
সমসাময়িক কবিদের মধ্যে আমিনুল ইসলাম পত্র-পত্রিকায়, ভার্চুয়াল জগতে বেশিই সরব। প্রচুর লিখতে পারা একজন লেখকের বড় গুণ। লেখালেখিতে তিনি বিরতিবিহীন। কেউ কেউ বলেন, কম লেখা ভালো, অথবা আমি কম লিখি। আমি মনে করি, যারা এটা বলেন, তাঁরা লিখতে পারেন না বলেই কম লেখেন। লেখার ইচ্ছেটাকে দমিয়ে রাখা যায়, যদি কবিতা ব্যতিরেকে অন্য কোনও মাধ্যম হয়। কবিতার উৎসারণ ঘটে স্বতঃস্ফূর্তভাবে। সেটাকে দমিয়ে রাখা কবির আত্মহননের শামিল। তবে কবিকে সচেতন হতে হয়, যেন তাঁর কবিতায় রিপিটেশন না ঘটে। আমিনুল ইসলাম বেশি লিখছেন বলেই তাঁর কবিতা বৈচিত্র্যহীন, এমনটি আমার মনে হয়নি। বরং আমার মনে হয়েছে তিনি বিচিত্র বোধের এক নিপুণ কারিগর। কারিগর বলছি এজন্য যে, বৃহত্তর অর্থে কবিরা স্রষ্টা নন, রূপকার মাত্র। পৃথিবীর সবকিছুই পরিবর্তন হয়, রূপান্তর ঘটে, সৃষ্টি হয় না। আমরা যা নতুন করে দেখি বা ভাবি, তা সৃষ্টির রূপান্তর ছাড়া কিছুই নয়। ভাবনা ও বোধের নতুনত্বকে আমরা সৃষ্টি বলে ভুল করি। প্রশ্ন আসতে পারে, তাহলে সৃষ্টিশীলতা বা সৃজনশীলতা বলে কিছু নেই? হ্যাঁ, অবশ্যই আছে। নতুন চিন্তার ক্ষমতা, নতুন আইডিয়া প্রদানের সক্ষমতাই সৃষ্টিশীলতা বা সৃজনশীলতা। কিন্তু তা সৃষ্টি নয় কখনও। যা হোক, এটা অন্য আলোচনার বিষয়। প্রসঙ্গ আমিনুল ইসলামের কবিতায় বিচিত্র বোধ নিয়ে। বিস্তারিত আলোচনার আগে আমি তাঁর কবিতার বৈশিষ্ট্য ও প্রবণতাসমূহকে চার ভাগে নির্দিষ্ট করে নিয়েছি। এগুলো হচ্ছে:
১. নবতর কাব্যভাষা ও কাব্যশৈলী
২. প্রেম ও প্রকৃতি
৩. শ্লেষ ও ব্যঙ্গোক্তি
৪. ছন্দ, চিত্রকল্পের যথার্থ ব্যবহার
আমরা উপরোক্ত বৈশিষ্ট্যের আলোকে আমিনুল ইসলামের কবিতালোচনায় অনুপ্রবেশ করতে চাই।
১.
ভাষা কবিতার প্রাণ। প্রতিটি সচেতন কবি তাঁর কবিতার জন্য একটি নিজস্ব ভাষারীতি গড়ে তোলেন। যাকে আমরা কবিভাষা বলে জানি। কবি আমিনুল ইসলাম সচেতনভাবে তাঁর কবিতার একটি নিজস্ব ভাষা আয়ত্ত করেছেন। আমরা প্রতিদিন যেসব কবিতা পাঠ করছি, তা কোনও না কোনওভাবে স্নিগ্ধ, পেলবময়। কেননা, আমাদের বাংলা কবিতা জীবনানন্দ দাশীয় আবহ থেকে অদ্যাবধি পুরোপুরি মুক্ত নয়। কিছু কবি সচেতনভাবে নিজেকে শনাক্ত করে চলেছেন। আমিনুল ইসলাম এই কিছু সংখ্যকদের একজন। তাঁর কবিতা থেকে উদ্ধৃতি দিতে পারি:
দ্যাখো―এক থাবার নগ্ন সাফল্যে উজ্জীবিত আরো
এক থাবা; উভয় ক্ষেত্রেই থাবাগুলো সংখ্যাগরিষ্ঠতার
আর তাদের আঘাতে স্বভূমে সমূলে উৎপাটিত
বাতাসের সংগীত শুনে বেড়ে ওঠা দুই ভূগোলের
সংখ্যালঘু বৃক্ষরাজি যারা দিয়ে এসেছে ফল ও ছায়া,
শোভা ও অম্লজান, দিনের পর দিন, যুগের পর যুগ।
(‘জঙ্গলায়ন’, বাছাই কবিতা)
অথবা
চাঁদবোনা শাড়ি পরে হেঁটে যায় রাত
আমার উঠোনজুড়ে কুয়াশার হিম
উষ্ণতার গোলাঘরে লাগিয়ে কপাট
তুমি দূরে বসে আছো উদাসী অসীম
(‘বিড়ম্বিত জোছনায়’, বাছাই কবিতা)

আমিনুল ইসলামের কবিতায় কোনো রমণীয় পেলবতা নেই, নেই কোনও তুলতুলে মোলায়েম বুনন। তাঁর সময়ে তাঁর কবিতা মেদহীন এবং জীবনানন্দীয় আবহ থেকে মুক্ত। তাঁর ভাষা সহজ ও সাবলীল কিন্তু গভীর ব্যঞ্জনাময়। এই সহজ ভাষায় কবিতা নির্মাণে একটি ভিন্ন ভাষাশৈলী সহজে চোখে পড়ে। ভালো কবিতার বড় বৈশিষ্ট্য তার স্বতঃস্ফূর্ততা। কত সাবলীলভাবে তিনি ব্যক্ত করেন তাঁর অনুভূতি। আমিনুল ইসলাম সমাজ ও পৃথিবীর বহু জটিল বিষয়কে অনায়াস ভঙ্গিতে কবিতার পঙক্তিতে প্রকাশ করেন। প্রেমের কবিতার মোড়কে তুলে ধরেন সাম্রাজ্যবাদ, স্বৈরতন্ত্র, সামরিক একনায়কতন্ত্র, নয়া উপনিবেশবাদ, বিশ্বমিডিয়ার পক্ষপাতদুষ্ট ভূমিকা ইত্যাদি কুটিল ও নেতিবাচক প্রপঞ্চসমূহ। তাঁর সেই প্রকাশ শৈল্পিকভাবে সুন্দর ও হৃদয়গ্রাহী। তিনি বলেন:
আমি দূর্বাশিশিরে পা ধোয়ায় অভ্যস্ত মানুষ
ভালোবাসার চরণে তোমার উঠোনে এসেছি
কোনো ক্ষমতালোভী সেনাপতির বুটজুতা নেই
আমার পায়ে,
আমাকে ভেতরে নাও!
আমার ভালোবাসা আরব আকাশে ঝুলে থাকা
শান্তির জন্য কোনো মার্কিনী প্রতিশ্রুতি নয়;
আমার প্রতিজ্ঞা নয় রোহিঙ্গাদের জন্য
টাটমাডো প্রণীত প্রত্যাবাসন প্রকল্পের ঘোষণা,
আমাকে আস্থায় নাও!
প্রান্তরের স্বরলিপি আর নদীর লিরিক
আমাকে প্রেমনিষ্ঠ কবি হতে বলেছে,
আমি কবি হয়েছি,
ভালোবাসা আমার একমাত্র বদঅভ্যাস,
আমাকে গ্রহণ করো সানজিদা, আমাকে গ্রহণ করো!
(‘আমাকে গ্রহণ করো’ : বাছাই কবিতা)
সহজ ভাষায় অনুভূতি প্রকাশের এমন দৃষ্টান্ত আমাদের চোখে পড়বে অনেকের কবিতায়, তবে সেখানে হৃদয় খুঁজে পাওয়া যাবে না। হৃদয়ের অমল অনুভূতি প্রকাশের মধ্যেই আমিনুল ইসলামের স্বাতন্ত্র্যের উপস্থিতি। উপভোগ্য প্রেমের ভাষার অবকাঠামোর মধ্যে সাম্রাজ্যবাদ-স্বৈরতন্ত্র-একনায়কতন্ত্র বিরোধী এমন কবিতা বিরল। এটা তাঁর নিজস্ব কাব্যভাষার পরিচায়ক।
আমিনুল ইসলাম তাঁর কবিতায় চারপাশের মানুষের মুখের ভাষা ব্যবহার করেন। তাঁর কবিতায় আরবি, ফারসি শব্দের ব্যবহার যেমন আমরা প্রত্যক্ষ করি, তেমনি দেখতে পাই কবিতায় ইংরেজি শব্দের অনায়াস ও জুতসই ব্যবহার। কবিতায় তাঁর ইংরেজি শব্দ ব্যবহার পাঠকের বিরক্তির কারণ হয় না। কারণ তিনি সেসবল বিদেশি কিন্তু পরিচিত শব্দকে কবিতায় অপরিহার্য করে তুলেছেন। দৃষ্টান্ত দেওয়া যেতে পারে। যেমন:
ইয়েস, আই ডু বিলিভÑ কার্ডস ফেভার দা ফুলস!
দ্যাখোÑ পৃথিবীর ছবি আঁকতে গিয়ে আমি একটি
শ্যামল মুখেরই ছবি এঁকেছি; সেটা এই পৃথিবীর
নয়; অথচ সে-ই হয়ে উঠেছে আমার অন্তরঙ্গ
পৃথিবী।….
(‘কার্ডস ফেভার দা ফুলস’, বাছাই কবিতা)
অথবা
চুমু খাওÑ চুমু খাও
চুমু খাও নাভিতে―চুমু খাও নিতম্বে
চুমু একটি নিবন্ধন নম্বর
অতঃপর―
অটো-ইস্টাব্লিশমেন্ট অব এভরিথিং
(‘চুমু’, বাছাই কবিতা)
বাংলা কবিতায় ইংরেজি শব্দের বহুল ব্যবহার আমিনুল ইসলামের কবিতায় ছাড়া অন্য কারও কবিতায় সহসাই চোখে পড়ে না। আমরা তাঁর কয়েকটি কবিতার নাম উল্লেখ করতে পারি। যেমন: দ্য মিসড্ ট্রেন, রানিং ট্র্যাক থেকে, থার্ড আম্পায়ারের চোখে, ব্যর্থতার প্রেসনোট, ভালোবাসার স্টেশন, তোমার ভালোবাসা অথবা ধান্দাবাজির পিএইচডি, অন্ধকারের এক্সরে রিপোর্ট, নিষেধের সিলেবাস অথবা অবাধ্যতার পাঠ, অডিটবিহীন দিন, ভালোবাসার ইন্টারনাল রিপোর্ট, বিপিএটিসি তোমাকে, কিউপিডের মিউজিয়াম, ফোরকালার অধঃপতন, ব্রেকিং নিউজ, চোরের জন্য কনসালট্যান্সি, নিরপেক্ষতার পোস্টমর্টেম, সিগারেট, পাখির টক শো, ড্রেসিং টেবিল, নম্বরহীন সেলফোন, সবুজ সিগন্যাল, জলের রেকর্ড, ডায়াগনোসিস আফটার অপারেশন, বেদখল হয়ে যায় পরানের পার্ক, ইস্তাম্বুলের ইমেইল, মিউজিয়াম প্রভৃতি।
তিনি তাঁর কাব্যগ্রন্থের নামও দিয়েছেন ইংরেজি-বাংলা মিশিয়ে। যেমন: আমার ভালোবাসা তোমার সেভিং অ্যাকাউন্ট, শরতের ট্রেন শ্রাবণের লাগেজ, হিজলের সার্কিট হাউজ। প্রতিটি ইংরেজি শব্দ তাঁর কবিতায় নিপুণ শৈল্পিক সৌন্দর্যে অঙ্গীভূত হয়েছে, যা আমাদের বিস্মিত করে বৈকি!
২.
প্রেম ও প্রকৃতি আমিনুল ইসলামের কবিতার অন্যতম অনুষঙ্গ। প্রেম ছাড়া বাংলা কবিতার অস্তিত্বই যেন কল্পনা করা যায় না। বাংলা সাহিত্যে এমন কোনও কবি নেই যিনি অন্তত একটি প্রেমের কবিতা লেখেননি। এই প্রেম এক একজন কবির কবিতায় এক একরকম ভাবে বাক্সময় হয়ে ওঠে। আমিনুল ইসলামের প্রেমের কবিতা বিচিত্রধর্মী। কবি জলের অক্ষরে লেখেন প্রেমপত্র। কবি তাঁর দয়িতার উদ্দেশ্যে বলেন:
দোহাই তোমার ভুলিনিকো নীলুফর
তেমনি থাকার প্রয়াস বিরামহীন
বাতায়ন খুলে দৌড় দিতে চায় ঘর
চেপে ধরি চোখ যেই জাগে নিদহীন।
(‘একাকী, অবরেণ্য’, বাছাই কবিতা)
কবির প্রেম শুধু নারী-পুরুষের প্রেমের ছকে আবদ্ধ নয়। প্রেমিকার প্রতি ভালোবাসা মানুষ ও মানবতার ভালোবাসায় একাকার হয়ে যায়। কবিকে পোড়াতে এখনো কি পোড়ে কেউ? সুদূরে বোমায় যখন মরে শিশু ও নারী; কবি তখন প্রতিবাদী হয়ে ওঠেন। তাঁর কানে জল কাঁটাতার ভেঙে চলে আসে রোল, কবি তখন কবিতায় লাল কালি দিয়ে লিখে রাখেন প্রতিবাদ। সেই প্রতিবাদ প্রেম ও বিপ্লবে জারিত। এ ধরনের কবিতাতেও তাঁর কাব্যভাষা বুদ্ধিদীপ্ত, হৃদয়ের দানে সমৃদ্ধ ও উপভোগ্য। তিনি লেখেন:
আন্দোলনে তুমিও ছিলে
আমিও ছিলাম সোচ্চার
প্রেম ছিল ব্যালকনিতে
মিছিলে দিয়ে চোখ তার।
(‘বিপ্লব ফলুক ভালোবাসায়’)
আমিনুলের প্রেমিকা কখনও হিন্দি সিনেমার ভেনাস নামে খ্যাত মধুবালা, কখনও প্রাচীন মিশরের রানি নেফারতিতি, কখনও-বা কিংবদন্তির সাবার রানি বিলকিস হয়ে উঠেছে। এতে করে তাঁর প্রেমের কবিতা ঐতিহাসিক প্রত্নঘ্রাণ ও আন্তর্জাতিক রঙের ছোঁয়ায় সমৃদ্ধ হয়েছে। হয়তো সেজন্যই প্রেমিকাকে কাছে পেয়েও তাঁর প্রতীক্ষা শেষ হয় না। তিনি ট্রেন মিস করেন বলে প্রেমিকার সঙ্গে দেখা হয় না তাঁর। প্রেমিকার আশায় তিনি আজও ঘুরে বেড়ান পুরাতন স্টেশনে। বসে থাকেন, পায়চারি করেন, ফেসবুকে চোখ রাখেন। ট্রেনের আগমনী হুইসেল শুনতেই দৌড়ে যান প্ল্যাটফরমের দিকে―নিশ্চয়ই এইবার এসে যাবে তাঁর প্রেমিকা। কিন্তু :
ট্রেন থেকে নেমে আসা
রং করা মুখের দিকে চেয়ে দেখি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে
চোখে ফিরে আসে চোখভরা হতাশা।
মধুবালা, অপেক্ষায় থাকি তোমার দিনের পর দিন
যেভাবে আউশ ধানের বীজ বুনে জমিনে―
খরার আকাশে চেয়ে থাকে শস্যপ্রেমী কৃষক।
(‘দা মিসড ট্রেন’, বাছাই কবিতা)
কবি যখন প্রেমিকার অপেক্ষায় পথ চেয়ে থেকে হতাশ; তখন প্রকৃতির মাঝেই খুঁজে ফেরেন তাঁর হারানো ভালোবাসা। তিনি বলেন:
আমিও এখন বদলে গিয়েছি প্রিয়
আঁধার কবিতা বোধ হয় গেল ছেড়ে
পুবের বাতাসে উড়িয়ে উত্তরীয়
প্রভাত উপমা নতুন আঁধার ফেঁড়ে।
ভালোবাসি তাই প্রকৃতির পাঠশালা
আমাকে শেখায় আকাশের নীলজ্ঞান
প্রেমপত্রে হাসে মাটির বর্ণমালা
প্রাণের কবিতা নদীর অভিজ্ঞান।
(‘ভালোবাসার কবিতা’, বাছাই কবিতা)
এসব কবিতায় যেমন আছে হৃদয়ের উথালপাতাল, তেমনি আছে প্রকৃতির সাথে নিজের প্রেমকে মিশিয়ে নেয়ার অদ্ভুত ক্ষমতা। প্রেমের কবিতার প্রকৃতির সবুজ উপকরণাদির জুতসই ব্যবহার তাঁর কবিতাকে প্রাণবন্ত ও উপভোগ্য করে তোলে। তিনি মানব উঠোনের ক্ষুদ্র অনুষঙ্গে এবং মহাবিশ্বের বৃহৎ উপকরণের মাঝে চমৎকার মেলবন্ধন রচনার মাধ্যমে ভাবনার দিগন্তকে প্রসারিত করেন। কবির প্রেম যেন মহাজাগতিক প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি পেরিয়ে অনন্তগামী। তাই তিনি বলতে পারেন:
যখন তোমার নীল নিস্ক্রিয়তায় থেমে থাকে
অনুরক্ত কারো আহ্নিক গতির ট্রেন
সেটা জেনেও তুমি নিষ্ক্রিয় থাকো,
তোমার ডায়মন্ড পায়ের কাছে পড়ে থাকে
সবুজ সিগন্যালের ফ্লাগ,
তখন লোকাল ট্রেন, ইন্টারসিটি ট্রেনের
শব্দ ভেঙে
একটি মনের মৃত্যুঘণ্টা শোনে স্টেশনমাস্টার।
(‘ভালোবাসার স্টেশন’, বাছাই কবিতা )
প্রেমিকার প্রতি অনুরাগ আর স্বদেশপ্রেম একাকার ব্যঞ্জনা লাভ করেছে আমিনুলের বেশ কিছু প্রেমের কবিতায়। সে সকল কবিতায় হতাশাও আছে। কেন? কবি কি ব্যর্থ প্রেমিক? ব্যর্থতার মধ্যেই কি প্রেমের সার্থকতা? নাকি স্বদেশ নিয়ে হতাশা আছে তাঁর মনে? তা না হলে কবিকে কেন হতে হয় পরাজিত প্রেমিকের দেশের বাসিন্দা! কবির হাঁটুর নিচে দংশনের দাগ, বাহুতে তীরের ক্ষত। প্রণয়ী উঠোন থেকে বিষধর সাপকে তাড়িয়ে দিলেও উত্তোলিত ফণা কবিকে ঘুমাতে দেয় না। কবির শিথানে হিসহিস শব্দ করে পাইথন। মহাকালের তিস্তা-করতোয়া-মহানন্দার স্রোতে কলার ভেলার সাথে ভেসে গেছে পরাজিত সওদাগরের যুগ; তবু মাথার ওপর থেকে মনসার ছায়া সরে না। কবি ভালোবাসার গৌড়রাজকন্যার ঈষৎ ঝুঁকে থাকা মেঘস্তনে পাহাড়ি নাক রেখে ঘুমাতে চান। কবে আসবে সেদিন? আশাহত কবি অপেক্ষার প্রহর না গুনে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারেন। অভিমান ভরা ভাষায় তিনি বলেন:
সহস্র গোলাপ হাতে চেনা মোড়ে যদি রচো স্বাগত আসর
গোলাপের পাপড়িতে ঠোঁট ঘষে ধরো মেলে ফুল্ল মখমল―
যাব না তোমার কাছে মালা নিতে আর ছলিত গলায়।
(‘যাব না তোমার কাছে’, বাছাই কবিতা)
কেন কবি এমন সিদ্ধান্ত নিতে চান? কেননা কবি সময়ের পিঠে চড়ে নেতিবাচক পরিবর্তনের মোড়গুলো দেখে নিতে পারেন। সেভাবেই তিনি জানেন:
ভালোবাসা এখন কাগজের নোট
পাঁচ-দশ-একশো-পাঁচশো
চোর-বাটপার-ছিনতাইকারী-পকেটমার
সবার হাতে―সবখানেই সে লভ্য!
(‘ভালোবাসা সোনার মোহর’, বাছাই কবিতা)
কিন্তু কবি আশাবাদী। প্রেমেও আশাবাদ তাঁর নিরন্তর পথচলার সম্বল ও পাথেয়। ভালোবাসা-প্রেমের খোঁজে নিরন্তর ছুটে চলা কবি শেষ পর্যন্ত প্রকৃতির মাঝেই খুঁঁজে পান তাঁর নিবিড় আশ্রয়। কারণ প্রেমিকাকে পেতে চান নিবিড় ভালোবাসায় একাকার জন্মভূমির উঠোনে। তাই প্রেমিকাকে ফিরে আসার জন্য তাঁর আহ্বান কবিতায় মূর্ত হয়ে ওঠে। তিনি উচ্চারণ করেন:
ফিরে এসো তুমি
ফেরার সময় চাঁপাইয়ের মেয়েরা তোমার হাতে তুলে দেবে
একদা রানি এলিজাবেথের চোখ ঝলসানো নকশিকাঁথাÑসুজনী
তোমার বাদামি অঙ্গে জড়িয়ে দেবে
মসলিনের বিকল্প উত্তরসূরি ঝলমলে শিবগঞ্জ সিল্কের শাড়ি
তোমার ভাবনার ভাঁজে ভাঁজে তরু-তুফানেরা গুঁজে দেবে
ইতিহাসের সোনালি দিন ও রাত।
যাবে চন্দনা, যাবে আমার সাথে
নানা-নাতির গম্ভীরা গানে মুখরিত চাঁপাইনবাবগঞ্জ?
(‘ঢাকার মেয়ে চন্দনাকে’, বাছাই কবিতা)
কবি আমিনুল ইসলাম চাঁপাইনবাবগঞ্জের সন্তান। তাঁর নারী প্রেম আর জন্মভূমি প্রেম তাঁর কবিতায় একাকার হয়ে গেছে।
৩.
শ্লেষ ও ব্যঙ্গোক্তি আমিনুল ইসলামের কবিতার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। তীব্র শ্লেষের মধ্য দিয়ে তিনি তুলে ধরেন সমাজের অসঙ্গতিসমূহ, সমকালীন প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি, সুখ-দুঃখের অনুভূতিকে। বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে কবির কটাক্ষ পাঠককে সচকিত করে। শুভবাদী চিন্তা বিচিত্র চিত্রকল্পের কোলাজে চেতনায় করাঘাত দেওয়া কবিতা হয়ে ওঠে। প্রেম, বিভাজনকবলিত দেশীয় রাজনীতি, সাম্রাজ্যবাদী আন্তর্জাতিক রাজনীতির কূটচাল, চরম পুঁজিবাদের প্রযোজনায় অর্থনীতির সামরিকায়ন এ সমস্ত পরস্পর বিপরীতগামী বিষয়াদি প্রেমের কবিতায় ক্যানভাসে বুদ্ধিদীপ্ত ও হৃদয়ছোঁয়া ছবি হয়ে ওঠে। তিনি বলেন:
স্বপ্ন দেখি―ছুরিগুলো স্যালুট করছে গোরুগুলোর পায়ে
আর গোরুমশায়েরা ডান পা উঁচিয়ে গ্রহণ করছে সালাম;
স্বপ্ন দেখি―নেকড়েরা রাখি বাঁধছে হরিণের গলায় আর
হরিণ-নেকড়ের নাচের দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে বাঘ;
স্বপ্ন দেখি―সামরিক কারখানাগুলো উৎপাদন করছে
গোলাপগন্ধী পারফিউম আর কামানগুলো লিখছে কবিতা;
স্বপ্ন দেখি―পেন্টাগনে পড়ানো হচ্ছে প্রেমের বর্ণমালা
আর সৈন্যরা পরে আছে বেহুলা-লখিন্দর ইউনিফর্ম।
স্বপ্ন দেখি―বাংলাদেশের রাজনীতিকরা একতাবদ্ধ হয়েছেন
জাতীয় স্বার্থের এজেন্ডায় আর নদীগুলো ফিরে পাচ্ছে জল।
স্বপ্ন দেখি―দ্বিধার শহর থেকে ফিরে আসছো তুমি আর
তোমার জন্য কফির মগ নিয়ে আমি দাঁড়িয়ে আছি দুয়ারে।
(‘অবুঝ স্বপ্নের সমীকরণ’, বাছাই কবিতা)
অথবা
রাজপ্রাসাদ নেই, নেই রাজমুকুটও
অথচ যেখানেই হাত দিই,
সেখানেই রাজার শরীর;
আলো ছেড়ে অন্ধকারে যাই
চাররঙা আঁধারের যেখানেই
হাত পড়ে―ডানে কিংবা বামে,
সেখানেই হাতে ঠেকে
মাননীয় নিতম্বের ছোঁয়া!
(‘রাজাময়’, বাছাই কবিতা )
সাধারণ মানুষের চোখ দেখে অসুস্থ অন্ধকার চারপাশে। কিন্তু কবির চোখ সাধারণ মানুষের চোখের চেয়ে বেশি দেখে। দিনের আলোয় যা দেখা যায় তা সমাজের সকল মান্ষুই প্রায় একই রকম দেখে থাকে। বুদ্ধিমান স্বার্থপর মানুষেরা দিনের আলোতে নিজেদের সম্পূর্ণরূপে প্রকাশ করে না। রাতের অন্ধকারে তারা নানাবিধ কুপরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করে থাকে। সেজন্য কবি আঁধারের উঠোনকে বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন ও সবচেয়ে বড় শিক্ষালয় হিসেবে অভিহিত করেছেন। আঁধারের শরীরে গভীর দৃষ্টির টর্চলাইট মেরে পড়ে নিতে হবে দিনের আড়ালে থাকা সেসব লেখা। তাই কবি জেগে যখন সবুজপাড়ায় কোনও সাড়া নেই। নিদ্রাহীন কবি তীব্র শ্লেষমাখা কবিতায় উচ্চারণ করেন আঁধারের পাঠশালায় নেওয়া সেই পাঠ অভিজ্ঞান:
আহা মদ, দিনের চোখ এড়িয়ে জমে থাকা ঠান্ডা কালো মদ!
নাকে ঘ্রাণ লাগতেই খুলে যাচ্ছে সত্যের চিচিংফাঁক!
এই হচ্ছে আদি পাঠশালা! আজাহার-অক্সফোর্ড নয়,―
আঁধারই হচ্ছে সর্বশ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয়!
আমাদের জন্য আর অন্য কোনো পাঠশালা নেই;
দ্যাখো, রাজনীতির গায়ে আজ দুর্গন্ধের ছত্রাক!
(‘অন্ধরাতের এক্সরে রিপোর্ট’, বাছাই কবিতা)
সমাজ-রাষ্ট্র যখন চরম বিপর্যয়ের মুখোমুখি, তখন একজন কবিও নিজেকে গুটিয়ে নেন আপন বলয়ে―আত্মকোটরে। কিন্তু কবি একা নয়, সমাজের বহু মানুষই আত্মকোটরে গুটিয়ে যাচ্ছে। তাছাড়া বিশ্বায়নের যুগে মানুষের মন প্রত্যাশিতভাবে বৈশ্বিকতায় উদার না হয়ে দিন দিন উল্টো নির্লজ্জভাবে আত্মকামী, সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদী, দলান্ধ এবং প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের গণ্ডিতে সীমায়িত হয়ে পড়ছে। কবি এর নাম দিয়েছেন কুয়ায়ন। কুয়ার ব্যাং বাগধারাটিকে কবি পরিহাসের চাবুক হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তীব্র ব্যঙ্গোক্তির মধ্য দিয়ে তিনি বলেন:
আহা কী সুখ, দার্শনিক অনিদ্রায় রাত জেগে কষ্টকল্পনার
কষ্ট থাকছে না আর! এ সুযোগে শামুকের কাছে প্রাইভেট
পড়ে শিখে নিচ্ছি―গুটিয়ে নেওয়ার পাঠ;
কেননা, যেমন খাপটি―তেমনটি তলোয়ার!
ও ভাই ব্যাং, ও বোন কুয়ো,Ñ এই কান ধরলাম,
আর গালি দেওয়া নয়,
দ্যাখোÑ ইতিমধ্যেই কতখানি ছোটো হয়ে এসেছি আমি!
(‘কুয়ায়ন’, বাছাই কবিতা)
কিন্তু নিজেকে গুটিয়ে নিয়েও কবি চুপচাপ বসে থাকতে পারেন না। চারপাশে যে লুটপাট, পুকুরচুরি তা তাঁকে বিচলিত করে। সমাজে ছোট চোরদের মাঝেমাধ্যে শাস্তি হলেও বড় চোরেরা আইন ও শাস্তির নাগালের বাইরে রয়ে যাচ্ছে। কারণ দেশীয় ভূগোলে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বড় চোরেরা রাষ্ট্রীয় ও অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার প্রত্যক্ষ অথবা অদৃশ্য অংশীদার হয়ে থাকে। কবি শ্লেষভরা কণ্ঠে উচ্চারণ করেন:
সাবধান হে চোর মহোদয়, আর মুরগি চুরি নয়!
হাজতের চাবি আর হাতকড়া হাতে নিয়ে
দ্যাখো নাকি―দাঁড়িয়ে আছেন থানা মহাশয়!
জেনে রাখো―মুরগি চোরকে ঘৃণা করে―
জনতা ও জেলখানা, থানা ও দুদক,
উকিল ও আদালত,―অধিকন্তু সকলেই প্রায়।
তার চেয়ে―যদি পারো গিলে খাও দিঘি ও পুকুর
জেনে নাও হজমের হাল;
ভালো? অতঃপর আস্ত একটি বঙ্গোপসাগর
জঙ্গলে বা জাতিসংঘে তখন আর কে আটকায় হে বীর!
(‘চোরের জন্য কনসালট্যান্সি’, বাছাই কবিতা)
আজকাল মানুষের নিরপেক্ষতা নিয়ে মানুষ প্রশ্ন তোলে। আসলেই নিরপেক্ষ বলে কিছু হয়? নিরপেক্ষ হলেই উপেক্ষা, নিরপেক্ষ হলেই অস্বীকৃতি? বাস্তবে নিরপেক্ষ মানুষদের আজকাল কেউই পছন্দ করে না। কারণ সবাই চায় নিজের পক্ষের লোক। গুণগত মানের প্রকৃত গণতন্ত্রহীন সমাজে অনুদার রাজনীতি নিরপেক্ষ মানুষদের প্রতিপক্ষের দৃষ্টিতেই দেখে। তাদের চায় না কোনও পদে কিংবা কাজে। ফলে যারা নিরপেক্ষ তারা ছাগলের তিন নম্বর বাচ্চার মতো বঞ্চিত হয় সমাজের সকল অঙ্গনে। এই নিয়ে কবির ব্যাঙ্গোক্তি কতখানি তীব্র তা তাঁর কবিতায় মূর্ত হয়ে ওঠে :
নিরপেক্ষ মানে―তুমি ক্ষমতার চোখে চক্ষশূল
নিরপেক্ষ মানে―তুমি বিরোধী-নয়নে বালি;
নিরপেক্ষ মানে―তুমি পার্টি ও পলিটিক্সের দেশে
ছাগলের তিন নম্বর বাচ্চাটি―ভ্যা…ভ্যা…ভ্যা…ভ্যা।
(‘নিরপেক্ষতার পোস্টমর্টেম’, বাছাই কবিতা )
আজকাল গণতন্ত্রের নামে মানুষ নিষ্পেপিত হয়, মিথ্যা হয়ে যায় সত্য। চারপাশ যেন গোয়েবলসের আলোকায়িত সংস্করণ। গুম হচ্ছে হরহামেশা, খুন হচ্ছে প্রতিনিয়ত। পিতৃহীনের কান্নায়, ধর্ষিতার যন্ত্রণায় ভারী হয়ে আসে বাতাস। সততাই সর্বোৎকৃষ্ট পন্থাÑএই পুরোনো ও শ্রদ্ধামিশ্রিত প্রবাদটি আজ অচল হয়ে গেছে। বাতিল হয়ে গেছে তার সমস্ত প্রায়োগিক ব্যবহার। সততা, সত্য, মানবতা ইত্যাদির আজ আর কোনও মূল্য যেখানে নেই, তাই কবির ব্যঙ্গোক্তি:
মাফ করে দাও বাবা
‘পূর্ব পাকিস্তান’ শব্দটির মতো বাতিল হয়ে গেছে
তোমার শেখানো সে তরিকা;
জং ধরা ঐ প্রবাদবাক্য বয়ে আর
ভাঙতে চাই না ঘাড়
এবার পুরাতন বোতলে নতুন মদ
খাবে না বাবা? তুমি না খাও, রাষ্ট্র খাবে―রাজনীতি খাবে।
(‘বৃদ্ধ বাবা এবং সত্যের রং’, বাছাই কবিতা)
দায়িত্বশীলতার উচ্চ চেয়ারে আসীন আমাদের অনেকের অদূরর্শিতা, হীনম্মন্যতা কবিকে পীড়া দেয়। সমাজের চোখে যারা বরণীয়, সমাদৃত তাদের অনেকেই মূলত সুযোগসন্ধানী। সেই সুযোগসন্ধানী ও স্বার্থপর মানুষদেরকে কবি চিহ্নিত করেন তীব্র ব্যঙ্গোক্তির মধ্য দিয়ে। প্রকৃত যোগ্যতাহীন তেলবাজ ও চাটুকাররা সমাজের প্রতিষ্ঠিত ক্ষমতাবানদের পেছন থেকে চালিত করে। এরা প্রাণির লেজের মতো পেছনে থাকে কিন্তু কাজ করে চালকের। তিনি বলেন:
লেজ। বড়োই উপকারী অঙ্গ!
চতুষ্পদ হোক, হয় হোক দ্বিপদ
প্রাণীমাত্রেই জানে এই যুক্ত-মাহাত্ম্যের মর্মসীমা।
হাত না থাকলে ক্ষতি নেই, পা না থাকলেও চলে;
এমনকি অপরিহার্য নয় মাথামোটা মাথাটাও;
কিন্তু ওই সোনা অঙ্গ চাই; আহা অঙ্গ সোনা।
ইতর জ্বালাতন অথবা চোরা অ্যালার্জির কুটকামড়ানি
অথবা আবদার অভিব্যক্তি, যাই হোক―
সফল তরিকামতে লাঙ্গুলই অবিকল্প সহায়;
(‘পুচ্ছ সংকীর্তন’, বাছাই কবিতা)
আমিনুল ইসলামের এমন অনেক কবিতা আছে, যেসব কবিতায় সমাজ ও রাষ্ট্রের নানাবিধ অসঙ্গতি তিনি তুলে ধরেছেন স্যাটায়ারের মধ্য দিয়ে। স্যাটায়ার, পরিহাস, বিদ্রুপ, শ্লেষ তাঁর অন্যতম প্রধান কাব্যিক অলংকার যা তাঁর কাব্যভাষাকে প্রাতিস্বিকতায় ও উপভোগ্যতায় উন্নীত হতে সহায়তা করেছে।
৪.
কবিতায় ছন্দের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে মতভেদ আছে। কিন্তু একটি কবিতা ছন্দ ও অলংকারের নিয়ম-বিধি মেনেই সার্থক হয়ে ওঠে। আমিনুল ইসলাম ছন্দসচেতন কবি। অলংকারের নিপুণ ব্যবহারে তাঁর কবিতা হয়ে ওঠে পাঠকপ্রিয়। কবিতায় প্রচলিত ছন্দের পাশাপাশি আছে চিত্রকল্প তথা উপমা, উৎপ্রেক্ষার যথার্থ ব্যবহার। আমিনুল ইসলাম মাত্রাবৃত্ত ছন্দে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। তাঁর একটি কবিতায় মাত্রাবৃত্তের চমৎকার ব্যবহার দৃষ্টি কাড়ে। ৬ + ৬ + ২ মাত্রার একটি দৃষ্টান্ত :
ভালোবাসি তাই ভালোবাসা মূলধন
রণতরি নয়, সাতডিঙা মধুকর
দারুচিনি দ্বীপ পেতে চায় এই মন
ভান্ডি সে নয়,―বেহুলার বন্দর।
ভালোবাসি তাই অথরিটি আমরাই
আমরাই দিই আমরাই নিই ট্যাক্স
সব ডিসিশন অনুরাগ কামরায়
শরীরের চিঠি শরীরের কাছে ফ্যাক্স।
(‘ভালোবাসার কবিতা’, বাছাই কবিতা )
স্বরবৃত্ত ছন্দেও তিনি সাবলীল। ৪ + ৪ + ৪ + ২ একটি দৃষ্টান্ত :
মেঘ এসেছে রোদের বাড়ি
বৃষ্টি পড়ে গাছে
দুর তুমি তো খরা আমার
বৃষ্টি,―এলে কাছে।
(‘বৃষ্টি’, বাছাই কবিতা)
অক্ষরবৃত্ত ছন্দেও তিনি অনায়াসে কবিতা রচনা করেন। অক্ষরবৃত্তে ১৮ মাত্রার একটি দৃষ্টান্ত:
বিস্মৃত বাঁশের কেল্লা, জলে ভাসে আলাওল নাম
কালের করাত হাসে: বটভায়া, দ্যাখো দফারফা!
সুরের অরিশ ভুলে প্রেমে-ভরা নগরের ধাম
শেরাটনে হয়ে ওঠে কৌটিল্যের গোপন মুনাফা
পাহাড়পুরের সোনা চূর্ণরেণু কালের ধুলায়
সে-ধুলায় ধূলিচাপা মাঝিহীন গন্ধেশ্বরী-ঘাট
শ্রীজ্ঞানের পাঠশালা উড়ে যায় শিমুল তুলায়
শিক্ষার্থী বিকেলে ফেরে বুকে নিয়ে বনসাইপাঠ।
(‘মেঘের মিনারে বসে দেখা’, বাছাই কবিতা)
কবিতায় চিত্রকল্পের ব্যবহার একটি অনিবার্য অনুষঙ্গ। কেউ কেউ বলেন চিত্রকল্পই কবিতা। কবি আমিনুল ইসলামের কবিতায় চিত্রকল্পের যথার্থ ব্যবহার প্রত্যক্ষ করি। তিনি অভিনব ধরনের নানাবিধ চিত্রকল্প রচনা করেছেন। আমরা তাঁর বাছাই কবিতা থেকে উদ্ধৃতি দিতে পারি :
১.
এখন আমার কবিতা বারোভুঁইয়ার ভূগোলে
এক চিরনাব্য নদী―যা মাঝির অপেক্ষায়
টলমল করছে বুকে নিয়ে স্রোত ও ঢেউ, জল ও জোছনা।
(জলের অক্ষরে লেখা প্রেমপত্র)
২.
বিষাদের ম্যানিলা রোপে ঝুলতে থাকে
অনুরক্ত সময়ের লাশ!
(হে মেয়ে, ভালোবাসাও একটা কাজ)
৩.
তুমি তো জানো সুমনা, আমি এক পুরোনো পৃথিবী ;
বহুবার বর্ষায় ভিজেছি, শুকিয়েছি শীতে,
(বৈশাখী ভালোবাসা)
৪.
মনের উঠোন জুড়ে অন্তরঙ্গ স্পর্শগুলো গোপন বাগান।
(অন্তরঙ্গ অন্তরালে )
৫.
অতঃপর মেইল নম্বরের সাথে পাসওয়ার্ডের মতো
হাতের মুঠোয় হাত
টয়োটা সোফায় শরীরের ক্লাসমেট শরীর।
(তুমি পারবে, পারতেই হবে তোমাকে)
৬.
বহুগামী অন্ধকারের শরীরে,Ñ যেখানে
জোছনাকে কুকুরের চোখ বলে মনে হয়।
(ব্যর্থতার প্রেসনোট)
৭.
আমার এ জীবনটা বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেট
একটা জয়ের আগে অনেকবার হারতে হয়
(অসমাপ্ত আত্মজীবনী, আমার)
৮.
তোমার কথার জোছনা মেখে
মন হয়েছে রাত
(মুঠোফোন প্রেম)
৯.
মহাকালের মিউজিয়ামে জমা হয়েছে
রাখালিয়া বাঁশি
(হে আমার সবুজ শব্দেরা)
১০.
আহা, অহিংসার আগুনে পোড়ে―
স্তনে মুখ দিয়ে ঘুমিয়ে পড়া চাঁদ
হুপিংকফে আক্রান্ত সাগর
আগুনে বিধবা আলো এবং
বন্দুকের নল দেখে কুঁড়েঘরে ঢুকে পড়া মালী;
আর কেরোসিনের টিন ও পেট্রোলের ডিবা নিয়ে শশব্যস্ত
গেরুয়া-রাখিতে আবদ্ধ সম্মিলিত হাত।
(রাখাইন এবং…)
১১.
আঁধারের পাঠাগারে লেখা আছে অবিকৃত ইতিহাস;
এসো পাঠ করি।
আলো হচ্ছে চাবি,
আলো হচ্ছে সংরক্ষিত টর্চলাইট।
(অন্ধকারের এক্সরে রিপোর্ট)
১২.
পাতার পোস্টারে লেখা পাখির স্লোগান হয়ে
পতাকায় দোলে আজ অতীতের ভুলে-যাওয়া বাণী
বাতাসের অনুবাদে বেজে ওঠে সে―বাণীর মানে।
(আছে সংগ্রাম―আছে ভালোবাসা)
১৩.
অহিংস উঠোনে ডাঁসের হুল হয়ে কামড়ায় দখলবাজি দুঃস্বপ্ন;
আমি দড়িছেঁড়া বাছুর হয়ে ছুটে যেতে চাই খুঁটাহীন মাঠে―
(কালোরাত গেরুয়াদিন)
১৪.
পাকা হেমন্তের খেত হয়ে উঠেছে রোদের শরীর
পৃথিবী পরে আছে পরনে রেশমের শাড়ি
(সোনালি রোদের পরাবাস্তবতা)
১৫.
অদ্ভুত শোকে পায়রারা উড়ে যাচ্ছে দুপাশে মেলে
শরণার্থীর পায়ের মতো ভয়ার্ত ডানা
(দাঁতাল স্তব্ধতা )
১৬.
পাথরের ঘাটে বসে পা উঠিয়ে পা ঘষে রজনী
খসে পড়ে অন্ধকার
(পাথর নিয়তি)
১৭.
দ্যাখো―নীল সাদা প্রচ্ছদে ভাঁজ হয়ে শুয়ে আছে সুন্দর
লাল আলো চুমে যায় সাদা-কালো চোখ
ভোরের হাওয়া এসে খেলা করে মেঘভাঙা চুলে
(শুয়ে আছে সুন্দর )
১৮.
পুরোনো বাগান ঘেঁষে ম-ম করছে দুপুরের রোদ
(দুঃসময়ের ডানা)
১৯.
দ্যাখো―বুশের অধরে বাঘের লালা―নেতানিয়াহুর ঠোঁটে গোখরোর বিষ
(অধরচরিত)
২০.
আহা কত পরিশ্রম―শ্রান্তিতেও ফিরিয়ে দেওয়া বুকখোলা সাঁঝের দাওয়াত!
দিনের শরীর জুড়ে ফোঁটা ফোঁটা ঘাম
(কচুপাতার কাব্য)
এমনি করে আরও প্রচুর উদ্ধৃতি দেওয়া যাবে। আমিনুল ইসলামের কবিতায় চিত্রকল্পের যে ব্যবহার, তার মধ্যে চমক আছে, আছে এক ধরনের স্বাতন্ত্র্য। তাঁর কবিতার চিত্রকল্পের মধ্যেই লুকিয়ে আছে রূপক, উপমা, উৎপ্রেক্ষাসহ অলংকার শাস্ত্রের বিভিন্ন বিষয়।
৫.
আমিনুল ইসলাম একই সাথে দৈশিক ও বৈশ্বিক চেতনার কবি। বিশ্ব মানবিক চেতনা তাঁর কবিতাকে দিয়েছে অনন্য স্বাতন্ত্র্য। তাঁর কবিতায় ছড়িয়ে আছে তাঁর জন্মভূমি থেকে এশিয়া, আফ্রিকাসহ সারা বিশ্বের নিপীড়িত মানুষের মুখচ্ছবি। যেখানে অসঙ্গতি, সমাজ-রাষ্ট্রের ক্ষতের প্রাবল্য, আমিনুল ইসলাম সেখানে প্রতিবাদী। কখনও সরাসরি, কখনও বা প্রতীকের আড়ালে।
আমিনুল ইসলামের কবিতা বিচিত্রগামী। তাঁর কবিতার বহুমুখিতা আমাদের বিস্মিত করে। কবিরা সংবেদনশীল। সময় ও সময়ের প্রতিবেশ একজন কবিকে স্পর্শ করবেই। একজন কবি কতখানি সার্থক তা নির্ভর করে তাঁর পর্যবেক্ষণ ক্ষমতার উপর। কবি আমিনুল ইসলামের গভীর অন্তর্দৃষ্টি সমাজের সকল অসঙ্গতি, অসত্যকে তুলে ধরে পাঠকের সামনে। কবিতা লেখার নির্দিষ্ট কোনও বিষয় নেই, এটা তাঁর কবিতাগুলির দিকে দৃষ্টি ফেরালেই সহজে বোঝা যায়। দেশ, কাল, সমাজ, রাষ্ট্র ইত্যাদি যেমন তাঁর কবিতায় প্রতিফলিত, তেমনি আমাদের চেনাজানা এমন কোনও বিষয়-অনুষঙ্গ নেই, যা তাঁর কবিতায় খুঁজে পাওয়া যাবে না। প্রাচ্য, প্রতীচ্য, সভ্যতা, ভালোবাসা, প্রেম, দুঃখ, সুখ, সফলতা, ব্যর্থতা, মেঘ, বৃষ্টি, চেয়ার, টেবিল, নদী, দিঘি, মেঘ, বৃষ্টি, আগুন, বৃক্ষ, তূর্যবাদক, তুতেনখামেন, নেফারতিতি, খুফুর পিরামিড, বুশ, নেতানিয়াহু, জাতিসংঘ, পুঁজিবাদ, গণতন্ত্র, অভিবাসন, উদ্বাস্তু, রেলগাড়ি, স্টেশন, হালখাতা, সুন্দরবন, কিউপিড, পৃথিবী, জল, চাঁদ, ফুটবল খেলা, কার্টুন, বাস্তবতা, পরাবাস্তবতা, এক্সরে রিপোর্ট, আহ্নিক গতির ট্রেন, অভিকর্ষ, মহাকর্ষ, কালো বামন, ব্ল্যাক হোল, আয়োনোস্ফিয়ার, জোয়ারভাটা, ইথারের নদী, মার্শাল মেজর কান, ক্রুসেডের লিঙ্গ টমাহক, বীর্যহীন জাতিসংঘ, বিকিনি হাসি, পাখির টকশো, বেহুলা-দুপুর, লখিন্দর কায়া, অহিংসা প্রযোজিত গেরুয়া জাহান্নাম, প্রতিবেশী অভিচার, বারুদসভ্যতার আধুনিক জঙ্গল, তলবিসভার নোটিশ, চাইনিজ রেস্তোরাঁর ডিজিটাল আলো-আঁধারি, দানাদার চুম্বনের শব্দ, প্রণয়ের পাঠশালা, ইস্কেপ ভেলোসিটি অব লাভ, স্বপ্নের হালখাতা, শ্রবণের সিলেবাস, মিলনের রিং টোন, বিচ্ছেদের এসএমএস, মহাকালের রিসাইকেল বিনের ঝুড়ি, শেয়াল, কুমির, বাঘ, হাঁস, চিলেকোঠা, ঘোড়া, রাজা, রাজকন্যা, জামদানি, পর্ণমোচী, ভ্রাম্যমাণ ক্যামেরা―কী নেই তাঁর কবিতায়! আমিনুল ইসলাম যে কোনও বিষয় নিয়ে কবিতা লিখতে পারেন। অনায়াসে যে কোনও শব্দকে কবিতায় রূপান্তরিত করতে পারেন, এ যোগ্যতা সবার থাকে না। শব্দের খেলা, বিষয়ের অভিনবত্ব বিচিত্র ধারায় তাঁর কবিতাকে অনন্যতা দান করেছে।
উত্থানগত নিরিখে আমিনুল ইসলাম নব্বই দশকের কবি। কিন্তু প্রকৃত একজন কবিকে কোনও দশকের গণ্ডিতে আবদ্ধ করা যায় না। তাই কবি নিজেই বলেছেন:
এ কোন জাতের কবি? কী তার দশক?
মাঝে মাঝে উঁকি দেয় আশির ঘরানা
কোনো কবিতার ভাঁজে সত্তরের শোক
নব্বইয়ের ঘরে আনি―সে ঘরে ধরে না।
(কবিতা তো নেবে তাকে দশক নেবে না)
আমিনুল ইসলামের মতো মনে-প্রাণে একজন খাঁটি কবি কোনও দশকের গণ্ডিতে বৃত্তাবদ্ধ না হয়ে হয়ে উঠবেন সর্বকালের কবি, এটাই আমাদের একান্ত প্রত্যাশা।
লেখক : কবি ও গবেষক



