আর্কাইভগল্প

গল্প : কেউ একজন অপেক্ষায় : মাহরীন ফেরদৌস

মিসেস উইলসন একটা নরম রুমাল দিয়ে নিজের চশমার কাচ মুছতে মুছতে বললেন, ‘তোমার হাতে কতক্ষণ সময় আছে সেলিনা ?’

‘এই ধরো ঘণ্টাদুয়েক।’

‘এই সময়ের মাঝে কি তোমার কথাগুলো বলা শেষ হবে ?’

‘মনে হয় হবে।’

সত্তর বছরের মিসেস উইলসন আমার এই কথা শুনে নিজের ভাঁজ পরা চামড়ায় মৃদু আলোড়ন তুলে নিঃশব্দে হাসলেন। তারপর পুরু কাচের চশমাটা পরে আমার চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে শান্ত স্বরে বললেন, ‘ঠিক আছে। তাহলে শুরু করো।’ 

দূরে গির্জার ঘণ্টার শব্দ আসছে। আমি সেই ঘণ্টার শব্দ শেষ হবার অপেক্ষা করলাম। তারপর, এই শহরের সবচেয়ে অভিজ্ঞ মনোবিদ মিসেস উইলসনকে শান্ত স্বরে বলতে শুরু করলাম বছর কয়েক আগের কাহিনি, ‘আমি ভেবেছিলাম আমার সবচেয়ে বড় যুদ্ধটা ছিল গাড়ি অ্যাক্সিডেন্টের পর সুস্থ হয়ে ফিরে আসার। কিন্তু আমি ভুল ছিলাম। তখনও বুঝতে পারিনি যে দুর্ঘটনাটা কিছুই ছিল না। আমার আসল পরীক্ষা শুরু হয়েছিল বাড়ি এসে পৌঁছানোর পর। আজ বেশ কিছু বছর পর যখন আমি পিছন ফিরে তাকাই, আমার বুকের ভেতরে একটা হিমশীতল বাতাস বয়ে যায়। সেই বাতাসের সঙ্গে আমি ভেসে চলে যাই সেই সময়ে। যখন পৃথিবী হয়ে ছিল অস্থির। মৃত্যুসংবাদে জর্জরিত। সে সময় চব্বিশ ঘণ্টা গৃহবন্দি ছিলাম আমরা দুজন মানুষ। অথচ দুজনের কথা বলার মতো কোনও বিষয়বস্তু খুঁজে পাওয়া যেত না। এক রাতে তাই একগুঁয়ের মতো চিৎকার করতে করতে আমি আরেফিনকে বলেছিলাম, ‘আমি এভাবে এই সম্পর্কে থাকতে পারব না। তোমার কী হয়েছে বলো।’

উত্তরে ও আনমনে নিজের খসখসে দাঁড়িতে হাতের তালু ঘষতে ঘষতে বিষণ্নসুরে বলেছিল, ‘আমার এই পৃথিবীর কারও সঙ্গে কোনও কথা বলতে ইচ্ছে করে না। আর সব সময় চারপাশ কেমন যেন অদ্ভুত লাগে। ব্যস এটুকুই।’  

‘আমি ফিরে আসার পর থেকে তুমি আমার সঙ্গে একটা দিন ঠিকমতো কথা বলোনি। গত এক মাসে এমন কী হয়েছে ? কেন এভাবে বদলে গিয়েছ ?’

‘কিছুই হয়নি। চিন্তা করো না।’ আবারও একই স্বরে উত্তর দিয়েছিল ও।

ওর গলার স্বরের স্বাভাবিকতা দেখে সেদিন আরও রেগে গিয়েছিলাম আমি। রাগে-ক্ষোভে একগাদা কথা বলে যাচ্ছিলাম। বার বার বলছিলাম বাড়ি ছেড়ে চলে যাব। ও বেশ অনেক সময় ধরে আমার কথাগুলো শুনে যাচ্ছিল চুপচাপ। তারপর একটা সময় খুব নিচু স্বরে বলল, ‘এখানে থাকতে না পারলে, কোথায় চলে যাবে সেলিনা ? বাইরে কিছুই ঠিক নেই। পরিস্থিতি ভয়াবহ। কোনও মানুষেরই কোথাও নিরাপদে যাবার জায়গা নেই। যদি এমন কোনও জায়গা থাকত, আমি তাহলে তোমার কোনও সিদ্ধান্তেই আপত্তি করতাম না।’

ওর এমন সোজাসাপটা উত্তর শুনে আমার মাথায় প্রচণ্ড ব্যথা শুরু হয়ে গিয়েছিল। তার মানে কি এই দাঁড়াল পৃথিবী স্বাভাবিক থাকলে আমাকে ও আসলেই বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে দিত ? কোনও বাধাই দিত না ? আমি মুখ বিকৃত করে দু হাতে শক্ত করে আমার কপাল ধরে বসেছিলাম অনেকক্ষণ। কিন্তু তাতেও ওর মধ্যে কোনও বিকার কাজ করেনি।

‘তোমার স্বামী তোমার সঙ্গে নিজে থেকে এরপর কোনও কথা বলেছিল ?’ মিসেস উইলসন ইলেকট্রিক কেটলিতে পানি বসিয়ে প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন আমার দিকে। তাঁর কিচেন কাউন্টারের পাশে মস্ত বড় ট্র্যাশবিন। এরপর পাশেই কাউন্টারের ওপর একটা বেতের ঝুড়ি রাখা। তাতে নানা রকমের চায়ের প্যাকেট। কেটলি অন করে দিয়ে আমাকে চোখের ইশারায় জিজ্ঞেস করলেন চা পান করতে চাই কি না। আমি মাথা নেড়ে না করে দিলাম। তারপর একটা ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে বললাম, ‘সেই রাতের পর বেশ কিছুদিন কোনও কথাই বলেনি।’

‘সে কি তখন অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করত ? মানে ফোনে কথা বলত ? মেসেজ দিত ? নিজের বাসায় কিংবা বন্ধুবান্ধদের ?’  

‘অতোটা খেয়াল আমি নিজেও করিনি আসলে। অভিমানে, ক্ষোভে আমি বেশির ভাগ সময় কাটাতাম আমাদের গেস্ট রুমে। খুব কমই আসতাম ওর সামনে। তবে হ্যাঁ, ওর অফিসের দু-একজন কলিগের সঙ্গে কথা বলতে শুনেছি। যাদের সঙ্গে ওর এক-দেড় মাস আগেও তেমন কোনও যোগাযোগ ছিল না।’

‘ইন্টারেস্টিং! সে সময়ে তোমার স্বামী তার নিজের পরিবার, পুরোনো বন্ধু ও তোমার সঙ্গে যোগাযোগ কমিয়ে দিয়েছে, অথচ স্বল্প পরিচিত কলিগ কিংবা নতুন কারও সঙ্গে ঠিকই যোগাযোগ করছে। তোমার মনে হয়নি, এটার পেছনে কোনও কারণ থাকতে পারে ? মানে যারাই তাকে বহু আগে থেকে চিনে বা চিনত, বা ওর যে কোনও পরিবর্তন ধরে ফেলার মতো মানুষ, তাদেরকেই সে এড়িয়ে চলেছে। আর যারা ওকে কম চেনে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়েছে।’

এ কথা শুনে একটু যেন চমকে উঠলাম আমি। এমন কিছু তো আগে ভাবিনি। এতই অস্থিরতা নিয়ে দিনগুলো কাটিয়েছি তখন যে ঠান্ডা মাথায় এমন কিছু ভাবার সুযোগ ছিল না।

‘এমন কিছু তখন মাথায় আসেনি। তবে আপনার কথা শুনে এখন মনে হচ্ছে তাই হয়েছিল আসলে। তবে তাদের সঙ্গেও ঘুরে ফিরে কাজের কথা বা পৃথিবীর অস্থিরতার কথাই বলত।’ স্বগতোক্তির মতো বললাম আমি।

‘হুম…’ হালকাভাবে নিজের মাথা নেড়ে নিজেকেই যেন কিছু বোঝালেন মিসেস উইলসন। তারপর এত যত্ন করে চায়ের ঝুড়ি থেকে চায়ের প্যাকেটগুলো বের করে কাউন্টারে রাখতে শুরু করলেন যেন সেগুলো চায়ের প্যাকেট নয়, কোনও ছোট্ট বিড়ালছানা।    

‘তারপর হঠাৎ একদিন ও বলল, ‘চলো একটা সিনেমা দেখি।’ সত্যি বলতে ওর এই একটা কথা শুনে আমি মনে মনে খুশি হয়ে গিয়েছিলাম। এক মুহূর্তের জন্য ভুলে গিয়েছিলাম বাইরের অসুস্থ পৃথিবী আর আমাদের গৃহবন্দি জীবনের কথা। আমাদের দাম্পত্য জীবনের ফেলে আসা সুখের দিনগুলোর মতো কিছু স্ন্যাকস নিয়ে লিভিং রুমে রাখা মস্ত বড় টেলিভিশনের সামনে বসে গিয়েছিলাম সিনেমা দেখতে। তবে, মিনিট পনেরো পরেই বুঝে গিয়েছিলাম আসল বিষয়টা। ও আমাকে নিয়ে সিনেমা দেখতে বসেছে যেন রুপালি পর্দার দিকে তাকিয়ে সময়গুলো কেটে যায়। যাতে, আমরা একে অন্যের জীবনে নাক না গলিয়ে পাশাপাশি থাকতে পারি। যাতে আমাদের মধ্যে অন্য কোনও কিছু নিয়ে মান-অভিমান বা কটুবাক্য বিনিময় না হয়। বেশ অভিনব আইডিয়া, তাই না ?’

‘অবশ্যই। এতে করে ওর তোমার সঙ্গে সরাসরি সময় কাটানো না হলেও একসঙ্গে কিছু সময় পাশাপাশি থাকা হচ্ছে। ফলে, তুমিও অভিযোগ করতে পারবে না যে ও দুজনের মাঝে দেয়াল তুলেছে।’

‘আমি অভিযোগ না তুললেও, সিনেমা দেখার পেছনের কারণটুকু আবিষ্কার করার পর আমি প্রচণ্ড ভেঙ্গে পড়েছিলাম ভেতরে-ভেতরে। মনে হচ্ছিল আমার আপন কেউ আমাকে বোকা বানাল। নতুন কোনও উপায়ে প্রতারণা করল আমার সঙ্গে। আমি কি এতই অবুঝ ? তা তো না। তাই আমি বহু কষ্টে, দাঁতে দাঁত চেপে, বার বার ঢোক গিলে নিজেকে শান্ত করে সিনেমা দেখা শুরু করলাম। আর আমাদের দুজনের মাঝে সেদিন থেকে আরেকটা বিচিত্র সম্পর্ক শুরু হলো।’     

২. 

এরপর থেকে পরস্পরকে সহ্য করার জন্য আমরা নিয়মিত সিনেমা চালিয়ে রাখতাম। প্রতিদিন কয়েকটি করে সিনেমা দেখা শুরু হলো আমাদের। কখনও বাংলা সিনেমা, কখনও ইংরেজি, ফ্রেঞ্চ, টার্কিশ, কোরিয়ান কোনও ভাষা বা জঁরার সিনেমা দেখাই বাদ গেল না। প্রতিদিন চার থেকে পাঁচটা সিনেমা দেখা হতো। প্রথম দিকে আমি এমন একটি বিচিত্র স্তরে ছিলাম যেখানে সিনেমায় কারও দুঃখ দেখলেই আমার মনের ভেতরে অসম্ভব দুঃখ কাজ করত। কিন্তু তাদের সুখ দেখলে আমার ভালোলাগা বা আনন্দ কাজ করত না।

একমাত্র সিনেমার চরিত্রগুলোর দুঃখের সঙ্গেই আমি নিজেকে মেলাতে পারতাম। আর অনুভব করতাম যে আমি ভেতরে-ভেতরে অসম্ভব দুঃখী। এতটাই দুঃখী যে আমাকে হয়তো কোনওদিনই আর কোনও সুখ স্পর্শ করতে পারবে না। এর কিছুদিন পর আবিষ্কার করলাম, সিনেমার কাহিনিও আমার মাথায় ঢুকছে না। পাশে বসে থাকা মানুষটার দিকে এক পলকও না তাকিয়ে স্রেফ একটা জম্বির মতো বসে আছি স্ক্রিনের সামনে। অথচ আমি সুখী হতে চাইতাম, পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের মতোই সুখী হবার একটা আকাক্সক্ষা আমার ছিল। কিন্তু আমার কোনও উপায় জানা ছিল না। আমার জীবনসঙ্গী, যাকে আমি ভালোবেসে বিয়ে করেছি সে কেন নিজেকে একটা অদৃশ্য শক্ত সিন্দুকে আটকে ফেলেছে তা আমি বুঝতে পারছিলাম না। কেন আমরা আলাদা ঘুমাচ্ছি, একই বাসায় থেকেও স্বল্প পরিচিত মানুষের মতো দূরত্ব¡ বজায় রাখছি তাও ছিল না জানা।

এরপর একদিন আমরা একটা সিনেমায় দেখতে পেলাম হতাশাগ্রস্ত এক মেয়ে নিজের জীবনকে শেষ করে দিতে চাইছে। কিন্তু তার আত্মহত্যা করার সাহস নেই। একবারে মৃত্যুর স্বাদ নেবার চেয়ে তাই সে একটু একটু করে মৃত্যুর কাছে যেতে চায়। আবার সে এটাও চায় না যে কেউ টের পেয়ে যাক, সে স্বেচ্ছায় এই পথ বেছে নিয়েছে। তাই সে প্রতিদিন খাবারের সঙ্গে অল্প অল্প করে থ্যালিয়াম খেতে থাকে। এভাবে বেশ কিছুদিন খাবার পর ধীরে ধীরে তার শারীরিক অবস্থা খারাপ হতে শুরু করলে সে মানসিকভাবে আগের চেয়ে ভালো বোধ করতে থাকে। এরপর একদিন গভীর রাতে মেয়েটি বাসা থেকে বের হয়ে যায় আর মাঝ রাস্তায় নেমে আকাশের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বলে, ‘বাঁচতে চাই’। ঠিক তখনই একটা ট্রাক এসে ধাক্কা মেরে চলে যায়। মেয়েটির আর জ্ঞান ফিরে আসে না।   

এই সিনেমা দেখার পর আমার মধ্যে আত্মহত্যা করার ইচ্ছে না জাগলেও নিজেকে আহত করার একটা গোপন ইচ্ছে জেগে ওঠে।

৩.

এরপর এক বিকেলে মূর্তির মতো অনেকক্ষণ বসে থেকে আমি অনুভব করি আমার ভেতরে-ভেতরে ভয়ংকর বিষণ্ন লাগছে এই ভেবে যে, আমি এমন কারও সঙ্গে আছি যে আমার সঙ্গে কথা বলার কোনও প্রসঙ্গ খুঁজে পায় না। এবং তার মনের মাঝে, মস্তিষ্কের ভেতরে কী চিন্তাভাবনা চলে আমিও তা বুঝতে পারি না। শুধু দুজন দুজনকে সহ্য করে যাচ্ছি। এভাবে তো দিনের পর দিন চলতে পারে না তাই না ?

‘এভাবে তোমরা একসঙ্গে কতদিন কাটিয়েছিলে ?’ বৃদ্ধা মিসেস উইলসন জিজ্ঞেস করেন। আমি দেখতে পাই একটা স্বচ্ছ কাপে উনি গরম পানি ঢেলে তাতে এবার কিছু ধূসর রঙের পাতা মেলাচ্ছেন।

‘বছরখানেকের বেশি তো হবেই।’  

‘এতগুলো দিন সহ্য করলে কীভাবে ? ওকে কোনও সাইক্রিয়াটিস্টের কাছে তো নিতে পারতে। কিংবা অনলাইনে কাপল কাউন্সেলিং নেবার কথা ভাবতে পারতে।’

‘চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু কোনও লাভ হয়নি। ওর শারীরিক কোনও অসুস্থতা ছিল না। মানসিক অস্বাভাবিকতা যেটা আমার চোখে পড়েছিল তা অন্য কারও চোখে তেমন পড়েইনি। ও হোম অফিস করত, তাই অফিসেও যেতে হয়নি। প্রফেশনাল কাউন্সিলরের সাহায্য আমি ওকে নিতে বলেছিলাম, তাতে করে পালটা আমাকেই শুনতে হয়েছিল যে আসলে মানসিক সাহায্য আমার প্রয়োজন, ওর নয়।’

‘দেখো, মেয়েরা তাদের কাছের মানুষের সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্ম পরিবর্তনও খুব সহজে টের পায়। যা অন্য অনেকেই ধরতে পারে না। তাই আমার বিশ্বাস তুমি এমন কিছু বুঝতে পেরেছিলে যা তোমাকে অস্বস্তি দিচ্ছিল, সে কারণেই তুমি আরও বেশি অস্থির হয়ে গিয়েছিলে।’

‘হ্যাঁ, তাই হয়েছিল।’

‘যাই হোক, এরপর কী হলো বলো।’

৪.

সেই বিকেলের পর থেকে আমার মধ্যে একটা অদ্ভুত পরিবর্তন আসতে শুরু করল। আমি লক্ষ করলাম, নিজেকে আহত করতে চাওয়ার ইচ্ছার পাশাপাশি, আরেফিনের সঙ্গে কাটানো নিস্তব্ধ সময়গুলো ধীরে ধীরে আমার শরীরের ভেতর একটা অদৃশ্য ক্ষত তৈরি করছে। রাতের বেলা, যখন আমি গেস্ট রুমে একা বসে থাকতাম, তখন মনে হতো, দেওয়ালের ফাটল দিয়ে কেউ যেন আমাকে দেখছে। যখনই আমি নিজেকে আঘাত করতে যাব, তখনই সে লাফিয়ে বেরিয়ে আসবে দেয়ালের অন্য প্রান্ত থেকে। শীতের সন্ধ্যায়, যখন হিটার চালিয়ে বসে থাকতাম, আমার আশপাশের উষ্ণ বাতাস তখন মাঝে মাঝে অস্বাভাবিক ঠান্ডা হয়ে উঠত।

প্রথমে ভাবলাম, এগুলো নিছক কল্পনা। মন-মেজাজ খারাপ থাকলে এরকম হ্যালুসিনেশন হয়। কিন্তু যেদিন অদ্ভুত ঘটনাটা ঘটল, সেদিন আমি বুঝতে পারলাম যে, যা ঘটছে তা শুধু আমার মনের ভুল নয়।

সেদিন রাত প্রায় তিনটা বাজে। আরেফিন লিভিং রুমের সোফায় ঘুমিয়েছিল, আর আমি গেস্ট রুমে। বেডরুমে একসঙ্গে ঘুমানো বা রাত কাটানো কোনও এক অদ্ভুত কারণে আমরা দুজনেই বাদ দিয়েছিলাম। আরেফিন লিভিং রুমের কাউচে রাত কাটিয়ে দিত যেন সেটাই ওর একমাত্র ঠিকানা। সেদিন গভীর রাতে যখন বাইরের বাতাসটা অদ্ভুত এক সাইরেনের মতো শোনাচ্ছিল, জানালার কাচ ছুঁয়ে অল্প অল্প বৃষ্টি পড়ছিল। আমি একা বসে আমার ছোটবেলার ছবির অ্যালবাম দেখছিলাম। যে অ্যালবামটা আমার মা আমাকে উপহার দিয়েছিল। এমন সময় টের পেলাম, হঠাৎ করেই জানালার পর্দা একটু নড়ে উঠল, যেন জানালাটা খোলা ছিল আর কেউ জানালার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে।

আমি ধীর পায়ে উঠে জানালার কাছে গেলাম, বাইরে তাকিয়ে দেখি কিছুই নেই। শুধু বৃষ্টির ছিটেফোঁটা কাচ বেয়ে নিচে পড়ছে। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে যাব, ঠিক তখনই কাচে ধীরে ধীরে একটা হাতের ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠল!

আমার শরীরের লোম দাঁড়িয়ে গেল। এক পা পিছিয়ে আসতেই ঘাড়ের পেছনে কেমন একটা ঠান্ডা শ্বাস অনুভব করলাম, যেন কেউ খুব কাছে দাঁড়িয়ে আছে আমার। 

আমি দৌড়ে দরজা খুলে বাইরে এলাম। পুরো বাসাটা নিস্তব্ধ। আরেফিন ঠিক আগের মতোই সোফায় পড়ে আছে, কোনও নড়াচড়া নেই। কিন্তু কেমন যেন মনে হলো, বাসাটার ভেতর অন্য কেউ আছে! এমন কেউ, যার এখানে থাকার কথা নয়।

আমি নিঃশব্দে লিভিং রুমের এক কোণে দাঁড়িয়ে আরেফিনকে দেখছিলাম। কিছুক্ষণ পর মনে হলো, ওর নিঃশ্বাস খুব ধীর হয়ে এসেছে। আমি এক পা এক পা করে কাছে গিয়ে ওর মুখের দিকে তাকালাম।

আর ঠিক তখনই, ওর চোখ হঠাৎ খুলে গেল!

কিন্তু ওর চোখের চাহনি… এমন চাহনি আমি কখনও দেখিনি। যেন ও আমাকে দেখতে পারছে না। দেখছে অন্য কাউকে। আমার মনে হচ্ছিল, ওর এই অদ্ভুত দৃষ্টির পেছনে আমার চেনা আরেফিন নেই, আছে অন্য কেউ।

আমি পেছনে সরে গেলাম। ওর মুখটা ছিল অনুভূতিহীন, ফ্যাকাশে। কিছু বলার আগেই ও ধীরে ধীরে উঠে বসল, অদ্ভুতভাবে আমার দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর শান্ত স্বরে বলল, ‘সেলিনা, তুমি কি জানো, তোমার পিছনে কে দাঁড়িয়ে আছে ?’

৫.

মিসেস উইলসন একটু নড়েচড়ে বসলেন, যেন বাতাসে একঅদৃশ্য শীতলতার অস্তিত্ব টের পেয়েছেন। আমি অনুভব করলাম, ঘরটায় হঠাৎ এক ধরনের চাপা নীরবতা নেমে এসেছে―যেন কিছু একটা আমাদের চারপাশে নজরদারি করছে।

‘এরপর কী হলো ?’ মিসেস উইলসন ধীরস্বরে বললেন।

আমি শুষ্ক কণ্ঠে বললাম, ‘তারপর, এক রাতে আমি একটা অদ্ভুত জিনিস দেখলাম। জানালার ওপারে ধোঁয়ার মতো এক আবছা অবয়ব। চেহারা বোঝা যায় না। প্রথমে ভেবেছিলাম আলোছায়ার খেলা, কিন্তু পরের রাতেও আমি সেটাকে দেখলাম―কেমন যেন অস্পষ্ট। যেন এক দুর্বোধ্য মুখ আমার দিকে তাকিয়ে আছে, নির্বিকারভাবে।’

মিসেস উইলসনের চোখ সংকুচিত হয়ে গেল। ‘তারপর ?’

‘এরপর থেকে আমি হঠাৎ হঠাৎ শুনতে পেতাম… রাতের গভীরে ফিসফিসানির মতো কিছু শব্দ। শব্দগুলো আমার নাম ধরে ডাকত। সেলিনা… সেলিনা… এমনভাবে যেন কেউ জানালার ওপাশ থেকে আমার করোটির গভীরে আঘাত করতে চাইছে। অদৃশ্য কোনও ছুরি দিয়ে নিপুণভাবে কেটে ফেলতে চাইছে আমার হৃৎপিণ্ড।’

মিসেস উইলসন এবার কাপে চামচ নাড়তে গিয়ে থেমে গেলেন। ‘আর তোমার স্বামী ? সে কি আর কিছু বলেছিল ? কে দাঁড়িয়েছিল তোমার পেছনে ?’

‘সেই রাতে আমি কাউকেই আমার পেছনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখিনি। কিন্তু, আরেফিন যা বলছিল তা পুরোপুরি বিশ্বাস করেই বলছিল। ওর চোখে ভয় ছিল, ছিল দ্বিধা। ভোরের আলো না ফোটা পর্যন্ত সংকুচিত হয়েছিল ও।’

‘এরপর থেকে ও কেবল জানালার দিকে তাকিয়ে থাকত। যেন সে কিছু একটা জানে, কিন্তু আমাকে বলতে চায় না। একদিন আমি যখন ওর দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলাম, উত্তরে ও শুধু বলল―‘সেলিনা, তোমার অনেক কষ্ট হবে। তুমি নিজেকে শক্ত রেখো।’

আমি এ কথা শুনে হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম। ‘আর কী কষ্ট হবে ? আমি কি অলরেডি অনেক কষ্টের মাঝে নেই আরেফিন ?’

ও এই কথার কোনও উত্তর দেয়নি। শুধু উঠে গিয়ে জানালাটা বন্ধ করল। ভারী পর্দা টেনে দিল। কিন্তু পরদিন সকালে জানালাটা আবার হাট করে খোলা পেলাম।’

মিসেস উইলসন দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। ‘তোমার স্বামী কি আগে কখনও এমন অদ্ভুত আচরণ করেছিল ?’

আমি মাথা নাড়লাম। ‘না, কখনও না। সে একসময় প্রাণবন্ত ছিল। উচ্ছ্বল ও আত্মবিশ্বাসী ছিল। কিন্তু আমি হাসপাতাল থেকে ফেরার পর থেকে সে যেন অন্য একজন হয়ে গেছে। আর সেই ছায়াটা আমি জানি না এটা বাস্তব, না কি আমার মনের ভুল।’

মিসেস উইলসন এবার সান্ত্বনার হাসি দিলেন। এরপর বললেন, ‘সবকিছুই বাস্তব, যদি তুমি সেটাকে অনুভব করো। হয়তো এখানে কিছু একটা ছিল, কিছু পুরোনো কিংবা নতুন যা তোমাদের সম্পর্কের ফাঁকফোকর গলে ঢুকে পড়েছে।’

আমার সারা শরীরে ঠান্ডা শিরশিরে অনুভূতি জেগে উঠল। মনে পড়ে গেল ফেলে আসা সেই সময়টার কথা।

যখন দুনিয়াজুড়ে ভাঙচুর, অস্থিরতা। শহরের সীমানা ভেঙে পড়তে শুরু করেছে, এক অজানা অন্ধকারের চাপে। প্রতিদিন অদৃশ্য এই ছায়ার ধাওয়া খেয়ে চলেছি আমি আর আরেফিন। পরস্পরের কাছে আসার বদলে চলে যাচ্ছি আরও দূরে। সবকিছু এমন এক মুহূর্তে এসে দাঁড়িয়েছে―যেখানে অদ্ভুত ঘটনাগুলো, অতিপ্রাকৃতের ইঙ্গিতগুলো, এমনকি আরও কিছু প্রাচীন, আরও ভীতিপ্রদ বিষয়ের গোপন আনাগোনা টের পাচ্ছি আমরা। কিন্তু নিজেদের বাঁচানোর জন্য কিছুই করতে পারছি না। 

মাঝে মাঝে মনে হতো আমাদের বেঁচে থাকার আকাক্সক্ষা শহরের ভেতরেই কোথাও চাপা পড়ে আছে। লোকালয় হয়ে আছে এক জীবন্ত কারাগার। যা শহরের সব বাসিন্দাদেরও বন্দি করে রেখেছিল অদৃশ্যভাবে। তাদের অনুভূতিগুলো, তাদের ভয় এবং সবচেয়ে বড় কথা, তাদের অপ্রকাশিত ইচ্ছেগুলো অদৃশ্য কিছু খেয়ে চলছিল প্রতিনিয়ত। বেঁচে থাকার সংকটের সঙ্গে সঙ্গে বাস্তবতা আর তার নীচে লুকিয়ে থাকা আতঙ্কের সীমারেখা মিলিয়ে দেবার জন্য।   

৬.

‘তারপর ? কী হলো ?’ মিসেস উইলসন নরম সুরে জিজ্ঞেস করলেন আমাকে। আমি একটা লম্বা শ্বাস নিয়ে আবার কথা বলতে শুরু করতে চাইলাম, কিন্তু পারলাম না। মিসেস উইলসনের চা পাতা রাখা ঝুড়ির পাশে থাকা বেশ বড় রুপালি রঙের ট্র্যাশবিনের দিকে আবার চোখ চলে গেল আমার। বিনের গায়ের রুপালি আস্তরণে আমার পাশে কাউচে বসে থাকা যে মানুষের প্রতিবিম্ব দেখা যাচ্ছে, তাকে দেখে আমি আতঙ্কে শিউরে উঠলাম।

প্রচণ্ড এক যন্ত্রণা জেগে উঠল আমার মাঝে। কে বসে আছে এই কাউচে ? একজন মানুষ, কিন্তু পুরোপুরি মানুষ না। জীবিত হয়েও জীবিত না। আগুনে ঝলসে যাওয়া এক মানবীর শরীর। যে হুবহু বসে আছে আমার মতো করে। একই ভঙ্গিতে।

‘এটা কে ?’ ফিসফিসিয়ে প্রশ্ন করলাম আমি। মনে হলো যেন আমার গলার আওয়াজ সাগরের গর্জনের সঙ্গে মিশে গিয়ে প্রায় হারিয়ে যাচ্ছিল। প্রাণপণে আমি সেটা ফিরিয়ে আনছি।

‘কোনটা কে ?’ কিছুটা চিন্তিত মুখে জিজ্ঞেস করলেন মিসেস উইলসন।

‘কাউচে বসে আছে। আমার পাশে। অবিকল আমার ভঙ্গিতে।’ প্রায় না শোনা যাওয়া কণ্ঠে বললাম আমি।

‘কই ? কাউচে তো আর কেউ নেই। তুমি ঠিক আছো তো সেলিনা ?’ মিসেস উইলসন কিছুটা উদ্বিগ্ন হয়ে ঝুঁকে আসেন আমার দিকে।

হঠাৎ আমার মুখে এক অস্বাভাবিক বিষণ্ন হাসি ফুটে ওঠে। আমার কানে কানে যেন কোনও অদৃশ্য সত্তা চিরন্তন কিছু সত্য গুনগুনিয়ে যায়। আমি সব বুঝতে পারি। সব। হাসপাতাল থেকে ফিরে আসার পরই আরেফিন কোনও না কোনওভাবে টের পেয়েছিল আমার জীবনের অন্তিম পরিণতি আমার পিছু নিয়েছে। সম্ভবত, ও বুঝে গিয়েছিল ধ্বংস হয়ে থাকা পৃথিবীর কোনও পুরোনো শহরের মতো আমার শরীরটাও ঝলসে যাবে গনগনে আগুনে কোনও না কোনও দিন। সে কারণে, ভয়ে-আতঙ্কে নিজেকে গুটিয়ে ফেলেছিল। সেই রাতে, গভীর রাতে হয়তো ও আমার পেছনে সেই ঝলসানো শরীরটাকেই দেখেছে। কিন্তু আমাকে কিছুই বলতে পারেনি। আহহা… আমার বুকের গভীর থেকে আরেকটা দীর্ঘশ্বাস নেমে এল সমুদ্রে বয়ে যাওয়া ঝোড়ো বাতাসের মতো।

আমি আবার সেই রুপালি রঙের ট্র্যাশবিনের দিকে তাকালাম। আমার ঝলসানো শরীরটা নিপুণভাবে আমার ভঙ্গিতেই বসে আছে কাউচে। ও কি দীর্ঘশ্বাস ফেলছে নিজের জীবন্ত অবয়বের ভবিষ্যৎ পরিণতির কথা ভেবে ? ও কি বলতে পারবে ঠিক কতদিন পরে আগুনে পুড়ে যাব আমি ? এক বছর নাকি এক মাস পর ? নাকি আজকেই ?

আরেফিনের উসকোখুসকো চুলের চিন্তামগ্ন মুখটা পলকের জন্য ভেসে উঠল আমার চোখে। তারপর এক বিচিত্র নীরবতা নেমে এল ঘরটায়। আমি দেখতে পেলাম, একের পর এক শহর ধীরে ধীরে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। উঁচু উঁচু দালানগুলি গলে যাচ্ছে। এক সময় চকচকে যে রাস্তাগুলো ছিল, সেগুলো অন্ধকারে ঢেকে গেছে। চারিদিকে এক অনিবার্য পতন। কিন্তু, তাতে কী ? এই পৃথিবী তো কখনও পুরোপুরি মরে না। এটি সবসময় নতুন রূপে আবির্ভূত হয়, চক্রবৃদ্ধি প্রক্রিয়ার মতো। সবকিছু শেষ হয়ে যাবার পর কোথাও না কোথাও নিশ্চয়ই আবার নতুন করে শুরু হবে বেঁচে থাকার গান। যেই গানে নিশ্চয়ই প্রাণপণে সাড়া দিয়ে যাবে প্রকৃতি ও প্রাণ।

‘কী হলো সেলিনা ? কথা বলো…’ বহু দূর থেকে ভেসে আসা বাতাসের মতো বলে উঠলেন মিসেস উইলসন। আমি কোনও উত্তর দিলাম না। আমার বুকের ভেতরটুকু ধুকধুক করতে লাগল। বুঝতে পারলাম আমি নিজেই একটি বৃহত্তর, অবিরাম গল্পের অংশ। আর হয়তো এই গল্পটা একসময় ঠিক এভাবে শেষ হবার কথা ছিল।

লক্ষ লক্ষ বছর আগেই নির্ধারিত ছিল এর চূড়ান্ত পরিণতি…

সচিত্রকরণ : রজত

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button