
প্রচ্ছদ রচনা : গল্পসংখ্যা ২০২৪―গল্প
লোকটা তড়িঘড়ি করে রাস্তা পার হচ্ছিলো, পেছন থেকে কিছু একটা শুনে সে হঠাৎই ঘুরে তাকায়। সঙ্গে সঙ্গে মিলে যায় ট্রাফিকের গেরো খুলে যাবার একটা মোক্ষম সুযোগ। লোকটা পেছনে ঘুরে দাঁড়িয়ে শব্দের উৎস খুঁজে পাবার আগেই গাড়িগুলো একযোগে হমড়ি খেয়ে পড়ে তার ওপর। অনেকগুলো ক্ষুধার্ত বাঘ একটা মাত্র হরিণ শাবকের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লে যেমন দেখায় ঠিক তেমন দেখায় দৃশ্যটা। দু’জন ট্রাফিক পুলিশ মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থেকে এই দৃশ্য দেখে যায়―এমন একটা ঘটনা ঘটার পরও তাদের ভেতর বিন্দুমাত্র কর্মতৎপরতা দেখা যায় না। খানিক দূরে ফুটপাথে দাঁড়িয়ে থাকা ঝালমুড়িওয়ালা স্বভাবে কৌতূহলী কিন্তু সুযোগ সন্ধানী। তাই গাড়ির নিচে চাপা পড়া লোকটার পরিণতি কী হলো সেটা দেখবার জন্য দাঁড়িয়ে পড়া লোকগুলোর ভিড়ে নিজেকে সামিল না করে দু হাতে ধরে রাখা মশলার কৌটো উঁচু করে ঝনাৎ ঝনাৎ শব্দ করে হাঁক পাড়ে ‘এই ঝালমুড়ি, ঝালমুড়ি’ বলে।
শিশিরের সঙ্গে রায়নার দেখা হয়ে যায় এমনই একটি দৃশ্য চলাকালীন। রায়না মনে মনে প্রার্থনা করেছিল শিশিরের সঙ্গে যেন জীবনে আর কোনওদিনও তার দেখা না হয়। অথচ তারা দুজনই একই শহরের অধিবাসী সুতরাং দেখা হয়ে যাওয়াটাই স্বাভাবিক। শিশির যদি শহর ছেড়ে চিরদিনের মতো অন্য কোথাও চলে যেত তাহলে হয়তো সম্ভাবনা আরও কমে যেত দেখা হবার। কিন্তু সম্ভাবনা ঠিকই থেকে যেত দেখা হবার, কেননা ঘূর্ণায়মান পৃথিবীর সঙ্গে মানুষও ঘুরপাক খায় পুনরাবৃত্তির কক্ষপথ ধরে।
রায়নার সঙ্গে শিশিরের চোখাচোখি হয় সড়কের বিপরীতে দাঁড়িয়ে, খানিক আগে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনা থেকে মাত্রই কয়েক হাত দূরে। একটা অদৃশ্য বিদ্যুৎরেখা এক ঝটকায় সড়কের এপার থেকে ওপারে ছুটে গিয়ে স্ট্যাচু করে দেয় দুজনকে। এই অল্প সময়ের ভেতর তারা আপাদমস্তক দেখে নেয় পরস্পরকে। রায়না দাঁড়িয়ে ছিল ঝালমুড়িওয়ালা লোকটার পাশাপাশি। লোকটার হাঁক-ডাক থামছিলই না বরং ক্রমেই উঠছিল উচ্চগ্রামে। শিশির এক মুহূর্তের জন্যও চোখ ফিরিয়ে নেয় না। রায়নার ভেতরটা কেঁপে ওঠে তুমুল অস্বস্তিতে। সে চোখ নামিয়ে একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে স্ট্যাচু হয়ে। অথচ তার রাস্তা পার হয়ে ওপাশেই যাবার কথা ছিল যেখানে শিশির দাঁড়িয়ে আছে এই মুহূর্তে। আহত লোকটাকে রাস্তার মাঝখান থেকে সরিয়ে পাশের ফুটপাথে তোলা হলে মানুষজনের ভিড়টাও সেদিকে হেলে পড়ে।
অল্প কিছুক্ষণ পর রায়না যখন সন্ত্রস্ত ভঙ্গিতে চোখ তুলে তাকায় রাস্তার ওপারে ততক্ষণে শিশির অদৃশ্য হয়ে গেছে ভিড়ের ভেতর। তার বুকের ভেতরের কাঁপুনিটা থেমে গিয়ে স্বস্তি নেমে আসে কিছুটা। খানিক আগে ঘটে যাওয়া ঘটনাকে একবার মনে হয় দৃষ্টি বিভ্রম। কিন্তু তখনই আবার সতর্ক হয়ে ওঠে মন।
তার মনে হয় এই মুহূর্তে এখান থেকে সরে পড়া দরকার। চলে যাবার জন্য ঘুরে দাঁড়াতেই ‘ম্যাডাম, ঝালমুড়ি দেই আপনাকে’ বলে তার মুখোমুখি দাঁড়ায় সেই ঝালমুড়িওয়ালা। রায়না চমকে ওঠে, তার ইচ্ছে করে ঝালমুড়িওয়ালা লোকটাকে ধাক্কা দিয়ে রাস্তায় ফেলে দিয়ে ছুটে পালিয়ে যেতে। নিজেকে অনেক কষ্টে নিয়ন্ত্রণ করে সে মাথা নেড়ে ‘না’ বলে এবং হাত ইশারায় তাকে বলে সামনে থেকে সরে গিয়ে যাবার জন্য জায়গা করে দিতে। লোকটা অসন্তুষ্টভাবে ভ্রƒ কুঁচকে সামনে থেকে সরে দাঁড়াতেই রায়না দ্রুত পা চালিয়ে চোখের সামনে যে গলিটা দেখতে পায় সেখানেই ঢুকে পড়ে। গন্তব্যহীন অবস্থায় সে হাঁটতে থাকে দ্রুতগতিতে।
হাঁটতে হাঁটতে সে ভাবে তবু কতদিন পর শিশিরের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। মন বদলের সঙ্গে সঙ্গে দুজনের চেহারাটাও বদলেছে কিছুটা। তবু এতদিন বাদেও কত দ্রুত ও সহজে চিনে নেওয়া গেলো পরস্পরকে। শিশিরের মুখোমুখি সে কোনওভাবেই হতে চায় না। শিশির বদরাগী, মানসিকভাবে অসুস্থ। মানুষজনের সামনে বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করতে তার আটকাবে না। ভিড় বাড়ানো অতি উৎসাহী মানুষগুলোর মাঝখানে ঘটতে থাকা ভয়ংকর চিত্রনাট্যের কুশীলব হিসেবে সে নিজেকে কোনওভাবেই ভাবতে পারছে না আপাতত। শিশিরের সঙ্গে তার এমন পরিস্থিতি বহুবার তৈরি হয়েছে। শেষবারের ঘটনাটা ছিল রীতিমতো ভয়ংকর। আর একটু হলে খুনোখুনি লেগে যেত। তাদেরকে ঘিরে থাকা মানুষগুলোও যেন এমন কিছু একটাই প্রত্যাশা করেছিল। তাদের ঝগড়া থামাতে পথচারীদের কেউ সেদিন এগিয়ে আসেনি, উল্টো শেষমেষ কিছু ঘটল না বলে তাদের চোখেমুখে হতাশা জড়ো হয়েছিল। তারপর গত পাঁচ বছর শিশিরের সঙ্গে তার দেখা হয়নি। অবশ্য বরাবরই ঝগড়া করবার জন্য শিশিরই রায়নাকে খুঁজে বের করত। দুর্বৃত্তের মতো হুটহাট সে রায়নার পথ আটকে দাঁড়াত। রায়না কিছু বলামাত্রই কথা কাটাকাটি শুরু হতো। তারপর ক্ষুধার্ত কোনও পশু যেমন ক্ষুধা নিবৃত্তির পর আস্তে করে শিকারস্থল থেকে সরে পড়ে শিশিরও তেমনি সরে পড়ত। ব্যপারটা রুটিনমাফিক ঘটত। শেষ ঝগড়ার দিনে তা চলে গিয়েছিল হাতাহাতির পর্যায়ে। তবে সেটাই প্রথম, সেটাই শেষ।
ফুটপাথ ধরে দ্রুতপায়ে হাঁটতে হাঁটতে রায়না মনে করবার চেষ্টা করে কে প্রথম গায়ে হাত তুলেছিল। পাঁচ বছর পর এই প্রথম এই ব্যপারটা মনে করতে গিয়ে তার স্মৃতি কুয়াশাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। সে দাঁড়িয়ে পড়ে ফুটপাথের ওপর। মুহুর্মুহু চাপে একসময় স্মৃতির তলকুঠুরি হাট করে খুলে যায়। রায়নার স্পষ্ট মনে পড়ে সেদিন সে-ই শিশিরের গালে থাপ্পড় মেরেছিল। আরও মনে পড়ে শিশির সেদিন প্রত্যাঘাত করেনি। লজ্জায় অপমানে মাথা নিচু করে চুপচাপ চলে গিয়েছিল। তারপর পাঁচ বছর সে আর রায়নার মুখোমুখি হয়নি।
অথচ শিশির কবে কীভাবে এমন প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে উঠেছিল তার হিসেব-নিকেশ করতে গিয়ে রায়নার স্মৃতিশক্তি বিদ্রোহ করে বসে। তার স্মৃতিতে শিশিরের যে মুখ ভেসে ওঠে সেখানে কোনও প্রকার প্রতিহিংসা নেই। আরও বহু দুপুর-বিকেলের কথা মনে আসে তার কিন্তু সেখানকার কোথাও তাদের পরস্পরের তিক্ত সম্পর্কের কোনও চিহ্ন নেই। রায়নার হঠাৎই মনে হয় গত পাঁচ বছরে সব ধুয়ে মুছে গেছে। খানিকটা ভেবে সে যতটুকু মনে করতে পারে যে একসময় ওদের পরস্পরের সম্পর্ক ছিল বন্ধু ও পরিচিত মহলে ঈর্ষাজাগানিয়া। আদর্শ যুগলের উদাহরণ হিসেবে ওরা বারবার ফিরে আসত তাদের কথাবার্তা-আলোচনায়। অথচ একসময় ঠিক তার উল্টোটিই ঘটে গেলো। ওদের পরস্পরের বিবাদ সন্ত্রস্ত করে তুলত তাদেরকে। কিন্তু তার শুরুটা হয়েছিল কীভাবে ? রায়নার কেবল মনে পড়ে মজার ছলে বলা কোনও একটা কথা হঠাৎই রূপ নিয়েছিল ঝগড়ায়। কে শুরু করেছিল মনে পড়ে না তার। তবে পরদিন যখন বিবাদ মিটে গিয়েছিল তখন তাদের সম্পর্ক পেয়েছিল নতুন এক মাত্রা। দুজনেই আবিষ্কার করতে পেরেছিল যে এ বিবাদের কারণেই তারা দুজন পরস্পরের সঙ্গে পরস্পরের যোগসূত্র খুঁজে পেয়েছিল। এরপর এ ঝগড়া ও মিলে যাওয়াটা হয়ে পড়েছিল রোজকার অভ্যাসের মতো।
কিন্তু শিশির কেন এমন বদলে গিয়েছিল ? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেতে রায়নার স্মৃতিশক্তি এক প্রকার অকেজো হয়ে পড়ে। বহুকাল বাদে আজ শুধু এটুকু মনে পড়ে যে সবকিছুর পরও এরকম ছিটকে যাবার বদলে তাদের এক হয়ে থাকার কথা ছিল। তারা যেদিন পরস্পর আলাদা হয়ে যায় সেদিন বন্ধু ও পরিচিত মহলের সবাইকেই পেয়ে বসেছিল এক ধরনের সামষ্টিক হতাশাবোধে। যতদূর মনে পড়ে রায়না খুব আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে শিশিরকে বলেছিল তাদের চূড়ান্ত মিলে যাবার দিনে এই হতাশাবোধ কাটিয়ে দেওয়া যাবে। শিশিরের মুখে কোনও কথা ছিল না সেদিন, ছিল ঐ মানুষগুলোর মতোই একটা দুঃখবোধ। তার ভেতর হয়তোবা কখনই ছিল না ঐ সামষ্টিক হতাশা মিটিয়ে দেবার দায়বোধ। রায়নার বহু যুক্তির বিপরীতে তার শুধু জিজ্ঞাসা ছিল ‘ফিরে আসবে তো ? ফিরে আসতে পারবে তো ?’
রায়না চলতে চলতে দাঁড়িয়ে পড়ে হঠাৎ। তার ভেতরটায় একটা প্রবল ভূকম্পন টের পায় সে। সে ফিরে আসতে পারেনি। বিবাদ মিটিয়ে ফেলবার আনন্দই পরে তার মাথার ভেতর সাময়িক মুক্তির বীজ বপন করে দিয়েছিল। এই মুক্তির ধরন সম্পর্কে তার যদিও পুরোপুরি ধারণা ছিল না, শুধু মনে হয়েছিল জীবনযাপনের চেনা চক্র থেকে তার দরকার একটা সাময়িক বিরতি। কোন কারণ ছাড়াই শিশিরের সঙ্গ ক্রমেই অসহ্য হয়ে উঠছিল তার কাছে। অন্যদিকে শিশির যেন হয়ে উঠছিল তার ঠিক বিপরীতমুখী এক চরিত্র। রায়না যতই দূরত্ব তৈরি করেছিল, শিশির মরিয়া হয়ে উঠেছিল তার নিকটবর্তী হবার জন্য। আনুষ্ঠানিক বিদায়ের দিনে শিশির ছিল খানিকটা চুপচাপ, ভারাক্রান্ত। তবে রায়নার বাড়ির গেটের কাছ থেকে যেভাবে হাসিমুখ বিপরীতে মুখ ঘুরিয়ে মিলিয়ে গিয়েছিল গলির অন্ধকারে তা দেখে রায়না স্বস্তি পেয়েছিল যে শিশির ব্যপারটা স্বাভাবিকভাবেই নিয়েছে। তখনই একবার তার মনে হয়েছিল সাময়িক মুক্তির আস্বাদ পাওয়া হয়ে গেলে ঠিকই আবার ফিরে আসা হবে এই সম্পর্কের কাছে।
কিন্তু শিশির হঠাৎই হয়ে পড়লো বেপরোয়া আর প্রতিহিংসাপরায়ণ যা উলোট পালট করে দিয়েছিল সবকিছু। হঠাৎ হঠাৎ দুর্বৃত্তের মতো শিশিরের আবির্ভাব রায়নার ফিরে আসবার ভাবনাটা ঠেলে সরিয়ে দিয়েছিল মন থেকে। রায়নার ভেতর হঠাৎই মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে একটা বেপরোয়া ভাবনা। শিশির গত পাঁচ বছর তার মুখোমুখি হয়নি কিন্তু রায়নার মন প্রতি মুহূর্ত সতর্ক থেকেছে শিশিরের মুখোমুখি হবার ভয়ে। শেষমেষ সে যখন ভয়টা ভুলতে শুরু করেছিল তখনই ঘটলো আজকের ঘটনা। সে মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে যে জীবনের আর একটি মুহূর্তের জন্যও সে কারও কাছ থেকে পালিয়ে বেড়াবে না। আর এ কারণেই তাকে আজ শিশিরের মুখোমুখি হতে হবে।
সে উল্টো দিকে ঘুরে আবার আগের জায়গা বরাবর হাঁটতে শুরু করে। যতক্ষণে সে ঠিক আগের জায়গায় পৌঁছায় ততক্ষণে ঐ জায়গাটা প্রায় জনশূন্য হয়ে গেছে। দুর্ঘটনায় আহত লোকটাকে সম্ভবত সেখানে থেকে সরিয়ে নেবার কারণেই লোকজন যে যার মতো কেটে পড়েছে। রায়না মেরুদণ্ড স্বাভাবিকের তুলনায় সোজা করে রাস্তা পার হয়। তার চোখ আতিপাতি করে খুঁজে বেড়ায় শিশিরকে। কিন্তু শিশির কোথায় ? কোথাও নেই।
জাদুকরের আঙুলের চুটকিতে মিলিয়ে যাওয়া গোলাপের মতো শিশির যেন উধাও হয়ে গেছে। ফুটপাথ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা ইলেকট্রিক পোলে হেলান দিয়ে একটি ছেলে সিগারেট খাচ্ছে। তার মুখটা উল্টো দিকে ঘোরানো। রায়নার একবার মনে হয় ঐ বুঝি শিশির! কিন্তু শিশির কি সিগারেট খেত ? তার মনে পড়ে না। সে গটগট করে হেঁটে ছেলেটার মুখোমুখি দাঁড়ায়। নাহ এ শিশির নয়, তার ভুল ভাঙ্গে।
ছেলেটা ভড়কে যায় কিছুটা। থতোমতো ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করে ‘কিছু বলবেন ?’ রায়না স্বাভাবিক কন্ঠস্বরে বলে ‘সরি, আমি আসলে পেছন থেকে ভেবেছিলাম আমার পরিচিত এক বন্ধু!’ ছেলেটা হেসে বলে ‘ইটস্ ওকে’। রায়না ফুটপাথ থেকে নেমে রাস্তা ধরে সামনে এগিয়ে যায়। তার মনে হয় শিশির এখানকার কোনও গলিতেই ইচ্ছে করে লুকিয়ে আছে। বিগত পাঁচ বছরে লুকোচুরির খেলায় তাদের পরস্পরের ভূমিকা স্রেফ উল্টে গেছে। শিশির নিজেই হয়তো চাইছে না রায়নার মুখোমুখি হতে।
মাথার উপর সূর্যটা ইতমধ্যেই ঢালতে শুরু করেছে গনগনে আগুন। রায়নার এক গলি পার হয়ে আরেক গলির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে শেষ মাথা পর্যন্ত চোখ বুলায়। কাউকেই সে দেখতে পায় না। সে যেখানে দাঁড়িয়ে আছে তার ঠিক বিপরীত দিকে রাস্তার ওপাশে আরেকটা গলি। সে ঘাড় ঘুরিয়ে সেদিকে তাকাতেই চোখে পড়ে গলির একেবারে শেষ মাথায় একটা ছায়ামূর্তি যেন দ্রুতই সরে পড়লো। রায়না নিশ্চিত হয় যে এটাই শিশির। সে দ্রুত রাস্তা পার হয়ে গলির ভেতর ঢুকে পড়ে। তার হৃৎপিণ্ড দ্রুত লয়ে বাজতে থাকে। যে করেই হোক শিশিরকে ধরতেই হবে এমন একটা বেপরোয়া ইচ্ছে মাথার ভেতর ফুলে ফেঁপে ওঠে। কিন্তু শিশির ধরা দিতে না চাইলে, তার কি আদৌ সাধ্য আছে তাকে ধরবার ? তাছাড়া শিশিরের মুখোমুখি হয়ে ঠিক কিসের জবাবদিহি সে আদায় করবে ? এসবের কিছুই জানা নেই তার। দুপুর পূর্ববর্তী এই নির্জন গলিপথ সে দ্রুত পায়ে পার হতে থাকে। তার মনে হয় শিশির নিজেও চায় তাকে রায়না খুঁজে বের করুক, তবে অবশ্যই সেটা খুব সহজে নয়। কিন্তু কেন এই নাটকীয়তা ? সে কি জানত রায়না আজ এ পথে আসবে ? এই ভাবনাটা মাথায় আসতে রায়নার পা হঠাৎ মাটিতে গেঁথে যাবার উপক্রম হয়।
তার মানে গত পাঁচ বছর শিশির তার মুখোমুখি হয়নি, যদিও ঠিকই তাকে অনুসরণ করেছে।
রায়নার ভেতর পুরনো ক্ষোভটা হঠাৎই ফিরে আসে যার বশবর্তী হয়ে সে সেদিন সে শিশিরের গায়ে হাত তুলেছিল। তার পা চলতে থাকে দ্রুত। তার শরীর ভিজে যায় ঘামে। মাথার ভেতরকার মগজ ফুটতে থাকে টগবগে সূর্যতাপে। সে তাপে ভস্ম হয়ে যায় বিবিধ অপরাধবোধ। সে পা চালায়, পা চালায়। পৌঁছে যায় গলির একেবারে শেষ মাথায় যেখান থেকে শিশিরের ছায়ামূর্তি উধাও হয়েছিল খানিক আগেই। রায়না ডানে ঘুরে একই গতিতে পরের গলিতে ঢুকে পড়ে। আর তখনই ক্ষণকালের জন্য তার চোখ অন্ধকার হয়ে যায়, দমবন্ধ লাগে। সে চোখ খুলে দেখতে পায় একটা প্রকাণ্ড মালবাহী ট্রাক গলিতে আটকে পড়েছে। এদিক সেদিক করেও কোনভাবে বের হতে পারছে না। একেকবার ইঞ্জিনের প্রবল গর্জনে কেঁপে উঠছে গলির ভেতরকার বাতাস। রায়না ফিরে আসে গলির ভেতর থেকে। মুহূর্তের ভেতর মিইয়ে আসে তার ভেতরকার সমস্ত উত্তেজনা। কোথাও ছায়ার নিচে দাঁড়িয়ে খানিকটা জিরিয়ে নিতে পারলে ভালো হতো। কিন্তু এইখানে গলির রাস্তা গাছশূন্য। তাই সে আস্তে আস্তে পা টেনে নিয়ে ফিরতে থাকে আগের গন্তব্যে। মনে মনে নিজেকে এই বলে ধিক্কার দেয় যে, ‘এসবের কোনও কিছুরই কোনও মানে নেই।’ পরমুহূর্তেই বুকের ভেতর থেকে দলা পাকানো কান্নার অনুভূতি ঠেলে বেরিয়ে আসতে চায়। সে হাঁটতে হাঁটতে দু হাতে চোখ ঢেকে ক্ষুধার্তের মতো সূর্যের দিকে মুখ তুলে মনে মনে বলতে থাকে ‘শিশির কোথায় তুমি ? দেখা দাও প্লিজ!’
‘আপনার কি শরীর খারাপ লাগছে ?’ প্রশ্নটা শুনে রায়না ঘুরে তাকিয়ে দেখে তার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে সেই ছেলেটি যাকে সে শিশির ভেবে ভুল করেছিল। রায়না কিছুটা ভড়কে যায় তাকে দেখে। থতমত ভঙ্গিতে সে বলে ‘একটু খারাপ লাগছে, বাট আই এম অলরাইট। থ্যাংকস ফর আস্কিং’। রায়না দ্রুত ছেলেটাকে পাশ কাটিয়ে যাবার চেষ্টা করতেই তার চোখে আবারও অন্ধকার নেমে আসে। এবার সে তাল সামলাতে পারে না শরীরের। ছেলেটা তাকে দু হাতে ধরে ফেলে। তারপর সাবধানে ধরে আস্তে আস্তে রাস্তার পাশের একটি বাড়ির গেটের সামনে নিয়ে যায়।
দারোয়ানকে অনুরোধ করে একটা চেয়ারের ব্যবস্থা করে সেখানে বসিয়ে দেয় রায়নাকে।
রায়না চোখ বন্ধ করে পুরো শরীরটা ছেড়ে দেয় চেয়ারে। তার কণ্ঠনালি শুকিয়ে আসে। সে শুনতে পায় ছেলেটা দারোয়ানকে অনুরোধ করছে একটু পানির ব্যবস্থা করতে। একটু পর সে চোখ খুলে দেখতে পায় ছেলেটা একটা ঠান্ডা পানির বোতল হাতে দাঁড়িয়ে আছে, তার পাশেই উদ্বিগ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে মাঝবয়েসী দারোয়ানটা। দুজনের প্রতি রায়নার মন অপরিসীম কৃতজ্ঞতায় ভরে ওঠে। সে ক্লান্ত স্বরে কোনওমতে তাদের ধন্যবাদ জানাতে গেলে দারোয়ান লোকটা বলে, ‘আপা আপনি এইখানে বইসা একটু রেস্ট নেন। বাইরে অহনো যে রোদ এর মধ্যে বাইর হইলে আবার মাথা ঘুইরা পইড়া যাইবেন।’ ছেলেটাও দারোয়ানের কথায় মাথা নেড়ে সায় দেয়। রায়না প্রথমবারের মতো ছেলেটাকে আপাদমস্তক পর্যবেক্ষণ করে। ছেলেটাকে দেখে মনে হচ্ছে তার থেকে বয়সে বেশ ছোট হবে। তাকে শিশিরের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলার জন্য নিজের কাছে নিজেই এক প্রকার অপ্রস্তুত বোধ করে সে। রায়না সদ্যই পা দিয়েছে একত্রিশে। অথচ তার নিজেকে মনে হয় এর থেকেও অনেক বেশি বয়সী। শিশির ছিল তার সমবয়সী, সহপাঠী। তাদের সম্পর্কটা গড়িয়ে ছিল ক্লাস রুম থেকে।
শিশির খুব ছোট বয়সে বাবা-মা দুজনকেই হারিয়েছিল সড়ক দুর্ঘটনায়। রায়না ঘটনাক্রমে এসব জেনেছিল, আর শিশিরের নিকটবর্তী হয়েছিল সেই দুঃখবোধকে কেন্দ্র করেই। খানিক পরেই রোদটা পড়ে আসে। রায়না যখন ছেলেটার সঙ্গে রাস্তায় বেরিয়ে আসে ততক্ষণে আকাশে ঘন কালো মেঘ জমতে শুরু করেছে। ছেলেটা তার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে অন্য গলিতে ঢুকে পড়ে। রায়না চলতে চলতে হঠাৎ থেমে ছেলেটার চলে যাওয়া দেখে। ছেলেটা মিলিয়ে যায় গলির ভেতর। আশ্চর্য হলেও সত্যি যে তাকে পেছন থেকে হুবহু শিশিরের মতো দেখায়। রায়না দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবে হয়তো মানুষকে গিলে খাবার জন্য এই শহর ভরে আছে অগণিত অলি-গলিতে। রায়না যখন আবার ফিরে আসে আগের জায়গায় যেখানে খানিক আগেই দুর্ঘটনা ঘটেছিল এবং শিশিরের চোখে চোখ পড়েছিল ততক্ষণে প্রায় অন্ধকার হয়ে এসেছে চারপাশ।
রাস্তা পার হয়ে সে যখন আবার ঝালমুড়িওয়ালার পাশে গিয়ে দাঁড়ায় তখনই চারপাশ ভেঙ্গেচুরে বৃষ্টি নামে। রাস্তাজুড়ে যানবাহন ও মানুষজনের ছোটাছুটি শুরু হয়ে যায়। রায়না স্ট্যাচুর মতো ফুটপাথে দাঁড়িয়ে ভিজতে থাকে। নিজেকে অদ্ভুত রকমের হালকা লাগে তার। মনে হয় বৃষ্টি ধুয়ে দিচ্ছে তার সমস্ত দুঃখবোধ-ক্ষোভ। আজ তার যেখানে যাবার কথা ছিল বৃষ্টি মুছে দিচ্ছে তার নিশানা। আজ তার কোথাও যাবার নেই, কিচ্ছু করার নেই। তার মনে হয় বৃষ্টি প্রকৃত ভালোবাসার মতো। তাকে ছেড়ে যেতে নেই, বিবিধ দুর্যোগের সময় তাকে ধরে রাখতে হয় জোর আলিঙ্গনে। বৃষ্টি বাড়তে থাকে।
রায়না পাখির মতো করে দু হাত শরীরের দু পাশে মেলে ধরে। আকাশের দিকে মুখ উঁচু করে বৃষ্টি মেখে নেয় চোখের পাতায়। তার তখনই মনে হয় শিশির ফিরে এসেছে। শিশিরই নিয়ে এসেছে এই বৃষ্টি। রায়না চোখ মেলে রাস্তার ওপারে তাকায়। আর তখনই অবাক হয়ে দেখে শিশির ঠিক আগের জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে উল্টো দিক মুখ করে। বৃষ্টিতে সেও কাকভেজা হচ্ছে। রায়নার বুকের ভেতরটা দুলে ওঠে। তার খুব ইচ্ছে করে শিশিরকে ছুটে গিয়ে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরতে। রাস্তায় ইতিমধ্যেই জল জমতে শুরু করেছে। সেদিকে তাকাতেই তার মনে হয় এই জল সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো ফুলে ফেঁপে উঠে তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে খড়কুটোর মতো। শিশিরের মুখোমুখি কখনই দাঁড়ানো হবে না তার। রায়না অপলক চোখে তাকিয়ে থাকে সেদিকেই, যদি অন্তত আরেকবার শিশিরের চোখে তার চোখ পড়ে।
সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ



