বিশ্বসাহিত্য : অনুবাদ গল্প : পাওনা : মূল : বার্নার্ড মালামুদ

বাংলা অনুবাদ : শাকের হোসেইন
[বার্নার্ড মালামুদ (২৬ এপ্রিল, ১৯১৪―১৮ মার্চ, ১৯৮৬, নিউ ইয়র্ক) ছিলেন একজন আমেরিকান ঔপন্যাসিক এবং ছোটগল্প লেখক যিনি ইহুদি অভিবাসী জীবন থেকে উপমা তৈরি করেছিলেন।মালামুদের বাবা-মা ছিলেন রাশিয়ান ইহুদি যারা জারবাদী রাশিয়া থেকে পালিয়ে এসেছিলেন। তিনি ব্রুকলিনে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, যেখানে তার বাবার একটি ছোট মুদি দোকান ছিল। পরিবারটি ছিল দরিদ্র। মালামুদের মা মারা যান যখন তিনি ১৫ বছর বয়সে ছিলেন, এবং তার বাবা পুনরায় বিয়ে করলে তিনি অসুখী ছিলেন। তিনি প্রথম দিকে তার প্রতিবন্ধী ভাইয়ের দায়িত্ব নেন। মালামুদ নিউ ইয়র্কের সিটি কলেজ (বিএ, ১৯৩৬) এবং কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে (এমএ, ১৯৪২) পড়াশোনা করেন। তিনি নিউ ইয়র্ক সিটির উচ্চ বিদ্যালয়ে (১৯৪০-৪৯), ওরেগন স্টেট ইউনিভার্সিটিতে (১৯৪৯-৬১), এবং ভার্মন্টের বেনিংটন কলেজে (১৯৬১-৬৬, ১৯৬৮-৮৬) পড়ান।
তাঁর প্রথম উপন্যাস দ্য ন্যাচারাল (১৯৫২; ফিল্ম ১৯৮৪), একজন বেসবল নায়ক সম্পর্কে একটি কল্পকাহিনি। দ্য অ্যাসিস্ট্যান্ট (১৯৫৭; ফিল্ম ১৯৯৭) একজন যুবক বিধর্মী এবং একজন বৃদ্ধ ইহুদি মুদির সম্পর্কে। জারবাদী রাশিয়ায় সংঘটিত দ্য ফিক্সার (১৯৬৬), একটি খ্রিস্টান ছেলেকে হত্যার জন্য অন্যায়ভাবে কারারুদ্ধ একজন ইহুদির গল্প; এটি পুলিৎজার পুরস্কার জিতেছে। তাঁর অন্যান্য উপন্যাস হলো : একটি নতুন জীবন (১৯৬১), দ্য টেন্যান্টস (১৯৭১; চলচ্চিত্র ২০০৫), Dubin’s Lives (১৯৭৯) এবং ঈশ্বরের অনুগ্রহ (১৯৮২)।
মালামুদের প্রতিভা তাঁর ছোটগল্পে সবচেয়ে স্পষ্ট। যদিও একটি অতিরিক্ত, সংকুচিত গদ্যে বলা হয় যা তাদের অভিবাসী চরিত্রগুলির তুচ্ছ ঘটনা প্রতিফলিত করে, গল্পগুলি প্রায়শই আবেগময় রূপক ভাষায় বিস্ফোরিত হয়। মালামুদের ছোটগল্প সংকলন দ্য ম্যাজিক ব্যারেল (১৯৫৮), ইডিয়টস ফার্স্ট (১৯৬৩), ফিডেলম্যানের ছবি (১৯৬৯), এবং রেমব্রান্টের হাট (১৯৭৩)। এছাড়া তাঁর Uncollected Stories মরণোত্তর ১৯৮৯ সালে প্রকাশিত হয়েছিল।]
নদীর তীর ধরে সরু রাস্তাটা চলে গেছে; দু’ধারে সারি সারি পুরানো দালান ছড়িয়ে ছিটিয়ে গায়ে গা লাগিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। ইটের এ বস্তিতে আকাশ ভালো দেখা যায় না, রাস্তায় খেলতে খেলতে কোনও ছেলে যদি ওপরের দিকে হাতের বলটা ছুড়ে মারে, তাহলে হয়তো এক চিলতে বিষণ্ন ধূসর আকাশ চোখে পড়ে, ব্যস ওইটুকুই।
রাস্তার কোণে আরেক মাথায় বিপরীত পাশের এমনি একটি কালচে ধরা পুরানো বাড়িতে ঝাড়ুদারের কাজ করত উইলি শ্লেগেল। অন্য আর দশটি বাড়ির সঙ্গে শ্লেগেল-এর এই বাড়িটির ছোট একটি পার্থক্য রয়েছে; এ রাস্তার একমাত্র খাবারের দোকানটি এ বাড়িটিতেই। বাড়ির নিচে বেইজমেন্টে পাথরের পাঁচটি ধাপ পেরিয়ে মিস্টার ও মিসেস পানেসার এ দোকানে ঢুকতে হয়, যেন দেয়ালের গায়ে আচমকা হাঁ করে ওঠা কোনও গহ্বর।
পানেসা দম্পতির জমানো শেষ কড়িটুকু দিয়ে এ দোকানটি কেনা। মিসেস পানেসার কাছ থেকেই উইলি শ্লেগেল-এর বউ জানতে পায় পানেসাদের দুই মেয়ে; দুজনেরই নাকি বিয়ে হয়েছে ভীষণ স্বার্থপর দুই ছেলের সঙ্গে যারা নিজেদেরটা ছাড়া কিছুই বোঝে না। স্বামীদের ঘর করতে করতে মেয়ে দুটিও ক্রমেই তেমনি আত্মকেন্দ্রিক হয়ে উঠেছে। মেয়েদের ওপর নির্ভর করে চলতে হবে―এ ভয়েই পানেসারা এ দোকানটি কেনেন।
কারখানা-শ্রমিকের কাজ করতেন মিস্টার পানেসা; অবসরে যাবার পর হাজার তিনেকের মতো জমেছিল হাতে, তার পুরোটাই এই দোকানের পেছনে ঢালেন।
শ্লেগেলরা ঝাড়ুদারের কাজ করে আসছে বহু বছর ধরে; রাস্তার অপর পাশ থেকে দোকানটি দেখে দেখে অভ্যস্ত তারা, কোথায় কী আছে সবই তাদের ভালো করেই জানা, তবু মিসেস পানেসাকে শ্লেগেল-পত্নী অ্যাটা জিজ্ঞেস করেই ফেললো, ‘তো, এই দোকানটাই কিনলেন ক্যান ? আর কোথাও দ্যাখেন নাই ?’
মিসেস পানেসা খুশিমনেই উত্তরটা দিলেন; তাঁদের নাকি আসলে বেশি টাকাপয়সার প্রয়োজন নেই, স্রেফ দুজনের কোনওমতে খেয়েপরে চলবার টাকাটা উঠে গেলেই হয়। দোকানটা ছোট, কাজকর্মও খুব বেশি নাই। রাতের পর রাত আলোচনা করে, বহু হিসেব কষেই সিদ্ধান্তটা নেওয়া পানেসা দম্পতির। অ্যাটা শ্লেগেলের চোখের দিকে তাকিয়ে মিসেস পানেসা বললেন, ‘আশা করি কষ্ট হবে না বেশি, হয়া যাবে সব আস্তে আস্তে’। অ্যাটা সায় দিল তাঁর কথায়।
বাড়ি ফিরে অ্যাটা উইলিকে জানাল তাদের নতুন প্রতিবেশী পানেসাদের কথা; পুরনো ইহুদি মালিকদের কাছ থেকে ব্যবসাটি কিনে নেয়া পানেসাদের দোকানে মাঝে মাঝে এক দুবার ঢুঁ দিয়ে দেখা যায় বলে রায় দিল অ্যাটা। মূলত অ্যাটা যা বোঝালো তা হলো খুব প্রয়োজন না পড়লে তারা আসলে সে দোকানে যাবে না, যেখান থেকে নিয়মিত বাজার সদাই করে তারা, সেখানেই চালিয়ে যাবে। কিছু আনতে ভুলে গেলে বা একান্তই না পাওয়া গেলেই পানেসাদের শরণাপন্ন হবে তারা। উইলিও তার সঙ্গে একমত হলো।
উইলির পিঠটা চওড়া, দৈহিক গঠনেও বেশ লম্বাটে। বছরের পর বছর ধরে গোটা শীতকালটা জুড়ে কয়লা আর ছাই সরাবার কাজ করে যাচ্ছে ও, ফলে ভারী মুখটা নিষ্প্রভ দেখায় তার; জঞ্জাল ভরার ট্রাকে যখন ছাইয়ের বাক্সগুলো বোঝাই করে, সেখান থেকে উড়ে আসা ছাইয়ে প্রায়ই তার চুলগুলো ধূসর হয়ে থাকে। সবসময়ই ওভারঅলটা পরনে তার, আর মুখে একটাই অভিযোগ: দিনরাত খেটে মরে সে, এক মুহূর্তের বিরাম নাকি নেই তার। বাড়ির কাজে ছোটখাটো কিছুর প্রয়োজন হলেই রাস্তাটা পেরিয়ে সিঁড়ি বেয়ে বেইজমেন্টে পানেসাদের দোকানে চলে যায় ও, আর পাইপ জ্বালিয়ে মিসেস পানেসার সঙ্গে গপ্পো জুড়ে দিয়ে নিজের জীবনের এসব সাতকাহনই শোনায়। বেঁটেখাটো গড়নের মিস্টার পানেসা স্মিত হাসি নিয়ে কাউন্টারের পেছনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে থাকেন কখন উইলি তার যৎসামান্য পরিমাণ বাজারের দামটা অবশেষে মিটিয়ে বিদায় হবে; উইলির গোটা সওদা কখনই ৫০ পয়সার বেশি হয় না।
এভাবেই দিব্যি চলছিল। এরপর উইলি একদিন ভীষণ বিমর্ষ হয়ে দোকানে এল, ভাড়াটেরা কীভাবে তার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে চলেছে, বাড়ির মালিক কীভাবে দিনের পর দিন তাকে এঁদো দুর্গন্ধময় স্যাঁতসেতে ৫ তলা বাড়িটা সাফ সুতরো রাখার জন্য তাড়া দিয়ে চলেছে এসব নিয়ে অনেকক্ষণ টানা বিষোদ্গার করে চলল। নিজের গল্পে এতটাই বুঁদ হয়ে ছিল সে যে কোন ফাঁকে যে ৩ ডলারের বাজার জমিয়ে ফেলেছে হাতে সে খেয়ালও রইল না, ওদিকে পকেটে তার রয়েছে মাত্র ৫০ পয়সা। দাম চুকাতে গিয়ে যখন টের পেলো, বজ্রাহত হয়ে গেল যেন সে, ঘা খাওয়া কুকুরের মতো মিনমিন করে কিছু একটা বলতে চাইল, কিন্তু গলা দিয়ে আওয়াজ বেরল না।
মিস্টার পানেসা কিন্তু দিব্যি স্বাভাবিক, গলাটা সামান্য খাঁকারি দিয়ে বললেন, ‘কোনও সমস্যাই নেই, উইলি চাইলে পরে যে কোনো সময় এসে বাকি টাকাটা দিয়ে যেতে পারো।’
বুঝতে না পেরে উইলি তাকিয়ে থাকলে মিস্টার পানেসা ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘মানুষ তো মানুষেরই জন্যই, নয় কি ? মানুষের উপকারে এমন এক আধটু বাকি দেয়াই যায়, এবং তা উচিতও।’
এর আগে আর কোনও দোকানদারের কাছে এমন কথা উইলি কখনও শোনেনি, বিস্ময়াভিভূত হয়ে পড়ে সে। এর কিছুদিন বাদে সে বাকি আড়াই ডলার যখন শোধ করে, মিস্টার পানেসা তাকে আশ্বাস দিয়ে জানান, উইলি যখনি চাইবে বাকিতে সওদা করতে পারে, কোনও আপত্তি নেই, উইলিদের প্রতি পুরোপুরি বিশ্বাস আছে পানেসাদের। পাইপে লম্বা করে একটা দম দিয়ে উইলি একের পর এক মাল অর্ডার করতে থাকে।
উইলি যখন দু হাত ভর্তি বাজারের ব্যাগ নিয়ে বাড়িতে ঢোকে, অ্যাটা চিৎকার করে ওঠে, ‘পাগল হয়া গেলা নাকি তুমি ?’ হাত তুলে অভয় দিয়ে উইলি বোঝায়, তাকে একটা পয়সাও ছোঁয়াতে হয়নি, সবই বাকির খাতায় লিখিয়ে এসেছে সে।
‘কিন্তু ট্যাকা তো আমাগেরে শোধ দিতেই অইবো, নাকি ? আইজ হোক, কাইল হোক…’ অ্যাটা চিৎকার থামায় না। ‘আর পানেসাগোর ওখানে তো সবকিছুর দামও বেশি। আমরা তো এর চায়া কম ট্যাকাতেই বাজার করা পারতাম’। এরপর অ্যাটা তার বিবাহিত জীবনের প্রতিটি দিন যে কথাটা বলে এসেছে, তাই আবার শোনায়, ‘আমরা গরিব মানুষ, ট্যাকা কই পামু আমরা ?’
অ্যাটার কথার বাস্তবতা সবই উইলি বোঝে, তবু সে অ্যাটার চোখরাঙানি উপেক্ষা করে রাস্তা পেরিয়ে পানেসাদের দোকানে বাকিতে কেনাকাটা করে চলে। একবার ৪ ডলারের বাজার করে ও, পকেটে ১০ ডলারের একটা দুমড়ানো মোচড়ানো নোট ছিল ঠিকই, কিন্তু তবু সে টাকাটা দেয় না। পানেসার বাকির খাতায় টাকার অংকটা লিখিয়ে বাজার নিয়ে চলে আসে। অ্যাটা জানত উইলির কাছে টাকা আছে, তবু সে দাম না মেটানোয় ফের চেঁচামেচি শুরু করে দেয়, ‘তুমি এইগুলা কী করতেছ ? তোমার কাছে তো ট্যাকা ছিলই, তবু দিলা না ক্যান ?’
উইলি প্রথমে জবাব দেয় না, পরে আমতা আমতা করে বলে, তার অন্য জিনিস কেনার আছে, টাকাটা সে কারণে জমিয়ে রেখেছে। একটু পর উইলি একটি প্যাকেট নিয়ে এসে ভেতর থেকে জরি বসানো একটি কালো জামা বের করে আনে। জামাটা দেখে অ্যাটা কান্না সংবরণ করতে পারে না, একটু সামলে উঠে এরপর ঘোষণা দেয়, এ জামা সে কখনই গায়ে চড়াবে না, কারণ, এই প্রথম উইলি জীবনে তাকে কিছু কিনে দিল, আর সেটিও কী না মানুষের সঙ্গে অন্যায় করে। এরপর থেকে দুজনের মাঝে একটি অলিখিত চুক্তি হয়ে যায়; মুদি দোকানের বাজার সব উইলিই করবে, আর যখন বাকিতে খাওয়া আনবে, তখন অ্যাটা তার সঙ্গে কথা বলবে না।
উইলি পানেসাদের দোকানে নিয়মিত বাজার করে চলল। পানেসারা যেন উইলির জন্যই সবসময় অপেক্ষা করে থাকত। কোনওদিনই উইলির সওদা ২ ডলারের নিচে হতো না, কখনও কখনও ৫ ডলারে গিয়েও ঠেকত। মিস্টার পানেসা এক এক করে উইলির কেনা মালগুলোর নাম বলে তাঁর খাতায় কালো পেন্সিল দিয়ে টুকে রাখতেন, আর মিসেস পানেসা সেগুলো ব্যাগে ভরে উইলির হাতে তুলে দিতেন। উইলি দোকানে পা রাখলেই মিস্টার পানেসা জিভে আঙুল ভিজিয়ে খাতার পাতাটা উল্টে উইলির অংশটায় চলে যেতেন সরাসরি। কেনাকাটা শেষে সব মাল প্যাকেট করা হয়ে গেলে মিস্টার পানেসা পেন্সিলটা হাতের প্রতিটি আঙুলে ছুঁইয়ে হিসহিস আওয়াজে মনে মনে হিসেব করে উইলির আগের বাকির সঙ্গে নতুন বাকির অংক যোগ করে পুরোটা একবারে লিখে নিচে দুবার করে টান দিয়ে রাখতেন। মিসেস পানেসা ও তাঁর ঈগলের মতো তীক্ষè দৃষ্টি দিয়ে পানেসার হিসেব ঠিক আছে কী না পরীক্ষা করে নিতেন। সব হিসেব শেষ করে বাকির খাতাটা সরিয়ে না রাখা অবধি উইলি কাউন্টারের সামনে থেকে নড়ত না, পাইপটা না জ্বালিয়ে মুখে পুরে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকত। খাতা বন্ধ করবার পর উইলি মালগুলোকে দুহাতে জড়িয়ে বেরোবার পথে হাঁটা দিতো; পানেসারা প্রতিবারই তাকে হাতের জিনিসপত্র নিয়ে যাবার জন্য সাহায্য লাগবে কী না জিজ্ঞেস করতেন, সে বরাবরই না করে দিত।
একদিন বাজার সারার পর হিসেব করে যখন দেখা গেল উইলির সব মিলিয়ে ৮৩ ডলারের কিছু বেশি বাকি পড়েছে, মিস্টার পানেসা খাতা থেকে মাথা উঠিয়ে সামান্য হেসে জিজ্ঞেস করলেন উইলি কবে থেকে অল্প অল্প করে কিছু টাকা শোধ করা শুরু করতে পারবে। এর পর দিন থেকে উইলি আর অ্যাটা পানেসাদের দোকানে যাওয়া পুরোপুরি বন্ধ করে দিল। যত দরকারই পড়ুক না কেন, কিছুতেই আর সে পথে তারা পা বাড়ায় না। বাজার সারার পর বাড়ি ফেরার পথে অ্যাটা রীতিমতো দেয়ালের সঙ্গে গা ঘেষটে চলা শুরু করে, রাস্তার অপর পাশে পানেসাদের দোকান থেকে যতখানি সম্ভব দূরে থাকাটাই যেন তার লক্ষ্য।
বেশ কিছুদিন পর উইলিকে অ্যাটা আবার একদিন জিজ্ঞেস করে পানেসাদের সে কিছু টাকা পরিশোধ করেছে কী না। উত্তরে উইলি ‘না’ বলে বরাবরের মতোই।
‘তাইলে কবে দিবা ?’
উইলি জানায় এর উত্তর তার জানা নেই।
এক মাস পেরিয়ে যায়, এর মাঝে একদিন ঘটনাচক্রে রাস্তার মোড়ে মিসেস পানেসার সঙ্গে অ্যাটার দেখা হয়ে যায়। মিসেস পানেসা যদিও পাওনা টাকার কথা উল্লেখ করেন না, কিন্তু অ্যাটা বাড়ি ফিরে ঠিকই উইলিকে আবার টাকার কথা মনে করিয়ে দেয়।
‘ছাড়ো তো, এম্নেই বহুত ঝামিলার মইধ্যে আছি, আর ঘ্যানঘ্যান কইরো না’।
‘আবার নতুন কইরা কী করছ, উইলি ? সত্য কইরা কও তো ?’
‘আরে, এই বেকুব বাড়িওয়ালা আর বেকুব ভাড়াটিয়ার গুল্লি মারি’, চিৎকার করে কথাটা বলে দরজাটা ঠাস করে লাগিয়ে বেরিয়ে গেল উইলি।
মেজাজ কিছুটা ঠান্ডা হলে বাড়ি ফিরে এসে উইলি বলে, ‘আমি ক্যামতে ট্যাকা শোধ দিমু, কও ? আমার কি ট্যাকা আছে ? সারাজীবনই তো টানাটানির উপরে গেল আমার’।
টেবিলের পাশেই বসে ছিল অ্যাটা। উইলির কথা শুনে হাত নামিয়ে মাথা গুঁজে কাঁদতে শুরু করল সে।
‘ট্যাকা আমি ক্যামতে শোধ দিমু কও ? আমার শইল থিকা গোশত সব খুইলা নিলেও কি শোধ দিবার পারুম ? কথা কও না ক্যান অখন ? জবাব দাও ?’―প্রায় গর্জে উঠে উইলি।
‘না তা ক্যান ? আমার চৌক্ষে যে ছাই পড়ে সেইটা দিয়া শোধ দিবা। ভাড়াটিয়া গো যে গু-মুত পরিষ্কার করি সেইটা দিয়া শোধ দিবা। কী, পারবা না ? অখন তুমি চুপ কইরা থাকো ক্যা ?’
উইলির বুকের ভেতর পানেসাদের প্রতি তীব্র একটা ঘৃণাবোধ জন্মে ওঠে, ক্ষোভে তার চোখ জ্বলজ্বল করতে থাকে। মুঠো পাকিয়ে মনে মনে সে প্রতিজ্ঞা করে, এ টাকা সে আর কখনই ফেরত দেবে না, কিছুতেই না। আর পানেসা বুড়োটাকে মিটমিটে সে হাসিটা হাসতে দেখলে মাটিতে এক আছাড় মেরে শালার কোমরটা ভেঙে দেবে ঠিকঠিক।
সে রাতে উইলি বাইরে গিয়ে গলা পর্যন্ত মাল টেনে এক নালায় শুয়ে ভোর অবধি ঘুমালো। যখন নোংরা জামাকাপড় আর টকটকে লাল চোখ নিয়ে বাড়ি ফিরে এল, অ্যাটা তাদের ডিপথেরিয়াতে মারা যাওয়া ৪ বছরের ছেলের ছবিটা বের করে দেখাল। উইলি ফুঁপিয়ে কাঁদলো কিছুক্ষণ, এরপর অ্যাটার কাছে প্রতিজ্ঞা করল, এ জীবনে আর মদ ছুঁয়েও দেখবে না সে।
উইলি প্রতিদিন ভোরে উঠেই ট্রাকে ছাইয়ের বড় বড় ক্যানগুলো বোঝাই করা শুরু করে দেয়। একবারের জন্যও সে মাথা তুলে অপর পাশের রাস্তার দিকে তাকায় না। মনে মনে ভেংচি কেটে নিজেকেই শুধু শোনায়, ‘ব্যাপার না, কোনও ব্যাপারই না, নেন না বাকিতে, পরে দিয়া দিবেন আর কী’ ।
সময় ক্রমশ আরও খারাপ হয়ে ওঠে। খরচ বাঁচাতে বাড়িওয়ালা হিটারের তাপ আর গরম পানির সরবরাহ কমিয়ে দেয়। উইলির বেতনেও ভীষণ টান পড়ে। ঠান্ডায় কষ্ট পেতে থাকা ভাড়াটেরা উইলিকে ডেকে পাঠিয়ে বারবার গালাগাল করে; উইলিও ছেড়ে কথা বলে না, সেও গালির তুবড়ি ছোটায়। ভাড়াটেরা স্বাস্থ্য বিভাগে ফোন দিয়ে অভিযোগ জানায়, কিন্তু কর্মকর্তারা এসে সব দেখেশুনে রায় দেন বাড়ির তাপমাত্রা সরকারের বেঁধে দেয়া সর্বনিম্ন সীমার ভেতরেই রয়েছে, তাই তাঁদের কিছু করার নেই। ভাড়াটেরা ফের উইলির সঙ্গে চেঁচামেচি করে তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করে, উইলি বোঝাবার চেষ্টা করে ঠান্ডায় তার নিজেরও কম কষ্ট হচ্ছে না, কিন্তু কেউ তার কথা বিশ্বাস করে না।
একদিন বাইরে উইলি যখন ট্রাকে ছাইয়ের ক্যানগুলো ভরছে, তখন হঠাৎ তার খেয়াল হলো রাস্তার অপর পাশে দোকানের ভেতর থেকে পানেসারা তার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। ওদের দিকে চোখ ফিরিয়ে দেখতে দেখতে উইলির মনে হতে থাকে তার চোখের দৃষ্টি যেন ঝাপসা হয়ে উঠেছে। একসময় দুটো ঢ্যাঙ্গা পাখির মতো অবয়ব ছাড়া আর কিছুই সে দেখতে পায় না।
মাস গড়িয়ে বসন্ত এল, দেয়ালের ফাটল দিয়ে একটু একটু করে ঘাসের মাথা উঁকি দেয়া শুরু করল। উইলি অ্যাটার কাছে গিয়ে বলল, ‘আমি আসলে একবারে পুরা ট্যাকাটা শোধ দেয়ার লিগা অপেক্ষা করতেছি, ভাইব না অতো’ ।
‘কী কও ? একবারে ক্যামনে দিবা এত ট্যাকা ? কই পাইবা ?’
‘ধরো, ট্যাকা জমাইলাম। জমায়া একবারে শোধ দিলাম’।
‘কই থেইকা জমাইবা ?’
‘ক্যান, আমাগো কত ট্যাকা জমানো আছে এখন ?’
‘নাই, এক ট্যাকাও নাই’।
‘ওহ, আইচ্ছা, ঠিক আছে, সমস্যা নাই। আস্তে আস্তে একটু একটু কইরা দিয়া দিমু। উপরওয়ালার উপরে ভরসা রাখো, হয়া যাইব’।
সমস্যা কিন্তু হলো; টাকা জোগাড় করবার যতগুলো উপায় উইলি ভাবল, কোনওটাই কাজে এল না। গাধার মতো খেটে চলল ও, কিন্তু টানাটানির দিন শেষ হবার কোনও লক্ষণ দেখা গেল না। অবসর মিললেই উইলি ভাবতে বসে যেত কেমন হয় যদি একবারে পুরো টাকাটা নিয়ে পানেসাদের কাছে গিয়ে হাজির হওয়া যায়! গটগট করে সে রাজার মতো বুক ফুলিয়ে হেঁটে যাবে দোকানটায়, পকেট থেকে রাবার ব্যান্ড দিয়ে বাঁধা এক তাড়া নোট তাচ্ছিল্য ভরে বের করে বেঁটে বুড়াটার নাকের সামনে ছুড়ে মারবে, তারপর বলবে, ‘কী মিয়া, ভাবো নাই ট্যাকাটা যে ফেরত পাইবা, না ? লও লও গুইনা দ্যাহো, পুরাটাই আছে, আরে গুনো না। আমার কিন্তু মিয়া হিসাব পুরা পাকা, এক ট্যাকারও এইদিক ঐদিক পাইবা না’। পানেসারা অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকবে তার দিকে কিছুক্ষণ, এরপর হুমড়ি খেয়ে টাকার বান্ডিলটা হাতে নিয়ে দেখবে, অতগুলো টাকার এত বড় বান্ডিল ওরা বোধহয় কখনও দেখেইনি….
এমন দিবাস্বপ্নে উইলি প্রায়ই বিভোর হয়ে চলল, কিন্তু বাস্তবে টাকার কোনও কূল-কিনারাই সে করে উঠতে পারল না।
উইলি পরিশ্রম করা বাড়িয়ে দিল; ভোরবেলা থেকেই সে সাবান আর শক্ত বুরুশ নিয়ে কাজে নেমে পড়ে। ৫ তলা বাড়িটার একদম নিচ তলা থেকে ছাদ অবধি ঘষে মেজে পরিষ্কার করে। এরপর মন দেয় সিঁড়ির রেলিংগুলো সাফ করার কাজে। সেটা হয়ে গেলে এরপর লেটারবক্সগুলো নিয়ে বসে; সাফ সুতরো করে রীতিমতো চেহারা দেখা যাবার মতো চকচকে করে তোলে পুরনো জীর্ণ বক্সগুলোকে। সম্প্রতি গোঁফ রাখা শুরু করেছে সে, আর মাথায় চড়িয়েছে আগের এক ভাড়াটের ফেলে যাওয়া একটা পুরনো টুপি। চকচকে লেটারবক্সে গোঁফ আর টুপি সমেত নিজের নতুন চেহারার প্রতিচ্ছবিটা দেখে একদিন নিজেই ভীষণ চমকে গেল সে। মুখটা যে এখনও তার বেশ ভার হয়ে থাকে সেটা চোখে ঠিকই পড়ল।
অ্যাটাও বসে রইল না; উইলিকে যতভাবে সাহায্য করা যায় তার চেষ্টা করে সে। দুজনে একসঙ্গে গোটা সেলারটা পরিষ্কার করল, রোদে শুকাবার জন্য ভাড়াটেদের এলোমেলো করে ঝোলানো কাপড়গুলো সরিয়ে নোংরা হয়ে থাকা উঠানটারও চেহারা কিছুটা ফেরালো। ভাড়াটেদের ফরমায়েশি নানা কাজ তারা যত দ্রুত সম্ভব করে দেওয়ার চেষ্টা শুরু করল। খাটতে খাটতে এক একটা দিন দুজনেরই নির্জীব হয়ে যাবার দশা হয়, তবু অতিরিক্ত একটা পয়সারও দেখা মেলে না।
একদিন সকালে লেটারবক্সটা পরিষ্কার করতে বসেছে, তখন উইলি নিজের নামে আসা একটা চিঠি দেখতে পেল। অবাক হয়ে খামটা খুলে আলোয় ধরে কাঁপা কাঁপা হাতে লেখা চিঠিটা পড়া শুরু করল। মিসেস পানেসার কাছ থেকে এসেছে চিঠিটা।
মিস্টার পানেসার শরীর ভীষণ খারাপ। ঘরে একটা টাকাও নেই। উইলির পক্ষে কি ১০টা ডলার দেওয়া সম্ভব ? বাকিটা পরে দিলেও চলবে।
উইলি চিঠিটা কুটি কুটি করে ছিঁড়ে ফেলে দিল, এরপর পুরোটা দিন সেলারে লুকিয়ে বসে রইল। অ্যাটা সারাদিন তাকে রাস্তায় রাস্তায় খুঁজে ব্যর্থ হয়ে শেষে রাতে বাড়ি ফিরে গিয়ে ফার্নেসের পেছনে রাজ্যের পাইপের মাঝখানে গুটিশুটি অবস্থায় উইলিকে আবিষ্কার করল। অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল কী হয়েছে তার।
উইলি চিঠির ব্যাপারটা অ্যাটাকে খুলে বলল।
‘অখন লুকায়া থাইকা আর লাভ কী ? যা হওনের তো হইছেই’।
‘আমি কী করুম তাইলে ? একটা বুদ্ধি দাও। মাথায় তো কিছুই ধরতাছে না’।
‘চলো, ঘুমাইবা। এইসব নিয়া ভাইবা অখন আর কোনও লাভ নাই। সারাদিন তো প্যাটে দানাপানিও পড়ে নাই তোমার।’
উইলি ঘুমোতে গেল বটে, কিন্তু ভোরের আলো ফুটবার সঙ্গে সঙ্গেই লাফ দিয়ে উঠে পড়ল।
ওভারঅলটা গায়ে চাপিয়ে কাঁধের ওপর একটা ওভারকোট ঝুলিয়ে তাড়াহুড়া করে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। রাস্তার মোড়ে একটা বন্ধকী দোকান পেয়ে গেল সে, সেখানেই ওভারকোটটা জমা রেখে ১০ ডলার হাতে নিয়ে ভীষণ খুশি মনে বাড়ির দিকে হাঁটা দিল।
কিন্তু বাড়ির সামনে আসতেই দেখল উল্টো পাশের রাস্তায় একটা লাশবাহী গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে, আর কালো কাপড় পরা দুটো লোক বাড়ির ভেতর থেকে একটা ছোট কফিন কাঁধে বয়ে নিয়ে বেরিয়ে আসছে।
‘কে মারা গেছে ? এই বাড়ির ঐ পিচ্চি পোলাডা নাকি ?’ উইলি পাশের এক লোককে জিজ্ঞেস করল।
‘না, পানেসা বইলা একজন মারা গেছে শুনলাম’।
উইলি কোনও কথা বলতে পারল না, গলার কাছটা কাঠের মতো শুষ্ক আর ভীষণ শক্ত ঠেকল ওর কাছে।
সরু চত্বরটা পেরিয়ে লোকদুটো যখন লাশবাহী বাক্সটা নিয়ে বেরিয়ে গেল, মিসেস পানেসা টলমলে পায়ে উঠে দাঁড়ালেন। উইলি সঙ্গে সঙ্গে মুখ ফিরিয়ে নিল; মনে মনে আশা করতে লাগল গোঁফ আর টুপিতে ঢাকা চেহারা চিনতে পারবেন না পানেসার সদ্য বিধবা।
‘ক্যামেø মারা গেছেন উনি ? কিছু শুনছেন না কি ?’ ফিসফিস করে পাশের লোকটাকে জিজ্ঞেস করল উইলি।
‘জানি না আসলে। মারা গেছে শুইনা মাত্রই আসলাম’।
মিসেস পানেসার কানে কিন্তু ঠিকই গেল কথাটা।
‘বয়স হয়া গেছিল। বয়সেই মইরা গেছে’, উত্তর এল।
সান্ত্বনা দিয়ে মিষ্টি কিছু একটা বলার চেষ্টা করল উইলি, কিন্তু ওর জিভটা যেন একটা পচা ফলের মতো মুখের ভেতরে লটকে রইল, আর বুকের ভেতরটা কেমন কুচকুচে কালো হয়ে উঠল।
মিসেস পানেসা তাঁর পাথরের মতো মুখ করে রাখা মেয়েদের যান্ত্রিক সংসারে গিয়েই ওঠেন; প্রথমে বড় মেয়েটির কাছে কিছুদিন, এরপর ছোটটির কাছে চলে যান। পাওনা টাকাটা উইলির আর শোধ করা হয় না।
সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ



