
প্রচ্ছদ রচনা : গল্পসংখ্যা ২০২৪―গল্প
ফৌজদারখোলা এস্টেটের বাতিখানার সিঁড়িতে বসে আসমানের দিকে তাকিয়ে থাকেন শ্রী ভবতোষ দত্ত। বুকে কবরেজি মালিশ লেপার ফলে তার হাঁপানির টান কমে আসছে। কিন্তু বাতব্যাধিতে কাহিল শরীরখানা টেনে উঠে দাঁড়াতে ইচ্ছা হয় না। দারুণ রকমের দুশ্চিন্তায় পড়লে হালফিল তার হাঁপানির টান বাড়ে। এস্টেটের কাছারি বাংলোর পেছনে চাপালিশ গাছের ছায়ায় টালির ছানি দেওয়া বাতিখানা। তার বড়সড় কামরাটির শেল্ফে রাখা আছে হরেক কিসিমের হ্যাজাক, পেট্রোমেক্স, হ্যারিক্যান লণ্ঠন ও বাহারে শেডওয়ালা বিলেতি টেবিল ল্যাম্প প্রভৃতি মিলিয়ে দুই-শ তেরোটি কেরোসিনের বাতি।
এ ছাড়া আছে ছাপ্পান্নটির মতো মোমদান ও বিজলি বাতির ছোটখাট একটি ডায়নোমা। ডায়নোমা চালিয়ে ঝলমলে বিজলি বাতির বন্দোবস্ত হয় ফৌজদারবাড়িতে কেবল পুন্যাহের দিন, আশুরার আগের রাতে দিঘির পাড়ে লাঠি খেলা ও হিন্দু প্রজাদের জন্য দুর্গাপূজার সময় যাত্রাগানের রাতে। টাংকিতে পেট্রোল ভরে ডায়নোমা চালানোর কারিকুরি কেবলমাত্র দত্তবাবুর জানা আছে, তাই সেরেস্তার কর্মচারীরা তাকে বিজলিবাবু ডাকে। এতে দত্ত মহাশয় বিশেষ কিছু মনে করেন না।
ফৌজদারবাড়িতে গড়পড়তা রাতে দরকার পড়ে সত্তরটি লণ্ঠন, হ্যাজাক বাতি ও বিলেতি টেবিল ল্যাম্পের। এগুলোর জন্য অজস্র চিমনি ধুয়েমুছে হামেহাল তাইয়ার রাখতে হয়। এস্টেটের যৌথ মালিক বড় ও ছোট সাহেবদের কুঠি ছাড়াও, বিবিদের মহলে মাগরেবের আজানের আগে সরবরাহ করতে তাদের পছন্দ-মাফিক লণ্ঠন। জাবেদা খাতায় লিখে হিসাব রাখতে হয়, কোন কুঠি বা মহলে পাঠানো হয়েছে কয়টি লণ্ঠন ও শেডের ঝালরশোভিত বিলেতি ল্যাম্প। দত্তবাবুর কাজের কোনও গাছ-পাথর নেই।
বাতিঘরের কাজ সুশারে সম্পাদন করার জন্য আছে চাকর-নওকর গোছের সাতজন নিষ্কর প্রজা। এরাই চিমনি সাফসুতরা করে বাদ-আছর তাবৎ কিছু তাইয়ার করে রাখে। তারপর বাতি-বরদার কুঁজা পিঠের বশারত মোল্লা ঠেলাগড়িতে করে কুঠি, মহল, দেউড়ি ও কাছারিতে পৌঁছে দেয় হ্যাজাক, লণ্ঠন ও বাহারি শেডের বিলেতি টেবিল ল্যাম্পগুলো। তবে, মাগরেবের আজানের আগেই, তাবৎ কিছু তদারক করতে দত্তবাবুকে এক পাক কুঠি ও মহলগুলোতে রাউন্ড দিতে হয়।
আজকের রাউন্ডে এসে বেজায় ফ্যাসাদের মাঝে পড়েন দত্তবাবু। ঘটনাটি ঘটে এস্টেটের সাত-আনি অংশের ছোট মালিক নাজিবুদৌলা সাহেবের কুঠিতে। এ বাড়ির ছোট শরিকান ধনদৌলতের দিকে থেকে তার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা আসফুদৌলা সাহেবের চেয়ে অনেক বেশি বিত্তবান। কারণ বিবাহের পর পত্নীর শরীরে সামান্য খুঁত বিদ্যমান থাকার অজুহাতে, যৌতুক ছাড়াও, পাটকল ও চা বাগানের মালিক শ্বশুরকে তালাকের ভয় দেখিয়ে তিনি আদায় করেন নগদ হাজার পঞ্চাশেক রুপিয়া। তারপর তার শ্বশুর প্রয়াত হলে, স্ত্রীর ফরাইজ সম্পত্তি হিসাবে পান একটি চা বাগান ও নগদ টাকাপয়সা। মুফতে পাওয়া এ সম্পদ ইস্তেমাল করে, তিনি ফৌজদারবাড়ির উত্তর খণ্ডে তাইয়ার করান সাহেবি কেতার কান্ট্রি হাউসের কায়দায় দ্বিতল একটি বাংলো। ছোটসাহেব আংরেজ টি প্ল্যান্টারদের সঙ্গে দহরম-মহরম করতে ভালোবাসেন। তাদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তিনি হাল ফ্যাশনের বাংলোটির নামকরণও করেছেন নাজিব ম্যানশন।
ম্যানশনে আজ সন্ধ্যাবেলা টি কোম্পানির এক স্কটিশ সাহেবের মেমসহ ডিনারে আসার কথা আছে। সুতরাং ছোটসাহেব চিট পাঠিয়ে দত্তবাবুকে বিশেষ ধরনের বাতি সরবরাহের এত্তেলা দিয়েছেন। তার ফরমায়েশ মোতাবেক, বাতিগুলো বশারত মোল্লা মাগরেবের আজানের আগেই পৌঁছে দিয়েছে। রাউন্ডে এসে দত্তবাবু দেখেন, ম্যানশনের দেউড়িতে ঝোলানোর জন্য তিনি যে কোলম্যান হ্যাজাকটি পাঠিয়েছেন, তা খুলে ফেলে ফুলবাগিচায় টেনিস কোর্টের কাছে সিমেন্টের বেঞ্চে রাখা হয়েছে। আর বশারত মোল্লা ম্যানশনের আরেক খোঁড়া খিদমতগারের সহায়তায় মাটিতে পুঁতছে লকলকে শিখাওয়ালা কয়েকটি মশাল। বিষয় কী―তার আন্দাজ পেতে দত্তবাবু এদিক-ওদিক তাকালে, ছোটসাহেবকে ম্যানশনের বেলকনিতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেন। নাজিবুদৌলা সাহেব মোচ চুমরাতে চুমরাতে চোখমুখ কুঁচকে তাকিয়ে আছেন, ফুলবাগিচায় জ্বলা কোলম্যান বাতিটির দিকে। তার ঘন ঘন মোচ চুমরানোর বাতিক মেজাজ খারাপের আলামত বিশেষ।
বিলাত-ফেরত ছোটসাহেবের চণ্ড ক্রোধের ব্যাপারে দত্তবাবু বিলক্ষণ ওয়াকিবহাল। বছর কয়েক আগে, তিনি তার পোষা ঘোড়া ‘নেটিভ এঞ্জেলে’র সঙ্গে যে সলুক করেছিলেন, সে নিষ্ঠুরতার তুলনা মেলা ভার। বিলাত থেকে বারিস্টারি পড়া শেষ না করে দেশে ফিরে ছোটসাহেবের মাথায় হর্স রেসের বাই চাপে। নিজ হাতে এস্টেটের ঘোড়া নেটিভ এঞ্জেলকে প্রশিক্ষণ দিয়ে, করিমগঞ্জ মুহকমার চা-কর সাহেবদের ক্লাবে আয়োজিত ঘোড়দৌড়ে পাঠান। দৌড়ে নেটিভ এঞ্জেল হেরে গেলে―তিনি ম্যানসনে ফিরে প্রচুর পরিমাণে ব্র্যান্ডি পানে বেহেড হয়ে, ঘোড়াটিকে রিভলবারের গুলিতে হত্যা করেন।
ছোটসাহেবের খাস-বরদার আদম আলি এসে তাকে সালাম দেয়। ভেতর দারুণ শঙ্কা নিয়ে দত্তবাবু নাজিবুদৌলা সাহেবের সঙ্গে দেখা করতে ম্যানশনের সিঁড়ি বেয়ে বেলকনিতে উঠেন। ডার্ক স্যুটের সঙ্গে বো টাই পরা ছোটসাহেবের পাইপ থেকে উড়ছে ট্যবাকোর নীল ধোঁয়া। ইংরেজিতে তাকে তিনি বলেন, দেউড়িতে কোলম্যানের উজ্জ্বল বাতি থাকলে গাড়ি থেকে নামা মাত্র সাহেব-মেমের চোখ ধাঁধিয়ে যাবে; আর বাগিচা অন্ধকার থাকলে ডিনারে আগত মেহমানরা ফুটন্ত ফুলের শোভাই-বা দেখবেন কীভাবে ?
দত্তবাবু সাহেবের মন্তব্যের কোনও জবাব না দিয়ে লাজ্জিতভাবে হাত কচলালে―তিনি তাকে পার্লারে ঢুকতে হুকুম দেন। ওখানে ফায়ারপ্লেসের মেন্টেলের ওপর রাখা জাফরানি রঙের কাচের ক্যানচেস্টার ল্যাম্পটি কিন্তু ছোটসাহেবের পছন্দ হয়েছে। তবে গোল বেঁধেছে, বাতিখানা থেকে সরবরাহ করা, রুপার তস্তরিতে খাঁটি গব্য ঘৃতে জ্বলা তিন-তিনটি পিলসুজ নিয়ে। এগুলোর দিকে পাইপ ধরা হাতের ইশারা করে ছোটসাহেবের মেজাজ উস্কে ওঠে। তিনি দাঁত কিড়মিড়িয়ে বলেন, ‘মিস্টার ডাট, ইউ মাস্ট আন্ডারস্ট্যান্ড দ্যাট দিস ইজ অ্যা ডিনার ফর অ্যা পারফেক্ট স্কটিশ কাপোল, নট একজ্যাক্টলি অ্যা পূজা অর দেওয়ালি… যে পার্লারে জ্বলবে তিন-তিনটি গওয়া ঘিয়ের বদবুঁ ছড়ানো পিলসুজ। টেক দেম আউট রাইট অ্যাট দিস মোমেন্ট।’
দত্তবাবু তার ফরমায়েশ বুঝতে না পারার অক্ষমতা স্বীকার করতে যান। কিন্তু তাকে হাত তুলে থামিয়ে দিয়ে, ছোটসাহেব পিলসুজের পরিবর্তে তিনটি ছোট সাইজের সানডিয়েগো ল্যাম্প সরবরাহের হুকুম করেন। তিনি চাচ্ছেন, পার্লারের দেয়ালে ঝুলানো গোনডেলকার, অমৃতা শেরগুল ও রবি বর্মার তৈলচিত্রগুলোর নিচে কাঠের স্ট্যান্ডে জ্বলবে একটি করে সানডিয়েগো ল্যাম্প। তাতে তসবিরগুলোর রঙ-রেখা বিঘতভাবে উজালা হবে।
দত্তবাবু সমস্যাটি বুঝতে পেরে, তৎক্ষণাৎ হাঁক পেড়ে, বশারত মোল্লাকে বাতিখানা থেকে সানডিয়েগো ল্যাম্প নিয়ে আসতে আদেশ করেন। তারপর ফের হাত কচলাতে শুরু করলে, ছোটসাহেব মসকরা করে বলেন, ‘আপনি তো এস্টেটের বিজলিকুমার রায়, ডেকোরেশনের এ সামান্য বিষয়গুলো আপনার উর্বর মস্তিষ্কে ঢোকে না কেন ?’
ছোটসাহেবকে আদাব-আরজ করে, দেউড়ির দিকে পিছু হটতে গেলে দত্তবাবু অনুভব করেন, তার বুকে চিনিক পেড়ে উঠছে ব্যথা। সাতাইশ বছর ধরে এ এস্টেটের গোলামি তিনি করছেন, ভুলচুক হলে ক্ষমা প্রার্থনার আদব তার ভালোভাবে জানা আছে, মুনিবরা তার কাজের সমালোচনা করার অধিকার রাখেন, কিন্তু তাদের একজনের মুখে মস্করা-বিদ্রƒপ এ বয়সে তার আর সয় না। দেউড়ি পাড়ি দিতে গিয়ে তার বুকে যেন পুরানো হাঁপানির টান ঢেঁকির পাড় দিতে শুরু করে।
দত্তবাবু অতঃপর এসে পড়েন বড় শরিকের পুরানো কুঠির দেউড়িতে। ওখানকার দেয়ালগিরিতে হ্যারিক্যান লণ্ঠন দুটি টিমটিমিয়ে জ্বলছে। তার এসে পড়ার সাড়া পেয়ে, দারোয়ান মহব্বত খাঁ সিপাহি বাম হাতের তালুতে খৈনি সামলাতে সামলাতে, উঠে এটেনশন হয়ে ডান হাতে স্যালুটের ইশারা করে বলে―‘বিজলি সাহাব।’ মহব্বত খাঁ সিপাহি বড় সাহেবের পেয়ারের দারোয়ান। বিহারের মুঙ্গের জেলার অধিবাসী হলেও ছাতুখোর খাঁর শরীরে আছে পাঠান কৌমের খুন। বড়সাহেবের দোনালা বন্দুকের হেফাজত সে করে থাকে। তার বুকে আড়াআড়ি করে ঝুলানো আছে টোটা ভরা বেল্ট। মহব্বৎ খাঁ সিপাহি কাঠের বিশাল দরোজা খুলে তাকে পুরানো কুঠিতে ঢুকতে দেয়।
গাড়িবারান্দা ধরে কুঠির সুন্দি-কাঠের কারুকাজ করা সিঁড়িতে ওঠেন দত্তবাবু। ছাদ থেকে ঝোলা লুইসভিল লণ্ঠনের অ্যাম্বার-গ্লাস চিমনি দিয়ে বেরোচ্ছে অপর্যাপ্ত আলো। তাতে কালো রঙের ভক্সহল মোটর কারটিকে কেমন যেন ভৌতিক দেখায়। প্রশস্ত বারান্দায় উঠে তিনি চারদিকে চোখ বোলান। ফিটন গাড়িতে লাগানো বাতির মতো দিপদিপিয়ে জ্বলছে বারান্দার খিলানে আংটা দিয়ে সাঁটা চারটি ক্যারেজ ল্যাম্প। বাতিগুলোর মেরুণ রঙের কাচ চুঁইয়ে পড়া মোলায়েম আলোয়, রাজা পঞ্চম জর্জ ও রানি ভিক্টোরিয়ার মার্বেল পাথরের মূর্তি দুটিকে দেখায় রহস্যময়।
দত্তবাবু পকেট থেকে রুমাল বের করে একটি ক্যারেজ ল্যাম্পের কাচ মোছেন। তারপর আস্তে করে গলা খাঁকারি দেন। পুরানা কুঠির খানসামা ইফুরুল্লা, খানা-কামরা থেকে রুপার একখানা বর্তন সিল্কের কাপড় দিয়ে ঘষামাজা করতে করতে বেরিয়ে আসে। সঙ্গে সঙ্গে কাচের দরোজার পাল্লা খুলে, খানসামা তাকে বৈঠকখানায় ঢুকতে ইশারা দেয়। দত্তবাবু পাম্পসু খুলে পাপোষের পাশে রেখে বৈঠকখানার গালিচা মোড়া ফ্লোরে পা দেন।
ফুটরেস্টের ওপর নাগ্রা পরা পা-খানা রেখে, মেহগিনি কাঠের ভারী কেদারায় বসে বড়সাহেব আসফুদৌলা ফর্সি হুকায় ধূমপান করছেন। সারা বৈঠকখানা ম-ম করছে খামিরা তামাকের মিঠা খোশবুতে। তার সামনের টি-টেবিলে, ‘কমলাকান্তের দফতর’ বইটির পাশে রাখা পাথরের গেলাস। দত্তবাবুর আদাবের জবাবে, তার দিকে তাকিয়ে হুকার নলটি বাঁকা করে, দত্তবাবুর উপস্থিতি আমলে এনে আবার চোখ মুদলে তিনি বুঝতে পারেন যে, বড়সাহেব মাত্র সিদ্ধির গেলাস উজাড় করে মৌতাতে মশগুল হয়ে আছেন।
গেল রাতে পত্রিকায় পড়া কিছু বিষয়আশয় বড়সাহেবকে জানানোর প্রয়োজন আছে, তাই দত্তবাবু পকেট থেকে নোটবুক বের করে তার দিকে তাকান। বড়সাহেব আদ্দির ফিনফিনে কোর্তার সঙ্গে তসরের সদরিয়া পরে, মসনদ-তাকিয়ায় হেলান দিয়ে বসে আছেন। তার বেশভূষায় মনে হয়, এখনই ভক্সহল গাড়িখানা হাঁকিয়ে, কোনও মাইফেলে তিনি যাবেন রসুলান বাঈয়ের ঠুমরি শুনতে। বড়সাহেবও যেন খোয়াবের ঘোরে দত্তবাবুকে নীরবে অবলোকন করেন, কিন্তু কিছু বলেন না।
আসফুদৌলা সাহেব উজ্জ্বল আলো পছন্দ করেন না, তাই তার বিশাল বৈঠকখানার পাথরের সাইডটেবিলে, ছোট্ট একটি আলাদিনস ল্যাম্প ছাড়া অন্য কোনও বাতি নেই। কেরোসিনের গন্ধ তার বেজায় রকমের অপছন্দ, তাই বাতিখানা থেকে হররোজ লেমনগ্রাসের নির্যাসে বিশেষভাবে প্রস্তুত সিটব্রোনেলা ওয়েল ভরে, আলাদিনস ল্যাম্পটি পুরানা কুঠিতে সরবরাহ করা হয়। এ বাতিটি পরিবেশে ছড়ায় লেবুর সুগন্ধ, কিন্তু বিশাল আকারের হল-কামরার জন্য এর আলো যথেষ্ট নয়। তবে কামরাটির খানিক আলো-আঁধারি বাতবরণে, ব্রোঞ্জের প্রকাণ্ড সেন্টার টেবিলটিতে রাখা রুপার ক্যান্ডেলাব্রায় জ্বলা পাঁচটি মোমবাতি দিচ্ছে কাজ চালানোর মতো উজ্জ্বলতা। তার দুটিতে মোম গলে গলে লেপ্টে স্তূপাকার হয়ে বিচিত্র আকার ধারণ করেছে।
দত্তবাবু পকেট থেকে নরুনের মতো ছোট্ট একটি ধারালো ছুরি বের করে, গলা মোমের বিন্দুগুলো কেটে কেটে সাবধানে রাখেন চীনামাটির তস্তরিতে। তখন তার সঙ্গে আলগোছে চোখাচুখি হয়, ডিবানে বসে থাকা স্বর্ণলংকারে ঝলমলানো ছায়া বানুর সঙ্গে। কিশোরীটির চোখের পাতা কী যেন এক রহস্যে তিরতিরিয়ে কাঁপে। মেয়েটি আজ বালুচরী শাড়ি পরে আছে, তাই তাকে সমোত্থ নারীর মতো দেখায়।
ছায়া বানুর বাবা ছনর মোহাম্মদ ছিল ফৌজদারখোলা এস্টেটের মাহুত। মেয়েটির বয়স যখন আট, তখন বড়সাহেবের হুকুমে, আসামের গোয়ালপাড়ায় হাতির খেদা করতে গিয়ে, দাঁতালের আক্রমণে নিহত হয় ছনর মোহাম্মদ। বালিকা ছায়া বানুর কণ্ঠস্বরে কী যেন এক জাদু আছে। তা শুনতে পেয়ে, বড়সাহেব প্রথমে মাস্টার রেখে তার পড়াশোনার বন্দোবস্ত করে দেন।
মেয়েটির গানের গলা নেই, তবে সে রবিবাবু ও কবি বিহারীলালের পদ্য পড়তে পারে দরদ দিয়ে। এগারো বছর বয়সে, এস্টেটের এক সদ্যমৃত পাইকের ছেলের সঙ্গে তার নিকা দেন বড়সাহেব। বিয়ের এক বছর পর, ছেলেটিকে চাকুরির বন্দোবস্ত করে দিয়ে তিনি পাঠিয়ে দেন রানিগঞ্জের কয়লাখনিতে। শোনা যায়, ওই খনিতে নাকি ছায়া বানুর নামে বড়সাহেব শেয়ারের কাগজও কিনেছেন।
গলন্ত মোমের বিন্দুগুলো কাটতে গিয়ে অন্যমনস্ক হয়েছিলেন দত্তবাবু। চোখ তুলে তাকাতেই দেখেন, ছায়া বানুর কোলে রাখা, ছন্দের জাদুগর সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের লেখা কবিতার বই ‘অভ্র-আবীর।’ তবে কি বালিকাটি বড়সাহেবকে পদ্য পড়ে শোনাচ্ছিল ? তার দৃষ্টিপাতে বিব্রত হয়ে, আঙুলে শাড়ির আঁচল প্যাঁচাতে প্যাঁচাতে সে অস্ফুটে ডাকে―‘কাকাবাবু।’
এ আওয়াজে ধড়মড় করে জেগে ওঠেন বড়সাহেব। তিনি জোড়া ভুরু কুঁচকে বলেন, ‘সন্ধ্যা হলে আমার বড্ড পিপাসা পায়, তোমার তিয়াস লাগে না দত্তজা ?’
হাত কচলে তিনি জবাব দেন, ‘জি আজ্ঞা, আমারও পিপাসা পায়। জবর পিপাসা পায় আজ্ঞা।’
বড়সাহেব মুচকি হেসে, হাতের ইশারায় বেতের একটি বাহারে মোড়া দেখিয়ে তাকে বসতে বলেন। তিনি জড়সড় হয়ে একটি মোড়ার কোনায় বসলে, বড়সাহেব বলেন, ‘ছায়া বানু আজকাল বড্ড মজাদার সোডাজল তাইয়ার করে। আজ এক পেয়ালা সোডাজল খেয়ে দেখো দত্তজা।’ বলেই তিনি যেন স্বপ্নের ঘোরে চোখ আধবোজা করে ফিরে যান ভিন্ন এক পৃথিবীতে।
ছায়া বানু উঠে, সাইডটেবিলে গিয়ে, তার দিকে পেছন ফিরে সোডামেশিনে তৈরি করছে বুদবুদ ছড়ানো সোডাজল। সে কোমরে বিছাহার পরে আছে বলে―তার নড়াচড়ায়, ধাতু ও পাথরের মৃদু ঝংকারে যেন বৈঠকখানার আলোছায়া পরিবেশ ঠমকে ঠমকে ওঠছে। গেল বছর দুয়েকে মেয়েটি গায়ে-গতরে বেড়ে উঠেছে অনেক, তার নিতম্বের ডৌলে এসেছে নারী শোভন ঊর্মি। কিশোরীটি মনে হয় সদ্য ঋতুমতী হয়েছে।
ছায়া বানু কাটগ্লাসের পেয়ালায় তাকে সোডাজল পরিবেশন করলে―বড়সাহেব যেন খোয়াব থেকে জেগে উঠে জানতে চান, ‘কী সমাচার দত্তজা, স্টেটসম্যান আজকাল কী লিখছে ?’
হাতে ধরা পেয়ালা টি-টেবিলে রেখে, দত্তবাবু কুর্তার ঢোলা জেব থেকে বের করেন নোটবুক, চোখে চশমা লাগিয়ে বলেন, ‘আজ্ঞা, জাপানের সম্রাট হিরোহিতো পত্রিকায় বিবৃতি দিয়ে বলেছেন, তিনি ঈশ্বর নন, স্রেফ মানুষ-মাত্র তাঁকে পূজা করার কোন জরুরত নেই আজ্ঞা।’
‘বলো কী দত্তজা, এ তো বিশাল ঘটনা।’ বলে বড়সাহেব ফর্সি হুকার নল মুখে তুলে গড়গড়িয়ে ধোঁয়া ছাড়েন।
দত্তবাবু বড়সাহেবের উৎসাহকে ধরে রাখার জন্য বলেন, ‘আজ্ঞা, আরও খবর আছে, নুরেনবার্গের ট্রাইবুনালে মামলা চলছে, কিন্তু জার্মানির এয়ারফোর্সের প্রধান হেরম্যান গোরিংকে এরা বিচার করতে পারেনি, গত পরশু গোরিং সাইনাইড পয়জন খেয়ে আত্মহত্যা করেছে আজ্ঞা।’
সংবাদ শুনে বড়সাহেব কী যেন ভাবেন। খানসামা ইফুরুল্লা কামরায় ঢুকে বদলিয়ে দেয় তার হুকার চিলিম। তিনি মুখে নল তুলতে গিয়ে চিন্তিতভাবে আবার জানতে চান, ‘জিন্না সাহেবের কোনও সংবাদ জান দত্তজা ?’
দত্তবাবু উঠে দাঁড়িয়ে, বিদায় নেওয়ার জন্য কুর্নিশি কায়দায় ঝুঁকে আদাব দিতে দিতে বলেন, ‘ডাইরেক্ট অ্য্যাকশনের ঘোষণা দেওয়ার পর থেকে পত্রিকায় উনার আর কোনও খবর ছাপেনি আজ্ঞা।’ বড়সাহেব হঠাৎ চুপ হয়ে গিয়ে হাত তুলে তাকে বৈঠকখানা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ইজাজত দেন।
বারান্দায় বেরিয়ে, পাম্পসু পায়ে গলাতে গলাতে একটি বিষয় নিয়ে ভাবেন দত্তবাবু। তিনি খেয়াল করেছেন যে, কলকাত্তার হিন্দু-মুসলিম রায়টের পর থেকেই বোম্বাইয়ের নামজাদা বারিস্টার জিন্নাহ সম্পর্কে বড়সাহেব খোঁজখবর নিচ্ছেন। কিন্তু কখনও কোনও মন্তব্য করছেন না। বড়সাহেব হালফিল সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত না থাকলেও, এক সময় কংগ্রেসের টিকিটে, দিল্লি কাউন্সিলের দুই দফায় মেম্বার ছিলেন বছর দশেকের মতো। বর্তমানে তিনি চুপ মেরে আছেন। মুসলিম লীগের উত্থানের সব খবর তিনি রাখছেন, কিন্তু ওই দলের কর্মকাণ্ডে শরিক হওয়ার কোনও আগ্রহ দেখাননি। তবে একটা ব্যাপার, বড়সাহেব জমিদার হিসেবে আদতে গভীর জলের মাছ। তার কনিষ্ঠ ভ্রাতা নাজিবুদৌলা সাহেব, মুসলিম লীগের টিকেটে মাত্র বছর খানেক আগে, আসামের ব্যবস্থাপক সভার সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। এ বাবদে অবশ্যই তার নীরব আশীর্বাদ আছে।
দত্তবাবু বড়বিবির মহলের দিকে হাঁটতে হাঁটতে ভাবেন, জমিদারদের দুই নৌকায় পা দিয়ে চলার স্বভাব আছে। এদের রাজনৈতিক মক্কর সহজে বোঝা মুশকিল। এ বাবদে আর অধিক ভাবনার কোনও ফুরসত তার হয় না। সন্ধ্যা গাঢ় হয়ে জমেছে। ছোট ও বড় দুই বিবির মহলে রাউন্ড এখনও বাকি আছে। তারপর তাকে কাছারি বাংলোতে ঝুলানো হ্যাজাক বাতিগুলোরও তদারক করতে হবে। তিনি বড়বিবির মহলের দিকে পা চালান।
বড়বিবির মহলের দেউড়িতে এসে দাঁড়ান দত্তবাবু। নোনাধরা ইটে তৈরি দেউড়ির শিরানায়, রিলিফের পদ্ধতিতে আঁকা জোড়া-ময়ূরের মাঝখানে লেখা জোবায়দা মঞ্জিল। তার নিচে, নির্মাণের সন-তারিখ ১৮৭৬ ইংরেজি। তো দত্তবাবু দেউড়ির দেয়ালগিরিতে ঝুলানো ঘন্টির দড়ি ধরে টানেন। ভেতরের কোথায় যেন ঢিং-ঢং করে আওয়াজ হয়।
সামান্য সময় দাঁড়াতে হয় এখানে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দত্তবাবু ভাবেন, আজ জোবায়দা মঞ্জিল থেকে চিট পাঠিয়ে, মাহফিলের উপযোগী জোরালো বাতি সরবরাহ করতে তাকে বলা হয়েছে। তিনি ফরমায়েস অনুযায়ী একটি পেট্রোমেক্স পাঠিয়েছেন, কিন্তু বুঝতে পারেননি―ঘটনা কী ?
বড়বিবির খানদানের তালুক-মিরাশ তাবৎ কিছু বিহারের মোগলসরাই জেলায়। তার পিতামাতা, কলকাত্তার জাকারিয়া স্ট্রিটের স্থায়ী বাসিন্দা হলেও, বড়বিবির বাংলা বোলচালে আছে উর্দুর পরিষ্কার টান। মাজহাবের দিক থেকে তাঁর পরিবার শিয়া মতাদর্শের অনুসারী। মহলের একটি কামরায়, বড়বিবির ভিন্ন তরিকার ইবাদত-বন্দেগির জন্য, বড়সাহেব তাইয়ার করিয়ে দিয়েছেন ছোটখাট একটি ইমামবাড়া। ওখানে স্বর্ণের সুর্মাদানে তাজিমের সঙ্গে রাখা আছে কারবালার যৎসামান্য মৃত্তিকা।
দত্তবাবু বিলক্ষণ অবগত যে, ঈদে-চান্দে তথা শবে-বরাত ও মহরমের সময়, বড়বিবির ইরাদা অনুযায়ী সরবরাহ করতে হয়―চার-চারটি চান্দির চেরাগদান, ও খুশবো ছড়ানো অনেকগুলো মোমবাতি। এ চেরাগদানগুলো বড়বিবি তার পিত্রালয় থেকে নিয়ে এসেছেন। এগুলোর গায়ে স্বর্ণজলে লেখা আছে আল্লাহ রব্বুল আল আমীনের পবিত্র নাম। লোকমুখে দত্তবাবু শুনেছেন যে, এ চেরাগদানগুলোতে কতল বা আশুরার রাতে বড়বিবি হজরত আলি (রা.), মা-জননী ফতেমা এবং ইমাম হাসান ও হোসেনের ইয়াদগারিতে নিজ হাতে জ্বালান খুশবো ছড়ানো মোম। বিষয়টি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল বলে, তিনি আগেভাগে কলকাত্তা থেকে সুগন্ধি মোম ইত্যাদি আনিয়ে রেখেছেন। বাতিবরদার বশারত মোল্লা চেরাগদানগুলো পয়পরিষ্কারও করে রেখেছে, কিন্তু মাহফিলে জ্বালানোর মতো উজ্জ্বল বাতির চাহিদা কেন জোবায়দা মঞ্জিল থেকে এল, বিষয়টির কোনও হদিস তিনি করতে পারেননি।
এ বিষয় নিয়ে বেশিক্ষণ বিছরানোর ফুরসত হয় না দত্তবাবুর। বড়বিবির খাস-বাঁদি ফুলজান বেওয়া এসে, হুড়কা টেনে তার জন্য মহলে ঢোকার দুয়ারটি খুলে দেয়। মহলের অন্দরে এসে তিনি দেখেন, আঙিনার সিমেন্টে বাঁধানো বৃত্তাকার চাতালে বিছানো হয়েছে বিশাল সতরঞ্জি, তাতে গোল হয়ে বসে, গেরামের বিশ্বাসভাজন রায়ত-প্রজাদের জনা তিরিশেক স্ত্রী-কন্যা। তাদের মাথার ওপর চন্দোয়ার তলায় ঝুলছে পেট্রোম্যাক্স বাতিটি। তা থেকে বলকে-বলকে লাফিয়ে ওঠছে শিখা এবং বেরোচ্ছে প্রচুর পরিমাণে ধোঁয়াও। জনা কয়েক নারী আতঙ্কে উঠে দাঁড়িয়ে, কপালে হাত দিয়ে, পেট্রোম্যাক্সটির দিকে এমন তাজ্জব হয়ে তাকাচ্ছে, যেন তাদের গাঁয়ের ফলবতী বেগমপছন্দ আমের বয়স্ক বিরিক্ষটি, এইমাত্র বজ্রাঘাতে জ্বলেপুড়ে চোখের সামনে অঙ্গার হয়ে গেলো।
দত্তবাবু তৎক্ষণাৎ কাজে হাত লাগান। তিনি ধুতির খুঁট কোমরে গুঁজে, টুলের ওপর দাঁড়িয়ে, চান্দোয়ার সঙ্গে ঝুলানো বাতিটি নামিয়ে আনেন। তারপর দক্ষ হাতে পাম্প করে ফিরিয়ে আনেন প্রেসারের ভারসাম্য। চান্দোয়াতলে তা আবার ঝুলালে, পেট্রোম্যাক্স থেকে ছড়িয়ে পড়ে, রীতিমতো অরুণোদয়ের আচানক রুশনি। রায়তদের স্ত্রী-কন্যারা তার দিকে এমনভাবে তাকায় যে, তিনি বুঝি যাত্রামঞ্চে এই মাত্র বদখত এক রাক্ষসকে, তলোয়ারে বিদ্ধ করে, বিবেকের সঙ্গে লিপ্ত হয়েছেন মজবুত সংলাপে।
দত্তবাবুর কাজ কিন্তু এখানেও শেষ হয় না, তিনি বাঁদি ফুলজান বেওয়াকে বলে, এক কমবয়সী দাসীকে পাঠান, বাতিবরদার বশারত মোল্লার তালাশে। তাকে এখনই এখানে এসে, জোবায়েদা মঞ্জিলের দেউড়ির সামনে কয়েম-মোকাম হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার নির্দেশ দেন, যাতে আবার যদি পেট্রোম্যাক্সে পাম্পের প্রয়োজন পড়ে, তা হলে সে যেন পরিস্থিতি সামাল দিতে পারে।
ফুলজানের বাচনিকে তিনি জানতে পারেন, মোড়ারবন্ধ থেকে এক নামজাদা কবিয়াল এসে মেহমানখানায় বিশ্রাম করছেন। এশার নামাজ অন্তে চাঁদ উঠলে পর, তিনি এসে মঞ্জিলের চান্দোয়াতলে দাঁড়িয়ে পাঠ করবেন, মশহুর পুঁথি―জঙ্গেনামা।
বড়বিবিকে সালাম দেওয়ার জন্য দত্তবাবু অতঃপর সিঁড়ি বেয়ে উঠে পড়েন মঞ্জিলের দালানে। জাফরিতে ঘেরা বারান্দায়, অর্ধ চন্দ্রাকৃতিতে সাজানো রেড়ির তেলের গোটা ছয়েক দিয়া-দিপম বাতি ছড়াচ্ছে মোলায়েম আলো। কামরায় কাশ্মিরী কায়দার জালি-তোলা, আখরোট কাঠের স্ক্রিনের আড়ালে কৌচে বসে আছেন বড়বিবি। স্ক্রিনের দুপাশে সিরামিকের স্ট্যান্ডে রাখা দুটি ফেনটন গ্লাস ল্যাম্প। তার একটিতে―বিচ্ছুরিত আলোর বলয়ে গড়বড় আন্দাজ করে―দত্তবাবু চোখে চশমা লাগিয়ে বাতিটি নিরিখ করে দেখেন। চিমনিতে অনেকগুলো সূক্ষ্ম ক্র্যাচের জন্য বিঘ্নিত হচ্ছে আলোর সহজাত প্রতিসরণ। একটি ক্র্যাচ থেকে ঝলসাচ্ছে রঙধনুর মৃদু আভা। তিনি বিরক্ত হন। বাতিবরদার বশারত মোল্লার ওপর তার মেজাজ তেড়িয়া হয়ে ওঠে। বাতিখানায় ফিরে বিষয়টির একটা হেস্তনেস্ত করতে হয়।
স্ক্রিনের সামনে, মখমলের গদি-মোড়া কুটিচৌকিতে তাকে বসার জন্য ফুলজান বেওয়া ইশারা দেয়। নেকাব পরা একটি অল্পবয়সী বাঁদি তার সামনে এনে রাখে পানদান। তা থেকে লবঙ্গ গাঁথা একটি খিলিপান হাতে তুলে, দত্তবাবু মাথা ঝুঁকিয়ে বলেন, ‘আদাব-আরজ বিবি-আম্মা…।’
খানিক পর খুব অনুনয়ের স্বরে বড়বিবি জবাব দেন, ‘বিজলি বাবা, তোমার কাছে আমার একটি আরজু…।’
মনোযোগ দিয়ে দত্তবাবু বড়বিবির বক্তব্যের প্রতিটি শব্দ শোনেন। ফৌজদারখোলা এস্টেটের জয়েলে আছে এ অত্রাফের তিন-তিনটি পরগনা। তাতে কামেল পির-ফকিরের মোকাম আছে নয়টি। এগুলোর মাঝে, তিনটির মাজারে দেহান্তরে ‘পর্দা’ নিয়েছেন, হজরত শাহজালাল মুজররদ ইয়েমেনির সফরসঙ্গী তিন আওলিয়া। বড়বিবি এ বছর মহরমের সময়, প্রতিটি মোকামে পাঠাতে চান একটি করে চেরাগদান।
দত্তবাবু তাকে আশ্বাস দিয়ে বলেন, ‘দুশ্চিন্তা কিছু করবেন না বিবি-আম্মা, আমি সদর-নায়েবের সঙ্গে পরামর্শ করে, এস্টেটের সবচেয়ে পরেজগার কর্মচারীর তত্ত্ববধানে, ঘোড়সওয়ার দিয়ে মোকামগুলোতে চেরাগদান পাঠানো বন্দোবস্ত করব।’
বড়বিবি আর কিছু বলেন না, তবে ফুলজান বেওয়ার মাধ্যমে তার কাছে পাঠান এক জোড়া স্বর্ণের কুমুদিনী কানবালা। ফুলজান ফিসফিসিয়ে তাকে বলে যে―বড়বিবির মানত হচ্ছে, প্রতিটি চেরাগদানিতে স্বর্ণের হরফে লেখা থাকবে পবিত্র কালাম। এ বাবদে তিনি এস্টেটের খাজাঞ্চিখানা থেকে কোনও খায়খরচ করতে চান না। দত্তবাবু বাজারের জেওরপট্টির বিশ্বস্ত পৌদ্ধার দিয়ে, কুমুদিনি কানবালা দুটিকে ভেঙ্গে-গলিয়ে, তা দিয়ে চেরাগদানির গায়ে পবিত্র কালাম লেখানোর ওয়াদা করেন।
ফুলজান বেওয়া তার পাশে-পাশে হেঁটে-হেঁটে, মহলের সিঁড়ি দিয়ে কয়েক ধাপ নিচে নেমে, গলার স্বর আরও নিচু করে, তাকে ফের হুঁশিয়ার করে দেয়, কারণ মোকামগুলোতে সোনার হরফে কালাম লেখা চেরাগ পাঠানোর খবর তার স্বামী বা দেবর―ছোট বা বড়সাহেবদের কানে যেন না যায়।
মাথা ঝাঁকিয়ে সম্মতি জানিয়ে, বড়মহল থেকে বেরিয়ে আসার পথে, তার নাকে এসে লাগে, তোসা শিন্নি রান্নার গব্যঘৃতে সিদ্ধ দারুচিনি ও এলাচির মুখরোচক গন্ধ। দত্তবাবু ঘাড় বাঁকিয়ে, সতরঞ্জিতে বসা জেনানাদের মাহফিলে ঝুলানো পেট্রোম্যাক্সের দিকে তাকান। তা থেকে ছড়াচ্ছে দেদার আলো, চারপাশে চক্রাকারে উড়ছে কালচে-সবুজ পোকা। নেকাবপরা দাসীটি কুটিচৌকির উপর দাঁড়িয়ে গোলাপপাশ থেকে ছিটাচ্ছে সুগন্ধী জল।
এ দৃশ্যেটির সামনে দাঁড়িয়ে দত্তবাবুর কী যেন একটা মনে পড়তে গিয়েও পড়ে না, ইচ্ছা হয়, দুদণ্ড দাঁড়িয়ে পুঁথিপাঠের মাহফিলটির ইন্তেজাম নিজে তদারক করেন, কিন্তু তার কাজকর্মের কোনও খামতি আছে কী ? পা চালান তিনি জোবায়দা মঞ্জিলের দেউড়ির দিকে। হুড়কা খোলার অপেক্ষায়, কাঠের ভারী দরওয়াজার সামনে দাঁড়িয়ে, দুই হাত জোড় করে অদৃশ্য কোন দেবতাকে প্রণাম করতে করতে, মৃদু দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে তার মুখ থেকে অস্ফুটে বেরিয়ে আসে, ‘গুরুদেবও দয়া করো দীনজনে…।’
সচিত্রকরণ : রজত



