আর্কাইভগল্প

গল্প : মায়াকাজল : জয়দীপ দে

অনিন্দ্য বিরাট একটি পুরস্কার পেয়েছে। পাশের রুমে সে সেলিব্রেট করছে। কাগজের একটা প্যাকেটে দুটো বোতল এনেছে। সায়রা জানে এটা ভোদকা। বাম রাজনীতি ছেড়ে দিয়েছে, কিন্তু ভোদকা ছাড়েনি অনিন্দ্য। নেশায় ভারী হয়ে এসেছে তার কণ্ঠ। খিস্তিখেউড় করছে কাকে নিয়ে যেন। ওপাশ থেকে একটা মেয়ে খিলখিল করে হাসছে। হাসির শব্দ শোনা যাচ্ছে না, কিন্তু সায়রার মানসপটে তা-ই ভেসে উঠছে বারবার। মনে মনে বলছে, ডাইনি!

অপালা ঘুমাচ্ছে। গভীর ঘুম। ব্রেন টিউমারের অপারেশনের পর তাকে ঔষধ দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়। অনিন্দ্য সেটা জানে। তাই পাশের রুমের লোকজন কী মনে করল, না করল তাতে তার কিছু যায় আসে না।

সায়রার আর কিছু বলার নাই। আশা ছেড়ে দিয়েছে। বেহায়ার মতো পড়ে আছে এ সংসারে।

আগে খুব রিয়েক্ট করত সায়রা। মাকে বলত। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা হতো। মা কত বুদ্ধি দিতেন স্বামীকে বশে আনার। তাবিজ কবজ করতে বলেছিলেন। সায়রার রুচিতে বেধেছে। তাই করেনি। এখন সে উৎসাহ নাই। কালেভদ্রে মা কল করেন। আরেঠারে বুঝিয়ে দেন, স্বামীর সংসারে একটু মানিয়ে চলো।

অনিন্দ্যের কোনও ব্যাপারেই কেন জানি সায়রার এখন আর কোনও আগ্রহ নাই। এক ছাদের নিচে থাকা লাগে তাই থাকে। এর বিনিময়ে অনিন্দ্যের মেয়েটাকে লালন-পালন করে। স্কুলে নিয়ে যায়। রেঁধে-বেড়ে দেয়।

অনিন্দ্যের মেয়ে! তার কিছু না! বুকটা ছ্যাৎ করে ওঠে সায়রার। এই মেয়েটার জন্য তো স্বেচ্ছাবন্দি হয়ে আছে এ সংসারে। অনিন্দ্যের সব অপরাধ সে এই মেয়েটার দিকে তাকিয়ে মেনে নিয়েছে। তার প্রতি অনিন্দ্যের যতই অবহেলা তাচ্ছিল্য থাকুক না কেন, মেয়েটিকে ভালোবাসে প্রাণ দিয়ে। অনিন্দ্য আসলে ভালোবাসতে জানে। মেয়েটা এখনও টিকে আছে তার বাবার ভালোবাসার জোরে। দুদিন পর পর হিল্লি দিল্লি করে বেড়াচ্ছে মেয়েটাকে নিয়ে। একাই। বাসাবোতে একটা ফ্ল্যাট বুকিং দিয়েছিল। মেয়ের দিকে তাকিয়ে সেটাও হাতছাড়া করেছে অনিন্দ্য।

এত তীব্র বিদ্বেষের অনুভূতির মধ্যেও কেন জানি অনিন্দ্যের প্রতি একটা সফটনেস কাজ করে সায়রার। মাঝে মাঝে মনে হয় দোষটা হয়তো তার। যুক্তিহীনভাবে সে অনিন্দ্যকে দোষারোপ করে যাচ্ছে। শুধু অনিন্দ্যের দোষ দিয়ে কী হবে, তার আত্মীয়স্বজনও তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। যে মাকে এতকাল সে অথৈ সাগরে একখণ্ড বালুচর ভেবে আঁকড়ে ধরেছিল, সে মা-ই একদিন বলে বসলেন, পুরুষ মানুষের একটু আরেকটু মতিভ্রম হয়। সেসব মেনে নিয়েই সংসার করতে হয়। যাই করুক, ভাত তো দেয়…

শেষমেষ ভাতের খোঁটা শুনতে হলো! তার এই পরান্নজীবী জীবনের জন্য তো অনিন্দ্যই দায়ী। বিশ্ববিদ্যালয়ে খুব মেধাবী ছাত্রী না হলেও, একেবারে এলেবেলে ছিল না সায়রা। প্লেসে থাকত সবসময়। অনার্স ফাইনালে উঠেই অনিন্দ্যের মায়াজালে আটকে পড়ে সায়রা। 

কীভাবে কী হলো, হিসাব মেলে না।

কালচারাল ফ্রন্টের কাজে অনিন্দ্য আসত। লিকলিকে শরীর। মাথাভর্তি উস্কোখুস্কো চুল। হলদে দাঁত। উচ্চতাও গড়পরতার চেয়ে কম। ঢাকার বাইরে থেকে এসেছে। কথায় বার্তায় গ্রাম্যতার ছাপ। এমন ছেলেকে কোনও মেয়ের চোখে লাগবার নয়।

বিপরীতে সায়রা তখন মঞ্চের রূপকুমারী। লোকনাট্য সংঘের প্রধান অভিনেত্রী। শ্যামলা মুখের ওপর গভীর দুটো চোখ মাতিয়ে রেখেছে পুরো ক্যাম্পাস। পাপড়ির গাঢ় দুটো রেখার মধ্যে টলটল করত আই-বল। কতজন তাকে বলত তোমার চোখের দিকে তাকালে আর ফসকে যাওয়ার উপায় নেই। অনেক পরে অবশ্যি অনিন্দ্যও সেটা স্বীকার করেছে। অনিন্দ্য তখন পত্রিকায় কবিতা লিখত। ভোরের কাগজে ছাপা হয়েছিল একটা কবিতা, মায়াকাজল। সেটা নিয়ে খুব আলোচনা হয়েছিল থিয়েটারের সার্কেলে। কারও বুঝতে বাকি ছিল না কাকে উদ্দেশ্য করে কবিতাটা লেখা। এসবে মনোযোগ দেওয়ার মতো সময় সায়রার ছিল না। 

কিন্তু নিজের অজান্তেই দুধে-জলে মিলে গেল। অনিন্দ্যের মোহে পড়ে গেল সায়রা। অল্পদিন পর অনিন্দ্য কাজ নিল একটা পত্রিকায়। তারপর থেকে বিয়ের জন্য চাপ দিতে লাগল।

বাসাতে অনিন্দ্যের কথা বলতেই বাবা খেঁকিয়ে উঠলেন। অ্যাঁ, পেপারে কাজ করে… এটা একটা চাকরি!

কিন্তু সায়রার তীব্র জেদের মুখে সব বাধা যেন টলে গেল।

মাস্টার্সের শুরুতেই বিয়ে হয়ে গেল। তারপর রায়েরবাজারের একটি ছোট্ট ফ্ল্যাট। টানাপোড়েন। ছুটি পেলেই এদিক ওদিক ছুটে যাওয়া। সেসব কথা ভাবলে একটা সুখানুভূতিতে মন ভরে যায়। পরক্ষণেই আবার আত্মগ্লানিতে মন বিষিয়ে ওঠে। এভাবে আবেগে ভেসে যাওয়া ঠিক হয়নি। এভাবে নিজেকে সস্তা করার কোনও মানে ছিল না। অনিন্দ্যের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার পর থেকে সে একতরফা ছাড় দিয়ে গেছে। সংসারের মায়াজালে পড়ে আর চাকরির জন্য ভালো করে চেষ্টাই করা হলো না। হুট করে পুটি এসে গেল। পুটি মানে অপালা। অপালাকে এখনও সায়রা পুটি বলে ডাকে। অনিন্দ্য রাগ করে। অনিন্দ্যের কবি হওয়ার শখ সে পূরণ করতে চায় অপালাকে দিয়ে। তাই বৈদিক কবি অপালার নামে মেয়ের নাম রেখেছে।

যখন দেখল চাকরি-বাকরির সুযোগ কমে আসছে, সায়রা বুদ্ধি করে বিএডটা করে ফেলেছিল। চিন্তা ছিল একটা স্কুলে ঢুকে পড়বে। কিন্তু অনিন্দ্য অপালার কথা বলে তাকে আটকে দিল। যখন তার সব দুয়ার বন্ধ, ডানার সব পালক খসে পড়েছে, তখনই অনিন্দ্য অন্য একটা চেহারায় আবির্ভূত হলো। লিকলিকে শরীরে সামান্য মেদ লেগেছে। পত্রিকার চাকরি ছেড়ে একটা সাহায্য সংস্থায় ঢুকেছে। চাকরির খাতিরে নিজেকে পরিপাটি করে রাখতে হয়। চেহারা একটা খোলতাই এসেছে। বোঝা যায় মেয়েরা এখন তার প্রতি উৎসাহী। স্মৃতির অনিন্দ্যের সঙ্গে আজকের অনিন্দ্যকে মেলালে অবাক লাগে সায়রার। কী পরিবর্তন!

ততদিনে লোকনাট্য সংঘের রূপকুমারী আটপৌরে গৃহিনী। ঘাড়ে কোমরে মেদ জমেছে। চোখের কোলে কালি। নিজের দিকে তাকানোর সময় পায়নি সায়রা। অথবা প্রয়োজন বোধ করেনি। সংসারের ঘানি টানতে ব্যস্ত ছিল। অনিন্দ্যের প্রতি ছিল তার অন্ধ বিশ্বাস। বিশ্বাসের বাসর ঘরে কখন যে সুতানাগিনী ঢুকে পড়ল, টেরই পায়নি সায়রা।

একদিন ক্যাবল টিভি অপারেটরের নাম্বার খুঁজতে গিয়ে অনিন্দ্যের সেল ফোনটা ঘাটছিল। তখনই এক গাদা ম্যাসেজ তার চোখে পড়ল। পুরোটা শরীর গুলিয়ে উঠল। মেয়েগুলো এত বাজে। এত নোংরা! একজন বিবাহিত পুরুষ…

জীবনে এমন ধাক্কা সে কম খেয়েছে। কিছুই বলেনি অনিন্দ্যকে। জানে জেরা করে লাভ নেই। ম্যাসেজ পড়ে বোঝা গেছে, সম্পর্কটা অনেক দিনের। অনেক দূর গড়িয়েছে। খুম ধরে  বসেছিল অনেক দিন। বিশেষ একটা কথাবার্তা বলত না। অনিন্দ্য যখন বুঝতে পারল তার সঙ্গে অন্য নারীর সম্পর্কের কথা সায়রা জেনে গেছে, তখন সে ব্যক্তিস্বাধীনতার কথা বলত। তার একটা প্রাইভেট লাইফ আছে ইত্যাদি বুঝাত।

সায়রা যুক্তির পিঠে যুক্তি দিত। অনিন্দ্য অসহিষ্ণু হয়ে উঠত। শান্ত জলের সরোবরটি ঘোলাটে হতে শুরু করল। সায়রা তখনও সংসারের কুটিল দিকগুলো দেখেনি। আপনজনের কাছে মন খুলে সব বলেছে। প্রথম প্রথম সকলের সহানুভূতি সে উপভোগ করত। একসময় বুঝতে পারল, এটা সহানুভূতি নয়, করুণা। করুণা একটা সময় প্রকৃতির নিয়মে তাচ্ছিল্যে পরিণত হয়। তাই হয়েছিল।

এদিকে অপালার হেডএইক দিন দিন তীব্র হতে শুরু করল। ফলে একটা সময় দাম্পত্য কোলাহল রেখে অপালার দিকে মন দিতে হলো দুজনকেই। অন্তত এই একটা বিষয়ে অনিন্দ্যের কাছে কৃতজ্ঞ সায়রা।

অনিন্দ্যের খিস্তিখেউড় থেমেছে। সে নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে। সায়রা অনিন্দ্যের ঘরে ঢোকে। যুদ্ধ শেষের এক ক্লান্ত ধ্বস্ত রূপ চারদিকে। সিগারেটের ধোঁয়ায় ঘরটা আচ্ছন্ন হয়ে আছে। জানালা খুলে দেয়। অনিন্দ্য হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে আছে। পায়ে চটি জুতা। সায়রা অনিন্দ্যের জুতা খুলে দেয়। মনে মনে হাসে। নিজেকে বাংলা সিনেমার ববিতা মনে হয়। এখন একটা সিঙ্গার মেশিন হলেই হয়! সাইড টেবিলে একটা পিতলের ক্রেস্ট রাখা। কোনও একটা বিদেশি সংস্থা নারী নির্যাতন প্রতিরোধে জনমত তৈরির জন্য অনিন্দ্যকে পুরস্কার দিয়েছে। সায়রা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, আইরনি।

মশারি টাঙ্গিয়ে দিয়ে বেরিয়ে আসে সায়রা। বাপের মতো হাত-পা ছড়িয়ে ঘুমাচ্ছে মেয়েটা। কেমন নিশ্চিন্ত আর নিবিড় লাগছে মেয়েটাকে। এত বড় ঝড় গেল ছোট পাখিটার উপর, চেহারায় তার কোনও ছাপ নাই। কেমোর পর চুল পড়ে গিয়েছিল। এখন উঠতে শুরু করেছে। মাথা যেন কচি ঘাসে ভরে গেছে।

সায়রা অপলক তাকিয়ে থাকে মেয়েটার দিকে। চেহারাটা পুরো বাপের। যত বড় হচ্ছে তা আরও প্রকট হচ্ছে। কিন্তু চোখটা! ধক করে ওঠে তার বুক। সায়রা ছুটে যায় আয়নার কাছে। কই তার চোখ! গাঢ় চোখের পাপড়ির মধ্যে টলটল করা একটা আই-বল। বরং গর্তে পড়া কালিতে ঢাকা ফ্যাকাসে দুটো চোখ। দীপ্তিহীন, নিষ্প্রভ। কই গেল তার সেই মায়াকাজল! কই!

অপালার দিকে তাকিয়ে সায়রা কাঁদতে থাকে, আমার সব নিয়ে গেলি, সব―

সচিত্রকরণ : রজত

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button