
বেলা চড়ে দুপুর হলেও, নিচের জনপদে দাঁড়িয়ে বোঝার উপায় ছিল না, মনে হচ্ছিল ভোর বড়জোর। বৃষ্টির অবিরত ধারাপতনের একটা সাধারণ নাগরিক আশীর্বাদ আছে। আশীর্বাদপ্রার্থীর আপদ- বিপদের ধার সে ধারে না। জলাবদ্ধতার কথা বলছি।
সেদিনের রাস্তায় ওই জলাবদ্ধতা বেশ এক রকমের সৌন্দর্য সৃষ্টি করেছিল। যারা পুলের জলে দাপানো শিখেছে, তারা জানে স্বচ্ছ জলের নিচে নিরাপদ সীমায় যখন মেঝের কাঁপা কাঁপা ছবিটা দেখা যায়, তখন ভরসায় মেশানো অনুভব মনে জাগে। এখানেও তেমনই। তদুপরি জলডোবা পিচঢালা সড়কের ওপর গাছের ছায়ার ওপর যখন বৃষ্টির ফোঁটা এসে জলের ওপর পড়ছে, একেকটা রাজার মুকুট তৈরি হচ্ছে আবার মিলিয়েও যাচ্ছে। জমে থাকা ওই জলকে আবদ্ধ মনে হলেও আসলে তা নয়। লক্ষ করলে বোঝা যায় কোথাও কোনও সূক্ষ্ম জঠর ছিদ্রের দিকে জল এগিয়ে চলেছে। ওপর থেকে কেবল জলের দিকে তাকিয়ে থাকলে বোঝা যায় না। কিন্তু নর্দমা থেকে উঠে আসা বিচিত্রদর্শন বস্তুগুলো জলডোবা রাস্তার ওপর দিয়ে নীরবে পরিপাটি গাম্ভীর্য বজায় রেখে যেভাবে জীবন্ত প্রাণির মতো হেঁটে চলেছে তা দেখে জঠরছিদ্রগামী ওই চোরাস্রোতটা টের পাওয়া যায়।
হেঁটে যাওয়া ওই বস্তু সারিতে কী কী আছে ? আছে লেবেল তোলা ঘনায়িত দুধের কৌটা, কাঁঠালের ছেঁড়াখোঁড়া ক্ষয়িষ্ণু কাঁটাল ত্বক, নানা রঙের পোয়াতি পলিথিন।
আছে মৃত প্রাণির গলিত জট পাকানো নাড়িনধর, অগণিত গলিত বেরঙা গাছের পাতা, সংবাদপত্রের টুকরা ছিন্নাংশ।
আছে বর্ণনাতীত আরও অনেক কিছুই। ওদের গতিপথ অনুসরণ করে আরও বেশ কিছুদূর এগোলে, অদূরে সরু চৌরাস্তার ঠিক মধ্যখানে একটা লাল পতাকাওয়ালা সরু বাঁশ গেড়ে দেওয়া খোলা ম্যানহোল পড়বে চোখে। চারটি রাস্তা ধরেই হেঁটে আসতে থাকা জীবন্মৃত আবর্জনার দল ওই ম্যানহোলের চারধারে ঘড়ির কাঁটার দিকে বারকয়েক ঘুরপাক খেয়ে ওই অন্ধকার বৃত্তাকার গর্তপথ ধরে পাতালের পথ গুনছিল। এমন সময় দক্ষিণ দিকের এক চারতলা দালানের তৃতীয় তলার জানালা থেকে একটা কাগজের পিণ্ড এসে পড়ল ওই পাতালগামী জলের উপরিতলে। এরপর সবেগে পূর্বসূরিদের পশ্চাদ্ধাবন ছাড়া পরিণতি আর কী-ই বা হতে পারে।
কী চলছে ওই তৃতীয় তলায় ?
জানালার চওড়া কাঠামোর বাইরের দিকে ভেজা শরীর নিয়ে, ভাবলেশহীন চোখ মেলে তাকিয়ে আছে প্রায় নির্জীব এক কাকপাখি। ভেতরের ঘরটা মোটের ওপর অন্ধকার। নগরের বিদ্যুৎ আকাশের বিদ্যুৎ দেখে পালিয়েছে।
প্রায় আলোহীন ওই ঘরে জানালাঘেঁষা বিছানার ওপর ঝুঁকে বসে খালি গায়ের শ্যামলরঙা ছেলে নিপু আঁকছে ঠোঁটখোলা এক বৃষ্টিখেকো পাখি। চাতক।
নিপুর চোখের মণি কালো, বাকিটা খুব সাদা। কালো মণিটা সাদা কাগজের এমাথা-ওমাথা ঘন ঘন যাতায়াত করছে। সাদা কাগজের ওপর ভীষণ মনোযোগ দিয়ে পেন্সিলে কাটছে একেকটা আঁচড়। তখন দুই ঠোঁটের মধ্য দিয়ে লাল জিভটার ছোট্ট অংশ বেরিয়ে আসছে। রবারের ডলুনিতে যখনই কাগজ যাচ্ছে ছিঁড়ে বা আঁকবাঁক পছন্দ হচ্ছে না, রাগত কিশোরের হাতের মুঠোয় তা পিণ্ডে পরিণত হচ্ছে। এরপর উড়ে গিয়ে বাইরের বাতাসে খানিকক্ষণ ভেসে থেকে হচ্ছে নরকগামী। কিছু সৌভাগ্যবান পিণ্ড বাইরে না পড়ে জানালার শিকে একবার মাথা ঠুকে মেঝেতে গড়াচ্ছে।
ওদিকে রান্নাঘরের মাটির কলস থেকে হাতের রুপালি জগটায় জল ভরবে বলে এগোচ্ছিল নিপুর নিভাদি। দরজাপথে ভাইকে অমন ক্রুদ্ধ দেখে তার কৌতূহল হলো ভীষণ। জল ভরে খাবারঘরের চারপেয়ে টেবিলটার ঠিক মধ্যখানে রেখে সদ্য রান্না হওয়া সজল সরস সবজির পাত্রগুলোর জ্যামিতিক সুসজ্জা আরও খানিকটা বাড়িয়ে আঁচলে হাত মুছতে মুছতে নিভা এল ভাইয়ের ঘরে। কপালে আর নাকের ডগায় বিন্দু বিন্দু ঘাম।
আলোর কাছে এসে দাঁড়ানো ছাড়া ওই মুক্তোবিন্দু আলো ছড়ায় না।
চোখের সামনে যখন বড় বোনটি দণ্ডায়মানা, তখন নিপুর শিল্পকর্ম ঝটিতে চলে গেল আড়ালে। এখনই তা দেখার অধিকার কারও নেই। ভাইদের এমন লুকানোর প্রচেষ্টা কোনও কালের কোনও দেশের বোনদের কাছেই আমল পায়নি। এখানেও তাই হতে চলেছিল। একপলক বাইরের বৃষ্টি দেখে শিল্পকর্ম উদ্ধারের উদ্যোগ করার ঠিক আগমুহূর্তে নিভার চোখের কোণে পড়ল এক লাল বিষপিঁপড়ার সারি। সারিটা জানালার একটা আধভেজা কোণ থেকে দেয়াল ধরে সুড়সুড়িয়ে এগোতে এগোতে নিপুর দেয়ালঘেঁষা বিছানার তোষকের আড়ালে কোথাও হারিয়ে গেছে।
কতক্ষণ ধরে পিঁপড়াগুলোর এক্সোডাস এমন নিরুপদ্রব চলছিল তা তো বলার উপায় নেই। তবে তার মতো এমন মানবের মহৎ ত্রাণকর্ত্রী চলে আসার পর তো আর এমনটা চলতে দেওয়া যায় না।
নিভাদি ছোট্ট নিপুকে ছেড়ে দিয়ে পিঁপড়ার ওই চলন্ত সারির কাছে মুখটা এগিয়ে নিয়ে কিছুক্ষণ কেবল দেখে গেল তাদের। ততক্ষণে নিপুরও নজর কেড়েছে ওরা। নিভাদি গিয়ে ঘরের এক কোণে দাঁড়ানো পুরনো ধাতব শো-কেসের ওপর থেকে ধুলো ঝাড়ার বিবর্ণ কাপড়ের টুকরাটা হাতে নিল। এরপর স্বভাবসিদ্ধা হালকা পায়ের চলায় জানালার কাছে এসে যেই সারিটাকে মিশিয়ে দিতে যাবে, কচি শ্যামল একটা হাত তার কব্জিটাকে খপ করে ধরে ফেলল। খানিক আগের ক্রুদ্ধ নিপুর চোখে এবার অনুনয়। পিঁপড়ার এই নির্দোষ সারিটিকে নিশ্চিহ্ন হতে সে দেবে না। প্রাণের গভীরে জমা প্রাকৃতিক সহানুভবের জারকরসে জারিত তার হৃদয়মন উদ্বাস্তু কীটগুলোকে রক্ষায় প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগে প্রস্তুত হয়ে উঠল। বলল, না! ওদের মারবে না তুমি!
কেন! আশ্চর্য নিভা। কামড়ালে তখন মজা টের পাবি।
কামড়াবে না ওরা!
কথা দিয়েছে তোকে ? একশোবার কামড়াবে।
না!
নিপুর ওই না-এর ভেতর না বুঝের টিমটিমে একটা ক্ষোভ অনেকটুকু অনুভব এমনভাবে জ্বলছিল যেন ফুঁ দিলে তা নিভতে পারে, তবে তাতে ইলিয়ে ওঠা ধোঁয়ায় নিপুর কিশোর মনের সাজানো ঘরটার হাওয়া বহুক্ষণ ভারাক্রান্ত হয়ে থাকবে। সংকটের এমন মুহূর্তে ছোট ভাইটিকে এ নিয়ে বাড়তি ওটুকু ব্যতিব্যস্ত করে তুলতে, কষ্ট দিতে বোনের মন সরলো না। ঘনায়মান একটা কালো সম্ভাবনার কথা না-বলে কয়ে মনে ঢুকে পড়ায় একটা মৃত্যুশীতল অস্বস্তিকর হাওয়া তাকে পেয়ে বসল, মুহূর্তে। একই সঙ্গে ছোট ভাইটির জন্য করুণার্দ্র দরদে মনপাত্র পূর্ণ হয়ে উঠল। বলল, আচ্ছা পাগল, মারব না।
বোনের ওপর যথেষ্ট অনাস্থাবান দেখা গেল নিপুকে। ছাড়ল না হাত। নিভা তখন কপট রাগের সঙ্গে কব্জিতে এঁটে বসা নরম সাঁড়াশিটা শক্তি প্রয়োগে খুলতে চাইলো।
বললাম তো মারব না!
এরপর কণ্ঠটিকে আরও শান্ত, আদুরে করে তুলে বলল, সত্যি বলছি ভাই। বিশ্বাস কর ?
এবার নিপু হাত ছাড়ল। বিদ্যুৎ এসে গেছে। চলতে শুরু করেছে পাখা। শরীরের পেছনে আড়াল করা নিপুর শিল্পকর্ম আসন্ন যুদ্ধের সম্ভাবনায় আগেই হয়েছিল হাতছাড়া। এবার পাখার বাতাস ভেসে উঠে যেন হাতে-পায়ে হেঁটে একেবারে নিভার সামনে এসে এলিয়ে পড়ে থাকল। নিভা তুলে নিল কাগজটা। একের ওপর এক চাপের পর এবার আর কিশোর মনটা মানলো না, প্রত্যক্ষ যুদ্ধেও সরলো না। ছুঁড়ল এমন এক অস্ত্র, পৃথিবীতে দুর্বলের ভাণ্ডারে জমা এর চেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র একটিও নাই। তা হলো, কান্না। এমনই সেই বুকভাঙা কান্না যে আঁতকে উঠে হাত থেকে কাগজ ফেলে ঝুঁকে ভাইকে জড়িয়ে ধরল নিভা।
দেখব না ভাই! দেখব না। ইশ, আমার ভাইটার মন খুউব খারাপ হয়ে আছে, খুউব খারাপ। জানি তো! আমি দিদি কি আর জানি না ? সব জানি, স-ব জানি!
দিদির বুকের ভেতর মুখ লুকিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকল নিপু। কান্নার একেকটা ঢেউ দমিয়ে দিতে গিয়ে ছোট শরীরটা দুলে দুলে উঠল থেকে থেকে। নিভা তখন আরও গাঢ় করে জড়িয়ে ধরল নিপুকে। পারে তো পাঁজরের ভেতর লুকিয়ে ফেলতে চায়। নিপুর ছোট করে ছাঁটা চুলের সুসজ্জাকে স্বীকৃতি দেওয়া কচি দুটো কান তখন আড়াল হওয়া মুখের প্রতিনিধিত্ব করছে।
চল, চল ভাই! বাবা বোধয় আসবে না। খেয়ে নিই আমরা, চল।
নিপু আলিঙ্গনমুক্ত হয়ে সুবোধ কিশোরের মতো মাথাটা একবার হেলিয়ে বিছানা ঘষটে নেমে এল মেঝেতে, সঙ্গে নেমে এল বিছানার চাদর। মেঝেতে গড়াচ্ছে তখন হাতে আঁকা বৃষ্টিখেকো চাতক। আজকের এই অসহ্য বৃষ্টি সব সে একাই খেয়ে নেবে। এক ফোঁটাও আর এই ডুবন্ত শহরে পড়তে দেবে না। বৃষ্টিতে গোটা শহর সদ্য জেগে ওঠা চরের মতো কেবল খানিকটা দেখিয়ে জলডোবা হয়ে আছে। এ বর্ষায় যা হয়েছে বিগত দশ বছরে তা আর হয়নি, লিখেছে পত্রিকায়।
ছোট ছোট হাতে ভাতের নলা বানিয়ে মুখে পুরে নিপু বলল, বাবা আসবে না কেন ?
আসবে না বলেছি নাকি! বলেছি, বোধয় আসবে না। মানে আসতেও পারে, নাও পারে।
আসতে নাও পারে কেন ?
না-ও পারে বলেছি নাকি!
এই মাত্র বললে শুনলাম!
বলেছে! কপট রাগ নিভার। অবশ্যই আসবে। যদি তুই ঘুমাস, তাহলে।
নিপু আর কিছু না বলে বোনের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল। আরও এক নলা ভাত নিল মুখে দৃষ্টিবদল না করেই। নিভা আরও এক চামচ বেগুনের ঝোলে ভিজিয়ে দিল নিপুর ভাত। এবার সেদিকে তাকিয়ে নিপু নিশ্চুপ। আর ওদিকে নিজ ভাত কেবল মেখেই চলেছে নিভা, মুখে তোলার নাম নেই।
এমন সময় মৃদু স্বরে জিজ্ঞেস করল নিপু, আর মা ?
কথাটা প্রায় শোনাই যায় না, এমন। তাতে কী হয়েছে, নিভা ঠিকই শুনতে পেয়েছে। আর শুনেও নিজেকে চুপ করিয়ে রাখবে, সে কি এমন দিদি ? মাথাটা একবার ওপর-নিচ দুলিয়ে চেষ্টাকৃত স্পষ্ট স্বরে বলল, আরে মা তো অবশ্যই আসবে, জানিস না তুই ? হুম, আসবে তো। মাকে একবারে আনবে বলেই তো বাবা আর আসছে না আজ। মানে, হয়ত, আসছে না আজ। একজন কাউকে সঙ্গে থাকতে হয় না! কেউ একজন তো সঙ্গে থাকে। নয়ত রাগ করে ডাক্তাররা। আর―
আরও কিছু যেন ছিল বলার; নিভার শেষ বাক্যের সুরটা হলো এমন। নিপু আগের মতোই শান্ত চোখে ভাতের নলা তুলল মুখে।
ধীরে ধীরে পাতের ভাত কমে এল দুজনারই। রান্নাঘরের শ্যাওলাধরা স্যাঁতস্যাতে এক কোণে ছোট্ট চৌবাচ্চা, কিছু এঁটো বাসন-কোসন ওখানে জমা হয়ে আছে। এর ঠিক ওপরে এসে থেমেছে প্লাস্টিকের এক সবুজ ঢিলে কল। ঘোরানো ছাড়াই সরু নালে দিনভর জল ঝরছে। কল ঘুরিয়ে ঠান্ডা জলের ধারায় পালা করে হাত ধুলো ভাইবোন। এরপর আবার স্নানঘরে ঢুকে হাত মুখ পায়ে জল ঢেলে আলনা থেকে জায়গায়-জায়গায় রোঁয়াঝরা একটা সাদা তোয়ালে টেনে বের করে হাত-মুখ আলতো চেপে চেপে মুছে নিল। এরপর বাবা-মায়ের ঘরের প্রায়ান্ধকার কোণে এসে জানালার কপাট খুলে দিয়ে বসল হাঁটু গেড়ে।
ঠাকুরঘর নাই, এটা ঠাকুরকোণ। সামনে লাল জমিন আর সোনালি পাড়ের শাড়ি জড়ানো লক্ষ্মী আর সরস্বতীর ছোট্ট দুটো প্রতিমা রাখা। মধ্যখানে দেবাদিদেব শিবের একটা হাতে আঁকা রঙিন ছবি। তার সামনে ছোট পেতলের আগরবাতিদান। পাশের তাকের ওপর থেকে আগরবাতির প্যাকেট নামিয়ে দুটো বের করে আনলো নিভা। নিচের তাক থেকে দিয়াশলাইয়ের বাকসো থেকে কাঠি বের করে ধরালো আগুন। এরপর আগরবাতি দুটো জ্বালিয়ে বাতিদানের নকশি ঢাকনির ছিদ্রতে দিল সাজিয়ে। দিয়াশলাইয়ের কাঠিটা এক ফুঁ-তে নিভিয়ে পাশেই রেখে দিল। ততক্ষণে এঁকেবেঁকে উড়ে সুগন্ধ ছড়াতে লেগেছে আগরবাতির ধোঁয়া। দু চোখ বন্ধ করে হাত-জোড়া বুকের কাছে এনে স্থাপন করল নিভা। বোনের দেখাদেখি ভাইও করল তা-ই। এরপর শুরু হলো বিড়বিড়িয়ে স্ত্রোত্র পাঠ। মন্দ্রগম্ভীর স্বরে চলল দেবতা আর দেবীর বন্দনা। বন্দনা শেষে নিভা আরোগ্য কামনা করল মায়ের; ভাষায়। আর ওদিকে ভাষাহীন সমর্পণে চুপটি করে বসে থেকে নিপু কেবলই ভাবল আকাশপাতাল। মাকে ছাড়া বুকটা তার ভীষণ ফাঁকা ঠেকছিল থেকে থেকে। কিন্তু প্রার্থনায় বসলে দিদির মতো নিবিষ্ট মনে কেবল মায়ের জন্যেই প্রার্থনা করতে পারে না নিপু। তার অল্পে তুষ্ট কিন্তু সদা বিচরণশীল মন কত কিছুই যে চায় ঘুরেফিরে! আর শেষতক কোনটা যে তার সবচেয়ে বেশি দরকারি, তাই ঠিক বুঝতে না-পেরে অস্থির হয়ে পড়ে আরও। তখন ভরসার আশায় নিভার দিকে তাকিয়ে দেখে, নিভার বন্ধ চোখ দুটি ভেজা। দেখে তারও কান্না কান্না পায়। বড় বড় চোখ দুটো ফিরিয়ে নিয়ে আবার দেবাদিদেবের ওপর স্থির করে নিপু। পেছনে দেবতাত্মা অপূর্ব হিমালয়! যে কান্নাটা গলা অবধি এসে চোখের পাতায় উত্তাপ ছড়াতে চেয়েছিল, ততক্ষণে আবার তা পেটের থলেতে উপুড়। এভাবেই একসময় প্রার্থনা শেষ হয়।
নিভে যাওয়া দিয়াশলাইয়ের কাঠিটা জানালাপথে বাইরে ফেলে দিয়ে উঠে দাঁড়াল নিভা। রুপালি কালো দুপুরের আলো ভিজিয়ে দিয়ে বৃষ্টি তখনও ঝরছেই। বোনের দিকে না তাকিয়ে কেবল আড়চোখে লক্ষ রেখে একই সঙ্গে উঠে দাঁড়াল নিপু। শিব আর তার মেয়ে দুটির সামনে তখনও নৃত্যরতা আগরবাতির ধোঁয়া।
বিছানায় শুয়ে ঠান্ডা হয়ে আসা কোল-বালিশটা আঁকড়ে ধরে নিপু আরামে চোখ দুটো বুজতেই হঠাৎ ঘাড়ের কাছে কামড়। সর্বনাশ! সেই বিষপিঁপড়া! নিপু সাবধানে ঘাড়ের কাছে আঙ্গুল বোলালো, অবুঝ কীটটা আবার টুকরা না হয়ে যায়। পিঁপড়াটাকে অবশেষে খুঁজে পেল নিপুর সাবধানী আঙ্গুল। আঙ্গুলের ডগা দিয়ে মৃদু ঠেলে ত্বকের ওপর থেকে তার দাঁত সরাতে বলল যেন। পিঁপড়াটা শুনলো তার কথা। দাঁত সরিয়ে নিল। তখন তর্জনী আর বুড়া আঙ্গুলের ডগায় ধরে, পাশ ফিরে জানালামুখী হয়ে দেয়ালঘেঁষা ভেজা তোষকের শেষ প্রান্তে কীটটাকে ছেড়ে দিল নিপু। ওই অবস্থাতেই ঘাড় ফিরিয়ে দরজার দিকে দেখ নিল একবার, দিদি লুকিয়ে সব দেখে নিচ্ছে কি না। না, কেউ তাকিয়ে নেই। ঘাড় ফিরিয়ে আবার আগের দৃষ্টিবিন্দুতে তাকাল নিপু। পিঁপড়াটাকে যেখানে ছেড়েছিল, কিছু নেই আর সেখানটায়।
সন্ধ্যায় ঘুম ভাঙল নিপুর। পাশ ফিরে চোখ মেলে দেখে, ঘরের এক কোণে বেতের আরাম কেদারায় বসে পা দোলাচ্ছে ছোটকাকা। গোঁফে-চশমায় প্রথমে বাবা বলে ভ্রম হয়। পরে স্বাস্থ্যের কৃশ রূপ দেখে ভ্রমটা কাটে। নিপুর দিকে তাকিয়ে হাত নাড়ল ছোটকাকা, একবার। হাতটা তেমনি তোলা থাকল কিছুক্ষণ। অপর দিক থেকে কোনও সাড়া না-পেয়ে অবশেষে নামিয়ে নিল। এ সময় ঘরে এসে ঢুকলো নিভা। চোখজোড়া ভীষণ লাল হয়ে আছে। কেঁদেছে বুঝি খুব ? কাছে এসে নিপুর গালে একবার ঠোঁট ছুঁইয়ে বলল, এখনই তোকে জাগাতাম নিপু। স্নানঘরে যা ভাই! হাত-মুখ ধুয়ে আয়। আমাদের বেরোতে হবে।
নিপুর ঘুমঘুম ভাবটা আবার ফিরে আসছিল। বেরোতে হবে শুনে কান হলো খাড়া। জড়ানো গলায় জিজ্ঞেস করল, কোথায় ? গলায় আলস্যের টান। তার এই কোথায়-এর উত্তর নিভা দিল না। আবার বলল, যা-না ভাই। হাত-মুখ ধুয়ে আয়। দেখিস না, কাকা অপেক্ষা করছে ? আর নিচে গাড়ি দাঁড়িয়ে। যা।
নিভার কণ্ঠ কান্নাভারী, খানিকটা জড়ানো, একটা আরোপিত খুশির ঢঙে ভঙ্গুর। সব মিলিয়ে এমন যে, লুকিয়ে রাখা বিপন্নতাটুকু কিশোর মনের আয়নাতেও দিব্যি ধরা পড়ল। দিদিকে তাই আর কোনও প্রশ্ন করতে বাধল নিপুর। সবসময়ের মতো নিজের সঙ্গে বিছানাটাকেও নামিয়ে মেঝেতে পা রাখল নিপু। ছোট ছোট পা ফেলে গেল স্নানঘরে। খানিক বাদেই হুসহাস জলপতনের শব্দ। এরপর ভেজা হাত পা মুখ নিয়ে বেরিয়ে এল। স্নানঘরের সামনেই বিছিয়ে রাখা অর্ধচাঁদের আকারের পাপোশে পা রেখে একটা হাল ছেড়ে দেওয়ার ভঙ্গি করল হাত-পা নাচিয়ে। উফ কেন যে মনে থাকে না!
কী ব্যাপার ? বলল ছোটকাকা।
এখানে পা মুছতে মানা। তাকিয়ে নিপুর জবাব।
কেন রে ? পা মুছতে মানা―মানেটা কী ? কী বিষয় ?
তুমি তো জানো না―ভূতের পাপোশ এটা!
ভূতের পাপোশ! সর্বনাশ! কী করে বুঝলি ? কাকার ভয়ার্ত প্রশ্ন।
বাইরে নিয়ে একবার ঝেড়ে এনে রাখো, দেখবে একটু পরেই আবার, আবার ভরে গেছে বালিতে। ভূতের না তো কী। কোন জামাটা পরবো ? শেষ প্রশ্নটা নিভার দিকে তাকিয়ে।
নিভা হাতের আধভেজা তোয়ালেটা নিপুর কাঁধের ওপর রেখে আবার গিয়ে দাঁড়াল কাঠের আলনাটার কাছে। নিপু তোয়ালে চেপে হাত-মুখ মুছে নিতে নিতে নিভা মায়ের শাড়ির সারির পাশ থেকে ভাইয়ের প্রিয় সুতির নীল ফতুয়াটা সভাঁজ বের করে সশব্দে একবার ঝাড়ল। আলনার নিচের দিকে, যেখানে বাবার পাজামা, লুঙ্গি এসব থাকে, সেখান থেকে সাদা একটা পাজামা বের করে ঝাড়া হলো সেটিও। এ সময় শান্ত স্বরে স্বগোতোক্তির মতো বলল দিদি, বৃষ্টির দিন, সব কিছুতেই পিঁপড়া। পরার আগে এভাবে ঝেড়ে নিবি। এরপর কণ্ঠে আরোপিত হলো সুর। সবসময়। স-বসময়। আর ঝাড়বি জুতা। উল্টো করে ঝাড়বি পরার আগে। কেমন তো নিপু ?
পোশাকগুলো বিছানায় রেখে কাছে টেনে নিল নিরুত্তর ভাইকে। শরীরে তোয়ালে পেঁচিয়ে রেখে কৌশলে পরিয়ে দিল ফতুয়া পাজামা দুটোই। তোয়ালেটা নিভা ছাড়ানোর সময় আড়চোখে বারবার ছোটকাকাকে দেখছিল নিপু। ঘোর সন্দেহ তার, বই পড়ার ভান ধরে ছোটকাকা আসলে তার দিকেই তাকিয়ে আছে আড়চোখে। ভাগ্যিস, তোয়ালে তার সম্মান বজায় রেখেই খুলে এসেছে। দিদির হাতেই অভয়। নিজ হাতে ভয়।
দিদি গাল টিপে ধরে চুলটাও আঁচড়ে দিলে এরপর মুক্তি পেল নিপু। এরপর, নিজ চুল আঁচড়াতে থাকল বিছানার কাছে দাঁড়িয়ে। জানালার দিকে মুখ। চৌকাঠ ছাড়িয়ে আরও অনেক দূরে তার দৃষ্টি।
মেঝেতে গড়াচ্ছে বৃষ্টিখেকো চাতকের ছবিটা। তুলে ভাঁজ করে পকেটে ঢোকালো নিপু। মা-কে দেখাবে।
নিচতলার সিঁড়ির শেষ কটা ধাপ এক লাফে নেমে দরজার বাইরে তাকিয়ে নিপুর মুখ ঝলমলিয়ে উঠল। গুটিসুটি মেরে বসে থাকা কোনও বড় বড়সড় খরগোশের মতো একটা বেবি ট্যাক্সি রাস্তায় দাঁড়িয়ে। রংটা আবার বাঘের মতো হলুদ কালোয় মেশানো, যদিও ডোরাকাটা নয়। চালকের আসনে বসা লোকটা ঝাড়ুর শলা ভেঙ্গে চিবোচ্ছিল। নিপুকে দেখে তার মুখের ভেতর শলাকাটার ওঠানামা থেমে গেল। ওদিক সিঁড়িতে জুতার শব্দ তুলে ধীরে ধীরে নিপুর পেছন পেছন নেমে এল নিভা আর সুবীর কাকা। তাদের উপস্থিতি টের পেয়ে চোখে উচ্ছ্বাস আর প্রশ্ন নিয়ে পেছনে তাকাল নিপু। দেখতে পেল, ওদের দুজনার মুখই অন্ধকার হয়ে আছে। কী ব্যাপার ? খানিকটা দমে গেলেও প্রশ্নটা না-করে পারল না। আমরা কি এই বেবি ট্যাক্সিতে যাব ?
হ্যাঁ নিপু। এই বেবিতে যাব আমরা। বললো সুবীর কাকা।
বেবি ট্যাক্সির ভেতর একপাশে দিদি আর আরেক পাশে ছোট কাকাকে রেখে মধ্যখানে আয়েশ করে বসল নিপু। একবার ভাবল পায়ের ওপর পা তুলে দেয়। দিলও। কিন্তু ট্যাক্সিটা চলতে শুরু করতেই ঝাঁকুনির উপর্যুপরি চোটে ওই আসন আর বজায় রাখতে পারল না। নামিয়ে নিয়ে দিদির দিকে তাকাল। শুকনো হাসলো দিদি। আর সঙ্গে সঙ্গে হাসির মতো ভঙ্গি করে মাথা নিচু করে চোখ ঢাকলো হাতে। আসলে সে কাঁদছে। ওটা হাসি নয়, বুঝলো নিপু। কান্নার আগে মুখটা বিকৃত হয়ে উঠেছিল। কান্নার মেঘচাপা শব্দটা বৃষ্টি আর রাস্তার শত কর্কশ শব্দের আড়ালে গেল হারিয়ে। খুব দ্রুতই আবার সামলে উঠল নিভা। চোখ-মুখে সোজা হয়ে বসে আবার তাকাল নিপুর দিকে। বাক্সময় চোখে তাকিয়ে আছে নবীন কিশোর।
কোথায় যাচ্ছি আমরা ? এখনও কিন্তু বলোনি। অনুযোগ নিপুর কণ্ঠে।
ওহহো, তাই তো ভাই! জিভ কেটে হাসলো নিভা। এই হাসিটুকুই নিপু চাইছিল। কিন্তু কীভাবে নিয়ে আসা যায় তা কোনওমতেই বের করতে পারছিল না। নিভা বাইরের দিকে তাকিয়ে আরও একবার চোখের কোণ মুছে বলল, আমরা হাসপাতালে যাচ্ছি নিপু! হাসপাতালে যাচ্ছি আমরা।
মাকে আনতে ? নিপুর প্রশ্ন।
হ্যাঁ ভাইয়া! মাকে আনতে যাচ্ছি আমরা। শেষ দিকে নিভার কণ্ঠ আবারও বিকৃত হয়ে উঠল। বিস্মিত নিপুর মাথার ওপর দিয়ে সুবীর কাকা ওই কাঁধে রাখল হাত। কাঁদিস না নিভা। অন্তত―হঠাৎ কথার ধারা বদলে ফেলে পাশ থেকে জড়িয়ে ধরল নিপুকে। কিরে নিপু ? এই দেখ, এই আমার দিকে তাকা। ওই, শুনতে পাচ্ছিস ? ট্যাক্সির ছাদের ওপর কেমন শব্দ করে বৃষ্টির জল পড়ছে ? শুনতে পেলি ? মনে হচ্ছে না ছোট ছোট অনেকগুলো বাঁদর ? আর হাতে অনেকগুলো ঢাকের কাঠি ? শুনছিস ?
ট্যাক্সির ছাদের ওপর বৃষ্টির বিন্দুছেদি শব্দ অবিরল উৎপন্ন হচ্ছে। ট্যাক্সির স্বচ্ছ কাচের ওপর অবিরাম নড়ছে জল সরানোর ওয়াইপার লাঠি দুটো। চালকের মাথার পেছনের চুলগুলো শামুকখোলের মাথার মতো চক্রাকার। তার কপালের কাছে ঝুলছে একটা আয়তাকার কাচ। তাতে ট্যাক্সির ছাদের বিম্ব। ছাদে পেটানো লোহার বেড়া আর প্লাস্টিকের আবরণের মধ্যকার ফাঁকে একটা গোটানো সংবাদপত্র আটকে রাখা। আয়তাকার কাচে তার ছবি ফুটে উঠেছে। বড় বড় লাল অক্ষরের শিরোনাম, দালাল লেখা একটুখানি অংশ কেবল দেখা যায়।
বৃষ্টির ছাঁট এসে দুপাশ থেকে নিভা আর সুবীর কাকা দু’জনকেই ভিজিয়ে দিচ্ছে। নিপু দুজনের শরীরের উষ্ণতায় আছে বেশ। কাকা নিভাদিকে বলল, ফিতে খুলে প্লাস্টিক নামিয়ে দে নিভা। নয়ত ঠান্ডা লাগবে। একদম ভিজে যাচ্ছি। বলেই আর অপেক্ষা নয়। নিজ অংশের বৃষ্টিরোধক প্লাস্টিকের ফিতে খুলতে লেগে গেল। নিপু তাকিয়ে দেখছিল। মনে হলো, এরচেয়ে কঠিন কাজ আর নাই। ফিরে নিপুর দিকেও একবার তাকাল গিঁট খুলতে ব্যর্থ কাকা। নিপুর ভর্ৎসনামাখা দৃষ্টি দেখে বলল, হয়েছে কি, গতকাল রাতেই নখ কাটলাম। নখ অবশ্য রাতে কাটতে হয় না, তাও কাটলাম। সময় পাই না তো! যেটা হয়েছে, হ্যাঁ―চেষ্টা তখনও অবিরত―নখটা বেশি কাটা পড়ে যাওয়ায় গিঁট খুলতে ব্যথা পাচ্ছি আঙ্গুলে, বুঝলে কাক্কু ? এটাই হয়েছে সমস্যা। নইলে―ঠিক এই সময়ে গিঁট খুলে গেল। আবরণ নেমে পড়তেই এবার আরেকবার গিঁট বাঁধার ঝক্কি। দ্বিতীয়টা ছোটকা ভালোই সামলালো। অপরদিকে দিদির কাপড়জামার একপাশ ভিজে সেঁটে আছে। সেদিকে ওর নজর নাই। একদৃষ্টি তাকিয়ে আছে সামনে। ছোটকাকার ডাকে কোনও সাড়া সে তখনও দেয়নি। ছোটকা নিপুর কোলের ওপর দিয়ে ঝুঁকে নিভার মাথার কাছে প্লাস্টিকের গিঁট খুলতে শুরু করল। তখনও খুব শান্তভাবে যেন মাটিতে অবতরণ করল নিভাদি। একবার ছোটকার দিকে, আরেকবার তার চঞ্চল হাতের দিকে তাকিয়ে বুঝতে চেষ্টা করল কী ঘটছে। এরপর নিজেই হাত লাগালো। তখন সোজা হলো ছোটকা। তখন নিপুও নিঃশ্বাস ফেলতে পারল।
ফিতে লাগানোর পর বাতাস ঢুকে পালের মতো ফুলে উঠতে থাকল ওই বৃষ্টিরোধক। দণ্ডে বাঁধা পাশ-ফিতায় পড়ছিল টান। নিপু ভাবছিল ফিতেগুলো একবার খুলে যেতে পারলে কিন্তু বেশ হয়।
বেবি ট্যাক্সিটা দেখতে দেখতে বিরাট এক ফটকের সামনে এসে থামল। নিপু বুঝতে পারল না, আগে থেকেই কী করে খবর পেয়ে তাদের অপেক্ষায় দিব্যি দাঁড়িয়ে আছে বাবা ? বাবার চোখ- মুখ আগের চেয়ে অনেক বেশি ফোলা ফোলা লাগছে। চুলও এলোমেলো। পরনের হলদে শার্টটার হাতা বরাবরের মতোই গুটিয়ে কনুইয়ের ওপর তোলা। নিচের সাদা পায়জামাও সভাঁজ গোড়ালির ওপর; অবশ্য, এটা বরাবরের মতো নয়। চামড়ার কালো স্যান্ডেল জোড়া বৃষ্টিতে ভিজে নতুনের মতো চকচকে দেখাচ্ছে। পা জোড়া অল্প ফাঁক করে পায়ের পাতা দুটো গাছের দ্বিখণ্ডিত শাখার মতো কোণে রাখা। ট্যাক্সিটা এসে যখন থামলো, চালকের সামনের ওই অর্ধস্বচ্ছ কাচের ভেতর দিয়ে এর ভেতরটা একবার দেখতে চাইলো বাবা। ছোট কাকা যেদিকে বসেছিল, সেদিকটা পড়েছিল বাবার দিকে। একপাশের প্লাস্টিকের পর্দাটা সরাতেই বাবা ঝটিতে তাকে একবার দেখলো শুধু। পরমুহূর্তে ট্যাক্সির অপর পাশে তার দৃষ্টি চলে গেল। ওপাশ দিয়ে নিভা নেমে এসেছে। জলকাদা মাড়িয়ে ওরা দুজন ছুটে গেল দুজনের দিকে। জড়িয়ে ধরার আগমুহূর্তে একবার পরস্পরকে দেখে নিল ওরা।
নিভাদি ছোট্টবেলার মতো বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ল বাবার। আর বাবাও সবটুকু মমতায় গাঢ় আলিঙ্গনে বাঁধল মেয়েকে। পাশে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে বৃষ্টিতে ভিজতে থাকল ছোটকাকা। নিভা একসময় বাবার বুক থেকে মুখ তুললে, তাকে এক হাতে ধরে রেখে অপর হাতে কাকাকে কাছে টেনে জিজ্ঞেস করল বাবা, নিপুকে আনিসনি ? কার কাছে ও ?
কাকা যেন একটা ঘোরের মধ্যে ছিল। ঠিক ওই মুহূর্তে কেটে গেল ঘোর। বলল, নিপু এসেছে তো! ওই তো, ওই―বলে ট্যাক্সির সবুজ পর্দাটা উঁচিয়ে ভেতরটা দেখাল বাবাকে। ওই তো ও। কিরে নিপু ? ভেতরে বসে থাকবি ? নামবি না ?
এতটাক্ষণ কেউ এসে কেন তাকে ডাকছে না, এই অভিমানে নড়েনি নিপু। এবার তার ওই অভিমান চড়ে উঠল আরও। ছোটকাকার মুখের দিকে একবার মাত্র তাকিয়ে অভিমানী চোখজোড়া সামনে ফেরাল আবার। ছোটকাকা মাথা বের করে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বাবাকে কিছু একটা বলে থাকবে। নিভার কপালে চুমু খেয়ে এরপর বাবাই এগিয়ে এল ট্যাক্সির কাছে। পর্দাটা সরিয়ে দেখতে পেল, তার দিকে নিপুর ভ্রƒক্ষেপ নাই বটে, কিন্তু মনটা যে পড়ে আছে তা স্পষ্ট। বাবা ট্যাক্সির ভেতর খানিকটা ঢুকে যেই ধরতে হাত বাড়াল, নিপু গেল সরে। সরে গেল, কিন্তু দৃষ্টিপথটা বদলালো না। বেরিয়ে এসে নিভার দিকে তাকিয়ে উদ্বগ্ন চোখে বাবা বলল, নিপুকে বলেছিস কিছু ? মায়ের কথা ?
না বাবা। নিভার সংক্ষিপ্ত উত্তর।
নিচের ঠোঁট কামড়ে আরও কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে ভাবল বাবা। এরপর আবার পর্দাটা সরিয়ে মুখটা ভেতরে নিয়ে ডাকল ছেলেকে। নিপু ? রাগ করেছ বাবা ? রাগ করে না। এস, আমার কাছে এস। তোমাকে কত আদর করি না আমি ? এস। মায়ের কাছে যাবে না নিপু ?
এত সব কথা শুনেও নিপু নড়ল না। তবে ভিজলো কিছুটা। এরপর আবার তার দিকে হাত বাড়াতে আর সরে গেল না। ধরা দিল। বাবা নিপুকে কোলে তুলে বুকে চেপে এগিয়ে চলল বড় ফটকের দিকে। ফটকটা পেরিয়ে ভেজা প্রশস্ত হাঁটাপথ ধরে সোজা চলল। সামনে হাসপাতালের মূল ভবন। বিশাল ভবনটার কেচিমুখো দরজার সামনে এসে দাঁড়াল কিছুক্ষণ। পেছন থেকে ওরা এসে তার পাশে দাঁড়ানোর পর ভেতরে বাড়াল পা। পুলিশি পোশাক পরিহিত ক্ষুব্ধ চেহারার কিছু মানুষ ওখানে পাহারায় ছিল। এগিয়ে এসে বাবার মুখটা দেখতে পেয়ে ওরা সরে গেল। একজন মাথাটা নাড়ল ওপর-নিচ। এটুকুতেই বাবাকে নিয়ে নিপুর গর্ব হলো খুব।
হাসপাতালের নিচতলায় অসংখ্য শুয়ে বসে থাকা মানুষ। আর তাদের ভেতর দিয়ে পথ করে আসা-যাওয়া করতে থাকা আরও সব মানুষের ছোঁয়াচ বাঁচিয়ে দোতলায় ওঠার সিঁড়ির দিকে এগোল ওরা। নিপু ঘাড় ঘুরিয়ে মেঝের মানুষগুলো দেখে নিল, ওটুকু সময়ে যতটা দেখা চলে। দেয়ালে ঠেস দিয়ে বা মেঝেতে পিঠ এলিয়ে শুয়ে থাকা মানুষগুলোর চোখগুলো ভীষণ প্রাণহীন, ভেজা, অস্বচ্ছ। সারা দেহে রাজ্যের সমস্ত মানুষের ক্লান্তি এসে বুঝি ওদের শরীরে ভর করেছে। হাত-পা নাড়ছে ওরা এতই ধীরে, যেন হাওয়ায় ব্যথা দিচ্ছে ওদের এবং ওরা তা সইতে প্রস্তুত নয়। প্রতি মুহূর্তে ওদের কাছে এসে এসে থামছে বুকখোলা সাদা ঢোলা এপ্রন পরা সুন্দর সব ছেলে আর মেয়ে। কারও ঘাড়ে ঝোলানো স্টেথিস্কোপ, কারও বা এপ্রনের পকেটে। ওরা এসে থামলে শুয়ে বসা লোকগুলোর কেউ কেউ সম্ভ্রমে উঠে বসার চেষ্টা করছিল। তখন ওই তরুণ তরুণীরা আবার ধরে শুইয়ে দিচ্ছিল তাদের। কারও চোখে ফুটে উঠছিল গাঢ় কৃতজ্ঞতা। কারও কারও চোখে অস্বস্তি, উপেক্ষা। শুয়ে বসে আর চলাচল করতে থাকা মানুষ ছাড়াও আরও এক ধরনের মানুষের বিচ্ছিন্ন সব সারি ওখানে। ওই একেকটা সারি মেনে ওরা এগোচ্ছে একেকটা আলো ঝলমলে ঘরের দিকে। ওসব ঘরে রোগীদের ওপর নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানোর টাকা জমা নেওয়া হচ্ছিল। আর ওই সমস্ত পরীক্ষার ফল ইতোমধ্যে পাওয়া হয়ে গিয়ে থাকলে বিরাট এক খামে করে তা তুলে দেওয়া হচ্ছিল রোগীর স্বজনদের হাতে। বিরাট ঘরটায় সবাই সবার সঙ্গে কথা বলছিল। কারও কথা আলাদা করে বোঝার কোনও উপায় ছিল না। সবার স্বর একত্র হয়ে একটামাত্র মন্দ্রধ্বনি গোটা ঘরে অনুরণিত হচ্ছিল কেবল।
এসব দেখতে দেখতে, শুনতে শুনতে, বাবার কোলে তরঙ্গিত হতে হতে নিপু পৌঁছে গেল সিঁড়ির কাছে। ভেবেছিল এই জায়গায় এসে বাবা তাকে কোল থেকে নামিয়ে দেবে। মনে মনে এটাও দেখে ফেলেছিল নিপু―এক সিঁড়ি টপকে পরের সিঁড়িতে সে পা রাখছে, বাবা আর ছোটকাকার মতো। ওরা যা পারে, তা কি আর সে পারে না! শুধু করার দেরি। দেখা স্বপ্নে পড়ল ভঙ্গ। বাবা তাকে না নামিয়ে সিঁড়ি ভেঙ্গে অবলীলায় ওপরে উঠতে শুরু করল। আর এই দৃশ্যটা নিপুর চোখে গাঁথা হয়ে থাকল। পেছন পেছন আসতে থাকল ছোটকাকা আর নিভাদি।
ছোট্ট একটা মোড় নিয়ে দ্বিতীয় দফার সিঁড়ি ভেঙ্গে উঠে আসার পথে নিপু আরও অনেক আত্মীয়স্বজনকে দেখতে পেল। বাবাকে ফের দেখতে পেয়ে কেঁপে কেঁপে উঠে দাঁড়িয়ে সবল আহাজারিতে বাতাস অচল করে তুলল ওরা। ওদের সিঁড়ি ভাঙ্গা শেষ হলে, দূরের নিবিড় পরিচর্যা ঘরের কেচিমুখো দরজার সামনে থেকে ছুটে এল বড় মাসি। তার চোখ দুটো ভীষণ রকম ফোলা। নাকের ডগা লাল হয়ে আছে। বাবার কোল থেকে মাসি একরকম ছিনিয়ে নিল নিপুকে। নিঃশব্দ কান্নার ঢল কোন বাঁধে এতোটাক্ষণ জমে ছিল কে বলবে। নিপুকে বুকে নিয়ে ওই বাঁধ তার ভেঙ্গে গেল। মাসিপিসিদের ভেতর চলতে থাকল কোলবদল। নিভাকেও একে একে সবাই জড়িয়ে ধরছে, আউড়ে চলেছে যত স্মৃতিবাক্য।
এত কিছুর ভেতর নিবিড় পরিচর্যা ঘরের কেচিমুখো দরজার কাছে দাঁড়ানো নিরাপত্তারক্ষী লোকটি কাঁচুমাচু মুখে একটা কিছু বলতে ভিড়ের দিকে এগিয়ে পিছিয়ে যাচ্ছিল আবার। যেন বাধা পাচ্ছিল অদৃশ্য কোনও দেয়ালে। মাথাটা তার ঠুকে যাচ্ছিল বারবার। অবশেষে একটা কোনও ভরসা পাওয়ার মতো মুখ খুঁজতে লেগে গেল তার চোখ এবং পেয়ে গেল বাবা আর ছোটকাকাকে। বাবা তখন একটা থামের সঙ্গে মাথা ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে। নিরাপত্তারক্ষীর দিকে তাই ছোটকাই এগিয়ে গেল।
লোকটা বলল, আসলে স্যার, কী বলব, নিজেরও তো খারাপ লাগে। মানে, এটা তো আইসিইউ, বুঝতেই পারেন। ভেতরে জটিল সব রোগী আছে। কাঁদলে তাদের কষ্ট বাড়ে। বাড়ে না বলেন ? এখন, কী করব বুঝতে পারছি না। একজন মারা গেছে, শোক তো হবেই। স্বজনেরা শোক তো করবেই, করবে না! সরে যেতে কীভাবে বলি। কিন্তু আবার না বলেও যে পারছি না স্যার। আমার অবস্থাটা একবার ভাবেন ?
সুবীর কাকা হাত তুলে বলল, চিন্তা করবেন না। সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছি ওদের। আপনি আপনার দায়িত্ব করছেন।
লোকটা হাতজোড় করে বলল, অনেক ধন্যবাদ স্যার। মনে কষ্ট নেবেন না স্যার। আমি নিরুপায়। কিন্তু চাকরি করি, কী করব বলেন। ভেতরে রোগীরা সারাক্ষণ ভয় পায়। সবারই তো আপনজন আছে। আমিও তো মরব স্যার একদিন। মরব না ?
দিদির কাছাকাছি দাঁড়িয়ে নিপু দেখল, কাকা ওই পুলিশ রকমের লোকটার কাঁধে হাত রেখে আরও কী যেন বলল। এরপর ঘুরে দাঁড়িয়ে মাসিপিসিদের ভিড়ে এসে মাথা নুইয়ে দু হাত পাখির ডানার মতো মেলে ধরে সবাইকে খানিকটা দূরে সরে যেতে ইশারা করল। অনেকেই তার সংকেতটা বুঝতে পারল না। তখন বলল, এটা আইসিইউ তো, ভেতরে আরও অনেক রোগী। চলো, আমরা একটু দূরে যাই। আরও একটু দূরে। চলো চলো!
উপস্থিত অন্যান্য রোগীর আত্মীয়-স্বজনেরা ছোট কাকার দিকে খুব আগ্রহ আর প্রশান্তি নিয়ে তাকিয়ে থাকল। কেউ কেউ তার কাছাকাছি এসে মুখটা দেখে গেল একবার। ছোট কাকাও কেমন চিবুক উঁচিয়ে চলল। কারও দিকে একবার ফিরেও তাকাল না। কিন্তু চোখের কোণ দিয়ে ঠিকই লক্ষ করে গেল সবাইকে। কান্নার রোল নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র থেকে এভাবে সরে গেল খানিকটা। কিন্তু তার তীব্রতা কমে আসার কোনও লক্ষণ দেখা গেল না। সবার বিলাপের ভাষায় নিপু অনেক আগেই বুঝে গেছে, মা বড় ঘুম ঘুমিয়েছে। বাহ্যত কোনও ভাবান্তরই যেন হলো না তার। সবল বাহু এক পিসির কোলে থাকতে থাকতে ঘেমে নেয়ে গিয়েছিল নিপু। নামতে পেরে তাবৎ কোল থেকে বাঁচতে এক দৌড়ে একটা মোটা থামের আড়ালে লুকিয়ে গুপ্তচরের চোখে খুঁজে বের করতে চাইলো নিভাকে। এ সময় একটা হাত তার ফতুয়ার পকেটে, ছবিটার ওপর চলে গেল। ওটা আছে তো ?
নিপু দেখল, বাবা একজন বয়েসী ডাক্তারের সঙ্গে শান্ত মুখ করে খুব আলাপ করছে। থেকে থেকে মুখটা ছাদের দিকে তুলে ভাবছে কী সব। পরমুহূর্তে নিচের দিকে তাকিয়ে কী সবের যেন ফিরিস্তি দিচ্ছে। ডাক্তারের চোখে চশমা, তাতে ছাদের টিউববাতির ঝিলিক। পায়ে তার কালো চকচকে জুতা। ওই জুতোর পাশে বাবার জল শুকানো মলিন স্যান্ডেলজোড়া কেমন অসহায়।
মাকে দেখতে এসে নিপুর রাত গভীরে হাসপাতালের করিডোরের টানা বেঞ্চিতে বসে দিদির কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ার উপক্রম। ঘুমটা জমাট হওয়ার আগে শুনতে পেল, গভীর রাত, তাও আবার ঝড়ঝঞ্ঝার; অ্যাম্বুলেন্স অনেক ভাড়া হাঁকছে। অত ভাড়া দেওয়ার সামর্থ্য এ মুহূর্তে বাবার যেমন নেই, তেমন নেই আর কারও। চিকিৎসার ব্যয়ভার মেটাতে বরং ধার করতে হয়েছে প্রচুর। সুতরাং নিরুপায় সিদ্ধান্ত, রাতটা মা-কে হাসপাতালেই রাখা হবে। তবে এর জন্যে কার যেন হাত-পা ধরার ব্যাপার আছে। কে যেন কার হাতে-পায়ে ধরলও। তবে নিছক হাত-পা ধরে হয়নি কাজটা। হাতের ভেতর বড় মেসোর অনেক কাগজ গুঁজে দিতে হয়েছে বলে প্রকাশ। তো যাক, রাতের জন্য মৃতের তীর্থতুল্য শীতলঘরে মায়ের থাকার একটা ব্যবস্থা তো হলো!
এসব শুনতে শুনতে নিপু স্বপ্ন দেখতে থাকল, বাবা ওই চকচকে জুতার লোকটার হাতজোড়া ধরে অনেক অনুনয়-বিনয় করছে। লোকটা ঘন ঘন মাথা নাড়ছে দু পাশে, যেন কিছু একটায় একমত নয়। বাবা ঝুঁকে লোকটার পা জোড়া জড়িয়ে ধরতে চাইলে লোকটা চট করে সরে গেল কিছুদূর। এরপর মাটি থেকে এক হাত উঁচুতে উঠে উড়তে থাকল, যেন তার ডানা আছে। এরপর শত শত লোকের ভিড়ে মিশে গেল ডাক্তার, বাবা, সবাই। জমাট সেই ভিড়ের ভেতর মানুষকে ঠেলে জায়গা করে নিয়ে এগিয়ে চলল এপ্রন পরা তরুণ-তরুণীরা, কী সুন্দর তারা দেখতে একেকজন। একসময় ঘুরতে ঘুরতে একে অপরকে হারিয়ে ফেলল তারাও। চারদিকে দেখা গেল মানুষের অগণিত পা, আর ওপরে তাকালেই অজস্র নাকের ফুটো। সেই সব ফুটো দিয়ে বেরিয়ে আছে বড় বড় লোম। হঠাৎ দেখল, একটা সবুজ খোলা মাঠে বাবার পেছন পেছন দৌড়াচ্ছে নিপু। আর মাটি থেকে এক হাত ওপরে তাদের সঙ্গে সঙ্গে উড়ে চলেছে চকচকে জুতার ডাক্তার।
বাবা দৌড়াতে দৌড়াতে চিৎকার করে উঠছে লোকটার দিকে তাকিয়ে, শুনুন! শুনুন! আমার কাছে অনেক টাকা আছে। অনেক টাকা। এই যে! এই যে ভাই!
বাবার কণ্ঠটা যেন বহুদূর থেকে আসতে আসতে প্রতিধ্বনিত হতে হতে একসময় পথটা ভুলে হারিয়ে গেল। এরপর কোথায় যে আরও কী কী হতে থাকল কিছুরই কোনও আগপাশতলা থাকল না। একসময় আপনা থেকেই নিপুর চোখজোড়া গেল খুলে। দেখল, চারপাশ আলো করে দিদির কোলের ওপর সকাল হয়ে আছে। তখনও তিন দিকে ছড়িয়ে যার যার মতো ঘুমোচ্ছে সবাই। দিদির চোখজোড়া কেবল খোলা, রক্তাভ। আশপাশে কোথাও বাবা বা ছোটকাকে দেখা গেল না।
খানিক বাদে, পাউরুটি কামড়ে ছিঁড়ে মুখে নিয়ে দাঁতে কলা কেটে এরপর একসঙ্গে চিবোতে চিবোতে বাবার পাশে পাশে হেঁটে হাসপাতালের ফটকের দিকে এগোতে থাকল নিপু। সকালে ওঠার সময়ও আকাশ ছিল ঝলমলে, কিন্তু দেখতে দেখতে কালো হয়ে আসছে আবার। ফটকের কাছে আরও কিছুক্ষণ দাঁড়াতে দাঁড়াতেই ঠান্ডা বাতাস আসা শুরু হলো। দূরে কোথাও বৃষ্টি চলছে, বাতাসে ওজোন নেমে গেছে। দেখতে দেখতে আকাশটা ওখানে আরও কালো হয়ে উঠল। তাদের দেখতে পেয়ে, একটা বেবি ট্যাক্সি রাস্তার ওপারের কাঁঠাল গাছের তলটা ছেড়ে সড়কদ্বীপের একটা ফাঁক ধরে এল এগিয়ে। কাছে এসে দাঁড়াতেই নিপু দেখল, চালকের আসনে ঝাঁটার শলা ভেঙ্গে চিবোনো গতকালের লোকটাই।
দেখতে দেখতে কাকাও চলে এল কোথা থেকে। এরপর বাবার সঙ্গে গম্ভীর মুখে জুড়ে দিল আলাপ। ট্যাক্সিচালক ভাবলেশহীন মুখে তাদের আলাপরত মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল পুরোটা সময়। এরপর বাবা এল নিপুর কাছে।
নিপু, আমরা এই বেবিট্যাক্সিতে চড়ে তোমার নানুবাড়ি যাব। পারবে না বাবা ?
কল্পনাতীত আকস্মিক এমন সৌভাগ্যযোগে মুখে খাবার নিয়ে নিপু বাক্যহারা। ডাগর চোখগুলো আরও বড় হয়ে উঠেছে বিস্ময়ে। একবার ট্যাক্সিটার দিকে, আরেকবার বাবার মুখের দিকে তাকাতে থাকল পরপর। ট্যাক্সিওয়ালাও ভুরু দুটো নাচিয়ে মাথা দোলাতে থাকল তার আনন্দটুকু টের পেয়ে। ছোটকাকা হেসে তাকে দেখিয়ে বাবাকে বলল, মানে, পাগল একটা।
বাবা আর কাকা এরপর আবারও গম্ভীর আলাপে পড়ল ঢুকে। আবার সেই টাকা আর টাকা। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গাড়ি, কাঠ, মাঠ, মাটি, অন্ত্যেষ্টি, শ্রাদ্ধের আলাপ আর পুরোহিত। সেখান থেকে আলাপ আবার টাকায় গড়ালো। এরপর আবার গাড়ি, কাঠ, মাঠ, মাটি, অন্ত্যেষ্টি, শ্রাদ্ধের আলাপ এবং পুরোহিত। এভাবে একটা অনিঃশেষ চক্র বুঝিবা চালিত হয়ে গেছে। নিপু ওই চক্রের বাইরে দাঁড়িয়ে কেবল দেখতে থাকল, শুনতে থাকল, আর তার ছোট্ট মাথাটা বাঁই বাঁই ঘুরতে থাকল। এমন সময়, লালকালিতে উল্টা করে অ্যাম্বুলেন্স লেখা একটা সাদা গাড়ি এসে থামল ওদের সামনে। ফুটপাথের ওপর দাঁড়িয়ে থাকার কারণে গাড়ির জানালা দিয়ে নিপু একটা কাঠের আয়তাকার বাকশো দেখতে পেল, সাদাও নয় আবার ঠিক হলুদও নয়। আর দেখতে পেল, তার ওপর একটা হাত রেখে পাশে তার দিদি বসে আছে। গাড়ির একদিকের পুরোটা জুড়ে রাখা ওই বাকসো। বাকি তিনদিকেই জড়ো হয়ে বসেছে দুই মাসি, এক পিসি, আর―আর মাসির ছেলে বিভব।
বিভব কখন এলি ?
শুনতে পেল না বিভব। নিপুর দিকে একবার তাকিয়েই আবার মাথা নিচু করল। বুঝি আর কথা বলবে না। নিভা আর বিভব ছাড়া বাকিরা ঘন ঘন চোখ মুছছে। হঠাৎ জানালার বাইরে তাকিয়ে নিপুকে দেখতে পেল নিভা। মুখে মৃদু হাসি ফুটল তার। এরপর নিপুকে ডাকল হাতছানি দিয়ে। নিপু ধীর পায়ে কাছে গিয়ে দাঁড়ালে বলল, যাবি আমার সঙ্গে ? মাকে নিয়ে যাব আমরা। যাবি ?
নিপু নিচু গলায় বলল, আমি তো বেবি ট্যাক্সিতে যাব!
শুনে নিভা হেসে ফেলল। আচ্ছা বেশ তো। তুই তাহলে বেবি ট্যাক্সিতে চড়েই যা। আমি গাড়িতে করে মাকে নিয়ে যাই।
মায়ের মরদেহের সঙ্গে যেতে চেয়েছিল নিভা, কিন্তু নিষেধ করল বাবা। বলল, এই গাড়িতে থেকো না তুমি, না না, এই গাড়িতে তুমি থেকো না। তুমি বরং নিপুকে দেখো মা! আমিই যাব তোমার মায়ের সঙ্গে। অনেক ঝামেলা হতে পারে পথে! ওসব ঠেকাতে আমার থাকাটা দরকার। আর নিপুকে দেখার মতো তোমার ওপর ছাড়া আর কার ওপর এখন ভরসা করব আমি, বলো ? কথা শোনো ? লক্ষ্মী মেয়ে না আমার ? চোখ মুছে অ্যাম্বুলেন্স থেকে নেমে ট্যাক্সিতে উঠে নিপুকে জড়িয়ে বসল নিভা। নিপু, নিভা আর ছায়া মাসি। সামনে চালকের পাশে জায়গা করে নিয়ে বসল সুবীর কাকা। ছায়া মাসি ভীষণ স্থূলকায়া হওয়ায় খানিকটা চাপাচাপি। মাসি একবার নিপুকে নরম সুরে বলল, নিপু, আমার কোলে উঠবে তুমি ? বা তোমার দিদির ?
নিপু বলল, না। আমি তো সিটে বসে যাব।
মাসি এবার নিরস্ত। আচ্ছা বেশ, সিটে বসেই যাও।
ট্যাক্সি চলতে শুরু করার সঙ্গে বৃষ্টির কোনও যোগ নিশ্চয়ই আছে। গতদিনের মতো আজও গাড়িটা চলতে শুরু করামাত্র ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামলো। ট্যাক্সির প্লাস্টিকের ছাদে শব্দ হতে থাকল মজার, পট পট পট পট! আর এঞ্জিন একটানা শব্দ করতে থাকল, কিট কিট কিট কিট! গর গর গর গর! বৃষ্টিতে সামনের কাচটা ঝাপসা হয়ে আসতে থাকল ঘন ঘন। আর কালো ওয়াইপার দুটো হেলেদুলে নাচতে থাকল অবিরাম। থেকে থেকে রাস্তার একেকটা খানাখন্দে পড়ে লাফিয়ে উঠছিল ট্যাক্সিটা। সঙ্গে সঙ্গে চড়া-মৃদু আর্তনাদ তুলছিল সবাই, শুধু নিপুই অবিচল। কণ্ঠে কোনও কাতরধ্বনি নাই। তার মতো বীর আর দুটো হয় নাকি! এদিকে তার ট্যাক্সিটাও বীরোচিতভাবে একটার পর একটা অন্য ট্যাক্সি আর মিনিবাসকে পেরিয়ে চলেছে। কী আনন্দ! এমন সময়ে তাদের ট্যাক্সিটাকে হুশ করে পেরিয়ে গেল সাদা অ্যাম্বুলেন্স। সামনের বাম্পারের সঙ্গে একটা ধাতব লাঠিতে বাঁধা পড়ে উড়ছে একটা সাদা পতাকা, বৃষ্টির জলে তার জমিন কিছুটা ভারী। ওড়ায় টান নেই। অ্যাম্বুলেন্সটাকে এগিয়ে যেতে দেখে নিপুর দুঃখ হলো, বাবার সঙ্গে যদি থাকা যেত ওই গাড়িতে! এ সময় সামনে গতিরোধক পড়ায় অ্যাম্বুলেন্সের গতি কমে এল খানিকটা। তখন ট্যাক্সিটা কাছাকাছি চলে আসায় মনে আবার আশা জেগে উঠল নিপুর। হয়ত পেরোতে পারবে। কিছুক্ষণ গাড়িতে গাড়িতে টেক্কা আর হারজিতে মেতে থেকে নিপু এবার তাকাল পথের দুপাশে গাছের দিকে। ঝড়ে মাতাল বৃষ্টিতে ভেজা গাছগুলোর কাণ্ড কী কালো আর পাতাগুলো কী সবুজ! অর্ধস্বচ্ছ কাচের মধ্য দিয়ে দেখে মন ভরছিল না। এদিকে দিদি কিংবা পিসির পাশ থেকে সবুজ প্লাস্টিকের পর্দাটাও সরানোর উপায় নেই। এভাবে কিছুক্ষণ যেতেই প্রকৃতি বোধহয় খানিকটা প্রসন্ন হলো নিপুর ওপর। ঢাকার উত্তরপ্রান্তে আসতে আসতে বৃষ্টি খানিকটা ধরে এল। সরিয়ে দেওয়া হলো পর্দা। পথের দু পাশে গাছের ঘনত্ব এখন বেড়েছে আরও। একসময় তা এতই বেড়ে গেল যে সবুজের পেছনে সবুজ, মাটিতে সবুজ, আকাশে সবুজ; দেখে নিপুর মনে হলো গাড়িটা বুঝি জঙ্গলের ভেতর দিয়ে পথ করে এগোচ্ছে। থেকে থেকে পথের ওপর পড়ে থাকছে ছোট বড় গাছের ডাল। দিনের আলোয় গতিরোধকের কাজ করছে ওসব। একসময় বন হালকা হয়ে এল, দু পাশে ক্রমে বাড়ল ধূসর সাদা বেলে মাটি। এরপর স্ফীতজল তুরাগ নদ পড়ল সামনে। ফেরির জন্য ওদের কিছুটা সময় অপেক্ষা করতে হলো। দেখা গেল অপেক্ষমাণ বাহনের ভিড়ে সাদা অ্যাম্বুলেন্সটাও আছে।
ট্যাক্সি থেকে নেমে খোলা হাওয়ায় কিছুক্ষণ হাত-পা খেলিয়ে নিল নিভা আর নিপু। সুবীর কাকা চলে গেল কাছের এক টঙ দোকানের আড়ালে।
এ সময় নিপুর হাত আবার গিয়ে পড়ল পকেটে তার ছবিটার ওপর। এত হুল্লোড়ের ভেতর কখন যেন দুমড়ে গেছে ওটা। তাতে অবশ্য ছবিটা বুঝতে মায়ের সমস্যা হওয়ার কথা নয়। আর সমস্যা যদি হয়েও থাকে, সে তো থাকছেই বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য।
নদ পেরিয়ে আবার আগের মতো যার যার গাড়িতে চাপলো সবাই। আরও নিবিড় কিন্তু আলোকিত ভাওয়াল গড়ের শালবন পেরোলো এবার ওরা। শালবনের ভেতর দিয়ে ইট বিছানো পথ ধরে ঝাঁকুনি খেতে খেতে গাছগাছালি, ঘাস ঝোপ ঝাড়, এসবের ফাঁকে ফাঁকে শাপলায় ভরা রুপালি সব সরোবর পেরিয়ে অবশেষে একটা গ্রামের কাঁচা রাস্তায় উঠে এল গাড়ি। মাটির বুকে ভারী গাড়ির চাকার দাগ পড়ে আছে। দেখিয়ে মাসি বলল, তোদের মা কেমন আমাদের আগে চলে গেছে।
দেখতে দেখতে নিবিড় গাছপালার ফাঁকে চিরচেনা প্রাঙ্গণ মাটির দোতলা বাড়িটার কাছে চলে এল নিপুরা। প্রাঙ্গণের বাইরে, যাওয়া-আসার সরু মেটে রাস্তার একপাশে এক টুকরা জায়গা নিয়ে কচুশাকের কোমল সবুজ ক্ষেত। অপর পাশে বিরাট এক কদমগাছ। টিয়েসবুজ মখমলের জমিন নিয়ে পাতার ডালাগুলো বাতাসে এপাশ-ওপাশ করছে কেবল। তার পাশ ঘেঁষে নরম মাটিতে চাকা দাবিয়ে থেমে গেল বেবি ট্যাক্সিটা। মাথার ওপর কদমের ডালি নাড়াতে থাকল হাওয়া। নেমে বাড়ির দিকে এগোতে থাকল মাসি। নিভা আসছে না দেখে পেছন ফিরে বলল, এস নিভা!
নিভা সঙ্কোচে দাঁড়িয়ে থাকল দেখে মাসিও পড়ল দাঁড়িয়ে। কাছে এসে নিভার পিঠে হাত রাখল। প্রাঙ্গণের অপর পাশে সাদা অ্যাম্বুলেন্সটা দাঁড়িয়ে। রুপালি মাটির ওপর এনে রাখা হয়েছে আয়তাকার কফিন। স্বজন সজ্জন প্রতিবেশীরা যেন শেষবারের মতো দেখতে পারে মুখ, তাই ওপরের ডালাটা খানিকটা সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। দেখতে এসে সবাই দাঁতে আঁচল কাটছে, বিকৃত হয়ে উঠছে চোখ মুখ, কেউ আর সরছে না। পুরনো সখী, শিক্ষয়িত্রী, গুরুমা আর ধর্মবোনের ভিড়ে জট এতে ক্রমেই জমাট হতে থাকল।
সুরভীকাঠি জ¦লল, বহু স্তোত্র পাঠ হলো। একসময় সারি বেঁধে বসে নিরামিষ খেয়ে নিল আগতরা। নিভা ছাড়া কেউ বাদ যায়নি। বেলা গড়ালো বিকেলের দিকে।
নারীদের রেখে কেবল পুরুষসমেত শ্মশানের দিকে চলল দুটো গাড়ি। বৃষ্টি থেমে গেছে, সজাগ স্নাত ঝোপালো সবুজ শ্মশান। ঢোকার মুখের তোরণ ক্ষয়িষ্ণু, লেখার ওপর সবুজ শ্যাওলার স্তর পড়েছে। ভেতরে আকাশের দিকে চিত হয়ে শুয়ে এক রুপালি জলাশয়। চারধারের স্বল্পজল ফুঁড়ে মাথা তুলে আছে সবুজ ঘাস। আর চারপাশ ঘিরে আছে বড় বড় গাছেরা। একটা লটকনের গাছ বুদ্বুদের মতো অসংখ্য লটকনে ভরে আছে। জলাশয়ের এক কোণে লাল ইটের এক কালীমন্দির। নিম্নাঙ্গে কেবল এক টুকরা নোংরা কাপড় জড়িয়ে সিঁড়ির ওপর পা ছড়িয়ে বসে আছে ছোট্ট এক ছেলে, হাতে মিছরির বড় দানা। একেকবার জিভ ছুঁইয়ে তাকাচ্ছে ওদের দিকে, চোখ বুলিয়ে নিচ্ছে ওপর-নিচ। খুব ভালো করে একবার নিপুকে লক্ষ করে কী যেন বলে উঠল; বুঝি গালমন্দ কোনও। নিপু চোখ ফিরিয়ে নিল সঙ্গে সঙ্গে। ফিরে তাকাল আবার। একই সঙ্গে অভিযানের আনন্দঘন এবং আনন্দজর্জর দীর্ঘ সময় কাটলো এরপর। বহুক্ষণ শ্মশানময় ঘুরে বেড়াল নিপু। কত কিছুই যে চোখে এল তার। দেখল শ্মশানে ছোট্ট একটা কুঁড়েঘর বানিয়ে থাকে জনা পাঁচেকের এক পরিবার। তাদের চেহারাগুলো বেশ অদ্ভুত রকমের। একটা চোখ বড় তো আরেকটা ছোট, নাকের সামনের অংশ বেশ মোটা। ছেলেগুলোর হাতের হাড় বেশ চওড়া, যেন অনেক শক্তি ধরে। মেয়েদের বাহু মাংসল। বাড়ির বাইরে মোড়া পেতে এরা নিজেদের ভেতর গল্প করা ছাড়া আর কারও সঙ্গে কথা বলে না। নিপু আরও দেখতে পেল একটা প্রশস্ত লাল মেঝের থান, মাথার ওপরে শনের ছাউনি পাতা। ছাউনির ওপর ছায়া ফেলে রেখেছে বয়েসী অশ্বত্থ। অশ্বত্থের সুচমুখো গোলাকার পাতা বাতাসে কেঁপে কেঁপে দোলে। বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকা যায় না, ঘাড় ব্যথা হয়ে যায়। থানের এক কোণে গুটিসুটি হয়ে বসে আছে এক সাধু। কপালে, দু চোখের পাশে আর পেটে তার অগণিত ভাঁজ। নিম্নাঙ্গে লাল কৌপিন জড়ানো তার। কালোয় সাদায় মেশানো লম্বা চুল, দাড়ি। চুলে চূড়ো খোঁপা বেঁধে রাখা। আর তলপেট অবধি নেমে আসা দাড়ির পেছনে তারা গলার বিচিত্র সব মালা পড়ে চোখে। নিপু সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই চোখ বুজে রাখা সাধুর পিঙ্গল চোখজোড়া গেল খুলে। তাড়াতাড়ি সটকে পড়ল ভীত বালক। এগোতে এগোতে বিশেষ এক জায়গায় পৌঁছুল অবশেষে নিপু। সেখানে ছোট ছোট মন্দিরের মতো বেশ কিছু কাঠামো, ভেতরটা ফাঁকা। ফাঁকা জায়গাটায় ঘাসের ভেতর থেকে মাথা তুলে রেখেছে পেটসমান উঁচু নামফলক। গোটা ফলকজুড়ে শ্যাওলার স্তর এমনভাবে পড়েছে যে নামগুলো পড়ার আর উপায় থাকেনি। অনেক বড় বড় ঘাস এ জায়গাটায়। দুটো লাল রঙ্গনের গাছ দেখে মুগ্ধ হয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকতে হলো তাকে। কিন্তু এক্ষেত্রেও, খানিক বাদে ঘাড় নামিয়ে ফিরে আসতে হলো।
চারদিকে ঘুরে যখন দাহ করার ভিটার কাছে এসেছে, দেখে চিতা সাজানো হয়ে গেছে। মোটা মোটা গাছের গুঁড়ি লম্বায় আড়ে সাজিয়ে যেনতেনভাবে একটা বিছানা তৈরি করা হয়েছে যেন, তোষকবিহীন। নিচে খানিকটা দূরে মায়ের দেহটা একটা সাদা কাপড়ে আগাগোড়া মুড়িয়ে নামিয়ে রাখা।
মায়ের শরীরটা ওই নিষ্ঠুর-দেখতে বিছানার ওপর শুইয়ে দেওয়া হলো। আর তখন ফতুয়ার পকেটে ফের হাতটা রাখল নিপু। ওটা কি আর দেওয়া হবে না ? মা তো ঘুমাচ্ছে কেবল। ঘুমটা ভেঙ্গে দিলেই হয় ? তারপর মা দেখুক, ভুটকো চাতক ঠোঁট হা করে আস্ত আস্ত সব মেঘ গিলে খাচ্ছে। দেখে কী অবাকই না হয়ে যাবে মা। বলবে, বাহ, আমাদের নিপু কী সুন্দর আঁকতে শিখিছে! শিখবে না ? ও যে আমার ছেলে। আমার হীরের টুকরা ছেলে। তারপর ওই যে প্রায়ই যা বলতো আরও ? নিপু একদিন অনেক বড় শিল্পী হবে। অনেক বড়। এই, তোমরা কেউ ওকে কিছু বলবে না! আমার নিপু পড়বেও না, লিখবেও না। ও শুধু ছবি আঁকবে। বুঝেছ ? পারবে তোমরা ? পারবে এমন আঁকতে ? পারবে এমন হাতি, পুতুল, হাতপাখা আর বাঘ আঁকতে ? পারবে এত সুন্দর সব হাত-পাওয়ালা পাখি আঁকতে ? এই যে মেঘ খাওয়া চাতক! কী কল্পনা রে বাবা! এ কি একজনমে হয় ? হয় না। কে এসেছে এটা ? আমার পেটে কে এসেছ তুমি ? মনে হয় তোমাকে আমি চিনি! মনে হয় তোমাকে আমি আর জনমে পূজা দিয়েছিলাম! কী, তাই না ? তারপর ? পারবে এমন পাহাড় ঝরনা হরিণ ? কী নিভা ? পারবি আঁকতে ?
না মা!
কিরে বিভা! স্বাক্ষর ? পারবি তোরা ?
না মাসিমা!
না মাসিমা! নিপুর মতোন কী আর পারি!
অজান্তেই নিপু একবার হেসে উঠল মায়ের বলা এত সব বার্তাকথার স্মৃতিশান্তি করে। মায়ের এসব কথা শুনে শুধু তারই নয়, যারাই থাকত আশপাশে, সবার হাসতে হাসতে গালে ব্যথা ধরে যেত। গোটা পরিবার এক হলে সবাই উৎফুল্ল থাকত বেশ, এ ধরনের আলাপ-সালাপ তখনই হতো বেশি। হাসতে হাসতে বাবা বলত, মায়া, সত্যিই তোমার তুলনা হয় না।
পীত রোগী মায়া বহুদিন ছিল বিছানায়। তাই তার সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার মতো সূক্ষ্ম অনুভূতি থেকে শুরু করে বাহ্যিক আচরণ―সবই ওই শুয়ে থাকার সঙ্গে সবার খাপ খাইয়ে নিতে হয়েছিল। এই যেমন, এমন একটা অনুরাগরসসিক্ত আলাপ-প্রলাপের পর, নিপু খাটের বাইরে দাঁড়িয়ে থেকে মায়ের নরম পেটে কেবল মাথাটা রেখে শিরশায়া হয়ে থাকত। ওর সরু হাত দুটো বিছানার প্রান্তে অদ্ভুতভাবে ঝুলে থাকত তখন। তবু এভাবে থাকাটা তার যেমন প্রিয় ছিল, তেমনই প্রিয় ছিল মায়ের। তবে ধড়ের ভরের একটা বড় অংশ তখন পেটের ওপর এসে পড়ত বলে মা খুব বেশি সময় তা সহ্য করতে পারত না। একসময় বলে উঠত, ওঠ বাবা ওঠ, এখন ব্যথা পাচ্ছি, তখনই কেবল মাথা তুলত নিপু।
তো যে মা তার ছবির এত বড় সমঝদার, সে কি আর উঠবে না ? আচ্ছা, একটা পিঁপড়া কামড় দিলে তো মাকে উঠতেই হবে, তাই না ? পিঁপড়ার কামড়ের পর কি আর ঘুমিয়ে থাকা যায় ? যায় না তো। একটা লাল পিঁপড়া। ওহ, পিঁপড়াগুলো সব বাসায় পড়ে আছে। কোনওভাবে একটা যদি মাকে এখন দিতো ধরে কামড়ে, আর দেখতে হতো না। কোনওভাবেই মা ঘুম ভেঙ্গে না তাকিয়ে পারত না।
ভাবতে ভাবতে নিপু কখন যেন শুইয়ে রাখা মায়ের খুব কাছে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। তার হাতে ভাঁজ করে রাখা সেই ছবি। ছবির ভাঁজের সূক্ষ্ম ডগায় তখন পা আঁকড়ে মাথা বের করে রেখেছে এক লাল বিষ পিঁপড়া। নিপু কিন্তু তখনও তা দেখেনি। ছবিটা মায়ের বুকের কাছে রাখল। রাখতেই পিঁপড়াটা যখন মরদেহ জড়ানো কাপড়ের ওপর নেমে পড়ল, মুহূর্তের জন্যে ওটাকে দেখতে পেল নিপু। দেখেই চেঁচিয়ে উঠল, দিদি! বাবা! ব্যাপারটা যদিও কেমন হলো, তবু মা এবার জেগে উঠবে। এবার ঠিক ঠিক জেগে উঠবে।
পিঁপড়াটা ততক্ষণে একটা ভাঁজের আড়ালে ফাঁক পেয়ে সেঁধিয়ে গেল আরও ভেতরে। আর নিপুর চোখের আয়নায় মা যেন একবার নড়ে উঠল! ততক্ষণে পাশে এসে দাঁড়িয়ে পিঠ জড়িয়ে কাঁধে হাত রাখা বাবাকে সাক্ষী মানতে চাইলো নিপু। কিন্তু বাবার চোখের একমত হওয়ার কোনও চিহ্নই ফুটল না। বাবা যেন ব্যাপারটা লক্ষ্যই করেনি, গুরুত্বই দেয়নি কোনও। বাবা মলিন হেসে নিপুকে আরও খানিকটা কাছে টানল। ওই হাসিটা দেখে নিপু স্পষ্ট বুঝে গেল, বাবা তাকে বিশ্বাস করেনি। কিন্তু এটা কী করে হতে পারে ? কী করে হতে পারে যে বাবা তাকে বিশ্বাস করল না! এ পর্যন্ত এমন কোন কথাটা আছে যে সে বলেছে আর বাবা অবিশ্বাস করেছে ? কোনওদিন তো এমন হয়নি ? তাহলে আজই কেন এমন হতে যাবে ?
বাবা নিপুকে আদর করে বলল, নিপু, বাবা, একটু পেছনে এস। তোমার কাজ আছে।
একটা কাঠের দণ্ডের মাথায় আগুন ধরিয়ে বাবার দিকে এগিয়ে দিল কেউ। কেঁপে উঠল নিপু। যেন অন্তর্তন্তুতে বয়ে নিয়ে আসা কোনও অতীত স্মৃতির গ্রন্থিতে পড়ল দাঁত। নিভাদি কোথায়, নিভাদি ? নিপুর সমস্ত কাজের ভাবনার চিরটাকাল বিশ্বস্ত সঙ্গী নিভা সেদিনই তার পাশে ছিল না। নিপু অস্থির হয়ে চারপাশে নিভাকে খুঁজে বেড়াল। বিড়বিড় করে ডাকতে থাকল, দিদি! দিদি!
বাবা তাকে টেনে নিল কাছে। নিপু শরীর মুচড়ে বেরিয়ে যেতে চাইলো। প্রথমবারের মতো তার চোখে এল জল। ঝটিতে তাকাল মায়ের দিকে। মনে হলো, আরও একবার বুঝি নড়ে উঠেছে মা। কিন্তু তার কথা বিশ্বাস করবে না কেউ।
তোমাকে মুখে আগুন দিতে হবে বাবা, শান্ত কণ্ঠে বাবা বলল।
না! নিপু একপিণ্ড ভেজা ক্রোধ ছুড়ে দিয়ে কাঁধ থেকে বাবার হাতটা সরিয়ে দিল। আবার বলে উঠল, না! ভেজা কণ্ঠটা উঠে দাঁড়াত পারছে না আর। মা তবে সত্যিই আর উঠছে না। চোখের সামনে সচেতন অভিজ্ঞতায় পাওয়া এই তার প্রথম মৃত্যু। না এর ফল জানে, না এর শোক বোঝে। হাহা-শূন্য অনুভবের আদিম স্মৃতি প্রাণের তন্তুতে বিজড়িত এবং স্মৃতি হিসেবে নয়, সংকেত হিসেবে। শৈশবে অনভিজ্ঞতা এ সংকেত অনুবাদ করতে পারে না, বার্ধক্যে অভ্যাসে বিবশ মন অনুনাদ গ্রহণে ক্রমশ অক্ষম হয়ে পড়ে। তবু এর সামনে দাঁড়িয়ে পাওয়া বিপুলা অসহায়ত্বের বোধ প্রাণির অনুভবে অব্যক্ত জ্ঞানের মতো ধরা দেবেই। যে পশু-শিশু কখনও মৃত্যু দেখেনি, যূপকাষ্ঠের দিকে বা বধ্যভূমির দিকে তাকে নিয়ে যাওয়ার কালে মাটিতে খুর দাবিয়ে সেও দুর্বল প্রতিরোধ গড়ে। নিপুর দূর শৈশবে নিভা যখন প্রায়ই তার পাশে অসাড় হয়ে পড়ে থাকত কপট মৃত্যুর অভিনয়ে, আধো বোলে দিদিকে ডেকে সাড়া না পেয়ে নিপু কি হঠাৎ ঠোঁট উল্টে বুকের গভীর অঞ্চল থেকে কেঁদে ওঠেনি ? ক্ষুধার কান্না থেমেছে, আঘাতের কান্নাও, কিন্তু সেই কান্না নয়, অথবা থামলেও বহুক্ষণ রেশ থেকে গেছে। কেন ?
ছবি আঁকা কাগজটা রেখেই মায়ের শরীরের ওপর আড়াআড়ি শুকনো কাঠের গুঁড়ি বসানো হতে থাকল। একটা সহজভেদ্য খাঁচার মতো তৈরি হলো। বাতাস খেলে গেল তার ভেতর। ভাঁজ করা কাগজটা বাতাসে উড়ে গিয়ে একটা কাঠখণ্ডে আটকে গেল। এরপর আরও কাঠের টুকরা লম্বি, পাশশোয়া করে দেওয়া হতে থাকল। ভেতরটাও হয়ে উঠল এমন এক কারাগার, কারও পক্ষেই আর বেরোনোর উপায় থাকল না।
বিকেল শেষ প্রায়। আকাশে ও চিতায় আগুন একসঙ্গে জ¦লে উঠেছে। ছবি আঁকা কাগজটাকে নিপু কোথাও দেখতে পেল না। পুড়ছে, নাকি উড়ে গেছে ?
সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ



