
প্রচ্ছদ রচনা : গল্পসংখ্যা ২০২৪―গল্প
‘মামা, হঠাৎ তুমার মশারির দরকার পড়ল ক্যা ? বাড়িতে কুটুম আসিছে নাকি ?’ ছেলেটার মুখের দিকে তাকিয়ে আঁতকে উঠল ওয়াজ। কারেন্টের শক লাগল যেন। তবে কি বাজারের এ ছেলেটাও সব জেনে গেছে ? না না, তা কীভাবে সম্ভব ? ওয়াজ নিজেকেই নিজে প্রশ্ন করে।
পরশু সন্ধ্যায় তিনি এসেছেন। মেঘেদের গৃহবিবাদে তখন অস্থির হয়ে উঠেছিল আসমান। আর আসমানে বিবাদ হলে জমিনের কার ধড়ে জান থাকে ? ধাক্কা লাগলেও এসময় কেউ কারও মুখের দিকে তাকায় না। সবাই ছুটতে থাকে নিজ নিজ টার্গেটের পেছনে। গ্রামে যার যত উঠান, তার তত কাজ। হাঁকডাকে মনে হচ্ছিল আসমান ভেঙ্গে যাবে আজ। তবে সেদিন বৃষ্টি হয়নি। বৃষ্টি হয়নি, ভালো হয়েছে। নিচু জমিগুলোতে টান ধরেছে কেবল। এখন বর্ষা নামলে সরিষা বোনা-রসুন লাগানো আরও পিছিয়ে যাবে। চলন বিলে রসুনের গাছ উঠে গেছে!
এ সময় গনগনে গ্রীষ্ম আপনাকে সমর্পণ করে উত্তরের নরম হাওয়ার কাছে। নতুন ফল-ফসলে ভরে ওঠে মাঠ। তবে কয়েক বছর থেকে গ্রীষ্ম ভীষণই বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। প্রকৃতিতে শীতের যেন কোনও অধিকার নাই। সে যেন সৎ বোন। তার গনগনে রূপকে সমীহ করত সবাই। এখন সবাই মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। মানুষ নালিশ জানাচ্ছে মালিকের দরবারে। দু-চার দিন বা সপ্তা অথবা আরও কিছু বেশি সময় পরে আসমান থেকে গ্রিন সিগনাল আসে। ওয়াক্তিয়ার ঘরে জুম্মার পরে লাখো-কোটি শোকর করে ময়-মুরুব্বিরা। তখন আমাদের কঙ্কাল বাবুও হয়ে ওঠেন মহাবীর রুস্তম। এরইমধ্যে আগাম গুড়ের আশায় অনেকেই কেটেছে খেজুরগাছ। প্রথম ‘চাঁচ’ও পড়েছে দু-একজনের। আসমানের ঐ অবস্থা দেখে ঐসব গাছিরা কত হাজার-কোটিবার খোদার নাম জপেছে, তার হিসাব নাই। এখন বৃষ্টি হলে খেজুরগাছে পচন লাগবে নিশ্চিত। গাছটা মারাও যেতে পারে।
বৃষ্টি না নামলেও পরের দিন রাত পর্যন্ত বাতাস থামেনি। ‘গরম-ঠান্ডার যুদ্ধ লাগিছে। এবার নিজের দখল বুঝে লিবে শীত।’ ইব্রাহিম মণ্ডলের এই কথাতে সায় দিয়েছিল চায়ের দোকানের অন্য মুরুব্বিরাও। কিন্তু পরদিন সকালে মুরুব্বিরা দেখল রোদের নৃশংসতা। মুহূর্তে সে খালি করে দিল চায়ের দোকান। গনগনে লাল কাঠে পানি দিল আফসার মিয়া। একজনের প্রশ্নের জবাবে ইব্রাহিম মণ্ডল বলল, ‘শোনো আমরা তো সসম্মানে ফিরে যাচ্ছি আপন আপন ঘরে। কিন্তু বিদ্রোহীদের কী হাল হয় জানো ? সিপাহি বিদ্রোহের মুরুব্বি বাহাদুর শাহ জাফরকে নির্বাসন দেওয়া হয়েছিল রেঙ্গুনে।’ কথা জানে মণ্ডল। একই গল্প সে বার বার বললেও মানুষ শোনে। ঐ দুরাত বাতাসের কারণে মশাদের উৎপাত বোঝা যায়নি। তবে আজ রাতের জন্য একটা ব্যবস্থা দরকার।
বাড়তি মশারি একটা তাদের বাড়িতে আছে। তবে তা মোষের চামড়ার মতো মোটা। ওর ভেতরে বাতাস ঢোকে না। ওটাই তারা ডাক্তার সাহেবকে দিয়েছে। বাতাস ছিল তাই তাতেই চলেছে। অসুবিধা হয়নি। তবে আজ রোদের তেজ ভিন্ন ইঙ্গিত দেয়। গরম লাগলেও তো ডাক্তার সাহেব তাদের মতো জানালা খুলে ঘুমাতে পারবেন না। সকালে বাজারে আসার কথা শুনেই তিনি ওয়াজকে ডেকে বলেছেন, ‘শোনো আমাকে তো তুমি চেনো। আমার জন্য তোমরা আলাদা কিচ্ছু করতে যেও না। তোমরা পেরেশান হলেই বরং আমি কষ্ট পাব। ফিৎরার টাকাতে আমি স্কুলে-কলেজে পড়িছি। আল্লাহ সহায় হয়েছেন―কখনই আমি তা ভুলি না। অতএব আমাকে নিয়ে চিন্তা করো না।’ তিনি যাই বলুন। তাই হয় ? হ্যাঁ, তবে একটা কথা সত্য যে তিনি ফিৎরার টাকাতে, সরকারি-বেসরকারি বৃত্তিতে দেশে-বিদেশে লেখাপড়া করেছেন। তার ইনকাম এখন মাসে লাখ টাকার বেশি। তবে এতে তার চরিত্রে কোনও পরিবর্তন ঘটেনি। নানার বাড়িতে মানুষ হয়েছেন। আজও একটা ভাড়া বাড়িতে সপরিবারে থাকেন। একটা সোফা সেট পর্যন্ত নাই সেই বাড়িতে। মানুষকে বসতে দেন কাঠের চেয়ারে। ঐ বাড়িতে একটা জিনিসে চোখ আটকায়, তা হচ্ছে প্রচুর বই! এখানেও তিনি মোটা মোটা কয়েকখান বই নিয়ে এসেছেন। ইংরেজি বই। সেগুলো পড়েন আর একটা খাতার মধ্যে কী যেন লেখেন। বুলনপুর মাদ্রাসায় কাজ করার সময় ডাক্তার সাহেবের সঙ্গে তার পরিচয়। অনেক দিন সে তাদের বাড়িতে খেয়েছে। তাদের বাড়ির চাল বা তরকারির সঙ্গে সে ডাক্তার সাহেবের বাড়ির কোনও তফাৎ দেখেনি। তারাই বরং এলুমিনিয়ামের জগ বাতিল করেছে, সেই কত বছর আগে। চাল-ডালের টাকা রেখে সব তিনি বিলিয়ে দেন।
ছয় বছরের বেশি সময় ওয়াজ ডাক্তার সাহেবকে চেনে। মেয়েটার জান বাঁচাতে তিনি ফেরেস্তারূপে এসেছিলেন। ছোট্ট এ মেয়েটা তাদের বাঁচার রসদ। এছাড়া তার অনুরোধে গ্রামের কত মানুষকে বিনা পয়সায় চিকিৎসা দিয়েছেন। এমন ওজনদার একজন মানুষ! দেশ-বিদেশে কত মানুষ তাকে চেনেন। তবে চড়ুইয়ের পালকও তাকে বহনে সক্ষম।
রেওয়ামিলটা মেলাতে পারছে না ওয়াজ। বাড়িতে তারা স্বামী-স্ত্রী দুজন, তার মা এবং তাদের ঐ মেয়েটা ছাড়া আর কেউ নাই! উঠানে নামতেও এখন তার মাকে যুদ্ধ করতে হয়। তবে এমনিতেও দুনিয়া মানে তিনি বাপের বাড়ি-স্বামীর ঘর আর মাঝখানের পানাপুকুর, আসমানের আগুনে পোড়া জোড় তালগাছ, পুরোনো জুম্মাঘর… এগুলো ছাড়া অন্যকিছু চিনতেন না। হাসপাতালেই কাঁদতে শিখেছিল মেয়েটা। এখন হাসতে শিখেছে। তাছাড়া হুটহাট কেউ তার বাড়ির ভেতরে যায় না। কারণ তার বৌ জামিরার ঝি। পাড়ার নারী-পুরুষ সবাই তাকে সমীহ করে। বারো বছরেও পাড়ার লোকের কাছে সে ‘ওয়াজের বৌ’-এ পরিচিতি পায়নি। সবাই তাকে ‘মৌলবির বিটি’ বলেই ডাকে। এসব ভেবে ওয়াজের মাঝেমধ্যে হিংসে হয়, খাটো খাটো লাগে নিজেকে। আবার তার নমনীয়তা, তার সমর্পণ তাকে সব ভুলিয়ে দেয়।
মনে মনে শক্ত হলো ওয়াজ। না, এ খবর কেউ জানে না। অযথা সে ঘাবড়ে যাচ্ছে। তবু এক চিলতে সাহসের সন্ধানে এদিক-ওদিক তাকাতে লাগল। মিথ্যাকে সামলাতে সে অভ্যস্ত নয়। এ মুহূর্তে দোকানে আর কোনও খদ্দের নেই। বাজারে লোকজন কম। জরুরি না হলে কেউ বাইরে আসছে না। রোড সাইডের চায়ের দোকানগুলো একেবারে শূন্য। সাগরকে দেখা যাচ্ছে। তার স্টলটাও রাস্তার পাশে, বন্ধ। গামলাভর্তি মাটি এনে সে স্টলের চৌহদ্দির মধ্যে ঢালছে। তারপর শরীরের সব শক্তি এক করে উঠে দাঁড়াচ্ছে ঝুরঝুরে ঐ মাটিগুলোর ওপর। মন মতন মসৃণ হলে গামলা হাতে পেছন ফিরে দৌড়াচ্ছে, আরও মাটি আনতে।
‘কী গো মামু, কোত হারায় গেলে ? দোকান বন্ধ করব। কোনটা লিবে দেখো। আমরাও দল করি কিন্তু পরিস্থিতি ভালো না। কে, কখন, কাকে যে কোরবানির খাসি বানাচ্ছে বোঝা মুশকিল! দোকানের আর্ধেক মাল বাড়িতে রাখিছি।’
ছেলেটার কথা ফুরাল না―দোকানের মালিক চলে এল। তাকে দেখেই মুখ কালো হয়ে গেল ওয়াজের। এবার মশারির দাম অন্তত ৫০ টাকা বেশি লাগবে, নিশ্চিত।
‘ছোটবাপ, কী চায় রে ?’
এ দোকানের মালিক ওয়াজকে ‘ছোটবাপ’ সম্বোধন করে। তবে এ ডাকে ওয়াজের মন ভিজে না। অনেকবার সে খেয়াল করেছে দোকানের ছেলেটার চেয়ে সে দাম বেশি রাখে। তবু কেন সে এই দোকানেই আসে, আল্লাহই জানে! আজ অবশ্য উপায় নেই, অন্য দোকানগুলো সব বন্ধ।
‘মামুর নাকি মশারি লাগবে একটা’ মালিকের প্রশ্নের জবাব দিল ছেলেটা।
‘মশারির জবর টান গো। সদর হাসপাতালে কালকেও নাকি চারজন এন্তেকাল করেছেন, এত ডেঙ্গু। আর জঙ্গলে-ধানক্ষেতে যারা লুকাচ্ছে তাদের জন্য এ মশারি ফরজ। জঙ্গলে কয়েল চলে না। পায়ের দিকে জ্বালালে, মাথায় কামড় দিবে আর মাথার দিকে জ্বালোলে পায়ে-গায়ে-গতরে… তাই মশারি ছাড়া উপায় নাই।’
‘যাই হোক, তিনিই রিজিকের মালিক! না হলে দেখ অন্য জিনিস কিন্তু বিক্রি নাই। শালা একটা না একটা ফ্যাসাদ হচ্ছেই, বুঝলে ? দুইটা মশারি বিক্রি হচ্ছে, হোক। তা না। বণিক সমিতির অফিসে, মশারি ক্রেতার বাপ-দাদার নাম জমা দিতে হচ্ছে রোজ। এসব সহ্য করা যায়―বলো তো ? ’
ওয়াজের পাশের টুলে বসতে বসতে এ কথাগুলো বলে ফেলল দোকান মালিক। তার মুখ তো নয়, যেন মেশিন! একই সঙ্গে পাঁচজন খদ্দেরকেও সে সামলাতে পারে। তবে কথাতে ওয়াজের মন ভিজছে না, বরং বিরক্ত লাগছে। লাভ-লস যা-ই হোক এখন সে দোকান থেকে বের হতে পারলেই হয়। মশারির গায়ে আলতো করে হাত বুলিয়ে দোকান মালিক বলল,―‘লেও ছোটবাপ, তুমি লিজের লোক এইটা তুমি তিনশো ট্যাকা দেও আর এইটার দাম একটু বেশি, মুকামেও মশারি শর্ট। এইটা সাড়ে পাঁচশো, লেও। অন্য কেউ হলে তো ধরো এই মশারির দাম সাড়ে সাতশো ট্যাকা অন্তত।’
ডাক্তার স্যারের জন্য ভালো মশারিটাই নেওয়া দরকার। তবে এ মুহূর্তে তার স্বভাববিরুদ্ধ কোনও কাজ সে করতে চাচ্ছে না। এ ব্যাপারে ডাক্তার সাহেব নিজেও তাকে সতর্ক করেছেন। পকেট থেকে দুশো টাকার একটা নোট বের করে দিল ওয়াজ। এতে দোকানের ছেলেটা চটে গিয়ে বলল,―‘ধুর মামা, তুমি আমারে পর নাকি ? এইডা ম্যাজিক মশারি। তুমাক বুলনুনি, এক দাম। সারা জীবন তুমি ঐরকমই থাকি গেলে। দেও আর পঞ্চাশটা ট্যাকা দেও।’ ছেলেটার কথার পর মালিক আর কোনও কথা বলল না। ছেলেটার কথার কারুকাজ নিশ্চয়ই তাকে মুগ্ধ করেছে। নইলে কাসার বাসনের মতো তার চোখ জোড়া চিকচিক করে উঠত না।
ছেলেটা তার মধ্যে কোনও পরিবর্তন লক্ষ করেনি ভেবে ওয়াজের ভালো লাগল। সে পঞ্চাশ টাকার একটা নোট ছেলেটার হাতে দিল। নোটটা হাতে ধরেই ছেলেটা আচমকা এক প্রশ্ন করে বসল―‘কী ব্যাপার মামু, তুমি তো এক কথাতে ট্যাকা ছাড়ার মানুষ না ?’ এ পরিস্থিতিতে এ প্রশ্নটা সহজ নয়। তবে এইবার আর ধাবড়াল না ওয়াজ। ঠোঁটের হাসিকে পালিশ করে সে জবাব দিল,―‘মশারি কিনার ট্যাকা দিছে তুমার মামির মা…! তাহলে আমার ভারী-পাতল কী বুলো ?’ এ কথা শুনেই হা হা করে হেসে উঠল সবাই। এ হাসির শব্দ বাতাসে মিশিয়ে দিয়ে গেল যত ভয়, যত সন্দেহ।
রাস্তায় উঠে এল ওয়াজ। রোদ উঠেছে খুব। উঠুক, এখন তার রোদ দরকার। কিন্তু কতক্ষণ তার মন এবং ঐ আকাশ এমন নির্ভার থাকে সেটাই বড় প্রশ্ন। ক্ষণে ক্ষণে বদলে যাচ্ছে আকাশের রং।
এ দেশের মানুষ সুযোগ পেলেই ঢোল-তবলা বাজিয়ে নাচে। চৈত্রের খাঁখাঁ রোদকে তারা গান গেয়ে উড়িয়ে দেয়। বর্ষা-বন্যাকেও তারা উপভোগ করে―উঠানে জাল পেতে রাখে, মাছ ধরে খায়। নির্বাচন তাদের কাছে ছিল ঈদের অধিক উৎসবের…! যা এখন অতীত। এখন হিরো আলমও রক্তাক্ত হন, তাও উপ-নির্বাচনে।
এসব দেখে-শুনে এ ভাগ-বাটোয়ারার সঙ্গে নিজেকে আর জড়াতে চাচ্ছে না কেউ। তবে খিল এঁটে বসে থাকতে দেওয়া হচ্ছে না কাউকেই। মিছিলে না গেলে জোরজবরদস্তি-হেনস্তার বলি হচ্ছেন অনেকে। আগে ভার্সিটির হলগুলোতে এমন হতো। স্বাধীনের পর গ্রামগঞ্জে অন্তত এমনটা হয়নি। তবে লোকমুখে একাত্তরের কথা শোনা যায়। শান্তি কমিটির লোকেরা ব্রিজ-কালভার্ট পাহারা দিতে বহু মানুষকে বাধ্য করেছে। তালিকা মোতাবেক কেউ না গেলে―তাকে গুনতে হয়েছে কাফফারা। নগদ অর্থ, পাঁচটা মোরগ অথবা একটা খাসি। এভাবেই যুগে যুগে ফিরে ফিরে আসে দুঃসহ একাত্তর… ?
সকালেও সদলবলে পাড়াতে নেমেছিল অমল ঘোষ। ওয়াজের ধারণা সব জেনেশুনেই তারা এসেছে কিন্তু পরে জানা গেল তা না। তারা এসেছে অন্য একটা বিষয়ে তাগিদ দিতে।
‘আদাব দাদা, আগামীকাল ট্রাফিক মোড়ে ‘শান্তি ও উন্নয়ন সমাবেশ’। যেতে হয় যে! মানে এটা মন্ত্রী মহোদয়ের নির্দেশ।’
সরু একটা সিগারেট জ্বালাতে জ্বালাতে বলল অমল। ধোঁয়া থেকে সুগন্ধ ছড়াচ্ছে। নিশ্চয়ই দামি সিগারেট। অথচ এই ক বছর আগেও সে বাবা-দাদাদের সঙ্গে অন্যের জমিতে কাজ করত। ধান লাগানো, পেঁয়াজ লাগানো, পাট নিড়ানো, কাটা-ধোঁয়া… এসব। তবে এখন সে কত টাকার মালিক তা হয়তো স্বয়ং অমলও জানে না। ওয়াজ তাকে ভয় করে তা নয়। সে অমলের বড় ভাইয়ের ক্লাসমেট। হাইস্কুলে তারা একসঙ্গে পড়েছে। অমল নিজে অনেক পয়সা-কড়ির মালিক হলেও তার অন্য ভাইয়েরা কেউই তেমন কিছু করতে পারেনি। সুবলটা এখনও সাইকেল নিয়ে সাত গ্রামে ঘোরে। পাঁচ বাড়ির দুধ দুয়ে নিয়ে যায়। ওয়াজের পাড়াতেও আসে―দেখা হলে তার গল্প ফুরায় না।
সুবলের ছোট, সেই অধিকারে ওয়াজ অমলের সঙ্গে কথাবার্তা বলত। সুবল তাকে ‘তুই’ সম্বোধন করে। আর ওয়াজ ‘তুমি’। তবে অনেক দিন তার সামনাসামনি দেখা হয়নি। কথা হয়নি। আজকে সে পয়সা-কড়িতে অনেক এগিয়ে গেছে। হাবভাব-কথাবার্তাও আলাদা। এখন অমল তার সম্মুখে দ্বিধাহীন সিগারেট জ্বালায়। ভেবেচিন্তে জবাব দিল ওয়াজ।
‘অমল ইয়ে, কাল যে আমার রসুন পোতার ডেট গো, পাইট-পাটাল সবই ঠিক। জমিতেও টান ধরিছে, শুকায় যাবে যে। এসব হিসাব সবই তো তুমি জানো।’
নাম ধরে ডাকাতেও হয়তো অমল মনে কিছু করেনি। কিন্তু তার মুখটা দেশলাইয়ের কাঠির মতো জ্বলে উঠল অন্য কারণে। পেছনের দিনের কোনও কথা উঠলে সে খুবই কষ্ট পায়। এখন তার দিন বদলেছে। কখনও তারা অমলের সামনে ওসব কথা তোলে না। কথা প্রসঙ্গে উঠলেও তেলে-বেগুনে জ্বলে ওঠে অমল।
‘ওকে ফাইন। তই দাদা সামনের দিন আর মিস করেন না। মিস মানে, সবাই বুঝে নেবে আপনি এ পক্ষের নন। মানে মামলা-টামলা হতে পারে। অন্য ঝামেলাও হতে পারে। দেখেন নাই, আকাশের ‘চাঁদ সাহেব’ আমরা কই নামাইছি। এক সিজিনে একশোর বেশি মামলা হইছে তার নামে। আর মনে রাইখেন ‘গা খারাপ’ হয় মাসের মধ্যে একবার…!’
অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল সবাই। পাটগাছের মতো একজন আরেকজনের গায়ের ওপর হেলে পড়ছে। এরই মধ্যে সামাদ মোল্লা জিজ্ঞেস করল, ‘দাদা, আপনি এসব কথা মেলান কীভাবে ?’ সামাদ মোল্লাকে বুকে জড়িয়ে নিল অমল ঘোষ। তারপর তারা এগিয়ে গেল পাড়ার ভেতরের দিকে।
ক্ষোভে-দুঃখে ফেটে গেল ওয়াজের দু চোখ। অমলের ব্যাপারে বাজারে নানা কথা শোনা যায়। যে অমল হাইস্কুলের বারান্দা মাড়ায়নি কোনওদিন সে এখন হাইস্কুলের সভাপতি। সে নাখোশ হলে ভার্সিটির দু ডজন পাস লোকের বেতন আটকে যায়। কয়েক দিন আগে হেডমাস্টারকে সে স্যার-ম্যাডাম এবং শিক্ষার্থীর সামনে শাসন করেছে… ঐ ডিডিওটা ভাইরাল হয়েছিল খুব। যাই হোক অমল তার সঙ্গেও এমন আচরণ করতে পারে ? ওয়াজ তা কল্পনাও করতে পারেনি।
গামছায় চোখ মুছে কিছুক্ষণ পর সে পেছন ফিরল। পেছনে তাকিয়ে সে অবাক। বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে তার বৌটা দাঁড়িয়ে আছে কাছেই। সেও আঁচলে চোখ জোড়া মুছে নিচ্ছে। ডাক্তার সাহেবও দাঁড়িয়ে আছেন দরজার আড়ালে, তার হাতেও রুমাল। এত কাছে থেকেও ওয়াজ তাদের কারও কান্নার আওয়াজ পায়নি। তার ছোট্ট মেয়েটাও হ্যাঁ-হু কিচ্ছু করেনি। কতটা নীরবে কাঁদছে সবাই।
দুপুর গড়িয়ে যাচ্ছে। কালকে রসুন লাগানোর কথা। সার-বিষ নিয়ে দ্রুত ফেরা দরকার। মহাসড়ক ঘেঁষা কাসাপট্টি, তারপর চালপট্টি, তারপর সারি সারি কীটনাশকের দোকানগুলো। কাসাপট্টির মধ্যেই তার ফোনটা বেজে উঠল। আমানতের ফোন। আমানত তার অধীনে টাইলস মিস্ত্রির কাজ করে। তবে শৌখিন ছেলে। বিয়ে-থা করেনি এখনও। হোন্ডা কিনেছে একটা।
‘ওস্তাদ, কোতি আছেন ?’
‘বাজারে, কাসাপট্টিতে। কালকে রসুন পোতার ডেড। সার-বিষ লাগবে।’
‘ওহিনেই দাঁড়ান আর মোবাইলডা বন্ধ করেন। পুলিশ আপনার বাড়ি ঘিরে ফেলেছে। আপনার বাড়িতে নাকি এক ডাক্তারকে পাওয়া গেছে। একটা পিস্তলও নাকি পেয়েছে। আপনার কথা বার বার জিজ্ঞেস করছে পুলিশ। আমি আসছি।
মোবাইলটা বন্ধ করতে গিয়ে মনে পড়ল। বাড়ি থেকেও তাকে কল দিয়েছিল। সে কেটে দিয়েছে এবং ব্যাক করবে ভেবে আর করা হয়নি। হাতের মশারিটার দিকে তাকাল ওয়াজ। মনে মনে সে আড়াল খুঁজছে।
সচিত্রকরণ : রজত



