে ঘুরবেন, নিয়ে যবেন বাঙালিপাড়ায়, কালো আদমিদের ডেরায়। দেশ দেখা মানে তো শুধু বিল্ডিং দেখা নয়, বরং মানুষকে দেখা, সংস্কৃতিকে বোঝা, জীবনের স্পন্দনকে অনুভব করা, চেতনার গাঢ়রসে সিঞ্চিত করা জীবনের প্রবাহ আর নিউ ইয়র্ক হলো গোটা দুনিয়ার এক মিনি সংস্করণ সে অর্থে যে সেখানে বাস করে পৃথিবীর প্রতিটি জনপদের প্রতিনিধি। কিন্তু আমি যে আগেই বুকড। ১৭ তারিখ লং আইল্যান্ড, ১৮ তারিখে বোস্টন আর ১৯ তারিখ ম্যানহাটন।
যাদের সাথে কয়েকবার টেলিফোনে কথা হলো তাদের একজন হলেন ডা. জোবায়দুর রহমান শিবলী। কথা বলা পর্বে সে নিউ ইয়র্কেই ছিল, মে মাসের শেষ ভাগে চলে যায় ফ্লোরিডায়। আমাকে প্রতিদিনই ট্রাকিং করছিল সে, আমার আমেরিকা ভ্রমণকে নির্বিঘ্ন করতে তার আন্তরিকতা ছিল অনুপম। তবে তা সবই ছিল রহঃধহমরনষব, কেননা আমার মতোই সেও কিছুটা ভাসমান পদ্মপাতা ওই মহাসরোবরে। তার এক ভাগ্নির মাধ্যমে আমাকে এয়ারপোর্ট থেকে পিকআপ করতে চাইল সৌদি আরব নিবাসী কলেজ বন্ধু ডা. আনোয়ারুল হক, যার আতিথ্যে আমি গত ফেব্রুয়ারিতে এক সপ্তাহ ছিলাম রাজধানী রিয়াদে। কিন্তু সেটা হলো না, দরকারও নেই। উড়োজাহাজ হাডসনের কূলে ভিড়লে আমাকে তুলে নিবেন কুলদা রায়; আমি কূলচ্যুত হব না। কথা হলো ডা. কানিজ ফাতেমা বিউটির সাথে। সে জানাল জুনে সে থাকবে কানাডায় তার ছোট মেয়ের কাছে, আমার সাথে দেখা হবে না। আমি বললাম, যাও, আমি তো বিউটিকে দেখতে নিউ ইয়র্ক যাচ্ছি না, আমি যাচ্ছি আমেরিকার বিউটি দেখতে।
আমার আইআইটি খড়গপুর জীবনের বন্ধু শ্যামাপ্রসাদ মণ্ডল বাস করে ওয়াশিংটন ডিসিতে। সেখানে বাস করে চিকিৎসক বন্ধু মোহাম্মদ আসগর খান রতন। আমেরিকার রাজধানীতে যে দুদিন থাকব তা কোন নিবাসে কাটাব এ দ্বিধায় যখন বিচলিত তখন স্থির করি রতনের নিবাসে কাটাব দু রাত, দেখব আমেরিকার আইকনিক দালানকোঠা; কী কী রতন তারা সাজিয়ে রেখেছে তাদের রাজধানীতে। তৃতীয় প্রভাতে শ্যামা আমাকে নিয়ে ছুটবে রিচমন্ডের পথে, সেখানে প্রসাদ হিসেবে পাব টমাস জেফারসন আর জর্জ ম্যাডিসনের বাড়ি। পূর্ব উপকূলে বিধৃত আমেরিকার ইতিহাসের এক গৌরবময় পরিমণ্ডল ঘুরেই যাব সেই মন্ডপে যার নাম রিচমন্ড।
এদিকে আমাকে নিয়ে বিস্তারিত প্রোগ্রাম সেট করেছেন ঘুংঘুর নামক নদীটি সাথে নিয়ে যিনি ঘোরেন সেই ডা. হুমায়ূন কবির। কথা ছিল জেরিকোতে একটি দিন আমি কাটাব হাসপাতালের আইসিইউতে। না, আঁতকে ওঠার কিছু নেই, ওই হাসপাতালেই চিকিৎসাসেবা দেন ডা. হুমায়ূন কবির, আমার কাজ আমেরিকার চিকিৎসাব্যবস্থা প্রত্যক্ষ করা, স্বাস্থ্যসেবার ধরন ও পদ্ধতি নিয়ে ধারণা অর্জন। সময়াভাবে সেটা হলো না বলে তিনি পরিকল্পনা করলেন আমাকে নিয়ে যাবেন আটলান্টা শহরে এক কবি-লেখক সভায়। সেখান থেকেই উড়ে আসব নিউ ইয়র্ক নগরীতে।
কবি তাপস গায়েন নিউ ইয়র্কে থাকেন জানি। কবি রাজু আলাউদ্দিন যে দুবার নিউ ইয়র্কে গিয়েছিলেন, থেকেছেন, তার ভাষায়, ‘তাপসের ডানার নিচে’। সেটাই হয়তো আমার গন্তব্য হতো, কেননা তাপস ভীষণ বন্ধুবৎসল। আমি ভেবেছি সে হলো আমার লাস্ট রিসোর্ট, তবে তার প্রয়োজন হলো না ফারুখ ফয়সালের ঔদার্য ও আমার অন্যান্য বন্ধুর আন্তরিক ভালোবাসায়। নিউ ইয়র্ক থেকে দেশে ফিরে আসার দিনে অর্থাৎ জুনের কুড়ি তারিখে তাপস আমাকে কেন্দ্রে রেখে কবি-লেখকদের পার্টির পরিকল্পনা করেছে। পার্টি শেষে আমাকে বিমানবন্দরে পৌঁছে দেবারও দায়িত্ব নিল প্রাণবান মানুষটি।
আমি প্রস্তুত, টার্কিশ এয়ারলাইন্সের স্টাফরা বলেছে তাদের হংসমিথুন বলাকাও প্রস্তুত!
(চলমান)
লেখক : কবি, ভ্রমণসাহিত্যিক



