প্রচ্ছদ রচনা : বাঙালি রেনেসাঁর মহান পুরুষ : সৈয়দ আজিজুল হক

প্রচ্ছদ রচনা : ভাষাসৈনিক আহমদ রফিক―মূল্যায়ন
বায়ান্নর ভাষা-আন্দোলন বাংলাদেশ ভূখণ্ডে যে রেনেসাঁর জন্ম দিয়েছে তার এক মহান পুরুষ আহমদ রফিক। এই ভাষা-আন্দোলন সৃষ্টিকারীদের যেমন তিনি অন্তরঙ্গ একজন, তেমনি এই আন্দোলন যে নতুন একটি প্রজন্ম সৃষ্টি করেছে তিনি হয়ে উঠেছেন তারও অন্যতম গৌরবময় প্রতিনিধি; হয়ে উঠেছেন তারই অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই আন্দোলনের স্রষ্টা ও সৃষ্টির উভয়বিধ সত্তাকে ধারণ করেই তিনি আসীন হয়েছেন অনন্য মর্যাদায়। অতঃপর সমগ্র জীবনকে নিবেদন করেছেন জ্ঞানচর্চায় জ্ঞানার্জন ও জ্ঞানসৃষ্টিতে। তাঁর ভাবুক সত্তার প্রধান দিকগুলোর দিকে দৃষ্টি দিলেই স্পষ্ট হবে এর স্বাতন্ত্র্যের মাত্রা। ভাষা-আন্দোলনের ইতিহাস চর্চা, এর তাৎপর্য বিশ্লেষণ, সেই সূত্রে বাঙালির জাতিসত্তা সন্ধান, বাঙালির গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধের অন্তর্বৈশিষ্ট্য উন্মোচন প্রভৃতির মধ্য দিয়ে জাতীয় ইতিহাসের সত্য সন্ধান―এ হলো একটি দিক। আরেকটি দিকে আছে রবীন্দ্রচর্চা ও রবীন্দ্র-অনুশীলন। বাঙালির সাংস্কৃতিক বিনির্মাণে, তার মনন সৌন্দর্য ও অভিরুচি গঠনে রবীন্দ্রনাথের অতুলনীয় অবদানকে একের পর এক বিশ্লেষণ ও আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে পাঠকসমাজের কাছে আলোকিত করা। জ্ঞানসাধনার ব্রত নিয়ে তিনি একজন সাধকের মতো অতিবাহিত করছেন এক নিরলস জীবন।
আহমদ রফিক (জন্ম : ১৯২৯) তাই পঁচানব্বই বছরের এক তরুণ সাহিত্যসৈনিকের নাম। খুবই সচেতনভাবে অবলোকন করেছেন বিশ শতকের চল্লিশের দশকের উত্তাল রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ। ওই ঘটনাধারার অভ্যন্তরেই লুকিয়ে ছিল প্রগতি ও প্রতিক্রিয়ার দ্বন্দ্ব। প্রায় দুইশো বছরের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন অবসানের জন্য ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে ফ্যাসিবাদবিরোধী লড়াই, আর তারই মধ্যে তৎকালীন ভারতের নিপীড়িত পশ্চাৎপদ সংখ্যালঘু একটি জনগোষ্ঠীর আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের আন্দোলনস্বরূপ স্বতন্ত্র রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম―এর মধ্যেই গড়ে উঠেছে আহমদ রফিকের কৈশোর-তারুণ্যের আত্মসচেতন জিজ্ঞাসু জীবন। দীক্ষিত হন মার্কসীয় বিশ্ববীক্ষায়। তাঁর এই সচেতন জিজ্ঞাসাপ্রবল তারুণ্যের উদ্দামতার মধ্যেই ১৯৪৭-এ ব্রিটিশ শাসনমুক্তি ও দেশভাগসহ প্রতিষ্ঠা পায় নতুন এক রাষ্ট্রকাঠামো। উপনিবেশবাদী শাসনের অবসানের লগ্নে ভারতবর্ষ ও বাংলায় যে বিভাজন সৃষ্টি হয় তাকে অনিবার্য মনে করেন না এই মনীষী। রক্তক্ষয়ী অতীতের সঙ্গে স্বাধীনতা ও নতুন রাষ্ট্রের উৎসাহ-উদ্দীপনা আর সেই সঙ্গে উন্মূলিত মানুষের হাহাকার ও কান্না সব মিলে সাতচল্লিশের পরিবর্তন এক মিশ্র মূল্যবোধের জন্ম দেয়। স্বপ্ন, আশা ও প্রাপ্তির আনন্দ-দ্বন্দ্বের টানাপড়েনের মধ্যেই শুরু হয় রাষ্ট্রভাষা-বিতর্ক। বাংলা ভাষার পক্ষে এ অঞ্চলের মানুষের সর্বতোপ্লাবী আবেগ-অনুরাগ- ভালোবাসার মধ্য দিয়ে সৃষ্টি হয় এক নতুন জাতীয়তাবাদী রাজনীতি-সংস্কৃতির, সৃষ্টি হয় এক অসাম্প্রদায়িক ধর্মনিরপেক্ষ চেতনার, সৃষ্টি হয় নতুন মূল্যবোধ ও সাংস্কৃতিক জাগরণের। ঢাকাকেন্দ্রিক রেনেসাঁ হিসেবে যাকে আমরা অভিহিত করতে পারি।
বায়ান্নর ভাষা-আন্দোলনের সময় আহমদ রফিক ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্র। প্রগতিচিন্তায় বিভোর তেইশ বছরের যুবক জাতীয়তাবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে এই আন্দোলনে সম্পূর্ণভাবে আত্মনিয়োগ করেন। শুধু উপরিতলগত আবেগতাড়িত সক্রিয়তা নয়, তিনি জাতীয়ভাবে সৃষ্ট এই গণসাংস্কৃতিক জাগরণের উত্তাল তরঙ্গের সঙ্গে নিজ জীবনের স্বপ্ন-আশাকে সম্পূর্ণ একাত্ম করে ফেলেন। ফলে তাঁর জীবনে শুধু তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না এই আন্দোলনের প্রভাব; বরং জাতীয় স্বপ্নমথিত এই সংগ্রাম কিংবা এর মধ্য দিয়ে সৃষ্ট রেনেসাঁর চেতনা তাঁর জীবনের আদর্শ―উদ্দেশ্যকে সম্পূর্ণভাবে পাল্টে দেয়, সেখানে তৈরি হয় সম্পূর্ণ নতুন এক জীবনপ্রেরণা, নতুন এক স্বপ্ন আর আদর্শ। মেডিকেল কলেজের ছাত্র আহমদ রফিক রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ায়, এমনকি একপর্যায়ে গ্রেফতার এড়াতে বছরকাল আত্মগোপনে থাকতে হওয়ায়, এমবিবিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে লেগে যায় দীর্ঘ সময়। ভালোভাবেই তিনি উত্তীর্ণ হন, কিন্তু ভাষা-আন্দোলন ও তৎপরবর্তী রাজনৈতিক ঘটনাযজ্ঞে তিনি স্থির করে ফেলেন নিজ জীবনের লক্ষ্য-আদর্শ ও সেই সূত্রে কর্মপরিধি। চিকিৎসা পেশায় নিজেকে নিয়োজিত না-করে দেশমাতৃকার সাংস্কৃতিক উন্নয়নে পুরোপুরিভাবে আত্মোৎসর্গ করেন তিনি। সাধকোচিত এ এক কঠিন প্রতিজ্ঞা, এক অতুলনীয় দেশপ্রেমমূলক অঙ্গীকার।
বাংলাভাষী অঞ্চলে আমরা দুটি রেনেসাঁ সংঘটিত হতে দেখি। একটি ঘটে উনিশ শতকে, আরেকটি বিশ শতকে। একটি কলকাতা-কেন্দ্রিক, আরেকটি ঢাকা-কেন্দ্রিক। প্রথমটির বিরুদ্ধে এই অভিযোগ উচ্চারিত হয় যে, তা ছিল কলকাতা শহরের শুধু শিক্ষিত এবং হিন্দু মধ্যবিত্তের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। পুরো বাংলার পুরো সমাজ বা পুরো জাতিকে তা আলোকিত করতে বা প্রভাবিত করতে সমর্থ হয় না। অন্যদিকে বিশ শতকের রেনেসাঁটি বাংলার একটি অংশকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হলেও তার প্রভাব ছিল ব্যাপক। এটি সমগ্র পূর্ববঙ্গের সকল সম্প্রদায়ের মানুষের জীবনকে স্পর্শ করে। একটি পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠীকে জাগ্রত করে তোলে সাংস্কৃতিক ও জাতীয় আত্মপরিচয় নির্মাণের প্রেরণায়। জাতীয় আত্মানুসন্ধান ও আত্মনির্মাণের এই প্রয়াসেই সামগ্রিক হয়ে ওঠে বিশ শতকের এই রেনেসাঁ। ইউরোপীয় রেনেসাঁ যেমন বিজ্ঞানী দার্শনিক সাহিত্যিক শিল্পী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বকে উদ্বুদ্ধ করেছিল নতুন নতুন গবেষণা, সৃষ্টিশীলতা ও মননশীলতা তথা ব্যাপক জ্ঞানচর্চায়, তেমনি বাংলাদেশেও বায়ান্নর ভাষা-আন্দোলন আমাদের সৃষ্টিশীলতা ও মননশীলতার সকল ধারাকে বিপুলভাবে উজ্জীবিত করেছিল নবনির্মাণের প্রেরণায়। আহমদ রফিক হলেন এই রেনেসাঁ-উদ্বুদ্ধ মহৎ ব্যক্তিত্ব, যিনি উপলব্ধি করেছিলেন চিকিৎসার মাধ্যমে তিনি কতজন মানুষের শারীরিক সুস্থতা নিশ্চিত করবেন, তার চেয়ে অধিক প্রয়োজন এই জাতির মানসিক বিকাশ নিশ্চিত করা। ফলে পশ্চাৎপদ এই জাতিকে আলোকিত করার মহান ব্রতে আত্মোৎসর্গী হয়ে তিনি জ্ঞানচর্চায় আত্মনিবেদন করেছিলেন।
তাঁর একটি বইয়ের নাম: জাতিসত্তার আত্মঅন্বেষা। এই নামের মধ্যেই লুকিয়ে আছে লেখকের জ্ঞানান্বেষার মূল সূত্রটি। অর্থাৎ একটি জাতির সত্তাসন্ধানের সঙ্গে নিজের জীবনাদর্শ সন্ধানের বিষয়টিকে তিনি একাত্ম করে ফেলেছেন। এই একাত্মতা-সূত্রেই তিনি হয়ে ওঠেন রেনেসাঁর যথার্থ পুরুষ, তার অনিবার্য ধারক-বাহক। এই আত্মানুসন্ধান-সূত্রেই তিনি দেখতে পান যে, বাঙালি জাতিসত্তা ও বাংলাদেশ রাষ্ট্রগঠনের বীজটি ভাষা-আন্দোলনের মধ্যেই গভীরভাবে প্রোথিত ছিল। এই আন্দোলনের অন্তর্গত আদর্শে যে বৈষম্যবিরোধী গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও ধর্মনিরপেক্ষ অসাম্প্রদায়িক চেতনা সক্রিয় তা উদঘাটনের পাশাপাশি নিজ জীবনাদর্শের সঙ্গেও তাকে গ্রথিত করে ফেলেন। যৌবনে যে আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতাসূত্রে জীবনের লক্ষ্যই পাল্টে ফেলেছেন সেই আন্দোলনের অন্তঃসত্য অনুধাবন তাঁর জীবনব্যাপী সাধনারই অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে। তিনি লেখেন একুশের ইতিহাস আমাদের ইতিহাস, ভাষা আন্দোলন: ইতিহাস ও তাৎপর্য, ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি ও কিছু জিজ্ঞাসা, ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস, ভাষা আন্দোলন ইতিহাস ও উত্তরপ্রভাব প্রভৃতি গ্রন্থ। তিনি বিস্ময়ের সঙ্গেই লক্ষ করেন, দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে সৃষ্ট একটি রাষ্ট্রকাঠামোর উপরিতলকে ভেদ করে কীভাবে মুহূর্তের মধ্যে জাগ্রত হয়ে ওঠে এ অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর জাতিচেতনার মর্মে নিহিত ভাষাপ্রেম আর সম্প্রদায়গত সম্প্রীতিবোধের সৌন্দর্য ও সংগ্রামী অনুপ্রেরণা। ভাষা-সংগ্রামের ইতিহাস খুঁড়েই তিনি কেবল আমাদের জাতিগত শক্তি ও সৌন্দর্যের তাৎপর্য আবিষ্কার করেন না; এই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় সংঘটিত হয় বাঙালি জাতির ইতিহাসের সবচেয়ে যে গৌরবোজ্জ্বল ঘটনা একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, তার গুরুত্ব ব্যাখ্যায়ও তিনি মনোনিবেশ করেন। লেখেন: একাত্তরের পাকবর্বরতার সংবাদভাষ্য, বাঙালির স্বাধীনতা যুদ্ধ প্রভৃতি গ্রন্থ। এ অঞ্চলের অনার্য-নিম্নবর্গীয় জনশক্তির উদার মনোভঙ্গি, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, স্বাজাত্যবোধ, দেশাত্মবোধ, সমষ্টিগত স্বার্থে আত্মত্যাগের প্রবল স্পৃহা আর ঐক্যচেতনা মুক্তিযুদ্ধকে সফল করার ক্ষেত্রে পালন করেছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। তিনি যথার্থভাবেই লক্ষ করেন, সফলতার এই অন্তর্নিহিত বীজটি বাঙালি জাতিসত্তার গভীরেই প্রোথিত ছিল। পাশাপাশি কিছু সীমাবদ্ধতার অনুষঙ্গও তাঁর দৃষ্টি এড়ায় না। জাতিসত্তার অন্তর্নিহিত সম্ভাবনা ও সংকটকে বিচিত্রভাবে বিচার বিশ্লেষণ করেন বলেই বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদী চেতনা ও জাতিরাষ্ট্র ভাবনা তাঁকে আন্দোলিত করে; অতঃপর তিনি লেখেন: বাংলাদেশ: জাতীয়তা ও জাতিরাষ্ট্রের সমস্যা।
শুধু তাই না, ভাষা-আন্দোলন, বাঙালি জাতীয়তাবাদ প্রভৃতি সূত্রেই ১৯৪৭-এর ভারতভাগ বাংলাভাগের ঘটনার দিকেই সর্বদা নিবদ্ধ থাকে তাঁর উৎসুক দৃষ্টি। যে ঘটনাকে তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন নিবিড়ভাবে, সেই ঘটনাকে উত্তরকালে দেখেছেন বিশ্লেষণী দৃষ্টিতে, বের করে নিয়ে আসতে চেয়েছেন এর ভেতরকার সত্যের নির্যাসকে। লিখেছেন এক গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ দেশবিভাগ: ফিরে দেখা। জীবনের দীর্ঘ সময় যে বিষয়টি তাঁকে ভাবিয়েছে, আন্দোলিত-আলোড়িত ও ব্যথিত করেছে, যৌবনের সবচেয়ে মূল্যবান দিনগুলোতে সংঘটিত আনন্দ-বিষাদে ভরা সেই ঘটনা নিয়েই লিখলেন জীবনের এই পড়ন্ত বেলায়। লিখলেন বিশ্লেষণাত্মক ভঙ্গিতে, জাতির প্রতি এক প্রতিশ্রুতিশীল বুদ্ধিজীবীর দায়বোধ থেকে। লিখলেন সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ অবস্থানে থেকে, হিন্দু-মুসলিম- বৌদ্ধ-খ্রিস্টান পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে কেবল মানুষ পরিচয়কে মুখ্য করে। তিনি দেশভাগের অনিবার্যতা নিয়ে যথার্থভাবেই প্রশ্ন তোলেন এবং মনে করেন, এটি এড়ানো গেলে সেটাই ছিল বৃহত্তরভাবে কল্যাণকর। তিনি নেতৃত্বের ভুলগুলোকে এক্ষেত্রে চিহ্নিত করেন। ১৯৩৭ সালের নির্বাচনে উত্তর প্রদেশে নেহরু কর্তৃক জিন্নাহর কোয়ালিশন প্রস্তাব নাকচ আর ১৯৪৬-৪৭-এ বঙ্গকে অবিভক্ত রাখার ব্যাপারে আবুল হাশিমদের আন্তরিক প্রচেষ্টায় প্রতিপক্ষের অনাগ্রহ―অন্য অনেক কিছুর সঙ্গে এ দুটি ঘটনাকে ভারতভাগ ও বাংলাভাগের ক্ষেত্রে, নেতৃত্বের ব্যর্থতার দিক থেকে, গুরুত্বপূর্ণ বলে তিনি মনে করেন।

আবার তিনি এও স্বীকার করেন যে, ‘ভারত বিভাগে বঙ্গের রয়েছে বিশাল ভূমিকা। কলকাতা তো দীর্ঘ সময় ধরেই গোটা ভারতবর্ষের রাজধানী হিসেবে সারা ভারতের রাজনীতির নিয়ন্ত্রক ছিল। অথচ গোটা উত্তর ভারত বা পশ্চিম ভারতের মুসলমানদের তুলনায় বঙ্গীয় মুসলমানদের অবস্থা ছিল খুব খারাপ। এই যে শ্রেণিগত ও অর্থনৈতিক বৈষম্য, এগুলো কিন্তু আমাদের বাঙালি মুসলমানদের ভিন্ন জায়গায় নিয়ে গেছে।’ এরূপ স্বীকারোক্তি অর্থনৈতিক ও শ্রেণিগত বাস্তবতার প্রতিই আমাদের দৃষ্টি নিবদ্ধ করে আর মুখোমুখি করে ভিন্নতর এক সত্যের। এর কারণ হিসেবে তিনি চিহ্নিত করেন চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ও তৎকালীন ব্রিটিশ নীতিকে। এবং বলেন, ‘এই দুটি কারণেই বাঙালি মুসলমান ও হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে যে অর্থনৈতিক বৈষম্য ছিল, তা বিভেদ কিংবা বিভাজনের জায়গাগুলোকে খুব শক্তপোক্তভাবে তৈরি করেছিল। সেই সূত্রেই বলা যায়, এই দেশবিভাগটি মোটামুটিভাবে অনিবার্য হয়ে দাঁড়ায়।’ (আহমাদ মাযহারের সঙ্গে সাক্ষাৎকার, পাতাদের সংসার, আহমদ রফিক সংখ্যা, ২০১৮, পৃ ১১৫)। এই যে দুটি কথাই তিনি বললেন, একবার ‘অনিবার্য ছিল না’, আরেকবার ‘অনিবার্য হয়ে দাঁড়ায়’―এ দুটিই সত্য। একটি হলো আকাক্সক্ষা, আরেকটি হলো বাস্তবতা। এই বাস্তবতাকে অতিক্রম করা যেত, যদি সকল পক্ষের প্রভাবশালী গ্রুপের মধ্যে যথাযথভাবে শুভবুদ্ধির উদয় হতো। কিন্তু দুঃখজনকভাবে তা হয়নি।
তাঁর জ্ঞানসাধনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো রবীন্দ্র অধ্যয়ন। উনিশ শতকের শেষ দশকের শুরুতে বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথ জমিদারি কার্য তদারকির জন্য যখন আসেন তখন ঠাকুর এস্টেটের তিনটি কাছারিবাড়িতে তাঁকে অবস্থান করতে হয় শিলাইদহ, সাজাদপুর ও পতিসর। এর মধ্যে প্রথম দুটি সম্বন্ধেই বাংলাদেশের মানুষ অধিকতর অবহিত ছিল; কালের ব্যবধানে পতিসর অনেকটা বিস্মৃতির তলে চাপা পড়ে গিয়েছিল। আহমদ রফিক মূলত বিস্মৃতির অন্তরাল থেকে পতিসরকে টেনে তোলেন। লেখেন: রবীন্দ্রভুবনে পতিসর। এটি অনেক পরের ঘটনা, গত শতকের শেষ দশকের। কিন্তু এর তাৎপর্য ব্যাপক। আমরা জানি, সাধারণভাবে রবীন্দ্রনাথ প্রজাবৎসল ছিলেন। প্রজার হিতার্থে, তাদের দারিদ্র্য নিবারণার্থে তিনি পূর্ববাংলার তিন জমিদারি অঞ্চলেই নানা ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এক্ষেত্রে পতিসর ছিল বিশেষভাবে স্বতন্ত্র। পতিসরে তিনি সমবায় গঠন ও সামাজিক ঐক্য সৃষ্টির মাধ্যমে প্রজার জীবনমান উন্নয়নে উদ্যোগী হন। বিশেষত, মহাজনি ঋণের দুর্বহ ভার থেকে মুক্ত করে প্রজার দারিদ্র্য লাঘবের উদ্দেশ্যে সহজ সুদে ঋণদানের জন্য স্থাপন করেন ব্যাংক। যে-ব্যাংকে তিনি তাঁর নোবেল পুরস্কারের অর্থ গচ্ছিত রাখেন, প্রজার কাছ থেকে যে-টাকা উদ্ধার করা আর সম্ভবপর হয় না। অর্থাৎ পতিসরপর্ব থেকে এক ভিন্নতর রবীন্দ্রনাথকে পাঠকসম্মুখে দাঁড় করিয়ে তিনি রবীন্দ্র-গবেষণার তাৎপর্যকে প্রতিষ্ঠা করেন।
তাঁর রবীন্দ্রপাঠ ও রবীন্দ্র সাহিত্য-শিল্প বিশ্লেষণ অনেক পুরনো, বলা যায়, তাঁর লেখকজীবনের প্রায় সমানবয়সী। লিখেছেন : পদ্মাপারের সেই গাল্পিক জাদুকর, পদ্মাপর্বের রবীন্দ্র গল্প, রবীন্দ্রনাথের রাষ্ট্রচিন্তা ও বাংলাদেশ, রবীন্দ্রনাথের চিত্রশিল্প, রবীন্দ্রসাহিত্যের নায়িকারা: দ্রোহ ও সমর্পণে, রবীন্দ্রনাথ এই বাংলায় প্রভৃতি গ্রন্থ। আহমদ রফিকের রবীন্দ্রবিশ্লেষণের একটি প্রধান প্রবণতা হলো রবীন্দ্র সৃষ্টির বাংলাদেশ পর্বকে আলোকিত করা। বর্তমান বাংলাদেশ ভূখণ্ডে অবস্থানকালে রবীন্দ্রনাথ যা সৃষ্টি করেছেন তা সমগ্র রবীন্দ্রসাহিত্যেই একটি আলাদা মাত্রা অর্জন করেছে। এর মধ্য দিয়ে তিনি দেখাতে চান যে, রবীন্দ্রনাথের পূর্ণাঙ্গ রবীন্দ্রনাথ হয়ে ওঠার পেছনে বাংলাদেশের রয়েছে বিরাট অবদান। এখানকার প্রকৃতি, পদ্মাসহ নানা নদী এবং বিশেষভাবে এ অঞ্চলের সাধারণ নিম্নবর্গের মানুষ রবীন্দ্রসাহিত্যকে ভিন্ন আলোয় উদ্ভাসিত করেছে। বিশেষ করে মুসলমান সম্প্রদায় সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা সৃষ্টির ক্ষেত্রেও রবীন্দ্রনাথের জমিদারি অঞ্চলের অভিজ্ঞতা ছিল বিপুলভাবে সহায়ক। পতিসরের অভিজ্ঞতায় রবীন্দ্রনাথ দেখেছেন, সামাজিক ঐক্য সৃষ্টির ক্ষেত্রে মুসলমানের দিক থেকে যত সহজে সাড়া পাওয়া যায়, বর্ণভেদের কারণে হিন্দুর দিক থেকে তা পাওয়া যায় না। নানা রচনার মধ্য দিয়ে আহমদ রফিক রবীন্দ্রনাথের এই স্বতন্ত্র মাত্রাটিকে বিচিত্রভাবে বিশ্লেষণ করেন। সাহিত্যিক রবীন্দ্রনাথের বাইরে এক মানবিক ও সামাজিক দায়বদ্ধ রবীন্দ্রনাথকে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন। রবীন্দ্র চিত্রশিল্পকেও তিনি তাঁর বিশ্লেষণের আওতায় নিয়ে এসেছেন। শুধু রবীন্দ্রচিত্র নয়, তিনি পাশ্চাত্য শিল্প নিয়েও রচনা করেছেন বিশ্লেষণমূলক গ্রন্থ।
আহমদ রফিক শুধু একজন প্রবন্ধকার নন, তিনি একজন কবিও; শুধু কবি নন, কথাসাহিত্যিকও। মার্কসবাদী সমাজাদর্শে আলোকিত এই লেখক সর্বদা প্রগতিভাবনায় ভাবিত। নিজ মাতৃভূমিতে একটি শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন তিনি দেখেন। তাঁর এই কবি ও কথাশিল্পীসত্তার সঙ্গে যুক্ত বিপ্লবী সত্তা তাঁকে শুধু কবিতা বা কথাশিল্প রচনায়ই উদ্বুদ্ধ করে না, মার্কসবাদী সমাজসচেতন কবিতা বিশ্লেষণেও সমানভাবে আগ্রহী করে তোলে। তাঁর রচিত কিছু গ্রন্থের নাম : নজরুল কাব্যে জীবন সাধনা, জীবনানন্দ সময় সমাজ ও প্রেম, বিষ্ণু দে: কবি ও কবিতা, কবিতা আধুনিকতা ও বাংলাদেশের কবিতা প্রভৃতি। কবিতা বিষয়ে তাঁর আগ্রহের ক্ষেত্রটিকে এর মধ্য দিয়ে মোটামুটিভাবে চিহ্নিত করা যায়। বিষ্ণু দে কবি হিসেবে দুরূহ। তাঁকে বোধের আওতায় আনতে গেলে প্রাতিষ্ঠানিক কিছু পদ্ধতির সাহায্য গ্রহণ অনিবার্য হয়ে ওঠে। শুধু মার্কসবাদী কবি বলেই তাঁকে বিশ্লেষণের বিষয় করে তোলা সহজ নয়। কবিতার দুরূহ পথে পরিভ্রমণের সামর্থ্য ও শক্তি নিয়েই তিনি বিষ্ণু দের কাব্যসৌন্দর্য মন্থনে প্রবৃত্ত হন। এবং এই দুরূহ কবির কাব্য থেকেও বের করে আনেন সৌন্দর্যের নির্যাস। নজরুল, জীবনানন্দ ও বিষ্ণু দের কবিতা বিশ্লেষণের মাধ্যমে তিনি বাংলা কবিতার আধুনিকতাকে অনুধাবন করতে চেয়েছেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশের কবিতার আধুনিক বৈশিষ্ট্যকেও তিনি বিচার্যের বিষয় করেছেন। প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা কিংবা শিক্ষকতার বাইরে থেকেও তাঁর আধুনিক কবিতা অধ্যয়ন ও বিশ্লেষণের এই ব্যতিক্রমধর্মী প্রয়াস নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়।
আগেই আমরা বলেছি, অন্তরে তিনি লালন করেন এক বিপ্লবী সত্তাকে। তাঁর কবিসত্তার রোমান্টিকতা আর বিপ্লবী সত্তার রোমান্টিকতা কখনও কখনও একাকার হয়ে যায়। তাঁর বিপ্লবী সত্তায় যাঁকে তিনি নায়কের মর্যাদা দেন তিনি হলেন লাতিন আমেরিকার বিপ্লবী, বিশেষত কিউবা বিপ্লবে ফিদেল ক্যাস্ট্রোর সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সহযোগী চে-গুয়েভারা। তাঁকে নিয়ে তিনি একটি স্বতন্ত্র গ্রন্থও রচনা করেছেন। তারপর একটি কবিতার বইয়ের নাম যখন তিনি রাখেন বিপ্লবী ফেরারী, তবু তখন তাঁর কবি ও বিপ্লবী সত্তার ঐকান্তিকতাকে আমরা উপলব্ধি করতে পারি। অনুভব করতে পারি তাঁর জীবনব্যাপী সাধনার মর্মমূলকে।
মনুষ্যত্ববোধের যে জাগরণে একজন আত্মপরতা থেকে পরার্থপরতায় উন্নীত হয়, বিষয়বুদ্ধি পরিহার করে সমষ্টির কল্যাণে আত্মনিবেদিত হয়, তার মধ্যে একটি রোমান্টিক স্বাপ্নিক মানুষের উপস্থিতি অপরিহার্য হয়ে ওঠে। এছাড়া এমন ত্যাগ স্বীকারে উদ্বুদ্ধ হওয়া সহজসাধ্য নয়। কেননা, স্বার্থপরতাই মানুষের স্বভাবজাত, তাকে অতিক্রম করে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মঙ্গলসাধনে, একটি জাতির সাংস্কৃতিক উৎকর্ষবিধানে, নিজেকে ব্যাপৃত করতে হলে অন্তর্গত সত্তায় বৃহৎ বলের দরকার হয়। এই শক্তির শিখা আজও তাঁর হৃদয়ে প্রজ্বলিত আছে বলেই প্রতিনিয়ত জাতির সামগ্রিক কল্যাণে নিজেকে ব্যাপৃত রাখতে পারছেন। সৃষ্টিশীলতা ও মননশীলতায় নিরলসভাবে নিয়োজিত থাকতে পারছেন। এভাবেই তিনি আমাদের সামনে সর্বাংশে দেশপ্রেমে মণ্ডিত, সমাজ ও মানুষের প্রতি দায়বদ্ধ, এক মহৎ পুরুষের, একজন অসামান্য বুদ্ধিজীবীর, অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
লেখক : প্রাবন্ধিক, গবেষক



