আর্কাইভগল্প

গল্প : ময়নার শাড়ি : আফরোজা পারভীন

বাচ্চা দুটো ক্ষুধায় কাঁদছে। ধমক দিয়ে, মেরে, বুঝিয়ে তাদের শান্ত করতে পারছে না ময়না। পারবে কী করে, ক্ষুধার জ্বালা বড় জ্বালা! ময়নার নিজের পেটও চোঁ চোঁ করছে। আগের দিন এক মুঠো চাল এক হাঁড়ি পানি দিয়ে জ্বাল দিয়েছিল ময়না। তাই প্লেটে ঢেলে খেয়েছিল তিনজন। তাতে তপ্ত পেট আরও জ্বলে উঠেছিল। মেয়ে গয়না কাঁদতে কাঁদতে বলেছিল : কী দিলা মা ফ্যানের লাহান। পেটের জ্বালা যে আরও বাড়ল।

ময়না সতেজে জবাব দিয়েছিল : যা পাইছস তাই শুকুর কর। খাতি পারলি শুতি চায়।

ওই খেয়েই কেটেছে কাল দিন-রাত। এখন পরদিন দু পহর। ক্ষুধায় কাতরাচ্ছে তিনজন। ময়নার দিশেহারা লাগে। কোথায় পাবে সে চাল! একটা কাজের বাড়িতে মাইনে পাওনা। যেতে পারলে আনতে পারত। বিবিসাহেব লোক খারাপ না। মাসের পয়লা তারিখেই বেতন দিয়ে দেন। তিনি ভরা পোয়াতি। এক তারিখে কাজ করতে যেয়ে দেখে বাসায় তালা। কোথায় গেলেন বিবিসাহেব। বাচ্চা জন্ম দিতে হাসপাতালে ভর্তি হলেন নাকি! দুই তিন দিন গেছে। নেই তো নেই। মোবাইল একটা আছে ময়নার। টাকা কখনই থাকে না। কেউ ফোন করলে ধরে। বিবি সাহেব একটা ফোনও করলেন না। বাইরে প্রচণ্ড গোলমাল। ছেলেরা কোটা আন্দোলনে নেমেছে। কোটা আন্দোলন কি জানে না ময়না। তবে শুনেছে এ আন্দোলন ন্যায্য। ওরা চায়, সবাই সমান হোক। ধনী আর গরিবের ব্যবধান থাকবে না। ওরা যখন হাত তুলে সেøাগান দেয়, ‘আমাদের দাবি মানতে হবে, মানতে হবে’, খুব ভালো লাগে ময়নার। ওরও ইচ্ছে করে দু হাত দুলিয়ে বলে, ‘আমাদের দাবি মানতি হবে। ভাত দিতি হবে, কাপড় দিতি হবে, ঘর দিতি হবে’। দু-একদিন সে মিছিলের পেছন পেছন হেঁটেছেও। মিছিল দেখলে কেমন যেন নেশা নেশা লাগে!

ছেলেটা পেছন থেকে ওকে জড়িয়ে ধরে। ময়না টেনে কাছে নেয়। ওর পেটটা নেতিয়ে সমান হয়ে গেছে। বড় কষ্ট হয় ময়নার! ছেলেটাকে ১০ দিনের রেখে সেই যে স্বামী চলে গেল তো আজও গেল কালও গেল। ওর কথা ভাবে না ময়না। স্ত্রী সন্তানের প্রতি যার দায়িত্ব নেই সে আবার কিসের সোয়ামি! খুব শখ করে মেয়ের নাম রেখেছিল গয়না। এ যেন দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানো। যাদের জীবনে গয়না জোটে না তারা এই জাতীয় নাম রেখে আনন্দ পায়!   

ময়না ওঠে। কাজের বাড়িতে যাবে। তিনটে বাড়িতে কাজ করে ময়না। বাড়িগুলো যেন কেমন। ওকে দিয়ে মাছ কাটায়, মাংস রান্না করায়, ডিম ভুনায় কিন্তু ভুলেও ওকে দেয় না। ভাবখানা এমন, তোমাকে খাবার দেওয়ার কথা নেই, দেব কেন। ময়না ভাবে, কথা নেই ঠিক আছে। কিন্তু এক দুই দিনও কি হাতে ধরে কিছু দিতে মন চায় না। ময়নাও কখনও ওদের কাছে কিছু চায় না। ওর কেমন যেন ঘৃণা ধরে গেছে এই মানুষগুলোর প্রতি। এদের ঘরে ফ্রিজ টিভি এসি সব আছে, বাড়ি আছে গাড়ি আছে অনেক টাকা আছে। এদের এত আছে বলেই ময়নাদের কিছু নেই।

ময়না হাঁটে। সে গলি দিয়ে যাচ্ছে। বড় রাস্তায় মিছিল চলছে। এখন মিছিলে মিছিলে দেশ সয়লাব। বেশ কয়েকটা বাচ্চা মারা গেছে। তাদের ছবি দেখে বুক ভেঙে গেছে ময়নার। আহা রে কোন মায়েদের যে বুক খালি হলো! ময়না শুনেছে, যে কোনও ধর্মযুদ্ধে অনেক জীবন ক্ষয় হয়। এও তো একরকম ধর্মযুদ্ধ। ময়না মনে মনে আন্দোলনকারীদের দোয়া করে, ‘হে আল্লাহ ওদের সহিসালামতে রাখো। ওরা যেন দাবি আদায় করতি পারে।  যেন সফল হয়’।

 দ্রুত হাতে দুটো বাড়ির কাজ সারে ময়না। বাড়িগুলোতেও যেন পাষাণের নিস্তব্ধতা। আগের মতো ফরমাশ করে না, বকাঝকাও দেয় না। কাজ সেরে রাস্তায় বেরিয়ে আসে ময়না। এবার সে তিন নম্বর বাসায় যাবে। আল্লাহকে ডাকতে থাকে। বিবিসাহেবা যেন বাসায় থাকেন। টাকাটা যেন পায়। টাকা পেলে সে বাজার করবে। ছেলে মেয়ে পেট ভরে খাবে। ওদের মুখে হাসি ফুটবে।

ময়নার পা টলে। না খাওয়া শরীরে কত আর সয়! আজ বাসায় তালা নেই। আশায় দুলে ওঠে ময়নার বুক। ও বাসার বেল টেপে। সাহেব এসে দরজা খুলে একপাশে সরে দাঁড়ান। ময়না গেটে দাঁড়িয়ে বলে, বিবিসাহেবা আছেন ? কেমন আছেন ? ছেলে হইছে না মাইয়ে ?

সাহেব জবাব না দিয়ে বলে : ভেতরে যাও।

ভেতরে ঢুকে বিবি সাহেবাকে দেখে না ময়না। ওর বুক কেঁপে ওঠে। দ্রুত রান্নাঘরে ঢোকে। একটু পরে সাহেব এসে রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়ান।

ঘরে আসো।

কী কাম কন ?

ঘরে আসো বলছি।

ময়না কম্পিত পায়ে ঘরে ঢোকে।

বিবিসাহেবা আসেন নাই ?

না। তাতে কী। আমি তো এসেছি।

ময়নার পা থেকে মাথা পর্যন্ত বার বার দেখেন সাহেব। সে দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে কেঁপে ওঠে ময়না। শাড়ির ছেঁড়া আঁচল ভেদ করে উনি যেন বুক পর্যন্ত দেখতে পান। হাসি ফুটে ওঠে সাহেবের ঠোঁটে। উঠে এসে ময়নাকে জড়িয়ে ধরেন তিনি।

করছেন কী, করছেন কী সাহেব। আমি কামের বিটি। আমি যাই।

কে কামের বিটি আর কে বিবিসাহেব তা কি শরীরে লেখা থাকে ? তোমার শরীরটা বেশ ডাসা।

আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে সাহেব।

আপ্রাণ চেষ্টায় নিজেকে ছাড়ায় ময়না। কাঁপতে কাঁপতে বলে, সাহেব, আমার দুইডা ছাওয়াল মাইয়ে আছে। পাপ হবে। আপনার ঘরে সন্তান আসতিছে।

তাতে কী, আমাকে নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না। তোমার শরীর কুমারীর মতো।

সাহেব আমি অমন না। আমার বেতন পাওনা আছে ছয় হাজার টাকা। ঘরে চাউল নেই। টাকাটা দেন। চইলা যাই।

আহা ঘরে চাউল নেই। চাল ডাল মাছ মাংস সব হবে। মাইনেও হবে। বরং বেশি হবে। কিন্তু তার আগে আমাকে খাওয়া।

আবারও ময়নাকে জাপটে ধরে সাহেব। ময়না আপ্রাণ চেষ্টায় নিজেকে ছাড়ায়।

পাওনা টাকাটা দেন সাহেব। আমি চইলে যাই। এ বাড়িতে আমি কাম করুন না।

সাহেব রাগী চোখে তাকিয়ে বলেন, তুই স্বাভাবিক ব্যাপারটাকে অস্বাভাবিক করে তুলছিস। ঠিক আছে চলে যা। তোর পাওনা টাকা বেগম সাহেবার কাছ থেকে নিস। 

ময়না ক্ষণিক ভাবে। সাহেবের কথায় রাজি না হলে বেতনের টাকাটা পাবে না। ছেলে মেয়ের মুখে ভাত জুটবে না। এমন না যে ময়না স্বামী ছাড়া আর কারও সঙ্গে শোয়নি। এমন পরিস্থিতিতে সে আগেও পড়েছে। সন্তানদের বাঁচাতে গরিব মাকে অনেক কিছু করতে হয়। ময়না আর বাধা দেয় না। একসময় তৃপ্ত সাহেব বিছানা থেকে উঠে বাথরুমে যায়। তারপর পকেটে হাত দেয়, এই নে ছয় হাজার। আর এই পাঁচশ বখশিস। যে কদিন বেগম সাহেবা থাকবে না রোজ আসবি। বখশিস পাবি। আন্দোলনের কারণে অফিস ছুটি দিয়েছে। আমি বাসাতেই থাকি। আর হ্যাঁ বিবিসাহেবকে এসব কথা বলবি না কিন্তু।

ময়না মনে মনে বলে, বিবি সাহেবারে না কইলে তো ভালোই। বেতনের টাকাটা আবার নিতি পারব।

রান্নাঘরে সামান্য কাজ সেরে দরজার পাশে আসে ময়না। বেরিয়ে যাবে। হঠাৎ ওর চোখ পড়ে গুছিয়ে রাখা একখানা শাড়ির দিকে। শাড়িখানা দারুণ সুন্দর! অনেক দিন ধরে ওখানে পড়ে আছে। ময়নার খুব ইচ্ছে হয়েছিল বিবিসাহেবার কাছে শাড়িখানা চাওয়ার। একদিন সাহস করে চেয়েছিল, বিবি সাহেবা আপনি তো ওই শাড়িখানা পরেন না। আমারে দেবেন। খুব সোন্দর!

সেদিন বিবি সাহেবের ছোট বোন বাসায় বেড়াতে এসেছিলেন। বিবিসাহেবা কিছু বলার আগেই ফস করে বলেছিল, কাকের ময়ূর হবার সাধ জেগেছে আপু!

দুজন হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়েছিল। সে কথা মনে পড়ে ময়নার। কেমন যেন প্রতিশোধস্পৃহা জেগে ওঠে। মনে মনে বলে, ‘বিবিসাহেবা, সেই কাক তোমার বিছানায় স্বামীর বুকে ছিল একটু আগে। যে ময়ূর স্বামীকে বশে রাখতে পারে না সে কেমন ময়ূর!  অমন করে হাসতে নেই।’

কিরে ময়না দাঁড়ালি কেন ? কিছু চাই ?

হ ওই শাড়িখান। দেবেন ?

সাহেব একবার ভাবে, শাড়ি দিলে বউ জিজ্ঞাসা করলে কী বলবেন তাকে। আবার যদি না দেন ময়না আসবে না। গর্ভবতী বউ, অনেক দিন এসবের স্বাদ পায়নি সে। তাছাড়া ময়নার শরীরখানা অন্যরকম। কেমন যেন বুনো বুনো। যাক পরেরটা পরে দেখা যাবে।

শাড়ি নিবি ? তা নে না। কিন্তু বিবিসাহেবাকে বলবি না। 

শাড়ি নিয়ে বেরিয়ে আসে ময়না। সন্তর্পণে রাস্তায় হাঁটে। ময়না মনে মনে ভাবে, পরিবেশ পরিস্থিতি আর অভাবের কারণে সে কতটা নির্লজ্জ, কতটা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে! আগের ময়না কখনই সাহেবের কাছ থেকে শাড়ি চেয়ে নিত না।

চারদিকে মিছিল সেøাগান গোলাগুলি পুলিশ। সাধারণ মানুষ বাইরে নেই বললেই চলে। ও দ্রুত এ গলি ও গলি দিয়ে বাড়ির কাছে আসে। দোকান খোলা পাবে তো সে। দোকানের ঝাঁপ ফেলা, পাশের ছোট্ট জানালা দিয়ে কেনাবেচা চলছে। ময়না চাল ডাল আলু ডিম মরিচ পিঁয়াজ নেয়। দোকানি একবার অবাক হয়ে তাকায়। এত জিনিস কিনছে ময়না। সেদিন ওরা পেট পুরে খায়। ছেলে মেয়ে আনন্দে মাকে জড়িয়ে ধরে। এরপর ভাতঘুম দেয়। মেয়েটা শাড়িখানা গায়ের ওপর মেলে রাখে। ছেলেটা ময়নার নেতানো মাইয়ে একটা হাত দিয়ে ধরে রাখে। ময়নার কেমন যেন অপরাধী অপরাধী মনে হয়। এই দুধ একটু আগে একজন কামুক পুরুষ টাকার বিনিময়ে চুষেছে। একবার ভাবে ছেলেটার হাত সরিয়ে দেয়। দেয় না। গরিবের অত নীতিবোধ থাকলে চলে না। সম্ভ্রম বাঁচালে সন্তানের পেট খালি থাকে। বাড়িওয়ালা এসে বাড়ি ভাড়া তিন হাজার টাকা নেবার পর দ্রুত ফুরিয়ে যায় টাকা। আবার অভাব, আবার নেই নেই।

২.

ময়না রাস্তায় নামে। সাহেবের কাছে যাবে। গেলে নিশ্চয়ই কিছু টাকা দেবেন। রাস্তায় নেমেই মিছিলের মধ্যে পড়ে। মিছিলের পেছন পেছন হাঁটতে থাকে। ছেলেদের সঙ্গে গলা মিলিয়ে সেøাগান দেয়, ‘আমাদের দাবি মানতি হবে, মানতি হবে’। বাসার দরজায় এসে দেখে তালা ঝুলছে। এবার উপায়! শেষ ভরসাও নষ্ট হয়ে গেল। ও মাথা নিচু করে বাড়ি ফিরে আসে। ছেলে মেয়ে বুঝতে পারে মা চাল-ডালের ব্যবস্থা করতে পারেনি। করুণ চোখে ওর খালি হাতের দিকে তাকায়। ময়না মেয়ের কাছ থেকে শাড়িটা চেয়ে নেয়।

শাড়ি নিলে ক্যা ?

ব্যাচব।

না।

কোনও কথা বলে না ময়না। রাস্তায় বেরিয়ে আসে। হাঁটতে থাকে বাজারের দিকে। ওখানে অনেক বড় বড় কাপড়ের দোকান। যদি কেউ শাড়িটা কেনে। ময়নার বহুদিনের ইচ্ছে ছিল শাড়িটা পরার। শাড়ি হাতেও এল। কিন্তু পরা হলো না। ভাবতে ভাতে সে মিছিলের মধ্যে পড়ে। মিছিলের সঙ্গেই চলতে থাকে ময়না। আচমকা লাঠিচার্জ হয় মিছিলে, তারপর গুলি। দৌড় দৌড়। সবাই ছুটতে থাকে। ময়নার হাত থেকে ছিটকে যায় শাড়ি। সে শাড়ির ওপর পড়তে থাকে পা। একসময় পায়ে পায়ে শাড়িটা খুলে যায়। লম্বা হতে থাকে। ময়না শাড়িটা ধরার জন্য নিচু হয়। ধরতে পারে না। মানুষের ধাক্কায় পড়ে যায় শাড়ির উপর। ওর গায়ের ওপর দিয়ে ছুটতে থাকে অসংখ্য মানুষ। একসময় শাড়িটা জাপটে ধরে ময়না। আর কিছু মনে নেই।

সেই শাড়িতে ময়নাকে জড়িয়ে মিছিল করছে ছেলেরা, ‘মা হত্যার বিচার চাই, বোন হত্যার বিচার চাই, বাঁচার মতো বাঁচতে চাই’। ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে গলা মেলায় দু ভাইবোন। মা হত্যার বিচার চাই, বিচার চাই। গয়নার কেমন যেন শাড়িটা চেনা চেনা লাগে। কিন্তু ভালো করে দেখার আগেই সরে যায় মিছিল। গয়না ভাইকে জড়িয়ে ধরে বলে, মা কই ভাই, মা ?

চেনা শাড়িটা বার বার ওর চোখে ভাসতে থাকে।  

সচিত্রকরণ :  রজত

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button