বিশেষ রচনা : আবুল হাসনাত : বহুমাত্রিক সংস্কৃতির উজ্জ্বল ধারক : কামরুল হাসান

আবুল হাসনাত। কবি, কথাসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক, চিত্র-সমালোচক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী―তাঁর অনেক পরিচয়। বহুমাত্রিক মানুষটির সকল পরিচয় ছাপিয়ে উঠেছে তিনি একজন বিরল দক্ষতার সাহিত্য সম্পাদক―প্রথিতযশা শুধু নন, কিংবদন্তি। কবি আহসান হাবীবের পরে সবচেয়ে সর্বজনস্বীকৃত সম্পাদক বলতে আবুল হাসনাত। আজ থেকে ৪ বছর আগে তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন পহেলা নভেম্বরে। ২০০৪ সাল থেকে মৃত্যু অবধি ছিলেন কালি ও কলম পত্রিকার সম্পাদক। বেঙ্গল ফাউন্ডেশন থেকে প্রকাশিত কালি ও কলম প্রতি বছর তাঁর স্মরণে আবুল হাসনাত স্মারক বক্তৃতার আয়োজন করছে। সম্প্রতি বেঙ্গল শিল্পালয়ের মিলনায়তনে কালি ও কলম আয়োজন করেছিল চতুর্থ স্মারক বক্তৃতা।
এ শহরে কবি-সাহিত্যিকদের মিলিত হবার জায়গা অপ্রতুল। ক্ষমতাসীন কোনও সরকারই কবি-সাহিত্যিকদের জন্য তেমন কিছু নির্মাণ করেনি, যদিও তাদের কেউ কেউ কবি-সাহিত্যিকদের প্রবল সমর্থন পেয়েছে। এ নগরে প্রচুর সুরম্য ক্লাব, সুদৃশ্য মিলনায়তন তৈরি হয়েছে, হয়নি কেবল রাইটার্স ক্লাব। বেঙ্গল শিল্পালয় সে অভাব কিছুটা মেটাচ্ছে। নিচে আকাশ-খোলা রেস্তোরাঁ, তার পাশেই বেঙ্গল বুকশপ, দোতলায় কফিশপ ও মিলনায়তন―বেঙ্গল শিল্পালয় হয়ে উঠেছে সংস্কৃতিঘেঁষা, শিল্পসাহিত্যমনস্ক, বইপ্রেমী উপরন্তু আড্ডাবাজ শহুরে মধ্যবিত্ত শিক্ষিত সম্প্রদায়ের এক মিলনতীর্থ। এর উঁচু ছাদ মিলনায়তনটির আয়তন এত বেশি যে তাতে স্বস্তিদায়ক পরিবেশ সৃষ্টি করতে শীতলসেবক যন্ত্রগুলো প্রাণপণ কাজ করেও পুরোপুরি সফল হয় না। শীতআসন্ন হেমন্তের দিনগুলোর গা থেকে উত্তাপ পুরোটা না-গেলেও সন্ধেটি ছিল মুগ্ধকর। কী স্নিগ্ধ আভিজাত্য, কী রুচিশীল সৌন্দর্য ধরে আছে মঞ্চটি। ভূমি থেকে সামান্যই উঁচু ধূসর রঙের কার্পেটে মোড়ানো রোস্ট্রামটি, তার উপরে ধূসর রঙের পোডিয়াম, একটি ছোট নীল কাপড়ে ঢাকা টেবিলের পেছনে দেখে মনে হবে বেতের তৈরি, আসলে প্লাস্টিকের, চারটি চেয়ার পেতে রাখা। মৃত্যুর রঙ কি ধূসর, কিংবা শোকের রঙ ? ধূসর রঙের এক সমাবেশ মঞ্চে। পেছনের মেঝে থেকে উঠে গেছে প্রায় ছাদ ছোঁয়া মূল ব্যানারটি, যা ধরে আছে আবুল হাসনাতের সর্বাধিক প্রচারিত, সবচেয়ে প্রদীপ্ত আইকনিক ছবিটি, সেই ব্যানারের জমিনও ধূসর, তাতে কেবল প্রয়োজনীয় কথামালা সাদারঙে মুদ্রিত। মূল ব্যানারের দুপাশে কৌণিকভাবে প্রতিস্থাপিত দুটি নিরেট সাদা বোর্ড, ছাদের আলোয় প্লাবিত হয়ে মঞ্চটিকে দিয়েছে এলিগ্যান্স ও অ্যারিস্টোক্রাসি।
সাহিত্য অনুষ্ঠানে যোগ দিলে মস্ত লাভ এই যে সাহিত্যজগতের অনেক প্রবাদপ্রতিম, শীর্ষ ব্যক্তিত্বের দেখা পাওয়া যায়। সঙ্গে একঝাঁক প্রিয় কবি-সাহিত্যিক-শিল্পীর সান্নিধ্যলাভ। বেঙ্গলের অনুষ্ঠান হলে তো কথাই নেই। ঘড়ি পাঁচটার দিকে যাত্রা শুরু করলে হলঘরটা ধীরে ভরে উঠল আগ্রহী শ্রোতায়। কিছু পরে অনুষ্ঠান একটা মাত্রায় পৌঁছালে দেখলাম হলঘর লোকে প্রায় পরিপূর্ণ, আবুল হাসনাত যে একজন চুম্বক ব্যক্তিত্ব তাও বুঝতে দেরি হলো না।
অনুষ্ঠান শুরু হলো একেবারে সঠিক সময়ে। মঞ্চের পূর্বপার্শ্বে দাঁড় করিয়ে রাখা পোডিয়ামটির পেছনে গিয়ে দাঁড়ালেন বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের সভাপতি লুভা নাহিদ চৌধুরী। পেশায় তিনি স্থপতি, কিন্তু চিন্তা-চেতনা ও অনুশীলনে পুরোপুরি শিল্পী; সংস্কৃতির জগতের আনন্দিত বাসিন্দা। মাইক্রোফোনে ভাসল তার সুমিষ্ট কণ্ঠস্বর। যিনি ধ্রুপদী গানের রেওয়াজও পরিবেশন করেন―তার কণ্ঠস্বর যে সুমিষ্ট হবে তাই তো স্বাভাবিক। তিনি আলোচকদ্বয়, অনুষ্ঠানের সভাপতি ও স্বাগত ভাষণপ্রদানকারীকে মঞ্চে এসে আসন গ্রহণ করতে সনির্বন্ধ অনুরোধ জানালেন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনায় সঞ্চালকের বড় ভূমিকা হলো সম্মানিতজনদের পরিচয় তুলে ধরা, যদিও সুপরিচিত তাঁরা সকলেই,তবু সেটাই সৌজন্যমূলক।
প্রথমেই আবুল হাসনাতের বিপুল কর্মময় জীবনের এক বর্ণাঢ্য ছবি আঁকলেন লুভা নাহিদ চৌধুরী। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সমাপ্তি বছরে আবুল হাসনাতের জন্ম আর করোনা মহামারীর উত্তুঙ্গ বছর ২০২০ সালে মৃত্যু। সে হিসেবে এ পৃথিবীতে তিনি বেঁচে ছিলেন ৭৫ বছর। দৈনিক সংবাদের সাহিত্য সাময়িকীর সম্পাদক হিসেবে বহুল পরিচিত হলেও ২০০৪ সাল থেকে সম্পাদনা করেছেন কালি ও কলম। এছাড়া তিনি সম্পাদনা করেছেন গণসাহিত্য ও সাহিত্য পত্রিকা নামের আরও দুটি পত্রিকা। মাহমুদ আল জামান ছদ্মনামে কবিতা লেখা আবুল হাসনাতের নামের পাশে রয়েছে মোট ৭০টি গ্রন্থ―যার ভেতর সৃজনশীল রচনা ও সম্পাদিত গ্রন্থ―দুটোই রয়েছে। তবু বোদ্ধা পাঠক তাঁকে চেনে একজন একনিষ্ঠ সম্পাদক হিসেবে। কর্মজীবনের প্রায় পুরোটাই সাহিত্যের পরিচর্যা করে গেছেন, অনেক নবীন লেখককে তিনি আবিষ্কার ও সাহিত্যাঙ্গনে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। সাহিত্যে অবদানের জন্য পেয়েছেন অগ্রণী ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কারসহ বেশ কিছু পুরস্কার। বহুত্ববাদী সংস্কৃতির ধারক ছিলেন তিনি। আজীবন শিল্পকলা চর্চা ও গ্রন্থপাঠে কাটানো মানুষটি ছিলেন প্রগতিশীল রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। ছাত্রজীবনে যুক্ত ছিলেন ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতির সঙ্গে, পরে যোগ দেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টিতে। বহুমুখী সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক চেতনা থেকে উদ্ভূত যে সামাজিক দায় তার মাঝে তৈরি হয়েছিল তা তিনি বহন করেছেন আজীবন। যারা তাঁকে সরাসরি দেখেছেন তাঁরা জানেন তাঁর চরিত্রে মাধুর্য ছিল, ছিল বিনয়।

পরিচিতি ও ভূমিকার পরে স্বাগত বক্তব্য রাখলেন কালি ও কলম পত্রিকার বর্তমান সম্পাদক প্রথিতযশা সাহিত্যিক সুব্রত বড়ুয়া। তিনি বললেন, আবুল হাসনাত স্মারক বক্তৃতায় এসে কেবল যে ওই বহুমুখী সৃজনশীল মানুষটিকে স্মরণ করি তা নয়, আরও অনেক কিছু স্মরণ করি, সাহিত্য-সংস্কৃতির চর্চাকে স্মরণ করি, একই সঙ্গে নিজের পথচলারও মূল্যায়ন করি। আবুল হাসনাতের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ষাটের দশকের মাঝামাঝি থেকে যখন তাঁদের ছাত্রজীবন। আবুল হাসনাত আজীবন সাহিত্য, সংস্কৃতি, প্রগতিশীল রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। দীর্ঘ ৩০ বছর দৈনিক সংবাদের সাহিত্য সাময়িকীর পাতা সম্পাদনা করে কিংবদন্তি হয়ে ওঠেন। ২০০৪ সালে তিনি কালি ও কলম পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। আমৃত্যু তাঁর দক্ষ সম্পাদনায় পত্রিকাটি সমৃদ্ধ থেকে সমৃদ্ধতর হয়ে উঠেছে। আজও কালি ও কলম তাঁর প্রবর্তিত ও অনুসৃত ধারাই অক্ষুণ্ন রেখেছে। তিনি কালি ও কলম-এর আহ্বানে যারা বেঙ্গল শিল্পালয়ে উপস্থিত হয়েছেন তাদের আন্তরিক ধন্যবাদ জ্ঞাপন করলেন।
পরের বক্তা আবুল হাসনাতের সহধর্মিণী নাসিমুল আরা হক মিনু। স্বামীর প্রশংসায় পঞ্চমুখ মানুষটি বললেন, আবুল হাসনাতের সমগ্র জীবন কেটেছে সাহিত্য-সংস্কৃতির সেবায়। তিনি পরিশ্রমী ছিলেন, কাজ করতেই আনন্দ পেতেন। কাজের প্রতি নিষ্ঠাবান মানুষটি নিজের দিকে তাকাতেন না। তাঁর চেতনাজুড়ে ছিল গণতন্ত্র, প্রগতিশীলতা, মানবতা। তিনি মুক্তবুদ্ধি, মুক্তচিন্তার ধারক ছিলেন। জীবনে অনেক সংগঠনের সঙ্গে সংযুক্ত ছিলেন, যার অন্যতম ছাত্রজীবনে গড়ে ওঠা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃতি সংসদ। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর ইকবাল আহমেদ, আবুল হাসনাত প্রমুখ সংস্কৃতি সংসদের ব্যানারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সপ্তাহব্যাপী সাংস্কৃতিক উৎসবের আয়োজন করেছিলেন। প্রথম দিনটা কেটেছিল স্পেনের গৃহযুদ্ধ নিয়ে পাবলো পিকাসোর আঁকা বিখ্যাত চিত্র ‘গুয়ের্নিকা’ প্রদর্শন করে। গান, কবিতা আবৃত্তি, নাচ, নাটক নিয়ে দারুণ জমে উঠেছিল সে উৎসব। স্বাধীন দেশের প্রধানতম বিদ্যাপীঠে সেই ছিল সংস্কৃতিচর্চার শুরু।
কালি ও কলম এ দেশের একমাত্র পত্রিকা যা একটা সময়, একই সঙ্গে ঢাকা ও কলকাতা থেকে প্রকাশিত হতো। কলকাতায় খুব সমাদৃত ছিল পত্রিকাটি। একটা সময়ে কলকাতা সংখ্যাটি বন্ধ হয়ে গেলে কবি শঙ্খ ঘোষ ‘ক্ষতি হয়ে গেল’ বলে দুঃখপ্রকাশ করেছিলেন। মনীষী চিন্ময় গুহ প্রমুখ পত্রিকাটির জন্য তাঁদের আকুতির কথা জানিয়েছিলেন। কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী কিছুকাল এর সম্পাদনাও করেছেন। নাসিমুল আরা হক মিনু বললেন আবুল হাসনাত যেমন নিষ্ঠাবান ছিলেন তাঁর কাজে, তেমনি তাঁর সাহিত্যরুচি ছিল উঁচুমানের। তিনি ছিলেন প্রচারবিমুখ, নিজের লেখা নিজের সম্পাদিত পাতায় ছাপতেন না। পুরস্কারের ব্যাপারেও কাউকে বলতেন না, চেষ্টা করেননি। সংবেদনশীল মানুষটির চরিত্রে বিনয়ের সঙ্গে মিশে ছিল দৃঢ়তা। বলা হয় একজন মানুষকে প্রকৃত চেনেন তার জীবনসঙ্গী বা জীবনসঙ্গিনী। নাসিমুল আরা হক মিনু তাঁর জীবনসঙ্গী সম্পর্কে যে শ্রদ্ধা ও মুগ্ধতা রেখে গেলেন তাতে প্রমাণ হয় আবুল হাসনাত, তাঁর সকল কীর্তিসহ, মানুষ হিসেবেও অতুলনীয় ছিলেন।
আবুল হাসনাত স্মারক বক্তৃতার চতুর্থ আসরে মূল প্রবন্ধ পাঠ করলেন কবি ও প্রাবন্ধিক আবুল মোমেন। সঞ্চালক লুভা নাহিদ চৌধুরী তাঁর সংক্ষিপ্ত পরিচিতি তুলে ধরলেন। আবুল মোমেনের জন্ম চট্টগ্রামে, স্কুল ও কলেজ জীবন চট্টগ্রামে, বিশ্ববিদ্যালয় পর্ব ঢাকায়। তিনি নিয়মিত কবিতা, প্রবন্ধ ও কলাম লিখেছেন। শিক্ষা নিয়ে, বিশেষ করে শিশুশিক্ষা নিয়ে গবেষণা করেছেন। ১৯৭৫ সাল থেকে তাঁর ও শীলা মোনের নেতৃত্বে চট্টগ্রামে পরিচালিত হচ্ছে ‘ফুলকি’ নামের বিদ্যালয়। তিনি ত্রিশটির অধিক পুস্তকের রচয়িতা। শিশু-কিশোরদের জন্য লেখা তার বই বাংলা ও বাঙালির কথার জন্য পেয়েছেন অগ্রণী ব্যাংক শিশু সাহিত্য পুরস্কার। প্রবন্ধের জন্য ২০১৬ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার অর্জন করেন। পরের বছর তিনি একুশে পদকে ভূষিত হন।
আবুল মোমেন লিখিত প্রবন্ধের নাম ছিল ‘সাহিত্য ও গণমুক্তির সাধনা’। ব্যানারে তাই মুদ্রিত। তিনি শিরোনামটি সামান্য বদলে নিয়ে করেছেন ‘গণমুক্তি ও মানুষের মুক্তিসাধনা’। সাহিত্য থেকে কিঞ্চিত সরে গিয়ে এ প্রবন্ধে জোরালো হয়ে উঠল মুক্তির সাধনা। বস্তুত আজীবন সাহিত্যচর্চার ভেতর দিয়ে আবুল হাসনাত গণমুক্তির সাধনাই করে গেছেন। তিনি স্মরণ করলেন আবুল হাসনাতের সঙ্গে তাঁর প্রথম দেখার স্মৃতি। ১৯৬৬ সালে চট্টগ্রামে ছাত্র ইউনিয়ন সম্মেলনে প্রথম দেখা বামচিন্তা ও আদর্শের দুই যুবকের। সম্পর্কের সেই সূত্রপাত যা আজীবন টিকে ছিল। কবি ও লেখক হিসেবে তিনি ছিলেন সম্পাদক আবুল হাসনাতের শর্ট লিস্টে, যাকে একটি সৌভাগ্য বলে মনে করেন আবুল মোমেন।
আবুল মোমেনের প্রবন্ধের প্রথম বাক্যটিই ছিল সেই সাধনার সূচনা : ‘গত শতকের ষাটের দশক ছিল আমাদের প্রজন্মের জেগে ওঠার কাল।’ আবুল মোমেনের প্রবন্ধের ভাষা যে সুললিত ও মনোরম তা টের পাই পরের বাক্যে―‘রবীন্দ্রনাথের শেষ জীবনের মন্ত্রোপম কবিতা রূপ-নারানের কূলের আলোকে বলতে চাই কৈশোর পেরুতে পেরুতে আমরা জেনেছি এ জগৎ স্বপ্ন নয়, আন্দোলন-সংগ্রামে সত্যিই রক্তের অক্ষরে লেখা হচ্ছিল আমাদের কালের রূপ।’ পঞ্চাশ ও ষাটের দশককে বাঙালি মুসলমানের জাগরণের কাল বলে অভিহিত করেছেন অধ্যাপক অনিসুজ্জামান, অনুপম সেন, গোলাম মুরশিদ, আহমদ ছফা প্রমুখ বুদ্ধিজীবী। শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চার মাধ্যমে যোগ্য মানুষ গড়ে তোলার ব্রত ছিল সমাজে। বায়ান্নোর ভাষা আন্দোলন থেকেই এ দেশে বামপন্থার জোয়ার আসে, শুধু এ দেশ নয়, গোটা বিশ্ব বাম আন্দোলনে মুখর হয়ে ওঠে। আফ্রিকা ও এশিয়ার দেশগুলোর ঔপনিবেশিক জোয়াল ফেলে স্বাধীন হয়ে ওঠা তৈরি করে বামঘেঁষা জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের জোয়ার। তখন সাহিত্যপাঠে পক্ষপাত ছিল কবিতার প্রতি। বই ও সৃজনশীল মানুষদের সঙ্গে তরুণ প্রজন্মের পরিচয় গভীরতর হতে থাকে। জ্ঞানসতৃষ্ণ একটি গোটা প্রজন্মের অনুসন্ধানকে আবুল মোমেন চমৎকার ভঙ্গিতে বলেন, ‘এভাবেই আমরা পৌঁছে যাই যেন উৎসে, বিপ্লবী সৃজনশীলতার ঝর্নাতলায়।’ সেই ঝর্নাতলায় রয়েছে রুশ বিপ্লব, প্রগতি প্রকাশনীর অবিশ্বাস্য কম দামে আসা মহান রুশ সাহিত্যের বাংলায় অনূদিত বইগুলো। পরিচয় ঘটে ম্যাক্সিম গোর্কির কথাসাহিত্য, মায়াকোভস্কির কবিতার সঙ্গে। সাহিত্যের পাশাপাশি তরুণদের আগ্রহ সঞ্চারিত হয় চলচ্চিত্রের প্রতি। তারা পান আইজেনস্টাইন, পুদোভকিনের ছবির খবর, পরিচিত হন চ্যাপলিনের সিনেমা, পাবলো পিকাসোর ছবির সঙ্গে। জানতে পারেন ঢাকাতেই গড়ে ওঠা প্রগতি লেখক সংঘের কথা, প্রগতিশীল গল্পকার সোমেন চন্দের নৃশংস হত্যার কথা, ভারতীয় গণনাট্য সংঘ বা আইটিপির কর্মকাণ্ডের কথা। সে সময়কার উপমহাদেশ জুড়ে খ্যাত কিছু কৃতী মানুষের সঙ্গে ঘটে আত্মিক মেলবন্ধন। এরা হলেন সাজ্জাদ জহির, মুলকরাজ আনন্দ, সলিল চৌধুরী প্রমুখ। ছেঁড়াতার, নবান্ন, কোনো এক গাঁয়ের বধূ প্রভৃতি চলচ্চিত্র যেমন তাদের দেখা হয়ে যায়, তেমনি তারা সন্ধান পান পূর্বাশা, চতুরঙ্গ, নতুন সাহিত্য, অগত্যা, সমকাল―প্রভৃতি পত্রিকার।
আবুল মোমেনের প্রবন্ধে শব্দ যেমন সুনির্বাচিত, বাক্য তেমনি সুগঠিত। তিনি অবিরল ধারায় বলে চলেন ষাটের দশকের গতিপ্রকৃতি, আবুল হাসনাতের গড়ে ওঠা, সৃজনশীল মানুষদের বহুবিধ পরিচয়, বহুমাত্রিকতার কথা। আবুল হাসনাত যে একজন বহুমাত্রিক মেধার মানুষ হয়ে উঠেছেন, তাঁর আগ্রহ যে বহুস্বরে বিস্তারিত, তার কারণ ষাটের দশকের ওইরূপ স্বভাব। আবুল হাসনাত একা নন, সেকালের বুদ্ধিজীবীরা তাঁদের চেতনা ও কর্মে ছিলেন বহুমাত্রিক, বহুস্বরের; বহুবিধ শিল্পের প্রতি ছিল তাঁদের আগ্রহ। ব্যক্তিমানসে কালের এই প্রভাব অনিবার্য ও অনস্বীকার্য। ষাটের দশকে রাজনীতির সঙ্গে সংস্কৃতির অটুট মেলবন্ধন গড়ে উঠেছিল।
ব্যক্তি আবুল হাসনাতকে এতটাই বুঝতে পারেন আবুল মোমেন, তাঁর জীবন তিনি এতখানি পাঠ করেছেন যে তিনি আবুল হাসনাতের একটি পছন্দের তালিকা তৈরি করেন। আবুল হাসনাতের পছন্দ ছিল কবিতা, কথাসাহিত্য, শিল্পকলা, চলচ্চিত্র, আড্ডা ও ভ্রমণ। কবিতায় তাঁর প্রথম পছন্দ সুভাষ মুখোপাধ্যায়। কথাসাহিত্যে মানিক বন্দোপাধ্যায়, শিল্পকলায় পটুয়া কামরুল হাসান, চলচ্চিত্রে সত্যজিৎ রায় আর ভ্রমণসঙ্গী হিসেবে পছন্দ ছিল প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান।
আবুল হাসনাতের সৃজনশীলতার বহুমাত্রিকতা, বহু বিষয়ের প্রতি অনুরাগ ও বহুপরিচয় বোঝাতে আবুল মোমেন উদ্ধৃত করেন ওফবহঃরঃু ধহফ ঠরড়ষবহপব বইয়ে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন নিজের পরিচয়ের যে দীর্ঘ তালিকা তৈরি করেছেন―তা। একজন হিন্দু ব্রাহ্মণ হয়েও তিনি ধর্ম ও পরকালে অবিশ্বাসী, পুরুষ হয়েও নারীমুক্তিতে বিশ্বাসী। তিনি নিজেকে একই সঙ্গে একজন এশীয়, একজন ভারতীয়, একজন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত বাঙালি বলে পরিচিত করান, যিনি বাস করেন কখনও আমেরিকা, কখনও গ্রেট ব্রিটেনে। তিনি একজন অর্থনীতিবিদ, একজন দার্শনিক, একজন লেখক ও একজন সংস্কৃত ভাষা চর্চাকারী। তাঁর আরও আরও পরিচয় আছে। মানুষের এই বহুপরিচয় স্বাভাবিক। মৌলিকভাবে মানুষ বহুমুখী, বৈচিত্র্য অনুসন্ধানী। বিপরীতমুখী বিষয় মানুষকে আকর্ষণ করে।
আবুল মোমেন বললেন, মুখস্তবিদ্যার শিক্ষা বামনায়ন ঘটাচ্ছে। ব্যক্তিত্বের মহত্ববাদ ঘটছে না। সাংস্কৃতিক উদ্বাস্তু হয়ে উঠছে মানুষ। গণতন্ত্রের অভাবে অনেক সময় রাষ্ট্র ও সমাজ একাকার হয়ে মতপ্রকাশের অধিকার কেড়ে নিয়ে মানবিক বিকাশের সর্বনাশ ঘটায়।
শুধু বাংলাদেশের নয়, বিশ্বসমাজে মানবজাতির চরম অবক্ষয় ও গভীর সংকটের ভয়াবহ চিত্র উপস্থিত। পৃথিবীর ভবিষ্যৎ নিয়ে বিজ্ঞানীরা মহাশংকিত। আমেরিকার স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক পল এরিক দ্বিধাহীনভাবেই বলেছেন এখন আমরা পৃথিবীর ইতিহাসে ষষ্ঠ গণবিলুপ্তির পর্যায়ে রয়েছি। প্রায় ৬ কোটি বছর পরে এমন একটা মহাবিপর্যয় যে ঘটতে যাচ্ছে তার দায় আমরা এড়াতে পারি না। ব্রিটিশ বিজ্ঞানী মার্টিন রিজ ১৯৯৫ সালে আস্ত এক বই লিখেছেন ঙঁৎ ঋরহধষ ঈবহঃঁৎু যাতে তিনি নিঃসংশয়ে বলেছেন, একবিংশ শতাব্দী হতে পারে আমাদের সর্বশেষ শতাব্দী, ২১০০ পর্যন্ত যাওয়া যাবে না, তার আগেই মানব সম্প্রদায় বিলুপ্ত হতে পারে। আত্মপরিচয়ে বৈচিত্র্য, বহুত্ববাদী দর্শন মহামনীষী হিসাবে চিত্রিত করছি না, ধর্ম রেখেই বিজ্ঞানচর্চা করা সম্ভব, ধর্ম পালন করেই সংস্কৃতিচর্চা সম্ভব। ইহলোকে আনন্দ ও সৌন্দর্যের সমন্বয় প্রয়োজন, সুকুমার কলা এ নিয়ে বিভ্রান্তি কাটেনি। মুসলিম চিন্তাবিদেরা এ নিয়ে লিখে গেছেন। আবুল মনসুর আহমেদ, কাজী মোতাহার হোসেন প্রমুখ চিন্তা ও আদর্শে এরা সবাই গভীরভাবে মুসলিম ছিলেন। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে গণজাগরণ হলেও গণমুক্তি ঘটেনি; চেতনার পূর্ণ বিকাশ ঘটেনি। ধর্মনিরপেক্ষ সমন্বয়বাদী সংস্কৃতি হয়নি। আজও গ্রামীণ সংস্কৃতি অসাম্প্রদায়িক। সংস্কৃতিবিহীন রাজনীতি দুর্বৃত্তের রাজনীতি। সে রাজনীতির ধারকরা দুর্নীতিপরায়ণ হয়ে ওঠে। তিনি আমেরিকার নির্বাচনের উদাহরণ দিয়ে বললেন সেখানে দুই প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী এককটি জনগোষ্ঠীর কাছে গিয়ে একেকরকম প্রচারণা চালাচ্ছে। সারা দুনিয়াতেই রক্ষণশীলতা বেড়েছে, ভোগ বেড়েছে। রামমোহন রায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ, শিখা গোষ্ঠী যে পথ দেখিয়ে গেছেন আমরা সে পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছি। সারা দুনিয়োতেই পুঁজিবাদের যুদ্ধবাজ রাজনীতি ছড়িয়ে পড়েছে। শিক্ষায় প্রাণ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। চধংংরাব ঊফঁপধঃরড়হ-কে অপঃরাব ঊফঁপধঃরড়হ-এ পরিণত করতে হবে। কাজে, সৃজনশীলতায় আনন্দ সঞ্চার করতে হবে শিশুর প্রাণে।
আমরা মোহিত হয়ে আবুল মোমেনের দীর্ঘ প্রবন্ধপাঠ শুনলাম। পরের আলোচক কথাসাহিত্যিক ওয়াসি আহমেদ। তার পরিচয় দিতে গিয়ে লুভা নাহিদ চৌধুরী বললেন : ওয়াসি আহমেদের জন্ম সিলেটে। স্কুলের পাঠ বৃহত্তর সিলেটে, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় জীবন কেটেছে ঢাকায়। তার প্রধান পরিচয় কথাসাহিত্যিক হলেও তিনি লেখালেখি শুরু করেছিলেন কবিতা দিয়ে। কথাসাহিত্যে, বিশেষ করে গল্পে মনোনিবেশ করেন আশির দশকে। লেখালেখির স্বীকৃতি হিসেবে তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কারসহ একাধিক পুরস্কার অর্জন করেছেন। কর্মজীবনে ছিলেন কূটনীতিক, বর্তমানে তিনি একটি ইংরেজি দৈনিকের সম্পাদকীয় বিভাগে কর্মরত।
তিনি স্মরণ করলেন আবুল হাসনাত স্মারক বক্তৃতা সাধারণত জুলাই মাসে হয়। এবার জুলাই ছিল উত্তাল। হয়ত সে কারণেই এটা নভেম্বরে সরে এসেছে। তবে আজকের দিনটি আবুল হাসনাতের মৃত্যুদিন। সে বিচারে তাঁকে স্মরণ করার জন্য যথার্থ দিন। আবুল হাসনাতের সঙ্গে তাঁর পরিচয় পারস্পরিক ঘনিষ্ঠতা থেকে পারিবারিক পর্যায়ে গড়িয়েছে। ওয়াসি আহমেদের মতে আবুল হাসনাত ছিলেন একজন লাজুক মানুষ, অন্তর্মুখী। তাঁর ব্যক্তিত্বের চারিপাশে একটি বর্ম ছিল। একদিন সে বর্ম ভেঙে গিয়েছিল, তিনি তাঁর স্নেহধন্য হতে পেরেছিলেন।
আশির দশকে ওয়াসি আহমেদ যখন লেখালেখি শুরু করেন তখন দৈনিক সংবাদের সাহিত্য পাতায় লিখতে পারা ছিল গর্বের। প্রথমে তিনিই লেখা দিতেন, পরে আবুল হাসনাত যখন লেখা চাইতে শুরু করলেন তখন নিজেকে ধন্য মনে হতো। তিনি সময় বেঁধে দিতেন ১০ দিন, একটা চাপ অনুভব করলেও লেখা কিন্তু ১০ দিনের মধ্যেই তৈরি হয়ে যেত। ওয়াসি আহমেদ যখন কর্মোপলক্ষে বিদেশ গেলেন তখনও যোগাযোগ ছিল। আবুল হাসনাত একদিন উচ্ছ্বসিত হয়ে জানিয়েছিলেন নতুন মাসিক কালি ও কলম-এর কথা, বলেছিলেন সেখানে নিয়মিত লেখা দিতে হবে। আবুল হাসনাত, ওয়াসি আহমেদের চোখে, একজন তর্কের ঊর্ধ্বে মিতাচারি মানুষ। একটা জীবন তিনি কাটিয়েছেন বই পড়ে, চিত্রকলা, চলচ্চিত্র দেখে, সাহিত্য সম্পাদনা করে। এ দেশের সকল সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সঙ্গে তিনি ঘনিষ্ঠ ছিলেন। আবুল মোমেন রচিত ও পঠিত আজকের মূল প্রবন্ধ ‘গণমুক্তি ও মানুষের মুক্তিসাধনা’ প্রসঙ্গে বললেন রাজনীতির মাধ্যমে মানুষের মুক্তি আসেনি। বাঙালি মুসলমানের যে রেনেসাঁর কথা বলা হচ্ছে সে রেনেসাঁ হয়নি। সেটা ছিল কিছু অগ্রসর মানুষের যূথবদ্ধ মানসগঠনের কাল।
আবুল মোমেনের প্রবন্ধের ওপর আলোকপাত করতে গিয়ে ওয়াসি আহমেদ বললেন তিনি পরিবেশের ওপর জোর দিয়েছেন। উচ্চ পর্যয়ের আনুকূল্য না থাকায় যে অবক্ষয় ঘটছে তা নানাদিকে বিস্তৃত। আবুল মোমেন নানা কোণ থেকে আলোচনা করেছেন― দেশীয় পরিস্থিতি, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডল। আবুল মোমেন এবং তাঁর মতো আরও অনেকে অবক্ষয়ের কথা বলেছেন। সমস্যা হলো আমরা তর্কে নেই, পরমত সহিষ্ণুতায় নেই। চড়ঢ়ঁষরংস বা লোকরঞ্জন খারাপ জিনিস, এটা রাজনীতিকেরা করে, যে জিনিস শুনে লোকেরা খুশি হবেন তা বলার লোক সর্বত্র ছড়িয়ে আছে। মানুষের আবেগ নিয়ে ন্যারেটিভ তৈরি লোকরঞ্জন। যদি জানি আপনার দুর্বলতম জায়গা তবে সেখানে চড়ংঃ ঞৎঁঃয মিথ্যাচার নয়। নির্মম সত্যকে আড়াল করতে গিয়ে ভিন্ন ভাষ্য তৈরি করা এটা বিভিন্ন পর্যায়ে হতে পারে। সত্য সরাসরি অস্বীকার না করে ভিন্নভাষ্য তৈরি হলো লুকানো সত্য। গণমুক্তি জেলখানা থেকে মুক্তি নয়, চিন্তায় মুক্তি, বৃহত্তর পরিসর তৈরি। অনেক মানুষের অনুপস্থিতি পঙ্গুত্ব সৃষ্টি করবে। আমি লক্ষ করি মঞ্চে যে চারজন গুণী মানুষ বসে আছেন, তাঁদের দুজনের পোশাক সনাতনী, গত শতাব্দীর; দুজনের পোশাক আধুনিক ও একবিংশ শতাব্দীর।
আজকের আলোচনা অনুষ্ঠানের সভাপতি সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম কালি ও কলম পত্রিকার সম্পাদকমণ্ডলীরও সভাপতি। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ইমেরিটাস, একজন শক্তিমান কথাসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক। এটা যেহেতু আবুল হাসনাত স্মারক বক্তৃতার অনুষ্ঠান, অদৃশ্যে থেকেও তিনিই নায়ক, প্রত্যেক বক্তাই আবুল হাসনাতের সঙ্গে তার ব্যক্তিগত পরিচয় ও সম্পর্কের ইতিহাস, সামান্য হলেও তুলে ধরছেন। সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম স্মরণ করলেন আবুল হাসনাতের সঙ্গে তাঁর প্রথম পরিচয় ঘটে সত্তর দশকের মাঝামাঝি। দৈনিক সংবাদের সাহিত্য সাময়িকীর প্রথিতযশা সম্পাদকের ফরমায়েশ এল পটুয়া কামরুল হাসানের ওপর লিখতে হবে, কোনও অজুহাতেই এড়িয়ে যাওয়া যাবে না। সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম নিবিষ্ট হয়ে লিখলেন। সে লেখা পড়ে কিংবদন্তি চিত্রশিল্পী খুব খুশি হয়েছিলেন, তিনি সৈয়দ মনজুরুল ইসলামকে তাঁর বাড়িতে ডেকেছিলেন। আবুল হাসনাতের মাধ্যমে তিনি ভারতের অনেক বিখ্যাত চিত্রশিল্পী―যেমন গনেশ হালুই, গনেশ পাইন, শোভন শ্যাম প্রমুখের সঙ্গে পরিচিত হতে পেরেছিলেন। আশির দশকে বিশ্বসাহিত্য নিয়ে সংবাদের পাতায় সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম ধারাবাহিকভাবে লিখলেন, পরে যা অলস দিনের হাওয়া নামে বই হিসেবে বেঙ্গল বই থেকে বেরিয়েছিল। আবুল হাসনাত লেখকদের সাহিত্যের-পথটি ধরিয়ে দিতেন, তাদের গন্তব্যে পৌঁছাতে সাহায্য করতেন। লেখার গভীরে যে সংবেদন থাকে তা আবুল হাসনাত বুঝতেন। তিনি টের পেতেন একের ভেতর অনেক মানুষ বাস করে।
আবুল মোমেন সাংবাদিক, ভিন্নমাত্রার সংস্কৃতির গণমুখী চর্চা, শিশুদের জন্য স্কুল করেছেন। আবুল মোমেন শুধু সাংবাদিক নন, বহুমাত্রিক। সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের মনে পড়ল নেপালে দেখা একটি ঝর্নার কথা। ঝোপঝাড় দিয়ে ঢাকা, প্রথমে বোঝা যায় না, কিন্তু যতই নিচের দিকে এগুনো যায় ততই প্রবল জলধারা হয়ে ওঠে উপরের ক্ষীণ ধারাটি। সংস্কৃতির উৎস কোথায় আমরা জানি না, কিন্তু আমরা আশা করি তা পদ্মা, মেঘনার মতো বিস্তৃত হবে, গভীর হবে, চলমান জীবনচিত্রকে ধারণ করবে, বহুমাত্রিক হবে। নদীর উপরে যেমন বাঁধ দিয়ে নদীর প্রবাহ রুদ্ধ করে দেওয়া হয়, তেমনি সংস্কৃতির নদীর উপরে নানারকম বাঁধ―মতের বাঁধ, দর্শনের বাঁধ, সংস্কারের বাঁধ, বিরুদ্ধ ধারণার বাঁধ তুলে ১৯৭১ থেকে বেগবান সংস্কৃতির ধারাটি শুকিয়ে ফেলেছে। নামহীন গোত্রহীন গণতন্ত্রহীন শিক্ষা যে সংকীর্ণ হতে বাধ্য আবুল মোমেন তা ঘনিষ্ঠভাবে অবলোকন করেছেন, সংবাদপত্রের জগতে দেখেছেন অনেক মিথ্যা, বানানো খবরের ছড়াছড়ি।
অনেক মনীষীর মনীষায় সমৃদ্ধ একটি দেশে এই গণতন্ত্রহীনতা তৈরি করেছে সাংস্কৃতিক বন্ধ্যাত্ব। আমরা এই বন্ধ্যাত্বের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। এখন বহুমত চর্চা লুপ্ত হতে চলেছে। চষঁৎধষরঃু নেই, এখন কেবল শ্রেণিস্বার্থ, পুঁজির বিকাশ। গণমুক্তি শুধু রাজনৈতিক মুক্তি নয়, এটি সাংস্কৃতিক মুক্তিও। শিক্ষার ভেতর দিয়ে এমন একটি সুস্থ সংস্কৃতি গড়ে তোলা যা বহুত্ববাদকে ধারণ করে। সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের মনে পড়ল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনীষী অধ্যাপক খান সরওয়ার মুরশিদের কথা যিনি ছিলেন একজন নিরলস জ্ঞান অনুসন্ধানী। সেই ১৯৬৮ সালে তিনি ফরাসি দার্শনিক সোসাইটির সভ্যপদ লাভ করেছিলেন। এখন চারিদিকে চমক দেবার চেষ্টা, চিন্তার ক্ষেত্রে এখন উর্বর শস্য নেই, এখন অকারণ ঝগড়া।

তিনি আমাদের দৃষ্টি ফেরালেন সেই সময়ে যখন সোস্যাল মিডিয়া ছিল না, তখন মানুষের হাতে বই ছিল। এখন মানুষের হাতে বই নেই। এই বিপদের কথা আবুল মোমেন তাঁর প্রবন্ধে বলেছেন, আমরা এখন বামনায়নে বিশ্বাস করি। কিন্তু এটা তো সত্য যে অন্যকে খাটো করে কেউ বড় হতে পারে না। এখন ‘আমি’ ও ‘অপর’-এ বিভক্ত করে ফেলেছি। আমি পূত-পবিত্র, অন্যেরা কদর্য, যে আমার সঙ্গে একমত হয়নি সে কদর্য। এটাই অপরায়ন। বিদেশের এয়ারপোর্টে আমাদের দেখলে ‘সাদা চামড়া’ ভাবে এই আপদ কেন প্রবেশ করছে, অথচ ঔপনিবেশিক শাসনের ফলমূল তারা খেয়েছে। এরা হলো শংকর ইংরেজ। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন আত্মশক্তি বিকাশের জন্য শিক্ষার প্রয়োজন। সংস্কৃতিহীন শিক্ষা অসম্পূর্ণ শিক্ষা। আমাদের জাতীয় অভিপ্রায় প্রয়োজন। আমরা জানি না ভবিষ্যৎ কেমন হবে। আবুল হাসনাত যে সমাজে, বিশেষ করে সংস্কৃতির জগতে, মননচর্চায় সর্বাঙ্গীন বিকশিত মানুষ তৈরির চেষ্টা করেছেন―এটা নিশ্চিত। অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম তাঁর অত্যন্ত মনোগ্রাহী বক্তৃতাটি এই বলে শেষ করলেন যে আবুল হাসনাত নিশ্চয়ই ভালো কিছু করেছেন যে জন্য আপনারা এ সভায় এসেছেন। তাঁর আশাবাদ আবুল হাসনাত বহুকাল প্রাসঙ্গিক হয়ে থাকবেন।
আলোচনা শেষ হয়ে এলে লুভা নাহিদ চৌধুরী অতিথিদের আমন্ত্রণ জানালেন আপ্যায়নে। মিলনায়তনের প্রবেশ দরোজা যে করিডোরে তার অপর প্রান্তে রুপালি সার্ভিং ডিশগুলো থেকে পরিবেশকরা অতিথিদের প্লেটে তুলে দিচ্ছিল সিঙাড়া ও কেক। ওপ্রান্তে চা বানিয়ে দিচ্ছিলেন একজন। খাবার খেতে খেতে অতিথিরা―এরা সবাই লেখালেখির জগতের মানুষ, পরস্পরের সঙ্গে গল্প করছিল, কেউ কেউ মগ্ন ছিল বিখ্যাতজনদের সঙ্গে তাদের ছবি তোলায়।
আহারের পরেও আড্ডা চলতে থাকে। একদলকে দেখি পাশের কফিশপে গিয়ে বসেছে। আমি আমার প্রবন্ধের বই কবিতার মায়াহরিণ কবির মঙ্গলযাত্রা কবি আবুল মোমেনকে উপহার দিই। আমার সর্বশেষ কাব্যগ্রন্থ তোমার অকূল জলে ঈশ্বর উপহার দিই বিখ্যাত বাচিকশিল্পী শুধু নন, শুদ্ধ বাংলা উচ্চারণের শিক্ষাগুরু ভাস্বর বন্দোপাধ্যায়কে। তাঁকে বলি, যদি আমার একটি কবিতাও আপনার আবৃত্তিতে উঠে আসে আমি সুখী হব। অপর বইটি উপহার দিই কবি মণিকা চক্রবর্তীকে―যার সৌন্দর্যময় উপস্থিতি সভার অলঙ্কার। আমাকে দেখে খুব খুশি হন কথাসাহিত্যিক কাজী রাফি। সম্প্রতি আমি এই মেধাবী কথাসাহিত্যিকের লেখা এপিক নভেল ত্রিমোহিনী পড়তে শুরু করেছি। আমাকে ছবি তুলে দিতে ব্যস্ত রাখা আরেক মেধাবী কথাসাহিত্যিক পাপড়ি রহমানকে দেখেছি অনুষ্ঠানের শুরু থেকেই। কফিশপে পরিচয় হলো কবি নুরুল হকের কন্যা চারু হকের সঙ্গে। তার বাবার উপরে আমি প্রবন্ধ লিখেছি বলে কৃতজ্ঞতা জানাল। সেখানে আরও উপস্থিত ছিলেন নূর কামরুন নাহার, সাবেরা তাবাসসুম, আসমা সুলতানা শাপলা, সুশীলা শীলা, রুখসানা আহমেদ, মাহফুজা শিলু, সুমী সিকান্দার। অর্থাৎ ছিলাম নারীপরিবেষ্টিত, আমার একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল জাকারিয়া বিপ্লব। খাবার খেতে খেতে কথা হয়েছে কয়েকজন কবির সঙ্গে। এরা হলেন দুই জাহিদ―জাহিদ হায়দার ও জাহিদ মুস্তাফা, সাখাওয়াত টিপু। অগ্রজদের মধ্যে ছিলেন অধ্যাপক ফকরুল আলম, কবি ফারুক মাহমুদ, কবি মানিক মোহাম্মদ রাজ্জাক। অনুষ্ঠানের শুরুর আগেই যার পাশে গিয়ে বসেছিলাম তিনি কথাসাহিত্যিক, প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত ইকতিয়ার চৌধুরী। আমার পেছনেই বসেছিলেন কথাসাহিত্যিক মোজাফ্ফর হোসেন। একঝলক দেখেছিলাম বিখ্যাত জীবনানন্দ গবেষক ফয়জুল লতিফ চৌধুরীকে। আর যার অ্যাসাইনমেন্ট নিয়ে এ সভাগৃহে আমার প্রবেশ ও উপস্থিতি তিনি কথাসাহিত্যিক মোহিত কামাল। বিখ্যাত নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক নজরুল ইসলামের সঙ্গে দেখা হলে তিনি যখন বল্লেন, ‘আপনার লেখা পড়ি,’ তখন সত্যি মহাকাশে উড়ে যাওয়া ছাড়া আমার উপায় ছিল না। সবশেষে যার কথা না বললেই নয় তিনি আশফাক আহমেদ। কালি ও কলম-এর এ কর্মীর কাঁধে ছিল অতিথিদের দেখভালের দায়িত্ব।
লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক



