আর্কাইভবইকথাবইকথা

বইকথা : মোস্তফা মোহাম্মদের বাংলাদেশের সাহিত্য: ভিন্নমাত্রা অন্যসুর : পাঠের ভিন্ন মানচিত্র : সুহৃদ সাদিক

বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বিস্তৃত পরিসরে কিছু কিছু গ্রন্থ এমনভাবে উঁকি দেয়, যা কেবল সাহিত্য বিশ্লেষণের পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকে না―বরং পাঠকের ভাবনার জগতে নতুন দ্বার উন্মোচন করে। মোস্তফা মোহাম্মদ-এর লেখা বাংলাদেশের সাহিত্য: ভিন্নমাত্রা অন্যসুর তেমনই এক মননঘন পাঠ। এটি একাধারে আমাদের সাহিত্যচিন্তার প্রচলিত কাঠামোকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, আবার অন্যদিকে সাহিত্য অনুধাবনের নতুন ভুবনে প্রবেশের আহ্বান জানায়। এই গ্রন্থ নিছক একটি প্রবন্ধসংকলন নয়; এটি লেখকের অন্তর্দৃষ্টিসঞ্জাত অভিজ্ঞতা ও বিশ্লেষণী ক্ষমতার এক নিবিড় বহিঃপ্রকাশ। ১৯৭১ সাল পরবর্তী বাংলাদেশে সাহিত্যের গতি-প্রকৃতি, তার অন্তর্বয়ান, ভাষা-সংস্কৃতির সংহতি ও দ্বন্দ্ব―সবকিছুই এই গ্রন্থের আলোচনায় এসেছে ভিন্ন এক দৃষ্টিকোণ থেকে, যা পাঠককে তৃপ্তি দানে সক্ষম। এই বইয়ে যেমন আছে বিখ্যাত সাহিত্যিকদের রচনার মূল্যায়ন, তেমনি আছে সমকালীন সাহিত্য, ভাষাতত্ত্ব, ছড়া ও নাগরিক জীবনের বিশ্লেষণও। গ্রন্থটি মূলত একটি চিন্তানির্ভর পাঠের দৃষ্টান্ত, যা বাংলাদেশের সাহিত্যভুবনকে নতুন আলোয় দেখে ও দেখায়। মননশীল পাঠকের জন্য এটি এক অনন্য গ্রন্থ―যা ভাবায়, আলোড়িত করে, এবং সাহিত্যচিন্তার এক বিকল্প রাস্তা মস্তিষ্কে গেঁথে দেয়।

গ্রন্থটির সূচনায় লেখক মোস্তফা মোহাম্মদ যে দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন, তা একদিকে যেমন মৌলিক, অন্যদিকে তাৎপর্যপূর্ণও বটে। তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, ‘বাংলাদেশের সাহিত্য’ বলতে তিনি ১৯৭১-পরবর্তী ভূখণ্ডের ভিত্তিতে রচিত সাহিত্যকর্মের পরিসংখ্যানমূলক উপস্থাপন বোঝাতে চান না। তাঁর লক্ষ্য সাহিত্যের অন্তর্নিহিত ভাবনা, মানসিক প্রেক্ষাপট এবং আত্মচেতনার রূপ উন্মোচন করা। ফলে গ্রন্থটি হয়ে ওঠে এক অন্তর্মুখী, বিশ্লেষণাত্মক পাঠযাত্রা―যেখানে সাহিত্যকে দেখা হয় কেবল সাহিত্যকর্ম হিসেবে নয়, বরং ইতিহাস, রাজনীতি, সংস্কৃতি, স্মৃতি ও আত্মপরিচয়ের সমন্বিত রূপ হিসেবে। লেখক মনে করেন, বাংলাদেশের সাহিত্যচিন্তা কোনও সীমারেখায় বাঁধা নয়। এর পরিধি ভূগোল বা সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে চলে যায় আরও গভীরে―মননের স্তরে, সমাজের অন্তস্তলে, মানুষের অভিজ্ঞতার ব্যঞ্জনায়। এই সাহিত্য বহমান এক চেতনার ধারক, যেখানে একসঙ্গে থাকে বিদ্রোহের আগুন, স্মৃতির ব্যথা, ইতিহাসের বয়ান ও আত্মান্বেষণের দুর্দম আকাক্সক্ষা। সাহিত্য এখানে একটি ধারাবাহিক অভিযাত্রা, যা কেবল বাহ্যিক নয়, বরং অভ্যন্তরীণ―চেতনায়, সংস্কারে ও সময়বোধে গঠিত এক অনন্য মানবিক প্রক্রিয়া।

প্রথমেই চোখে পড়ে, বাংলাদেশের সাহিত্য: ভিন্নমাত্রা অন্যসুর গ্রন্থটি তার আলোচনার পরিসরে কতটা বিস্তৃত ও গভীর। এই বইয়ের প্রবন্ধসমূহে লেখক যেসব সাহিত্যিককে অন্তর্ভুক্ত করেছেন―তাঁরা প্রত্যেকেই শুধু বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে নয়, বরং বাঙালি জাতিসত্তা ও সংস্কৃতিচিন্তায় গভীর প্রভাব রেখে গেছেন। গ্রন্থটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, হুমায়ুন কবির, জীবনানন্দ দাশ, শওকত ওসমান, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ, আবু হেনা মোস্তফা কামাল প্রমুখ সাহিত্যিকের সৃষ্টিকর্ম নিয়ে লেখকের বিশ্লেষণ মূলত চিন্তার গভীরতা ও পাঠপ্রতিবেদনের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এখানে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠতে পারে―স্বাধীন বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে সাহিত্য বিশ্লেষণে কেন এই পূর্বতন মনীষাদের স্থান দেওয়া হলো ? লেখক এই প্রশ্নের উত্তর অত্যন্ত স্পষ্টভাবে দিয়েছেন: এই গুণীজনদের সাহিত্যকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশের সাহিত্য বা সংস্কৃতির নির্মাণ কল্পনাই করা যায় না। তাঁদের রচনার ভেতরেই রয়েছে জাতির আত্মপরিচয়ের শিকড়, মননের বুনিয়াদ ও ঐতিহাসিক চেতনার ভাস্কর্য। তাই এই আলোচনায় তাঁদের অন্তর্ভুক্তি এক প্রাসঙ্গিক এবং সময়োচিত সিদ্ধান্ত, যা বইটিকে করেছে গভীরতর ও পূর্ণাঙ্গ। এই প্রসঙ্গের মধ্য দিয়েই লেখক প্রমাণ করেছেন, বাংলাদেশের সাহিত্যচিন্তা কেবল ১৯৭১-পরবর্তী পরিসরে সীমাবদ্ধ কোনও ধারণা নয়।

আধুনিক বাংলা সাহিত্যে চলমান সময়, সমাজ ও জীবনবোধকে গভীরভাবে তুলে ধরার ক্ষেত্রে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস এক অনন্য নাম। ইলিয়াসের সঙ্গে লেখকের ব্যক্তিগত পরিচিয় ছিল। পরবর্তী সময়ে তিনি ‘আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের কথাসাহিত্যে জীবন ও সমাজ’ শীর্ষক অভিসন্দর্ভ রচনা করে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। উল্লেখ্য এটিই ছিল আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের সাহিত্যকর্মের উপরে দুই বাংলায় প্রথম পিএইচডি গবেষণা।  ইলিয়াস অধ্যয়ন ও ইলিয়াসের সঙ্গে পরিচয় প্রসঙ্গে লেখক মোস্তফা মোহাম্মদ লিখেছেন: ‘১৯৯৫ সালে এমএ পাস করে বেরোলাম। শুরু হলো অন্য জগৎ―চাকরির সন্ধান। ঢাকা কমার্স কলেজ এবং রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজে চাকরির দরখাস্ত করলাম ১৯৯৫-এ। দু-জায়গা থেকেই ভাইভা কার্ড এলো। এই প্রথম জীবনের প্রথম চাকরির পরীক্ষায় দু স্থানেই বোর্ডের প্রধান ছিলেন আখতারুজ্জামান ইলিয়াস। ১৯৮৮ থেকে ১৯৯৫―এই সাত বছরের ব্যবধানে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসকে এতো কাছাকাছি পেলাম। অবশ্য ছাত্রজীবনে শহীদ সালাম বরকত হলের দক্ষিণ ব্লকের দোতলায় থাকাকালীন সালাম বরকত ও কামাল উদ্দিন হলের মাঝখানের রাস্তা দিয়ে পশ্চিম দিকে তাঁর ছোটভাই কামাল উদ্দিন হলের প্রভোস্ট খালিকুজ্জামান ইলিয়াসের কোয়ার্টারে যেতে দেখেছি। কিন্তু কোনও কথা হয়নি। এই বাসাতেই বসে নাকি খোয়াবনামা উপন্যাসের বড় অংশ লিখেছিলেন আখতারুজ্জামান ইলিয়াস ―এ কথা পরে শুনেছি। ঢাকা শহরের কমার্স কলেজ এবং রেসিডেন্সিয়াল কলেজে আমার চাকরি হয়নি। আখতারুজ্জামান ইলিয়াস আমাকে বলেছিলেন―‘ফার্স্ট ক্লাস পেয়েছো। গবেষণা করার ইচ্ছে নেই ? গবেষণা করো।’ এরই মধ্যে ১৯৯৫-৯৬ সেশনে ‘সিকান্দার আবু জাফর ও সমকাল পত্রিকা: সমকালের জীবন ও সমাজ’ শিরোনামে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে এমফিলে ভর্তি হলাম। ঐচ্ছিক বিষয় হিসেবে ‘বাংলাদেশের সাহিত্য’ পড়তে হলো। ১৯৪৭-এর দেশবিভাগ-পরবর্তী বাংলাদেশের সাহিত্য এবং পূর্ববর্তী রচনাসমূহ পড়তে হয়েছে। সমকাল পত্রিকায় যাঁরা লিখতেন তাঁদের মধ্যে অনেকেই পরবর্তী সময়ে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন, যশস্বী হয়েছেন কেউ কেউ। ইলিয়াসের লেখাও ছাপা হয়েছে সমকাল পত্রিকায়। এমফিলের প্রথম বর্ষ পরীক্ষায় সম্মানসূচক নম্বর পাওয়ায় এমফিল পিএইচডিতে স্থানান্তরিত হয়, সুযোগ পেয়ে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসকেই গবেষণার বিষয় হিসেবে নির্বাচন করি।’ এভাবেই মোস্তফা মোহাম্মদের ইলিয়াস-যাপনের সূচনা।

ইলিয়াস ছিলেন এক বিরলপ্রজ প্রতিভাবান কথাশিল্পী, যাঁর সাহিত্য বাস্তবতা ও ইতিহাসের সংমিশ্রণে সমৃদ্ধ। তাঁর রচনায় উঠে এসেছে ঢাকা শহরের উচ্চবিত্তের জীবন থেকে শুরু করে রিকশাচালক, মজুর, কবরখোদক, নেশাগ্রস্ত, পাগল, চাষি, মাঝি, কলু, নাপিতসহ সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনের রূপ ও অন্তর্জগৎ। তাঁর উপন্যাস চিলেকোঠার সেপাই ও খোয়াবনামা―মাত্র দুটি হলেও―বাংলাদেশ তথা উপমহাদেশের প্রায় দুই শত বছরের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের সার্থক প্রতিফলন ঘটিয়েছে। এসব রচনায় ইলিয়াস প্রগাঢ় সমাজসচেতনতা ও বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বাস্তব ও ইতিহাসকে শিল্পরূপে উপস্থাপন করেছেন। তাঁর গল্পগ্রন্থ অন্য ঘরে অন্য স্বর, খোঁয়ারি, দুধভাতে উৎপাত, জাল স্বপ্ন, স্বপ্নের জাল ইত্যাদিতে ইতিহাস, বর্তমান বাস্তবতা ও ভবিষ্যতের কুহকী সম্ভাবনাকে সূক্ষ্ম শিল্পবোধে একত্র করে এক অনন্য গল্পভুবন নির্মাণ করেছেন। তাঁর সাহিত্য নিছক গল্প বলা নয়, বরং সময়, রাজনীতি ও মানুষের মনস্তত্ত্বের নিবিড় বিশ্লেষণ। মোস্তফা মোহাম্মদ-এর মন্তব্য:

‘আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের শিল্পসাধনার পেছনে একটি বিদ্রোহী শক্তি এবং আত্মবিশ্বাস তীব্রভাবে কাজ করেছে। এর পেছনে ছিল তাঁর অধীত বিদ্যার অহঙ্কার এবং সামাজিক, অর্থনৈতিক, নৃ-তাত্ত্বিক, ভৌগোলিক, রাজনৈতিক বিষয়ে বিশ্লেষণজ্ঞান। তাঁর এ-বিদ্রোহ ছিল শিল্পের, এ-বিদ্রোহ আঙ্গিকের, এ-বিদ্রোহ শৈলীর, গঠনের। বাংলা উপন্যাসকে একান্তই আমাদের মতো করে, আমাদেরই সমাজের কাটা খালে প্রবাহিত করে সমুদ্রের দিকে প্রবাহিত করার প্রচেষ্টাই ছিল কথাশিল্পী ইলিয়াসের সাধনার মৌল বিষয়।’

গ্রন্থটিতে আলোচিত সাহিত্যিকদের লেখা নিয়ে লেখক মোস্তফা মোহাম্মদ যে পাঠপ্রতিক্রিয়া উপস্থাপন করেছেন, নিছক তথ্যনির্ভর বিশ্লেষণ নয়; বরং তা তাঁর স্বতন্ত্র চিন্তাভাবনারই এক মননশীল বহিঃপ্রকাশ। প্রবন্ধকার হিসেবে তিনি কেবল সাহিত্যিকদের রচনার সারাংশ দেননি, বরং সেই রচনার অন্তর্নিহিত রূপ, বোধ এবং সময়-সচেতনতা বিশ্লেষণ করেছেন গভীর মনোযোগ ও অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে। তাঁর ব্যাখ্যায় ধরা পড়ে সাহিত্যকে দেখার এক বিকল্প পথ―যা প্রচলিত পাঠসংস্কৃতির বাইরে গিয়ে রচনার ভেতরের স্তরগুলো উন্মোচন করে। লেখক যে শুধু ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরেছেন তা নয়, বরং তিনি সে প্রেক্ষাপটকে পাঠকের জন্য প্রাঞ্জল, চিন্তামূলক ও অর্থবহ করে তুলেছেন। তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি পাঠ্যবইয়ে প্রচলিত ধারণার বাইরে, যেখানে সাহিত্যকে কেবল বিষয় হিসেবে নয়, বরং চিন্তার উৎস, প্রশ্নের উৎস এবং আত্মসন্ধানের ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। এই ব্যতিক্রমী বিশ্লেষণ ও ব্যাখ্যাগুলোই বইটিকে সাধারণ পাঠ থেকে তুলে এনে এক প্রজ্ঞাবান সাহিত্যচিন্তার স্তরে উন্নীত করেছে। ফলে বাংলাদেশের সাহিত্য: ভিন্নমাত্রা অন্যসুর হয়ে ওঠে এমন একটি গ্রন্থ, যা পাঠককে কেবল জানায় না, ভাবায়, আলোড়িতও করে।

বাংলাদেশের সাহিত্য: ভিন্নমাত্রা অন্যসুর গ্রন্থে ভাষা ও সাহিত্যের মধ্যকার অন্তর্গত সম্পর্ক নিয়ে লেখকের বিশ্লেষণ এক কথায় গভীর, প্রাসঙ্গিক এবং চিন্তাপ্রসূত। মোস্তফা মোহাম্মদ ভাষাকে কেবল বাহন হিসেবে দেখেন না; তিনি ভাষাকে বোঝেন এক সাংস্কৃতিক চেতনার ধারক, এক রাজনৈতিক বলয়ের অংশ এবং মানসিক গঠনের ভিত্তি হিসেবে। বিশেষত বাংলাদেশের উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে ব্যবহৃত ভাষা ও ভাষাচিন্তা নিয়ে তাঁর সমালোচনা অত্যন্ত তীক্ষè ও যুক্তিনির্ভর। তিনি দেখিয়েছেন, পাঠ্যক্রমে ভাষার যে ব্যবহার প্রচলিত আছে তা প্রায়শই দৃষ্টিভঙ্গির সংকীর্ণতা ও প্রাতিষ্ঠানিক গাফিলতির বহিঃপ্রকাশ। এই ভাষাচিন্তা যেমন ছাত্রদের সৃজনশীলতার বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে, তেমনি তা ভাষার স্বাভাবিক প্রগতি ও প্রাণশক্তিকে দমন করে ফেলে। লেখক এই সংকটকে নিছক একাডেমিক সমালোচনা হিসেবে উপস্থাপন করেননি; বরং তিনি ভাষার প্রাতিষ্ঠানিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ব্যবহারের জটিলতা তুলে ধরে আমাদের ভাবতে বাধ্য করেছেন―ভাষা কাকে প্রতিনিধিত্ব করে ? কার ভাষা প্রাধান্য পায় ? এবং কাদের ভাষা উপেক্ষিত হয় ?

এই দৃষ্টিভঙ্গি বইটির বিশ্লেষণী শক্তিকে বহু গুণে বাড়িয়ে তোলে এবং ভাষা-সাহিত্যের সম্পর্ককে এক নতুন আলোয় উদ্ভাসিত করে।

বাংলাদেশের সাহিত্য: ভিন্নমাত্রা অন্যসুর গ্রন্থের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ জুড়ে রয়েছে সাহিত্য ও সমাজের আন্তঃসম্পর্ক বিশ্লেষণ। এই প্রসঙ্গে অর্থনীতিবিদ আবদুল বায়েস-এর লেখার আলোকে নাগরিক জীবনের বাস্তবতা এবং তার সাহিত্যিক রূপান্তর বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে। লেখক মোস্তফা মোহাম্মদ অত্যন্ত সূক্ষ্ম দৃষ্টিভঙ্গিতে তুলে ধরেছেন―কীভাবে নাগরিক জীবনের প্রাত্যহিক অভিজ্ঞতা, টানাপোড়েন, সংগ্রাম, ব্যস্ততা ও নিঃসঙ্গতা সাহিত্যে রূপান্তরিত হয়, এবং সেই রূপান্তর কেবল আবেগ নয়, বরং সমাজতাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতাও প্রকাশ করে। আবদুল বায়েস মূলত অর্থনীতি ও নগরজীবনের ওপর লেখালেখি করলেও, তাঁর লেখায় যে ভাষার সৌন্দর্য, পর্যবেক্ষণের সূক্ষ্মতা এবং সমাজচেতনার গভীরতা রয়েছে, তা সাহিত্যিক পাঠেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। লেখক এই দিকটি বিশেষভাবে তুলে ধরে নাগরিক জীবনের সাহিত্যে প্রতিফলনের সম্ভাবনাকে সামনে এনেছেন। এই অনুধাবন থেকে বোঝা যায়, সাহিত্য শুধুই শিল্পচর্চা নয়; এটি সামাজিক পাঠের এক বিকল্প ভাষা। ফলে মোস্তফা মোহাম্মদের বিশ্লেষণে সাহিত্যের মধ্য দিয়ে নাগরিক জীবনের বহুমাত্রিক রূপ উন্মোচিত হয়―যা বইটির ব্যতিক্রমী বোধ ও প্রাসঙ্গিকতাকে আরও দৃঢ় করেছে।

এই গ্রন্থের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও চিন্তাসমৃদ্ধ একটি প্রবন্ধ হচ্ছে ‘তরুণদের ৭১ গল্প: বাংলাদেশ ও ভারত’, যেখানে লেখক দুই বাংলার তরুণ গল্পকারদের রচনার একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ করেছেন। এই আলোচনায় প্রধানত উঠে এসেছে―একই ইতিহাস, অর্থাৎ ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, দুই ভিন্ন রাষ্ট্রীয় ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে কীভাবে আলাদা ভঙ্গিতে সাহিত্যে প্রতিফলিত হয়েছে।

বাংলাদেশের তরুণ লেখকেরা যেখানে মুক্তিযুদ্ধকে সরাসরি স্মৃতি, বেদনা ও জাতিগত আত্মপরিচয়ের নির্যাস হিসেবে উপস্থাপন করেছেন, সেখানে পশ্চিমবঙ্গের গল্পকারদের লেখায় সেই একই ইতিহাস অপেক্ষাকৃত বিমূর্ত, কাব্যিক কিংবা দূরবর্তী অভিজ্ঞতা হিসেবে প্রতিফলিত হয়েছে। লেখক অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে ভাষা, দৃষ্টিভঙ্গি, আঙ্গিক এবং বাস্তবতা তুলে ধরার পদ্ধতিতে বিদ্যমান পার্থক্য ও সাযুজ্য চিহ্নিত করেছেন। এই প্রবন্ধটি শুধু দুই বাংলার তরুণ সাহিত্যচিন্তার তুলনাই নয়, বরং সাহিত্যের মাধ্যমে ইতিহাস কীভাবে নির্মিত ও পুনর্গঠিত হয়―সেই প্রক্রিয়াকেও বিশ্লেষণ করে। ফলে এটি সাহিত্যবিশ্লেষণের পাশাপাশি ইতিহাসের পাঠও হয়ে উঠেছে, যা বইটির গবেষণাধর্মী মাত্রা আরও গভীর করে তুলেছে।

গ্রন্থে সংকলিত প্রবন্ধগুলোর বেশির ভাগই পূর্বে দেশের স্বনামধন্য সাহিত্যপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। যেমন―সুন্দরম, বাংলা একাডেমি পত্রিকা, উত্তরাধিকার, ভাষা-সাহিত্য পত্র, জাহাঙ্গীরনগর রিভিউ (পার্ট-সি), ঊষালোক, নান্দীপাঠ, শব্দঘর, দৈনিক জনকণ্ঠ এবং দৈনিক আজকের কাগজ―প্রতিটি পত্রিকা বাংলাদেশের সাহিত্যচর্চার ভিন্ন ভিন্ন পরিসরে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। এসব পত্রিকায় প্রকাশিত লেখাগুলোর সংকলন হিসেবে গ্রন্থটি পাঠকের কাছে পেশাদার সাহিত্য বিশ্লেষণের নির্ভরযোগ্য একটি রূপ পেয়েছে। প্রবন্ধগুলো যেহেতু আলাদা আলাদা প্রেক্ষাপটে, আলাদা সময় ও পাঠকের জন্য রচিত, তাই প্রতিটির ভেতরেই রয়েছে স্বাতন্ত্র্যপূর্ণ বক্তব্য, নির্দিষ্ট প্রাসঙ্গিকতা ও বিশেষ পাঠানুভব। একত্রে সংকলিত হয়ে তারা গড়ে তুলেছে একটি পূর্ণাঙ্গ ও অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন সাহিত্যচিন্তার মানচিত্র। প্রায় ২০০ পৃষ্ঠার এই গ্রন্থ শুধু আগ্রহী সাহিত্য পাঠকদের জন্যই নয়; বরং বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থী, গবেষক, এবং সাহিত্য-সমালোচকদের জন্যও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ রেফারেন্স টেক্সট হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। একাধিক ধারার সাহিত্য ও ভাষা-আলোচনার উপস্থিতি বইটিকে করে তুলেছে বহুমাত্রিক ও গবেষণানির্ভর, যা সমকালীন বাংলা সাহিত্য বিশ্লেষণের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।

গ্রন্থটি কেবল একটি সাহিত্য বিশ্লেষণ নয়; এটি বাংলাদেশের সাহিত্যের গত চার দশকের একটি বিকল্প পাঠ ও চিন্তার রূপরেখা। লেখক মোস্তফা মোহাম্মদ এখানে যে পাঠপ্রবাহ নির্মাণ করেছেন, তা কোনও নিরপেক্ষ বিশ্লেষকের দূরত্ব নয়, বরং একজন সচেতন সাহিত্যমনস্ক চিন্তকের সক্রিয় অবস্থান। তিনি সাহিত্যের ভেতর দিয়ে সময়, সমাজ ও ইতিহাসের যে বহুমাত্রিক পাঠ নির্মাণ করেছেন, তা নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রমধর্মী। লেখকের ভাষাশৈলী স্বচ্ছ, গুছানো এবং গভীর মননের পরিচায়ক। তাঁর লেখায় যে তত্ত্ব, অভিজ্ঞতা ও নান্দনিকতা মিশে আছে, তা প্রবন্ধগুলোর পাঠকে করে তুলেছে চিন্তামূলক ও উপভোগ্য। তিনি সাহিত্যকে শুধু রচনার গঠন বা শিল্প হিসেবে দেখেননি; বরং সাহিত্যের ভেতর দিয়ে সামাজিক চেতনা, সাংস্কৃতিক নির্মাণ এবং বুদ্ধিবৃত্তিক অন্বেষণকেও তুলে ধরেছেন। এই বইটি তাঁদের জন্য, যারা সাহিত্যের পাঠ শুধু কাহিনি বা ভাষার দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, বরং একটি সামগ্রিক মানবিক চেতনার প্রকাশ হিসেবে বোঝার চেষ্টা করেন। যারা সাহিত্যকে ভাবেন, প্রশ্ন করেন, বিশ্লেষণ করেন―তাঁদের কাছে এই গ্রন্থটি হতে পারে নির্ভরযোগ্য, উদ্দীপক এবং অনিবার্য পাঠসঙ্গী।

 লেখক : প্রাবন্ধিক

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button