প্রচ্ছদ রচনা : আহমদ রফিকের রবীন্দ্র-গবেষণা : গ্রাম, কৃষি ও কৃষক : ইসমাইল সাদী

প্রচ্ছদ রচনা : ভাষাসৈনিক আহমদ রফিক―মূল্যায়ন
বাংলাদেশের প্রবন্ধসাহিত্য, ভাষা আন্দোলন ও রবীন্দ্র-গবেষণার ক্ষেত্রে নন্দিত এক নাম আহমদ রফিক। তাঁর নামের আগে অন্য অনেক বিশেষণ ব্যবহৃত হলেও অবিচ্ছেদ্যভাবে উচ্চারিত হয় দুটি শব্দবন্ধÑএক. ভাষাসংগ্রামী, দুই. রবীন্দ্র-গবেষক। তবে সাহিত্য সমালোচনা, বাংলা কবিতার নানা অনুষঙ্গ উদ্্ঘাটনসহ বহু বিচিত্র বিষয়ে উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ প্রণয়ন করেছেন তিনি। ভাষা আন্দোলনের সংগঠক হিসেবে তাঁর অবদানকে ঊর্ধ্বে রেখেই বলতে হয়, ভাষা আন্দোলনের নৈর্ব্যক্তিক ইতিহাসচর্চার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান অনেকটাই পথিকৃতের। অন্যদিকে রবীন্দ্রসাহিত্য নিয়ে এককভাবে সবচেয়ে বেশি গ্রন্থ প্রণয়ন করেছেন তিনি। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকে মেধাতালিকায় স্থান অধিকার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেছিলেন তিনি। কিন্তু ভাষা আন্দোলনে সম্পৃক্ত থাকার ‘অপরাধে’ তাঁকে ইন্টার্ন করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হয়। সঙ্গতকারণে চিকিৎসাকে পেশা হিসেবে বেছে নিতে পারেননি। অনেকটা বিকল্প হিসেবে তিনি সার্বক্ষণিক পেশা হিসেবে লেখালেখি ও গবেষণাকে বেছে নিয়েছিলেন। ব্যক্তির শুশ্রƒষায় নিজেকে নিয়োজিত করতে না পারলেও লেখালেখির মধ্য দিয়ে তিনি মূলত ‘সমাজেরই চিকিৎসা’ করতে চেয়েছিলেন।
এক সময়ের বামপন্থি রাজনৈতিক কর্মী আহমদ রফিক কেবল স্বীকৃতি ও সম্মানের জন্য লেখালেখির সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত করেননি। মানুষ ও সংস্কৃতির প্রতি অকৃত্রিম দায়বোধের তাগিদ থেকে সমাজ বদলের সংগ্রামী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে তিনি কলমকে শাণিত করেছিলেন। গত শতকের পঞ্চাশের দশক থেকে আজও তিনি লিখে চলেছেন বিরামহীনভাবে। বয়স শতক ছুঁতে বাকি মাত্র বছর-পাঁচেক। দৃষ্টিশক্তি ও শ্রুতিশক্তি দুর্বল হলেও স্মৃতিশক্তি এখনও প্রখর। জুৎসই শ্রুতিলেখক পেলে এখনও যথেষ্ট চিন্তাশীল ও বিশ্লেষণী নিবন্ধ লেখার সামর্থ্য রাখেন। তাঁর লেখার গতিমুখ আর বাঙালির আন্দোলন-সংগ্রাম যেন একসূত্রে গাঁথা। ভাষা আন্দোলনের পরবর্তী সময়ে বাঙালির ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে যতই পাকিস্তান সরকার ও তাদের অনুসারীরা নানা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে, বাঙ্গালি ততই সংগঠিত হয়েছেÑমোকাবিলা করেছে সমূহ প্রতিকূলতা। একইভাবে ভাষাসংগ্রামী আহমদ রফিকের লেখালেখির ক্ষিপ্রতাও যেন বেড়েছে বিষয়বৈচিত্র্য ও নান্দনিক কুশলতায়। কবিতা দিয়ে তাঁর লেখালেখির হাতেখড়ি হলেও প্রথম প্রকাশিত হয় প্রবন্ধগ্রন্থ (১৯৫৮); নাম শিল্প সংস্কৃতি জীবন।
ষাটের দশকে পাকিস্তানি সরকারের সাম্প্রদায়িক চেহারা যখন ক্রমশ উৎকটভাবে প্রকাশিত হচ্ছিল, তখনই কাজী নজরুল ইসলামের কবিতার ‘ইসলামীকরণ’ এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান-কবিতার প্রচার ও প্রকাশের ওপর আরোপ করা হয় নিষেধাজ্ঞা। আহমদ রফিকের রবীন্দ্রসাহিত্যচর্চার তাগিদ সেই থেকে শুরু। স্বাধীন বাংলাদেশেও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্য নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনার অব্যাহত ছিল, যা এখনও বিদ্যমান। সেই পরিস্থিতিতে বাংলা একাডেমি রবীন্দ্রসাহিত্য-বিষয়ক গ্রন্থ প্রকাশের উদ্যোগ নেয়। ১৯৭৭ সালে প্রকাশিত সেই গ্রন্থের নাম আরেক কালান্তর; লেখক আহমদ রফিক। অর্থাৎ আরেক কালান্তর বাংলাদেশের কোনও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান থেকে প্রকাশিত আহমদ রফিক রচিত রবীন্দ্রসাহিত্য-বিষয়ক প্রথম গ্রন্থ। এর মধ্য দিয়ে আহমদ রফিক যে মাইলফলক স্থাপন করেছিলেন, তার গতিধারা আরও বহু বিস্তৃত হয়েছে তাঁর নিরলস রবীন্দ্রচর্চার মধ্য দিয়ে। রবীন্দ্রসাহিত্যের বহু বিচিত্র অনালোকিত দিক নিয়ে তিনি গবেষণা করেছেন, নতুন পাঠোন্মোচন করে পাঠকের সামনে হাজির হয়েছেন। রচনা করেছেন বাংলা একাডেমি কর্তৃক প্রকাশিত চার খণ্ডের রবীন্দ্রজীবনের দুই খণ্ড। তবে রবীন্দ্র-অধ্যয়নের ক্ষেত্রে তুলনামূলক কম আলোচিত পূর্ববাংলার গ্রাম, কৃষি ও কৃষক নিয়ে আহমদ রফিকের পর্যবেক্ষণ-দৃষ্টিকে বেশ অভিনব মনে হয়। বলা যেতে পারে, এক্ষেত্রেও তিনিই অগ্রপথিক। বিশেষত পতিসরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জমিদারির দায়িত্ব পালন, কালিগ্রামে কৃষিব্যাংক স্থাপন, ক্ষুদ্রঋণ বিতরণের প্রয়াস ইত্যাদি আহমদ রফিকের অনুসন্ধিৎসু মনের নির্মোহ দিকেরই পরিচয় বহন করে। তাঁর পর্যালোচনা সম্পর্কে পাঠককে অবগত করাই এ লেখার প্রধান উদ্দেশ্য।

দুই
বংশপরম্পরায় জমিদারের সন্তান রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রান্তিক কৃষক, কৃষিজীবী, শ্রমজীবী তথা সমাজের নিচুতলার মানুষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হওয়ার সুযোগ ছিল সীমিত। পারিবারিক পরিমণ্ডলের কারণেই নিজে জমিদারির দায়িত্ব নেওয়ার আগ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রাম, তাদের অভাব, সমাজে তাদের অবদান, তাদের নিত্যনৈমিত্তিক প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে তেমন ওয়াকিবহাল ছিলেন না তিনি। কারণ কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কর্মী রবীন্দ্রনাথে ‘উন্নীত’ হওয়ার ক্ষেত্রে ছিল তাঁর পিতার নির্দেশ। সে-নির্দেশ পালন করতে কলকাতার ‘নাগরিক কবি রবীন্দ্রনাথ পারিবারিক জমিদারির কাজ তত্ত্বাবধানের জন্য এসেছিলেন শিলাইদহ-সাজাদপুর-পতিসর অঞ্চলে। সেখানকার স্থানিক অভিজ্ঞতা নাগরিক কবিকে সর্বজনীন জীবনশিল্পীতে রূপান্তরিত করে। অন্যদিকে জীবনের প্রাকৃত রূপ তাঁকে করে তোলে পল্লীসংগঠকÑকবি ও কর্মীর এক অদ্ভুত সমন্বয় রবীন্দ্রজীবনে সত্য হয়ে ওঠে।’ (রফিক, ২০১৩: ৪) এই জীবনসত্যের উপলব্ধি রবীন্দ্রনাথকে নতুন ভাবনায় উজ্জীবিত করে তুলেছিল জীবনের শেষ দিকে। জন্মদিনে কাব্যের ১০ সংখ্যক কবিতায় তিনি নির্দ্বিধায় তা ব্যক্ত করেছেন। প্রকৃত কবি আখ্যা দিয়েছেন ‘কৃষক ও শ্রমজীবী’ মানুষকে।
চাষি খেতে চালাইছে হাল,
তাঁতি বসে তাঁত বোনে, জেলে ফেলে জালÑ
বহুদূর প্রসারিত এদের বিচিত্র কর্মভার
তারি পরে ভর দিয়ে চলিতেছে সমস্ত সংসার।
অতি ক্ষুদ্র অংশে তার সম্মানের চিরনির্বাসনে
সমাজের উচ্চ মঞ্চে বসেছি সংকীর্ণ বাতায়নে।
মাঝে মাঝে গেছি আমি ও পাড়ার প্রাঙ্গণের ধারে,
ভিতরে প্রবেশ করি সে শক্তি ছিল না একেবারে।
জীবনে জীবন যোগ করা
না হলে কৃত্রিম পণ্যে ব্যর্থ হয় গানের পসরা।
তাই আমি মেনে নিই সে নিন্দার কথা
আমার সুরের অপূর্ণতা।
আমার কবিতা, জানি আমি,
গেলেও বিচিত্র পথে হয় নাই সে সর্বত্রগামী।
কৃষাণের জীবনের শরিক যে জন,
কর্মে ও কথায় সত্য আত্মীয়তা করেছে অর্জন,
যে আছে মাটির কাছাকাছি,
সে কবির বাণী-লাগি কান পেতে আছি।
এই উপলব্ধি কবি শেষ বয়সের দিকে রচিত কবিতায় যে লিপিবদ্ধ করেছেন, তা ছিল তিলে তিলে সঞ্চিত অভিজ্ঞতারই প্রতিরূপ। জমিদারির দায়িত্ব পালনকালে দরিদ্র কৃষক-শ্রমিকের সংগ্রাম ও নিষ্ঠা কাছে থেকে দেখেছিলেন তিনি। অবশ্য ১৯২১ সাল থেকে ১৯৩৭ সাল পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথের কর্মনিবেদনের অনেকটাই ছিল পতিসরকে ঘিরে। এ-সময়ে প্রান্তিক শ্রমজীবী ও কৃষিজীবী মানুষকে গভীরভাবে দেখার অভিজ্ঞতা হয়েছিল তাঁর। কবি রবীন্দ্রনাথ পিতার নির্দেশ পালন করতে গিয়ে কর্মী হওয়ার যে সুযোগ গ্রহণ করেছিলেন, তা প্রতিপালন করেছেন উল্লিখিত অঞ্চলসমূহে। এই তিন অঞ্চল (শিলাইদহ-সাজাদপুর-পতিসর) রবীন্দ্রনাথের গ্রামীণ ভুবন রচনা করেছে। এর অন্যতম কারণ, ‘এই তিন খণ্ড ভুবনের সঙ্গে অদ্ভুত সম্পর্ক রয়েছে সুনির্দিষ্ট কিছু নদ-নদীর। যেমন শিলাইদহে পদ্মা, সাজাদপুরে (একটু দূরে হলেও) যমুনা আর পতিসরে নাগর ও দূরবর্তী নাগর।’ (রফিক, ২০১৭: ১৪) কিন্তু রবীন্দ্রÑঅনুরাগীদের বড় অংশ বাংলাদেশে রবীন্দ্র-স্মৃতিবিজড়িত স্থান হিসেবে প্রধানত শিলাইদহ, অংশত সাজাদপুরকে চেনেন। এই দুই স্থানের তুলনায় পতিসর তেমন পরিচিত নয়। অথচ কর্মী রবীন্দ্রনাথ অনেক গুরুত্বপূর্ণ কর্ম সম্পাদন করেছেন পতিসরকে ঘিরে। এই পতিসরকে বাংলাদেশের রবীন্দ্র-অনুরাগীদের কাছে পরিচিত করানোর ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রয়েছে নিভৃত রবীন্দ্র-গবেষক আহমদ রফিকের। তাই তিনি বলেছেন :
শিলাইদহকে নিয়ে লেখা একেবারে কম নয়। প্রমথনাথ বিশী থেকে শচীন্দ্রনাথ অধিকারীর মতো কেউ কেউ লিখেছেন। সাজাদপুর সম্পর্কে রয়েছে সেখানকার মোহাম্মদ আনসারুজ্জামানের সাজাদপুরে রবীন্দ্রনাথ। আর গোলাম মুরশিদের রবীন্দ্রবিশে^ পূর্ববঙ্গ, পূর্ববঙ্গে রবীন্দ্রনাথ বাংলাদেশের রবীন্দ্রভুবন সম্পর্কে আলোচনা। কিন্তু পতিসর সম্পর্কে সার্বিক বিবরণ নিয়ে কোনও বই বাংলাদেশে প্রকাশিত হয়নি, পশ্চিমবঙ্গে হয়েছে কি না জানা নেই। সব কিছু মিলে পতিসরকে তুলে ধরার চেষ্টা তাই জরুরি মনে হয়েছে। (রফিক, ২০১৭: ৯)
পতিসরে এসে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বোটে করে ঘুরে বেড়িয়েছেন ইছামতী, আত্রাই ও নাগর নদীতে। এই তিন নদীতীরবর্তী গ্রামাঞ্চলের রূপবৈচিত্র্য রবীন্দ্রসাহিত্যকে ভিন্নতর সমৃদ্ধি দান করেছিল। এখানকার মানুষ ও জনপদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাই ভাবুক ও রোমান্টিক কবিকে কর্মী-কবিতে পরিণত করে। জনমানুষকে কাছে থেকে দেখার সুযোগ তাঁর ‘চেতনায় গভীর দাগ কাটে, দাগ কাটে কবি-মনের সংবেদনশীল পলিস্তরে।’
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অন্য পাঁচজন জমিদারের মতো ছিলেন না। প্রয়োজনে কিংবা কেবল ভ্রমণে গেলেও সাহিত্যসৃজন প্রয়াস থেকে তিনি কখনও নিজেকে নিবৃত্ত রাখেননি। জমিদারের দায়িত্ব দায়সারাভাবে পালন করে আরাম-আয়েসে কেবল গ্রাম-নদীদর্শন আর লেখালেখি করে সময়কে উপভোগ করতে পারতেন তিনি। সময় কাটাতে পারতেন ভ্রমাণানন্দের মধ্য দিয়ে। কিন্তু ‘রবীন্দ্রনাথ ভিন্ন ধাতুতে গড়া, তার প্রকৃতি একেবারেই আলাদা। তাঁর আপাত-পেশা জমিদারি তত্ত্বাবধান, নেশা আশমানদারি হওয়া সত্ত্বেও মানুষকে দুচোখ ভরে দেখার ক্ষেত্রে তিনি অনন্য। জমিদারি-অঞ্চলে এসে রবীন্দ্রনাথের অভিজ্ঞতা বোধহয় এক অভিভূত চাষারই মতো।’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই উপলব্ধির যথার্থতা মেলে বার্লিন থেকে প্রতিমা দেবীকে লেখা এক চিঠিতে। তাঁর সেই চিঠিতে ফুটে উঠেছে গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর প্রতি তাঁর অন্তরের ভালোবাসা:
কেবলই ভাবছি আমাদের দেশজোড়া চাষীদের দুঃখের কথা। আমার যৌবনের আরম্ভকাল থেকেই বাংলাদেশের পল্লীগ্রামের সঙ্গে আমার নিকট-পরিচয় হয়েছে। তখন চাষীদের সঙ্গে প্রত্যহ ছিল দেখাশোনাÑওদের সব নালিশ উঠেছে আমার কানে। আমি জানি ওদের মতো নিঃসহায় জীব অল্পই আছে, ওরা সমাজের যে তলায় তলিয়ে সেখানে জ্ঞানের আলো অল্পই পৌঁছয়, প্রাণের হাওয়া বয়না বললেই হয়।
প্রজাদের কল্যাণভাবনার পাশাপাশি তিনি তাদের ‘বিধাতার শিশুসন্তানের মতো নিরুপায়’ বলেছেন। গ্রামীণ নিসর্গ-প্রকৃতির প্রতি আত্মিক মোহ সত্ত্বেও তিনি প্রজাদের অসহায়ত্ব নিয়ে ভেবেছেন। ছিন্নপত্রাবলীর এক চিঠিতে বলেছেন, ‘এই জন্যে স্বর্গের উপর আড়ি করে আমার দরিদ্র মায়ের ঘর আরও বেশি ভালোবাসিÑএত অসহায়, অসমর্থ, অসম্পূর্ণ, ভালোবাসার সহস্র আশঙ্কায় সর্বদা চিন্তাকাতর বলেই।’ এমন চিন্তার নানা দৃষ্টান্ত থাকলেও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কেমন জমিদার ছিলেন, তা নিয়ে নানা ভুল ও অপতথ্য ছড়ানো হয়ে থাকে। এসব ভুল তথ্যের সূত্রে রবীন্দ্রনাথকে অনেকে প্রজাপীড়নকারী জমিদার হিসেবেও উপস্থাপন করতে চান। অবশ্য এক্ষেত্রে তথ্যের অপ্রতুলতা স্বীকার করেও আহমদ রফিকের মন্তব্য ও বিশ্লেষণকে বলিষ্ঠ বলে ধরে নেওয়া যায়। কারণ, তিনি তাঁর যুক্তিকে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে প্রথমনাথ বিশীর শিলাইদহে রবীন্দ্রনাথ, নরেশচন্দ্র চক্রবর্তীর দরদী রবীন্দ্রনাথ, গোপালচন্দ্র রায়ের রবীন্দ্রনাথের ছিন্নপত্রাবলী মোহাম্মদ আনসারুজ্জামানের সাজাদপুরে রবীন্দ্রনাথ, অমিতাভ চৌধুরীর জমিদার রবীন্দ্রনাথসহ বহু বই এবং স্থানীয় মানুষের নথিপত্রের দ্বারস্থ হয়েছেন।
এমনও হয়েছে প্রাকৃতিক কারণে কৃষকের ফসলের ক্ষতি হলে তাদের কাছ থেকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর খাজনা আদায় না করে উল্টো টাকা দিয়ে সাহায্য করেছেন। এ-বিষয়ে নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের একটি চিঠির সূত্রে আহমদ রফিক লিখেছেন, ‘ফসলহানিতে দুর্দশাগ্রস্ত প্রজার কাছ থেকে খাজনা আদায়ের বদলে ঘর থেকে টাকা দিয়ে প্রজাকে সাহায্য করা কি প্রজাপীড়নের উদাহরণ ? এর আগেও কালিগ্রামে ফসলহানির খবরে উদ্বিগ্ন রবীন্দ্রনাথ নায়েব শৈলেশচন্দ্র মজুমদারকে খাজনা আদায়ে প্রজাদের ওপর চাপ না দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন।’ প্রখ্যাত এক জীবনীকারের সূত্রে আহমদ রফিক জানিয়েছেন, একসময় পতিসর ছিল এজমালি জমিদারির অংশ। ফলে সব সময় প্রজাদের কল্যাণে একক সিদ্ধান্ত তিনি বাস্তবায়ন করতে পারেননি। পরে যখন পতিসর তাঁর নিজস্ব জমিদারির আওতাভুক্ত হয়, তখন প্রজাদের সংকট-পরিস্থিতি তৈরি হলে তিনি খাজনা মওকুফ করে দিতেন। কারণ, ‘এই মানবিকতাবাদী মানুষটি ব্যক্তির প্রয়োজন এবং প্রজার স্বার্থরক্ষায় সমান আগ্রহী।’ পূর্ববাংলার দরিদ্র কৃষকপ্রজাদের কল্যাণের বৃহত্তর স্বার্থে কবি তাঁর পুত্র এবং জামাতাকে কৃষিশিক্ষা-বিষয়ে উচ্চতর পড়াশোনা করতে বিদেশে পাঠিয়েছিলেন। এ-নিয়ে তাঁদের প্রতি ছিল কবির সতর্কতামূলক তাগিদ; যেন তাঁরা ফিরে এসে প্রজাদের কল্যাণে আত্মনিয়োগ করেন। কেননা, প্রথাগত জমিদারি-ব্যবস্থার প্রতি কবির এক ধরনের বিতৃষ্ণা ছিল। কবি বহু চেষ্টা সত্ত্বেও পারেননি প্রজাদের কষ্ট পুরোপুরি লাঘব করতে। কারণ, ‘সমাজ পরিবর্তনের লক্ষ্য সম্পর্কে কবির দৃষ্টি ছিল স্পষ্ট, সমস্যাটা পদ্ধতি নিয়ে। সদিচ্ছার বা সততার অভাব নেই, কিন্তু সমস্যা বাস্তবায়নের।’ এই অতৃপ্তি থেকেই জীবনের শেষপাদে কবি লিখেছেন ‘আমার পরিচয়’ : ‘মোর নাম এই বলে খ্যাত হোক, আমি তোমাদেরই লোক/ আর কিছু নয়,/ এই হোক শেষ পরিচয়।’ কবির এই আকুতির মধ্যে যেন এই চরণ দুটিও বেজে ওঠে, ‘যে আছে মাটির কাছাকাছি,/ সে কবির বাণী-লাগি কান পেতে আছি।’ এ-বিষয়ে আহমদ রফিক বলেছেন, ‘জীবনের শেষপ্রান্তে পৌঁছেও রবীন্দ্রনাথ তাঁর চৈতন্যের অন্তর্লীন দ্বন্দ্বের সম্পূর্ণ অবসান ঘটাতে পারেননি ঠিকই। তা সত্ত্বেও অবাক হতে হয় দেখে যে তাঁর শৈল্পিক দৃষ্টিতে স্বচ্ছতা-সততার স্বাক্ষর স্পষ্ট এবং তা মানবিকতার উপাদানে সমৃদ্ধ।’ (রফিক, ২০১৭: ৬৯)
এই মানবিকতার কথা আহমদ রফিক উল্লেখ করেছেন রবীন্দ্রভুবনে পতিসরে গ্রন্থের পরতে পরতে। কালিগ্রামের প্রজাদের নিয়ে হিতৈষী সভা সংগঠিত করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। এর পাশাপাশি দরিদ্র গ্রামবাসীদের কল্যাণে নতুন অর্থকরী দিক প্রতিষ্ঠার চেষ্টা ছিল তাঁর। যেমন গতানুগতিক চাষাবাদের বাইরে নতুন নতুন ফসল উৎপাদনের চেষ্টা করা, রাজশাহীর বিখ্যাত রেশমশিল্পের কার্যক্রম পতিসরে চালু করা যায় কি না তার সম্ভাবনা যাচাই করা, এমনকি রেশমতত্ত্ব নিয়ে শিক্ষালাভের জন্য দুজন ছাত্রকে কালিগ্রাম থেকে রাজশাহী পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। যেন প্রশিক্ষিত ছাত্ররা ফিরে এসে এ-নিয়ে কাজ করতে পারে। কবি ও জমিদার রবীন্দ্রনাথের এমন উদ্যোগ ও প্রচেষ্টা নিশ্চয়ই অন্য জমিদারদের চেয়ে ব্যতিক্রমী। জমিদার হিসেবে এমন কল্যাণ-তৎপরতা ‘ছিল তাঁর শ্রেণিগত ও সামাজিক অবস্থানের বিপরীত বৃত্তের। হতে পারে এর পেছনে রয়েছে রবীন্দ্রনাথের সংবেদনশীল কবি স্বভাব এবং তাঁর উদার মানবিক চেতনা।’ আদতে গ্রামীণ জীবনের মানুষের মাঝে বিরাজমান ভয়াবহ অমানবিক রূপ তাঁর কবিচেতনায়, মানবিক চেতনায় যে প্রভাব ফেলেছিল, তাঁর সেই উপলব্ধি থেকেই ‘কর্মী ও পল্লীসংগঠক রবীন্দ্রনাথের আবির্ভাব’ ঘটে। তিনি মূলত চেয়েছিলেন গ্রামোন্নয়ন ও নয়া পল্লিসমাজ প্রতিষ্ঠা করতে। কারণ, ‘এর ভিত্তি ছিল স্বশাসনের উপযোগী ব্যবস্থা (পঞ্চায়েত) প্রবর্তন এবং জীবিকাকে সমবায়নীতির মাধ্যমে আত্মনর্ভিরশীলতায় গড়ে তোলা। গ্রামে গ্রামে অর্থকরী সংগঠন গড়ে তোলা। যেমন পতিসরে গড়ে তোলেন কৃষি, তাঁত, আখমাড়াই, মৎস্যচাষ ইত্যাদি নিয়ে সমবায় সংগঠন। তাঁর চিন্তায় পল্লীসমাজ ছিল আধুনিক চরিত্রে, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি জ্ঞান-নির্ভর।’ (রফিক, ২০১৭: ৬৭)
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পতিসরে প্রজাদের মহজনী সুদখোরদের হাত থেকে মুক্ত করতে স্থাপন করেছিলেন কৃষিব্যাংক। সহজ শর্তে ঋণ বিতরণের মধ্য দিয়ে এ ব্যাংক অত্যন্ত গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিল। ব্যাংকটি তিনি ১৯০৫ সালে প্রতিষ্ঠা করেন। আহমদ রফিকের মতে, ‘কৃষকদের মধ্যে ব্যাংক এতটাই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে যে, তাঁদের ঋণের চাহিদা মিটানো স্বল্পশক্তির এ ব্যাংকের পক্ষে সম্ভব ছিল না। অবশ্য সমস্যা কিছুটা সমাধান হয় নোবেল পুরস্কারের টাকা ১৯১৪ সালের প্রথম দিকে কৃষি ব্যাংকে জমা হওয়ার পর।…কৃষি ব্যাংকের প্রভাব কালিগ্রাম পরগনায় এতটাই ছড়িয়ে পড়ে যে সেখান থেকে মহাজনদের ব্যবসা গুটিয়ে নিতে হয়।’ (রফিক, ২০১৭: ৬৯)
তিন
পতিসরে রবীন্দ্রনাথ গ্রামোন্নয়ন ও প্রজাদের কল্যাণচিন্তায় যেমন কর্মমুখর ছিলেন, গ্রাম-প্রকৃতি ও ইছামতী-নাগর নদীর কূলসমূহও কবিকে বঞ্চিত করেনি। এখানে জমিদারির দায়িত্ব পালনকালেও রবীন্দ্রনাথ রচনা করেছেন বহু কালজয়ী গান, কবিতা, ছোটগল্প, প্রবন্ধ প্রভৃতি। এর মধ্যে চিত্রা, চৈতালী, কল্পনা, ক্ষণিকা কাব্যের বেশকিছু কবিতাসহ কথা ও কাহিনী কাব্যের ‘দুই বিঘা জমি’। এ ছাড়া ‘বিধি ডাগর আঁখি’, ‘বঁধু মিছে রাহ করো না’, ‘জলে ডোবা চিকন শ্যামল’, ‘আমি কান পেতে রই’ প্রভৃতি গান এবং গোরা ও ঘরে-বাইরে উপন্যাসের অংশবিশেষ রচনা করেছেন পতিসরে জমিদারির দায়িত্ব পালনকালে। আহমদ রফিকের রবীন্দ্রভুবনে পতিসর গ্রন্থে এসব বিষয়ে বিস্তারিত উল্লেখ আছে। আর পূর্ববঙ্গে গ্রাম ও গ্রামের মানুষের উন্নয়নের পাশাপাশি কৃষিব্যবস্থা, সমবায় সমিতি গঠন, কৃষি ও কৃষকের সংকট এবং তার সমাধানের পথ বাতলে দেওয়ার ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের মানবিক উদ্যোগ ও কর্মপ্রয়াসের নানা দিক নিয়ে আহমদ রফিক রচনা করেছেন নাতিদীর্ঘ বই রবীন্দ্রভাবনায় গ্রাম: কৃষি ও কৃষক। কলেবরে ছোট হলেও অত্যন্ত সমৃদ্ধ বই দুটি কর্মী, প্রশাসক, জনবান্ধব জমিদার হিসেবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এক নির্মোহ ভাবমূর্তিকে পাঠকের সামনে ভাস্বর করে তোলে। আহমদ রফিকের এ-প্রয়াস নিঃসন্দেহে কর্মী-রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে আগ্রহীদের বিস্তর গবেষণার ক্ষেত্র তৈরিতে ভূমিকা রাখবে।
সহায়ক গ্রন্থ
আহমদ রফিক (১৯৭৭)। আরেক কালান্তর। বাংলা একাডেমি, ঢাকা
আহমদ রফিক (২০১৩)। রবীন্দ্রভাবনায় গ্রাম: কৃষি ও কৃষক। গণ প্রকাশনী, ঢাকা
আহমদ রফিক (২০১৭)। রবীন্দ্রভুবনে পতিসর। সাহিত্য প্রকাশ, ঢাকা
লেখক : প্রাবন্ধিক



