অনুবাদ গল্পআর্কাইভবিশ্বসাহিত্য

বিশ্বসাহিত্য : অনুবাদ গল্প : মাধুরী : মূল : টনি মরিসন

বাংলা অনুবাদ : নাহার তৃণা

[টনি মরিসন বিশ্বের প্রথম সারির বিখ্যাত লেখকদের একজন। নাটক এবং শিশুদের বই লেখার পাশাপাশি, তাঁর উপন্যাসগুলি পুলিৎজার পুরস্কার এবং আমেরিকান রাষ্ট্রীয় পুরস্কার ‘প্রেসিডেন্সিয়াল মেডেল অফ ফ্রিডম’ (২০১২)সহ বহু সম্মানজনক পুরস্কার অর্জন করেছে। সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার জয়ী প্রথম আফ্রিকান-আমেরিকান নারী হিসেবে, মরিসনের কাজ লেখকদের একটি প্রজন্মকে তাঁর পদাঙ্ক অনুসরণ করতে অনুপ্রাণিত করেছে।

টনি মরিসন ১৮ ফেব্রুয়ারি, ১৯৩১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ওহিওর লোরেইন শহরে জন্মগ্রহণ করেন। চার ভাইবোনের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। তাঁর পুরো নাম ক্লোয়ি অ্যান্থনি ওফফর্ড (Chloe Anthony Wofford)। তিনি এমন একটি মিশ্র জনবসতিপূর্ণ পরিবেশে বেড়ে ওঠেন যেখানে বর্ণবৈষম্য নিরন্তর যাতনা হিসেবে চলমান ছিল।

মরিসনের বয়স যখন দুই বছর, তখন যে অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিংয়ের তাঁরা থাকতেন সেটার মালিক তাদের ভেতরে থাকা অবস্থায় অ্যাপার্টমেন্টে আগুন ধরিয়ে দেন। কারণ তাঁর পরিবার ভাড়া দিতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। সম্ভবত এই অমানবিক অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে তিনি নিজের পায়ের তলার মাটি শক্ত করার ব্যাপারে অধিকমাত্রায় সচেতন হয়ে ওঠেন। পড়াশোনায় মনপ্রাণ ঢেলে দেন। একজন একনিষ্ঠ এবং উৎসুক পাঠক হিসেবে তিনি স্কুলের বিতর্কের দল, স্কুল ইয়ারবুক এবং লোরেইন পাবলিক লাইব্রেরির প্রধান গ্রন্থাগারিকের সচিব হিসেবে নিজের মেধা-বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারে যত্নবান হন। বারো বছর বয়সে তিনি ক্যাথলিক ধর্মে দীক্ষিত হন এবং পাডুয়ার (Padua) সেন্ট অ্যান্থনির নামানুসারে তাঁর ব্যাপ্টিজম প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। তিনি সেন্ট অ্যান্থনির নামানুসারে রাখা ‘টনি’ ডাকনামে পরিচিত হন।

ব্ল্যাক ইনস্টিটিউট কলেজ পাশের পর তিনি ওয়াশিংটনে চলে যান হাওয়ার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার জন্য। হাওয়ার্ড থেকে ১৯৫৩ সালে ইংরেজি সাহিত্যে ব্যাচেলর ডিগ্রি লাভ করার পর তিনি কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমেরিকান সাহিত্য বিষয়ে ১৯৫৫ সালে মার্স্টার্স ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর তিনি টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে কিছুদিন কর্মরত থাকার পর হাওয়ার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নের সময় হ্যারল্ড মরিসনের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ঘটে, তারপর সেটা প্রেম থেকে পরিণয়ে গড়ায়। পরে অবশ্য তাঁদের বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে (১৯৬৪)।

জীবনের বিভিন্ন ধাপে তিনি বর্ণবৈষম্যের নানা অভিজ্ঞতা অর্জন করেন, ব্যক্তিগতভাবে তিনি নিজেও বর্ণবৈষম্যের নিদারুণ শিকার হয়েছিলেন। কোণঠাসা জনগোষ্ঠীর একজন হয়েও তিনি নিজের প্রতিভা-বুদ্ধিমত্তার জোরে সংখ্যাগুরুর কাঁটা বিছানা পথ পাড়ি দিয়েছেন বিজয়ী হওয়ার একাগ্রতায়। শেষ পর্যন্ত তিনি তাঁর কাক্সিক্ষত গন্তব্যে ঠিকঠিক পৌঁছেও গেছেন। একাধারে একজন প্রাজ্ঞ শিক্ষাবিদ, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, তুখোড় বাগ্মী হিসেবে নিজের যে মজবুত আসন তিনি তৈরি করেছিলেন আমৃত্যু সেখানেই সম্মানের সঙ্গে আসীন থেকেছেন।

তিনি সর্বমোট ১১টি উপন্যাস, বহু প্রবন্ধ, ছেলে স্লেড মরিসনের সঙ্গে ৮টির শিশুতোষ বই, এবং হাতেগোনা কয়েকটি গল্প রচনা করেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য উপন্যাসগুলো হচ্ছে বিলাভেড, সং অব সলোমন, সুলা, দ্য ব্লুয়েস্ট আই, গড হেল্প দ্য চাইল্ড ইত্যাদি।

১৯৯৩ সালে টনি মরিসন সাহিত্যের সর্বোচ্চ স্বীকৃতি নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। ২০২০’এ টনি মরিসনকে ‘ন্যাশনাল উইমেন হল অফ ফেম’ সম্মানে অভিষিক্ত করা হয়।

২০১৯-এর ৫ আগস্ট, ৮৮ বছর বয়সে টনি মরিসন মৃত্যুবরণ করেন।

এই গল্পটি ‘সুইটনেস’ শিরোনামে নিউ ইয়র্কারের মুদ্রণ সংস্করণের ৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। এটি টনি মরিসনের উপন্যাস গড হেল্প দ্য চাইল্ড উপন্যাসের সংক্ষিপ্ত অংশ। এ পর্যন্ত টনি মরিসনের যে দুটি গল্প প্রকাশিত হয়েছে এটি তার একটি।]

এ আমার দোষ নয়, আপনারা তাই আমায় দোষারোপ করতে পারেন না। আমি এটা করিনি, এবং কীভাবে এমনটা হলো সে-সম্পর্কেও আমার কোনও ধারণা নেই। আমার দু পায়ের মাঝখান থেকে তারা যখন ওকে টেনে বের করল, আমার বুঝতে এক ঘণ্টাও লাগেনি কিছু একটা গড়বড় হয়েছে। ভালো রকমের গড়বড়। সে এত কালো যা আমাকে ভড়কে দিল। নিকষ রাতের মতো কালো, সুদানিদের মতো কৃষ্ণকায়।

আমার গায়ের রং ফর্সার দিকে, মাথার চুলও চমৎকার, এমন গাত্রবর্ণকে আমরা উজ্জ্বল হলুদ বলে থাকি, আর লুলা অ্যানের বাবার রংও তেমন। ওর রঙের ধারেকাছে আমার পরিবারে কোথাও কেউ নেই। তার ওরকম গায়ের রঙের কাছাকাছি তুলনা হিসেবে আলকাতরাকে ভাবতে পারি, তবে ওর চুলের রং গায়ের চামড়ার সঙ্গে মানানসই নয়। একটু অন্য রকম―সোজা আবার কোঁকড়া, অস্ট্রেলিয়ার সেই নগ্ন উপজাতিদের চুলের মতো। আপনাদের মনে হতে পারে ওর মাধ্যমে আমাদের পূর্বপুরুষের ধারা ফিরে এসেছে। কিন্তু কোন পূর্বপুরুষ ? আমার নানিকে আপনাদের দেখা দরকার ছিল; তাকে দিব্যি শ্বেতাঙ্গ হিসেবে চালিয়ে দেওয়া যেত; বিয়েও করেছিলেন এক শ্বেতাঙ্গকে, যিনি তাঁর সন্তানদের সম্পর্কে কখনও কারও কাছে মুখ খোলেননি। আমার মা কিংবা খালার কাছ থেকে কোনও চিঠি পেলে না খুলে তৎক্ষণাৎ সেটা ফেরত পাঠাতেন। শেষমেষ তাঁর কোনও খবর না পেয়ে তারা (সন্তানেরা) হাল ছেড়ে দেন এবং তাঁকে তাঁর মতো থাকতে দেন। তাঁর কাছ থেকে আর কোনও খবর না পাওয়াটাই স্বাভাবিক বলে ধরে নিল সবাই। তখনকার সময়ে প্রায় সব মিশ্রবর্ণ এবং বর্ণসংকর জাতির লোকেরা এমন আচরণ করতেন। যদি তাদের চুলের রং বিশেষ ধরনের হতো―তবে তো কথাই ছিল না। আপনি কল্পনা করতে পারেন কতজন শ্বেতাঙ্গের শিরায় কৃষ্ণাঙ্গের রক্ত গোপনে বয়ে চলেছে ? অনুমান করুন। আমি শুনেছি বিশ শতাংশই অমন, আমার মা লুলা মে নিজেকে শ্বেতাঙ্গ বলে দিব্যি চালিয়ে দিতে পারতেন, কিন্তু তিনি সে পথ বেছে নেননি। মা আমাকে বলেছিলেন, তাঁর সেই সিদ্ধান্তের জন্য তাঁকে মাশুলও দিতে হয়েছিল। মা এবং বাবা যখন বিয়ে করতে কোর্টে গিয়েছিলেন, সেখানে দুটো বাইবেল রাখা ছিল, কালোদের জন্য সংরক্ষিত বাইবেলে তাঁদের হাত রাখতে হয়েছিল। অন্য বাইবেলটি ছিল শ্বেতাঙ্গদের জন্য। বাইবেলের মধ্যেও এমন বিভেদ! ভাবা যায়!

আমার মা বড়লোক এক শ্বেতাঙ্গ দম্পতির বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ করতেন। তারা প্রত্যেক বেলা তাঁর হাতের রান্না খেতেন, এমনকি গোসলের সময় বাথটবে বসে থেকে মাকে দিয়ে তাদের পিঠ ঘষিয়ে নিতেন। সৃষ্টিকর্তাই জানেন তাঁকে দিয়ে আর কী কী একান্ত ব্যক্তিগত কাজ তারা করাতেন, কিন্তু বাইবেলের বেলায় যত ছ্ৎুমার্গ―তাদের বাইবেল ছোঁয়া যাবে না।

আপনাদের মধ্যে কেউ কেউ হয়ত ভাবতে পারেন গায়ের রং দিয়ে আমাদের মধ্যে বিভেদ তৈরি করা গর্হিত কাজ―গায়ের রং যত ফর্সা তত ভালো―সামাজিক আসর, পাড়াপড়শি, গির্জা, মহিলা সমিতি, এমনকি কৃষ্ণাঙ্গদের বিদ্যালয়গুলোতে পর্যন্ত একই কাণ্ড। কিন্তু আর কী উপায়েই বা আমরা নিজেদের সম্মান ধরে রাখতে পারতাম ? ওষুধের দোকানে গেলে লোকের থুথুর হাত থেকে নিজেকে বাঁচানো, বাসস্টপে কনুইয়ের গুঁতো খাওয়া এড়ানো, শ্বেতাঙ্গদের পুরো ফুটপাথ ছেড়ে দিয়ে খানাখন্দের উপর হাঁটা, মুদি দোকানে শ্বেতাঙ্গদের বিনে পয়সায় কাগজের ঠোঙ্গা দেওয়া হলেও আমাদের পয়সা দিতে হতো, এসব থেকে নিজেদের রক্ষার অন্য কোনও উপায় কী  ছিল আমাদের সামনে ?

আমাদের উদ্দেশ্যে ব্যাঙ্গ-বিদ্রƒপ আর গালিগালাজের কথা বাদই দিলাম। সেসব কেচ্ছাকাহিনি ছাড়াও আরও অনেক, অনেক কিছুর আমি সাক্ষী। তবে গায়ের রঙের কারণে আমার মাকে শ্বেতাঙ্গদের বিপণীগুলোতে অবাধে ঢুকে টুপি পছন্দের সময় মাথায় দিয়ে দেখার সুযোগ পেতে কিংবা মহিলাদের জন্য নির্ধারিত জায়গা ব্যবহারে কোনও বাধার মুখে পড়তে হয়নি। আর বাবাও জুতো পছন্দের সময় সেটা দোকানের সামনের অংশেই পরে দেখার সুযোগ পেতেন, পেছনের নির্ধারিত ঘরে যেতে হতো না। তেষ্টায় মরার দশা হলেও দুজনের কেউই ‘শুধু কৃষ্ণাঙ্গদের জন্য’ বরাদ্দ ফোয়ারা থেকে কখনও পানি পান করতেন না।

শুনতে খারাপ লাগলেও আমি বলতে বাধ্য হচ্ছি, প্রথম থেকেই প্রসূতি বিভাগের ভেতর শিশু লুলা অ্যান আমাকে অপ্রস্তুত অবস্থায় ফেলেছিল। জন্মানোর সময় তার শরীরের ত্বক অন্য শিশুদের যেমন ফ্যাকাশে থাকে তেমনই ছিল, এমনকি আফ্রিকান শিশুদেরও তাই থাকে, কিন্তু এরটা দ্রুত বদলে গিয়েছিল। তার গায়ের রং পালটে যখন নীল হলো, পরক্ষণেই সেটা কালো হলো, চোখের সামনে ব্যাপারটা ঘটতে দেখে ভেবেছিলাম আমি বুঝি পাগল হয়ে যাচ্ছি। জানি কয়েক মুহূর্তের জন্য আমি উন্মত্তদশায় পৌঁছেও ছিলাম, কারণ কয়েক সেকেন্ডের জন্য―আমি তার মুখের ওপর একটা কম্বল চেপে ধরেছিলাম।

 আমি যতই কামনা করি না কেন ওরকম বিদঘুটে রং নিয়ে বাচ্চাটার জন্মানো উচিত হয়নি, কিন্তু ভয়াবহ কাজটা করে ওঠা আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি। এমনও মনে হয়েছিল তাকে কোথাও কোনও অনাথ আশ্রমে পাঠিয়ে দিই। কিন্তু আমি সেইসব মায়েদের একজন হতে ভয় পেয়েছিলাম যারা তাদের সন্তানকে গির্জার সিঁড়িতে ফেলে পালিয়ে যায়। সম্প্রতি, জার্মানির এক দম্পতির কথা শুনেছি, যাদের গায়ের রং বরফ সাদা, তাদের গায়ের রং কালো এমন বাচ্চা হয়েছে, কেউ তার ব্যাখ্যা দিতে পারেনি। যমজ বাচ্চার কথাই শুনেছিলাম আমার ধারণা―একটা সাদা, অন্যটা কালো চামড়ার। তবে খবরটা সত্যি কিনা আমার জানা নেই। ওকে দুধ খাওয়ানোর সময় মনে হতো, কোথাকার এক কালচে প্রাণি আমার স্তন চুষছে। বাড়ি ফেরার পর যত দ্রুত সম্ভব তাকে বোতলে দুধ খাওয়ানো শুরু করেছিলাম।

আমার স্বামী, লুইস, রেলের একজন কুলি, কাজ থেকে ফিরে সে আমার দিকে এমনভাবে তাকালো মনে হলো আমি সত্যিই পাগল হয়ে গেছি আর বাচ্চাকে এমন ভাবে দেখল যেন সে বৃহস্পতি গ্রহ থেকে আগত কেউ। লুইস মোটেও গালিগালাজ করার মতো লোক নয়, তাই সে যখন বলল, ‘ঈশ্বর, এ কি অভিশাপ! কী এটা ?’ তখনই বুঝেছিলাম অশান্তিতে পড়তে যাচ্ছি। অশান্তি তৈরির কারণও ছিল এটা―আমার আর তার (লুইস) মধ্যে ঝগড়াঝাটি চলতে থাকল। যার ফলে আমাদের বিবাহ বিচ্ছেদ পর্যন্ত ঘটল। আমরা একসঙ্গে তিনটি সুখময় বছর কাটিয়েছি, কিন্তু কালো বাচ্চা জন্মের সবটা দায় লুইস আমার উপর চাপানো শুরু করল এবং লুলা অ্যানের সঙ্গেও এমন আচরণ শুরু করল যেন সে উটকো একজন আগন্তুক―তার চেয়ে বড় কথা, তাকে একজন শত্রু হিসেবে দেখতে লাগল। বাচ্চাটাকে সে কখনও ছুঁয়ে পর্যন্ত দেখেনি।

অন্য কোনও পুরুষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ মেলামেশা করে তাকে বোকা বানাইনি, এ কথা আমি তাকে বোঝাতেই পারিনি। তার বদ্ধমূল ধারণা ছিল আমি মিথ্যা বলছি। আমাদের ঝগড়াঝাটি ক্রমশ বাড়তে বাড়তে চরমে উঠল। যেদিন আমি তাকে বললাম এই রং এসেছে তার পরিবারের দিক থেকে, সেদিনই ব্যাপারটা চূড়ান্ত পরিণতির দিকে গড়ালো। সে চুপচাপ উঠে বাড়ি ছেড়ে চলে গেল। তারপর বাধ্য হয়ে আমাকে থাকার জন্য অন্য কোনও সস্তার জায়গা খুঁজতে হয়েছিল।

সস্তার আস্তানার সন্ধানে আমি আমার সাধ্যমতো চেষ্টা করেছি। আমি ভালো মতোই জানতাম বাসাভাড়া পাওয়ার জন্য আবেদন করতে হলে মেয়েকে সঙ্গে নেওয়া চলবে না, তাই তাকে আমার এক কিশোরী আত্মীয়ার কাছে রেখে বাড়ি খুঁজতে বের হতাম। আমি অবশ্য তাকে নিয়ে খুব একটা বাইরে বেরও হতাম না, কারণ যখন স্ট্রলারে বাচ্চাটাকে নিয়ে ঠেলতে ঠেলতে হাঁটতাম তখন অনেকেই নিচু হয়ে ঝুঁকে তাকে দেখে সুন্দর কিছু বলার প্রস্তুতি নিয়েও কেমন ভ্যাবাচাকা খেয়ে বা ভ্রƒকুটি করে লাফ দিয়ে পিছু হটে যেতেন। বিষয়টা খুব পীড়াদায়ক ছিল। যদি আমাদের গায়ের রঙের অদল-বদল ঘটত তাহলে আমি দিব্যি বাচ্চাটার পরিচর্যাকারী হিসেবে মানিয়ে যেতাম।

শহরের ভদ্রস্থ এলাকায় বাসা ভাড়া পাওয়া একজন কৃষ্ণাঙ্গ নারীর পক্ষে―এমনকি উজ্জ্বল হলুদ গাত্রবর্ণের অধিকারীর জন্যেও বেশ কঠিন ছিল। নব্বইয়ের দশকে, যখন লুলা অ্যান জন্ম নিয়েছিল, তখন ভাড়াটেদের সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণের বিপক্ষে একটি আইন পাস হয়েছিল, কিন্তু খুব বেশি বাড়িওয়ালা আইনটির তোয়াক্কা করেননি। তারা আপনাকে বাড়ি ভাড়া না দেবার জন্য নানা ছুতো তৈরি করতেন। তবে আমার সৌভাগ্য বলতে হবে মিস্টার লেইয়ের বাড়িটি ভাড়া পেয়েছিলাম, যদিও জানি তিনি যে বিজ্ঞাপন দিয়েছিলেন তার চেয়ে সাত ডলার বেশি ভাড়া নিয়েছেন, আর টাকাটা দিতে এক মিনিট দেরি হলেই তিনি ভাড়া না দেবার অজুহাত পেয়ে যেতেন।

লুলা অ্যানকে বলেছিলাম আমাকে ‘মা’ বা ‘মাম্মি’ না ডেকে ‘মাধুরী’ ডাকতে। আমাদের জন্য সম্বোধনটা স্বস্তির ছিল। ওরকম গায়ের রং আর মোটা ঠোঁটের একজন আমাকে ‘মামা’ বলে ডাকলে লোকজন বিভ্রান্ত হতো। তাছাড়া, বলিহারি বিচিত্র ছিল ওর চোখের রং, কাক কালো তার সঙ্গে নীলচে ছোপ, ডাইনিসুলভ যেন।

এরকম পরিস্থিতিতে একটা দীর্ঘ সময়ের জন্য আমরা কেবল দুজন দুজনের সাহচর্যে কাটিয়েছি। একজনের পরিত্যক্ত স্ত্রী হিসেবে এমন দিন কাটানো যে কী ভয়ানক কষ্টকর সে কথা আপনাদের বুঝিয়ে বলতে পারব না। আমার মনে হয় আমাদের ওভাবে ফেলে চলে যাওয়ার পর লুইস খানিক অনুতপ্ত হয়েছিল, কারণ কয়েক মাস পর সে নিজেই আমাদের বর্তমান ঠিকানা খুঁজে বের করে এবং তারপর থেকে মাসে একবার টাকা পাঠাতে থাকে, যদিও আমি কখনও তাকে টাকার কথা বলিনি বা সেটা আদায়ের জন্য আদালতের শরণাপন্নও হইনি। তার পাঠানো পঞ্চাশ ডলার আর আমার হাসপাতালের রাতের চাকরির বেতনের কারণে আমরা সরকারি অনুদানের ওপর নির্ভরশীল হওয়া থেকে রক্ষা পেয়েছিলাম। আমার মনে হয় এটাকে অনুদান বলাটা ওরা বন্ধ করবে এবং আমার মায়ের বালিকা বেলায় যে শব্দটি ব্যবহার করা হতো সেটিতে ফিরে যাবে। তখন এটাকে ‘ত্রাণ’ বলা হতো। শব্দটা অনেক ভালো শোনায়, এটা যেন অনেকটা নিজেকে গুছিয়ে নেওয়ার আগে স্বল্পমেয়াদি শ্বাসের মতো। তাছাড়া অনুদানের কেরানিগুলোর ব্যবহার থুতুর মতন। অবশেষে যখন আমি কাজ পেয়েছিলাম তখন আর ওদের সাহায্যের প্রয়োজন ছিল না, চাকরি থেকে আমি ভালোই উপার্জন করছিলাম যা কেরানিগুলোর পক্ষে কখনও সম্ভব হতো না।

আমার ধারণা যৎসামান্য বেতন কেরানিগুলোর মন-মানসিকতাকে হীনতায় পূর্ণ করে তুলেছিল, যার ফলে ওরা আমাদের সঙ্গে ফকিরের মতো আচরণ করত। বিশেষত লুলা অ্যানের দিকে তাকানোর পরপরই ওরা যখন আমার দিকে তাকাত―ওদের ভঙ্গি দেখে তখন মনে হতো আমি বুঝি তাদের সঙ্গে প্রতারণা কিংবা সেরকম কিছু করার চেষ্টা করেছি। কাজ পাওয়ার পর থেকে আমাদের অবস্থার ক্রমশ উন্নতি ঘটে, কিন্তু তারপরও আমাকে যথেষ্ট সতর্ক থাকতে হয়েছিল। লুলা অ্যানকে বড় করে তোলার পেছনে আমি যথেষ্ট যত্নবান ছিলাম। তার জন্য কঠোর হতে আমার বাধেনি, ভীষণ মাত্রায় কঠোর। কীভাবে যথাযথ শিষ্টাচার আয়ত্ত করতে হবে লুলা অ্যানের সেসব শেখার প্রয়োজন ছিল, কীভাবে মাথা নত রাখতে হবে এবং কোনও রকম ঝামেলা না পাকিয়ে থাকতে হবে। কতবার সে তার নাম বদল করল তা নিয়ে আমার কোনও মাথাব্যথা ছিল না। তার এই গাত্রবর্ণ (যিশুর) ক্রুশের মতো সারা জীবন বহন করে যেতে হবে। কিন্তু এ আমার দোষ নয়। আমার দোষে এমনটা হয়নি। কখনওই না।

ওহ, হ্যাঁ, এটা ঠিক, লুলা অ্যান যখন ছোট ছিল তখন তার সঙ্গে আমি কেমন আচরণ করেছি সেটা ভেবে মাঝেমধ্যে আমার কষ্ট হয়। কিন্তু আপনাকে মানতে হবে; তাকে তখন রক্ষা করাই ছিল আমার দায়িত্ব। জগৎ-সংসার বিষয়ে তার বিন্দুমাত্র ধারণা ছিল না। ওই গায়ের রং নিয়ে অতিরিক্ত মার্জিত হওয়া কিংবা আপসহীন, এমনকি সঠিক হলেও, সেভাবে গোয়ার্তুমি দেখানোর কোনও মানে নেই। এরকম পৃথিবীতে তো নয়ই, যেখানে আপনি অন্যায় নিয়ে মুখ খুললে কিংবা বিদ্যালয়ে ঝগড়া বিবাদে জড়ানোর অপরাধে অপ্রাপ্ত বয়স্কদের গারদে আপনাকে চালান করা হতে পারে, এমন এক জগৎ যেখানে চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে আপনার অবস্থান হবে সবার শেষে কিন্তু ছাঁটাইয়ের বেলায় আপনি থাকবেন সবার আগে। এসবের কিছুই সে জানত না, এটাও জানা ছিল না ওর কালো চামড়া শ্বেতাঙ্গদের কতটা ভয় পাইয়ে দেবে বা হাসিঠাট্টার খোরাক করবে কিংবা তাকে ঠকানোর চেষ্টা চলবে। একবার লুলা অ্যানের কাছাকাছি কালো গায়ের রং এমন এক মেয়েকে দেখেছিলাম যার বয়স দশ বছরের বেশি কিনা সন্দেহ, একদল শ্বেতাঙ্গ ছেলে তাকে ল্যাং মেরে ফেলে দিচ্ছিল, যখনই বেচারি হামাগুড়ি দিয়ে উঠে দাঁড়াতে চেষ্টা করছিল তখনই অন্য আরেকজন পেছন থেকে ল্যাং মেরে তাকে আবার মাটিতে শুইয়ে দিচ্ছিল। বাচ্চা মেয়েটার হাল দেখে ছেলেগুলো পেট চেপে ধরে হাসছিল। অনেকক্ষণ পর হাঁচড়ে-পাঁচড়ে উঠে মেয়েটা ওখান থেকে চলে গেল, ছেলেগুলো তখনও হেসেই যাচ্ছিল, নিজেদের কৃতকর্মের গর্বে তারা অস্থির। বাসের জানলা দিয়ে না দেখে আমি যদি তখন রাস্তায় থাকতাম মেয়েটাকে সাহায্য করতাম, তাকে ওই সাদা আবর্জনার দঙ্গল থেকে টেনে সরিয়ে আনতাম। দেখুন, আমি যদি লুলা অ্যানকে ঠিকভাবে প্রশিক্ষণ না দিতাম তাহলে সে সবসময় সতর্ক হয়ে রাস্তা পেরোতে এবং শ্বেতাঙ্গ ছেলেদের এড়িয়ে চলতে শিখত না। তাকে যা শিখিয়েছিলাম তা সার্থক হয়েছে, এবং শেষ পর্যন্ত সে আমাকে ময়ূরের মতো পেখম মেলে ধরার গর্বে গর্বিত করেছে।

আমি মোটেও খারাপ মা ছিলাম না, আপনাদের বুঝতে হবে, তবে আমার একমাত্র আত্মজাকে রক্ষা করার জন্যই অনেক সময় ওর সঙ্গে আমাকে বেদনাদায়ক ব্যবহার করতে হয়েছিল। তার দরকারও ছিল। দরকার ছিল শুধু চামড়ার বিশেষাধিকারের জন্য। প্রথম দিকে আমি ওর গাত্রবর্ণের বিষয়টা উপেক্ষা করে ওর আসল পরিচয়ে ওকে খোলা মনে ভালোবাসতে পারিনি। তবে এখন সেটা পারি, সপাটেই পারি। আমার ধারণা সেও হয়ত এখন সেটা বুঝতে পারে। সেরকমই মনে হয় আমার।

গত যে দুবার তার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে, তাকে বেশ চমৎকার এবং আকর্ষণীয়া দেখাচ্ছিল। বেশ সপ্রতিভ আর আত্মবিশ্বাসী ধরনের। প্রতিবার সে যখন আমাকে দেখতে এসেছে, আমি মনে করতে পারিনি আগে সে আসলে কতটা কালো ছিল কারণ সাদা পোশাকের মোড়কে নিজের সৌন্দর্যকে সে ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিল।

মেয়েটা আমাকে একটা পাঠ শিখিয়েছে যা আমার আগেই জানা উচিত ছিল। বাচ্চাদের সঙ্গে আপনি কী আচরণ করেন সেটা গুরুত্বপূর্ণ। আর সেটা তারা কখনও ভোলে না। লুলা অ্যান বড় হওয়া মাত্রই আমাকে সেই অসহ্য অ্যাপার্টমেন্টে একা রেখে চলে যায়। আমার কাছ থেকে যতটা দূরে যাওয়া সম্ভব ও চলে গেল :

 নিজেকে যতটা সম্ভব গুছিয়ে নিয়ে ক্যালিফোর্নিয়াতে বড় চাকরিতে ঢুকে গেল। সে আর আমাকে ফোন করে না বা দেখতেও আসে না। প্রায় প্রায় সে আমাকে টাকাপয়সা আর এটাসেটা পাঠায়, কিন্তু মেয়েটাকে কত দীর্ঘ সময় চোখের দেখাটাও দেখি না―কতদিন ঠিক জানিও না।

এই জায়গাটি আমার পছন্দ―উইনস্টন হাউজ―শহরের বাইরের সেই বড় বড় বিলাসবহুল নার্সিং হোমের তুলনায় এটি বেশ ছোট। ঘরোয়া, খরচ কম, চব্বিশ ঘণ্টা নার্সদের সেবাযত্ন আর সপ্তাহে দুবার হাজিরা দেওয়া বড় ডাক্তারের তত্ত্বাবধানে ভালোই আছি। আমার বয়স মাত্র তেষট্টি―শয্যাশায়ী হওয়ার জন্য খুব কম―কিন্তু হাড়ের কিছু ক্ষয়জনিত রোগে জেরবার হয়ে এসেছি, নিবিড় সেবাযত্ন জরুরি। শারীরিক দুর্বলতা বা ব্যথার তুলনায় একঘেয়েমি অনেক জঘন্য জিনিস, তবে এখানকার নার্সদের ব্যবহার খুব ভালো। তাদের একজনকে যখন বললাম আমি নানি হতে চলেছি, সে আনন্দে আমার গালে চুমু দিয়ে বসল। তার হাসি এবং অভিনন্দন বাক্য এমন ছিল বুঝি কাউকে মুকুট পরিয়ে সম্মান জানানো হচ্ছে। আমি তাকে নীল কাগজের চিরকুটটা দেখালাম, যেটা লুলা অ্যানের কাছ থেকে পেয়েছি―ভালো কথা, কাগজটার নিচে লুলা অ্যানের স্বাক্ষর―‘কনে’, কিন্তু আগে মোটেই ওটা মনোযোগ দিয়ে দেখিনি। চিরকুটে লিখিত শব্দগুলো কেমন নেশাচ্ছন্নের মতো মনে হলো আমার। ‘জানো এস, তোমাকে এই খবরটা জানাতে আমার কতটা ভালো লাগছে। শীঘ্রই আমার বাচ্চা হবে। এটা নিয়ে আমি ভীষণ, ভীষণ রোমাঞ্চিত এবং আশা করি খবরটা শুনে তুমিও তাই হবে।’ ভেবে দেখলাম আমার সবটুকু রোমাঞ্চ শিশুটিকে ঘিরে, তার বাবাকে নিয়ে নয়, কারণ লুলা অ্যান তার কথা কিছুই উল্লেখ করেনি। আমি ভাবতে চেষ্টা করি সেও লুলা অ্যানের মতো কালো কি না। যদি তাই হয়, তবে তাকে আমার মতো দুশ্চিন্তায় পড়তে হবে না। যখন তরুণী ছিলাম তার তুলনায় সময় খানিকটা হলেও বদলেছে। নীলচে-কালো মানুষদের এখন টেলিভিশনে, ফ্যাশন ম্যাগাজিনগুলোতে, বিজ্ঞাপনে আকছার দেখতে পাওয়া যায়―এমনকি তারা চলচ্চিত্রেও অভিনয় করছে।

খামের উপর ফিরতি কোনও ঠিকানা দেওয়া নেই। কাজেই অনুমান করছি আমি এখনও তার কাছে খারাপ মা হিসেবেই রয়ে গেছি এবং মৃত্যুর আগমুহূর্ত পর্যন্ত সে কারণে আমাকে শাস্তি ভোগ করতে হবে, অথচ সবটাই ওর ভালোর জন্যই করেছিলাম, এবং, প্রকৃতপক্ষে ওকে বড় করে তোলার জন্য সেসব আচরণবিধির প্রয়োজনও ছিল। আমি জানি সে আমার প্রতি বীতশ্রদ্ধ। আমাদের সম্পর্কের অবনতি হতে হতে এখন শুধু টাকাপয়সার লেনদেনে এসে দাঁড়িয়েছে। স্বীকার করছি ওর পাঠানো টাকার জন্য আমি কৃতজ্ঞ, কারণ অন্য রোগীদের মতো অতিরিক্ত খরচের জন্য আমাকে হাত পাততে হয় না। নির্জনে একা বসে খেলার জন্য যদি পরিছন্ন ঝকঝকে তাস চাই, আমি সেটা পেতে পারি, লাউঞ্জের নোংরা, বারোয়ারি তাস দিয়ে আমাকে খেলতে হবে না। চাইলে মুখে দেবার বিশেষ ফেসক্রিমও আমি কিনতে পারি। তবে অতটা বেকুব আমি নই। কেননা আমি জানি সে যে টাকা পাঠায় সেটা আমার কাছ থেকে দূরে থাকার এবং তার নিজের যেটুকু বিবেক অবশিষ্ট আছে তাকে কিছুটা শান্ত রাখার ছুতা। তার ভেতর যে এখনও সামান্য হলেও বিবেক অবশিষ্ট আছে সেটাও জানিয়ে দেওয়া।

আমাকে যদি বিরক্তিকর, অকৃতজ্ঞ মনে হয় তবে তার আংশিক কারণটা হলো আমার ভেতরের অনুশোচনা। যেসব ছোটখাট কাজ আমি করিনি অথবা অক্ষম, রাগ বা ভুলবশত হয়ে গেছে সেগুলো আমাকে পোড়ায়। আমার মনে আছে প্রথমবার যখন তার মাসিক হয়েছিল আমি কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিলাম। আবার কখনও কখনও হাঁটতে গিয়ে হোঁচট খেলে বা হাত থেকে কিছু ফেলে দিলে, তাকে ভৎর্সনা করে কেমন বিকট ভাবে চেঁচাতাম। এসবই সত্যি। আমি আদতেই খুব মনঃক্ষুণ্ন হতাম, এমনকি যখন সে জন্মালো, তখন ওর কাছ থেকে দূরত্বে থাকতে চেয়েছি―ওর গায়ের রং দেখে ভীষণ ক্ষেপে গিয়ে আমি প্রথমে এমনও ভেবেছিলাম… না। সেটা সম্ভব হয়নি। ওসব স্মৃতি আমাকে দূরে ঠেলে দিতে হবে―খুব দ্রুত। মানে হয় না ওসব যাতনা বয়ে বেড়ানোর। আমি জানি বিরূপ পরিস্থিতি সত্ত্বেও তার জন্য সেরাটা করার চেষ্টাই আমি করেছি। আমার স্বামী যখন আমাদের ছেড়ে চলে গেল, লুলা অ্যান তখন আমার কাছে একটা বোঝা হয়ে উঠল। বেশ ভারী একটা বোঝা, কিন্তু আমি সেটা ভালোভাবেই বহন করেছি।

 হ্যাঁ, আমি ওর প্রতি কঠোর ছিলাম। সে বিষয়ে আপনারা নির্দ্বিধায় আমাকে দায়ী করতে পারেন। ওর বয়স যখন বারো থেকে তেরোতে গড়ায়, তখন আমাকে আরও কঠোর হতে হয়েছিল। ও তখন মুখে মুখে তর্ক করত। আমি যা রাঁধতাম সেগুলো খেতে অনীহা দেখাত, চুলগুলো চুড়ো করে রাখত। আমি পরিপাটি করে চুলে বেণি করে দিতাম, স্কুলে গিয়ে সে চুল খুলে ফেলত। আমি চাইনি সে বখাটে হয়ে উঠুক। আমি তাকে কষে ধমক দিয়ে সতর্ক করতাম―এমন বেয়াড়াপনা করলে লোকে তাকে নিয়ে নানা ব্যঙ্গবিদ্রƒপ করবে। তবে আমার এসব কড়া শাসন একেবারে বিফলে যায়নি। দেখতে পাচ্ছেন এখন সে কতোটা উন্নতি করেছে। আজ সে একজন সফল কর্মজীবী নারী। আপনি কি সেটা অস্বীকার করতে পারেন ?

এখন সে সন্তানসম্ভবা। এটা একটা দারুণ প্রাপ্তি, লুলা অ্যান। তবে তুমি যদি মনে করো যে মা হওয়া মানে শুধু কিচি কিচি কুহুকুজনসমৃদ্ধ আমোদ প্রমোদের জীবন, ডায়াপার বদল বাদে আর কোনও ঝামেলা নেই, তাহলে তোমার জন্য বড়সড় ধাক্কা অপেক্ষা করছে।

তুমি বা তোমার বেনামি প্রেমিক বা স্বামী যেই হোক, তোমরা হয়তো ভাবছ ‘একটা বাচ্চা আসছে, আহা কী মজা, কুটুকুটু আদর করব শুধু’। জেনে রাখো, মা হলে কেমন লাগে সেই বাস্তবতার মুখোমুখি হতে যাচ্ছ তুমি। জগৎ সংসার কেমন, কীভাবে তার যাবতীয় কাজ চলে, আর মা হলে চারপাশের জগৎটা কীভাবে বদলে যায় তার সবই তুমি এবার বুঝবে।

শুভকামনা তোমার জন্য, সৃষ্টিকর্তা তোমার সন্তানের সহায় হোন।

সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button