আর্কাইভপ্রচ্ছদ রচনা

প্রচ্ছদ রচনা : আহমদ রফিক এক দীপান্বিত মনীষা : পবিত্র সরকার

প্রচ্ছদ রচনা : ভাষাসৈনিক আহমদ রফিক―মূল্যায়ন

১৯৯৮ সালে বাংলাদেশের বৃহত্তম সেতু যমুনা ব্রিজ উদ্বোধন অনুষ্ঠান দেখার সুযোগ হয়েছিল ও দেশের সরকারের আমন্ত্রণে। আন্তর্জাতিক সাংবাদিক দলে আমারও স্থান হয়েছিল। সাংবাদিকদের মধ্যে মার্ক টালির মতো আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ব্রিটিশ সাংবাদিকও ছিলেন, যিনি ১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ভাঙার ঘটনাটি বিবিসি প্রতিনিধি হিসেবে টিভি চ্যানেলে প্রচার করে বিশ্বকে ঐ ভয়ংকর ঘটনা জানার সুযোগ করে দেন। যেহেতু সফরসূচি অনুযায়ী আমাদের চলতে হচ্ছিল তাই ইচ্ছে থাকলেও অনেকের সঙ্গে দেখা করতে পারিনি। তবে একটু সময় বের করে ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিজীবী বদরুদ্দীন উমর এবং তখনকার সময়ে বাংলাদেশে শ্রেষ্ঠ কবি শামসুর রাহমানের সঙ্গে দেখা করে মতবিনিময়ের সুযোগ পেয়েছিলাম। পরিচিতি থাকা সত্ত্বেও বাহান্নর একুশে ফেব্রুয়ারির ঐতিহাসিক ভাষা-আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক ডা. আহমদ রফিকের সঙ্গে সে-যাত্রায় দেখা করতে পারিনি। এটা আমার একটা বড় আক্ষেপ।

একুশের ভাষা-আন্দোলন নিয়ে বদরুদ্দীন উমরের গ্রন্থকেই সবাই আকরগ্রন্থ হিসেবে মান্যতা দিয়েছে। কিন্তু পরবর্তীকালে ডা. রফিক ভাষা আন্দোলন : ইতিহাস ও তাৎপর্য (১৯৯১) নামে যে বইটি লিখেছেন তাতে অনেক নতুন তথ্য ও বিশ্লেষণ সন্নিবেশিত হয়েছে। পঁচানব্বই ছুঁয়ে যাওয়া এই মানুষটি নিঃসন্দেহে দুই বাংলার শীর্ষস্থানীয় মৌলিক প্রবন্ধকার, সেই সঙ্গে কবি ও কলামিস্ট। এক সময় তিনি পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরে দলীয় রাজনীতি ছেড়ে মুক্তবুদ্ধির চিন্তাবিদ ও সমাজকর্মী হিসেবে থাকতে চাইলেন এবং এখনও সেভাবেই আছেন। এ-বাংলার অর্থাৎ পশ্চিমবাংলার বুদ্ধিজীবী মহলে তাঁর অবাধ যাতায়াত ছিল। ১৯৯১-৯২ সালে সামাজিক সংগঠক প্রাণতোষ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মাধ্যমে তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয়। সে-সময় বিধাননগর বা সল্টলেকে বিদ্যাসাগর নিকেতনে বলিষ্ঠ সাংবাদিক সোমেশ দাশগুপ্ত (বর্তমানে প্রয়াত)-র ফ্ল্যাটে প্রতি রবিবার সকালে ঘরোয়া আড্ডা হতো। দাশগুপ্তই ছিলেন এর উদ্যোক্তা। এ বাংলার অনেক বড় বড় মানুষ সে আড্ডায় কোনও না কোনও সময়ে যোগ দিয়েছেন। বেশ কয়েকবার ডা. রফিকও এসেছেন ও আলোচনায় অংশ নিয়েছেন। খুব সহজ, সাদাসিধে, নিরহংকার মানুষ। অসম্ভব রকম জ্ঞানী ও ওয়াকিবহাল। লক্ষ করলাম, তিনি বেশ গুছিয়ে নিজের কথা বলতে জানেন। অচিরেই সোমেশ দার সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে উঠল। কয়েক বছর পর তিনি সাম্প্রদায়িকতার ওপর একটি মূল্যবান গ্রন্থ সম্পাদনা করেন। তাতে সোমেশ দাশগুপ্তের একটি প্রবন্ধ যুক্ত হয়। ওই সম্পাদিত গ্রন্থটি আমার বেশ ভালো লেগেছিল। দেখলাম, ডা. রফিক ধর্ম সম্পর্কে যান্ত্রিক কালাপাহাড়ি দৃষ্টি পোষণ করেন না। ধর্মের রাজনৈতিক-মৌলবাদিক স্বার্থবুদ্ধির তিনি প্রবল বিরোধী, আবার সাধারণ মানুষের ধার্মিকতার আশ্রয়কে তিনি স্বীকার করেন। মার্কস যেভাবে বলেছিলেন―ধর্ম শোষিত মানুষের কাছে আফিং আবার দীর্ঘশ্বাস। অর্থাৎ শোষকশ্রেণি ধর্মের আফিং খাইয়ে মানুষকে শোষণ করে। আবার সেই মানুষরা ধর্মের জন্য দীর্ঘশ্বাস ফেলে, শোষণের বিরুদ্ধে বাঁচার জন্য ধর্মকে আঁকড়ে থাকে। এক ধরনের গোঁড়া রাজনৈতিক ব্যক্তি মার্কসের এই দার্শনিক ধর্মতত্ত্বের দ্বান্দ্বিকতা বুঝতে অক্ষম কিন্তু আহমদ রফিক মার্কসের এই ধর্মতত্ত্ব আত্মস্থ করেছেন। তিনি বিশ্বাস করেন মহামানবতাই মানুষের আসল ধর্ম।

ডা. রফিক প্রবন্ধ কবিতা ও অন্যান্য গদ্য মিলিয়ে ষাট খানার বেশি বই লিখেছেন। একাত্তরে পাক বর্বরতার সংবাদভাষ্য (২০০০) কলামিস্ট হিসেবে তাঁর পরিচয় তুলে ধরে। এই বই পড়তে পড়তে সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের সংবাদভাষ্য ক্ষমা নেই (১৯৭১) বা শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ডেটলাইন ঢাকা (১৯৭১) মনে পড়ে যায়। স্বীকার করে নেওয়া ভালো আমি তাঁর সব কটি বই পড়ার সুযোগ পাইনি। কিন্তু যে পাঁচ-সাতটি পড়েছি তা থেকে তাঁর মাপটা বুঝে নিতে অসুবিধা হয়নি। গৃহিণী যেমন দু-একটা ভাত টিপে বুঝে নেন গোটা হাঁড়ির ভাত সেদ্ধ হয়েছে কিনা। আহমদ রফিকের মৌলিক কাজ কোনটি ? যে কোনও গবেষক-প্রবন্ধকারের ক্ষেত্রে এটাই বড় প্রশ্ন। আমার বিবেচনায় বাঙালি ও বাংলাদেশি জাতিসত্তার স্বরূপ বিশ্লেষণ ও বাংলাদেশ নামক এক ভাষিক-জাতিক রাষ্ট্রের সমস্যা অনুধাবনের চেষ্টা। এই সমস্যার উৎসমূল খুঁজতে গিয়ে তাঁকে ভারতীয় জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ও বিস্তার নিয়ে গভীর চর্চা করতে হয়েছে। পাকিস্তান ও বাংলাদেশের জাতিরাষ্ট্রের সমস্যা আলোচনা করতে হলে ভারতীয় জাতীয়তাবাদের ইতিহাস জানতেই হবে। কারণ ভারত ভেঙেই পাকিস্তান ও বাংলাদেশের জন্ম। ডা. রফিক এটা লক্ষ করেছেন, একদিন সর্বভারতীয় স্তরে বিদেশি শাসন থেকে মুক্তির আকাক্সক্ষায় জাতীয়তার অবাস্তব মিথ সৃষ্টি হয়েছিল। ‘দ্রাবিড়, মারাঠা, বঙ্গ ও উত্তর অঞ্চল থেকে উৎসারিত ঐ জাতীয়তার চেতনা সমস্যার আপাত সমাধান মনে হলেও তা স্থায়ী ও বিজ্ঞানসম্মত সমাধান ছিল না। এতে করে সম্প্রদায়বাদী রাজনীতি বিকশিত হতে পেরেছে, এমনকি জাতিসত্তাভিত্তিক সর্বজনীন চেতনা দিকভ্রষ্ট হয়েছে, তাকে আত্মঘাতী হতে সাহায্য করতে।’ আজকে ২০১৮ সালে ভারতে উগ্র জাতীয়তাবাদের যে বিচ্ছুরণ ঘটেছে তা থেকে বুঝতে পারা যায় দু দশক আগের করা ডা. রফিকের বিশ্লেষণ কতটা সঠিক (জাতিসত্তার আত্মঅন্বেষা: বাঙালী ও বাংলাদেশী)।

আহমদ রফিক তাঁর ঐ গ্রন্থে আরেকটি বিষয় প্রসঙ্গত উল্লেখ করেছেন। ভারতীয় জাতীয় আন্দোলনের সমগ্র কালপর্বে মুসলমানদের যে অবদানটুকু ছিল তা জ্ঞাত ও অজ্ঞাতসারে উপেক্ষা করা হয়। এই প্রসঙ্গে তিনি অবিভক্ত বাংলার তিন মুসলিম ব্যক্তিত্ব সৈয়দ নৌসের আলি ও কবির ভ্রাতৃদ্বয় (হুমায়ুন ও জাহাঙ্গির)-এর কথা উল্লেখ করেছেন। কিন্তু অখণ্ড ভারতের পক্ষে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে যে নেতা মুসলিম লীগ দুষ্কৃতীদের হাতে মাত্র ৪৩ বছরে জীবন দিয়েছেন, তিনি হচ্ছেন আল্লা বক্স―দু দফায় সিন্ধুপ্রদেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, যাঁকে ব্রিটিশ রাজ্যপাল ১৯৩৮ সালে বরখাস্ত করেন। আহমদ রফিক তাঁর উপরোক্ত গ্রন্থে ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনে বক্সের অবদান উল্লেখ করেছেন।

বাংলাদেশের বাঙালি জাতিসত্তার প্রকৃত বিকাশে প্রগতিবাদী শিক্ষিত শ্রেণিকেই এগিয়ে আসতে হবে বলে তিনি দৃঢ় মত পোষণ করেছেন। আহমদ রফিক আক্ষেপের সঙ্গে বলেছেন ‘এদেশের সমাজতন্ত্রীরা বাঙালী জাতিসত্তার আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের বিষয়টি রাজনৈতিক কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত করেননি। বরং তাদের কেউ কেউ এর বিরোধিতা করেছেন।’

বাঙালি মুসলমানের জাতীয়তাবাদের বহুমাত্রিক জটিলতা নিয়ে জনাব রফিক বিস্তৃততর আলোচনা করেছেন ২০০০ সালে প্রকাশিত বাংলাদেশ জাতীয়তা ও জাতিরাষ্ট্রের সমস্যা গ্রন্থে। এটিকে সাহিত্যগ্রন্থ না বলে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের গবেষণা গ্রন্থ বলা উচিত। রচনারীতিতে রাবীন্দ্রিক ধাঁচ রয়েছে। উল্লেখ করা যেতে পারে তিনি বাংলাদেশের রবীন্দ্রচর্চা কেন্দ্র ট্রাস্টের প্রতিষ্ঠাতাও। রবীন্দ্রনাথের ওপর তাঁর সবিশেষ উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ―রবীন্দ্রনাথের চিত্রশিল্প (১৯৯৬) ও রবীন্দ্রভুবনে পতিসর (১৯৯৮)। ডা. রফিক নিজে আমাকে শেষোক্ত বইটি উপহার দিয়েছিলেন।

অনেকেই বলে থাকেন এবং মেনেও থাকেন, বাহান্নর ভাষা-আন্দোলন, ষাটের দশকে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন এবং পরবর্তী পর্যায়ে ১৯৭১-এর মার্চ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সম্প্রদায় নির্বিশেষে জনতার ব্যাপকতম অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা আন্দোলন পৃথিবীর মানচিত্রে বাংলাদেশ নামক এক স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল যেটি এক ভাষিক জাতিক রাষ্ট্র। ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশের অবিসংবাদী জননেতা শেখ মুজিবুর রহমানের ষড়যন্ত্রমূলক হত্যাকাণ্ডের পর যারা ক্ষমতায় এলেন তারা পরিকল্পিতভাবে সংবিধানের মৌল চরিত্র বদল করে, ইসলামকে দেশের রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ বলে নতুন ভাবনার জন্ম দিলেন। অর্থাৎ বাঙালির নিজস্বতার সঙ্গে ধর্মীয়তার মেলবন্ধনে জাতিরাষ্ট্রের চরিত্র বদল হলো এবং ধর্মচেতনাজারিত জাতীয়তার প্রকাশ ঘটল। ডা. রফিক তাঁর উপরোক্ত গ্রন্থে প্রতিটি বিষয়ের অনুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করে প্রকৃত ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক জাতীয়তাবাদের লক্ষ্যে পৌঁছাবার চেষ্টা করেছেন। ভারতের দিকে তাকিয়ে তিনি মন্তব্য করেছেন, বিশ্বে এখন ধর্মীয় মৌলবাদের প্রাধান্যই বেশি। এই অবস্থায় বাংলাদেশে প্রকৃত ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদী আদর্শ প্রতিষ্ঠা করা খুবই কঠিন কাজ। তিনি এ প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘এ অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে পারত তৃণমূলস্তরে, নিম্নবর্গীয় শ্রেণিতে শ্রেণিচেতনার বিকাশ ও শ্রেণি সংগ্রামের প্রভাব। কিন্তু এদেশে সমাজবাদীদের কর্মকাণ্ডের ফলে তেমন সম্ভাবনা অনেক আগেই বিদায় নিয়েছে। একুশ শতকে পৌঁছেও কৃষি শ্রমজীবীদের মধ্যে শ্রেণি চেতনা নামীয় কোনও উপলব্ধি আবিষ্কার করা কঠিন হবে।’ বাংলাদেশ পরিস্থিতির দিকে তাকিয়ে তিনি কথাগুলো বললেও এটা ভারতীয় উপমহাদেশের প্রায় সাধারণ অবস্থা। পরিশেষে তাঁর বিশ্বাস, সর্বজনীন চরিত্রের জাতিরাষ্ট্র তৈরি হওয়া খুবই কঠিন কাজ হওয়া সত্ত্বেও মানবধর্মের সাধনাই পথ দেখাতে পারে। তিনি যখন গ্রন্থটি রচনা করেন তখনও প্রকৃত ধর্মনিরপেক্ষ শাহবাগ আন্দোলন (২০১৩)-এর বিচ্ছুরণ ঘটেনি। যাই হোক সে আন্দোলনের রেশ এখন বিশেষ নেই। অতএব আবার সময় মেপে চলা।

আহমদ রফিকের সাম্প্রতিকতম গ্রন্থ ইলা-রমেন কথা প্রাসঙ্গিক রাজনীতি ২০১৮-এর ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত হয়েছে। এটি নতুন ধাঁচের রচনা। পঞ্চাশ দশকের এক ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ পরিস্থিতিতে ইলা রমেন মিত্রের সঙ্গে তাঁর পরিচয়ের সূত্র ধরে তিনি গ্রন্থটি রচনা করেছেন। ১৯৫০ সালে পূর্ব পাকিস্তানের নাচোলে আদিবাসী কৃষকদের জমি আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়ায় ইলা মিত্রকে নূরুল আমীন সরকারের পুলিশ গ্রেফতার করে ও তাঁর ওপর চরমতম শারীরিক অত্যাচার ও যৌন নিপীড়ন চালায়। অসুস্থ অবস্থায় ফজলুল হকের পরামর্শে ১৯৫৪ সালে তিনি এ বাংলায় চলে আসেন এবং আমৃত্যু (২০০৩ পর্যন্ত) এখানেই থেকে যান। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডা. রফিকের সঙ্গে ইলা মিত্রের পরিচয় হয় এবং তাঁদের সে পরিচয় বজায় ছিল। কলকাতায় তিনি রমেন-ইলা মিত্র, তাঁদের পুত্র মোহন, পুত্রবধূ সুকন্যা ও নাতির সঙ্গে দেখা করেন ও অনেকটা সময় কাটান। ডা. রফিক এই সিদ্ধান্তে এসেছিলেন, রাজনৈতিক মত ও পথে মিত্র দম্পতির নমনীয়তা এলেও শেষাবধি ইলা-রমেন মিত্র আদর্শ কমিউনিস্টই ছিলেন। তিনি প্রাসঙ্গিক রাজনীতি বিশ্লেষণ করে বলেছেন, পূর্ব বাংলার মুসলমান কৃষকরা ১৯৪৭-এ যখন পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় আনন্দিত তখন তেভাগা আন্দোলনে তারা তেমনভাবে সাড়া দেননি। এবং এ আন্দোলনকে পাকিস্তানবিরোধী মনে করেছিলেন। এটাকে ডা. রফিক স্রোতের বিপরীতে যাওয়া বলে মনে করেছেন।

এতক্ষণ আহমদ রফিকের প্রবন্ধ-সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করলাম, এবার তাঁর কবিতার জগতে প্রবেশ করি। মাধ্যমটা হয়ত আলাদা, বিপ্লবের পক্ষে তাঁর উচ্চারণ স্পষ্ট। ২০১৩-য় প্রকাশিত বিপ্লব ফেরারী, তবু কাব্যগ্রন্থে তাঁর পড়ন্ত বেলার কবিতাগুলো সংকলিত। তিনি বুঝতে পারছেন বিপ্লব এখন ফেরারি, তবু তিনি আশাহত নন, সমাজ পরিবর্তনের লক্ষ্যে অবিচল। তাই তিনি বলতে পেরেছেন―

আপাতত বিপ্লব ফেরারি, তবু এ মাটির একক সুগম্য বেনামি বন্দরে একা জেগে আছে প্রত্যাশার বিনিদ্র আশ্রয়ে। (বিপ্লব ফেরারী, তবু) রাজনৈতিক ভুলভ্রান্তি সংশোধন করে লক্ষ্যপথে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন : না, মৃত্যুকে বারবার ভুল পথে হাঁটতে দিও না (মৃত্যুকে আর)। কঠিন সময়ে, চরম নৈরাশ্যের মধ্যে সাথীদের উদ্দেশে প্রশ্ন রেখেছেন―

কতদিন ভালোবাসা সাথে নিয়ে হাঁটতে চেয়েছো।

ভালোবাসা গায়ে মেখে এখন নির্ভয়ে

হাঁটতে পারবে?

এই দুঃসময়ে? (ভালোবাসা নিয়ে চলা)

হ্যাঁ, আজও আহমদ রফিক ‘ভালোবাসা সাথে নিয়ে’ পথ হাঁটছেন। বয়সের অভিঘাতে তাঁর শরীর অনেকটা অশক্ত, দৃষ্টিশক্তি আচ্ছন্ন, তবু মনটা যথেষ্ট তেজি আছে। বুদ্ধির প্রখরতা হারাননি। আমরা চাই এই প্রবুদ্ধ মানুষটি মনীষায় সমুজ্জ্বল থেকে শতবর্ষ অতিক্রম করুন।

 লেখক : প্রাবন্ধিক

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button