প্রচ্ছদ রচনা : সাহিত্যে নোবেলজয়ী হান কাং : মনোজগতের শব্দকারিগর―গল্প : মধ্যবাচ্য : মূল : হান কাং

বাংলা অনুবাদ : বিনয় বর্মন
[হান কাং-এর জন্ম দক্ষিণ কোরিয়ার গোয়াংজুতে ২৭ নভেম্বর ১৯৭০ সালে। তিনি ২০২৪ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। এর আগে তিনি ২০১৬ সালে তাঁর ভেজিটেরিয়ান উপন্যাসের জন্য ম্যান বুকার পুরস্কার লাভ করেছিলেন। তাঁর অন্যান্য বইয়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য―দ্য হোয়াইট বুক, হিউম্যান অ্যাক্টস, গ্রিক লেসনস, আই ডু নট বিড ফেয়ারওয়েল, এবং স্কার্স। উপন্যাস ছাড়াও তিনি অনেক ছোটগল্প ও কবিতা লিখেছেন।]মহিলা তার দু হাত একত্র করে বুকের কাছে আনে। চোখ বাঁকা করে ব্ল্যাকবোর্ডের দিকে তাকায়।
রুপালি রিমযুক্ত মোটা কাচের চশমা-পরা লোকটি হেসে বলেন, ‘আচ্ছা, এটি পড়ো।’
মহিলা ঠোঁট কুঞ্চিত করে। জিভের অগ্রভাগ দিয়ে ঠোঁট ভেজায়। বুকের কাছে তার শান্ত হাত অশান্ত হয়ে উঠতে চাইছে। সে তার মুখ খোলে, আবার বন্ধ করে। দম বন্ধ করে, আবার গভীরভাবে শ্বাস ছাড়ে। লোকটি ব্ল্যাকবোর্ডের দিকে এগিয়ে যায় এবং মহিলাকে আবার পড়তে বলে।
মহিলার চোখের পাতা নড়ে, পোকামাকড়ের পাখা ঘষার মতো। সে চোখ বন্ধ করে, আবার খোলে। যেন প্রত্যাশা করছে, চোখ খুলেই দেখবে সে অন্য কোথাও চলে গেছে।
লোকটি তার চশমা ঠিক করে। তার আঙুলগুলো চকের গুঁড়োতে সাদা হয়ে আছে।
‘হুঁ, এবার বলো, একটু জোরে।’
মহিলার পরনে উঁচুগলার কালো সোয়েটার এবং কালো পাজামা। তার কালো জ্যাকেটটি সে চেয়ারে ঝুলিয়ে রেখেছে। আর তার কালো উলের ওড়নাটি বিশাল কালো ব্যাগে রাখা। তার পোশাক-আশাক দেখে মনে হয় সে শেষকৃত্য অনুষ্ঠান থেকে ফিরেছে। তার চেহারা রোগাটে ও চোখা, অনেকটা মাটির পুতুলের মতো।
সে তরুণী নয়, সুন্দরীও নয়। তার দু চোখে বুদ্ধির ছাপ, কিন্তু ঘন ঘন চোখের পাতা ফেলার কারণে তা আঁচ করা যায় না। তার পিঠ ও কাঁধ বাঁকানো। সে যেন কালো পোশাকের ভেতর আশ্রয় নিয়েছে। তার নখগুলো কাঁটছাঁট করা। বাম কব্জিতে গাঢ় লাল মখমলের হেয়ারব্যান্ড। কালোর বাইরে তার এটাই একমাত্র অন্য রঙ।
‘চলো আমরা একসাথে পড়ি।’ লোকটি আর মহিলার জন্য অপেক্ষা করতে পারছে না। সে অন্যদের দিকে তাকায়―মহিলার সঙ্গে একই সারিতে বসে থাকা বাচ্চা-বাচ্চা চেহারার ছাত্র, পিলারের আড়ালে অর্ধেক ঢেকে থাকা মধ্যবয়সী এক লোক, এবং জানালার ধারে চেয়ারে আলুথালুভাবে বসা এক স্নাতকোত্তর তরুণ ছাত্র।
“এমোস, হেমেটেরোস। ‘আমার,’ ‘আমাদের’।” তিনজন ছাত্র নিচুস্বরে লজ্জিতভাবে পড়ে। “সোস, হুমেটেরোস। ‘তোমার’ একবচন, ‘তোমাদের’ বহুবচন।”
ব্ল্যাকবোর্ডের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটির বয়স তিরিশের কোঠায় মধ্য থেকে শেষের দিকে হবে। লোকটি হালকাপাতলা, চোখের ভুরু ঘন, নাকের গোড়ায় গভীর খাত। নিয়ন্ত্রিত আবেগের সূক্ষ¥ হাসি তার চোখেমুখে খেলা করে। তার গাঢ় বাদামি কটন জ্যাকেটে কনুইয়ের কাছে হালকা হলুদ রঙের চামড়ার জোড়া লাগানো। আস্তিন ছোট, ফলে তার কব্জি দেখা যায়। মহিলা তার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখে। একটি হালকা কালো দাগ তার বাম চোখের প্রান্ত থেকে মুখের প্রান্ত পর্যন্ত নেমে এসেছে। প্রথম ক্লাসে মহিলা এই দাগ দেখে ভেবেছিল এটি হয়তো বা অশ্রু গড়িয়ে পড়ার পথ।
ফ্যাকাসে-সবুজ কাচের পিছনে লোকটির চোখ দুটো মহিলার শক্তভাবে বন্ধ মুখের ওপর। তার মুখের হাসি মিলিয়ে যায়। হাবভাবে কাঠিন্য ফুটে ওঠে। তিনি ব্ল্যাকবোর্ডের দিকে ঘোরেন এবং দ্রুত হাতে গ্রিক ভাষায় একটি ছোট বাক্য লেখেন। তিনি হরফের সঙ্গে বিশেষ উচ্চারণ চিহ্নগুলো দিতে যাবেন, অমনি তার হাতের চক ভেঙ্গে দু টুকরো হয়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে।
আগের বছর বসন্তের শেষ দিকে মহিলা নিজেই ব্ল্যাকবোর্ডের সামনে দাঁড়িয়েছিল। চক হাতে নিয়ে আঁচড় দিয়েছিল বোর্ডে। মিনিট পার হয়ে যায়, কিন্তু সে কোনও অক্ষর লিখতে পারে না। ছাত্ররা সবাই যার যার আসনে বসে ফিসফাস করছে। সে চোখ রগড়ে তাকায়, কিন্তু ছাত্র বা ছাদ কিছুই দেখতে পায় না, তার সামনে কেবল শূন্য হাওয়া।
‘তুমি কি ঠিক আছো, সিয়নসায়েংনিম ?’ ক্লাসের সম্মুখসারিতে বসে থাকা কোঁকড়া চুল ও মিষ্টি চোখের এক তরুণী জিজ্ঞেস করে। মহিলা হাসার চেষ্টা করে, কিন্তু না, ক্ষণিকের জন্য তার চোখের পাতা কাঁপে কেবল। ক্লাসের মধ্যে প্রায় পঞ্চাশজন ছাত্র। তারা একে অপরের সঙ্গে চোখাচোখি করে। তার কী হয়েছে ? ফিসফিসে প্রশ্ন এক ডেস্ক থেকে আরেক ডেস্কে ছড়িয়ে পড়ে।
মহিলা শান্ত পদক্ষেপে ক্লাসরুম থেকে বেরিয়ে আসে। নিজেকে কোনওরকমে সামলে নেয়। করিডোরে পা দিয়েই সে শুনতে পায় ফিসফাসগুলো উচ্চরবে বাজছে, যেন লাউডস্পিকার লাগানো হয়েছে। পাথুরে মেঝেতে তার জুতা ঠকঠক শব্দ করে। সে ঠোঁটে ঠোঁট চেপে ধরে। গলার গভীর থেকে শব্দ বেরিয়ে আসে―সেই সমস্যা ফিরে এসেছে!
লক্ষণটি প্রথম দেখা দেয় যখন তার বয়স ষোল। যে ভাষা তাকে সহস্র সুচের আঘাতে জর্জরিত করত তা আচমকা অদৃশ্য হয়ে গেল। তখনও শব্দ তার কানে যেত, কিন্তু তা কানের পর্দা ও মস্তিষ্কের মাঝখানে একটি ভারী পর্দায় বাধাগ্রস্ত হতো। সেই কুয়াশাময় নীরবতার মধ্যে তার জিহ্বা ও ঠোঁট এবং পেন্সিল ধরার হাত যেন দূরে সরে গেল। সে আর ভাষা দিয়ে চিন্তা করতে পারে না। সে ভাষা ছাড়াই জীবনযাপন করে, যে অবস্থা ভাষা শেখার আগে ছিল, জন্মানোর আগে ছিল। সুতার বলের মতো সময়প্রবাহ শুষে নেওয়া নীরবতা তার শরীরকে ভিতরে-বাইরে মুড়ে ফেলল।
তার মা আতঙ্কিত হয়ে তাকে এক মনোচিকিৎসকের কাছে নিয়ে যান। চিকিৎসক তাকে একগাদা ট্যাবলেট দেন। কিন্তু সে ট্যাবলেট গিলত না, জিভের নিচে রেখে দিত। তারপর ফুলের টবে তা ফেলে দিত। তার থুতুমিশ্রিত ট্যাবলেটের পুষ্টি পেয়ে ফুলে টকটকে লাল কেশর আসে। মা আবার মনোচিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলেন। গৃহবন্দি হয়ে থাকলে তার অবস্থার কোনও উন্নতি হবে না, কাজেই তাকে আবার স্কুলে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়। লেখাপড়ায় পিছিয়ে পড়লে তো চলবে না।
প্রথম যে সরকারি স্কুলে সে ভর্তি হয়, তা ছিল নীরস, ভীতিকর জায়গা। সেখান থেকে চিঠি আসে ক্লাস শুরু হবে মার্চ মাসে। স্কুলের পাঠ অনেক অগ্রগামী। শিক্ষকেরা এখানে সবসময় হম্বিতম্বি করে। ক্লাসের কেউই তার প্রতি আগ্রহ দেখায় না। যে মেয়ে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত একটি শব্দও উচ্চারণ করে না, তার প্রতি কার আগ্রহ থাকবে ? তাকে যখন বই থেকে পড়তে বলা হয়, অথবা শারীরিক শিক্ষা ক্লাসে যখন সংখ্যা গুনতে বলা হয়, তখন সে হা করে দাঁড়িয়ে থাকে। তাকে ক্লাসের শেষ বেঞ্চে পাঠিয়ে দেওয়া হয়, কিংবা গালে থাপ্পর মারা হয়।
মনোচিকিৎসক ও তার মায়ের আশা সত্ত্বেও সামাজিক যোগাযোগের উদ্দীপনা তার নীরবতা ভাঙতে পারে না। বরং তার শরীর যেন কালো মৃৎপাত্র, উজ্জ্বল ও ঘনীভূত এক নিথরতায় ভরে ওঠে। জনাকীর্ণ রাস্তা দিয়ে বাড়ি ফেরার সময় সে ওজনশূন্য হয়ে হাঁটে, যেন তার শরীর সাবানফেনার এক বিশাল বুদবুদে বন্দি। এক আলোকিত নিস্তব্ধতার ভিতরে, পানির নিচ থেকে ওপরের দিকে তাকিয়ে থাকার সময়, গাড়িগুলো ভয়ানক শব্দ করে চলে যায় এবং পথিকেরা তাকে কনুইয়ের গুঁতো দিয়ে অস্থির করে তোলে। তারপর সব অদৃশ্য হয়ে যায়।
অনেকক্ষণ পর তার বোধ ফিরে আসে।
পড়ার সময় কোনও শব্দ কি তার মধ্যে বিন্দুমাত্র আলোড়ন তোলেনি ? সে কেন ভাষা মনে রাখতে পারে না ? তার মস্তিষ্ক কি ক্ষয়ে গেছে ? ক্লাসিক্যাল চাইনিজ বা ইংরেজি নয়, ফরাসি ভাষার ক্ষেত্রে কেন এমনটা হয় ? হয়তো এর নতুনত্বের জন্য। এখন সে এটি শিখবে, এজন্য সে মাধ্যমিক স্কুলে ভর্তি হয়েছে। তার শূন্য দৃষ্টি ব্ল্যাকবোর্ডের দিকে, কিন্তু সেখানে তার দৃষ্টি বাধাগ্রস্ত হয়। বেঁটে টাকওয়ালা ফরাসি শিক্ষক শব্দ উচ্চারণ করার সময় সেটির দিকে ইঙ্গিত করেন। অকস্মাৎ মেয়েটির ঠোঁট শিশুর মতো নড়ে ওঠে। বিবলিওথেক। গলার গভীর থেকে অস্পষ্টভাবে উচ্চারিত হয়।
সেই মুহূর্তটি কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা জানার কোনও উপায় নেই।
এখনও পর্যন্ত অস্পষ্ট ভয়, নীরবতার গভীর থেকে বেদনা প্রকাশিত হতে চায় না। যখন বানান, ধ্বনি ও অর্থের সাক্ষাৎ মেলে, তখন আনন্দ ও নিয়মভঙ্গের শিখা ধীরে ধীরে জ্বলে ওঠে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করে মহিলা প্রথমে একটি বই প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানে চাকরি নেয়। তারপর ছয় বছরের কিছু অধিককাল কাজ করে একটি সম্পাদকীয় প্রতিষ্ঠানে। এরপর সে রাজধানীর আশেপাশে প্রায় সাত বছর ব্যয় করে দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং একটি আর্টস সেকেন্ডারি স্কুলে সাহিত্য পড়ানোর কাজে। সে তিনটি কবিতার বই লেখে, যেগুলো তিন-চার বছর অন্তর অন্তর প্রকাশিত হয়। একটি দ্বিপাক্ষিক সাহিত্য পত্রিকায় সে কয়েক বছর কলাম লেখে। সম্প্রতি সে একটি সাংস্কৃতিক সাময়িকীর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। সাময়িকীটির নাম এখনও ঠিক হয়নি, তবু সে প্রতি বুধবার বিকালে তাদের সম্পাদকীয় সভায় যোগ দেয়।
এখন সেই রোগের লক্ষণ আবার ফিরে এসেছে। সমস্ত কাজকর্ম বাদ দেওয়া ছাড়া কোনও উপায় নেই।
কোনও প্রকার জানান না দিয়ে এবং কোনও কারণ ছাড়াই এটি ঘটে। ছয় মাস আগে সে তার মাকে হারিয়েছে। সম্প্রতি তার বিবাহবিচ্ছেদ ঘটেছে, এবং তার আট বছরের বাচ্চার অধিকার সে পায়নি। আদালতে দীর্ঘ লড়াইয়ের পর পাঁচ মাসের মাথায় সে তার প্রাক্তন স্বামীর বাসায় ওঠে। তার বাচ্চা যেহেতু স্বামীর বাবার প্রথম নাতি, বাচ্চাটি যেহেতু খুব ছোট নয়, সে যেহেতু মানসিকভাবে অসুস্থ এবং ছেলেটির ওপর তার খারাপ প্রভাব পড়তে পারে―কিশোরী বয়সে তার মানসিক চিকিৎসার সমস্ত নথিপত্র প্রমাণ হিসেবে দাখিল করা হয়―যেহেতু তার স্বামীর তুলনায় তার উপার্জন কম (সম্প্রতি ভদ্রলোক ব্যাঙ্কের প্রধান কার্যালয়ে যোগদান করেছে), আদালতের রায় তার বিপক্ষে চলে যায়।
সে সপ্তাহে একদিন পাকাচুলো মনোচিকিৎসকের কাছে যায়। ছেলে চলে যাওয়ার পর থেকে সে অনিদ্রায় ভুগছে। চিকিৎসক বুঝতে পারেন না কেন রোগী তার রোগের ব্যাপারে উদাসীন। টেবিলের ওপর রাখা একটি সাদা কাগজে রোগী লেখে, না, ব্যাপারটি এত সহজ নয়।
এটাই ছিল তাদের শেষ দেখা। লেখার মাধ্যমে মনোচিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া সময়সাপেক্ষ, আর এতে ভুল বোঝাবুঝির সুযোগ বেশি। মনোচিকিৎসক তাকে ভাষারোগ বিশেষজ্ঞের কাছে যাওয়ার পরামর্শ দেন, কিন্তু সে তা বিনীতভাবে প্রত্যাখ্যান করে।
মহিলা ডেস্কের ওপর তার দুই হাত রাখে। শক্ত হয়ে বসে। সামনের দিকে বাঁকা হয়, যেন সে বাচ্চা মেয়ে আর তার নখ পরীক্ষা করা হবে। লেকচার কক্ষে সে লোকটির গমগমে কণ্ঠ শুনতে পায়।
‘কর্তৃবাচ্য ও কর্মবাচ্য ছাড়াও প্রাচীন গ্রিক ভাষায় তৃতীয় একটি বাচ্য রয়েছে, যা আমি আগের ক্লাসে ব্যাখ্যা করেছি, ঠিক আছে ?’
মহিলার সঙ্গে একই সারিতে বসে থাকা যুবক সোৎসাহে মাথা নাড়ে। যুবকটি দর্শনের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র, গোল গালের কারণে তাকে চটপটে, দুষ্ট ছেলে বলে মনে হয়।
মহিলা ঘুরে জানালার দিকে তাকায়। স্নাতকোত্তর ছাত্রের একপাশ দেখতে পায়। সে প্রাকচিকিৎসা বিষয়ে অকৃতকার্য হয়ে চিকিৎসাশাস্ত্রের ইতিহাস বিষয়ে পড়াশোনা শুরু করেছে। সে বিশালদেহী, মুখমণ্ডল দ্বৈত চিবুকবিশিষ্ট, এবং তার চোখে গোল কালো চশমা। প্রথম দেখায় তাকে সহজ-সরল বলে মনে হয়। বিরতির সময়গুলো সে তরুণ দর্শনের ছাত্রের সঙ্গে কাটায়। তারা ঝাঁঝালো কণ্ঠে হাসিতামাশা করে। কিন্তু পাঠ শুরু হওয়ামাত্র তার হাবভাব পালটে যায়। তার টান টান চেহারা দেখে মনে হয় সে ভুল করার ভয়ে আতঙ্কগ্রস্ত।
‘আমরা যাকে মধ্যবাচ্য বলি তা এমন কাজকে নির্দেশ করে যা কর্তার সঙ্গে আত্মবাচক সম্পর্কে সম্পর্কিত।’
দ্বিতীয় তলার জানালার বাইরে কমলা রঙের বিক্ষিপ্ত আলো অন্ধকার নিচু ভবনগুলোকে যৎকিঞ্চিৎ আলোকিত করেছে। অন্ধকারে বড় বড় গাছের পাতায় শীর্ণ কালো ডালপালা ঢেকে আছে। তার দৃষ্টিতে ধরা পড়ে নির্জন স্থান, স্নাতকোত্তর ছাত্রের আতঙ্কিত চেহারা এবং গ্রিক শিক্ষকের ফ্যাকাসে কব্জি।
বিশ বছর পরে আবার যে নীরবতা ফিরে এল তা উষ্ণ কিংবা ঘন কিংবা উজ্জ্বল নয়। আগের নীরবতা যদি জন্মপূর্ব নীরবতার সঙ্গে তুলনীয় হয়, তবে এবারের নীরবতাকে তুলনা করা যায় মৃত্যুপরবর্তী নীরবতার সঙ্গে। আগে সে নিজেকে দেখত পানির মধ্যে ডুবে আছে, ওপরে অনুজ্জ্বল পৃথিবী। এখন সে নিজেকে দেখতে পায় ছায়ারূপে, ঠান্ডা শক্ত দেয়ালের বাইরে, সে বিশাল পানির ট্যাঙ্কে বন্দি জীবনের পর্যবেক্ষক। সে প্রতিটি শব্দ শুনতে ও পড়তে পারে, কিন্তু তার মুখ ফুটে কথা বেরোয় না। আকারহীন ছায়ার মতো, মৃত বৃক্ষের ফাঁপা কাণ্ডের মতো, দুই নক্ষত্রের মাঝখানে কালো শূন্যস্থানের মতো এটি তিক্ত, পাতলা নৈঃশব্দ্য।
বিশ বছর আগে সে কখনও ভাবতে পারেনি যে একটি অপরিচিত ভাষা, যার সঙ্গে তার মাতৃভাষা কোরিয়ানের কোনও সম্পর্ক নেই, তা তার নীরবতা ভাঙবে। সে প্রাইভেট একাডেমিতে প্রাচীন গ্রিক কোর্সে ভর্তি হয়েছে, কারণ সে নিজের ইচ্ছামতো ভাষার দখল নিতে চায়। হোমার, প্লেটো ও হেরোডোটাসের সাহিত্যে, কিংবা পরবর্তী সময়ে ডিমোটিক গ্রিকে লিখিত সাহিত্যের প্রতি তার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। অথচ এসব সাহিত্য মূল ভাষায় পড়ার জন্য তার ক্লাসের অন্য ছাত্রছাত্রীরা উন্মুখ হয়ে থাকে। যদি বার্মিজ বা সংস্কৃত ভাষার কোনও কোর্স থাকত, যার লিপি আরও বেশি অপরিচিত, তাহলে সে ঐ কোর্স বেছে নিত।
“উদাহরণস্বরূপ, মধ্যবাচ্যে ‘নেওয়া’ ক্রিয়ার অর্থ হবে ‘আমি বেছে নিই’। ‘ধোয়া’ ক্রিয়া মধ্যবাচ্যে হবে ‘আমি ধুই’, অর্থাৎ আমি নিজেকে ধুই বা গোসল করি। যা ধোয়া হয়, তা নিজেরই অংশ। যেমন ইংরেজিতে বলা হয় ‘হি হ্যাংড হিমসেল্ফ।’ প্রাচীন গ্রিক ভাষায় ‘নিজেকে’ বলার কোনও প্রয়োজন হয় না। যদি আমরা মধ্যবাচ্য ব্যবহার করি, তাহলে এক শব্দেই সে অর্থ প্রকাশিত হয়। এরকম,” বলে শিক্ষক ব্ল্যাকবোর্ডে গ্রিক হরফে একটি শব্দ লেখেন যার অর্থ ফাঁসি দেওয়া বা গলায় দড়ি দিয়ে নিজেকে হত্যা করা।
ব্ল্যাকবোর্ডের লেখা অনুসরণ করে মহিলা তার পেন্সিল দিয়ে হরফগুলো খাতায় লেখে। এত সূক্ষ¥ নিয়মের ভাষা সে আগে কখনও দেখেনি। ক্রিয়াপদগুলো নানাভাবে তাদের রূপ পরিবর্তন করে কর্তার পুরুষ ও বচন, ক্রিয়ার কাল, ভঙ্গি এবং বচন অনুসারে। ক্রিয়ার কালের নানা প্রকার আছে, ভঙ্গির আছে চারটি ভাগ এবং বচনের তিনটি। এমন অসম্ভব বিশদ নিয়মের কারণেই প্রতিটি বাক্য হয় সহজ ও স্পষ্ট। কর্তাকে নির্দেশ করার এবং শব্দক্রম স্থির রাখার কোনও প্রয়োজন পড়ে না। ক্রিয়ারূপ থেকেই বোঝা যায় এর কর্তা তৃতীয় পুরুষ একবচন এবং ক্রিয়ার কাল অতীত। মধ্যবাচ্য এভাবেই অর্থ প্রকাশ করে, যেমন, সে ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করল।
তার আট বছরের সন্তানকে সে ভরণপোষণ করতে পারবে না এই অজুহাতে তার কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়। তখন ছেলেটি সবে কথা বলা শিখেছে। সে তখন এমন একটি শব্দের স্বপ্ন দেখত যার মধ্যে পৃথিবীর সমস্ত ভাষা নিহিত। তীব্র দুঃস্বপ্নে তার পিঠে ঘাম ছুটত। একটি শব্দের সঙ্গে প্রচণ্ড ঘনত্ব ও গুরুত্ব বাঁধা। একটি শব্দ উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে ব্রহ্মাণ্ডের জন্মমুহূর্তের সমস্ত বস্তুপুঞ্জের মতো বিস্ফোরিত ও প্রসারিত হবে। যখন সে তার ক্লান্ত জেদি বাচ্চাকে ঘুম পাড়াত, তখন সে নিজেই ঘুমিয়ে পড়ত। আর প্রতিবারই সে স্বপ্ন দেখত সমস্ত ভাষার একত্রীভূত রূপকে যা তার স্পন্দমান দেহকুঠুরিতে বন্দি তপ্ত হৃদপিণ্ডে বরফঠান্ডা বিস্ফোরকের মতো জমে আছে।
সেই সংবেদনের তীব্রতায়, যা শীতল স্মৃতিমাত্র, সে গ্রিক হরফে লিখে ফেলে সেই শব্দটি যার অর্থ ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করা।
বরফস্তম্ভের মতো ঠান্ডা ও শক্ত একটি ভাষা। যে ভাষা ব্যবহৃত হওয়ার পূর্বে অন্য কিছুর সঙ্গে মিশ্রিত হতে চায় না। একেবারে স্বয়ংসম্পূর্ণ একটি ভাষা। এমন ভাষা যা কারণ ও ধরনের সম্পূর্ণ নিষ্পত্তি করে তবেই ঠোঁট থেকে নির্গত হয়।
ছাত্ররা গুনগুন করে পড়ে, আর সে চুপচাপ বসে থাকে। গ্রিক ভাষায় বক্তৃতা তার নীরবতার জন্য আর কোনও সমস্যা নয়। শিক্ষক ক্লাস থেকে ঘুরে ব্ল্যাকবোর্ডের দিকে তাকান এবং সেখানে লেখা বাক্যটি বাহু প্রসারিত করে মুছনি দিয়ে দ্রুত মুছে ফেলেন।
পরিষ্কার ব্ল্যাকবোর্ডে হেলান দিয়ে গ্রিক শিক্ষক ঘোষণা করেন, ‘জুন মাস থেকে আমরা প্লেটো পড়ব। অবশ্য পাশাপাশি আমরা ব্যাকরণও শিখব।’ তার ডান হাতে চক, আর বাম হাত দিয়ে তিনি তার চশমাটি নাকের আরও ওপর দিকে ঠেলে দেন।
যখন সে কথা বলতে পারত, তার কথা সবসময় ছিল অস্ফুট। এটা ফুসফুসের উপরিভাগে স্বরতন্ত্রের সমস্যা নয়। সে স্থান দখল করতে চাইত না। প্রত্যেকেই তার শরীরের আয়তন অনুযায়ী জায়গা দখল করে, কিন্তু কণ্ঠ তার বাইরে চলে যায়। সে নিজেকে ছড়িয়ে দিতে চাইত না। পাতাল-সড়কে বা রাস্তায়, কফিশপ বা রেস্তোরাঁয়, সে কখনওই উচ্চস্বরে কথা বলত না, কাউকে ডাকার প্রয়োজন হলেও না। কেবল ক্লাসে পড়ানোর সময় ছাড়া অন্য সকল অবস্থায় তার কণ্ঠ থাকত সবচেয়ে নিচু। এমনিতেই হালকাপাতলা গড়ন, তার ওপর আবার সে তার কাঁধ ও পিঠ গুটিয়ে রাখত যাতে তার শরীর বেশি জায়গা দখল না করে। সে রসিকতা বুঝত এবং তার হাসিও ছিল স্মিত, কিন্তু যখন সে হাসত তা প্রায় শোনাই যেত না।
কথা বলার সময় সে প্রায়শ তার সামনের ব্যক্তির দিকে তাকিয়ে থাকত যাতে ঐ ব্যক্তি তার চোখ দেখে বুঝে ফেলে সে কী বলতে চায়। ভাষা ব্যবহার না করে কেবল চোখ দিয়ে সে লোকজনকে সম্ভাষণ করত, ধন্যবাদ দিত এবং ক্ষমা প্রার্থনা করত। তার মতে কোনও স্পর্শ দৃষ্টির মতো এত তাৎক্ষণিক ও অন্তর্গত নয়। স্পর্শ না করেও এটি স্পর্শের কাছাকাছি।
তুলনামূলকভাবে, ভাষা অসীমভাবে স্পর্শের এক শারীরিক প্রক্রিয়া। ভাষা ব্যবহারের সময় ফুসফুস, গলা, জিভ ও ঠোঁট আন্দোলিত হয়, বাতাস কম্পিত হয় এবং পাখা মেলে শ্রোতার দিকে ধাবিত হয়। জিভ শুকিয়ে যায়, লালা ঝরে এবং ঠোঁট ফেটে যায়। যখন সে দেখত শারীরিক দোলাচল বেড়ে যেত, সে লেখায় মনোনিবেশ করতে পারত না, এমনকি একা হলেও। বাতাসের ভেতর দিয়ে কথা ছড়িয়ে পড়াটা সে পছন্দ করত না। তার উচ্চারিত বাক্য নীরবতা ভেঙে খানখান করে দিচ্ছে, এটা সে মেনে নিতে পারত না। অনেক সময় কিছু লেখার আগেই, কেবল একটা দুটো শব্দ লিখতে হবে এটা চিন্তা করেই তার গলার পেছনে পিত্তরস উঠে আসত।
কখনও কখনও এমন হয়েছে, সে এইমাত্র যে শব্দগুলো লিখেছে তাদের আকার-আকৃতি নিরীক্ষণ করছে আর অমনি তার ঠোঁট থেকে অস্ফুট ধ্বনি বের হয়ে গেছে। সঙ্গে সঙ্গে শব্দরূপের বিষমতা তার কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। শব্দগুলো যেন পেরেকবিদ্ধ শরীর এবং সে তাদের যস্ত্রণা টের পায়। তার গলা শুকিয়ে যায় এবং সে তখন পড়া বন্ধ করে ঢোঁক গিলে। এটা সেই সময়ের কথা মনে করিয়ে দেয় যখন রক্ত পড়া বন্ধের জন্য ক্ষতস্থান চেপে ধরতে হয়, অথবা চাপ দিয়ে রক্ত বের করে দিতে হয় যাতে ব্যাকটেরিয়া রক্তস্রোতে প্রবেশ করতে না পারে।
পাকাচুলো চিকিৎসক তার শৈশবের মধ্যেই রোগের মূল কারণ খুঁজে পান। মহিলা তার সঙ্গে অর্ধেক সহযোগিতা করেছে। কৈশোরে তার যে ভাষা লোপ পেয়েছিল তা সে প্রকাশ করেনি। সে আরও পুরনো স্মৃতি মনে করার চেষ্টা করেছে।
তার মা তাকে বলেছেন, সে তার পেটে থাকার সময় টাইফয়েড হয়েছিল। এক মাস তিনি জ্বর-ঠান্ডায় ভুগেছেন এবং প্রতিবার খাদ্য গ্রহণের সময় তাকে একগাদা ট্যাবলেট খেতে হয়েছে। তার মা ছিল খিটখিটে প্রকৃতির, মেয়ের ঠিক উলটো। একটু সুস্থ হলে তিনি স্ত্রীরোগবিশেষজ্ঞের কাছে যান এবং সন্তান ফেলে দেওয়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করেন। কারণ তার মনে হয়েছে এত ঔষধপত্র খাওয়ার পর বাচ্চাটা সুস্থ হয়ে জন্মাবে না।
চিকিৎসক তাকে জানিয়েছেন যে গর্ভপাত ঘটানো ঠিক হবে না, কারণ ভ্রƒণ কিছুটা বড় হয়ে গেছে। তিনি তাকে দুই মাস পরে দেখা করতে বলেন। তখন তিনি তাকে একটি ইনজেকশন দেবেন যাতে ভ্রƒণ গর্ভ থেকে বেরিয়ে আসে। কিন্তু দুই মাস পরে যখন ভ্রƒণ নড়াচড়া করতে শুরু করে, তখন তার মন দুর্বল হয়ে যায় এবং তিনি আর হাসপাতালে যান না। বাচ্চার জন্ম না হওয়া পর্যন্ত তিনি উদ্বেগে অস্থির হয়ে থাকেন। জন্মেও পর বারবার গুনে দেখেন গর্ভতরল-মাখা বাচ্চার হাতপায়ের আঙুলগুলো ঠিক আছে কিনা। ঠিক আছে দেখে তার মন শান্ত হয়। সে যখন বেড়ে উঠছে তখন আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীরা তাকে তার জন্মের আগের কাহিনি শোনায় : তুমি জন্ম না হওয়া থেকে অল্পের জন্য রক্ষা পেয়েছো। বাক্যটি তার কানে মন্ত্রের মতো পুনরাবৃত্ত হয়েছে।
তখন তার নিজের আবেগ-অনুভূতি বোঝার মতো বয়স হয়নি, কিন্তু সেই বাক্যে নিহিত ভয়ঙ্কর শীতলতা সে স্পষ্ট টের পেত। সে জন্ম প্রায় নেয়নি বললেই চলে। তার পৃথিবী তাকে স্বাভাবিকভাবে দেওয়া হয়নি। এটি একটি সম্ভাবনামাত্র যে ঘনঘোর অন্ধকারে অনেক নিয়ামকের আকস্মিক সংযোগ ঘটেছে এবং তার ফলে সময়মতো সংক্ষিপ্ত আকারে একটি দুর্বল বুদবুদ তৈরি হয়েছে। একদিন বিকেলে সে তার মায়ের হুল্লোড়ে বন্ধুদের বিদায় জানিয়ে বাড়ির সামনে গিয়ে বসে এবং দেখে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। সে চিকিৎসককে জানায়, সে দম বন্ধ করে ঘাড় বাঁকিয়ে বসেছিল এবং তখন তার সামনে অন্ধকারের মধ্যে এক সূক্ষ¥ বিশাল এক-স্তর দুনিয়া উন্মোচিত হয়েছে।
চিকিৎসক ভাবলেন ব্যাপারটা মজার বৈকি। ‘তোমার তখন জীবন বোঝার মতো বয়স হয়নি। স্বাধীনভাবে জীবনযাপনেরও উপযুক্ত হওনি। বারবার তুমি শুনেছো জন্মের আগেই তোমাকে মেরে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে। তোমার মধ্যে অস্তিত্বের সংকট তৈরি হয়েছে। কিন্তু তুমি ভালোভাবে বেড়ে উঠেছো এবং এখন তোমার সময় এসেছে এসব মোকাবেলা করার। তোমার ভীত হওয়ার কোনও কারণ নেই। কুঁকড়ে থাকার কোনও প্রয়োজন নেই। খোলাসা করে কথা বলতে হবে। তোমার ঘাড় সোজা করো এবং যতটুকু স্থান দরকার ততটুকু দখল করো।’
কিন্তু সে জানত যদি সে এইমতো কাজ করে তাহলে তার বাকি জীবন যাবে একটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে, যে প্রশ্ন তার দুর্বল ভারসাম্যকে প্রতিনিয়ত ধ্বংস করতে চেয়েছে। সেই প্রশ্ন―অস্তিত্বের ওপর তার কি কোনও দাবি আছে ? চিকিৎসকের স্পষ্ট সুন্দর উপসংহার সঠিক বলে প্রতীয়মান হয় না। সে এখনও অধিক স্থান দখলের পক্ষপাতী নয়। সে এটাও বিশ্বাস করে না যে সে ভয়ে জবুথবু হয়ে জীবনযাপন করেছে, অথবা তার স্বাভাবিক চিন্তাকে দমন করে সে জীবনযাপন করেছে।
তাদের মধ্যে কথাবার্তা ঠিকঠাকমতো চলে এবং পাঁচ মাস পরে যখন দেখা যায় যে তার কণ্ঠ জোরালো হয়নি, বরং সে বোবা হয়ে গেছে, চিকিৎসক আশ্চর্য হয়ে যান। ‘আমি বুঝতে পারছি,’ তিনি বলেন, ‘তুমি কতটা ভোগান্তি সহ্য করেছো। সন্তানের অধিকার না পাওয়াটা তোমার জন্য কষ্টকর ছিল। তারপর মরার ওপর খাঁড়ার ঘা তোমার মায়ের মৃত্যু। গত কয়েক মাস ধরে তুমি সন্তানের অনুপস্থিতির যন্ত্রণা সহ্য করছো। আমি বুঝি। তুমি অনুভব করেছো এত কিছু সহ্য করার ক্ষমতা তোমার নেই।’
চিকিৎসকের কণ্ঠঃনিসৃত সহানুভূতিমাখা কথা তাকে বিমূঢ় করে দেয়। সবচেয়ে অসহ্য হলো তার এই দাবি যে তিনি তাকে বুঝতে পেরেছেন। এটি সত্য নয়, এ ব্যাপারে সে একেবারে নিশ্চিত।
নীরবতা যা এক শান্ত উপশম, তাদেরকে গ্রাস করে। তারা অপেক্ষা করতে থাকে।
সে তার সামনে কাগজ-কলম নেয় এবং স্পষ্টভাবে লেখে, বিষয়টা এত সহজ নয়।
গ্রিক হরফে লেখা দুটি শব্দ।
“এই দুটি ক্রিয়ার অর্থ ‘ভোগা’ এবং ‘শেখা’। দেখতে পাচ্ছ কি, শব্দদুটি প্রায় একই রকম ? সক্রেটিস এখানে শব্দ নিয়ে খেলেছেন। এর মাধ্যমে তিনি দুটি কাজের মধ্যে সাদৃশ্য নির্দেশ করেছেন।”
সে একটি ছয়কোনা পেন্সিল নেয়। অন্যমনস্কভাবে সে কনুই দিয়ে এর ওপর ভর করে ছিল। সেটি দিয়ে সে চামড়া চুলকায়, তারপর ব্ল্যাকবোর্ডে লেখা শব্দদুটো খাতায় তোলে। প্রথমে গ্রিক হরফ লেখে, তারপর তার নিজের ভাষায় শব্দদুটোর অর্থ লেখার চেষ্টা করে, কিন্তু পেরে ওঠে না। সে বাম হাতের তালু দিয়ে তার ঘুমকাতুরে চোখ ঘষে। চোখ তুলে গ্রিক শিক্ষকের ফ্যাকাসে মুখ দেখে। তার আঙুলে ধরা চক। খাতায় মাতৃভাষায় লেখা অক্ষরগুলো যেন শুকিয়ে যাওয়া রক্তের দাগ, কিন্তু ব্ল্যাকবোর্ডের লেখাগুলো স্পষ্ট সাদা।
সে ডেস্কে রাখা খোলা বইয়ের ওপর তার মাথা ঝোঁকায়। এটি প্লেটোর শুরুর দিকে লেখা বইগুলোর একটি ‘রিপাবলিক’-এর মোটা দ্বিভাষিক সংস্করণ, যেখানে মূল গ্রিক ভাষার পাশাপাশি কোরিয়ান ভাষা আছে। তার কপাল থেকে ফোঁটা ফোঁটা ঘাম গড়িয়ে পড়ছে গ্রিক বাক্যগুলোর ওপর। ফলে খাতার পাতার অংশবিশেষ ভিজে ফুলে উঠেছে।
“যা হোক, শব্দের খেলা হিসেবে আমরা এই ক্রিয়াপদগুলোর মধ্যে মিল দেখতে পাই না। যেমন, সক্রেটিসের কাছে, ‘শেখা’ আক্ষরিকভাবে কষ্টভোগ করা বোঝায়। তারপরও সক্রেটিস কিন্তু খুব বেশি জায়গায় এভাবে শব্দ ব্যবহার করেননি। এ জাতীয় চিন্তা তরুণ বয়সে তার মাথায় এসেছিল।”
বৃহস্পতিবার গ্রিক ক্লাস। সেদিন সে একটু আগেভাগে ব্যাগ গুছিয়ে বের হয়। একাডেমি স্টপের অনেক আগেই সে বাস থেকে নেমে পড়ে এবং হাঁটা শুরু করে। উত্তপ্ত রাস্তার তাপ সহ্য করে সে। একাডেমি বিডিংয়ের ছায়াময় অভ্যন্তরে প্রবেশের পরও কিছুক্ষণ তার শরীর বেয়ে ঘাম ঝরতে থাকে।
একবার দ্বিতীয় তলায় পৌঁছে সে দেখতে পায় গ্রিক শিক্ষক আর আগে আগে হাঁটছেন। সে সহজাতভাবে হাঁটা থামিয়ে দেয়। দম বন্ধ করে রাখে যাতে কোনও শব্দ না হয়। পিছনে কারও উপস্থিতি টের পেয়ে শিক্ষক ঘাড় ঘোড়ান এবং মুচকি হাসেন। এই হাসিতে মিশে ছিল নিকটত্ব, খাপছাড়াভাব এবং স্বস্তি। বোঝা যায় শিক্ষক তাকে সম্বোধন করতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু কী ভেবে থেমে যান। এরপর যখনই সিঁড়ি বা করিডোরে তাদের দেখা হয়েছে, ভদ্রলোক না হেসে হালকা চোখ নেড়ে তাকে সম্বোধন করেছেন।
যখন সে মাথা তোলে, তখন মনে হয়, আধো আলোকিত ক্লাসরুম যেন হঠাৎ উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে, যা তার অস্থিরতা বাড়িয়ে দেয়। সে ব্ল্যাকবোর্ডের দিকে তাকায়। বিরতির সময় বলে এখন সেখানে কোনও লেখা নেই। শিক্ষক মুছনি দিয়ে সেটি পরিষ্কার করে ফেলেছেন, যদিও চকের দাগের ছিঁটেফোঁটা রয়ে গেছে। এমনকি একটি বাক্যের এক-তৃতীয়াংশ তার চোখে ধরা পড়ছে। এক জায়গায় চকের দাগের মোটা আঁচড়, যেন ইচ্ছাকৃতভাবে ব্রাশ দিয়ে তা করা হয়েছে।
সে আবার বইয়ের ওপর ঝুঁকে পড়ে। গভীর নিঃশ্বাস নেয় এবং তার স্পষ্ট শব্দ শোনে। ভাষা হারানোর পর থেকে তার মনে হয়েছে নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে ভাষার মিল রয়েছে। কণ্ঠের মতো এটি নীরবতাকে ভীষণভাবে নাড়িয়ে দেয়। মৃত্যুর সময় মায়ের নাভিশ্বাস দেখেও তার একই অনুভূতি হয়েছিল। মা তখন কোমায়। যখন তিনি গরম নিঃশ্বাস ছাড়তেন, নীরবতা পিছু হটতো। তারপর যখন তিনি নিঃশ্বাস নিতেন, তীব্র শীতল নীরবতা চেঁচিয়ে উঠত, যেন মায়ের দেহ একে শুষে নিচ্ছে।
সে পেন্সিলটি আঁকড়ে ধরে এবং এইমাত্র পড়া বাক্যটির দিকে তাকায়। প্রতিটি হরফের ছবি তার কাছে স্পষ্ট হয়ে ধরা পড়ে। সে যদি পেন্সিল দিয়ে চাপ দেয় এবং জোরে টান দেয়, তবে পুরো শব্দ নয়, পুরো বাক্য ছিদ্র করে ফেলতে পারে। সে ছোট কালো হরফগুলো পরীক্ষা করে, যেগুলো খসখসে পাতায় স্পষ্ট দৃশ্যমান। হরফের ওপর-নিচের উচ্চারণচিহ্নগুলো পোকামাকড়ের মতো কিলবিল করে। একটি ছায়াচ্ছন্ন জায়গা, আবছা, যেখানে যাওয়া যায় না। পরিণত বয়সে প্লেটো একটি বাক্যের কথা ভাবেন কিন্তু সময়ের অভাবে তা আর এগোয় না। কারও অস্পষ্ট কণ্ঠ, হাত দিয়ে যার মুখ ঢাকা।
সে পেন্সিলটিকে আরও শক্ত করে ধরে। সাবধানে নিঃশ্বাস ছাড়ে। বাক্যের মধ্যে লুকানো আবেগ স্পষ্ট হয়ে ওঠে, চকের দাগের মতো অথবা শুকিয়ে যাওয়া রক্তের দলার মতো। সে তা সহ্য করে।
শরীর তার দীর্ঘমেয়াদি মূকাবস্থা দেখেছে। বাস্তবের চাইতে এটি অধিক দৃঢ় ও ভারী মনে হয়। তার পদক্ষেপ, হাত-পায়ের সঞ্চালন, লম্বা গোলাকার মুখের আদল―সবকিছু স্পষ্ট সীমারেখায় আবদ্ধ। এই সীমার ভেতরে কিছু ঢুকবে না, বাইরেও কিছু যাবে না।
সে নিজেকে আয়নায় কখনও দীর্ঘ সময় নিরীক্ষণ করেনি, কিন্তু এখন এই চিন্তাটা তার কাছে অবোধ্য মনে হয়। জীবনে আমরা যার মুখ ঘন ঘন কল্পনা করি তা হলো নিজের। কিন্তু যখন সে নিজের ছবি দেখা বন্ধ করে, তখন সে বোঝে, সময় গড়িয়ে গেলে সব অবাস্তব হয়ে যায়। জানালায় বা আয়নায় যখন সে তার প্রতিচ্ছবি দেখে, তখন সে তার চোখের দিকে নজর দেয়। সেই স্বচ্ছ চোখের তারাদুটি তার কাছে মনে হয় আগন্তুক ও তার মধ্যে যোগাযোগের একমাত্র রাস্তা।
কখনও কখনও তার নিজেকে ব্যক্তির চেয়ে বরং বস্তু মনে হয়, চলমান কঠিন বা তরল। যখন সে গরম ভাত খায়, তখন তার মনে হয় সে নিজেই গরম ভাত। যখন সে ঠান্ডা পানি দিয়ে মুখ ধোয়, তখন তার মনে হয় তার ও পানির মধ্যে কোনও পার্থক্য নেই। একইভাবে আবার তার মনে হয়, সে ভাতও নয়, পানিও নয়, সে রুক্ষ কঠিন পদার্থ যা কখনও প্রাণময় বা প্রাণহীন কোনও জিনিসের সঙ্গে মিশবে না। একমাত্র যে জিনিসগুলো সে শীতল নীরবতা থেকে পুনরুদ্ধার করে, যেগুলো তার সমস্ত শক্তি হরণ করে, সেগুলো হলো, এক, তার সন্তানের মুখ, যাকে সে দুই সপ্তাহে একবারের জন্য কাছে পায়, এবং দুই, মৃত গ্রিক শব্দগুলো যা সে তার হাতের পেন্সিল দিয়ে ক্ষতবিক্ষত করে ফেলে।
একজন মহিলা ভূমিতে পড়ে আছে।
সে পেন্সিলটি নামিয়ে রাখে। এটি ঘামে ভিজে চটচটে হয়ে গেছে। হাতের তালু দিয়ে সে তার কপালে জমে থাকা বিন্দু বিন্দু ঘাম মোছে।
‘মা, তারা আমাকে বলেছে আমি সেপ্টেম্বরের পরে এখানে আর আসতে পারব না।’
গত শনিবার রাতে ছেলের মুখে এই কথা শুনে সে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে। দুই সপ্তাহে ছেলেটা যেন আরও বড় হয়েছে, তবে লম্বায় বড় হলেও শরীর আরও শীর্ণ হয়ে গেছে। তার চোখের পাপড়ি লম্বা ও পাতলা, গালে আঁচড়ের মতো দাগ, যেন পেন্সিল দিয়ে স্কেচ করা হয়েছে।
‘আমি যেতে চাই না। আমার ইংরেজি অতটা ভালো নয়। বাবার বোন সেখানে থাকে, কিন্তু তার সঙ্গে আমার কখনও দেখা হয়নি। বাবা বলেছেন, আমাকে এক বছরের জন্য যেতে হবে। এখানে আমার সবেমাত্র কয়েকজন বন্ধু হয়েছে, আর এর মধ্যেই আমাকে চলে যেতে হবে ?’
সে ছেলেকে গোসল করিয়ে বিছানায় শুইয়েছে। তার চুল থেকে আপেলের ঘ্রাণ বেরুচ্ছে। সে ছেলের গোলাকার চোখের মধ্যে তার নিজের মুখচ্ছবি দেখতে পাচ্ছে। তার নিজের চোখেও ছেলের মুখের প্রতিচ্ছবি। প্রতিচ্ছবির মধ্যে প্রতিচ্ছবি… এরূপ অনন্ত প্রতিচ্ছবি।
‘মা, তুমি কি বাবার সঙ্গে কথা বলতে পারো না ? যদি কথা বলতে না পারো, তাহলে কি চিঠি লিখতে পারো না ? আমি কি আবার এসে তোমার সঙ্গে থাকতে পারি না ?’
ছেলেটি হতাশায় দেয়ালের দিকে মুখ ঘুরিয়ে নেয়। মা ছেলের দিকে হাত বাড়ায় এবং তাকে আবার নিজের দিকে ফেরায়।
‘পারি না ? আমি কি ফিরে আসতে পারি না ? কেন নয় ?’
সে আবার দেয়ালের দিকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। ‘দয়া করে আলো নিভিয়ে দাও। এত আলোতে আমি কীভাবে ঘুমাব ?’
মা উঠে দাঁড়ায় এবং লাইটের সুইচ অফ করে দেয়।
নিচতলার জানালা দিয়ে রাস্তার আলো ঘরে ঢুকেছে, কাজেই সে তার ছেলের অবয়ব স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে। ছেলের কপালে একটি গভীর কাটা দাগ। সে সেখানে হাত বুলিয়ে দেয়। ছেলে মুখব্যাদান করে। সে মুখ বন্ধ করে চুপচাপ শুয়ে থাকে, এমনকি তার নিঃশ্বাসের শব্দও শোনা যায় না।
জুনের শেষ রাতের অন্ধকারে পানিবন্দি ঘাসের গন্ধ এবং গাছের আঠার সঙ্গে মিশেছে উচ্ছিষ্ট খাবারের গন্ধ। ছেলেকে নামিয়ে দিয়ে সে সিওল সেন্টারের বাসে না উঠে প্রায় দুই ঘণ্টা পায়ে হাঁটে। কোনও কোনও রাস্তা প্রখর দিবালোকের মতো উজ্জ্বল। কোথাও যানবাহন থেকে নির্গত দমবন্ধ করা ধোঁয়া, সঙ্গীতের ধামাকা, আবার কোথাও একেবারে অন্ধকার। রাস্তার বিড়ালেরা দাঁত দিয়ে ময়লার ব্যাগ ছিঁড়ে ফেলেছে এবং তার দিকে তাকাচ্ছে।
তার পায়ে ব্যথা হয়নি। সে ক্লান্ত নয়। লিফটের কাছে আবছা আলোয় সে তার ঘরের সম্মুখ দরজায় দৃষ্টি মেলে দাঁড়িয়ে থাকে। এই দরজা দিয়েই এখন তার ঘরে ঢোকার কথা, ঘরে গিয়ে বিছানায় শোয়ার কথা। সে ঘুরে দাঁড়ায় এবং আবার ভবনের বাইরে চলে যায়। বাইরে গ্রীষ্মরাতের গন্ধ, নানারকম পচা জিনিসের গন্ধ, যেগুলো একসময় তাজা ছিল। সে দ্রুত পায়ে হাঁটে, এত দ্রুত যে তা প্রায় দৌড়ের পর্যায়ে পৌঁছে। সে কেয়ারটেকারের ঘরের সামনে পাবলিক ফোনবুথে ঢোকে। তার পাজামার পকেট হাতড়ে সমস্ত কয়েন বের করে।
সে একটি কণ্ঠ শুনতে পায়, ‘হ্যালো ?’
সে মুখ খোলে। দম ফেলে। আবার দম নেয় এবং দম ফেলে।
আবার একই কণ্ঠ। ‘হ্যালো ?’ ফোনের রিসিভার ধরতে গিয়ে তার হাত কাঁপে।
‘তুমি কীভাবে তাকে নেওয়ার কথা ভাবতে পারো ? এত দূরে ? এবং এত লম্বা সময়ের জন্য ? হারামি কোথাকার! পাষণ্ড কোথাকার!’
তার দাঁত কড়মড় করতে থাকে এবং হাতে খিঁচুনি ধরে। সে ফোন নামিয়ে রাখে। দুই হাত তার গালে রাখে, যেন সে নিজেকে নিজেই চড় মারছে। সে অবিরাম তার নাকে-মুখে হাত ঘষতে থাকে।
সেই রাতে, যখন তার প্রথম ভাষালোপ ঘটে, সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে ভালোভাবে নিরীক্ষণ করে। তার মনে হয়, হয়তো সে নিজেকে ভুলভাবে দেখছে, যদিও সে তার চিন্তাকে শব্দে রূপান্তরিত করেনি। তার চোখ এত নির্মল হতে পারে না। যদি তার চোখ বেয়ে রক্ত বা পুঁজ ঝরতো তাহলে সে এতটা আশ্চর্য হতো না।
তার মনের মধ্যে দীর্ঘকাল ধরে টগবগ করে ফুটতে থাকা ঘৃণা ক্রমে ক্রোধে পরিণত হয় এবং প্রচণ্ড যন্ত্রণার স্রোত ফুলে ফোঁড়ায় পরিণত হয় যা কখনওই ফেটে যাবে না। কোনওকিছুরই উপশম হয় না।
কোনওকিছুই শেষ হয় না।
‘পৃথিবী ক্ষণস্থায়ী ও সুন্দর, তাই না ?’ শিক্ষক বলেন। ‘কিন্তু এই ক্ষণস্থায়ী ও সুন্দর পৃথিবীর বদলে প্লেটো চেয়েছিলেন এমন এক পৃথিবী যা হবে চিরস্থায়ী ও সুন্দর।’ ফ্যাকাসে-সবুজ চশমার পেছনে তার শান্ত দৃষ্টি সরাসরি নিবদ্ধ হয় মহিলার স্বচ্ছ চোখে। ছাত্রদের আজ পড়ায় মনোযোগ নেই, হয়তো তিনি আজ ব্যাকরণের পরিবর্তে টেক্সটের বিষয়বস্তু ব্যাখ্যা করছেন এই কারণে। দশ মিনিট ধরে তিনি বকবক করে যাচ্ছেন। ক্লাসের এক পর্যায়ে এমনটা ঘটেই থাকে, পাঠের মনোযোগ গিয়ে পড়ে শিথিলবাঁধন গ্রিক ভাষা ও দর্শনের ওপর।
‘মানুষজন যদিও সুন্দর জিনিসে বিশ্বাস করে, কিন্তু তারা সুন্দরে বিশ্বাস করে না। প্লেটোর মতে, এ ধরনের লোকজন স্বপ্নে ভাসমান, এবং এটা যুক্তির মাধ্যমে প্রমাণ করা যায়। এই পৃথিবীতে সবকিছুই উলটা। অর্থাৎ তার মতে, তিনি নিজে জেগে আছেন এবং স্বপ্ন দেখছেন না। তিনি বাস্তবের সুন্দর জিনিসগুলোকে বিশ্বাস করতেন না, বরং বিশ্বাস করতেন পরম সৌন্দর্যকে যা বাস্তবে অবস্থিত নয়।’
সে চিরাচরিত স্থবিরতা নিয়ে তার ডেস্কে বসে আছে। একই অবস্থায় দীর্ঘক্ষণ বসে থাকতে থাকতে তার পিঠ, ঘাড় ও কাঁধ আড়ষ্ট হয়ে গেছে। সে খাতা খুলে বিরতির আগে লেখা বাক্যগুলো দেখে। বাক্যগুলোর মাঝখানে ফাঁকা জায়গায় শব্দগুলো লেখে। সে ধৈর্য্যসহকারে বিশেষ্যপদের নানা রূপ এবং কাল ও বাচ্যের জটিল ব্যবহারে সরল, অসমাপ্ত বাক্য তৈরি করে। সে অপেক্ষা করে কখন তার ঠোঁট ও জিভ নড়াচড়া শুরু করবে। প্রথম ধ্বনিটি উৎক্ষিপ্ত হওয়ার জন্য সে অপেক্ষা করতে থাকে।
গ্রিক হরফে লেখা :
একজন মহিলা ভূমিতে পড়ে আছে।
গলায় তুষার।
চোখে মাটি।
‘এটা কী ?’ একই সারিতে বসা দর্শনের ছাত্র জিজ্ঞেস করে। সে খাতার দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে, যেখানে প্রাচীন গ্রিক ভাষায় অসমাপ্ত বাক্য লেখা রয়েছে। প্রথম বাক্য ‘একজন মহিলা ভূমিতে পড়ে আছে।’ এটি তারা পূর্বের পাঠে উদাহরণ হিসেবে শিখেছিল। নির্বিকার, সে তার খাতাও বন্ধ করে না। সে সমস্ত শক্তি সঞ্চয় করে যুবক ছেলেটির চোখের দিকে তাকায়। চোখে যেন অতল বরফ।
‘এটি কি কবিতা ? গ্রিক ভাষায় লেখা কবিতা ?’ জানালার পাশে বসা স্নাতকোত্তর ছাত্র ঘুরে তার দিকে তাকায়। তার চোখেমুখে কৌতূহল। ঠিক তখনই শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক প্রবেশ করেন।
‘সিয়নসায়েংনিম!’ দর্শনের ছাত্রটি চাপাহাসি হাসে। ‘দেখো, সে গ্রিক ভাষায় কবিতা লিখছে।’
পিলারের পিছনের সিটে মধ্যবয়সী লোকটি তার দিকে তাকায়। তার চোখে বিস্ময়ভরা প্রশংসা। হঠাৎ সে উচ্চহাসিতে ফেটে পড়ে। হতচকিত হয়ে মহিলা তার খাতা বন্ধ করে। সে শূন্য চোখে তাকিয়ে থাকে। শিক্ষক তার চেয়ারের দিকে এগিয়ে আসছেন।
‘সত্যি ? আমি কি খাতাটা একটু দেখতে পারি ?’
শিক্ষকের কথায় মনোযোগ দিতে তার কষ্ট হয়, যেন সে কোনও বিদেশি ভাষা বোঝার চেষ্টা করছে। সে শিক্ষকের চশমার দিকে তাকায়। চশমার কাচ এত মোটা যে তার চোখ সেখানে সাঁতরে বেড়ায়। হঠাৎ সে সম্বিত ফিরে পায়, এবং মোটা পাঠ্যবই, খাতা, অভিধান ও পেন্সিলের বাকসো তার ব্যাগে ভরে।
‘না, দয়া করে বসে থাকো। ওটা আমাকে দেখাতে হবে না।’
সে উঠে দাঁড়ায়, ব্যাগ কাঁধে নেয়, চেয়ারের সারির মাঝখান দিয়ে দরজা অভিমুখে এগিয়ে যায়।
জরুরি প্রস্থানের রাস্তা চলে গেছে সিঁড়ি অবধি। কেউ একজন পেছন থেকে তার হাত চেপে ধরে। সে চমকে পেছন ফেরে। এই প্রথম সে শিক্ষককে এত কাছ থেকে দেখছে। তিনি তার ধারণার চেয়ে খাটো। তিনি এখন ক্লাসরুমের সম্মুখভাবে উঁচু প্ল্যাটফর্মে দাঁড়ানো নন। তাকে কেমন বেখাপ্পারকম বয়স্ক লাগছে।
‘আমি তোমাকে বিব্রত করতে চাইনি।’ গভীর নিঃশ্বাস নিয়ে তিনি আরও নিকটে আসেন। ‘তুমি কি … তুমি কি আমার কথা শুনতে পাচ্ছ ?’ তিনি হাত তুলে ইঙ্গিত করেন। তিনি আরও কয়েকবার একই ইঙ্গিত করেন। যেন নিজের ব্যাপারে ব্যাখ্যা দিচ্ছেন, একটু থেমে বলেন, ‘আমি দুঃখিত। দুঃখ প্রকাশ করার জন্যই আমি বেরিয়ে এসেছি।’
সে নির্বাক হয়ে শিক্ষকের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। শিক্ষক আবার নিঃশ্বাস নেন। অপার উৎসাহে তিনি বলতে থাকেন : ‘আমি সত্যি দুঃখিত। দুঃখ প্রকাশ করার জন্যই আমি বেরিয়ে এসেছি।’
তার ছেলের বয়স ছয়।
একবার এক অলস রোববার সকালে তারা গল্পগুজব করছিল। মা বললো, চলো আমরা নিজেদের জন্য জুতসই নাম খুঁজে বের করি। নামগুলো প্রকৃতির এমন বিষয় হবে যা আমাদের সঙ্গে খাপ খাবে। ছেলে ব্যাপারটা পছন্দ করে। সে নিজের নাম প্রস্তাব করে, ঝলমলে বন। তারপর মায়ের নাম রাখে, যা তার সঙ্গে খুব মানানসই।
‘ঘন পতনশীল তুষারের দুঃখ।’
‘কী ?’
‘ওটাই তোমার নাম, মা।’
কী বলবে বুঝতে না পেরে, সে ছেলের স্বচ্ছ চোখের দিকে তাকায়। সে তার পাশে বসে এবং চোখ বন্ধ করে। যদি সে চোখ খোলে, তাহলে মনে হয় ঘন পতনশীল তুষার দেখতে পাবে, তাই সে আরও জোরে চোখ বন্ধ করে। চোখ বন্ধ থাকলে তা আর দৃশ্যমান হবে না। ছয়কোনা ঝিকমিকে কাচও না, পালকের মতো কোমল তুষারও না। কিংবা গভীর বেগুনি রঙের সমুদ্র, বা সাদা পর্বতচূড়ার মতো হিমবাহও নয়।
রাত পোহানোর আগ পর্যন্ত তার জন্য শব্দ কিংবা রঙ কিছুই নেই। সবকিছু ভারী তুষারে ঢাকা। সময়ের মতো তুষার, সময় যা জমে গেলে ফেটে যায়। সময় তার শক্ত শরীরে জমা হতে থাকে। পাশে তার ছেলে নেই। শীতল বিছানার প্রান্তে নিশ্চল শুয়ে থেকে সে তার স্বপ্নকে মূর্ত হতে বলে, বারবার, তার সন্তানের উষ্ণ চোখে চুমো খাওয়ার ইচ্ছায়।
এই সড়কের প্রতিবন্ধক-দেয়ালের সমান্তরালে একমুখী এক লেনের রাস্তা অনেক দূর চলে গেছে। সে সেই রাস্তার কিনার দিয়ে হাঁটছে। এই পথে বেশি লোকজন চলাচল করে না, কাজেই নগর কর্তৃপক্ষ এই রাস্তার উন্নয়নে বেশি মনোযোগ দেয়নি। রাস্তা এখানে-সেখানে ফাটা এবং তার ফাঁকফোকর দিয়ে গজিয়েছে ঘাসঝোপ। ফ্ল্যাটগুলোর পাশে দেয়ালের জায়গায় যেসব একাশিয়া গাছ লাগানো হয়েছিল, তাদের ঝোপলা কালো শাখাপ্রশাখা একে অপরের দিকে বাহুবিস্তার করেছে। আর্দ্র রাতের বাতাসে ধোঁয়ার কুয়াশা ঘাসের গন্ধের সঙ্গে মিশেছে। নিকট সড়ক থেকে ইঞ্জিনের শব্দ তার কান বিদীর্ণ করে দেয়, যেমনভাবে ধারালো স্কেট বরফ কেটে ফেলে।
অদ্ভুত।
মনে হয় এর আগে অবিকল তার এরকম রাতের অভিজ্ঞতা হয়েছে।
মনে হয় সে এর আগেও এই রাস্তা দিয়ে হেঁটেছে। একই লজ্জা ও বিব্রতবোধ।
তখন তার ভাষা ছিল, কাজেই অনুভূতি আরও স্পষ্ট ও জোরালো ছিল।
কিন্তু এখন তার মধ্যে কোনও ভাষা নেই।
শব্দ ও বাক্য তাকে ভূতের মতো তাড়া করে, শরীর থেকে দূরে, কিন্তু চোখ ও কানের নিকটে।
এই দূরত্বের কারণে দুর্বল অনুভূতিগুলো শুষ্ক কাগজের মতো তার কাছ থেকে ঝরে পড়ে।
সে কেবল তাকিয়ে থাকে। তাকিয়ে থাকে, এবং যেসব জিনিস সে ভাষার মধ্যে প্রত্যক্ষ করে তার কিছুই অনুবাদ করে না।
তার চোখে বস্তুর ছবি তৈরি হয়। সেগুলো নড়াচড়া করে, অথবা পথচলার সঙ্গে সঙ্গে সেগুলো মুছে যায়। সেগুলো আর কখনও শব্দে রূপান্তরিত হয় না।
অনেক আগে এমনই এক গ্রীষ্মরাতে রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে সে হঠাৎ হাসতে শুরু করে।
সে আকাশে উজ্জ্বল ত্রয়োদশীর চাঁদের দিকে তাকায় এবং হাসতে থাকে।
ওটা কোনও মানুষের গালফোলা মুখ ভেবে সে হেসেছিল। চাঁদের খানাখন্দগুলো হতাশা-লুকানো চোখের মতো মনে হয়েছিল।
মনে হয় তার শরীরের ভেতরের শব্দগুলো হাসিতে ফেটে পড়ছে, এবং সেই হাসি তার মুখে ছড়িয়ে পড়েছে।
উত্তরায়ণের সময় নিদাঘ রাত, এখন যেমন, অন্ধকারের অন্তরালে দ্বিধান্বিতভাবে নিজেকে প্রত্যাহার করে নেয়।
সেই সুদূর রাত এত সুদূর নয়। তার ছেলে তার আগে আগে হাঁটছে। সে হেঁটে চলেছে কোলে এক বিশাল ঠান্ডা তরমুজ নিয়ে।
তার কণ্ঠে স্নেহ, কিন্তু সেই কণ্ঠ সামনে এগুতে চায় না, ন্যূনতম স্থান নিয়েই সে সন্তুষ্ট।
তার ঠোঁটে দাঁত কটমট করার কোনও চিহ্ন নেই।
তার চোখে রক্ত জমেনি।
(গল্পটি অনূদিত হয়েছে দ্য নিউ ইয়র্কার পত্রিকার ৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ সংখ্যায় প্রকাশিত ঞযব গরফফষব ঠড়রপব নামক ইংরেজি ভার্শন থেকে, যা হান কাঙের লেখা মূল কোরিয়ান ভাষা থেকে অনুবাদ করেছেন ডেবোরা স্মিথ এবং এমিলি ইয়া ওন।)
সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ



