অনুবাদ গল্পআর্কাইভবিশ্বসাহিত্য

বিশ্বসাহিত্য : অনুবাদ গল্প : আলো ঝলমলে গৃহ : মূল : ঝুম্পা লাহিড়ী

বাংলা অনুবাদ : এলহাম হোসেন

[ঝুম্পা লাহিড়ী (জন্ম : জুলাই ১১, ১৯৬৭) পুলিৎজার পুরস্কার বিজয়ী মার্কিন ও ভারতীয় বাঙালি বংশদ্ভুত লেখক। তিনি তাঁর গল্প সংকলন ইন্টারপ্রেটার অফ ম্যালাডিস-এর জন্য ২০০০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পুলিৎজার পুরস্কার লাভ করেন। ২০১৪ সালে লাহিড়ীকে জাতীয় মানবিক পদক দেওয়া হয়েছিল। তিনি বর্তমানে প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের সৃজনশীল লেখার অধ্যাপক]

চমৎকারভাবে আলোকসজ্জিত একটি গৃহ আপনার জীবন বদলে দিতে পারে। বসন্তকালে পাঁচ ছেলেমেয়ে নিয়ে ওখানে ওঠার পর আমার স্ত্রীর পা চলন্ত সিঁড়িতে আটকে যাওয়া নিয়ে উদ্বিগ্নতা কমলো। সন্তানেরা দুই, চার, ছয়, সাত ও নয় বছরের। সকালবেলায় প্রচণ্ড হৈচৈয়ের শব্দে খোলা দরজাগুলো কেঁপে উঠত। বাজারে টমেটো কেনার সময় মাথা থেকে পাঁচ থেকে সাত ফুট উঁচুতে থাকা ছাতা এদিক-ওদিক  টলমল করত। রুগন্ ও অযত্নে লালিত গাছ, যেগুলোর শেকড় কেটে ফেলা হয়েছে বা পচে গেছে, সেগুলো হুটহাট করে রাস্তার মাঝখানে এসে পড়ত। গাড়িতে, মানুষে, মাটিতে একাকার।

যখন একটি বাড়ির বাইরে আমার এক সন্তানকে সঙ্গে করে নিয়ে ঘুরছিলাম, তখন দেখলাম একটা পাইনগাছ উপড়ে পড়েছে এক আগন্তুকের ওপর। লোকটি মারা গেছে। এক লোক তার গাড়িতে বীতস্পৃহ হয়ে বসে ছিল। সম্ভবত কারও জন্য অপেক্ষা করছিল। মোবাইল ফোনে বারবার ম্যাসেজ চেক করছিল। আমার স্ত্রী ওখানে বেদনায় বিমূঢ় হয়ে ঘণ্টাখানেক দাঁড়িয়ে রইল। যেন তার পছন্দের কেউ মারা গেছে। পুলিশ ও দমকল বাহিনীর লোকজন এসে মৃতদেহ উদ্ধার করে নিয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত সে ওখানে দাঁড়িয়ে থাকল। পরে দুই হাতের মধ্যে দুমড়ে মুচড়ে যাওয়া প্লাস্টিক বোতলের মতো গাড়িটির অবস্থার কথা সে আমাকে বলল। ডাস্টবিনে জায়গা বাঁচানোর জন্য প্লাস্টিকের বোতলকে দোমড়ালে যেমন দেখায়, ঠিক তেমন। কয়েক সপ্তাহ সে ঘরেই থাকল। বেচারা ঘাবড়ে গেছে। বাচ্চাদের নিয়ে আর বের হতে চাইল না।

শহরের পূর্ব দিকে অবস্থিত ঐ বাড়িতে এখানে সেখানে ওত পেতে থাকা বালামুসিবত নিয়ে বা সংবাদপত্রে ছাপা হওয়া বিপদ-আপদের খবর নিয়ে সে আর হাপিত্যেশ করল না। চিৎকার করার মতো করে শব্দ করা এমনকি গরম পানির কেতলিও আর তাকে জ¦ালাতন করল না। বাচ্চাকাচ্চার চিৎকার চেঁচামেচিও নয়। আমাদের তিনটি ছেলে―বড়টার মেজাজ-মর্জি ভালো, আর শরীর শুকনো কাঠির মতো। মেজটির একটু স্বাস্থ্য ভালো। তৃতীয়টি ইতিমধ্যে চশমা পড়তে শুরু করে দিয়েছে। আর এদের মাঝখানে আমাদের উজ্জ্বল নয়না দুটি মেয়ে। একেবারে ওদের মায়ের চোখের আকৃতি পেয়েছে। ওরা দুজন ঘরের জিনিসপত্র সবসময় উলট-পালট করে।

আমাদের অ্যাপার্টমেন্ট প্রথম তলায়। মাত্র পাঁচশ বর্গফুটের। তবে এই প্রথমবারের মতো ছোট্ট একটা শোবার ঘর পেলাম যেখানে সূর্যের সোনা রোদ একেবারে আছড়ে পড়ে। সূর্যের আলোয় অবগাহন করতে করতে আর পাখির কলকাকলি শুনতে শুনতে আমাদের ঘুম ভাঙ্গে। আমাদের জগতে এগুলোর ভাষা দুর্বোধ্য। নরম আলো কী যে ভালো লাগে! যখন বাচ্চারা ঘুমায়, তখন দরজাটা লাগিয়ে দিই। সফেদ আলো আমাদের হৃদয়-মনে প্রেমের জোয়ার বইয়ে দেয়। আমরা ষষ্ঠ সন্তান নেওয়ার ব্যাপারে কৌতুক পর্যন্ত করি। বাসার ভেতরে সবসময় চঞ্চল হাওয়া নেচে বেড়ায়। উষ্ণ বসন্তকালে এই চঞ্চল হাওয়া আমাদের বাঁচিয়ে দেয়। বাড়ির ভেতরটা প্রায় সমূদ্র সৈকতের মতো। আমরা স্বামী-স্ত্রী একে অপরকে বলি, আমরা যেন কোন ছুটিতে সমুদ্র সৈকতে বেড়াতে এসেছি। মাঝে মাঝে গাঙচিলের ডাক শুনতে পাই। তবে বালি বা জেলি ফিশের ঝামেলা নেই। কিন্তু সবসময় এক উষ্ণ আলো শরীরে স্নিগ্ধ পরশ বুলিয়ে দেয়। চোখ বন্ধ করলেও চোখের পাতার নিচে এক ধরনের লাল আলো হাতছানি দেয়।

শহরের উপকণ্ঠে আকাশটা মুক্ত, স্বাধীন―সত্যিই ওখানে আকাশটা অসীম। শহরটি নির্মাণ সামগ্রী আর সিমেন্ট-বালিতে গিজ গিজ করলেও মনে হয়, আমরা যেন শহরে নয়, গ্রামে আছি। অল্প কিছু সংখ্যক গাছ রয়েছে, খুব একটা বেশি নয়। কিন্তু রাস্তার পাশ দিয়ে জন্মেছে অনেক অনেক ঝোপঝাড়। বড় বড় ধারালো কাঁটাযুক্ত গাছগাছড়া। একদিকে হেলে আছে। যেন বিরাট এক সৈন্যবাহিনী বর্শা উঁচিয়ে আক্রমণের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে। এটি এমন এক বিশ্ব যেখানে সামনাসামনি যুদ্ধ হয়। রাস্তায় ড্রাগ বিক্রি হয়। তবে কিছু মনে করার নেই। শহরের ভেতরে এমন দৃশ্য দুর্লভ নয়। এমনকি কেতাদুরস্ত চত্তরগুলোতেও, যেখানে পর্যটকরা ভিড় করেন সেখানেও।

বাসা বদল করে আমরা বেশ উত্তেজিত। তাই প্রতিবেশীদের সতর্কবার্তায় পাত্তা দিলাম না। এক বয়োজ্যেষ্ঠ বিধবা, যার পিঠে সামান্য কুঁজ রয়েছে, তিনি একদিন আমাদের সঙ্গে দেখা করতে এলেন। তখন আমরা আমাদের বাক্স-পেটরাগুলো গোছাচ্ছিলাম। বিধবার অস্থিচর্মসার হাতে একটা ট্রে। ওর চামড়ার ওপর থেকে ঠেলে বেরিয়ে আসা নীল ধমনিগুলো দেখা যাচ্ছিল। ট্রেতে এককাপ কফি আর একটা কেক। আমার স্ত্রীর স্কার্ফ দেখে তিনি প্রশংসা করলেন। বললেন, তাকে দেখতে অনেক আগেকার দিনের অভিজাত মহিলাদের মতো লাগে। গির্জা বা জাদুঘরে সংরক্ষিত রং চটে যাওয়া বা কালো হয়ে যাওয়া চিত্রকর্মে এমন মহিলাদের ছবি দেখা যায়। বিধবা মহিলা আশপাশের প্রতিবেশ-পরিবেশ সম্বন্ধে আমাদের সতর্ক করলেন। বললেন, একটু অস্বস্তিকর হতে পারে। আমাদের দেখে তাঁর কাছে সুন্দর একটি পরিবার মনে হলো।

তবে আপনার স্বপ্নের সবকিছু থাকা সত্ত্বেও আপনি আরও বেশি বেশি চাইতে পারেন। অ্যাপার্টমেন্টে উঠে আলমারিতে কাপড়চোপড় গুছিয়ে নিয়ে, ড্রয়ারে কাটাচামচগুলো সাজিয়ে এবং রান্নাঘরের জানালায় গাছের চারা লাগানোর পরেও আমরা ভাবলাম, আমাদের পাশের বিল্ডিংয়ের অ্যাপার্টমেন্টের মতো যদি আমাদের একটা বেলকনি থাকত তাহলে ভালো হতো। একটু বড়সড় রকমের বেলকনি থাকলে তাতে আরও কিছু চারা ধরত। শোবার ঘর থেকে বেলকনিটা দেখতে পেতাম। আমার স্ত্রী দেখেছে একটি জবা ফুলের চারাকে আপনা আপনি বেড়ে উঠতে। যেন একটা মাছ ধরার ছিপ যা আকাশের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমাকে অবশ্য সে একদিন বলেছিল, যদি সে ঐ লতার মতো হতো তবে বাতাসের সঙ্গে পরম সুখে দোল খেত। বাতাসে শুধু পত পত করে উড়ত। কোনও কিছুতে ভর না দিয়ে শুধু বাতাসের গায়ে হেলান দিয়ে সে ঝুলে থাকত। সকালবেলা কবুতর মুখে খড়কুটো নিয়ে আসত। সানশেডের নিচে বাসা বানাত। সানশেডের নিচে সাদা ধাতব টেবিল পাতা ছিল। কিন্তু সূর্যাস্তের সময় আমরা ওখানে কাউকে বসতে দেখি না। কেউ ওখানে বসে কিছু খায়ও না, খোশগল্পও করে না। একদিন চটি জুতা পরা এক মহিলা একটি ঝাড়ু হাতে বেশ খুশি মনে বাসাটা ঝাড়ু দিয়ে দিল।

এই প্রথমবারের মতো আমরা লক্ষ করলাম যে, আমাদের বাসায় বেশ সুরক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে। প্রতিবেশী এলাকার তুলনায় বেশি। জায়গাটা লোকে লোকারণ্য। দোকানদাররা সচরাচর ওখানে থাকে। ওরা একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত আমাদের সহ্য করল। উদাহরণস্বরূপ, যে কসাইয়ের কাছ থেকে আমরা মাংস কিনি সে কখনও আমার স্ত্রীর পা পর্যন্ত লম্বা পোশাক ও মাথার স্কার্ফের ব্যাপারে কিছু জিজ্ঞেস করেনি। এমন পোশাক পরে বাইরে যেতে আমার স্ত্রী স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। আমার স্ত্রী কীভাবে মুরগির মাংস রান্না করবে ও কীভাবে কলিজা রান্না করবে, এসব প্রশ্ন সে কখনও করেনি। যদিও অন্য মহিলাদের সে এরকম প্রশ্ন জিজ্ঞেস করে। এই জায়গাটাকে ছিমছাম মনে হয়। ঘন, বড় বড় ঝোপের বেড়া জায়গাটাকে আলাদাও করেছে। একপাশে একটা বড় হাসপাতাল। অন্যপাশে রেল স্টেশন। হাসপাতালটি বিশাল। এর প্রধান ফটক জনাকীর্ণ রাস্তার সঙ্গে লাগোয়া। সমান্তরাল রেখার মতো একটি রাস্তার সঙ্গে এর লাশকাটা ঘর। একটু বিচ্ছিন্ন। এই দুয়ের মাঝখানে প্যাভিলিয়ন, পায়ে হাঁটা পথ, ঝোপঝাড়, ফুলগাছ ইত্যাদি মিলিয়ে যেন নতুন এক ছোট্ট শহর গড়ে উঠেছে। প্রবেশমুখে বড় ফটক। তবে যে কেউ চাইলে ভেতরে ঢুকতে পারে। আমরা বাচ্চাদের নিয়ে কয়েকবার ওখানে বেড়াতে গেছি। এমনভাবে ঢুকেছি যেন ভেতরে আমাদের কোনও এক অসুস্থ আত্মীয় রয়েছে, আর আমরা তাকে দেখতে যাচ্ছি। ভেতরে বেঞ্চে বসে রক্তকরবীর প্রশংসা করেছি। ম্যাগনোলিয়া ফুলের গন্ধ শুঁকেছি। বাচ্চারা যখন লুকোচুরি খেলায় ব্যস্ত থাকত তখন সিগারেট ফুকেছি। আশেপাশের অল্প কয়েকটা বিল্ডিং-এর গায়ে উল্টাপাল্টা কিছু গ্রাফিত্তি আঁকা রয়েছে। হাসপাতালের চারপাশের দেয়ালেও। এমন জিনিস আর কোথাও আপনি দেখতে পাবেন না।

বিছানায় সটান শুয়ে সামিয়ানার দিকে তাকিয়ে থাকি। আমাদের বিল্ডিংয়ের পরের বিল্ডিং-এর বেলকনিতে সামিয়ানাটি টানানো রয়েছে। ওখানে পাখির বাসা রয়েছে। আর আছে জবা ফুল। আমার স্ত্রী ওই ফুল খুব পছন্দ করে। বাতাসে সবসময় সামিয়ানার ঝালরগুলোতে ঢেউ খেলতে থাকে। কাপড়ের রঙ জ¦লে মলিন হয়ে গেছে। কিছু সুতা ওখান থেকে চুলের মতো বা ঘাসের মতো ঝুলছে। ভাঁজ করা পাড় একই আকৃতির তরঙ্গ তৈরি করে। প্রত্যেকটা তরঙ্গ একই রকমের। এবার তরঙ্গগুলো আলাদা হয়ে যায়। কোনও কোনওটা ভেঙ্গে দুভাগ হয়ে যায়। দুয়ের মাঝে ব্যবধান তৈরি হয়। থিয়েটার হলের পর্দার মতো। প্যাপিরাসের ওপরে সময়ের ধারালো দাঁত ওগুলো চিবিয়ে খেয়েছে। ওগুলো তো খোলাবাজারে বিক্রি করা সস্তা জিনিসগুলোর মতো। ওখানে আমি কাজ করি রবিবারগুলোতে। এখানে সেখানে পাড় খুলে খসে পড়েছে। দেখতে কোটরাগত চোখের মতো যার মধ্য দিয়ে আকাশ দেখা যায়। মাঝে মাঝে বাতাসের তোড়ে এই গ্যাপ বা ব্যবধান বেড়ে যায়।

যখন ঐ ছিঁড়ে যাওয়া, বাতাসে উড়তে থাকা সামিয়ানার দিকে তাকিয়ে থাকি তখন যুদ্ধের কথা ভুলে যাই। সৈন্যদের কথা ভুলে যাই। ওরা আমার দাদা-দাদিকে হত্যা করেছে। পরে আমার বাবা-মার সঙ্গে এই দেশে আসি। সেই যাত্রার কথাও ভুলে যাই। সাদা প্রজাপতিরা সমুদ্রের বুকে উড়ে বেড়ায়। সফেদ, আনন্দে উদ্বেলিত প্রজাপতির ঝাঁক আমাদের পাশে পাশে উড়ে বেড়ায়। ভ্রমণ করে। যেন আমাদের পথ দেখিয়ে দেয়।

প্রথমে আমরা একটা ক্যাম্পে থাকতাম। তারপর এক বস্তিতে। তারপর যেখানে পেরেছি সেখানে। তার মানে হলো―আমি শহরের নানা স্থানে ঘুরে ঘুরে বড় হয়েছি। প্রত্যেকটি জায়গা বিস্ময়কর। বাবা-মার সঙ্গে এসেছিলাম। আমার ভাইয়েরাও এসেছিল। শনিবারগুলোতে বাজারে আমার বাবাকে সাহায্য করতাম। ঘড়ি ঠিক করা, ব্যাটারি বদলানো, ঘড়ির ফিতা বদলানো ইত্যাদি সব টেকনিক্যাল কাজে সাহায্য করতাম। অপ্রয়োজনীয় জিনিসের জন্য কাড়ি কাড়ি টাকা অপচয় করার জন্য লোকজন আসত।

আমার বাবা যখন মারা যান তখন আমি ছোট। দুর্ভাগ্যবশত আমি তখনও ঘড়ি ঠিক করতে শিখিনি। কাজেই, কাপড় বিক্রির কাজ শুরু করলাম। সপ্তাহের দিনগুলোতে আমি আসবাবপত্র, ভারী বাক্স, জিনিসপত্র সরবরাহ করার কাজ করি। আর রবিবারে পুরাতন বইয়ের দোকানে বিক্রেতার কাজ করি। আগে উনি তামাক কুড়াতেন। তিনি চান তার গাড়িতে আমি মাল তুলি, তাবু খাটাই, দিন শেষে বুথ তুলে ফেলি। কিছু কিছু লোক পোকা-কাটা বইয়ের জন্য অবাক করা পরিমাণ টাকা দিত।

বিশ বছর বয়সে একটা মেয়েকে বিয়ে করি। ও আমার দেশের। আমার জন্য সে সবাইকে ছেড়ে এসেছে পৃথিবীর অন্য এক প্রান্তে। এক অনাকর্ষণীয় বসন্তের দিনে এসে হাজির হলো। যখন আমরা বিমানবন্দরে বাড়ি ফেরার ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করছিলাম, তখন ও দীর্ঘ ভ্রমণের ক্লান্তিতে কাঁপছিল। দুঃখজনকভাবে ওকে দেওয়ার মতো আমার কোনও কোট ছিল না। ওকে স্বাগত জানানোর জন্য আমার মা আমাদের বাড়ির সিঁড়িতে সারিবদ্ধভাবে ফুলের তোড়া সাজিয়ে রাখতে বললেন। যদিও অন্যান্য ভাড়াটিয়ারা এটিকে ঝামেলা মনে করে অভিযোগ করলেন।

ওকে এখানে সেখানে বেড়াতে নিয়ে যেতাম যেন সে শহরটা চেনে। পাশের পার্কে ঘন ঘন যেতাম। পার্কটি ঘন সন্নিবেশিত গাছ আর কিছু ভাস্কর্যে ঠাসা। এক সকালে ও জলপাই গাছের ডাল থেকে রুপালি পাতা ছিঁড়তে লাগল। তখন হঠাৎ একটা ঘোড়াপোকা লাফিয়ে ওর হাত বেয়ে উঠতে লাগল। ও তখন ভয়ে শক্ত হয়ে গেল। সম্ভবত এ কারণেই ওর মধ্যে গাছভীতি তৈরি হয়েছে।

আমাদের বিয়ের এক মাস পরে আমার স্ত্রী গর্ভবতী হয়ে পড়ে। সে বছর শীতে আমাদের প্রথম সন্তানের জন্ম হলো। সেটা তখন কষ্টের বছর। সে বছর মাকে হারালাম। দন্ত চিকিৎসক একটা সংক্রমিত দাঁত তুলে ফেলার তিন দিন পর মা মারা গেলেন। মার মৃত্যুর পর ভাইদের সঙ্গে দুঃখজনকভাবে আমার বনিবনা হলো না। ওরা ভিন্ন শহর, ভিন্ন দেশে চলে যেতে মনোস্থির করল। আর আমার নিজের পক্ষে পুরো বাড়ির ভাড়া বহন করা সম্ভব হলো না। তার ওপরে ক্যাম্পের জীবন। মানুষ গিজগিজ করে ওখানে। সবাই অপেক্ষা করে কবে ক্যাম্পের বাইরে যাবে। আমাদের তৃতীয় সন্তানের জন্মের পর সামর্থ্যরে মধ্যে একটা বাসার জন্য আবেদন করলাম। সবসময়ই ভাবতাম যে, আমার নাগরিকত্ব দরকার। কিন্তু আমার স্ত্রী একটু চিন্তাভাবনা করে। উৎকণ্ঠায় ভুগলেও ও একজন বুদ্ধিমতি মহিলা। বুঝতে পেরেছিলাম, যতদিন আমাদের কাছে বৈধ কাগজপত্র থাকবে ততদিন আমরা ঐ বাড়িগুলোর একটা পৌর কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করে চাইতে পারব। আমি অবশ্য কখনও ফরম পূরণ করিনি। আশাও করিনি যে, এতে কোনও  কাজ হবে। তবে আমাদের ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলো। কারণ, আমরা একটা আলো ঝলমলে বাসা পেয়ে গেলাম।

যতদিন চাইবে আমাদের সৌভাগ্য ততদিন বিরাজ করবে। বাড়ির আঙিনায় কয়েকজন বাসিন্দা ফিসফাস করে। জোট বেঁধে আমাদের গোষ্ঠী উদ্ধার করে। অবশ্য আমরা যখন বাড়িতে থাকি না তখন। একদিন দুটি ছেলে আমাদের বড় ছেলেকে স্কুল থেকে ফেরার পর উত্ত্যক্ত করে। আমাদেরকে চোর বলে গালি দেয়। বলে, আমরা নাকি সংখ্যায় অনেক। যখন আমি ওদের নিবৃত্ত করতে বাড়ির বাইরে গেলাম তখন ওদের বাপ-মা আরও খারাপ খারাপ কথা বলল। আমি বেশ চিন্তিত, ওরা রাস্তার পাশে আড্ডা দেওয়ার জায়গায় জড়ো হওয়া লোকদের অংশ। ওদের হাতে আড়াআড়িভাবে ভেদ করা দুটি পতাকা থাকে। পাশ দিয়ে কেউ গেলে তার হাতে লিফলেট ধরিয়ে দেয়। কিছু প্রতিবাদ সভায় অংশ নেয়। প্রত্যেকে হাতটা একই কোণে শক্ত করে প্রসারিত করে ঝাঁকুনি দিয়ে সেøাগান দেয়। একদিন আমরা সাতজন একসঙ্গে যখন বাড়ি ফিরছিলাম তখন অন্য ভাড়াটিয়ারা আমাদের ঘরে ঢুকতে দিচ্ছিল না। মহিলারা চিৎকার করতে করতে আঙিনা আটকে দিলো। বলল, ‘কাঁথা-বালিশ গুটিয়ে নাও।’ ওদের সবাইকে দাঁড়কাকের মতো দেখাচ্ছিল। মাথার চুল ঘন, কালো আর ভ্রƒ দুটো সুপ্রতিসম। অবশেষে ওদের পাশ কাটিয়ে ঘরে ঢুকি। কিন্তু বাচ্চারা কান্নাকাটি শুরু  করল। ভেবেছিলাম, ঘরে ঢুকতে দরজার কাছে সমস্যা হবে। প্রতিবেশীদের কেউ হয়তো মাস্তানি করবে। কিন্তু কেউ বাধা দিল না। দরজায় কোনও লিফলেটও লাগানো হয়নি। বাঁকা হাতলটা ছাড়া।

কিন্তু ঘরে ঢোকার পর দরজা-জানালা লাগানো হলেও ওগুলোর ফাঁক গলিয়ে ওদের কথাগুলো ঘরে প্রবেশ করে আমাদের সূর্যালোকে ঝলমলে ঘরটাকে অন্ধকারে ভরিয়ে দিচ্ছিল। বৃষ্টি হবার পূর্বে যেমন আকাশে কালো মেঘ জমে, ঠিক তেমন। পরিবেশ আবার ভারী হয়ে উঠল। আমার স্ত্রী বাইরে যেতে ভয় পেল। গাছ বা চলন্ত সিঁড়ির জন্য নয়। ঐ দাঁড়কাকের মতো দেখতে মহিলারা, আর ওদের কর্কশ চেঁচামেচির জন্য। ক্যাম্পের একেবারে শেষ প্রান্তে বসবাসরত বৃদ্ধ বিধবা আমাদের থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখতে শুরু করল। এখন আর আমার স্ত্রীকে চা খেতে ডাকে না। বাচ্চাদেরও চকলেট দেয় না। একদিন সিঁড়িতে দেখা হলে আমার দিকে বেদনাক্লিষ্ট চোখে তাকিয়ে তাড়াতাড়ি চলে যায়। কালক্রমে এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে পুলিশ ও রিপোর্টাররা। অভিযোগ দাখিল করা হলো। এমনকি সংবাদপত্রে একটি ছবিসহ খবরও ছাপা হলো। সেখানে আমার স্ত্রী মাথা নিচু করে চোখের ওপর শক্ত করে হাত রেখে হেঁটে যাচ্ছে, আর তার চারপাশ থেকে দাঁড়কাকের মতো মহিলারা চিৎকার করে চলেছে। আরেকটা ছবিতে দেখা যায়, আমাদের সন্তানরা জানালায় বসে আছে। ওরা বিস্মিত চোখে ক্ষ্যাপা লোকগুলোর দিকে তাকিয়ে আছে। এরা ধীরে ধীরে বড় হয়ে উঠবে। সেই ভাষায় কথা বলবে যে ভাষা শুনলে আপনার মনে হবে, ওরা আমাদের ভাষায় কথা বলছে না। দাঁড়কাকের মতো মহিলাদেরও ছবি ছিল ঐ পত্রিকায়। এক মহিলার একটা উদ্ধৃতিও ছাপা হয়। বলে, আমাদের মতো মানুষদের সে ভয় পায়।

এক মহিলা রিপোর্টার কয়েকবার আমাদের সঙ্গে দেখা করতে আসেন। উনি আমাদের যে কোনওভাবে সাহায্য করতে চান। মহিলাটি বেঁটে, লিকলিকে, সাদা চামড়ায় ঢাকা তাঁর পুরো শরীর। মাথার চুল আফ্রিকান স্টাইলে বেণি করা। তিনি বিশ্বাস করেন, আমাদের ঐ বাড়িতে বাসবাসের অধিকার রয়েছে। অন্য সব ভাড়াটিয়ার আচার-আচরণ প্রকাশ করে দেওয়া ও এর প্রতিবাদ করা উচিত। এ কারণেই তিনি আমাদের সঙ্গে দেখা করে সাক্ষাৎকার নিয়ে আমাদের দুঃখের গল্প ও বিষয়টি নিয়ে আমাদের ধারণা সবার মাঝে ছড়িয়ে দিতে চান। আমি আমার দেশ থেকে আসা লোকদের ছাড়া কারও কাছে ব্যক্তিগত ব্যাপার নিয়ে কিছু বলিনি। একজন তরুণ সুন্দরী মহিলা, যে আমার স্ত্রী, তার সঙ্গে কাটানো ব্যক্তিগত জীবনের গল্প কাউকে বলতে চাইনি। তাই গল্পে আমি সচরাচর একাই থাকি। ব্যাপারটি ওর কাছেও ভালো লাগে না। আর ওই রিপোর্টার মহিলাকে আমার স্ত্রী বিশ্বাস করতে পারে না। ওর মতে, রিপোর্টার এক ভবঘুরে মহিলা। আমার মনে হয়, সে রিপোর্টারের ব্যাপারে ঈর্ষাকাতর। আমরা শহরের কেন্দ্রস্থলের একটি চত্বরে বসব বলে ঠিক করলাম। দেখলাম, উনি বিশাল এক ছাতার নিচে স্কাই ব্লু রংয়ের গোল একটা টেবিলে বসে আমার জন্য অপেক্ষা করছেন, আর বরফ দেওয়া চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছেন। হাতে পাতার তৈরি চুরুট। ওর পায়ের কাছে বিরাট এক কুকুর ঘুমিয়ে রয়েছে। তাঁর মধ্যে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে বলে মনে হলো। আমার সঙ্গে একেবারে বন্ধুসুলভ আচরণ করলেন। আমি কথা বলার সময় তিনি মুখটা তুলে আমার দিকে তাকালেন এবং বাম হাতে নোট লিখে গেলেন, আমাদের কথোপকথন রেকর্ড করা সত্ত্বেও। এক পর্যায়ে রিপোর্টারের মোবাইল ফোন বেজে উঠল। তাঁর বস ফোন দিয়েছেন। সুসংবাদ দিলেন, এই সাক্ষাৎকার আগামীকালের পত্রিকায় ছাপা হবে।

আমি তাঁকে অনেক বিষয় নিয়ে বললাম। শুধু গত কয়েক মাসের ঘটনা যে বর্ণনা করলাম, তা নয়। আমার শৈশব, সেই শৈশবে ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাক, যা আজও আমার মন ও মননে গেঁথে আছে এবং আমার স্ত্রীর হাতে ঝিঁঝিঁ পোকা যে বিড়বিড় করে বেয়ে উঠেছিল, সে কথাও বললাম। মার কথাও বললাম। মার মাথায় লম্বা, ঘন কালো চুল ছিল এবং তা তিনি রাতের বেলা বেণি করে রাখতেন। বাবার কথাও বললাম যে, তিনি ঘড়ি ঠিক করতেন। কিন্তু কখনও বিশ্রাম নিতেন না। যা যা বললাম তার সবকিছু রিপোর্টার মনোযোগ দিয়ে শুনলেন। পরে অবশ্য তিনি বললেন, পত্রিকার উপযোগী করার জন্য আমার সাক্ষাৎকার কাটছাঁট করবেন। আমাকে বলে যেতে বললেন। আমার মনটা হালকা লাগল। সমুদ্রের গভীরে ডুব দিয়ে ওঠার পর একেবারে পরিচ্ছন্ন হাতে, ঠান্ডা ও ভেজা চুলে একটা স্যান্ডউইচ খেতে যেমন মজা লাগে, ঠিক তেমন মজা লাগল। রিপোর্টার আমাকে অ্যাপার্টমেন্ট না ছাড়ার পরামর্শ দিলেন। যাওয়ার আগে তিনি কয়েকটা ছবি তুললেন। সেই আকাশি রংয়ের টেবিলে বসেই। মনে প্রশান্তি নিয়ে বাড়ি ফিরলাম। ভাবলাম, আমি আমার পরিবারটিকে বাঁচিয়েছি, আর ঐ দাঁড়কাকের মতো মহিলাদের পরাভূত করেছি। কল্পনা করলাম, অনেক লোক আমাদের কথোপকথন পড়বে এবং প্রশংসা করবে। এমনকি শহরটি যারা চালান, যেমন―মেয়র, আইনজীবী, সিনেটর―এমন সব সম্মানীয় ও ক্ষমতাধর লোকজনও প্রশংসা করবে।

পরের দিন সকালে একটি পত্রিকা কিনব বলে গেলাম সংবাদপত্রের দোকানে। প্রতিটি পাতায় তন্ন তন্ন করে আমার ছবি খুঁজলাম। পেলাম না। সাক্ষাৎকার নেই সেখানে। রিপোর্টার একটি বার্তা পাঠালেন। বললেন, আগামীকাল ছাপা হবে। এটা অস্বাভাবিক কোনও ঘটনা নয়। ধৈর্য ধরতে হবে। কিন্তু পরের দিনও সাক্ষাৎকার ছাপা হলো না। তার পরের দিনও না। তিনি ব্যাখ্যা করে বললেন, একটি গ্লোবাল ব্রেকিং নিউজের জন্য বসকে সব খবর নতুন করে সাজাতে হয়েছে।

এদিকে বাড়িতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হলো। দাঁড়কাক সংখ্যায় যত বাড়তে লাগল পুলিশের সংখ্যা তত কমতে লাগল। আগের চেয়ে আরও বেশি সংখ্যক ছেলেপুলে পকেটে চাকু নিয়ে ঘুরতে লাগল। আমি আর ঘুমাতে পারছিলাম না। এখন আর সূূর্যের আলোয় বা পাখির কলকাকলিতে আমার ঘুম ভাঙছিল না। ঐ খসখসে সাদা ছায়া অন্ধকার ও দিনের আলোয় ঘুরঘুর করে বেড়ায়। ঐ ধূসর আবছা আলোয় আমার স্ত্রী যখন ঘুমায়, তখন তার চোখেমুখে অস্বস্তি দেখি। বুঝতে পারলাম না, কী করব। কোথায় যাব। এখন শুধু একটা পথই খোলা আছে বলে মনে হয়। যে বাড়িটা শুরুতে আমাদের এত আনন্দ দিয়েছে সেটি এবার ছাড়তে হবে। আর কোনও সমাধান নেই। ইতিমধ্যে একদিন আমার স্ত্রী আমাদের জমানো সব টাকা বের করে বাচ্চাদেরসহ তার দেশে ফেরার জন্য উড়োজাহাজের টিকিট কেটে ফেলল। দেশে অনেক বিপদ থাকা সত্ত্বেও অন্ততপক্ষে এমন অসম্মান তো আর ভোগ করতে হবে না। ওদেরকে যেতে দেখতে আমার খারাপ লাগবে। কিন্তু আমার মনে হলো, ও ঠিক কাজটাই করছে।

ওদের সঙ্গে ট্রেনে চেপে বিমানবন্দরে গেলাম। আমার স্ত্রী বলল, মাত্র কয়েক মাস থাকবে। আমাদের সুস্থতার জন্য এটুকু দরকার। ইতিমধ্যে আমি নতুন একটা জায়গা ঠিক করে ফেলব। ও হতাশ হয়ে পড়েছে। কিন্তু লম্বা সুতি কাপড়ে ওকে সুন্দর দেখাচ্ছিল। সুযোগ পেলেই ফোন করতাম। ফোনের স্ক্রিনে আমাদের বাচ্চাদের দেখতে শুকনা, ঝাপসা মনে হতো। ওরা আমার দিকে হাত নাড়তো। চুমু দিত আমাকে।

পুরাতন বই বিক্রেতা যখন আমার অবস্থার কথা শুনলেন তখন বললেন, তাঁর বাড়ির বেজমেন্টে একটা ঘর আছে যা আমি গুদাম হিসেবে ব্যবহার করতে পারি। কিন্তু আমাকে সেজন্য অপেক্ষা করতে হলো। ইতিমধ্যে আমার এক বন্ধুর মারফত কেন্দ্রীয় রেলস্টেশনের পেছনের এপার্টমেন্টে একটা ঘর পেলাম। ওকে ধন্যবাদ। ঐ ঘরটা আরও সাতজনের সঙ্গে ভাগাভাগি করলাম। ওরা সবাই একই শহর থেকে এসেছে। একে অপরের সঙ্গে ওরা যে ভাষায় কথা বলে, তা আমি বুঝি না। ওদের একজন রান্না করে। দেরিতে খায়। রাত প্রায় এগারটায়। বড় পাতিলে ভাত রান্না করে। সঙ্গে মাংস আর মসুর ডাল। খুব ভারী খাবার। হজম করতে আমার কষ্ট হয়। বাড়িটা স্যাঁতস্যাঁতে। গুমোট। আমার ঘুম খুব কম হয়। প্রতি আধা ঘণ্টা পর পর চোখে, মুখে, কানে মশার কামড়ে ঘুম ভেঙ্গে যায়। প্রতি রাতে মনে হতো, ঘুম যেন আমাকে ছেড়ে পালিয়ে গেছে। সকাল বেলায় নিজেকে পরাস্ত ও একাকিত্বে ভোগা সৈনিকের মতো মনে হতো। অবচেতন মনটাও সায় দিত না।

নরকের মতো ঐ অ্যাপার্টমেন্টে সপ্তাহখানেক কাটানোর পর আমি ঐ রিপোর্টারকে ফোন দিলাম। উনি জানতে চাইলেন, আমি কেমন আছি। যখন বললাম আমার পরিবার দেশ ছেড়ে চলে গেছে, তখন তিনি হতাশ হলেন। একটা কফি হাউসে আমাদের সাক্ষাতের ব্যবস্থা করলেন। তার সঙ্গে সাক্ষাতের ব্যাপারটা ভাবতেই মনটা চনমনে হয়ে উঠল। তিনি সাক্ষাতের আগেই বললেন, আমাদের সাক্ষাতের সময়টা পুনর্নির্ধারণ করতে হবে।

কফি হাউসটা ছোট্ট। পৌঁছে দেখলাম, বন্ধ হয়ে গেছে। হাতের কাছে একটা প্লাস্টিকের চেয়ার পেয়ে রাস্তার পাশে বসে পড়লাম। কফি হাউসের কর্মচারী কিছু বললেন না। উপরন্তু, এক গ্লাস পানি পর্যন্ত সাধলেন। সাদরে গ্রহণ করে শান্তি পেলাম। সে সময় রাস্তায় বেশ বাতাস। গাছগুলো খসখস শব্দ করছে। সরু ডালগুলো কাণ্ড থেকে বড়শির মতো বেরিয়ে এসেছে। ঠোঁটে একটা সিগারেট ধরে কর্মচারী কফি হাউসটি ঝাড়ু দিচ্ছে।

এক পর্যায়ে একজন জ্যেষ্ঠ ভদ্রলোক এলেন। হালকা নীল রংয়ের হাফ হাতা শার্ট পরা। একটু ইতস্তত করতে লাগলেন। বললাম, ‘ওরা দোকান বন্ধ করে ফেলেছে।’ যখন দরজার দিকে এগোচ্ছিলেন, তখন কথাগুলো বললাম। প্রত্যুত্তরে তিনি কিছুই বললেন না। হয়তো আমার কথা শোনেনইনি। দরজার কাছে কর্মচারী যে ডাস্টবিনটা রেখেছেন সেটি ডিঙিয়ে জ্যেষ্ঠ ভদ্রলোক সামনে যেতে উদ্যত হলেন। নতুন কোনও খদ্দেরকে ঢুকতে দেবেন না বলে কর্মচারী এ কাজ করেছেন।

‘বন্ধ হয়ে গেছে,’ কর্মচারী বললেন।

‘আমার তেষ্টা পেয়েছে।’

‘আপনি কী চান ?’

‘একটা চিনোটো।’

কর্মচারী একটা গ্লাস আর একটা ছোট বোতল নিলেন। তারপর গ্লাসে ঢেলে দিলেন। লোকটি কাউন্টারে হাতের কনুই দুটো ঠেস দিয়ে গিলে ফেললেন। এরপর আমার পাশে বসে পড়লেন। বলতে দ্বিধা নেই, আমি খানিকটা অবাক হলাম। হতে পারে, তাকে দেখে আমার হিংসে হলো। কফি হাউসে তিনি বেশ স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন তো, তাই। তিনি কর্মচারীকে পাত্তা দেন না। কোনও ঝামেলারও ভয় পান না। তাঁকে দেখে মনে হলো, সারাটা জীবন আমি নিজে একজন অনুপ্রবেশকারী হিসেবে কাটিয়েছি। সারাটা জীবন, এমনকি এখনও নিজের একটা জায়গা পাইনি। সর্বশেষ, আমার পরিবারটাও চলে গেছে। ঐ দাঁড়কাকের মতো মহিলাগুলোর তোপের মুখে আমার কী আর করার আছে ?

ঠিক সেই মুহূর্তে কল্পনা করলাম, আমার স্ত্রী কফি হাউসের দিকে হেঁটে হেঁটে আসছে। বোরকা পরা। পরনে লম্বা সুতি পোশাক। লম্বা পোশাকটি পায়ের সঙ্গে বারবার ধাক্কা খাচ্ছে। বাচ্চা বহনকারী একটা চাকাওয়ালা গাড়ি ঠেলতে ঠেলতে এদিকে আসছে। বাচ্চাটার হাতে একটা বিশাল ধনুক। আর ছয় বা সাত বছরের একটা ছেলে ওদের সামনে হেঁটে হেঁটে আসছে। সে তার ফোনের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে। সত্যি সত্যিই মনে হলো, ও তো আমার স্ত্রীই। কিন্তু একটু পরেই বুঝলাম―এ তো মনের ভ্রম। বুঝতে পারলাম, ওটা অন্য আরেকজন মহিলা। অন্য এক সন্তানের মা, অন্য একজনের স্ত্রী। রাস্তার মোড়ে অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত ওই মহিলার দিকে তাকিয়ে রইলাম। আমার পাশে বসা জ্যেষ্ঠ লোকটি আগ্রহ ভরে মহিলাটির দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর বিড় বিড় করে কী জানি বললেন। শুনতে পেলাম না। আমাকে একটু হতবিহবল দেখে তিনি আবার বললেন, ‘বললাম, এই গরমে―।’

‘কী ?’

‘ঐ মহিলা পুরো শরীর ঢেকে রেখেছে।’

তাকে বলতে পারতাম, ঐ পোশাক তৈরির জন্য যে কাপড় ব্যবহার করা হয়, তা আসলে হালকা, সুতির। এটি সূর্যের ক্ষতিকারক রশ্মি আটকে দেয়। তাকে আরও বলতে পারতাম, গির্জা বা মিউজিয়ামে দেখতে পাওয়া অভিজাত মহিলাদের মতো দেখতে লাগছে ঐ মহিলাটিকে। ঠিক আমার স্ত্রীর মতো। কিন্তু আমি মুখ খোলার আগেই ভদ্রলোক বললেন, আগামী বিশ বছরের মধ্যে সব জায়গায় শুধু ওদেরকেই দেখা যাবে।

তৎক্ষণাৎ কফি হাউস থেকে বেরিয়ে পড়লাম। ঐ জঘন্য লোকটার কাছ থেকে সরে গেলাম। উনি নিজেও একটা দাঁড়কাক। শুধু ঐ মহিলাকে নয়, আমার স্ত্রীকেও অপমান করেছেন। ভাবলাম, এমন পোশাক পরে আমাদের বাচ্চাকাচ্চা সব সঙ্গে নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হাঁটা আমার স্ত্রীর জন্য কতটা কঠিন, বিশেষ করে, যখন এমন ধারণা পোষণ করে লোকজন তার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। তাকে কোনও বিশাল এবং অভিজাত প্রাণী মনে করে। এবার বুঝলাম, কেন সে এ দেশ ছেড়ে চলে গেছে। আশঙ্কা হলো, সে হয়তো আর কখনও এদেশে ফিরে আসবে না।

বাড়ি ফিরে গেলাম। কিন্তু রাতে এতই গরম পড়লো যে, শেষ রাতে হাঁটতে বেরিয়ে পড়লাম। নদী পার হয়ে পাশের এলাকার একটা খোলা বাজারে এসে পড়লাম। ওখানে শুধু রবিবার করে যেতাম। যখন সব স্থান কানায় কানায় ভরে যায় এবং একটা দোকানও আর বসানোর জায়গা থাকে না, তখন ওখানে যাই। হাঁটতে হাঁটতে বজ্রপাতের শব্দ শুনতে পেলাম। শুরু হলো প্রচণ্ড বৃষ্টি। একটা আন্ডারপাসের নিচে আশ্রয় নিয়ে বৃষ্টি থামার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। ওখানে একটা কাঠের বাক্স রাখা ছিল। ওর ওপর বসে পড়লাম। পরিষ্কার ও প্রশান্তিময় জায়গা। আশেপাশে কেউ নেই। সাধারণত এর মধ্য দিয়ে অনবরত গাড়ি চলাচল করে। কিন্তু এই মুহূর্তে এটি একেবারে ফাকা, সুনসান। এর দুই পাশে ধার ঘেঁষে দুটি প্রশস্ত পায়ে হাঁটা পথ। দেয়ালের সঙ্গে মাথাটা ঠেস দিয়ে বসলাম। পা ছড়িয়ে দিলাম। এরপর হালকা একটা ঘুম দিলাম। জেগে ওঠার পর মনে হলো না যে, কোনও রকম ঝিমুনি বোধ রয়েছে। মনে হলো, ঘুমটা ভালোই হয়েছে।

পরের দিন সকালে আমার জিনিসপত্র সব গোছগাছ করে নিলাম। একটা ম্যাট্রেস আর একটা কম্বলই আমার সম্বল। দিনের বেলা আন্ডারপাসে কিছু সস্তা বইপুস্তক বিক্রি করি। এতে আহামরি কিছু আয় হয় না। মাঝে মাঝে কেউ কেউ টাকা দেয়। কিছু অতিরিক্ত টাকাও দেয়। সেটা দিয়ে আমি স্যান্ডউইচ কিনতে পারি। এক লোক আন্ডারপাস পরিষ্কার করতে আসে। কিছু পয়সা পায়। ঐ পয়সা নিয়ে আমরা দুজনে স্যুপ কিচেনে যাই গরম খাবার কিনতে। ওখানে গিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে যাই। যানবাহনের শব্দ শুনে ঘুম ভাঙ্গে। ক্যাম্পের মতো নয়। এই জায়গাটা অন্ততপক্ষে আমার নিজের। কোনও কোনও দিক থেকে জায়গাটা বড়ই মনে হয়। লম্বা, সরু, প্রাসাদতুল্য। বড় বড় দুটি জানালা। দুপাশে খোলা। গাড়িগুলো আমার পাশ দিয়ে যাতায়াত করে। বৃষ্টি হলে পথচারীরা কয়েক মিনিটের জন্য থামে। বৃষ্টি ছাড়ার অপেক্ষায় থাকে। কেউ আমাকে নিয়ে মাথা ঘামায় না।

ঘুমিয়ে পড়ার আগে মনে হয়, যেন আমাদের সেই জ¦লজ¦লে আলোকিত বাড়িতেই আছি। ভাবি, মৃদু আলো আমার স্ত্রীর সরু পা দুটোতে পড়েছে। তার ঘন কালো চুল বালিশের ওপর ছড়িয়ে রয়েছে। কিন্তু পরক্ষণেই আবার সংবাদপত্রে ছাপা হওয়া তার ছবির কথা মনে পড়ে। মুখমণ্ডল ঢেকে রাখা তার দু হাত। আর একটা ছবিতে দেখা যায়―বাচ্চারা জানালায় খেলছে। পেছন থেকে আপনি তাদের চোখে-মুখে ভীতির চিহ্ন দেখবেন না। কিন্তু আমার সে-ব্যাপারটা  মনে আছে। এই আন্ডারপাস দিয়ে যারা হেঁটে যায়, আমার বিশ্বাস, তাদের প্রত্যেকের ফোনে এই ছবিগুলো রয়েছে। যারা গাড়ি চালিয়ে যায় এই আন্ডারপাসের মধ্য দিয়ে বা ওপর দিয়ে, তাদের ফোনেও আছে। এখানে যত দোকানদার রয়েছে, যারা বাস ধরার অপেক্ষায় রয়েছে, তাদের ফোনেও এই ছবিগুলো রয়েছে। এরা সবাই ঐ ছবিগুলোর ভার বয়ে বেড়াচ্ছে। এ কথা ভাবলে আমার বুকের ভেতরে গুমরে গুমরে ওঠা বেদনা কিছুটা কমে। একদিন এক পর্যটক থামলেন এবং আমার কয়েকটা ছবি তুলতে চাইলেন। ভাবলেন, আমি মনে হয় ঘুমিয়ে পড়েছি। কিন্তু আমি তখনও ঘুমাইনি। উনি আমার ছবি তুলে কী আর করবেন ?

ঘুম থেকে উঠে পড়লাম। রাগ হলো আমার। তাঁর সঙ্গে একটু আলাপ সেরে নিলাম। তারপর আমার ছবি তুলতে দিলাম। তাঁকে আক্রমণ করে লাভ নেই। কী আর বলব ? দোকানের সামনে একটু থামলাম। আমি তো এখন শুকিয়ে গেছি। দাড়ি উষ্কখুষ্ক। দেখে মনে হবে, আমি আর আমার মাঝে নেই। একটি চিরুনি কিনতে চাই। গোসল করতে চাই। আন্ডারপাসের অন্ধকার পরিবেশে আর ফিরে যেতে চাই না। আরও সাতজনের সঙ্গে এপার্টমেন্টেও ফিরে যেতে চাই না। বেইজমেন্টের জন্যই আমাকে আজীবন অপেক্ষা করতে হবে।

পকেটে যে পয়সাটুকু ছিল, তা দিয়ে মেট্রোর টিকেট কেটে শহরের উপকণ্ঠে চলে গেলাম। স্মৃতিকাতরতায় ভুগছিলাম। যে বিল্ডিং-এ একসময় আমার পরিবার নিয়ে থাকতাম, সেই বিল্ডিংটা দেখার খুব ইচ্ছে হলো। অন্ততপক্ষে বাইরে থেকে হলেও ছেঁড়া সামিয়ানাটা দেখতে চাইলাম। বেলকনি থেকে বাইরের দিকে ঝুলে পড়া জবা ফুলের থোকাও দেখতে মন চাইলো। নলখাগড়ার ধারালো পাতাগুলোও মিস করি। শরীরে উষ্ণতা ছড়িয়ে দেওয়া নরম রোদ, মাঝে মাঝে উড়োজাহাজ উড্ডয়নের শব্দ, গাংচিল এবং ওদের উন্মত্ত চিৎকার আমাকে স্মৃতিকাতর করে দেয়। ওই বাড়িতে এখন কারা থাকে―সেটি জানতে ইচ্ছে করে। হতে পারে, সেই দাঁড়কাকের মতো মহিলাদের একজন। ওদের উৎপাতে আমরা বাড়ি ছেড়েছিলাম। আর কিছু কি পেছনে ফেলে গিয়েছিলাম ? আমার সন্দেহ হয়। দরজার পেছনের দেয়ালে আঁকা পেন্সিলের দাগগুলো। সেগুলো সেই বসন্তকালে এঁকেছিলাম আমাদের সন্তানরা কে কত লম্বা তা মাপার জন্য ?

হাসপাতালে যাওয়ার পথটা দেখলাম। ভেতরে গিয়ে ঝোপ ও ফুলগাছগুলোর মধ্য দিয়ে হাঁটতে লাগলাম। এক মধুর স্মৃতি আমাকে ঘিরে ধরল। একদিন এই পথে আমার স্ত্রীর সঙ্গে হাঁটতাম। বাচ্চারা আমাদের ঘিরে খেলাধুলা করত। ভাবলাম, বেঞ্চিতে বসে আরাম করব। কিন্তু সবই দখল হয়ে গেছে। একটা বেঞ্চ অবশ্য তখনও খালি রয়েছে। তবে এর ওপরের কাঠের পাটাতন নেই। শুধু পেছনে হেলান দেওয়ার অংশটি রয়েছে। কাজেই, হাসপাতালের চারপাশের রাস্তা ধরে হাঁটতে লাগলাম। তারপর লাশকাটা ঘরের পাশ দিয়ে গেলাম। ওখানে এমন একটা কিছু দেখতে পেলাম যা আমি এই শহরে অনেক দিন ধরে থাকলেও কোনও দিন দেখিনি। চারপাশে ঝাঁকে ঝাঁকে মথ উড়ছিল। কালো। ক্ষ্যাপাটে। ওদের কোনও গন্তব্য নেই। আমার ভালো লাগল না। ওগুলো ঐসব সাদা প্রজাপতি নয় যেগুলোকে আমি সমুদ্রের জলের উপর দিয়ে উড়তে দেখেছি।

ক্লান্ত লাগছিল। দিনটাও ভ্যাপসা, গরম। কাজেই একটা ছায়াযুক্ত গাছের নিচে বসে থাকলাম। নিচে দাঁড়িয়ে ওপরে এর ডালপালার দিকে তাকালাম। মথগুলো ডাল থেকে জলপ্রপাতের মতো ঝুলে আছে। চোখের সামনে বিরক্তিকর মথগুলো যখন উড়াউড়ি করছিল, তখন ঘুমিয়ে পড়লাম। মাথার উপরের পাতাগুলো আলতোভাবে ভয়ে ভয়ে কাঁপছিল। ফুলের পরাগের মতো কিছু একটার জন্য আমার চোখগুলো জ্বালা করছিল। পাতার ফাঁক দিকে আকাশ দেখতে পাচ্ছিলাম। তবে এটি সেই বিশাল আকাশ নয় যা একসময় প্রতিদিন সকালে আমাদের অভিবাদন জানাতো। গাছের পুষ্পমঞ্জরীগুলো আকাশকে চিবিয়ে খেয়ে ফেলেছে। প্রত্যেকটি জিনিস আলাদা, স্বতন্ত্র।

যখন ঐ আকাশের দৃশ্যগুলোর কথা ভাবছিলাম তখন যে বইগুলো আমি বাজারে বিক্রি করেছিলাম সেগুলোর কথা মনে পড়ে গেল। কোনও কোনও বই তো খুব দামি। প্লাস্টিকের প্যাকেটে মোড়ানো। পাতাগুলো প্রায় নষ্ট হয়ে গেলেও বইগুলো মূল্যবান। চোখ বন্ধ করে বসেছিলাম। কিন্তু চোখের পাতার পেছনের দুনিয়াটা অন্ধকারও নয়, স্থবিরও নয়। সব সময় চলছে। একটা টার্গেট অনেকগুলো বৃত্তবেষ্টিত। এক বিন্দুতে গিয়ে স্থির হলে আমার স্ত্রীকে দেখতে পেলাম। তার চোখ, চোয়ালের হাড়, চমৎকারভাবে বাঁকা ভ্রƒ মুচকি হাসিও। এক প্রশান্তি মাখা মুখ। সত্যিই। তব সেই অপচ্ছায়ার মধ্যে আমি তাকে দেখতে পেলাম। ঐ মরীচিকা শুধুই আমার। আমার স্ত্রী ও তার বড় গাছ ভীতির কথা মনে পড়লো। গাছগুলো অকস্মাৎ ভেঙ্গে পড়ে মানুষের মাথায় । তাকে বলার ইচ্ছে হলো, এই গাছগুলো কোনও ক্ষতি করেনি। বরং আমাকে রক্ষা করেছে। এতে কোনও ক্ষ্যাপা ঝিঁঝিঁ পোকাও নেই যেটি অকস্মাৎ পাতাগুলোর মধ্য থেকে ঝাঁপিয়ে পড়বে। তারপর আমার হাতে ঝুলবে। দূর থেকে এইসব শক্ত, মজবুত শিকড়গুলো দেখতে আলোহীন, অন্ধকার উপত্যকার মতো দেখায়।

ঘুম থেকে জেগেই চিন্তা করলাম, এরপর কোথায় যাব। মথগুলো আমাকে রেল স্টেশনের দিকে নিয়ে গেল। আমি শুধু মজার বিষয়গুলো নিয়ে ভাবতে লাগলাম। আমার পায়ের চারপাশে হলুদ, লাল পপির চারা গজাচ্ছিল। রেল লাইনের দুই ট্র্যাকের মাঝখানে।

সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button