প্রচ্ছদ রচনা : বাংলাদেশের অভিযাত্রার অগ্রপথিক : আহমদ রফিক : আবুল মোমেন

প্রচ্ছদ রচনা : ভাষাসৈনিক আহমদ রফিক―মূল্যায়ন
লেখক চিন্তাবিদ আহমদ রফিক ভাষা-আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে সম্ভবত শেষ প্রতিনিধি। তখন তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্র। মেডিকেল হাসপাতাল, হোস্টেল ও কলেজ বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারি ও তার পরের কয়েকদিন আন্দোলনের মূল পীঠস্থান। তরুণ আহমদ রফিকের মতো সচেতন কর্মী-সংগঠকদের কারণেই প্রতিষ্ঠানটির এই গৌরবময় ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন সম্ভব হয়েছে। তবে আহমদ রফিকের দীর্ঘ জীবন প্রমাণ করে যে এ আন্দোলন তাঁর জীবনের আকস্মিক কোনও ঘটনা নয়, আবার এতে সক্রিয় অংশ নেওয়ায় তাঁর জীবন-সাধনার কোনও বড় রূপান্তর ঘটেনি। ছাত্র জীবনের স্কুলপর্বেই গণমানুষের প্রতি অঙ্গীকার নিয়ে যে অভিযাত্রা শুরু হয়েছিল তা একইভাবে আজও চলমান। তিনি মূলত চিন্তাবিদ, এবং সেই চিন্তা পাঠকদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে ভালোবাসেন। অর্থাৎ তিনি মূলত একজন লেখক, আরও সুনির্দিষ্টভাবে বলা যায় একজন মননশীল প্রবন্ধকার।
ছিয়ানব্বই বছর বয়সেও তাঁর মন সচল, আর কলম এখনও থামেনি। এটা আমাদের জন্যে সৌভাগ্যের বিষয়। অনেকেই দেখা যায় কোনও সফল আন্দোলন-সংগ্রামে জড়িয়ে পড়লে সেই সাফল্যের জেরে, অনেক সময় নিজে স্বচ্ছন্দ বোধ করবেন কি-না তা না ভেবে, ঘটনার গতিবেগে ভেসে গিয়ে ক্রমেই প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক জগতে জড়িয়ে যান। আহমদ রফিক ভেসে যাওয়ার বা ভেঙে পড়ার মানুষ নন। তাঁর চিন্তা যেমন স্বচ্ছ, ব্যক্তিত্ব ঋজু, তেমনি নিজের অবস্থান ও করণীয় সম্পর্কেও তাঁর ধারণা স্পষ্ট।
তিনি ডাক্তারি পাস করে নিজের পেশা নির্ধারণ করে নিয়েছেন। কিন্তু সেই ব্যস্ততার পেশা তাঁকে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধতে পারেনি। বরং নানা রকম স্বাধীন উদ্যোগের চেষ্টা বিফল হওয়ার পর পেশাগত দায়িত্ব পালন করেছেন নীরবে, নেপথ্যে, ব্যক্তিগত পর্যায়ে, কিন্তু পাশাপাশি জনজীবনে প্রাসঙ্গিক থেকে সচল রেখেছেন তাঁর কলম। গণসচেতন সৃজনশীল মানুষটি প্রথম জীবনে কবিতায় মনোযোগী ছিলেন, তবে বাস্তবতার দাবি তাঁর ভেতরকার চিন্তাশীল মানুষটিকে কেবল সক্রিয় করে তুলেছে বেশি, তাতে মননশীল প্রাবন্ধিক সত্তা ক্রমেই কবি-পরিচয়কে ছাপিয়ে গেছে। আজ হয়তো পাঠক তাঁর কবিতা সম্পর্কে আর অবহিত নন―যদিও কেবল ৬/৭টি কাব্যগ্রন্থই তাঁর প্রকাশিত হয়নি, কবিতা নিয়ে একজন প্রকৃত সমঝদারের বোধ ও মেধায় রচিত কবিতাবিষয়ক প্রবন্ধগ্রন্থের সংখ্যাও কম নয়।
জনাব আহমদ রফিকের লেখালেখির একটি ধারাবাহিকতা আছে। প্রথম থেকেই তিনি মুক্তচিন্তার মানুষ, প্রগতিচেতনাকে ধারণ করে সক্রিয় থেকেছেন। রাজনৈতিক বিশ্বাসে তিনি বামপন্থি, সমাজতন্ত্রবাদী। ১৯৯১-এ সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ও মুক্তবাজার অর্থনীতির জোয়ারে চীনসহ সর্বত্র সমাজতন্ত্রের অবসানের মধ্যেও আহমদ রফিকের মার্কসবাদে অঙ্গীকার ও সমাজতন্ত্রের প্রতি আস্থা বজায় রয়েছে। এটি তাঁকে ব্যক্তিগত সাফল্য, ব্যস্ততা বা বয়স ও প্রতিষ্ঠার মধ্যেও গণমুখী অবস্থান বজায় রাখার প্রেরণা দিয়ে গেছে এবং নীতি-আদর্শের প্রতি দায়বদ্ধ রেখেছে। জনাব আহমদ রফিক যেন একজন আদর্শবাদী দায়বদ্ধ মনীষীর প্রতীক। তাঁর কাব্যগ্রন্থগুলোর নামে আমরা দায়বদ্ধ একজন কবির সন্ধান পাই―বাউল মাটিতে মন (১৯৭০), রক্তের নিসর্গে স্বদেশ (১৯৭৯), বিপ্লব ফেরারী, তবু (১৯৮৯), পড়ন্ত রোদ্দুরে (১৯৯৪) ইত্যাদি আর প্রবন্ধ গ্রন্থগুলো আরেক কালান্তর (১৯৭৭), বুদ্ধিজীবীর সংস্কৃতি (১৯৮৬), ভাষা আন্দোলন, ইতিহাস ও তাৎপর্য (১৯৯০), জাতিসত্তার আত্মঅন্বেষা (১৯৯৭), বাংলাদেশ: জাতীয়তা ও জাতিরাষ্ট্রের সমস্যা (২০০০), বাঙালির স্বাধীনতা যুদ্ধ (২০১২), দেশবিভাগ: ফিরে দেখা ইত্যাদিতে জাতীয় ইতিহাসের প্রতি এক দায়বদ্ধ বুদ্ধিজীবীর প্রখর ভাবনার প্রকাশ ঘটে।
আমাদের সমাজে সাম্প্রদায়িকতা ও লুটেরা পুঁজিবাদের আগ্রাসন এবং রাজনৈতিক আদর্শবাদের অবসানের ফলে রাষ্ট্র ও সমাজে নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও রুচির সংকট গভীর হচ্ছে। পাশাপাশি মুক্তবাজার অর্থনীতির দাপটে এই মানবিক সংকট কেবল গভীর, তীব্র ও বিস্তৃত হচ্ছে। এমন সময়ে বুদ্ধিজীবী, পেশাজীবী ও সংস্কৃতিকর্মীসহ সমাজের সংবেদনশীল সচেতন মানুষের মধ্যেও আমরা অবক্ষয় ও দিগভ্রান্তিই দেখতে পাচ্ছি। এর মধ্যে যে অল্প কয়েকজন মানুষ তাঁদের অবস্থান দৃঢ়ভাবে ধরে রেখেছেন, পথচলার ধারাবাহিকতা বজায় রেখে চলছেন তাঁদের মধ্যে লেখক আহমদ রফিক অন্যতম। এখনও ‘কেন সমাজে যুক্তিবাদী চেতনার প্রসার ঘটেনি, কেন ইউরোপীয় রেনেসাঁসের দর্শন-বিজ্ঞান-কেন্দ্রিক যুক্তিবাদী চেতনা-বিশ্বকে জানা, জীবনের রহস্য উদ্ঘাটন, অজানাকে জানা-চেনা-বোঝার ও জয় করার মানসিকতা আমাদের মননে আকাক্সিক্ষত মাত্রায় প্রভাব ফেলেনি, আবার রক্ষণশীলদের অচলায়তন কেন ভেঙে ফেলা যায়নি’ সেসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা আজ জরুরি বলেই তিনি মনে করেছেন। কেন যায়নি ? ‘আসলে অন্ধ ধর্মীয় চেতনা ও রক্ষণশীল আচার বা সংস্কারে গড়া অচলায়তনের ভিত ধরে টান দিয়ে তাকে গোড়া থেকে উপড়ে ফেলতে পারাই সমাধানের উপায়।’ আর তাও এখনও না পারার কারণ―‘মুক্তি না পাওয়ার গোড়ার গলদ শিক্ষার সঙ্গে যুক্তিবাদকে একাত্ম করে নিতে না পারা।’ (যুক্তিবাদী সংস্কৃতির আত্মঅন্বেষা, সংস্কৃতি কথা: যুক্তিবাদ মুক্তচিন্তা, পৃ. ২৮-২৯)
দীর্ঘ জীবনে তাঁর মুখ্য পরিচয় তিনি চিন্তাশীল লেখক। প্রধানত সমাজ, ইতিহাস ও সমকালীন রাজনীতি তাঁর ভাবনা ও লেখার বিষয়। একটি প্রগতিশীল সমাজ বিনির্মাণের পথে ধর্মীয় রক্ষণশীলতা ও সাম্প্রদায়িকতার মনোভাব বড় প্রতিবন্ধক। আহমদ রফিক তাঁর জীবনকালের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা এবং অধ্যয়নকে কাজে লাগিয়ে এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছেন দেশভাগ: ফিরে দেখা গ্রন্থে। আমাদের সামাজিক-রাজনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ পর্বগুলোর তিনি একজন অংশীজন, প্রত্যক্ষদর্শী এবং নিবিড় পাঠক। এর সমন্বয় ঘটেছে তাঁর লেখায়। তিনি দীর্ঘজীবনে নিরবচ্ছিন্নভাবে লিখে গেছেন এবং প্রকাশ করেছেন একের পর এক বই। সমকালীন বিভিন্ন ঘটনা ও ইস্যুর প্রেক্ষাপটে তিনি ইতিহাস ও সমাজ বিজ্ঞানের আলোকে স্বকীয় দৃষ্টিকোণ থেকে আলোকপাত করে আজও দৈনিক পত্রিকার পাতায় কলাম লিখে যাচ্ছেন। সেসব কলামের একটি সংকলনও রয়েছে। বর্তমান সময়েও উন্নয়নের অসমতা ও চরম বৈষম্যের মধ্যে শিক্ষার সংকট ও যুক্তিবাদী মননের অভাবে যে অবক্ষয় ও সংকট তৈরি হয়েছে তার চূড়ান্ত মূল্যায়নে যেন বেরিয়ে আসে তাঁর কলম থেকে ‘আমাদের সমস্ত সমস্যা-সংকটের মূলে রয়েছে দেশাত্মবোধহীন রাজনৈতিক ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, পারস্পরিক সংঘাত, প্রবল অর্থলোভ ও দুর্নীতি এবং তা সব পক্ষকে ঘিরে।’ (‘একটি অসমাপ্ত মুক্তিযুদ্ধ সমাধানের গল্প’ একুশে থেকে একাত্তর, পৃ. ২১৫)।
আহমদ রফিকের চর্চার আরেক প্রিয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রবীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্র-সাহিত্যকে তিনি যখন মূল্যায়ন করেন তখন এই বামপন্থি চিন্তকের ভিতরকার চিরায়ত বাঙালি সত্তাটি উন্মোচিত হয়। বোঝা যায় এ বাঙালিত্ব রবীন্দ্রসাহিত্যের একনিষ্ঠ পাঠক হিসেবে তাঁর অন্তর জুড়ে এক গভীর রুচি ও নান্দনিকতার আবেগের ঝরনাধারা বইয়ে দেয়। ফলে বোঝা যায় আন্তর্জাতিকতা ও বৈশ্বিক সর্বজনীনতায় বিশ্বাসী এই মানুষটি অন্তরের গভীর থেকেই খাঁটি বাঙালি। তিনি গভীর নিষ্ঠায় বোঝার চেষ্টা করেন রবীন্দ্রনাথের গ্রামোন্নয়নের উদ্যোগগুলো। কীভাবে কবি গ্রামের কৃষক ও দরিদ্র মানুষের কল্যাণে অর্থনৈতিক ও জীবনমানের উন্নতির জন্যে কাজ করে গেছেন সেসব বিষয়ও উঠে এসেছে তাঁর লেখায়। ক্ষুদ্র ঋণের প্রবর্তক হিসেবে আহমদ রফিক রবীন্দ্রনাথকেই সব কৃতিত্ব দিতে চান―তাঁর সে উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত সফল হয়েছিল কি-না সে বিচারকে ততটা গুরুত্ব না দিয়ে। তবে বোঝা যায় গ্রামবাংলার সাধারণ মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের বিষয়টি তাঁর চেতনায় রাজনীতির অনুষঙ্গ নয় কেবল, এ তাঁর সাহিত্যিক বিবেচনারও বিষয়। যেভাবে রবীন্দ্রনাথ সাহিত্যে গ্রামের সাধারণ দরিদ্র মানুষ ও তাদের জীবনকে জীবন্ত করে তুলেছিলেন ঠিক তেমনি একাগ্রতা ও হৃদয়বেত্তার সঙ্গে আহমদ রফিক তাদের কথা ভাবেন, লেখেন।
আহমদ রফিকের প্রসঙ্গে আরেকটি কথা মনে পড়ছে। ভাষা-আন্দোলন থেকে গণআন্দোলন ও গণঅভ্যুত্থান হয়ে মুক্তিযুদ্ধ এবং তারপরে গণতন্ত্রের সংগ্রামে এদেশের মুক্তচিন্তার লেখকগণ সক্রিয় ভূমিকা পালন করে গেছেন। এই ধারাবাহিক ভূমিকার ফলে তাঁরা যেন বাংলাদেশের অভিযাত্রার অগ্রপথিক। সেদিক থেকে আজকে রাজনীতি ও সামাজিক বাস্তবতার যে পরিণতি ঘটে চলেছে তা নিশ্চয়ই এঁদের জন্যে মর্মবেদনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনীতিতে নীতি-আদর্শের বালাই প্রায় নেই বললেই চলে, দেশচেতনা ও মানবভাবনাও কি আর অবশিষ্ট থাকছে ? সমাজ তাহলে কীভাবে এগুবে, তামাদি ভাবনা ও সংস্কার থেকে কীভাবেই বা বেরিয়ে আসবে ? আজ রাজনীতি বা সামাজিক অঙ্গনে মুক্ত বিবেকী কণ্ঠস্বর কম শোনা যায়। বিলীয়মান সেইসব কণ্ঠের অধিকারীদের একজন আহমদ রফিক। এঁরা বুঝি আমাদের সভ্যতার নিঃসঙ্গ সৈনিক। ভালো কথা, জীবন সায়াহ্নে তাঁকে যে সম্মান জানানোর কথা ভাবা হচ্ছে, তাতে যুক্ত হয়েছেন নতুন প্রজন্মের ভাবুক, সংগঠকেরা। এই শুভ সংযোগের সার্থকতা কামনা করি। আমাদের শ্রদ্ধেয় আহমেদ রফিকের সক্রিয় শতায়ু কামনা করি।
লেখক : প্রাবন্ধিক



