প্রচ্ছদ রচনা : কবিতার ইতিহাস কবিতার বৈচিত্র্য : আহমদ রফিক

প্রচ্ছদ রচনা : ভাষাসৈনিক আহমদ রফিক―আবার পড়ি : তাঁর রচনা থেকে
কবিতার জন্ম যেমন মানবমনের বিশেষ অনুভূতি বা নান্দনিক উপলব্ধি প্রকাশের তাড়না থেকে, তেমনি কবিতার বিকাশ সময় সমাজ ও পারিপার্শ্বিক পরিবর্তনের প্রভাবে। তাই কবিতার ইতিহাস তার জন্মলগ্ন থেকে সময়ের দীর্ঘযাত্রায় বৈচিত্র্য ও জটিলতার প্রকাশ ঘটায়। কবিতা শুরুতে নৃত্যগীতবাদ্যের সঙ্গে বা এককভাবে মুখে-মুখে গীত। পরে হরফ উদ্ভবের সময় থেকে লিখিতরূপে প্রকাশিত। তবে সেই পুরনো গীত ও আবৃত্তির ঐতিহ্য এখনও শেষ হয়ে যায়নি। শুধু আদিবাসী সংস্কৃতিতেই নয়, এ ধারা উন্নত সমাজেও লক্ষ করার মতো।
কবিতার প্রাকৃত রূপ ভাষার উচ্চকিত অর্জনের মধ্য দিয়ে ক্রমশ পরিবর্তিত হয়েছে। ক্রমে সেখানে যুক্ত হয়েছে নানা মাত্রা। ছন্দোময়তা, শাব্দিক ও আঙ্গিক বিন্যাসে বৈচিত্র্য, অন্তর্নিহিত সুর ও একাধিক গুণের আরোপে কবিতার চরিত্র সমৃদ্ধ হয়েছে, জটিলতর রূপ ধারণ করেছে। আর সংগীতের সুর তো প্রথম থেকেই কবিতার আত্মিক সঙ্গী। সুর-স্বরের সেই জাদুর সঙ্গে কবিতায় যেমন উপকরণগত ও আঙ্গিকগত পরিবর্তন ঘটেছে, তেমনি ঘটেছে ভাষারও প্রয়োজনীয় পরিবর্তন এবং তা সমাজের বিকাশ ও পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে। কবিতার ইতিহাস তাই এক অর্থে ভাষারও ইতিহাস, তার বিবর্তনের ইতিহাস।
মিশরীয় প্যাপিরাস এবং মেসোপটেমিয়ার ‘কিউনিফর্ম’ লিপি যদি হিসাবে আনা হয়, তাহলে ভাষার লিখিত রূপের আনুমানিক বয়স পাঁচ হাজার থেকে চার হাজার বছরের মতো। চীনা চিত্রলিপির বয়সও অনুরূপ সময়ের। তবে সিন্ধুসভ্যতার চিত্রলিপির বয়স কমপক্ষে পাঁচ হাজার বছরের। অর্থোদ্ধার হয়নি বলে এর সাহিত্যমূল্য নির্ধারণ সম্ভব হয়নি। তবে জনৈক সাম্প্রতিক গবেষকের (Egbert Richter-Ushanas) ধারণা, সিন্ধুলিপির সঙ্গে আদি বৈদিক লিপির সাদৃশ্য রয়েছে। সিদ্ধান্তটি বিভিন্ন দিক থেকে বিতর্কের জন্ম দিতে পারে।
মিশরীয় লিপিতে ধর্মীয় রচনা যদিও যথেষ্ট প্রাচীন, তবু এর সাহিত্যরূপের প্রকাশ কমপক্ষে সাড়ে চার হাজার বছর আগে (হিতোপদেশ) এবং মহাকাব্যের (‘পান্তা আউর’) বয়স প্রায় তিন হাজার বছর। তবে ভিন্নমতে মেসোপটেমীয় সাহিত্যই সবচেয়ে প্রাচীন এবং ব্যাবিলনীয় ‘গিলগামেশ’ কাব্যকে প্রাচীনতম মহাকাব্য হিসাবে চিহ্নিত করা হয় (খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম শতক)। অন্যদিকে হিব্রুভাষায় রচিত ‘ওল্ড টেস্টামেন্ট’-এর ধর্মীয় শ্লোক খ্রিস্টপূর্ব দ্বাদশ শতকের। কিছুটা পরে ‘সঙ্ অব সলোমন’, মৃত্যু বা শোকগীতি, স্তোত্র ইত্যাদি। অবশ্য সংস্কৃতভাষায় রচিত বৈদিক শ্লোকমালাও প্রাচীন, কিন্তু ভাবসম্পদে অনন্য।
চতুর্বেদের মধ্যে সবচেয়ে প্রাচীন ঋগে¦দের রচনা ১৪০০ থেকে ১০০০ খ্রিস্ট-পূর্বাব্দের কোনও এক সময়ে। যজু, সাম ও অথর্ববেদ পরবর্তী সময়ের। সামবেদের শ্লোকাদি তো মূলত স্তবগানের উদ্দেশ্যে রচিত। অবশ্য গায়ন বা আবৃত্তির বা শ্রবণের হলেও এ-ধরনের শ্লোক, স্তব বা উপাসনাগীতি শুরুতে মুখস্থরূপেই ধরা ছিল, লিখিতরূপে এদের প্রকাশ ঘটেছে সম্ভবত ৭০০ থেকে ৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের কাল-পরিসরে। সংস্কৃতসাহিত্যের শ্রেষ্ঠ মহাকাব্য মহাভারত ও রামায়ণ যথাক্রমে ৩০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে ৩০০ খ্রিস্টাব্দ এবং ২০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে ২০০ খ্রিস্টাব্দ সময়কার বলে মনে করা হয় (এন্সাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা, ১৯৯০)। তবে অন্য সূত্রের হিসাবে এসবে ধৃত ঘটনাবলির সময় ৯০০ থেকে ৮০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের।
প্রাচীনতা সত্ত্বেও গ্রিক কাব্যসাহিত্যের মান ও উৎকর্ষ কবিতা সমালোচকদের বরাবরই আকর্ষণ করেছে। প্রাচীন গ্রিসেও যথারীতি লিখনকৌশল আবিষ্কারের (খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম শতকে) আগেই গ্রিক লিরিকের (গীতিকবিতার) জন্ম বলে মনে করা হয়। জনসমক্ষে গায়ন ও আবৃত্তির উদ্দেশ্যে রচিত এসব গীতিকবিতা এর আদিম ঐতিহ্যবিষয়ক ধারণা প্রমাণ করে। প্রাচীন গ্রিক-কাব্যের মনস্বী জনক হিসাবে স্বীকৃত হোমারের হাতেই সম্ভবত খ্রিস্টপূর্ব নবম বা অষ্টম শতকে প্রথমে ‘ইলিয়াড’ পরে ‘ওডেসি’র মতো মহাকাব্য রচিত বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত। ক্লাসিক-পূর্ব হোমারীয় যুগ পেরিয়ে বহুখ্যাত গ্রিক ট্রাজেডির জন্ম। এ ক্লাসিক পর্বের তিন প্রধান কবি ঈস্কাইলাস, সফোক্লিস ও ইউরিপিডিস-এর আবির্ভাব যথাক্রমে ৫২৫, ৪৯৬ ও ৪৮৪ খ্রিস্টপূর্বাব্দে, যদিও মতভেদ এক্ষেত্রেও রয়েছে। আর গ্রিক-কমেডি’র রচয়িতা অ্যারিস্টোফেনিস-এর জন্ম ৪৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে।
গ্রিক-কাব্যের ক্লাসিক যুগ খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকে শেষ হয়ে যায় বলে ধারণা করা হয়। তবে নীতিবাদী কাব্যের পাশাপাশি গীতিকবিতা (‘লিরিক’) পূর্বাপর গ্রিক কাব্য-ঐতিহ্যের বৈশিষ্ট্যময় রূপ হিসাবে চিহ্নিত। এছাড়া গ্রিক কাব্যসৃষ্টিতে ‘এলিজি’রও (শোককবিতার)ও রয়েছে উল্লেখযোগ্য স্থান। হেলেনিস্টিক যুগ কয়েক শতকের বিস্তৃতি পেলেও খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকের মধ্যেই এর সৃজনশীলতার উৎকর্ষ প্রায় শেষ হয়ে যায়। শেষ পর্বের তিন কীর্তিমান কবি : থিওক্রিটাস, ক্যালিম্যাকাস ও অ্যাপোলোনিয়াস। থিওক্রিটাসে যেখানে লিরিকশুদ্ধতা ও রম্যতার প্রকাশ, ক্যালিম্যাকাসের ক্ষেত্রে তা হয়ে ওঠে এলিজির মননধর্মিতা বা পার্থিব অহংবোধের প্রতি ব্যঙ্গ এবং অনুরূপ উপলব্ধির প্রকাশ। অন্যদিকে শেষোক্তের হাতে রচিত হয় এ-পর্বের শেষ মহাকাব্য। নায়কী বীরত্ব-কাহিনির প্রতি তার শৈল্পিক আকর্ষণের প্রভাব লক্ষ করা যায় ইতালীয় কবি ভার্জিলের ‘ঈনিড’ (‘Aeneid’) কাব্যে।
লাতিন তথা রোমক সাহিত্য রোমান প্রজাতন্ত্র ও রোমসাম্রাজ্যের সাংস্কৃতিক ফসল। এর প্রভাব পশ্চিম-ইউরোপে লক্ষণীয় চরিত্রে প্রকাশ পেয়েছিল। রোমের পতন সত্ত্বেও লাতিন মধ্যযুগীয় পশ্চিম-ইউরোপের দেশগুলোতে সাহিত্যের ভাষা হিসাবে ব্যবহৃত হয়েছে। স্থানীয় দেশজ ভাষার সৃজনধর্মী বিকাশের পটভূমিতে লাতিনের আধিপত্য ক্রমে শেষ হয়ে আসে।
কথাটা সবাই স্বীকার করেন যে, লাতিন সাহিত্যের বিকাশ গ্রিক সাহিত্যের প্রভাবে। লাতিন সাহিত্যের আদিরূপ ৭০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের মধ্যে শেষ হয়ে যায়। এর পরই রোমক লাতিন সাহিত্যের বিকাশ খ্রিস্টপূর্ব ৭০ থেকে ১৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। পরবর্তী রুপালি-যুগের প্রসার ১৩৩ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। রোমক সাহিত্যের কথিত স্বর্ণযুগের (অগাস্টিন যুগও বলা হয়) মূল প্রতিনিধি যদিও ভার্জিল, তবু এ কথা সত্য যে কবি-দার্শনিক-রাজনীতিবিদ সিসেরোর প্রতিভাদীপ্ত হাতে লাতিন সাহিত্যভাষার বিকাশ।
গ্রিকসাহিত্যের প্রধান আদিপুরুষ যেমন হোমার, তেমনি রোমক সাহিত্যের ক্ষেত্রে ভার্জিল। তার প্রধান রচনা ‘Georgic’-এর প্রকাশ এবং Aenid রচনা সম্পূর্ণ হয় ২৯ থেকে ১৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দের মধ্যে। ভার্জিলের মৃত্যু ঐ ১৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দেই। এ পর্বের দ্বিতীয় প্রধান কবি হোরেসের গাথা, পত্রকবিতা, শোককবিতা (এলিজি)-র গীতিধর্মী সৃষ্টি তাঁর প্রতিভার পরিচয় নিশ্চিত করে। তেমনি তৃতীয় প্রধান কবি Propertius তার প্রেমাত্মক এলিজির জন্য খ্যাত।
রুপালি যুগের প্রধান কবি-ব্যক্তিত্ব ওভিদ। তার ‘Metamorphoses’ কল্পনা ও জাদুর অপূর্ব সংমিশ্রণ। তাঁর Ars amatoria কমেডি, কিন্তু রাজনৈতিক স্যাটায়ারে তীক্ষè। অন্যদিকে রাজতান্ত্রিক পৃষ্ঠপোষকতাও যে কখনও কখনও বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে তার প্রমাণ ওভিদ। এরপর নামিদের মধ্যে ট্যাসিটাস, জুভেনাল, সেনেকা প্রমুখ। আরও পরে রাষ্ট্রিক সংকট ও বিভাজন, অবক্ষয় ইত্যাদি। ফলে সাহিত্য হয়ে ওঠে গ্রিকসাহিত্যের গতানুগতিক অনুকরণ অনুসরণÑপরিণামে শৈল্পিক বন্ধ্যাত্ব। সেই দীর্ঘ অন্ধকার ও স্তব্ধতার পর মধ্যযুগে রোমক-লাতিনের ঐতিহ্য নিয়ে ইতালীয় সাহিত্যে আলোর ঝলসানি ফোটে। উৎস ‘ডিভাইন কমেডি’ কাব্যের অমর স্রষ্টা দান্তে এবং সনেটের রাজা পেত্রার্ক।
এরপর রাজকীয় শক্তির কেন্দ্রবিন্দু অবস্থার চাপে সরে গেল অন্যত্র, কন্স্টান্টিনোপ্ল হয়ে ওঠে খ্রিস্টীয় জগতের মধ্যমণি, শক্তিরও আধার। হেলেনিক ও খ্রিস্টীয় ভাবধারার সমন্বয়ে ও প্রচলিত ভাষার পরিবর্তিত রূপের মাধ্যমে সৃষ্টি বাইজানটাইন সাহিত্য হয়ে ওঠে আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। বাইজানটাইন কাব্যের দ্বিমুখী চরিত্রে ছিল ক্লাসিক (গ্রিক) ও খ্রিস্টীয় বৈশিষ্ট্যের সংমিশ্রণ, যেখানে হোমারীয় ভাষা ও ছন্দের প্রভাব ছিল যথেষ্ট।
কিন্তু রাজনৈতিক দিক থেকে কন্স্টান্টিনোপ্লকে কেন্দ্র করে বাইজানটাইন সাম্রাজ্যের রাজকীয় মর্যাদা ও ধর্মীয় মতাদর্শগত মহিমা যতটা প্রচার পেয়েছিল এবং যা পরবর্তীকালের ইউরোপীয় সমাজ-সংস্কৃতিতে লক্ষ করা যায়, সে-তুলনায় কতটা ফলবান প্রভাব সাহিত্যের সৃজনশীলতায় প্রতিফলিত হয়েছিল তা বিচারের বিষয়। তবে এটা ঠিক যে, কবিতার চরিত্রে ছায়া ফেলেছিল রাজকীয় খ্রিস্টীয় মহিমা। বাইজানটাইন সাহিত্যে নীতিবাদিতার প্রকাশ ছিল অপেক্ষাকৃত বেশি। রাজনৈতিক ভাঙাগড়ার মধ্যেও বাইজানটাইন সাহিত্যের ধারা দ্বাদশ শতক পর্যন্ত টিকে থেকেছে ঠিকই, কিন্তু তাতে নবসৃষ্টির কোনও পরিচয় শেষ দিকে ছিল না।
অন্যদিকে ইউরোপে একাধিক স্বাধীন রাজ্য সুনির্দিষ্ট সীমানা ও জাতিচরিত্র নিয়ে গড়ে ওঠে। তাদের নিজস্ব ভাষার বিকাশ নিজস্ব সাহিত্যসৃষ্টির পক্ষে অনুকূল পরিবেশ গড়ে তোলে। বিশেষ করে দ্বাদশ-ত্রয়োদশ শতকে স্থানীয় ও আঞ্চলিক পুরাকাহিনি ইউরোপীয় সাহিত্যের জন্য উদ্দীপক ঐতিহ্য-উৎস হয়ে ওঠে। তাই দেখা যায় ইউরোপের একাধিক দেশের সাহিত্যে একই ধরনের কাহিনি কাব্যসৃষ্টির উৎস খুলে দেয়। এবং সেগুলোকে নিয়ে কাহিনিকাব্য বা আখ্যানকাব্য হিসাবে কবিতার উদ্ভব ও বিকাশ ঘটে।
দুই
এ পর্যায়ে উল্লিখিত ইউরোপীয় সাহিত্যের প্রকাশ বিশেষভাবে দেখা যায় ইংরেজি, ফরাসি, জার্মান ও রুশ ভাষার নিজস্ব পরিসরে। সাহিত্যের ইতিহাসরচয়িতার বিচারে ইংরেজি কবিতার বয়স হাজার বছরেরও বেশি। চসার থেকে নয়, অ্যাংলো-স্যাক্সন কাব্য থেকে ইংরেজি কবিতার সূচনা বলে তাদের বিশ্বাস। যদিও তখন তাতে ভাষিক বিদেশিয়ানার স্পর্শ ছিল, তবু ইংরেজি কাব্যের সূচনা মোটামুটি হিসাবে ৭০০ খ্রিস্টাব্দের বেশ খানিকটা পরে। অন্যদিকে অনুরূপসূত্রে ফরাসি কবিতার বলিষ্ঠ সূচনা দ্বাদশ শতকের শুরু থেকেÑযুগচেতনা ও সমাজচেতনার পরিপ্রেক্ষিতে আখ্যানকাব্য ও রূপক কাব্যের মাধ্যমে। দান্তের জন্মের শতবর্ষ পূর্বে ফরাসি কাব্যের সুস্পষ্ট উদ্ভাস। আর ইংরেজি-ফরাসি কাব্যের অনুরূপ চরিত্র নিয়ে জার্মান কাব্যের সূচনা বীরত্বগাথা, উপাসনা-স্তোত্র বা মৃত্যুশোকগীতি নিয়ে খ্রিস্টীয় অষ্টম শতকে।
কবিতার উৎস সম্পর্কে প্রসঙ্গত কথাটা স্বীকার করতে হয় যে, আদি পর্যায়ে মানুষের সমষ্টিগত জীবনাচরণের সঙ্গে যুক্ত হয়ে কবিতার প্রকাশ। প্রাগৈতিহাসিক কালের ‘ম্যাজিক থেকে মেডিসিন’-এর মতো ধর্ম ও শিল্পসাহিত্যের উদ্ভবের ক্ষেত্রেও একই কথা সত্য। গোষ্ঠীবদ্ধ মানুষ বা কৌম সমাজ থেকে বিবর্তনের ধারার সঙ্গে সঙ্গে আপন চরিত্রবদল ঘটিয়ে আদি কবিতার আধুনিক সমাজে প্রবেশ। অর্থাৎ গোষ্ঠী বা কৌম থেকে বিকশিত সমাজ বা সমূহ থেকে ব্যক্তিবৃত্তে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবোধে পৌঁছানো কবিতার ঐতিহাসিক পরিণতি হিসাবে স্বীকৃত। কবি ও কবিতার ভবিতব্য এভাবে অনিবার্য জটিলতার বৃত্তে উত্তীর্ণ।
এ উত্তরণ সর্বজনীন স্বার্থ ও শ্রেণিস্বার্থের দ্বন্দ্বে জটিল। দ্বন্দ্বের প্রভাব যেমন কবিচৈতন্যে, তেমনি কবিতায় পরিস্ফুট। আত্মপরতার টানে সৃষ্ট সমাজ-বিচ্ছিন্নতা ও ব্যক্তিসত্তার নির্বিরোধ বিকাশের তাগিদে অনিশ্চয়তাবোধ ও নিঃসঙ্গতা শিল্পসাহিত্যের চরিত্রও স্পর্শ করে, করে বিষয়ে প্রকরণে। সেই সঙ্গে আমিত্ববোধের প্রকাশ। আর আমিত্বের স্বরূপ উদ্ঘাটনের জন্য তাকাতে হয় ব্যক্তির অন্তর্লোকে, সেখানে চেতন-অবচেতন- অচেতনের মিথস্ক্রিয়ার চরিত্র বুঝে নিতেÑদেখে নিতে সম্ভাব্য উদ্ভটত্ব ও অস্তিত্বের সংকট। কবিতার ইতিহাস তাই ব্যক্তিক ও সমষ্টিগত মানবিক তৎপরতার ইতিহাস। সেজন্যই বলা যায়, সেই ধারাবাহিকতার বিচারে কবিতা সমষ্টির পটভূমিতে ব্যক্তিচেতনার ফসল। প্রসঙ্গত কথাটা বলা হয়েছে যে কবিতার সংগীতময় প্রকাশ আদি-স্তরে নৃত্যবাদ্যের ছন্দোময়তায়।
কবিতার প্রকাশ ভাষায় ও শব্দে। ভাষা সামূহিক তথা সামাজিক উপকরণ বলে কবিতারও রয়েছে সমষ্টিগত সামাজিক ভিত। ভাষা গোষ্ঠীবদ্ধ ও সামাজিক মানুষের ভাব-ভাবনা বিনিময়ের মাধ্যম হওয়ার কারণে কবিতার উৎসবিচার সমাজ-সমীক্ষার অন্তর্গত, কবিতার ইতিহাস-বিচারও ঐ একই ধারায়। তাতে স্পষ্ট হয় সমষ্টির চত্বর থেকে ব্যক্তিবাদিতার সংকীর্ণ বৃত্তে কবিতার উত্তরণের তাৎপর্য। বুঝতে পারা যায় আধুনিক মননের সমাজ ও জীবন-বিচ্ছিন্নতার ও তজ্জনিত নিঃসঙ্গতার টানে সৃষ্ট আধুনিক কবিতার চরিত্রবদলের ঘটনা।
উল্লিখিত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে কবিতা তার প্রাথমিক সংগীতসত্তা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে সর্বশেষ রূপ গ্রহণ করেছে। অন্যদিকে গদ্যকবিতার প্রসাধিত রূপ ভাষার সামাজিক-জৈবনিক বাস্তবতা স্মরণ করিয়ে দেয়। কিন্তু কবিতা কি বাস্তবিকই সর্বাংশে তার সাংগীতিক দ্যোতনা থেকে মুক্ত হতে পেরেছে ? বিশেষ করে যখন কবিতার সর্বশেষ প্রবণতাও ঘুরেফিরে ঐ সংগীতসত্তার প্রকাশ ঘটানোর ইচ্ছায় আন্তরিক। তাই বলা যায় কবিতার পথচলা শুরু থেকেই শব্দ, ধ্বনি ও সুরের এক আত্যন্তিক মিশ্ররূপ নিয়ে। বিশেষজ্ঞদের মতে প্রাচীন গ্রিককাব্যও সূক্ষ্মবিচারে সংগীতদ্যোতনাযুক্ত, এমনকি নাট্যকাব্যও।
ভাষার ক্রমবিকাশ ও উৎকর্ষের ধারাবাহিকতায় কবিতার ঐ মিশ্রচরিত্র সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্ম স্তরের চারুকুশলতায় পৌঁছেছে বলে সবসময় একে শনাক্ত করা যায় না। কিন্তু কবিতার এ বৈশিষ্ট্য অর্জন আধুনিক কবিরও আকাক্সিক্ষত। কবিতার ঐতিহাসিক চরিত্রবিচারে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিগণ তাই লক্ষ করেন যে, কবিতার উল্লিখিত এ বৈশিষ্ট্য এখনও দেশি বা বিদেশি আদিবাসীদের সংস্কৃতিচর্চায় সুস্পষ্টরূপে প্রতিফলিত, বিশেষ করে তাদের উৎসব-অনুষ্ঠানে যেখানে সমষ্টিগত আবেগের প্রকাশ ঘটে।
তবে একথাও সত্য যে, সমাজ যত বিকশিত হয়েছে, সংস্কৃতিচর্চাও সেই ধারায় বিকশিত হয়ে উঠেছে; কবিতায় তাই সমাজ ও জীবনের প্রতিফলন ঘটেছে। অন্যদিকে ব্যক্তিক বোধ যত পরিশীলিত হয়ে সূক্ষ্ম ও চারুরূপ নিয়েছে, কবি ও কবিতা ততই আত্মকেন্দ্রিকতার চৌখুপিতে বাঁধা পড়তে চেয়েছে। আর ঐ আত্মকেন্দ্রিকতার সংকীর্ণ টানে সে ক্রমশ সমাজবিচ্ছিন্ন ও নিঃসঙ্গ হয়েছে। ফলে তার মনোগহনে যথেষ্ট জটিলতা জন্ম নিয়েছে। এ জটিলতার পরিণাম কবি ও কবিতার জন্য কতটা শুভ হয়েছে সে-বিচার নিয়ে বিতর্কও রয়েছে। তবে সমাজবিজ্ঞানীদের মতে এ সবই পুঁজিবাদী সমাজ-সংস্কৃতির দান।
উল্লেখ করা হয়েছে যে, ইতিহাসের ধারাবাহিকতা বিচারে কবিতার সূচনা কাহিনি বা আখ্যানকাব্যে, গীতিকবিতা বা গাথার (ব্যালাডের) ফর্মে। শুরুতে সাহিত্য মানেই কাব্য, কবিতা। স্ক্যান্ডেনেভীয় আখ্যায়িকার (‘বিউলফ’) ভিত্তিতে অ্যাংলো-স্যাকসন রূপকথা-কাব্যের সূচনা মোটামুটি হিসাবে সপ্তম শতকের বেশ কিছুটা পরে। এর লিখিত রূপ প্রকাশ পায় দশম শতকে। সেজন্যে কারও কারও মতে অ্যাংলো-স্যাকসন কাব্যের বাস্তবিক সূচনা প্রকৃতপক্ষে দশম শতকে। আর এখানে ভাষাগত দিক থেকে ভিন্নতার পরিপ্রেক্ষিতে প্রকৃত ইংরেজি কাব্যের সূচনা আরও পরে বলে অনেকেরই দাবি।
সেজন্যই ইংরেজি কাব্যের যথার্থ রূপ চৌদ্দশতকে চসারের (১৩৪০-১৪০০ খ্রি.) হাত দিয়ে প্রকাশ পেয়েছে বলে গরিষ্ঠসংখ্যক সাহিত্যের ইতিহাসবিদ মনে করেন। আবার কারও কারও মতে ইংরেজি কাব্যের আদি-আধুনিক যুগের প্রকাশ এ সময়েই, মূলত চসারের প্রতিভাস্পর্শে। এ সময়েই রূপক কাব্যের রোমান্স পুঁজি করে প্রেমকাব্যের প্রকাশ ঘটেছে কাহিনিকাব্যের ফর্মে। জীবনের আশা-আকাক্সক্ষা, জীবননাট্যের মিলন-বিরহ, দুঃখ-আনন্দ তাতে প্রকাশ পেয়েছে, পেয়েছে কমেডি, ট্রাজেডির চরিত্র নিয়ে। সেখানে জীবন, মৃত্যু এবং প্রেমই প্রাধান্য পেয়েছে অন্য সবকিছু ছাপিয়ে। তবে কথকতার সঙ্গে এর প্রকাশ গীতিকবিতার রোমাঞ্চিত মাধুর্যে।
লাতিন ক্লাসিকস, বিশেষ করে ভার্জিল, ওভিদ পড়া চসার তার লিরিক, ব্যালাড, রূপক কাব্য ইত্যাদির সৃষ্টি-উৎকর্ষ নিয়ে তার যুগের প্রতিনিধি। চসারের বিশেষ কোনও রচনায় ‘ডেকামেরন’-এর প্রেরণা লক্ষ করা গেলেও তা আপন বৈশিষ্ট্যে ভাস্বর। তার বিশিষ্ট রচনা ‘ট্রয়লাস ও ক্রেসিডা’ (১৩৮৫) বা ‘ক্যান্টারবেরি টেলস’ (১৩৮৭-১৪০০) সার্বিক বিচারে যেমন তার রচনার মানবিক মূল্যবোধ, তেমনি রচনারীতির বৈশিষ্ট্য নিয়ে তার সমকাল পেরিয়ে পরবর্তী শতকের ইংরেজি কাব্যকেও প্রভাবিত করেছে। আর সে-কারণেই ইংরেজি কাব্যসাহিত্যের আদি প্রাণপুরুষ চসার সম্পর্কে চেস্টারটনের প্রশস্তিবচনই সম্ভবত সব কথার সেরা। তার ভাষায় ‘ঐব রং ধং ষধৎমব ধং ঃযব ষধহফ ধহফ ধং ড়ষফ ধং ঃযব হধঃরড়হ’। এর চেয়ে উত্তম সাধুবাদ আর কীই বা হতে পারে। অন্যদিকে স্যার ইভান্সের মতে চসার এমনই এক মহৎ কবি যে, পরবর্তী এক শতকের কবিকুল তাকে অনুকরণ করেই সময় কাটিয়েছে।
তুলনায় ফরাসি কাব্যসাহিত্য পিছিয়ে ছিল না। বরং কারও কারও মতে এক পা এগিয়ে ছিল, এমনকি ইতালীয় বা স্পেনীয় কাব্য থেকেও। সাহিত্যের জনৈক ইতিহাসবিদের ভাষায় ফরাসি কাব্যের সেই ‘অকালপক্ব পুষ্পিত রূপ’ দ্বাদশ শতকের শুরু থেকেই যেমন রোমান্স কাব্যে, তেমনি বা ততোধিক গুণময়তায় পরিস্ফুট দক্ষিণ ফ্রান্সের ‘ত্রুবাদুর’ সংগীতের রমণীয় ঐতিহ্য সৃষ্টিতে। ‘ত্রুবাদুর’ সংগীতের ঐ স্বর্ণযুগের গীতিময় প্রভাব বিস্তার করেছিল কমবেশি গোটা ইউরোপে।
কোনও কোনও কাব্যবিশ্লেষকের মতে “স্পেনীয় আরব ভুবনের প্রেমকবিতা ও আরবি গীতিকবিতা ইউরোপীয় ‘ত্রুবাদুর’ প্রেমসংগীতের ওপর প্রভাব রেখেছিল।” প্রধানত খ্রিস্টীয় দশম শতাব্দী থেকে পরবর্তী সময়ে প্রাচ্যের ঐসব প্রেমঘনিষ্ঠ গীতিকবিতা ও সংগীতের সৃষ্টি, যা চসার থেকে বোকাচ্চিও, এমনকি বোলতের (ভোলটেয়ার) বা জনসনের মতো ধীমানদের চেতনা স্পর্শ করেছিল। ক্ষেত্রবিশেষে গভীর প্রভাব রেখেছিল। বস্তুত দান্তের ১০০ বছর আগে এবং চসারের ২০০ বছর আগে ফরাসি কবিকুল তাদের নিজস্ব ভাষায় এ কাব্য-কৃতিত্ব অর্জন করেছিলেন। এর কারণ বিশেষজ্ঞদের মতে ফরাসিভাষার তুলনামূলক অধিক বিকশিত চরিত্র।
ইংরেজি, ফরাসি কবিতার মতো জার্মান কবিতারও সূচনা উপাসনাস্তোত্র, শোকগীতি, বা বীরত্বগাথা রচনার মাধ্যমে। এমনকি বারো থেকে তেরো শতকে পৌঁছেও নাইট-নায়ক-বীরদের নিয়ে প্রেমনির্ভর গাথা বা গীতিকবিতা অভিজাতকুলের সদস্য জার্মান কবিদের খুবই প্রিয় বিষয় ছিল। শেষোক্তদের অধিকতর প্রিয় বিষয় ছিল কবিতায় রোমান্সকাহিনি রচনা, অবশ্য রাজসভার রীতিনীতি মেনে। জনপ্রিয় কাহিনি অবলম্বনে চারণকবিদের রচনাও ছিল এসময়কার কাব্যসৃষ্টির বৈশিষ্ট্য। তাছাড়া রাজসভায় পাঠযোগ্য এপিকও ফরাসি-উৎস অবলম্বনে লেখা হয়েছে। যেমন রাজা আর্থারের জনপ্রিয় গোলটেবিল কাহিনি (১১৭৫-৮৬ খ্রি.)।
একইভাবে ফরাসি-উৎস থেকে নেওয়া রাজসভার উপযোগী গীতিকবিতার ফর্মও ছিল প্রেমকাহিনি-নির্ভর (জার্মান ‘মিনেসাং’)। এসব কবির কেউ কেউ আবার রাজসভায় সভাকবির মর্যাদাও লাভ করতেন। এদের মধ্যে বিশেষভাবে জনপ্রিয় ছিল ‘Wallhgion der Vogelweide’-এর প্রেমগীতি। এর গীতিকবিতার প্রভাব দেখা গেছে পরবর্তী কবিদের রচনায়, এর নীতিবাদী ও রাজনৈতিক কবিতাও ছিল জনপ্রিয়। তখনকার জনপ্রিয় কবিতা ছিল একদিকে রাজতন্ত্র বনাম যাজকতন্ত্রের দ্বন্দ্ব সংঘাতের প্রতিভূ, অন্যদিকে ক্রুসেড ও তীর্থপরিক্রমার আধ্যাত্মিক মূল্যবোধে ঋদ্ধ। এর মধ্যে প্রেমকবিতার উৎকৃষ্ট সংকলনও প্রকাশিত হয় (চতুর্দশ শতকে)।
পনেরো শতকের মাঝামাঝি জার্মানিতে টাইপ ও মুদ্রণযন্ত্রের উদ্ভাবন শুধু প্রকাশনার ক্ষেত্রেই নয়, সাহিত্যের ওপরও পরিবর্তনের প্রভাব আনে। তা সত্ত্বেও আশ্চর্য যে, মধ্যযুগীয় প্রথায় রূপককাব্য, লোকগীতি, ‘ব্যালাড’ এবং প্রেম ও প্রকৃতিবিষয়ক গীতিকবিতার পাঠ দীর্ঘদিন অস্তিত্ব বজায় রেখেছে। অবশ্য এর মধ্যে নতুন ধারায় দক্ষিণ অঞ্চলে ‘হিউমার’-‘স্যাটায়ার’ সমন্বিত সংক্ষিপ্ত নাট্যকাব্যের সৃষ্টি জনপ্রিয়তার দিকে একপা দু পা বাড়াতে থাকে।
এর কারণ সামাজিক পরিবর্তন। এ সময়ে মূলত ১৫ শতকের মাঝামাঝি থেকে নব্য ধনিক শ্রেণির আত্মপ্রকাশ ঘটে এবং বুর্জোয়া চেতনার প্রভাব পড়তে থাকে কাব্যসাহিত্যে। ইতালীয় রেনেসাঁসের প্রভাবে ১৪৫০ খ্রি. থেকে সূচিত মানবতাবাদী (‘হিউম্যানিস্ট’) আন্দোলন জার্মান সাহিত্যে নয়া উপকরণ যোগ করে। এরই সঙ্গে ক্লাসিক সাহিত্যের চর্চা-গ্রিক-লাতিন (‘ডেকামেরন’ও বাদ পড়েনি) এমনকি ভারতীয় উপাদানও সাহিত্যচেতনার দিকবদল ঘটায়। ইতিহাস-ঐতিহ্য সম্পর্কেও আগ্রহ দেখা দেয়। স্বাদেশিকতার বোধ রাজনৈতিক ভুবনে বিশেষ বিস্তার লাভ করে। এরও প্রভাব পড়ে সাহিত্যে, বিশেষ করে নাটকে।
ইউরোপীয় কাব্যসাহিত্যের এই প্রাথমিক পর্বে কবিদের লক্ষ্য হয়ে উঠেছিল জীবন-মৃত্যু, প্রেম-ঘৃণা, মিলন-বিরহ চেতনার প্রকাশ ঘটাতে গীতিকবিতার পাশাপাশি কাহিনিকাব্য রচনা। এ প্রবণতাই প্রতিফলিত হয় ট্রাজেডি-কমেডির প্রতি অনুরাগে। ইংরেজি, ফরাসি বা জার্মান কাব্যসাহিত্যে এই একই ধারার প্রকাশ। জার্মান সাহিত্যেও প্রাচীন সংগীত ‘নাইটদের প্রেমকাহিনী’ ‘Minnesongs’ ও চারণ-গাথা হয়ে নেমে আসে লোকসংগীতে। দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ শতকে ফরাসি লেখকদের রচিত বহুখ্যাত পুরাকাহিনিগুলোই ইউরোপীয় সাহিত্যের ঐতিহ্য-উৎস তৈরি করে। যেমন ফরাসি উৎস থেকে রাজা আর্থার ও তার রাউন্ড টেবিলের কাহিনি এ সময়ের ইংরেজি রোমান্স ও অন্যান্য কাব্যের বিষয় হয়ে ওঠে। এর বিশেষ রূপ টমাস ম্যালোরির ‘Morte d’ Arthur উল্লেখযোগ্য।
পরবর্তী দুই শতকে গীতিকবিতার অনন্য কারুকাজ সত্ত্বেও ব্যালাড (গাথা) চর্চাই নানাভাবে প্রধান্য পায় ইংরেজি, জার্মান সব সাহিত্যেই, অবশ্য নিজ নিজ বৈশিষ্ট্য নিয়ে। ফরাসি কবিদের হাতে সাড়ে তিন স্তবকে এর সরলতম চমকপ্রদ রূপ ফুটে ওঠে। তেমনি ‘জড়হফবধঁ’ ধরনের কবিতাও প্রকাশ পায় হ্রস্বতর রূপে। ইতালীয় সনেট অনুকরণের পাশাপাশি ব্যালাডের উৎকর্ষসাধনে ফরাসি কবিদের শ্রম ও সাধনা ছিল সবিশেষ। এগুলোতে চীনা ও আরব কবিতার হ্রস্ব সৌন্দর্য ফরাসি বৈশিষ্ট্য নিয়ে প্রকাশ পেয়েছিল। কবিতার সমৃদ্ধিতে তখন যুদ্ধবিগ্রহের মধ্যেও ছোটবড় রাজসভার রাজপুরুষ ও অভিজাতশ্রেণির প্রাধান্য ছিল লক্ষ করার মতো। ব্যতিক্রম ছিল না ইঙ্গ জার্মান ও ইতালীয় সাহিত্যের ক্ষেত্রে।
ইউরোপে যখন দশম শতকের পর থেকে পনেরো শতক অবধি রোমান্স-প্রধান কাহিনিকাব্য আর সেই সঙ্গে গীতিকবিতা ও ব্যালাড চর্চার প্রাধান্য (সেই সঙ্গে ধর্মীয় উপসনাগীতিও) তখন বাংলা কবিতায় হাজার বছরের ঐতিহ্যের শুরুতে ধর্মীয় চেতনা জীবননির্ভর সহজিয়া সাধনায় প্রকাশ পেয়েছে। চর্যাপদে গুহ্যসাধনার মধ্যেই দুঃস্থ প্রান্তবাসী সাধারণ মানুষের জীবনাচরণের প্রতীকী প্রকাশ স্পষ্ট। এসব কবিতায় মানবিক চেতনাও পরিস্ফুট। চর্যাপদের সহজিয়া তত্ত্বের ভাববাদিতায় তন্ত্রমন্ত্র ধ্যান বা অধ্যাত্মবাদিতা পার হয়ে আছে দেহাশ্রয়ী সহজকে পাওয়ার এক কঠিন সাধনার কথা। তাদের বিচারে ‘মানবদেহের মধ্যেই দেহাতীত সহজের অবস্থান’। আমরা জানি চর্যাপদ রচনার কাল অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতক।
তেমনি মঙ্গলকাব্যেও মানুষের কথা, তার জীবনাচরণের বিশদ বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে। দেবতা সেখানে উপলক্ষ মাত্র, মানুষই মুখ্য বিষয়। মঙ্গলকাব্যের কালপরিসর পনেরো থেকে আঠারো শতক। অন্যদিকে চৌদ্দ থেকে পনেরো শতকের মধ্যে রচিত বৈষ্ণবকাব্যে যেমন আখ্যানমূলক রচনা তেমনি পদাবলির প্রকাশ। এতে গীতিকাব্যের অনন্য সুষমা প্রতিফলিত। সেই সঙ্গে মানবিক চেতনার পরম প্রকাশও সত্যÑ‘সবার উপরে মানুষ সত্য/তাহার উপরে নাই।’ অন্যদিকে বাউল বা প্রাকৃত গানে, তান্ত্রিক সাধনায় এবং অনুরূপ লৌকিক সাধনাকে কেন্দ্র করে রচিত কবিতাগানে মানবধর্ম ও প্রেমধর্মই হয়ে উঠেছে প্রধান।
চর্যাপদ থেকে পরবর্তী কাব্যে মানবিক ও প্রেমচেতনার যে নিগূঢ় প্রকাশ, তাতে রয়েছে বিশ্বজনীন চরিত্র এবং তাতে হৃদয়বৃত্তির, যুক্তির, ব্যক্তিক ও ঐশী প্রেম, রোমান্টিকতা ও আধ্যাত্মিকতার এক অদ্ভুত মিশ্ররূপ প্রকাশ পেয়েছে। সমসাময়িক ইউরোপীয় কাব্যের সঙ্গে তুলনামূলক বিচারে বাংলা কবিতা তখন পিছিয়ে ছিল না, বরং কোনও-কোনও দিক থেকে দু-এক পা এগিয়েই ছিল, বিশেষ করে দার্শনিক অভিধায়, মানবিক চেতনায়; যদিও তাতে ভাবুকতার প্রাধান্য অস্বীকারের প্রয়োজন পড়ে না।
বাঙালির ধর্মসিক্ত জীবনের সহজ লৌকিক রূপ ফুটে উঠেছিল তার প্রাচীন ও মধ্যযুগের কাব্যসাধনায়। পাশাপাশি ধর্মবিযুক্ত চেতনারও কিছুটা প্রতিফলন। পাশ্চাত্য কাব্যের প্রবল ইন্দ্রিয়-ঘনিষ্ঠ রূপও এখানে প্রতিফলিত, বাংলার লোকসাহিত্যে দেখা গেছে জনভিত্তিক মানবিক চরিত্র; তাতে ধর্মীয় সংকীর্ণতার প্রকাশ ছিল না। আঠারো শতক থেকে রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা ও বিদেশি উপনিবেশবাদী শাসনের প্রভাবে যেমন সমাজমানসে তেমনি কাব্যসাধনার ক্ষেত্রেও স্বাভাবিক বিকাশ ব্যাহত হয়েছিল, এমন ধারণা অসংগত বা অযৌক্তিক নয়। একাধিক পরস্পরবিরোধী স্রোত বাংলাসাহিত্যের পথচলা ভিন্ন নিশানায় নিয়ে যায়। পাশ্চাত্য রেনেসাঁসের প্রভাব তার অন্তর্লোকে ভালোভাবে প্রবেশ করতে পারেনি। এর মধ্যে এসেছে নৈরাজ্যিক সময়; সাহিত্যে কিছুটা গ্রহণের কাল। এরপর সাহিত্য যখন চোখ মেলেছে, তখন সেখানে একদিকে সম্প্রদায়বাদী সংকীর্ণতা, অন্যদিকে ঔপনিবেশবাদী এলিট আধুনিকতার জনবিচ্ছিন্নতা, মাঝখানে স্বাদেশিকতার নানামুখী চেতনা। এ ধারা বেয়ে বাংলা কবিতা চল্লিশের দশকে পৌঁছেছে। এর মধ্যে দেশবিভাগ (১৯৪৭) বাংলা কবিতাকে দুই বাংলাভাষী ভূখণ্ডে বিভক্ত করেছে। ঘটেছে বাংলা কবিতার দুই ভূখণ্ড-ভিত্তিক স্বতন্ত্র বিকাশ।
তিন
যোড়শ শতকে ইউরোপীয় রেনেসাঁস বিজ্ঞান, দর্শন ও জ্ঞানের নানা শাখায় বুদ্ধিদীপ্ত মননশীলতার চর্চায় এক আলোকিত পরিবেশ তৈরি করে, সেইসঙ্গে শিল্প-সাহিত্যের ক্ষেত্রেও নয়া সৃষ্টির উদ্দীপক ঢেউ তোলে, যে ঢেউ ইতালি, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড ও সংলগ্ন দেশগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। একদিকে গ্রিক, লাতিন ইত্যাদি ভাষার ধ্রুপদী সাহিত্য ও জ্ঞানবিজ্ঞানের পাঠ চিন্তার নবজাগরণ ঘটায়, অন্যদিকে যুক্তিবাদিতার পাঠগ্রহণ ধর্মীয় সংস্কারের পথ তৈরি করে দেয়। সময়টা হয়ে ওঠে জ্ঞানচর্চার; মুক্তচিন্তা ও মুক্তবুদ্ধির চর্চা এবং সেই সঙ্গে ব্যক্তিক ও মানবিক অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠার।
এমন একটি আলোড়িত পরিস্থিতির খুবই প্রয়োজন ছিল বিরাজমান অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে। যেমন প্রয়োজন ছিল সমাজের জন্য তেমনি ছিল শিল্প-সাহিত্যের বৈচিত্র্যময় নয়া সৃষ্টির জন্য। সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে ফ্রান্সই এদিক থেকে এগিয়ে ছিল, বিশেষ করে বুদ্ধিদীপ্ত মানসিকতা ও দার্শনিকতার চর্চায়, যা পরবর্তী কয়েক শতকে কূলপ্লাবী চরিত্র অর্জন করে। পাশাপাশি কবিতা, নাটক ও মননশীল সাহিত্যে এর সর্বাধিক প্রভাব পড়ে।
এ পর্বে প্রতিনিধিস্থানীয় মনীষার সর্বোত্তম প্রকাশ ঘটে ফ্রাসোঁয়া র্যাব্লে (১৪৯০-১৫৫৩)-র তীব্র স্যাটায়ার থেকে পিয়ের রনসাঁর (১৫২৫-৮৫) এবং জোয়াসিম দ্য বেলি (১৫২২-৬০)-র মানবিক প্রেমের আনন্দ বেদনার গভীরতায় ভাস্বর সনেট ও গীতিকবিতার উৎকর্ষে। এদের ওপর ইতালীয় সনেটের অন্যতম প্রধান পেত্রার্কের প্রভাব নিতান্ত কম ছিল না। আদি রেনেসাঁসের পথ ধরে মানবিক আদর্শ ও মূল্যবোধে জারিত ছিল এ সময়কার কবিদের চেতনা। কবিতায় নাটকে ভাষার কারুকুশলতায় এ প্রভাব ছিল সবচেয়ে বেশি।
সময়টা একইভাবে ইংরেজি সাহিত্যের জন্য ছিল অনুরূপ সমৃদ্ধ সৃষ্টির। আদর্শ সৌন্দর্য, আদর্শ প্রেম কবিতার বিষয় হয়ে ওঠে আর ধ্রুপদীচেতনার চর্চা কবিতায় প্রাধান্য পায়; ভাষাচর্চার ক্ষেত্রেও তাই। ভাষা ও শব্দের শক্তি আর কারুকর্মের প্রতি নজর পড়ে বিশেষভাবে। এদিক থেকে স্মরণীয় এডমন্ড স্পেনসর (১৫৫২-৯৯)। শব্দকে শাণিত ও সুচারু করে তোলার দিকে তার ঝোঁক ছিল অসামান্য। শব্দের আকার, রঙ ও ছন্দোবিন্যাস নিয়ে তার সমীক্ষা খানিকটা অদ্ভুতই বটে। তার ‘ফেয়ারি কুইন’ কবিতা তখনকার জন্য ছিল আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। এর কারণ সেখানে প্রোটেস্টান্ট জাতীয়তাবাদের প্রতীকী প্রকাশ।
ইংরেজি সাহিত্যে এ সময়টা (এলিজাবেথীয় যুগ) কাব্যনাট্যের উৎকর্ষে স্বর্ণযুগ তথা শেক্সপিয়রীয় যুগ হিসেবে চিহ্নিত হলেও সনেট, লিরিক গীতিকবিতা বা দীর্ঘকবিতার বিচারেও সমৃদ্ধির যুগ। উইলিয়াম শেক্সপিয়র (১৫৬৪-১৬১৬), ক্রিস্টোফর মার্লো (১৫৬৪-৯৩) এবং বেন জনসন (১৫৭৩-১৬৩৭) উল্লিখিত কাব্যসৃষ্টির কৃতী পুরুষ।
এই সোনালি যুগের সাংস্কৃতিক চরিত্র রচনায় যেমন স্পেনসর তেমনি তার সমকালীন স্যার ফিলিপ সিডনির অবদানও কম নয়। তিনি যে শুধু নব্য-রেনেসাঁসীয় চেতনায় সিক্ত কাব্যের সপক্ষে (‘The Defence of Poesie’, c. 1578) সন্দর্ভ রচনা করে কবিতার অগ্রযাত্রা নিশ্চিত করেন তাই নয়, ‘বিশ্বজনীন মানব’ (টহরাবৎংধষ গধহ) ধারণার প্রতিষ্ঠায়ও মনোযোগী ছিলেন। কবিতার প্রচলিত ফর্ম ভেঙে নয়া ফর্ম ও নয়া গঠনশৈলীর মধ্যদিয়ে ‘মেলোডি’ সৃষ্টির চেষ্টা ছিল তার। যেমন সামাজিক শ্রেণির ক্ষেত্রে, তেমনি কবিতার আঙ্গিকে দুই বিপরীতকে মেলানোর তত্ত্বে বিশ্বাসী ছিলেন ফিলিপ সিডনি।
যেমন স্পেনসর ও সিডনি, তেমনি কবি জন ডান ভিন্ন দিক থেকে একই গন্তব্যে পৌঁছাতে চেষ্টা করেছেন। কবিতাকে নয়া অগতানুগতিকতার সমৃদ্ধ চরিত্রে তুলে ধরার ক্ষেত্রে কবিতার প্রচলিত ফর্ম ভেঙে ছন্দ ও উপমার চিরাচরিত রীতি থেকে সরে এসে সনেট, স্যাটায়ার, গীতিকবিতা ইত্যাদিতে নয়া রীতির উদ্ভব ঘটান জন ডান (১৫৭২-১৬৩১)। তবে বৈপরীত্য জন ডানের বৈশিষ্ট্য যেমন চেতনার দিক থেকে, তেমনি কবিতার আঙ্গিকে (বিশেষত গীতিকবিতা ও সনেটে)। তাঁর ব্যক্তিত্ব বহুধাবিভক্ত, অস্থির অনিশ্চয়তায় ভরা, আবার সমাজ-সংস্কৃতির অবক্ষয়ের প্রতি তীব্র ব্যঙ্গবিদ্রƒপে সোচ্চার। ডক্টর জনসন তাঁর কবিতা ‘মোটাফিজিক্যাল’ (অধিবিদ্যক) চরিত্রে চিহ্নিত করলেও তাতে দুই বিপরীতের সুস্পষ্ট টান লক্ষ করা যায়Ñযা কারও কারও মতে চরিত্রধর্মে সেক্যুলার। আত্মপ্রতিষ্ঠার আকাক্সক্ষার সঙ্গে আত্মসমালোচনা ঐ বৈপরীত্যেরই উদাহরণ। আসলে তার অস্থিরতা ও বৈপরীত্যবোধ নিয়ে জন ডান দুই যুগসন্ধির কবি, সেই সঙ্গে যুগ অতিক্রমেও সফল।
আর এ কথাও সত্য যে, সাহিত্যের ঐ সোনালি যুগের আর্থ-সামাজিক চেহারাটা মোটেই সোনালি ছিল না। সেখানে ছিল অস্থির আর্থ-সামাজিক চাপের অস্বাভাবিকতা। জনসংখ্যার বৃদ্ধি (দ্বিগুণ), দ্রব্যমূল্যের হঠাৎ বৃদ্ধি, শিল্পবাণিজ্য-কৃষিতে নতুন অর্জনের সন্ধান, প্রকৃত মজুরির সর্বনিম্নপর্যায় এবং সর্বোপরি বণিকী স্ফীতির বিনিময়মূল্য অভিজাত ও শ্রমিকশ্রেণির কাঁধে রীতিমতো চাপ সৃষ্টি করে। স্বভাবতই রেনেসাঁসীয় মূল্যবোধের পরিপ্রেক্ষিতে সংস্কৃতিক্ষেত্রের সংবেদনশীল মননে এ পরিস্থিতি প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে এটাই ছিল স্বাভাবিক। এ সবই দেখা গেছে জন ডানের তিক্ত বিদ্রƒপে এবং জনসনের মেধাবী রচনায় নয়া মূল্যবোধ সৃষ্টির ইচ্ছায়, যা কমবেশি প্রতিফলিত ফিলিপ সিডনির নয়া সংস্কৃতিচেতনার রূপরেখা প্রণয়নে।
তাই উল্লেখিত কাব্যসাহিত্যের নয়া উদ্ভাবনা ও উজ্জীবনের লক্ষ্য ছিল বিরাজমান রাজমহিমার মধ্যেও ব্যক্তিচেতনার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা। কবিতা আত্মসচেতন ভূমিকা নিয়ে ব্যক্তির সামাজিক অবস্থান নিরাপদ ও নিশ্চিত করতে চেয়েছে। বুর্জোয়াব্যবস্থার অসারতা তার চৈতন্য স্পর্শ করেছে। আর বুর্জোয়াব্যবস্থার অন্তর্নিহিত স্ববিরোধী দুর্বলতার কারণে পরিপূর্ণ প্রতিবাদী অবস্থানের বদলে কবি ও কবিতাকে মধ্যপথ গ্রহণ করতে হয়েছে। এর প্রমাণ মেলে প্রতিবাদের পর অবস্থান-ত্যাগ, সাময়িক আশ্রয় হিসাবে শেক্সপিয়রীয় কাব্যনাট্যের ময়নাদ্বীপের স্বপ্নে (‘টেম্পেস্ট’)। এ ছাড়া ছিল রাজা-রাজসভা-অভিজাতদের সমন্বয়ে গঠিত ত্রিমাত্রিক অন্তর্দ্বন্দ্বÑযেখানে ‘ক্যালিবান’ অন্তর্ভুক্ত নয় এবং যে দ্বন্দ্বের টানে পরবর্তীকালে প্রতিক্রিয়ার জন্ম।
অনেকটা অনুরূপ ধারায় রেনেসাঁসের আলোয় মুক্তচিন্তার পথ ধরে জার্মানিতে ধর্মীয় সংস্কার তথা ‘রিফর্মেশন’ (মার্টিন লুথার) মানবিক ঔদার্যের চেতনা প্রধান করে তোলে। এর প্রভাব পড়ে সাহিত্যে-সংস্কৃতিতে-কবিতায়। স্বদেশি ভাষায় বাইবেল অনুবাদ ও পাঠ, ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে উপাসনাগীতি ও স্তোত্ররচনা এবং বাইবেলীয় কাহিনি নিয়ে নয়া চারিত্র্যে নাট্যরচনা প্রচলিত প্রথার বাইরে পা রাখে। বিজ্ঞানে দর্শনে লাতিনের বদলে জার্মান ভাষার ব্যবহার এবং অনুরূপ একাধিক পদক্ষেপ ঘিরে জার্মান জাত্যাভিমানও প্রকাশ পায়।
যেমন কবির চেতনায় তেমনি সময় ও সমাজে দ্বন্দ্ব ও প্রতিক্রিয়ার অস্থিরতা ভবিষ্যৎ পরিবর্তনের ইঙ্গিত আনে। সতেরো শতক সেই সন্ধিক্ষণের প্রতীক হিসাবে উপস্থিত হয়। এ সময়েই ইংরেজ বুর্জোয়াদের সাময়িক হলেও রাজতন্ত্রবিরোধী ভূমিকা; রাজসভার স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে ব্যক্তি ও সমষ্টির মানবতাবাদী চেতনার উদ্ভাস; সংঘাত, গণবিদ্রোহ, গৃহযুদ্ধ, স্টুয়ার্ট রাজবংশের পতন; আবার বিপরীত ধারায় নয়া রাজসভার সঙ্গে অভিজাততন্ত্রের আপসবাদিতা এবং সেই টানে আশা-নিরাশার বিচিত্র ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার প্রকাশ ঘটে। এর পাশাপাশি বিজ্ঞানের জয়যাত্রা ও যুক্তিবাদের প্রাধান্য ঘিরে বিজ্ঞান ও কবিতার পারস্পরিকতা কবিতার জন্য নতুন আশার সম্ভাবনা তুলে ধরে।
এই দ্বন্দ্বের মধ্যদিয়ে ১৭-শতকে ইংরেজি কবিতার বিদ্রোহী চরিত্রের প্রকাশ। ‘স্যাটান’ হয়ে ওঠে বিদ্রোহী তথা আধিপত্যবাদ-বিরোধী শক্তির প্রতীক। কিন্তু রাজতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা, প্রজাতন্ত্রীদের পরাজয় ও অভিজাতদের আপসবাদিতা ব্যক্তিচৈতন্যের জয় নিশ্চিত হতে দেয়নি, চক্রের পূর্ণ আবর্তন ঘটেনি। মিলটনের সদিচ্ছা কার্যকর হয়নি। তবু লক্ষ্য অর্জনের লড়াই চলেছে। ক্রমওয়েলের মানবীয় বিজয়বার্তা পিছু হটে গেলেও চেষ্টা চলেছে শুদ্ধতর নীতি ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠার জন্য। জন মিলটন (১৬০৮-৭৪) ইংরেজি কাব্যে সেই অস্থির যুগচেতনার যথার্থ প্রতিভূ। তার কাব্যসৃষ্টি স্বর্গ হতে বিদায় ও অন্যান্য চরিত্রবিচারে একই সঙ্গে সংগ্রাম ও নিঃসঙ্গতার প্রতীক। তার নীতিবাদী লড়াই শুদ্ধতা, মঙ্গল ও সদাচারের লক্ষ্যে সমর্পিত। কবিতার ভাষাও ক্রমশ শুদ্ধতার দিকে ঝুঁকেছে, মার্জিত শব্দাবলি নিয়ে সংযত ছন্দের সারল্য অর্জনে আগ্রহী হয়ে উঠেছে। আর মানবীয় মুক্তির চেতনা যেন বলতে চেয়েছে : ‘মানুষ তার আত্মপ্রতিষ্ঠার রূপকার।’
কিন্তু সতেরো শতকের অস্থির সময় আর্থ-সামাজিক পশ্চাৎবর্তিতার কারণে ফ্রান্সের জন্য হয়ে ওঠে প্রতিক্রিয়া ও দুর্যোগের ইঙ্গিতবাহী। যন্ত্রবিজ্ঞানের প্রয়োগে পশ্চাৎপদতা, কৃষিনির্ভর ক্ষয়িষ্ণু অর্থনীতি, ভূমি-অভিজাতদের ঘুণেধরা ক্ষয়িষ্ণু জীবন সামাজিক-সাংস্কৃতিক ক্ষয়ের প্রকাশ স্পষ্ট করে তোলে। বিত্তবান-অভিজাতদের ‘সালোঁ’ (‘ঝধষড়হং’)-সংস্কৃতি একদিকে অনাচারে, অন্যদিকে ভোগবাদিতায় স্থবিরতার প্রতিফলন নিশ্চিত করে। অবস্থাটা ইংরেজি সাহিত্য থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন মূলত রাজনৈতিক-সামাজিক কারণে। এ অস্বাভাবিকতা কারও-কারও বিচারে ‘বারোক’ প্রতিক্রিয়া হিসেবে চিহ্নিত।
রেনেসাঁস-উত্তর শিল্পকলার পদ্ধতিগত বাঁক ফেরা, প্রচলিত রীতিনীতির বিপরীত পথ ধরে চলায় হোক তা উদ্ভট, তাৎক্ষণিক চেতনার প্রকাশ, তা-ই ছিল ‘বারোক’-বৈশিষ্ট্য। এর মধ্যে আবার স্ববিরোধী চরিত্রের অভাব ছিল না। কিন্তু চিত্রকলার জন্য যা ছিল সত্য বা জার্মান সাহিত্যের জন্য সত্য, তৎকালীন ফরাসি কবিতায় ‘বারোক’ প্রভাব ঠিক সে-অর্থে প্রতিফলিত হয়নি। বরং এক ধরনের আত্মমুখী সংকীর্ণতার পথই চলার পক্ষে সঠিক বিবেচিত হয়। এবং তা প্রধানত ঐ ‘সালোঁ’ আচারের প্রভাবে।
ফলে যেমন সমকালীন তেমনি ফেলে-আসা রীতির চর্চা কবিতায় প্রাধান্য পায়। সম্পূর্ণ বিপরীত চরিত্রের এসব কবিতার ফর্মের মধ্যে রয়েছে ‘ম্যাড্রিগাল’ ‘ভিলানেল’ ‘সনেট’, পুরনো ‘ব্যালাড’, দীর্ঘ ‘শোকগাথা’ ইত্যাদি। আর এসব রচনার পেছনে উঠে আসেন কয়েকগুচ্ছ গৌণ কবি। নাগরিক জীবনে উচ্ছৃঙ্খল যৌনতা, আভিজাত্যবাদী অহমিকা আর উগ্র বিলাসী ফ্যাশনপ্রিয়তার মধ্যে ধ্রুপদীচর্চার উদাহরণ বিরল হয়ে ওঠে। নষ্টভ্রষ্ট পচনধরা এ অবস্থা যেমন পরবর্তী শতকে ভোলটেয়ার বা রুশোর প্রতিবাদী শক্তিত্বের আবির্ভাব সম্ভব করেছিল, তেমনি রাজনৈতিক সামাজিক স্তরে বিস্ফোরক পরিবেশও গড়ে তোলে। আবার এ অস্থির অনিশ্চয়তার মধ্যে যুক্তিবাদী চেতনার টানেই সম্ভবত রেনে দেকার্তের (১৫৯৬-১৬৫০) মতো বিশ্বাসী যুক্তিবাদী দার্শনিক তার মানবিকতার চেতনা তুলে ধরেন। বলেন : ‘সত্যের অন্বেষায় ব্রতী মানুষই স্রষ্টার মূল অবদান। যুক্তি স্রষ্টারই দান। আর যুক্তির সাহায্যেই সত্যের সন্ধান।’
জার্মানিও তখন প্রায় একই ধরনের অস্থিরতা-অনিশ্চয়তায় ভুগছে। একদিকে ধর্মীয় সংস্কার (রিফর্মেশন), যুক্তিবাদী জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চা; অন্যদিকে সংস্কার-বিরোধিতা (কাউন্টার রিফর্মেশন), যুদ্ধ, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা সমাজ ও সংস্কৃতিতে ছায়া ফেলে। এমন এক বৈপরীত্যের টানে সাহিত্যে ‘বারোক’-প্রভাব প্রধান হয়ে ওঠে। এতেও ছিল বৈপরীত্যের উপস্থিতি। যেমন তাৎক্ষণিকতা, আবেগদীপ্ত অস্থিরতা, তেমনি সময়কে ফাঁকি দিয়ে অসীমের সন্ধান বারোক-সাহিত্যের বৈশিষ্ট্য হয়ে ওঠে। বারোক-ধারার আরেক বৈশিষ্ট্য ছিল ঐশীচেতনার পাশাপাশি জীবনবাদী বাস্তবতার প্রতি আকর্ষণ।
সমকালীন ইউরোপীয় সাহিত্যের ব্যবহৃত বিষয় এবং লিরিক, এপিক বা নাট্যকাব্যে ব্যবহৃত ‘থিম’ যদিও তখন কবিদের উপজীব্য ছিল, তবু এর মধ্যেই দেখা গেছে ‘বারোক’ কবিদের এক অদ্ভুত দ্বৈতসত্তা, যা পরিস্ফুট একই সঙ্গে সেক্যুলার ও ধর্মীয় কবিতা রচনায়। এসব সহজ সারল্য ও জৈবনিক উষ্ণতা ছিল লক্ষণীয় চরিত্রের। পল ফ্লেমিং-এর প্রেম-কবিতা ও সনেটে যেমন ধরা পড়ে একাধারে আবেগের গভীরতা ও গীতিময়তার সুষমা, তেমনি পল জেরহার্ডের স্তোত্রে ফুটে ওঠে সাহজিক সারল্য যা স্বচ্ছতায় আকর্ষণীয়।
ইউরোপীয় রেনেসাঁসের অন্তর্নিহিত শক্তির টানে সেখানে জাতিরাষ্ট্রের স্বাদেশিকতা এবং মাতৃভাষার বিকাশ ও ব্যবহারিক ভূমিকা সাহিত্য-সংস্কৃতির বিভিন্ন শাখায় উচ্চমাত্রিক গুণগ্রাম পরিস্ফুট করে তোলে। সে পথ ধরে সতেরো শতকেরও জ্ঞানবিজ্ঞান দর্শন চর্চার যুক্তিবাদী ধারায় সংস্কৃতি অঙ্গনে ১৮ শতক যেমন আলোকিত সময় (‘এনলাইটেনমেন্টের’ যুগ) হিসাবে চিহ্নিত, তেমনি তা শিল্পবিপ্লবেরও সূচনা ঘটায়। ফলে একদিকে স্বাধীনতা ও সামাজিক বন্ধনমুক্তির সম্ভাবনা দেখা দেয়, অন্যদিকে প্রকৃতির ওপর বিজ্ঞাননিষ্ঠ যন্ত্রশক্তির প্রভুত্বের কারণে উৎপাদনের দ্রুত বৃদ্ধি, বাণিজ্যের ব্যাপক প্রসার এবং উপনিবেশের বিস্তার রাষ্ট্র ও সমাজের চরিত্র পালটে দিতে থাকে। উপনিবেশবাদী শোষণ বিপুল পুঁজির উৎস হয়ে ওঠে। এশিয়া, আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার সমৃদ্ধ ভাণ্ডার লুট করে ইউরোপীয় জাতিরাষ্ট্রগুলোর যে বিপুলায়তন স্ফীতি, সেখানে ইংল্যান্ডের স্থান ছিল সবার ওপরে।
সময়টা হয়ে ওঠে ইউরোপীয় জাতিরাষ্ট্রগুলোর পক্ষে আত্মসমৃদ্ধির উপযোগী। আকাক্সক্ষার তাড়নায় বিশ্বজুড়ে শক্তির দাপট নিয়ে তাদের বিচরণ। সেখানে নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা ছিল না এমনও নয়। তবু রাষ্ট্রের আধুনিকীকরণ, সামাজিক সংস্কার ও যুক্তিবাদী জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চার মধ্য দিয়ে যে আলোকিত চেতনার প্রকাশ তার কিছুটা সুপ্রভাব পড়ে সাহিত্য-সংস্কৃতির অঙ্গনে। সতেরো শতকের ফরাসি ‘Art of Poetry’তে (১৬৭৪) প্রতিফলিত শৈল্পিক যুক্তিবাদ (ভাষা, বিষয় ও প্রকরণের সংগতি নিয়ে) ১৮-শতকে এসে সার্বিক যুক্তিবাদে পরিণত হয় যা প্রভাব ফেলে শিল্পীচৈতন্যে। ব্যক্তিমানুষ ও সামাজিক মানুষ দুই-ই কবিচৈতন্যে ছায়া ফেলতে থাকে। কিন্তু সংবেদনশীল শিল্পীচৈতন্যে দুই ভিন্ন বাস্তবতার দ্বন্দ্বও ক্ষেত্রবিশেষে প্রভাব ফেলেছে।
চার
আঠারো শতকের ঐ বৈপরীত্যময় যুক্তিবাদী চেতনার মিশ্ররূপ প্রকৃতপক্ষে পূর্ববর্তী দুই শতকের ধারাবাহিকতায় অর্জিত। ষোড়শ শতকীয় সাহিত্যের সোনালি আভা ১৭-শতকের সমাজবাস্তবতার ভিত্তিতে যে প্রতিক্রিয়া ও যুক্তিবাদী চেতনার প্রকাশ ঘটায় তা কবিতা ও গদ্য রচনায় এক বৈপরীত্যময় ধারার জন্ম দেয়। রাজনীতি ও সাহিত্যের মূল্যায়নে মূলত সমালোচনা ও শ্লেষাত্মক চরিত্র প্রধান হয়ে ওঠে। আর কবিতায় ব্যঙ্গবিদ্রুপের প্রকাশ পূর্ব-ঐতিহ্য ধারায়।
জোনাথন সুইফট (১৬৬৭-১৭৪৫)-এর খ্যাতি যদিও গদ্যসাহিত্যের তীক্ষè, শরসন্ধানী স্যাটায়ারিস্ট হিসাবে, তবু এদিক থেকে কবিতায় তার সিদ্ধি রচনার স্বল্পতা সত্ত্বেও অবহেলার নয়। যেমন বিষয়ে, তেমনি এবং মূলত প্রকরণের শাণিত দীপ্তি তার কবিতার বৈশিষ্ট্য। তার হিউমার-সিদ্ধ ‘Verses on the Death of Dr. Swift’ (রচনা ১৭৩২, প্রকাশ ১৭৩৯) বিদ্রƒপাত্মক রসরচনার চমকপ্রদ উদাহরণ। নিজেকেও রেহাই দেননি সুইফ্ট। তার অন্যান্য কবিতায়ও মানবিক চেতনার প্রতিফলন খুবই স্পষ্ট।
কিন্তু ১৮-শতকের ইংরেজি কবিতার যুগপ্রতিনিধিদের অন্যতম প্রধান পুরুষ আলেকজান্ডার পোপ (১৬৮৮-১৭৪৪)-এও উল্লিখিত মিশ্র উপলব্ধির প্রকাশ সুস্পষ্ট। দুই উপলব্ধির টানাপড়েনে বরাবর তাড়িত হয়েছেন পোপ। যেমন টোরি (রক্ষণশীল) রাজপ্রধানদের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা ছিল, তেমনি আবার সমকালীন সমাজের বহিরঙ্গে জড়ানো সুদর্শন আবরণের প্রতি শ্লেষ প্রকাশে দ্বিধা ছিল না তার (‘Rape of the Lock)। এককথায় ফ্যাশনসর্বস্ব তৎকালীন এলিটসমাজের প্রতি আসক্তি ও ব্যঙ্গবিদ্রƒপ দুইই প্রকাশ করেছেন পোপ, যদিও ব্যঙ্গবিদ্রƒপের দিকটা তুলনামূলক বিচারে তিক্ততায় জারিত। তার একাধিক কবিতায় কমনীয়তা ও রুক্ষতা, সদর্থক চেতনা ও ইন্দ্রিয়জ বাসনার সংমিশ্রণ ঘটেছে (১৭১৭)। তার শেষ দিককার রচনায় তিনি বহু চেনা বাণিজ্যিক সমাজের নৈতিক বিকৃতি ও নৈরাজ্যের প্রতি সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। অথচ ঐ অবাঞ্ছিত পরিবেশে তার বসবাস যেন ভবিতব্য-নির্ধারিত, অনিবার্য। এমনি সামাজিক ও শৈল্পিক দ্বন্দ্বের মধ্যেই পোপের জীবন অতিবাহিত হয়েছে। হয়তো ঐ দ্বন্দ্ব থেকে মুক্তির উদ্দেশ্য নিয়ে পোপ মাঝেমধ্যে প্রকৃতির দিকে হাত বাড়িয়েছেন।
এমনটা প্রায়ই দেখা যায় যে, শৈল্পিক ও সামাজিক দ্বন্দ্বের তাড়নায় দুই বিপরীতের সমন্বয় ঘটাতে গিয়ে যুক্তিবাদী বাস্তবতার অপর পিঠে ভাববাদী অধ্যাত্মবাদিতা অনেক সময় স্বস্তির আশ্রয় গড়ে তোলে। উইলিয়াম ব্লেক (১৭৬৭-১৮২৭) ঐ তাড়িত বিরলদের অন্যতম। একাধারে কবি ও চিত্রশিল্পী ব্লেক ছিলেন নিঃসঙ্গচেতনার অন্তর্মুখী ব্যক্তিত্ব, প্রচলিত রীতিনীতি প্রথার বিপরীত পথের যাত্রী। তাকে নিয়ে হিসাব মেলানো ঠিকই একটু কঠিন। কারণ কবি ব্লেক একদিকে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী অথচ আপসহীন, অন্যদিকে প্রথাবিরোধী, কিন্তু অধ্যাত্মবাদিতায় আক্রান্ত; সর্বোপরি কবিতায়, নতুন ধারার প্রবর্তনে আগ্রহী। পীড়ন বা দমন তার চোখে অনাচার ও পাপ, অথচ পীড়ন থেকে মুক্তির পথ তার জন্য লড়াইয়ের নয়। আবার এই কবিই ফরাসিবিপ্লবকে স্বাগত জানান, বিপ্লবের প্রতীক লাল ব্যাজ টুপিতে পরেন। সময় ও সমাজের ভণ্ডামিকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেন। তার অনন্য রচনা ‘The Marriage of Heaven and Hell’ (1790-93)’ (১৭৯০-৯৩)’ ও ‘Songs of Experience’ (1794)’ (১৭৯৪)। এতে তিনি প্রচলিত যুক্তিবাদের বদলে নিজস্ব পৌরাণিক যুক্তিবাদী তত্ত্ব দাঁড় করান এবং পরবর্তী একাধিক রচনায় তা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন।
তাই বলা যায়, অদ্ভুত এক আত্মিক দ্বন্দ্ব ও স্ববিরোধিতার কবি উইলিয়াম ব্লেক। কবিতা তার নিজস্ব প্রতীকের চাপে কখনও কখনও দুর্বোধ্য হয়ে উঠেছে, আবার কখনও সহজ স্বচ্ছন্দ আকর্ষণীয়। এককথায় সমকালের দ্বন্দ্ব, বৈপরীত্য চেতনা, অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতার পরিপূর্ণ প্রতীক কবি ও চিত্রী ব্লেক। সমকাল তাকে উন্মাদ আখ্যা দিয়েছিল। শিল্পী হিসাবে ঐতিহ্যকে অগ্রাহ্য করেছেন ব্লেক, কিন্তু তার সৃষ্টিতে ছিল সময়তাড়িত নৈরাজ্যের প্রভাব। অন্যদিকে তাত্ত্বিকতার ঊর্ধ্বে সহজ সারল্যের কবিতায় ব্লেক ছিলেন অসামান্য, যে-কবিতা মানবিক বোধেও ঋদ্ধ। সব মিলিয়ে তাকে ওয়ার্ডসওয়র্থ প্রমুখ রোমান্টিকদের সঙ্গে এক সারিতে অন্তর্ভুক্ত করা (এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা, ১৮ খণ্ড, পৃ. ৪৫১) যায় কি না সেটা বিবেচ্য বিষয়। আসলে ব্লেক যুগসন্ধিক্ষণের কবি, যার পদচারণা উনিশ শতকেও প্রসারিত। হয়তো তাই রোমান্টিকদের সঙ্গে তার আসন নির্ধারিত হয়।
অনেকটা ব্লেকের মতোই সময়তাড়িত কবি রবার্ট বার্নস (১৭৫৯-১৭৯৬)। অকালপ্রয়াত এই কবি সমকালে একই সঙ্গে স্বীকৃত এবং কিছুটা অবহেলিত (কৃষক সন্তান হওয়ার কারণে ?)। তিনিও সামাজিক বৈষম্য ও প্রচলিত নৈতিক ও ধর্মীয় ভণ্ডামির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন। তার আবেগতাড়িত প্রেমগীতির পাশাপাশি অন্যান্য কবিতায় সমকালের প্রতি তীক্ষè বিদ্রƒপই (১৭৮৫) শুধু বর্ষিত হয়নি, ব্যক্তিসত্তা এবং জাতিসত্তার মুক্তির আকাক্সক্ষাও সেখানে প্রতিফলিত। সেই সঙ্গে রয়েছে সামাজিক বিধিবিধান পরিবর্তনের ইঙ্গিত। হতে পারে ফরাসিবিপ্লবের (১৭৮৯-৯৫) আঁচ তার চৈতন্য স্পর্শ করেছিল। তাকে নিয়ে মতভেদ বিস্তর। প্রসঙ্গত স্মর্তব্য, আত্মঘাতী কবি টমাস চ্যাটারটন (১৭৫২-৭০) যিনি ১৮ বছরের উদ্ধত যৌবনের গর্ব ও শৈল্পিক রোমান্টিকতা নিয়ে গল্পকথার নায়ক।
সত্যই ইংরেজি কবিতায় ১৮-শতক সম্ভাবনা ও রোমান্টিকতা নিয়ে, বিদ্রƒপ ও স্যাটায়ারের বাস্তবতা নিয়ে দ্বৈতসত্তার প্রতীক এক ক্রান্তিকাল। পোপ থেকে সুইফট ও জনসন হয়ে ব্লেক ও বার্নসে সেই যুগচেতনার প্রকাশ। স্যামুয়েল জনসন (১৭০৯-৮৪) যদিও ভাষা ও গদ্য সাহিত্যের অনন্য রূপকার হিসাবে খ্যাত, তবু তার কবিতা ধ্রুপদী স্বচ্ছতা, ডেকাডেন্স-বিরোধী স্যাটায়ার, যুক্তির ধার, শ্রম ও মেধার সমন্বয়ে অনন্য। ‘এলিজি, ওউড্ (Ode), স্যাটায়ার ও শ্লেষ-কবিতায় জনসন ছিলেন সমান পারদর্শী’। এদিক থেকে তার চমকপ্রদ সৃষ্টি ‘The Vanity of Human Wishes’ (১৭৪৯)। তবু কবিতাকে ছেড়ে শাণিত ও বিশ্লেষী গদ্যের পেছনেই তিনি সময় ব্যয় করেছেন।
আঠারো শতকের উল্লিখিত যুগপ্রতিনিধিদের হাত দিয়েই কবিতার ভাষা ও ফর্মে পরিবর্তন, শব্দাবলির চারুরম্যতা বা স্যাটায়ারের তীব্র তীক্ষè শাণিত রূপ ধরা দিয়েছে। এদের শ্রমে ইংরেজি ভাষা ও কবিতার দৃষ্টিনন্দন ভবিষ্যৎ-চরিত্রের ভিত অনেকটাই তৈরি হয়েছিল। আর ১৮-শতক যদি পোপের কবিতায় প্রতিফলিত হয়ে থাকে (যেমনটা দাবি করা হয়) তাহলে স্বীকার করতে হয় যে, স্কটল্যান্ডের জাতীয় কবি বার্নসে এর অপর পিঠ পরিস্ফুট।
এ সময়ে ইংরেজির তুলনায় ফরাসি কবিতা কিছুটা পিছিয়ে ছিল, যদিও শতাব্দীর শেষ দিকের কবিতা, বিশেষ করে আঁদ্রে চেনিয়ে (১৭৬২-৯৪)-র রচনা পরবর্তী রোমান্টিক-পর্বের পূর্বসৃষ্টি হিসাবে বিবেচিত হতে পারে। এর বাইরে ফরাসি সাহিত্যের পুরোটাই যুক্তিবাদিতার, বিজ্ঞানমনস্কতার ও মানবিক চেতনার যা বোলতের, রুশো, দিদেরো প্রমুখের মানসবৈশিষ্ট্যে পরিস্ফুট। তাদের রচনায় পরিস্ফুট যুক্তিবাদ যেমন মানবিকতার পক্ষে, তেমনি শ্রেণিবৈষম্যের বিরুদ্ধে, তেমনি আধিপত্যবাদী চেতনার বিরুদ্ধে। সময়টা ফরাসি এনসাইক্লোপিডিয়ায় নিষ্ঠদের জন্যও বটে। ফলে প্রগতিচেতনায় পরিস্রুত লেখকদের সামাজিক-বৈজ্ঞানিক-দার্শনিক প্রশ্ন ও বিচার সমাজে প্রভাব ফেলে, ভাষাও হয়ে ওঠে যুগোপযোগী, এমনকি অগ্রযাত্রিক।
সতেরো শতকের জার্মান সাহিত্যে ধর্মীয় ও ঐশীচেতনার যে প্রাধান্য, সম্ভবত তারই প্রতিক্রিয়ায় ১৮-শতকের বুদ্ধিদীপ্তি (‘এনলাইটেনমেন্ট’) ও যুক্তিবাদিতার উদ্ভাস। তাই বিশ্ব-অবধানের ক্ষেত্রে বিশ্বাসের ঊর্ধ্বে যুক্তি প্রধান হয়ে ওঠে। এর কারণ বিজ্ঞান ও দর্শনের প্রভাব। ‘বিজ্ঞানের নিয়ম ও সূত্রাবলি বিশ্ববিধানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রবিশেষে নিয়ন্ত্রক’-এমন বোধ বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে প্রাধান্য পায়। তাদের বিচারে অশুভ-অমঙ্গল (ইভিল) দৈব কিছু নয়, বরং তা জীবনের অসঙ্গতির প্রকাশ এবং তা মানুষের চেষ্টায় পরিবর্তনযোগ্য। ধর্মীয় অনুশাসনকে অতিক্রম করে সততা। এ-ধরনের চিন্তায় ইংরেজি সাহিত্যের প্রভাব স্পষ্ট, বিশেষ করে মিলটন, পোপ কিংবা এডিসন (১৬৭২-১৭১৯) ও সুইফ্ট (১৬৬৭-১৭৪৫)-এর চিন্তার তীক্ষèতা। সর্বোপরি ছিল শেক্সপিয়রের প্রভাব যেখান থেকে ‘স্টর্ম অ্যান্ড স্ট্রেস’ আন্দোলনের সূচনা। পরে অবশ্য এর প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছিল বিপরীত ধারায়।
জার্মানিতে এ সময়ে বুদ্ধিদীপ্তি ও যুক্তিবাদী মানবিকতার যুগ-প্রতিনিধি গ্যয়টে (১৭৪৯-১৮৩২)। এমনকি তার যুগ অতিক্রম করেও তার প্রভাব ছড়িয়েছে বুদ্ধিবৃত্তিতে ও সাহিত্যে। বুদ্ধি ও মেধা, অনুভব ও মননের সুষম সমন্বয়ে গড়ে ওঠে নব্য ধ্রুপদী আদর্শ (‘নিওক্লাসিসিজম’)। এর মধ্যে ত্রিধারা স্পষ্ট : ‘স্টর্ম অ্যান্ড স্ট্রেস’, ‘ক্লাসিসিজম’ ও রোমান্টিসিজম’। ইংরেজি-ফরাসি ধ্রুপদী চেতনার প্রভাব পড়েছিল এসব ধারায়। ঐ নব্য আন্দোলনের মূল স্লোগান ছিল : প্রকৃতি (Nature), প্রতিভা ও মৌলিকত্ব। প্রকৃতিচর্চা সনাতন ধর্মচর্চার স্থান দখল করে। ব্যক্তিচৈতন্য হয়ে ওঠে অনুধাবনের, সমীক্ষণের। সাহিত্যে, বিশেষত কাব্যের ঐতিহাসিক যোগসূত্র তথা ঐতিহ্য হিসাবে গুরুত্ব অর্জন করে মধ্যযুগীয় লোকগীতি, গাথা (‘ব্যালাড’) ও রোমান্স-কাব্য।
গ্যয়টে ও শিলারের ভাবনায় সৃষ্ট ‘বুদ্ধি ও অনুভূতি (উপলব্ধি)-র সমন্বয়ধর্মী তত্ত্বের’ মধ্য দিয়ে জার্মান-সংস্কৃতি অঙ্গনে উল্লিখিত নব্য ধ্রুপদী চেতনার উদ্ভব। নৈতিক ভাবাদর্শ (Moral Idealism) হয়ে ওঠে গ্যয়টে ও শিলারের কাব্যাদর্শ। ফরাসি বিপ্লবের তীব্র আবহেও তারা নৈতিকতার ওপরই সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করেন। শিল্প হয়ে ওঠে বাস্তবতা ও নন্দনতাত্ত্বিকতার সমন্বিত প্রকাশ। গ্যয়টের সর্বোত্তম সৃষ্টি ‘ফাউস্ট’-এর মূলকথা ছিল, ‘মানবজীবনের সিদ্ধি (ফুলফিল্মেন্ট) বা প্রত্যাশা পূরণ সম্ভব হয় শ্রম ও নিঃস্বার্থ কর্মের মাধ্যমে।’
আঠারো শতকের অন্তিমক্ষণে পৌঁছে সমাজ-রাজনীতি ঘিরে সবচাইতে বিস্ফোরক ঘটনা ফরাসি বিপ্লব, যা সংস্কৃতির জগৎকেও প্রবলভাবে আলোড়িত করে। শুধু ফরাসি দেশেই নয়, সংলগ্ন সবকয়টি দেশেরই সাহিত্য-সংস্কৃতি ক্ষেত্রে এর প্রভাব পড়ে। বিপ্লবের উন্মাদনা যেমন তাদের স্পর্শ করে, তেমনি করে এর ব্যর্থতা। ফরাসি বিপ্লবের ইতি ও নেতির ইঙ্গিত সম্ভবত নিহিত ছিল ১৮ শতকের যুক্তিবাদিতার সঙ্গে আবেগের প্রাধান্যে, বস্তুবাদিতার পাশাপাশি ‘থিওসোফি’ ও অধ্যাত্মবাদিতার উপস্থিতিতে। তত্ত্বগত দিক থেকে ইংরেজি কাব্যচেতনার সঙ্গে সাদৃশ্য দেখা গেলেও বিপ্লব-পূর্ব ফ্রান্সে সামাজিক অস্থিরতা ও বিপ্লবী আতিশয্য ও ব্যর্থতা ঐ সন্ধিকালের ফরাসি কবিতার ওপর প্রভাব ফেলে অনিশ্চয়তা ও অসম্পূর্ণতা নিয়ে।
পাঁচ
ইউরোপীয় কবিতার ইতিহাস বিচারে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের অভিমত হল : ‘এনলাইটেনমেন্টের’ পোশাকি উজ্জ্বলতা ও যান্ত্রিকতার প্রতিক্রিয়া হিসাবে উনিশ শতকের কবিতায় রোমান্টিকতার আর্বিভাব। এ রোমান্টিক-পর্ব কারও কারও মতে ‘রোমান্টিক আন্দোলন’ হিসাবে চিহ্নিত হলেও এর নায়কদের কাব্যচেতনায় ভিন্নতা স্পষ্ট। আন্দোলন বলতে তা যে-কোনও ধরনের হোক তাতে মতাদর্শগত যে ঐক্য, সংহতি ও সংগঠিত তৎপরতার সঙ্গতি লক্ষ করা যায়, রোমান্টিক কাব্যের সৃষ্টি ও প্রকাশে তা ছিল না।
রোমান্টিক-পর্বের কবিদের ব্যক্তিনির্ভর ভিন্ন ভিন্ন দিকদর্শন থাকা সত্ত্বেও তখনকার বুর্জোয়াবিপ্লবের পরিপ্রেক্ষিতে কডওয়েল ঐ রোমান্টিক কাব্য-তৎপরতার নাম দিয়েছেন ‘রোমান্টিক বিপ্লব’ বা ‘মতাদর্শগত বিপ্লব’ (‘Romantic Revolution’/ ‘ideological revolution) যা মিল্টনীয় যুগের ‘পিউরিটান’ বিপ্লব থেকে ভিন্ন। তার বিচারে রোমান্টিক কবিতা ‘পুরনো ফর্মের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে, আবেদন জানায় হৃদয়বৃত্তি ও আবেগের প্রতি। এতে যেমন নির্বস্তুক ভাববাদিতা পরিস্ফুট, তেমনি ইন্দ্রিয়জ ও বস্তুচেতনা নির্দেশক শব্দ এবং ভাবও উপস্থিত। রোমান্টিকতা যেমন সনাতনী ঐতিহ্যবিরোধী, তেমনি আবার ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী।’ এখানেও সেই পূর্বধারার মতো দ্বৈতচেতনার মিশ্রণ একে সার্থক বিপ্লবীচেতনার বিন্দুতে পৌঁছে দেবার ক্ষেত্রে পিছুটানেরই প্রভাব রেখেছে।
এছাড়া রোমান্টিক ভাবধারার কবি ও কবিতার চারিত্রবৈশিষ্ট্য প্রকাশ পেয়েছে আত্মমুখী চেতনা, বিস্ময়বোধ, স্বাপ্নিকতা, নয়া জীবনদৃষ্টি, অনুভূতির অভিনবত্ব, ব্যক্তিক আবেগের আতিশয্য, প্রাকৃত সৌন্দর্য নিয়ে মগ্নতা ও প্রাকৃত সত্তার সঙ্গে একাত্মতার গুণময়তায়। কবিতায় ঐ একাত্মতার প্রকাশ যেমন মূর্ত ও বিমূর্ত বোধে, তেমনি প্রতীকী রূপে। রোমান্টিক কাব্যচেতনার প্রকাশ শুধু ধ্রুপদীবোধ বা সনাতন প্রথা ও রক্ষণশীলতার বিরোধীই নয়, কখনও কখনও মধ্যপন্থারও বিরোধী; আর প্রচলিত সামাজিক-সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের বিরোধী তো বটেই। হয়তো তাই ব্যক্তিক ও সামূহিক উভয় দিক থেকে চৈতন্যের মুক্তি (liberty)) ছিল রোমান্টিকদের আকাক্সিক্ষত। একই কারণে ফরাসিবিপ্লবের সাম্য-মৈত্রী-স্বাধীনতার তাত্ত্বিক ঘোষণা তাদের অনেককেই গভীরভাবে স্পর্শ করে। কবিতায় সে-অনুভব প্রকাশ পায়।
রোমান্টিকতা কবিতাকে স্পর্শ করেছে দেশকাল প্রভাবে কিছু-না-কিছু ভিন্ন মাত্রায়। এর সূচনা ইউরোপীয় সাহিত্যে ১৮-শতকের শেষ দিক থেকে, বিস্তার ১৯-শতকের অনেকটা সময় জুড়ে। দেশ কাল এবং সমাজ-সংস্কৃতির ওপর নির্ভর করে এর চরিত্রগত ভিন্নতার প্রকাশ ঘটেছে। ইউরোপীয় সাহিত্যে এই রোমান্টিক চেতনার নয়া উদ্ভাস ১৮-শতকের একেবারে শেষ দিকে গীতিকবিতার পুনরুজ্জীবন ও নয়া চর্চার পথ ধরে যেমন ফরাসি কবিতায় আঁদ্রে শেনিয়ে’র হাত ধরে, তেমনি ইংরেজি সাহিত্যে ওয়ার্ডসওয়ার্থের ‘লিরিকাল ব্যালাড্স’-এর মাধ্যমে।
তবে জার্মান সাহিত্যে রোমান্টিকতার প্রাথমিক উদ্ভাস ১৭৭০ খ্রিস্টাব্দের ‘স্টর্ম অ্যান্ড স্ট্রেস’ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। রুশোর ভাবাদর্শ সেক্ষেত্রে প্রভাব রেখেছে। গ্যয়টে ও শিলারের মতো কবিও তখন প্রচলিত কাব্যাদর্শের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে কবিতাকে আবেগের (ইমোশন-এর) ধন হিসাবে কারুকর্মে সাজিয়ে লাবণ্যময়ী করে তোলার চেষ্টায় ব্রতী হন। অবশ্য গ্যয়টে তার দীর্ঘজীবনে একাধিক কাব্যধারায় অবগাহন করেছেন, নব্য ধ্রুপদী চেতনাও বাদ পড়েনি ভাইমার রাজসভার এই বিচিত্র চেতনার কবির ক্ষেত্রে। আসলে গ্যয়টে ধ্রুপদী চেতনা ও রোমান্টিকতার মধ্যে এক সেতুবন্ধ। পরে ঐ নব্য ধ্রুপদী চেতনার পথ মাড়িয়ে দুইকে এক করে স্বনামখ্যাত জার্মান কবি ফ্রিডরিখ হেল্ডারলিনও রোমান্টিকতার ফুল-ফোটানো পথে পা বাড়ান। এ পথটাকে রোমান্টিকতার কুসুমে কুসুমে আমোদিত করে দেন রোমান্টিকপ্রবর নোভালিস। জার্মান রোমান্টিকতার গীতিময়তা এভাবে শুরু হলেও এতে কিছু ইংরেজ কবি বিশেষভাবে শেক্সপিয়রের প্রভাব ছিল অসামান্য, যদিও অনুবাদের মাধ্যমে। অন্যদিকে বাংলা কবিতায় রোমান্টিকতার প্রকাশ তুলনামূলক বিচারে অনেক পরে। সমাজ-সংস্কৃতির পিছুটান এর কারণ।
ইংরেজি কাব্যে রোমান্টিকতার প্রতিষ্ঠায় শুরুতে বিশেষভাবে উল্লেখ্য কবি উইলিয়াম ওয়ার্ডস্ওয়ার্থ (১৭৭০-১৮৫০) ও স্যামুয়েল কোলরিজ (১৭৭২-১৮৩৪) কিংবা কবিতায় গৌণ ভূমিকাসম্পন্ন স্যার ওয়াল্টার স্কট (১৭৭১-১৮৩২)। পরবর্তী পর্যায়ে তিন বিচিত্র রোমান্টিক লর্ড বায়রন (১৭৮৮-১৮২৪), পার্সি বিসি শেলি (১৭৯২-১৮২২) এবং জন কিট্স (১৭৯৫-১৮২১) ভিন্ন ভিন্ন চরিত্রে কবিতার রোমান্টিকতায় ঐশ্বর্য আরোপ করেন। যথারীতি এদের রোমান্টিকতার বৈশিষ্ট্যে ছিল প্রকৃতিমনস্কতা ও প্রকৃতির সঙ্গে একাত্মতা। জীবন ও প্রকৃতিকে ঘিরে আবেগ ও বিস্ময়বোধ ভিন্নতর সংবেদনা নিয়ে তাদের কবিতায় প্রকাশ পায়। আবার ব্যক্তিক অভিজ্ঞতার অভিনবত্ব সামাজিক দায়বদ্ধতার মধ্যেও নিঃসঙ্গতাবোধের বা কখনও জনবিচ্ছিন্নতার কারণ হয়ে উঠেছে। এখানেই ধরা পড়ে রোমান্টিকদের আত্মিক স্ববিরোধিতা, বিশ্বাস বা মতাদর্শের সঙ্গে ব্যবহারিক বাস্তবতার দ্বন্দ্ব। তাত্ত্বিক উপলব্ধির পেছনে ছোটার অত্যধিক আগ্রহ বাস্তব থেকে, বস্তুজগতের সমস্যা থেকে কবিদের অনেক সময় দূরে নিয়ে গেছে। আর এটাই হয়ে উঠেছে রোমান্টিকতার একদিককার বৈশিষ্ট্য।
‘প্রকৃতিই আমার চোখে সবার সেরা’, এমন বিশ্বাসে স্থিত ওয়ার্ডসওয়র্থের ‘লিরিক্যাল, ব্যালাড্স’ (১৭৯৮) ছিল ইংরেজি রোমান্টিক কবিতার সূচনায় এক তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা, বলা চলে ইংরেজি কবিতায় নয়াযুগের সূচনা। এদিক থেকে ওয়ার্ডসওয়র্থের সঙ্গে কোল্রিজের কাব্যভাবনার একাত্মতা ছিল লক্ষ্য করার মতো বিষয়। তাদের ভাষায় ‘কবিতাকে নির্ভর করতে হবে প্রাকৃত সত্যের ওপর, আর কল্পনাকে সিক্ত করে তুলতে হবে বৈচিত্র্যের নানা রঙে’।
কিন্তু বিদ্রোহী রোমান্টিক কবি বলতে বায়রন ও শেলিকেই বোঝায়, যেমন জীবনধর্মে তেমনি কাব্যসৃষ্টির বৈশিষ্ট্যে। জীবন মৃত্যু প্রেম তাদের জন্য ছিল প্রচলিত নিয়ম-বিরোধী ও মূল্যবোধ-বিরোধী বিষয়। আর তাদের কবিতায় সে-উপলব্ধিরই প্রকাশ ঘটেছে। অন্যদিকে ঐ দুজন থেকে ভিন্নসুরে বাঁধা কিটসীয় কাব্যমেজাজ। শেলির বিদ্রোহী কাব্যের (প্রমিথিউস) পথ না-মাড়িয়ে বরং লিরিক সুষমার মানবিকবোধের গভীরতায় কিটসের বিচরণ স্বচ্ছন্দ। তিনি যেমন সত্য ও সৌন্দর্যের পারস্পরিকতায় অভিনব, তেমনি বিশিষ্ট শব্দাবলির অভিনব ব্যবহারে। এ ছিল কডওয়েলের ভাষায় ‘ভবিষ্যৎ ইংরেজি কবিতার উপযোগী শব্দভুবন’। আবার ভিন্নধর্মী সমালোচকের মতে ‘কিটস শব্দের জাদুকরি শক্তি শনাক্ত করেন স্পেনসর ও শেক্সপিয়রীয় শব্দজগৎ থেকে।’ অন্যদিকে ম্যাথু আর্নল্ডের বিচারে এদিক থেকে কিট্সের প্রতিভা শেক্সপীয়রের সমতুল্য।
ফরাসি কাব্যেও রোমান্টিকতার আবির্ভাব মোটামুটি একই ভাবে, যেমনটা আগে বলা হয়েছে, ১৮-শতকের শেষ দিক থেকে। সামাজিক ও রাষ্ট্রিক বাস্তবতার প্রতিক্রিয়া এক্ষেত্রে ছিল উল্লেখ্যযোগ্য বিষয়। ফরাসি বিপ্লবের ব্যর্থতা, আর কারও কারও মতে বুর্জোয়া সুবিধাবাদের বিশ্বাসঘাতকতা (কডওয়েল) ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের বিকাশ ঘটায় যা রোমান্টিক কবিতার অনুকূল মানসপরিবেশ তৈরি করে। উনিশ শতকের গোড়ার দিকে ফ্রান্সে লিরিক কবিতার পুনরাবির্ভাব ও চর্চা কবিদের মধ্যে রোমান্টিক চেতনার বিকাশ ঘটাতে সাহায্য করে। ফরাসি কবিতার জন্য সময়টা ছিল উদ্দীপনায়, প্রাণশক্তিতে এবং সৃষ্টিকর্মের বৈচিত্র্যে ঐশ্বর্যময়।
ফরাসি রোমান্টিকতার প্রতিষ্ঠায় যারা অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করেন তাদের মধ্যে লামার্তিন (১৭৯০-১৮৬৯), ভিকতর উগো (হুগো ১৮০২-৮৫) বা স্বল্পকালজীবী আলফ্রেদ দ্য ম্যুসে (১৮১০-৫৭) বা জেরার দ্য নের্ভাল (১৮০৮-৫৫) যেমন রয়েছেন, তেমনি রয়েছেন বোদলেয়ার (১৮২১-৬৭), তেয়োফিল গোতিয়ে (১৮১১-৭২) বা আর্তুর র্যাঁবো (১৮৫৪-৯১)। এমনকি বাদ দেওয়া চলে না প্রতীকীবাদী পল ভেরলেন (১৮৪৪-৯৬) প্রমুখ কবিকে। তবে ফরাসি রোমান্টিক কবিতার বর্ণময় রূপকার হিসাবে অনেকটা ইংরেজ রোমান্টিক ওয়ার্ডসওয়ার্থের সমসারিতে নাম করা চলে যেমন উগোর, তেমনি শেষ রোমান্টিক হিসাবে বোদলেয়ারের। অবশ্য বোদলেয়ারকে নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই।
তেমনি শিল্পকলাবাদী কবি-চিত্রশিল্পী গোতিয়ে বা শেষ বোহেমিয়ান হিসাবে পরিচিত পল ভেরলেন ছিলেন মর্মে মর্মে রোমান্টিক। রোমান্টিকতার বাইরে পা ফেলতে গিয়েও এরা রোমান্টিকতাকে প্রশ্রয় দিয়েছেন। যেমন পারনেসিয়ান গোষ্ঠী রোমান্টিকতার বিরোধী হয়েও প্রকৃতপক্ষে রোমান্টিকতার ভিন্নধারার প্রকাশ ঘটিয়েছে। এ কথা সত্য যে, ফরাসি রোমান্টিকতার ভিত তৈরিতে পলির কিছুটা জোগান এসেছিল জার্মান ব্যালাড, স্পেনীয় ব্যালাড এবং স্কট ও বায়রনের প্রাচ্যগীত-গাথার মাধ্যমে।
অন্যদিকে ইউরোপীয় রোমান্টিকতার প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছিল আমেরিকা মহাদেশেও। সে প্রভাব দেখা গেছে এমার্সন প্রমুখ নব্যচেতনার মার্কিনি লেখকসহ একাধিক কবির উপর। সমাজ-সংস্কৃতির ভিন্নতার কারণে সেখানে রোমান্টিকতার চরিত্র ছিল কিছুটা ভিন্ন। রোমান্টিকতার সঙ্গে মিশেল এসেছিল কিছুটা ‘মিস্টিক’ আধা-ধর্মবাদিতার দার্শনিক চেতনার। তবু প্রকৃতির প্রভাব ক্ষুণ্ন হয়নি সেখানে, যা বোঝা যায় এমার্সনের একটি মন্তব্যে : ‘Nature is the incarnation of thought (‘প্রকৃতিই চিন্তাভাবনার মূর্ত প্রতীক’)।
ইঙ্গ-ফরাসি রোমান্টিকতার তুলনায় জার্মান রোমান্টিক কবিতা মোটেই পিছিয়ে ছিল না যেমনটা আগে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে জার্মান রোমান্টিকতায় ইঙ্গ-ফরাসি রোমান্টিকতার তুলনায় ভাববাদিতার প্রভাব কিছুটা বেশিই ছিল। যেমন বাস্তবতা তেমনি অলীক কল্পনাও ছিল জার্মান কবিদের রোমান্টিক ভুবন তৈরির উৎস, যেজন্য প্রকৃতির পাশাপাশি অতিপ্রাকৃত, অবচেতন বা অলৌকিকও তাদের কবিতার প্রেরণা হয়ে ওঠে। আর সেখানে জার্মান দর্শনের প্রভাবও নিতান্ত কম ছিল না।
প্রথম জার্মান রোমান্টিক প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে জেনা’য় ১৭৯৮ সালে যার পেছনে ছিল প্রাকৃত দর্শনের (Nature-philosophy) প্রভাব। ছিল সাহিত্যতত্ত্ববিদ হিসাবে অগাস্ট ভিলহেল্ম (August Wilhelm) এবং ফ্রিডরিখ শ্লেগেল (Friedrich Schlegel) প্রমুখের চেষ্টা। উদ্দেশ্য ছিল রোমান্টিক কবিতাকে ‘প্রগতিবাদী, বৈশ্বিক কাব্যে’ (Progressive Universal Poetry) পরিণত করা। এ প্রতিষ্ঠানের রোমান্টিক কাব্যনায়ক সম্ভবত নোভালিস, যার রোমান্টিক প্রেমভাবনার দূরযাত্রার সঙ্গে আদি রবীন্দ্র-রোমান্টিকতার প্রচণ্ড মিল, বিশেষ করে ‘সোনার হরিণ’-রূপী কাব্যের পরমাকে কাছে পাওয়ার বাসনার ক্ষেত্রে।
দ্বিতীয় পর্যায়ে (১৮০৫ সালের পর থেকে) রোমান্টিকতার উৎস হয়ে ওঠে ঐতিহ্যবাহী লোকগীতি এবং জনপ্রিয় গদ্য রোমান্স কিংবা রূপকথার কল্পকাহিনি। এই রোমান্টিক গীতলতার পাশাপাশি হাইনরিখ ক্লিয়েস্ট বা হফম্যানের চেষ্টা ছিল রোমান্টিকতার আদলে জীবনের অন্ধকার দিক তুলে ধরা, অবশ্য গদ্যরচনায়। শেষ পর্যায়ে নব্যধ্রুপদী কাব্যচেতনার আড়ালে রোমান্টিক কাব্যের চর্চা নতুন মুখ পরিস্ফুট করে তুলেছে। তবু জার্মান রোমান্টিক কবিতা-সমালোচকদের মতে দ্রুতই তার সৃষ্টিক্ষমতা ও সজীবতা হারিয়ে ফেলে। হয়তো তাই গীতিকবিতার কীর্তিমান পুরুষ হাইনরিখ হাইনে রোমান্টিকতাকে কবিতার ভুবন থেকে বাতিল করে দেন। কিন্তু তার ‘বুক অব সঙ্স’ (১৮২৭) প্রেমকাব্যের উজ্জ্বলতায় রোমান্টিক গীতিকবিতার আভাস আনে। তার কবিতায় বৈপরীত্যের প্রকাশ আশা ও হতাশার যুগপৎ উপস্থিতিতে। অবশ্য অবশেষ পরিণতি জীবনবাদী বাস্তবতায়। এর কারণ শোপেনহাওয়ারীয় দুঃখবাদ পেরিয়ে ফয়েরবাখ-মার্কস-এঙ্গেলসের প্রভাব।
ইউরোপে কাব্যের রোমান্টিকতা যেমন উনিশ শতকের শুরু থেকে স্ফুটিত, তেমনি এর মধ্যেই কবিতায় ভিন্নচেতনার উন্মেষ লক্ষ করা গেছে। কারও কারও মতে তা অন্তর্নিহিত আধুনিকতার সোনার হরিণের টানে, যে-আধুনিকতা যুগ থেকে যুগে ভিন্ন থেকে ভিন্নতর রূপ গ্রহণ করেছে। যেমন এসেছে কবিতায় শিল্পসর্বস্বতাবাদ (‘অৎঃ ভড়ৎ অৎঃং ংধশব’) কিংবা প্রতীকীবাদ (‘ঝুসনড়ষরংস’) ইত্যাদি নানারঙের স্রোতে। রোমান্টিকতা যেমন অনেকাংশে যুক্তিবাদকে বাতিল করে দিয়ে তার স্থান দখল করেছিল, তেমনি একইভাবে রোমান্টিকতার আবেগ, কল্পনাপ্রিয়তা ও প্রকৃতিতত্ত্ব বাতিল করে শুদ্ধকাব্যের সংকীর্ণ ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের পত্তন। অভিনবত্বের আকাক্সক্ষা থেকে এ পার্শ্বপরিবর্তনÑএমন ধারণা হয়তো বিতর্কের জন্ম দেবে।
উনিশ শতকের ইংরেজি কবিতায় নানা স্রোতের মধ্যে শিল্পসর্বস্বতার ধারায় তেমন কোনও প্রতিভাবানকে দেখা যায়নি। গ্যাব্রিয়েল রসেটি (১৮২৮-৮২) বা তার সুহৃদ মরিস (১৮৩৪-৯৬) বা স্বল্পায়ু জেরার্ড হপ্কিন্সদের মতো কবি এই ধারায় কবিতা রচনা করেন। এ তত্ত্বের উদ্ভব, বিকাশ এবং কবিতায় প্রয়োগÑসবই মূলত ফরাসি কবিতায় বিশিষ্ট হয়ে ওঠে। গোতিয়ে থেকে বোদলেয়ার, ভার্লেইন বা র্যাঁবো কমবেশি এই কাব্যবোধে প্রাণিত ছিলেন, যদিও এদের মধ্যে মিশ্রচেতনার উপাদানও উপস্থিত ছিল। আসলে রোমান্টিক কবিদেরই কেউ কেউ গতানুগতিকতামুক্ত ধারায় কবিতাকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে ভিন্নপথের সন্ধানে নেমে পড়েন। র্পানেশিয়ানদের সম্পর্কেও একই কথা বলা চলে।
শিল্পসর্বস্বতায় ধৃত বিনোদনমূলক সাহিত্যের পথ ধরেই র্পানেশিয়ান কবিদের অন্তরে লালিত শব্দসৌকর্যের প্রাধান্য নিয়ে প্রতীকীবাদের আবির্ভাব উনিশ শতকের শেষপাদে। বোদলেয়ার, নের্ভাল, এমনকি পল ভেরলেইনের কাব্যচর্চায় এই স্বাতন্ত্র্যবোধ উপস্থিত ছিল। পরে ভেরলেইনের হাতে প্রতীকীবাদী কবিতার প্রকাশ; এবং শব্দসর্বস্বতায় মগ্ন এর তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক রূপাভাস পরিস্ফুট হয়ে ওঠে স্তেফান মালার্মের (১৮৪২-৯৮) কাব্যসাধনায়। মালার্মের হাতেই নিছক কবিতার জন্যই বিকশিত কাব্য-শব্দের উদ্ভব ঘটে নানামাত্রিক ব্যঞ্জনায় নির্ভর করে। শব্দের যেমন ভিন্নার্থ, তেমনি বাক্যের বিভিন্ন আকার এবং ছন্দ ও ধ্বনির প্রয়োগে ব্যাপক পরীক্ষানিরীক্ষায় কবিতা বেশ খানিকটা দুর্বোধ্যই হয়ে ওঠে।
সেজন্যই সাহিত্যের ইতিহাসবিদ বলতে পারেন যে ‘উনিশ শতকের অবসান ঘটে কবিতাচর্চায় প্রতীকীবাদের জয়ধ্বজা উড়িয়ে।’ কিন্তু এ প্রভাব দুই দশকের বেশি স্থায়ী হয়নি যদিও স্বতঃস্ফূর্ততা, গীতিকবিতার রমণীয়তা ও রোমান্টিক ভাবাবেগের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ নিয়ে কবিতার শব্দনির্ভর প্রসাধনে নিবেদিত তৎপরতায় প্রতীকীবাদের আবির্ভাব। অবশ্য কাব্যচর্চার শুরুতে মালার্মে-অনুরাগী তরুণ পল ভ্যালেরি (১৮৭১-১৯৪৫) প্রতীকীবাদী চেতনার প্রকাশ ঘটান ১৯ শতকের শেষ দশকে রচিত কিছু কিছু কবিতায়। কিন্তু ঐ ধারা থেকে অচিরেই সরে আসেন ভ্যালেরি তার বিশ-শতকী কাব্যচর্চায়।
তবে এ কথাও সত্য যে, প্রতীকীবাদী কবিতার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের দেশগুলোতে। ইংরেজি সাহিত্যেও এর প্রভাব দেখা যায় বিশ শতকের গোড়ার দিকে। অন্যদিকে জার্মান কবিতায়ও প্রতীকীবাদের প্রভাব লক্ষ করা যায়, যেমন চোখে পড়ে তরুণ রিল্কের কবিতায়। কথাসাহিত্যিক টমাস মান কিছুটা হলেও প্রতীকীবাদের কাব্য-কারুকর্মে প্রভাবিত হন। বাংলা কবিতায় এ প্রভাব পৌঁছায় বিশ শতকের তিরিশের দশকের দিকে, দেখা যায় কোনও-কোনও কবির রচনায় এর প্রতিফলন।
উনিশ শতকের রাজনৈতিক-সামাজিক টানাপড়েন ও টালমাটালের দিকে চোখ রেখে কডওয়েলের মনে হয়েছে যে ‘গোটা উনিশ শতককেই রাজনৈতিক মতাদর্শের অর্থাৎ বিপ্লবী মতাদর্শের প্রতি বিশ্বাস হননের জন্য চিহ্নিত করা যেতে পারে, বিশেষভাবে ফরাসি বিপ্লবের পরিপ্রেক্ষিতে। একইভাবে এ সময়ের কাব্যাদর্শের ক্ষেত্রেও কবিদের পক্ষ থেকে অনুরূপ প্রত্যাখ্যান প্রকাশ পেয়েছে।’ সমালোচকের এ উগ্র পর্যবেক্ষণ পাশ কাটিয়েও বলতে হয় যে, সময়টা ঐ পরিপ্রেক্ষিতে ইউরোপীয় কাব্যভুবনের জন্য ছিল অস্থিরতার ও স্ববিরোধিতার, যেজন্য তখন একের-পর-এক শৈল্পিক মতবাদের উদ্ভব ঘটেছে। আর কবিও প্রবল ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী সংকীর্ণতার চৌখুপিতে ঠাঁই নিয়েছেন স্বস্তি ও শান্তির অন্বেষায়। এটাও ছিল এক ধরনের প্রতিক্রিয়া।
সেই হতাশার প্রতিক্রিয়ায় কবিদের মধ্যে বৃত্তে বসবাসের প্রবণতা দেখা দেয়; কোথাও ধর্মবাদিতার শান্তিময় আশ্রয় সন্ধান, কখনওবা বাস্তব জগৎ থেকে পলায়নের চেষ্টা দেখা যায়। কবিতায় পরিস্ফুট হয়ে ওঠে নিভৃত কক্ষে বসে শিল্পসর্বস্বতার আরাধনা, প্রকরণগত জটিলতা নিয়ে ছক আঁকা, অথবা পরাবাস্তবতার আলো-আঁধারের কুহকে আত্মসমর্পণ আকাক্সিক্ষত হয়ে ওঠে। পশ্চিমা রাজনীতির চত্বর থেকে অনেকদূরে বসেও উনিশ শতকের শেষ সূর্যাস্ত দেখার অনুভূতি নিয়ে লেখা রবীন্দ্রনাথের কবিতায় কিন্তু সময়-বাস্তবতাই ধরা পড়েছিল ‘শতাব্দীর সূর্য আজি রক্তমেঘ-মাঝে অস্ত গেল’ ইত্যাদি পঙ্ক্তিমালায়। বস্তুত গোটা কবিতাটাই এ প্রাসঙ্গিকতায় উদ্ধারযোগ্য।
ছয়
উনিশ শতকে নিহিত পূর্বোক্ত অস্থিরতার আলোড়ন অনিবার্য কারণে বিশ শতকে সঞ্চারিত হয়ে যে সংকট সৃষ্টি করে তাতে একাধিক কারণ যুক্ত হয়ে ক্রমান্বয়ে ভাঙনের রেখা স্পষ্ট করে তোলে। বিশ শতকের সংকট ও ভাঙনের পেছনে ছিল আরও একাধিক কারণ। সাম্রাজ্য নিয়ে ও আধিপত্য প্রতিষ্ঠা নিয়ে উপনিবেশবাদী দেশগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা এবং অন্যদিকে সাম্রাজ্যের সঙ্গে ‘বাণিজ্যের গান্ধর্ব বিয়ে’ সমস্যা জটিল করে তোলে। তৈরি হয় লোভ লালসা হতাশা ও নৈরাজ্যের এক মিশ্র আবহে সংকটের প্রেক্ষাপট। ‘আধুনিক চেতনার নব জাগরণ’ (ম্যাথু আর্নল্ড, ১৮৬৫) ঐ রাজনৈতিক পরিবেশের ওপর কোনও সুপ্রভাব রাখতে পারেনি, সামাজিক অবস্থার ওপর তো নয়ই।
এমনকি হঠাৎ-সূচিত প্রথম বিশ্বযুদ্ধ সংকটের অবসান ঘটানো দূরে থাক সংকটের নতুন পরিপ্রেক্ষিত তৈরি করে, যা দুই দশক পর অধিকতর ভয়াবহ এক বিশ্বযুদ্ধের জন্ম দেয়। ভাঙ্গাচোরা রাষ্ট্রিক সমস্যাকে আরও জটিল করে তোলে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর অর্থনৈতিক মন্দা কোনও শক্তিমান রাষ্ট্র বা সমাজ কাউকে রেহাই দেয়নি। বেকারত্ব, পণ্যমূল্য বৃদ্ধি, নিরাপত্তাহীনতা ও নিম্নতম মজুরি ইত্যাদি ঘটনা ব্যক্তিক ও আর্থ-সামাজিক স্তরে বিরূপ নেতিবাচক পরিবেশ সৃষ্টি করে। জার্মানিতে এর সঙ্গে আবার কিছু নৈতিক কারণও (হীনম্মন্যতার প্রতিক্রিয়া) যুক্ত হয়েছিল যা রাষ্ট্রিক রাজনৈতিক পরিবেশ উত্তপ্ত হতে সাহায্য করে। সমকালীন বিজ্ঞান-দর্শনের অগ্রগতি বা নয়া সমাজতত্ত্বের সুপ্রভাব উত্তাপ হ্রাস করতে পারেনি। এ অবস্থার বিরূপ প্রভাব ও নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সাহিত্য-সংস্কৃতিকে গভীরভাবে স্পর্শ করে।
তাই কথাটা অনস্বীকার্য যে বিশ শতকের রাষ্ট্রিক-রাজনীতির মতো এর সাহিত্য-সংস্কৃতির পরিবেশ প্রত্যাশার মধ্যেও মূলত নৈরাশ্যের মিশ্রচরিত্র নিয়ে যাত্রা শুরু করে। কবিতাও সেই জটিলতা থেকে পরিত্রাণ পায়নি। তাই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির নয়া ভাষ্য নিয়ে এইচ. জি. ওয়েল্স-এর মানবিক আশাবাদের (১৯০২-০৫) বিপরীতে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সমরসজ্জা ও যুদ্ধ, শ্রেণি ও নারীর অধিকারবিষয়ক কিছু নৈতিক প্রশ্ন (১৯০৬-০৭) বার্নার্ড শ শিক্ষিতশ্রেণির সামনে তুলে ধরেন তার স্বভাবসিদ্ধ তীক্ষè ও তির্যক ভঙ্গিতে, যা ঐ বৈপরীত্যেরই প্রকাশ ঘটায়।
ইংরেজ কবি লেখক বুদ্ধিজীবীদের গরিষ্ঠসংখ্যকের মধ্যে অবস্থাদৃষ্টে মোহমুক্তি ঘটতে থাকে এমন উপলব্ধিতে যে ‘নয়া শতক সভ্যতার জন্য সংকটই নয় শুধু, পতনেরও কারণ হয়ে উঠতে পারে।’ দক্ষিণ আফ্রিকায় বোয়ার যুদ্ধে (১৮৯৯-১৯০২) ব্রিটিশ রাজশক্তির চরিত্র অনেকের মধ্যে প্রবল হতাশার সৃষ্টি করে। প্রসঙ্গত এ-সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের ইংরেজশক্তির বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া এবং উনিশ শতকের শেষ সূর্যাস্তদৃশ্যের পটভূমিতে লেখা কবিতার (‘শতাব্দীর সূর্য আজি রক্তমেঘ মাঝে অস্তাচলে গেল’ ইত্যাদি) প্রতীকী তাৎপর্য একই প্রতিক্রিয়ার প্রকাশ ঘটায়। একই বিষয়ে কবি টমাস হার্ডি তার কবিতায় শ্লেষ ও বিদ্রƒপের প্রকাশ ঘটিয়ে জীবনবিনাশের বিনিময়মূল্য সম্পর্কে রাজশক্তির সামনে প্রশ্ন রাখেন।
হার্ডির ঐ তীক্ষ্ণ স্যাটায়ার-শৈলী পরবর্তী সময়ে একাধিক কবির চোখে ব্যবহারযোগ্য মনে হয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও এ সময়ে গত শতকের প্রচলিত কাব্যশৈলীই প্রধানত অনুসৃত হয়েছে। (হার্ডির মতো রাষ্ট্রিক দুর্যোগের ইঙ্গিত আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছিলেন হেনরি জেমস ও জোসেফ কন্রাড তাদের কথাসাহিত্যে।) হয়তো তাই উল্লিখিত হতাশা ও সংকটের প্রতিক্রিয়া হিসাবেই প্রচলিত কবিতার বিষয়, ফর্ম ও শৈলীর বাইরে নতুন অন্বেষায় সচেষ্ট হয়ে ওঠেন পাউন্ড, এলিয়ট, লরেন্স প্রমুখ ইঙ্গ-মার্কিন কবি এবং লেখক। এদের উদ্দেশ্য ছিল কবিতায় যুগোপযোগী নয়া আধুনিকতার পত্তন, আধুনিক কবিতার ভিন্নতর রূপ সৃষ্টি। পাউন্ডের ভূমিকা ছিল এক্ষেত্রে অগ্রণীর (‘Ripostes’, 1912)।
ঐ ভিন্নতার টানে কবিতায় প্রকরণ-বৈশিষ্ট্য সৃষ্টির জন্য চিত্রকল্পই প্রধান বিবেচ্য বিষয় হয়ে ওঠে। আর সেজন্য উল্লিখিত কাব্যধারা ‘ইমেজিস্ট’ (চিত্রকল্পপ্রধান) হিসাবে পরিচিত হয়ে ওঠে। নব্য এই আধুনিকতার পেছনে সমকালীন বিজ্ঞানের একাধিক শাখা এবং রাজনীতি ও সমাজতত্ত্বের অবদান রয়েছে বলে কারও কারও অভিমত। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কবিদের মধ্যে সমকালীন সমাজবাস্তবতার নেতিবাচক প্রতিক্রিয়াই ছিল প্রধান। তাদের স্লোগান ছিল : প্রচলিত কাব্য-ঐতিহ্য শেষ হয়ে গেছে, ওখান থেকে নেওয়া বা পাওয়ার কিছু নেই। এ জাতীয় প্রচারের মধ্য দিয়ে চিত্রকল্পবাদী কবিদের চেষ্টা ছিল ঐ নয়া পদ্ধতিতে তাদের মেজাজ ও বক্তব্য যথাযথভাবে ফুটিয়ে তোলা। কবিতা রচনার ঐ ব্যক্তিত্ববাদী পথে প্রয়োজনীয় স্বাধীনতার জন্য ‘ফ্রি ভর্স’ ‘অসম ভর্স’ চর্চার বিষয় হয়ে ওঠে। চিত্রকলা ও ভাস্কর্যে দেখা দেয় অনুরূপ আঙ্গিক চর্চা, যা ‘ভর্টিসিজম’ (নির্বস্তুকতা) রূপে চিহ্নিত।
শুরু হয়ে যায় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ (১৯১৪)। এর মধ্যেই হয়তো সামাজিক প্রতিক্রিয়ায় সাহিত্যক্ষেত্রে নতুন করে বৃত্তাবদ্ধতার ধারণা প্রাধান্য পায়। দাবি ওঠে : ‘ফর্ম এবং স্টাইলই কবিতার সঠিক ব্যঞ্জনাময় প্রকাশ ঘটাতে পারে, অন্য কিছু নয়’ (পাউন্ড)। অনুরূপ ধারণার বশবর্তী হয়ে টি.এস. এলিয়টও আঁটোসাঁটো দৃঢ়সন্নিবদ্ধ কবিতার ফর্মে প্রতীক ও চিত্রকল্পই (পরবর্তীকালে ‘মিথ’) প্রধান করে তোলেন যাতে সমকালীন অস্থিরতা, দূষিত সময় ও বিনষ্ট সমাজের ইঙ্গিতার্থক রূপ যথাযথ চরিত্রে তুলে ধরা যায়। এলিয়টের এই কাব্যচেতনার ফসল ‘Prufrock and Other Observations (১৯১৭) এবং পরে একই ধারায় আরও প্রকটভাবে পরিস্ফুট ‘The Waste Land’ (১৯২২)। এই ছিল কবিতায় নয়া দিকদর্শন।
যুদ্ধের ভয়াবহতা শেষ হয় (১৯১৮) কবির ভাষায় ‘স্বার্থের সমাপ্তি অপঘাতে’ (রবীন্দ্রনাথ) এই সত্য প্রতিফলনের মধ্যদিয়ে। সমাজের দিকে তাকিয়ে বুঝতে কষ্ট হয়নি যে সেখানে আশা করার মতো সামান্যই অবশিষ্ট রয়েছে। চারিদিকে ফাঁপা শূন্যতা ও নেতিবাদী চেতনার আর্তি কবিকে বিশ্বাসের জগতের দিকে আকর্ষণ করে যেখানে স্বস্তি, শান্তি ও শ্বাস ফেলার মতো কিছুটা অবকাশ মিলতে পারে। পাউন্ড-এলিয়টের নেতৃত্বে ইঙ্গ-মার্কিন শৈল্পিক আধুনিকতা এভাবে নেতিবাদের পথ ধরে ধর্মীয় ভক্তিবাদিতার অঙ্গনে পা রাখতে চায় (বিশেষত এলিয়ট)।
রাজনৈতিক সামাজিক চেতনার দিক থেকে এই যাত্রার চরিত্র হয়ে ওঠে একান্তই ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদিতায় সংকীর্ণ ও রক্ষণশীল, সেই সঙ্গে প্রতিক্রিয়াশীলতায় চিহ্নিত। আর এজরা পাউন্ড তো অবশেষে প্রতিক্রিয়াশীলতার চরম প্রকাশ ঘটিয়ে ফ্যাসিবাদের কট্টর সমর্থক হয়ে ওঠেন, যা কারও কারও মতে তার চিত্তবৈকল্যের পরিণাম। কথাসাহিত্যিক ডি.এইচ. লরেন্সও ঐ গণতন্ত্রবিরোধিতায়, ভক্তিবাদিতায় ও প্রতিক্রিয়াশীলতায় অনেকটা একই পথে বিচরণ করেছেন। বিশ শতকের শৈল্পিক সময় এভাবে কবি লেখকদের একটি প্রধান অংশের হাত দিয়ে সংকট ও ভাঙ্গনের যুগ হিসাবে প্রতিফলিত হয়।
অল্ডাস হাক্সলি এই ‘শিকড়বিহীন আধুনিকতার জালে আবদ্ধ ব্যক্তিসত্তার সংকট ও ভবিষ্যৎ’ নিয়ে উদ্বেগের প্রকাশ ঘটান ব্যঙ্গবিদ্রƒপে তার বিশ্লেষণধর্মী কাহিনিতে (১৯২১-২৮), তেমনি সাহসী নয়া পৃথিবীর সম্ভাবনাও তুলে ধরেন (১৯৩২), ধরেন মধ্যবিত্ত শিক্ষিত ও বুদ্ধিজীবীর পরিণতি নিয়ে দুশ্চিন্তায় (১৯২৬)। প্রচলিত অবস্থা সম্পর্কে মোহমুক্তি রবার্ট গ্রেভস-এর কবিতায়ও প্রতিফলিত হয়ে ওঠে (১৯২৯)। ঐতিহ্যবাহী পথে এ সংকট থেকে মুক্তির কোনও উপায় ধরা দেয়নি। তবু বিশের দশক থেকে তিরিশের দশকে পৌঁছেও কবিতায় ইতিবাচক সম্ভাবনার প্রকাশ ঘটান অনেকটা হার্ডি বা গ্রেভ্সের ধারায় অপেক্ষাকৃত তরুণ কবিগোষ্ঠী, যেমন অডেন, স্পেন্ডার বা সি ডে-লুইস।
কিন্তু ঐ স্বার্থতাড়িত ও লোভ-লালসার নেতিবাদী আচরণ প্রতিরোধ করা শিল্প-সাহিত্যের পক্ষে সম্ভব ছিল না। বিশ্বব্যাপী হতাশা ও নৈরাজ্যের পটভূমিতে শক্তিশালী ফ্যাসিবাদের উত্থান ঘটে ঐ সময়েরই পরিসরে ইতালি ও জার্মানিতে। তাদের ক্রমবর্ধমান শক্তির প্রেক্ষাপটে গণতন্ত্রী স্পেনের গৃহযুদ্ধ রাজনৈতিক মেরুকরণের কাজ সম্পূর্ণ করে আনে। আনে বিশ্বগণতন্ত্রীদের দুর্বলতার কারণে। তবু শিল্পের ভুবন ইতি ও নেতির (প্রধানত নেতির) টানে দ্বিভাজিত হয়ে মিশ্ররূপই ধারণ করে। মার্কসের সমাজতাত্ত্বিক রাজনীতির প্রকাশ উল্লিখিত নয়া পৃথিবীর সম্ভাবনা নিয়ে আঁক কাটতে থাকে। এ মিশ্রচেতনা গোটা ইউরোপ-ভূখণ্ডেরই বাস্তবতা।
আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে এমনি ধারার সংকট ও বৈপরীত্যের মুখে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ঠিক পরপরই হতাশা ও নৈরাজ্যের মধ্যে পল ভ্যালেরির কবিতার পঙ্ক্তিতে এক ধরনের আশা হতাশার মিশ্র বাণী উচ্চারিত হয় এই বলে যে ‘All was not lost, but everything felt itself dying’. কিন্তু সার্বিক বিচারে পরিস্থিতির বিরুদ্ধে কবি-শিল্পীদের প্রতিক্রিয়া মূলত স্বাতন্ত্র্যবাদী ধারাতেই প্রকাশ পায়। যেমন ইঙ্গ-মার্কিন কবিদের আধুনিকতার ও চিত্রকল্পবাদী ধারায় তেমনি সমকালীন ফরাসি কবিদের মধ্যেও অনুরূপ চেতনার প্রকাশে। ইঙ্গ-মার্কিনি আধুনিকতার ঐ ধারাকে ব্রিটিশ এনসাইক্লোপিডিয়ার সংশ্লিষ্ট লেখক (কন্ট্রিবিউটর) যদিও ‘মডার্নিস্ট রিভোলিউশন’ (আধুনিকতাবাদী বিপ্লব) হিসাবে চিহ্নিত করেছেন, তবু তাতে কোনও বিপ্লবী ইতিবাচক উপকরণ বা বৈশিষ্ট্য উপস্থিত ছিল না। পুরোটাই ছিল নৈরাশ্যের নেতিবাদী প্রতিক্রিয়ার প্রকাশ। এ উদ্যোগকে বড়জোর বিদ্রোহ হিসাবে চিহ্নিত করা যায়।
প্রচলিতকে প্রত্যাখ্যান করতে গিয়ে নতুনত্বের উপস্থাপনায় শিল্প-সাহিত্যের প্রকরণগত বিদ্রোহ ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদিতার সংকীর্ণ বৃত্তে বাঁধা পড়ে। ব্যক্তিক অনুষঙ্গই এক্ষেত্রে প্রাধান্য পায়। এ বিদ্রোহের আপাত-নায়ক যদিও পাউন্ড বা এলিয়টের মতো কবি, কিন্তু এর মূল উৎস ফরাসি প্রতীকীবাদী ও স্বাতন্ত্র্যবাদী ধারার পূর্বজ কবিগণ এবং সমকালীন চিত্রকল্পবাদী ফরাসি পরাবাস্তবতার ধারা। হয়তো তাই পাউন্ড বা এলিয়টকে কবিতায় নব্যধারার প্রবর্তনায় পিছন ফিরে একবার হলেও বোদলেয়ার, র্যাঁবো বা মালার্মের মতো স্বাতন্ত্র্যবাদী প্রকরণের নায়কদের সৃষ্ট আধুনিকতার দিকে হাত বাড়াতে হয়েছে, পূর্বসূরি ফরাসি দিকপালদের শিল্পতাত্ত্বিক মনস্বিতা থেকে পুঁজি সংগ্রহ করতে হয়েছে।
অবশ্য বিশ শতকের শুরুতে ফরাসি কাব্যের প্রধানদের ক্ষেত্রেও অনেকটা এমন উদাহরণই লক্ষ করা যায়। যেমন এ পর্বের অন্যতম প্রধান কবি পল ভ্যালেরি মূলত মালার্মে থেকে যাত্রা শুরু করে কবিতা ও সংগীতের মিশ্রণ ঘটিয়ে ভিন্ন গন্তব্যে পৌঁছান, তেমনি আরেক গুরুত্বপূর্ণ কবি পল ক্লোদেল (১৮৬৮-১৯৫৫) র্যাঁবোর ঋণ স্বীকার করে পরে অধ্যাত্মবাদিতার বাঁধাধরা খ্রিস্টীয় কক্ষে অবস্থান নেন (তুলনীয় টি.এস. এলিয়ট)। অন্যদিকে গিয়োম আপলেনিয়ের (১৮৮০-১৯১৮) প্রকরণে অভিনবত্ব সৃষ্টি ও দর্শননির্ভর ঐক্ষিক কবিতা (‘ভিজুয়াল পোয়েট্রি’) সৃষ্টির ক্ষেত্রে কিছুটা হলেও মালার্মের পদ্ধতি অনুসরণ করেছেন।
তবে তার মৌলিকত্ব প্রকাশ পেয়েছে বিশ শতকের শুরুতে প্রচলিত প্রথাবিরোধী কবিতায় আধুনিকতার আন্দোলন প্রবর্তনার প্রচেষ্টায়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগেই তার চেষ্টায় এ আন্দোলনের সূচনা বৈশিষ্ট্যধর্মী কবিতা রচনার (১৯১৩) এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে মেনিফেস্টো রচনার (১৯১৩) মাধ্যমে। আপলেনিয়ের-এর নব্য আধুনিকতার আন্দোলন ‘ফিউচারিজম’ ছিল প্রকৃতপক্ষে সুরোরিয়ালিজমের (পরাবাস্তবতার) অপর পিঠ। যেমন তার নিজের কথায় তার কবিতাগ্রন্থ ‘Mamelles de tirestsa’ (১৯১৭) পরাবাস্তবতাবাদী নাটক, তেমনি কবিতা-সমালোচকের মতে ‘তার কবিতায় পরাবাস্তবতার ছায়াপাত এক বাস্তব ঘটনা।’
অবশ্য পরাবাস্তবতা কাব্যিক আন্দোলন হিসাবে পরে তাত্ত্বিক রূপ পেয়েছিল আদ্রেঁ ব্রেতাঁর তৎপরতায়। কবিতা-সমালোচক অ্যান্থনি হার্টলের বিচারে ‘সময় ও পরিবেশের প্রহারে আধুনিক ব্যক্তিসত্তার ভাঙ্গাচোরা চেহারার করুণ ছবি প্রকাশ পেয়েছে আপলেনিয়ারের কবিতায়। তার স্বল্পায়ু জীবনের (যুদ্ধে আহত) শেষ দিককার কিছু অসামান্য কবিতায় (La jolie Rousse) পরিবেশ-তাড়িত মানুষের হতবাক অভিব্যক্তি প্রকাশ পেয়েছে।’ এখানে যুদ্ধের ভয়াবহতা কি প্রতীক হিসাবে ব্যবহৃত হয়েছে ?
সংকট, দূষণ, ধস, হতাশা মাথায় নিয়ে শিল্পের মহিরুহ থেকে আপাতদৃষ্টিতে সবকিছু ঝরে গেলেও নয়া উদ্গমের কিছু বিন্দু ঠিকই থেকে যায় যেখান থেকে অঙ্কুর দেখা দেয়। বিশ শতকের প্রবল নেতির মধ্যেও ইউরোপীয় কবিতা তার নতুন পথ ধরে তাই ঠিকই এগিয়ে গেছে যদিও সেখানে ব্যক্তিমুখী বোধ প্রাধান্য পেয়েছে। চেষ্টা চলেছে ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে চেতন-অবচেতনের, এমনকি আরও গভীরে অচেতনের স্বরূপ সন্ধানের। সভ্যতার জটিল যান্ত্রিকতায় সৃষ্ট ব্যক্তি ও সমাজের ক্ষতমুখ, রেখাঙ্কিত চেহারা কখনও স্যাটায়ারে কখনও সমবেদনার ট্রাজিক আভায় পরিস্ফুট। আবার এর বিপরীত চরিত্র নিয়ে এ উপলব্ধিই চিত্রকল্পের বর্ণময়তায় পরাবাস্তবতার চরিত্র নিয়ে প্রকাশ পায়।
মূলত ফরাসি কাব্যভূমিতে উদ্ভূত পরাবাস্তবতার লক্ষ্য ছিল মানবপ্রকৃতির যথার্থ সত্যরূপ পূর্ববর্তীদের তুলনায় পরিপূর্ণতায় তুলে ধরা এবং সেইসঙ্গে অচেতনের স্বরূপ সন্ধান। দাদাইজমের পূর্ণাঙ্গ নেতিবাদ অতিক্রম করে তাত্ত্বিকসূত্রে পরাবাস্তবতার প্রতিষ্ঠা আঁদ্রে ব্রেতঁর (১৮৯৬-১৯৬৬) হাতে, সঙ্গে দুই কবিব্যক্তিত্ব পল এলুয়ার (১৮৯৫-১৯৫২) ও লুই আরাগঁ (জ. ১৮৯৭)। ইউরোপে ও স্বদেশে বিরাজমান সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিবেশে পরাবাস্তবতার কাব্যিক বিদ্রোহ ও শৃঙ্খলমুক্তির ঘোষণা সমকালীন কবিদের আকৃষ্ট করে, বিশেষ করে চিত্রকল্প-প্রাধান্য ও ‘ফ্রি ভর্সের’ প্রাকরণিক বৈশিষ্ট্য।
প্রতীকীবাদের পথ ছেড়ে কবিতার অগ্রবর্তী যাত্রায় পরাবাস্তবতাকে ফরাসি অঙ্গনে প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে প্রধান ও গৌণ একাধিক কবি হাত লাগিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে আরাগঁ, এলুয়ার ছাড়াও উল্লেখ্য রেনে শা (১৯০৭), জ্যাঁ কক্তো (১৮৯২), জ্যাক প্রেভের (১৯০০) প্রমুখ কবি, যারা কমবেশি পরাবাস্তবতার পথ মাড়িয়েছেন। এমনকি সাঁ জন পার্স (১৮৮৭) তার অসাধারণ মৌলিকতা নিয়েও মাঝেমধ্যে পরাবাস্তবতার স্বাপ্নিক হ্রদে অবগাহন করেছেন (হার্টলে, ১৯৬৭)। একই কথা খাটে মেটাফিজিক্যাল কবি পিয়ের রিভের্দি (১৮৮৯) সম্পর্কেও। তার কবিতায় ধ্রুপদী গীতলতার প্রকাশ সত্ত্বেও বিশ্বযুদ্ধোত্তর (১৯৪৫ পর্যন্ত) ইউরোপের ক্ষতবিক্ষত রূপ বিদীর্ণ দর্পণে প্রতিফলনের চরিত্র নিয়ে ফুটে উঠেছে।
পরাবাস্তবতাবাদী কবিতার সম্পন্ন ফসল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনাকাল পর্যন্ত বৈশিষ্ট্যচিহ্নিত; এরপরে তাতে ভাটার টান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকে ফরাসি কবিতা একাধিক ধারায় বিভক্ত হয়ে যায় যেমন শৈল্পিক মতাদর্শে, তেমনি রাজনৈতিক মতাদর্শগত কারণে; যেমন মার্কসবাদী মানবহিতৈষণার পথে আরাগঁ-এলুয়ার অন্যদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যান। তবু এলুয়ারের মানবপ্রেম ও প্রকৃতিভিত্তিক ‘ফ্রি ভর্সে’ যে শ্রমনিষ্ঠ মননভাস্বরতার প্রকাশ, সে-কারণে এমন অভিমত প্রকাশ পায় যে, ‘পরাবাস্তবতার যথার্থ ধ্রুপদী কবি পল এলুয়ার, যেমন প্রতীকীবাদের ধ্রুপদী প্রকাশ পল ভ্যালেরির কবিতায়’ (Geoffrey Brereton, 1956।
ভাষা, শব্দ-ব্যবহার, আঙ্গিক ও বিষয়ে অভিনবত্ব সৃষ্টির উদ্দেশ্যে বিশ শতকের জার্মান সাহিত্য এবং কবিতাও পূর্বধারা থেকে সরে এসে ভিন্নপথ সন্ধান করেছে। এ চেষ্টায় প্রভাব ফেলেছে সমকালীন সমাজ, রাজনীতি ও ধর্মবোধকেন্দ্রিক অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা। ফরাসি প্রতীকীবাদ, এমনকি অংশত চিত্রশিল্পীদের অনুসৃত প্রতীতিবাদের (‘ইমপ্রেশনিজম’) চেতনা আত্মসাৎ করে এ সময়কার জার্মান কবিদের পথচলা শুরু। আর প্রতীকীবাদে নিবেদিত কবিদের অন্যতম স্তেফান গেয়র্গ (১৮৬৮) ও তার সতীর্থদের উদ্দেশ্য ছিল কবিতাকে এ-পথে উৎকর্ষের উচ্চতায় পৌঁছে দেওয়া।
অন্যদিকে হুগো ফন হফমেন্স্থাল (১৮৭৪) প্রতীতিবাদী ধারায় রোমান্টিক সুরপ্রধান কবিতা সৃষ্টিতে নতুনত্ব আনার চেষ্টা করেন। তবে প্রতীকীবাদের ছত্রছায়ায় সংগীতধর্মী গীতিকবিতা রচনার মধ্যদিয়ে রাইনে মারিয়া রিল্কে (১৮৭৫) জার্মান কবিতায় নতুন মাত্রা সংযোজন করেন। আপাতবিচারে বিমূর্তচরিত্রের হওয়া সত্ত্বেও রিল্কে তার কবিতায় জীবন মৃত্যু ও প্রকৃতির বাস্তব (অবজেক্টিভ) রূপ তুলে ধরেছেন। তার ‘ডুই নো এলিজি’তে (১৯২৩) যেমন আধ্যাত্মিকতার সংকট নিয়ে জটিলতা, তেমনি ‘অর্ফিয়ুসের প্রতি সনেট’ (১৯২৩) অস্তিত্বের সংকট মোচনে ও বাস্তবতার ন্যায্যতা প্রতিপাদনে কবিতার ভূমিকা তুলে ধরে।
জার্মান অভিব্যক্তিবাদ (‘এক্সপ্রেশনিজম’) যদিও মূলত চিত্রশিল্পকেন্দ্রিক তবু প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ও পরবর্তী সময়ে সাহিত্যে এর প্রভাব কম ছিল না। একগুচ্ছ প্রতিভাবান কবি এই শৈল্পিক মতাদর্শ কবিতায় রূপায়িত করতে চেষ্টা করেন। যেমন আর্নস্ট স্টেডলার (১৮৮৩), গটফ্রিড বেন (১৮৮৬), গেয়র্গ হেইম (১৮৮৭), গেয়র্গ ট্র্যাক্ল (১৮৮৭) প্রমুখ কবি। এদের কবিতায় নাগরিকজীবনের ভয়াবহতাই নয়, ভাঙন ও বিচ্ছিন্নতার প্রতীকী রূপ ফুটে উঠেছে। উল্লেখ্য যে, বস্তুর বহিরঙ্গ নয় বরং এর অন্তররূপের তাৎপর্য অনুধাবন ছিল অভিব্যক্তিবাদী কবিতার বিষয়, সেইসঙ্গে নব্য মানুষের অন্বেষণ।
যুদ্ধের ভয়াবহতা (রক্ত, মৃত্যু, ধ্বংস) অনুধাবন করার মধ্য দিয়ে আবার কাব্যধারায় পরিবর্তন ঘটে এবং অভিব্যক্তিবাদ পেরিয়ে কবিতা সামাজিক বাস্তবতায় উত্তীর্ণ হয়। কবিতা ও গদ্য দুইই এই নব্যচেতনায় আত্মপ্রকাশ করে। কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং এর অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্ব জাতীয় জীবনে অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়, যার পরিণামে নাৎসিবাদের অভ্যুত্থান। ফ্যাসিবাদী তাড়নায় দলে দলে কবি লেখক নাট্যকার ও বিজ্ঞানীদের দেশত্যাগের কারণে শিল্পসাহিত্যে নেমে আসে এক অস্বস্তিকর স্থবিরতা। এ উদ্ভট অবস্থা থেকে মুক্তি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরও জার্মান সাহিত্য-সংস্কৃতির জন্য সহজ হয়ে ওঠেনি।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরিণাম জার্মান সমাজ ও সংস্কৃতির জন্য আরও নানা সমস্যার জন্ম দেয়। কবিতা ঐ দুর্দিনে দুই বিপরীত ধারায় প্রকাশ পায়, যেমন দুর্বোধ্য জটিলতা ও সংকেতপ্রিয়তায়, তেমনি সহজ সরল স্বচ্ছতায়। তাই একদিকে যেমন ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী সংকীর্ণ চরিত্রের কবিতা, তেমনি সর্বজনভোগ্য কবিতা (‘কনজুমার পোয়েট্রি’)-র প্রকাশ আর এপিক থিয়েটার খ্যাত ব্রেখ্ট সমাজবাস্তবতার ভিত্তিতে ব্যক্তিচৈতন্যের প্রকাশ ঘটিয়েছেন তার কবিতায়।
এর পর জার্মান কবিতা ক্রমেই নিত্যনতুন পরীক্ষানিরীক্ষার মধ্য দিয়ে চরিত্রবদল ঘটাতে চেষ্টা করেছে। তার মুখে আলোছায়ার প্রভাব পড়েছে সময়ের দীপ্তি ও জটিলতা থেকেÑএটা অবশ্য কমবেশি সবকটি ইউরোপীয় সাহিত্য সম্পর্কে সত্য। শব্দ, ধ্বনি ও ফর্ম নিয়ে পরীক্ষার ক্ষেত্রে ইউরোপ তো বটেই, মার্কিন দেশের সাহিত্যও পিছিয়ে থাকেনি, হোক তা যত খুশি অবাস্তব বা অস্বাভাবিক। জার্মানিতে তাই যুদ্ধোত্তর পঞ্চাশের দশকে যেমন এসেছে রেডিও নাটক, তেমনি সেই অস্বাভাবিকতার পথ ধরে সত্তরের দশকে দেখা গেছে ‘কংক্রিট পোয়েট্রি’র প্রচেষ্টা। দেখা ও শোনার উপযোগী ভিন্ন স্বাদের কবিতাসৃষ্টিও ছিল পরবর্তীদের লক্ষ্য। ভাষাকে এরা ভৌতবস্তু বলেই গণ্য করেন যা দর্শন ও শ্রুতির ক্ষেত্রে উপভোগের বাহন। বিশ্বযুদ্ধের পর পশ্চিম জার্মানিতে এ-ধরনের অদ্ভুত কবিতা রচনার প্রবণতা জন্ম নিয়েছে, অন্যদিকে পূর্ব জার্মানিতে মার্কসবাদী মতাদর্শের তাত্ত্বিক ধারায় কবিতাসৃষ্টির পালা চলেছে। বর্তমানে একীভূত জার্মানি সেই মিশ্রপ্রভাব থেকে কবিতার কোনও আকর্ষণীয় ধারার জন্ম দিতে পারেনি। এ অবস্থার জন্য স্থানিক রাজনীতি ও বিশ্বরাজনীতি অনেকাংশে দায়ী।
সাত
দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শেষে ইউরোপের ধস্ত, স্তব্ধ প্রাঙ্গণে কবি-লেখকদের জন্য স্বপ্ন ও প্রত্যাশার পরিবর্তে ধ্বংস ও নেতিবাদী চেতনার পুরনো উপাদানগুলোই বিছানো ছিল। হতাশা, ক্লান্তি, বিষণ্নতা ও উদ্যমহীনতার মোহমুক্ত বোধই প্রাধান্য পায়। যুদ্ধের সময়ই দেখা গিয়েছিল এলিয়ট তার তখনকার সেরা রচনা ‘ফোর কোয়ার্টেট’-এ ধ্বংসের মধ্যে নৈতিক ও ধর্মীয় বোধের তাৎপর্য সন্ধান করছেন। যুদ্ধশেষে তিনি কবিতাকে নির্বাসনে পাঠিয়ে অন্য রচনায় মনোনিবেশ করেন। হয়তো তারই পথ ধরে খ্রিস্টীয় মূল্যবোধের সনাতনী প্রকাশ ঘটাতে দীক্ষিতের মতো কবিতারচনায় মগ্ন হন একদা-আধুনিকতা-অভিসারী ডিলান টমাস ও এডিথ সিটওয়েল। অডেন ও গ্রেভ্স দেশত্যাগী হন স্বপ্নের ময়নাদ্বীপের সন্ধানে-যা কখনওই ধরা দেবার নয়। অডেনের কবিতায় আগেকার তীক্ষ্ণউজ্জ্বলতা অনুপস্থিত না হলেও নৈতিকতাকে আশ্রয় করে জটিলতাই প্রধান হয়ে ওঠে। আর গ্রেভ্স নিজের মতো করে কবিতায় ব্যক্তিক উপলব্ধির যে প্রতিফলন ঘটান তাতে পূর্বেকার গ্রেভ্সের প্রতিচ্ছবি ফোটে না। অডেন-গ্রুপের অন্য সদস্যরাও কমবেশি নিষ্প্রভ হয়ে পড়েন; বলা চলে কবিতা নিয়ে আগেকার সেই আবেগ, উত্তেজনা তাদের চেতনায় ধরা দেয় না। কবিতা লিখলেও তা গতানুগতিক অভ্যাসের প্রতিফলন হয়ে ওঠে।
অবাক হওয়ার মতো ঘটনা যে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর চারিদিকে ক্ষয়, সংকট, ভাঙন ও হতাশার মধ্যে কিছুটা হলেও প্রত্যাশা ও নেতিবাদী দ্রোহের প্রকাশ ঘটেছিল পশ্চিমা কবিতায়Ñইংরেজি ফরাসি জার্মান, এমনকি মার্কিনি কবিতায়ও। বিদীর্ণ দর্পণে মুখ দেখার যন্ত্রণা সত্ত্বেও কবিতার যাত্রা রুদ্ধ হয়নি। কিন্তু সে পর্যায় পেরিয়ে কয়েক দশকের মধ্যেই ঐ কাব্য-উত্তরাধিকারে দেখা গেল খরা আর অনুর্বর ভূমির অপরিণত অপুষ্ট ফসল, অন্তত তুলনায় তেমনই মনে হতে পারে। এমনকি পূর্বপ্রতিষ্ঠিতদের মধ্যে দেখা গেল নিষ্প্রভ ভোলবদল, বলিষ্ঠ নয়া প্রকাশ নয়।
হয়তো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা ধ্বংস ও মূল্যবোধের ব্যাপক বিনাশ এর অন্যতম প্রধান কারণ। প্রত্যাশার কোনও দিগন্ত যেন আর সামনে নেই। প্রকৃতপক্ষে পঞ্চাশের দশক থেকে সৃষ্টির গুণগ্রামে যুগ-প্রতিনিধি হিসাবে প্রধান কবিরূপে কাউকে যেমন চিহ্নিত করা যায়নি, তেমনি কবিতায় অভিনবত্বের দিক থেকে সুস্পষ্ট নতুন ধারাও জন্ম নেয়নি। কাব্যের কোনও নয়াতত্ত্ব এমন কোনও পলির জোগান দিতে পারেনি যেখানে সুশ্রী আকর্ষণীয় ফসল সৃষ্টি হতে পারে। সময়টা অনুকূল হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রধানত কথাসাহিত্যের পক্ষে, কবিতার জন্য নয়। এমনকি কথিত উত্তর-আধুনিকতাও (‘পোস্টমডার্নিজম’) কবিতাকে মুক্তির ছাড়পত্র দিতে পারেনি।
সেজন্যই কি ঐতিহ্যবাহী ইংরেজি কবিতার তলানি এসে ঠেকেছে ফিলিপ র্লাকিন (১৯২২-৮৫), ডোনাল্ড ডেভি (১৯২২), টেড হিউজেস (১৯৩০) কিংবা এদের পরবর্তী প্রজন্মের মাইকেল হফম্যান (১৯৫৭) বা গ্রিন ম্যাক্সওয়েল (১৯৬২) প্রমুখ কবির গীতিকবিতা-কল্পে। সাম্রাজ্যের আকর্ষণীয় রোদের শেষ উত্তাপটুকুও আর উপভোগ করতে না-পারার বেদনা গীতিকবিতাকে শেষ সম্বল হিসাবে গ্রহণের কারণ হতে পারে। হয়তো তাই পূর্বব্যবহৃত দ্রুত ধাবমান ট্রেনের প্রতীকীরূপ (এবার পেছন ফিরে দেখা) বা অন্বিষ্টকে না-পাওয়ার বিষাদ কবিতার বিষয় হয়ে ওঠে, হয়ে ওঠে নাগরিক জীবন ফিরে ফিরে তন্ন তন্ন করে দেখার গতানুগতিকতা। তবু মনের মতো একখণ্ড জমি নিজের মতো করে পাওয়া যায় না।
যায় না বলেই লারকিনের ঐ হতাশার সূত্রে টেড হিউজেসের জন্য নিসর্গই সান্ত্বনার আশ্রয় হয়ে ওঠে। সেখানেও আধুনিক মনের পরিপূর্ণ সান্ত্বনা মেলে না। মাইকেল হফম্যানের কবিতায় শীতার্ত আবেগহীন নির্মোহ গতানুগতিক নাগরিক চিত্র ফিরে আসে যেখানে ‘Dogs vet the garbage before the refuse collectors.’। ঘুরেফিরে অডেনীয় হতাশার বার্তা নবীন কবিদের জন্য বিষণ্নতার শ্বাস ফেলে বাতাসে ছড়িয়ে যায় : ‘England, this country of ours where nobody is well.’ তবু অতিনাগরিকত্বের আভিজাত্য এড়িয়ে সাম্প্রতিক ইংরেজি কাব্যধারা যে ‘জনপ্রিয় কবিতা’, ‘প্রতিবাদী কবিতা’ বা অকেতাবি, অতাত্ত্বিক কবিতার দিকে পা বাড়াতে শুরু করেছে এবং টনি হ্যারিসনদের মতো কবি শ্রেণি-নির্বিশেষ জনতার জন্য কবিতাকে গড়েপিটে নিতে চাইছেন, সেটাই আশার কথা।
প্রায় একই ধরনের অবস্থাÑপ্রত্যয়হীন নৈরাজ্যের ছেঁড়াখোঁড়া ছবি একদা-বৈচিত্র্যময়তায় সমৃদ্ধ ফরাসি কবিতার অঙ্গনে। কবিতাকে অভিনবত্বে যুগোপযোগী বাঁক-ফেরানোর মতো প্রতিভার অভাব সাম্প্রতিক অনুর্বরতার কারণ বলে সমালোচকের বিশ্বাস (জন টেলর, ১৯৯৬)। ফরাসি কবিতায় পরাবাস্তবতাবাদীরাই সম্ভবত শেষ নায়ক, যাদের সুপ্রভাব আশপাশের সাহিত্যে ছড়িয়ে পড়েছিল। এখন তাদের ঈর্ষণীয় স্থান সাহিত্য-দর্শনের তত্ত্বাচার্যদের দখলে কবিতাকে পিছনে ঠেলে দিয়ে তত্ত্বের ঘোর সৃষ্টি করে চলেছেন-রলাঁ বার্থে (১৯১৫-৮০), জ্যাঁ বদ্রিলা (১৯২৯), জ্যাক দেরিদা (১৯৩০), মিশেল ফুকো (১৯২৬-৮৪) প্রমুখ তত্ত্ববিদ।
এর মধ্যে কবিতায় উল্লেখযোগ্য সৃষ্টির অনেকটাই পূর্বজদের সাম্প্রতিক চর্চায়Ñযেমন রেনে শা (১৯০৭-৮৮)-র ‘Leaves of Hypnos’ (১৯৪৬) কিংবা ফ্রান্সিস পঞ্জ (১৮৯৯-১৯৮৮)-এর ‘Soap’ (১৯৬৭) এবং অনুরূপ কবিদের সৃষ্টিকর্ম। পরবর্তীদের মধ্যে পরীক্ষানিরীক্ষার প্রবণতাই প্রধান। যেমন আলো-আঁধার, জীবন-মৃত্যু, ইতি ও নেতির বৈপরীত্যকে সমন্বিত রূপদান করা। আবার কারও কারও চেষ্টা দেখা যায় পরাবাস্তবতার পূর্বতত্ত্বকে কবিতায় নতুনভাবে প্রয়োগ করার, নতুন অর্থে ব্যাখ্যা করার। অন্যদিকে চেষ্টা চলে অস্তিত্ববাদী নৈরাশ্য থেকে মুক্ত হয়ে অন্তর্লোকে একখণ্ড শান্তি ক্রয়ের। ফলে সন্ধান চলে প্রেম, প্রত্যাশা, নিঃসঙ্গতা, আতঙ্ক, আত্মকেন্দ্রিকতার গভীর খননের মধ্য দিয়ে। তাই জীবনের বিনিময়ে কবিতার জন্য যথার্থ শব্দের অন্বেষা সঠিক মনে হয়। কারণ `Words truer than the world and what it contains’ (Jean-Philippe Salabreuil, 1940-70)। সব মিলিয়ে অবশ্য লিরিক ও এলিজি ধরনের কবিতার প্রাধান্যই পরিস্ফুট হয়ে থাকে।
সাম্প্রতিক জার্মান সাহিত্যে বিভাজিত জার্মান জাতিসত্তার রাজনৈতিক সামাজিক সমস্যার প্রভাব অনস্বীকার্য, তবে এ-ধরনের সমস্যা সম্ভবত কবিতাকে স্পর্শ করেছে বেশি। হয়তো তাই উপন্যাসেই তুলনামূলক সম্পন্ন ফসল লক্ষ করা গেছে (যেমন গুন্টার গ্রাস, হেনরিখ বল, মার্টিন বালসার, পিটার ওয়েইস প্রমুখের রচনা)। তবু এর মধ্যে অনেকটা ইঙ্গ-ফরাসি কাব্যধারার মতো গীতিকবিতার প্রাধান্য লক্ষ করা যায়। নতুন করে আবিষ্কার ও সৃষ্টির (ৎবফরংপড়াবৎু) চেষ্টা কবিদের মুখ্য বিষয় হয়ে ওঠে।
দুই জার্মানিতে কবিতা নিয়ে একদিকে নয়া বিষয়ীকেন্দ্রিকতা (rediscovery) বা নয়া অন্তর্মুখী চেতনা, অন্যদিকে মতাদর্শগত বস্তুবাদী চেতনার টানাপড়েন অনিশ্চয়তার প্রভাব বাড়িয়ে তোলে। এ প্রভাব অস্ট্রিয়া ও সুইজারল্যান্ডের জার্মানভাষী কবিদেরও স্পর্শ করে। বিষয়ীকেন্দ্রিকতার প্রকাশ দেখা যায় নিকোলাস বর্ন-এর কবিতায়, যেমন ‘What I Have a Mind For’ (1970), ‘The Discoverer’s Eye’ (১৯৭২) সংকলনে। কিন্তু চিত্রকল্প রূপক প্রতীক ইত্যাদি প্রাকরণিক বৈশিষ্ট্যের ওপর নির্ভর করে মূলত ফরাসি তাত্ত্বিকদের উদ্ভাবিত উত্তর-আধুনিকতার তত্ত্ব নিয়ে সাম্প্রতিক জার্মান কবিদের যাত্রা খুব একটা সমৃদ্ধ নয়াদিগন্তের সন্ধান দিচ্ছে না। তাতে নেহাত অস্তিত্ব রক্ষার কাজটাই চলছে। ব্যক্তিবাদিতা, জীবনবিচ্ছিন্নতা ও সার্বিক নেতিবাদী চেতনার ওপর ভর করে, এমনকি ব্যক্তিত্বের মুক্তি নিয়েও প্রগল্ভ প্রচারণায় সাম্প্রতিক জার্মান কবিতা তার মুক্তি খুঁজে ফিরছে।
আট
ইংরেজি-ভাষার ব্যবহারিক ভুবনে ফরাসি, জার্মান সাহিত্য বাদে অন্য সবাই বুঝি ব্রাত্য। হয়তো তাই ইউরোপীয় বলয়ের অন্তর্ভুক্ত থেকেও স্পেনীয় সাহিত্য (কবিতাও) অনুবাদের অনীহায় অবমূল্যায়নের শিকার। পাঠকপ্রিয়তার ক্ষেত্রেও তা-ই, বিশেষত এশীয়-বিশ্বে। কিন্তু স্পেনীয় কবিতার সূচনা মুরসভ্যতার কাল থেকে। পনেরো শতক থেকে স্পেনীয় কবিতার সঙ্গে গীতবাদ্যের যে ঐতিহ্য তৈরি হয় তাতে লোকায়ত সংস্কৃতির প্রভাব পরিস্ফুট। প্রসঙ্গত আন্দালুশীয় মাঝিদের গান কিংবা স্থানিক কবিদের চিত্রকল্পপ্রীতিও স্পেনীয় বৈশিষ্ট্যের দৃষ্টান্ত হিসাবে বিবেচনার যোগ্য।
প্রধানত ১৫ শতক থেকে স্পেনীয় সাহিত্যে লিরিক, ব্যালাড ও রোমান্স কাব্যের প্রকাশ এর চারণ-চরিত্রকেও অনেকটা তুলে ধরে। এ সময়ের উল্লেখযোগ্য কবি হুয়ান ডি মেনা, মার্কুইস সাটিলানা একই সঙ্গে লিরিক কবিতার রচয়িতা ও লোকগীতির সংকলক হিসাবে খ্যাতি অর্জন করেন। এ সময় থেকে স্পেনীয় বৈশিষ্ট্যে মণ্ডিত কবিতার আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু। অবশ্য ১৬ শতকে ইতালীয় বিষয় ও ছন্দ, বিশেষত পেত্রার্কীয় সনেটের প্রভাব নিয়ে স্পেনীয় কাব্যে রেনেসাঁসের সূচনা। লিরিক কবিতার ওপর এ সময় হোরেস বা ভার্জিলের প্রভাব কিছুটা বিদ্যমান, সঙ্গে মেটাফিজিকাল চেতনার প্রভাব। এমনি বৈচিত্র্য নিয়ে স্পেনীয় কবিতার যাত্রা।
নানা কারণে ১৭ থেকে ১৯ শতকের মধ্যপর্যায় পর্যন্ত স্থানিক বৈশিষ্ট্যের পুরিপুষ্টি ও প্রকাশ স্পেনীয় কবিতায় উল্লেখযোগ্য পর্যায়ের ছিল না। উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে গুস্তাফ বেকার ও রোজালিয়া কাস্ত্রোর মতো কবি এগিয়ে আসেন। তারা জীবনের আনন্দ-বেদনার চিত্তস্পর্শী প্রকাশ ঘটান কবিতায়। সেভিলবাসী বেকারের কাব্যিক বিষয় ছিল প্রেম, জীবনযন্ত্রণা ও মৃত্যুÑযা বাস্তব রুক্ষতা নিয়ে চিত্রিত, অনেকটা টমাস হার্ডির মতো। আর গ্যালিসিয়াবাসী কাস্ত্রোর কবিতা স্থানিক জীবনচিত্র, নিসর্গচিত্র নিয়ে লোকগীতির মডেল হয়েও আধুনিকতার গুণগ্রামে মণ্ডিত হয়ে ওঠে। ব্যক্তিক অভিজ্ঞতাসৃষ্ট বিষণ্নতাও এদের কবিতায় চিত্তস্পর্শী চরিত্র আরোপ করেছে।
তবে ১৯ শতকের পরবর্তী প্রজন্মের কবি অনেকেই যথারীতি ফরাসি কাব্যের প্রতীকীবাদী তত্ত্বে আক্রান্ত। এর মধ্যে ১৮৯৮ সালে আমেরিকার সঙ্গে যুদ্ধে পরাজয় এবং আন্তর্জাতিকতাবাদের প্রভাব অধিকাংশ স্পেনীয় কবিকে স্বাদেশিকতা-নির্ভর ও ঐতিহ্যবাদী করে তোলে। আন্তনিও মাকাদো (১৮৭৫) আঁকেন স্থানিক নিসর্গ-নির্ভর রূপকথা চিত্র, আর হুয়ান হিমেনেথের (১৮৮১) মতো কবি আন্দালুসিয়ার দ্যুতিময় কাব্যের লুপ্ত ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারে মনোযোগী হয়ে ওঠেন। সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের নয়া চিত্রণের আকাক্সক্ষা বিশ শতকের স্পেনীয় কবিতাকে স্পর্শ করে। এদের মধ্যে অনন্য ফেদেরিকো গার্থিয়া লোর্কা (জ. ১৮৯৯)। বাংলার নজরুল-জীবনানন্দের সমবয়সী।
লোর্কা একাধারে গীতিকবি এবং স্পেনীয় জীবনঐতিহ্যের বাস্তব রূপকার। মাটি, নিসর্গ ও মানুষের প্রতি মমতা ছাড়াও জিপসি, বুলফাইট (ষাঁড়ের লড়াই), প্রবল ইন্দ্রিয়জ নারীপ্রেম ইত্যাদি ‘টিপিক্যাল’ স্পেনীয় বিষয় তার কবিতায় উঠে এসেছে। তার কবিতার চিত্রকল্পে স্পেনীয় জীবনের সংরক্ত ছাপ, শব্দের সংগীতময়তা অসামান্য কাব্যিক রূপময়তা ও গীতিময়তা নিয়ে প্রকাশ পেয়েছে। লোর্কার ‘এলিজি’ আশ্চর্য সংবেদনশীল চরিত্র নিয়ে তার অন্যান্য কবিতার মতোই জনচিত্ত জয় করে। এককথায় লোর্কা হয়ে ওঠেন স্পেনীয় আত্মার কাব্য-ঐতিহ্যের প্রতিনিধি।
লোর্কার সমকালীন রাফায়েল আলবের্তি (১৯০২) একাধারে স্পেনের লোকজ ঐতিহ্য ও পরাবাস্তবতার প্রতি সমানভাবে আকর্ষিত। কিন্তু স্পেনের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, ফ্যাসিবাদের জয় এবং গণতন্ত্রের পতন স্পেনীয় কবিতার জন্য দুঃসময়ের অন্ধকার আবর্ত তৈরি করে। খুন হন লোর্কা ও একাধিক কবি লেখক, নির্বাসনে যান আলবের্তির মতো একাধিক গণতন্ত্রী, প্রগতিবাদী কবি বুদ্ধিজীবী। প্রকৃতপক্ষে স্পেনীয় ভাষার কবিতা এরপর নির্বাসনে যায় মেক্সিকো, আর্জেন্টিনা ও স্পেনীয় ভাষাভাষী দক্ষিণ-আমেরিকার অন্যান্য দেশে।
ফ্যাসিস্ট রাজত্বে স্পেনীয় কবিতা যদিও তার ঐতিহ্যাশ্রয় বর্জন করেনি, কিন্তু তার চরিত্রে প্রধান হয়ে ওঠে ধর্মবাদিতা এবং রাজনীতি-বিরুদ্ধতা। ওক্তাভিও পাজ-এর মতো শক্তিমান কবিরাও ঐতিহ্যসূত্রে এবং কখনও ফরাসি পরাবাস্তবতার টানে ভাববাদিতাকে কবিতার পরম নির্ভর জ্ঞান করেছেন। এদের চোখে গণতন্ত্রের আদর্শ হয়ে ওঠে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। কবিতা সমাজবাস্তবতাকে এড়িয়ে চলাই শৈল্পিক প্রয়োজন হিসাবে গ্রহণ করে।
জেনারেল ফ্রাংকোর একনায়কী শাসনের রক্তাক্ত অনাচার অন্ধকার ও সাংস্কৃতিক স্থবিরতা পেরিয়ে আধুনিক স্পেনীয় কবিতা তার পূর্বঐতিহ্য পুরোপুরি ফিরে পায়নি। সমাজচেতনার বিপরীত নান্দনিকতা ও ভাববাদিতাই আধুনিক স্পেনীয় কবিতার মূলধন হয়ে উঠেছে। অন্তর্মুখী জীবনবিচ্ছিন্ন মরমিয়া চেতনার বিকাশ ঘটানোতেই কবিতার সর্বাত্মক চেষ্টা নিবদ্ধ (যেমন জোস অ্যাঞ্জেল ভ্যালেন্টি, ১৯২৯)। আবার কারও কারও কবিতায় জীবন ও সমাজ সম্পর্কে অবিশ্বাস, সংশয় ও তিক্ত পরিহাস প্রকাশ পেয়েছে। পরিণামে বিষণ্নতা, নিঃসঙ্গ অসহায়তাবোধ। কেউবা পরাবাস্তবতার নয়াচরিত্র সৃষ্টিতে উদ্যোগী।
তবে সমাজবাদের বিপরীত মেরুতে দাঁড়িয়ে সাম্প্রতিক স্পেনীয় কবিতা এখনও আত্মঅন্বেষা সত্ত্বেও নিজস্ব পথ বা নিজেকে খুঁজে পায়নি। পরীক্ষানিরীক্ষার অনিশ্চয়তাই সেখানে প্রধান। ফরাসি বা মার্কিনি নতুনত্ব অনুসরণের ঝোঁক যথেষ্ট। আবার কারও দৃষ্টি নিবদ্ধ আঙ্গিকসর্বস্বতার নতুন নির্মাণের দিকে। সে-সূত্রে ‘টাইপো ডিভাইস’-এর সাহায্যে কবিতায় অভিনবত্ব সৃষ্টির চেষ্টাও লক্ষ করা যায়। পথের অন্বেষায় কোনও-কোনও কবির আগ্রহ প্রকৃতি ও রোমান্টিকতায় ফিরে যাওয়া এবং সেই ধারায় নবসৃষ্টি। সময় ও নিসর্গ সৌন্দর্যের নিরিখে নয়া-অভিব্যক্তিবাদী কবিতা রচনা করার চেষ্টা।
স্পেনীয় কবিতার সর্বশেষ প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে নয়জন অতিনব্য কবির জোটবদ্ধতায় Nine Ultra-New Spanish Poets’, ১৯৭০) যা অতি-আধুনিকতার নামে কবিতায় নান্দনিকতা, মরমি ঐশীবাদিতা ও শিল্পসর্বস্বতার চেতনা কবিতায় প্রকাশ করতে সচেষ্ট। তবে পরাবাস্তবতা এখনও স্পেনীয় অত্যাধুনিক কবিদের প্রিয় তত্ত্ব। সবকিছু বিচারে স্পেনীয় কবিতার আত্মঅন্বেষার পথ এখনও যথেষ্ট দীর্ঘ বলেই মনে হয়।
অবশ্য খোদ স্পেনের বাইরে দক্ষিণ-আমেরিকায় স্পেনের একদা-উপনিবেশগুলোতে স্পেনীয় ভাষায় রচিত কবিতা পরিমাণে ও গুণমানে মূল স্পেনীয় কবিতা থেকে পিছিয়ে নেই। বরং কারও কারও বিচারে এক পা এগিয়ে রয়েছে, যদিও কবিরা একাধিক ভূখণ্ডবাসী। মেক্সিকো থেকে নিকারাগুয়া হয়ে চিলিÑদক্ষিণ-আমেরিকার স্পেনীয়ভাষী দেশগুলোতে, বলা যেতে পারে স্পেনীয় বিশ্বে স্বাধীনতা-উত্তর কবিতার প্রধান সুর যেমন স্বাদেশিকতা তথা মাটি ও মানুষ, তেমনি আধুনিকতা। কোথাও কোথাও গভীর সমাজচেতনা। তাই হিস্পানিপূর্ব লোকায়ত ঐতিহ্য কবিদের প্রেরণা ও উদ্দীপনার উৎস হয়ে ওঠে। যেমন মায়া, অ্যাজটেক ইত্যাদি প্রাচীন সভ্যতা-সংস্কৃতির ঐতিহ্য।
একদিকে যেমন এদের কবিতার উৎস লোকসংস্কৃতি ও অসামান্য নিসর্গসম্পদ, তেমনি আধুনিকতার আন্তর্জাতিকতাবাদ, মূলত ফরাসি কাব্যতত্ত্বের প্রভাব, বিশেষ করে প্রতীক ও পরাবাস্তবতাবাদ। নিকারাগুয়ার রুবেন দারিও (১৮৬৭) শুরুতে কবিতায় আধুনিকতার আন্দোলন জোরদার করে তোলেন। এর প্রভাব স্পেনীয় বিশ্বে দ্রুত ছড়িয়ে যায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ ও সংশ্লিষ্ট ভূখণ্ড দখল, স্পেনের পরাজয়, পরবর্তীকালের মেক্সিকো যুদ্ধ ইত্যাদি ঘটনা স্পেনীয় বিশ্বে ‘ইয়াংকি’ সংস্কৃতির প্রতি বিরূপতার সৃষ্টি করে। স্বাদেশিকতার উত্তাপ নতুন মাত্রা পায়।
দারিও প্রমুখের কবিতায় আধুনিকতার পাশাপাশি স্বদেশ ও সংস্কৃতি এবং মাটি ও মানুষের উপস্থিতি বিশেষ মর্যাদা অর্জন করে (যেমন দারিও’র ‘স্যালুটেশন’)। ‘বেঁচে থাকার যন্ত্রণা’ এবং ‘চেতনা’ নিয়ে বিড়ম্বনা এদের কাব্যচেতনায় উদ্দীপনা জোগায়। একদিকে স্বদেশ ও মানুষ, অন্যদিকে একসময়কার ভাষিক পিতৃভূমির বিপর্যয় ও দুর্যোগÑএই দুই ধারাতেই কবিদের পুষ্পিত বিকাশ, সেই সঙ্গে আত্মঅন্বেষা ও আত্মচেতনার প্রকাশও সবিশেষ হয়ে ওঠে। পূর্বতন হীনম্মন্যতা ঝেড়ে ফেলে এরা নিজ বিশ্বের পাশাপাশি ভাষিক বিশ্বের গৌরবগাথা ও স্মৃতিচারণে সোচ্চার হয়ে ওঠেন।
তাই চিলির কবি পাবলো নেরুদার (১৯০৪) কবিতায় ‘ঐশ্বর্য সমৃদ্ধ গালিসিয়া’ কিংবা ‘মৃত্যুর আবাদ মালাগা’র কথা উঠে আসে, বেদনার অভিব্যক্তি ঘটে ‘শহিদের আত্মত্যাগ’ এবং সেই সঙ্গে ‘উন্মত্ত জানোয়ারের দাপাদাপি’ স্মরণে। সেই রক্তাক্ত স্মৃতি এমনি যে ‘কবরের মাটিতে জ্বলন্ত জেরানিয়াম ফুটলেও’ তা মুছে যাবার নয়। আর সেই ভাষিক পিতৃভূমির প্রতি কবির আহ্বান থাকে ‘অনির্বাণ মানবিকতার আলো’ জ্বালিয়ে রাখার জন্য, যাতে ‘শত্রুদেশের আকাশে আগুন লাগে’। সেইসঙ্গে উচ্চারিত হয় ‘ঘুমন্ত আমেরিকায় মানুষের ভবিষ্যৎ’ জাগিয়ে রাখার আহ্বান। নেরুদা ও নেরুদাপন্থি কবিদের বৈশিষ্ট্য ছিল যদিও উদার মানবিকতার, তবু এর প্রসার ছিল ক্ষেতখামারের মানুষজনের প্রতি।
নেরুদা যেমন লোকজ ঐতিহ্যের মাধ্যমে তেমনি আধুনিকতার সহজ স্বচ্ছন্দ প্রকাশের মধ্য দিয়েও কবিতাকে মাটি ও মানুষের কাছে নিয়ে যেতে চেয়েছেন। পাশাপাশি তিনি শ্রেণিসংগ্রাম ও শ্রেণিচেতনার বিকাশ ঘটাতেও কবিতার সাহায্য নিয়েছেন, যেমন নিয়েছেন ভিন্ন ভূখণ্ডবাসী তার একাধিক আত্মিক সতীর্থ। নেরুদার প্রধান লক্ষ্য ছিল কবিতায় এই বস্তুবাদিতার মধ্যেও নতুন শৈল্পিক মাত্রা সংযোজন করতে, যা মাটি ও মানুষ-নিরপেক্ষ নয়।
তার উত্তর-প্রজন্মের, এমনকি সমসাময়িক একাধিক কবি অবশ্য শ্রেণিচেতনার চেয়ে মানবিক চেতনাকে প্রাধান্য দিয়েছেন। দিয়েছেন লোকজ ঐতিহ্যের প্রতি অনুরাগ বজায় রেখেও। লোকজ ঐতিহ্য ও নিসর্গপ্রীতি দক্ষিণ-আমেরিকার কবিদের এক অনন্য বৈশিষ্ট্য। ঔপনিবেশিকতা এদের এদিক থেকে তাদের নিরুৎসাহী তো করেইনি বরং প্রতিক্রিয়া হিসাবে তাদের সেদিকে টেনে নিয়ে গেছে। প্রসঙ্গটি বাংলা কবিতার সঙ্গে তুলনার যোগ্য।
মেক্সিকো বিদ্রোহের (১৯১৭) পর থেকে স্থানিক চেতনা ঐ ভূখণ্ডের কবিদের শুধু স্বাদেশিকতার দিকে নিয়ে গেছে তাই নয়, তাদের ঐতিহ্যাশ্রয়ীও করে তুলেছে। এনরিকে মার্টিনেজ, র্যামন লোপেজ ভেরার্দি (যিনি আবার কৃষ্ণাঙ্গ অধিবাসীদের নিয়ে লিখেছেন প্রচুর) কিংবা ফরাসি কাব্যাদর্শ-প্রভাবিত ওক্টাভিও পাজ (১৯১৪) এরা সবাই লোকজ ঐতিহ্যের দিকে গভীর দৃষ্টিতে ফিরে তাকিয়েছেন। তবে পাজ ইতিহাস, দর্শন, পুরাণ তার কবিতার অন্তর্ভুক্ত করেছেন, দক্ষিণ-আমেরিকার আত্মপরিচয়ের কথা বলেছেন। কিন্তু সেই সঙ্গে মার্কিনি গণতন্ত্রের প্রতি মুগ্ধতার কথাও গোপন করেননি। গোপন করেননি আদ্রেঁ ব্রেত ও পরাবাস্তবতার প্রতি তার আকর্ষণের কথা। অন্যদিকে লোর্কা, নেরুদা প্রমুখের প্রধান উচ্চারণ মানুষের সঙ্গে মানুষের, বিশেষ করে সাধারণ মানুষের সহমর্মিতার বোধ। এটাই স্পেনীয় বিশ্বের এবং দক্ষিণ-আমেরিকা ভূখণ্ডের কবিতার মূল সুর।
নয়
আমেরিকার স্বাধীনতাযুদ্ধের পটভূমিতে রাজতন্ত্রবাদী ও স্বাধীনতাবাদীদের দ্বন্দ্বে মার্কিনি কবিতা সে সময় দ্বিমুখী চরিত্র নিয়ে প্রকাশ পায়। মূলত ব্যঙ্গ ও রোমান্টিকতা নিয়ে তাদের যাত্রা শুরু। সবদিক বিচারে মার্কিনি সাহিত্যের/কবিতার প্রথম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব অ্যাডগার অ্যালেন পো (১৯০৯)। তবে তার পূর্বসূরি এমার্সনকে (১৮০৩) হিসাবের বাইরে রাখা যায় না। পোর কবিতার অনুবাদ করেছিলেন তার গুণগ্রাহী ফরাসি কবি শার্ল বোদলেয়ার। অ্যালেন পোর বহুনন্দিত ‘জধাবহ’ কবিতাটির প্রকাশ ১৮৪৫ খ্রিস্টাব্দে।
প্রকৃতপক্ষে মার্কিনি সাহিত্যে রেনেসাঁসের সূচনা দাসত্বপ্রথা-বিরোধী কবিতার প্রকাশ ও মানবিক চেতনার জয়গানের মধ্য দিয়ে। মানবিকতা, স্বাদেশিকতা ও গণতন্ত্রের পূজারি ওয়াল্ট হুইটম্যানের (১৮১৯) কবিতায় সর্বজনীন মানবিক চেতনার সঙ্গে স্বাদেশিকতার (মানুষ ও ভূখণ্ডের প্রতি ভালোবাসার) অন্তরমিশ্রণ প্রকাশ পেয়েছে। তার বহুখ্যাত কবিতা সংকলন ‘Leaves of Grass’-এর প্রথম প্রকাশ ১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দে। হুইটম্যানকে বলা হয় মার্কিন জাতীয়তাবাদী চেতনার প্রতিনিধি কবি। মানবিক আদর্শ, মানুষের প্রতি বিশ্বাস, ব্যক্তিক মহত্ত্ব ইত্যদি মৌল গুণ নিয়ে হুইটম্যানীয় চেতনা মার্কিনি কবিতার প্রথম পথ-নির্দেশনার কাজ সম্পন্ন করে। এর সামাজিক ভিত অনুধাবন করা যায় ঐসব কবিতার প্রচণ্ড জনপ্রিয়তার মধ্যে। তার ‘ফ্রি ভর্স’ ছিল প্রচলিত কাব্য-আঙ্গিকের ব্যতিক্রম।
বিশ শতকের প্রথমার্ধে মার্কিনি কবিতার প্রধান পুরুষ রবার্ট ফ্রস্ট (১৮৭৫)। ফ্রস্টের কবিতায় মানবজীবনের ট্রাজিক বৈচিত্র্য এবং মানব-অস্তিত্বের জটিলতার চমকপ্রদ চিত্রণ প্রকাশ পেয়েছে। মার্কিনি কবিতার বিস্তারে সেখানকার লিটল ম্যাগাজিনগুলোর ভূমিকা ছিল অসাধারণ। সেগুলোর ভিত্তিতে ক্রমশ ভিন্ন ভিন্ন চরিত্রের কবিতার প্রকাশ ও জনপ্রিয়তা অর্জন সম্ভব হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে কার্ল স্যান্ডবার্গের হুইটম্যানীয় ধারার কিম্বা লিন্ডসের পুরাকাহিনি-ভিত্তিক কবিতা কিংবা লি মাস্টার্স-এর জনপ্রিয় ফ্রি ভর্স।
এজরা পাউন্ড, টি. এস. এলিয়ট মার্কিন দেশের হলেও তাদের কাব্যখ্যাতির অনেকাংশই ইংরেজি সাহিত্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। এদের সম্পর্কে আলোচনা ইংরেজি সাহিত্য প্রসঙ্গেই করা হয়েছে। পাউন্ডের জটিলতাসিদ্ধ কবিতার চরম ব্যক্তিবাদী বৈশিষ্ট্য বহুবিতর্কিত বিষয়, বিশেষভাবে তার ‘ক্যান্টোস’। এনসাইক্লোপিডিয়ার ভাষায় “His most controversial work remained ‘The Cantos”। এলিয়টের অতীত সন্ধান, রুগ্ণ বাস্তবতা ও খ্রিস্টীয় অধ্যাত্মবাদিতাও বহু-আলোচিত বিষয়। বিশ শতকের আধুনিক কবিতায় এলিয়টের প্রভাব যথেষ্ট। মার্কিনি কবিতায় সে-প্রভাব বিশেষভাবে পরিস্ফুট আর্চিবল্ড ম্যাকলিশ (১৮৯২), হার্ট ক্রেন (১৮৯৯) ও কার্ল শাপিরোর (১৯১৩) মধ্যে।
বিশ শতকের তিন কৃষ্ণাঙ্গ কবির মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ল্যাংস্টন হিউজেস। আধুনিক মার্কিনি কবিদের মধ্যে ফর্ম নিয়ে পরীক্ষার ঝোঁক যথেষ্ট। এর মধ্যে প্রচলিত ফর্মের বাইরে একেবারে ভিন্ন চরিত্রের ‘সিম্ফোনিক’ ফর্ম বা ‘টাইপোগ্রাফিক’ কূটকৌশলী ফর্ম নিয়েও পরীক্ষার শেষ নেই (যেমন ই.ই. কামিংস)। আর অভিনবত্ব, এমনকি উদ্ভটত্বও মার্কিনি-রুচি যথেষ্ট আকর্ষণ করে। অন্যদিকে মারিয়ান মুর (১৮৮৭) যে চমকপ্রদ ‘ফ্রি ভর্স’ আমদানি করেন তা এতটাই জনপ্রিয় যে তাকে বলা হয় আধুনিক মার্কিনি কবিতার নয়া কণ্ঠস্বর।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মার্কিনি সাহিত্যে বিচিত্র ও উদ্ভট চরিত্রের কবিতা প্রকাশ পেয়েছে। শুধু পঞ্চাশে আবির্ভূত বীট কবিদের প্রাকৃত কবিতাই নয় (অ্যালেন গীনসবার্গ, জ. ১৯২৬), থম গুন (১৯২৯) বা রবার্ট লোয়েল (১৯১৭-৭৭)-এর কনফেশনধর্মী কবিতাও ঐ বৈচিত্র্যের পরিচায়ক। এক্ষেত্রে ব্যক্তিক অভিজ্ঞতাই কবিতার মর্মবস্তু; তাতে পাপ, অন্যায় যা কিছুই থাকুক-না কেন। লোয়েলের হাসপাতাল-অভিজ্ঞতা-নির্ভর কবিতা ‘Walking in the Blue’ তার অন্যতম সেরা রচনা বলে সমালোচকদের অভিমত। এই ধারার কবিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য রবার্ট হ্যাস (জ. ১৯৪২), রবার্ট পিন্স্কি (জ. ১৯৫০) কিংবা ফ্র্যাংক বিভার্ত (১৯৩৯) প্রমুখ। দীর্ঘ কবিতা বা হ্রস্ব কবিতায় এদের, বিশেষত শেষোক্তের মূল বিষয় পাপবোধের প্রকাশ, যা মার্কিনি সমাজে একটি প্রচলিত প্রবণতা। এ ছাড়াও রয়েছেন জিম পাওয়েল (জ. ১৯৫১), ব্রেন্ডা হিলম্যান (১৯৪১), মাইকেল রায়ান (১৯৪৬), অ্যালান শাপিরো (১৯৫২), ম্যারি জো স্যাল্টর (১৯৫৬) প্রমুখ। কিন্তু কবিতায় অসামান্য উৎকর্ষ সাম্প্রতিক মার্কিন সাহিত্যে দেখা দিচ্ছে না।
দশ
রুশসাহিত্যে প্রাচীন লিখিত পর্বের সূচনা একাদশ শতকে এবং ১৭ শতকের অন্তিমক্ষণ পর্যন্ত এর বিস্তার। তবু আঞ্চলিক ভিত্তিতে লোকগীতির মৌখিক রূপ অনেক আগেকার। এমনকি মূল্যবান ঐতিহ্য হিসাবে যে বীরত্বব্যঞ্জক এপিক গীতিকাব্যের (Bylina) কথা বলা হয় তারও রচনাকাল দশম শতাব্দী। এ-ধরনের লোকগীতি কিয়েভ, নভোগোরদ প্রভৃতি অঞ্চলে জন্ম নিয়েছিল। অন্যান্য ইউরোপীয় সাহিত্যের মতো প্রাচীন রুশকাব্যও চরিত্রের দিক থেকে ছিল নীতিবাদী ও ধর্মবাদী। প্রথমে কাব্যে ছিল বাইজান্টাইন সাহিত্যের প্রভাব, মূলত গ্রিক থেকে অনুবাদের মধ্য দিয়ে। কিন্তু সেক্যুলার রুশসাহিত্যের ওপর ছিল জবানি লোকগীতির প্রভাব।
আঞ্চলিক ভিত্তিতে কয়েক শতক ধরে পূর্ব স্লাভ ভাষায় রচিত রুশ কাব্যসাহিত্যের প্রধান উপকরণ ছিল গীতগাথা এবং গ্রিক-লাতিন থেকে অনুবাদ। পনেরো শতকের শেষদিকে তাতার শাসন থেকে মুক্ত হলেও অনাচারী একনায়কী রাজতন্ত্রী শাসন মুক্তচেতনার সাহিত্যসৃষ্টির অনুকূল ছিল না। সাহিত্যে রাজন্য জীবনচরিত ও অনুবাদই ছিল প্রধান। প্রথম সময়চিহ্নিত ছাপা বইয়ের প্রকাশ ঘটে ১৫৬৪ সালে। অত্যাচারী জারের আমলে (‘আইনভান দ্য টেরিব্ল’) সামন্ত ভূস্বামী বনাম রাজতন্ত্রের সংঘাত যে সামাজিক আলোড়নের জন্ম দেয় তার ফলে দেখা যায় কিছু সাহিত্য। এরপরও চলে রাজনৈতিক দুর্যোগ, ১৬ শতকের শেষ দিক থেকে ১৭ শতকের প্রথমদিকে। একদিকে কৃষকদের সামন্তবিরোধী লড়াই, অন্যদিকে বিদেশি আক্রমণ, গণপ্রতিরোধ ইত্যাদি ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সাহিত্যের ঐতিহ্যবদলÑসেক্যুলার বিষয়, বাস্তববাদী চেতনা ও লোকগীতির প্রভাবে ধর্মবাদী প্রভাবযুক্ত সাহিত্যধারার অবসান ঘটে ১৭ শতকের মধ্যেই। স্যাটায়ার, হিউমার, লোকগীতির সুষমা প্রাধান্য পায়।
আধুনিক রুশসাহিত্যের উদ্ভব ১৮ শতকের প্রথম দিকে ক্লাসিসিজমের ধারায়। এ-পর্বের প্রধান কাব্যব্যক্তিত্ব সেক্যুলার কবি কান্টেমির, বিদগ্ধ বিজ্ঞানী-কবি লোমোনোসভ এবং নাট্যকার আলেকসান্দার সুমারোকভ। প্রথম জন বিশেষভাবে প্রেমগীতি ও স্যাটায়ারের জন্য খ্যাত; তাকে রুশ স্যাটায়ারের জনক বলে ধরা হয়। আর দ্বিতীয় জনের হাতে কবিতা, ওউড্ (Ode) ইত্যাদির মাধ্যমে নিওক্লাসিসিজমের প্রতিষ্ঠা। তার হাতে রুশ সাহিত্যভাষার উল্লেখযোগ্য বিকাশ, যা সমৃদ্ধি, সৌন্দর্য ও শক্তির দিক থেকে অন্যান্য ইউরোপীয় ভাষা থেকে পিছিয়ে ছিল না। অন্যদিকে সুমারোকোভের খ্যাতি রুশ ধ্রুপদী ট্রাজিডিকাব্যের (১৭৪৭) জন্য। সেই সঙ্গে প্রেমগীতি, এলিজি ও অনুরূপ কবিতার জন্যও তিনি জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। রাজতন্ত্রের অনাচার-বিরোধিতার ক্ষেত্রেও এর বলিষ্ঠ ভূমিকা স্মরণযোগ্য।
উনিশ শতক রুশসাহিত্যের সোনালি যুগ কবিতা, উপন্যাস, ছোটগল্প ইত্যাদি নিয়ে। আলেকসান্দর পুশকিন (১৭৯৯) এ-যুগের শ্রেষ্ঠ কবি। নাগরিক ও গ্রামীণ জীবনচিত্র সমানভাবে তার রচনায় উপস্থিত। কবিতায় প্রাকরণিক বৈচিত্র্য ও নতুনত্বের দক্ষতাও তার দান। তার বিখ্যাত আখ্যানকাব্যে (১৮২৩-৩১) দেখা যায় হৃদয়বৃত্তির উষ্ণতার সঙ্গে হালকা সরসতা, ভাষায় সারল্যের সঙ্গে গভীরতার অসামান্য প্রকাশ। তিরিশের দশকে তার হাতে যেমন রোমান্টিকতার প্রকাশ, তেমনি রিয়ালিজমেরও সফল প্রতিফলন লক্ষ করার মতো। একদিকে হালকা স্যাটায়ার ও হিউমার, অন্যদিকে অসাধারণ মানের লিরিক পুশকিনকে অতুলনীয় অবস্থানে পৌঁছে দেয়। রূপকথা, কাহিনি, মানবিক গাথা থেকে সমাজের বাস্তব জীবনচিত্রণ-এমনি ধারার বৈচিত্র্যে, দক্ষ কারুকর্মে পুশকিন রুশসাহিত্যের প্রধান পুরুষ হিসাবে বিবেচিত। প্রায় একই সময়ের খ্যাতনামা রোমান্টিক কবি মিখাইল লেরমন্তভ (১৮১৪) তার ককেশীয় বিষয়বস্তুর জন্য বিশিষ্ট। ভাববাদ-বস্তুবাদের দ্বন্দ্বে পুশকিনের শৈল্পিক অবস্থান নীতিগত দিক থেকে আমাদের আধুনিক কবিতার জন্য একটি বিচার্য বিষয় হতে পারে। যেমন পারে হুইটম্যানকে নিয়ে।
প্রসঙ্গত স্মর্তব্য, ১৯ শতকের দার্শনিক কবি ফিওদের তিউত্চেফ (Tyutchev, ১৮০৩), যাকে তাত্ত্বিক রোমান্টিকতার জন্য ইংরেজি রোমান্টিক পর্বের তাত্ত্বিক কবি বা জার্মান রোমান্টিক কবি হেল্ডারলিনের সমগোত্রীয় মনে করা হয়। অবশ্য মধ্যশতকের কবি নিকোলাই নেক্রাসভকে স্মরণ করা হয় তার উজ্জ্বল নাগরিক কবিতার জন্যে। আবার এই কবিই কৃষকজীবনের চিত্ররচনায় পুরাকাহিনি (মিথ) ও বাস্তবতার (রিয়ালিজম) আশ্চর্য সংমিশ্রণ ঘটিয়েছিলেন তার বহুনন্দিত দীর্ঘ আখ্যানকাব্যে (‘The Red-Nosed Frost, ১৮৬৩)। কিন্তু কবিতার সামাজিক দায়বদ্ধতায় বিশ্বাসী কবিদের মধ্যে বিশেষভাবে স্মরণযোগ্য গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক কবি কোন্দ্রাতি রাইলিয়েফ (Ryleyev) যিনি জার-শাসনের অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে মৃত্যুকে মহিমান্বিত করে তোলেন।
বিশ শতকের রুশ-কবিতায় প্রতীকীবাদের প্রতিফলন স্পষ্ট হয়ে ওঠে সম্ভবত উনিশ শতকের প্রতীকীবাদী আন্দোলনের প্রভাবে। ভ্লাদিমির সলোভিয়েফের কাব্যিক বিশ্বাসে ভৌতজগতের প্রতীক আর অধিবিদ্যক বাস্তবতার এক উদ্ভট সংমিশ্রণ ঘটেছিল। প্রতীকীবাদী কবিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন ভ্যালেরি ব্রিউসফ (১৮৭৩) এবং প্রতীকী কাব্যের শ্রেষ্ঠ রচয়িতা আলেকজান্দর ব্লক (১৮৮০), যিনি আবার তত্ত্বগত দিক থেকে দুই বিপরীতের (বিপ্লব ও অধ্যাত্মবিশ্বাস) সমন্বয় ঘটাতে চেষ্টা করেছেন তার কবিতায়। আশ্চর্য যে, রুশ প্রতীকীবাদী একাধিক কবি তাদের খ্রিস্টীয় বিশ্বাস ও সমাজবাস্তবতার মধ্যে সেতুবন্ধন ঘটাতে চেয়েছেন।
কিন্তু রুশী বাস্তবতার পরিবেশে প্রতীকীবাদী কবিতা স্থায়িত্ব পায়নি। অনেকটা এর প্রতিক্রিয়া হিসাবে নিকোলাই গুমিলিওফ সম্পূর্ণ ভিন্নধারার কাব্য-আন্দোলন গড়ে তোলেন (১৯১১)। এতে প্রাকরণিক কলাকুশলতার পাশাপাশি অভিব্যক্তির স্বচ্ছতার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়। এ ধারার প্রধান কবি আনা আখ্মাতোভা (১৮৮৯)-র গীতিকবিতার সৌন্দর্য ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। একই সময়ে ভেলিমির খ্লাব্নিকফ (Khlelbnikov) উল্লিখিত প্রতীকীবাদের বিপরীত ধারায় ভিন্নধর্মী কাব্য-আন্দোলন শুরু করেন ‘ফিউচারিজম’ নামের আড়ালে (১৯১০)। কিন্তু এর চরিত্র ছিল ফরাসি ফিউচারিজম থেকে কিছুটা ভিন্ন। কবিতার প্রচলিত ফর্ম বর্জন করে এরা নয়া আধুনিক কাব্যরীতি প্রবর্তনের চেষ্টা করেন যেখানে ভাষা হবে স্বচ্ছ, জনমুখী কিন্তু কাব্যগুণসমৃদ্ধ। ভøাদিমির মায়কোভ্স্কি (১৮৯৩) থেকে বরিস পাস্তেরনাক (১৮৯০)-এর মতো কবি এ-আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন সম্ভবত আধুনিকতার আকর্ষণে। এদের কাব্যরীতির সার্থকতাও বাঙালি কবির ভাবনার বিষয় হতে পারে।
সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পর রুশসাহিত্যে আমূল পরিবর্তন ঘটে। সেখানে কবিতা নিয়ে, অন্যান্য সাহিত্য নিয়ে তাত্ত্বিক অন্তর্দ্বন্দ্ব সৃষ্টির গুণগতমান ব্যাহত করে, বিশেষ করে মত ও পথের অনিশ্চয়তা ঘিরে। সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতার (Socialist realism) তাত্ত্বিক চাপই এর মূল কারণ। এর প্রভাব পড়ে কবিতায় সবচেয়ে বেশি। অবশ্য যুদ্ধকালীন (দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ) কবিতায় তীব্র স্বাদেশিকতার আবেগ সঞ্চারিত হয়েছিল তত্ত্ব ও মতাদর্শ-নিরপেক্ষভাবে। যুদ্ধোত্তর-পর্বে আবার নাগরিক কবিতা জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এ ধারার কবিদের মধ্যে ইয়েভ্তেশেংকো, তারকোভ্স্কি জোসেফ ব্রড্স্কি উল্লেখযোগ্য। এদের আকর্ষণীয় রচনার মধ্যে গীতিকবিতাই প্রধান।
সার্বিক বিচারে সাম্প্রতিক রুশ-কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য যেমন প্রচলিত রাজনৈতিক মতাদর্শের বিরোধিতা, তেমনি অতীব আত্মকেন্দ্রিকতা যা ব্যক্তিচেতনার প্রাধান্যই প্রকাশ করে। অন্যদিকে আরেক নয়া প্রবণতা অধ্যাত্মবাদিতা বা অতীন্দ্রিয়বাদিতার কাব্যিক প্রকাশ ঘটানো, অনেকটা সমাজবাদের প্রতিক্রিয়া হিসাবে। তাই কবিতায় এলিয়টীয় খ্রিস্টভক্তির প্রকাশ দেখা যায়। আবার কারও কারও কলমে উদ্ভট কবিতা (অ্যাবসার্ড পোয়েমস) নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষাও চলছে। তা সত্ত্বেও এ কথা সত্য যে, রাজনৈতিক কারণে কবি-বিশেষকে নোবেল পুরস্কার দেওয়ার পরও সাম্প্রতিক রুশ-কবিতায় মৌলিকত্ব ও কাব্যিক কুশলতার অভাব প্রকট। অগ্রগণ্য কবি ব্রডস্কির কবিতায় তাই দেখা যায় ‘জন ডান, এলিয়ট বা অডেনের প্রভাব’ (রবার্ট পোর্টার) যা হয়তো রুশী সমাজের বাস্তবতাকে পরিস্ফুট করে তোলার সহায়ক নয়। তবে রুশ-কবিতার ঐতিহ্যানুসারী নাগরিক কবিতা বা সমাবেশের কবিতার চরিত্র এখনও অক্ষুণ্ন রয়েছে।
এগারো
ইতালীয় মাতৃভাষায় সাহিত্যের সূচনা ১৩ শতকে; এর পূর্ববর্তী সাহিত্যকর্ম সবই লাতিনে। রোমান্স কাহিনির ফরাসি উৎসের ভিত্তিতে রচিত কাব্যকাহিনি মানবিচারে বড় একটা অসাধারণ হয়ে ওঠেনি। এর মধ্যে ছিল প্রেমগীতির প্রাধান্য। ছিল নারীপ্রেমের আবেগ-ভাবালুতা। সেই সঙ্গে ঐশীপ্রেম মিলে ভিন্নতর কাব্যচরিত্রের জন্ম। পরবর্তী সময়ে এর সর্বোত্তম প্রকাশ দান্তের রচনায়, বিশেষ করে ‘ডিভাইন কমেডি’ কাব্যের কুশলতায়। এ জাতীয় প্রথম রচনা ‘Vita nuova’ (The New Life) অবশ্য ১২৯৩ সালের। এ পর্যায়ে কমিক কবিতা, হালকা উপভোগের কবিতাও রচিত হয়।
চতুর্দশ শতকে রেনেসাঁসের চরিত্র নিয়ে রচিত দান্তের ‘ডিভাইন কমেডি’ (১৩১০-২১) নামীয় রূপক কাব্য গোটা ইউরোপের কাব্য-অঙ্গনে প্রভাব ফেলে। রোমান কবি ভার্জিল হয়ে ওঠেন ক্লাসিক আদর্শের কাব্যব্যক্তিত্ব। সেই সঙ্গে পেত্রার্কের সনেট, গান ও ব্যালাড (১৩৩০-৭৪) শুধু ইতালীয় সাহিত্যেই নয়, পশ্চিম-ইউরোপীয় সাহিত্যে অনুসরণযোগ্য আদর্শ হয়ে ওঠে। কবিতা, গীতিকবিতা, বিশেষত সনেট নিয়ে সব কবির নজর তখন ইতালির দিকে। আর ইতালীয় ‘হিউম্যানিজম’ তখন ইউরোপীয় সংস্কৃতিচর্চার পালে হাওয়ার শক্তি জোগাতে থাকে।
ইতালীয় রেনেসাঁসের সূচনা ১৪ শতকে পেত্রার্ক, বোকাচ্চিয়ো প্রমুখ কবি ও গদ্যকারের মানবতাবাদের পথ ধরে। রেনেসাঁসের প্রভাব নিয়ে পশ্চিম-ইউরোপে বিজ্ঞান দর্শন ও সাহিত্যকলার যে বিকাশ ঘটে, তুলনায় মূল ইতালীয় সাহিত্যে সেই প্রভাব পরবর্তী সময়ে যথেষ্ট গভীর ছিল না। সাহিত্য বা কবিতার সৃষ্টি উৎকর্ষ-বিচারে উচ্চমানের হয়ে ওঠেনি। পনেরো শতক তো সেদিক থেকে অনুর্বরই বলা চলে। মূলত ক্লাসিক সাহিত্যচর্চার প্রভাবে গ্রেকো-লাতিনচর্চা ইতালীয় মাতৃভাষার চর্চা ও সৃষ্টি গৌণ করে তোলে। তবু এর মধ্যে হয়তো নিছক মাতৃভাষার প্রতি আকর্ষণের কারণে ইতালীয় কবিতার চর্চা অব্যাহত থাকে, দেখা যায় ফ্লোরেন্সে ১৪৪০ সালের পর থেকে।
সেই ধারায় ১৬ শতকে অনেকটা রেনেসাঁসীয় মানবিক চেতনার প্রভাবে কবিতার নয়া চারিত্র্য ভিত তৈরি হয় কল্পনা ও যুক্তিবাদিতার সমন্বয় ঘটিয়ে। যেমনটা দেখা যায় ইংরেজি, ফরাসি ও স্পেনীয় সাহিত্যে। ষোড়শ শতকের লিরিকে তখনও পেত্রার্কীয় প্রভাব স্পষ্ট। আর এ লিরিক-প্রাধান্যের মধ্যে চলে কিছুটা সনেটচর্চা। আবার এর মধ্যে এপিক ধরনের কাব্যও রচিত হয় বিষয় ও আঙ্গিকের ভিন্নতা এবং আয়রনির চমক নিয়ে (লুদোভিকো আরিয়োস্তো, ১৫১৬)। ইতালীয় রেনেসাঁসের শেষ উল্লেখযোগ্য কবি তাসো (Tasso), যার এপিকধর্মী কাব্যে ক্লাসিক ও সমকাল-চেতনার সামঞ্জস্য বিধানের চেষ্টা পরিস্ফুট (‘জেরুজালেম ডেলিভার্ড’, ১৫৮১)।
সতেরো শতক ইতালীয় কবিতায় অবক্ষয়ের যুগ। স্যাটায়ারই এ সময় লিরিক কবিতায় প্রাধান্য পায়। আঠারো শতকে শেক্সপিয়রের অনুকরণে অমিত্রাক্ষরে ট্রাজেডি রচনার চেষ্টা চলে ক্লাসিক ও বাইবেলীয় বিষয়বস্তু ব্যবহার করে। উনিশ শতকে রাজনৈতিক নৈরাজ্যের ছায়া পড়ে সাহিত্যে। স্বাদেশিকতার চেতনা লিরিক কবিতায়ও প্রভাব ফেলে। এ পর্যায়ে Ugo Foscolo’র কবিতা, যেমন ‘On Sepulchres’, স্বাদেশিকতার উদ্দীপক প্রতীক হয়ে ওঠে। তাছাড়া সনেট ও লিরিকে ক্লাসিসিজম ও রোমান্টিকতার দ্বন্দ্বে রোমান্টিক আধুনিকতারই জয় সূচিত হয়। এ শতকের প্রতিনিধিস্থানীয় কবি গিয়োকোমো (জিকোমো) লিওপার্দির গীত গান (১৮৬১) স্বাদেশিকতার উচ্চারণ নিয়ে সর্বোত্তম গীতিকবিতার গভীর অনুভবে ঋদ্ধ। রোমান্টিক দেশাত্মবোধ নিয়ে কবিতা সারল্য, সৌন্দর্য ও সংগীতময়তার প্রতীক হয়ে ওঠে। একই সময়ে জোশুয়ে কার্দুচ্চি’র কবিতায় (The New lyrics, The Barbarian Odes ইত্যাদি) প্রকাশ পায় তিক্ততা ও হতাশার সঙ্গে স্বাদেশিকতার মিশ্রণ।
বিশ শতকে রাজনৈতিক দুর্যোগ, ফ্যাসিবাদ ও সমাজবাদের দ্বন্দ্ব, ফ্যাসিস্টদের জয় কবিতাকে বিপর্যয়ের মুখে ফেলে দেয়। কবিতায় বৃত্তাবদ্ধতা বেড়ে ওঠে ফরাসি প্রতীকীবাদের প্রভাবে। শব্দের ঐশীশক্তিতে মোহ, বিচ্ছিন্নতা ও নিঃসঙ্গতাবোধ, হতাশা ইত্যাদি প্রভাব কবিতায় দুর্বোধ্যতা ও অস্পষ্ট ধূসরতার জন্ম দেয়। হতাশার টানে দেখা দেয় ‘হার্মেটিসিজম’ আন্দোলন (উজেনি মনতালে ১৮৯৬)। সমাজে এলিটত্ব অর্জনের ঝোঁক কবিদের আদর্শচ্যুত করে (যেমন জোসেপ্পে উনগারেত্তি, ১৮৮৮)। অবাস্তবতা, জীবনবিচ্ছিন্নতা কবিতাকে অনাকর্ষণীয় করে তোলে। অবশ্য বিশ্বযুদ্ধ ‘হার্মেটিক’ সৌধ ভেঙে ফেলে। সামাজিক বাস্তবতা আবারও সামনে চলে আসে। নয়া আঙ্গিকে কবিতার নব্য রূপায়ণের চেষ্টা চলে (সালভাতোর কোয়াসিমোদো, ১৯০১)।
যেমন যুদ্ধপূর্ব, তেমনি যুদ্ধোত্তর ইতালিতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং সেই সঙ্গে আর্থ-সামাজিক পরিবর্তন সাহিত্য-সংস্কৃতিতে যথেষ্ট প্রভাব রেখেছে। যুদ্ধোত্তর-পর্বে পুরনো কৃষি-সংস্কৃতি ও আঞ্চলিক ভাষা-সংস্কৃতিচর্চার স্থান দখল করে নেয় নাগরিক চেতনাভিত্তিক জাতীয় ভাষা-সংস্কৃতির চর্চা। এতে গ্রাম্সি-কথিত ‘জাতীয়-জনপ্রিয় (জনমুখী) সাহিত্য’ (‘Nationalist-popular literature’) সৃষ্টির পক্ষে কতটা অনুকূল পরিবেশ তৈরি হবে তা বলা কঠিন। তবে লক্ষণীয় যে, পরিস্থিতির টানে কবি-লেখকদের আগ্রহ দেখা যায় বৃত্তাবস্থা থেকে খোলা ময়দানে বেরিয়ে আসার দিকে। নব-বাস্তবতার (‘Neo-realism’) প্রভাব এতে কতটা সাহায্য করতে পারে তা বলা যায় না। তবে নয়া আধুনিকতার প্রভাব পশ্চিম-ইউরোপীয় সাহিত্যের নিরিখে কবিদের ঠিকই স্পর্শ করছে। চলছে কৃষিসংস্কৃতির সঙ্গে নাগরিক চেতনার তথা নব্য আধুনিকতার দ্বন্দ্ব (যেমন জানজোত্তোর কাব্যে, জ. ১৯২১)। বিষয়টি বাংলাদেশের কবিতা প্রসঙ্গে বিবেচ্য। আবার আত্তিলো বার্তোলুচ্চি (জ. ১৯১১)-র চেষ্টা সমন্বয়ের পথে কবিতায় নব্যধারার প্রবর্তন। সবমিলিয়ে এ কথা ঠিক যে, ইতালীয় কাব্যে আঞ্চলিক চরিত্র যেমন হাত রেখেছে, তেমনি রাজনৈতিক টানাপড়েনের প্রভাবও সেখানে কম নয়।
বারো
বিশ্বসাহিত্যের পটভূমিতে কবিতার প্রতিনিধিস্থানীয় ইতিহাস পর্যালোচনায় একটি বিষয় স্পষ্ট যে, কবিতা তার দীর্ঘ পথপরিক্রমায় মূলত সমষ্টিচেতনা ও ব্যক্তিচেতনাকে শুরু থেকে বর্তমান সময় অবধি ছুঁয়ে ছুঁয়ে গেছে। একে হয়তো ধর্মবাদিতা সূত্রে অধ্যাত্মচেতনার ভাববাদিতা এবং সমাজ ও জীবন-নির্ভর বাস্তববাদিতার দ্বৈতচরিত্র হিসাবে চিহ্নিত করা চলে। বিশ্বের অধিকাংশ প্রধান সাহিত্য তথা কাব্যপ্রচেষ্টায় এ চারিত্রবৈশিষ্ট্য কখনও পরিস্ফুট রূপে, কখনও পরোক্ষভাবে উপস্থিত হয়েছে। আর এ দ্বৈতচরিত্র ঘিরে কবিতার আত্মসচেতনতার যুগে নানাবিধ কাব্যতত্ত্বেরও প্রকাশ ঘটেছে এবং কবিতা সেসব প্রভাবে তার চরিত্রবদল ঘটিয়েছে। এতে যে কবিতার চরিত্রে বৈচিত্র্য তৈরি হয়েছে সে-বিষয়ে সন্দেহের কারণ নেই। কিন্তু উৎকর্ষে কতটা উচ্চতা অর্জন করেছে তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।
বিশ্বের নানা দেশে ভাষা ও সমাজ-সংস্কৃতির ভিন্নতার মধ্যেও কবিতার ঐ দ্বৈতধারা একাধিক রূপে প্রকাশ পেয়েছে। যেমন ঐশী পরমের অন্বেষায়, তেমনি জীবনের মধ্যেই পরমকে খুঁজে নেবার তাগিদে। সমাজ ও জীবনের বৈচিত্র্য এবং ব্যক্তির মানসলোকের বৈচিত্র্য-বৈশিষ্ট্যের মধ্যেই কবিতার দ্বৈতচেতনার ধারা অব্যাহত থেকেছে। সমাজবাস্তবতার ভিন্ন প্রেক্ষাপটে কখনও সেখানে দেখা গেছে কাব্য-আন্দোলনের প্রকাশ, আবার কখনও সময়ের বহমানতায় দর্শন-বিজ্ঞান ও সমাজতত্ত্বের প্রভাব। এদিক থেকে কবিতার পরিবর্তনে দেখা গেছে তার বিশ্বজনীন চরিত্র, যা ভাষা-ভূখণ্ডের ভিন্নতা সত্ত্বেও সত্য। এ সত্য কবিতা যে প্রাথমিক বিচারে মানবমনের অনুভূতির প্রকাশ ও মানবচেতনার ফসল, তারও প্রমাণ রাখে। আক্ষরিক ভাষা ভিন্ন হলেও কবিতা তার নিজস্ব ভাষায় বরাবরই বিশ্বমানবিক চরিত্রের।
বাংলা কবিতা শুরু থেকে তার আধুনিক পর্বে এ সত্য অনুধাবন করেছে ঠিকই। তবে একালে বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাস-অনুধাবন বাংলাদেশের কবিতাকে উদ্দীপ্ত করতে পারে ঋণগ্রহণের জন্য নয় বরং ইতিহাস থেকে শিক্ষাগ্রহণের মাধ্যমে আপন পদছন্দ আপন বাস্তবতার ভিত্তিতে ঠিক করে নেবার জন্য। নিজস্ব পথ ও পদ্ধতি, আদর্শ ও রীতি (ধর্মবাদী সমাজতাত্ত্বিকদের ভাষায় যা ‘ইমান ও নিশান’) তৈরি করে নেবার জন্য। অনুকরণ বা অনুসরণ কবিতাকে কখনও মহৎ উচ্চতায় নিয়ে যায় না। এ সত্য বিশেষভাবে বাঙালি কবিদের জন্য অনুধাবনের।
সচিত্রকরণ : রজত



