
প্রচ্ছদ রচনা : গল্পসংখ্যা ২০২৪―গল্প
এক সকালে আতাহার আলিকে আর খুঁজে পাওয়া গেল না। আতাহার আলি পেশায় পোস্টমাস্টার। নিশ্চিন্তপুর হাইস্কুল থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছিলেন। তারপর সংসারের টানাপোড়েনে আর পড়াশোনা হয়নি। সুযোগ ছিল তাই পোস্ট অফিসে জয়েন করেছিলেন। পরবর্তীকালে পদোন্নতি পেতে পেতে পোস্টমাস্টার হয়েছেন। বয়স ষাট ছুঁই ছুঁই। কাজের প্রতি তার ছিল প্রবল টান। ঝড়বৃষ্টি যা-ই হোক অফিসে সময়মতোই হাজির হতেন। সেদিন সকাল এগারটা বেজে গেলেও যখন আতাহার আলি পোস্ট অফিসে এলেন না তখন প্রথমে মনে হলো তিনি ছুটির দিন ভেবে অফিসে না এসে বাড়িতেই আছেন। অথবা শরীর খারাপ হতে পারে। কিন্তু শরীর খারাপ হলে তিনি কাউকে না কাউকে পাঠিয়ে খবর দিতেন যে আজ আর অফিসে আসতে পারব না। যেহেতু কেউ খবর নিয়ে আসেনি তাই শরীর খারাপের বিষয়টা সঠিক না। সুতরাং ছুটির দিন ভেবে বাড়িতে থাকাটাই যুক্তিযুক্ত। অবশ্য সে ক্ষেত্রে তার স্ত্রী নিশ্চয়ই তাকে মনে করিয়ে দিতেন যে অফিসে যাচ্ছ না কেন ? তখন হয়তো তিনি বলতেন আজ তো ছুটির দিন। এবং আলাপ করতে করতে হয়তো বুঝতে পারতেন আজ ছুটির দিন না। তখন অফিসে দেরি হয়েছে দেখে তড়িঘড়ি করে ছুটে আসতেন। তবে সেটা হলেও এত দেরি হতো না।
অফিসের পিওন গৌরাঙ্গ খোঁজ নিতে আতাহার আলির বাড়িতে গেল। বাড়ি বলতে একটা দোচালা টিনের ঘর আর একটা রান্নাঘর। গরু-ছাগলের বালাই নেই বলে গোয়ালঘর থাকার প্রশ্নই ওঠে না। একজন পোস্টমাস্টারের আর কতইবা বেতন ? যা সামান্য আয় তা দিয়ে এর চেয়ে ভালো কিছু করাও তার পক্ষে সম্ভব ছিল না। পিওন গৌরাঙ্গ গিয়ে দেখল আতাহার আলির ঘরে তালা দেওয়া। বাড়িতে আতাহার আলির স্ত্রী এবং একমাত্র কন্যা আতিয়া থাকত। আতিয়ার বয়স ১০ বছর। স্থানীয় প্রাইমারি স্কুলে চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে। অবশ্যি আতাহার আলির পাশে দাঁড়ালে যে কেউ বলবে সে আতাহার আলির নাতনি। দু’জনের বয়সের ব্যবধানই মানুষকে এটা ভাবতে বাধ্য করবে। একটি সন্তানের আশায় বছরের পর বছর কেটে গেছে কিন্তু সন্তান আর হয়নি। শেষ বয়সে এসে তাদের ঘর আলো করে আতিয়া জন্ম নেয়। সেই খুশিতে আতাহার আলি সেবার সারা গ্রামের মানুষকে জিলাপি খাইয়েছিলেন এবং খাশি জবেহ করে সবাইকে আপ্যায়ন করেছিলেন। বাড়িতে তাদেরকেও পাওয়া গেল না। বোধহয় কোথাও বেড়াতে গিয়েছে। তবে তিনি তো ভুলোমনা মানুষ নন। মানুষ হিসেবে তিনি সবার খুব প্রিয়পাত্র। বিশেষ করে ছোটরা তাকে খুবই ভালোবাসে। অফিস থেকে আতাহার আলির যা আয়-রোজগার হয় তা নিজের পরিবারের জন্য খরচ করেন। পাশাপাশি অন্যদের জন্যও কিছু করতে চেষ্টা করেন। দুঃখী অভাবী মানুষের পাশে তিনি যথাসাধ্য দাঁড়াতে চেষ্টা করেন। সেই আতাহার আলি এবং তার পরিবার ভোজবাজির মতো হাওয়া হয়ে গেছে। কথাটি চার কান হতে খুব বেশি সময় লাগল না। ফরিদা বেগমও একসময় খবরটি শুনলেন।
অফিস খোলা অথচ আতাহার আলির কোনও খোঁজ নেই। সেই সময়ে যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম ছিল চিঠি। আতাহার আলি অফিস থেকে ছুটিও নেননি। তাহলে পরিবারসহ লোকটি কোথায় গেল ? এরপর কেটে গেল পুরো এক সপ্তাহ। কিন্তু আতাহার আলি ও তার পরিবারের কারও কোনও সন্ধান মিললো না। পোস্ট অফিস থেকে থানায় ডায়েরি করা হলো এবং অফিসের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানানো হলো। স্থানীয় পত্রিকায় আতাহার আলির একটি সাদাকালো ছবি ছাপা হলো। সঙ্গে লেখা হলো বিনোদপুর পোস্ট অফিসের পোস্টমাস্টার জনাব আতাহার আলি ও তার পরিবারকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। কেউ সন্ধান পেলে পোস্ট অফিসে খবর দিয়ে বাধিত করবেন।
আতাহার আলি ও তার পরিবারের নিরুদ্দেশ হওয়ার ঘটনায় এলাকায় চাঞ্চল্য শুরু হলো। এর মাঝে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এসে তদন্ত শুরু করল। এলাকায় তার সঙ্গে কারও শত্রুতা ছিল কি না সেটায়ও খোঁজখবর নিল। সবাই এক বাক্যে স্বীকার করল তার মতো এমন সাদাসিধে মানুষের শত্রু কোথা থেকে আসবে ? তিনি কারও বাড়া ভাতে ছাই ঢালেননি। তবে আতাহার আলি ও তার পরিবারের নিরুদ্দেশ হওয়ার ঘটনায় সবচেয়ে মর্মাহত হলো ফরিদা বেগম। কেননা ফরিদা বেগমের অভাব-অনটনের সংসার টিকে ছিল আতাহার আলির সহযোগিতায়। বিবাহিত জীবনে দেড় যুগ পার করেও সন্তানের মুখ দেখতে না পারা আতাহার আলি ও তার স্ত্রী আম্বিয়া খাতুন ফরিদা বেগমকে সন্তানের মতোই স্নেহ করতেন। পরবর্তীকালে আতাহার আলির মেয়ে আতিয়ার জন্ম হলেও তিনি ও তার স্ত্রী ফরিদা বেগমকে আগের মতোই স্নেহ করতেন। তাছাড়া ফরিদা বেগম ছিল এলাকার সবচেয়ে দুঃখী মানুষদের একজন। অথচ এই মানুষটির একসময় সবই ছিল। কিন্তু হঠাৎ করে সব কিছু এলোমেলো হয়ে গেল। ফরিদা বেগমের তিন ছেলে-মেয়ে। স্বামী বিদেশ গিয়েছিল। মাসে মাসে টাকা পাঠাত এবং তা দিয়ে সুখে-শান্তিতেই দিন কাটছিল। প্রতিবার টাকা এলেই আতাহার আলি খবর পাঠাতেন। ফরিদা বেগম গিয়ে টাকা এবং চিঠি নিয়ে আসত। কিছু টাকা জমিয়ে ঘরের কাজ ধরেছিল। তারপর এক ঝড়ে সব কিছু তছনছ হয়ে গেল।
বিদেশে থাকা অবস্থাতেই ফরিদা বেগমের স্বামীর মৃত্যুর সংবাদ এল। পরিস্থিতি এমন ছিল যে লাশটা পর্যন্ত দেশে আনা গেল না। সেখানেই দাফন করা হলো। সেই থেকে ফরিদা বেগমের পরিবারের পাশে ছিল পোস্টমাস্টার আতাহার আলি ও তার স্ত্রী। তাদের খুব দুঃখ হতো। এই বয়সে মেয়েটি বিধবা হয়ে গেল। তার তিন ছেলে-মেয়ে আতিয়ার চেয়েও ছোট। এইটুকু ছেলে-মেয়ে নিয়ে বেচারি কীভাবে দিন কাটাবে ভেবে খুব খারাপ লাগত। ফলে তিনি সাধ্যমতো তাদের পাশে থাকতে চেষ্টা করতেন। তাছাড়া ফরিদার বাবা ফরিদ উদ্দিন ছিল আতাহার আলির বন্ধু। এক বর্ষায় সাপের কামড়ে তার মৃত্যু হয়েছিল। আতাহার আলি ও তার পরিবার নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় ফরিদা বেগমের মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়ল। আপনজন বলতে তেমন কেউ নেই অত্র এলাকায়। এমনিতেই অল্প বয়সে বিধবা হওয়ায় তার দিকে মানুষ অন্য চোখে তাকাত। আতাহার আলি ও তার স্ত্রী তাকে সন্তানের মতো আগলে রেখেছিলেন বলে এতদিন কিছুটা ভালো ছিল। এখন কী হবে ? এই ঘটনার পর ফরিদার জীবনেও অনেক পরিবর্তন এল। আগে যেখানে আতাহার আলি চাচা তার নিজের বাজার করার পাশাপাশি ফরিদার জন্যও বাজার করে দিতেন, এখন যেহেতু তিনি নেই তাই নিজেদের বাজার নিজেরই করা লাগছে। বাড়িতে বাজার করার মতো বড় কেউ নেই। ফরিদা বেগমের বড় ছেলের নাম তৈমুর। তার বয়স ছয় বছর। দ্বিতীয়টার নাম শফিকুল তার বয়স চার বছর আর সবচেয়ে ছোট মেয়ে শরিফার বয়স দুই বছর। এদের কারও বাজার করার মতো বয়স হয়নি।
বাজার থেকে ফেরার পথে রোজ বাজে কথা শুনতে হয় ফরিদার। সেই সব কথা শুনে কান পচে যায়। মাঝে মাঝে মরে যেতে ইচ্ছে করে ফরিদার। কিন্তু ছেলে-মেয়ের কথা চিন্তা করে কিছু করতে পারে না। সব মেনে নিতে হয়। এই সব বাজে কথা শুরু হয়েছিল স্বামী বিদেশে যাওয়ার পর থেকে। এলাকার বাজে ছেলেরা তার দিকে কুনজরে তাকাত। তাকে খারাপ ইঙ্গিত দিত। কিন্তু ফরিদা ছিল স্বামী অন্তঃপ্রাণ। কখনও কারও ইশারায় সে চলেনি। তার দিনকাল বেশ ভালোই চলছিল। অভাবের সংসারে একটু একটু করে সুখ ফিরে আসছিল। কিন্তু ফরিদার কপালে বুঝি সুখ বেশিদিন স্থায়ী হবার কথা লেখা ছিল না। তার স্বামী গিয়েছিল ইরাকে। ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের সঙ্গে আমেরিকার কী একটা বিরোধের জের ধরে যুদ্ধ শুরু হলো। যুদ্ধের সময়ও ফরিদার স্বামী সেকেন্দার সুযোগ পেলেই চিঠি দিত, টাকাও পাঠাত। তারপর হঠাৎ সব বন্ধ হয়ে গেল। মাস গেল কিন্তু সেকেন্দার আর চিঠি পাঠালো না, টাকাও পাঠালো না। প্রথম দিকে ফরিদা ভেবেছিল যুদ্ধের কারণে সে হয়তো সময়মতো চিঠি পোস্ট করতে পারছে না, মানি-অর্ডার করতে পারছে না।
কিন্তু যখন দুই মাস পেরিয়ে গেল কিন্তু কোনও চিঠি বা মানি-অর্ডার এল না তখন তার মনে কু ডাক দিতে থাকল। রেডিও-টেলিভিশনে রোজই মানুষের মৃত্যুর সংবাদ ভেসে আসতে লাগল। তাদের মধ্যে অনেক বাংলাদেশিও ছিল। যুদ্ধের ভয়াবহতা এত বেশি ছিল যে যারা মারা গেল তাদের লাশটাও দেশে ফিরল না। এর মাঝে সাদ্দাম হোসেন ধরা পড়ল। দিন পেরিয়ে সপ্তাহ পেরিয়ে মাস পেরোলো কিন্তু সেকেন্দারের আর কোনও খোঁজ মিললো না। অনেক মানুষকে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হলো। সবার মনে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মালো যে ওই সব বেওয়ারিশ লাশের মধ্যে সেকেন্দারও একজন। এই ঘটনায় কিছুদিন কান্নাকাটি করে শান্ত হয়ে গেল ফরিদা। তার এখন বেঁচে থাকার অবলম্বন তিন ছেলে-মেয়ে। স্বামীর রেখে যাওয়া আমানত এই ছেলে মেয়েদের সে যে কোনওভাবেই হোক মানুষের মতো মানুষ করবে।
বিধবা হওয়ার পর এলাকার খারাপ মানুষের নজর তার দিকে আরও তীব্র হলো। তার পথ হয়ে উঠল কণ্টকময়। সেই কঠিন সময়ে তার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন আতাহার আলি ও তার স্ত্রী। আজ তারাও নেই। আতাহার আলি ও তার পরিবার নিরুদ্দেশ হয়েছে এক মাস হতে চলল। কোথাও তাদের আর কোনও খোঁজ পাওয়া গেল না। তবে কীভাবে নিরুদ্দেশ হলো এবং কেন নিরুদ্দেশ হলো সেটা জানা গেল এই ঘটনার আরও কিছুদিন পর। সন্ধ্যার কিছু আগে ফরিদা বেগম তার তিন ছেলে- মেয়েকে উঠানে বসিয়ে রেখে রাতের জন্য রান্না করছিল। চুলায় ভাত রান্না হচ্ছিল। এই ফাঁকে সে তরকারি কেটে রেডি করছিল। আয়োজন তেমন কিছু না। ডাঁটা শাক আর কয়টা পুঁটিমাছ। মনুমিয়া নকখোলার বিল থেকে মাছ মেরে ফেরার পথে বিক্রি করতে করতে বাড়ি যায়। তার কাছ থেকেই এক পোয়া পুঁটি মাছ কিনেছিল। সেগুলো সে আগেই কেঁটে ধুয়ে একটা বাটিতে রেখেছে। এখন ডাঁটা শাক আর দুটো আলু কেটে ভাতের হাড়ি নামিয়ে তরকারি রান্না করলেই হয়ে যাবে। বাচ্চারা বসে বসে মুড়ি খাচ্ছে। এমন সময় পাশের বাড়ির মুবারক হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এল। মুবারকের বয়স ১০ বছর। দৌড়াতে দৌড়াতে উঠানের উপর এসে থামল। হাঁপাতে হাপাতে বলল, চাচি চাচি, চাচা ফিরে আইছে! মুবারকের কথা প্রথমে সে কিছুই বুঝতে পারল না। কোন চাচা ফিরে এসেছে, কোথা থেকে ফিরে এসেছে তার মাথায় কিছু ঢুকল না। ফরিদা বেগম মুবারককে একটু জিরিয়ে ধীরেসুস্থে ঘটনাটা বলতে বলল। মুবারক একটু ধাতস্থ হয়ে ফরিদা বেগমকে যে সংবাদ দিল তা শোনার জন্য ফরিদা বেগম প্রস্তুত ছিল না। সে কখনও কল্পনাও করেনি। এর চেয়ে আনন্দের সংবাদ তার জীবনে আগে কখনও আসেনি, ভবিষ্যতেও কখনও আসবে না।
লটারিতে কোটি টাকার পুরস্কার জিতলেও তার মনে এত আনন্দ হতো না। মুবারক হাঁপাতে হাঁপাতে যা বলল সেটা হলো সেকেন্দার চাচা ফিরে এসেছে! সেকেন্দার চাচা মানে ফরিদার স্বামী! ক বছর আগেই যে ইরাকের যুদ্ধের সময় মারা গিয়েছিল! সেই থেকে ফরিদা বিধবা হয়ে দিন কাটাচ্ছিল। সেই সেকেন্দার জীবিত আছে এবং দেশে ফিরে এসেছে এটা বিশ্বাসই হচ্ছে না। ফরিদা বেগম চুলার রান্না চুলায় রেখেই ছোট মেয়েকে কোলে নিয়ে বাড়ির বাইরে রাস্তায় বেরিয়ে এল। দেখতে পেল ওই তো দূরে একটা মানুষ তার দিকেই এগিয়ে আসছে আর তাকে ঘিরে আছে গোটা এলাকার মানুষ। গোটা এলাকার মানুষের কাছে এ যেন এক বিস্ময়কর ঘটনা। যে সেকেন্দারকে সবাই মৃত বলে জেনে এসেছে সেই সেকেন্দার জীবিত অবস্থায় ফিরে আসায় গোটা এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। এই ঘটনার ফলে পোস্টমাস্টার আতাহার আলি ও তার পরিবার নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাটা একটু একটু করে চাপা পড়তে শুরু করল।
সেকেন্দারকে ঘিরে এলাকার মানুষের দারুণ কৌতূহল। কীভাবে সে মৃত থেকে জীবিত হয়ে ফিরে এল এটাই সবার কাছে রহস্য। চারপাশ থেকে নানা জন নানা রকম প্রশ্ন করতে থাকল। কিন্তু সেকেন্দার কারও কোনও প্রশ্নের উত্তর দিল না। সে আপন মনে বাড়ির দিকে হাঁটতে থাকল। সেও দেখল দূরে ফরিদা দাঁড়িয়ে আছে। তার কোলে ছোট্ট একটা বাচ্চা। ওটা নিশ্চয়ই তার মেয়ে শরিফা। যার জন্মের কয়েকদিন আগেই সে বিদেশ চলে গিয়েছিল। ফরিদার দুই পাশে ছোট ছোট দুইটা ছেলে দাঁড়ানো। দূর থেকে চেনা না গেলেও সেকেন্দারের বুঝতে অসুবিধা হলো না যে ওরা দু জন তার ছেলে তৈমুর আর শরিফুল। হাঁটতে হাঁটতে একসময় বাড়ির সামনে চলে আসল। ফরিদা বেগমের চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়তে এল। এই চোখের পানি আনন্দের। তার জীবনে এর চেয়ে আনন্দের আর কোনও মুহূর্ত কখনও এসেছিল কি না তা সে মনে করতে পারে না। কাঁধের ব্যাগটা মাটিতে নামিয়ে রেখে সেকেন্দার দুই হাতে দুই ছেলেকে কোলে তুলে কপালে মুখে চুমু এঁকে দিলেন। তারপর তাদেরকে কোল থেকে নামিয়ে রেখে স্ত্রীর কোল থেকে শরিফাকে নিজের কোলে নিলেন। ছোট্ট শরিফা কিছুই বুঝতে পারছিল না। কারণ জন্মের পর সে তার বাবাকে কখনও দেখেনি। এত মানুষের ভিড়ে একজন অপরিচিত মানুষ তাকে কোলে নিচ্ছে দেখে সে ভীত হয়ে ভ্যা করে কেঁদে উঠল। সেকেন্দার তখন তার কপালে চুমু এঁকে দিয়ে বলল, কাঁদে না মা আমি তো তোমার বাবা। ফরিদা নিজেও তখন শরিফাকে বলল দেখো তোমার বাবা ফিরে এসেছে। এ কথা শুনে তার কান্না কিছুটা থামলো।
দশ বছরের মুবারক সেকেন্দারের ব্যাগটা মাটি থেকে তুলে বাড়ির ভিতরে নিতে চেষ্টা করল। কিন্তু ব্যাগটা অনেক ভারী হওয়ায় তার একার পক্ষে তা উঁচু করা সম্ভব ছিল না। পাশ থেকে আরেকজন হাত বাড়ালো। দু জন মিলে ব্যাগের দুই পাশ ধরে বাড়ির ভিতরে নিয়ে গেল।
সেকেন্দার কিংবা ফরিদার মনের মধ্যে বলার মতো কত শত কথা জমে আছে। কিন্তু চারপাশে এত মানুষের ভিড়ে সেই সব কথা বলার সুযোগ কোথায়। সে জন্য তাদের আরও অপেক্ষা করতে হবে। সেকেন্দারের সবচেয়ে বেশি বিস্ময় লেগেছে এটা দেখে যে এলাকার সব মানুষ জানে সে মৃত! ইরাক যুদ্ধের সময়ই তার মৃত্যু হয়েছে এবং সেটাও দুই বছর হয়ে গেছে! অথচ এমনটা হওয়ার কোনও কারণই সে খুঁজে পেল না। তার জীবনের গল্প না শুনে কেউ বাড়িতে যাবে না বলেই যেন পণ করল। কোনও উপায় না দেখে সেকেন্দার সবাইকে তার গল্প শোনাল। চুলায় তখন অর্ধেক রান্না বাকি। মুবারকের মাকে ফরিদা বেগম অনুরোধ করল তরকারিটুকু রান্না করে দিতে। এই অবস্থায় সে কিছুতেই রান্না করতে পারছে না। তার অনুরোধে মুবারকের মা রান্না করতে গেল। যদিও তার ইচ্ছে করছিল না। তারও সেকেন্দারের জীবনের গল্প শুনতে ইচ্ছে হচ্ছিল। তবে ফরিদা তাকে বলেছিল, ভাবি আমি তুমারে সব খুলে কবানে। সেই আশ্বাস পেয়েই মুবারকের মা ফরিদাদের জন্য তরকারি রান্না করতে গেল।
এলাকায় বিদ্যুৎ আসেনি। হারিকেন জ্বালিয়ে সেই আলোয় উঠানে একটা পাটি বিছিয়ে সেকেন্দার কথা বলা শুরু করল। তার কথা বলার মাঝেই সবাই বুঝতে পারলো পোস্টমাস্টার আতাহার আলির নিরুদ্দেশ হওয়ার রহস্য। ইরাকে যাওয়ার পর বেশ ভালোই চলছিল। প্রতি মাসে যা আয় হতো তা থেকে নিজের খরচ চালিয়ে বাকিটা সে দেশে পাঠিয়ে দিত। হঠাৎ করে ইরাকে যুদ্ধ লাগায় সবাই দিশেহারা হয়ে পড়ল। দেশে ফিরে আসার সুযোগ নেই। অনেক টাকা ঋণ করে বিদেশে এসেছে। এখন ফিরে গেলে কীভাবে সেই ঋণ শোধ করবে ? তাছাড়া সেই সময়ে যুদ্ধের ডামাডোলের মধ্যে বিমান চলাচলও বন্ধ হয়ে গেল। কেউ কেউ পালিয়ে পাশের দেশে আশ্রয় নিল। কেউ কেউ মারা পড়ল। সেকেন্দার যে কারখানায় কাজ করত একদিন সেখানেও বোমা হামলা হলো। অনেকেই মারা গেল। তাদের মধ্যে বাংলাদেশেরও অনেকেই ছিল। কিন্ত ভাগ্যক্রমে সেকেন্দার খুব আহত হলেও প্রাণে বেঁচে গেল। তবে জ্ঞান না থাকায় তার আর তখন কিছু মনে ছিল না। যখন জ্ঞান ফিরল তখন সে নিজেকে আবিষ্কার করল একটি অস্থায়ী হাসপাতালে। রেডক্রসের উদ্ধার টিম হতাহতদের উদ্ধার করে চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ করে তুলল। পুরাপুরি সুস্থ হতে তার প্রায় ছয় মাস লেগে গেল। এই সময়ে সে কোনও কাজ করতে পারেনি, এমনকি বাড়িতে চিঠিও লিখতে পারেনি। সে ইংরেজি পারত না আবার ওখানে আর যারা ছিল তারাও বাংলা জানত না। ফলে মুখে মুখে বললে কেউ তার হয়ে চিঠি লিখে পোস্ট করবে এমন সুযোগও সে পায়নি।
যেহেতু রেডিও-টেলিভিশনে অনেক মানুষের মৃত্যুর সংবাদ প্রচার হয়েছিল এবং তাদের মধ্যে অনেক বাংলাদেশিও ছিল তাই এলাকার মানুষ ধরে নিয়েছিল সেকেন্দারও মারা গেছে। কিন্তু সেকেন্দার একটু পরে যে তথ্য দিল তা শুনে ফরিদাসহ উপস্থিত সবার চোখ কপালে উঠল। সুস্থ হওয়ার পর সেকেন্দার বাড়িতে চিঠি লিখেছিল এবং সেখানে তার সঙ্গে ঘটে যাওয়া সব ঘটনা বিস্তারিত লিখেছিল এবং সেই সময়ে অল্প কিছু টাকাও পাঠিয়েছিল। ফরিদা তখন জানাল সে কোনও চিঠি পায়নি, এমনকি টাকাও পায়নি। তখনই সবার মধ্যে খটকা লেগে গেল। সেকেন্দার বলল কিন্তু বরাবরের মতই সেই চিঠির জবাব পেয়েছিল সেকেন্দার। সেই চিঠিতে টাকা প্রাপ্তি-স্বীকারসহ পরিবার এবং এলাকার অনেক সংবাদও ছিল। তারপর সে প্রতি মাসে টাকা ও চিঠি পাঠিয়েছে এবং বরাবরের মতই উত্তরও পেয়েছে। অথচ ফরিদা এর কিছুই জানে না! সে তখন জানাল সেকেন্দারের মৃত্যুর খবর শুনে তার পৃথিবীটাই বদলে গেল। সেই সময়ে আতাহার আলি চাচা ও তার স্ত্রী তার পাশে না দাঁড়ালে ছোট ছোট ছেলে-মেয়ে নিয়ে তাকে পথে বসতে হতো। সেকেন্দারকে লেখা প্রতিটি চিঠি সে যত্ন করে রেখে দিয়েছিল। সবার মাঝ থেকে উঠে গিয়ে ব্যাগ থেকে সে সেই সব চিঠি নিয়ে আসল। সবাইকে দেখালো। সব চিঠিই অবশ্য হতাহত হওয়ার পর সুস্থ হয়ে ওঠার পরের সময়কার। স্বামীর হাত থেকে একটা চিঠি হাতে নিয়ে ফরিদা বলে উঠল, এই হাতের লেখা তো আমার না! এটা তো আতাহার আলি চাচার হাতের লেখা!
এ কথা শোনার পর উপস্থিত সবার চোখ ছানাবড়া অবস্থা! তার মানে সব কিছুর মূলে আতাহার আলি! অথচ সবাই তাকে কত ভালো মানুষ মনে করে। ফরিদাকে নিজের মেয়ের মতো মনে করে নানা সময়ে সহযোগিতা করেছে! সবাই তখন অনুমান করতে পারে আতাহার আলি ও তার পরিবার কেন নিরুদ্দেশ হয়েছে। বিশেষ করে সেকেন্দার যখন জানাল বাড়ি আসার এক মাস আগেও সে অনেকগুলো টাকা পাঠিয়েছে। সেই সঙ্গে চিঠিতে জানিয়েছে এ মাসের সাতাশ তারিখে সে বাড়ি আসবে। সেই চিঠিটাও আতাহার আলির হাতেই পড়েছিল এবং সেটা পড়ে যখন সে জানতে পেরেছে সেকেন্দার ফিরে আসছে তখন বিপদ টের পেয়ে পরিবারসহ নিরুদ্দেশ হয়েছে। তখন আর কারও বুঝতে বাকি থাকল না যে পোস্টমাস্টার আতাহার আলি আগে থেকেই জানত সেকেন্দার বেঁচে আছে। কেননা সেকেন্দার সুস্থ হওয়ার পর যখন চিঠি লিখেছিল এবং অল্প কিছু টাকা পাঠিয়েছিল তখন সেটা আতাহার আলির হাতেই পড়েছিল। ততদিনে এলাকার সবাই জানত সেকেন্দার মারা গেছে। ফরিদা নিজেও সেটাই বিশ্বাস করে নিজেকে বিধবা হিসেবেই মেনে নিয়েছিল। যে মানুষটা সবার কাছে মৃত সেই মানুষটা জীবিত আছে এবং টাকা পাঠাচ্ছে এটা ভেবে আতাহার আলির সরল মনে শয়তান খোঁচা মারলো। উস্কানি দিল এই টাকাটা তুমি মেরে দিলেও কেউ কিচ্ছু টের পাবে না। অন্তত সেকেন্দার দেশে ফিরে না আসা পর্যন্ত কোনও সমস্যাই নেই! ফলে প্রতিবার সেকেন্দার টাকা আর চিঠি পাঠালে সেটা পোস্টমাস্টার আতাহার আলি সরিয়ে ফেলতো আর নিজের মতো করে চিঠির উত্তর দিয়ে দিত। এতে করে সেকেন্দারের মনেও কোনও সন্দেহ তৈরি হতো না। যেহেতু সেকেন্দারের পাঠানো টাকাটা আতাহার আলি হাপিশ করে দিচ্ছে তাই সেখান থেকে কিছু টাকা ফরিদাকে দিয়ে নিজেকে দয়ালু প্রমাণ করতে থাকল। এতে তার নিজের কাছেও একটু ভালো লাগলো যে পুরোপুরি সে তাদেরকে বঞ্চিত করছে না।
তারপর যখন সেকেন্দার ফিরে আসবে বলে চিঠিতে নির্দিষ্ট তারিখ জানিয়ে দিল তখন সেই চিঠি হাতে পেয়ে আতাহার আলির মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ল। একবার সেকেন্দার ফিরে এলে তার সব জারিজুরি ফাঁস হয়ে যাবে। এই নিয়ে সে অনেক ভাবলো। তার মনের শয়তান তাকে বারবার উস্কানি দিচ্ছিল সেকেন্দার ফিরলেই গ্রামে আসার আগেই তাকে খুন করতে হবে। কিন্তু কাউকে খুন করার মতো শক্তি বা সাহস কোনওটাই ছিল না আতাহার আলির। তেমন কাউকে সে চেনেও না যাকে টাকা দিয়ে এই কাজটা সে সারবে। অগত্যা সে পরিবারসহ পালিয়ে যাবে বলে সিদ্ধান্ত নিল। হাতে তখনও প্রায় এক মাস বাকি। সে ভেবে দেখল একবার যদি সে পালিয়ে যায় তবে আর ফিরতে পারবে না। আর ফিরতে না পারলে দীর্ঘদিন চাকরিতে যে প্রভিডেন্ড ফান্ড জমা হয়েছে সেটাও সে তুলতে পারবে না। একটু খোঁজখবর নিয়ে সে জানতে পারলো আবেদন করলে প্রভিডেন্ড ফান্ডের টাকা সে এখনি তুলে নিতে পারবে। সে কিছুদিন দৌড়ঝাপ করে কাজটা হাসিল করল। তারপরই সে পরিবারসহ নিরুদ্দেশ হলো।
সেকেন্দারের জীবনের গল্প শুনে সবাই স্তব্ধ হয়ে গেল। এলাকায় উত্তেজনা তৈরি হলো। সেই রাতেই উত্তেজিত জনতা মিলে আতাহার আলির বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিল। পরে আর আতাহার আলি ও তার পরিবারের কারও কোনও খোঁজ মেলেনি। দেশে ফেরার আগে মানি অর্ডার করে সেকেন্দার অন্যবারের তুলনায় অনেকগুলো টাকা পাঠিয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল বিদেশ যাওয়ার সময় যাদের থেকে ঋণ নিয়েছিল তাদের এখনও কিছু টাকা পাওনা আছে সেগুলো একবারে শোধ করে দেবে। কিন্তু তার সেই আশা পূরণ হলো না। সম্বল বলতে আসার সময় সঙ্গে করে যে টাকাগুলো নিয়ে এসেছিল সেই কটা টাকা। তা দিয়ে সে ঋণও শোধ করতে পারবে না, আবার নতুন করে বিদেশেও যেতে পারবে না। সেকেন্দারের মৃত্যুর সংবাদ শুনে লোকে যতটা কষ্ট পেয়েছিল তারচেয়ে বেশি কষ্ট পেল তার প্রতি যে অবিচার করেছে আতাহার আলি সেটা জেনে। তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা কারও ছিল না। যাদের থেকে সে ঋণ নিয়েছিল তারা তাকে আশ্বস্ত করল যে তাদের পাওনা টাকা নিয়ে এতটা না ভাবলেও চলবে। সে যে ফিরে এসেছে এলাকার মানুষের জন্য এটাই অনেক বড় বিষয়। বেঁচে থাকলে কোনও না কোনওভাবে টাকা আয়-রোজগার করা যাবে। সেকেন্দারের জীবনের গল্প শুনতে শুনতে রাত গভীর হয়ে গেল। আকাশে তখন মস্ত বড় চাঁদ। সেও বোধহয় দূরে বসে সেকেন্দারের জীবনের গল্প শুনছিল। তারপর সেই দুঃখগাথা শুনে তার মনেও রেখাপাত করল। একখণ্ড কালো মেঘ এসে তাকে ঢেকে দিল। গোটা পৃথিবী অন্ধকারে তলিয়ে গেল। সেই অন্ধকার হয়তো মেঘ সরলেই কেটে যাবে। কিন্তু সেকেন্দারের জীবনে যে অন্ধকার নেমে এসেছে তা কি কাটবে কখনও ? কেউ জানে না। একে একে সবাই যে যার বাড়িতে ফিরে গেলে সেকেন্দার কাপড় বদলে হাত-মুখ ধুয়ে ছেলে-মেয়েকে পাশে বসিয়ে খেতে বসলো। মনের মধ্যে এত ঝড় বয়ে যাওয়ার পরও তার ভালো লাগছে। এমন প্রশান্তির খাওয়া কতদিন সে খেতে পায়নি। হাতপাখার বাতাস করতে করতে তার মুখের দিকে অপলক তাকিয়ে থাকল ফরিদা বেগম। গতকালও যে বিধবা ছিল!
সচিত্রকরণ : রজত



