
‘না ম ?’
‘হিলিবিলি।’
‘উল্টাপাল্টা বলছেন কেন ?’
‘কিছুই উল্টাপাল্টা না।’
‘আপনার নাম তো হিলিবিলি না।’
‘জানি। আমি একটা সংখ্যা।’
‘০১৭১৬৪৮৭৮৩১.’
‘এটা আপনাদের দেয়া নাম।’
‘হ্যা, পরিশোধন কেন্দ্র আপনার এই নাম নির্ধারণ করেছে। শুধু আপনার না, সবারই একেকটা অনন্য নাম আছে। বাবা-মা নাম রাখলে অসংখ্য একই নামের মানুষ ঘুরে বেড়ায়। কাজেই নামকরণ পদ্ধতিকে বিকেন্দ্রীকরণ থেকে সরিয়ে কেন্দ্রীভূত করা হয়েছে। পরিচয়পত্রের নাম্বারই এখন নাম।’
‘আমার বাবার নামটা কী ? ০১৭১৬৪৮৭৮৩০ ?’
‘আপনি আমাদেরকে বিভ্রান্ত করার হাস্যকার চেষ্টা চালাচ্ছেন।’
‘সেটা আপনারা চালাচ্ছেন আমার উপর, তবে হাস্যকর না, করুণভাবে।’
‘জনাব .৫৪৫, আপনি বিনা কারণে একটা সরল প্রক্রিয়াকে দীর্ঘায়িত করছেন।’
‘পরিশোধক কি বদলে গেছে ? অন্য নামে ডাকলেন কি না, তাই বলছি।’
‘আপনার নামটাকে দুইবার বর্গমূল করলে এই সংখ্যা আসে। নইলে নামটা অনেক বড় হয়ে যায়।’
‘ভালো।’
‘এই নাম আপনাকে মনে রাখতে হবে।’
‘দশমিক পাঁচ চার পাঁচ ? সুন্দর নাম। আমার পছন্দ হয়েছে। দশমিকের আগে কিছু ছিল না ?’
‘ছিল। নইলে দশমিক আসবে কেন ?’
‘আগের অংশটা দেওয়া গেল না ?’
‘নিয়ম।’
‘নিয়মটা অন্যরকমও তো হতে পারত।’
‘বর্তমান যুগে নিয়ম প্রশ্নাতীত।’
‘প্রশ্ন করা নিষেধ ?’
‘মোটেই না। নিষেধ হলে আমরা আপনার প্রশ্নের উত্তর দিতাম না। দালানবাসীর কোনও প্রশ্নই অনুত্তরিত থাকবে না। আপনার প্রশ্নের উত্তর হলো―বর্তমান অভিভাবকগণ অভূতপূর্ব জ্ঞানী। তারা প্রজ্ঞার এমন পর্যায়ে অবস্থান করেন যা সাধারণের বোধশক্তির বাইরে। জনতা তাদের কাছে শিশুর মতো। শিশু কি নিজের ভালো বোঝে ? শৈশবে বোঝা যায় না যে অভিভাবকরা কেন শাসন করছেন। দশমিকের আগের অংশটা শাসকদের জন্য নির্ধারিত।’
’অতি উন্নত মানের কথা।’
‘আপনি কবে থেকে এখানে আছেন, মনে আছে ?’
‘আপনারা বারবার আসেন আর একই প্রশ্ন করেন। কারণ কী ?’
‘আপনার স্মৃতি পরীক্ষা করি। বুঝতে চাই আপনার স্মৃতিশক্তিতে কোনও ঘাটতি আছে কি না।’
‘আছে ?’
‘এই প্রশ্নের উত্তর পরে দিচ্ছি। বলুন তো, আপনি এখানে কীভাবে এলেন ?’
‘এই প্রশ্ন তো আমার করার কথা। আমি এখানে যেভাবে এসেছি বলে জানি, আসলেই কি সেভাবে এসেছি ?’
‘এখানে আসার ঘটনাটা যেভাবে মনে আছে সেভাবে বলুন।’
‘একই কথা কিছুদিন পরপর বলতে ভালো লাগে না।’
‘বলুন। জটিল রোগের ডায়াগনসিস বারবার করতে হয়।’
‘ঠিক আছে। আমার বয়স তখন চার। একটা অদ্ভুত বাড়িতে থাকতাম। একপাশে তৃণভূমি, অন্যদিকে একটা হ্রদ। প্রায় নিঃশব্দ জায়গাটা। সরু পথ এদিক-ওদিক চলে গেছে। ত্রিসীমানায় ঘরবাড়ি তেমন নাই। তখনও বর্ণপরিচয় হয়নি আমার। রাতে প্রধান বিনোদন ছিল নানির কাছে গল্প শোনা। তারপর বাবা-মায়ের কাছে শুতে যাওয়া। বিদ্যুৎ বলতে কিছু ছিল না। এক রাতে নানি গল্প বলছিল―অনেক আগে এই দেশ এক সম্রাট শাসন করতেন। তিনি সুশাসক ছিলেন। দেশের সকল প্রজা নির্ভয়ে এবং সন্তুষ্টচিত্তে বাস করত। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা আর চিকিৎসা নিয়ে তাদের অন্তত চিন্তা করতে হতো না। তারা গানবাজনা করত, নাটক নামাত, মুখে মুখে গল্পগাথা বানাত, আর ঈশ্বরের উপাসনা করত। এই পর্যায়ে আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম―এখন আমাদের সম্রাট কে ? তিনি কেমন ? নানি বলেছিল―তিনি অসাধারণ। প্রজাদের খোঁজখবর প্রতিনিয়ত রাখেন। তাদের কোনও অঙ্গসঞ্চালন তাঁর চোখ এড়ায় না। প্রজারা কী করছে, কী বলছে, তারা কী খাবে, কতখানি খাবে, সবই তিনি ও তার উপদেষ্টাবৃন্দ নির্ধারণ করেন। মানুষের প্রতিটি উচ্চারিত এবং লিখিত শব্দে তাঁদের গভীর আগ্রহ। হোক তা প্রশংসা, আক্ষেপ, হাহাকার বা উপহাস। এরপর নানি তার গল্পে ফিরল―গভীর রাতে প্রজারা হঠাৎ হঠাৎ দরজায় কড়ানাড়া শুনত। তারা নির্ভয়ে দরজা খুলত এবং দেখত দাঁড়িয়ে আছে সম্রাটের কোনও সেপাই, নাজির, উজির, মন্ত্রী, সিপাহসালার, কিংবা ভাগ্য অতি সুপ্রসন্ন হলে, সম্রাট নিজেই। তাঁরা বলতেন, ‘আমরা ক্ষুধার্ত, মা, আমাদেরকে কিছু খাবার দেবেন ?’ অথবা, ‘বাইরে থেকে কান্নার আওয়াজ শুনলাম, কোনও সমস্যা হয়েছে ? আপনারা ভালো আছেন তো ? আজ খাওয়া হয়েছে ?’
‘তখনই সত্যিই আমাদের বাড়ির দরজায় কড়ানাড়া শোনা গেল। আমি নানিকে জিজ্ঞেস করলাম―বোধহয় সম্রাট আমাদের খোঁজ নিতে এসেছেন। নানি আমার মুখ চেপে ধরল আর সঙ্গে সঙ্গে পাশের ঘরে শুনলাম হুটোপুটি। জানালা খোলার শব্দ হলো, সেই শব্দকে ধামাচাপা দিল দরজা ভাঙ্গার শব্দ। মা আর বাবা জানালা দিয়ে পালাতে পারল না। আপনারা তাদের ধরে ফেললেন। আর আমাকে নিয়ে এলেন এখানে।’
‘আপনার স্মৃতিতে কিছু ঘাটতি আছে, বুঝতে পারছেন ?’
‘যন্ত্রের মতো প্রতিবার একই কথা বলবেন না দয়া করে।’
‘ঘাটতিটা কোথায় আপনি ধরতে পারছেন না বলেই বারবার বলা। গতবার কী বলেছিলাম মনে করুন।’
‘মনে নাই। মনে রাখতেও চাই না। এই জিনিস প্রতিবার একইভাবে মাথায় ঢোকাতে ঢোকাতে আমার চিন্তাশক্তি মরে গেছে। তবে এটুকু মনে আছে নতুন কিছু বলেননি। আর আমাকে দিয়ে বারবার একই ইতিহাস বলাবেন না। নিজের শৈশবের প্রতি ঘৃণা ধরাতে চাই না আমি।’
‘আমরা চাই। এবং সেটা আপনার ভালোর জন্যই। ভুল ইতিহাসের প্রতি ঘৃণা জন্মাক মানুষের, এটাই বর্তমান অভিভাবকবৃন্দের ইচ্ছা।’
‘হতে পারে ভুল। তবু নিজের শৈশবকে ঘৃণা করতে চায় কে বলুন ?’
‘আপনি ভেবে দেখুন জনাব .৫৪৫। এমন প্রমিত ভাষায় আপনি শৈশবের কথা বর্ণনা করলেন। বাক্যগঠন, শব্দচয়ন, ব্যাকরণ, সব নিখুঁত। অথচ তখনও আপনার বর্ণপরিচয় হয়নি। চার বছর বয়সের স্মৃতি কি এতটা খুঁটিনাটি মনে থাকে ? দ্বিতীয়ত, আপনি শৈশবের বাসস্থানকে নিঃশব্দ বলছেন। পৃথিবী কি নিঃশব্দ হয় ? গাছের পাতার শব্দ, পাখির ডাক, জলের শব্দ, এসব তো থাকে। নিঃশব্দ হয় কবর, আর এই ঘরটা, যদি না কেউ কথা বলে। আরেকটা ব্যাপার লক্ষ করেছেন ? প্রত্যেকবার ঘটনাটা আপনি অবিকল একইভাবে বর্ণনা করেন। একই শব্দ ব্যবহার করেন, প্রতিবার একই স্থানে একই মাত্রার বিরতি দেন যেন কোনও লিখিত বক্তৃতা পাঠ করছেন, আগেরবার যে বাক্যের পর যে বাক্য বলেছিলেন, আজও তাই বলছেন। মাথা খাটান, দেখুন কত অসঙ্গতিময় আপনার স্মৃতি। যে আখ্যানকে আপনি স্মৃতি মনে করছেন, আসলে তা আপনার মস্তিষ্কপ্রসূত।’
‘অবিকল একইভাবে বলি, কারণ বারবার বারবার বারবার বলতে বলতে মুখস্থ হয়ে গেছে। প্রত্যেকবার আমি অভিনব হতে তো পারব না।’
‘মুখস্থবিদ্যা কি প্রকৃত স্মৃতি ? এটা নিন, দেখুন তো এই কাগজে কী লেখা আছে পড়তে পারেন কি না ?’
‘পারছি তো। লেখা আছে―মৃতের মুখভঙ্গিতে কোনও যন্ত্রণার অভিব্যক্তি থাকবে না।’
‘আপনার তাহলে বর্ণপরিচয় হয়েছে। এ কারণেই এমন সুন্দর শব্দ ব্যবহার আর বাক্যগঠনে আপনি ছোটবেলার ঘটনাটা বর্ণনা করলেন। কে করাল বর্ণপরিচয় ? বর্তমান অভিভাবকবৃন্দ। অথবা যদি আপনার স্মৃতি ভুল হয়ে থাকে, তো পরিবারেই আপনার বর্ণপরিচয় হয়েছিল।’
‘না হয়নি। আমার স্মৃতি ভুল না। বরং আপনারা আমার বর্ণপরিচয় করিয়েছেন, সেটা আমার মনেও নেই।’
‘মনে নেই, কারণ আপনি এটা অর্জন করেননি। আপনাকে দেওয়া হয়েছে। অনায়াসে যা পাওয়া যায়, মানুষ শুধু তার ফল ভোগ করে, জন্মের ইতিহাস স্মৃতিতে থাকে না। যেমন, আপনিই বলুন, আপনার বাবা-মাকে কেন আমরা ধরে আনব ?’
‘সম্ভবত রাষ্ট্রদ্রোহিতার দায়ে। কারণ আপনি তাদেরকে শান্ত স্বরে বলেছিলেন―ওই হ্রদের জলে ঝাঁপিয়ে পড়লেও রেহাই নেই, ঈশ্বর ওখানেও আছেন, আর আছে মৃত্যুর যন্ত্রণা।’
‘আমাকে তাহলে মনে আছে ?’
‘হ্যাঁ আছে। সেই চেহারা, সেই চুল, সেই চশমার মতো চোখ। সেই আদিরূপ। আপনার দুই পাশে যে দু জন দাঁড়িয়ে পাহারা দিচ্ছে, তারাও।’
‘এই তো জনাব .৫৪৫, আপনার স্মৃতি প্রতারণা করছে। আপনার চার বছর বয়সে যদি আমরা এমন হয়ে থাকি তো এতদিনে আমাদের মৃত্যু হবার কথা।’
‘আর যা-ই হবার কথা হোক, মৃত্যু আপনাদের হবার কথা না।’
‘হা হা। সে আবার কী কথা ? আদিম যুগের একজন কবি বলেছিলেন―জন্মিলে মরিতে হবে।’
‘ঠিকই বলেছেন কবি। তিনি স্পন্দিত প্রাণির কথা বলেছেন। তত্ত্বের কথা না।’
‘তত্ত্ব ?’
‘আপনারা একটা তত্ত্ব মাত্র। তত্ত্বের মৃত্যু নেই।’
‘এই কথাটা ভুল বললেন। তত্ত্ব আমরা না, আপনি। আমরা তত্ত্বপ্রণেতা। আপনাকে প্রণীত করেছি।’
‘হতে পারে। এই একটা ভুলে আমার আক্ষেপ নেই। তত্ত্ব সত্য, তত্ত্বের স্রষ্টা হওয়া সত্যেরও সত্য।’
‘জনাব, আপনার জন্ম এখানেই। এটাই পৃথিবী। এর বাইরে কিছু নাই। স্মৃতি আর কল্পনার তফাৎটা বোঝার চেষ্টা করুন। জীবনে ডেজাভু হয়, কিন্তু জীবন ডেজাভু নয়। মানুষ হিসেবে অসাধারণ কল্পনাশক্তি নিয়ে আপনি জন্মেছেন। আপনার মস্তিষ্ক কিছু কল্পনাকে স্মৃতি বলে চালিয়ে দিচ্ছে।’
‘বাবা-মা কোথায় গেল ? মানুষ যেহেতু, বাবা-মা আছে নিশ্চয়ই।’
‘উনারা মারা গেছেন। যথাযথ সম্মানের সঙ্গে তাঁদের শেষকৃত্য হয়েছে। দায়িত্ব শেষ হয়েছিল তাঁদের। সামাজিক উৎকর্ষর চরমে থাকা এই সভ্যতায় দায়িত্ব শেষ হলে অস্তিত্ব শেষ হয়।’
‘আমার দায়িত্ব কী ?’
‘মানুষ হওয়া। ভুল স্মৃতি থেকে মুক্ত হলেই আপনি মানুষ হয়ে উঠবেন।’
‘আমার স্মৃতি ভুল না। জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় ছিল সেটা। ওই দোচালা ঘর, হ্রদ, বৃষ্টি, ফিনফিনে বাতাস আর তৃণভূমি ভুল হতে পারে না।’
‘অবশ্যই পারে না। কল্পনার শক্তি বাস্তবের মতো দুর্বল নয় মোটেই। তবে আমাদের কাজ শক্তিশালীকে টিকিয়ে রাখা নয়, ডারউইনের তত্ত্ব আপাতত মেয়াদোত্তীর্ণ। আমাদের কাজ বাস্তবকে সমুন্নত রাখা। অতিকল্পনা বাস্তব থেকে দূরে সরিয়ে রাখে। সত্যিকার অর্থে তাকে কৃতজ্ঞ হতে বাধা দেয়। ঘরবাড়ি, হ্রদ, বৃষ্টি আর তৃণভূমি সবই আছে জনাব। শুধু কোনটা কোথায় থাকবে আর কতটুকু থাকবে, সেটা আমাদের নিয়ন্ত্রণে আছে। যেখানে বন্যা দরকার, সেখানে বন্যা তো দিতে হবে। যেখানে ঘূর্ণিঝড় ছাড়া মানুষ বেয়াদবি করছে, সেখানে ঘূর্ণিঝড়। যতটুকু বৃষ্টি হলে আর যতটুকু ফসল হলে মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণ হবে ততটুকু বৃষ্টিতে কোনও খামতি নেই। বাইরে গেলেই দেখবেন সবই আগের মতো আছে।’
‘এই জায়গার বাইরেও তাহলে জগৎ আছে, যেখানে বন্যা-জলোচ্ছ্বাস-ঘূর্ণিঝড় হয় ? এবং মানুষ আছে ? এখানকার বাইরে কিছু নেই কথাটা তাহলে ঠিক বলেননি।’
‘ওরা মোহে আছে। তফাৎ হলো, আগেকার যুগের অভিভাবকগণ মানুষের মোহ চোখে দেখতে পেতেন না। আমরা পাই, এবং যথাযথ ব্যবস্থার মাধ্যমে তাদের বাস্তবে ফিরিয়ে আনি।’
‘হ্যাঁ নিশ্চয়ই। সবই আছে, তবে নিয়ন্ত্রণে। নিয়ন্ত্রককে চোখে দেখা যায় না যেহেতু, মহাপ্রকৃতিকেই নিয়ন্ত্রক মনে করে লোকে।’
‘আপনি ভুল স্মৃতি থেকে বেরোন। দেখবেন সব ঠিক আছে। সবাই সুখী।’
‘সবাই সুখী ? এটা কি স্বর্গ ? পৃথিবীতে সবাই একযোগে সুখী হবে না, এটাই প্রাকৃতিক।’
‘আপনি যে প্রাকৃতিক যুগের কথা বলছেন, তা মহাপ্লাবনে ধূলিসাৎ হয়েছে। এখন যা আছে সেটাই স্বর্গ। প্লাবন বয়ে এনেছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। প্রযুক্তি ছাড়া মানুষের টিকে থাকার পথ নেই এখন। প্রযুক্তি ও পরিবেশ হাত ধরাধরি করে চলছে না। এরা আলাদাও নয় আর। এখন প্রযুক্তিই পরিবেশ। এর নাম অভিভাবকগণ দিয়েছেন―পরিযুক্তিবেশ। পৃথিবীতে সালোক সংশ্লেষণ টিকিয়ে রাখতে হবে, আলো রাখতে হবে নিয়ন্ত্রিত, বৃষ্টি ঝরাতে হবে মাপমতো, ফসল ফলাতে হবে দ্রুত এবং কাক্সিক্ষত হারে। আর মুছে দিতে হবে ভুল স্মৃতি।’
‘আমার স্মৃতি ভুল না।’
‘ভুলকে আপনি ভুল সংজ্ঞায়িত করছেন জনাব .৫৪৫। মহাপ্লাবনের আগের স্মৃতি যারা বয়ে বেড়াচ্ছে, সেসব স্মৃতি মেয়াদোত্তীর্ণ। যে স্মৃতি আজ আর কোনও কাজের না, ওসবই ভুল স্মৃতি। ভেবে দেখুন, আপনার ওই হ্রদ এখন কী কাজের ? মহাপ্লাবনের জলে এখনও ডুবে আছে। কোনও কালে আর ভাসবে কি না কেউ জানে না।’
‘আপনি বলছেন বাইরে এখন শুধু জল আর জল ?’
‘সর্বত্র না, কোথাও কোথাও এখনও জল আছে। সেগুলোকে বরফে ফিরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে। বরফ গলেই উৎপত্তি যেহেতু। পরিত্যক্ত ঘোষিত এলাকাগুলোর জলই কেবল বরফে ফিরিয়ে নেওয়া হবে।’
‘আমার শৈশব স্মৃতির জায়গাটাও ?’
‘ওটা ভুলে যান, .৫৪৫। স্মৃতি জরুরি না, জরুরি হলো জীবনের প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া। মানুষ কেবলই স্মৃতি বাড়ায়। বাড়ায় দুঃখ। জীবনের মূল প্রাকৃতিক যে স্রোত, সেখানে মানুষকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়াই সুখ নিশ্চিত করার একমাত্র উপায়। জন্মানো, শৈশব-কৈশোর খেলায় পার, যৌবনে বংশবিস্তার আর খাদ্যানুসন্ধান, বার্ধক্যে সেবাপ্রাপ্তি এবং আক্ষেপহীন মরে যাওয়া। সব প্রাণি তাইই করে। মানুষ একসময় মারা যেত আক্ষেপ নিয়ে। কেন ? কারণ স্মৃতি। স্মৃতি অগণিত আক্ষেপের জন্ম দেয় আর নিশ্চয়তা দেয় পুনর্জন্মের। সুতরাং, মানুষকে স্মৃতিবিবর্জিত করাই বর্তমান অভিভাভকগণের অন্যতম মূলনীতি।’
‘মানুষকে আপনারা পশুপর্যায়ে নামিয়ে এনেছেন ?’
‘মানুষ পশু তো বটেই। তবে মানুষ সৃষ্টির সেরা, এটাও আমরা মানি। তাই তার বর্ণপরিচয় করাই এবং যন্ত্রণাহীন মৃত্যু নিশ্চিত করি। আপনি যে দালানে বসে আছেন, দালানটা বহুতল। নিচতলায় শিশুর জন্ম হয়, দোতলায় খেলাধুলা আর খাবার জায়গা। তিনতলায় ঘুমানোর ব্যবস্থা। চতুর্থ তলা যুবকদের, সেখানে বিভিন্ন শারীরিক পরিশ্রমের মাধ্যমে তারা ক্রেডিট অর্জন করে, সেই ক্রেডিট খরচ করে খায় এবং যৌনতায় অংশ নেয়।’
‘ক্রেডিট দিয়ে যৌনতায় অংশ নেয় ?’
‘আপনার স্মৃতি কি বলে ? আপনার বাবা মা কোথায় যৌনকর্ম করত ? ঘরে তো ? ঘরটা কি বিনামূল্যের ? পেটে খাবার না থাকলে কি যৌনতাটা আনন্দদায়ক হবে ? খাবার কি ক্রেডিট ছাড়া আসে ? শুধু আপনাকে এখনও সাবসিডি দেওয়া হচ্ছে। এর একমাত্র কারণ, আমরা আপনাকে নিয়ে আশাবাদী।’
‘কী ধরনের পরিশ্রম তারা করে ?’
‘এই দালানের তলা বৃদ্ধি করে। নতুন নতুন তলা যোগ হচ্ছে প্রায়ই। কারণ কর্মকাণ্ড বিস্তৃত হচ্ছে। মানুষের আয়ু মারাত্মক বেড়ে গেছে। জায়গা লাগছে বেশি। আর এই দালান যত বৃদ্ধি পাবে, আমাদের সাফল্য-গৌরব তত বাড়বে। স্থাপনার ভিত মজবুত করার দায়িত্ব অবশ্য আমাদের, প্রতিনিয়তই আমরা তা করছি।’
‘যৌনতার সাবসিডিও আমাকেও দিয়েছেন আপনারা! মেয়েটা কে ? যে মাঝেমধ্যে আমার কাছে আসে ? মানুষ না প্রযুক্তি ?’
‘এমন প্রশ্ন কেন আসছে ?’
‘কারণ মেয়েটা অতিমাত্রায় নিখুঁত। এবং নিখুঁত সম্পর্কে আমার ধারণার সঙ্গে তাল রেখে তার শরীরের আকৃতি বদল হয়। কখনও আমার বড় স্তন পছন্দ হয়। যখন সে আসে, বড় স্তন নিয়েই আসে। কখনও আমার শ্যামলা রঙের চাহিদা হয়, তখন সে শ্যামলা হয়ে যায়। আসলে সে কী ?’
‘তা জানা কি জরুরি ? আপনি চাচ্ছেন মাংসের স্বাদ, আমরা সেটা দিচ্ছি, যেভাবেই হোক।’
‘ঝড়-বৃষ্টি আর মন্দার মতো যৌনতাও আশা করি নিয়ন্ত্রিত।’
‘হ্যাঁ। তবে আপনি সেটা টের পাবেন না। মেয়েটার শরীরে প্রবেশ করার সাধারণত দশ থেকে বারো মিনিট এবং দশমিক তিন এক চার আটো সেকেন্ডের মধ্যে আপনার চরম পুলক হয় এবং মেয়েটিরও, অন্তত সে তাই দেখায়। এই সময় আমরা নির্ধারণ করি। যৌনতায় বেশি সময় দেওয়ার মানে হয় না। যেটুকু সময় হলে মেয়েটির শরীর আপনি হাতড়ে দেখার সময় পান তাই যথেষ্ট। আপনি মেয়ে হলে আপনার কাছে একজন পুরুষ পাঠানো হতো, সেক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য, এমনকী সমকামীদের ক্ষেত্রেও। কিছুতেই আপনি নির্ধারিত সময়সীমা অতিক্রম করতে পারবেন না। পারলে হয়তো নানা ভাবে সময়সীমা বাড়িয়ে নিতে পারতেন। আপনার এই ছোটখাটো শরীরের ডায়াগ্রাম বলছে আপনি আধাঘণ্টারও বেশি নারীদেহে টিকে থাকতে সক্ষম। স্রেফ একটা শরীরের মধ্যে ওঠানামা করার জন্য বেশি শক্তি খরচ করাটা বর্তমান অভিভাবকবৃন্দ পছন্দ করেন না। বরং দালানটা উঁচু করা বেশি জরুরি।’
’দালান, না ? হুঁ।’
‘সবচেয়ে উপরতলাটা বৃদ্ধাশ্রম আর ছাদটা কবরস্তান। বিশেষ কল্পনা জন্মানোর সুযোগ নেই। কল্পনা নেই তো স্মৃতিও নেই। মানুষের মস্তিষ্ক বড়োই ছটফটে। সুযোগ পেলেই এটাসেটা জমা করতে চায়। সামাজিক সব বৈষম্যের অবসানে অভিভাভকবৃন্দ সফল। উঁচু-নিচু ভেদাভেদহীন সমাজ আজ পাঠ্যবই থেকে উঠে এসেছে বাস্তবে।’
‘বাহ, শুনলেও কানে আরাম হয়। মনে হয় কেউ কটন বাড দিয়ে কান চুলকে দিচ্ছে।’
‘বহুমুখী, সংগ্রামী এবং সংঘাতময় জীবন জন্ম দেয় অসংখ্য পরস্পরবিরোধী স্মৃতি। আপনি জানেন হয়তো, আমাদের গ্রন্থাগারের বেশিরভাগ বইয়ে এই কথা আছে, মৃত্যুর আগ মুহূর্তে মানুষ তার অতীত দেখতে শুরু করে। বহুঘাতী জীবন তাদেরকে দেয় আক্ষেপভরা স্মৃতি, অপূর্ণ স্বপ্ন, আর অনার্জিত প্রেমের হাহাকার। একমুখী জীবনই জীবনাদর্শ হওয়া উচিত। বিশ্বাস না হলে পরিদর্শন করে দেখতে পারেন, প্রত্যেক বৃদ্ধ-বৃদ্ধা মৃত্যুর আগে সন্তুষ্টির হাসি হাসে। মৃত্যুর পরও কারও ঠোঁট থেকে সেই হাসি যায় না। মৃত মানুষের হাসি দেখেছেন আপনি ? ঠিক শিশুর মতো। আর সেই মৃত যদি হয় ফোকলা বৃদ্ধ তো কথাই নেই।’
‘আপনারা অনন্তকাল চেষ্টা করতে থাকুন। আমাকে বোঝাতে পারবেন না যে স্মৃতি মানে নিছক কল্পনা। স্মৃতি আছে বলেই কল্পনা আছে।’
‘চেষ্টা তো করতে পারি। দুঃখভারাক্রান্ত একজন মানুষকে এভাবে ভাগ্যের হাতে ছেড়ে তো দিতে পারি না।’
‘করুন, চেষ্টা করুন। সময় কাটবে। সময় কাটানোও তো দরকার।’
‘আপনাকে নিয়ে বড়ই বিপদে আছেন অভিভাবকবৃন্দ। একমাত্র আপনি ছাড়া সকলেই স্মৃতিমুক্ত হয়ে শান্তিময় মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আপনাকে বলেছি .৫৪৫, মৌলিক চাহিদা এখন আর কোনও সমস্যা নয়। দ্রব্যমূল্যের অভিশাপ থেকে এখন আমরা মুক্ত। ক্রীড়াকৌশলই যথেষ্ট খাদ্য আর যৌনতার জন্য। বাকি সবকিছুর ভার আমাদের। আপনি চোখ বুজে চেষ্টা করুন, দেখবেন আপনার অতিকল্পনাপ্রবণ মস্তিষ্ক অনেক কিছুই আপনাকে দেখাবে, যা আপনার কাছে সত্য মনে হবে। মনে হবে, ওই জানালাটা খুললেই সেইসব দৃশ্য আপনি দেখবেন। চেষ্টা করুন। চোখ বন্ধ করুন। কী দেখছেন ?’
‘সূর্য।’
‘আর ?’
‘পাখি।’
‘তারপর ?’
‘জলাশয়, নীল, নিটোল, প্রাণময়।’
‘বলে যান।’
‘অনাবিল অন্ধকার। সুশোভন। অন্ধকারের প্রাণিদের নিরাপদ বিচরণ।’
‘ব্যস ?’
‘শহর। সারি সারি বাড়িঘর। প্রতিটি বাড়ির সামনে উঠান। কাঁচামাটি, ঘাস, তার মাঝে পাকা রাস্তা। খাবার, সুস্বাদু আর সুপাচ্য।’
‘হুম।’
‘প্রেম, শুদ্ধ প্রেম। যে-কাউকে ভালোবাসি বলার স্বাধীনতা। ভালোবাসা ভিক্ষা চাওয়ার স্বাধীনতা। আশ্রয় চাওয়ার মতো ধৃষ্টতা। জলের আশায় চাতক। মেঘ। সাদা, একেবারে ফিনফিনে সাদা। ফসল, ক্ষেতভরা। বাতাস, একেবারে কোনও গন্ধ ছাড়া বাতাস, স্রেফ স্বাদহীন বাতাস, প্রাণদায়ী।’
‘শুনছি আমরা।’
‘মানুষ, খেটে খাওয়া মানুষ। আশাহত মানুষ। আক্ষেপে ভরা পৃথিবী―কাক্সিক্ষত পৃথিবী।’
‘চোখ খুলুন। আপনার কি মনে হয়, এই জানালা খুললে কী দেখা যাবে ? দেখতে চান ?’
‘না! যা দেখলাম তা যদি দেখা না যায়, জানালা বন্ধই থাকুক। চিরতরে সিলগালা করে দিন।’
‘বুঝতে পারছেন ? আপনি কতটা কল্পনার দাস ? কল্পনা আর স্মৃতি একাকার হয়ে গেছে আপনার।’
‘ধরে নিন কল্পনাই। তাতে আপনাদের এত চুলকাচ্ছে কেন ? একজন মানুষ যদি তার কল্পনার জগতে ডুবে থাকে, মহাবিশ্বের কী এমন ক্ষতি ?’
‘ক্ষতি আছে .৫৪৫, ক্ষতি আছে। আপনি বলুন, একটা পরিবারে যদি একজন সিজোফ্রেনিক থাকে, তাহলে পরিবারের লোকের কী ক্ষতি ? কল্পনাবিলাসী মানুষ চুপচাপ হয় বলে একসময় প্রচলিত ছিল। আসলে তা না। তাদের কল্পনা পুরোপুরি ঘোঁট পাকিয়ে উঠতে যতক্ষণ লাগে, ততক্ষণ তারা চুপ থাকে। এরপরই সৃষ্টিশীল হয়ে ওঠে। কল্পনাগুলোর যৌনকেশ গজালেই সেটা তারা সচেতনে বা অবচেতনে প্রকাশ করতে থাকে―লিখে, বলে, গান গেয়ে, বা ছবি এঁকে। সৃষ্টিশীলতার সঙ্গে যৌনচাহিদার বিশেষ তফাৎ নেই।’
‘তো ? আপনাদের মাথায় তো বাড়ি দিচ্ছি না। বিদ্রোহ করছি না। সেøাগান দিচ্ছি না। স্রেফ কয়েকটা লিখিত বাক্য, কয়েকটা উচ্চারিত শব্দ, দুই ছত্র সুর করা কথা, আর আঁকা ছবির মতো জড়বস্তুকে এত ভয় আপনাদের ?’
‘আমরা নির্ভীক, .৫৪৫। তবে আমরা উদগ্রীব। জনকল্যাণ নিয়ে উদগ্রীব। যেহেতু একমাত্র আপনিই বাকি আছেন স্মৃতির বিভ্রম থেকে মুক্ত হতে, তার মানে আপনিই একমাত্র অসুখী নাগরিক, এই প্রাকৃতিক জগতে। আপনি কি চান অন্যরা আপনার জন্য অসুখী হোক ?’
‘নকল সুখ ভেঙ্গে যাওয়াই দরকার। খাওয়া-পরার চিন্তা নাই, যৌনতা নির্ধারিত, কাজ বলতে ইট গাঁথা, খাবারও হয়তো সিনথেটিক। এ তো স্বর্গ!’
‘আপনি অসুখী বলে সুখীদেরকে অসুখী ভাবছেন। ওরা যদি বলে ওরা সুখী, আপনি ওদের অসুখী বানানোর কে ? আর খাবার সিনথেটিক না, সাপ্লিমেন্ট। দেহের ইলেকট্রোলাইট ব্যালান্স ঠিক রাখার জন্য কিছু সাপ্লিমেন্ট যথেষ্ট। আগুন জ¦ালাবার মতো গ্যাস অবশিষ্ট নেই, কাঠখড়ও ব্যবহারের সুযোগ নেই এখন। মহাপ্লাবনের পর মহা-অগ্নিকাণ্ড চাই না আমরা।’
‘সব প্রাকৃতিক প্রাণিই তো শেষ হয়ে গেছে মনে হচ্ছে। ওই জানালাটা খুললে কি সারি সারি বন্যপ্রাণির গলিত লাশ দেখব ? এখন ফুল ফোটে ? পরাগায়ন হয় ?’
‘ফুলের চাষ হয়। কারণ ফুল ছাড়া ফল হয় না। ফল ছাড়া সাপ্লিমেন্ট বানানো যায় না। পরাগায়ন করার জন্য বিশেষায়িত ড্রোন আছে। ড্রোন মানে মৌমাছি, জানেন তো ? আবার ড্রোন মানে চালকবিহীন বিমান।’
‘আপনারা বিদায় নিন। আমার মাথা ব্যথা করছে। আপনারা যা বলছেন সবই খুব স্বাভাবিক মনে হচ্ছে, কিন্তু সহ্য করতে পারছি না।’
‘সত্যই স্বাভাবিক। আর সত্যকে সহ্য করা কঠিন। তবে, জনাব .৫৪৫, আপনাকে আর সময় দেয়া যাচ্ছে না। আজকে আবার সেই দুটো ট্যাবলেট আপনাকে দিচ্ছি। এ দুটো খান, আগামীকালই আপনি সুখী হবেন।’
‘আগে খাইনি, আজও খাব না। বলছেন যে আজ শেষ দিন, না খেলে কী করবেন ?’
‘আপনার প্রগাঢ়তম ভয়কে আপনার সম্মুখীন করা হবে। প্রগাঢ়তম ভয় মানুষকে কুঁকড়ে দেয় জানেন তো ?’
‘হা হা হা হা। ভয় ? তাও আবার প্রগাঢ়তম ? আমি প্রগাঢ়তম ভয়ের মধ্যেই আছি এবং প্রগাঢ়তম ভয় আমার নাই। এটা আপনারাও খুব ভালো করে জানেন। আমাকে আপনারা ভয়ের মুখোমুখি হওয়ার ভয় দেখাচ্ছেন না, দেখাচ্ছেন ভয়ের ভয়। আপনারাই দেননি আমার ভেতর ভয় জন্মাতে। চার বছর বয়স থেকে আমি এখানে। না সাপ দেখেছি, না ভূত। না কখনও ইঁদুরে কামড়েছে, না তেলাপোকার ফোবিয়া জন্মেছে। টাকার চিন্তা কখনও ভাবায়নি। আমার একমাত্র গভীরতম ত্রাস হতে পারতেন আপনারা। তা বারবার আমার কাছে এসে আর একই প্যাঁচাল পেড়ে পেড়ে নিজেদের এমন সস্তা বানিয়েছেন, আপনাদের দেখলেই এখন হাসি পায়। কাজ নাই, কর্ম নাই, মানুষকে সুখী বানানোর তাঁবেদার সেজে ভুঁড়ি ভাসিয়ে ঘুরছেন।’
‘আপনি একটি প্রাণি, জনাব। শারীরিক যন্ত্রণা সহ্য করার সীমা আপনারও আছে। যে কোনও কিছুকেই ভয় পায় না, সে-ও দৈহিক যন্ত্রণাকে ভয় পায়।’
‘আপনারা এ-ও জানেন যে শারীরিক যন্ত্রণাকেও আমি এখন ভয় পাই না। কেন পাই না তা কি জানেন ? কারণ আমি কখনও কোনও নারীকে ভালোবাসিনি। ভালোবাসার যন্ত্রণা যে পায়নি, শরীর দিয়ে তাকে ভয় দেখানো সম্ভব না। আর আপনারা যন্ত্রণাবিহীন মৃত্যু নিশ্চিত করে শারীরিক যন্ত্রণার ভয় অনেক আগেই শেষ করে দিয়েছেন। শান্তিময় মৃত্যুর নিশ্চয়তা যার আছে, শারীরিক বেদনাকে সে অগ্রাহ্য করতে পারে। আমি সেই একজন। তাই আমাকে আপনাদের এত ভয়। সুখ সংক্রামক না, তবে দুঃখ খুব সহজে ছড়ায়, মহামারির মতো। এই এক অসুখী আমি কয়েক কোটি সুখী মানুষের মধ্যে হাহাকার সৃষ্টি করতে পারি। এই ভয়ই আপনারা পাচ্ছেন। হ্যাঁ, আমি আপনাদের প্রগাঢ়তম ভয়।’
‘ভেবে দেখুন, আপনি অন্যদের অসুখী করবেন, অসুখী জনতা ভয়ঙ্কর। এই দালানে থাকতে চাইবে না। আমাদের কথা বাদ দিলাম, এই দালান থেকে বেরিয়ে ওরা যাবে কোথায় ? বাইরে অক্সিজেন অপর্যাপ্ত, খাবার নেই, সমুদ্রের জলই এখন স্থল। সংবিধানে এর নাম স্থলিত-জল। সেই জলে ঘুরছে অদ্ভুত সব হিংস্র প্রাণি। অ্যামিবা বহুকোষী প্রাণিতে রূপান্তরিত হবার পর প্রথম যে জলজ মাংসাশী উভচরটি স্থলে উঠে এসেছিল, তারা পরিযুক্তিবেশে ফিরে এসেছে। বিংশ আর একবিংশ শতকের বিজ্ঞানীরা এর নাম দিয়েছিল টেট্রাপড। এই একটা জন্ম আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি। এই দালানে হরিণের মতো, কুকুরের মতো, মাছির মতো, বিড়ালের মতো, ফড়িঙের মতো, দোয়েলের মতো জীবনে মানুষ এখন সুখে আছে। রসনার লোভ নেই, যৌনতা সুলভ, মৃত্যু শান্তির। এই সুখ আপনি নষ্ট করবেন ?’
‘আগে কখনও জিজ্ঞেস করিনি, আজ করছি, ট্যাবলেট দুটো ডিকসের ?’
‘সুখের আগে কিছু যন্ত্রণা আসে, জানেন তো ? প্রকৃতি বা প্রযুক্তি, কিংবা পরিযুক্তিবেশের এইই নিয়ম। ট্যাবলেট দুটো আপনি একসঙ্গে খাবেন। তবে কুয়াশারঙের ট্যাবলেটটা প্রথম কাজ করা শুরু করবে। আপনার মধ্যম মানের একটা ব্রেনস্ট্রোক হবে। নিয়ন্ত্রিত পরিমাণে রক্তপাত হবে এবং রক্ত জমাট বাঁধবে। ফলে আপনার স্মৃতি এলোমেলো হবে। কিছুদিন এমন যাবে, মাঝেমধ্যে আপনার মনে হবে আপনার হ্যালুসিনেশন হচ্ছে। একটা সময় আসবে, যখন ভ্রান্তদর্শনই স্থায়ী হবে। যাকে হ্যালুসিনেশন ভেবেছিলেন, দেখবেন সে-ই সত্য। আর ক্লোরোফিল রঙের ট্যাবলেটটি মহাপ্লাবনের আগের কল্পনাময় ভ্রান্তি থেকে আপনাকে মুক্তি দেবে। ঘুচে যাবে দোচালা ঘর, তৃণভূমি, হ্রদ আর নানির গল্পবিষয়ক বিভ্রান্তি। মোহমুক্ত হয়ে নির্বাণলাভ করবেন। আপনি সুখী হবেন।’
‘আমি আত্মহত্যা করতে চাই। তাহলে ল্যাঠা চুকে যাবে। আমার লাশ গোপনে গুম করে ফেলবেন। আশা করি সুখী মানুষেরা আমার অস্তিত্ব জানে না, জানলেও ভাবিত না।’
‘আত্মহত্যা বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে, জনাব .৫৪৫। যে যুগে হতাশা নেই, সে যুগে আত্মহত্যা কী করে থাকতে পারে ? টেট্রাপডের আবির্ভাবের পর আরেকটি ব্যর্থতা অভিভাবকবৃন্দ নেবেন না। আমরা চাইলে আপনাকে বেঁধে এই ট্যাবলেট গিলতে বাধ্য করতে পারি। তা করব না। আপনার কর্মফলের দায়িত্ব আপনার থাকবে। ট্যাবলেট দুটো খেয়ে নিজের ও অন্যের সুখ নিশ্চিত করতে পারেন, না খেয়ে সুখহীনতার মহামারিতে সবাইকে আক্রান্ত করতে পারেন। তখন তাদের পরিণতি হবে স্বেচ্ছায় গিয়ে ওই টেট্রাপডগুলোর সামনে লাফ দেওয়া। ট্যাবলেট রইল। বিদায়, .৫৪৫। ট্যাবলেট যদি না খান, আমাদের সঙ্গে এই আপনার শেষ দেখা।’
‘বিদায়।’
‘ভালো থাকবেন। আপনার সুখ কামনা করি।’
‘মাননীয় অভিভাবকবৃন্দ, আমার কথা এখন আপনাদের কানে ঢুকবে না। জনাব হিলিবিলি, ট্যাবলেট খাবে ? নাকি ফেলে দেবে ? শব্দনিরোধক দরজা বন্ধ হয়ে গেছে। আদিতম যুগে যে প্রাণি প্রথম স্থলে উঠে এসেছিল, সে নিশ্চয়ই এখনও স্থল খুঁজছে। আপনারা জলকে বরফ বানাচ্ছেন। জল যখন ঘনীভূত হবে, হয়তো জাগবে কোনও কোনও স্থল। টেট্রাপড উঠে আসবে হয়তো সেখানে। বংশবিস্তার চলবে, চলবে লক্ষ বছরে একবার বিবর্তন। সেই প্রক্রিয়ায় হয়তো একদিন আবার সৃষ্টি হবে মানুষ―সংগ্রামরত মানুষ, দুঃখী মানুষ, আর্ত মানুষ, খাদ্যানুসন্ধানী-আশঙ্কাগ্রস্থ মানুষ, বিপ্লবী মানুষ, প্রেমাহত মানুষ―দুঃখী এবং তৃপ্ত।
হোমোস্যাপিয়েন্স না হোক, নিয়ান্ডারথাল তো হবে!’
সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ



