আর্কাইভবিশেষ রচনা

বিশেষ রচনা : দ্রোহ-বিদ্রোহ ও মানবতাবাদী চেতনা নজরুলের কবিতা : আবুল কালাম আজাদ

বাংলা সাহিত্যের এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তাঁর জন্ম ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দের ২৪ মে (১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ জ্যৈষ্ঠ) ব্রিটিশ শাসিত ভারতবর্ষের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার চুরুলিয়া গ্রামে। তিনি একাধারে কবি, কথাসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক, নাট্যকার, গীতিকার, সুরকার, চলচ্চিত্র অভিনেতা ও সাংবাদিক। বাংলা কাব্য ও কথাকলার নানা শাখায় তাঁর ছিল অবাধ বিচরণ। বাংলা সাহিত্যের প্রথাগত ধারার বাইরে এসে তিনি বাঙালির আবেগ অনুভূতিকে প্রাধান্য দিয়ে মনন, মেধা ও লেখনীশক্তি দ্বারা ব্রিটিশরাজের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছেন। মাত্র আট বছর বয়সে পিতাকে হারিয়ে নজরুলের পরিবার চরম দারিদ্র্যে পতিত হয়। দুঃখের সঙ্গে সন্ধি করে চলতে চলতে তাঁর ডাকনাম হয়ে যায় ‘দুখু মিয়া’। জীবন ও জীবিকার তাগিদে নজরুলকে নানা কাজ ও পেশার সঙ্গে পরিচিত হতে হয়। ১৩১৬ বঙ্গাব্দে তিনি গ্রামের মোক্তব থেকে নিম্ন প্রাইমারি পাস করে সেখানেই এক বছর শিক্ষকতা করেন। ছেলেবেলা থেকেই নজরুল ছিলেন অসম্ভব মেধাবী ও পরিশ্রমী। বারো বছর বয়সে এক লেটো গানের দলে যোগ দেন এবং দলের জন্য পালাগান রচনা করেন। পরে কাজ করেছেন রুটির দোকানে। কিছুদিন বর্ধমানে ও ময়মনসিংহের ত্রিশাল থানার দরিরামপুর হাই স্কুলে লেখাপড়া করেন। তবে স্কুল গণ্ডির বাঁধাধরা নিয়ম তাঁর ভালো লাগত না। ছেলেবেলা থেকেই নজরুল সৃষ্টিশীল সত্তার অধিকারী হয়ে ওঠেন। তিনি প্রথাগতভাবে বিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করতে পারেননি। দশম শ্রেণির ছাত্র থাকাকালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ (১৯১৪-১৯১৯) শুরু হয়। নজরুল ১৯১৪ সালে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর ৪৯ নম্বর বাঙালি পল্টনে সৈনিক হিসেবে যোগ দেন এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশ নিতে করাচি যান (করাচি অধুনা পাকিস্তানের একটি প্রদেশ)। নজরুলের দক্ষতা ও কর্তব্যপরায়ণতা দেখে কর্তৃপক্ষ তাঁকে সৈনিক থেকে হাবিলদার পদে উন্নীত করে। ১৯১৯ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলে বাঙ্গালি পল্টন ভেঙে দেওয়া হয়। নজরুল চাকরি হারিয়ে বেকার হয়ে পড়েন। জীবনের চরম বাস্তবতায় দুঃখের কষ্টিপাথরে নজরুল নিজেকে শাণিত করেছেন। ছেলেবেলা থেকেই তিনি বাংলা, ইংরেজি, আরবি, ফারসি প্রভৃতি ভাষায় পারদর্শী ছিলেন। জীবনের নিখাদ বাস্তবতায় পড়ে একাডেমিক ডিগ্রি অর্জন করতে না পারলেও সৈনিক জীবনে নজরুল করাচির সেনাগ্রন্থাগারে বসে ব্যাপক পড়াশোনা করার সুযোগ পান। আরবি-ফারসি সাহিত্যের বাঘা বাঘা কবির কাব্য পড়ে তিনি সম্যক জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছেন। এভাবেই নজরুল স্বশিক্ষিত হয়ে ওঠেন।

নজরুলের আবির্ভাবের আগেই বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের (১৮৬১-১৯৪১) স্বচ্ছন্দ বিচরণ ছিল। তিনি ছিলেন বাংলা সাহিত্যের একটি প্রতিষ্ঠান, যুগদ্রষ্টা। বাংলাভাষা ও সাহিত্যকে বিশ্ব-দরবারে প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। ১৯১৩ সালে গীতাঞ্জলি কাব্যের জন্য নোবেল পুরষ্কার প্রাপ্তি বাংলা সাহিত্যকে নিয়ে যায় এক অনন্য উচ্চতায়। নজরুলের সমসাময়িক কবিদের মধ্যে সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত (১৮৮২-১৯২২), যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত (১৮৮৭-১৯৫৪),  জীবনানন্দ দাশ (১৮৯৯-১৯৫৪), প্রেমেন্দ্র মিত্র (১৯০৪-১৯৮৮), বুদ্ধদেব বসু (১৯০৮-১৯৭৪), সুধীন্দ্রনাথ দত্ত (১৯০১-১৯৬০), বিষ্ণু দে (১৯০৯-১৯৮২), অমিয় চক্রবর্তী (১৯০১-১৯৮৬), সমর সেন (১৯১৬-১৯৮৭), জসীমউদ্দীন (১৯০৩-১৯৭৬) প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। 

১৯২০ সালের শুরুর দিকে নজরুল করাচি ছেড়ে  কলকাতায় চলে আসেন এবং পরিপূর্ণভাবে সাহিত্যচর্চায় আত্মনিয়োগ করেন। এ সময় সাপ্তাহিক বিজলী (১৯২০) পত্রিকায় ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি (৬ জানুয়ারি, ১৯২২) প্রকাশিত হলে তাঁর কবিখ্যাতি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। তিনি কবিতায় পরাধীনতা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের বাণী উচ্চারণ করেছেন। অবিচার ও শোষণের বিরুদ্ধে তিনি প্রবল প্রতিবাদ গড়ে তোলেন। তাই তিনি ‘বিদ্রোহী’ কবি হিসেবেও সাধারণ মানুষের কাছে পরিচিতি লাভ করেন। নজরুল লিখেছেন :

বল বীর―

বল     চির উন্নত মম শির !

শির নেহারি’ আমারি নতশির ওই শিখর হিমাদ্রির!

বল বীর―১

একই কবিতায় নজরুল অন্যত্র লিখেছেন,

মহা-বিদ্রোহী রণ ক্লান্ত

আমি সেইদিন হব শান্ত,

যবে   উৎপীড়িতের ক্রন্দনরোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না

অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে রণিবে না―

বিদ্রোহী রণ ক্লান্ত

আমি সেই দিন হব শান্ত।২

কবিতায় বিদ্রোহী হলেও মানুষ নজরুল ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী ও দরদি। কবি মানুষকে ভালোবাসতেন অন্তর দিয়ে। তাই তাঁর কবিতায় পাওয়া যায় মানুষের সুখ-দুঃখের কথা, ভারতের পরাজয়ের গ্লানি, ইংরেজদের অত্যাচার এবং পরাধীনতার অভিশাপ থেকে মুক্তির আশাবাদ। তিনি গণমানুষের জন্য দেশাত্মবোধক গান, মুসলমানদের জন্য ‘গজল’ ও হিন্দুদের জন্য ‘শ্যামা-সংগীত’ রচনা করেছেন। নজরুলের কবিতা এবং গান অসাম্প্রদায়িক ও সাম্যবাদী চেতনার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

নজরুল বাংলা সাহিত্যের প্রায় সকল শাখায় বিচরণ করেছেন। নবযুগ (১৯২০), ধূমকেতু (১৩২৯), লাঙল (১৯২৫) প্রভৃতি পত্রিকা সম্পাদনা করেও খ্যাতি অর্জন করেছেন। বাংলা সাহিত্যে নজরুলের আরও একটি বড় অবদান আরবি-ফারসি শব্দের সার্থক ব্যবহার। নজরুলের কাব্যগ্রন্থের মধ্যে অগ্নিবীণা (১৯২২), বিষের বাঁশি (১৯২৪), সাম্যবাদী (১৯২৫), সর্বহারা (১৯২৬), ছায়ানট (১৯২৫), প্রলয়-শিখা (১৯৩০), সিন্ধু-হিন্দোল (১৯২৭), চক্রবাক (১৯২৯), সন্ধ্যা (১৯২৯) প্রভৃতি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এছাড়া ব্যথার দান (১৯২২), রিক্তের বেদন (১৯২৪) এ দুইটি তাঁর গল্পগ্রন্থ। শিউলিমালা (১৯৩১), মৃত্যুক্ষুধা (১৯৩০), কুহেলিকা (১৯৩১) প্রভৃতি উপন্যাস। ঝিলিমিলি (১৯৩০), আলেয়া (১৯৩১), মধুমালা (১৯৫৯), পুতুলের বিয়ে (১৯৬৪) এগুলো নজরুলের নাট্যগ্রন্থ। যুগবাণী (১৯২২), রাজবন্দীর জবানবন্দী (১৩৩৫), রুদ্রমঙ্গল (১৯২২), দুর্দিনের যাত্রী (১৯২৬), ধূমকেতু (১৯২২) প্রভৃতি তাঁর প্রবন্ধ-গ্রন্থ।

আমাদের অন্বিষ্ট নজরুল মানস ও বাংলা কাব্যে মানবতাবাদী চেতনা সম্পর্কে একটি বিশ্লেষণাত্মক আলোচনা উপস্থাপন করা।

কাজী নজরুল ইসলাম একই সঙ্গে বিদ্রোহী ও সমাজ সচেতন কবি। প্রকৃতপক্ষে ‘সামাজিক এবং রাজনৈতিক অসংগতিগুলো সম্পর্কে তাঁর সচেতনতাই তাঁকে বিদ্রোহী করে তুলেছিল। তবে তাঁর সমাজ সচেতনতা কোনও বিশেষ মত দ্বারা পরিচালিত নয়। তাঁর ধর্ম ছিল মানবতার ধর্ম, এবং একই মানবধর্ম দ্বারাই তিনি বিশেষভাবে  পরিচালিত হয়েছিলেন। তাঁর বিদ্রোহাত্মক বা সমাজ-সংস্কারমূলক কবিতাগুলো মূলত এই মানবতাবোধ থেকেই উদ্ভূত। রাজনৈতিক চিন্তাধারার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন সংস্কারমুক্ত ও অসাম্প্রদায়িক।’৩ অত্যচারী ও শোষণকারীকে পদানত ও পরাস্ত করে মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামই ছিল তাঁর আদর্শ, আর সেই আদর্শেরই প্রতিফলন ঘটেছে তাঁর কাব্যে। এ কারণেই তাঁর জীবন ও কবিতাকে পৃথক করে দেখার উপায় নেই। বস্তুত নজরুল ‘সকলকে জাগাতে চেয়েছেন মঙ্গলের জন্যে, সত্য প্রতিষ্ঠার জন্যে, মিথ্যার বিরুদ্ধে প্রাণপণ বিদ্রোহ ঘোষণার জন্যে।’৪ 

নজরুলের কবিতায় প্রকাশিত হয়েছে বিদেশি বেনিয়া শাসকগোষ্ঠীর শাসনপাশ থেকে দেশ ও জাতিকে মুক্ত করার আকাক্সক্ষা, আবার কখনও সাম্যবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে শোষণমুক্ত সমাজ গঠনের চেষ্টা। তাছাড়া অন্ধ কুসংস্কার, গোঁড়ামি এবং সাম্প্রদায়িক মনোভাববিরোধী কবিতা ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে মুসলিম পুনর্জাগরণমূলক কবিতাতেও কবির সমাজ সচেতনতার পরিচয় পাওয়া যায়। নজরুলের কবিতা সম্পর্কে ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান বলেন, ‘বস্তুত মানবতার মহান আদর্শে অনুপ্রাণিত কবি কাজী নজরুল ইসলামের কাব্য-ভাবনার এক প্রধান অংশ জুড়ে আছে হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতি কামনা। মনে রাখা দরকার, সমগ্র আধুনিক বাংলা কাব্যের ইতিহাসে কাজী নজরুল ইসলামই একমাত্র কবি―যিনি দক্ষতার সঙ্গে হিন্দু ও মুসলমান উভয় ঐতিহ্যকে আপন কাব্যে ব্যবহার করতে সমর্থ হয়েছেন।’৫

কবি নজরুলের উত্থান-পর্বে দেখা যায় ব্রিটিশ শাসিত ভারতবর্ষে মানুষের পরাধীনতার গ্লানি, ইংরেজ সিভিলিয়ানদের অত্যাচার, শাসকবর্গের শোষণনীতি, রুশ বিপ্লব (১৯১৭-১৯২৩), প্যান-ইসলামিক আন্দোলন, তুর্কি আন্দোলন (১৯০৮-১৯০৯), অহিংস অসহযোগ আন্দোলন (১৯২০-১৯২২), ভারতবর্ষসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম, নিপীড়ত, শোষিত মানুষের উত্থান, দ্রোহ ও সংগ্রাম; যা নজরুলের রচনায় ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছে। প্রকৃতপক্ষে, কবি মানবধর্মে বিশ্বাসী ছিলেন বলে জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে বিশ্বের যে কোনও প্রান্তের মানুষের মানবধর্মী ব্যক্তিত্ব ও আদর্শ তাঁকে অভিভূত করেছে।

নজরুলের সাহিত্যজীবন মোটামুটি তিন পর্বে বিভক্ত। মূলত তিনটি সাহিত্যপত্রিকা সম্পাদনাকে কেন্দ্র করে নজরুলের লেখায় দারুণ বৈচিত্র্য এসেছে। নজরুলকে নবযুগ (১৯২০) পত্রিকা প্রকাশের পূর্বে দেখি বিদ্রোহীর ভূমিকায়, ধূমকেতু (১৩২৯) পর্বে কবি যেন বিপ্লবীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন; আর লাঙল (১৯২৫) পর্বে সাম্যের প্রতিভূ এক মানবতাবাদী নজরুলকে পাই। ‘১৯২২ সালের পরে মজুর, কৃষক ও জনগণকে বাদ দিয়ে নজরুলকে কল্পনাই করা যেত না।’৬ কবির দীপ্ত উচ্চারণ :

 ঐ তেত্রিশ কোটি দেবতাকে তোর তেত্রিশ কোটি ভূতে

আজ নাচ বুড্ঢি নাচায় বাবা উঠতে বসতে শু’তে

ও ভূত যেই দেখেছে মন্দির তোর

নাই দেবতা নাচছে ইতর,

আর মন্ত্র শুধু দন্তবিকাশ, অমনি ভূতের পুতে

তোর ভগবানকে ভূত বানালে ঘানি চক্রে জু’তে।৭

জাতিভেদ প্রথা বা বর্ণভেদ প্রথার মতো সাম্প্রদায়িকতাকেও নজরুল মনেপ্রাণে ঘৃণা করতেন। ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দে হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা চূড়ান্ত হয়ে ওঠে। ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের পরিবর্তে সাম্প্রদায়িকতাই চূড়ান্ত লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়। এই সময়ে অর্থাৎ ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দের মে মাসে বঙ্গীয় প্রাদেশিক সম্মেলনে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের (১৮৭০-১৯২৫) হিন্দু-মুসলিম-প্যাক্ট সাম্প্রদায়িক চাপে বাতিল হয়ে যায়। “এই নাকচ করার ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিলেন ‘কংগ্রেস কর্মী সঙ্ঘ’।”৮ হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গায় মর্মাহত নজরুল সম্মেলনের জন্য যে উদ্বোধনী সঙ্গীত রচনা করেন তা এ প্রসঙ্গে স্মরণীয় :

অসহায় জাতি মরিছে ডুবিয়া, জানে না সন্তরণ,

কাণ্ডারী আজ দেখিব তোমার মাতৃমুক্তিপণ।

“হিন্দু না ওরা মুসলিম?”  ওই জিজ্ঞাসে কোন জন?

কাণ্ডারী বল ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মা’র।৯

হিন্দু-মুসলিম ঐক্য সবসময়ই নজরুলের নিকট প্রার্থিত ছিল। ফলে ধর্মীয় উন্মত্ততার দিনগুলোতে হিন্দু-মুসলিম সংঘাত কবি কাছে খুবই পীড়াদায়ক ছিল। কবি উপলব্ধি করেছিলেন মানুষে মানুষে ভেদবুদ্ধি আমাদের স্বাধীনতাকে বিলম্বিত করছে। শত্রুর দুর্বল মুর্হূতই স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনবার প্রশস্ত সময় হিসেবে তিনি মনে করতেন; আর এজন্য দরকার জাতি, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ঐক্যের সম্মিলন। নজরুল বাব বার দেশবাসীকে দুর্দিনে ক্ষুদ্র স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে জাতির বৃহত্তর স্বার্থের জন্য সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে আহ্বান জানিয়েছেন :

খালেদ আবার ধরিয়াছে অসি ‘অর্জুন’ ছোঁড়ে বাণ।

জেগেছে ভারত, ধরিয়াছে লাঠি হিন্দু-মুসলমান।১০

১৯২৫ সালের শেষ ভাগে ‘লেবার স্বরাজ পার্টি’ গঠিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই এর মুখপত্র হিসেবে লাঙল পত্রিকা প্রকাশিত হতে থাকে। নারী-পুরষ নির্বিশেষে সকলের রাজনৈতিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা এবং ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা অর্জনই ছিল লাঙল-এর আদর্শ এবং উদ্দেশ্য।১১ এই লাঙল পত্রিকাতেই নজরুলের মানবতাবাদী চেতনার কবিতাগুলো প্রকাশিত হতে থাকে। ‘সাম্যবাদী’, ‘ঈশ্বর’, ‘মানুষ’, ‘পাপ’, ‘চোর ডাকাত’, ‘বারাঙ্গনা’, ‘মিথ্যাবাদী’, ‘নারী’, ‘রাজাপ্রজা’, ‘সাম্য’, ‘কুলি-মজুর’ প্রভৃতি মানবতাবাদী চেতনার কবিতাগুলো পরবর্তীকালে সাম্যবাদী (১৯২৫) কাব্যগ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। মানবতাবাদের আদর্শ প্রচার করতে গিয়ে নজরুল চোর-ডাকাত, পাপী-তাপী, কুলি-মজুর, ইতর-ভদ্র, ধনী-গরিব নির্বিশেষে সকলকে মানুষ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন এবং মানবধর্মকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। তাঁর কাছে ধর্ম-বর্ণ, জাতিভেদ থেকে মানুষই প্রধান ছিল। মানুষকে কবি মহান হিসেবে দেখেছেন। কবির ভাষায় :

গাহি সাম্যের গান―

মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান।১২

এ সম্পর্কে গবেষক ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান বলেন, ‘মানুষ মহীয়ান বলেই ধর্মান্ধতা কবির অপ্রিয়, …সত্যপ্রিয়তা ও মানবতাবোধ কবিকে নারীর মর্যাদায় সচেতন করেছে; কুলি ও মজুরদের অসম্মানে তিনি ব্যথিত বোধ করেছেন। নজরুলের এই সত্যপ্রিয়তা ও মানবতাবোধ একই সঙ্গে বিশ্বাস ও আবেগের দ্বারা সমর্থিত―তাই অনুভবের প্রকাশ একই সঙ্গে আন্তরিকতাও তীব্র। এই আন্তরিকতার তীব্রতাই নজরুল মানসের স্বাতন্ত্র্য।’১৩ নজরুল লিখেছেন :

তোমাতে রয়েছে সকল ধর্ম, সকল যুগাবতার

তোমার হৃদয় বিশ্ব-দেউল সকলের দেবতার।

কেন খুঁজে ফেরো দেবতা-ঠাকুর মৃত পুঁথি-কঙ্কালে?

হাসিছেন তিনি অমৃত-হিয়ার নিভৃত অন্তরালে।১৪

মোল্লা ও পুরোহিতের মধ্য যারা ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করেন, তারা কবির কাছে বেনে সমতুল্য। এরা স্রষ্টার স্বরূপ বুঝতে অপারগ এবং তার মহিমা উপলব্ধি করতে অক্ষম বলেই ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করে। স্রষ্টা যে কেবল ধর্মগ্রন্থের মাঝেই সীমাবদ্ধ নন, তাঁকে খুঁজতে হবে মানুষের মাঝে, সত্যের মাঝে―নজরুল এ বিষয়টি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন :

কে তুমি খুঁজিছ জগদীশে ভাই আকাশ-পাতাল জুড়ে?

কে তুমি ফিরিছ বনে-জঙ্গলে, কে তুমি পাহাড়-চূড়ে?

হায় ঋষি-দরবেশ,

. . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . .

ডুবে নাই তারা অতল গভীর রত্ন-সিন্ধুতলে,

শাস্ত্র না ঘেঁটে ডুব দাও সখা, সত্য-সিন্ধু-জলে।১৫

পৃথিবীতে নানা ধর্ম, বর্ণ, গোত্র আছে। বিভিন্ন ধর্মের জন্য রয়েছে পৃথক পৃথক ধর্মগ্রন্থ। মানুষ ধর্র্মগ্রন্থগুলোকে খুবই শ্রদ্ধা করে, ধর্মের জন্য জীবন পর্যন্ত বাজি রাখে। কিন্তু নিরন্ন অসহায় মানুষকে সামর্থ্য থাকার পরও অন্ন দান করে না। মন্দিরের পুরোহিত কিংবা মসজিদের মোল্লা সাহেবও এরূপ হৃদয়হীন কাজ করে থাকেন। মানুষের চেয়ে বড় কিছু হতে পারে না। অথচ অনেকেই মানুষকে হেয় করে। মানুষকে তার প্রাপ্য মর্যাদা দেয় না। ধর্মকে ব্যবহার করে এক শ্রেণির মানুষ নিজ স্বার্থ হাসিল করে মনুষ্যত্বের চরম অবমাননা করছে। কবি এরূপ স্বার্থান্বেষী মহলের প্রতি তীব্র ধিক্কার জানিয়ে মানুষের জয়গান গেয়েছেন :

আশিটা বছর কেটে গেল, আমি ডাকিনি তোমায় প্রভু,

আমার ক্ষুধার অন্ন তা বলে বন্ধ করোনি প্রভু!

তব মসজিদ-মন্দিরে প্রভু নাই মানুষের দাবি,

মোল্লা-পুরুত লাগায়েছে তার সকল দুয়ারে চাবি।১৬

সমাজের বিভিন্ন স্তরে পাপী, চোর ডাকাত, মিথ্যাবাদী সবাইকে মানবিক দিক বিবেচনা করে কবি মানুষ হিসেবে দেখেছেন। তাদের ধর্ম-কর্ম কোনওটাকেই  প্রধান্য দেননি।  চুরি, ডাকাতি গর্হিত কাজ। সমাজের চোখে যেমন তা অপরাধ, ধর্মীয় দৃষ্টিতে তা পাপ।  কবি চুরি, ডাকাতিকে ঘৃণা করলেও চোর বা ডাকাতকে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে মানুষ হিসেবে দেখেছেন। তাছাড়া যে সমাজে কম-বেশি সবাই চোর; সেখানে তাদেরকে ঘৃণা করার অধিকার কারও নেই। দরিদ্রের সম্পদ লুট করে ধনীর ঐশ্বর্য, প্রজার রক্তের ওপর নির্মিত হয় রাজার প্রাসাদ। অসহায়, নিরন্ন মানুষকে ঠকিয়ে মালিকপক্ষ গড়ে তোলে সম্পদের পাহাড়। ‘কুলি-মজুর’ কবিতায় উচ্চশ্রেণি কর্তৃক নিম্নবর্গীয় মানুষকে নির্যাতন এবং তাদেরকে ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করার দিকটি উঠে এসেছে :

                                 দেখিনু সে দিন রেলে,

কুলি বলে এক বাবু সা’ব তারে ঠেলে দিলে নিচে ফেলে!

                                     চোখ ফেটে এল জল,

এমনি করে কি জগৎ জুড়িয়া মার খাবে দুর্বল?১৭

‘কুলি-মজুর’ কবিতায় কবি বিভিন্ন পেশার শ্রমজীবী মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে মানবসভ্যতার যথার্থ রূপকার সাধারণ মানুষের অধিকারের পক্ষে কলম ধরেছেন। যুগ যুগ ধরে কুলি-মজুরের মতো লক্ষ-কোটি শ্রমজীবী মানুষের অক্লান্ত পরিশ্রমে গড়ে উঠেছে আজকের সভ্যতা। কিন্তু সভ্যতার আসল কারিগরেরাই উপেক্ষিত। এক শ্রেণির হৃদয়হীন, স্বার্থান্ধ মানুষ শ্রমজীবীদের সবকিছু থেকে বঞ্চিত করেছে। কিন্তু মানবতাবাদী কবি নজরুল দরিদ্র মানুষের প্রতি সহানুভূতি জানিয়েছেন। মেহনতি মানুষের জন্য শুভ দিনের প্রত্যাশা ব্যক্ত করে লিখেছেন:

আসিতেছে শুভদিন,

দিনে দিনে বহু বাড়িয়াছে দেনা, শুধিতে হইবে ঋণ।১৮

‘বারাঙ্গনা’ কবিতায় কবি সমাজের অস্পৃশ্য ও অবহেলিত নারীদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন। নারী জাতির প্রতি কবি সংবেদনশীল হয়েছেন এবং নারীদের পুরুষের সমতুল্য বলে ঘোষণা করেছেন। ‘নারী’ কবিতায় কবি নর ও নারীর সাম্য ও সমঅধিকারের কথা তুলেছেন। সভ্যতা বিনির্মাণে নারী-পুরুষের সমান অবদানের কথা উল্লেখ করে কবি নারীর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। কবি সমাজে নারী-পুরুষের ভেদাভেদের প্রসঙ্গ টেনে নারীকে পুরুষের সমকক্ষ হিসেবে স্থান দিয়েছেন। নারীকে তার প্রাপ্য সম্মান প্রদানের ক্ষেত্রে পুরুষের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন :

                                 সাম্যের গান গাই―

আমার চোখে পুরুষ-রমণী কোনো ভেদাভেদ নাই।

                   বিশ্বে যা-কিছু মহান সৃষ্টি চির-কল্যাণকর

                অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।১৯

নজরুল ছিলেন গণমানুষের কবি। শোষিত, বঞ্চিত, নিপীড়িত মানুষের কথা তাঁর কাব্যে সাবলীল ভঙ্গিতে চিত্রিত হয়েছে। জাতি-ধর্ম-বর্র্ণ ও শ্রেণিবৈষম্যকে পাশ কাটিয়ে কবি আমৃত্যু মানবতাবাদের চর্চা করেছেন। রাজনৈতিক মতাদর্শ প্রচারের পাশাপাশি সংকীর্ণ সাম্প্রদায়িকতার প্রতিও নজরুল বিদ্রƒপবাণ নিক্ষেপ করেছেন। সাম্রাজ্যবাদবিরোধী মনোভাব নিয়ে স্বদেশপ্রেম ও স্বাধীনতার আকাক্সক্ষায় উজ্জীবিত নজরুল সমাজের সব অন্যায় আর অসংগতির বিরুদ্ধে কবিতাকে প্রতিবাদের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছেন। সমাজের অবহেলিত এবং নিম্নবর্গীয় নর-নারীর স্বপ্ন ও সংগ্রামকে পরম মমতায় কাব্যরূপ দিয়ে তিনি শ্রমজীবী মানুষের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন। সুতরাং এ কথা আমরা নিঃসন্দেহে বলতে পারি, নজরুল সাম্যবাদী কবি, আর তাঁর সাম্যবাদ অনেকাংশেই মানবতাবোধ দ্বারা পরিচালিত ছিল।

আকরগ্রন্থ :

১। রফিকুল ইসলাম প্রণীত নজরুল জীবনী

২। অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তের কল্লোল যুগ

৩। খান মুহাম্মদ মঈনুদ্দীনের যুগস্রষ্টা নজরুল

৪। মুজফ্ফর আহমদের নজরুল ইসলাম: স্মৃতিকথা

৫। শামসুন্নাহার মাহমুদের নজরুলকে যেমন দেখেছি

৬। শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের কেউ ভোলে না কেউ ভোলে

৭। সুফী জুলফিকার হায়দারের নজরুল-জীবনের শেষ অধ্যায়

৮। হায়াৎ মামুদ নজরুল ইসলাম: কিশোর জীবনী 

তথ্যসূত্র :

১।           ‘বিদ্রোহী’, অগ্নিবীণা, নজরুল রচনাবলী, প্রথম খণ্ড, কেন্দ্রীয় বাঙলা উন্নয়ন বোর্ড, ঢাকা, প্রথম প্রকাশ:

                 ১১ই জ্যেষ্ঠ ১৩৭৩, পৃ: ২৬ 

২।           ‘বিদ্রোহী’, অগ্নিবীণা, নজরুল রচনাবলী, প্রথম খণ্ড, কেন্দ্রীয় বাঙালা উন্নয়ন বোর্ড, ঢাকা, প্রথম প্রকাশ:

                 ১১ই জ্যেষ্ঠ ১৩৭৩, পৃ: ২৮

৩।          মাহবুবা সিদ্দিকী, আধুনিক বাংলা কবিতায় সমাজ সচেতনতা, প্রথম প্রকাশ জ্যৈষ্ঠ ১৪০১; মে ১৯৯৪ বাংলা একাডেমি, ঢাকা, পৃ: ৭৮ 

৪।           ড. আনিসুজ্জামান, নজরুল ইসলাম ও তাঁর কবিতা, নজরুল সমীক্ষণ, মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান সম্পাদিত, ঢাকা, প্রথম প্রকাশ, ১১ জ্যৈষ্ঠ, ১৩৭৯, পৃ: ১৭০

৫।          মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, নজরুল ইসলাম ও হিন্দু-মুসলমান সম্পর্ক, নজরুল সমীক্ষণ, পূর্বোক্ত, পৃ: ৬১

৬।          মুজফ্ফর আহমদ, কাজী নজরুল প্রসঙ্গে, প্রথম প্রকাশ কলিকাতা, ১১ই জ্যৈষ্ঠ ১৩৬৬, পৃ: ৮৫

৭।           ‘ভুত ভাগানোর গান’, বিষের বাঁশী, নজরুল রচনাবলী, প্রথম খণ্ড, কেন্দ্রীয় বাঙালা উন্নয়ন বোর্ড, ঢাকা, প্রথম প্রকাশ: ১১ই জ্যেষ্ঠ ১৩৭৩, পৃ: ৭১

৮।          মুজফ্ফর আহমদ, কাজী নজরুল প্রসঙ্গে, পূর্বোক্ত, পৃ: ১০৫

৯।          ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’, সর্বহারা, নজরুল রচনাবলী, দ্বিতীয় খণ্ড, কেন্দ্রীয় বাঙালা উন্নয়ন বোর্ড, ঢাকা, প্রথম প্রকাশ: ১১ই জ্যেষ্ঠ ১৩৭৪,  পৃ: ৩৭

১০।        ‘হিন্দু মুসলিম যুদ্ধ’, ফণিমনসা, পূর্বোক্ত, পৃ: ৮৯

১১।         মাহবুবা সিদ্দিকী, আধুনিক বাংলা কবিতায় সমাজ সচেতনতা, পূর্বোক্ত, পৃ: ৯২

১২।        ‘মানুষ”, সাম্যবাদী, নজরুল রচনাবলী, দ্বিতীয় খণ্ড, পূর্বোক্ত, পৃ: ৭

১৩।        মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, প্রেম ও সৌন্দর্যের কবি নজরুল, নজরুল সমীক্ষণ, পূর্বোক্ত, পৃ: ১৯৫

১৪।        ‘সাম্যবাদী’, সাম্যবাদী, নজরুল রচনাবলী, দ্বিতীয় খণ্ড, পূর্বোক্ত, পৃ: ৫

১৫।        ‘ঈশ্বর’, ঐ, পৃ: ৬

১৬।       ‘মানুষ’, ঐ, পৃ: ৭

১৭।        ‘কুলি-মজুর’, ঐ, পৃ: ২০

১৮।        ‘কুলি-মজুর’, ঐ, পৃ: ২০

১৯।        ‘নারী’, ঐ, পৃ: ১৪

লেখক : গবেষক, বাংলা বিভাগ, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button