প্রধান রচনা : বাংলাদেশের কবিতা : তিন দশকের ত্রিধারা : বিশ্বজিৎ ঘোষ

উনিশশো একাত্তর সালের মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশ পেরিয়ে এসেছে দীর্ঘ তিপ্পান্ন বছর। এই সময়খণ্ডে নানা অর্জন-বিসর্জনের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়েছে আমাদের দেশ। স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের কবিতার ক্ষেত্রেও আমরা খুঁজে পাব বহুমাত্রিক অর্জন-বর্জনের ছাপ, কবিতার শরীরেই দেখতে পাব আমাদের অগ্রগতি-পশ্চাৎগতির নানা কারুকাজ। বিশ শতকের শেষ তিন দশকে বাংলাদেশের কবিতায় মুক্তিযুদ্ধ, প্রেম, প্রকৃতি, রাজনীতি, বিচ্ছিন্নতাবোধ, ধর্মবিশ্বাস, অধ্যাত্মবাদ, পুরাণের পুনর্নির্মাণ, লোকজীবন-আশ্রয়, প্রতিবাদী চেতনাসহ নানা প্রবণতা বিশেষভাবে লক্ষ করা যায়। সময়ের পরিধির কথা বিবেচনায় রেখে আমি বর্তমান আলোচনায় বাংলাদেশের কবিতা সম্পর্কে বিশদ নয়, বরং তিন দশক থেকে কেবল তিনটি প্রবণতা সম্পর্কে আলোকপাতের প্রয়াস পাব। সত্তরের কবিতায় আমি দেখতে চেয়েছি নৈঃসঙ্গ্যচেতনার স্বরূপ, আশিতে মিথ-পুরাণের পুনর্মূল্যায়নের প্রয়াস, আর নব্বইয়ের কবিতায় নতুন নিরীক্ষার নির্যাস। ধারণা করি, এই তিন প্রবণতার মধ্যেই কৌতূহলী পাঠক খুঁজে পাবেন ওই সময়ের কবিতার অনুক্ত সব প্রবণতা-সূত্র। কেননা আমার বিবেচনায়, ব্যক্ত প্রবণতাগুলোই ওই দশকত্রয়ের বাংলাদেশের কবিতার কেন্দ্রীয় সুর।
২.
বাংলাদেশে সত্তরের দশকে যেসব কবির আবির্ভাব, আমাদের কবিতার ধারায় সম্মিলিত সাধনায় তাঁরা নির্মাণ করেছেন একটি ভিন্ন স্বর। মুক্তিযুদ্ধের গৌরবোজ্জ্বল স্মৃতি যেমন এঁদের উজ্জ্বল অহঙ্কার, তেমনি যুদ্ধ-পরবর্তী জাতীয় জীবনের বিপর্যয়, ক্রমবিলীয়মান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, পরাজিত শক্তির পুনরুত্থান এবং সেনাতন্ত্রের আগ্রাসন এঁদের করে তোলে অস্থির অবিশ্বাসী রিক্তআশ―ফলত অন্তঃস্বভাবী। সমাজবাস্তবতা ও ব্যক্তিক সংবেদনার মিথস্ক্রিয়ায় সত্তরের কবিতায়, কিংবা বলি সত্তরে আবির্ভূত কবিদের সৃষ্টিতে প্রধান হয়ে উঠল―মুক্তিযুদ্ধের গৌরব আর সংঘশক্তির উত্তাপ ফুরিয়ে যেতে-না-যেতেই―ব্যক্তির আত্মপ্রক্ষেপ আমিত্বচেতনা ও অতল-অসীম নৈঃসঙ্গ্যবেদনা। বিচ্ছিন্নতার দুর্ভর যন্ত্রণা ও নৈঃসঙ্গ্যের দুর্মোচ্য অভিশাপে বিপর্যস্ত সত্তর দশকী কবিমানস পৌনঃপুনিকভাবে সংক্রামিত হয়েছে অবিশ্বাস সংশয় আর অনন্বয়ের মরুময়তায়। অনাশ্রয়ী এই পৃথিবীতে সম্মিলিতভাবে তাঁরা সন্তরণ কেটেছেন অতলান্ত একাকিত্ব-অর্ণবে। তবে, ব্যর্থতাবোধ স্বপ্নভঙ্গের যন্ত্রণায় বিপন্ন হয়েও এই দশকের কবিরাই আবার কখনও-বা ব্যক্তিক দায়বদ্ধতা এবং সামাজিক প্রেরণায় জেগে উঠেছেন সপ্রাণ সত্তায়; আন্তঃমানবিক সম্পর্কবন্ধনে ঋদ্ধ হয়ে উচ্চারণ করেছেন বিচ্ছিন্নতা-বিভঙ্গতা-অনন্বয় থেকে মুক্তির আকাক্সক্ষার কথা।
সমাজসংগঠন এবং ব্যক্তিসংবেদনার আন্তঃসম্পর্কের নিয়ত দ্বৈরথে মানবচৈতন্যে উপ্ত হয় নৈঃসঙ্গ্যের প্রাণবীজ। মানবচিত্তে নৈঃসঙ্গ্যচেতনা সৃষ্টির পশ্চাতে মুখ্য ভূমিকা পালন করে আধুনিক মানুষের Alienation বা বিচ্ছিন্নতাবোধ। মানুষ সামাজিক জীব―অ্যারিস্টটলের এই প্রত্যয় সর্বাংশে সত্য হলেও, অষ্টাদশ শতাব্দী থেকেই সামাজিক সঙ্গতিশূন্যতা ও কালস্রোতের বৈনাশিকতায় ক্রমেই ছিন্ন হয়ে গেছে সমাজের সঙ্গে ব্যক্তিমানুষের অন্বয় ও সংযুক্তির সনাতন বন্ধন। বিংশ শতাব্দীতে এসে প্রবল রূপ ধারণ করেছে মানুষের এই অনন্বয় বা বিচ্ছিন্নতা। নৈঃসঙ্গ্যচেতনা হচ্ছে এই অনন্বয় বা বিচ্ছিন্নতারই অনিবার্য ফল।
সভ্যতার অভিশাপদীর্ণ ও সমাজের অভ্যন্তর দ্বন্দ্বশাসিত আধুনিক মানুষের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা-অভিশঙ্কা-চিত্তবৈকল্য এবং বহিশ্চাপ-অন্তর্চাপ ব্যক্তিবেদনে সৃষ্টি করে বিচ্ছিন্নতাবোধ। প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই মানব-অস্তিত্বের মর্মকোষে সংগোপনে সক্রিয় আছে বিচ্ছিন্নতার আদিভ্রƒণ। বস্তুত, সভ্যতার ইতিহাস এবং বিচ্ছিন্নতার ধারণা সমান্তরাল ও সমানবয়সি―‘The fundamental notion of alienation is at least as old as recorded time (Mizruchi, 1973: 111) । জন্মসূত্রেই মানুষ একা, তার এই একাকিত্ব সমগ্র জীবনের নিত্যসঙ্গী। মাতৃগর্ভ থেকে ভূমিষ্ঠ হওয়ার মুহূর্ত থেকেই মা ও সন্তানের মধ্যে সম্পর্কের জৈব-একাত্মতা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়―ক্রমে এই বিচ্ছিন্নতা বহির্জাগতিক অসঙ্গতি এবং চিত্তজাগতিক জটিলতার সঙ্গে বিমণ্ডিত হয়ে মানব-অস্তিত্বকে করে তোলে নিঃসঙ্গতাদীর্ণ ও সঙ্কটসঙ্কুল। আধুনিক মানুষের বিচ্ছিন্নতা, বস্তুত, রেনেসাঁস-উত্তর ব্যক্তি-স্বাতন্ত্র্যবাদী ও পুঁজিশাসিত সমাজব্যবস্থার অন্তর্নিহিত বৈপরীত্য এবং মৌলকাঠামো- উপরিকাঠামোর মধ্যকার নিহিত দ্বন্দ্বের ফল। Alienation বা বিচ্ছিন্নতাবোধ একটি মনস্তাত্ত্বিক পরিভাষা, যার মাধ্যমে আমরা ব্যক্তির পরিচয়, আর্থ-সামাজিক-মানসিক জটিলতাজনিত বহুমাত্রিক বিভ্রান্তি এবং ব্যক্তিবোধের অনুভব আবিষ্কার করি। বাংলাদেশের সত্তরের দশকের কবিদের সৃষ্টিতেও আমরা আধুনিক মানুষের এই বহুমাত্রিক বিচ্ছিন্নতা ও নিঃসঙ্গতার ছায়াপাত লক্ষ করি।
বাংলাদেশের সত্তরের কবিতায় ব্যক্তির নৈঃসঙ্গ্যচেতনার বহুমাত্রিক প্রকাশ ঘটেছে। নগরজীবনের প্রতি আধুনিক মানবচৈতন্যের বে-মানান স্বভাবজাত বিচ্ছিন্নতা, প্রেম বিচ্ছিন্নতা, প্রকৃতি বিচ্ছিন্নতা, ঈশ্বর বিচ্ছিন্নতা, সমাজবিচ্ছিন্নতা, পরিবার বিচ্ছিন্নতা, আন্তঃমানবিক সম্পর্কবন্ধন বিচ্ছিন্নতা, সত্তাবিচ্ছিন্নতা―এই সব বহুমাত্রিক বিচ্ছিন্নতাবোধে ক্লান্ত পীড়িত ও বিষণ্ন সত্তরে আবির্ভূত কবিদের বর্ণমালা। নগরজীবনের প্রেক্ষাপটে সত্তরের কবিতায় অনন্বয় নির্বেদ নৈঃসঙ্গ্যচেতনায় ছায়াপাত ঘটেছে। সত্তরের কবিতার একটি বিশাল অঞ্চল জুড়ে আছে নগরজীবন ও নাগরিক মধ্যবিত্তের বে-মানান স্বভাবজাত বিচ্ছিন্নতাবোধ ও নৈঃসঙ্গ্যচেতনার কথা। বিবর্ণ মহানগর, অনাত্মীয় মেট্রোপলিটান সিটি সত্তরের কবিতায় পৌনঃপুনিকভাবে প্রতিভাসিত। তিরিশের কবিদের মতোই সত্তরের কবিরাও নাগরিক নিঃসঙ্গতাবোধের দুর্মর যন্ত্রণায় হয়েছেন বিদ্ধ। মহানগর সত্তর দশকী কবিদের কাছে অনাত্মীয়, এখানে একান্তই মধ্যবর্গের মানুষ। ফলত তাঁদের সম্মিলিত চেতনায়, প্রধান হয়ে ওঠে নৈঃসঙ্গ্যের সংক্রাম।
মহানগর সত্তরের কবিদের কাছে অনাত্মীয় এক বিবর্ণভুবন―যেখানে বেঁচে থাকার নেই কোনও প্রেরণা―নেই বন্ধু কিংবা প্রেমিক-প্রেমিকা। সবাই এখানে মদ আর নারী আর টাকার পিছনে ছুটছে। মহানগরের এই বিনাশী রূপ সত্তরের কবিতায় বপন করেছে নৈঃসঙ্গ্যের বীজ। মহানগরে লক্ষ মানুষের পদচারণা থাকলেও, নাগরিক মানুষ পরস্পর থেকে পরস্পর বিচ্ছিন্ন ও বিযুক্ত। মেট্রোপলিটান সিটির lonely crowd সত্তরের কবিদের নিক্ষেপ করেছে বিচ্ছিন্নতার সর্বগ্রাসী যন্ত্রণাবর্তে। মহানগরের ভিড়ে একসময় সবাই হারিয়ে যায়, হারিয়ে যায় ব্যক্তির আইডেনটিটি, ধোঁয়ায় বিবর্ণ হয় মানুষের সব আশা, ভালোবাসা পরিণত হয় পণ্যে। মহানগরের এই ভয়াবহতাই শিল্পিতা পেয়েছে বাংলাদেশের সত্তরের কবিতায়।
পুঁজিবাদী সমাজে অবক্ষয়ের সার্বিক কর্কটরোগে মানুষের পারিবারিক বন্ধন বিনষ্ট হয়েছে, ছিন্ন হয়ে গেছে পিতা-মাতার সঙ্গে সন্তানের, স্বামীর সঙ্গে স্ত্রীর, এক মানুষের সঙ্গে অন্য মানুষের সম্পর্কের সনাতন সেতুবন্ধ। অর্থনৈতিক নিষ্পেষণে ভেঙে পড়েছে একান্নবর্তী পরিবারের নিশ্চিত নিরাপদ আশ্রয়, রক্ত-সম্পর্কের অন্তরঙ্গ আপনজন চলে গেছে দূরে, অন্য কোনও অচেনা প্রান্তরে। সমস্যাসঙ্কুল পারিবারিক জীবন ব্যক্তির কাছে হয়ে ওঠে দুঃসহ, এবং এ অবস্থায় সে ভালোবাসে একলা সময় কাটাতে; যে-সমাজ তাকে শিখিয়েছে ‘time is money’, সে-সমাজের অধিবাসী হয়েও সে ঘরের কোণে সময় কাটায় অর্থহীন অসঙ্গত ভাবনায়। পরিবারের প্রতি কোনও দায়িত্ব সে উপলব্ধি করে না, এমনকি নিজের প্রতিও। মানুষের সঙ্গে মানুষের বিচ্ছেদ, আন্তঃমানবিক সম্পর্ক-বন্ধনে ধস―সত্তরের পঙ্ক্তিমালায় উঠে এসেছে কবিদের সত্তার গভীর থেকে।
মুক্তিযুদ্ধ-উত্তর সময়খণ্ডে সামূহিক ভাঙনের তোড়ে ব্যক্তির সঙ্গে সমাজের সনাতন বন্ধনে চিড় ধরেছে। সমাজ ব্যক্তির দায়িত্ব নিতে আজ অক্ষম, প্রত্যাশা পূরণে অসমর্থ, নিরাপত্তাবিধানে ব্যর্থ; ব্যক্তিও হারিয়ে ফেলেছে সমাজকে দেওয়ার মতো তার সব সম্পদ-সামর্থ্য। ফলে অনিবার্যভাবে সৃষ্টি হয়েছে সমাজের সঙ্গে ব্যক্তির বিরোধ ও বিচ্ছিন্নতা। এই বিরোধ ও বিচ্ছিন্নতা ব্যক্তিচৈতন্যে সৃষ্টি করে নিরাশা ও নৈঃসঙ্গ্য। ফলে সমাজ থেকে, অন্য মানুষ থেকে সে নিজেকে নেয় গুটিয়ে। মানুষের সঙ্গে মানুষের এখন কোনও সম্পর্ক নেই, নেই পারস্পরিক দায়িত্বচেতনা―মানুষ এখন কেবলি হাড় আর মাংসের স্তূপমাত্র। মানবিক সম্পর্কবন্ধনে এই ধস এই বিপর্যয় নৈঃসঙ্গ্যবোধের ভয়াবহ পরিণতি, যা রূপায়িত হয়েছে সত্তরের সম্মিলিত কাব্যস্রোতে।
নৈঃসঙ্গ্যচেতনার সংক্রামে আত্মবিবরবাসী মানুষ সমাজ থেকে, পরিপার্শ্ব থেকে গুটিয়ে নেয় নিজেকে, চারদিকে সে তুলে দেয় আত্মতার দেয়াল। সমাজের পাঁক যেন তাকে স্পর্শ করতে না পারে, তাই সে আপন পরিমণ্ডলের চারধারে তুলে দেয় আত্মতার এক মোহনীয় আবরণ। এ আবরণের অন্তরালে আপন ভুবনের বাসিন্দা সে একাই, নিজেই নিজের অধীশ্বর―নেই সেখানে আর কারও অনুপ্রবেশের অধিকার। সমাজবিচ্ছিন্ন এই ভাবনার প্রকাশ বাংলাদেশের সত্তরের কবিতার উল্লেখযোগ্য এক প্রবণতা। সমাজবিচ্ছিন্ন অনন্বয়ী অবস্থাকে সত্তরে আবির্ভূত কবিরা শত চেষ্টাতেও দূর করতে পারেনি, ফলে নিয়ত এক নিঃসঙ্গতাবোধে তাড়িত ও পীড়িত ও দলিত তাঁরা।
সর্বগ্রাসী বিচ্ছিন্নতার ছোবলে কবি নিমগ্ন হন আত্মবিবরে, আত্মতার অমরাবতীতে খুঁজে পান তিনি টিকে থাকার জীবনমন্ত্র। কিন্তু এভাবে কি বাঁচা যায় ? তাই একসময় আমিত্বচেতনায় নিমগ্ন কবি মুখোমুখি হন সত্তার সঙ্গে―ব্যক্তিসত্তা থেকেও ক্রমে সে চলে যায় দূরে―এভাবে একসময় দেখা দেয় সত্তাছিন্নতার যন্ত্রণা। সত্তাছিন্নতাই, বস্তুত নৈঃসঙ্গ্যবোধের বিষময় ফল। সত্তরের কবিতায় আমরা পৌনঃপুনিকভাবে উচ্চারিত হতে দেখি এই আত্মময়তা ও সত্তাছিন্নতার ছবি। সত্তরে আবির্ভূত প্রায় সকল কবির হৃদয়ের অভ্যন্তর রক্তক্ষরণে সিক্ত হয়ে উৎসারিত হয়েছে আত্মময়তার অকহনীয় যন্ত্রণা, ব্যক্ত হয়েছে সত্তাশূন্যতার অতলান্ত বেদনা। সত্তাবিচ্ছিন্নতার পরিণতিতে মানুষনামের খোলসের মধ্যে জন্ম নেয় আরেক মানুষ, না-মানুষ; সত্তরের কবিতা এই না-মানুষদের ভিড়ে বিপুলভাবে আক্রান্ত। সত্তরের কবিতায়, প্রবল দ্রোহ ও প্রতিবাদের মাঝেও, আমরা শুনি নিঃসঙ্গতাদীর্ণ মানুষের অবিরত আর্তনাদ; দেখা পাই সেই সব মানুষের, যারা প্রকৃত অর্থেই ছিন্নমূল প্রাণের উৎকেন্দ্রে নিঃসঙ্গ―man নয়, তাদের অভিধা হয়ে ওঠে anti-man (না-মানুষ)।
সমাজবিচ্ছিন্নতা, আন্তঃমানবিক সম্পর্কবিচ্ছিন্নতা, সত্তাবিচ্ছিন্নতার পাশাপাশি সত্তরের কবিতায় কখনও কখনও ভিড় করেছে প্রেমবিচ্ছিন্ন প্রকৃতিবিচ্ছিন্ন ঈশ্বরবিচ্ছিন্ন নিঃসঙ্গ মানুষের দল―মহানগরে একসঙ্গে হাঁটলেও যাদের শরীর থেকে নির্গত হয় পরস্পর ভিন্নতার সুর। পারিবারিক বন্ধন ও দায়িত্বচেতনা থেকে ব্যক্তির বিচ্ছিন্নতা যতই প্রবল হয়েছে, ততই বৃদ্ধি পেয়েছে মানুষের প্রেমবিচ্ছিন্নতা। প্রেমিক-প্রেমিকার পারস্পরিক ভালোবাসা এ যুগের অদৃশ্য দৈত্য নিয়েছে হরণ করে। একালে দাম্পত্য-প্রেমে দেখা দিয়েছে দুর্মর সন্দেহ ও গভীর অবিশ্বাস, বাৎসল্য-প্রেম বাণিজ্যিক মূল্যচেতনায় নিপতিত হয়েছে প্রবল চাপের মুখে। আধুনিক মানুষের জীবনে প্রেম বলতে কিছু নেই; প্রেম এখন এলিয়টের ভাষায়―‘nothing with nothing-এর বন্ধন। একালে পুঁজিবাদী শোষণের চাপে প্রেম পরিণত হয়েছে বাণিজ্যিক পণ্যে। প্রেমছিন্নতার ফলে আধুনিক মানুষ পরিণত হয়েছে অনুভূতিশূন্য জড়-মানুষে। প্রেমবিচ্ছিন্নতার কারণে বিষময় নিঃসঙ্গতার শব্দছবি আমরা পাই সত্তরের পঙ্ক্তিমালায়।
প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের অন্বয় ও সংযুক্তি আন্তঃমানবিক সম্পর্কের মতোই সত্য। সংবেদনশীল শিল্পীচৈতন্য নিসর্গ-প্রকৃতির গভীর বন্ধনে থাকে যুক্ত, প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের গড়ে ওঠে আত্মিক সম্পর্ক। কিন্তু শিল্প-বিপ্লবোত্তর কালে, মহানগর প্রতিষ্ঠার যুগে, যন্ত্রসভ্যতার কালো ধোঁয়ায় প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের এই সম্পর্কে ক্রমেই নেমে আসে মলিনতা। মেট্রোপলিটন মনের যান্ত্রিকতায়, কারখানা আর অটোমোবাইলের চাকায় বন্দি আধুনিক মানুষ প্রকৃতির সান্নিধ্য থেকে ক্রমে দূরে চলে গেছে। প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের এই বিচ্ছিন্নতা মানবচিত্তে সৃষ্টি করে নিঃসঙ্গতার অনুভব। সত্তরের দশকে প্রকৃতি-বিচ্ছিন্ন মানবচিত্তের সামূহিক বিপন্নতা কবিদের শব্দস্রোতে উঠে এসেছে গভীর যন্ত্রণা নিয়ে।
প্রেম ও প্রকৃতির মতো, সত্তরের কোনও কোনও কবির রচনায় ধ্বনিত হয়েছে ঈশ্বর-বিচ্ছিন্নতার সুর, কখনও-বা ঈশ্বরের কাছে অস্তিত্ব-উন্মাতাল-করা কোনও প্রশ্ন। ঈশ্বর তাঁর দায়িত্ব পালন করেনি, তাই ঈশ্বরের প্রতিও একালের কবিরও কোনও দায়িত্ব নেই। সত্তরের কোনও কোনও পঙ্ক্তিস্রোতে উঠে এসেছে ঈশ্বরের সঙ্গে মানুষের এই বিযুক্তির দুর্মর যন্ত্রণাকথা।
২. ১
নৈঃসঙ্গ্যপীড়িত মানুষ কখনও কখনও জাগ্রত হয় মানবিক সম্ভাবনা ও দায়িত্বচেতনায়। নিঃসঙ্গতার সর্বগ্রাসী অন্ধকার থেকে নিজেকে মুক্ত করে মানুষ সংলগ্ন হতে চায় বৃহত্তর জনমানসের সঙ্গে। ‘বিরূপ বিশ্বে নিয়ত একাকী’ জেনেও অনৈক্যের মধ্যে একতা ও সংহতি সন্ধান করে মানুষ। লোকপুরাণের সেই ফিনিক্স পাখি যেমন আপন দেহভস্ম থেকে নতুন অবয়ব নিয়ে সপ্রাণ সত্তায় জেগে ওঠে, তেমনি সময় ও সমাজের সঙ্গে নিয়ত দ্বন্দ্বে বিক্ষত-বিচূর্ণ হয়েও আত্মগত অনুভবকে বিশ্বগত ঐকতানে সংলগ্ন করার জন্য বিচ্ছিন্ন নিঃসঙ্গ মানুষ কখনও কখনও নতুন সত্তা নিয়ে লাভ করে নবজন্ম। এ সূত্রেই এসে যায় নিঃসঙ্গতা থেকে মুক্তি বা উত্তরণের অনুষঙ্গ।
বস্তুত, মানবিক অন্তঃসার ও সম্ভাবনা আবিষ্কারের মধ্য দিয়েই ঘটতে পারে নিঃসঙ্গতার সংক্রাম থেকে ব্যক্তির মুক্তি। সমাজ ও সভ্যতার প্রগতির জন্যই প্রয়োজন নিঃসঙ্গতা-থেকে-মুক্ত স্বাধীন ও অস্তিত্বশীল এক মানবপ্রজাতি। শতাব্দীর অভিশাপে ব্যক্তিমন সংক্রামিত হয়েছে বিচ্ছিন্নতায়―এ কথা যেমন সত্য, তেমনি মিথ্যা নয় বিচ্ছিন্নতা থেকে মুক্তিপ্রত্যাশী ব্যক্তি-মানুষের দুর্মর আকাক্সক্ষা। সময় ও সমাজ যতই বিক্ষত করুক মানুষের সত্তা, তবু তার বিশ্ববীক্ষায় যেহেতু রয়েছে আত্মগত অনুভবকে বিশ্বগত ঐক্যে মেলানোর বাসনা, তাই এক সময় মানুষের সেই বিশ্ববীক্ষাই নির্মাণ করে সংলগ্নতার ঐকতান।
বিচ্ছিন্নতার সর্বগ্রাসী সংক্রাম থাকা সত্ত্বেও সত্তর দশকের কবিতায় আমরা একই সঙ্গে লক্ষ করি বিচ্ছিন্নতা থেকে মুক্তির আকুল আকাক্সক্ষার কথা, নৈঃসঙ্গ্যের যন্ত্রণা থেকে জেগে ওঠার অনেকান্ত বাসনার কথা। নীরক্ত মানুষের ক্লান্তি আর ছিন্নমূল প্রাণের উৎকেন্দ্রে নিঃসঙ্গ মানুষের যন্ত্রণা থেকে মুক্তির অভিলাষে সত্তরের কবিরা প্রায়ই অবগাহন করেন সংঘশক্তির অর্ণবে, তুলে আনেন সেখান থেকে প্রবহমানতা আর প্রত্যয় আর প্রত্যাশার অফুরান শক্তি-উৎস। সংঘশক্তির মতো আন্তঃমানবিক সম্পর্কবন্ধনও নিঃসঙ্গতা থেকে মুক্তির অন্যতম উৎস। সত্তরের কবিদের রচনায় এই আন্তঃমানবিক সম্পর্কের জন্য প্রবল আকুতিও আমনা শুনতে পাই। মানুষের সংস্পর্শে এসে কবি হয়ে ওঠেন সুস্থির, জনতার নেতাও কখনও কখনও তাঁর কাছে হয়ে ওঠেন চিরায়ত সন্দীপন উৎস। সত্তরের কবিতায় আমরা উপর্যুক্ত প্রবণতার উপস্থিতি বিশেষভাবে লক্ষ করি। প্রেম এবং প্রকৃতির সান্নিধ্যেও তাঁদের অবিরত যাতায়াত―প্রেমের সান্নিধ্যে তাঁরা বীজ থেকে নতুন সৃষ্টির মতো হতে চান উন্মীলিত। বিচ্ছিন্নতার সংক্রাম থেকে মুক্তির উপায় হিসেবে কবি কখনও কখনও বিচরণ করেন প্রকৃতিলোকে, সেখান থেকে তুলে আনেন প্রত্যয় আর প্রত্যাশা আর শুশ্রƒষার অবারিত উৎস। সত্তরের কবিদের পঙ্ক্তিস্রোতে আমরা এ প্রবণতা বিশেষভাবে লক্ষ করি।
কালের বৈনাশিকতায় সত্তরের কবিদের শরীরে ও সত্তায় নৈঃসঙ্গ্যচেতনার স্পর্শ লাগলেও, তাঁরা মূলত প্রগতিচেতনার শব্দশিল্পী। নিঃসঙ্গতার সর্বগ্রাসী যন্ত্রণা থেকে মুক্তির আর্তির মধ্যেই তাঁদের এই প্রগতিচিন্তার পরিচয় বিধৃত। সত্তরের কবিতা, পূর্ববর্তী কাব্যধারা থেকে, এ সূত্রেই স্বতন্ত্র ও ভিন্নতা-নির্দেশক।
৩.
আশির দশকে এসে বাংলাদেশের কবিতা নতুন বাঁকে দিক পরিবর্তন করে। এ সময়খণ্ডে একদল নতুন কবির আবির্ভাব ঘটল, যাঁরা সম্মিলিত সাধনায় সামাজিক ও রাষ্ট্রিক অবস্থাকে কবিতায় ধারণ করতে চেয়েছেন। আশির গোটা দশকটিই ছদ্ম-গণতন্ত্রের নামে সামরিকতন্ত্রের শাসনে ছিল স্তব্ধ ও ম্রিয়মাণ। প্রেম ও রিরংসা এবং তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক ঘটনা আশির কবিতায় প্রায় গৌণ, লোকজ-জীবনের অঙ্গীকারও ততটা প্রবল নয় এ সময়খণ্ডের কবিতায়। এ দশকের কবিরা রাজনীতিতে যে নিস্পৃহ, তা নয়; তবে তাদের প্রকাশরীতিতে আছে এক ধরনের কারসাজি, এবং সে-কারসাজির কারণেই তাঁরা প্রতীকী বর্ণনায় সমধিক আগ্রহী, সমকালকে ধরার জন্য তাঁদের মিথ-পুরাণের জগৎ-বিচরণ। মিথের জগৎ থেকে তাঁরা এমন সব উপাদান তুলে এনেছেন, যা নীরক্ত সমকালকে প্রকাশ করতে পালন করেছে অব্যর্থ ভূমিকা।
আত্মপ্রীতি, দুঃখবোধ আর স্বপ্নপীড়িত বেদনা নিয়ে আশির কবিরা ডুবে থাকতে চেয়েছেন আপন আপন অন্তস্তলে; কিন্তু সংবেদনশীল শিল্পীসত্তা অন্তর্লোকের অতল থেকে তাদের বার বার তুলে এনেছে বহির্লোকের প্রাঙ্গণে। সময়জ্ঞান, ইতিহাসচেতনা, পুরাণস্মরণ এবং মৃত্তিকা-সংলগ্নতার শক্তি দিয়ে আশির কবিরা অতিক্রম করে যান তাঁদের কালের বৈনাশিকতা আর বিভঙ্গতা, সময়ের নষ্ট আক্রোশ। পৌরাণিক উৎস থেকে এ দশকের কবিরা পৌনঃপুনিকভাবে চয়ন করেছেন তাঁদের ভাবনার বীজ, তাঁদের কবিতার অঙ্কুর। এই দশকের কবিদের পুরাণচেতনা সমকাললগ্ন―পুরাণকে পুনর্লিখন না করে এঁরা তা নতুন সৃষ্টির ব্যঞ্জনায় করেছেন অভিষিক্ত। সংরক্ত সমকালের সঙ্গে সংলগ্ন হয়ে আশির কবিদের কবিতায় মিথ-পুরাণ বিকিরণ করেছে নতুন মাত্রা, নবতর ব্যঞ্জনা।
মিথ-পুরাণ মানুষের সামূহিক চৈতন্যেরই এক প্রত্ন-উপাদান। বিখ্যাত মিথ-ব্যাখ্যাতা জোসেফ ক্যাম্পবেল মনে করেন, মানবজীবনের আত্মিক সম্ভাবনার সংকেত চাবি হলো মিথ (Campbell, 1988 : 13)। মিথ মানুষকে করে তোলে অন্তর্মুখী, তাকে পৌঁছে দেয় লক্ষ বছরের অভিজ্ঞতার প্রত্ন-ভুবনে। যুগ যুগ ধরে মানুষ যে সত্যের সন্ধান করে, জীবনের যে অর্থ ও প্রয়োজনীয়তা অনুসন্ধান করে, মিথ কাহিনিতে তা-ই শত ধারায় প্রকাশিত হয়। ক্যাম্পবেল মনে করেন, মিথের অনন্ত গহ্বরে জাগে নির্বাণের স্বর, হতাশার তিমিরে উচ্চারিত হয় রূপান্তরের নিখাদ বাণী, আর আলো ফোটে ঘন অন্ধকার মুহূর্তে (Campbell, 1988 : 46)। মিথ ও পুরাণ সুপ্ত অবস্থায় প্রত্নপ্রতিমারূপে বিরাজ করে মানুষের সামূহিক নির্জ্ঞানে (Frye, 1974 : 240)। ঐতিহ্যের মতো পুরাণও কবিপ্রতিভার জিয়নকাঠির স্পর্শে সমকালের সঙ্গে সংলগ্ন হয়ে বিদ্যুৎদীপ্তিতে হয়ে ওঠে উদ্ভাসিত। পুরাণের স্তরীভূত আবরণে সমকালীন জীবনযন্ত্রণার অভিঘাত তুলে কবি নতুন করে আবিষ্কার করেন মানুষের সুপ্ত সম্ভাবনা।
আধুনিক মানুষ পুরাণ-স্মরণের মাধ্যমে পেতে পারে জীবনের অন্তর্নিহিত অর্থের সন্ধান (Frye, 1974 : 164)। সমকালীন জীবন ও সমাজ-সংগঠনের বিদ্যমান বাস্তবতায় কবি যখন তাঁর অন্তর্গূঢ় অভীপ্সার রূপায়ণ অসম্ভব বলে মনে করেন, তখন তিনি অভীপ্সার প্রতিমান সন্ধান করেন মিথ-পুরাণের ঋদ্ধ ভুবনে। মিথ কবিকে করে তোলে স্বপ্নমুখী, সে-স্বপ্ন ব্যক্তিক নয়, সামষ্টিক। প্রসঙ্গত স্মরণ করা যায় বিল ময়ার্সের সঙ্গে কথোপকথনকালে জোসেফ ক্যাম্পবেলের অভিমত―‘…স্বপ্ন আমাদের সচেতন জীবনের ভরসা―গভীর, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা; আর মিথ আমাদের সমাজের স্বপ্ন। মিথ হলো গণস্বপ্ন, পক্ষান্তরে স্বপ্ন হচ্ছে ব্যক্তিগত মিথ’ (Campbell, 1988 : 49)। গণস্বপ্নের কারণেই দুঃসময়েও মানুষের চেতনায় মিথ জ্বেলে দিতে পারে আশা ও আশ্বাসের প্রদীপ, পরাভবদীর্ণ একজন কবিকে চরম বিপন্নতার মুহূর্তেও করে তুলতে পারে পরম আশাবাদী। আশির কবিরা স্বৈরশাসন-পীড়িত অবরুদ্ধ সময়ে প্রতিবাদীচেতনা প্রকাশের জন্য সঙ্গত কারণেই তাই ডুব দিয়েছেন মিথের অর্ণবে, পুরাণের দূরায়ত অমরাবতীতে।
আশির কবিতার দুটো প্রধান প্রবণতা আধুনিক সময়চেতনা এবং মৃত্তিকামুখী সমাজদৃষ্টি। তাই সত্তরের কবিতা থেকে আশির কবিতা হয়ে গেছে স্বতন্ত্র। সত্তরের কবিরা জীবনকে শিল্পিত করতে গিয়ে প্রধানত নির্ভর করেছেন মাইক্রো-সময়ের ওপর, আশির কবিরা সেখানে ম্যাক্রো-সময়ের বিশাল ডানায় ভর করে দূরায়ত পুরাণের উৎসধারা থেকে জীবনকে তুলে আনেন বর্তমানের সীমানায়। পুরাণ-আশ্রিত সদর্থক এই ইতিহাসবোধ ও সময়জ্ঞান আছে বলেই আশির কবিরা পথভ্রষ্ট হননি, ম্যাক্রো-সময়ের চোখে মানুষকে দেখেছেন বলে জীবনের ওপর কখনও পতিত হয়নি খণ্ডদৃষ্টি। প্রগতিশীল সমাজদৃষ্টি এবং মৃত্তিকামুখী মানবভাবনা আশির কবিতায় পৌনঃপুনিক বিম্বিত হয়েছে। বাসোপযোগী একটা পৃথিবী নির্মাণই এই দশকে আবির্ভূত কবিদের সৃষ্টির পরম অন্বিষ্ট। পরম এই অন্বিষ্টকে বাস্তব রূপ দেবার জন্য আশির প্রধান কবিরা সচেতনভাবে পরিভ্রমণ করেছেন পুরাণের প্রান্তরে। মানুষের অপরাজেয় গৌরবগাথা প্রকাশের জন্য এঁরা পুরাণের প্রাঙ্গণ থেকে সঞ্চয় করেছেন যাবতীয় শক্তি, পার্থের তীর তাঁদের কাছে স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ উচ্চারণে সাহসী করে তুলেছে। দায়বদ্ধতার দাবিতে, আশির কবিদের সৃষ্টিতে, পুরাণ-লোকপুরাণ-ইতিহাস-ঐতিহ্য সবকিছু একাকার হয়ে যায় আশির কবিতায়। নিখিল নাস্তির ভুবনে বাস করেও, সামূহিক বৈনাশিকতার প্রাঙ্গণে বিচরণ করেও আশির কবিরা পুরাণের শক্তি দিয়ে হয়ে ওঠেন ঋদ্ধিমান, তাঁদের কবিতা হয়ে ওঠে বেঁচে থাকার সাহসী মন্ত্র, জয়যাত্রার স্তোত্র।
আশির কবিরা মিথ-পুরাণকে প্রধানত ব্যবহার করেছেন প্রতিরূপক (Allegory) হিসেবে। লিলিয়ান ফেডার যে বলেছেন, বিশ শতকের কবিরা মিথকে কেবল প্রতীকী প্রকাশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখেননি; তাঁরা ব্যাখ্যা করেছেন মিথের জটিল প্রকৃতি এবং নব নব বৈচিত্র্যে তার প্রয়োগ করেছেন সৃষ্টিশীলতার ক্ষেত্রে (Fader, 1973 : 117)―আশির কবিদের মিথ-পুরাণ ব্যবহার এ অভিমতকেই যেন প্রতিষ্ঠিত করে। আশির কবিরা মানুষের সামূহিক নির্জ্ঞানের জগৎ থেকে উপাদান সংগ্রহ করে তাকে করে তুলেছেন সমকালস্পর্শী ও সর্বজনীন। আশির কবিদের হাতে মিথ-পুরাণ নতুন সৃষ্টির ব্যঞ্জনায় অভিষিক্ত হয়ে বিকিরণ করেছে নতুন মাত্রা।
৪.
ভাষা-আন্দোলন, উপনিবেশবিরোধী সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধ-উত্তর দেশ-কালের সামূহিক প্রবণতা, অগ্রগতি -পশ্চাৎগতি―এই সব গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস ও কালিক সঙ্কটকে অঙ্গীকার করে বাংলাদেশের নব্বইয়ের কবিদের দীপ্র আবির্ভাব। পূর্বসূরি কবিদের অস্বীকার করে নয়, বরং তাঁদের সাধনার সারাৎসার আত্তীকরণ করেই নব্বইয়ের কবিরা নির্মাণ করতে চেয়েছেন কবিতার নতুন এক কক্ষপথ। এক দশকের নিরন্তর সাধনায়, সম্মিলিত মেধায়, বাংলাদেশের কবিতায় তাঁরা যে নতুন এক মাত্রা সংযোজন করেছেন, আজ তা স্বীকার করতেই হয়। তাঁদের অর্জন এখনও পূর্ণতার কোনও ধারণা হয়তো দেয় না, কে কোথায় গিয়ে কীভাবে থামবেন তা ভবিষ্যৎই জানে; তবু বলতে দ্বিধা নেই, নব্বইয়ের কবিরা নতুন এক কবিতা-বিশ্বের স্বপ্নে যে বিভোর, তা তাঁদের শব্দশরীরে স্পষ্টই উৎকীর্ণ। কবিতার বিষয় ও আত্মিক উভয় দৃষ্টিকোণেই নব্বইয়ের কবিদের সম্পর্কে এ কথা বলা যায়।
বাংলাদেশের নব্বইয়ের কবিতা মূলত মেধা মনন ও আত্মোপলব্ধির কবিতা। আবেগ আর মননের মিথস্ক্রিয়ায় বাংলাদেশের নব্বইয়ের কবিতা, প্রকৃত প্রস্তাবেই, সত্তর-আশির কবিতা থেকে একেবারে ভিন্ন হয়ে গেছে। আত্মোপলব্ধি ও দার্শনিক মননশীলতায় নব্বইয়ের কবিতা সৃষ্টি করেছে, আমাদের কবিতার ধারায়, নতুন এক মেজাজ। এই মেজাজকে ধরতে হলে কবিকে সমাজের মতো ‘অবজেক্ট’ হিসেবে নয়, দেখতে হবে ‘সাবজেক্ট’ রূপে। কবির কণ্ঠে, সত্তরের মতো, যৌথ-শব্দস্রোতে সম্মিলিত চরণসজ্জায় কিংবা আশির মতো মিথের ব্যাক-প্রোজেকশনে কেবল কালের কথা উঠে আসে না; কবিতা এখন হয়ে ওঠে কবির আত্ম-অনুভূতি ও সত্তা-উপলব্ধির ব্যঞ্জনাগর্ভ স্বরগ্রাম। এই নিরীক্ষা, এই বৈশিষ্ট্যই, বোধ করি, নব্বইয়ের প্রধান স্বাতন্ত্র্য।
ইতিহাসচেতনা ও সময়ধারণা নব্বইয়ের কবিতাকে এনে দিয়েছে নতুন মাত্রা। নষ্ট সময়কে অতিক্রম করার জন্যে নব্বই-দশকী কবিরা ঋদ্ধ ইতিহাস ও ম্যাক্রো-সময়ের আশ্রয় নিয়েছেন―ম্যাক্রো-সময়ের বিশাল ক্যানভাস তাঁদের দিয়েছে স্থিত হয়ে ওঠার জল-মাটি-আকাশ। ইতিহাস আর সময়ের অঙ্গীকার থাকার ফলে নব্বই আলাদা হয়ে যায় না পূর্ববর্তী কাল থেকে, কিংবা থেমে থাকে না কেবল নব্বইয়ের সীমানায়―সীমানা ছাড়িয়ে তা প্রসারিত থাকতে চায় আবহমান সময়-পরিধিতে। নব্বইয়ের কবিতার এই ব্যাপ্তিচেতনা, সন্দেহ নেই, বাংলাদেশের কবিতার ধারায় এনে দেয় নতুন আইডেনটিটি, নবতর পরিচিতি। ম্যাক্রো-সময় নব্বইয়ের কবিদের উদ্বুদ্ধ করেছে পূর্ণ-জীবন অনুধ্যানে; ষাট বা সত্তরের মাইক্রো-সময় নিয়ত যে খণ্ডতার আরাধনায় উন্মুখ থাকে, নব্বইয়ের ম্যাক্রো-সময় সেখান থেকে নতুন কবিদের নিয়ে যায় উজ্জ্বল উদ্ধারের আলোতে, মৃত্তিকায় আর শালবনের দীর্ঘ পাতার আয়ত আশ্রয়ে, বাংলার লোকজীবনের স্মৃতিময়-শ্রুতিময় আঙিনায়।
আশিতে মিথের যে নবযাত্রা শুরু হয়েছিল বাংলাদেশের কবিতায়, নব্বইতে এসে তা নতুন মাত্রা অর্জন করল। মিথের ব্যবহার এখন ক্রমশই সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর হতে থাকল; মিথের অবভাসে জীবন প্রতিচিত্রিত হলো বিনির্মাণের ব্যঞ্জনা নিয়ে। আলোচ্য দশকের কবিদের পঙ্ক্তিমালায় মিথ প্রচ্ছন্ন থাকে গভীরতর অন্তর্মুখীনতায়, কখনও তা হয়ে ওঠে সমকালীন কোনও অনুষঙ্গের দীপ্তিময় প্রতীক, কখনও-বা স্মৃতিসত্তার আলোকিত উদ্ভাসন-উৎস। মিথের অনুষঙ্গ এখন আর ‘খালি চোখে’ দেখা যায় না, তার জন্য চাই ‘মেধাবী চোখ’―কারণ এ দশকে মিথ চূর্ণ থেকে ক্রমশই হয়েছে বিচূর্ণিত। মিথের মধ্যে লুকিয়ে থাকে যে প্রত্নস্মৃতি, এ দশকের কবিরা সমকালীন জীবনের সঙ্গে সেই স্মৃতিকে জড়িয়ে নির্মাণ করেন বর্তমান আর দূরাগত ভবিষ্যৎ।
নৈতিক মূল্যচেতনা, অধ্যাত্মবিশ্বাস ও বৌদ্ধিক নান্দনিকতা নব্বইয়ের কবিতার বিশিষ্ট লক্ষণ। নৈতিক মূল্যচেতনার পরিকাঠামোতে কখনও শিল্পিত হয়েছে শুদ্ধাচারী কোনও কবির আত্মউপলব্ধির ধর্মদর্শন। এই ধর্মদর্শনের অন্তরালেই উদ্ভাসিত হয় নবীন কোনও কবির ব্যক্তি-অস্তিত্বের দ্বান্দ্বিক উত্তরণ। বিজ্ঞানসৃষ্টি, উত্তর-আধুনিক শিল্পধারণা, অস্তিচেতনা, নৈঃসঙ্গ্যবোধ, ক্ষয়িষ্ণু নগরচেতনা, ফ্রয়েডীয় মনোবিকলন, নস্টালজিয়া, লোক-ঐতিহ্যের পুনর্নির্মাণ―এই সব কুললক্ষণেও নব্বইয়ের কবিতা বিশিষ্ট।
৫.
সূচনাসূত্রেই ব্যক্ত হয়েছে যে, বর্তমান আলোচনায় আমরা তিন দশকের কবিতার তিনটি ধারা সম্পর্কে আমাদের কথা সীমাবদ্ধ রাখব। এখানে বাংলাদেশের কবিতা সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ কোনও ধারণা পাওয়া যাবে না, এবং সে-চেষ্টাও করা হয়নি। তবে আমাদের ধারণা উল্লিখিত ত্রিধারার মাঝেই খুঁজে পাওয়া সম্ভব বাংলাদেশের কবিতার অনুক্ত সব প্রবণতা ও চারিত্র্য।
নির্বাচিত গ্রন্থপঞ্জি
Ephraim H. Mizruchi, ‘An Introduction to the Notion of Alienation’ in Frank Johnson (ed.), Alienation : Concept, Term and Meaning (New York : Seminar Press, 1973).
Joseph Campbell, The Power of Myth (New York : Doubleday, 1988).
Lillian Fader, Ancient Myth in Modern Poetry (New Jersey: Gateway, 1973).
Northrop Frye, ‘The Archetypes of Literature’ in Twentieth Century Criticism : The Major Statements (Editor: William Handy & Max Westbrook, New Delhi : Oxford, 1974).
সচিত্রকরণ : রজত



