আর্কাইভগল্প

বিকল্প : মণিকা চক্রবর্তী

প্রচ্ছদ রচনা : গল্পসংখ্যা ২০২৪―গল্প

এলিনা তখনও চুপ করে তাকিয়েছিল গরম কফির ওপর ভেসে থাকা ক্রিমের নরম স্তরের ওপর। চারপাশের সবটুকু সময়, কোলাহল ও পারস্পরিক কথা বিনিময়ের মাঝখানে কোথা থেকে এক অন্য অনুভব রচিত হলো যেন। হে প্রেম হে নৈঃশব্দ্য!

কফির কাপের গায়ের উষ্ণতা ছুঁয়ে ছুঁয়ে সে তখনও ভিতরে  ভেতরে খুুঁজে যাচ্ছিল কতটা গভীরে তার অনুভবের শিকড়! দ্রুত ফুরিয়ে আসছিল সময়। কফির কাপের সামনে মুখোমুখি ওরা দুজন। এই নীরব কফি পানের খেলায় বারবার সে যেন নিজেকে দেখে নিচ্ছিল, বারবার ভিন্ন ভিন্ন রূপে। মন্থর সঙ্গীতের মতো ঘনাচ্ছে বিকেল। তার উঠে পড়বার সময় বড় কাছে। বড্ড তাড়া আছে তার, বাসা থেকে মাত্র এক ঘণ্টার জন্য সময় চেয়ে নিয়েছিল সে। ঠিক ঠিক সময়ে না পৌঁছলে নানা বিপত্তি। তবু, এই ছায়া ছায়া দিনের অন্ধকারের ভিতর নিজেকে লুটিয়ে দিয়ে আছাড়ি বিছাড়ি সময়ের ভিতর আরেকবার জন্মের আকুতি সে ঠিকই টের পাচ্ছিল। সে যেন এক জিয়ন কাঠির ছোঁয়ায় নতুন এক মানুষ হয়ে উঠছিল।

সেদিন কফি শপে ঢোকার মুখে ট্রাফিক জ্যামে আটকে পড়েছিল সে কিছুক্ষণ। আর তখনই তার চোখ যেদিকে অনেকক্ষণ ধরে তার দৃষ্টিকে স্থির রেখেছিল, তা ছিল একটি পঙ্গু ছেলের সঙ্গে লেপ্টে জড়িয়ে থাকা আপনজনটি। তারা দুজনে রাস্তায় ট্রাফিক জ্যামের সুযোগে ভিক্ষা করছিল। আর এই বিদঘুটে দৃশ্যটিও তুলে ধরেছিল তার মধ্যে এক ভালোবাসাময় যাপনের অন্তরঙ্গ দিকটিকে। সে যেন সত্যিই হিংসে করেছিল সেই ভিখারিকে। কেন! তার এরকম একজন সঙ্গী আছে বলে! হুম, সে দেখছিল, তারা পরস্পরকে ভালোবেসে এক সমর্পণের প্রক্রিয়ায় দু’জনেই হয়ে উঠেছিল দুজনের কাছে অপরিহার্য।

প্রাত্যহিকতার প্রয়োজনে ওরা পরস্পরকে নিবিড়ভাবে ধরে রেখেছিল, আর কী এক ঘোরে ওরা হাত পেতে দাঁড়াচ্ছিল প্রতিটি গাড়ির জানলায়। কিছু টাকা পয়সা জড়ো হচ্ছিল ওদের থলিতে, কিন্তু ওরা পরস্পর ছিল স্থির, নির্ভীক, আর গতিময়। এলিনার একবারও মনে হয়নি, ওরা ছিন্নমুল মানুষ, বরং উবারে বসে তার নিজেকেই মনে হচ্ছিল শিকড়হীন। ওরা যেন জেনেছিল, তাদের ক্ষুদ্রজন্মকে, আর পাশাপাশি মহান সৃষ্টিকেও। এলিনা যেন তাদের থেকে অনেক অজ্ঞ, জীবন সম্পর্কে ও মহত্ত্ব বিষয়ে যার কিছুই জানা নেই।

২.

সে যে কতটা অজ্ঞ, তা সে প্রথমে জেনেছিল বয়ঃসন্ধিকালে। তখন তার বয়স বারো বা তেরো। খুব ছোট বয়সে অ্যাক্সিডেন্টে বাবার মৃত্যুর পর, তার সৎ বাবার প্রবল ইচ্ছাতেই, পরিবারের আর সবার চাপে তার মা দ্বিতীয় বিয়েতে রাজি হয়। মা আর সৎবাবাকে নিয়েই তার পরিবার। সচ্ছল রাজনীতিসংশ্লিষ্ট পরিবারে সবকিছুই বড় বেশি ঠিকঠাক। বাইরে থেকে বোঝাই যায় না, কোথাও রয়েছে রক্ত সতর্ক করে দেওয়া কিছু মুহূর্ত! আর সেই মুহূর্তগুলির মধ্যে দিয়ে তার চলা শুরু হলো বয়ঃসন্ধির প্রথম থেকেই।

নয় বছর থেকেই, আলাদা বিছানায় ঘুমায় এলিনা। ওর রুমের অনেক খেলনা পুতুলের সঙ্গে ভাব-বোঝাপড়ার দিন তখন শেষ, বরং অন্য রকমের দুষ্টুমির দিন শুরু। এখন অনেক কিছুর প্রতি আকর্ষণ!

নিজস্ব আবেগগুলোকে নিয়ে কী করবে ভেবে পায় না সে। কখনও কখনও এত মন খারাপের চাপ আসতে থাকে মনের ওপর যে, সে কোনও কারণ ছাড়াই ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কাঁদতে থাকত বড় ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে। কাঁদবার জন্য জায়গাটি সত্যিই ভালো ছিল। চোখের জল মুছে দেবার জন্য কেউ ছিল না বলে, নিজে নিজেই কান্না শেষে চোখের জল মুছতে শিখল সে, নিজেরই হাতের চেটোয়। একটু দুরে ফ্লোরে পড়ে থাকে তার পছন্দের পুতুল। খেলতে খেলতে পুতুলের একটি হাত কবেই হারিয়ে ফেলেছে সে। এসব ভর দুপুরগুলিতে মায়ের কথা খুব মনে পড়ে তার। সকাল বেলায় মায়ের সঙ্গে সে স্কুলে গেছে, কিন্তু ফিরেছে ঠিকা বুয়ার সঙ্গে।

মা কেন তাকে আনতে স্কুলে গেল না! সব বাচ্চারা তো মায়ের সঙ্গেই বাড়ি ফেরে। কিন্তু তার বেলায়! বুয়া তাকে স্কুল থেকে এনে, খাইয়ে-দাইয়ে, গোসল সারিয়ে টিভির সামনে বসিয়ে দিয়ে ঘরের কাজ করতে থাকে। সে কেবলি বুয়াকে বিরক্ত করে। ধীরে ধীরে এইসব দিনগুলিরও অবসান হতে থাকে। বড় হতে থাকে সে। মা যেন আছে সঙ্গে, আবার নেইও। থাকা না থাকার এই দ্বন্দ্বটা সে টের পেতে থাকল, বড় হতে হতে।

সে জানল, মায়ের দ্বিতীয় বিয়েটা মনোমত হয়নি। একটা গাড়ি অ্যাকসিডেন্টে এলিনার বাবার মৃত্যুর পর তাদের মা-মেয়ের জীবনটা পুরোপুরি এলোমেলো হয়ে গিয়েছিল। এলিনার মা জীবনের দিক থেকে যেন মুখ ফিরিয়েই নিয়েছিল।

মায়ের এই দ্বিতীয় বিয়েটা দেওয়া হয়েছিল পরিবারের সবার পরামর্শে, তাই মায়ের আপত্তি কারও শুনবার ধৈর্য ছিল না। বিয়ের পর, তার সৎবাবার প্রচুর আর্থিক ক্ষমতা মায়ের চাকরিকে ভেবেছে উপদ্রব। কখনও চায়নি তার মা চাকরি করুক। এই কাজটি সে অনেক আগে থেকেই করত বলে শেষ পর্যন্ত সেটা চালিয়েই গেল। অনেক সময় পরিবারে এইসব নিয়ে অশান্তি হয়েছে, যা এলিনা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে টের পাচ্ছিল।

তাকে স্কুল থেকে কে নিয়ে আসবে, তা নিয়ে একটা বড় রকমের সমস্যা তৈরি হবার মুহূর্তে তার বাসার ঠিকাবুয়াই এই ভারটুকু নিল, তার বাবার পরামর্শে। মাঝে মাঝে ড্রাইভারের সঙ্গেও সে স্কুল থেকে বাড়ি ফিরত মøানমুখে।

বাড়িতে খালামনিরা মাঝে মাঝে বেড়াতে আসত, কিন্তু এলিনা দেখত তার মা কখনও তাদের মতো স্বাভাবিক আর উচ্ছল নয়। তার খালামনিরাও আড়ালে-আবডালে বলত, ‘দ্বিতীয় বিয়েতে শফিকের মতো ভালো ছেলে পাওয়া তো ভাগ্যের ব্যাপার! অথচ দেখ, আমাগো এলিনার মায়ের হাবভাব! কথাই কয় না, ধরারে সরাজ্ঞান, ওইডাই হইছে! শফিক বড় বড় মন্ত্রী মিনিস্টারদের সঙ্গে ওঠা বসা করে। ওর কত পাওয়ার! ওর ট্রাভেল এজেন্সির ব্যবসার লাখ-লাখ টাকা। ওর কী দরকার ছিল এলিনার মাকে বিয়ে করতে যাবার! আগের সংসারের একটা মেয়েসহ! বড় মনের মানুষ বলেই এমনটা করেছিল! কথায় বলে না, ভালো মানুষের জায়গা নাই! কথা সত্য!’

সঙ্গে সঙ্গে আরেক খালা বলে উঠল, ‘এলিনার মায়ের তো কোনও কৃতজ্ঞতাই নাই। শফিকের সঙ্গে বিয়ে না হলে কীভাবে মেয়েটাকে বড় করত সে! মানলাম অ্যাক্সিডেন্টের পর মনের ওপর একটা ধকল গেছে! তাই বলে এতদিনেও এটা কাটানো গেল না! শফিক চায় না, চাকরি করুক। তবু করবে! কয় টাকা বেতন পায়! শফিক কি কোনও কিছুর অভাব রেখেছে! খামাখা সংসারের মধ্যে গণ্ডগোল পাকায়। সকালে কোনও এক বুটিকের দোকানে যায়, আর সন্ধ্যায় ফিরে!’

এলিনা আত্মীয়-পরিজনদের মুখে এসব শুনতে শুনতে বড় হয়। কিছু বোঝে, কিছু বোঝে না। বাড়িতে এত কিছুর আয়োজন, কিন্তু মা যেন সেই কবেকার বিধবা। যেন পৃথিবীর সবকিছুতেই তার আড়ষ্টতা। সকালে উঠে ঠিকা বুয়ার কাছে সংসারের দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে কোনও রকমে সে তার পছন্দের বুটিক ডিজাইনের অফিসটাতে যেতে পারলেই খুশি হয়। বুটিক শপটা বেশ ভালোই চলত, মায়ের কয়েকজন বান্ধবী মিলে খুলেছিল পোশাকের এই ব্যবসাটি। ব্যবসাটা সম্প্রসারিত হয়েছে, পোশাকের সঙ্গে সঙ্গে খাবারের দোকানের দিকে। কিন্তু তার মা, এখনও প্রায় সামান্য বেতনেই পোশাকের দিকটাই দেখে। খুব ছোট বাচ্চাদের পোশাকের ডিজাইন করে। এলিনা, বড় হতে হতে বুঝে, এটাই তার মায়ের একমাত্র পছন্দের জায়গা, যা তাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। মাঝে মাঝে সে বিনা কারণেই এলিনার জন্য সুন্দর সুন্দর ডিজাইন করা ফেব্রিকের অনেকগুলো ড্রেস নিয়ে আসে। তারপর এলিনাকে ড্রেসটা পড়িয়ে একটু সাজায়, মুখে একটু চুমু দেয়। তারপর বলে, তুই খুব দ্রুত বড় হয়ে যাচ্ছিস। এত তাড়াতাড়ি কেন বড় হতে হয়!

তুমি কি চাও না মা, আমি বড় হই ?

না, একদম চাই না।

তারপর এলিনার মুখের গোলাপি ব্রণের দিকে তাকিয়ে বলে, আমি না চাইলেও বড় হওয়া থেমে থাকবে না। যেন হঠাৎ, তার মুখের গোলাপি ব্রণটার দিকে তাকিয়ে রেগে ফেটে পড়তে চায়। এলিনা বুঝতে পারে না, কী করা উচিত!

তারপরে যতদিন সে নিজের গালে দু-একটি ব্রণের দেখা পেত, বাথরুমে যেয়ে নানা প্রকার লোশন দিয়ে ঘষে ঘষে তাকে তুলে ফেলবার চেষ্টা করত। কখনও কখনও গোলাপি লিপস্টিক লাগিয়ে রাখত ব্রণের ওপর যাতে বোঝা না যায়।

মা যে এক নীরব রহস্যময় জগতে নিজের মতো বাঁচত, এলিনা ছোটবেলায় তা দেখে দেখে বড় হলেও, বড় হতে হতে তার মনে হতে থাকল, তাদের মা-মেয়ের জীবনটা আসলে এক দুঃস্বপ্নের মতো। যেখানে বাবার ভূমিকাটা সে ঠিকঠাক বুঝে উঠতে পারত না। এই লোকটি কি সত্যিই তার বাবা! কিন্তু! অনেক কথা যে তার মনের মধ্যে ঘুরপাক খায়, যা কাউকে বলা যায় না। যদিও তার বাবার একটা চমৎকার বাড়ি আছে, আর সেই বাড়ির প্রতিটি কোনায় কোনায় লুকিয়ে থাকা আতঙ্করা যে সূক্ষ্মভাবে উপস্থিত, সেটা আর কেউ টের না পেলেও সে আর তার মা দু জনে মিলে ঠিক-ঠাক টের পায়।

৩.

দুঃস্বপ্নের ভিতরের জীবনটাকে চেনা গেলেও তার ভিতর থেকে বের হয়ে আসার উপায়টা এলিনা কেবলি খুঁজত। এই ঘরের প্রতিটি মানুষ যেন ভিন্ন গ্রহের। এক নিরুত্তাপ সস্পর্কের ভিতর প্রাণ যেন অন্ধকারের ভিতর নিঃশব্দে বয়ে চলেছে। এইসব অন্ধকার দিনের ভিতর এলিনা মন খারাপের ভার বুকে নিয়ে ফ্যাকাশে রঙের প্রজাপতি, আর লতা পাতা এঁকে ভরিয়ে তোলে ছবি আঁকার খাতা।

বয়ঃসন্ধির এক সন্ধ্যায় সে হঠাৎ আবিষ্কার করে, তার দু পায়ের ভিতর দিয়ে গড়িয়ে যাচ্ছে রক্তের ধারা। কাকে বলবে সে! দৌড়ে গেল বুয়ার কাছে। বুয়াই নরম স্বরে বুঝিয়ে দিল পুরো বিষয়টা। তারপর বলল, পুরুষ মানুষের ধারে কম যাইবা। এমনকি বাপের ধারেও যাইবা না। এহন কিন্তু তুমি বড় হইলা। সাবধানে থাহন লাগব। বুয়া কিন্তু কথাটা হেসে হেসে বলছিল। কিন্তু এলিনা ভাবল, বাবা যে প্রতি রাতেই তার ঘরে আসে এটা কি বুয়া জানে! কিন্তু বাবা তো বলেছে, এই কথা কাউকে বলা যাবে না! তাহলে ওর মা মরে যাবে!

বিস্ময় নিয়ে সে অপলক তাকিয়ে থাকে বুয়ার দিকে।

মায়ের মৃত্যুদৃশ্যের জন্য খুব বেশিদিন অপেক্ষা করতে হলো না তাকে। একদিন স্কুল থেকে ফিরে দেখল বাড়িভর্তি মানুষ। ঘরের বারান্দার মেঝে সাদা চাদরে ঢাকা তার মায়ের শরীর। খালামনিরা তাকে জড়িয়ে ধরে কান্নাকাটির সঙ্গে সঙ্গে কীসব অদৃশ্য সংকেতে যেন অনেক কথা বলে গেল, তার মাথায় কিছুই ঢুকছিল না। সে সাদা কাপড়টি তুলে মায়ের মুখটি দেখল একবার―একেবারে নীল হয়ে ছিল সবটুকু মুখ। কে যেন এলিনার কানের কাছে ফিসফিস করে বলে গেল বিষ খেয়েছে। কোনও বিচার হবে না, এমনিই মাটি দিয়া ফেলবে। তবে কি মা সব জানত! বাবা যে তার ঘরে যায়, কাউকে তো সে বলেনি, তবু মা মরে গেল কেন! চারপাশের অনেক উপস্থিতির মাঝেও সে যেন নীরবে এক কোণে স্তব্ধ হয়ে রইল। মানুষের অনেক স্বরের মধ্যে তার নিজস্ব স্বরটা ক্রমেই ডুবে যেতে থাকল নিজের ভিতর। চারপাশের কথাবার্তাকে মনে হতে লাগল স্রেফ ঝিঁ-ঝিঁ পোকার ডাকের শব্দ।

এইসব শোকবিহ্বল পরিবেশে, অনেক মানুষের ভিড়ের ভিতর কখন যে সতেরো-আঠারো বছরের একটি অসম্ভব সুদর্শন ছেলে তার হাতটি ধরে রেখেছিল, তার ঠিক মনে পড়ছিল না। তার হাতে ছিল ভালো মানের একটি ক্যামেরা। সম্ভবত বুুটিক শপের কিছু ডিজাইনের ছবি নিয়ে সে মায়ের কাছে এসেছিল, সেগুলি মাকে দেবার জন্য। বাসায় আসার পর ভয়াবহ অবস্থায় সে নিজেও ঠিক করতে পারছিল না কী করা উচিত। বারান্দার এক কোণে দাঁড়িয়ে সে শুধু তার ফোন নাম্বারটা এলিনাকে দিয়ে বলে, তোমার মায়ের কিছু জিনিস আমার কাছে আছে। পরে সময় করে আমাকে ফোন করো, আমি দিয়ে যাব।

৪.

মায়ের মৃত্যুর বেশ কিছুদিন পরে এলিনা এক বৃষ্টিদিনের মধ্যদুপুরে এসে দাঁড়ায় লাল ভেলভেটের পর্দা ঘেরা, তার মায়ের রুমটিতে। ইদানীং মায়ের ঘরটি বন্ধই থাকে। অনেক দিন পর ঘরটি খুলে মৃদু আলো জ্বালাবার পর চারপাশের লাল রঙের প্রতিফলন ও গুমোট গন্ধ মিলেমিশে নাকে এসে ধাক্কা দিল। ওয়াল ক্যাবিনেটের পাল্লাগুলি টেনে টেনে খুলবার চেষ্টা করছিল এলিনা। যেন নিশ্চিতই রয়েছে সেখানে এমন কিছু গোপন অন্ধকার, যা এলিনা এই বৃষ্টিদিনের নিরিবিলি দুপুরে আবিষ্কার করবে বলেই এখানে এসেছে। উল্টে-পাল্টে তেমন কিছু পাওয়া গেল না। কিছু শাড়ি, সায়া, ব্লাউজ, অর্ন্তবাস, সেলোয়ার-কামিজ, সানগ্লাস, মোবাইল এইসব, আর কিছু জমানো টাকা।

অথচ সে খুঁজেছিল অনেক কিছু। পর্দার আড়ালে লুকানো ছুরি বা পিস্তল, বা নিদেন পক্ষে কোনও চিরকুট। ভারী কাঁধ আর চওড়া লোমশ বুকের অধিকারী একমাত্র পুরুষটি এই রুমটিতে কখন আসতো মাংসের লোভে! যেমন করে সে আজকাল প্রতিনিয়তই রাতের গভীরে মাংসের খোঁজে আঘাত করে তার দরজায়। ভাবতে ভাবতে এলিনার দমবদ্ধ হয়ে আসে। এই বাড়ির রাতগুলো যেন ক্রমেই ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে। জানালার চারপাশের অন্ধকারে থমকে থাকে জমাট বাঁধা অন্ধকার, যেন এক মৃত্যুর প্রোর্ট্রেট। গভীর নীরবতায় হৃদয়ের ওপর বাজতে থাকে অনবরত হাতুড়ির শব্দ। তখন হয়তো অনেক দূরের আকাশে জ্বলে থাকে একটি বা দুটি তারা।

মায়ের বন্ধ মোবাইলটা চালু করার চেষ্টা করে সে। কিন্তু চার্জ না থাকাতে ব্যর্থ হয়। ফোনটা হাতে নিয়ে কল লিস্টটা বার করার চিন্তা মাথায় আসতেই এলিনার হঠাৎ মনে পড়ে গেল মায়ের মৃত্যুদিনে সেই ছেলেটির দেওয়া ফোন নাম্বারটির কথা। সত্যিই তো, প্রায় ছয় মাস হতে চলল, সে কিনা বেমালুম ভুলেই গেছে ব্যাপারটা!

মেঘ ডাকছে জোরে জোরে। চারপাশে তুমুল বৃষ্টির শব্দের ভিতর এলিনা তার ঘরে ঢুকে পড়ার টেবিলের ড্রয়ার থেকে দ্রুত বের করে আনল ছোট্ট কাগজে লেখা নাম্বারটি। নিজের বুকের ভিতর কিছুক্ষণের ধুকপুক শব্দ শুনতে শুনতে নাম্বার টিপতেই ফোনের ওইপাশ থেকে শুনতে পেল এক পুরুষ স্বর। ছেলেটির নাম মুহসিন। কথা হলো, গল্প হলো, সেদিন, একদিন―দুদিন―আরও―ক্রমাগত।

হঠাৎ যেন ধীরে ধীরে সে কণ্ঠস্বরের সঙ্গে কথোপকথনের ভিতর দিয়ে তার প্রতিবাদহীন বোবা জীবনের একটা ছায়া ছায়া প্রতিবিম্বকে সে আবিষ্কার করে ফেলল। লাল পর্দায় ঘেরা মায়ের পোষমানানো জীবনটাও যেন স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে গেল, মুহসিনের নানা কথার ভিতর দিয়ে। যা এতদিন এলিনার কাছে ছিল অস্পষ্ট, অচেনা। মুহসিন যেন অনায়াসে বুঝতে পেরেছিল তার মায়ের ক্রুশবিদ্ধ জীবনটাকে। যার সমান্তরালে সে তৈরি করতে চাইত বুটিক শপের চমৎকার রঙ ও ডিজাইনের পোশাকগুলি। মুহসিনের কাছ থেকে মায়ের অনেক কথা শোনার পর, তার চোখে নেমে এল বোবা অশ্রুর ধারা।

৫.

মায়ের মৃত্যুর পরে পাঁচ বছর ধরে এলিনার সময়গুলি অনেক দ্রুত বদলে গেছে। কিন্তু জীবনের বাধাগুলি রয়েছে আগের মতই। শুধু জীবনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মুহসিনের কণ্ঠস্বর। মুহসিনকে সে হয়তো কোনওদিনই ছুঁতে পারবে না। সে যেন কেবলই রয়ে যায়, একটি সবুজ গাছের আড়ালে। কর্মক্ষেত্রে এক দায়িত্ববান পুরুষ হয়েও, এলিনার বাবার কাছ থেকে তাকে কেড়ে নেবার সাহস সে দেখাতে পারবে না। কারণ লোকটি ভয়ঙ্কর লম্পট। সবার জীবন নিমিষেই নরক করে দেবার শক্তি সে রাখে। এলিনা অপেক্ষা করে, শুধু অপেক্ষা। এক অলৌকিক সময়ের।

ওদের ফোনালাপের সময়ে চারপাশটা ভরে যায় স্নিগ্ধতায়। সেখানে কোনও মৃত্যুদৃশ্য এসে হানা দেয় না। প্রেম ও জ্যোৎস্না তখন অপার্থিব দ্যুতি নিয়ে ঘিরে থাকে।

এলিনা এখন জানে, কী করে প্রশ্ন না করে ছায়াকে অনুসরণ করতে হয়। সে শিখে নিয়েছে হৃদয় বন্ধ রেখে কেমন করে শুধু দাঁত মেলে হাসতে হয়। সে এখন জানে তার সৎ বাবা রাতের গভীরে হঠাৎ তার ঘরে এলে তার দিকে তাকিয়ে কী করে বলতে হয়, ‘গ্ল্যাড টু মিট য়্যু’। কারণ লোকটি রাজনৈতিকভাবে অনেক শক্তিশালী। তার সঙ্গে এভাবেই কথা বলা বাড়ির নিয়ম। ঘরের আয়নায় তখন এলিনার দাঁতের চেহারা ভেসে থাকে, বিষাক্ত সাপের দাঁতের মতো।

তার শরীরের প্রতিটি লোমকূপ হতে চায় গোলাপের কাঁটা, যখন তার কমনীয়তাকে দু পায়ে মাড়িয়ে দিয়ে যায় তার সৎ বাবা নামের সম্পর্কটি। রক্তঝরানো হৃদয় নিয়ে এলিনা ভাবে, এই মরুভূমির সমান্তরালে সে কি কোনও দিন তৈরি করতে পারবে ফুলে ফুলে ভরে উঠা কোনও বাগান! যেখানে মাতাল হাওয়ায় মুক্তি পাবে তার শরীর, তার মন! লাল মখমলের পর্দায় মোড়ানো তার মায়ের বদ্ধ কক্ষটি ঘিরে সেদিন বয়ে যাবে দমকা হাওয়া, উড়িয়ে নেবে যাপনের ক্ষত!

এলিনা স্বপ্ন দেখে, একদিন সে মুক্ত হবে। জলের মতো ঘুরে ঘুরে আসে এসব স্বপ্নেরা। অন্ধকারে। ব্যথার অবিরল নীল তরঙ্গ ছড়ানো স্বপ্নের পুনরাবৃত্তির মাঝে মুহসিনকে সে অধিকার করে নিয়েছে। স্বপ্নে পাওয়া এক ছায়াময় বৃক্ষের নিচে ওরা হাঁটছে পাশাপাশি পরস্পরের হাত ধরে। গাছটি ফুলে ফুলে ভরে উঠবার অপেক্ষায়।

সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button