বিশ্বসাহিত্য : অনুবাদ গল্প : গৌরবের কয়েক নিমেষ : মূল : নগুগি ওয়া থিয়োঙ্গ’ও

বাংলা অনুবাদ : আহসানুল করিম
[কেনিয়ার লিমুরু শহরের সন্নিকটে কামিরিথুতে ৫ জানুয়ারি ১৯৩৮ সালে নগুগি ওয়া থিয়োঙ্গ’ও জন্মগ্রহণ করেন। ঔপনিবেশিক আমলে ব্যাপটাইজ করে তাঁর নাম রাখা হয়েছিল জেমস নগুগি।তিনি উগান্ডার ম্যাকেরেরে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৬৩ সালে ইংরেজিতে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৬২ সালে তাঁর লেখা The Black Hermit নাটকটি মঞ্চস্থ হয়। ইংল্যান্ডের লিডস বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে ১৯৬৪ সালে তাঁর প্রথম উপন্যাস Weep Not, Child প্রকাশিত হয়। এটা কোনও পূর্ব আফ্রিকান লেখকের ইংরেজিতে লেখা প্রথম উপন্যাস। ১৯৬৭ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর সাড়া জাগানো উপন্যাস A Grain of Wheat। এই উপন্যাসে ফ্যানোনিস্ট মার্কসিজমের প্রতি তাঁর আগ্রহ লক্ষ করা যায়। প্রচণ্ড বর্ণবাদ ও উপনিবেশবাদবিরোধী একজন লেখক হিসেবে তিনি বিশ্বব্যাপী খ্যাতি লাভ করেন। তিনি ইংরেজি ভাষা, খ্রিস্টধর্ম এবং তাঁর নাম জেমস্ নগুগিকে ঔপনিবেশিক ক্ষতচিহ্ন আখ্যা দিয়ে তা ত্যাগ করেন এবং ফিরে যান নগুগি ওয়া থিয়োঙ্গ’ও নামে; লেখালেখির কাজও করতে থাকেন মাতৃভাষা গিকুয়ু ও সোয়াহিলিতে।
স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে লেখালেখি এবং নাটক মঞ্চায়নের কারণে তাঁকে কারাবরণ করতে হয়। বৎসরাধিককাল কারাবাসের পর তিনি দেশত্যাগ করেন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে থাকেন।
বর্তমানে তিনি অ্যামেরিকার ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া, অ্যার্ভিনের ইংরেজি ও তুলনামূলক সাহিত্যের একজন বিশিষ্ট অধ্যাপক (Distinguished Professor)।
উল্লেখ্য যে, সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য একজন কথাশিল্পী হিসেবে তাঁর নাম প্রায়শই আলোচনায় উঠে আসে।
অনূদিত গল্পটি তাঁর OF MOTHERS AND CHILDREN গল্পগ্রন্থ থেকে নেওয়া MUGUMO গল্পের অনুবাদ। অনুবাদকর্মে বরাবরের মতো মূলানুগ থাকার আপ্রাণ চেষ্টা করা হয়েছে। দুটো শব্দের অর্থ [Airu I Ruriri] কোথাও খুঁজে না পেয়ে অনুবাদককে সরাসরি
মূল লেখকের শরণাপন্ন হতে হয়েছিল।]
নাম তার ওয়ানজিরু। অবশ্য নিজের খ্রিস্টান নামটাই তার বেশি পছন্দের : বিয়াট্রিস। বেশ পবিত্র আর শ্রুতিমধুর। দেখতে কুৎসিত নয় সে। আবার ঠিক সে অর্থে সুন্দরীও বলা চলে না। রঙটা গাঢ়। গায়ে গতরে বেশ একটা ভরাট ভাব আছে। কিন্তু তাতে যেন প্রাণপ্রাচুর্যের অভাব। একটা বিয়ারের বারে কাজ করে সে। রাজ্যের ব্যাটাছেলেরা এখানে এসে ফেনাওয়ালা বিয়ারের পাত্রে নিজেদের ডুবিয়ে দেয়। কেউ তার দিকে ভুলেও নজর দেয় না। হয়তো বারের মালিকপক্ষের কেউ কিংবা অধৈর্য কোনও খদ্দের হঠাৎ ডেকে ওঠে বিয়াট্রিস নাম ধরে। নামটা শুনে অন্য দুয়েকজন মুহূর্তের জন্যে মাথা তুলে তাকায়, এত সুন্দর নামটা কার হয়তো সেটা জানার কৌতূহল নিয়ে। আশানুরূপ সুন্দরী কাউকে না দেখতে পেয়ে তারা আবার পানীয়তে মনোযোগ দেয় কিংবা অশ্লীল কোনও কৌতুক বলতে বলতে বারের অন্য পরিবেশনকারী মেয়েদের সঙ্গে হাসিঠাট্টায় মেতে ওঠে। আহত পাখির মতো ওড়াউড়ি বাদ দিয়ে তখন যেন বাধ্য হয়ে মাটিতে নেমে আসতে হয় তাকে। লিমুরু শহরের অনেকগুলো বিয়ার―হলে কাজ করেছে সে। আলাস্কা, প্যারাডাইস, দ্য মডার্ন, থোম এরকম বাহারি নাম সেগুলোর। হয়তো রগচটা কোনও মালিকের মনে হলো সে যথেষ্ট খদ্দের টানতে পারছে না, ব্যস চলে গেল চাকরি। কোনও নোটিশ কিংবা বকেয়া বেতন ছাড়াই। তখন তাকে যেতে হয় নতুন কাজের সন্ধানে। যেসব জায়গায় টিকে যায় সেসব জায়গায়ও বেশিদিন থাকা হয় না অন্য কারণে। দেখা যায় প্রতি রাতে বার বন্ধের সময় হলে তার চেয়ে খারাপ দেখতে মেয়েগুলোকে নিয়েও খদ্দেরদের মধ্যে টানাহেঁচড়া শুরু হয়। অথচ তার দিকে কেউ ফিরে তাকায় না। বিষণ্ন মনে সে ভাবে, ওদের কী আছে যা ওর মাঝে নেই। একই জায়গায় কাজ করতে করতে আর এই রকম অবজ্ঞা সইতে সইতে একসময় আর মন টেকে না তার। তখন নিজেই কাজ ছেড়ে দেয়।
তার খুব সাধ বার হবে তার রাজত্ব। সে যেন অনেকের মাঝে একজন রানি হবে সেই রাজত্বের। নানা উপহার, বিয়ার, হাসি কিংবা খিস্তিখেউড় যার আড়ালে লুকানো থাকে কামনা বাসনা―সেসব নিয়ে প্রজারা আসবে তার কাছে একটুখানি অনুকম্পার প্রত্যাশী হয়ে। লিমুরু শহর ছেড়ে আশেপাশের ব্যাঙের ছাতার মতন গজিয়ে ওঠা ছোট ছোট সব শহরের বারেও কাজ করে দেখেছে সে। ঙ্গারারিগা, কামিরিথো, রিনোরি, এমনকি টিয়েকুনুতেও সেই একই ঘটনা ঘটেছে। হ্যাঁ, মাঝে মাঝে যে খদ্দের সে পায়নি তা নয়, পেয়েছে। কিন্তু সে যেভাবে চেয়েছে সেভাবে নয়। কেউ তাকে পাওয়ার জন্যে মারপিট করেনি। দেখা গেছে হয়তো আর কাউকে না পেয়ে মন্দের ভালো হিসেবে কম টাকাপয়সাওয়ালা কেউ তার কাছে এসেছে। পাঁচ পাঁচটা টাস্কার বিয়ার গিলে মাতাল পুরুষগুলো যে হ্যাংলামি করে মেয়েমানুষের সঙ্গে তার এক আনাও জোটেনি তার কপালে। হয়তো পরদিনই কিংবা মাসের প্রথম দিকের দিনগুলোতে বেতন পেয়ে সেই একই খদ্দের তাকে দেখেও চিনতে পারেনি। বরং পয়সার গরম দেখিয়ে যে মেয়েগুলোর খদ্দেরের অভাব নেই সেগুলোর পিছনে গিয়ে জুটেছে।
এমন অবহেলা সইতে পারত না সে। প্রত্যেকটা মেয়েকে মনে হতো শত্রু। সবার সঙ্গে তাই রূঢ় ব্যবহার করত। বিশেষ করে নিয়াগুথিকে মনে হতো জানের দুশমন। একটা কাঁটা হয়ে যেন তার বুকে বিঁধে আছে। ভীষণ দেমাগি মেয়েটা। মেশে না তেমন কারও সঙ্গে। অথচ মরদগুলো সব ওর পেছনে পড়ে থাকে। নিয়াগুথি সারাক্ষণ ওদেরকে গালিগালাজ করছে, অথচ ওকে খুশি করতে লোকগুলো নানা উপহার নিয়ে হাজির। সেও সেগুলো গ্রহণ করছে এমনভাবে যেন উপহারগুলো শুধু তারই প্রাপ্য। নিয়াগুথি বিরক্তি, উদাসীনতা কিংবা অবজ্ঞা নিয়ে তাকিয়ে থাকলেও ঢ্যামনা পুরুষগুলো তার পায়ের কাছে পড়ে থাকত। যেন তার গালিগালাজ, বেঁকিয়ে থাকা ঠোঁটের অবজ্ঞা আর আগ্রহহীন দৃষ্টিকেই বেশি উপভোগ করত তারা। নিয়াগুথিও যেন ছিল উড়ে চলা পাখি। কোথাও থিতু হতো না। একটা ছেড়ে অন্য একটা বারে গিয়ে জুটত বিয়াট্রিসের মতই। কিন্তু পার্থক্য হলো সে ছুটে যেত পরিবর্তন আর উত্তেজনার খোঁজে, অনেকটা যেন নতুন মুখ আর নতুন দেশে অভিযানের লোভে। এ কারণে বিয়াট্রিস নিয়াগুথির ছায়াকেও ঘৃণা করত। সে নিজে যা হতে চাইত এই মেয়েটি যেন ঠিক তাই। এই যে পঙ্কিলতার জীবনে ডুবে আছে অথচ তারপরেও সমাজের এই স্তরের নোংরামি, নিষ্ঠুরতা আর যৌনতা যেন নিয়াগুথিকে সেভাবে স্পর্শ করেনি। বিয়াট্রিস নতুন যেখানেই পালিয়ে যেত পিছনে পিছনে নিয়াগুথির ছায়াও এক সময়ে না এক সময়ে অনুসরণ করে চলে আসত।
লিমুরু থেকে পালিয়ে সে চিরি জেলার ইলমোরগে পালিয়ে এল।
ইলমোরগ এক সময়ে ছিল মরা জায়গা। কিন্তু নিয়ানগেন্ডো নামের এক অসামান্য নারী গোত্রপ্রধানের গুণে গ্রামটা জেগে উঠে ধীরে ধীরে ছোট একটা শহরে পরিণত হয়েছে। তাঁকে নিয়ে প্রায় সব জনপ্রিয় গানের দল গান বেঁধে সম্মান জানিয়েছে। মুথু আর মুচুন গয়ার নাচের দল যেমন গান বেঁধেছিল :
‘নাইরোবি ছেড়ে ইলমোরগে এসে
জানতাম না ভাগ্য এমন হবে
বুকে পাবো এমন এক আশ্চর্য লক্ষ্মী
সে আমার নিয়ানগেন্ডো’
ওই সময়ে ইলমোরগ যেন এক নতুন আশার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছিল যেখানে জীবনযুদ্ধে ক্লান্ত আর পরাজিত দলিত মানুষেরা এসে মরূদ্যানের বিশ্রাম আর তৃষ্ণার জল খুঁজে পেত। নতুন করে সব শুরু করার ইচ্ছে নিয়ে ইলমোরগে এল বিয়াট্রিস। কিন্তু এখানে আসার কিছুদিনের মধ্যেই নিয়াগুথিও এল তার পিছু পিছু। ফলে কিছুদিনের মধ্যে ইলমোরগের সমস্ত আশা, গান আর নাচ ফিকে লাগতে শুরু হলো তার কাছে। যেন লিমুরুর মতই বিশ্রী হয়ে গেল সবকিছু। বৈচিত্র্য আনতে সাজপোশাক বা চেহারায় পরিবর্তন আনার চেষ্টা করবে বলে ভাবল সে। ঝলমলে পোশাক কেনার মতো টাকা এখানে এসেও সে রোজগার করতে পারছিল না। মাসে পঁচাত্তর শিলিং মোটে রোজগার। নেই কোনও বাড়ি ভাড়া কিংবা খাবারের ভাতা। নেই টাকাওয়ালা নাগর। ইতোমধ্যে এম্বি কোম্পানির প্রসাধনগুলো ইলমোরগের দোকানগুলাতে এসে গেছে। বিয়াট্রিস ভাবলো এটাই হয়তো সমাধান। লিমুরুতে থাকতে দেখেছে তার চেয়েও কালো দেখতে মেয়েগুলো এসব রঙ উজ্জ্বল করার ক্রিম মেখে রাতারাতি ভোল পালটে ফেলেছে। মরদগুলোও হুমড়ি খেয়ে পড়ত ঐ মেয়েগুলোর ওপর। গর্ব করে নিজেদের মেয়েমানুষের কথা বাড়িয়ে বাড়িয়ে বলে বেড়াত। মাঝে মাঝে ভাবতে বসলে পুরুষ জাতিটাকে তার ভীষণ অদ্ভুত বলে মনে হয়। তারা সবসময় এম্বি, বুটোন, ফায়ারস্নো, মুনস্নো এসব রঙ উজ্জ্বল করা প্রসাধনী, পরচুলা কিংবা মসৃণ করা চুল―এসবের বিরুদ্ধে কথা বলে। কিন্তু সময়মতো আবার এম্বি মাখা উজ্জ্বল ত্বক কিংবা ইউরোপীয় বা ভারতীয়দের নকল করে লাগানো পরচুলা পরা মেয়েদের পেছনেই ছোটে। কালো হয়ে কালোকে ঘৃণা করার কারণ বিয়াট্রিস খুঁজতে যায় না। অসঙ্গতিটাকে মেনে নিয়েই যেন প্রতিশোধ নেওয়ার জন্যে সেও ওসব প্রসাধনের শরণাপন্ন হয়। কালো হওয়ার লজ্জাটাকে যেন ঘষে ঘষে উঠিয়ে ফেলতে চায়। কিন্তু এম্বির প্রসাধনীও খুব বেশি কেনার সামর্থ্য নেই তার। তাই শুধু মুখে আর দুহাতে মাখতে লাগল। শরীরের অন্য অঙ্গগুলোতে আসল রংটা থাকুক। আর তাছাড়া মুখের সব জায়গায়ও সেগুলো লাগানো যেত না, যেমন কানের পিছনে কিংবা চোখের পাতার ওপরে। সেসব জায়গায় লজ্জার চিহ্ন কালো রংটা সে ধরে রাখল।
সে অবশ্য তখনও জানে না এম্বির প্রসাধনী মাখার দিনগুলো একদিন তার কাছে বড় লজ্জার আর অপমানের মনে হবে যেদিন সে তার সেই ক্ষণিক গৌরবের মুহূর্তের মুখোমুখি হবে। ইলমোরগে এসে স্টারলাইট নামের একটা বার এবং সরাইখানায় কাজ করতে শুরু করে সে। নিয়াগুথিও সেখানেই হাতে মোটা বালা আর কানে বড় দুল পরে কাউন্টারে কাজ করত। মালিক ছিল সাচ্চা খ্রিস্টান। নিয়ম করে গির্জায় যায়। হারাম্বি প্রোজেক্টের মতো মানবসেবামূলক কাজে টাকাপয়সা দেয়। গোলগাল ভুঁড়ি। মাথার চুলে পাক ধরেছে। সম্মানিত এবং সংসারী মানুষ। ইলমোরগে লোকে তাকে চেনে। পরিশ্রমী লোক, বার বন্ধের সময় না হলে ঘরে ফেরে না। কে জানে নিয়াগুথির জন্যেই অতক্ষণ থাকে কিনা। বারের অন্য মেয়েদের দিকে চোখ দেয় না লোকটা। তবে নিয়াগুথির চারপাশে প্রায়ই ঘুরঘুর করে। নিয়াগুথির কাছ থেকে কোনও রকম সাড়া না পেলেও যখন তখন এটাওটা কিংবা জামাকাপড় উপহার দেয়। বিয়াট্রিস বোঝে যে নিয়াগুথি খেলছে লোকটাকে নিয়ে। লোকটা ভবিষ্যতে কবে শিকে ছিঁড়বে সে আশায় ঘুরছে ওর পিছনে। অন্য মেয়েরা যেখানে সবাই পেত আশি শিলিং করে, নিয়াগুথির বেলায় একটু বেশি। তার থাকার জন্যে আলাদা ঘরও দেওয়া হয়েছিল। যখন খুশি ঘুম থেকে উঠতে পারত নিয়াগুথি। নিজের মর্জিমাফিক চলার স্বাধীনতা ছিল তার। অন্যদিকে বিয়াট্রিস আর অন্য সব মেয়েদের ভোর পাঁচটায় ঘুম থেকে উঠেই কাজে লেগে পড়তে হতো। সরাইখানার অতিথিদের জন্যে চা বানানো, বার ঝাড়ু দেওয়া, থালাবাসন-গেলাস ধোয়া ইত্যাদি। তারপরে বারের শিফট শুরু হতো। দুপুর দুটোয় বিরতি। পাঁচটা থেকে আবার কাজ শুরু। খদ্দেরদের জন্যে ফেনাভাসা বিয়ার আর ঠোঁটে হাসি নিয়ে প্রস্তুত হয়ে থাকতে হতো তাদের। রাত বারোটা কিংবা যতক্ষণ টাস্কার আর পিলস্নার বিয়ারের জন্যে তৃষ্ণার্ত খদ্দের থাকবে ততক্ষণ চলতো কাজ। মালিকের কড়া নির্দেশ ছিল রাতে মেয়েদের স্টারলাইটেই থাকতে হবে। এতে মাঝে মাঝে চটে যেত বিয়াট্রিস। তা না হলে নাকি সকালে কাজে আসতে সবাই দেরি করবে। আসলে চাইত মেয়েরা স্টারলাইটে রাতে থেকে আরও বেশি অতিথিকে এখানে রাতে থাকার ব্যাপারে প্রলুব্ধ করুক। বেশির ভাগ মেয়ে অবশ্য নিয়াগুথির নেতৃত্বে নিয়মের তোয়াক্কা না করে পাহারাদারকে ঘুষ দিয়ে প্রায়ই বাইরে রাত কাটাতো। আবার ফিরেও আসত সময়মতো। ওরা চাইত প্রেমিক কিংবা খদ্দেরদের সঙ্গে বাইরে কোথাও মিলিত হতে যেখানে কেউ ওদেরকে বারের মেয়ে হিসাবে দেখবে না। বিয়াট্রিস অবশ্য কখনও বাইরে যেত না রাতে। কারণ তার এক রাতের খদ্দের যারাও বা ছিল তারাও চাইত খুব কম খরচের মধ্যে কাজ সারতে।
এক রাতে নিয়াগুথির কাছ থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়ে বারের মালিক বিয়াট্রিসের কাছে এল। এসেই গালিগালাজ করে তার নানা দোষের ফিরিস্তি দেওয়া শুরু করল। আবার কিছুক্ষণের মধ্যেই হঠাৎ নিয়াগুথির প্রশংসা করতে লাগল। তারপর ভুঁড়িওয়ালা পাকা চুলের লোকটা চেপে ধরলো তাকে। ধস্তাধস্তি করতে লাগল। লোকটার প্রতি প্রচণ্ড ঘৃণা হলো বিয়াট্রিসের। নিয়াগুথির ফেলে দেওয়া এঁটো সে গ্রহণ করতে পারে না, কখনওই না। হায় ঈশ্বর! ভিতরে ভিতরে ডুকরে কেঁদে ওঠে সে। নিয়াগুথির কী আছে যা তার নেই ? লোকটা এখন নিজেকে তার সামনে অপমান করছে। ভিক্ষে চাইছে যেন। উপহারের লোভ দেখাচ্ছে। বিয়াট্রিস তবু সায় দিল না। সেই রাতে সে নিয়ম ভাঙলো। জানালা দিয়ে লাফ দিয়ে বেরিয়ে পালালো। অন্য একটা সরাইখানায় রাত কাটিয়ে সকাল ছয়টায় ফিরল। বারের মালিক সকালে সবার সামনে তাকে ডেকে চাকরি থেকে ছাটাই করে দিল। সেদিন বিয়াট্রিস নিজের সাহসী আচরণে নিজেই অবাক হয়ে গেল।
চাকরি ছাড়া প্রায় একটা মাস কেটে গেল। এদিকে ওদিকে বিভিন্ন বারের মেয়েদের সঙ্গে তাদের আশ্রয়ে থেকে দিন কাটতে লাগল। ইলমোরগ ছেড়ে নতুন কোনও শহরে গিয়ে সব কিছু নতুন করে শুরু করারও সাহস হচ্ছিল না। মনের ভিতরে একটা দগদগে ঘা। এখানে ওখানে ঘুরতে ঘুরতে সে ক্লান্ত। এম্বির প্রসাধন ব্যবহার করাও বন্ধ করে দিয়েছে। টাকা নেই। আয়নাতে তাকালে বয়সের ছাপ চোখে পড়ছে। চেহারার লাবণ্য পড়তির দিকে। তাও কেন নিজের নীতিগুলো আঁকড়ে ধরে থাকা ? নিজেকে প্রশ্ন করে সে। নিজে নিজে খদ্দের ধরা কিংবা সরাসরি শরীর বিক্রি করার ব্যাপারটাকে ঘৃণা কিংবা ভয় পায় সে। সে যা চায় তা হলো একটা ভালো চাকরি আর সঙ্গে এক বা একাধিক প্রেমিক যারা সত্যি তার মূল্য বুঝবে। হয়তো একটা ভালোবাসার পুরুষ, একটা সংসার বা একটা সন্তানের স্বপ্ন নিয়ে পুরুষদের কাছে যায় বলে তারা ভয় পেয়ে যায়। তারা বারের মেয়েদের কাছে এমনটা আশা করে না।
গভীর রাতে কাঁদতে কাঁদতে বাড়ির কথা মনে পড়ে। মনে হয় নিয়েরিতে নিজের সেই গ্রাম যেন ঈশ্বরের দুনিয়ায় সবচেয়ে সুখের জায়গা। কৃষক বাবা আর মায়ের জীবনটাকে যেন মনে হতে থাকে অপরিসীম শান্তি আর সুখ দিয়ে ঘেরা। খুব ইচ্ছা করে বাড়ি ফিরে তাদের মুখ দেখতে। কিন্তু এভাবে কোন মুখে ফিরবে সে ? কপর্দকশূন্য খালি হাতে। সেই বাড়ি আজ শুধু সুদূর অতীতের স্মৃতি। তার জীবন আর তার বর্তমান আজকে অচেনা মানুষে ভরা শুঁড়িখানায় বন্দি। হারিয়ে গেছে সব। তার প্রজন্মের কেউ আর সেই মাটি, ফসল, হাওয়া আর অমাবস্যা-পূর্ণিমার হিসাবনিকাশে ফিরে যেতে পারবে না। ক্ষেত ঘিরে রাখা গুল্মের বেড়ার ফাঁকে বাতাসের ফিসফিসানি, কিংবা আকাশ ছুঁতে চাওয়া টুমু টুমু পাহাড়ের কোলে জোছনার আলোতে নাচ-গান কিংবা প্রেম―তাদের জন্যে নয় আর। তার গ্রামের সেই মেয়েটা―লিমুরুতে একের পর এক ধনী লোকের রক্ষিতা হয়ে বেশ সুখে আছে বলে সবাই ভাবত। এইতো কিছুদিন আগে আত্মহত্যা করল চুলোর আগুনে। এই প্রজন্ম যেন মৃত্যুর রহস্য নিয়ে কৌতূহলী শুধু, জীবন নিয়ে উদাসীন। কত অবিবাহিত মা সদ্যোজাত সন্তানকে ছুড়ে ফেলে দিয়েছে জীবনের চাকচিক্য ধরে রাখার লোভে। সেই মেয়েটার মৃত্যু মানুষের কাছে আজ পরিহাসের বস্তু হয়ে দাঁড়িয়েছে। লোকে বলত মেয়েটার মৃত্যু তৎক্ষণাৎ হয়েছে, তেমন কষ্ট পায়নি। শুনে বিয়াট্রিস প্রায় সপ্তাখানেক ভেবেছিল একইভাবে মরবে। কিন্তু সাহস হয়নি। সে তো ভালোবাসা চায়, সে তো বাঁচতে চায়।
ইলমোরগে একটা নতুন বার খুলেছে। নাম ট্রিটপ বার, লজিং ও রেস্তোরাঁ। একটা দোতলা দালানে হওয়া সত্ত্বেও নামটা কেন ট্রিটপ বিয়াট্রিস ভেবে পেল না। একতলায় একটা চায়ের দোকান। তার ওপরে বিয়ারের দোকান। হয়তো ওপরতলায় দোকান বলেই নাম দিয়েছে ট্রিটপ। দালানের বাকি ঘরগুলো পাঁচ মিনিট থেকে শুরু করে এক রাতের জন্যে ভাড়া দেওয়া হয়। মালিক এক অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা। এখন রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। টাকার কুমির। কেনিয়ার প্রায় সব বড় শহরেই ব্যবসা আছে। নতুন বারে তাই দেশের নানা জায়গা থেকে কেষ্টবিষ্টুরা আসা শুরু করল। কেউ মার্সিডিজ, কেউ বেন্টলি, কেউ জাগুয়ার বা ডায়েমলার্সে চড়ে আসত। তাদের সঙ্গে থাকত উর্দি পরা শোফার। মালিকেরা বারের ভিতরে থাকাকালে তারা গাড়িতে বসে অপেক্ষা করতে করতে বড় বড় হাই তুলত। আবার অনেকে আসত শুধু এসব রুই কাতলাদের তোষামোদ করতে। তারা রাজনীতি কিংবা ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে আলাপ করত। আড্ডা আর সেই সঙ্গে নানা গুজব আর পরচর্চা। ‘এখনও শোননি! অমুকের তো পদোন্নতি হয়ে গেছে।’ ‘আসলেই ?’ ‘তো আর বলছি কি ? আর ওদিকে তমুকের চাকরি চলে গেছে। তহবিল তছরুপ করেছিল কিনা। গাধা না হলে এভাবে ধরা পড়ে!’ আড্ডার সঙ্গে চলত তর্ক আর ঝগড়া। সেগুলো মাঝে মাঝে হাতাহাতির দিকে চলে যেত। বেশি ভিড় জমতে শুরু করল অবশ্য নির্বাচনী প্রচারণার সময়ে।
এত মতবিরোধের মাঝেও কয়েকটা ব্যাপারে তারা সবাই একমত ছিল। তা হলো কেনিয়াতে সমস্ত অশান্তির মূলে হলো লুও সম্প্রদায়। বুদ্ধিজীবীরা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ঔদ্ধত্যপূর্ণ মনোভাবের কারণে এবং অতিরিক্ত সুযোগসুবিধা পেয়ে জনবিচ্ছিন্ন। কিয়াম্বুতে উন্নয়ন অন্য জায়গার চেয়ে একটু বেশিই হচ্ছে। নিয়েরই আর মুতাঙ্গার লোকেরাই নাইরোবির সব ব্যবসা হাতিয়ে নিচ্ছে এবং চিরি জেলার দিকেও তারা হাত বাড়াচ্ছে। আফ্রিকান শ্রমজীবীরা, বিশেষ করে কৃষিকাজ করে যারা, তারা মূলত অলস এবং সমাজের উঁচু স্তরের মানুষ যারা কিনা ‘মাথার ঘাম পায়ে ফেলেই’ দ্রুত অল্প সময়ে উন্নতি করেছে তাদের প্রতি ঈর্ষান্বিত। এসবের বাইরে অনেকে শুধু হয় নিজেদের ঢোল পেটাত আর না হয় কেউ প্রশংসা করলে তাকেও দুটো ভালো কথা বলত। কখনও কখনও মাতাল হয়ে নিজেদের জাহির করতে কেউ কেউ বারে উপস্থিত সবাইকে দুই রাউন্ড করে বিয়ার খাওয়াত। এইসব নব্য ধনীর এমন সব কাণ্ডের জন্য ইলমোরগের গরিব লোকজনও ট্রিটপ বারে ভিড় জমাত।
শেষ পর্যন্ত এখানেই বিয়াট্রিস কাজ নিল। ঘর সাফ সাফাই আর সেই সঙ্গে সুইপারের কাজ। এখন সে লোকেদের বিছানা করে দেয়। আগে যাদেরকে শুধু পানীয় পরিবেশন করত। ট্রিটপে কাজ করতে করতে দেখত গরিব লোকেরাও মাতাল হয়ে সেখানে আসা ধনী লোকেদের সামনে পয়সাওয়ালার ভান করছে। কয়েক সপ্তাহ বেশ ভালোই গেল। কিন্তু ভালো লাগাটা টিকল না বেশিদিন। অন্য সব বার থেকে দল বেঁধে মেয়েরা এসে ট্রিটপে কাজ নিতে শুরু করল। ইলমোরগে এসে পরিচয় হয়েছে এমন কিছু মেয়ে ছিল এই দলে। লিমুরুতে চিনত এমন মেয়েরাও ছিল। বেশির ভাগ মেয়েই এসে দুয়েকজন করে টাকাপয়সাওয়ালা নাগর জুটিয়ে ফেলল। মাঝে মাঝে তারা কিছুদিনের জন্যে উধাও হয়ে কোনও কোনও প্রেমিকের সঙ্গে লুকোচুরিও খেলত। নিয়াগুথিও এসে কাউন্টারে কাজ করা শুরু করল। ধনী গরিব নির্বিশেষে যথারীতি সবার নজর এসে পড়ল তার ওপর। সেই একই বড় বড় চোখ মেলে, হাতে বালা আর কানে বড় দুল পরে চোখে মুখে কিছুটা একঘেয়ে নির্লিপ্ত ভাব নিয়ে কাজ করে চলতে লাগল নিয়াগুথি। সুইপারের কাজ করার কারণে বিয়াট্রিস আরও চোখের আড়ালে পড়ে গেল সবার। যেসব মেয়ে এরই মাঝে আখের গুছিয়ে নিয়েছে তাদের কাছ থেকে তাই তাচ্ছিল্য জুটতে লাগল তার।
তার সম্বল ছিল শুধু বুক জুড়ে থাকা স্বপ্নগুলো। প্রায় শ্বাসরোধ করে দেওয়া শীৎকারে আর পাঁচ মিনিটের ধস্তাধস্তিতে এলোমেলো হয়ে থাকা বিছানাগুলোর চাদর বদলানোর ফাঁকে সে মাঝে মাঝে জানালার পাশে এসে দাঁড়াত। বাইরে সারি সারি পার্ক করে রাখা গাড়িগুলো আর তাতে অপেক্ষমাণ শোফারদের দেখা যেত। কিছুদিনের মধ্যেই কোন গাড়িটার মালিক কে, প্লেটের নাম্বার কত আর তার শোফারের পোশাকের রং কি সেসব মুখস্থ হয়ে গেল তার। জানালায় দাঁড়িয়ে দেখতে দেখতে মাঝে মাঝে দিবাস্বপ্ন দেখত সে। দেখত তার প্রেমিকেরা দুই আসনের মার্সিডিজ স্পোর্টসকার চালিয়ে আসছে, তার হাতে হাত রাখছে। তারপর নাইরোবি নয়তো মোমবাসার রাস্তা ধরে হাঁটছে। উঁচু হিলের জুতোয় ছোট ছোট পায়ে ঠক ঠক আওয়াজ তুলে। তারপরে হয়তো হঠাৎ কোনও অভিজাত বিপণির বড় কাচের সামনে দাঁড়িয়েছে। বলছে, ‘এই শুনছ ? এটা আমায় কিনে দেবে ?’ ‘কোনটা ?’ তাকে হয়তো প্রেমিক জিজ্ঞেস করবে। ‘ঐ লম্বা মোজাগুলো।’ তখন আর সে ছেঁড়া মোজা সেলাই করে পরবে না। কখনই না। কোনওদিন না। অনেক রঙের পরচুলা থাকবে তার। সোনালি, বাদামি, লালচে, আফ্রিকান কোঁকড়ানো পরচুলা―দুনিয়ার সব রকম। সমস্ত পৃথিবী তার প্রশংসায় মুখর হয়ে থাকবে। এসব ভাবতে ভাবতে হারিয়ে যেত সে। কিছুক্ষণের জন্যে মনের অন্ধকার দূর হয়ে যেত। তখন সে আর ঝাড়পোছ করা মেয়ে নয়, সে যেন ওয়াঙ্গু মাকেরির বংশধরে পরিণত হতো। চাঁদের আলোয় যার নগ্ন দেহ দেখে পুরুষ কামনায় থরথর করে কেঁপে উঠত। কিংবা নিয়ান্ডেঙ্গোর মেয়ে, আধুনিক ইলমোরগের প্রতিষ্ঠাতা। যাকে নিয়ে জনশ্রুতি আছে তার সঙ্গে প্রেম করতে গিয়ে নাকি বহু পুরুষ নিঃস্ব ছিবড়ে হয়ে গেছে।
অবশেষে বিয়াট্রিসের কপালে যে মানুষটা জুটল সে তার স্বপ্নের পুরুষদের একেবারে বিপরীত। এক শনিবার দুপুরে লোকটা একটা বড় পাঁচটনী লরি চালিয়ে এল। দামি মার্সিডিজ, জাগুয়ার আর ডাইম্লারের পাশে এমনভাবে সাবধানে পার্ক করল যেন লরি নয়, মাখনের মত মোলায়েম দেখতে দামি কোনও গাড়ি সেটা। বোঝা গেল খুব গর্ব তার লরিটা নিয়ে। একটা ঢোলা ধূসর রঙের সুট ছিল পরনে। তার ওপরে একটা ভারী খাকি মিলিটারি ওভারকোট। গাড়ি থেকে নামার সময় ওভারকোটটা খুলে খুব যত্ন করে ভাঁজ করে পাশের সিটে রাখল। গাড়ির দরজা বন্ধ করে ঠিকমতো লক হয়েছে কিনা দেখল। তারপর পোশাকের ধুলা ঝেড়ে হাঁটতে শুরু করল। পুরো লরিটাকে একটা চক্কর দিল। যেন দেখছে কোনও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে কিনা। ট্রিটপে ঢোকার ঠিক আগ মুহূর্তে আরেকবার পিছন ফিরে আর সব গাড়ির মাঝে দানবের মতো দাঁড়িয়ে থাকা লরিটাকে দেখে নিল।
ট্রিটপে ঢুকে এক কোনায় গিয়ে বসল সে। সজোরে একটা কেনিয়া ওয়ানের জন্যে অর্ডার করল। আয়েশ করে তাতে চুমুক দিতে দিতে এদিকে ওদিকে তাকাতে লাগল। মনে হলো যেন চেনা মুখ খুঁজছে। একজন কাউকে যেন পেয়েও গেল, বারের বড়সড় খদ্দেরদের কেউ। চেনা লোকটার জন্যে সঙ্গে সঙ্গে সোয়া বোতল ভ্যাট সিক্সটি নাইন অর্ডার করল সে। অপর পক্ষ মাথা ঝাঁকিয়ে একটা যেন প্রশ্রয়ের হাসি হেসে গ্রহণ করল উপহার। কিন্তু উপহারের পরে যখন আলাপ জমাতে চাইল পাত্তা পেল না খাকি ওভারকোট। একটু যেন থতমত খেয়ে নিজের পানীয়ে মন দিল সে। কিছুক্ষণ পরে সে আবার চেষ্টা করতে লাগল সব কেউকেটাদের সঙ্গে ভাব জমাতে। কিন্তু কপালে জুটল শুধু ভুরু কুঁচকানো চাউনি। তারপরে চেষ্টা শুরু করল তাদের হাসিঠাট্টায় যোগ দিতে। নিজের কথায় সে শুধু নিজেই সজোরে হাসতে লাগল। বাকিরা কিছুটা বিরক্ত। অবশেষে বিকেলের দিকে সে উঠে পড়ল।
অনেকটা যেন সবাইকে দেখিয়ে কাউন্টারে নিয়াগুথির হাতে তুলে দিল কতগুলো চকচকে শ শিলিঙের নোট। ট্রিটপে থাকার সময়ে নিরাপদে রাখার জন্য আমানত হিসাবে। কেউ কেউ তাকিয়ে দেখল এবং নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করল, কেউ বা অবজ্ঞার হাসি হাসল। টাকা দেখে সবাই একটু হলেও তাকে যে গোনায় ধরা উচিত সেটা মেনে নিল। তবু খুব একটা হালে পানি পেল না লোকটা সেদিনকার মতো। কিছুটা টলতে টলতে ভাড়া নেওয়া সাত নম্বর ঘরের দিকে এগোল। বিয়াট্রিস এগিয়ে এসে চাবিটা তার হাতে তুলে দিল। বিয়াট্রিসের দিকে মুহূর্তের জন্যে তাকিয়ে চোখ সরিয়ে নিল লোকটা। আগ্রহ নেই। এরপর থেকে প্রতি শনিবারে আসত লোকটা। বিকেল পাঁচটা নাগাদ বেশিরভাগ গণ্যমান্য সব খদ্দের চলে আসত ট্রিটপে। প্রথম দিনের মতো একইভাবে সেই খদ্দেরদের সঙ্গে ভাব জমাতে চাইত লোকটা। লাভ হতো না।
সেই একই টেবিলে বসে পান করত লরিওয়ালা। তারপরে সাত নম্বর ঘর ভাড়া নিয়ে সেখানে চলে যেত। একসময়ে প্রতি শনিবার নিজের অজান্তেই বিয়াট্রিস লোকটার জন্য অপেক্ষা করা শুরু করল। সাত নম্বর ঘরটা তৈরি করে রাখত। কখনও কখনও গায়ে-পড়া স্বভাবের কারণে লোকটা অপমানিত হতো। সেই দিনগুলোতে বিয়াট্রিসকে ছেড়ে না দিয়ে তার সঙ্গে কথা বলত। কিংবা বিয়াট্রিসকে আটকে রেখে নিজের সঙ্গে নিজেই যেন কথা বলত। সেসব কথায় জানা যেত জীবনে অনেক ঘাটের পানি খেয়ে অনেক সংগ্রাম করেছে লোকটা। লেখাপড়া শেখার অদম্য আগ্রহ ছিল কিন্তু স্কুলে যায়নি কোনওদিন। সুযোগ হয়নি। তারা রিফট উপত্যকায় ইউরোপীয়দের এলাকায় একটা পরিত্যক্ত জায়গায় অবৈধভাবে থাকত। সেইসব ঔপনিবেশিক আমলে ওসব জায়গায় থাকার ফলাফল ছিল একটাই। শ্বেতাঙ্গ শয়তানগুলো আর তাদের সন্তানদের জন্যে সপরিবারে দাসের মতন খেটে মরতে হতো। ভবিষ্যৎ বলে কিছু ছিল না। এক পর্যায়ে তাই মুক্তি সংগ্রামে যোগ দিয়েছিল সে এবং আরও অনেকের মতোই কারাবন্দি হয়েছিল। স্বাধীনতা অর্জনের পরে আরও অনেক কারাবন্দির সঙ্গে মুক্ত হয়ে ফিরে এল সে। স্বাধীন দেশে দেখা গেল ভালো ভালো জায়গায় কাজ করতে যে শিক্ষাগত যোগ্যতা প্রয়োজন তা তার নেই। কিছুই বদলালো না। প্রথমে কয়লা পোড়ানোর কাজ, তারপরে কসাইয়ের কাজ, এরপর অবশেষে রিফট উপত্যকা আর চিন জেলা থেকে নাইরোবিতে সবজি আর আলু পরিবহণের কাজ শুরু করল। অবশ্য নিজের কাজ আর উন্নতিতে গর্বিত সে। সেই সঙ্গে অন্যদের উপর ভীষণ ক্ষোভ। যারা খেলাপি ঋণ আর ভর্তুকির কারণে লেখাপড়া শিখতে পেরেছে এবং ধনসম্পদ গড়ে তুলেছে সেইসব লোকের প্রতি ক্ষোভ। এই শ্রেণির লোকগুলো তার মতো খেটে খাওয়া মানুষদের মূল্য দেয় না। এসব নিয়ে সারাক্ষণ গজগজ করত সে। নিজের জীবনের নানা দুঃখ আর জ্বালাযন্ত্রণার কথা বলত। তারপর ক্লান্ত হয়ে একসময়ে পকেটের টাকাপয়সা সাবধানে গুনে বালিশের নিচে রেখে বিয়াট্রিসকে চলে যেতে বলত। মেয়েদের সন্দেহের চোখে দেখত সে। ভাবত মেয়েলোকগুলো পুরুষের পিছনে পয়সার জন্যে লেগে থাকে। এই কারণে এখনও বিয়েই করেনি সে। কিন্তু বিয়াট্রিস একজন ভালো শ্রোতা হওয়ায় মাঝে মাঝে আবার তাকে বিয়ার কিনে সাধত।
অবশেষে এক রাতে বিয়াট্রিসকে নিয়ে বিছানায় গেল সে। সকালে হাতড়ে হাতড়ে বালিশের তলা থেকে বিশ শিলিং-এর একটা নোট বের করে দিল। টাকাটা নিল বিয়াট্রিস। কিন্তু কেন যেন মনের ভিতরে একটা অদ্ভুত রকম অপরাধবোধ কাজ করতে লাগল তার। কয়েক সপ্তাহ পরপর একই ঘটনা। অতিরিক্ত এই টাকাটা পেয়ে সে খুশি তাতে সন্দেহ নেই। দরকার ছিল টাকাটার। কিন্তু তার কাছে মনে হতো এক ব্যাগ আলু বা এক বস্তা বাধাকপি কিনলে যেমন টাকা দিত লোকটা একইভাবে যেন তার শরীরটার জন্যে টাকা দিচ্ছে। নীরব শ্রোতা হিসেবে সমাজের উঁচু শ্রেণির মানুষের প্রতি লোকটার সমস্ত নালিশ শোনা এবং একেকটা রাতের জন্যে শরীরের খিদে মেটানোর দাম পেত। সেখানে আবেগ বা অনুভূতির কোনও জায়গা নেই। এদিকে লোকটার অহংবোধ দিনকে দিন বিয়াট্রিসকে বিরক্ত করে তুলছিল। সেই একই গল্প একই কাহিনি। কিন্তু তবু লোকটার ভিতরে সে কিছু একটা হয়তো দেখতে পেত। ছাইচাপা আগুন, নাকি কোনও একটা মহীরুহের বীজ কিংবা একটা পায়ে মাড়িয়ে যাওয়া ফুল ? লোকটার মধ্যে হয়তো নিজের মতোই একজন ভুক্তভোগীকে দেখতে পেত বিয়াট্রিস। বিরক্তি সত্ত্বেও শনিবারের অপেক্ষায় থাকত। তারও তো কারও সঙ্গে কথা বলতে মনে চাইত। মনে হতো তার কষ্টগুলো বুঝবে এমন কাউকে মন খুলে সব কথা বলতে। লোভ হতো লরিওয়ালার কাছে নিজের মনের কষ্টগুলোর কথা বলতে।
এক শনিবার রাতে সেটাই করল সে। লোকটার সেই একঘেয়ে কেচ্ছা থামিয়ে দিয়ে নিজের জীবনের গল্প বলতে শুরু করল সে। কেন সেদিন এমন করল সে নিজেও জানে না। হয়তো বাইরের মুষলধারায় বৃষ্টি তাকে এলোমেলো করে দিয়েছিল। ঢেউ টিনের ছাউনিতে বৃষ্টির ঝম ঝম শব্দ কেমন যেন একটা উষ্ণ আর বিষণ্ন নির্লিপ্ততা এনে দিয়েছিল তার মাঝে। লোকটা শুনছিল। না শুনে উপায় ছিল না। নিয়েরি কাউন্টির কারাতিনা শহর থেকে সেই গল্পের শুরু। ব্রিটিশ সৈনিকদের গুলিতে দুই ভাইকে হারায় সে। কারাগারে আরেক ভাইয়ের মৃত্যু হয়। ফলে সে বাবা-মায়ের একমাত্র বেঁচে যাওয়া সন্তান। দরিদ্র পরিবারে বেড়ে ওঠা। এক চিলতে প্রায় বন্ধ্যা জমিতে কঠিন পরিশ্রম করে বাবা-মা তার প্রাথমিক শিক্ষার খরচ জোগাতো। প্রথম ছয় বছর ইশকুলে ভালোই করছিল সে। সপ্তম শ্রেণিতে এসে তাতে বাধা পড়ল। ঢিলেমির কারণে ফলাফল ভালো হলো না। একই ফলাফল নিয়ে অবশ্য ক্লাসের অনেকেই ভালো সরকারি মাধ্যমিক ইশকুলে ডাক পেল। পারিবারিক যোগাযোগের সূত্রে তার চেয়ে খারাপ ফলাফল নিয়ে অনেকে একেবারে সেরা ইশকুলগুলোতে ভর্তি হলো। কিন্তু কোনও ভালো ইশকুল থেকে সে ডাক পেল না। সপ্তম শ্রেণিতে আরেকবার পড়ার ইচ্ছা তার ছিল না। পড়ালেখা বাদ দিয়ে তাই বাড়িতেই রয়ে গেল সে। মাঝে মাঝে ক্ষেতখামারের কাজে কিংবা বাড়ির নানা কাজে বাবা-মাকে সাহায্য করতে লাগল। কিন্তু এতদিনের ইশকুলে যাওয়ার অভ্যেসের কারণে ক্ষেতখামার বা বাড়ির কাজে মন বসল না তার। গ্রামের জীবন পানসে লাগতে লাগল। মাঝে মাঝে অবশ্য কারাতিনা শহরে বা নিয়েরির সদরে যেত সে কাজের খোঁজে। নানা অফিসে কাজ খুঁজত সে। সবখানে একই প্রশ্ন : ‘কি কাজ করতে চাও ? কি কাজ জানো ? টাইপিং বা শর্টহ্যান্ড জানা আছে ?’
একসময় মরিয়া হয়ে উঠল সে। একদিনের কথা। নিয়েরি সদরে একটা দোকানে দাঁড়িয়ে ছিল। হাতে ফান্টার বোতল। চোখে পানি। সেখানে এক যুবকের সঙ্গে দেখা। চোখে রোদ চশমা আর পরনে গাঢ় রঙের সুট। বিয়াট্রিসের অবস্থা বুঝতে পেরে যুবক তার সঙ্গে আলাপ জমালো। নাইরোবি থেকে এসেছে সে। জানালো যদি কাজ চাও তবে নাইরোবির মতো বড় শহরে যাও। কাজের কোনও অভাব নেই। সে নাকি নিজেও কাজ পেতে সাহায্য করতে পারবে। কীভাবে যাবে ? চাইলে বিয়াট্রিস তার সঙ্গে তার ঘিয়ে রঙের পোজো গাড়িতে করে যেতে পারে। বিয়াট্রিস যেন স্বর্গ হাতে পেল। নাইরোবির স্বপ্নময় হাতছানিতে দারুণ এক ভ্রমণও হলো। নাইরোবি পৌঁছে প্রথমেই যুবক তাকে নিয়ে গেল টেরেস নামের একটা বারে। সেখানে বিয়ারে চুমুক দিতে দিতে নাইরোবি শহর নিয়ে অনেক গল্প হলো। সন্ধেবেলা জানালা দিয়ে নিওন আলোয় ভরা শহরটা দেখে মনে আশা জাগল। সেই রাতে বিয়াট্রিস নিজেকে যুবকের কাছে সঁপে দিল। নতুন একটা ভোরের প্রতিশ্রুতি বুকে নিয়ে খুব হাল্কা লাগল তার নিজেকে। উৎফুল্ল অনুভব করল। গভীর ঘুম হলো সে রাতে। ঘুম থেকে উঠে দেখল ঘিয়ে রঙের পোজো গাড়ি চালানো যুবকটি নেই। তার সঙ্গে আর কোনওদিন দেখা হয়নি বিয়াট্রিসের। নিরুপায় হয়ে সেখানেই একটা বারে কাজ নিল। এভাবেই বারে পরিবেশিকা হিসেবে কাজ করা শুরু। এর পরে গত দেড় বছরে বাড়িমুখো হয়নি সে। মা-বাবাকে চোখের দেখা দেখেনি একটিবারের জন্যেও। এসব ভাবতে ভাবতে ফুঁপিয়ে কেঁদে ফেলল বিয়াট্রিস। নিজের প্রতি করুণা হলো। প্রতিনিয়ত অপমান আর পালিয়ে বেড়ানোই যেন তার জীবনের কাহিনি। বারের এই জীবনে সে কখনই সেভাবে অভ্যস্ত হতে পারেনি। সবসময় ভেবেছে এই বুঝি সে নতুন কোনও ভালো কাজের সুযোগ পাবে। কিন্তু সে আর হয় না। একটা ফাঁদে আটকা পড়ে আছে যেন। এখন এটাই তার একমাত্র চেনা জীবন। যে জীবনের নিয়ম, কৌশল আর ছলাকলা আয়ত্তে আসেনি তার। আবার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। নীরবে আরেক ফোঁটা পানি চোখ থেকে গড়িয়ে পড়ে। কিন্তু দীর্ঘশ্বাসটা মাঝপথে থেমে যায়। লক্ষ করল লোকটা অনেকক্ষণ আগেই ঘুমিয়ে পড়েছে। নাক ডাকার শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। একটা অদ্ভুত শূন্যতা গ্রাস করে যেন বিয়াট্রিসকে। তিক্ততায় ভরে উঠল ভেতরটা। অপমানে সজোরে কেঁদে উঠতে চাইল। অনেক পুরুষের কাছে গিয়েছে সে। তারা নিষ্ঠুরভাবে কষ্ট দিয়েছে তাকে। কেউ কেউ হেসেছে তার নীতিবোধ আর সরলতা দেখে। কেউ কেউ সেই সরলতাকে ভেবেছে ন্যাকামি। ভেবেছে একরকমের ছেনালপনা। সেসব মেনে নিয়েছে সে। কিন্তু এই মানুষটা কীভাবে তাকে অপমান করে ? এই লোকটা নিজেও কি ভাগ্যের নির্মম পরিহাসের শিকার নয় ? এই যে বিগত কতগুলো শনিবার সারারাত ঘ্যান ঘ্যান করে লোকটা কি তাকে তার জীবনের গল্প শোনায়নি ? তাতে কি তার মনের ভার লাঘব হয়নি ? হ্যাঁ, নগদ টাকা লোকটা তাকে দেয়। কিন্তু সেটা দিয়ে কি বিয়াট্রিসের আন্তরিকতার পুরোপুরি দাম হয় ? এখন লোকটা তার বুকের ভেতরের প্রচণ্ড কষ্টের কথা না শুনে আরাম করে ঘুমাচ্ছে ? গত দেড় বছরের সমস্ত অপমান আর তিক্ততায় জমে ওঠা সমস্ত ক্ষোভ এই মুহূর্তে সে অনুভব করল ঘুমিয়ে থাকা লোকটার প্রতি। তার সকল দুর্ভাগ্যের জন্যে দায়ী যেন লোকটা।
লোকটার চোখ স্পর্শ করে দেখল। গভীর ঘুমে অচেতন। আস্তে আস্তে ঘুমন্ত মানুষটার মাথা তুলে ধরে বালিশের পাশে নামিয়ে দিল। কান্নাভেজা চোখে এখন তার শীতল দৃষ্টি। বালিশ সরিয়ে টাকাগুলো হাতে নিল। গুনে দেখল পাঁচ পাঁচটা গোলাপি নোট। নোটগুলো নিয়ে তাড়াতাড়ি বক্ষবন্ধনীর ভেতরে গুঁজে ফেলল। এরপর সাত নম্বর ঘর থেকে বেরিয়ে এল। বাইরে তখনও বৃষ্টি হচ্ছে। নিজের ঘরে ফিরতে ইচ্ছে করল না তার। ছোট কুঠুরির মতো যে ঘরে সে থাকে সেখানে ফিরে গিয়ে হামবড়া স্বভাবের রুমমেটের বকবক শোনার মানে নেই। ট্রিটপ থেকে বেরিয়ে জল আর কাদার মধ্যে হাঁটতে শুরু করল সে। নিজের অজান্তেই যেন সে নিয়াগুথির ঘরের দিকে এগোল। দরজায় কড়া নাড়লো। প্রথমে কোনও সাড়া পেল না। তারপর নিয়াগুথির ঘুমে জড়ানো কন্ঠ শুনতে পেল, ‘কে ওখানে ?’
‘আমি। একটু খুলবে ?’
‘আমি কে ?’
‘আমি বিয়াট্রিস।’
‘এত রাতে কি ?’
‘দয়া করে খুলবে দরজাটা ?’
ঘরের ভিতরে আলো জ্বলল। ছিটকিনি খোলার শব্দ হলো। খুলে গেল দরজাটা। বিয়াট্রিস ঢুকলো ভিতরে। নিয়াগুথির মুখোমুখি দাঁড়ালো। একটা পাতলা ফিনফিনে রাতের পোশাক পরনে নিয়াগুথির। কাঁধে একটা সবুজ সোয়েটার।
‘বিয়াট্রিস! কোনও সমস্যা ?’ বিস্মিত কন্ঠে জিজ্ঞেস করল নিয়াগুথি। কণ্ঠে উদ্বেগ।
‘এখানে কিছুক্ষণ থাকতে পারি ? আমি ভীষণ ক্লান্ত। তোমার সঙ্গে কিছু কথা আছে।’ বিয়াট্রিস বেশ জোরের সঙ্গে বলল।
‘কিন্তু হয়েছে কি সেটা আগে বলবে ?’
‘আমি শুধু তোমার কাছে একটাই কথা জানতে চাই, নিয়াগুথি।’
তখনও তারা দাঁড়িয়ে। তারপরে দুজনেই বিছানার কিনারে মুখোমুখি বসল।
‘তুমি কেন বাড়ি ছেড়েছ, নিয়াগুথি ?’ বিয়াট্রিসের প্রশ্ন। একটা মুহূর্ত নীরব। নিয়াগুথি যেন প্রশ্নটা বোঝার চেষ্টা করছে। বিয়াট্রিস অপেক্ষা করছে জবাবের জন্যে। অবশেষে নিয়াগুথি মুখ খুলল। কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, ‘সে অনেক কথা, বিয়াট্রিস। আমার বাবা-মা বলতে গেলে বেশ অবস্থাপন্ন ছিল। তারা ধার্মিক খৃস্টান। আমাদের অনেক নিয়ম মেনে চলতে হ’ত। যারা ধর্মকর্ম মানে না কিংবা যারা বিধর্মী তাদের সঙ্গে মেশা বারণ ছিল। বিশেষ করে প্যাগানদের ওসব নাচগান কিংবা খতনার উৎসব―ওসব থেকে দূরে থাকার কড়া নির্দেশ ছিল। কখন কীভাবে কী খাবার খাওয়া যাবে কি যাবে না সেসবের কড়া নিয়ম ছিল। এমনকি একজন প্রকৃত খ্রিস্টান নারীর মতো করে হাঁটারও নিয়ম ছিল। ছেলেদের সঙ্গে মেশা ছিল বারণ। সারাক্ষণই কোনও না কোনও নিয়ম মেনে চলতে হতো। একদিন ইশকুল থেকে ফেরার বদলে আমি আর আমাদের মতো পরিবারেরই আরেকটা মেয়ে পালিয়ে গেলাম ইস্টলেই-এ। তারপর গত চার বছরে আর বাড়িমুখো হইনি। ব্যস।’
আবার নীরবতা। দুজনে একে অন্যের দিকে তাকিয়ে রইল। যেন আজ তারা বুঝতে পারছে একে অপরকে।
‘আরেকটা প্রশ্ন, নিয়াগুথি। এমন নয় যে তোমাকে জবাব দিতেই হবে। আমার সব সময়ে মনে হয়েছে তুমি আমাকে ঘেন্না করো। আমাকে সহ্য করতে পারো না।’
‘না, না, বিয়াট্রিস। আমি তোমাকে কোনওদিন ঘেন্না করিনি। সত্যি বলতে কি আমি কোনওদিনই কাউকে ঘেন্না করিনি। আসলে ব্যাপারটা হলো আমি আর কোনও কিছুতেই উৎসাহ পাই না। কারও প্রতি আমার কোনও কৌতূহল নেই। কোনও পুরুষই আমাকে আর টানে না। তবু মাঝে মাঝে জীবনে তাৎক্ষণিক উত্তেজনা অনুভব করতে লোভ হয়। মাঝে মাঝে ঐসব মিথ্যে প্রেমভরা চোখগুলোর মনোযোগ পেতে চাই। তার মাঝে যেন নিজেকে খুঁজে পাই। কিন্তু তোমাকে দেখে মনে হতো তুমি এসবের ঊর্ধ্বে। মনে হতো তোমার ভিতরে কিছু একটা আছে যা আমার মাঝে নেই।’
অনেক কষ্টে নিজের চোখের জল সামলালো বিয়াট্রিস।
সেদিন খুব ভোরে নাইরোবিগামী একটা বাসে চেপে বসল বিয়াট্রিস। নাইরোবি এসে বাজার স্ট্রিট ধরে দোকানপাট দেখতে দেখতে হেঁটে বেড়াল। সেখান থেকে গভর্নমেন্ট রোড, তারপরে ডানে এসে কেনিয়াত্তা এভিনিউ আর কিমাথি স্ট্রিট। এরপরে হুসেন সুলেমান স্ট্রিটে একটা দোকানে ঢুকে সেই শখের স্বচ্ছ নাইলনের আর সিল্কের লম্বা কতগুলো মোজা কিনল। এক জোড়া পরে ফেলল। তারপরে একটা দামি পোশাক কিনল। সেটাও পরল দোকানে। একটা বাটা জুতার দোকানে ঢুকে একজোড়া হাইহিল জুতা কিনে পায়ে দিয়ে বেরিয়ে এল। পুরনো জোড়া ফেলে দিল। আকাম্বা কিওস্ক থেকে এক জোড়া কানের দুল কিনে পরে আয়নাতে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে নিজেকে দেখল।
হঠাৎ অনুভব করল প্রচণ্ড খিদে পেয়েছে। যেন কতদিন কিছু পেটে পড়েনি। মতি মহলের সামনে এসে দাঁড়িয়ে একটু দ্বিধা করতে লাগল। অবশেষে সোজা হেঁটে গিয়ে ফ্রান্সি হোটেলে ঢুকল। নতুন সাজপোশাকে তার চোখে মুখে ফুটে রইল উজ্জ্বল এক আভা। অনেক পুরুষ ঘুরে ঘুরে তাকাতে লাগল তার দিকে। একটা শিহরণ অনুভব করল সে। এক কোণে একটা টেবিল বেছে নিয়ে বসল। ইন্ডিয়ান কারি অর্ডার করল। এমন সময় হঠাৎ একটা লোক নিজের আসন থেকে উঠে এসে তার টেবিলে বসল। বিয়াট্রিস তাকাল লোকটার দিকে। আপত্তি করল না। বরং চোখে একটা খুশির আমেজ। লোকটার পরনে গাঢ় রঙের সুট। চোখে কামার্ত দৃষ্টি। বিয়াট্রিসের জন্যে পানীয় অর্ডার করল লোকটা। তারপর আলাপ জমাতে চাইল। বিয়াট্রিস নীরবে খেতে লাগল। লোকটা টেবিলের নিচে হাত দিয়ে বিয়াট্রিসের হাঁটু স্পর্শ করল। পা সরিয়ে নিল না সে। প্রশ্রয় পেয়ে আস্তে আস্তে লোকটার হাত হাঁটু ছাড়িয়ে উপরে উঠতে লাগল। তারপর হঠাৎ খাবার ফেলে পানীয় স্পর্শ না করেই বিয়াট্রিস উঠে দাঁড়ালো। সোজা হেঁটে বেরিয়ে যাবার জন্যে রওনা দিল। কাজটা করে মজা লাগল তার। পিছনে না তাকিয়েও বুঝল যে লোকটা তাকে অনুসরণ করছে। তারপরে লোকটা তার পাশেপাশে কিছুদূর হাঁটল। মুচকি হাসল বিয়াট্রিস। কিন্তু লোকটার দিকে তাকাল না। এই অদ্ভুত আচরণে লোকটা যেন আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলল। একটা দোকানের সামনে তাকে কিছুটা অপ্রস্তুত অবস্থায় ফেলে চলে এল বিয়াট্রিস। ইলমোরগে ফেরার জন্যে যখন বাসে উঠল, কয়েকজন পুরুষ উঠে তাকে আসন ছেড়ে দিল। এটা যেন তার অধিকার সেভাবেই গ্রহণ করল ব্যাপারটা সে।
ট্রিটপে ফিরে এসে সোজা কাউন্টারে গেল। ততক্ষণে বারে কেউকেটাদের ভিড় বেশ জমে উঠেছে। তাকে দেখে অনেকে চুপ হয়ে গেল। লোভী চোখে তাকিয়ে রইল তার দিকে। বারের পরিবেশনকারী মেয়েরাও তাকে দেখছে। এমনকি নিয়াগুথির চোখেও সেই বিরক্ত একঘেয়ে দৃষ্টি নেই। সবার জন্যে পানীয় অর্ডার করল বিয়াট্রিস। বারের ম্যানেজার দ্বিধান্বিতভাবে এগিয়ে এল তার দিকে। কাজ ছেড়ে কোথায় ছিল জানতে চাইল। কেনই বা গিয়েছিল। আমতা আমতা করে এটাও জিজ্ঞেস করল বিয়াট্রিস ঘর গোছানো আর ঝাড়পোঁছের বদলে বারের কাউন্টারে নিয়াগুথির সঙ্গে কাজ করতে রাজি কিনা।
একটা মেয়ে এগিয়ে এসে বিয়াট্রিসের হাতে একটা চিরকুট ধরিয়ে দিল। কোনও একজন সম্মানী খদ্দের জানতে চেয়েছেন বিয়াট্রিস তার সঙ্গে একই টেবিলে বসবে কিনা। আরও বেশ কিছু চিরকুট পেল। একটাই প্রশ্ন তাদের। আজ রাতে বিয়াট্রিসের সময় হবে কিনা। আপত্তি না থাকলে নাইরোবি ঘুরতে নিয়ে যেতে চায় কেউ কেউ। কাউন্টারেই বসে রইল সে। কোথাও গেল না। কয়েকজন পানীয় অর্ডার করেছিল তার জন্যে। সেগুলোতে মৃদু চুমুক দিতে লাগল। নিজের ভেতর অদ্ভুত একটা ক্ষমতা উপলব্ধি করল সে। একটা আত্মবিশ্বাস যেটা আর কোনওদিন সে অনুভব করেনি।
একটা শিলিং নিয়ে সøটে পুরে দিতেই জুকবক্স থেকে রবিনসন মোয়াঙ্গির গলায় বেজে উঠল ‘হুনয়ু ওয়া মাশামবানি’ গানটা। গানটা সেইসব খামারে কাজ করা অবহেলিত মেয়েদের নিয়ে, শহুরে মেয়েদের চেয়ে যারা একেবারে আলাদা। তারপর কামারু আর ডিকে-এর একটা করে গান বাজালো বিয়াট্রিস। অনেকেই তার সঙ্গে নাচতে চাইল। কাউকে পাত্তা দিল না সে। শুধু মুহূর্তটা উপভোগ করতে লাগল। ডিকে-র গানের তালে তালে কোমর দোলাতে লাগল সে। নিজেকে মুক্ত মনে হলো তার। শরীর যেন পালকের মতো হালকা। টানটান উত্তেজনা ভরা বাতাসে ভেসে বেড়াল সে।
তারপর হঠাৎ সন্ধ্যা ছটার দিকে পাঁচটনি লরি চালানো লোকটা ঝড়ের বেগে বারে ঢুকল। সেই খাকি মিলিটারি ওভারকোটটা পরনে আছে। পেছনে একজন পুলিশের লোক। ঢুকে চারদিকে তাকাতে লাগল সে। বারের সবাই পুলিশ দেখে বিস্মিত। বিয়াট্রিস থামল না। নেচেই চলেছে। প্রথমে লরিওয়ালা বিয়াট্রিসকে খুঁজে পেল না। কিছুক্ষণ পরে হঠাৎ বুঝতে পারল নেচে নেচে যে মেয়েটা জুকবক্সের কাছে নিজের গৌরবের মুহূর্তটাকে উপভোগ করছে, সেটাই বিয়াট্রিস। যখন বুঝল তখন বিজয়ের কণ্ঠে চিৎকার করে উঠল, ‘ঐ যে ঐ মেয়েটা। ঐ মেয়েটাই চোর।’
বারের লোকজন সবাই যার যার চেয়ারে গিয়ে বসে পড়ল। পুলিশ অফিসার এসে বিয়াট্রিসকে হাতকড়া পরাল। কোনও বাধা দিল না বিয়াট্রিস। দরজার কাছে পৌঁছে শুধু একবার ফিরে তাকাল পিছনে। ঘৃণা ভরে থুতু ফেলল। তারপর পুলিশ অফিসারের পিছনে পিছনে হেঁটে গেল।
বারে পিনপতন নীরবতা। কেউ একজন কোনওরকম রক্তারক্তি ছাড়া এমন একটা ‘মিষ্টি’ ডাকাতির ঘটনা নিয়ে কৌতুক করায় সবাই হাসিতে ভেঙ্গে পড়ল। বিয়াট্রিসকে নিয়ে সবাই কথা বলছে। কেউ বলল মেয়েটাকে ধরে আচ্ছাসে পেটানো দরকার। কেউ কেউ মাথা নেড়ে বলল, ‘এসব বারের মেয়েদের কেউ বিশ্বাস করে!’ বেশির ভাগ লোকই মাথা নেড়ে হতাশ কণ্ঠে শহরে সংখ্যায় বেড়ে যাওয়া অপরাধ নিয়ে হা হুতাশ করল। তাদের কারও কারও মতে চুরির জন্যেও মৃত্যুদণ্ডের শাস্তি থাকা দরকার। এসবের মাঝে কখন যেন পাঁচটনি লরি চালানো লোকটা নায়কের আসন পেয়ে গেল। সবাই তাকে ঘিরে ধরে বিস্তারিত ঘটনা শুনতে চাইছে। কেউ কেউ তার জন্যে মদের অর্ডার দিল। এতদিন পরে অবশেষে সবার কাছে গুরুত্ব পেল লোকটা। শুধু তাই নয়, সবাই তার গল্প শুনলো মন দিয়ে। মাঝে মাঝে প্রশংসার হাসিও হাসলো কেউ কেউ। চুরির প্রতি ঘৃণা যেন সবাইকে একটা বন্ধনে আবদ্ধ করল সেদিন। লোকটা প্রথমবারের মতো সম্মান পেল অন্যদের কাছ থেকে। রসিয়ে রসিয়ে বিস্তারিত ঘটনা শোনাল সবাইকে।
আর কাউন্টারের পিছনে দাঁড়ানো নিয়াগুথির চোখে তখন জল। সে কাঁদছে।
সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ



