আর্কাইভগল্প

গল্প : দাঁত : মঈন শেখ

এক রুমের ছোট্ট বাসা। লুৎফর প্রামানিক ও পারুল বেগমের চার সদস্যের পরিবার। ছেলে রিফাত আশুলিয়ায় থাকে। মাদ্রাসায়। আলিম দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র রিফাত। সেদিক দিয়ে ছোট মেয়েকে নিয়ে এখন তিন সদস্য। তবে বৈষম্যবিরোধী গণআন্দোলনে মাদ্রাসা বন্ধ হওয়াতে আবার চার সদস্যের পরিবার। লুৎফর পোশাক কারখানায় রাজমিস্ত্রির কাজ করেন। পারুল বেসরকারি হাসপাতালে পরিচ্ছন্নকর্মী। আর্থিক অনটন নেই। বেশ হাসিখুশি সংসার। তবে অস্থিরতা যোগ হয়েছে এখন। ছাত্র-জনতা এখন এক কাতারে। সব দফা ঠেকেছে এক দফাতে। দফা, প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ। শাসকগোষ্ঠীও উঠেপড়ে লেগেছে। যাকে বলে শেষ কামড়। দেশ মৃত্যুপুরীতে পরিণত হচ্ছে ক্রমশ। মুহুর্মুহু গুলি, টিয়ার শেল, সাউন্ড গ্রেনেডে কাঁপছে রাজধানী।

টিভি খুলে চারজনে এগুলোই দেখছিলেন। তবে পারুল বেগমের অতটা আগ্রহ নেই বাকি তিনজনের মতো।  হাসপাতালে চাকরি করার জন্য লাশ, রক্ত দেখতে দেখতে ভেতরটা কেমন ভোঁতা হয়ে গেছে। আন্দোলন চরমে ওঠার পর থেকে তার কেন জানি মনে হচ্ছে, তিান রক্ত মোছার চাকরি নিয়েছেন। তাজা রক্ত, শুকিয়ে ওঠা রক্তা এই কদিনে মুছতে মুছতে ভেতরটা কেমন হয়ে গেছে তার। গুলি খাওয়া ছাত্র-জনতা দেখতে দেখতে এখন আর টিভি দেখতে ভালো লাগে না। টিভিতেও ওগুলোই দেখায়।

পারুল বেগম বাহিরেই ছিলেন। এমন সময় ঘরের ভিতর সমস্বরে চিল্লিয়ে ওঠার শব্দে চমকে ওঠেন। যেন বাংলাদেশ আর ভারতের মধ্যে বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলা চলছিল। ভারতের লাগবে দুই রান, বাংলাদেশের লাগবে এক উইকেট। সেই উইকেটটাই এখন পড়ল যেন। পারুল দৌড় দেন ঘরে। গিয়ে দেখেন দর্শক তিনজন টিভি না দেখে লাফাচ্ছে। দরজার কাছে যেতেই রিফাত মাকে জড়িয়ে ধরে―মা আমরা জিতে গেছি। মা থতমত খায়। ঢুকতে পারেন না ছেলের কথাতে। কোন খেলা তো হচ্ছে না। তবে জিতে যাওয়া বলছে কেন ? লুৎফর এবার পারুলের কাছে এসে চিল্লিয়ে বলেন―পারুল, প্রধানমন্ত্রী পালিয়েছে। পারুল এবার বাস্তবে আসেন। চোখের সামনে ভেসে উঠে জুলাই-আগস্ট। আর তা দেখতে দেখতেই টিভির দিকে তাকান। দেখতে পান, টিভির পর্দায় লাল বর্ণের লেখাগুলো বারবার ভাসছে। ভাসছে―প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। হাজার হাজার ছাত্র-জনতা বিজয় মিছিলে নানা সেøাগানে গলা ফাটায়। এর মাঝেই লুৎফর টিভির চ্যানেল বদলান। ঘুরে ঘুরে দেখতে চান, কোন টিভি কী বলছে। আরেক টিভিতে লেখা উঠছে―সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। মাথায় চক্কর দিয়ে উঠে লুৎফরের। মানুষ কত তাড়াতাড়ি সাবেক হয়ে যায়। এর ফাঁকেই রিফাত দৌড় দেয় বাহিরে। মা চিল্লায়―এই কী হলো, কোথায় গেলি ?

আনন্দ মিছিলে। রিফাতের কথা এতটুকুই শোনা গেল। নিমিষেই হারিয়ে গেল রিফাত। তাকে না দেখা গেলেও পারুল গলা তুলে বলেন―সাবধানে থাকিস। মা টিভির দিকে তাকিয়ে থাকলেন কিছুক্ষণ। তার চারদিকে ঠান্ডা এক স্বস্তির বাতাস বয়ে গেল। এতে মাসজুড়ে নাকে লেগে থাকা রক্তের নোনা গন্ধটা সরতে শুরু করেছে। কাল থেকে গুলিখাওয়া ছাত্র-জনতাকে দেখতে হবে না। মুছতে হবে না তাজা রক্ত।

বিকাল রাত হলেও রিফাত ফিরে এল না। রাত বাড়তে থাকে। অন্ধকার গাঢ় হয়। মায়ের মনে তা আরও গাঢ়। পারুল অস্থির হয়ে লুৎফরকে বলেন―চলো, একটু আশপাশে দেখি, ধারে কাছেই আছে বোধহয়।

ধারেকাছে থাকলে চলে আসত। নিশ্চয়ই দূরে আছে।

থাকুক, চলো যাই।

কী সব পাগলের মতো বলছ। কোথায় খুঁজব ?

চলোই না আশপাশে দেখি।

আচ্ছা তোমাকে যেতে হবে না। আমিই দেখে আসি। মোবাইলটা দাও।

কোথায় যাবে ? পারুলের উল্টোপাল্টা প্রশ্ন শুনে কিছুটা রেগে যান লুৎফর। কিছুক্ষণ থেমে বলেন―ধারে কাছের হাসপাতালে একটু দেখে আসি।

কী বলছ এসব ? হাসপাতালে কেন ? আমার ছেলে হাসপাতালে থাকবে কেন ? তুমি কি কিছু জানো ? অস্থির হয়ে উঠেন পারুল। এবার লুৎফর আর রাগলেন না। তার কী মনে হলো তিনিই জানেন। পারুলকে কাছে ডেকে বললেন―চলো, তুমিও চলো। পারুল মেয়েকেও সঙ্গে নেন। তবে দুধাপ দিয়ে পারুল আবার থামেন। স্বামীকে বলেন―চলো, রাসেলকে সঙ্গে নিই।

আবার রাসেল কেন ? কেন মানুষকে বিরক্ত করব ?

রাসেল বিরক্ত হবে না। রিফাতের কথা শুনলে সে ছুটে আসবে। এটা ঠিক, রাসেল রিফাতকে ভাইয়ের মতো ভালোবাসে। একসঙ্গে তারা ক্রিকেট খেলে। খেলতে খেলতেই তাদের পরিচয়। অথচ রিফাতের সঙ্গে তার কত দিনের পরিচয় যেন। একদিন দেখা না হলেই সে ছুটে আসে খোঁজ নিতে। রিফাতের জন্য কিছু করতে পারলেই রাসেলের মনে শান্তি আসে। পারুলের কথা ফেলতে পারেন না লুৎফর।

রাজপথ বেশ সরগরম। সবাই যেন ফুরফুরে। সবার আলোচনা এখন এক। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী। ঋণাত্মক বিশেষণে যে যার মতো করে প্রাক্তনকে ডাকছে তারা। লাইটপোস্টের আলোগুলো যেন আজ প্রাক্তন শাসকের মতো দেমাগি হয়ে উঠে। আলো ঢালতে কমতি রাখছে না। আলোর বন্যায় ভাসছে শহর। সকল অন্ধকার যেন ঘাপটি মেরে ঢুকে পড়ে পারুল আর লুৎফরের মনে। একটা অশনি ছায়া আঁকড়ে ধরে তাদেরকে।

কয়েকটা ক্লিনিক দেখে তারা এনাম হাসপাতালে আসে। রাসেল সবার আগে। সে লুৎফরকে বলে―আংকেল, আপনারা এখানে বসেন, আমি দেখে আসি। লুৎফর কিছু বলার আগেই পারুল বেগম বলেন―না বাবা, আমরাও যাব।

না আন্টি, সবাইকে তো যেতে দিবে না ওরা।

না বাবা, চলো দেখি। যেতে না দিলে যাব না। আগে চলো। রাসেলের হাত ধরে এবার লুৎফরই সামনে টানেন। তবে তাদের অবশ্য ওয়ার্ড পর্যন্ত যেতে হলো না। রিসিপশন থেকে কম্পিউটার দেখে দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি বললেন―তাদের হাসপাতালে রিফাত নামে কেউ নেই। তবে রাকিব নামে একজন ভর্তি আছেন। কথাটা শুনে তাদের সাময়িক স্বস্তি মিললেও ভেতরের অন্ধকার আরও গাঢ় হলো। আর সেই অন্ধকার হাতড়েই বাসায় ফিরে এলেন।

কোনও রকমে নির্ঘুম রাত পার হলো তাদের। নানা প্রশ্ন জাগে পারুল বেগমের মনে। প্রশ্নের উত্তরও বারবার জানতে চান স্বামীর কাছে। স্বামী উত্তর দেন। সান্ত্বনা দেন। প্রশ্ন জাগে লুৎফর প্রামানিকের মনেও। তার প্রশ্ন মনের মধ্যে প্রশ্ন হয়েই থাকে। তার উত্তর দেবার কেউ নেই। পারুল একের পর এক প্রশ্ন নিয়েই ব্যস্ত। ফজরের নামাজ পড়েই লুৎফর রাসেলের কাছে যান। রাসেল তখন অবশ্য লুৎফরের কাছ আসার জন্য বের হচ্ছিল। চোখ-মুখ বলে, রাসেলও সারারাত জেগে কাটিয়েছে।

এবার তারা প্রথমেই গেলেন আশুলিয়া থানায়। সেখানে একটা সমাধান পেতেই পারেন। আজ সকালে সবাই যেন সকালেই উঠেছে। স্বাধীন ঢাকার স্বাধীন বাতাসে তারা যেন বুক জুড়ায়। লুৎফর খেয়াল করেন, পথচারীর সবারই বুক খোলা। যেন নাক মুখ দিয়ে নয়, তারা বুক দিয়ে বাতাস নেয়। তারাও কি কিছু খুঁজতে বের হয়েছে না খুঁজতে বের হওয়া মানুষগুলোকে দেখতে বের হয়েছে, তা অনুমানে আসে না লুৎফর প্রামানিকের। নতুন ঢাকা দেখতে দেখতে তারা থানার কাছে পৌঁছে গেলেন। কিন্তু থানার মধ্যে তাদের ঢুকতে হলো না। গেটের কাছে যেতেই তাদের পা আটকে গেল। পুঁতে গেল পা। সবাই নাকে কাপড় দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেও তারা নাকে কাপড় দিলেন না। তারা ছুটে গেলেন ভ্যানের কাছে। ভ্যানের ওপর স্তূপ করে রাখা বেশ কিছু কয়লা হওয়া লাশ। হঠাৎ তাদের মনে হলো, এই দেশ তাদের বড় অচেনা। তারা ফিলিস্তিন অথবা আফ্রিকার জংলি আর বর্বরদের কোনও ভূখণ্ডে ভুল করে ঢুকে পড়েছে। একজন দাঁতাল লোক এসে লুৎফরকে বলল―আপনার কেউ কি হারিয়েছে ? এই লাশের মধ্যে দেখতে পারেন। লুৎফর লোকটির কথা শুনে ছুটে যান স্তূপের কাছে। রাসেল পেছন থেকে ডাক পাড়েন―আংকেল কী করছেন ? এখানে রিফাতের বডি থাকতে যাবে কেন ? লুৎফর কোনও ডাকই যেন শুনতে পান না। ছুটে যান স্তূপের কাছে। লাশ চিনবার উপায় নেই। সবই যেন এক জনের লাশ। জ্বলন্ত আগুনের মাঝে এক লাশই যেন হয়ে উঠেছিল লাশবীজ। অঙ্কুরিত হয়েছে লাশের পর লাশ। খুঁজতে থাকেন লুৎফর। কিনারা করতে পরেন না। এ যে লাশ নয়; লাশের খাঁচা। লাশের শরীরে মাংস বলতে কিছুই নেই। মাথায় চুল নেই। থাকা বলতে আছে দাঁত। তবে এক জায়গায় মিল আছে। সবগুলোই পাতলা জিরজিরে শরীরের খাঁচা। ঠিক রিফাতের মতো। কিন্তু ডুকরে কাঁদা বা একসঙ্গে সবগুলো জড়িয়ে ধরা, কোনও কিছুই করলেন না লুৎফর। তিনি তখন লৌহ মানব। কোনও স্বাভাবিক বাবা নন। কোনও বাবাই এতগুলো সন্তানের কয়লা হয়ে যাওয়া দেহ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারেন না। লুৎফরকে দেখে যে কেউ মনে করতে পারেন―তিনি জুলাই-আগস্টের শহিদ বাবাদের প্রতিনিধি। লুৎফর এবার প্রতিটি লাশের মাথায় হাত বুলাতে থাকেন। বিরত রাখতে চেষ্টা করে ব্যর্থ হয় রাসেল। লুৎফর যেন রিফাতকে খুঁজছেন না, সকল রিফাতের মাথায় হাত দিয়ে শেষবারের মতো আদর করছেন। হঠাৎ চিল্লিয়ে উঠেন লুৎফর, রিফাত রিফাত বলে। কেউ কেউ ভাবল, লোকটা বোধ হয় পাগল হয়ে গেলেন। রাসেল কাছে যেতেই বলেন―বাবা এই যে আমার রিফাত।

কী বলছেন আংকেল! রিফাত হতে যাবে কেন ?

হ্যাঁ বাবা এটাই আমার রিফাত। দেখছো না, তার সামনের দাঁত দুটো কেমন ভাঙা ? লুৎফর তার রিফাতকে আবার জড়িয়ে ধরেন। রাসেল এবার ভালো করে তাকায়। তারও মনে খটকা লাগে। ঠিকই তো, রিফাতের সামনের দাঁত দুটো কিছুটা ভাঙা ছিল। হাসলে দাঁত দুটো ঠিক এভাবেই বের হয়। তবে রাসেল সে কথা লুৎফরকে বলে না। সে তাকে আটকাতে চায়। পারে না। আস্তে আস্তে নিস্তেজ হতে থাকেন লুৎফর। বসে পড়েই বিলাপ করতে থাকেন।―বাবা রাসেল, দ্রুত রিফাতকে ওখান থেকে নামাও। তার কষ্ট হচ্ছে। তবে রাসেল কিছু বলার আগেই থানা কর্তৃপক্ষ লাশ নামাবার ব্যবস্থা করে। তাদের যেন খুব তাড়া। যত দ্রুত জায়গা খালি করা যায় ততই মঙ্গল।

চারদিন হলো রিফাতকে গ্রামে রেখে আসা। বগুড়ার ছোট্ট একটি গ্রাম পার রানীপাড়া। লুৎফর অবাক হন তার প্রতি গ্রামের মানুষের ভালোবাসা দেখে। সেই কবে গ্রাম থেকে ঢাকায় এসেছেন, অথচ সবাই তাকে মনে রেখেছে। গ্রামের মসজিদের মাইকে তার নাম বলেই ঘোষণা করা হয়েছিল, লুৎফরের ছেলে রিফাতের জানাজার সময়। ছুটে এসেছিল হাজারো মানুষ। মিলাদেও কম হয়নি। আরও দুদিন থাকতে চেয়েছিলেন রিফাতের সঙ্গে। থাকতে পারেননি। সবার কথা, তার নাকি এখন ঢাকা থাকা খুব জরুরি। রিফাতের প্রতিষ্ঠান থেকে, মেডিকেল থেকে রিফাত মারা যাবার নানা প্রমাণ সংগ্রহ করতে হবে। সরকারি নানা কাজে লাগবে সেগুলো। এলাকার লোকজন বলতে গেলে জোর করেই তাকে ঢাকাতে পাঠিয়েছে। তার অফিসও এ বিষয়ে সহযোগিতা করছে। ছুটি দিয়েছে কয়েক দিন। ছুটিতে আছেন পারুলও। দুজনেই জেগে আছেন। কদিন ধরেই ঘুম নেই। পারুলকে কোনওভাবেই থামানো যায় না। কখনও থামলেও যেন বিশ্রাম নেবার জন্যই থামছেন। দম নিয়ে আবার শুরু করেন নতুন করে। তাকে সামলাতে গিয়ে আরও কাহিল হয়ে পড়েছেন লুৎফর। গত দুদিন ধরে সংগ্রহ করা কাগজগুলো নিয়েই মাঝরাতে বসে আছেন তারা। রিফাতের মাদ্রাসার অধ্যক্ষের প্রত্যয়নপত্র বারবার নাড়ছেন লুৎফর। অধ্যক্ষ লিখেছেন―রিফাতের রুহের মাগফিরাত কামনা করি। অথচ কদিন বাদেই অন্যরকম একটা প্রত্যয়ন অধ্যক্ষের কাছে পেতে পারত রিফাত। পাশে পড়ে আছে ডেথ সার্টিফিকেট, জন্মনিবন্ধন কার্ড, তাদের জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি। সকালেই লাগবে এগুলো। রাসেল এগুলো নিয়ে কাকে যেন দিতে যাবে। বিভিন্ন সহায়তা পেতে কাজে লাগবে।

সবাই বলছে দেশ নাকি নতুন করে স্বাধীন হয়েছে। গণতন্ত্র মুক্তি পেয়েছে। প্রাণ খুলে কথা বলছে সবাই। শাসকগোষ্ঠী ও তাদের দোসররা ঘাপটি মেরেছে যে যার মতো। দেশের বাহিরে পালিয়েছে অনেকেই। নতুন স্বাধীনতার আলো মাখতে পারল না রিফাত। জবাব দিতে পারল না বাবা মায়ের শত বাধার। এমনই হাজার ভাবনার মাঝে রাত কাটে পারুল-লুৎফরের। কখন ভোর হয় বুঝতে পারেন না। আজও বুঝে ওঠার আগেই পাশের মসজিদ থেকে আযান ভেসে এল। আজান কানে আসতেই লুৎফর উঠলেন। পারুলকেও বলছেন―উঠ, নামাজ পড়ি। পারুল দেরি করেন না। আজান পড়তে যা দেরি। দ্রুত নামাজে বসেন। নামাজে অন্তত প্রাণ খুলে কাঁদা যায়। তখন কেউ বাধা দেয় না।

নামাজ শেষ হলেও বিছানাতেই বসে আছেন লুৎফর। দোয়া পড়ছেন। এমন সময় দরজার কাছে কার ডাক শুনতে পেলেন।―আংকেল আংকেল ? আকাশ কাঁপানো ডাক। কাঁসার থালা ঝন ঝনিয়ে পড়লে অনেককিছুই বুঝতে অসুবিধা হয়। লুৎফরেরও হলো। তিনি আরও ভালো করে কান পাতলেন। আবার ভেসে এল ডাকটা।―আংকেল আংকেল, দরজা খোলেন। এবারের ডাক আরও জোরে। লুৎফর এবার ডাকটা শুনলেন অন্যভাবে। তিনি শুনতে পেলেন―আব্বা আব্বা, দরজা  খোলেন। এই ডাক আবারও শোনতে পেলেন। ডাক যেন থামে না। তিনি ধড়মড়িয়ে উঠে দরজার দিকে গেলেন। পারুলও পিছনে। দরজা খুলেই আলো-আঁধারির মাঝেও চিনতে পারেন, সামনে রাসেল দাঁড়িয়ে। থরথর করে কাঁপছে। লুৎফর বুঝে পায় না, রাসেলের এই অবস্থা কেন ? এখন তো জুলুমবাজ শাসকের পেটোয়া পুলিশ নেই, হেলমেট বাহিনী নেই, তাহলে কে তাড়ানি দিল ?―রাসেল তোমার কী হয়েছে ? হাঁপাচ্ছো কেন ? বাড়িতে কিছু হয়েছে ?

না আংকেল কিছু হয়নি, আমাদের রিফাত বেঁচে আছে ? রাসেল আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। পড়ে যাওয়া আটকাতেই বোধ হয় লুৎফরকে জড়িয়ে ধরল।

কী বলছ এসব! তোমাকে এমন লাগছে কেন ? ভেতরে চলো, মাথায় পানি দাও। আরও কিছু একটা বলতে গিয়ে আটকে গেলেন লুৎফর। রাসেলকে সেটা বলা যায় না। রাসেলের পাগলামি দেখে ভয় পান। পারুলও ততক্ষণে পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। ছোট মেয়ে দূরে দাঁড়িয়ে চোখ ডলছে।

না আংকেল, আমার কিছুই হয়নি। আমাদের রিফাত বেঁচে আছে। সে এনাম হাসপাতালে আইসিইউতে আছে। কথাগুলো এক নিঃশ্বাসে বলেই পকেট থেকে মোবাইল বের করে রাসেল। এবার লুৎফর সব কিছু নিংড়ে নিজেকে আটকালেন যেন। কাঁপতে কাঁপতে বললেন―কী বলছ বাবা, আমার রিফাত বেঁচে আছে। কোথায় আমার রিফাত ? চিল্লিয়ে উঠেন পারুলও―রাসেল, আমাকে এক্ষুণি নিয়ে চল। রাসেলের আগেই বের হয়ে যান পারুল। যেন তিনি জানেন, তার রিফাত কোথায় আছে।

আন্টি, থামেন। অস্থির হবেন না। আংকেল একটা জামা গায়ে দেন। মোবাইলে রিফাতের ছবি দেখানোর জন্য বের করেছিল রাসেল, কিন্তু আর দেখানো হলো না। মোবাইলটা আবার পকেটে ঢুকাল।

এনাম হাসপাতাল ফেসবুকে একটি ছবি পোস্ট করে। তা শেয়ার করে ‘আমাদের সাভার’ নামের এক ফেসবুক গ্রুপ। তাতে লেখা―রাকিব নামের একজন এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিউরো আইসিইউতে চিকিৎসাধীন। তাঁর ‘গানশট ইনজুরি’। দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে পোস্টটি। আর এটা চোখে পড়ে রাসেলের। ছবি দেখেই চিনতে পারে রাসেল। এটা রাকিব নয়, রিফাত। সেই চোখ, সেই মুখ, সামনের আংশিক ভাঙা সেই দুটি দাঁত। মাঝরাতে দেখলেও ছটফট করে কয়েক ঘণ্টা কাটিয়ে ভোরে ছুটে আসে লুৎফরের কাছে।

মুহূর্ত দেরি না করে তারা সবাই মিলে ছুট দেন এনাম হাসপাতালে। ভোরে ঢাকার রাস্তা বেশ ঝরঝরে। বাতাসের মেজাজে ফুরফুরে ভাব। তবে কোনওদিকেই খেয়াল নেই তাদের। রাস্তা ফুরায় না। দুপাশের দালানগুলো অলস ঢঙে পিছনে সরে। তারা যেন সামনে আগাতে পারে না। যেন হাজার মাইল পথ পাড়ি দিতে হবে। তবেই এনাম হাসপাতাল।

হাসপাতালে ঢুকেই তারা ছুটে যান আইসিইউতে। কোনও বাধাই তারা মানেন না। রিফাত শুয়ে আছে আকাশমুখী হয়ে। ঘরে কে ঢুকল সেদিকে খেয়াল নেই। পারুল বেগমের ইচ্ছা হলো ঝাঁপিয়ে পড়তে। লুৎফর প্রামানিকের ইচ্ছা হলো বেডসহ রিফাতকে জড়িয়ে ধরতে। কিন্তু পেছন থেকে হাজারও বাধা। তবু কোনও বাধাই তার ধারেকাছে টিকবার নয়। কিন্তু রিফাতের মুখে তখনও অক্সিজেনের মাস্ক। মাথায় ব্যান্ডজ। মাথার মাঝ বরাবর গুলিটা লেগেছে। এখন জড়িয়ে ধরলে হয়তো ফিরে পাওয়া ছেলেকে আবার হারাতে হবে। আর হারাতে চায় না। পাশে রাখা দুটি চেয়ারে আলতো করে বসলেন পারুল ও লুৎফর। তারা শব্দ করে কাঁদলেন না পর্যন্ত। বার বার চোখ মুছছেন শুধু। এক সময় ডাক্তার এসে মাস্ক খুলে দিলেন। আর খুলে দিতেই তাকায় রিফাত। বাবা-মায়ের দিকে তাকাতেই এবার ডুকরে কেঁদে উঠলেন পারুল। লুৎফর ডাকলেন―রিফাত, রিফাত। রিফাত কথা বলে না। ফ্যালফ্যাল করে পলকহীন তাকিয়ে থাকল শুধু। মরা মাছের চোখের মতো। পলকহীন চোখটাও যেন ভিজে এল। বাবা-মা তাদের চেয়ারটা আর একটু এগিয়ে নিয়ে কাছে হবার চেষ্টা করলেন। এগিয়ে গেল রাসেলও। আস্তে আস্তে কয়েকবার ডাক দিলেন পারুল―রিফাত, রিফাত, আব্বা। এবার রিফার পলক ফেলল। তাকাল মায়ের দিকে। মগজের মধ্যে আটকে থাকা বুলেটের কষ্ট চেপে রেখে জোর করে হাসবার চেষ্টা করল রিফাত। কষ্টে মুখটা বেঁকে গেলেও হাসিটা বোঝা গেল। এই হাসিটার দাম সারা পৃথিবীর অধিক মনে হলো পারুলের কাছে। হাসিটা পরিষ্কার দেখবেন বলে বারবার চোখ মুছলেও আবার পানি আসে। ঝাপসা হয় দৃষ্টি। রাগ হয় চোখের ওপর। লুৎফর কিন্তু তাকিয়ে আছেন রিফাতের দাঁতের দিকে। মুখে হাসি ফুটে না উঠলেও দাঁতে তা স্পষ্ট করেছে। সামনের আংশিক ভাঙা দাঁতদুটোই বারবার দেখছেন লুৎফর। ভাঙা দাঁতদুটোতে বাংলাদেশ চিলমিল করে জ্বলে উঠে। দাঁতের দিকে তাকিয়ে লুৎফরের মনে হলো―কিঞ্চিৎ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও সামনে এগিয়ে যেতে সমস্যা হবে না।

সচিত্রকরণ : রজত

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button