আর্কাইভগল্প

নিভৃতে : আফসানা বেগম

প্রচ্ছদ রচনা : গল্পসংখ্যা ২০২৪―গল্প

আপনার মুখটা অ্যাসিমেট্রিকাল।

কথাটা শুনে, আমি কলম থামিয়ে,ঝ চোখ উঠাই। ষোলো-সতেরো বছরের মসৃণ অথচ বিষণ্ন মুখের মেয়েটি আমার চেম্বারের দেয়ালে টাঙ্গানো পোস্টারের দিকে তাকিয়ে আছে। পোস্টারে বলা হয়েছে, কী করে মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নিতে হয়। তার পাশেই আরেকটা পোস্টারে মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়া বা বিষণ্নতায় ভোগা মানুষের সঙ্গে আপনি কীরকম আচরণ করবেন সে বিষয়ে গোটাদশেক উপদেশ। মেয়েটির টলটলে চোখ সেদিকে যায়। আমি তার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকি। দুই আঙ্গুলে ধরা কলমের পিছনের অংশে আমার দাঁত ঘন-ঘন পড়তে থাকে। এই বয়সের একটা কিশোরীর চোখেমুখে চকচকে ভাব থাকে। কারণে-অকারণে এরা হেসে গড়াগড়ি যায়। হাতে-পায়ে অস্থিরতার লক্ষণ দেখা যায়। অথচ মেয়েটিকে আমি দেখি স্থির আকাশের মতো, যেখানে না আছে বাতাস, না আছে রোদছায়ার খেলা।

আমি কলম দোলাতে দোলাতে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে থাকি। সে হয়তো পোস্টারটা পড়ছে। তার চোখের চারদিকে অল্পবৃত্তের কূপের মতো অন্ধকার। সেখানে দুর্বোধ্য কিছু কথা প্রতিধ্বনির মতো ঘুরে ঘুরে বাজে। ঝুঁকলেও কোনও প্রতিবিম্ব স্পষ্ট দেখা যায় না। আমি শুধু তার দিকে দেখি, তার না-বলা কথা বোঝার চেষ্টা করি না। চুলগুলো ঝরঝরে বলেই হয়তো তত এলোমেলো দেখায় না, তবে ভালো করে লক্ষ করলে বোঝা যায় চিরুনি পড়েনি। এই বয়সের মেয়েরা আজকাল বেশ সাজে। চোখ আর ঠোঁট খুব সতর্ক হাতে সরু রেখায় আঁকে। চুলের রঙ বদলায় কদিন বাদেবাদেই। আমার সামনের মেয়েটির চোখে কাজল পর্যন্ত নেই। গালের ওপরে প্রাকৃতিক তেলতেলে চামড়ায় ছাদের স্পটলাইটের প্রতিফলন দেখতে পাই যেন। উপদেশগুলোতে চোখ বোলাতে বোলাতে মেয়েটার মুখে বিষণ্ন একটা হাসি খেলে যায়; ঠিক হাসিও নয়, তাকে হয়তো উপহাস বলা চলে। মেয়েটা ঝট করে আমার দিকে তাকায়। আমি মুখ থেকে কলম নামিয়ে তার দিকে তাকিয়ে সামান্য হাসি। প্রত্যুত্তরে সে হাসে না। এগিয়ে এসে চেয়ার টেনে আমার সামনে বসে। টেবিলের দিকে ঝুঁকে না এসে পিছনের দিকে হেলান দেয়। তার সরু হাতদুটো কোলের ওপরে পড়ে থাকে। আমি আবারও হেসে বলি, তার মানে, আমি দেখতে সুন্দর না, এই তো ?

আমি তা বলিনি, দেয়ালের কোনও এক পোস্টারে চোখ রেখে বলে সে।

তাহলে কী বলেছেন ?

বলেছি আপনার মুখ অ্যাসিমেট্রিক। এক দেখাতেই বুঝেছি।

এত দূর থেকে এক দেখাতেই কী করে বুঝলেন ?

আমি জিওমেট্রিতে ফুল মার্কস পেয়েছিলাম। এখন অবশ্যি আর পরীক্ষাই দিব কি না… সেটা না, মানে, আমি দূর থেকেই বুঝতে পারি। আর সব অ্যাসিমেট্রিক জিনিস সুন্দর। একটা স্কেল ধরলে দেখা যাবে আপনার একটা চোখ আরেকটার চেয়ে সামান্য উঁচুতে।

ও, আপনি তাহলে আমাকে সুন্দরই বলেছেন। ধন্যবাদ। তবে ওই কথাটা একদম ঠিক বলেছেন, পাসপোর্ট সাইজের ছবিতে আমি এই জিনিসটা প্রথম লক্ষ করে চমকে উঠেছিলাম। মানে, ওই যে, আমার একটা চোখ সামান্য নিচে। তারপর ভেবে নিয়েছি এমনটা হয়তো অনেকেরই থাকে। থাকে না ?

হয়তো থাকে। তবে সবাই ধরতে পারে না। আপনি পেরেছেন।

মেয়েটা হাসির মতো একটা মুখ করে আমার দিকে তাকায়, বলে, আমাকে কেউ তুমি বললে আমার ভালো লাগে না। কিন্তু আপনি আমাকে তুমি বলবেন। ইট্স ওকে।

আচ্ছা। নাম কী তোমার ?

আমি প্রেসক্রিপশনের ওপরে লেখার জন্য কলম তৈরি রাখি। রোগীর গল্পটা লেখার জন্য আমার আলাদা নোটবুক আছে। সেখানেও ছোট করে তার নাম লিখি, শারিন।

সুন্দর নাম। কার সঙ্গে এসেছ ?

একাই।

একদম একা ?

কেন, একা কি কেউ আপনার কাছে আসে না ?

তোমার মতো বয়সের কেউ কখনও একা আসেনি মনে হয়। তবে এই তো তুমি এলে।

আপনি আমাকে সমস্যা জিজ্ঞেস করবেন না ?

তুমি তো সমস্যা বলতেই এসেছ। এই যে জিজ্ঞেস করছি, বলো, শুনি।         

বলব বলেই তো কোচিং থেকে ফেরার পথে এখানে নামলাম। কিন্তু…

কিন্তু কী ?

আমি আপনাকে ঠিক বিশ^াস করতে পারছি না।

তুমি বুদ্ধিমান।

মানে ? আমি বললাম, আমি আপনাকে ঠিক বিশ^াস করতে পারছি না।

আমিও তো সেটাই বললাম যে, তুমি বুদ্ধিমান। এত অল্প দেখাতে কাউকে বিশ^াস করা উচিত ? উচিত যে না, সেটা বুঝতে পারাই তো বুদ্ধির ব্যাপার।

মেয়েটা আমার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। আমি তাকে সময় দিই। খামোখাই পাশে থাকা একটা ফাইল তুলে নাড়িচাড়ি। মেয়েটা হঠাৎ কাঁদো কাঁদো গলায় বলে, কী করব আমি ? আমি যে কাউকেই বিশ^াস করতে পারছি না ?

আচ্ছা, শারিন, তোমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে কেউ কি তোমার সঙ্গে কিছু করেছে ? মানে, বলতে ইচ্ছা হলে বলো, আর না ইচ্ছা হলে…

আপনি জানলেন কী করে ?

আমি জানি না তো! আমি শুধু তোমার কাছে জানতে চাইলাম। বলতে পারো, আমি আন্দাজ করলাম।

হ্যাঁ, মানে সেটাই, আপনি আন্দাজ করলেন কী করে ?

ধরো, আমরা তো বিভিন্ন বিষয়ের ওপরে এটাসেটা আন্দাজ করেই থাকি। কখনও সেটা মিলে যায়, আবার কখনও ধারেকাছ দিয়েও যায় না। তাই হতে পারে কাকতালীয়ভাবে আমার আন্দাজ তোমার সঙ্গে ঘটা কোনও ঘটনার সঙ্গে…

শারিন কয়েক মুহূর্ত আমার দিকে তাকিয়ে থেকে মুখের ওপর দুই হাত চেপে ধরে ফুঁপিয়ে ওঠে। আমি চেয়ারের পিছনে হেলান দিয়ে তাকে কাঁদতে দিই। কান্না এক ধরনের বহিঃপ্রকাশ। এই প্রকাশ খুব জরুরি। মানুষ তার দুঃসহ সময়ে যত ভেঙে পড়ে, ততটা কাঁদে না। মানুষ দেখাতে চায় তার মনোবল অনেক বেশি। যে কোনও পরিস্থিতি সে সামলে উঠতে পারে। হতে পারে কারও কারও পক্ষে সেটা সত্যিই সহজ। তবে কারও পক্ষে কান্না চেপে প্রতিদিনের সবকিছু সামলে চলা সহজ নয়। কান্না চেপে থাকতে থাকতে তাদের বুকের ওপরে পাহাড় জমে ওঠে। সেই ভারী পাহাড় নিয়েই তারা চলাফেরা করেন।

আমি শারিনকে বেশ খানিকক্ষণ কাঁদতে দিই। হয়তো এর পরে সে আগের চেয়েও স্পষ্ট করে কথা বলতে পারবে। দুই কনুই টেবিলে ঠেকিয়ে আমি গালে হাত দিয়ে তার দিকে তাকিয়ে থাকি। আমি তাকে চিনি না। শুধু তার ঝরঝরে চুলগুলোর সামনে দিকে ঝুঁকে আসার দৃশ্যটা দিয়ে আমি তাকে চিনতে শুরু করি। আমার ইচ্ছে করে টেবিলের ওদিকটায় গিয়ে তার মাথায় হাত রাখি। কিংবা তাকে জড়িয়ে ধরি। কিন্তু কেন যেন তা করতে পারি না। সংকোচ হয়। শারিন আমাকে বিশ^াস করতে পারবে কি না সেটাই এখনও জানা হয়নি। আমার স্পর্শ তার ভালো না-ও লাগতে পারে। কারও স্পর্শের ব্যাপারেই তার বিরক্তি থাকতে পারে। আমি চুপচাপ টেবিলের এদিকটাতেই বসে থাকি। শারিন কিছুক্ষণ ডুকরে কাঁদে। আমি বুঝতে পারি সে আমাকে বিশ^াস করতে শুরু করেছে, না হলে কেবল আমার সামনে বসে ওভাবে বাঁধনহীন কাঁদতে পারত না। একটা সময়ে হয়তো তার মনে পড়ে সে নিজের জনশূন্য আপন ঘরে নেই, অন্য কোথাও অন্য কারও সামনে এতটা ভেঙ্গে পড়েছে। চমকে উঠে সে হাতের উল্টা পিঠে ভেজা গাল আর গলা মুছে নেয়। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে মরিয়া হয়ে বলে, আমি কাউকে বলতে পারছি না, কাউকে বোঝাতে পারছি না আমার ওপর দিয়ে কী যাচ্ছে। আপনি কি বুঝবেন ?

আমি চেষ্টা করব, শারিন। যার যার ব্যথা যার যার সমস্যা তার কাছে বড়। অন্যে কি তা আন্দাজ করতে পারে ? কিন্তু আমি কথা দিচ্ছি, আমি তোমার সমস্যাটা বোঝার চেষ্টা করব। তুমি তো কাউকে বলবে বলেই আমার এখানে এসেছ, তাই না ?

আমার কথার কোনও উত্তর শারিন দেয় না। ঘরটার এদিক-ওদিকে তাকায়। মাথার ওপরের বাতিগুলো অফ করে রেখে আমি দরজার কাছের বাতি আর টেবিলের ওপরের ল্যাম্প জ¦ালিয়ে রেখেছি। এতে করে রোগীর মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করা যায়। সে কেবল টেবিলের ওপরটা আর আমাকে দেখতে পায়, বাকি পৃথিবী তার কাছে ঝাপসা করে ফেলার উদ্দেশ্যেই এই প্রয়াস। শারিন উঠে দাঁড়ায়। আবছা আলোয় ডান দিকের দেয়ালের দিকে হেঁটে যায়। পিয়ানোর দুটো রিডে টুং টাং শব্দ করে বলে, আমি কোনওদিন কোনও ডাক্তারের চেম্বারে পিয়ানো দেখিনি।

আমি হাসি, আরে আমি কি আর সেরকম ডাক্তার নাকি যারা গাদা গাদা ওষুধ দিয়ে চিকিৎসা করেন ? যান গিয়ে এক্স রে করুন চারটা, আলট্রা সনোগ্রাম দুটো, ইসিজি ইটিটি করে নিয়ে আসুন গে―আমি কি এসব বলি ? আমি তো তোমার মতো মানুষের সঙ্গে শুধু কথা বলি।

কিন্তু আমার যে ওষুধ লাগবে! আমি কতদিন ঘুমাই না জানেন ?

শারিন পিয়ানোর রিডে টুংটাং করে। আমি চুপচাপ তার দিকে তাকিয়ে থাকি। ঘুম না হওয়ার চিহ্ন তার চেহারায় স্পষ্ট। শারিন যেভাবে টুংটাং করে তাতে মনে হয় সে পিয়ানো বাজাতে জানে। কিছু পরে আমি জানতে চাই, তুমি কি পিয়ানো বাজাও ?

বাজাই না। বাজাতাম।

তাই নাকি!

হুম। আমার দুই হাতের মোটোর স্কিল ঠিক ছিল না। পেনসিল ধরতে পারতাম না ঠিকমতো, তাই লিখতেও পারতাম না। তাই সেই ছয় বছর বয়সে আমাকে মোটোর স্কিল ডেভলপ করার জন্য মা পিয়ানো শিখতে পাঠিয়েছিল। স্কুলে এক রাশান টিচার পিয়ানো শেখাত। ফিমেল। শি ওয়াজ বিউটিফুল।

কথা বলতে বলতেই শারিন একটা মিউজিক বাজাতে শুরু করে। আমি স্তব্ধ হয়ে যাই। ইয়োহান পাখ্লবেলের ক্যানন ইন ডি। শারিনের সরু আঙুলগুলো হালকা আলোয় অনুসরণ করতে চেষ্টা করি আমি। কিছুতেই পেরে উঠি না। সুরটা কানকে এমনভাবে ভরিয়ে ফেলে যে আমার মাতাল মাতাল লাগা শুরু হয়। শারিনের আঙুলগুলো দেখতে ঝাপসা হয়ে ছড়িয়ে যাওয়া ছবির মতো লাগে। আউট অফ ফোকাস। ষোড়শ শতাব্দীর একটা ভুলে যাওয়া সঙ্গীত শারিনকে কে শেখাল আর এত সুন্দর তার হাত কে তৈরি করল তাই ভাবছিলাম। ওই রাশান বিউটিফুল মহিলা ? সঙ্গীতে ঘরের বাতাস ভারী হয়ে উঠল। সৌন্দর্যের চাপ কখনও তীব্র হয়। অসহনীয়। মাথার কোথায় যেন গিয়ে লাগে, মনে হয় চোখে পানি এসে গেছে। নিউরনে আলোড়ন তুলে শেষের দিকে সঙ্গীত ঘন হতে হতে অন্য উচ্চতায় গিয়ে তিনটা টুংটাং শব্দে গিয়ে থামে। যেন শেষ মুহূর্তে মাথায় একটা তুমুল উত্তেজনা তুলে উধাও। ঘরে আবারও নীরবতা নেমে এলে আমি বোবার মুখে কথা ফোটার ভঙ্গিতে বললাম, এত আগের একটা সঙ্গীত তুমি এত সুন্দর করে বাজালে কী করে! মানে, আমি অবাক হচ্ছি যে তোমার জেনারেশনের কেউ ষোড়শ শতাব্দীর মিউজিকটা… মানে, আমি বিশ^াসই করতে পারছি না!

ইউটিউব থেকে শিখেছি। তবে আমি কারও সামনে পিয়ানো বাজাই না। ইন ফ্যাক্ট, আমি কাউকে বলিই না যে আমি পিয়ানো বাজাতে পারি। আমার স্কুলে কেউ জানে না।

ইউটিউব থেকে এত কঠিন মিউজিকও শেখা যায় ? ওরা খুব ভালো শেখায় বুঝি! যা হোক, স্কুলের লোকেরা তোমার এই চমৎকার হাতের কথা জানলে তোমাকে প্রতিটা অ্যানুয়াল প্রোগ্রামে পিয়ানো বাজাতে হতো। ভালোই হয়েছে।

এই প্রথম শারিন হুট করে হেসে ফেলে। তারপর আমার সামনে চেয়ার টেনে বসে বলে, আপনি খুব ভালো। মানুষের ইচ্ছার মূল্য আছে আপনার কাছে। আমি ভেবেছিলাম সাইকিয়াট্রিস্টরা ঠিক এমনই হয়। এজন্যেই তো আমি খুঁজে খুঁজে আপনাকে বের করলাম।

কিন্তু খুঁজলে কেন ? মানে, শারিন, বলো তোমার সমস্যটা আসলে কী।

আপনিও আমার মতো, প্রশংসা শুনতে চান না।

দেখ, শারিন, এখানে তুমি আমাকে বুঝতে এসেছ নাকি তোমাকে আমাকে বোঝাতে এসেছ ?

আমাকে বোঝাতে। ওই যে মিন করলাম, আমিও আপনার মতো। আপনি কি আমাকে বুঝতে পারছেন ?

আমি তার দিকে হাত বাড়াই। নিতান্ত হ্যান্ডশেকের ভঙ্গিই বলা যায়। সে বাড়ায় না। বরং চেয়ারের পিছনের দিকে তার পিঠ হেলিয়ে দেয়। আমি চমকে উঠে বলি, শারিন, কেউ কি তোমাকে বিশ্রীভাবে ছুঁয়ে দিয়েছে ?

আশ্চর্য, আপনি কী করে বুঝলেন ?

আমি বুঝব বলেই তো তুমি এসেছ এখানে।

শারিন কেঁদে ফেলে। যে কথাটা আমি বলতে চাইলেও মা বোঝে না, সেটা আপনি না বলতেই বুঝে গেলেন!

তুমি কি মাকে বলতে চেয়েছিলে ?

বিশ^াস করেন, বহুবার বলতে চেয়েছি। আমি পরিষ্কার করে বলেছি যে, শুভ স্যারের কাছে আমি পড়ব না। কিন্তু মা… মা মনে করে আমি পড়া ফাঁকি দেওয়ার জন্য উনার কাছে পড়তে চাই না।

তুমি সত্যি কথাটা মাকে বলে দাওনি কেন যে, শুভ স্যার তোমাকে…

আমি বলতে পারিনি। আমার কথা মা বিশ^াস করবে না। আপনি বুঝতে পারছেন না। মা বলবে আমি পড়া ফাঁকি দেওয়ার জন্য উনাকে… উনার কাছে যে পড়ে সে-ই ম্যাথস আর ফিজিক্সে এ প্লাস পায়। মা চায় আমি সব সাব্জেক্টে এ প্লাস পাই। খুঁজে খুঁজে সে আমার জন্য প্রায় সব সাবজেক্টের জন্য টিচার ঠিক করে এনেছে। আমার সারা দিনের প্রতিটা মিনিটে কোথাও না কোথাও মা আমাকে ব্যস্ত রেখেছে। আমি তো চেষ্টা করছি। বিশ^াস করেন, আমার বলা উচিত আমি চেষ্টা করছিলাম। এখন আর করছি না, মানে, পারছি না। আমার ঘুম নেই, খাওয়া নেই, পড়া মনে থাকে না। কী করব বলেন তো!

শারিনের মাথা দোলানো দেখতে অপ্রকৃতিস্থের মতো লাগে। শারিন দুই হাত দিয়ে কানের দুই পাশে চেপে ধরে। তারপর গোঙানির মতো শব্দ করে। আমি টেবিলের ধার দিয়ে ঘুরে তার দিকে যাই। ঝরঝরে চুলগুলোর ওপরে ইতস্তত হাত রাখি। মসৃণতায় হাত পিছলে যায়। কিন্তু অবাক করা বিষয় হলো আমার স্পর্শে শারিন কোনও প্রতিক্রিয়া দেখায় না। আমি তার মাথায় হাত বোলাই, তুমি কি তোমার সঙ্গে যা হয়েছে, তার জন্য বেশি দুঃখিত, নাকি মা যে তোমার কথা বিশ^াস করেন না সেজন্য বেশি ?

প্রশ্ন শুনতেই শারিন স্তব্ধ হয়ে যায়। কান্না থামিয়ে শূন্যদৃষ্টিতে কী যেন ভাবে, তারপর আমার কোমর জড়িয়ে ফুঁপিয়ে ওঠে। আমি বলি, এই বোকা মেয়ে কাঁদছ কেন বলো তো ? সারাটা জীবন পড়ে আছে তোমার সামনে। কত্ত কিছু করার আছে!

কিচ্ছু নেই আমার সামনে। আমাকে দিয়ে আর কিছু হবে না।

এরকম বলে না, শারিন। প্রতিটা মানুষের ভিতরে থাকে অপার সম্ভাবনা। প্রকৃতি যে কখন কাকে কোথায় নিয়ে দাঁড় করিয়ে দেয়, কেউ জানে না। আর তুমি কিন্তু সেটা জানার সুযোগই পাওনি।

আমার কথার মাঝখানে শারিনের ফোন বেজে ওঠে। সে চমকে উঠে কবজির উলটো পিঠে চোখ-নাক মুছে ফেলে। তারপর ভয়ে কুঁকড়ে যায়। চোখ গোল গোল করে বলে, মা ফোন করেছে! আমি তার বিপদটা ঠিক আঁচ করতে পারি না।

হ্যালো, মা… জি, আমি কোচিং থেকে জাস্ট বেরোলাম।… না মা, আমি তো গেছি, ওরা ভুল বলছে।… ও আচ্ছা, আমি মনে হয় একটু দেরিতে গেছি, প্রেজেন্ট মার্ক করা হয়নি।… আমার লোকেশন জি ব্লক দেখাচ্ছে ? গাড়ির দিকে হাঁটছিলাম তো, গাড়িটা আজকে একটু দূরে পার্ক করা হয়েছে।… এখন মা, গাড়ি একটা ব্লক দূরে পার্ক করতে হলে আমি কী করব, নিশ্চয় পার্কিং পায়নি।… হ্যাঁ, চলে আসব। এই তো…

উফ! শারিন হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। জোরে একটা নিশ^াস টেনে বলে, বিশ^াস করেছে মনে হয় ? কে জানে।

আমি হাসি। এখানে আসাটা লুকাতে চাইলে তুমি, এই তো ?

লুকাব না ? মা জানলে খবর আছে। কোচিংয়ের বাইরে একটা মিনিট কোথাও সময় নষ্ট করেছি শুনলে মা…

কিন্তু তোমার মায়ের সঙ্গে যে আমার কথা বলার দরকার ছিল।

মাথা থেকে আমার হাত এক ঝটকায় সরিয়ে দিয়ে শারিন উঠে দাঁড়ায়, মানে ? এর মধ্যে মা কেন ? মাকে কী বলবেন আপনি ? বলতে বলতে শারিন হ্যান্ডব্যাগ হাতে নেয়, তারপর সোজা হাঁটা দেয় দরজার বাইরে। আমি পিছনে হেঁটে যেতে যেতেই সে নাই। মনে মনে বলি, আমাকে অবিশ^াস কোরো না শারিন। খানিক পরে অপেক্ষমাণ অন্য রোগী ঘরে ঢোকে। আমি ডুবে যাই অন্য জটিলতায়। নতুন গল্পের নতুন চরিত্রগুলোকে বুঝতে চেষ্টা করি। কিন্তু শারিনের ফোলা ফোলা টলটলে চোখের ছবিটা ভুলতে পারি না। কী হয়েছিল ওর সঙ্গে ? ধুর ছাই, ভাবতে গিয়ে পরের রোগীর কিছু ডিটেইলস কান ছুঁয়ে চলে যায়। স্যরি বলে আবার শুরু করাই তাকে। মানুষের চোখ-কান দুটো হলেও চিন্তা কিন্তু একটাই। আর চিন্তার কথা ভাবতে গেলে পৃথিবীতে মাল্টি টাস্কিং বলে কিছু নেই। আমি আর মনোযোগ দিতে পারি না। রোগীদের কথায় শতভাগ মনোযোগ না দেবার জন্য আমার অপরাধবোধ হতে থাকে।

বাসায় ফিরেও আমি শারিনের কথাই ভাবতে থাকি। সে কি আমার কাছে আর আসবে ? তার ফোন নম্বর রেজিস্ট্রার খাতা থেকে নিয়ে আমি তাকে ফোন করতে পারি। সে কি তাকে সাহায্য করার জন্য আমাকে আর মেনে নেবে ? কিছুই বুঝতে পারি না। বুক ফেটে কান্না আসে। শারিনের জন্য নয়, আমি জানি কান্নাটা আমার নিজের জন্য। তবে আজকের আমার জন্য নয়। সেই যে আমি যখন শারিনের বয়সে ছিলাম, সেই ‘আমি’টার জন্য। আমি মাকে বলেছিলাম ফয়সাল চাচাকে আমার ভালো লাগে না। বলেছিলাম ফয়সাল চাচার সঙ্গে আমি মোটরবাইকে উঠব না, মা আমার কথা বুঝতে পারেনি। উলটো বলেছিল, এমনি তো দেখি মোটর বাইকে ওঠার জন্য পাগল, কিন্তু এখন ফয়সাল একটু ঘুরিয়ে আনতে চাচ্ছে, এখন আবার কী হলো ? আমি শরীর মুচড়ে মাকে জানান দিচ্ছিলাম। ফয়সাল চাচা আমাকে হাত ধরে টেনে মোটরবাইকে বসাতে বসাতে মায়ের সামনেই আমার কোমরে জড়ানো তার আঙুলগুলো পিয়ানোর রিডে রাখার মতো চালনা করেছেন, আমি মনে মনে ঈশ^রকে ডেকেছি, আর ডেকেছি মাকে, মা দেখো মা দেখো লোকটা আঙুল দিয়ে আমাকে কী করে, লোকটা তার আঙুলগুলো আমার সারা শরীরে ঢুকিয়ে দেয়, ফ্রক-পায়জামা কিছুই তাকে ঠেকাতে পারে না… মা দেখেনি। মা আমার নির্বাক কথা শুনতেও পায়নি। মা হেসে হেসে কথা বলছিল ফয়সাল চাচার সঙ্গে, তার চোখের দিকে তাকিয়ে, আমার ফুলছাপা প্রিন্টেড ফ্রকের ওপরে তার আঙুলের নড়াচড়ার দিকে মায়ের নজর ছিল না। আমি জানতার এরপর কী হবে। পাড়ার গণ্ডি পেরিয়ে বাইকটা যখন নদীর ধারের দিকটায় যাবে, চাচা আমাকে দেখাতে নিয়ে যাবেন শুকনো বালুর ওপরে তিনি কত জোরে বাইক চালাতে পারেন। প্রায়ই চাকা আটকে যাবে আর চাচার দুই হাতের দশ আঙুল তখন সহস্র আঙুল হয়ে আমাকে দংশন করবে।

সব জানলেও আমি মাকে বলতে পারিনি। বলা যায় না, এটুকু বুঝেছি। কিন্তু এই অভিমান নিয়ে বড় হয়েছি যে, মা কেন বোঝেনি ? মা কেন দেখেনি ? মায়ের উদাসীনতার কারণেই তো আমার সঙ্গে এত কিছু হয়েছিল। বাড়ির পিছনের পুনর্ভবায় আমার ঝাঁপিয়ে পড়তে ইচ্ছে করত, বছরের পর বছর মোটর বাইকের আওয়াজ শুনলে আমার বুক কেঁপে উঠত। মায়ের মৃত্যু পর্যন্ত আমি তার খেয়াল রেখেছি, আমার হাতের ওপরে মাথা রেখে মা মারা গেছে। কিন্তু আমার শরীর হাতিয়ে মায়ের সঙ্গে মিষ্টি মিষ্টি কথা বলা ফয়সাল চাচার স্মৃতিও আমি ভুলিনি আর আমার প্রতি মায়ের অমনোযোগের জন্য তাকে ক্ষমাও করিনি। মায়ের শাস্তি হলো আমার ক্ষমাহীন ঘৃণার কথা আমি কখনও তাকে জানতে দিইনি।

কিন্তু আমার মতো শারিনও কি অশ্রুত রয়ে যাবে ? তার কথা কেউ জানবে না ?

বিছানায় এপাশ ওপাশ করি। ঘুমের সমস্যা নেই বলে বাড়িতে সামান্য পাওয়ারের কোনও ঘুমের ওষুধও থাকে না। কী করি কী করি! দুশ্চিন্তায় রাতে ফোনটা নীরব রাখতেও ভুলে গেছি। বন্ধ চোখে মনে হয় তারস্বরে সেটা চিৎকার করে ওঠে। চমকে উঠে দেখি অপরিচিত নম্বর। এত রাতে কে ফোন করবে আমাকে, কোনও রোগীর কি ভয়ানক বা জরুরি কিছু হতে পারে ? ছোটকালে দেখেছি খুব রাতে টিঅ্যান্ডটি ফোন বেজে উঠলেই মা ধরে নিতেন মৃত্যুসংবাদ। ভাবতেই হাত কেঁপে ওঠে। ফোনের ওপারে কান্নাভেজা পরিচিত গলা, আপনি জানেন আজকে শুভ স্যার আমার সঙ্গে কী করেছেন ?

শারিন, কী হয়েছে তোমার ? কী করেছেন তিনি বলো তো ?

আমি বলতে পারব না, কিছুতেই বলতে পারব না। শুভ স্যার আমাকে আজকে…

মুখে থুতু জমাতে শারিনের কথাগুলো স্পষ্ট হয় না। আমি তাকে শান্ত করার চেষ্টা করি। আচ্ছা, শারিন তোমার তো এখন হেল্প দরকার, হয়তো দ্রুত কোনও হাসপাতালে… আমি কি তোমার বাড়ির কারও সঙ্গে একটু কথা বলতে পারি ?

শারিন মনে হয় হঠাৎ কিছুটা ধাতস্থ হয়। কার সঙ্গে কথা বলবেন ? বাবা একজনকে বিয়ে করে চলে গেছে। মা সারাদিন অফিসে থাকে। তিনি এখন ভীষণ ক্লান্ত। নানি আছে, ঘুমাচ্ছে। তাকে ডাকলে তুলকালাম কাণ্ড হবে। আমার যেদিন মেন্ট্রুয়েশন হলো, মা দেখলাম স্যানিটারি প্যাড নিয়ে আমার ঘরের দিকে আসছে, নানি তার বিছানায় বসে খোলা দরজার দিকে উঁকি দিয়ে বলল, হলো নাকি ? কী ঝামেলা! আস্ত আমিটাই তাদের কাছে ঝামেলা। আমার কাছে কোনটা ঝামেলা তা কি তারা কোনওদিন জানতে চেয়েছে ? আমি তো ছোট, আমার আবার বোধ বুদ্ধি আছে নাকি ? এই যেমন আপনি, কেন কথা বলতে চান অন্য কারও সঙ্গে ? আমি তো বলছি শুভ স্যার আমাকে আজকে…

বলো, কিংবা কাল আমার কাছে এসে বলো।

কী করে আসব ? আজকে এসে দেখি শুভ স্যার বসে আছেন। দেরি হয়েছে বলে মা সন্দেহ করেছেন, আমি নিশ্চয়ই পড়া বাদ দিয়ে কিছু একটা করেছি। বলতে হয়েছে ক্লাসমেটদের সঙ্গে আইসক্রিম খেতে গেছি। মা লাইফ৩৬০ নামের একটা অ্যাপ দিয়ে আমাকে দিনরাত অনুসরণ করেন। আমি কোথায় কয়েকটা মিনিট নষ্ট করি, মা জানতে পারেন। সময় নষ্ট করলে আমার রেজাল্ট খারাপ হবে। শুভ স্যারের কাছে দেরি হলে আমার রেজাল্ট খারাপ হবে, আমি এ প্লাস পাব না। শুভ স্যার আমাকে কী করল তাতে মায়ের কী ? মায়ের দরকার এ প্লাস। শুভ স্যারের কাছে যে সায়েন্স আর ম্যাথস পড়ে সে এ প্লাস পাবেই।               

এ কী শারিন, তুমি এখনও ঘুমাওনি ? কী আশ্চর্য, কাল স্কুল আছে না ? সারা রাত জেগে তুমি কালকে ক্লাসে মনোযোগ দিতে পারবে ? রেজাল্ট খারাপ হলে কিন্তু আমি তোমাকে… আর এত রাতে কার সঙ্গে কথা বলছ ? দেখি ফোন দেখি ?

শারিনের মায়ের আর্তনাদ শুনে আমি কাঠ হয়ে অপেক্ষা করতে লাগলাম।

হ্যালো হ্যালো… কে আপনি ? কে ওদিকে ?

আমি, ডক্টর আফরোজা। আপনার মেয়ে আমার পেশেন্ট।

পেশেন্ট মানে ? কী পাগলের প্রলাপ এই মধ্যরাতে ? কে আপনি ?

আমি সাইকিয়াট্রিস্ট। আপনার মেয়ে আমার কাছে এসেছিল। ওর শুভ স্যার ওকে আজকে কী করেছে জানেন ?

কী করেছে ?

ওর শুভ স্যার সম্ভবত আজকে ওকে রেপ করেছে।

এই শারিন, এ এসব কী বলছে, পাগল নাকি এই মহিলা ? আবার নিজেকে বলছে ডাক্তার! তুমি চেনো ?

শারিনের কোনও সাড়াশব্দ নেই। তার মা আমাকে বলে যায়, আর এই যে আপনি শুভর সম্পর্কে আজেবাজে কথা বলছেন, আপনার উদ্দেশ্যটা কী বলেন তো ? আমার মেয়ের রেজাল্টটা যেন খারাপ হয়, এই তো ? কত কষ্ট করে, অন্য বাড়ির চেয়ে পাঁচ হাজার টাকা বেশি দিয়ে তারপর শুভ স্যারকে আমি রাজি করিয়েছি। আর এখন আপনি কে না কে ফোন করে এসে এই সমস্ত কথা বলছেন। এমনিতেই মেয়েটা পড়ায় ফাঁকি দেওয়ার ওস্তাদ। ছোট্টবেলা থেকে ওই স্যার ভালো না, এই স্কুল ভালো না―এসবই চলছে। যাকগে, আপনি আসলে কে বলেন তো ?

মা, ইনি সত্যি বলছেন, শুভ স্যার আজকে আমাকে…

চুপ করো তুমি! সে তোমাকে কী করেছে তা জানবেন উনি, না ? এত ভালো একটা ছেলের সম্পর্কে যা তা মিথ্যা কথা। পড়াশোনা ফাঁকি দেয়ার যত্ত সব কায়দা তোমার। আমি বুঝি না মনে করেছ ? নিশ্চয়ই স্যার কাল পরীক্ষা নিতে চেয়েছেন, তাই না ? ফাঁকি দেওয়ার কত কায়দা যে তুমি জানো, শারিন! সায়েন্স আর ম্যাথসে এ প্লাস না পেলে তুমি কত পিছিয়ে যাবে জানো ? এসএসসিতে পুওর মার্ক হলে, পরে মেডিকেল, বুয়েট, কোনও পরীক্ষায় বসতেই পারবে না। আর আমি কিনা তোমাকে বিদেশের বড় ইউনিভার্সিটিতে মাস্টার্স করানোর স্বপ্ন দেখি… উহ্ মাঝরাতে উটকো একটা কলে, কী যে বলব… শোনো শারিন, পড়া ফাঁকি দেওয়ার এত ফন্দি করবে না। আমি অনেক সহ্য করেছি। এবার কিন্তু তোমাকে আমি…                    

শুনুন শুনুন… আমার কথাটা একবার…

ফোনের লাইনটা কেটে যায়। শারিনকে আর বিপদে ফেলতে ইচ্ছা করে না। কিন্তু আমি তো ডাক্তার, আমার তো পেশেন্টকে সাহায্য করতে হবেই! গা ঝাড়া দিয়ে বসে আমি লিস্টের লাস্ট কলে কল করতে থাকি।           

নম্বরটি এখন বন্ধ আছে। আমি বন্ধ দরজায় বারবার ঘা দিতে থাকি। ফোনের মধ্য দিয়ে হাত ঢুকিয়ে আমি ওপারে কোথাও ফয়সাল চাচার টুঁটি চেপে ধরবো নিশ্চিত।

সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button