বিদ্রোহী কবিতা : ফিরে দেখা : মাহবুবুল হক
প্রচ্ছদ রচনা : সময়ের শব্দস্বর

আলোড়ন সৃষ্টিকারী ‘বিদ্রোহী’ কবিতা কাজী নজরুল ইসলামকে অমর করে রেখেছে। কবিতাটি বাঙালির নবজাগরণের দামামার গর্জন। এ কবিতা যখন লেখা হয় তখন রুশবিপ্লবের দুনিয়া কাঁপানো ঘটনা এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পটভূমিতে সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে উত্তাল হয়েছে ভারতবর্ষ। ব্রিটিশবিরোধী অসহযোগ ও খেলাফত আন্দোলন হয়ে উঠেছে দুর্বার। নজরুলের এই কবিতায় রাজনৈতিক-সামাজিক পরিস্থিতির এসব মর্মবস্তু পেয়েছে দুর্বার উচ্চারণ। অসাধারণ বলিষ্ঠ কবিতাটি পাঠকমহলে ঝড় তোলে। এ কবিতা লেখার আগে তিনি হাবিলদার কবি হিসেবে পরিচিত ছিলেন। কিন্তু ‘বিদ্রোহী’ প্রকাশের পর তিনি ‘বিদ্রোহী কবি’ হিসেবে নন্দিত হন। ২০২১ সালে সেই বিখ্যাত ‘বিদ্রোহী’ কবিতা রচনার শতবর্ষ।
১৯২১-এর ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে কলকাতায় ৩/৪ সি তালতলা লেনের বাসায় শেষ রাতের দিকে নজরুল ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি রচনা করেন। স্বরাজ আন্দোলনের জোয়ারের মুখে কবিতাটি রচিত হয়। নজরুল তখন ২২ বছরের টগবগে যুবক। সেনাবাহিনীর হাবিলদারি ছেড়ে ফিরেছেন কলকাতায়। তারুণ্যের আবেগ-উচ্ছ্বাস নিয়ে সাহিত্য সাধনায় মেতেছেন। পত্র-পত্রিকায় গল্প-কবিতা লিখে হাবিলদার কবি হিসেবে পেয়েছেন পরিচিতি।
সেই ১৯২১-এ কমিউনিস্ট পার্টির সংগঠক কমরেড মুজফ্ফর আহমদের সঙ্গে কলকাতার ৩/৪ সি তালতলা লেনের বাসায় থাকতেন নজরুল। সেখানে রুশবিপ্লবের প্রেরণা থেকে সমাজবিপ্লব ও শোষণমুক্তির লক্ষ্যে কমিউনিস্ট পার্টি গঠনের প্রচেষ্টা শুরু হয়। নজরুল সরাসরি কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য না হলেও বিপ্লবী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন। সেই বিপ্লবী চেতনার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে ‘বিদ্রোহী’ কবিতায়। কবিতাটি কেবল অসাধারণ জনপ্রিয়তা পায়নি, একই কবিতা একাধিক পত্র-পত্রিকায় প্রকাশের দুর্লভ সৌভাগ্যও অর্জন করে।
‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি প্রথম কার্তিক ১৩২৮ সংখ্যা মোসলেম ভারত এবং ২২শে পৌষ ১৩২৮ সংখ্যা (৬ জানুয়ারি ১৯২২) সাপ্তাহিক বিজলী পত্রিকায় যুগপৎ প্রকাশিত হয়। জনপ্রিয়তার কারণে বিজলী পত্রিকার ঐ সংখ্যা আবারও ছাপতে হয়। তুমুল সাড়া জাগানোয় মাঘ ১৩২৮ সংখ্যা প্রবাসী ও বৈশাখ ১৩২৯ সংখ্যা সাধনা পত্রিকায়ও কবিতাটি প্রকাশিত হয়। এটি স্থান পায় কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ অগ্নি-বীণায় (২৫-এ অক্টোবর ১৯২২)।
‘বিদ্রোহী’ কবিতা প্রকাশের পর পাঠক নন্দিত হওয়ার পাশাপাশি এর বিরুদ্ধে নানা সমালোচনাও শুরু হয়। নজরুল-অনুরাগী মোহিতলাল মজুমদার অভিযোগ তোলেন এটি নাকি তাঁর ‘আমি’ (মানসী, পৌষ ১৩২১-এ প্রকাশিত) শীর্ষক গদ্য রচনার অনুসরণে রচিত। কবি গোলাম মোস্তফা ‘নিয়ন্ত্রিত’ শিরোনামে মাঘ ১৩২৮ সংখ্যা সওগাত পত্রিকায় ‘বিদ্রোহী’ কবিতার ব্যঙ্গাত্মক প্যারোডি লিখে নজরুলের তথাকথিত ঔদ্ধত্যকে আক্রমণ করেন। ইসলাম দর্শন পত্রিকার সম্পাদক আবদুল হাকিম কার্তিক ১৩২৯ সংখ্যায় অশালীন ভাষায় নজরুলের বিরুদ্ধে কলম ধরেন ‘বিদ্রোহ দমন’ শীর্ষক কবিতায়। এই পত্রিকার অগ্রহায়ণ ১৩২৯ সংখ্যায় ‘প্রলয়ের ভেরি’ শিরোনামে মোহাম্মদ গোলাম হোসেন নজরুলকে ‘বিদ্রোহী এক ইবলিস’ অভিহিত করে কবিতা লেখেন। কিন্তু এ ধরনের সমালোচনা সত্ত্বেও নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতা আরও বেশি করে প্রচারিত, নন্দিত ও গৃহীত হয়। তা শিক্ষিত তরুণ সমাজের মন জয় করতে থাকে।
দুই.
‘বিদ্রোহী’ কবিতায় নজরুলের কবিতার সাধারণ বিশিষ্টতা প্রতিফলিত। তাঁর কবিতার ভাববস্তুর দুটি প্রধান দিক হচ্ছে―প্রেম ও বিদ্রোহ। তা অভিব্যক্তি পেয়েছে ‘বিদ্রোহী’-র একটি চরণে :
মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরি, আর হাতে রণ-তূর্য।
লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, নজরুলের সৃজন ক্ষমতার মৌলিক প্রেরণা রোমান্টিকতা। তার একদিকে রয়েছে বিদ্রোহ, অন্যদিকে রয়েছে গভীর প্রেম ও হৃদয়ানুভূতি। যেমন―‘বিদ্রোহী’ কবিতায় স্ফুট হয়েছে সামাজিক বৈষম্য, ধর্মীয় রক্ষণশীলতা ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির বিরুদ্ধে বিদ্রোহের সবল দৃপ্ত ঘোষণা :
মহা- বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত
আমি সেই দিন হব শান্ত,
যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে-বাতাসে ধ্বনিবে না,
অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে রণিবে না―
বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত
আমি সেই দিন হব শান্ত।
অন্যদিকে প্রেম ও হৃদয়ানুভূতির অনুষঙ্গও এসেছে এই কবিতায়। যেমন :
১. আমি অভিমানী চিরক্ষুব্ধ হিয়ার কাতরতা, ব্যথা সুনিবিড়।
২. আমি বন্ধন-হারা কুমারীর বেণী, তন্বী-নয়নে বহ্নি,
আমি ষোড়শীর হৃদি-সরসিজ প্রেম উদ্দাম, আমি ধন্যি।
৩. আমি পথিক কবির গভীর রাগিণী, বেণুবীণে গান গাওয়া।
সূক্ষ্ম ইন্দ্রিয়ানুভূতিতে এসব পঙ্ক্তি উজ্জ্বল। তা নজরুলের সংবেদনশীল প্রেমিক মনকেই প্রগাঢ় করে তোলে। এভাবে আমরা অনুভব করতে পারি, বিদ্রোহে ও প্রেমে কবির কাব্যবোধের পূর্ণ প্রকাশ এই ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটিতেই ইঙ্গিতবহ হয়ে উঠেছে।
‘বিদ্রোহী’ কবিতায় নজরুল মানুষের মহিমাকে বড় করে দেখেছেন। এর পেছনে ইউরোপীয় নবজাগরণ ও বিশেষ করে রুশবিপ্লবের প্রভাব পড়েছে। মানুষের মহিমাকে তিনি সবার ওপরে স্থান দিয়েছেন :
বল বীরÑ
বল উন্নত মম শির
শির নেহারি’ আমারি, নতশির ওই শিখর হিমাদ্রির!
তিন
মানবমহিমার শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ করতে গিয়ে আবেগ-সমুজ্জ্বল ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় নজরুল ভারতীয় পুরাণ, মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম পুরাণ ও গ্রিক পুরাণের যুগপৎ ব্যবহারে কুশলতা দেখিয়েছেন। যেমন―ভারতের প্রাচীন মহাকাব্য মহাভারত থেকে পৌরাণিক প্রসঙ্গে টেনেছেন এভাবে : ‘আমি ক্ষ্যাপা দুর্বাসা-বিশ্বামিত্র-শিষ্য’। এমনিভাবে এসেছে বিষ্ণু, শ্রীকৃষ্ণ, শিবের প্রসঙ্গ।
জগৎপালক বিষ্ণুকে নজরুল ইঙ্গিতবহ করে তুলেছেন ‘আমি চক্র ও মহাশঙ্খ’ শব্দবন্ধে। বিষ্ণুর ষষ্ঠ অবতার পরশুরামের সঙ্গে তুলনা করেছেন নিজেকে : ‘আমি পরশুরামের কাঠের কুঠার’। বিষ্ণুর অবতার শ্রীকৃষ্ণকে ফুটিয়ে তুলেছেন ‘এক হাতে মোর বাঁশের বাঁশরী’ চিত্রকল্পে। অন্য চিত্রকল্পে টেনে এনেছেন শ্রীকৃষ্ণের অগ্রজ বলরামের প্রসঙ্গ : ‘আমি হল বলরাম স্কন্ধে।’ দেবাদিদেব শিবের প্রসঙ্গ এসেছে একাধিক জায়গায় : ‘মহা-প্রলয়ের আমি নটরাজ’ ও ‘আমি পিনাক-পাণির ডম্বরু ত্রিশূল’। এ ছাড়াও এসেছে ভগবান, নরক, চণ্ডী ইত্যাদি ভারতীয় পৌরাণিক ঐতিহ্য।
মধ্যপ্রাচ্যের পুরাণের ব্যবহারের উদাহরণের মধ্যে পড়ে ‘হাবিয়া দোজখ’, ‘জিব্রাইলের আগুনের পাখা’, ‘ইস্রাফিল,’ ‘তাজী বোররাক্’, ‘জাহান্নাম’, ‘বেদুইন’, ‘আরশ’ ইত্যাদির উল্লেখ। ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় গ্রিক পুরাণের ব্যবহার খুব কম। বিশেষ উল্লেখযোগ্য : ‘অর্ফিয়াসের বাঁশরী’। এভাবে ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় প্রধানত হিন্দু ও মুসলিম পুরাণের মেলবন্ধন ঘটিয়ে নজরুল বোঝাতে চেয়েছেন যে, তিনি ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতায় আচ্ছন নন। তিনি মানুষ। সর্ব ধর্মবোধই তাঁর ধর্মচেতনার মর্মবস্তু।
‘বিদ্রোহী’ কবিতায় নজরুলের জাতীয়তাবোধের সঙ্গে আন্তর্জাতিকতাবোধের মেলবন্ধন চোখে পড়ে। নজরুল যে সম্প্রদায়-বিভেদের ঊর্ধ্বে ছিলেন ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় তৎসম শব্দের পাশাপাশি আরবি-ফারসি শব্দ প্রয়োগ করে তার কুশলী প্রমাণ রেখেছেন। ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় আছে :
তাজী বোররাক আর উচ্চৈঃশ্রবা বাহন আমার
হিস্মৎ-হ্রেষা হেঁকে চলে।
বোররাক হলো কোরআনে বর্ণিত দিব্য ঘোড়া আর উচ্চৈঃশ্রবা হলো স্বর্গীয় ঘোড়া। এই প্রয়োগ সাম্প্রদায়িক ভেদরেখাকে একাকার করে দেয়। আরবি ও সংস্কৃত শব্দে তৈরি সমাসবদ্ধ ঈদ ‘হিস্মৎ-হ্রেষা’ প্রয়োগ কুশলতার অভিনবত্বে আমাদের মুগ্ধ করে। এমনি অনবদ্য প্রয়োগ : ‘ভয়ে সপ্ত নরক হাবিয়া দোজখ নিভে নিভে যায় কাঁপিয়া।’
নজরুল এ উপমহাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম অগ্রনায়ক চারণ কবি। জাতি-ধর্মনির্বিশেষে বাঙালির জাতীয় জাগরণের তিনি ছিলেন অন্যতম অগ্রদূত। বাঙালির মানস-চেতনায় তিনি এনেছিলেন উদ্দীপনাময় নবজাগরণের বাণী। বাঙালি মুসলমান সমাজের সংকীর্ণ ও অর্গলবদ্ধ মনোজগতে তিনি বইয়ে দিয়েছিলেন নবচেতনার মুক্ত হাওয়া। অবিভক্ত বাংলার বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মধ্যে জাতীয় চেতনার উৎসারণে অসম্প্রদায়িক মানবতাবাদী কবি হিসেবে নজরুলের ভূমিকা তাই ব্যতিক্রমধর্মী।
নজরুলের জাতীয় চেতনার প্রথম বলিষ্ঠ প্রকাশ ঘটে ‘বিদ্রোহী’ কবিতায়। এ কবিতায় তিনি ভারতবর্ষের মিশ্র সংস্কৃতির ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকারকে আশ্রয় করে বলিষ্ঠভাবে জাতীয় চেতনার উৎসারণ ঘটিয়েছেন। এখানেই নজরুলের জাতীয় চেতনার স্বাতন্ত্র্য ফুটে ওঠে। এক্ষেত্রে দুটো দিক প্রধানত স্পষ্ট :
১. দেশজ উত্তরাধিকার―যা দেশের মাটি, মানুষ ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত;
২. ধর্মজ উত্তরাধিকার―যা ধর্মীয় সংকীর্ণতার পরিবর্তে সব ধর্মের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধের আদর্শে উদ্বুদ্ধ।
নজরুল জাতীয় চেতনার উজ্জীবন ঘটালেও তিনি ছিলেন সংকীর্ণ অন্ধ জাতীয়তাবাদের বিরোধী। বরং অখণ্ড মানবতাবোধ ও পূর্ণ মানবসত্তায় উত্তীর্ণ হওয়াই ছিল তাঁর কবিতার অন্যতম প্রেরণা। তাঁর কবিতায় সাম্যবাদী ও আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গির যে প্রকাশ ঘটেছে তা এ কারণেই।
জাতীয় চেতনার পাশাপাশি জাতি-ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে মানুষই ছিল কবির কাছে সবচেয়ে বড়। এই মানবপ্রীতি নিয়েই দেশকালের ঊর্ধ্বে সব নিপীড়িত মানবাত্মার মুক্তিবন্দনায় তাঁর কবিতা সোচ্চার। ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় মানুষের অবমাননা, লাঞ্ছনা ও নিপীড়নের কারাগার ভেঙে তিনি মানবমুক্তির সংগ্রামে ব্রতী।
নজরুলের বিদ্রোহী চেতনার ঐন্দ্রজালিক প্রভাব এখনও আমাদের উজ্জীবিত করে। কারণ তাঁর জাতীয় চেতনা কেবল রাজনৈতিক বন্ধন মুক্তিতে সীমিত নয় বরং পূর্ণ মানবিকমুক্তিই তাঁর কবিতার মূল প্রেরণা।
চার
‘বিদ্রোহী’ কবিতায় শব্দ ব্যবহারের নতুনত্বও লক্ষণীয়। রবীন্দ্রনাথ সংস্কৃত-প্রভাবিত তৎসম ও সমাসবদ্ধ শব্দের আড়ষ্টতা থেকে কবিতাকে কথ্য ভাষারীতির অনুগামী করতে সচেষ্ট হয়েছিলেন। নজরুল আরবি-ফারসি শব্দের কুশলী প্রয়োগ ঘটিয়ে বাংলা কবিতাকে দিয়েছেন নতুন মাত্রা :
আমি বেদুঈন, আমি চেঙ্গিস,
আমি আপনারে ছাড়া করি না কাহারে কুর্নিশ।
নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় ছন্দ ও অন্ত্যমিলের চমৎকারিত্বও অভূতপূর্ব :
আমি তাই করি ভাই যখন চাহে এ মন যা,
করি শত্রুর সাথে গলাগলি, ধরি মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা,
আমি উন্মাদ, আমি ঝঞ্ঝা!
‘বিদ্রোহী’ কবিতায় নজরুলের ছন্দ কুশলতার প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, প্রচলিত মাত্রাবৃত্ত ছন্দকে তিনি নিজের ভাবোচ্ছ্বাসের উপযোগী করে ব্যবহার করেছেন। এক্ষেত্রে তাঁর বিশেষ উদ্ভাবন অতিপর্বের ব্যবহার। ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় এমন ব্যবহারের বিপুলতা লক্ষ করা যায় :
১. আমি কভু প্রশান্ত, – কভু অশান্ত, দারুণ স্বেচ্ছাচারী;
২. মহা- প্রলয়ের আমি নটরাজ, আমি সাইক্লোন, আমি ধ্বংস;
৩. করি শত্রুর সাথে গলাগলি, ধরি মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা।
এই কবিতায় প্রধানত আমি শব্দটি অতিপর্ব হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। এ ছাড়া বল, করি, মম, তাজি, ধরি, ভয়ে, কভু, যবে ইত্যাদি শব্দ অতিপর্বের রূপ পেয়েছে।
এই কবিতায় মিত্রাক্ষর বিন্যাসেও নজরুলের কুশলতা লক্ষণীয়। যেমন :
বল বীর
বল মহাবিশ্বের মহাকাশ ফাড়ি’
চন্দ্র সূর্য গ্রহ তারা ছাড়ি’
ভূলোক দ্যুলোক গোলোক ভেদিয়া,
খোদার আসন ‘আরশ’ ছেদিয়া,
উঠিয়াছি চির-বিস্ময় আমি বিশ্ব-বিধাত্রীর!
এখানে অন্ত্যমিল কাঠামোটি এ রকম :
ক খ খ গ গ ক
অনুপ্রাস ব্যবহারের কুশলতাও এখানে রয়েছে। যেমন : ‘ভূলোক, দ্যুলোক, গোলোক।’
পাঁচ
বাংলা কবিতায় বিকাশের ধারায় ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি নানা দিক থেকে বিশেষ উল্লেখযোগ্য। এই কবিতায় বিদ্রোহব্যঞ্জক ভাবের উৎসারণ ঘটিয়ে নজরুল বিদ্রোহী কবি হিসেবে বিশেষ পরিচিতি লাভ করেছেন।
কবিতাটি নজরুলের কবি-জীবনের সূচনায় সবচেয়ে সাড়া জাগানো কবিতা। এই কবিতায় সব ধরনের অশুভ ও সব ধরনের অপশক্তির বিরুদ্ধে নজরুলের বিদ্রোহ বাণীরূপ পেয়েছে। বলিষ্ঠ ও প্রত্যয়ী ভাষায় কবি নজরুল ইসলাম এখানে দায়বদ্ধ কবির ভূমিকাকে তুলে ধরেছেন।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় (১৯১৪-১৯১৮) পৃথিবীব্যাপী ধ্বংস ও অবক্ষয়ের প্রেক্ষাপটে ভারতবর্ষে ব্রিটিশবিরোধী স্বাধিকার আন্দোলনের উত্তাল বাতাবরণের মধ্যে নির্মিত হয়েছে কবিতাটি। ভাব-পরিমণ্ডল, জীবনবোধ ও প্রকরণ-কৌশলে ‘বিদ্রোহী’ রবীন্দ্র-প্রভাবিত কাব্যবলয়ে পুরোপুরি নতুন নির্মাণ।
লেখক : প্রাবন্ধিক, বাংলা একাডেমি ফেলো ও একুশে পদকপ্রাপ্ত
(পূর্বে প্রকাশিত)



