
প্রচ্ছদ রচনা : গল্পসংখ্যা ২০২৪―গল্প
ছোট কাকা শাহজাদার হাত ধরে যে বাসে চড়ালো তার গায়ে নীল হরফে বড় বড় করে লেখা ‘আল্লাহর দান’। নন্দননগর বাজার থেকে এই একটা বাসই সকাল নটায় ঢাকার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। ‘আল্লাহর দান’ বাসে অগ্রিম টিকেট কাটার নিয়ম নেই। আগে এলে আগে পাবেন ভিত্তিতে সিট বরাদ্দ দেওয়া হয়। কাকা শাহজাদাকে নিয়ে টেনে হিঁচড়ে বাসে উঠলেও জুতমতো সিট পাওয়া গেল না। বাসের একদম শেষ প্রান্তে দু পাশে দুই সিট পাওয়া গেল। তার মধ্যে এক সিটে বিশাল বপু নিয়ে হাত-পা ছড়িয়ে এক আংকেল বসে আছেন। কাকা শাহজাদাকে আংকেলের পাশে বসিয়ে নিজে অপেক্ষাকৃত শুকনো এক লোকের পাশে গিয়ে বসল। কাকার ওপর এমনিতেই মেজাজ গরম। বাবা দুবাই থেকে ফোনে বলে দিয়েছেন, শাহজাদাকে যেন মাইক্রোবাসে করে ঢাকা নিয়ে যাওয়া হয়। আর কাকা সেই টাকা বাঁচিয়ে নিয়ে যাচ্ছে এই লক্করঝক্কর মার্কা মুড়ির টিনে। বাবার কাছে যে নালিশ দেবে সে উপায় নেই। কাকা আগেই শাসিয়ে রেখেছে, ‘বাপকে আবার বলতে যেও না যে, বাসে যাচ্ছি। জোয়ান মানুষ মাইক্রোতে এত টাকা খরচার কোনও মানে নেই। এই তো মাত্র আট ঘণ্টার জার্নি। বুঝস নাই ?’
শাহজাদার দুবাই প্রবাসী বাবা নিজে বেশি দূর পড়ালেখা করতে পারেননি বলে ছেলেকে নিয়ে ভয়ানক ভয়ানক সব স্বপ্ন দেখেন। ছেলে তার ঢাকা শহরের নামকরা কলেজ, ভার্সিটিতে পড়ালেখা করে দিগ্গজ হবে। বাবার মতো বিদেশে হাড় খাটুনি না খেটে গাট্টি গাট্টি ফাইলে খসখস করে সাইন করা বড় অফিসার হয়ে হুলিয়া হুকুমত জারি করবে। নইলে ‘শাহজাদা’ নামের সার্থকতা কোথায় ?
কদিন আগেই ম্যাট্রিকের রেজাল্ট বেরিয়েছে। যেখানে জিপিএ ফাইভের ভারে পুরো দেশ ভারাক্রান্ত সেখানে শাহজাদা কোনওমতে সাড়ে তিন পয়েন্ট হাসিল করল। এইট পাস বাবা তাতেই খুশিতে গদ্গদ হয়ে মাকে ফোন করে বললেন, ‘রাজিয়া, পুরো গাঁও মিঠাই বাটো, ইস্কুলের স্যারগোরেও কিন্তু খাওয়াইবা।’ মা বাটন ফোন কানে নিয়ে খালা চাচি ফুফা সক্কলকে ফোন করে জানিয়ে দিলেন ‘আমাগো শাহজাদা তো পাস দিছে।’ শাহজাদার পরিবারের একমাত্র বিএ পাস পুরুষ ছোটকাকা হুংকার ছেড়ে বলেছিল, ‘কিরে বেটা, সারা বছর না পইড়া ক্যারাম খেলছস ? ভর্তি হইতে তো কলেজ পাইবি না।’
বললে কী হবে ? বিদেশ থেকে বড় ভাইয়ের হুকুম, ভাতিজাকে যে করেই হোক ঢাকায় নামকরা কোনও কলেজে ভর্তি করতে হবে। টাকা যত খরচ হোক, ব্যাপার না। কিন্তু বংশের এমন জ্বলন্ত প্রদীপ ঢাকা শহরে পড়ালেখা করে বংশের আলো ছড়াবে না ? তো কাকা কীভাবে কীভাবে যেন ‘হাজি জব্বার আলি মেমোরিয়াল’ কলেজে ভর্তি করিয়ে দিল। ঢাকায় যাবার উত্তেজনায় শাহজাদা সারা রাত দু চোখ এক করতে পারেনি। আগে বেশ কয়েকবার বাবাকে বিদায় জানাতে ঢাকায় গিয়েছে, কিন্তু সে ছিল মাইক্রোবাসে করে এয়ারপোর্ট পর্যন্ত যাওয়া।
কাকা বাসের সিটে হেলান দিয়ে হা করে ঘুমাচ্ছে। পাশের মোটা আংকেল শাহজাদার গায়ে তার পুরো বপু চেপে নাসিকা গর্জন করছেন।
প্রায় যখন সন্ধ্যা হয় হয় তখন ‘আল্লাহর দান’ ঢাকায় এসে থামল। কাকা বলল, ‘এই জায়গা চিনস ? এই জায়গার নাম মহাখালী। ছুটিতে যখন বাড়ি যাবি এইখান থেইকাই বাসে চড়তে পারবি।’
মহাখালী থেকে আবার আরেক বাসে চড়ল তারা। এই বাসটা আগের বাসের চেয়েও ছোট। মানুষে ঠাসাঠাসি। গরম, ঘাম আর মানুষের মুখের গন্ধে শাহজাদার বুক ঠেলে বমি আসতে চাইছে। এর মধ্যেও সে জানালার বাইরে চোখ রাখে। তার স্বপ্নের শহর! চারপাশে ঝলমলে আলো, রাস্তা-ঘাট, বাজার, মানুষ আর ইটের পরে ইট!
বাস থেকে নেমে প্রথমে রিকশা, তারপর গলি থেকে তস্য গলির ভেতরে হেঁটে একটা ছাল চামড়া ওঠা বিল্ডিংয়ের সামনে যাত্রার সমাপ্তি ঘটল। বাড়িটির গেটের কপালে লেখা ‘মা ননী হাউজ।’ মায়ের সঙ্গে ননীর কী সম্পর্ক ? আবার মায়ের সঙ্গে হাউজ শব্দটাও ঠিক মানানসই লাগছে না।
‘শুন, এইটা হইলো তর মেস। মেস মানে নয়জন মিলে চার রুমের ফ্ল্যাটে ভাড়া থাকা আর কি। রিয়াদ ভাড়া নিছে, তোর জন্য একসিট রাখতে বলছি। মিলেমিশে থাকবি।’
‘এই বাড়ির নাম কি ‘মা ননী হাউজ ?’
‘হাহাহা। আরে পাগল, মা ননী না। মা জননী। বর্গীয় জ টা উঠে গেছে।’
সরু নোংরা সিঁড়ি দিয়ে কাকার পেছন পেছন শাহজাদা উঠতে থাকে। কাকা মেস সম্পর্কে নানা ধারণা দিয়ে যাচ্ছে, ‘বারো জায়গার বারো মানুষ বারো চরিত্র। তুমি তোমার মত থাকবা। কারও পার্সোনাল বিষয় নিয়া মাথা ঘামাবা না। সব মেসের কিছু নিয়ম থাকে, মেনে চলবা সমস্যা হবে না।’
কাকার কোনও কথায় হ্যাঁ না বলে না সে। চারতলার দরোজার সামনে ওরা থামে। কলিং বেল চাপে কাকা। খালি গায়ের হাফপ্যান্ট পরা একজন চাপ দাড়িওয়ালা লোক দরজা খুলে দিল। আধবুড়ো মানুষটার পোশাক দেখে শাহজাদা বহুকষ্টে হাসি চাপে। লোকটি কাকাকে উদ্দেশ্য করে বলে, ‘ওহ নোমান ? ভাতিজাকে নিয়া আসছ ?’
কাকার দেখাদেখি জুতা খুলে ঘরে এক পা রাখতেই মেঝের সঙ্গে কোনও আঠায় মনে হলো পা আটকে গেছে। পায়ের কাছে-দূরে গোটা কতক পানির খালি বোতল গড়াগড়ি খাচ্ছে। একপাশে হাতল ভাঙ্গা দুটো চেয়ার কাত হয়ে পড়ে আছে। অন্তত ডজন খানেক জুতা, চিপসের প্যাকেট, নানা কাগজের টুকরো এলোমেলো ছড়িয়ে আছে। ঘরের কোণে একটা ফ্রিজ কিন্তু এককালে তার নিজস্ব কী রঙ ছিল বোঝা যাচ্ছে না।
ঘরের লাগোয়া চারটা বন্ধ দরোজা। দরোজাগুলোর দিকে তাকিয়ে চমৎকৃত হয় শাহজাদা। একেক দরোজায় একেক নদীর নাম লেখা। করতোয়া, ভাগীরথী, কংস, শঙ্খচিল। বাকি তিন নদীর নাম শাহজাদা জানে কিন্তু শঙ্খচিল নামে কোনও নদী আছে নাকি ? এসব নামকরণের মাহাত্ম্যই বা কী ? দরোজার গায়ে নানা ধরনের স্টিকার লাগানো। শাহজাদা সেগুলো পড়ার চেষ্টা করে। ‘দয়া করে জুতা খুলে প্রবেশ করুন’, ‘কেবলমাত্র প্রয়োজনেই নক করুন’। ‘পরীক্ষার্থীর রুম, নীরবতা বজায় রাখুন।’ করতোয়ার দরজায় লেখা ‘অযথা খোঁচাখুঁচি করবেন না’। খোঁচাখুঁচি শব্দটা পড়ে শাহজাদা ফিক হেসে ফেলে। ভাগ্যিস কাকা খেয়াল করেনি।
হাফপ্যান্ট পরা লোকটি ‘শঙ্খচিল’ নামের ঘরের দরজায় টোকা দিলে জীর্ণ-শীর্ণ চেহারার শাহজাদার বয়সী এক ছেলে দরোজা খুলে দিল। খুপরি একটা রুম। দুই দেওয়ালের দুইপাশে দুটো চৌকি। মাথার দিকে দেড় ফুটি একটা করে টেবিল একটা কাঠের চেয়ার। দুই চৌকির মাঝখানে বড়জোড় দুই হাত খালি জায়গা। ছেলেটি দরোজা খুলে দিয়ে ধপাস করে শুয়ে পড়েছে। ওর দেওয়ালে লম্বা একটা দড়িতে ভেজা ট্রাউজার আর শুকনো প্যান্ট শার্ট ঝুলছে। ঘরের এক দেওয়ালে একটা জানালা তার অর্ধেকটা টেবিল দিয়ে বন্ধ। কোনও বারান্দা বা টয়লেট নেই। আর একজনের সঙ্গে রুম শেয়ার করতে হবে ভেবেই শাহজাদার মনটা ছোট হয়ে যায়। গ্রাম হলেও বাবা ইটের দালান বানিয়েছেন। বড় বড় চারটা ঘর। তার মধ্যে একটা শাহজাদার নিজস্ব। একদম একার। বাবা বাড়িতে মিস্ত্রি এনে বিশাল কারুকাজ করা খাট, পড়ার টেবিল বানিয়ে আরাম আয়েশের কোনও কমতি রাখেননি। কাকা আগেই বলেছিল, রুমে আরেকজন থাকবে। শাহজাদা এক রুমের জন্য গোঁ ধরেছিল। কিন্তু কাকা ধমকে উঠেছিল, ‘একেক রুমের ভাড়া কত সে আন্দাজ আছে ? এত খরচ করা লাগত না। সামনে আরও বহুত খরচা আছে।’
শাহজাদা তখন পর্যন্ত ভাড়া কত জানে না। কিন্তু সে আর কথা বাড়ায়নি। শুনেছিল ঢাকা শহরে টাকা-পয়সা খই-মুড়কির মতো খরচ হয়। মায়ের সঙ্গে কাকা গল্প করে। শাহজাদার বোকাসোকা স্বল্পশিক্ষিত মা মুখে হাত রেখে বিস্ময়ে হাঁ হয়ে যায়, ‘বাপরে! তাইলে আবুডারে ঢায়ায় নেওন কি কাম ছুডু বাই ? কুনু কিছু বুঝেসুঝে না ব্যক্কল পোলাডা আমার।’ বাবার অনেক ছোট হলেও কাকা শাহজাদার মায়ের থেকে বেশ বড়। মা তাকে সবসময় ছুডু বাই বলেই ডাকে।
সারা দিনে পেটে দানাপানি পড়েনি। পেটে প্রচণ্ড ক্ষুধা। মাঝের ঘরের লাগোয়া এজমালি বাথরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে আসতে আসতে দেখা গেল কাকা দুই প্লেটে খাবার নিয়ে বসে আছে। শাহজাদা অবাক হয়। জিজ্ঞেস করে, ‘কোথায় পেলে কাকা ?’
‘রিয়াদকে কিনে রাখতে বলেছিলাম। আজ এই খাও কাল থেকে ওদের সঙ্গে মিল দিবা।’ তার মানে হাফপ্যান্ট পরা লোকটির নাম রিয়াদ। শাহজাদা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে,
‘মিল কী ?’
‘হাহাহা। মিল মানে কি ধীরে ধীরে বুঝবা বাপধন। আরও অনেক কিছু বুঝবা। এইটা ঢাকা শহর। তোমার গ্রাম না যে মা রান্না কইরা সামনে প্লেট সাজাইয়া ধরব।’
তেলে ভাজা ভাতের মধ্যে মনে হলো অণুসম দুই তিন পিস ব্রয়লার মুরগি। সেটাই গোগ্রাসে গিলতে থাকে। খেতে খেতে কাকা জিজ্ঞেস করে,
‘তোর মা বিছানার চাদর-টাদর দিয়েছে তো ? বাইর কর। ওইটা পাইতা আজ থাকলে হবে। কাইল তোশক বালিশ কিনা যাবে।’
দুই ব্যাগে ভর্তি করে মা কী কী দিয়েছে শাহজাদা জানে না। খুলে ওসব দেখার মতো এনার্জি নেই। কাকাই চাদর আর আর কাঁথা বের করে চৌকিতে বিছায়। সারা দিনের ধকলে শরীরের বারোটা। কোনওমতে ধপ করে শুয়ে পড়ে সে। কাকা কখন শুয়েছিল জানা নেই।
‘আবু উঠ। আমি যাইতেছি।’
অনেক দূর থেকে কাকা যেন ডাকছে। ধড়ফড় করে উঠে বসে শাহজাদা। প্রথমে মনে হলো নিজের বাড়ির খাটে শুয়ে আছে। পরক্ষণে গতকালের সবকিছু মনে পড়ে যায়। সামনেই কাকা রেডি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। শাহজাদা কিছু না বুঝে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। কাকা আবার বলে, ‘তর কাকির অসুখ। আমি যাইতেছি আবু। তুই ভালোভাবে থাকিস। ফোন করিস আর কোনও সমস্যা হইলে রিয়াদকে বলিস। আজ ওদের কারও সঙ্গে গিয়ে যা যা লাগবে কিনে আনিস। পারবি না ? আর শুন পরশু থেকে তোমাদের ক্লাস শুরু হবে। মন দিয়া পড়ালেখা করবা।’
কাকা চলে যাচ্ছে। শাহজাদা চিৎকার করে বলতে চায়, ‘কাকা আমাকেও নিয়ে যাও।’ কিন্তু সে মুখে কোনও কথাই উচ্চারণ করে না। বরং কাকা বেরিয়ে যাবার সঙ্গে সঙ্গে আবার ঘুমিয়ে পড়ে।
প্রায় দশটার দিকে শাহজাদার ঘুম ভাঙ্গে। প্রথমেই চোখ যায় পাশের চৌকিটার দিকে। পাটপাট করে বিছানার চাদর বিছানো চৌকিটা খালি। ইবনুল নামের শুকনো ছেলেটি নেই সেখানে। রাতেই নাম জেনেছিল। ওরই ক্লাসমেট। ঘরের চারপাশে চোখ বুলিয়ে বুকের মধ্যে হাহাকার ওঠে। মাথার কাছে জানালার পাশের জবা গাছটা নেই। পায়ের দিকের খোলা জানালা দিয়ে তাকালে দেখা যেত প্রশস্ত উঠোনের ওপাশে মায়ের হাতে যত্নে বেড়ে ওঠা নয়নতারার দল। অথচ এখানে যেদিকে তাকাও কেবল দেয়াল আর দেয়াল। আলো বাতাস আসার সব রাস্তা বন্ধ। ঘরের মধ্যে ভর সন্ধ্যার অন্ধকার।
ফোন হাতে নেয় সে। স্ক্রিনে সাতটা মিসকল উঠে আছে। মায়ের তিনটা বাকিগুলো রবি, ইরাম আর শিহাবের। ওরা চার বন্ধু ছিল এক আত্মার। ওদের কথা ভেবে বুকটা মোচড় দেয়। যাদের সঙ্গে একবেলা দেখা না হলে অস্থির হয়ে যেত তাদের সঙ্গে কতদিন পর দেখা হবে কে জানে! মাকে কল ব্যাক করে সে। একটা রিং শেষ না হতেই মায়ের উদ্বিগ্ন কণ্ঠ শোনা যায়, ‘অহনো ঘুমাইতেছ আবু ? কিছু খাইছ ? ফোন ধর না কেন ? মা চিন্তায় মইরা যাইতেছে। তোমার কাকায় তো চইলা আসতাছে। মন খারাপ কইরো না য্যান একদম। পয়লা পয়লা খারাপ লাগব পরে ঠিক হইব। আর হুন পড়ালেখা কইরো বাপজান। তুমার বাবার কত শখ তুমি বড় অফিসার হইবা।’
‘ঠিক আছে মা। অহন রাখো। নাস্তা কইরা পরে ফোন দেব।’ মাঝপথে মাকে থামিয়ে দিয়ে ফোন রাখে সে। নাস্তা করার কথা বলে কিন্তু কী নাস্তা করবে জানে না। বাসায় কারও কোনও সাড়া শব্দ নেই। কাকা বলেছিল এখানে কেউ চাকরি করে, কেউ বিজনেস, কেউ পড়ালেখা। হয়তো সবাই যার যার কাজে বেরিয়ে গেছে। শাহজাদার কলেজ শুরু হবে আরও দু দিন পর। বাসায় কেউ নেই বুঝতে পেরেও কেমন একটু ইতস্তত পায়ে রান্নাঘরে ঢোকে। বাড়িতে রান্নার সময় নানা কারণে মাঝেমধ্যে মায়ের কাছে রান্নাঘরে গিয়েছে কিন্তু রান্নাবান্না সম্পর্কে তার মিনিমাম কোনও ধারণা নেই। এমনকি ডিম ভাজি করেও কখনও খায়নি। রান্নাঘরে এক চুলায় বড় একটা পাতিল আরেক চুলায় বিশাল কড়াই। কৌতূহল বশত সে পাতিলের ঢাকনা খোলে। তলায় কিছু ভাত পড়ে আছে। কড়াইয়ে পাতলা ডাল। একপাশে একটা বাটিতে খানিকটা আলুভর্তা। কার খাবার জানে না। খাবার হয়তো শাহজাদারই। কাকা বলেছিল সকালে ভর্তা আর ভাত হয়। খাবার দেখে মনটা দমে যায়। মায়ের হাতের গরম গরম পরোটা, ভাজি, ডিম ছাড়া কখনও সকালে অন্য কিছু খেয়েছে মনে পড়ে না।
রান্নাঘর থেকে ফিরে আসে সে। ক্ষুধায় পেট জ্বলছে কিন্তু বুঝতে পারছে না কী করবে। বাইরে নিশ্চয়ই হোটেলে আছে কিন্তু দরোজার চাবি তো কেউ দিয়ে যায়নি তাকে। কারও ফোন নম্বরও কাছে নেই। কাকাকে ফোন করবে ? নাহ থাকুক। হুট করে কাকা চলে যাওয়াতে মনে হচ্ছে অথৈ জলে পড়েছে। অসহায় লাগে শাহজাদার। মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয়, নাহ এখানে থাকবে না সে। বাড়িতে চলে যাবে।
দুই
দিন গড়িয়ে যায়। শাহজাদার সিদ্ধান্ত বাস্তবে রূপ নেয় না। তাই বাড়িও ফেরা হয় না। বরং ‘মা জননী হাউজে’র এই চার কামরার ফ্ল্যাট তার জীবনের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে পড়ে। শুরু হয় এই শহরের সঙ্গে মানিয়ে নেবার যুদ্ধ। ক্রমেই বুঝতে পারে অজ পাড়া গাঁয়ের কুয়োর ব্যাঙ সে। তার কাছে ঢাকা শহর যেন সীমাহীন সমুদ্র। কূল নেই কিনারা নেই। কেবল করোগেটেড ঢেউগুলো ছলাৎ শো শো শব্দে তুফানের আভাস নিয়ে দৌড়াচ্ছে।
ঢাকার প্রতি যে তীব্র মোহ ছিল সেটা প্রথম কদিনেই কেটে গেছে। বাবা মা কাকা, সবার প্রতি প্রচণ্ড অভিমান হয়। কী সমস্যা ছিল বাড়িতে থেকেই যদি সে উপজেলা ডিগ্রি কলেজে ভর্তি হতো ? শিহাব, রায়হান, সবুজ তারাও তো জিপিএ ফাইভ পেয়ে ডিগ্রি কলেজে ইন্টারমেডিয়েট পড়ছে। এই কলেজের বিশাল ক্লাসরুমে বসে নিজেকে অতি ক্ষুদ্র লাগে। ধোপদুরস্ত পোশাকে সব অপরিচিত আর ঝকঝকে মুখ। ঠিক নতুন পাঁচ টাকার কয়েনের মতো। ওদের কাছে সে খুব ম্লান আর মলিন অচল হয়ে যাওয়া সিকিটা। কারও সঙ্গেই বন্ধুত্ব করতে ইচ্ছে হয় না। ওরাও শাহজাদাকে যেন দেখতে পায় না। ক্লাসের পড়ায় একদমই মন বসে না। কেবলই মনে হয়, এই কলেজ, এই শহরে সে অযাচিত অতিথি। এখনই হয়তো কেউ বলে বসবে, ‘কি হে, এখানে তোমার কাজ কি ? বহুদিন তো হলো, এবার ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে যাও।’
সারা দিন নদীর নামে নাম রাখা এজমালি ঘরগুলো সুনসান ঝিমিয়ে থাকে। মাঝেমধ্যে রান্নাঘরে মলুদা খালার হাড়িপাতিলের টুংটাং ছাড়া শব্দ নেই। সন্ধ্যা থেকে একটু একটু করে সরগরম হতে শুরু করে। শাহজাদা আজ কলেজে যায়নি। রাত থেকে হালকা জ্বর ছিল, শেষ রাতের দিকে জ্বরের প্রকোপ উথাল-পাথাল হয়ে ওঠে। ঘোরের মধ্যে নির্জীব বিছানায় পড়ে থাকে সে। কাউকে ডাকেনি। এমনকি রুমমেট ইবনুলকেও কিছু বলে না। শুধু মনে পড়ছে ইবনুল সকালে একবার ডেকে বলেছিল, ‘কলেজে যাবে না ?’ শাহজাদা কি জবাব দিয়েছিল মনে নেই। মেসের রুটিন অনুসারে এই সপ্তাহের মেস ম্যানেজার শাহজাদা আর ইবনুল। গতকাল বাজার করতে গিয়ে বৃষ্টিতে বেশ খানিকটা ভিজে গিয়েছিল সেজন্য হয়তো এই জ্বর। জীবনে কখনও একটা কাঁচা মরিচ কিনতে না জানা ছেলেটি এখন নয়জন মানুষের পুরো সপ্তাহের বাজার, মিলের হিসেব নিকেশ রাখতে পারে।
জ্বরের ঘোর এখনও কাটেনি। গায়ে বেশ জ্বর। সকালে মা ফোন করেছিল। শাহজাদা যথাসম্ভব স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করেছে। মা যদি জ্বরের খবর জানতে পারে ছোট কাকাকে সঙ্গে নিয়ে নির্ঘাত ঢাকার দিকে রওনা দেবে। মলুদা খালার কোনও শাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছে না। আজ হয়তো আসেনি। মাঝেমধ্যে সে আসে না। তখন মেস জুড়ে হইহুল্লোড় পড়ে যায়। মিনহাজ ভাই রাত দুপুরে রাঁধুনি সেজে পুরো মেস মাথায় তুলে ফেলে। মেসের সবাইকে হাঁকডাক করে কাজে লাগিয়ে দেয়। পিয়াজ কাটো, চাল-ডাল ধোও, মশলা আনো, তারপর ডিমের ওমলেট দিয়ে সেই খিচুড়ি গোল হয়ে বসে খাও। শাহজাদা অবশ্য হোটেলে খাওয়ায় অভ্যস্ত হয়ে গেছে। বুয়া না এলে তার কোনও সমস্যা হয় না। যেহেতু টাকার সমস্যা নেই। মাকে বাবা হুকুম জারি করে রেখেছেন, ‘হুনো রাজিয়া, পোলারে টেকার কষ্ট দিবা না। তার পড়ালেখা খাওন দাওনের পেছনে যা খরচ লাগবো পাডাইবা। ডাহা শহর হইল টেকার শহর। টেকা ছাড়া এক গেলাস পানিও পাইবা না, বুঝ নাই ?’
বাবাও যতবার ফোন করেন ততবারই মনে করিয়ে দেন, ‘বাপজান, টাকার জন্য চিন্তা করবা না। টাকা তোমার বাপে দিব। তুমি খালি খাইবা আর পড়বা।’ তবে মেসের বেশির ভাগ বাসিন্দা খুব হিসেব করে চলে সেটা শাহজাদা বুঝে ফেলেছে। খাবারের মেন্যুতে প্রায় প্রতিদিন ব্রয়লারের মুরগি আর আলুর লম্বা সালুন। সঙ্গে পাতলা ডাল, একটু শাক বা ভাজি। ক্বচিৎ বড় মাছ বা গরুর মাংস হয়। কোনও কোনও সপ্তাহে খরচ বেশি হয়ে গেলে ম্যানেজারকে কৈফিয়ত দিতে হয়।
শরীর প্রচণ্ড দুর্বল। তবু বিছানা ছেড়ে ওঠে শাহজাদা। ওয়াশরুমে গিয়ে হাতমুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে ডাইনিংয়ে যখন আসে তখনই মনে হলো বাইরে থেকে কেউ সন্তপর্ণে দরোজার লক খুলছে। সম্ভবত মলুদা খালা। কিন্তু চোরের মতো কেন ? চোর নয়তো ? অপেক্ষা করে সে। মলুদা খালা নয়। আরিফ ভাই। সঙ্গে ইউনিফর্ম পরা একটি মেয়ে। আরিফ ভাই এই সময়ে শাহজাদাকে বাসায় আশা করেনি। একটু থথমত খেয়ে যায় সে। বিব্রত ভঙ্গিতে বলে, ‘আরে ছোট ভাই, আজ কলেজ নাই ?’
‘আছে ভাই। জ্বর আসছে তাই যাইনি।’
‘ওহ তাই নাকি ? ওষুধ খেয়েছ তো ?’
আরিফ ভাই জবাবের অপেক্ষা না করে আড়ষ্ট হয়ে থাকা মেয়েটিকে নিয়ে রুমে ঢুকে যায়। এই প্রথম নয়, মাঝেমধ্যেই দরোজার সামনে মেয়েদের স্যান্ডেল আবিষ্কার করেছে সে। বিশেষ করে দুপুর টাইমে কলেজ থেকে ফেরার পর। প্রথম প্রথম বেশ অবাক হয়ে যেত, মেসে তো মেয়ে নেই, তাহলে ? কিন্তু কখনও কাউকে প্রশ্ন করেনি বা করার সাহস পায়নি। নিজেই বুঝে নিয়েছে। কাকার কথামতো মেসের কারও কোনও পার্সোনাল বিষয়ে সে মাথা ঘামায় না। কেউই ঘামায় না।
ঘরে পাউরুটি কলা ছিল, সেগুলো খেয়ে শাহজাদা শুয়ে পড়ে। জ্বর ক্রমশ বাড়ছে। অসহ্য যন্ত্রণায় মাথা ছিঁড়ে পড়ছে। মাগো! বলে দু হাতে মাথা চেপে ধরে শাহজাদা। খুব ঘুম পাচ্ছে কিন্তু চোখ জ্বলে পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে। একসময় মনে হলো পায়ের কাছের জানালা হাট করে খুলে গেছে। একদল নয়নতারার মাঝ থেকে ছুটে আসছে মা। মায়ের কোলে শুয়ে দুলছে সে। মা ঘুমপাড়ানি গান গাইছে। অনেক দূর থেকে গুনগুন সুরে ভেসে আসা সেই গানের তালে তালে বাড়ির পাশের নদীটাও হাজির হয়ে গেছে। এই নদীটির নামই কি শঙ্খচিল ? মনে করতে পারছে না শাহজাদা। শীর্ণ প্রায় মরে যাওয়া নদীটির বুকে এখন বিশাল বিশাল ঢেউ। ঠিক এই শহরের মতো। ঢেউয়ের তোড়ে আসা তীব্র বাতাসে ওর শরীর জুড়িয়ে যায়। খুব নির্ভার লাগে। শরীরের সমস্ত বেদনা উবে যায়। ছোট্ট শিশুটি হয়ে মায়ের বুকে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে শাহজাদা।
ঘুমের মধ্যেই বোধ হয় হাজার বছর অতিক্রান্ত হয়ে গিয়েছিল। চারপাশের কোলাহলে যখন সেই ঘুম ভাঙ্গে তখন মুখের ওপর ঝুঁকে থাকা অনেকগুলো উদ্বিগ্ন মুখ। মুখগুলোকে সে চিনতে পারছে না। কিন্তু ওদের কথা সব শুনতে পাচ্ছে।
‘আরে ইবনুল, ফ্রিজে বরফ আছে কিনা দেখো ভাইয়া। পানিতে খানিকটা বরফ দাও।’
‘নাহ জ্বর কমতেছেই না। ১০৪। মাসুদ ভাই, হাস্পাতালে নেওয়া ভালো।,
‘আরিফ সিএনজি ডাকো একটা, হাসপাতালে নিতে হবে।’
‘ওর বাড়ির ফোন নম্বর আছে কারও কাছে ? বাড়িতে জানানো দরকার।’
‘আচ্ছা ওর ফোন কই ? এহ লক করা।’
‘শাহজাদা ফোনের পাস বলতে পারবা ?’
শাহজাদা চিৎকার করে বলে, ‘৭৩৪০।’
‘এই শাহজাদা, ফোনের পাসটা বলো।’
‘আরে ওর জ্ঞান আছে নাকি ? বাদ দাও পরে জানানো যাবে।’
শাহজাদার কানের কাছে সম্মিলিত স্বরে মৌমাছির ভনভন শুরু হয়। মৌমাছিগুলো ক্রমশ তার কানে মুখে ঢুকে যাচ্ছে। অসহ্য যন্ত্রণায় আর্তনাদ করে সে। তারপর চারপাশে শ্মশানের নীরবতা নেমে আসে।
তিনদিন হাসপাতালে কাটিয়ে মেসে ফেরে শাহজাদা। বাড়ি থেকে কাকা এসেছিল। কিন্তু কাকার বাইরেও মেসের মানুষগুলো রুটিন করে হাসপাতালে শাহজাদার দেখভাল করেছে। আচমকা এই কদিনেই শাহজাদার কাছে নয় জায়গা থেকে আসা নয় চরিত্রের মানুষ এক চরিত্রে বদলে যায়। অতি আপন আর কাছের হয়ে ওঠে তারা। শাহজাদার ওষুধ আনা, পথ্য খাওয়ানো ইত্যাদি সব দায়িত্ব চুলচেরা হিসেব করে চলা এই মানুষগুলো ভাগ-বাটোয়ারা করে নেয়।
ছোট কাকা বাড়ি চলে গেছে। শাহজাদাকে নিয়ে যেতে চেয়েছিল কিন্তু সামনে বার্ষিক পরীক্ষা। যাওয়া সম্ভব না। শাহজাদার অসুখের খবর অবশ্য মা জানে না। জানলে কী হতো বলা যায় না।
ছেলের প্রতি বাবা-মায়ের আকাশচুম্বি প্রত্যাশা, কাড়ি কাড়ি টাকার শ্রাদ্ধ, পড়াভীতি, সবকিছু মিলিয়ে মনের ওপর প্রচণ্ড চাপ। পাগল পাগল লাগে শাহজাদার। পরীক্ষা ঘাড়ের কাছে অথচ পড়ালেখা তেমন কিছুই হয়নি। অবসন্ন শরীর নিয়ে অনেক দিন পর পড়ার টেবিলে বসে সে। কিন্তু মনে হচ্ছে বইয়ের সবকিছুই নতুন। এগুলো কখনও সে পড়েইনি। মাথায় কিচ্ছু ঢুকছেও না। বই বন্ধ করে উঠে পড়ে।
বহুক্ষণ যাবত ইবনুল সিলিংয়ের দিকে চোখ রেখে শুয়ে ছিল। এই সময়ে পড়ার টেবিল ছেড়ে শুয়ে থাকার মানুষ ইবনুল নয়। অবাক হয় শাহজাদা। বয়সের হিসেবে শাহজাদা আর ইবনুল এই মেসের সর্বকনিষ্ঠ সদস্য। কিন্তু আচার আচরণে দুজন দুজনের একদম বিপরীত মেরুর। ইবনুল অনেক বেশি পরিণত আর দায়িত্বশীল। দুই-তিন মাস না যেতে শাহজাদা অস্থির হয়ে বাড়ি চলে যায়। কিন্তু ইবনুলকে কখনও বাসায় যেতে দেখেনি। অথচ ওর বাসা ঢাকাতেই। বাবা-মা ঢাকায় থাকার পরেও কেন যে মেসে থাকে কে জানে ? শাহজাদা জিজ্ঞেস করেছিল, ইবনুল এড়িয়ে গেছে। ইবনুলের ধ্যানজ্ঞান কেবল পড়ালেখা। কোনও মানুষ সারা দিন এভাবে মুখ গুঁজে পড়তে পারে সেটা শাহজাদার ধারণা ছিল না। এসএসসিতে গোল্ডেন এ প্লাস পাওয়া ছাত্র ইবনুল। ঢাকা শহরের নামকরা কলেজে পড়ে। জ্বরের মধ্যে সে শাহজাদাকে একবারের জন্য রান্নাঘরে যেতে দেয়নি। প্লেটে খাবার সাজিয়ে এনে হাতে তুলে খাইয়ে দিয়েছে পর্যন্ত। কিন্তু এই অসময়ে শুয়ে কেন ? ওর মুখের কাছে ঝুঁকে দেখে ঘুমাচ্ছে কি না। না, ঘুমাচ্ছে না। কিন্তু ইবনুল কাঁদছে কেন ? দু চোখের কোণ বেয়ে অঝোরে পানি পড়ছে। শাহজাদা অস্থির হয়ে ওঠে,
‘ইবনুল কী হয়েছে, শরীর খারাপ ?’
‘নাহ।’,
ছোট্ট করে জবাব দিয়ে পাশ ফিরে চোখ লুকায় ইবনুল। শাহজাদার মনটা খুব খারাপ হয়। পাশাপাশি চৌকিতে শুয়ে থাকতে থাকতে কবে যে ওরা আত্মার আত্মীয় হয়ে গেছে! এই বয়সের ছেলেদের চোখ দিয়ে এত সহজে পানি পড়ে না সে জানে। ইবনুলের পাশে বসে ওর গায়ে হাত রাখে, ‘বাসার জন্য মন খারাপ হচ্ছে ? কাছেই তো বাসা। যাও তোমার মায়ের সঙ্গে দেখা করে এসো।’
বহুক্ষণ চুপচাপ। কেউ কথা বলছে না। একসময় ইবনুল নিজে থেকেই বলে, ‘আমার মা নেই।’
‘মা নেই মানে ?’
‘হুম। আমি যখন ক্লাস নাইনে পড়ি তখন রোড এক্সিডেন্টে মা মারা গেছেন।’
‘ইশ! কিন্ত বাবা কোথায় ? বাসায় থাকো না কেন ?’
‘বাবা বিয়ে করেছেন। উনার স্ত্রী আমার সঙ্গে এক বাসায় থাকতে পারবেন না বলে দিয়েছেন।’
শাহজাদার মুখে কথা জোগায় না।
‘আজ আমার মায়ের মৃত্যুবার্ষিকী।’―ইবনুল বলে।
শাহজাদার সাফোকেশন শুরু হয়। নন্দননগরের যে বাড়িটিতে মা আছে, সেখানে মায়ের কাছে এক ছুটে চলে যেতে ইচ্ছে করে। সে ইবনুলের গায়ে মৃদু চাপ দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে।
রুম্মান ভাইয়ের রুমে হাই ভলিউমে গান বাজছে। এই মেসে রুম্মান ভাই কেবল সিংগেল রুম নিয়ে থাকে। সব থেকে স্মার্ট আর আমুদে মানুষ। কিসের যেন বিজনেস করে। সারাক্ষণ হই হুল্লোড়ে মেসের সবাইকে জমিয়ে রাখে। শাহজাদার অসুখের সময় সেই ছুটোছুটি করে হাসপাতালে সিট ম্যানেজ করেছিল।
আজ বৃহস্পতিবার। সম্ভবত এই কারণে রুম্মান ভাইয়ের রুমে আড্ডা বসেছে। বৃহস্পতিবারের রাত মেসবাসীর জন্য চানরাত। রুম্মান ভাই তাই বলে। মাঝেমধ্যেই গভীর রাত পর্যন্ত আড্ডা মাস্তি চলে। যদিও সর্বকনিষ্ঠ সদস্য হিসেবে শাহজাদা আর ইবনুলকে সেসব আড্ডায় ডাকা হয় না। মাসুদ ভাই তো বলেই দিয়েছে, ‘তোমরা এখনও নাবালক, এডাল্ট আড্ডায় নো এন্ট্রি।’
ডাইনিং রুমে সজীব ভাইয়ের মুখোমুখি পড়ে যায় শাহজাদা। সজীব ভাই এই মেসের বাসিন্দা নয়। রুম্মান ভাইয়ের ফ্রেন্ড। কিন্তু প্রায়ই মেসে যাওয়া আসার সুবাদে সবাই তাকে চেনে। শাহজাদাকে দেখে সে হইহই করে ওঠে, ‘আরে আলমে আলা, শাহজাদা খুররম, তুমি তো সেই খেইল দেখাইলা। সবাই খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। এখন তো সুস্থ তাই না ?’
শাহজাদা মুচকি হেসে বলে, ‘জি ভাই, সুস্থ।’
‘আরে আসো, রুমে আসো ভাই। আজ তোমাকে আমি পুরাই সুস্থ বানায়ে দেব। বুঝ নাই ? আসো আসো। হেহেহেহে।’
সজীব ভাইয়ের চোখ দুটো লাল। তার কথাবার্তাও জড়িয়ে যাচ্ছে। শাহজাদার হাত ধরে টানতে টানতে রুম্মান ভাইয়ের রুমে নিয়ে যায় সে। হাই বিটের গানের শব্দে কানে তালা লেগে যাবার মতো অবস্থা। পুরো রুম সিগারেটের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন। ছোট ছোট গ্লাসে পানীয়। এর মধ্যে এমদাদ ভাই আর রুম্মান ভাই পাগলের মতো নাচছে। সঙ্গে আরও চার-পাঁচজন। সবাইকে সে চেনে না। এমদাদ ভাই শাহজাদার হাত ধরে টান দেয়। জড়ানো কণ্ঠে কোনওমতে বলে, ‘আরে ডিয়ার, প্রিয় ছোট ভাই। আসো আসো জয়েন উইদ আস।’
এমনিতেও এমদাদ ভাইয়ের চোখ দুটো সবসময় ঘুমঘুমে ঢুলঢুল করে। ইবনুল বলে, এমদাদ ভাই নিয়মিত গাঁজা খায়। এমদাদ ভাইয়ের মুখের উৎকট গন্ধে বমি আসছে। কোনওমতে তার হাত থেকে হাত ছাড়িয়ে রুম থেকে বেরিয়ে আসে শাহজাদা। প্রচণ্ড শ্বাসকষ্ট হচ্ছে তার। খোলা হাওয়া দরকার।
মরিয়া হয়ে এক ছুটে ছাদে চলে যায় সে। কিন্তু ছাদের দরোজা খুলতেই বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে পড়ে, কোথায় কৃত্রিম আলোর ঝলমলে জাদুর শহর! চোখের সামনে ফুলেফেঁপে উঠেছে বিশাল এক নদী। চাঁদের কিরণে ঝিকমিকে ঢেউগুলো তার বুকে রিমঝিম রিমঝিম ঝংকারে নাচছে। বাড়ির পাশের এই নদীটি তার চেনা। নদীটির নাম শঙ্খচিল!
সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ



