আর্কাইভগল্প

গল্প : হুদহুদ পাখি : শাহনাজ মুন্নী

ঘুটঘুটে অন্ধকার রাতে গাড়িটা চলছে একটা কুয়াশাচ্ছন্ন গ্রামের ভেতরের সরু পথ ধরে। অন্ধকারে গা ডুবিয়ে পথের দু পাশে বাঁকা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে লম্বা লম্বা কড়ই গাছ, ঘন ঝোপঝাড়। মাঘ মাসের প্রচণ্ড শীত, চারপাশে সবকিছু নিকষ কালো আঁধারে ঢাকা, টিমটিম করে রাস্তার পাশের ল্যাম্প পোস্টের বাতিগুলো সর্বশক্তি দিয়ে জ্বলার চেষ্টা করছে কিন্তু তাদের মলিন ঘোলাটে আলোয় পরিষ্কার করে তেমন কিছু দেখা যাচ্ছে না। গাড়ির হেডলাইটের কড়া আলোও যেন সামনের অন্ধকারের নিরেট দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসছে। বহু চেষ্টা করেও সামনের দুই হাত দূরত্ব অতিক্রম করতে পারছে না।

জামান-ফৌজিয়া দম্পতি ঢাকা থেকে ফিরছিল তাদের সখের গ্রমের বাড়ি কাননপুরে। এক বন্ধুর ভাইয়ের বিয়ের অনুষ্ঠানে অংশ নিতে গিয়ে রাত হয়ে গিয়েছিল বলে ফৌজিয়ার তেমন ফেরার ইচ্ছা ছিল না। কিন্তু জামান কিছুতেই সেই রাতে ঢাকায় থাকতে চাইছিল না। ওদের নিজস্ব গাড়ি নাই। যাতায়াতে উবারই ভরসা।

‘কিন্তু এত রাতে ঢাকার বাইরে যাওয়ার জন্য উবার পাবা ?’ 

রাত তখন সাড়ে বারোটা পেরিয়ে গেছে, ফলে ফৌজিয়া বেশ সন্দিহান।

‘ওকে, গাড়ি না পেলে যাব না। তার আগে একটু কল দিয়ে দেখি! আজকাল অনেক গাড়ি সারা রাত ডিউটি করে!’

কল করার দশ মিনিটের মধ্যে ওদের অবাক করে দিয়ে একটা সিলভার কালার টয়োটা এক্স করোলা গাড়ি এসে হাজির। ছিমছাম পরিচ্ছন্ন গাড়িটার নরম সিটে গা এলিয়ে দিয়ে মনটা ভালো হয়ে গেল জামানের।

‘বাহ, গাড়িটা তো সুন্দর! আপনার নিজের ?’

‘না স্যার! মালিকের!’

মিট ইওর ড্রাইভারে গিয়ে ফৌজিয়া এক ফাঁকে দেখে নিল চালকের নাম হাবিবুল, বয়স ২৯ এবং উবারে এটি তার প্রথম ট্রিপ।

‘প্রথম ট্রিপেই ঢাকার বাইরে যাচ্ছেন হাবিবুল ?’

ড্রাইভার উদাস ভঙ্গিতে বলল ‘ট্রিপ তো ট্রিপই ম্যাডাম, ঢাকার বাইরেই কি আর ভেতরেই কি ?’

‘তা অবশ্য ঠিক! কতদিন ধরে গাড়ি চালান আপনি ?’

গাড়ি ততক্ষণে চলতে শুরু করেছে, চানখারপুল পেরিয়ে হানিফ ফ্লাইওভারে ওঠার মুখে এত রাতেও সামান্য যানজট পাওয়া গেল। সেই জটের ভিড় ঠেলে ফ্লাইওভারে উঠতেই গাড়ির ডানপাশ ঘেষে সাঁই সাঁই করে বিপজ্জনক গতিতে দুটো মোটর সাইকেল বেরিয়ে গেল। আরেকটু হলেই হাবিবুলের গাড়ির লুকিং গ্লাসটা নির্ঘাত ভাঙতো। এমন অবস্থায় অন্য ড্রাইভাররা হয়তো চেঁচিয়ে উঠত, গালি দিত, নিদেনপক্ষে ‘দেখছেন ভাই, কাজটা কী করল!’ বলে তাদের সাক্ষী মানতো। কিন্তু হাবিবুল শান্ত হাতে স্টিয়ারিং ধরে বসে রইল। কিছুই বলল না। তা বেশ ভালো, জামান বুঝল হাবিবুল মাথা গরম করা ড্রাইভার না। একটু স্বস্তি পেল সে।

বড় রাস্তা ধরে মসৃণ গতিতে গাড়ি চলতে থাকলে একটু নিশ্চিন্ত হয়ে বাড়ির ছাদে আরও কিছু গোলাপ চারা লাগানো যায় কি না তা নিয়ে আলাপ জুড়ে দেয় জামান আর ফৌজিয়া। শিশু একাডেমির পাশে কয়েক দিন আগে একটা হালকা হলুদ রঙের গোলাপের চারা দেখেছিলাম। যা সুন্দর! ফৌজিয়া বলল। জামান বলছিলো, ‘গনি মিয়াকে বলতে হবে দুই বস্তা শুকনা গোবর সার দিয়া যাইতে। গোলাপ চারায় দিতে হবে।’

গাড়ি এখন ডেমরা পার হয়ে কাজলায়। তারপরই মূল রাস্তা থেকে একটা বাঁক নিয়ে গাড়িটা ঢুকে গেল বাঁ দিকে কোনাপাড়ার রাস্তায়। নোংরা পানিতে প্রায় ড্রেনে পরিণত হওয়া একটা খালের ওপরের ছোট্ট ব্রিজ পার হয়ে গ্রামের ভেতর দিয়ে নীরব সুমসাম চিকন পথ। পথের ধারের টং দোকানগুলো অনেক আগেই বন্ধ হয়ে গেছে। ঝাপের উপর স্বল্প পাওয়ারের বাতি সারা রাত ধরে জেগে থাকার অঙ্গীকার ঘোষণা করছে। রাতের দ্বিপ্রহরে গ্রামবাসী হয়তো তাদের লেপের তলায় ঘুমের ঘোরে ডান পাশ থেকে বাঁ পাশে কাত হচ্ছে, যাকে বলে ‘প্রহরান্তের পাশ ফেরা’। এতক্ষণ সব ঠিকই ছিল, হঠাৎ ফৌজিয়া খেয়াল করল হাবিবুল কেন যেন খুব জোরে গাড়িটা চালাচ্ছে।

সে একটু ঘাবড়ে গিয়ে বলল, ‘ড্রাইভার সাহেব গাড়িটা আস্তে চালান।’

ড্রাইভার এবারও সেইরকম উদাস ভঙ্গিতে বলল, ‘আস্তে চালালেই কি আর জোরে চালালেই বা কি ? একই কথা!’ 

‘না। একই কথা না। আপনি আস্তে চালান।’

একটু উচ্চস্বরে ধমক দিয়ে বলল ফৌজিয়া। গাড়ির গতি সামান্য কমালো হাবিবুল। এতক্ষণ তবু আকাশে চাঁদ ছিল, চারপাশটা আবছাভাবে দেখা যাচ্ছিল। এখন হঠাৎ দেখা যাচ্ছে চাঁদ তো নেইই, একখণ্ড ঘন কুয়াশা কোথা থেকে ভেসে এসে গাড়ির উইন্ড শিল্ডে আছড়ে পড়ল আর সামনের পথটাকে সাদা চাদর দিয়ে মুড়ে প্রায় অদৃশ্য করে দিল। জামান এবার বেশ চিন্তিত হয়ে পড়ল। সে পেছনের সিট থেকে ড্রাইভারকে বলল, ‘ভাই আপনি কি ঠিক মতো দেখতে পাচ্ছেন সামনে ?’ 

‘হ্যাঁ, চিন্তা করবেন না, আমি দেখতে পাচ্ছি এবং একটু বেশিই দেখতে পাচ্ছি স্যার।’ ড্রাইভার স্টিয়ারিং ধরে সামনের দিকে তাকিয়ে উত্তর দেয়।

‘বলেন কি, বেশি দেখতে পাচ্ছেন মানে ?’

‘স্যার, আমি এমন কিছু দেখতে পাই যেটা অন্য কোনও ড্রাইভার পায় না।’

‘মানে কি ?’

‘এই যে একটু পরে দেখবেন আর একটু কুয়াশা যদি রাস্তায় জমে তাহলে আমি চোখ বন্ধ করে গাড়ি চালাব।’

জামান ও ফৌজিয়া এবার সত্যিই আঁতকে উঠে। 

‘বলেন কী ? এই ভাই, এই ভাই এগুলো কী ধরনের কথা ?’

‘স্যার চিন্তা করবেন না, ভয় পাবেন না। যখন আমি চোখ বন্ধ করে গাড়িটা চালাব তখন গাড়িটা কিন্তু মেঘের মধ্যে মানে আকাশের মধ্যে উড়ে যেতে পারে। এই জন্য স্যার কষ্ট করে সিট বেল্টটা একটু বেঁধে নেন।’

‘এই মিয়া কন কি, আপনে ?’

জামান এবার ধমকে ওঠে। হাবিবুল শান্ত কণ্ঠে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলে, ‘সিট বেল্টটা বাঁধেন স্যার, বিমানে চড়ার সময় যেমন বাঁধেন, ইউটিউব খুলে সিট বেল্ট বাঁধাটা দেখে নিতে পারেন, নয়তো আমিই দেখাই।’

কী বলছে এই লোক ? পাগল নাকি ? এমন গভীর রাতে নিঝঝুম গ্রামীণ পরিবেশে ঠান্ডা গলায় বলা তার কথাগুলো ফৌজিয়ার বুকের মধ্যে ভয় ধরিয়ে দিচ্ছিল। বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ ছোটবেলার মতো ওর মনে হলো কোনও অদৃশ্য দানব যেন জানালার কাচের ওপাশে দু হাত মেলে দাঁড়িয়ে আছে। গোল গোল চোখে দেখছে ওদের। ভয়ে শিউরে উঠে জামানের হাত আঁকড়ে ধরে ফৌজিয়া। আতংকের একটা চিকন স্রোত তার শিরদাঁড়া বেয়ে কুল কুল করে নেমে যায়। বলে কি লোকটা ? এই অদ্ভুত সময়ে কার খপ্পরে পড়লাম আমরা ? ফৌজিয়া ভাবে।

জামান বলল, ‘আপনি গাড়িটা থামান। আমরা নেমে যাব!’

‘স্যার, আপনি বললেই গাড়ি থামবে না। কারণ কী জানেন, এই গাড়ি স্যার আমি চালাচ্ছি না। গাড়িতো স্যার আল্লাহ চালাচ্ছে।’

‘এই মিয়া গাড়ি আল্লাহ চালাচ্ছে, ফাইজলামির জায়গা পান না মিয়া! আল্লাহ তো আপনাকে বিদ্যাবুদ্ধি দিছে, আপনি ড্রাইভিং শিখে গাড়ি চালাচ্ছেন! এই সব কী বলেন আজগুবি কথা ? ’

‘স্যার পৃথিবীটাই আল্লাহ চালাচ্ছে স্যার, গাড়ি আর এমন কি ?’

‘আল্লাহ পৃথিবী চালান, বুঝলাম! কিন্তু গাড়ি তো আপনি চালাচ্ছেন! কী বলতেছেন এইসব আবোল তাবোল ? এই মিয়া আপনের মাথা ঠিক আছে তো ?

‘স্যার মাথা তো ঠিকই ছিল, কিন্তু আমাকে যখন বাবা-মা হাসপাতালে ভর্তি করে দিল, মাথাটা তখন সামান্য বিগড়ে গেছে। আর মনে হয় ঠিক হয় নাই!’

এই মধ্যরাতে নিস্তব্ধ রাস্তায় এসব কথা শুনে গাঁয়ে কাটা দিয়ে উঠল ফৌজিয়ার। শেষ পর্যন্ত আমরা একটা বদ্ধ উন্মাদের পাল্লায় পড়লাম ? কী হবে এখন ? রাগে দুঃখে ভয়ে ফৌজিয়ার কান্না পেয়ে গেল। ড্রাইভার তো গাড়িও থামাচ্ছে না। যদিও গতিটা আগের চেয়ে কমিয়ে এনেছে। জামান এবার ফৌজিয়ার হাতের উপর হালকা করে চাপ দিল। তারপর যেন খুব মজা পাচ্ছে এমন আগ্রহ নিয়ে সামনের দিকে গলাটা বাড়িয়ে জানতে চাইল, 

‘বলেন কী, ঘটনাটা একটু খুলে বলেন তো ভাই, শুনি…’

‘স্যার আমি একটা প্রেমে পড়েছিলাম।’ হাবিবুল একটা  দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ‘আচ্ছা বলেন স্যার, প্রেমে পড়াটা কি খারাপ ?’ 

‘না, না, অবশ্যই খারাপ না। এই ভদ্রমহিলাকে প্রেমে পড়েই বিয়ে করেছি আমি।’ 

জামান ডান হাত দিয়ে ফৌজিয়াকে জড়িয়ে ধরল। ফৌজিয়া বুঝল, তাকে আশ্বস্ত করতে চাইছে জামান। ভয়ের মাঝে অভয় দিচ্ছে। সাহস দিতে চাইছে। গাড়িটা তক্ষুনি ঠাস করে একটা ঝাঁকুনি খেল। বোধহয় কোনও খানাখন্দে গিয়ে পড়েছে। বুকটা ধক করে উঠল ফৌজিয়ার। এইবার নিশ্চয়ই গাড়ি উল্টে পাশের খাদে গিয়ে পড়বে। কিন্তু সুখের বিষয় তেমন কিছু ঘটলো না। হাবিবুল দক্ষ হাতে গাড়িটা সামলে নিয়ে বলল, ‘আমি কিন্তু স্যার প্রেমে পড়ে কবিতা লেখা শুরু করলাম। কবিতা শোনাই স্যার আপনাকে। আপনারা গোলাপ ভালোবাসেন নিশ্চয়ই কবিতাও আপনাদের পছন্দ হবে।’

জামান বলল, ‘দেখেন ভাই, এই রাস্তাটা কিন্তু জায়গায় জায়গায় ভাঙ্গা আছে, সেটা দেখেশুনে সাবধানে আস্তে আস্তে গাড়ি চালান, তারপর কবিতা শোনান… মুখস্থ আছে ? কত বড় কবিতা ?’

‘মুখস্থ কি বলেন, ঠোঁটস্থ আছে স্যার! কবিতাটা অনেক বড় স্যার! আপনারা শুনতে চাইলে আমি সারা রাতই কবিতা শুনায়া কাটায়া দিতে পারব।’

ফৌজিয়া মনে মনে আল্লাহকে ডাকে। ভাবে, এই তো গ্রামের পথ পার হয়ে আর কিছুদূর গেলেই হাইওয়েতে পৌঁছে যাব। ততক্ষণ পর্যন্ত এই আজব লোকটা কোনও অঘটন না ঘটালেই হয়। এরই মধ্যে ড্রাইভার হাবিবুল সামনের দিকে তাকিয়ে এক লয়ে সুর তুলে দ্রুতগতিতে তার কবিতা পাঠ শুরু করে দিয়েছে,    

‘হে প্রিয়া, পেয়ে তোমার প্রেমের ছোঁয়া,

হৃদয় আমার ব্যাকুল হলো ভালোবাসা দিয়া

হে প্রিয়া হে প্রিয়া তুমি আমার হিয়া

তোমায় আমি ভালোবাসি হৃদয় মন দিয়া

তোমার চোখে বিজলি চমক, বুকে কাহার ছায়া

আমার মনটি নৃত্য করে তোমায় ঘিরিয়া

তুমি আমার প্রাণ, আমায় তুমি বাঁচিয়ে রাখো ভালোবাসিয়া

হে প্রিয়া যাইও না আমায় ছাড়িয়া।

তুমি যবে ছেড়ে গেলে ঢাকিল পূর্ণিমা চাঁদ

আমার দুঃখের সীমার ভেঙ্গে গেল বাাঁধ ।

হে প্রিয়া কেন এলে, কেন তবে ছেড়ে গেলে

কী ছিল তোমার মনে জানা হলো না

জীবন মরণের সাথী হলে না…’

প্রায় পনের-বিশ মিনিট একটানা প্রলাপের মতো গড়গড় করে তার প্রেমের কবিতার আবৃত্তি এবং গাড়ি চালনা যুগপৎ চলল। ফৌজিয়া এক ফাঁকে জামানের কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল, ‘ওর সব কিছু কেমন অস্বাভাবিক লাগছে না তোমার! কেমন উইয়ার্ড, ক্রেজি!’

‘লাগছে তো! আর ও তো বললই বিগড়ানো মাথা ঠিক হয় নাই!’

‘অ্যাঁ! পুলিশে ফোন দিবা নাকি ?’

‘না। তাতে লাভ হবে না। আসলে ওকে এখন ক্ষেপানো ঠিক হবে না! ওর মতে মতে থেকে বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছাতে হবে! ভয় পেয়ো না! এই তো বাড়ির কাছাকাছি এসে পড়ছি!’

কবিতা শেষ করে ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকালো হাবিবুল।

‘কবিতা কেমন লাগল স্যার ? ম্যাডাম কি ভয় পাইছেন নাকি ?’

ফৌজিয়া শুকনা গলায় বলল, ‘না, না, ভয় পাব কেন ?’

জামান বলল, ‘ম্যাডাম অত সহজে ভয় পায় না। উনি সাংবাদিক মানুষ। উনাকে সবাই ভয় পায়, বুঝলেন! তবে আপনার কবিতা অত্যন্ত চমৎকার হয়েছে।’

‘এমন কবিতা স্যার হাজারখানেক আছে। সবই আমার মুখস্থ। শুনবেন ?’

জামান হাত নেড়ে বলল, ‘পরে শুনব ভাই! এখন আপনে আমাকে বলেন, আপনি এত বড় একজন কবি, উবার ড্রাইভার হইলেন কীভাবে ?’ 

‘সে লম্বা ঘটনা স্যার! বলতে গেলে শেষ হবে না। তবে জানতে চাইছেন যখন তখন সংক্ষেপে বলি।’

গাড়ি ততক্ষণে তিন পথের মাথায় পৌঁছে গিয়েছিল। এদিকে ঘন জনবসতি। রাস্তায় টিমটিমে আলো দেখা যাচ্ছে। কয়েকটা কুকুর একসঙ্গে ঘেউ ঘেউ করে দৌড়ে গেল। ওদের কাননপুর আর বেশি দূরে নয়। ফলে ফৌজিয়া হারিয়ে যাওয়া মনের জোরটা আবার ফিরে পেল।

জামান বলল, ‘গল্প শুরুর আগে ভাই, আপনি ডান দিকের রাস্তায় ওঠেন।’ 

হাবিবুল বাধ্য ছেলের মতো ডান দিকের রাস্তায় গাড়ি ঘুরালো। তারপর একটু থেমে আবার বলতে শুরু করল।

‘আমি এইসব কবিতা লিখিটিখি, ঘুরাঘুরি করি কিন্তু স্যার একদিন আমার আব্বা আর বড় ভাই করল কী স্যার, হঠাৎ করে আমাকে বাইন্ধা টাইন্ধা নিয়া গেল হাসপাতালে, বলে আমি নাকি ড্রাগ নিই। কিন্তু আমি স্যার বিশ্বাস করেন ড্রাগের নেশা না, প্রেমের নেশায় পড়ে আউলা ঝাউলা হয়ে গেছিলাম। কী এক অদ্ভুত হাসপাতাল, ডাক্তারগুলি শুধু পিটায়। আমাকে কী একটা ইনজেকশন দেয়। আমি ঘুমাই থাকি। আবার জাগনা পাই, আবার ঘুমাই। কেমন একটা ঘোরের মধ্যে থাকি সবসময়। চোখে ঘুম কাটে না। একদিন ঘুমের মধ্যেই দিলাম উড়াল।’ 

‘কীভাবে ?’

প্রায় একসঙ্গে জিজ্ঞেস করল ওরা দুজন। 

‘চোখ বন্ধ করে তিনতলা থেকে দিলাম লাফ। শরীরটা হাল্কা হয়ে গেল। তারপর হঠাৎ করে চোখ খুলে দেখি আমার পাশে একটা বিরাট বড় পাখি পাখা মেইল্যা উড়তেছে! পাখির নাম হুদহুদ পাখি। সেই পাখির হাত ধইরা আমি উড়তে উড়তে নামলাম এক জঙ্গলে।’

একটু দূরে কাননপুর বাজার দেখা যাচ্ছে। এত রাতে স্বাভাবিকভাবেই মানুষজন দোকানপাট বন্ধ করে চলে গেছে। কিন্তু বাজারের এ কোণে একটা লম্বা বাঁশের খুঁটিতে শক্তিশালী বাল্ব আলো ছড়াচ্ছে। আলো দেখলেই মনে সাহস আসে। বাজার পার হয়ে বামে গেলেই রাস্তার পাশে ওদের বাড়ি। বাড়ির কাছাকাছি এসে গেছে বলেই কি না ভয় কেটে কৌতুক জেগে উঠল ফৌজিয়ার মনে। একের পর এক, কী উদ্ভট সব গল্প শুনিয়ে যাচ্ছে লোকটা। দেখি তার এই কল্পনার দৌড় কতটুকু!

‘তারপর কী হলো ?’    

‘তারপর ম্যাডাম সেই জঙ্গলে দেখা হলো খুবই খুবসুরত এক নারীর সঙ্গে। উনার দিকে এক নজর তাকায়াই আমার চোখ ঝলসায়া গেল। ম্যাডাম কিছু মনে করবেন না, সত্যের খাতিরে বলা লাগতেছে, সেই নারীর গায়ে একটা সুতাও ছিল না। একেবারে খালি গায়ে ঝরনার জলে গোসল করতেছেন তিনি। আমিতো খুবই শরমিন্দা হইলাম। এমনভাবে কোনও নগ্ন নারী আমি আগে দেখি নাই।’

গাড়ি এখন প্রাচীন বটগাছ পেরিয়ে বাঁশঝাড় পেছনে রেখে একেবারে জামান-ফৌজিয়ার বাড়ির সামনে চলে এসেছে। জামান ঘড়ি দেখল রাত দুটো বেজে পাঁচ মিনিট। যাক শেষ পর্যন্ত কোনও অঘটন ছাড়াই বাড়ি পৌঁছানো গেল। একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।

‘বামের গেটের সামনে রাখেন। আমরা চলে আসছি।’

‘কাহিনিটা এখনও শেষ হয় নাই স্যার!’

গাড়ির স্টার্ট বন্ধ করে বলল হাবিবুল।

‘কিন্তু আমরা তো এসে গেছি। এখন আর গল্প শোনার টাইম নাই ভাই। আল্লাহ চাহে তো পরে আরেক দিন আপনার গল্প শুনব। এখন ভাড়া কত হইছে বলেন!’

খুট করে একটা শব্দ হলো। ওরা বুঝতে পারল হাবিবুল গাড়ির দরজা লক করে দিয়েছে। সে লক না খুললে ওরা গাড়ি থেকে বের হতে পারবে না। জামান একটু অস্থির হয়ে পড়েছিল।

‘এইসব কী ফাইজলামি ?’

ফৌজিয়া হাত ধরে তাকে শান্ত করে বলল, ‘ঠিক আছে, হাবিবুল বলেন, বাকিটুকু শুনেই যাই।’

‘হুদহুদ পাখি ওই অনিন্দ্যসুন্দর নারীকে দেখিয়ে বলল, ‘এখন থেকে উনিই তোমার মালকিন! তিনি যা বলেন তাই করতে হবে তোমাকে। নারী স্নান সেরে উঠে আসলে আমি মাথা নুইয়ে তাকে কুর্ণিশ করলাম। এখন তিনি নানা রঙের ফুলের পোশাক পরে আছেন। রূপ যেন হিরার মতো ঠিকরায়া পড়তেছে। তার পিঠের পেছনে দেখলাম প্রজাপতির মতো সাদা ফুরফুরে দুইটা ডানা। হুদহুদ পাখি আমাকে দেখায়ে বলল, ‘একে আপনার নওকর হিসেবে নিয়োগ করা হয়েছে, মাতাজি।’

মাতাজি ভ্রু কুঁচকে কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থাকলেন। পা থেকে মাথা পর্যন্ত মানে আপাদমস্তক দেখলেন। তার পটলচেরা সুন্দর চোখের দৃষ্টি ছিল একেবারে এক্সরে মেশিনের মতো। সেই দৃষ্টির সামনে আমি কুঁকড়ে গেলাম। মাতাজি তার সুমধুর কণ্ঠে বললেন, ‘তোমরা ভুল মানুষকে আনছো। জগতের সঙ্গে ওর দেনা- পাওনা মিটে নাই। ওকে ফিরায়া দাও।’

হুদহুদ পাখি ফিরল আমার দিকে। একটা শিস দিয়া বলল, ‘যা ব্যাটা ফিরে যা!’

‘আমি বললাম, কীভাবে যাব ? উড়তে তো পারব না, উড়া ভুলে গেছি।’

পাখি বলল ‘চোখ বন্ধ করে দুই হাত দুই পাশে মেলে ধর। ফিরে যেতে পারবি।’

আমি স্যার সেইভাবে করে ফিরে আসলাম। দেখলাম হাসপাতালের বিছানায় চিত হয়ে শুয়ে আছি। হাতে পায়ে সারা গায়ে প্রচণ্ড ব্যাথা ও ভারী ব্যান্ডেজ। হাসপাতালে মাস খানেক চিকিৎসা করে একটু সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলাম। আমার বড় ভাই বলল, ‘কয় দিন আর তোকে বসায়া খাওয়াব ? গাড়ির ব্যবস্থা কইরা দিতাছি। উবারে ট্রিপ মার।’

তারপর তো স্যার আপনেরাই আমার পয়লা প্রথম প্যাসেঞ্জার।

‘তা বেশ! আপনার গল্প ফুরালো, নটে গাছটি মুড়ালো। এবার তাহলে বিদায় হাবিবুল! লকটা খোলেন, আমরা নামি!’

জামান অধৈর্য্য কণ্ঠে তড়িঘড়ি বলে। ফৌজিয়াও হাতের ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে নামার উপক্রম করে। 

‘সরি স্যার! এখন যে নামতে পারবেন না! হুদহুদ পাখি আপনাদের সালাম দিছে!’

‘মানে ? ফাইজলামি নাকি ? হুদহুদ পাখি কই ?’

‘আশেপাশেই আছে স্যার! খুব বুদ্ধিমান পাখি তো বাতাসে মিশে থাকেন! তিনি এখন আপনাদের সাক্ষাৎ চান!’

হাবিবুল গাড়ির ভেতর ও বাইরের সব বাতি নিভিয়ে দিয়ে মাথা দুলিয়ে ফিক ফিক করে হাসে! বিড়বিড় করে বলে, ‘এই সামান্য অপেক্ষা…’

কিছুক্ষণের মধ্যেই কোথা থেকে কে জানে, তীব্র হেডলাইট জ্বালিয়ে একটা মালবাহী ট্রাক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বড় রাস্তা ছেড়ে হুড়মুড় করে ছোট রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা সিলভার কালার টয়োটা এক্স করোলাকে প্রায় গুঁড়িয়ে দিয়ে একটা গাছের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে থেমে যায়।

সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button