প্রচ্ছদ রচনা : আহমদ রফিকের দেশবিভাগ পরিভ্রমণ : স্বপন নাথ

প্রচ্ছদ রচনা : ভাষাসৈনিক আহমদ রফিক―গ্রন্থ আলোচনা
আহমদ রফিক (১৯২৯) কৈশোর থেকেই হয়ে ওঠেন সমাজ ও রাজনীতি সচেতন। এসূত্রে ছাত্রজীবনে যুক্ত হন প্রগতিশীল, সমাজরূপান্তরের রাজনীতির সঙ্গে। রাজনীতির সূত্র ধরে অংশগ্রহণ করেছেন ভাষা আন্দোলনে। সেই থেকে তিনি ভাষাসৈনিক হিসেবে পরিচিত। এরপর সংগঠন, শিল্পচর্চা, পত্রিকা সম্পাদনা ও প্রকাশনা, শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপন সবই করেছেন তাঁর স্বপ্নজারিত সাধনা―মানবকল্যাণে। এছাড়া প্রতিষ্ঠা করেছেন রবীন্দ্রচর্চা কেন্দ্র। আজীবন রবীন্দ্রসাধনায় মগ্ন রয়েছেন। জীবনের পর্বে পর্বে তাঁর বহুমাত্রিক পরিচিতি। এক পর্যায়ে তিনি পরিচিত হলেন কলাম লেখক হিসেবে। জনসমাজে পরিচিত হন লেখক হিসেবে। সবকিছু ছাপিয়ে রবীন্দ্রগবেষক হিসেবে তাঁর নাম উচ্চারণ করেন অনেকে। এ ছাড়া বাঙালি, বাঙালি সংস্কৃতি, ভাষা, ভাষা আন্দোলন, সংস্কৃতি, দেশভাগ প্রভৃতি গবেষণা ও আলোচনার ক্ষেত্র ধরে প্রচুর লিখেছেন। সাহিত্যচর্চার জন্য আহমদ রফিক পেয়েছেন বাংলা একাডেমি, একুশে পদক ও অলক্ত পুরস্কার। এছাড়া অর্জন করেছেন আরও কয়েকটি সম্মাননা।
বস্তুত মানবতার পক্ষে ও সাম্প্রদায়িকতার বিপক্ষে তাঁর অবস্থান খুব স্পষ্ট। এ পরিসরে উপমহাদেশের অতি ট্র্যাজিক ঘটনার প্রতি তাঁর নিজস্ব মনোভঙ্গি কেমন, তা দেখা। উল্লেখযোগ্য যে, লেখার মধ্যে প্রতি লেখকই উপস্থিত থাকেন। সকল সময় কি থাকা যায় ? না, কারণ সময়, পরিবেশের চাপ ও দাপট লেখক অনুভব করেন। যে কোনও লেখকের ক্ষেত্রে তা সত্য। অবশেষে কাল ও সমকালীন পরিসরের প্রচণ্ড দাপট ও বলয়ের কাছে তাকে নমনীয় হতে হয়। এটা সব কালে হয়েছে। ব্যতিক্রম যে কিছু নেই, তা বলব না। লেখক ভাষার প্রতিবেদনে ভিন্নভাবে বলার চেষ্টা করেন। কখনও সংকেত, রূপক বা আড়ালের আশ্রয়ে উপস্থাপন করা হয়। যেমন, গাব্রিয়াল গার্সিয়া মার্কেজ, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বা বুদ্ধদেব বসুর কথা বলা যায়। কখনও কখনও ঐতিহাসিক ঘটনা বিশ্লেষণে অধিকাংশ লেখক ঘটনার সত্যাসত্য নিরূপণে নিজের বিশ্বাস, গোষ্ঠী ও শ্রেণির দিকে হেলে যান। মূল ঘটনা জেনেও লেখক এড়িয়ে যান, প্রলেপ লেপন করেন, প্যারাটেক্সট, সাবটেক্সটের অবতারণায় মূল বিষয় আড়াল করেন। এ প্রবণতা শুধু একালের নয়, প্রাচীনকাল থেকেই বহমান।
আহমদ রফিক কী দেখেছেন, কীভাবে দেখেছেন অতীতভ্রমণে, কীভাবে করেছেন ইতিহাসের মূল্যায়ন। সুধীসমাজ, বুদ্ধিজীবী, সাধারণ ব্যক্তিস্তরেও স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের উৎসমুখ কী ১৯৪০ নাকি ১৯৪৭ নাকি ১৯৫২ সাল, কীভাবে পৌঁছানো গেল ১৯৭১ সালে; এমন বিতর্ক চলমান। আবার কেউ কেউ বলেন দেশ ভাগ ও পাকিস্তান রাষ্ট্র না হলে বাংলাদেশ হতো না। যাই হোক না কেন, সবই ঐতিহাসিক বাস্তবতা। আমাদের গর্ব―স্বাধীন বাংলাদেশ গঠন, একটি মহৎ ঘটনা। একই সঙ্গে বাংলা ভাগ সকলকে এখনও কাতর করে। উপর্যুক্ত তর্ক-বিতর্ক এড়িয়ে ১৯৪৭ সালের বিভাজনকৃত হিংসাত্মক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে যে মানবিক ভাঙন হয়েছে, রক্তক্ষরণ ঘটেছে, এর পরিণামের দিকে আহমদ রফিক মনোযোগী হয়েছেন। ফলে তাঁর আলোচনা সাধারণ পাঠককে আকৃষ্ট করে। যে কারণে পাঠকসমাজ মুগ্ধ হন। এ বিষয়ে কিছু লেখা, মন্তব্য করা, তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে কিছু লেখা খানিকটা জটিল, স্পর্শকাতর কি না, তাও ভাবতে হয়। তাঁর পর্যবেক্ষণে মনে হয়েছে, দেশ ভাগ বা নতুন রাষ্ট্র গঠন, তাতে কোনও প্রশ্ন ছিল না। তবে প্রয়োজন ছিল না অকল্পনীয় হিংসা, উদ্বাস্তু হওয়া, নারী নির্যাতনের মতো ঘটনার। তিনি দেশবিভাগ : ফিরে দেখা (২০১৫)-এর প্রারম্ভকথায় বলেছেন, ‘‘দেশভাগ নিয়ে নানামাত্রিক রচনায় আগ্রহের মূল কারণ সম্ভবত এর রক্তক্ষয়ী ‘মানবিক ট্রাজেডি’, কারও মতে ‘ঐতিহাসিক ট্রাজেডি’। এ কথা ঠিক যে বিশ শতকের অনেক তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অনেক তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে রক্তস্নাত ভারতভাগ ও ব্রিটিশ রাজের ভারতত্যাগ তৎকালীন দক্ষিণ এশিয়ায় এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত।’’ [রফিক ২০১৫ : ৯] আমাদের বিবেচনায় দেশভাগ, প্রতিক্রিয়া ও উত্তরকালের সাক্ষী হলেন আহমদ রফিক। ফলে তাঁর পক্ষে দেশভাগ বিষয়ক নানাবিধ ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া পুনর্বিচারে সুবিধা হয়েছে।
উল্লেখযোগ্য ১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্ট আলাদা রাষ্ট্রের দাবিতে ‘ডিরেক্ট অ্যাকশন’ কর্মসূচি ঘোষণা হলো। ঘটল ‘দা গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং’। আহমদ রফিক বলেছেন, এ দাঙ্গার মূল লক্ষ ছিল মানুষ হত্যা করা। পরিকল্পিত হত্যা কর্মসূচি। দু পক্ষ উন্মাদের মতো পরস্পরকে খুন করেছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, কলকাতা, নোয়াখালীসহ বিভিন্ন এলাকার হত্যালীলা উপমহাদেশে স্থায়ী ক্ষত তৈরি করেছে। ফলত আহমদ রফিকের উপস্থাপন ভাষাকেন্দ্রিক বিরোধাভাস থেকে অনেক দূরে। অথচ তিনি বাস্তবতার বাইরে গিয়ে আরোপিত কোনও মন্তব্য করেননি বা কোনও অভিমত চাপিয়ে দেননি। সম্প্রতি অনেক গবেষক মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে পার্টিশন বা দেশভাগের ইতিহাস ও সাহিত্য রচনায় নিয়োজিত আছেন। তবে দুর্ভাগ্য হলো অনেক তথ্যই এর মধ্যে ধ্বংস, নষ্ট হয়ে গেছে, আবার যাপনাক্রান্ত ব্যক্তিরা বেঁচে নেই বা জীবনের স্বাভাবিকত্বে সচল নেই। ফলে তথ্যসংগ্রহ এ মুহূর্তে অনেক কষ্টসাধ্য ও জটিল হয়ে উঠেছে। এ সময়ে আঞ্চলিক রাজনীতি, ভূরাজনীতি, ক্ষুদ্রস্বার্থ, সাম্প্রদায়িক পক্ষপাত, সম্পদের প্রতি লোভ-লালসার চাপে বিভ্রান্তিকর তথ্য উপস্থাপনও রয়েছে। একজন গবেষকের পক্ষে অনেক তলানি থেকে বস্তগত সত্য উপস্থাপন বেশ জটিল। লক্ষণীয় আহমদ রফিক দ্বৈতীয়িক উৎসে আশ্রয়ী হলেও তাঁর বিবরণ বিভ্রান্ত করে না পাঠককে। এখানেই তাঁর সাফল্য। মাঠ পর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ করা অনেক গবেষকই রয়েছেন, যাঁরা নানা চ্যালেঞ্জের কথা বলেছেন। এমন নিবিষ্ট একজন উর্বশী বুটালিয়া। উল্লেখিত বিষয়ে উর্বশী খুবই সচেতন ছিলেন :
‘When I wrote this book twenty years ago, like many others in India, I was deeply concerned at what we saw as the rise of religion-based identity politics and the ways in which it was playing on imagined fears. Today, that seems almost moment seems almost as if it was a setting of the stage for a politics of upper caste, majotarian domination.’ [Butalia 2017: xii]
এ বিষয়ে সাম্প্রতিক গবেষকগণ একমত বলা যায়। লক্ষণীয় গবেষকরা ঐতিহাসিক সমস্যার সঙ্গে রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিষয়াবলিকে সমচিন্তায় গুরুত্ব দিয়েছেন। একই সঙ্গে মানববিচ্যুতির ঘটনা ও কারণগুলো বিবেচনা করা হচ্ছে। বুটালিয়ার গবেষণা পাঞ্জাবকেন্দ্রিক হলেও পূর্ব ও পশ্চিমকে অন্তর্ভুক্ত করেছেন তিনি। তাঁর কথা স্মরণীয় :
The political partition of India caused one of the great human convulsions of history. Never before or since have so many people exchanged their homes and countries so qickly. … Estimates of the dead vary from 200,000… around a million people died is now widely accepted. As always there was widespread seual savagery: about 75000 women are thought to have been abducted and raped by men of religious different from their own and indeed sometimes by men of their own religion.[Butalia 2017: 3]
বুটালিয়ার গবেষণা অত্যন্ত প্রভাবসঞ্চারী। কারণ এটি একটি মডেল হতে পারে। তিনি তত্ত্বগত আলোচনার সঙ্গে মুখনিসৃত তথ্য সংগ্রহ করেছেন। যেসব সাক্ষাৎকার ও তথ্য দেশভাগের মানবিক বিপর্যয় প্রমাণে যথেষ্ট। যে কারণে তাঁর উপলব্ধি হলো, রাজনৈতিক বিভাজনের সঙ্গে হৃদয় ভেঙেছে, ট্রমা ও ট্র্যাজেডির জন্ম দিয়েছে। যে ট্রমা থেকে উদ্ভূত সমস্যা এখনও নিঃশেষ হয়নি। দেশভাগ-এর হিংসাত্মক, ট্র্যাজিক বিভক্তি নিয়ে লেখালেখি, কথা, আলোচনা, গবেষণা চলমান। রক্তক্ষরণের প্রবাহ বন্ধ করা কঠিন। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এ দেশের মানুষ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এ ট্র্যাজিক ঘটনার বলি হয়েছে। আহমদ রফিক স্বীয় মেধা, প্রজ্ঞায় দেশবিভাগের দহন ও পূর্বাপর ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা উপস্থাপন করেছেন। দেশভাগ, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে তাঁর নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি আমরা লক্ষ করি ভ্রমণ ও পর্যবেক্ষণে। তিনি অন্যদের মতো ঐতিহাসিক বিবরণ উল্লেখ করেছেন বটে। একই সঙ্গে তুলে ধরছেন ওই সময়ের মনোভঙ্গি ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং পার্থক্যসমূহ। যা এই উপমহাদেশের মানুষের মধ্যে হিংসার জন্ম দিয়েছে। উপমহাদেশের রাজনীতি, মানুষের মনোগঠন ও বৈশিষ্ট্যের কারণে বিভিন্নমুখী প্রবণতা তৈরি হয়েছে। ঐক্যের উদাহরণ আছে, তবে তা টেকসই হয়নি। আবার বিষমভাবের লেন্স তৈরি হয়েছে। আমরা যুক্তিগতভাবে বিভিন্ন লেন্সের মাধ্যমে মূল্যায়নকে স্বাগত জানাই। এমন বিষম আকৃতি-প্রকৃতির লেন্সের মাধ্যমে দেশ বিভাগ বা ভাঙ্গাগড়া বিবেচনা করা হয়েছে। এর অধিকাংশই মানুষকে বিভ্রান্ত করেছে। পরিণামে সাধারণ মানুষের চাওয়া পাওয়া আড়াল হয়েছে বটে, কোনও লক্ষ্যই বাস্তবায়িত হয়নি। বিষম প্রকৃতির লেন্স থেকে এ অঞ্চলে মাত্রাহীন হিংসা ও বিভাজন-বিবাদের সৃষ্টি হলো, তা অপনোদন করা যায়নি। এ বাস্তবতায় আহমদ রফিক তাঁর স্বচ্ছ দৃষ্টিকোণ থেকে দেশভাগের কারণ, ফল, পরিণাম বিবেচনা ও বিশ্লেষণ করেছেন। গবেষক ইয়াসমিন খানের কথাও রফিকের দৃষ্টিভঙ্গির কাছাকাছি :
‘Partition had a widespread psychological impact which may never be fully recognized or traced. This afflicted not only refugees but also eyewitness, perpetrators of violence, aid workers, politicians and policemen; … More invasive mental health problems may have plagued some people for the rest of their lives. …Others experienced culturally specific shame and and humiliation related to violations religious or community rights that inverted the normal social order.’ [Khan 2017: 187]
২.
আহমদ রফিক দেশভাগ ভ্রমণে কী কী বিষয়ে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখেছেন, এবং তাঁর পর্যবেক্ষণোত্তর সিদ্ধান্ত কী; এসব আমাদের বিবেচ্য। ওইসব বিষয় দেখতে পারলে আহমদ রফিকের ফিরে দেখার নিরীক্ষা, মূল্যায়ন স্পষ্ট হতে পারে। বলতে পারব, তাঁর দেখাটা অন্যদের থেকে আলাদা হয়েছে। লক্ষণীয় মোটা দাগে তিনি কিছু প্রশ্নের উত্তর খোঁজ করেছেন। যেমন : ভাঙ্গনের পরিকল্পনা কী আগে থেকেই ছিল; দেশভাগের ধারণা কীভাবে বিকশিত হলো; কেন আলদা পাকিস্তান বানাতে হলো; বাংলা কেন ভাগ হলো; রাজনৈতিক দল, সম্প্রদায় ও গোষ্ঠীর ভূমিকা; উপনিবেশের লক্ষ্য― সাম্প্রদায়িকতা নাকি নতুন রাষ্ট্র তৈরি; উপনিবেশ কী আসলেই নন্দঘোষ; এ ট্র্যাজেডি কি রোধ করা যেত না ইত্যাদি।
বিস্তৃত আলোচনার আগে স্মরণ রাখতে হয়, দেশ ভাগাভাগি ও সংশ্লিষ্ট বিষয়াদি নিয়ে এখন বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে লেখালেখি হচ্ছে। চলচ্চিত্র, ডকুমেন্টারি তৈরি হচ্ছে। এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে যেসব গবেষণা হয়েছে, তা নিছক কম নয়। অনেক গবেষণাকর্ম বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। কিন্তু এর বিপরীতে দেশবিভাগের আগের মিথ্যে বয়ানসমূহ, বিভ্রান্তিকর রাজনৈতিক বক্তব্য, নেতৃবৃন্দ, বুদ্ধিজীবী, একাডেমিশিয়ানদের পক্ষপাতদুষ্ট আলোচনা, যুক্তিহীন পোপাগান্ডা ইত্যাদি কারণে বিভাজিত হিংসা বিস্তৃত হয়েছে। মানুষের মনোজগতে হিংসা, ক্রোধের স্থায়ী জায়গা তৈরি হয়েছে। সেই বিষাক্ত প্রতিক্রিয়া এখনও নানাভাবে ক্রিয়াশীল।
একই সঙ্গে জনভাষ্য সংগ্রহ ও ডকুমেন্টেশন করা হচ্ছে; যা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এতে অনেক মনগড়া কথাবার্তা, ইতিহাসের রূপকথা তলিয়ে যাচ্ছে। ফলে, সত্যমিথ্যার মাখামাখির পাশাপাশি আসল তথ্য উদ্ধারের প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে। কিন্তু যাই হোক না কেন ওই অমানবিক, অধরা ইঙ্গিত ও দহনের ভাষারূপ কেউ দিতে পারবেন বলে মনে হয় না। যে হাহাকার দৃশ্যমান বা অন্তস্রোতে প্রজন্মান্তরে প্রবহমান, সেসবের উত্তর দেওয়া সম্ভব নয়। কেবলই উপলব্ধি ও অনুভব করা যেতে পারে। প্রথাগত রাজনীতি, সংস্কৃতি, প্রচলিত ধর্মকেন্দ্রিক বিবেচনার ব্যর্থতার পরিণামই দেশভাগের ইতিহাস। অবশ্যই একটা সারাংশে পৌঁছে বলা যায় রাজনৈতিক দল, নেতৃত্ব, দলীয় কর্মসূচি ও ব্রিটিশ শাসনের দায় রয়েছে। কিন্তু কিছু উচ্চাভিলাষী ব্যক্তির স্বার্থকেন্দ্রিক তৎপরতার কী হবে। গুটিকতক ব্যক্তির ইচ্ছা বাস্তবায়নে এদেশে কত পরিবারের বিপর্যয় নেমে এল, কত মানুষের মৃত্যু আর অপমান দেখতে হলো। এর মূলে কী ছিল―আবদুর রাজ্জাকের কথা লক্ষণীয় :
“In the context of India, it really meant that by the beginning of the 20th century, two movements drawing their ideals from two sources were simultaneously functioning. When Mr. Gandhi wanted to enthuse his audience with a picture of the future he envisaged for India, he naturally talked of a RamRajya. When the Muslim leader aims to do the same,… the all India Muslim league defining its object in 1913 demanded ‘self-government of a kind suitable for India’ rather than a system of government similar to that enjoyed by the self-governing members of the British empire…” [Razaq 2022: 136]
উপনিবেশ ও এ-শাসনাশ্রিত শিক্ষার মাধ্যমে এ ভারতবর্ষে দোদুল্যমান মধ্যবিত্ত শ্রেণির প্রতিষ্ঠা ও বিকাশ। ফলত মধ্যবিত্তের মানসিকতায় সামন্তবাদ, সাম্প্রদায়িকতা, ক্ষুদ্রত্ব থাকাই স্বাভাবিক। তা শুধু রাজনীতি নয়, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও প্রচার মাধ্যমকেও প্রভাবিত করে। এর পরিণামে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি, কলকাতা ও নোয়াখালীসহ বিভিন্ন এলাকায় সংঘটিত দাঙ্গা বিষয়ে সেকালের সংবাদপত্র ইতিবাচক দায়িত্ব পালন করেনি। বিবিধ সীমাবদ্ধতার মধ্যে আলোচনায় নির্মোহ থাকা অত্যন্ত কঠিন। এক্ষেত্রে আহমদ রফিকও নিজের অবস্থান নিয়ে শঙ্কায় ছিলেন। কারণ তাঁর পর্যবেক্ষণে বলেছেন :
‘সাম্প্রদায়িক বিরূপতার বিচ্ছিন্ন ঘটনা নিমেষে সামাজিক-রাজনৈতিক সহিংসতায় পরিণত হয়ে যায়। দেশভাগের বাস্তব পরিণাম হিন্দু জাতীয়তাবাদ ও মুসলিম জাতীয়তাবাদ যেখানে হিন্দু-আইডেনটিটি, মুসলিম আইডেনটিটি প্রধান হয়ে ওঠে… তাই এক্ষেত্রে চেষ্টা করেছি ঘটনার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে নির্মোহ ও নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রাখার। অর্থাৎ, না-মুসলমান, না-হিন্দু, না-বাঙ্গালি, না-অবাঙ্গালি এমন নিরপেক্ষরৈখিক অবস্থান নিশ্চিত রাখা’। [রফিক ২০১৫: ১৬]
বিভাজনের ইতিহাস বিশ্লেষণ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে ৪৬টি বই এবং রবীন্দ্ররচনাবলি উল্লেখ করেছেন। কিন্তু তিনি প্রাতিষ্ঠানিক কোনও গবেষণার মতো লিখেননি। সব লেখার তত্ত্ব, সারাংশ আত্মস্থ করে নিজের মতো উপস্থাপন করেছেন। দেশ বিভাগ : ফিরে দেখা বইটি ৫৪টি অধ্যায়ে গ্রন্থিত। শেষে দুটো অধ্যায়ে রেখেছেন একুশ শতকের বিবেচনা। রেফারেন্স দিয়ে তাঁর বক্তব্যকে ভারী করেননি। ফলে পাঠ করতে গেলে কোথাও আটকাতে হয় না।
আহমদ রফিক প্রশ্ন তুলেছেন, বাঙালিরা কেন আলাদা দেশের দাবিতে পশ্চিমের সঙ্গে যুক্ত হলো। একই সঙ্গে তিনি দেখালেন কীভাবে এদেশে ধর্ম দিয়ে মানুষকে ক্ষ্যাপাটে করা যায়। যেখানে রাজনৈতিক-দ্বন্দ্ব ব্যবহারে এদেশের মানুষকে টেনে নেওয়া হলো সাম্প্রদায়িক সংঘাতের পথে। তিনি বলেছেন, মূলে ছিল আর্থ-সামাজিক বৈষম্য। এ বৈষম্য চিরকালের, যদিও আমরা তা খালি চোখে দেখি না। এর সঙ্গে ক্ষমতা, শাসনের দুঃখবোধ ছিল বটে। সাধারণ মানুষ শুধু না বুঝে আলাদা রাষ্ট্র, দেশের জন্য আন্দোলন করতে গেল ? কোথাও না কোথাও আগেই এ বিভাজন তৈরি হয়ে গিয়েছে, তা আমরা বুঝিনি। না হয় হঠাৎ করেই একজন আরেকজন থেকে আলাদা হতে পারে না বা একে অপরকে মারতে পারে না। লাখ লাখ মানুষের মৃত্যু, হিংসাত্মক ঘটনাবলি সমস্ত আন্তরিকতার ইতিহাস, মায়া, বন্ধনকে কলুষিত করেছে। আবার ব্রিটিশ উপনিবেশ বিরোধী সংগ্রাম-বিপ্লবের গৌরব ও ইতিহাসকে মøান করে দিয়ে অবেশেষ হয়ে গেল―কে হিন্দু, কে মুসলমান। আহমদ রফিক দেখেছেন, মূলত এ বিবাদ, হিংসার বীজ অনেক আগেই রোপিত, ব্রিটিশ উপনিবেশ শুধু গরম তাওয়ায় রান্না করেছে। এ কথা মানতে অনেকেরই কষ্ট হয়। লক্ষণীয় বিশ-ত্রিশ দশক থেকে চল্লিশে রাজনৈতিক-সামাজিক রূপান্তর ঘটল এ অঞ্চলে, তাতে গৌরবের অনেক কিছু ম্লান হয়ে গেল। বলা যায় রাজনৈতিক নেতৃত্বের পেছনে সরে আসা, ব্যক্তি ও গোষ্ঠীস্বার্থে কালিমাবরণ সাধারণ মানুষকে বিপদে ফেলে দেয়। উপমহাদেশের বিভাজনে অনেক কারণের মধ্যে সাম্প্রদায়িক বিভক্তিকে একটি কারণ হিসেবে তিনি শনাক্ত করেছেন :
‘আদর্শবাদিতার চেয়ে ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্যবাদী চেতনা শক্তিমান হয়ে ওঠে চল্লিশের দশকের কয়েক বছরের মধ্যেই। এর প্রধান কারণ যেমন ভারতীয় রাজনীতির কিছু অনাকাক্সিক্ষত বৈশিষ্ট্য, এর ধর্মবাদী প্রবণতা তেমনি এর ছোট-বড় নেতাদের ক্ষমতার দড়ি নিয়ে টানাটানি। তবে মূল টানাটানিটা ছিল লীগ-কংগ্রেসে’। [রফিক ২০১৫ : ২৬]
১৯০৫-১৯৪৭ কালপর্ব অনেক ঘটনায় ঠাসা। এর মধ্যে গান্ধি ও জাতীয় কংগ্রেসের নেতৃত্বে সংঘটিত হয় স্বাধীনতার আন্দোলন। এ কালপর্বে মুসলিম লিগের প্রতিষ্ঠা, দল-মতের বিভাজন, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা―যত সব নেতিবাচক ঘটনার বিবরণ আমরা পেয়ে থাকি। ফলে এ সময়পর্বের অনেক বিষয় এখনও গবেষণার লক্ষ্য। তখন পুরো উপমহাদেশের জনগণের নেতৃত্বে ছিলেন মূলত তিনজন―মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধি, মোহাম্মদ আলি জিন্নাহ ও সুভাষচন্দ্র বসু। তিনজনই ছিলেন মেধাবী, প্রজ্ঞাবান ও জনসমাজে প্রভাবসঞ্চারী। আরও অনেক ব্যক্তিসহ এ তিনজনের নাম ইতিহাসের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য। ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে মুক্তি, ইতিহাসের প্রসঙ্গ এলেই এ নামগুলো অবশ্যই এসে যায়। এ তিনজনের নামের সঙ্গে জনগণ-উচ্চারিত অভিধাও সংযুক্ত। মহাত্মা গান্ধি, কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলি জিন্নাহ, নেতাজি সুভাষ বসু। অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে গান্ধি, জিন্নাহ, সুভাষ বসু তিনজনই খুব আধুনিক, জ্ঞানী, অসাম্প্রদায়িক। তাঁরা উপমহাদেশের স্বাধীনতা চেয়েছেন, তবে তারা সাম্যবাদ চাননি। অথচ ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে মুক্তির জন্য সাধারণ মানুষ তাঁদের নির্দেশনায় আন্দোলনে সামিল ছিল।
মূলত শ্রেণিশোষণ থেকে মুক্তির জন্যই আলাদা প্রদেশ দাবি করেছেন অনেকে, দেশ ভাঙ্গনের জন্য নয়। সবকিছুকে ছাপিয়ে সাম্প্রদায়িকতায় রক্তাক্ত হলো উপমহাদেশ আর পরিণতি হলো দেশ ভাগ। এ সাম্প্রদায়িকতার বিপক্ষে গান্ধি লড়াই করেছেন। এ সাম্প্রদায়িকতার হত্যার শিকার হলেন গান্ধি নিজে। ভাবতে হয়, সকলেই স্বাধীনতা চায়, তবে কেন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ? আবার ১৯৪২ সালে গান্ধির নেতৃত্বে ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনে সকলে অংশগ্রহণ করেনি। এমনকি ১৯২০-২১ সালে অসহযোগ-খিলাফত আন্দোলনে জিন্নাহ যুক্ত ছিলেন না। ‘দ্বিতীয়বারও তিন বছর লন্ডনে কাটিয়ে ১৯৩৪-এ যখন তিনি দেশে ফিরলেন তখন দেখা গেল আদর্শের বাছবিচারের ব্যাপার নয়, আদর্শগতভাবেই বদলে গেছেন। ভারতীয় জাতীয়তাবাদ ত্যাগ করে তিনি মুসলিমদের স্বতন্ত্র বাসভূমির দাবি তুলেছেন, এবং দ্বিজাতিতত্ত্বে বিশ্বাসী হয়ে পড়েছেন। এ যেন তাঁর দ্বিতীয় জন্ম, গান্ধি এঁর সম্বন্ধেই বলেছিলেন যে, এই নতুন জিন্নাহকে তাঁর চিনতে অসুবিধা হচ্ছে’। [ চৌধুরী ২০২৪ : ৯১]
উপমহাদেশের রাজনীতির ট্র্যাজেডি হলেন সুভাষ বসু ও শের এ বাংলা এ কে ফজলুল হক। দুজনই ছিলেন সর্বভারতীয় গ্রহণযোগ্য নেতা ও বাঙালির প্রতিনিধি। এর ফলে তাঁদের স্থান হলো না রাজনীতিতে। কেউ তাঁদের সেভাবে গ্রহণ করেনি। অনিবার্য হয়ে ওঠে বাংলা ভাগ, দেশ ভাগ। আহমদ রফিকের মূল্যায়নও তাই। ‘গান্ধী-সুভাষ রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের পর হক-জিন্না দ্বন্দ্বের সূচনা। উভয়েরই ক্ষেত্রেই বিষয়টি রাজনৈতিক ও সংগঠনগত ক্ষমতার দ্বন্দ্ব। গান্ধি চাননি কংগ্রেসে সুভাষের আধিপত্য। একইভাবে জিন্না চাননি মুসলিম লীগে ফজলুল হকের প্রভাব বাড়ুক। … জিন্না ইতিমধ্যে সর্বভারতীয় মুললিম লীগের কেন্দ্রে ও প্রদেশে নিজের অবস্থান এতটা সুসংহত করেছিলেন যে তার একনায়কসুলভ আচরণ মেনে নেয়াটাই লীগ সংগঠনে নিয়মে পরিণত হয়েছিল’। [রফিক ২০১৫ : ৮৩]
এর মধ্যে হিন্দু মহাসভা, ফরোয়ার্ড ব্লক, প্রজাপার্টির মধ্যে কোয়ালিশন হয়েছে ১৯৪১ সালে। কংগ্রেস এতে এগিয়ে আসেনি। সকলেই বিরোধিতা করেন এ কে ফজলুল হকের। ফজলুল হককে বিশ্বাসঘাতক, মুসলিম স্বার্থবিরোধী বলে অপবাদ দিলেন জিন্নাহ। অপবাদে তাঁকে মুসলিম লিগ থেকে বহিষ্কার করা হয়। এর মাঝে হক আর পাঞ্জাব নেতা সিকান্দার হায়াত খানের মধ্যেও বোঝাপড়া হয়। হক সাহেবের প্রতি বিদ্বেষ দেখালেও জিন্নাহ কাছে টেনে নেন সিকান্দার হায়াত খানকে। যে সিকান্দার হায়াত খান প্রদেশসমূহের স্বায়ত্তশাসন দাবি করেছেন। এ জন্য ফজলুল হকের সঙ্গে অনেকক্ষেত্রে তাঁর মিল ছিল। ‘পাকিস্তান-ভাবনার মর্মবস্তু হলো প্রদেশগুলোর পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন ও সীমিত শক্তির কেন্দ্র।… সিকান্দার হায়াতের পূর্ণাঙ্গ প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের চিন্তা উচ্চারিত হয় আড়াই দশক পর আরেক জাতীয়তাবাদী বাঙ্গালির কণ্ঠে’। [রফিক ২০১৫ : ৯১]
সকলেই বলে, প্রতিষ্ঠিত জনশ্রুতিও তাই। প্রচলিত প্রবাদতুল্য কথা হলো, ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ পলিসির মাধ্যমে ব্রিটিশ শাসকরা ভারত উপমহাদেশ ভাগ করে দিয়েছে। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার জন্য ব্রিটিশরা দায়ী, এদেশে কোনও সাম্প্রদায়িকতা ছিল না, ইত্যাদি প্রচার করা হয়ে থাকে। শুধু তাই নয়, একাডেমিক ডকুমেন্টেশনের অপবাক্য রয়েছে প্রচুর। ফলে ওই একাডেমিক পরিসরে দাঁড়িয়ে কেউ কোনও প্রশ্ন করে না। আমাদের সাম্প্রদায়িক বিষাক্ত দাঁতগুলো লুকিয়ে রাখার জন্য অপরের ওপর দোষ চাপানোর এসব তত্ত্ব এ বিশ্বে বহুল প্রচলিত। এ বিষয়ে আহমদ রফিক কৌশলে মৃদুভাষায় প্রশ্ন রেখেছেন বলে মনে করি। বাস্তবতার কারণে উপনিবেশ ছিল ভূমিকায়, কিন্তু ভাঙ্গনের জন্য আমরাই আসল কুশলীব।
এক সময় ক্ষমতার উত্তরাধিকার, শাসন-সম্পদ দখলের টানাপোড়েন, কংগ্রেস ও মুসলিম লিগের মধ্যে ব্যাপক পার্থক্য দেখা দেয়। এ রাজনৈতিক বিরোধ উপমহাদেশের রাজনীতিকে ভিন্ন পথে ঠেলে দেয়। এক সময় কংগ্রেসের প্রতি আস্থা হারায় ব্রিটিশ রাজ। এ অবিশ্বাস থেকে মুসলিম লিগ প্রতিষ্ঠা। গড়ে ওঠে রাজনীতির প্রতিপক্ষ। ফলে এখানে বিরোধ তৈরি হয় নানামুখী। রাজনীতির নানা মেরুকরণ হতেই পারে, তবে হিংসা কেন। আহমদ রফিকের পর্যবেক্ষণ, ‘যুক্তিসঙ্গতভাবেই এ কথা মানতে হয় যে ভারতীয় মুসলিম লীগ কখনওই জোরালোভাবে সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী, বিশেষভাবে ‘ব্রিটিশ রাজ’ বিরোধী নীতি প্রকাশ্যে গ্রহণ করেনি। দেশের স্বাধীনতার দাবির বদলে মুসলমান অধিকার নিয়েই লীগ এবং জিন্না বরাবর সোচ্চার। কারণ জিন্নার ধারণা ছিল, স্বাধীন ভারতে কংগ্রেসের একাট্টা শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে এবং সেটা হিন্দুশাসনের নামান্তর’। [রফিক ২০১৫: ৬২]
৩.
দেশভাগের সময় বা আগে পরে, একই কারণে হিংসার প্রকাশ দেখেছি এ উপমহাদেশে। দেশভাগে ক্ষতিগ্রস্ত অসংখ্য মানুষ, যারা শুধুই উৎপাদক, শ্রমী, সভ্যতার নির্মাতা, তাদের নাম ইতিহাসে নেই। যাদের রক্ত অনেকের বক্তব্য, বিবৃতির উপকরণ হয়েছে, এ রক্ত রাজনীতির খেলাতে উৎসাহ জুগিয়েছে। এর বেশি কিছু নয়। যাদের রক্তে অনেকের ভাগ্য পরিবর্তন হয়েছে। আবার ‘ভারতীয় রাজনৈতিক নিয়তির কী পরিহাস যে, টানাপড়েন শুধু বাংলা-পাঞ্জাবই বিভক্ত হলো, তাও ভ্রাতৃঘাতী রক্তস্রোতে। অথচ ওই বিভাগ কাম্য ছিল না বঙ্গ ও পাঞ্জাবের দুই গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক নেতা ও মুখ্যমন্ত্রী ফজলুল হক ও সিকান্দার হায়াত খানের’। [রফিক ২০১৫ : ৯০]
আহমদ রফিক পর্যবেক্ষণ করেছেন, বিদ্যমান পরিস্থিতি হক-সিকান্দার হায়াত খানের সেক্যুলার জাতীয়তাবাদ জিন্নাহ বা তার সমর্থনের কাছে স্থান পায়নি। ফলে যা হওয়ার তাই হলো। কারণ ফজলুল হকের লক্ষ ছিল অসাম্প্রদায়িকতা। তিনি একটি মঞ্চ চেয়েছেন অসাম্প্রদায়িকতার। ফলে ফজলুল হককে বিচ্ছিন্ন হতেই হলো। ভারত পাকিস্তান এক থাকলে কী ক্ষতি হতো বা কী লাভ হতো এটা অবশ্যই বিবেচনার দাবি রাখে। কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতায় ঐক্য আর রইল না। বহুভাগ হয়েছে। ভাগের ফল হলো নির্মমতা। ‘ভারতবিভাগ ও ক্ষমতা হস্তান্তর পর্বের আগে একই সময়ে ও অব্যবহিত পরে মানবতাবিরোধী গণহত্যা, ধ্বংসযজ্ঞ ও নারী নির্যাতনের যে বীভৎস ইতিহাস রচিত হয়েছিল, বিশেষ করে ১৯৪৬-৪৭-এ তার তুলনা বিরল। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, ভারতীয় রাজনীতিকদের পাশাপাশি শাসক ব্রিটিশরাজও এর জন্য দায়ী। ভাঙ্গনের শেষ পর্বে এর ভয়াবহতা সর্বোচ্চ মাত্রায় পৌঁছে, বিশেষ করে পাঞ্জাবে, সীমান্তে এবং বিহারসহ ভারতের একাধিক প্রদেশে, শহরে-নগরে কখনও গ্রামাঞ্চলে’। [রফিক ২০১৫ : ৩৫৬]
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তিনি উল্লেখ করেছেন, ‘লাহোর প্রস্তাব’―‘পাকিস্তান প্রস্তাব’-এ রূপান্তর কীভাবে হলো। মূলত পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রস্তাব জিন্নাহ করেননি। এ পাকিস্তান নাম প্রস্তাব করেছে কংগ্রেস ও হিন্দু প্রচার মাধ্যম। হিন্দু মহাসভার বিরোধাভাস নীতি মুসলিম সম্প্রদায়কে লিগের দিকে ঠেলে দেয়। পাকিস্তানের লাহোর প্রস্তাব আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। তা হলে এ প্রস্তাবের জন্য প্রস্তুতি নিতে হয়েছে। এ প্রস্তুতিপর্বের সঙ্গে নিশ্চিত ভাগাভাগির উসকানি আগে থেকেই ছিল। ফলে ভূমি বিভাজনের আগেই মানুষের মানোজগতে বিভাজনের প্রক্রিয়া প্রবল হয়েছে বলেই ধারণা করা যায়। উপমহাদেশে বিভাজনের রাজনীতি থেকে দেশ ভাগ হওয়ার কিছু কারণ শনাক্ত করেছেন আহমদ রফিক। তাঁর বিস্তৃত বিশ্লেষণ থেকে আমরা কয়েকটি উল্লেখ করতে পারি। ব্রিটিশ উপনিবেশের ভাগ করো নীতি, নেতৃত্বের দুর্বলতা, সম্পদ দখলের উসকানি ইত্যাদি। একই সঙ্গে জনমানসে দীর্ঘদিনের লালিত বিভাজনচর্চা এসবের ফল হলো দেশ বিভাজন। যা মানুষের মনোজগতে হিংসার জন্ম দেয়। তিনি বলেছেন, এ বঙ্গীয় অঞ্চলে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্প্রীতি সাধনের সুযোগ নষ্ট হয় বারবার। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য― দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ ও তাঁর দল এবং প্রণীত ‘বেঙ্গল প্যাক্ট’ (১৯২৩) অস্বীকার। ১৯৩৫ সালের সাম্প্রদায়িক রোয়েদাদ-এর আলোকে ১৯৩৭ সালের নির্বাচন হিংসা ও হানাহানির ক্ষেত্রে উত্তাপ ছড়িয়েছে। ১৯৪২ সালের ২৩ মার্চ ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিলের প্রতিনিধি স্ট্যাফোর্ড ক্রিপসের একটা উদ্যোগ ছিল সাম্প্রদায়িকতা সমাধানের। ধারণাগত সমস্যা ও ভুল বোঝার ফলে তা আর কাজে আসেনি। শাসকদের এ উদ্যোগে কংগ্রেস প্রত্যাখান করে। এ থেকে কংগ্রেস-ব্রিটিশ সম্পর্কের অবনতিতে ত্বরান্বিত হয় ভারত ছাড়ো আন্দোলন। ক্রিপস মিশন ব্যর্থতার জন্য কংগ্রেস ও ব্রিটিশ পরস্পর দোষারোপ করেছে। তবে কোনও ফল আসেনি। ফলে রুদ্ধ হয়ে যায় অবিভক্ত স্বাধীন ভারতের সুযোগ। [শাহ, বাংলাপিডিয়া]
আহমদ রফিক স্পষ্ট উল্লেখ করেছেন, জিন্নাহ যদি আন্তরিকভাবে আলাদা রাষ্ট্র না চাইতেন, তা হলে এত চরমপন্থায় পাকিস্তান চাইতেন না। ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাব ও দ্বিজাতিতত্ত্বের আলোকে তাঁর কথা, আলোচনার মূল টার্গেট ছিল যুক্তপ্রদেশ। এ বিষয়ে কংগ্রেস ছিল উদাসীন; একই সঙ্গে কংগ্রেস ও নেহরু কোয়ালিশন সরকার গঠনে অস্বীকৃতি জানান। এর প্রতিক্রিয়ায় জিন্নাহ এক বক্তব্যে জানিয়ে দেন হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে সহাবস্থান অসম্ভব। এক্ষেত্রে হডসনের কথা হলো ‘কংগ্রেসের দাবি স্বাধীনতা আর জিন্নার দাবি পাকিস্তান’ এবং ‘লীগ ও কংগ্রেসের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ ভিন্ন। পাকিস্তান ও অখণ্ড ভারতের ধারণা পরস্পরবিরোধী’। এ বিষয়ে কংগ্রেস সভাপতি মাওলানা আবুল কালাম আজাদের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল ভিন্ন। তিনি বারবার পরস্পর শ্রদ্ধার একটি দেশ ও সমাজ কামনা করেছেন। ‘লীগ-কংগ্রেস রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব কেউ কেউ দেখতে চেয়েছেন সাম্প্রদায়িক দ্বন্দ্বের পরিবর্তে সংখ্যাগুরু বনাম সংখ্যালঘু স্বার্থের দ্বন্দ্ব হিসেবে। বিষয়টা যেভাবেই দেখা যাক না কেন শেষ পর্যন্ত সেটা সাম্প্রদায়িক দ্বন্দ্বে দাঁড়িয়ে যায়। অন্তত এটুকু মানতে হয় যে, সংখ্যাগুরু বনাম সংখ্যালঘু স্বার্থের বিষয়টাকেই জিন্না দ্বিজাতিতত্ত্বের মাধ্যমে ধর্মীয় তথা সাম্প্রদায়িকরূপে উপস্থাপন করেন, যা শেষ পর্যন্ত ছিল ধর্মীয় সহিংসতার অশুভ বার্তাবাহক। সে অশুভ বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসার পক্ষে তৎকালীন কংগ্রেস সভাপতি মাওলানা আজাদ গান্ধিকে তাঁর নিজস্ব চিন্তা ও পরিকল্পনার কথা লেখেন’। [রফিক ২০১৫ : ২৯২]
অতঃপর জিন্নাহর দেওয়া ‘পোকায় খাওয়া পাকিস্তান’ জনগণের ক্ষেত্রে ‘গ্যারান্টি’ টিকেনি। তবে খাড়া রইল ‘মাইনোরিটি তত্ত্ব’। যা থেকে এখনও এ অঞ্চলের সাধারণ মানুষ মুক্ত হতে পারেনি। কেন এত সব বৈষম্যের তৈরি হলো, ধর্মীয় সম্প্রদায়ে বিভাজিত হয়ে দুই পক্ষ শত্রুতে পরিণত হলো। এর কারণ অনুসন্ধান করেছেন রফিক। একটি বিষয় অত্যন্ত স্পষ্ট হয়েছে আহমদ রফিকের গবেষণায়। এদেশে মূল বিবাদ শুরু হয় শ্রেণি শোষণের কারণে। শ্রেণিবৈষম্যের বিষয় প্রভাব সৃষ্টি করে মানুষের বিভাজনে। এর পেছনে কার কী উদ্দেশ্য ছিল। ব্রিটিশ উপনিবেশের কী পরিকল্পনা ছিল। একসময় কংগ্রেস নেতা, পরবর্তী পর্যায়ে মুসলিম লিগের মোহাম্মদ আলি জিন্নাহ নিজে সাম্প্রদায়িক ব্যক্তি ছিলেন না। এটা অনেকেই উল্লেখ করেছেন। কিন্তু হঠাৎ করেই ঔপনিবেশিক রাজনীতির খেলায় এক পর্যায়ে তিনি শুধু এক সম্প্রদায়ের নেতা হয়ে গেলেন। এর পেছনে কোনও রহস্য আছে কি না। আহমদ রফিক কীভাবে দেখেছেন বিষয়কে। ‘জিন্না ভারতীয় মুসলমানদের এক জাতি হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে। বলেছিলেন ধর্মবিশ্বাস, খাদ্যাভ্যাস এবং একাধিক বিষয়ে ভারতীয় মুসলমান এক জাতি’। [রফিক ২০১৫ : ২৮] জিন্নাহ আসলে যা বলেছেন যে, বাঙালি মুসলমানের সঙ্গে উত্তরভারত, বিহার, পাঞ্জাব, সিন্ধু, বেলুচিস্তানসহ অন্যান্য এলাকার মুসলমানদের কোনও মিল নেই। এসব স্থানের গোষ্ঠী, দল, আন্তঃসম্প্রদায়ের মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘাত ছিল, এবং তা অংশত চলমান আছে। অভিযোগ ছিল ব্রিটিশ উপনিবেশের আনুকূল্যে হিন্দু সম্প্রদায় প্রচুর সুবিধা ভোগ করেছে। শাসকগোষ্ঠীর সুযোগ-সুবিধায় হিন্দু সম্প্রদায় থেকে এলিট, বণিক ও ভূস্বামীর উদ্ভব ঘটে। যা মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে ছিল সীমিত।
প্রকৃতপক্ষে ব্রিটিশ রাজের বিদায়, উপমহাদেশের স্বাধীনতা, ভাগাভাগি নিয়ে কোনও বিষয়ে মনস্থির করতে পারেননি কংগ্রেস বা গান্ধিসহ সে সময়ের নেতৃত্ব। ওই সময় তারা নিজেদের স্বার্থ, রাজনীতির ফায়দা নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। কংগ্রেসের অনুদার দৃষ্টিভঙ্গির কারণে ফজলুল হক কংগ্রেস বিরোধী হলেন ও মুসলিম লিগে যোগদান করেন। এ ছাড়াও কংগ্রেস বামপন্থার রাজনীতিকে পরিসর দিতে পারেনি। শুরুতে জিন্নাহ দ্বিজাতিতত্ত্বে বিশ্বাসী ছিলেন না, বা সাম্প্রদায়িক ছিলেন না। শুধু রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, জেদ আর ক্ষমতাকাক্সক্ষা তাকে হিংসুটে ও সম্প্রদায় অনুরাগী করে তোলে। আহমদ রফিক বলেছেন, ‘সত্যি বঙ্গে অসাম্প্রদায়িক রাজনীতিতে বিপর্যয়ের কারণ যেমন ফজলুল হকের কিছু ভুল পদক্ষেপ তেমনি কংগ্রেসের রাজনৈতিক অদূরদর্শিতা আর লীগ প্রধান মোহাম্মদ আলী জিন্নার রাজনৈতিক চাতুর্যের কূটকৌশল’। [রফিক ২০১৫ : ৫২] তিনি আরও লক্ষ করেন, জিন্নাহ সর্বভারতীয় প্রতিনিধি হিসেবে কংগ্রেসকে মেনে নিতে পারেননি। আবার জিন্নাহর দৃষ্টিতে ঘৃণিত ব্যক্তি হলেন কংগ্রেস সভাপতি মাওলানা আবুল কালাম আজাদ। ফলে জিন্নাহ ভাবলেন, মুসলমান সমাজের পক্ষে একমাত্র প্রতিনিধি তিনি নিজে। নিশ্চিত বলা যায় যে উপমহাদেশে হানাহানির অন্যতম কারণ দ্বিজাতিতত্ত্ব। আহমদ রফিকের পর্যবেক্ষণের সমর্থনে আরও কিছু মন্তব্য এখন পাওয়া যায়। যা বলেছেন আমিনুল ইসলাম। এ দ্বিজাতিতত্ত্বের ভাগাভাগির জন্য অর্থাৎ, ‘‘ভারতে সাম্প্রদায়িকতা তথা দ্বিজাতিতত্ত্বের উদ্ভবের পিছনে কোনও ব্যক্তিকে এককভাবে দায়ী করা যায় না। আর সেটা ইতিহাসসম্মত নয়। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা-হাঙ্গামার পিছনে থাকে আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয়সহ নানা কারণ। সেই সঙ্গে শাসকশ্রেণির ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ পলিসি’’। [ইসলাম : ১৬৯] দ্বিজাতিতত্ত্বের উৎসের পেছনে যাদের প্ররোচণা ও তত্ত্ব কার্যকর ছিল, এমন কিছু নাম উল্লেখ করেছেন আমিনুল ইসলাম। যেমন, স্যার অরবিন্দ ঘোষ, পিডি সাভারকর ও স্যার সৈয়দ আহমদ খান উল্লেখযোগ্য। এটা অনেকেই ঢেকে রাখার চেষ্টা করেন এই বলে যে, প্রাচ্যে সাম্প্রদায়িকতা ছিল না। ব্রিটিশ উপনিবেশ এ অসুখের জন্মদাতা। এমন কথা প্রচার করলে অনেক সুবিধা আছে। প্রথমত, এ অঞ্চলের সাম্প্রদায়িকতার বাস্তবতা অস্বীকার করা। দ্বিতীয়ত, বক্তা নিজে যে সাম্প্রদায়িক, তা লুকিয়ে রাখা। তৃতীয়ত, এ অঞ্চলে সাম্প্রদায়িকতার শুরু যে অনেক আগে থেকে চলমান, তা আড়াল করা। এত সব আড়াল আর লুকোচুরির কারণেই তো এ উপমহাদেশের সমস্যার সমাধান করা যায়নি। শাসকগোষ্ঠীর চরম অবহেলা, রাজনৈতিক নেতৃত্বের দুর্বলতা, অন্তর্ন্দ্বন্দ্ব, এবং লুটেরাগোষ্ঠী তো রয়েছে; ইত্যাদি কারণে তৈরি হয় দুর্ভিক্ষ। এসব কারণে সাধারণ মানুষের বিক্ষুব্ধতা কোথাও পাত্তা পায়নি। হিন্দু মহাসভার সিদ্ধান্ত, জিন্নাহ ঘোষিত দ্বিজাতিতত্ত্বের প্রচারণা হিংসার জন্ম দিল, সাম্প্রদায়িক হিংসার গতি থামল না। যা দেশভাগের হিংসার সঙ্গেও মিলে না। হিংসা, সংঘাত, সংঘর্ষ ইত্যাদির মধ্যে উপমহাদেশ এক রাখা গেল না। এর সমাধানে আপাতত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করেছেন মাউন্টব্যাটন। বস্তুত দেশভাগ বিবেচনা শুধু ভৌগোলিক রেখা, সীমানা, হিন্দু, মুসলমান, শিখ জনগোষ্ঠীর স্থানান্তর ইত্যাদি দিয়ে বোঝানো যাবে না। এ বিষয়টা আরও গভীরে। এ অবস্থায় আহমদ রফিক বলেছেন―‘সাম্প্রদায়িক সমস্যার সমাধান কি করতে পেরেছেন মাউন্টব্যাটেন ভাগ করে ? ব্রিটিশ শাসকদের ভারত ত্যাগের ঘোষণা প্রচারিত হওয়ার পর থেকে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা, মৃত্যু ও নিষ্ঠুরতা যেন ভারতীয় জীবনের ভবিতব্য হয়ে দাঁড়ায় এবং তা হিন্দু-মুসলমান-শিখ নির্বিশেষে। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, হত্যা, ধ্বংসাত্মক ঘটনা, নারী নির্যাতন কোনওটাই আকাক্সিক্ষত স্বাধীন ভুবন পাওয়ার পরও কী ভারতে কী পাকিস্তানে বন্ধ হয়নি। সে ট্র্যাডিশন এখনও চলছে’। [রফিক ২০১৫ : ২৪০]
লক্ষণীয় একুশ শতকে পৌঁছে আহমদ রফিক নিজে স্পষ্ট হয়েছেন কি না, কেন কীভাবে দেশ ভাগ হলো। যা বলেছেন, তা অন্যরা যেভাবে বিবেচনা করেছেন, সেভাবেই তাঁর সিদ্ধান্ত জানিয়েছেন। ‘বিষয়টি জাতিরাষ্ট্র গঠনের প্রশ্ন’―এ প্রশ্নে যে অর্জন, তা গৌরবের বা অগৌরবের কোনওটাই নয়। লক্ষ করি এত উদ্বাস্তÍু, রক্ত, স্মৃতিকাতরতা তাঁকেও গ্রাস করেছে। যে যাই বলুক এটা বাস্তবতা। উপান্তে তাঁর বক্তব্য পাঠক হিসেবে আমাদের পর্যবেক্ষণ জরুরি। তা হলো :
‘দেশভাগ বাংলা ভূখণ্ড ও বাঙ্গালি জাতিসত্তাকে এবং দুই প্রধান ধর্মসম্প্রদায়ের চেতনাকেই বিভক্ত করেনি, ভূখণ্ড ভিত্তিতে ও চৈতন্যের জগতে সমধর্মী সম্প্রদায়কেও বিভক্ত করেছে। এ বিভাজন স্বাভাবিক নয়, রাষ্ট্রবিজ্ঞানভিত্তিকও নয়। ইতিহাস যে কোনও ঘটনাকে তার আপন তাৎপর্যে মেনে নেয়, কিন্তু সমাজবিজ্ঞানের বিচারে তা গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে’। [রফিক ২০১৫ : ৪৪১]
নিজের ভেতরের কান্না, স্মৃতি, রক্তক্ষরণ মুছে দিতে অবশেষে তিনি কুলদিপ নায়ার, মুশিরুল হাসানের কথা ব্যবহার করেছেন। আহমদ রফিকের ফিরে দেখা, পর্যবেক্ষণ ও ভ্রমণে তিনি যেভাবে নির্মোহ থাকার অঙ্গীকার করেছেন, অবশেষে তা বজায় রেখেছেন। আশা জারি রেখেছেন সাধারণ মানুষের মুক্তির আকাক্সক্ষায়, কল্যাণের দিকে, মানবতার স্বপ্নে।
তথ্যসূত্র
ইসলাম, আমিনুল (২০১৮)। ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনীতি দ্বিজাতিতত্ত্ব ও দেশভাগ। কলকাতা : এডুকেশন ফোরাম
চৌধুরী, সিরাজুল ইসলাম (২০২৪)। সাতচল্লিশের দেশভাগে গান্ধী ও জিন্নাহ। ঢাকা : কথাপ্রকাশ
শাহ, মোহাম্মদ, https://bn.banglapedia.org/ index.php ? 03.12.24
Butalia, Urvashi (2017). The Other Side of Silence Voices from the Partition of India. Peguin India
Khan, Yasmin (2017). The Great Partition the making of India and Pakistan. Yale University Press
Razzaq, Abdur (Etd.: Ahrar Ahmed) (2002). Political Parties in India. Dhaka: UPL
লেখক : প্রাবন্ধিক



