আর্কাইভগল্প

গল্প : ২১শে শ্রাবণের গান : দীপু মাহমুদ

এরকম ঘটনা ঘটতে পারে ধারণা করেছিলাম, কিন্ত এমন বীভৎসভাবে ঘটবে অনুমান করতে পারিনি। ভার্সিটিতে কনসার্ট হবে। শীতার্তদের সহযোগিতার জন্য কনসার্ট। ওপেন ফর অল। আয়োজন করেছে স্কাই ইজ নো লিমিট নামে ভার্সিটির এক কালচারাল ক্লাব। কনসার্টে ব্যান্ডদল আসবে। ব্যান্ডের নাম এলেবেলে। তারাই মূল আকর্ষণ। নিতা নামে একজন ব্যান্ডশিল্পী এলেবেলে ব্যান্ডের লিড ভোকালিস্ট। তার সব গান মেটাল টিউনে গাওয়া। গানের কথা সবটা বোঝা না গেলেও গানের মিউজিক আর নিতার নাচে পুরো অডিয়েন্স উন্মাতাল হয়ে যায়।

এলেবেলে ব্যান্ডদল স্টেজে পারফর্ম করার আগে ভার্সিটির ছেলেমেয়েদের গানের আয়োজন করেছে স্কাই ইজ নো লিমিট। সিদ্ধান্ত নিয়েছে সেখানে ভার্সিটির পরিচিত কোনও গানের শিল্পী গান গাইবে না। গাইবে অপরিচিত শিল্পী। অডিশনের জন্য যোগাযোগ করতে বলে পোস্টার লাগিয়েছে ভার্সিটি ক্যাম্পাসে।

অডিটরিয়ামের সামনে খোলা জায়গা। জনা পাঁচেক ছেলেমেয়ে সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে আছে। পাশের ক্যান্টিন থেকে তাদের চা দিয়ে গেছে। তারা চা খাচ্ছে। এখানেই গানের অডিশন হওয়ার কথা। আশপাশে সেরকম কাউকে দেখা যাচ্ছে না। আমি গিয়েছিলাম গিটারের স্ট্রিংয়ের খোঁজে। গত রাতে কেউ একজন আমার গিটারের স্ট্রিং ছিঁড়ে ফেলেছে। রুমের দু জন চাইছে না আমি গিটার বাজিয়ে গান গাই। তারা সরাসরি বলে না।

গত রাতে ঘরে ঢুকে হাই তুলে তাদের একজন বলল, তিহান, তুমি যখন-তখন এই ট্যাং ট্যাং আওয়াজ করে কী আনন্দ পাও বলো তো ?

বললাম, আপনারা যখন রুমে থাকেন তখন বাজাই না। আপনাদের অসুবিধা হবে ভেবে। আপনারা রুমে চলে এলে বাজানো বন্ধ করে দিই।

আরেকজন বলল, গান-বাজনা ভালো না। এসব শয়তানের কাজ।

আজ সকালে দেখি গিটারের দুটা স্ট্রিং ছেঁড়া। মানে গিটারে দুটো স্ট্রিং নেই। কেউ কেটে ফেলে দিয়েছে। অডিটরিয়ামের খোলা জায়গায় বসে যারা চা খাচ্ছে তাদের মধ্যে যে মেয়েটি কালো ড্রেস পরে আছে সে এগিয়ে এল। ভরাট গলায় বলল, অডিশন দিতে এসেছেন ?

ওপর-নিচ মাথা ঝাঁকালাম। আমি গানের অডিশন দিতে এসেছি।

মেয়েটি পেছনে তাকিয়ে বলল, আদি, গান শুনবি ওর ?

আদি বলে যে ছেলেকে ডেকেছে সে চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে ফ্লোরে কাপ নামিয়ে রাখল। চোখ সরু করে জিজ্ঞেস করল, কোন সেমিস্টার ?

বললাম, সেকেন্ড সেমিস্টার।

কোন ডিপার্টমেন্ট ?

কমিউনিকেশন অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ।

পাশ থেকে একজন আচমকা ‘তুই’ করে কথা বলল। আমার ভালো লাগেনি। কিছু বললাম না। ছেলেটা বলল, গান গাইতে পারিস নাকি গিটার নিয়ে মেয়েদের ইমপ্রেস করার জন্য ফ্লেক্স মারিস!

আদি নামের ছেলেটা বলল, কাম অন, অভ্র। লেট হিম কুক ফার্স্ট। গানটা আগে গাইতে দে।

আমার দিকে তাকিয়ে বলল, কী নাম তোমার ?

নাম বললাম।

বলল, আদি শোনো, তুমি আসতে অনেক লেট করেছ। আধাঘণ্টা আগে আমরা কাজ শেষ করে ফেলেছি। চা খেয়ে চলে যাচ্ছিলাম।

কালো ড্রেস পরা মেয়েটি বলল, এসেই যখন পড়ছে, গান শোনাক। চলে তো আমরা যাইনি।

অভ্র দুবার কাশি দেওয়ার মতো শব্দ করে বলল, মিতি যখন বলেছে আদি আর সে কথা ফেলে কীভাবে!

আমাকে গান গাইতে বলা হলো। আমি লালনের গান গাইলাম। লালন বলে জাতের কী রূপ, দেখলাম না এই নজরে।

অভ্র অদ্ভুত শব্দ করে হেসে বলল, গানটা পুরাই স্কিবিড।

স্কিবিড মানে আমি জানি। হাস্যকর। লালনের গান কেন তার কাছে হাস্যকর মনে হলো বুঝতে পারলাম না। নাকি আমি গাইতে পারিনি ঠিকমতো! চিন্তার মধ্যে পড়ে গেলাম।

মিতি বলল, হি হ্যাজ দ্য রিজ। তার গলায় কারিশমা আছে সেটা অস্বীকার করতে পারবি না।

অভ্র ঘাড় কাত করে মিতির মুখের কাছে চোখ ঝুলিয়ে বলল, সাস লাগতেছে, ব্রাহ্। ঘটনা কী ?

সাস লাগা শব্দটাও আমার পরিচিত। সাসপেক্ট আর সাসপিশিয়াস মিলিয়ে বানানো।

আদি বলল, তুমি আমাদের কনসার্টে গাইবে।

অভ্র ঠোঁট উলটিয়ে বলল, ওকে পুকি, গাইবে।

কনসার্ট শুরু হয়েছে। কনসার্ট শুরু হতে দেরি হয়েছে। ওপেন কনসার্ট। সেখানে বন্যার্তদের জন্য টাকা তোলা হচ্ছে। কনসার্টে যারা গান শুনতে এসেছে তারা বলছে গান শুরু হলে টাকা দেবে। আয়োজকেরা বলছে টাকা আগে দিতে হবে। সিদ্ধান্ত হয়েছে। একজন গান গাওয়ার পরে কয়েকজন ভলেন্টিয়ার চলে যাবে কালেকশনে। দশ মিনিট কালেকশন চলবে। তারপর আবার গান হবে। আমাকে ডেকেছে চারজন গান গাওয়ার পর। আগের চারজন চলতি মুভির চটুল গান গেয়ে অডিয়েন্সকে অস্থির করে দিয়েছে।

স্টেজে উঠে হট্টগোলের ভেতর পড়ে গেলাম। এলেবেলে ব্যান্ডদল চলে এসেছে। সবাই নিশ্চিত হতে চাইছে নিতা এসেছে কিনা। স্টেজের দিকে কারও মনোযোগ নেই। অভ্র চিৎকার করছে, কী রে, গান গা। তুই চুপ করে আছিস কেন ? তোর গান তুই গেয়ে যা। নাকি নিতার সঙ্গে নেচে নেচে গাইবি ?

গান শুরু করলাম। আমার লেখা গান। সুর নিজে করেছি। মানুষ বাঁচাও, বাঁচাও মানুষ। মানুষ কাঁদছে খুবই।

খেয়াল করলাম সামনের দর্শক শ্রোতা অমনি শান্ত হয়ে এসেছে। ফোক সুরের গান। বি ফ্ল্যাটে ধরে সি শার্পে উঠে গেছি। ইচ্ছে করে করেছি। হইচইয়ের ভেতর এমন না করে আর কিছু করার ছিল না। আমার ভোকালের জন্য হোক আর বন্যায় যে মানুষ ডুবছে সেজন্য হোক, সবাই আমার গানের দিকে মনোযোগ দিয়েছে। এবার শান্তভাবে গাইলাম, মানুষ বাঁচাও, বাঁচাও মানুষ। মানুষ কাঁদছে খুবই।

শান্ত হয়ে এসেছে সবাই। গান ধরে এগিয়ে গেলাম, রাতের ভোটে দেশ ডুবেছে হারিয়েছি সবই। মেরুদণ্ড হারিয়ে গেছে, হারিয়েছি কথা। শিক্ষানীতি…।

এ পর্যন্ত গাইতে পেরেছি। তখুনি শুনলাম দর্শক-শ্রোতাদের ভেতর থেকে কয়েকজন চিৎকার করে ছুটে আসছে। তাদের হাতে লাঠি। তারা কেন লাঠি নিয়ে কনসার্টে এসেছে জানি না। চিৎকার করছে, মার শালাকে, শালা রাজাকার। শিবিরের বাচ্চা। শালা স্বাধীনতাবিরোধী, ছুপা রুস্তম।

 উন্মত্ত ছেলেরা স্টেজে উঠে পড়েছে। তারা আমার হাত থেকে গিটার কেড়ে নিয়েছে। লাথি দিয়ে মাইক্রোফোন ফেলে দিয়েছে। সামনে দর্শক-শ্রোতাদের ভেতর দৌড়াদৌড়ি শুরু হয়েছে। আমাকে ধরে সবাই পেটাচ্ছে। এলোপাথাড়ি কিল-ঘুষি মেরে যাচ্ছে আমার গালে, চোখে, মুখে, পেটে। আমি মাথা বাঁচানোর চেষ্টা করছি। কেউ আমার মাথায় লাঠি দিয়ে আঘাত করেছে। আরেকবার কাঁধে মেরেছে জোরে লাঠি দিয়ে।

মাথার ভেতর ভোঁ ভোঁ করছে। মনে হচ্ছে অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছি। মিছিলের আওয়াজ আসছে। কয়েকজন সেøাগান দিচ্ছে, জয় বাংলা। জয় বঙ্গবন্ধু। শিবিরের ক্যাডারেরা, হুঁশিয়ার সাবধান। বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, নেতা মোদের শেখ মুজিব। সব অন্যায়ের প্রতিকার, ছাত্রলীগের অঙ্গীকার। ছাত্রলীগ দিচ্ছে ডাক, সন্ত্রাস নিপাত যাক।

আওয়ামী লীগ এখন রাষ্ট্রক্ষমতায়। ছাত্রলীগ হচ্ছে আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন। গত ১৫ বছর আওয়ামী লীগ একটানা বাংলাদেশে সরকার গঠন করে ক্ষমতায় আছে। পরপর তিন টার্ম আওয়ামী লীগ ভোটসন্ত্রাস করে ক্ষমতায় গিয়ে সরকার গঠন করেছে। এখন আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগের বিপক্ষে যায় এমন কোনও কথা বললেই তাকে প্রকাশ্যে পেটানো হয়। কখনও মেরে ফেলে কিংবা গুম করে দেয়। তারা এত বেশি ভয়ংকর যে তাদের বিরুদ্ধে কেউ কিছু বলতে পারে না।

আমার ভাগ্য ভালো। আমাকে মেরে ফেলেনি। আমার জ্ঞান ফিরেছে ভার্সিটির মেডিক্যাল সেন্টারে। পরে সেখান থেকে আমাকে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছিল। এখন সুস্থ। শুধু গিটার ফেরত পাইনি। সেটা ছাত্রলীগের ক্যাডাররা ভেঙে ফেলেছে।

মিতির সঙ্গে আমার আবার দেখা হলো এক বৃহস্পতিবার বিকেলে। ভার্সিটির ক্যাফেতে। মিতিকে আমার আলাদাভাবে মনে ছিল না। সেই অডিশনের পর আর দেখা হয়নি। দুপুর থেকে আকাশে ভীষণ মেঘ করেছে। ঘন কালো মেঘ। কয়েক দিন থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে। জোর বৃষ্টি। তবে গতকাল আর আজ এখনও বৃষ্টি হয়নি। রাতে ঝুম বৃষ্টি হবে মনে হচ্ছে।

শরীর পুরোপুরি সারেনি। হাঁটতে গেলে বাঁ হাঁটুতে ব্যথা করে। পিঠের কাছেও চিনচিনে ব্যথা আছে। শরীর ম্যাজম্যাজ করে। সকালে দুটো ক্লাস ছিল। ক্লাস শেষ করে রুমে গিয়ে শুয়েছিলাম। আমার গিটার বাজানো যারা পছন্দ করে না তাদের একজনের নাম দিলশাদ। আরেকজনের নাম নাদিম। তারাও ফিরে এসেছে রুমে। আমার শরীর ভালো লাগছিল না। দুপুরে খেয়ে শুয়েছিলাম। দিলশাদ কাছে এসে কিছুটা ফিসফিস মতো আওয়াজ করে বলল, তুমি শিবির করো ?

কিছু বললাম না। নাদিম বলল, অবশ্যই শিবির করে। শিবির না করলে ওরকম মার সহ্য করে বেঁচে আছে কীভাবে বল। শিবিরের জান হচ্ছে কই মাছের মতো। পানি থেকে ডাঙ্গায় তুলে ফেলে রাখলেও মরবে না।

দিলশাদ এদিক-ওদিক তাকিয়ে বলল, আহ আস্তে কথা বল। কেউ শুনে ফেলবে।

আমার দিকে তাকিয়ে দিলশাদ আগের মতো নিচু গলায় বলল, তুমি ফেরার পর থেকেই বলব ভাবছি। ওয়েট করছিলাম। বলিনি কিছু। আজ বলছি। এই সিট তুমি ছেড়ে দাও। তুমি রুমে থাকলে আমাদের অসুবিধা হবে। ছাত্রলীগের ছেলেরা একবার যখন জানতে পেরেছে তুমি শিবির, তখন এই রুম থেকে আমাদের সবাইকে বের করে দেবে।

বিছানা থেকে নেমে পড়েছি। ভালো লাগছে না। ক্লান্ত গলায় বললাম, তোমরা তো ছাত্রলীগ করো। তোমাদের ভয় কী ?

নাদিম বলল, তোমাকে কে বলছে আমরা ছাত্রলীগ করি ?

তোমরা ছাত্রলীগের মিছিলে যাও।

আজ তুমিও যাবে। না গেলে হলে আমাদের কারও সিট থাকবে না। নিজেকে বাঁচানোর জন্য দরকার পড়লে ছাত্রলীগ হল কমিটিতে ঢুকে পড়বে।

রুম থেকে বের হয়ে পড়েছি। কোথায় যাব বুঝতে পারছি না। আমরা যাওয়ার কোনও জায়গা নেই। মন খারাপ করে হাঁটতে হাঁটতে ক্যাফেতে চলে এলাম। সম্ভবত আকাশের ভাব দেখে ক্যাম্পাস থেকে সবাই হলে ফিরে গেছে। ক্যাফে মোটামুটি ফাঁকা। কোণার দিকে দুজন বসা যায় এমন একটা ছোট্ট টেবিলের ওপাশে গিয়ে বসে পড়লাম।

বৃষ্টি শুরু হয়েছে। আকাশভাঙা বৃষ্টি। ছেলেমেয়েরা ছুটে ক্যাফেতে ঢুকছে। জামাকাপড় ভিজিয়ে ছুটতে ছুটতে মিতি এসে ঢুকল ক্যাফেতে। তাকে চিনতে পেরেছি। চিনতে পারার কারণ হতে পারে মিতি আজও সেই কালো ড্রেসটা পরে আছে। প্রবল ঝড়বৃষ্টি আর হুড়োহুড়ির ভেতর আমার মাথায় সম্পূর্ণ অন্যরকম অদ্ভুত ভাবনা এল। এটা বুঝি আমার সঙ্গে মিতির দেখা হওয়ার ড্রেস! মনে হলো যদি আমার দেখা করার কেউ থাকত তাহলে প্রত্যেকবার আমি একই রঙের শার্ট পরে তার সঙ্গে দেখা করতে যেতাম। হতে পারে সেটা সাদা কিংবা কালো। ধরা যাক কালো। আমার অনেকগুলো কালো শার্ট থাকত। প্রতিবার তার সঙ্গে কালো শার্ট পরে দেখা করতে যেতাম। হয়তো সে অবাক হয়ে বলত, আচ্ছা, তোমার কি এই একটাই শার্ট ?

হেসে বলতাম, একটাই রং। তোমার জন্য। তোমার কাছে আমি রং বদলাই না!

আচ্ছা তখন সেই মেয়েটির মুখের চেহারা কেমন হতো!

মিতি সম্ভবত ক্যাফের বারান্দায় ছিল। বৃষ্টি শুরু হতেই ঢুকে পড়েছে। মনে হয় সঙ্গে আর কেউ নেই। সেও কোনও কর্নারে গিয়ে বসার কথা ভাবছিল। এগিয়ে এসে সামনের চেয়ারে ধপাস করে বসে পড়ল।

ক্যাফে ভরে উঠেছে। ঝড় শুরু হয়েছে। দুপুর বেলাতেই মনে হচ্ছে সন্ধ্যা পার হয়ে গেছে। বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। জোরে জোরে মেঘ ডাকছে।

মিতি বলল, তিহান, হোয়াটস আপ ? কখন আসছো ?

মিতি এমনভাবে কথা বলছে যেন আমরা কতদিনের পরিচিত। প্রায় প্রতিদিন আমাদের দেখা হচ্ছে। তবে তার গলায় নিখাদ আন্তরিকতা আর যত্ন মেশানো।

বললাম, বেশ কিছুক্ষণ।

মিতি চারদিকে তাকিয়ে আর কাউকে খুঁজছে মনে হলো। আস্তে সুরে বললাম, তোমার ক্লাস ছিল, মিতি!

মনে হলো মিতি চমকে গেছে। তার চোখে বিস্ময়। হতবাক গলায় বলল, তুমি আমার নাম জানো!

জানি বলেই তো বললাম।

সাবজেক্ট, সেমিস্টার ?

জানি না।

তোমার সঙ্গে। সেকেন্ড সেমিস্টার। সাবজেক্ট তোমার এসাইনমেন্ট। খুঁজে বাইর করবা।

মিতির সঙ্গে কথা বলতে ভালো লাগছে। বেশ স্বতঃস্ফূর্ত আর প্রাণবন্ত মেয়ে। কথায় আদর মেশানো আছে। বৃষ্টি যেমন হুড়মুড় করে শুরু হয়েছিল সেরকম হুট করে বন্ধ হয়ে গেল। আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে সাধারণত একটানা বৃষ্টি হয়। হুট করে বন্ধ হয়ে যায় না। আষাঢ় শেষ হয়ে শ্রাবণ মাস শুরু হয়েছে। তবে এখন বৃষ্টি ছেড়ে গেছে। ছেলেমেয়েরা ক্যাফে থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। ক্যাফে আবার ফাঁকা হয়ে গেছে।

মিতি বলল, চা খাই। তোমার সঙ্গে আমার জরুরি কথা আছে। চা খাইতে খাইতে বলি।

আমার সঙ্গে মিতির জরুরি কী কথা থাকতে পারে অনুমান করতে পারলাম না। চায়ের ব্যবস্থা মিতি করে ফেলেছে। সঙ্গে পাকোড়া।

চায়ে চুমুক দিয়ে মিতি বলল, তোমার কাছে আমাদের স্যরি বলতে যাওয়া উচিত ছিল। আমরা স্যরি। সেদিন কনসার্টে এমন কিছু হইতে পারে আমরা ভাবতেও পারি নাই। তাছাড়া আমরা ভাবছিলাম তুমি লালনের গান গাবে। তুমি যে চান্স পাইয়া এইরাম বাউন্ডারি হাকবা বুঝি নাই। রিহার্সালেও তো এই গান গাও নাই। আজিব ছেলে তুমি ব্রো। আমরা তো পুরাই টাশকি। মুহূর্তে সব আউলাইয়া দিলা।

বৃষ্টির ভেতর গরম চা যত ভালো লাগবে ভেবেছিলাম তত ভালো লাগছে না। আবার এমনও হতে পারে পাকোড়া খেতে ভালো হয়নি। তাই পাকোড়াতে কামড় দিয়ে চায়ে চুমুক দিয়েছি বলে চা তেতো লাগছে। শান্ত গলায় বলল, আমাদের দেশের এক একজন এমপি-মন্ত্রী যে পরিমাণ টাকা বানিয়েছে তা আমরা কেউ বিশ্বাস করতে পারব না। ব্রিটিশরা এ দেশ থেকে টাকা নিয়ে নিজের দেশে পাঠাত। আর আমাদের নেতারা দেশের টাকা বিদেশে পাচার করে।

মিতি বলল, চা ঠান্ডা হইতেছে। চা খাও।

চায়ের কাপে চুমুক না দিয়েই বললাম। এ দেশে ব্রিটিশ খেদাও আন্দোলন হয়েছে। তাহলে এদেশে এই মন্ত্রী-এমপিদের বিরুদ্ধে আন্দোলন কেন হবে না ?

শীতল গলায় মিতি বলল, এসব কথা আসতেছে কেন ? তুমি হাসপাতালে ছিলা। হ্যাঁ দরকার ছিল আমাদের তোমাকে দেখতে যাওয়া। দেখতে যাইতে না পারার পেছনেও কোনও কারণ নিশ্চয়ই আছে।

মিতির কথার রেশ ধরে কিছু বলিনি। বললাম, দেশে যত অনাচার হচ্ছে তার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে ইচ্ছে করে। দাঁড়াতে পারি না। আমার ভয় হয়। খুব ভয় হয়। মৃত্যুর ভয়। আমি কেবল গান গাইতে পারি। তাই গান গাই।

তোমাকে গান গাইতে কেউ নিষেধ করে নাই। গান গাইবে। উড়াধুরা যা ইচ্ছে হবে গাইবে।

মা লো মা, ঝি লো ঝি, বইন লো বইন, করলাম কী ? রঙ্গে ভাঙা নৌকা বাইতে আইলাম গাঙ্গে।

চুপ করে আছে মিতি। কথা বলছে না। গভীর গলায় বললাম, ওরা আমাকে বলেছে আমি নাকি স্বাধীনতাবিরোধী। বাবা ভয় পেত। গান গাইতে দিতে চাইত না। বাবা বলত, অসুবিধা নেই, তুমি দেশের গান গাইবে। সূর্যোদয়ে তুমি, সূর্যাস্তেও তুমি। ও আমার বাংলাদেশ, প্রিয় জন্মভূমি।

তখন আমি শায়ানের গান টিউন করতাম, কী করেছে তোমার বাবা, কী করেছে স্বামী ? গল্প সেসব তোমার চেয়ে কম জানি না আমি। তোমার যত কীর্তিকলাপ সেও তো আছে জানা। ইচ্ছে করেই মুখ খুলি না, বলতে ওসব মানা।

মিতি বলল, চা ঠান্ডা হইতেছে।

বললাম, চা খাব না। ভালো লাগছে না।

পাকোড়া খাও।

তিতো লাগছে। মনে হয় জ¦র আসবে।

মিতি উঠে এসে কপালে হাত ছোঁয়াল। মিতির হাত ঠান্ডা। অসম্ভব ঠান্ডা। যেন হিমশীতল পানিতে হাত চুবিয়ে এসেছে। ভালো লাগছে। মাথায় যন্ত্রণা করছিল। চাপ বোধ হচ্ছিল। এখন আর মাথার ভেতর চাপ নেই। আমার ভীষণ ইচ্ছে করছে মিতি আরও অনেকক্ষণ আমার কপাল ছুঁয়ে থাকুক। আমার জ¦র আসুক। প্রবল জ¦র।

কপাল থেকে হাত সরিয়ে নিয়ে মিতি বলল, কিচ্ছু হয় নাই। জ¦র নাই। শোনো, আদির সঙ্গে কথা বলব নে। আমাদের ক্লাব, স্কাই ইজ নো লিমিট থেকা তোমার জন্যে গিটারের ব্যবস্থা করা হবে। উঠতেছি। চায়ের বিল আমার। তুমি আবার দিতে যাইয়ো না।

মিতি উঠে চলে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে সে যেন কিছুই নিয়ে যাচ্ছে না সঙ্গে করে। কিন্তু রেখে গেছে অনেক কিছু। কী রেখে গেছে মিতি, বুঝতে পারছি না। মাথা ঝিমঝিম করছে। মিতি যা-ই বলুক। বুঝতে পারছি জ¦র আসছে। শরীর কাঁপিয়ে জ¦র আসবে রাত আসার আগেই।

ফোন বাজছে। আজ জ¦র নেই। তবে শরীর দুর্বল হয়ে আছে। রিং হচ্ছে ফোনে। আননোন নম্বর। কল রিসিভ করলাম। ওপাশ থেকে বলল, তিহান, আমি মিতি। শুনতে পাচ্ছ ?

মিতি আমার ফোন নম্বর কোথা থেকে পেয়েছে জানি না। সে আমার কাছ থেকে ফোন নম্বর নেয়নি। তবে আদির কাছে আমার ফোন নম্বর আছে। বললাম, শুনতে পাচ্ছি।

 শোনো, আজ সাড়ে পাঁচটায় আমাদের রিহার্সাল রুমে আইসো। কনসার্টের আগে যেখানে রিহার্সালে আসছিলা। হ্যাঁ, দক্ষিণ দিকের ওই বিল্ডিংয়ে। দেরি কইরো না।

আজ বিশ মিনিট আগে পৌঁছুলাম। পাঁচটা দশে। ঢুকতেই দরজার কাছে অভ্রর সঙ্গে দেখা। সে বেরুচ্ছে। ঘরের দিকে মুখ ঘুরিয়ে জোরে বলল, মিতি, হি হ্যাজ অল দ্যা রিজ।

আমার কাঁধে হাত রেখে অভ্র বলল, তোমার জন্য মিতির এত সিম্পিং, ভাবাই যায় না।

আদিকে চিনেছি। আর কাউকে চিনি না। হাই-হ্যালো টাইপ সাধারণ কথা হলো। কেমন যেন অস্বস্তিকর পরিবেশ। আমার ভালো লাগছিল না। তারা আমাকে কেন জানি স্বাভাবিকভাবে নিতে পারেনি।

মিতি একটা গিটার নিয়ে এসে আমাকে দিলো। বলল, এটা তোমার জন্য আমরা রাখছি।

পুরাতন গিটার। আমি যেটা ব্যবহার করতাম সেরকম। এরা হয়তো এখন নতুন কিনেছে, তাই এটা ফেলে না দিয়ে আমাকে দিচ্ছে। আমার মেজাজ খারাপ হচ্ছে। মিতিকে বুঝতে পারছি না। তাকে উইয়ার্ড লাগছে। তার আচরণ অদ্ভুত। সে আমার জন্য গিটারের ব্যবস্থা করেছে। কিন্তু একবারও আমাকে বুঝতে চায়নি। এই গিটার আমি নেব কিনা তাও ভেবে দেখেনি। কথাবার্তায় দখলদারিত্বের জোর আছে। যেন অতি আপন কেউ। বিভ্রান্ত হয়ে গেছি। না পারছি তাকে পুরোপুরি ইগনোর করতে, আবার না পারছি গ্রহণ করতে।

এমনভাবে মিতি বলল, এটা তোমার। আমি দিচ্ছি। নাও।

সেই গিটার নিতে অস্বীকৃতি জানাতে পারলাম না। গাঢ় গলায় মিতি বলল, পুরাতন গিটার। আমি বাজাইছি। এখন তুমি বাজাবে। আমি আরেকটা ম্যানেজ করে ফেলব। তোমার গান আমার পছন্দ হইছে। বেশি পছন্দ। তোমাকে আমার সবচেয়ে প্রিয় কিছু গিফট করলাম।

না করতে পারলাম না। মিতির কাছ থেকে তার গিটার নিলাম।

গিটার নিয়ে আসার পঞ্চম দিনে সরকারবিরোধী গান গাওয়ার অপরাধে পুলিশ আমাকে ধরে নিয়ে গেল। অথচ তখন গান গাইছিলাম না। ক্যাম্পাসের বাইরে চায়ের দোকানে বসে চা খাচ্ছিলাম। তিনজন ছেলে ঢুকল চায়ের দোকানে। তাদের দুজনের হাত পেছনে আর একজনের হাত পকেটে। ভার্সিটিতে এসে এসবের অর্থ শিখেছি। কোমরের পেছন দিকে গোঁজা থাকে। চাহিবামাত্র কোমরে গুঁজে রাখা অস্ত্র টান দিয়ে বের করে ফায়ার করতে পারে। পকেটেও রাখে।

অস্ত্র দেখানোর মতো কিছু করিনি। তবু তাদের দেখে অস্বস্তি লাগছে। তারা ক্যাম্পাসের চেনা মুখ। ছাত্রলীগের সভাপতির সঙ্গে ঘোরে। তাদের দেখে সবাই ভয় পায়। আমিও ভয় পাই। তারা ক্যান্টিনে খেয়ে বিল না দিলেও কেউ কিছু বলে না। তাদের নামে বাকি লিখতে লিখতে খাতার পাতা ভরে যায়। তবু কেউ ক্যান্টিনের বাকি রাখা টাকা শোধ করে না।

তাদের একজন কোমরের পেছনের দিকে হাত রেখেই বলল, শুনছি স্কাই ইজ নো লিমিট নাকি আবার মাঠে নামবো। তাদের তো ব্যান করা হইছে। স্কাই ইজ নো লিমিট ক্লাব ব্যান। শুধু ক্যাম্পাসে না, তারা বাংলাদেশে কোথাও কিছু করতে পারব না। নিষিদ্ধ ক্লাব। তোকে নিয়া তারা দেশবিরোধী গান করছে। কত্ত বড়ো সাহস! বুঝতেছি শিক্ষা হয় নাই। শুনতেছি তারা তোকে ফ্রন্ট লাইনে রাইখা মাঠে নামতেছে। গিটার দিছে তোকে। ঘটনা কি সত্য ?

কিছু বললাম না। চায়ের দাম মিটিয়ে দিয়ে ক্যান্টিন থেকে বেরুতে গেলাম। আমাকে ধাক্কা দিয়ে তাদের আরেকজন বলল, তোকে ভাই একটা কথা আস্ক করছে, উত্তর না দিয়া যাস কই ?

এবারও কিছু বললাম না। কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। অমনি দুজন আমাকে মারতে শুরু করল, শিবিরের বাচ্চা শিবির। পেশাব করে কুলুপ না নিয়ে, কুলুপ মুখে আটকাইছস। কুলুপ তোর পাছা দিয়া ঢুকাব।

নাটকের মতো সবকিছু যেন গোছানো ছিল। তখুনি পুলিশ চলে এল। পুলিশ আমাকে ধরে নিয়ে চলে গেল।

আমাকে পুলিশ ধরে থানায় নিয়ে এসেছে সকালে। মিতি এল দুপুরের পর। সে একা আসেনি। প্রোক্টর স্যারকে সঙ্গে নিয়ে এসেছে। প্রোক্টর স্যার ওসির সঙ্গে কথা বললেন। ওসি আমাকে মুচলেকা লিখতে বললেন, আমি কোনওদিন দেশবিরোধী কোনও গান গাইব না। যদি গাই তাহলে দেশের প্রচলিত আইনে আমার বিচার হবে।

থানা থেকে ছাড়া পেতে সময় লাগল। প্রোক্টর স্যার চলে গেলেন। মিতি থাকল।

ছাড়া পেয়েছি শেষ বিকেলে। মিতি রিকশা ডাকছিল। বললাম, অসুবিধা না হলে চলো হেঁটে যাই।

মিতি বলল, পুলিশ কি টর্চার করছে ? মারছে তোমাকে ?

বললাম, না। গালাগালিও করেনি। শুধু বেঞ্চে বসতে চেয়েছিলাম। তখন ফ্লোরে বসতে বলেছে।

রাস্তার পাশ ধরে আমরা দুজন হাঁটছি। কেউ কোনও কথা বলছি না। যেন আমাদের কোনও কথা নেই। কিংবা আমাদের বলার অনেক কথা আছে। সেসব উচ্চারণ করার প্রয়োজন নেই। নিঃশব্দতা অনেক কথা বলে যায়।

মিতি বলল, অ্যাই তিহান, তুমি কি জানো আমি কবিতা লিখি ? আমার লেখা কবিতার দু’টো বই আছে ?

এই ঘটনা আমার জানা নেই। একটু লজ্জা লাগছে। মনে হচ্ছে জানা উচিত ছিল। মিতি বুঝতে পেরেছে। বলল, এত অ্যামব্যারাসড হওয়ার কিছু নাই। কলেজে পড়ার সময় সবাই কবি হয়ে যায়। তুমিও হয়েছিলা। গান লিখতা। কলেজেই ছেলেমেয়েরা একবার হলেও প্রেমে পড়ে। প্রেম ভেঙে যায়। তখন কারও কাব্যপ্রতিভা হারায়ে যায়, কারও তুঙ্গে ওঠে।

আমার ক্লান্তি কেটে গেছে। ঝরঝরা বোধ হচ্ছে। হাসলাম। হেসে বললাম, তোমার প্রেম ভেঙে যাওয়ার পর তোমার কাব্যপ্রতিভার স্ফুরণ ঘটল!

মিতি হাসছে। হাসলে তাকে এমন অপূর্ব লাগে আগে খেয়াল করিনি। মিতির পরনে আজ হলুদের সঙ্গে হালকা সবুজের কম্বিনেশনের ড্রেস। খানিকটা সর্ষে ক্ষেতের মতো দেখাচ্ছে। ভোরবেলা হলুদ সর্ষে ক্ষেতে নরম সোনামাখা রোদ পড়লে যেমন দেখা যায় সেরকম। হাসিমুখে মিতি বলল, ভীষণ ডানপিটে ছিলাম। মারকুটে টাইপ। ছেলেরা খুব ভয় পাইত। আই লাভ ইউ বলার সাহসই ছিল না। কাব্যপ্রতিভা নিজে থেকেই লেগে আছে। কবিতা আমার প্রেম।

বলা ঠিক হলো কিনা জানি না। আচমকা বলে ফেলেছি, যারা আমাকে পুলিশে ধরিয়ে দিয়েছে তারা ক্যাম্পাসের ছাত্রলীগের ক্যাডার। তারা বলছিল তোমাদের ক্লাবকে কোনও প্রোগ্রাম করতে দেবে না।

যেন গভীর গলার নিতল থেকে মিতি বলল, আমি গান লিখব, তুমি গাইবে। দম বন্ধ হয়ে আসে। মুখ বুজে সব সহ্য করতেছি। সরকার যা ইচ্ছে তাই করতেছে। ছাত্রলীগ সরকারের সেই এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতেছে। আমরা সবাই কাফকার মেটামরফোসিসের গ্রেগর সামসার মতো হয়ে যাচ্ছি। মেনে নিতে নিতে মানুষ থেকে কীটপতঙ্গে রূপান্তরিত হয়ে গেছি। এভাবে বাঁচা যায় না।

আন্তরিকভাবে জানতে চাইলাম, এ সিদ্ধান্ত কি তোমার একার, নাকি তোমাদের ক্লাবের ?

মিতি বলল, তাদের সঙ্গে কথা বলব। মানলে মানবে। না মানলে আমি একাই।

আবার হাসলাম। হেসে খানিক সুরে বললাম, যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে। তুমি একা নও, মিতি। আমি আছি তোমার সঙ্গে।

এবার মিতি হাসল। হেসে বলল, আমরা দুজনে মিলে একলা।

আমিও অটোগ্রাফ মুভির সেই গানের কথা সুরে গেয়ে উঠলাম, আয় চলে আয়, আজ তোর সঙ্গে হই একঘরে।

আমাদের জীবনে চব্বিশের জুলাই-আগস্ট এসেছিল। ছাত্র-জনতার উত্তাল গণ আন্দোলনের দিন। ফ্যাসিবাদ হটানোর একদফার আন্দোলন। সেসব উত্তাল দিনে গিটার বাজিয়ে মিছিলে গান গাইতাম, নতুন সূর্য উঠবে দেখো, ফ্যাসিবাদের শেষ। হঠাও ফ্যাসিস্ট, বাঁচাও দেশ, আমাদের অধিকার…।

মিতি লিখেছে এই গান।

৩০ জুলাই মিতি এল লাল শাড়ি পরে। মাথায় লাল সবুজ পতাকা। সরকার শোক দিবস ঘোষণা করেছে। সরকারের মায়াকান্নাকে প্রত্যাখান করে কিশোর, তরুণ, জনতা সবাই লাল পোশাক পরে নেমে এসেছে রাস্তায়। মিতিকে দেখে চমকে গেছি। কেন জানি প্রথমেই মনে হলো আজ আমরা মৃত্যুকে বরণ করতে এসেছি। লাল অনেক দূর থেকে দেখা যায়। ভিড়ের ভেতর কানের কাছে মুখ নিয়ে মিতিকে বললাম, আজ পুলিশ আমাদের অ্যারেস্ট করবে। না-হয় গুলি করবে।

মিতি বলল, তোমার মরতে ভয় লাগছে ?

বললাম, না তো!

মিতি বলল, আজ তবে আমরা একসঙ্গে মারা যাব।

আমরা মিছিলে হাঁটলাম। পায়ে পায়ে, গানে গানে। তখুনি দেখলাম মিনিট্রাকে চড়ে স্কাই ইজ নো লিমিট ক্লাবের ছেলেমেয়েরা আসছে। আদি অভ্রও আছে। তারা গান গাইছে। স্কাই ইজ নো লিমিট ক্লাবের কালচারাল উইং খুব স্ট্রং। তারা সবাই দুর্দান্ত ভালো গান গায়। তারাও গাইছে মিতির লেখা গান, হঠাও ফ্যাসিস্ট, বাঁচাও দেশ, আমাদের অধিকার…।

সেদিন পুলিশ গুলি করে পুরো শহর তছনছ করে দিলো। পুলিশের গুলি থেকে শিশু-কিশোরও রেহাই পায়নি। পুলিশ তাদেরও গুলি করে মেরে ফেলেছে।

৫ আগস্ট ২০২৪। ২১ শ্রাবণ ১৪৩১। সোমবার। সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা দলের নেতা-কর্মীদের রেখে দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেল। আওয়ামী লীগ আর ছাত্রলীগের সকলে গা ঢাকা দিয়েছে। ফ্যাসিস্টমুক্ত দেশে স্কাই ইজ নো লিমিট ক্লাবের কালচারাল উইংয়ের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে গান গেয়ে পুরো শহর ঘুরলাম। মিতির লেখা নতুন গান, বিজয়ের এ গান মোদের, শান্তির পাখি উড়বে চিরকাল।

মিতি এসে আমার গা ঘেঁষে দাঁড়াল। গিটার থেকে এক হাত নামিয়ে মিতির দিকে হাত বাড়িয়ে দিলাম। মিতি আলতোভাবে আমার হাত ধরেছে। তবে ধরে রাখল শক্ত করে। আমরা আকাশের দিকে তাকালাম। শ্রাবণ মাসের আকাশ। কালো মেঘে ঢেকে থাকার কথা। আকাশ হয়ে আছে ঝকঝকে নীল। সাদা মেঘ ভেসে যাচ্ছে। আমাদের মাথার ওপর দিয়ে একঝাঁক টিয়া পাখি ট্যাট ট্যাট ট্যাট ট্যা আওয়াজ করে উড়ে গেল। মনে হচ্ছে অনেক দিন তারা যেন আটকা ছিল। আজ মুক্ত হয়ে আনন্দে ডাকতে ডাকতে ডানা নাড়িয়ে উড়ে যাচ্ছে নিজের ইচ্ছেমতো। 

সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ 

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button