আর্কাইভগল্প

গল্প : আতরের শিশি : ফজলুর রহমান

বনানী ১ নং রোডের দুই ধার দিয়ে যে বস্তিটি গড়ে উঠেছে তার নাম গোডাউন বস্তি। সারাদিন-রাত বস্তিটি মানুষের পদচারণায় মুখর ও সরগরম থাকে। ভাঙ্গাচোরা, এবড়োখেবড়ো রাস্তার দু ধারে বস্তির অশিক্ষিত, ঝগড়াটে নিম্নআয়ের নারী-পুরুষ বিচিত্র ব্যবসার দোকানপাটের পসরা সাজিয়ে বসেছে। এসব দোকানে দিনে পান-বিড়ি থেকে শুরু করে গভীর রাতে কোনও কোনও দোকানে চোলাই মদ,  ফেনসিডিল, গাজা, ইয়াবা, আইসের বিকিকিনি হয়। মাদকদ্রব্যের ব্যবসায় গোপনে লোকচক্ষুর আড়ালে হয়। তাই এসব কেনাবেচার সঙ্গে জড়িত পার্টি গভীর রাতকে এসব কাজের জন্য শ্রেয় মনে করে। শোনা যায় বা বস্তিতে একটা কথা চালু আছে, বড় বড় মালদার পার্টি ও শক্তিশালী মহল এসব মাদক ব্যবসার পৃষ্ঠপোষক। এখানে  কোনও কোনও ঘরে গোপনে পতিতাবৃত্তিও চালু আছে। ১ নং রাস্তাটা দীর্ঘদিন ধরে ভাঙ্গাচোরা। মেরামত করা হয় না। বর্ষায় রাস্তায় খানাখন্দে স্থানে স্থানে নোংরা কালো জল জমে। থিকথিকে কাদা হয়। সমস্ত বস্তি এলাকা জুড়ে তখন পাঁঠার গায়ের গন্ধের মতো একটা বোটকা গন্ধ সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। রাস্তার নিচ দিয়ে বস্তির ভেতরের দিকে ঢুকে যাওয়া অপ্রশস্ত একটা খাল আছে। যুগ যুগ ধরে সে খাল ময়লা-আবর্জনায় ভরা। তার জল এতটা কালো ও দুর্গন্ধযুক্ত যে কেউ সে খালের পাড় দিয়ে গেলে মুখে কাপড় চেপে যায়। খালে জলের প্রবাহ নাই অনেক দিন ধরে। রাস্তা সংস্করণ ও খাল পুনর্খননে সিটি করপোরেশনের তেমন কোনও নজর নেই। অনেক সময় বর্ষায় বস্তিবাসী নিজ উদ্যোগে খালের জলের প্রবাহ ফিরিয়ে আনার জন্য ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার করার চেষ্টা করে কিন্তু সে চেষ্টা খড়ের গাদায় সুচ খোঁজার মতো বৃথা চেষ্টা করা। সবাই মিলে বস্তির লোক জড়ো হয়, খাল থেকে ময়লা আবর্জনা তোলার প্রস্তুতি নেয়। কিছু ময়লা আবর্জনা বা বর্জ্য তোলাও হয়। পূতি দুর্গন্ধে চারপাশের বাতাস ভারী হয়। দুর্গন্ধ সহ্য করতে না পেরে স্ত্রীলোক, ছোট  ছোট বাচ্চারা নাকে হাত চেপে একে অন্যের সঙ্গে কথা বলে। দুর্গন্ধ রোধ করার জন্য খালের দুই পাড়ে ময়লা-আবর্জনার ওপর ব্লিচিং পাউডার ছিটানোয় বৃথা চেষ্টা চলে। এতদিনের জমাকৃত টন টন বর্জ্যরে সঙ্গে পেরে না উঠে এক সময় কর্তব্যে হতদ্যোম হয়ে এরা খালের পাড়ে উঠে আসে। তারপর রাস্তার পাশে পৌরসভার জলের কলে শরীর ধোয়। যাদের ঘরে স্ত্রী আছে সেসব স্ত্রী সন্তানদের দিয়ে সুগন্ধি সাবান পাঠায় গায়ে মাখার জন্য। এইজন্য সাবান পাঠায় যে, খালের জলের দুর্গন্ধ দূর না হলেও তার নিজের পুরুষটির গায়ের কালো জলের দুর্গন্ধ যেন দূর হয়। রাতে পুরুষটি যখন তার নিজস্ব নারীটির শরীরে ঢেউ তুলবে তখন যেন সে কালো জলের দুর্গন্ধ পুরুষটির শরীর থেকে বের হয়ে নারীটির নাকে ধাক্কা না লাগে। সিটি করপোরেশনের লোকেরা এদিকে খুব একটা ঘেঁষে না। রাজনৈতিক নেতা-কর্মীরাও পারতপক্ষে এদিকে পা মাড়ায় না। কেবল পাঁচ বছর অন্তর ভোটের সময় তাদের দরদি কণ্ঠ তারা শুনতে পায়।

বস্তির অধিকাংশ লোক পরশ্রীকাতর ও ঈর্ষাপরায়ণ। অন্যের সুখে থাকা ও ভালো থাকা তাদের সহ্য হয় না। পরনিন্দা ও পরচর্চায় তাদের সুখ। রাস্তার দু পাশে নানা ধরনের দোকান-পাট গড়ে উঠেছে। নিম্নআয়ের খাবারের দোকান অর্থাৎ হোটেল যেমন আছে কিছু, যেগুলি দিন ও রাতের বেলায়ও জমজমাট থাকে, তেমনি আছে সেলুন, পান-বিড়ি চায়ের দোকান, মুদি দোকান, মুচি ও চামড়ার দোকান, গাড়ির পার্টসপত্তর ও যন্ত্রাংশ মেরামত ও ঝালাইয়ের দোকান, রেন্ট-এ কারের দোকান, কাঁচা তরিতরকারি, মুরগি ও গরুর মাংসের দোকান,  ভাংড়ি ও বাঁধাই মাল বেচা-কেনার দোকান, দর্জির দোকান, পুরনো বই ও কাপড় বেচাকেনার দোকান। রাস্তার পশ্চিম পাশে মার্কেটের গা ঘেঁষে আছে খেলার মাঠ। যা স্থানীয়দের কাছে গোডাউন বস্তির মাঠ বলে পরিচিত। রাস্তার এক সাইডে সারিবদ্ধ ভাংড়িমাল কেনা-বেচার দোকানগুলো অপ্রশস্ত দূরত্বে গড়ে উঠেছে। জায়গাটা ভাংড়িপট্টি নামে পরিচিত। এই ভাংড়িপট্টির গা ঘেঁষে সিটি করপোরশনের ময়লার ভাগাড়। ময়লার ড্রাম ট্রাক দিনে-রাতে আসা-যাওয়া করছে। ঢাকা শহরের গুলশান-বনানীর ময়লা এখানে লোড-আনলোড হচ্ছে। দিনে-রাতে কোনও বিরাম নেই। চব্বিশ ঘণ্টা চলছে এই কর্মযজ্ঞ। ময়লার কূট দুর্গন্ধে গোডাউন বস্তির বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। চারিদিকে অস্বাস্থ্যকর, নোংরা পরিবেশে এখানকার মানুষেরা রক্তশূন্য টিকটিকির মতো বেঁচে থাকে। অবসরে ঝগড়া করে। মারামারি, হাতাহাতি, চুলাচুলি করে। তালাক দিয়ে আবার সেই বউকে পুনরায় বিয়েও করে। পরকীয়া করে। অন্যের বউয়ের সঙ্গে গোপনে রাত্রিযাপন করে। প্রকৃতির নিয়মে নারীরা সন্তান জন্ম দেয়। সন্তানের পিতৃপরিচয় নিয়ে এসব নারীকে অত ভাবিত হতে দেখা যায় না। এই  সন্তানেরা বস্তির এই অস্বাস্থ্যকর, অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিবেশ বড় হয়। বড় হয়ে তাদের কেউ টোকাই, কেউ পকেটমার, গুন্ডা, মাস্তান, স্মাগলার, কেউ নারীর দালাল হয়। কেউ রাস্তায় রাস্তায় মদ-গাঁজা খেয়ে নেশা-ভান করে পড়ে থাকে। বিরূপ পৃথিবীতে যে যার পথ বেছে নেয়। বাবা-মার এতে কোনও দায় থাকে না। এসব বখে যাওয়া সন্তানদের বাবা-মার কাছে কোনও দাবি থাকে না। তারা ভেবে নেয় এটাই তাদের নিয়তি। এজন্যই তারা পৃথিবীতে এসেছে। এদেরকে দুনিয়ায় আনার ক্ষেত্রে এদের বাবা-মার জৈব আনন্দটায় মুখ্য। পৃথিবীতে এদেরকে মানুষ করার কোনও দায় তাদের নেই। এসব অনাকাক্সিক্ষত শিশু জন্মের পর থেকে বুঝে যায় এ পৃথিবীতে তাকে একাই চলতে হবে, তার জন্য কেউ গোলাপের গালিচা নিয়ে অপেক্ষায় নাই। যে পাপের মধ্য দিয়ে তাদের জন্ম হয় জনমভর সেই পাপকে এড়িয়ে যেতে পারে না তারা। মাদক, চোরাচালান, পকেটমার, গুম, হত্যা, খুন-খারাবি, নারীপাচার, রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড, জ্বালাও-পোড়াও, সিন্ডিকেট ও দখল বাণিজ্যের মতো নানা অলিখিত অন্ধকার পেশায় তারা জড়িয়ে পড়ে। পশ্চিমে মাঠের কোল ঘেঁষে যে দোকান-পাটগুলি গড়ে উঠেছে তারই এক পাশে চতুর্দিকে কাচ দিয়ে ঘেরা একটা অপ্রশস্ত জায়গা। সেই কাচঘরের ভেতরে রয়েছে খিচুরি বা বিরিয়ানি রান্নার একটা বড় ড্যাগ বা পাত্র। তার উপর আছে একটা প্রশস্ত ঢাকনা। পুরো ড্যাগটা সালু কাপড়ে ঢাকা। সেখানে দিন-রাত আগরবাতি ও মোমবাতি জ্বলে। কাচের গায়ে একটা ছোট ছিদ্র আছে। তা দিয়ে লোকজন ও পথিকেরা টাকা পয়সা ফ্যালে। বস্তিবাসী স্থানটাকে পাগলা বাবার দরগা বা আতর বাবার দরগা বলে। শোনা যায় পাকিস্তান পিরিয়ডে ভারতের আজমির থেকে এক পাগল এসে এখানে আস্তানা গেড়েছিল। একটা কথা এ অঞ্চলের মানুষ ও বস্তিবাসীর কাছে চালু আছে, সেটা হলো তারা শুনেছে বা জেনেছে সে পাগল ছিল আল্লাহর পথের পাগল। তার গা দিয়ে নাকি সব সময় একটা সুগন্ধি আতরের ঘ্রাণ বের হতো। মানুষকে সে আতর উপহার দিত। এতে করে তখন থেকেই এ অঞ্চলে তার কিছু ভক্ত সমর্থক জুটে যায়। এই গোডাউন বস্তির অনেকে আছে যারা আতর বাবার অনুসারী। এই দরগা দেখাশোনার জন্য আইনাল নামে এক যুবক ভক্ত আছে। যে কি না এলাকার ওয়ার্ড কমিশনার ইদ্রিস মিঞার লতায়-পাতায় জড়ানো আত্মীয়। জানা যায় ইদ্রিস মিঞাও এই পাগলা বাবা বা আতর বাবার অনুসারী। এই আতর বাবার নামে প্রতি বছর ১ নং বনানী রোডের গোডাউন বস্তির  পশ্চিমে এই বড় খোলা মাঠে ‘ওরস’ শরিফ হয়, যা বাৎসরিক পাগলা বাবা বা আতর বাবার ওরস শরিফ নামে পরিচিত। ওয়ার্ড কমিশনার ইদ্রিস মিঞা এর সমস্ত আয়োজন দেখভাল করেন। সঙ্গে থাকে আইনাল ও বস্তিবাসীর অনেকে। বস্তিবাসী বছরে ঐদিনটায় একটু ভালো খাবার-দাবারের স্বাদ পায়। পাঁচ-সাতটা গরু জবাই হয়। সহস্রাধিক ডিম সেদ্ধ হয়। বড় বড় ড্যাগচিতে বিরিয়ানি রান্না করা হয়। শসা, গাজরের সালাদ কাটা হয়। বিরিয়ানির প্যাকেট-এর সঙ্গে একটা করে আড়াইশো এমএল-এর পানীয় দেওয়া হয়। জনপ্রতি ১ পিস করে মিষ্টিও দেওয়া হয়। আইনাল গোডাউন বস্তির খুব পরিচিত মুখ। সে বস্তিতে পাগলা বাবার খাদেম বলেই বেশি পরিচিত। দরগার পাশে দুই রুমের একটা বাসা ভাড়া করে সে একা থাকে। সে ব্যাচেলার মানুষ। সারা বছর মানুষের দানের যে টাকা ওঠে সে টাকার সে হিসাব রাখে। ওরসের সময় সেই টাকা ওরসের কাজে লাগানো হয়। শোনা যায় এই ওরস উপলক্ষে ইদ্রিস মিঞা ঢাকার অনেক ধনাঢ্য ব্যক্তি কাছ থেকে বড় ধরনের আর্থিক সাহায্য পেয়ে থাকেন। কারণ ধর্মের নেশা একবার কাউকে ধরিয়ে দিতে পারলে সে নেশায় বুঁদ করে অনেকের কাছ থেকে অনেক দামি জিনিস খসিয়ে নেওয়া যায়। আইনাল বস্তিবাসীর অনেকের কাছে আইনাল পাগলা নামে পরিচিত। তার চাল-চলন, কথাবার্তায় ও জীবন-যাপনে রয়েছে এক রহস্যময়তার ছাপ। তাকে সারাক্ষণ  পায়জামা-পাঞ্জাবি পরিহিত অবস্থায় দেখা যায়। লম্বা গড়ন। ফরসা চেহারা। মাথাভর্তি কালো চুল। চোখে সারাক্ষণ সুরমা লাগানো থাকে। চোখ দুটোর মণি কালো কুচকুচে। উন্নত নাসিকা, চওড়া কাঁধ ও বাবরি চুলে তাকে মুঘল বংশধরদের একজন বলে মনে হয়। বয়স আনুমানিক পঁচিশের কাছাকাছি।

বস্তির মুখরা নারী জবা। তার স্বামী মতি বাস ড্রাইভার। বস্তির সবার সঙ্গে জবা হাসি-তামাশায় মত্ত থাকে। পাগলা বাবার দরগা ঘেঁষে তার পান-বিড়ির দোকান। দোকান সে নিজে চালায়। স্বামী মতি অধিকাংশ সময় বাসায় থাকে না। জবার বিয়ে হয়েছে সাত বছর। কিন্তু কোনও সন্তানাদি নেই। একা জবার সময় কাটে না। বস্তিবাসীর সঙ্গে কারণে-অকারণে কোন্দল করে বেড়ায়। এই জন্য মতি নিজে বউয়ের জন্য দরগার গা ঘেঁষে একটা পান-বিড়ির দোকান করে দিয়েছে। তাদের বাসাও দরগার পিছনে। পশ্চিমে খোলা মাঠের প্রাচীর ঘেঁষে। আইনালের সঙ্গে জবার সম্পর্ক বেশ সরল ও সাবলীল। আইনাল হাকিমপুরী জর্দা দিয়ে নিয়মিত পান খায়। এই পান সে কেনে জবার দোকান থেকে। জবা তাকে পানের খিলি বানিয়ে হাতে তুলে দেয়। একটু লম্বাটে মুখ জবার। চোখ দুটো ঝিনুকের মতো। কালো আঁখিপল্লবের ভেতর মণিটা টলটলে দিঘির ভাসমান জলে যেন ফোঁটা পদ্ম। সস্তা দেশি সুতি বা তাঁতের শাড়ি সে আঁটসাঁট করে পরে। চলনে-বলনে, কথায়-বার্তায়, ইশারায়-চাহনিতে; হাসিতে, কোন্দলে, ঠাট্টা-তামাশায় যেন জবার লুকানো রূপ ভাষা পায়। সে যেন রানি মৌমাছি। তার পান-বিড়ি দোকানের ক্রেতারা মৌমাছির মতো তাকে ঘিরে গুঞ্জন তোলে। তার কালো মেঘের মতো চুলে বুনো যৌবন বাতাস হয়ে ঢেউ খেলে। সে পান বানায়। আর পান-রক্তিম ঠোঁটে গান করতে করতে চোখে মদির নেশার মৌমাত ঘনিয়ে আনে। সে নেশাতুর চোখ তার দোকানের সামনের বেঞ্চেতে বসে থাকা পানের খিলি প্রত্যাশীদের বিভ্রান্ত করে। সে গুনগুন করে গায়―‘সোনার ময়না ঘরে থুইয়া বাইরে তালা লাগাইছে। রসিক আমার প্রাণ বান্ধিয়া পিঞ্জর বানাইছে।’

গান গায় একটা পানের খিলি বানায়, একজন কাস্টমারের হাতে দেয়। দিয়ে ফিক করে হাসি হেসে এক কুহক বিস্তার করে। তার এই ঢলোঢলো আচার-আচরণের জন্য স্বামী মতি মিঞার কাছে সে কত গাল-মন্দ আর মারধোর খায়, তবু তার রং-তামাশায় কোনও ভাটা পড়ে না। স্বামী মতি মিঞা অনেক রাতে ফেরে না। বাসের ট্রিপ থাকে। সে দিনগুলোতে অনেক রাত অবধি জবা পান-বিড়ি বিক্রি করে। দোকানে হৈ-হুল্লোড় আর জবার উচ্চকণ্ঠ শোনা যায়। রাত যত গভীর হয় পানের রস পিয়াসীদের ভিড় বাড়ে ছাড়া কমে না। জবা তাদের যেন কেবল পানের খিলি পরিবেশন করে না, তার সঙ্গে তার অঢেল মদ্য যৌবনসুধা যেন ঢেলে দেয়। যে খিলিপানাসক্ত নয় সেও সে সুধা লাভ করার জন্য জবার হাতের পান খাওয়ার জন্য উদগ্রীব হয়ে ওঠে।

এখন বর্ষাকাল চলছে। বর্ষা শুরু হলে প্রতিবছর গোডাউন বস্তির অপ্রশস্ত খাল বস্তির সকলে মিলে পরিষ্কার করে। যাতে করে রাস্তার ও বস্তির ভিতরের জল খাল দিয়ে গড়িয়ে যেতে পারে। এতে জলাবদ্ধতা কমে। খালটি পরিষ্কার করলে সাময়িকভাবে পানি চলাচল করে। বর্ষার পরে বাকি সারা বছর ওই মজা খাল হয়েই পড়ে থাকে। এবার বর্ষায় গত দুই দিন আগে খালের বর্জ্য পরিষ্কার করেছে বস্তিবাসী। সেই বর্জ্য পরিষ্কার করতে গিয়ে আইনাল খালের বর্জ্যরে ভিতর একটা মাঝারি ধরনের ছিপি আঁটা সাদা কাচের শিশি পেয়েছে। শিশিটা কুড়িয়ে নিয়ে খাল পাড়ে উঠে একটা টিউবওয়েলের পরিষ্কার জলে সেটা ধুয়ে আইনাল দেখতে পায় তার ভেতরে কফিরঙের জলের মিশ্রণ। শিশিটা জলে ধুয়ে সে পাঞ্জাবির পকেট থেকে রুমাল বের করে মুছে উঁচিয়ে ঝাঁকালো। ঝাঁকানোর পরও ভেতরে কফি কালারের জলের মিশ্রণটা একই রকম দেখাল। আইনাল ভাবল এত ময়লা-আবর্জনার মধ্যেও শিশিটা অক্ষত থাকল কী করে। শিশিটার গড়ন দেখে মনে হচ্ছে কোনও বনেদি আমলের শিশি। আতরের শিশির মতো। মুঘল-পাঠান আমলের রাজা-বাদশারা বা আমির-উমরারা এ ধরনের আতরের শিশি ব্যবহার করে থাকতে পারে বলে আইনালের মনে হলো। শিশিটা বর্তমান সময়ের আতরের শিশির মতো নয়। ডিম্বাকৃতির মুখে ছিপি লাগানো আভিজাত্যপূর্ণ শিশিটা দেখে তার আতরের শিশি বলেই মনে হলো। তার মনে একটা চিন্তা খেলে গেল তাহলে কি শিশিটা পাগলা বাবার ব্যবহৃত বা ঐ সময়ে ব্যবহৃত কোনও আতরের শিশি ? সে তৎক্ষণাৎ শিশির মুখের ছিপিটা না খুলে সেটা পকেটে পুরে বাসায় চলে এল। খালের বর্জ্য পরিষ্কাররত বস্তিবাসীরা ভিড়ের মধ্যে আইনালের এই কর্মকাণ্ডকে খেয়াল করল না।

বাসায় ফিরে আইনাল সুগন্ধি সাবান দিয়ে গোসল করে ওজু বানিয়ে বিছানায় বসে শিশিটার ছিপি খুলল। মুহূর্তেই তার ঘর সুবাসিত একটা ঘ্রাণে ভরে উঠল। এমন সুবাস সে জীবনে কোথাও পায়নি। তার কাছে মনে হচ্ছে জান্নাত থেকে কোনও ফেরেস্তা তার ঘরে সুগন্ধি কোনও আতর বয়ে এনেছে। মন-মাতোয়ারা সে ঘ্রাণ। ছিপির সঙ্গে লম্বা একটা আংটা। সেটা দিয়ে সে খানিকটা আতর তুলে নিয়ে শরীরে তার পাঞ্জাবিতে, নাকে, বাম হাতের উপরে লাগাল। তার নাসিকাইন্দ্রিয়, সারা শরীর এক স্বর্গীয় সুগন্ধিতে ভরে উঠল। সে বিমোহিত হলো। কিছুক্ষণ বাকরুদ্ধ হয়ে থম ধরে সে বসে থাকল। তারপর মনে মনে বিশ্বাস করল এই আতর পাগলা বাবার সময়কার আতর। উনার ব্যবহৃত আতরও হতে পারে। স্রষ্টা তার জন্য এটা নেয়ামত স্বরূপ পাঠিয়েছে। খালের বর্জ্যরে মধ্যে যা এতদিন লুকানো অবস্থায় ছিল। সে তো কখনও খাল পরিষ্কার করতে যায় না। আজ কেন গেল ? আর কেনই বা তার হাতে এই স্বর্গীয় আতরের শিশি এসে পড়ল ? এই সব কিছুই ইশারা। তার গায়েবি প্রত্যাদেশ। সাত দিন গড়িয়ে যাওয়ার পরেও সে লক্ষ করল এই আতরের ঘ্রাণ সাত দিন গোসল করার পরও তার শরীর থেকে এক ফোঁটা মøান হয়নি। সুগন্ধটা প্রথম দিনের মতো তার শরীরে রয়ে গেছে। এরপর সে ঘটনাটা বস্তিবাসীকে জানাল। সাত দিনের মাথায় পাগলা বাবার দরগার সামনে আতরপ্রত্যাশী বস্তিবাসীর ভিড় জমে গেল। এই ভিড়ের মধ্যে বস্তির অনেককে দেখা গেলেও দেখা গেল না জবার। সে নির্বিকার। তার চোখে মুখে ও চেহারায় আইনালের আতর আবিষ্কার নিয়ে কোনও কৌতূহল নাই। তার দোকানে পান-বিড়ি কিনতে আসা অনেকের শরীরে সেই সুগন্ধি আতরের ঘ্রাণ সে পেয়েছে। কিন্তু সে কারও কাছে আইনালের আতরের ব্যাপারে কোনও কথা বা টুঁ-শব্দ উচ্চারণ করেনি। যদিও সবাই তার দোকানের সামনে বেঞ্চে বসে আইনালের আতর আবিষ্কার নিয়ে নানা কথা বলছে। কিন্তু সে মনে মনে ভাবল আইনালের আতর আবিষ্কার নিয়ে এত এক্সসাইটেড হওয়ার কী আছে ? সে তো আসবে পান কিনতে, তখন তার কাছ থেকে শুনে নেবে সে গল্প। চেয়ে নেবে আতর। আইনাল তো আর পালিয়ে যাচ্ছে না। এরই মধ্যে আইনাল বস্তিবাসীর কাছে রটিয়ে দেয় এই বলে, ‘এই আতর সে অনেক বস্তিবাসীকে দিয়েছে। কিন্তু তার আতরের শিশিতে একটু আতরও এখনও কমেনি। সে অন্য শিশিতে ঢেলে, আতর দেয়। খাল থেকে কুড়িয়ে পাওয়া শিশিটা এখনও সে কাউকে দেখায়নি। বস্তিবাসী বিশ্বাস করতে শুরু করেছে সে খাল থেকে পাগলা বাবার আতরের শিশি কুড়িয়ে পেয়েছে। এবং সে পাগলা বাবার একমাত্র উত্তরসূরি। এ কদিনে বস্তিবাসী তাকে সমীহ করে কথা বলতে শুরু করেছে। সে বস্তিবাসীর কাছে এই কদিনেই ধর্মীয় আধ্যাত্মিক নেতা হিসেবে পরিচিত হতে শুরু করেছে। গোডাউন বস্তির সবাই তার এই আধ্যাত্মিক কর্মকাণ্ড ও অলৌকিক গল্প বিশ্বাস করে মেনে নিলেও বিশ্বাস করল না একজন, সে হলো জবা। সে আইনালের এমন ঘটনা মন থেকে মেনেও নিতে পারল না। কিন্তু সে কথা মুখ ফুটে বস্তিবাসী কাউকে বলল না জবা। সে কেবল মনে মনে আইনালের সঙ্গে নির্জনে মুখোমুখি কথা বলার একটা সুযোগের অপেক্ষায় রইল। তারপর আষাঢ়ের বর্ষণমুখর এক গভীর রাতে তার সে সুযোগ এল। মতি নাইট শিফটে গাড়ি চালানোর ডিউটি থাকায় রাত ১০টার সময় রাতের খাবার খেয়ে বৃষ্টি মাথায় করে বের হয়ে গেছে অনেকক্ষণ।

কদিন ধরে টানা বৃষ্টি হচ্ছে। বস্তির খেটে খাওয়া লোকজনও খুব একটা দরকার না পড়লে বের হচ্ছে না। দোকানে কাস্টমার না থাকায় আজ সন্ধ্যায়ই জবা দোকান বন্ধ করে বাসায় চলে এসেছে। মতির জন্য সে রান্না করেছে। তারপর স্নান করল। শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা সব সময়ই জবা রাতে দোকান বন্ধ করে বাসায় ফিরে স্নান করে। এটা তার অভ্যাস। স্নান সেরে কাপড় পাল্টে একটু চুল আঁচড়ে মুখে সামান্য প্রসাধনী মেখে সে ঘুমাতে যায়। আজ সে মতির জন্য রান্না শেষে স্নান সেরে একটা লাল বেগুনি বেগুনি রঙের নতুন পাট করা তাঁতের শাড়ি পরল। মতি বাসায় নেই। রাতে বের হবে বলেছে। বৃষ্টিমুখর এই সন্ধ্যায় বস্তির কোনও আড্ডায় ক্যারাম অথবা দাবা খেলছে সে। বউয়ের মন নিয়ে সে খেলতে জানে না। জবা অনেকক্ষণ ধরে খোঁপা বাঁধল। খোঁপায় বিকেলে ফুলওয়ালি ময়না বুবুর কাছ থেকে চেয়ে রাখা একটা গোলাপ কুঁড়ি গুঁজে দিল। অন্য দিনের তুলনায় মুখে একটু বেশিই প্রসাধন করল সে। তার ঘরের টিনের চালে বৃষ্টির অবিরাম শব্দ শোনা যাচ্ছে। সে শব্দ তার বুকেও টিপটিপ করে দোল খাচ্ছে। সে শাড়ি পরে বস্তির অন্য মেয়েদের চেয়ে একটু উঁচু করে। তাতে করে তার পায়ের গোড়ালি, পাতায় লাগানো কুমকুম, রুপার নূপুর স্পষ্ট দেখা যায়। জবার শাড়ি পরার ঢং অনেকটা পাহাড়ি নারীর মতো। ঠোঁটে লাল রঙের লিপিস্টিক সে গাঢ় করেই দিল। স্বামী মতি মিঞাকে খাইয়ে-দাইয়ে বিদায় দিয়েই সে এমন সাজ সাজল। রাত গভীর হচ্ছে কিন্তু সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বৃষ্টির তোড় বাড়ছে। গোডাউন বস্তির সমস্ত টিনের চালে বৃষ্টির টানা রিমঝিম বোল শোনা যাচ্ছে। সমস্ত পৃথিবী যেন ভেসে যাচ্ছে এই বর্ষায়। গোডাউন বস্তির সবাই যখন এই বৃষ্টিমেদুর রাতে ঘুমে বেচাইন তখন জবার চোখে ঘুম নেই। রাত ১টা বাজলে একটা ছাতা নিয়ে বের হলো বাসা থেকে। তখনও ঝুম বৃষ্টি পড়েই চলেছে। দরগার আলো কখনও নেভে না। আজ এই ঝুম বৃষ্টির দিনে গভীর রাতে আইনালের ঘরেও আলো জ্বলছে। দরগার কোল ঘেঁষে তার বাসা। দোতলা বাসা। নিচতলায় মটর মেকানিক ও ঝালাইয়ের দোকান। দোতলায় দুটো রুমের বাসা নিয়ে আইনাল থাকে। সঙ্গে লাগোয়া বারান্দা। রুমের উপর টিনের শেড দেওয়া। বাসাটা কমিশনারই ঠিক করে দিয়েছে। যে মার্কেটের উপর বাসা সেটা কমিশনারের মার্কেট। আইনালকে বাসা ভাড়া দিতে হয় না। বর্ষাকালটা শেষ হলেই কয়দিন পরেই ওরস। দরগায় দানের সব টাকা আইনালের কাছে থাকে। ওরসের আগে তা হিসাব করে কমিশনার ওরসের কাজে লাগায়। ছাতা থাকা সত্ত্বেও জবা খানিকটা ভিজে আইনালের বাসায় পৌঁছাল। আইনালের ঘরে একটা এলইডি লাইট জ্বলছে। বারান্দাটা অন্ধকার। ঘরের দরজা হাটখোলা ছিল। বাইরে ঝুম বৃষ্টি ঝরেই চলেছে। দরজার কাছে হঠাৎই একটা ছায়া দেখে আইনাল দরজার দিকে তাকালো। আইনাল ঘরের ভেতর তার ছোট টেবিলটিতে আতর বানানোর একটা গুরুত্বপূর্ণ এক্সপেরিমেন্ট করছিল। এত রাতে আধভেজা জবাকে দরজায় দেখে সে খানিকটা অপ্রস্তুত হলো। চোখে-মুখে বিস্ময় ফুটিয়ে জবার দিকে তাকিয়ে আইনাল বলল, ‘জবা তুই! এই বৃষ্টিভেজা গভীর রাতে আমার ডেরায়।’

অবাক হলে ? এমন ভাব করছ যেন কোনও দিনও তোমার দরজায় এভাবে আসিনি ?

ছাতা থাকা সত্ত্বেও ফিরোজা রঙের আঁটসাঁট ঘটিহাতার ব্লাউজ  আর বেগুনি রঙের শাড়ির খানিকটা ভিজে গেছে জবার। মুখে বৃষ্টির জল লেপটে আছে। শাড়ির আঁচলটাও ভিজেছে। ছাতা বন্ধ করে মেঝেয় রেখে ভেজা আঁচল দিয়ে মুখটা মোছার বৃথা চেষ্টা করতে করতে জবা বলল, ‘আজকাল নয়া আতরের ঘ্রাণে জবার কথা মনে পড়ে না বুঝি ?’

কী কস তুই। সব আতরের সেরা আতর তোর শরীরের ঘ্রাণ।

সাত বছর ধইরা তো জবার কানে এই কথাই বলতেছ। নতুন বাহানা কী শুরু করছ তাই কও।

আমার সব বাহানা তোর রূপের অলিতে-গলিতে এসে মিলিয়ে যায়। আমার আতরের সুবাসে চেতনও অচেতন হয়, কেবল তোকে বশ করা যায় না। কারণ তুই নিজেই এই সুবাস থেকেও বেশি সুগন্ধযুক্ত।

এই সব মনচোরা কথা আমারে কইয়ো না। ভয় নাই তোমারে দেওয়া মন ফেরত চাইব না। জবার মন অত শস্তা না যে ফেনার লাহান প্রশংসায় তা ভাইসা যাইব। খালে পাগলা বাবার আতরের শিশি পাইছো। সেই আতর মানষেরে দিলেও শিশির আতর কমতেছে না। মানষে সে আতর গায়ে মাখলে গোসল করলেও সাত দিনে ঘ্রাণ যায় না এসব বুজরুকি কথা বস্তির মানষেরে বিশ্বাস করাইতে পারলেও জবার বিশ্বাস কিন্তু কিনতে পারবা না। আসল ঘটনা কী তাই কও। তুমি আতর বানাইতে পারো এ কথা কেউ না জনলেও তো আমি জানি।

হ, আমি জানি বস্তির সবাই বিশ্বাস করলেও এই সব গল্প তুই বিশ্বাস করবি না। তোরে সত্যি কথা বলি। খাল পরিষ্কার করতে গিয়া আতরের তো শিশি আমি একটা পাইছি। এ কথাডা সত্য। তয় তাতে আতর না, ময়লা পানি ছিল।

টেবিলের উপর রাখা শিশিটা ডান হাত দিয়ে ধরে আইনাল জবার সামনে সেটা উঁচু করে ধরল।

কিন্তু এই বোতলে আমার বানানো নতুন এক আতর ভরে তা বস্তিবাসীর কাছে এক শিশি জনপ্রতি একশো টাকা দরে বিক্রি করতেছি। আর বলতেছি এটা পাগলা বাবার আতর। আমার নতুন আবিষ্কার করা এই আতর শরীরে মাখলে এর সুগন্ধ এক সপ্তাহের বেশি থাকে। খালে পাওয়া শিশিটা উঁচিয়ে আইনাল বলল, ‘মাখবি তুই এই আতর। আমার নতুন আবিষ্কার করা এই আতর। আয় তোরে মাখায়া দিই। আধভেজা হয়ে গেছিস। তোয়ালে দিই মুছে ফেল শরীর।’

আইনাল একটা পরিষ্কার ধোয়া তোয়ালে এনে দিল জবাকে। জবা পেট, বুক, মুখ মুছতে মুছতে বলল, ‘তোমার দেওয়া বেগুনি শাড়িটা কত শখ করে পিন্ধলাম। আর আইজই মরণের বৃষ্টি নামল।’ জবা শরীর মোছা শেষ করে তোয়ালেটা আইনালের বিছানার উপর ফিক্কা মেরে আইনালের কাছে সরে এসে দুই বাহু আইনালের কাঁধের উপর রেখে বুকটা আইনালের বুকের সঙ্গে লেপটে আবেগঘন গলায় বলল, ‘এখানে এমন লোক ঠকায়ে লাভ কী ? আমারে নিয়া দূরে কোথাও পালাইয়া চলো। সেখানে নতুন গল্প ফাঁদবা। আতরের ব্যবসা করবা। আর আমার শরীর থিইক্যা নিবা প্রতিদিন নতুন আতরের ঘ্রাণ।

সত্য বলতাছিস জবা! তুই যাবি আমার লগে।

হ যামু। যাইবা। দূর কোনও অচিন দ্যাশে নিয়া যাইবা আমারে। যেহানে মতি মিঞা আমারে খুঁইজা পাইব না। তুমি দিবা আমারে প্রতিদিন আতরের ঘ্রাণ আর আমি তোমারে হাকিমপুরী জর্দা দিয়া মিষ্টি সুগন্ধি পানের খিলি বানাইয়া খাওয়ামু।

তারপর আইনালের হাতে ধরা আতরের শিশিখানা নিজের ডান হাতে ধরে সে শিশিটার দিকে মুগ্ধ চোখে তাকায়ে বলল, ‘বাহ্! শিশিটা তো ভারী সোন্দর। আমার বুকের মতো গোলাকার।’ তারপর সে শিশির ছিপি খুলে নাকের কাছে শিশিটা ধরে বলল ঘ্রাণটাও পাগলপারা। আমার নাভিতে, পেটে, স্তনসন্ধিতে মাখায়া দাও এই আতর। এই সুগন্ধের টানেই আমি তোমার কাছে আসি আইনাল।

আইনাল জবার সাদাটে পেটে একটা গাঢ় চুমু দিয়ে বলল, ‘এই আতর তোর শরীরের সুগন্ধ নিয়াই তৈরি।’ তারপর আইনাল জবার বলা শরীরের নির্দিষ্ট জায়গাগুলোতে তার আবিষ্কৃত নতুন আতর মাখায়া দিল। আইনালের সারা ঘর ঘ্রাণে ভরে উঠল।

‘কখন পালাবি বল জবা ?’

‘এখনই আইনাল।’

‘এক্ষুনি! এত রাতে এই ঘোর বৃষ্টিতে।’

‘হ এটাই চরম সুযোগ আমাদের জন্য। বৃষ্টিমুখর গভীর রাত। বস্তিবাসী ঘুমাইতেছে। কেউ জানব না। মতি মিঞা সবাই বাসায় নাই। সে গেছে গাড়ি চালাইতে। আইজ তার রাইতের শিফটে ডিউটি।’

প্রয়োজনীয় জিনিসপত্তর গুছিয়ে আধা ঘণ্টা পরে আইনাল আর জবা গভীর রাতে ঘন বৃষ্টির মধ্যে বের হলো। তখন বৃষ্টির মাদল বেজেই চলেছে। ওদের পেছনে পড়ে রইল পাগলা বাবার দরগা, ১ নং গোডাউন বস্তি, পশ্চিমের হাটাখানা মাঠ, অপ্রশস্ত খাল। ভিজতে ভিজতে দুজন নিরুদ্দেশ হলো অজানার উদ্দেশে। আইনালের ডান হাতের মধ্যে জবার ডান হাত শক্ত করে ধরা। বাম কাঁধে ঝোলানো কাপড়ের ঝুলিতে কেবল রইলো গোডাউন বস্তির খাল থেকে কুড়িয়ে পাওয়া খানদানি আতরের শিশি আর সেই শিশির ভেতরে তার আবিষ্কৃত নতুন সুগন্ধযুক্ত আতর। যার ঘ্রাণ জবার শরীরের লাহান।

সচিত্রকরণ : রজত

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button