আর্কাইভসম্পাদকীয়

বিশেষ সম্পাদকীয় : সময়ের স্বর : বিপ্লব-দ্রোহের শব্দস্বর

একাদশ বর্ষ   অষ্টম-নবম সংখ্যা   আগস্ট-সেপ্টেম্বর ২০২৪

সময়ের স্বর প্রতিধ্বনিত হয়েছে শব্দস্বর থেকে―কবিতা, গান আর র‌্যাপ সংগীতের উদ্দীপনাময় উচ্চারণের জোশের আলোয় ছড়িয়ে গেছে তা বিশ্বজুড়ে। পোস্টার-কার্টুন-গ্রাফিতিতেও স্ফুলিঙ্গের মতো ফুটে উঠেছে  বিদ্রোহ, বিপ্লব আর আন্দোলনের মহান শব্দের টগবগে ঢেউ। কোটাসংস্কার আন্দোলন, আবু সাঈদের বীরত্বগাথা, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন, সবশেষে অসহযোগ আন্দোলনের ডাক ও সরকার পতনের আহ্বান ছড়িয়ে দিয়েছে বিদ্রোহ-বিপ্লবের দাবানল!

‘বুকের ভেতর অনেক ঝড়/বুক পেতেছি গুলি কর’ স্লোগানে মুখর তারুণ্যের স্রোত পুলিশ-বিজিবির ব্যারিকেড ভেঙে জোয়ারের মতো ছুটে গেছে। কেবল মুখের শব্দে স্লোগান তোলেনি ছাত্র-ছাত্রীরা, বুলেটের সামনেও বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছে। আর একই সঙ্গে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামে বিখ্যাত গানের পঙ্ক্তিমালাÑ‘ভাঙার গান’’ ও ‘বিদ্রোহী’ কবিতার প্রবল প্রণোদনা সঞ্চারিত হয়েছে তারুণ্যের মনোরাজ্যে, মিছিলের স্রোতে।

    ‘বিদ্রোহী’ কবিতা রচনার শতবর্ষ পরেও এর অবিশ্বাস্য প্রাণসঞ্চারী প্রভাব আমরা দেখলাম ২০২৪-এর গণআন্দোলনে। নজরুলের এসব শব্দসম্ভার কেবল ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের জন্যই সৃষ্ট হয়নি, আমরা বুঝতে বাধ্য হচ্ছি, আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে, এই অনন্য সৃষ্টি সব যুগের সব দেশের মানুষের বিপ্লব-বিদ্রোহ ও অধিকারের কথা সগর্বে প্রকাশ করে যাবে যুগের পর যুগ। কালজয়ী হয়ে থাকবে তাঁর সৃজনসম্ভার। তাঁর অমর সৃষ্টি ‘কারার ঐ লৌহ কবাট’ সর্বকালের শোষিত-বঞ্চিত-লাঞ্ছিত-নিপীড়িত মানুষের বিদ্রোহীসত্তা প্রতিধ্বনিত করেই যাবে, তারও শতভাগ প্রমাণ পেয়ে গেলাম আমাদের যুগে!

    নজরুলের এসব সৃষ্টির গভীরতা, অর্থময়তা এবং দূরদৃষ্টিসম্পন্ন প্রাজ্ঞতা ইতিপূর্বে সাহিত্যবিশ্লেষক কিংবা আলোচকরা সঠিকভাবে তুলে আনতে পেরেছেন বলে মনে হয় না। তাঁদের আরও গভীরভাবে ভাবতে হবে। নজরুলকে আরও গভীরভাবে মূল্যায়ন করতে হবে―এ আমাদের দাবি।

শব্দঘর এ সংখ্যায় আমরা ধরে রাখার চেষ্টা করেছি সময়ের স্বরটা। এ সময়ের কবি-কথাসাহিত্যিকদের সৃজনপ্রভায় শব্দ-দলিল হিসেবে কবিতা-গল্পে ধরা থাকল অবিশ্বাস্য আন্দোলনের জয়ধ্বনি, আত্মত্যাগী বীরদের নিয়ে অমর গাথা।

    প্রাসঙ্গিকভাবেই আলোচনা করা হলো ‘বিদ্রোহী’ কবিতার মর্মকথা, এর মনস্তাত্ত্বিক আবেদন এবং ‘ভাঙার গান’-এর ভিন্নরকম বিশ্লেষণ। নজরুলের বিদ্রোহীসত্তার অমূল্য সম্পদও শ্রদ্ধা-মমতা-ভালোবাসায় তুলে রাখা হলো ভবিষ্যতের পাঠকের জন্য।

    সম্পাদনা পর্ষদ ও পত্রিকা প্রোডাকশনের সঙ্গে জড়িত সবার কাছে কৃতজ্ঞ। সকলের নিরলস প্রচেষ্টায় অবশেষে আমরা সংখ্যাটি বের করতে পারলাম।

কবি-কথাসাহিত্যিকগণও এক ধরনের বিজ্ঞানী

আন্দোলনের শুরুর আগে থেকেই গুচ্ছকবিতা সংখ্যা প্রকাশের পরিকল্পনা করেছিলাম আমরা। উৎকণ্ঠাও বেড়ে গিয়েছিল। বুঝিবা কাক্সিক্ষত কবিতাগুচ্ছ দিয়ে সাজানো সম্ভব হবে না শব্দঘর বিশেষ সংখ্যাটি। ভেবেছিলাম কবিতার দেহ ও আত্মার খোঁজ পাব না; প্রাণের সন্ধানও আবিষ্কার করা সম্ভব হবে না। অথচ সঠিক সময়ে প্রাপ্ত অধিকাংশ কবিতায় আমরা দেখার সুযোগ পেলাম অনন্য, উজ্জ্বল  চিত্রকল্প। এসবের  ভেতর থেকে কবিতার আত্মার স্বর, কবিদের প্রাণের গহনতলের প্রাণ শব্দতুলিতে ভর করে উঠে এসেছে শব্দঘর-এর পাতায় পাতায়। অক্ষর দিয়ে আঁকা উনত্রিশ জন কবির নির্মাণ অসাধারণ সব কবিতা। নবীন-প্রবীণের এই মিলনমেলা থেকে প্রবলভাবে উৎকীর্ণ হয়েছে বহুমাত্রিক বোধ, সৃষ্টিশীল রূপান্তর, প্রণোদনা―ক্রিয়েটিভ ইমাজিনেশন।

ইমাজিনেশন বলতে আমরা কী বুঝি ?

মনস্তাত্ত্বিকভাবে কল্পনাপ্রতিভা বা ভাবনাতত্ত্ব ইমাজিনেশনের গুরুত্বপূর্ণ অনুষদ। সৃজনশীলতা এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে সৃষ্টিশীল জগৎ আলোকিত করে। তাই কাব্যসাহিত্য সৃজনে কেবল কল্পনা নয়, প্রবলভাবে অন্তঃস্রোত তৈরি করে creative imagination বা সৃষ্টিশীল কল্পনাশক্তি। এসব কিছুই মেধার মূল বিষয়। এর সঙ্গে আরও যুক্ত আছে মেমোরি বা স্মরণশক্তি, অর্থপূর্ণ উপলব্ধির দক্ষতা, যুক্তি আরোপের ক্ষমতা, সমস্যা সমাধান ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা। কথাসাহিত্য নির্মাণে এসবের ভূমিকা থাকলেও কাব্যসত্তার স্বতঃস্ফূর্ত উদ্গিরণের জন্য লুকানো প্রধান শক্তি হিসেবে কাজ করে সৃষ্টিশীল কল্পনাপ্রতিভা।

দেহের সংবেদনশীল পঞ্চ ইন্দ্রিয় বা মনের পাঁচটি জানালা দিয়ে নানা তথ্য ঢোকে মস্তিষ্কে। তা মানুষের অভিজ্ঞতাকে সমৃদ্ধ করে এবং সচেতন ভাবনাজগৎ বা কগনিটিভ ওয়ার্ল্ড কিংবা কনশাস থটস আলোড়িত করে, আবেগে পরিবর্তন ঘটায়। আচরণেও। আবার ইন্দ্রিয়-মাধ্যম ছাড়াও অনুভব করা যায়, ঠিক দেখাশোনার মতো সরাসরি মনের একই রকম অনুভূতি, উপলব্ধি―এটাই সৃষ্টিশীল কল্পনাশক্তি বা ক্রিয়েটিভ ইমাজিনেশন।

কেবল ইংরেজিতে নয়, বাংলাতেও ক্রিয়েটিভ শব্দটি বেশ প্রচলিত। আমরা জানি ‘ক্রিয়েট’ থেকে এসেছে ‘ক্রিয়েটিভ’। এই পদটির মানে হচ্ছে মৌলিক কিছু সৃষ্টি করা, মৌলিক সত্যের উন্মোচন করা, মৌলিক পথ নির্মাণ করে সামনের জটিল পথ সহজ করা।

‘সাহিত্য হলো জীবন ও জগতের অনুকরণ বা imitation’―প্লেটোর এই মাইমেটিক থিওরি কিংবা ক্লাসিকাল ও নিউক্লাসিক্যাল মতবাদকে ধাক্কা দিয়ে রোমান্টিক যুগের কবিগণ জোরালোভাবে ঘোষণা করলেন, ‘সাহিত্যের কাজ হলো সৃজন, অনুকরণ নয়’।

তাঁরা আরও বলেছেন, ‘কবিতার প্রকৃত স্রষ্টা কবিকল্পনা―এটি ফ্যান্টাসি নয়, কল্পনাশক্তি। এই শক্তির সঙ্গে স্মৃতি, অভিজ্ঞতা বা পুনর্গঠন ক্রিয়ার কোনও সম্পর্ক নেই।’ অর্থাৎ স্মৃতি বা অভিজ্ঞতার পুনঃবয়ান ছাড়া আচমকা মাথায় বা মনে একটা আইডিয়া বা ধারণা উড়ে আসার নাম কবিকল্পনা। এই কল্পনাই সৃজনশীল প্রক্রিয়া  বা সৃজনশীল কল্পনা।

রোমান্টিক যুগের কবিদের মধ্যে ওয়ার্ডসওয়ার্থ তাঁর অসামান্য কল্পনাশক্তি ব্যবহার করে প্রকৃতির মধ্য থেকে অনন্য জ্যোতি ছড়িয়ে দিলেন―কখনও ওয়াই নদীর তীর, ড্যাফোডিল ফুল নিয়ে সৃষ্টি করলেন কালজয়ী সব কবিতা। নাইটিংগেলের গান কিংবা শরৎ-প্রকৃতির সুষমা নিয়ে কিটস রচনা করলেন ঘোরমগ্ন অনন্য জগৎ। ওয়েস্ট উইন্ডের বিপুল শক্তির কালজয়ী আলো ছড়িয়ে দিলেন শেলি। তবে তাঁরা কি সর্বতোভাবে সফল হয়েছেন ? সমালোচনার ঊর্ধ্বে উঠতে পেরেছেন ? নিউ ক্রিটিজম বলছে, “তাঁদের মধ্যে পলায়নপরতা ছিল (escapism)। বাস্তবের কঠিন রূঢ়তা-দুঃখ-কষ্ট-যাতনার সঙ্গে লড়াই করতে না-পেরে কাল্পনিক জগতে পালিয়ে বাঁচার চেষ্টা করে সাময়িক শান্তি লাভের আশায় মারাত্মকভাবে ‘আমি’ময় হয়ে গিয়েছিলেন রোমান্টিক যুগের কবিগণ। ‘আমার জগৎ’, ‘আমার শান্তি’ নিয়ে ডুবেছিলেন।”

আর রোমান্টিক যুগের কবিদের কিছু দাবি মেনে নিয়েও রবীন্দ্রনাথ কয়েকটি ক্ষেত্রে দ্বিমত পোষণ করে বলেছেন, ‘প্রতিটি মানুষেরই রয়েছে কল্পনাশক্তি। যে-শক্তির দ্বারা বিশ্বের সঙ্গে আমাদের মিলনটা কেবলমাত্র ইন্দ্রিয়ের মিলন না-হয়ে মনের হয়ে ওঠে, সে-শক্তি হচ্ছে কল্পনাশক্তি।’

পাশ্চাত্য সাহিত্যতত্ত্বের আরেক গুরুত্বপূর্ণ পণ্ডিত ইতালির লঙ্গিনাসের sublime থিওরি  মতে, ‘রচনার উৎকর্ষ হচ্ছে এক মহৎ মনের প্রতিধ্বনি’। এখানে লক্ষ্যণীয় বিষয় হচ্ছে ‘মন’। এর পাঁচটি উৎসের কথা ব্যাখ্যা করেছেন তিনি―এগুলোর মধ্যে প্রথম  হলো মহৎ ধারণা সৃষ্টির সামর্থ্য। দ্বিতীয় : শক্তিশালী ও অনুপ্রেরণাময় আবেগের উদ্দীপনা। তৃতীয় : চিন্তা ও বক্তব্য। চতুর্থ : দ্বিবিধ অলঙ্কার গঠনের কৃতিত্ব এবং সেই সঙ্গে মহৎ মননের সৃষ্টি―যাকে যথাযথ শব্দচয়ন, কল্পনাপ্রসূত শব্দালঙ্কারের ব্যবহার এবং বৈশিষ্ট্যের প্রকাশ বলা যায়। পঞ্চম : ভাবোন্নয়নের সামগ্রিক দক্ষতা। এসব উৎসের সঙ্গে মনের স্বাস্থ্যের গুরুত্বপূর্ণ অনুষদ আবেগানুভূতিও জড়িত। তবে স্বর্গীয় ভাবানুভূতি সৃষ্টিই sublime হিসেবে বিবেচিত হয়।

এখানেও বিতর্ক আছে। সাহিত্য কেবল স্বর্গীয় অনুভূতি সৃষ্টি করে না, নেতিবাচক যন্ত্রণাবিদ্ধ কষ্টকর অনুভূতি, হিংসা-বিদ্বেষ, ক্রোধ, ঘৃণা, দ্বন্দ্ব-সংকট, লোভ-লালসার কথাও বলে। কেবল মহৎ আবেগ সৃষ্টি হলে পূর্ণাঙ্গ জীবনের চিত্রকল্প  প্রতিফলিত হয় না। তবে বলা যায়, ভালো-খারাপের ভেতর থেকে উন্নত-স্বর্গীয় জীবনবোধ তৈরি হয়, হতে পারে। তাই স্মৃতি বা অভিজ্ঞতানির্ভরতা কিংবা অলৌকিক কবিকল্পনা ইত্যাদি বিতর্কের যে-কোনও বিষয় বিশ্লেষণ করে বলা যায়, এই কল্পনা হচ্ছে মনেরই শক্তি, মনেরই উপাদান, মনেরই বিপুল বিস্ফোরণ, বিস্ফোরিত শক্তির বিকিরণ―এসব নিয়েই সৃজন করেন কবিগণ।

এজন্য কবি-কথাসাহিত্যিকগণও এক ধরনের বিজ্ঞানী।

সহায়কগ্রন্থ :

১.            সাহিত্যতত্ত্ব একটি সংক্ষিপ্ত পরিক্রমা; মুহম্মদ মুহসিন (ঐতিহ্য)

২.           পাশ্চাত্য সাহিত্যতত্ত্ব; বদিউর রহমান (ঐতিহ্য)

৩.          কবিতার চিত্রকল্প; সরকার আমিন (পাঠক সমাবেশ)

৪.           সাহিত্যতত্ত্ব : প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য; হীরেন চট্টোপাধ্যায় (দে’জ পাবলিশিং)

৫.           বিদ্রোহী কবিতার মনস্তত্ত্ব; মোহিত কামাল (স্বপ্ন ’৭১)

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button