আর্কাইভগল্প

চাবিওয়ালি : কাকলী আহমেদ

প্রচ্ছদ রচনা : গল্পসংখ্যা ২০২৪―গল্প

ঠিক কোন জায়গায় টুপ করে চাবিটা পড়ল ঠাহর করতে পারল না রুমি। আধো অন্ধকারে বাড়ির কাছে এসে রিক্সা থেকে নামতেই শব্দটা কানে গেছে।

মনে হলো পকেট থেকেই পড়েছে চাবি। তাও আবার গৃহের চাবি। রাত গহিন। এখন চাবি খুঁজে না পেলে ঘরে ঢুকতে পারবে না।

পকেটে হাত ঢুকিয়ে বার কয়েক চেক করে দেখে নিল। একবার বাঁ পকেট, একবার ডান পকেট। রিক্সাচালক বেচারাও উৎকণ্ঠিত হয়ে উঠল, ‘ভাইজান কী পড়ছে ? টাকা ক্যান’ ?

দুই পকেটে বার কয়েক হাতড়ে চাবির দেখা পাওয়া গেল না। রিক্সার পাদানিতেও মোবাইলের আলো ফেলে দেখে নিল। রাস্তার আশপাশে খোঁজ করে না পেয়ে হতাশ বুকে জোর হু হু বাতাস বয়ে গেল। আজ বুঝি  সামনের পার্কে ঢুকে বেঞ্চে বসেই রাত কাটিয়ে দিতে হবে।

অফিস থেকে কাল এক আড্ডা দিতে গিয়ে ফিরতে ফিরতে অনেক রাত হয়ে গিয়েছিল। বারো বছরের সংসারে সন্তান নেই ওদের। দুজনের সংসার নিরিবিলি। মহুয়া নিজেও খুব শান্ত স্বভাবের। নিজের আবেগ, উদ্বেগ আর কষ্টের অনুভূতিকে অবদমিত করে রাখায় জুড়ি নেই। রুমি স্বভাবে চঞ্চল, রাগী, আধিপত্য বিস্তারে জুড়ি নেই।

রুমির এত সব কিছু মেনে নিয়ে খুব হাসিখুশি ভাবেই সংসার করে যাচ্ছে। রুমির সন্তানের ব্যাপারে আক্ষেপ নেই এমন না। মহুয়ার এসব ব্যাপারে কিছুই বোঝা যায় না।

বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে আড্ডা, ঢাকার বাইরে হুটহাট চলে গিয়ে দিন কেটে যায়। ভাগ্যিস মহুয়া নয়টা পাঁচটা অফিস করে। ঘরে ফিরে টুকটাক ঘর-গেরস্থালির কাজ সারতে সারতে রুমির ফেরার সময় হয়ে যায়।

সংসারের রঙ আসলে একেক বয়সে একেক রকম। কখনও সে রংধনুর সাত রঙ মেলে দেয়। কখনও ধূসর।  কখনও সাদা ধবধবে, ছিটেফোঁটা কোন অসন্তোষ নেই। আবার কখনও চকিতে গনগনে আগুনরঙা। সব মিলিয়েই সংসার। অন্তত বারো বছরে তাই বুঝে নিয়েছে।

স্বল্পভাষী, আবেগ চেপে রাখা মহুয়ার রাগ-অভিমান এতদিনের জীবনে দেখেনি। অথচ রুমি পান থেকে চুন খসলেই যে কোনও ব্যাপারেই তোলপাড় করে ফেলে। তুচ্ছ সব কারণ ময়ূরের মতো পাখা মেলে নাচতে থাকে। এমন উত্তপ্ত দিনে রুমি রাতে ভাত খায় না। নিজ ঘর থেকে বের হয়ে গোস্বাঘরে ঘুমিয়ে থাকে। এই গোস্বাঘর নামটা মহুয়ারই দেওয়া।

স্বামী-স্ত্রীর দাম্পত্য জীবনের প্রতিদিনের এসব কলহের কথা বন্ধুমহলে আর অফিসের কলিগের কাছেও ছড় ছড় করে বলে বেড়ায় রুমি। আসলে রুমির ভেতর বাহির বলে তেমন কিছু নেই বলেই মনে হয়।

গতকাল অফিসে থাকতে মহুয়া টেক্সট করেছিল ‘আমার খুব মিষ্টি খেতে ইচ্ছে করছে। একটু রসমালাই নিয়ে এসো’। 

টেক্সট পড়ে রুমি একটু অবাকই হলো। এমন আদর-আবদার করে তেমন কিছুই কখনও বলে না তার বৌ। মনে মনে ভালোই লাগল।  ঠিক করে রাখল ফেরার পথে রসমালাই নিয়ে ফিরবে।

অফিস শেষ হবার কিছু আগে বন্ধু রঞ্জু ফোন দিল। হল জীবনে রঞ্জু ওর রুমমেট ছিল। প্রায় সাত বছর ওরা এক রুমে ছিল। রাতে লাইট নেভানো নিয়ে, রুম গোছানো নিয়ে কতই না বাকবিতণ্ডা হয়েছে। দুজনের কাছে দুটো চাবি থাকত। রুমির এলোমেলো স্বভাবের কারণে কতদিন যে সে চাবি হারিয়েছে। রঞ্জুই ছিল তার ভরসা। এখন সে কানাডা থাকে। গত বছর আটেক আগে একবার এসেছিল। এবার যেন সারপ্রাইজ। না বলেই চলে এসেছে।

চাবি হারানোর এসব কারণেই বিয়ের পর থেকে মহুয়া হাজার বলেও রুমির চাবি রাখার দায়িত্ব নেয়নি। মহুয়া রুমির আগেই ঘরে ফেরে। কোনওদিন দেরি হলে ঘরের দরজার বাইরে এক লুকোনো জায়গায় চাবি রেখে যায়। রুমি সেটা জানে। সেখান থেকে হাতড়ে ঘরে ঢোকে।

শূন্য ঘরে ঢুকলে রুমির কেমন একটা ফাঁকা ফাঁকা অনুভূতি হয়। মহুয়া বাবার বাড়িতে গেলে দুই-একদিন থেকে আসলে প্রতি রাতেই রুমির ভেতরে শূন্যতার বিদ্যুৎ চমকায়। কিছুতেই ভালো লাগে না। অথচ এ কথাগুলো কখনও মহুয়াকে বলা হয়নি।

শুক্রবারে রান্না শেষ করে গোসল করে হালকা বেগুনি রঙের তাঁতের শাড়িতে মহুয়াকে অদ্ভুত সুন্দর লাগে। টিভি দেখতে দেখতে আড় চোখে চুল থেকে টপ টপ করে পানি পড়া দেখে। বারো বছরেও মহুয়াকে এখনও সেই নতুন বিয়ে হবার পরের দিনগুলোয় ভালোবাসার জড়াজড়িমাখা স্বপ্নতুলোর মত নরম নরম মনে হয়। কিন্তু মুখ ফুটে কখনওই বলা হয় না ‘তোমাকে আজ সুন্দর লাগছে’।

রঞ্জুর ফোন পেয়ে ওর সঙ্গে দেখা করতে চলে যায়। দুই বন্ধু মিলে পানীয় সেবন ও হল জীবনের গল্পগুজবে কত রাত হয়ে গেল। পুকুরের কোন অতলে ডুবে গেল বৌয়ের মিষ্টির আহ্লাদ।

রঞ্জুর বাবা মৃত্যুশয্যায়। পাবনা থেকে ঢাকায় হাসপাতালে নিয়ে এসেছে। সবই শুনলো। রঞ্জু বিদেশে বিয়ে করেছিল। এক পুত্র সন্তান। বয়স সাত। দুজনের ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে। ছয় ফুটের উপরে লম্বা ছিপছিপে রঞ্জু এখন এত মোটা। বন্ধুত্বের পাল উল্টো বাতাসেও ঠিক দিকেই চলে। তর তর করে খরস্রোতা নদীতে খুব দ্রুত এগিয়ে যায়। হল জীবনের গল্পে কত শত নাম মনে পড়ে। বন্ধুর এক শার্ট পরে কতগুলো ইন্টারভিউ দেবার গল্পও মনে পড়ে।

রাত দেড়টায় রঞ্জুর হাত থেকে ছাড়া পেল। মনটা প্রফুল্ল। পেটে পছন্দের হুইস্কিও মনকে আইসিইউ থেকে টেনে বের করে এনেছে।

এত রাতে দারোয়ান গেট খোলে নিতান্ত পেটের দায়ে। কলিং বেলে হাত দিতেই মনে পড়ে মহুয়ার মিষ্টি আনবার কথা। মহুয়া দরজা খোলে। মহুয়ার চোখের দিকে না তাকিয়েই রুমি বলে বসে ‘আরে জানো রঞ্জু এসেছিল…’। কথা শেষ হবার আগেই মহুয়ার মুখ থেকে তীরের মত বারো বছরের শত শত অভিযোগ বারুদের মতো বেরিয়ে এল। রুমি চমকে উঠল। কে কথা বলছে। কী বলছে এগুলো। অভিযোগের তালিকায় এক এক করে এত এত কথা। অথচ বারো বছরের জীবনে একবারও মহুয়া এগুলো বলেনি। এত রাতে দুজনে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করলে কী একটা অবস্থা দাঁড়াবে। রুমি নিশ্চুপ হয়ে গেল। বাথরুমের দরজা লাগাতে লাগাতে শুনতে পেল ‘আজ টেক্সট করে বলে দিলাম মিষ্টি আনতে। খালি বন্ধু বন্ধু করেই জীবন দিলে’।

গোস্বাঘরে আজ মহুয়াই জায়গা করে নিল। টেবিলে ভাত তরকারি সব পড়ে রইল। মহুয়া জানিয়ে দিল কাল সকালেই সে এ বাড়ি থেকে চলে যাবে। এই ঘরসংসার আর সে করবে না।

সকালে ঘুম থেকে উঠে রুমি দেখে ঘর ফাঁকা। চারিদিকের বাতাস কেবল ফিসফাস কথা বলছে। সাইড টেবিলে ডুপ্লিকেট চাবিটা রাখা। অগত্যা কী করা নাস্তা না করে সযত্নে চাবিটা নিয়ে অফিসের দিকে রওনা দিল। রিক্সায় যেতে যেতে যত মিষ্টির দোকান চোখে পড়ল, মনে হলো মণকে মণ নানা রকমের মিষ্টি নিয়ে হয় মহুয়ার অফিসে নয় বাবার বাড়িতে গিয়ে হাজির হবে।

অফিসে সারা দিন মেঘলা মেঘলা ঝিমঝাম দিন গেল। অফিস থেকে ফিরে শূন্য ঘরে ঢোকার কথা মনে হতেই বুকের ভেতর দুড় দাড় হাতুড়ি পেটা শুরু হলো। দুই একবার মনে হলো মিষ্টি নিয়ে শ্বশুরবাড়িতে যাওয়া যাক। মহুয়ার যে মূর্তি সে দেখেছে তাতে নিশ্চিত সে আর এমুখো হবে না।

চাবি ছাড়া ঘরে ঢোকা যাবে না। এত রাতে চাবিওয়ালাই বা কোথায় পাবে। এর চেয়ে পার্কে গিয়ে বসে থেকে সকালে চাবিওয়ালা ডাকলেই হতো।

কী অদ্ভুত মানুষের সম্পর্ক। বারো বছরের জীবনে হালকা পাতলা কথা কাটাকাটি ছাড়া কিছুই হয়নি কখনও। তবু বিবাহিত জীবনে একটা গোস্বাঘর তৈরি হয়ে যায়। আজ সে ঘরেও ঢুকতে পারছে না।

লিফট থেকে নেমে দরজার সামনে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকল। নাহ! ঢোকাই ভুল হয়েছে। আর বেটা চাবিটাও হারানোর সময় পেল না। লুকোনো জায়গায় যদি চাবিটা ভুলে চুকে থেকে যায়। না, এমন হবে না।  মহুয়া খুব সাবধানী মেয়ে। তবু খুঁজে দেখল।

নিজকে পাগল পাগল মনে হতে লাগল। অকারণেই ঘরের হাতল ধরে কয়েকবার মোচড় দিল। মহুয়া যে ওকে এলোমেলো বলে, আজ তার সত্যাসত্য মিলল। নিজের বোধোদয় হলো।

টুং করে দরজা খুলে গেল, হালকা বেগুনি রঙের তাঁতের শাড়ি আর কপালে ছোট কালো টিপ দিয়ে দরজা খুলে দিল মহুয়া।

‘তুমি’ ?

যথারীতি দারোয়ান ফোন করে আমাকে জানিয়েছে ‘স্যার ভুলে নিচে চাবি ফেলে গেছে’। উত্তরে বললাম, ‘ঠিক আছে তুলে রাখো। স্যারকে কিছু বলতে হবে না। আমি এলে দিও।’

আমি অবাক হয়ে ঘরের গৃহিণীর দিকে তাকিয়ে থাকলাম। পুরো ডাইনিং টেবিলের উপরে এত এত মিষ্টির প্যাকেট। হাতে সিরামিকের সাদা বকের মতো একটা বাটি থেকে মহুয়া মিষ্টি খাচ্ছে।

মহুয়ার দিকে তাকিয়ে থেকে বুঝলাম হলের রুমমেট চাবি নিয়ে উধাও হলে, হারিয়ে ফেললে তাকে গালি দেওয়া যায়। ইচ্ছে হলে রুম পালটে ফেলা যায়। কিন্তু এ রুমমেট সাংঘাতিক শক্তিধর। ঘরে ঢোকার মূল চাবি ও সুখ থাকে গৃহিণীর আঁচলে বাঁধা।

চেয়ারে পা দুলিয়ে দুলিয়ে মহুয়া একের পর এক মিষ্টি খাচ্ছে। আমি কানের কাছে গিয়ে বললাম ‘তোমাকে আজ খুব সুন্দর লাগছে। তবে সব সময় বলে দিলে এমন বলার সৌন্দর্য খান খান হয়ে যায় চাবিওয়ালি!’

সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button