বিশেষ রচনা : নজরুল : নজরুলের ফরিদপুর সফর : মফিজ ইমাম মিলন

প্রসঙ্গ কথা
নজরুল ফরিদপুরে প্রথম এসেছিলেন শতবছর আগে, ১৯২৫ সালের ১ মে। বঙ্গীয় কংগ্রেসের অধিবেশনে যোগ দিতে সে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মহাত্মা গান্ধী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীসহ বহু নেতা। সে সভায় সভাপতিত্ব করেছিলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ। অনেক স্বেচ্ছাসেবকের মধ্যে অন্যতম ছিলেন ফরিদপুরের সন্তান কবি জসীমউদ্দীন।
আমাদের আবেগ ও একাডেমির দুটো পাল্লাতেই কাজী নজরুল ইসলাম সমান ভারসাম্যে বিরাজমান। তিনি পাঠশালার পণ্ডিত, শিল্পের সংশপ্তক, বিপ্লব বিদ্রোহের বর্ষাফলক, প্রেম-প্রণয়ে পুষ্পপরাগপ্রজাতি; চেতনার চাবুক, মিনারে মুয়াজ্জিন আর বুকের বাসায় সাদা কবুতর। একবার দুই বার নয় এই অপরিমেয় নজরুল আমাদের ফরিদপুরে এসেছিলেন সাতবার, মতান্তরে আট। আইন পরিষদ নির্বাচনে স্বরাজ পার্টির প্রার্থী হয়ে নির্বাচন করেছিলেন ফরিদপুর অঞ্চল থেকে।
পৃথিবীর অনেক কবির জীবনেই বহু ট্র্যাজেডি ঘটেছে, কিন্তু সব দিক দিয়ে বিচার করলে নজরুলের মতো এতটা ট্র্যাজিক জীবন আর কোনও কবির হয়েছে বলে আমার জানা নেই। সবচেয়ে ট্র্যাজিক, নজরুল অপরিণত বয়সে সুস্থ রইলেন, আর যে বয়স থেকে একজন শিল্পীর প্রতিভা পরিণত হতে শুরু করে ঠিক সেই সময়েই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লেন, অন্য কথায় তাঁর যেন মৃত্যু হলো!
নজরুলের লেখাগুলোতে কী রাজনৈতিক, কী সামাজিক, কী ধর্মীয়, কী শোষিত-বঞ্চিত মানুষের ব্যাপারে বিদ্রোহী নজরুল তাঁর অগ্নিবীণায় বিষের বাঁশিতে সমস্ত সৃষ্টিশীল জীবনে যে সব দুঃসাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন তা ভাবলে অবাক হতে হয়।
নজরুলের সৃজনশীল জীবনের সময়সীমা স্বল্পকালীন হলেও বৈচিত্র্যে ভরা। তাঁর ব্যক্তিজীবনও কর্মজীবনের চেয়ে কম বৈচিত্র্যপুর্ণ নয়। সে কথা ভেবে, তাঁর সম্পর্কে গতানুগতিক কিছু লিখব না এ সিদ্ধান্ত আগেই নিয়েছিলাম। ফরিদপুরে তাঁর বিভিন্ন সময়ে আগমন নিয়ে যারা লিখেছেন, স্মৃতিচারণ করেছেন, কবির সান্নিধ্য পেয়েছেন নানান সূত্রে এমনজনদের সাক্ষাৎকার ও লেখা সংগ্রহ করতে থাকি। এঁদের মধ্যে কবি জসীমউদ্দীন, ড. কাজী মোতাহার হোসেন, অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম, অনুপম হায়াৎ, নজরুল সংগীত শিল্পী ফিরোজা বেগম, দুই বোন যোবায়দা মীর্জা ও সন্জীদা খাতুন, ভাষা সৈনিক আবদুল গফুর, সংগীতজ্ঞ মোবারক হোসেন খান, মুহম্মদ জাহাঙ্গীর, আসাদুল হকের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ১৩৪৩ বঙ্গাব্দে ফরিদপুর জেলা মুসলিম ছাত্র সম্মিলনীতে নজরুলের সভাপতির অভিভাষণ এবং জসীমউদ্দীনের কাছে লেখা চিঠি আমার এ লেখায় সহযোগিতা করেছে ভিন্ন মাত্রায়।
নজরুল বৃহত্তর ফরিদপুরের মাদারীপুর, পাংশা, রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে সভা-সমাবেশ, সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকেছেন। এসব জায়গা কালের পরিক্রমায় নিশ্চহ্ন হয়ে গেলেও ফরিদপুর শহরে কবির স্মৃতিবিজড়িত অম্বিকা মেমোরিয়াল হল (টাউন হল) ও ময়দান, রাজেন্দ্র কলেজ, ঈশান ইনস্টিটিউশন, হুমায়ুন কবির ও কবি জসীমউদ্দীনের বাড়ি এবং কমলাপুর ময়েজ মঞ্জিলের পুকুর ঘাট এখনও রয়েছে। অতি সম্প্রতি বকুল গাছটি কেটে ফেলায় যে বকুলতলায় বসে বাঁশি বাজিয়েছিলেন কবি সে স্থানটি নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে।

ফরিদপুরে নজরুলের অবস্থান নিয়ে যে সমস্ত রচনা পাওয়া যায় সেগুলোর মধ্যে প্রাণতোষ চট্টোপাধ্যায়ের কাজী নজরুল (দ্বিতীয় বর্ধিত ও পরিমার্জিত সংস্করণ ১৯৭৩, কলিকাতা)-এর চার পৃষ্ঠার ছোট প্রবন্ধ, জসীমউদ্দীনের যাঁদের দেখেছি (ঢাকা-১৯৫২) ও ঠাকুর বাড়ির আঙ্গিনায় (কলকাতা ১৯৬১) গ্রন্থের পঁয়তাল্লিশ পৃষ্ঠায় নজরুল অংশটি সবচেয়ে বেশি নির্ভরযোগ্য। জসীমউদ্দীনের প্রবন্ধ সংগ্রহে ফরিদপুরে নজরুলের সফর সম্পর্কিত বিবরণাদি প্রায় হুবহু। এছাড়া মুস্তাফা নূরউল ইসলামের সমকালে নজরুল ইসলাম (বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি ১৯৮৩)-এর আধা পৃষ্ঠায় একটি রিপোর্ট (পৃ. ১৯১) এবং নজরুল একাডেমি প্রকাশিত নজরুল স্মৃতিচারণ (১৯৯৫)-এর সৈয়দ সালেহ উদ্দিন মাহমুদ রচিত ছয় পৃষ্ঠার ‘স্মৃতিপটে নজরুল’ গ্রন্থভুক্ত হবার আগে নজরুল একাডেমি পত্রিকায় নবপর্যায়ে তৃতীয় সংখ্যার গ্রীষ্ম ১৩৯৪-এ প্রকাশিত হয়েছিল।
নজরুল কতবার ফরিদপুরে এসেছেন এ প্রসঙ্গে প্রথমে আবদুল মান্নান সৈয়দের দীর্ঘ ‘নজরুলের সৃষ্টি কর্মে বাংলাদেশ’ (সংবাদ ২৬ মে, ১৯৯৪) দিয়ে শুরু করতে চাই। লেখকের হিসাব অনুযায়ী নজরুল মোট চারবার ফরিদপুর আসেন। ১৯২৫ সালে বঙ্গীয় কংগ্রেসের প্রাদেশিক সম্মেলনে, ১৯২৬ মার্চ ফরিদপুরের মাদারীপুরের মৎস্যজীবী সম্মেলনে, ১৯৩৩-এ ফরিদপুরের পাংশা এবং ১৯৩৬-এ জেলা মুসলিম ছাত্র সম্মেলনে সভাপতিত্ব করতে ফরিদপুর আসেন।
১৯২৫ সালের ১ মে নজরুল প্রথমবারের মতো ফরিদপুর আসেন। এতে সম্ভবত কারও কোনও দ্বিমত করার অবকাশ বা বিতর্ক করার সুযোগ নেই। কেননা, জসীমউদ্দীনের পূর্বোল্লিখিত রচনায় আমরা জেনেছি, তিনি চৌদ্দ-পনের বছর বয়সে ফরিদপুর ছেড়ে কলকাতায় চলে যান এবং সেখানে স্বল্প অবস্থানকালেই কাজী নজরুলের সঙ্গে দেখা করেন। সময়টি ‘বিদ্রোহী’ কবিতা প্রকাশের আগে। অর্থাৎ ১৯১৮ বা ১৯১৯ সাল বলে অনুমান করা চলে। এরপর জসীমউদ্দীন ফরিদপুরে ফিরে আসেন এবং পরবর্তীকালে জিলা স্কুল থেকে মেট্রিক ও রাজেন্দ্র কলেজ থেকে আইএ ও বিএ পাস করেন। ইতোমধ্যে নজরুল-জসীমউদ্দীন কিছু পত্রালাপও ঘটেছে বলে জসীমউদ্দীন বিভিন্ন লেখায় উল্লেখ করেছেন। সুতরাং যদি ১৯২৫-এর আগে নজরুল ফরিদপুরে আসতেন তা জসীমউদ্দীনের অজানা থাকার কথা নয়।
প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করা যায়, লেখক খান মুহাম্মদ মাঈনুদ্দীন লিখেছেন, এখানেই গান্ধীজীর সঙ্গে নজরুলের প্রথম পরিচয় ঘটে। (যুগস্রষ্টা নজরুলের দ্বিতীয় পরিমার্জিত সংস্করণ ১৯৬৮, পৃ: ১৬২)। অন্যদিকে নজরুল চরিতমানস গ্রন্থে এ সম্মেলন নিয়ে ড. সুশীল কুমার গুপ্ত লিখেছেন, হুগলীতে ১৯২৪ সালে গান্ধীজির সঙ্গে নজরুলের প্রথম পরিচয় ঘটে (পরিমার্জিত ও পরিবর্ধিত দ্বিতীয় দে’জ সংস্করণ ১৯৯৭, পৃ: ৬৩)। মুজফ্ফর আহমদের কাজী নজরুল ইসলাম : স্মৃতিকথাতেও আমরা একই কথা পড়েছি।) মুক্তধারা, তৃতীয় প্রকাশ ১৯৮৭, পৃ: ২৮।
জসীমউদ্দীন লিখেছেন, ‘তখনও কবি ভালো বক্তৃতা করিতে শেখেন নাই। সভায় কবি যাহা বলিলেন তাহাও মামুলী ধরনের। কিন্তু কবি যখন গান ধরিলেন, সেই গানের কথায় সমস্ত সভা উদ্বেলিত হইয়া উঠিল।… কবি যখন জাতের নামে বজ্জাতি সব জাত জালিয়াৎ খেলছে জুয়া অথবা শিকল পরা ছল মোদের এই শিকল পরা ছল… প্রভৃতি গান গাহিতেছিলেন তখন সভায় যে অপূর্ব ভাবরসের উদয় হইতেছিল, তাহা ভাষায় বলিবার নয়।’
একদিন মহাত্মা গান্ধীর সামনে ‘ঘোর ঘোর ঘোর ঘোররে আমার সাধের চরকা ঘোর’ গানটি গাহিলেন। গান্ধীজী গান শুনিয়া হাসিয়া কুটি কুটি। জসীমউদ্দীনের এই কথারই প্রতিধ্বনি শোনা গিয়েছিল স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থ যাঁদের দেখেছি-তে। ফরিদপুরের এ সম্মেলনে জসীমউদ্দীন স্বেচ্ছাসেবকের ভূমিকা পালন করেছিলেন।

নজরুলের বাজেয়াপ্ত গ্রন্থ বিষের বাঁশি এবং ‘ভাঙ্গার গান গোপনে গোপনে সম্মেলনে বিক্রি করা হয়েছিল। এখানে প্রশ্ন জাগে নজরুল তাঁর এ ফরিদপুরে প্রথম সফরের সময় কোথায় উঠেছিলেন। লেখক প্রাণতোষ লিখেছেন নজরুল ফরিদপুরে গেলে খ্যাতিমান চিত্র পরিচালক মৃণাল সেনের বাবা আইনজীবী দীনেশ সেনের বাড়িতে উঠতেন। বইটির প্রথম সংস্করণে প্রাণতোষ বাবু নিশ্চয়ই এ কথা উল্লেখ করেননি, কেননা ১৯৫৫ সালে মৃণাল সেন চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবে পরিচিতি পাননি। মৃণালের ‘রাত ভোর’ ‘বাইশে শ্রাবণ’, ‘আকাশ কুসুম’ এবং হিন্দি ছবি ‘ভুবন সোম’ যথাক্রমে ১৯৫৬, ১৯৬০, ১৯৬৫, ১৯৬৯ সালে নির্মিত হলেও জনপ্রিয়তা ও খ্যাতিলাভ করে সত্তরের দশকে। আর সেজন্যই বোধহয় জসীমউদ্দীন তাঁর গ্রন্থে মৃণাল সেনের বাবার কথা উল্লেখ করতে পারেননি। তবে মৃণাল সেনের বড় ভাইয়ের বন্ধু হওয়ার সুবাদে জসীমউদ্দীন ঘন ঘন তাঁদের বাড়িতে যেতেন। জসীমউদ্দীনের জন্মশত বার্ষিকীতে ২০০৩ সালে প্রকাশিত স্মারকগ্রন্থে মৃণাল সেন ‘সাধুদা’ নামে একটা নিবন্ধ লেখেন এবং তাঁর সাত বছর বয়সী বোন রেবা পুকুরের পানিতে ডুবে মৃত্যুবরণ করলে জসীমউদ্দীন তাকে নিয়ে কবিতা লিখে তার মায়ের হাতে দিয়েছিলেন। সে কথা তিনি তাঁর লেখায় উল্লেখ করেছেন।
ফরিদপুরে এ সম্মেলনের পরে নজরুল কয়েক দিন জমিদারপুত্র মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরী ওরফে লাল মিয়ার বাড়ি কমলাপুরের ময়েজ মঞ্জিলে ছিলেন। লাল মিঞার বাড়িতেই নকশীকাঁথার কবি জসীমের সঙ্গে কবি নজরুলের প্রথম দেখা হয় এ কথা কেউ কেউ উল্লেখ করলেও তা সঠিক নয়। তবে নজরুল কবি জসীমউদ্দীনের অম্বিকাপুরের বাড়িতে সরাসরি দুইবার উঠেছেন একথা জসীমউদ্দীন তাঁর প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন।
বালুচর জসীমউদ্দীনের লেখা। সেখানে নজরুল কবিতা লিখেছেন? নজরুল পল্লী কবির বাড়িতে বসে বালুচরে সন্নিবেশিত একটি কবিতাও লিখেছিলেন।
নজরুল দ্বিতীয়বার ফরিদপুরে কবে সফর করেন?
১৯২৬ সালের ১১ ও ১২ মার্চ? ১৯২৬ সালের ১ মার্চ কবির মাদারীপুর সফর নিয়ে মুক্তবুদ্ধি আন্দোলন ও শিখা গোষ্ঠীর অন্যতম সদস্য ও লেখক আনোয়ার হোসেনকে এক চিঠিতে নজরুল লিখেছেন… এই শরীর নিয়েই আবার বেরুব ৬ মার্চ দিনাজপুরে। সেখানে ডিষ্ট্রিক্ট কনফারেন্সে, সেখান থেকে মাদারীপুরে (ফরিদপুর) যাব (নজরুলের পত্রাবলী, সম্পাদক শাহাবুদ্দীন আহমদ, নজরুল ইনস্টিটিউট, ১৯৯৫- পৃষ্ঠা ২৩)। নজরুল পরিচালিত লাঙ্গল পত্রিকা বন্ধ হওয়ার (১৫ এপ্রিল ১৯২৬) কয়েক সপ্তাহ আগের ঘটনা এটি। ছান্দসিক কবি আবদুল কাদির লিখেছেন, ফরিদপুর জেলার মাদারীপুরে নিখিলবঙ্গীয় ও আসাম প্রদেশীয় মৎস্যজীবী সম্মেলনের তৃতীয় অধিবেশন হয়েছিল, সে অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেছিলেন হেমন্ত কুমার এমএ এবং নজরুল ‘জেলেদের গান’ গান গেয়ে সম্মেলন উদ্বোধন করেছিলেন (নজরুল প্রতিভার স্বরূপ, পৃ: ৪৩)। মাদারীপুরে এ সফর ছাড়াও ১৯২৫-এর মে এবং ১৯২৬-এর নভেম্বর মাসের ভেতর কোনও এক সময় নজরুল ফরিদপুর সফর করেছিলেন। সেটা কি মাদারীপুর যাবার আগেই?
প্রাণতোষ তাঁর লেখায় উল্লেখ করেছেন, বঙ্গীয় প্রাদেশিক সম্মেলনের কয়েক মাস পরে কবিকে ফরিদপুরের হিন্দু-মুসলিম এবং বিপ্লবী দল আবার ফরিদপুরে নিয়ে আসেন (পৃ: ১৩৬)।
ফরিদপুরে এবার কবি হুমায়ুন কবিরদের বাড়িতে ওঠেন। নজরুল মুগ্ধ হন হুমায়ুন কবিরের পিতা কবীরউদ্দিন আহমদের সঙ্গে পরিচিত হয়ে। হুমায়ুন কবিরদের বাড়ির দোতলার (বর্তমান সাজেদা কবির উদ্দিন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়) সিঁড়ির সামনে মস্ত বড় শ্বেতপাথরের লাল অক্ষরে খোদাই করা ছিল নজরুলেরই বিখ্যাত ‘বিদ্রোহী’ কবিতার প্রথম তিন লাইন। এই সফরে নজরুলের সঙ্গে পরিচয় ঘটে ফরিদপুরের আর এক কৃতী সন্তান সৈয়দ আব্দুর রব-এর সঙ্গে। সৈয়দ আব্দুর রব ছিলেন ‘খাদেমুল এনসান সমিতি’র সম্পাদক এবং মোয়াজ্জিন পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক। তাঁর পত্রিকাতে নজরুলের ‘মোয়াজ্জিন’ কবিতা এবং আরও কিছু গান, কবিতাও ছাপা হয়েছিল। এ প্রসঙ্গে স্মরণ করা যেতে পারে সৈয়দ আব্দুর রব পরবর্তীকালে নজরুলকে নিয়ে ‘নজরুলনামা’ নামে একটি গ্রন্থও লিখেছিলেন।
নজরুলের নির্বাচনকালীন সময়ে ফরিদপুরে নজরুলের সফরের অনেক তথ্য পাওয়া যায় ঠাকুরবাড়ির আঙ্গিনায় গ্রন্থটিতে। তবে এ গ্রন্থের সমস্যা হলো এতে ক্ষণ-তারিখের সূক্ষ¥ ইঙ্গিত নেই। কবি জসীমউদ্দীন বুলবুলের মৃত্যুর সময়কালীন ঘটনাসমূহের বিবরণের পর নির্বাচন উপলক্ষে ফরিদপুরে নজরুলের আগমনের বিবরণ দিয়েছেন। অথচ আমরা সবাই জানি কেন্দ্রীয় আইনসভায় মুসলমানদের জন্য সংরক্ষিত আসনের প্রার্থী হিসেবে নজরুল ঢাকা বিভাগের (ঢাকা, ফরিদপুর, বরিশাল, ময়মনসিংহ) কংগ্রেস অর্থাৎ স্বরাজ পার্টির প্রার্থী হন ১৯২৬ সালের নভেম্বরে। অন্যদিকে বুলবুল মারা যায় ১৯৩০ সালের ৭ মে। সে নির্বাচনে প্রত্যক ভোটার দুটি করে ভোট দিতে পারতেন। ভোটারের সংখ্যা ছিল ১৮ হাজার ১১৬ জন। সম্পত্তির ভিত্তিতে তখন ভোটার হতে পারতেন। সে নির্বাচনে অন্য প্রার্থীরা ছিলেন বরিশালের জমিদার মুহম্মদ ইসমাইল চৌধুরী, টাঙ্গাইলের জমিদার আব্দুল হালিম গজনভী, ঢাকার নবাববাড়ির আব্দুল করিম ও মফিজ উদ্দীন আহমেদ।
নির্বাচনী প্রচারকালীন নজরুলের ফরিদপুরের আরও কিছু তথ্য পাওয়া যায়। নির্বাচনে তিনি পরাজিত হবে, তা ভোটের দিনে না বুঝলেও পরের দিনেই বুঝতে পেরেছিলেন। জসীমউদ্দীনকে বলেছিলেন, ‘দ্যাখ জসীম ভেবে দেখেছি এই ভোটযুদ্ধে আমার জয় হবে না। আমি ঢাকা চলে যাই। দেখি, অন্ততপক্ষে জামানতের টাকাটা যাতে মারা না যায়’, কিন্তু নজরুলের জামানত বাজেয়াপ্ত হয়। ঠাকুরবাড়ির আঙ্গিনায় নজরুলের ফরিদপুর সফরের আরও একটি বর্ণনা পাওয়া যায়। জসীমউদ্দীন রাজেন্দ্র কলেজের ছাত্র ছিলেন (আইএ এবং বিএ পড়েন এ কলেজ থেকে)। ১৯২৯ সালে বিএ পাস করে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন।
‘আমি তখন ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজে পড়ি। আমরা সকল ছাত্র মিলিয়া কবিকে কলেজে আনিয়া অভিনন্দন দিব, স্থির করিলাম। আমাদের প্রিন্সিপাল কামাখ্যাচরণ মিত্র মহাশয় খুশী হইয়া আমাদের প্রস্তাবে রাজী হইলেন।
‘খবর পাইয়া ফরিদপুরের পুলিশ সাহেব আমাদের প্রিন্সিপাল মহাশয়ের নিকট পত্র লিখিলেন, নজরুলের মতিগতি গভর্নমেন্টের বিরুদ্ধে: তিনি তাহার বক্তৃতায় সরলমতি ছাত্রদিগকে গভর্নমেন্টের বিরুদ্ধে ক্ষেপাইয়া তুলিবেন। নজরুলকে যদি কলেজে বক্তৃতা করিতে দেওয়া হয়, তবে সি,আই,ডি, পুলিশদেরও কলেজের সভায় উপস্থিত থাকিতে দিতে হইবে। আমাদের প্রিন্সিপাল কামাখ্যা বাবুর প্রতিও গভর্নমেন্টের সুনজর ছিল না। বহু বৎসর আগে তিনি পুলিশের কোপদৃষ্টিতে অন্তরীণ ছিলেন। নজরুলকে দিয়া বক্তৃতা করাইলে পরিণামে কলেজের ক্ষতি হইতে পারে বিবেচনা করিয়া তিনি আমাদিগকে ডাকিয়া বলিয়া দিলেন, ‘নজরুলকে লইয়া কলেজে যে সভা করার অনুমতি দিয়েছিলাম, তাহা প্রত্যাহার করলাম।’
‘আমরা মুষড়িয়া পড়িলাম। সবাই মুখ মলিন করিয়া কবির কাছে গিয়া উপস্থিত হইলাম। আমাদের অবস্থা দেখিয়া কবি বলিলেন, ‘কুছ পরওয়ানা নেই। উন্মুক্ত মাঠের মধ্যে সভা কর। আমি সেইখানে বক্তৃতা দেব।’
‘তখন আমাদিগকে আর পায় কে! দশ-বিশটা কেরোসিনের টিন বাজাইতে বাজাইতে সমস্ত শহর ভরিয়া কবির বক্তৃতা দেওয়ার কথা প্রচার করিলাম। সন্ধ্যাবেলা অম্বিকা হলের ময়দানে লোকে লোকারণ্য। হাজার হাজার নর-নারী আসিয়া জমায়েত হইলেন কবিকণ্ঠের বাণী শুনিবার জন্য।
‘সেই সভায় কবিকে নূতন রূপে পাইলাম। এতদিন কবি শুধু দেশাত্মবোধের কথাই বলিতেন। আজ কবি বলিলেন, সাম্যবাদের বাণী। কবি যখন উঠরে চাষী জগৎবাসী, ধর কষে লাঙ্গল অথবা আমরা শ্রমিকদল, ওরে আমরা শ্রমিকদল-প্রভৃতি গান গাহিতেছিলেন, তখন সমবেত জনতা কবির ভাব-তরঙ্গের সঙ্গে উদ্বেলিত হইতেছিল। সর্বশেষে কবি তাহার বিখ্যাত ‘সাম্যবাদী’ কবিতা আবৃত্তি করিলেন। সে কী আবৃত্তি, প্রতিটি কথা কবির কণ্ঠের অপূর্ব ভাবচ্ছটায় উচ্ছ্বসিত হইয়া সমবেত শ্রোতৃণ্ডলীর হৃদয়ে গিয়ে ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হইয়া উঠিতেছিল। মাঝে মাঝে মনে হইতেছিল, কবি-কণ্ঠ হইতে যেন অগ্নিবর্ষণ হইতেছে। সেই আগুনে যাহা কিছু ন্যায়ের বিরোধী, সমস্ত পুড়িয়া ধ্বংস হইয়া যাইবে।
‘সেই সভায় আমি বলিয়াছিলাম, ইনি আমাদের কবি: ইহার অন্তর হইতে যে বাণী বাহির হইতেছে, সেই বাণীর সঙ্গে আমাদের যুগযুগান্তরের দুঃখ বেদনা ও কান্না মিশ্রিত হইয়া আছে; শত জালিমের অত্যাচারে শত শোষকের পীড়নে আমাদের অন্তরে যে অগ্নিময় হাহাকার শত লেলিহান জিহ্বা মেলিয়া যুগ যুগান্তরের অপমানের গ্লানিতে তাপ সঞ্চয় করিতেছিল, এই কবির বাণীতে আজ তারা রূপ পাইল।”
একবার কলেজের সব ছাত্র মিলে নজরুলকে অভিনন্দন জানাতে সিদ্ধান্ত নিলে অধ্যক্ষের অনুমতিও মেলে। কিন্তু পুলিশ বিভাগের খবরদারির কারণে সে অনুষ্ঠান হয় টাউন হলে (অম্বিকা হলে)। রাজেন্দ্র কলেজের অনুষ্ঠান বন্ধ হবার সংবাদ শুনে নজরুল বলেছিলেন ‘তোমরা টিন পিটিয়ে জানিয়ে দাও সভা নয় গানের অনুষ্ঠান হবে।’ সত্যিকারেই হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতিতে নজরুল কবিতা ও গান পরিবেশন করেছিলেন সে অনুষ্ঠানে।
নজরুল ইসলাম ১৯৩৩ সালে নারায়ণগঞ্জ যাবার পথে কলকাতা থেকে পাংশা সফরে এসেছিলেন। তখনকার দিনে পাংশা ছিল হিন্দু বর্ধিষ্ণু এলাকা। নজরুলের পাংশায় আগমনের সংবাদে বিপুল সাড়া পড়ে যায়। হিন্দু-মুসলিম, নারী-পুরুষ নজরুলকে এক নজর দেখার জন্য আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে ওঠে। নজরুলকে সবংর্ধনা জানানোর একটি সবংর্ধনা কমিটি গঠিত হয়। এই সংবর্ধনা কমিটির যারা সদস্য ছিলেন, তাদের সকলের নাম জানা যায়নি―তবে যে কয়জনের নাম জানা যায় তাঁদের মধ্যে সু.সাহিত্যিক এয়াকুব আলী চৌধুরী ছিলেন অন্যতম। এ ছাড়া তাহের উদ্দিন আহম্মেদ, সহ-সভাপতি কলকাতা থেকে প্রকাশিত দৈনিক দি মুসলমান পত্রিকা। সৈয়দ মাহমুদ, ডি এস আর সুবোধ চন্দ্র সাহা, কংগ্রেস নেতা, পাংশা। শ্রী অতনু চন্দ্র দত্ত, সম্পাদক কলকাতা প্রকাশিত সিনেমাবিষয়ক পত্রিকা ‘জলসা’। শ্রী শ্যামলাল কুন্ডু, বিত্তশালী ব্যবসায়ী, পাংশা।
এয়াকুব আলী চৌধুরীর সঙ্গে কবি নজরুল ইসলামের অনাবিল মধুর সম্পর্ক ছিল। ১৯১৯ সালে প্রথম মহাযুদ্ধের অবসানের পর কাজী নজরুল ইসলাম যখন করাচি থেকে কলকাতায় ফিরে এসে বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির অফিসে আশ্রয় গ্রহণ করেন তখন থেকেই এয়াকুব আলী চৌধুরীর সঙ্গে কাজী নজরুল ইসলামের পরিচয় ঘটে। নজরুল ইসলাম তাঁর অগ্রজ কবি-সাহিত্যিকদের অত্যন্ত সম্মান ও সমাদর করতেন। এয়াকুব আলী চৌধুরী ছাড়াও পাংশায় কাজী নজরুল ইসলামের আরও কয়েকজন বন্ধু ছিলেন।
লেখক : প্রাবন্ধিক
(চলবে)



