আর্কাইভপ্রবন্ধ

মৃত্যুচিন্তা : কেন রে এই সংশয় ? : রামেন্দু মজুমদার

সেদিন টেলিভিশনে সুচিত্রা মিত্রের একটি সাক্ষাৎকার দেখছিলাম। তিনিও শম্ভু মিত্রর মতো বলেছেন, তাঁর জীবনাবসানের পর রবীন্দ্রসদন বা অন্য কোথাও না নিয়ে সোজা দাহ করতে নিয়ে যাবার জন্যে। কেবল শেষযাত্রায় রবীন্দ্রসংগীত যেন সঙ্গী হয়। কোন গান―প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছিলেন ‘কেন রে এই দুয়ারটুকু পার হতে সংশয় ?’

সঙ্গে সঙ্গে আমি গীতবিতান খুলে গানের কথাগুলো পড়লাম। কী চমৎকার যুক্তিপূর্ণ কথা―যেখানে  রবীন্দ্রনাথ লিখছেন :

‘মরণকে তুই পর করেছিস ভাই,

জীবন যে তোর তুচ্ছ হল তাই।

দু দিন দিয়ে ঘেরা ঘরে   তাইতে যদি এতই ধরে,

চিরদিনের আবাসখানা সেই কি শূন্যময়?

জয় অজানার জয় ॥’

সত্যই তো। অজানা বলেই কি আমাদের ভয় ? এই চেনা পৃথিবীতে আমরা বড় জোর ১০০ বছর বাঁচতে পারি। তারপর যে অনন্তলোকে আমরা চিরদিনের জন্যে চলে যাব, তখন কী হবে ? সেটা তো পৃথিবীর চেয়ে আরও মধুময় হতে পারে। আসলে ওখান থেকে ফিরে এসে কেউ আমাদের কিছু বলেনি বলেই আমাদের যত ভয়। দ্বিধা সেই অনিশ্চিত যাত্রা নিয়ে। কিন্তু জীবনের চরম সত্যই তো মরণ।

মৃত্যু তো জীবনের অনিবার্য পরিণতি। আগে কখনও আমার মৃত্যুচিন্তা হোত না। বয়স যতই বাড়ছে, কেবল মনে হতো কত কাজ বাকি পড়ে আছে। কিন্তু ইদানীং কেন জানি মৃত্যুর কথা মনে হয়। তবে ভয় হয় না অনিশ্চিত সে যাত্রায়। জাগতিক সম্পদ, পরিচিত পরিবেশ―এসব ছেড়ে যাবার কোনও আক্ষেপ নেই। কেবল কষ্ট হয় আমাদের একমাত্র মেয়ে ও নাতনির জন্যে। আমার স্ত্রীর আগে আমি চলে গেলে, সেও বড় অসহায় বোধ করবে। কেবলি ভাবি আমার ছোট পরিবারে যাদের রেখে যাব, তাদের বেদনার কথা। আমিও ওদের ছেড়ে কী করে থাকব ? তখন নিশ্চয়ই আমি এসব অনুভূতির ঊর্ধ্বে চলে যাব। কিন্তু এই বাস্তবতাটা মেনে নিতে কষ্ট হয়। কেবল এ জন্যই আমার মৃত্যুকে ভয় করে।

ব্যক্তিগত জীবনে আমার ছেলেবেলায় আমার ২৩ বছর বয়সী বড় ভাইকে ফুটবল খেলতে গিয়ে আঘাত পেয়ে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে দেখেছি। আমার চোখের সামনে বাবাকে চলে যেতে দেখেছি। মায়ের ছবির দিকে তাকিয়ে তাঁকে একটা দীর্ঘ শেষ নিঃশ্বাস ফেলতে দেখেছি। শেষ নিঃশ্বাস কেমন হয় প্রত্যক্ষ করেছি। রবীন্দ্রনাথের কথা ভাবি। চোখের সামনে স্ত্রী, সন্তান, প্রিয় বৌদিকে চলে যেতে দেখেও কী মানসিক শক্তি দিয়ে সে সব শোক সহ্য করেছেন। বেদনার মধ্যেই সৃষ্টি করেছেন অসাধারণ সব গান আর কবিতা। তাঁর পক্ষেই লেখা সম্ভব হয় :

‘আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু, বিরহদহন লাগে।

তবুও শান্তি, তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে ॥’

                        কিংবা

‘মরণ রে, তুঁহু মম শ্যামসমান।’

আত্মার বিনাশ নেই। বিভিন্ন ধর্ম বিশ্বাসে মৃত্যু পরবর্তী সময়ে কী হয়ে থাকে তা অনুসারীদের বলা হয়েছে। কেউ অন্যায় বা অপরাধ করলে অত্যাচারিত হতাশার কণ্ঠে বলেন, এ জগতে বিচার না হলেও আখেরাতে তার বিচার করবেন বিশ্ববিধাতা। যারা পরজন্মে বিশ্বাস করেন, তারা অভিশাপ দেন অত্যাচারী পরজন্মে নিকৃষ্ট কোনও প্রাণি হিসেবে আবির্ভূত হবে।

আফ্রিকার একটি গোষ্ঠীর মধ্যে মৃত্যুপরবর্তী একটা লোকাচার আছে। শবদেহকে সামনে রেখে সবার সামনে লোকটি বেঁচে থাকতে কেমন ছিল, তা অভিনয় করে দেখানো হয়। সেখানে তার দোষ-গুণ মানুষের সামনে তুলে ধরা হয়। তাই মৃত্যুর পর যেন কোনও অপমানের মুখোমুখি না হতে হয়, সে ভয়ে অনেকেই জীবনে অন্যায় করা থেকে বিরত থাকে। চমৎকার ব্যবস্থা। শোক প্রকাশের নানা রীতি আছে। ভারতে ‘রূদালী’ বলে নারীদের একটা পেশাদার গোষ্ঠী আছে যারা অর্থের বিনিময়ে মৃতের বাড়িতে গিয়ে শোক প্রকাশ করে। তারা বুক চাপড়ে অঝোরে কেঁদে শোক প্রকাশ করে। ইংল্যান্ডে নাকি ‘রেন্ট-এ-মোরনার’ বলে এক ধরনের লোকজনকে ভাড়ায় পাওয়া যায়। তবে তারা অনেক শান্ত সমাহিত ভাবে শোক প্রকাশ করে।

শোকের অনুভূতি একেক জনের একেক রকম। শোক নিতান্তই ব্যক্তিগত। যার জন্যে শোক করব, তার সঙ্গে সম্পর্কের উপর তা নির্ভর করে। পরিণত বয়সে কেউ চলে গেলে, আমরা মনকে প্রবোধ দিতে পারি। কিন্তু অসময়ে মৃত্যু পরিজনদের পক্ষে সহ্য করা কঠিন। জীবনে আমরা সব কিছুকেই এড়িয়ে চলতে পারি, কিন্তু মৃত্যু আসবেই। তাহলে সেভাবেই মনকে প্রস্তুত করতে হয়। অবশ্য অন্যকে উপদেশ দেয়া যত সহজ নিজে মেনে চলাটা বেশ কঠিনই।

মৃত্যুর পর মানুষ বেঁচে থাকে তার কর্মে। তিনি কত মানবিক ছিলেন, কীভাবে মানুষের উপকার করেছেন, জীবনে কতটা সাফল্য অর্জন করেছেন, দেশের জন্যে কী কাজ করেছেন―এসবই মানুষ মনে রাখবে। তিনি কত বিত্তশালী ছিলেন সেটা একেবারেই গৌণ। আজ সমাজে কোটি কোটি টাকা দুর্নীতি করেও যারা বীরদর্পে ঘুরে বেড়ায়, মৃত্যুর পর তাদের সম্পর্কে লোকে কত খারাপ কথা বলবে, এটা বোধহয় তারা ভাবে না। যাদের দাপটে সবাই তটস্থ থাকত, তারা যখন পাশা উল্টে গেলে জেলের পথে হেঁটে যায়, তখন সাধারণ মানুষের তীব্র ঘৃণার প্রকাশ আমরা সম্প্রতি প্রত্যক্ষ করেছি।

মৃত্যু কখন এসে দরজায় কড়া নাড়বে, আমরা জানি না। যে কোনও বয়সে, যে কোনও সময়ে আসতে পারে ভেবে, কিছুটা মানসিক প্রস্তুতি নেওয়াটা আমাদের সবারই উচিত। সে অবস্থায় মৃত্যুকে মেনে নেয়ার মানসিকতা নিজের এবং চারপাশের মানুষদের থাকা প্রয়োজন। আমরা যারা অস্তাচলের পথে আছি, আমাদের কেবলই প্রার্থনা―রোগে ভুগে ধুকে ধুকে যেন মৃত্যুর মুখোমুখি না হই। ঘুমের মধ্যে যারা চলে যান, কী সৌভাগ্য তাদের। কোনও যন্ত্রণা অনুভব করতে হলো না। অবশ্য বৈজ্ঞানিক কোনও প্রমাণ নেই যে ঘুমের মধ্যে মৃত্যুর সময়েও কোনও যন্ত্রণা হয় কি না। আরেকটা প্রার্থনা―শেষ জীবনে যেন শারীরিক কারণে পরনির্ভরশীল না হয়ে থাকতে হয়। চলতে চলতে চলে যাওয়াই হবে আনন্দের।

তবে যন্ত্রণাহীন মৃত্যু কম লোকের ভাগ্যেই ঘটে। অনেকেই শেষ বয়সে নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে দিন পার করেন। কিছু রোগ আছে, শেষ পর্যন্ত চিকিৎসকরা জবাব দিয়ে দেন―হাসপাতালে রেখে চিকিৎসা করেও কোনও ফল পাওয়া যাবে না। টারমিনাল রোগের ক্ষেত্রে চিকিৎসকরা যখন দেখেন রোগীর আয়ু আর বেশি দিন নেই, তখন আত্মীয়-স্বজনকে পরামর্শ দেন রোগীকে বাড়ি নিয়ে গিয়ে তাঁর শেষ দিনগুলো পারিবারিক আবহে কাটাবার ব্যবস্থা করতে। কিন্তু অনেকের পক্ষেই বাড়িতে রোগীর দেখাশোনা করা বাস্তব কারণেই সম্ভব হয় না।

পশ্চিমা দেশে একটা চমৎকার ব্যবস্থা আছে―হসপিস (ঐড়ংঢ়রপব) হাসপাতাল নামে। মৃত্যু পথযাত্রীকে শান্তিতে শেষ দিনগুলো কাটাবার বিশেষায়িত হাসপাতাল। এখানে চিকিৎসক, নার্স, সমাজসেবী, প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবী এবং আধ্যাত্মিক উপদেশ দেওয়ার মতো লোকেরা থাকেন। ওইসব দেশে যেহেতু স্বাস্থ্যবীমার ব্যবস্থা আছে, তাই রোগীর পরিবারকে কোনও ব্যয় বহন করতে হয় না। অনেকে বাড়িতেও হসপিসের ব্যবস্থা করতে পারেন। যেমন স্বামী বা স্ত্রী তার অসুস্থ জীবনসঙ্গীকে শেষ দিনগুলোতে চোখের সামনেই রাখতে চান। তারা বাড়িতে ব্যবস্থা করেন। আমাদের বন্ধু নাট্যজন আবদুল্লাহ আল-মামুনের ছোটভাই আবদুল্লাহ আল-হারুণও জার্মানিতে এ ধরনের হসপিসে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করত। ওর অভিজ্ঞতা নিয়ে একটা বইও লিখেছে। বাংলাদেশেও দেখলাম হসপিস হাসপাতাল চালু হয়েছে। তবে সেটা বেশ ব্যয়বহুল।

অনেকের কাছে রোগের যন্ত্রণা এক পর্যায়ে অসহনীয় হয়ে যায়। তারা কেবলই মৃত্যু কামনা করেন। কিন্তু চাইলেই তো আর মৃত্যু আসে না। তবে অনেক দেশে আজকাল স্বেচ্ছামৃত্যুর অধিকার আইনসিদ্ধ করা হয়েছে। আমেরিকার কয়েকটি রাজ্যে স্বেচ্ছামৃত্যু আইনত সিদ্ধ। আত্মহত্যার সাথে এটার পার্থক্য আছে। মৃত্যু পথযাত্রীর ইচ্ছা অনুযায়ী অন্যরা তাকে ইনজেকশান দিয়ে জীবনাবসান করে থাকেন। অবশ্য এ পদক্ষেপ নিতে কিছু আইনগত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়।

তবে জীবনের জটিলতা অবসানে আত্মহনন কোনওভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। তাই তো বলা হয় আত্মহত্যা মহাপাপ।

মৃত্যুর কথা বলে বলে পরিবেশটা খুব করুণ ও গম্ভীর হয়ে গেল। তাই এ লেখাটা শেষ করতে চাই তারাপদ রায়ের একটা রম্যরচনার উদ্ধৃতি দিয়ে।

“এক পাড়ায় এক শতায়ু ভদ্রলোকের খুব ধুমধাম করে জন্মের শতবার্ষিকী পালিত হচ্ছে। সেখানে বহিরাগত এক ভদ্রলোক জিজ্ঞাসা করলেন, ‘ব্যাপারটা কী?’ তখন স্থানীয় এক ব্যক্তি গরদের ধুতি, রেশমের চাদর শোভিত এক বৃদ্ধকে দেখিয়ে বললেন, ‘নগেনবাবুর একশো বছর পূর্ণ হলো, তাই আমরা একটু আনন্দ করছি’।”

বাইরের লোকটি বললেন, ‘আপনারা সবাই এত আনন্দ করছেন, কিন্তু ঐ দিকে শুকনো মুখে করুণ চোখে ঐ যে ভদ্রলোক গালে হাত দিয়ে বসে রয়েছেন, উনি কে?’

সেই ভদ্রলোক তখন জবাব দিলেন, ‘আরে উনি হলেন নগেনবাবুর পঁচিশ বছরের ছোট ভাই খগেনবাবু। নগেনবাবুর ষাট বছর বয়েসে একবার মর মর অসুখ হয়। তখন খগেনবাবু নগেনবাবুর নামে একটা জীবনবীমা করেন। সেই থেকে সেই জীবনবীমা খগেনবাবু টেনে চলেছেন, এখন তাঁর নিজেরই পঁচাত্তর বছর বয়েস অথচ নগেনবাবু বহাল তবিয়তে, জীবনবীমার কোনো ফয়সালা হওয়ার কোনও সম্ভাবনা নেই। তাই খগেনবাবুর এরকম কাহিল অবস্থা।’

শেষ কথা―জয় জীবনের জয়। জয় অজানার জয় ॥

 লেখক : নাট্যব্যক্তিত্ব

 সচিত্রকরণ : রজত

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button