আর্কাইভগল্প

গল্পের স্বর : সূর্যের ছায়া : মঈন শেখ

টাকাপোড়া গ্রাম। জেলা যখন রাজবাড়ি তখন রাজ-রাজাদের রমরমা একদিন যে ছিল তা বলা যায়। টাকাপয়সার ঝনঝনানি থাকবে এটাই স্বাভাবিক। তবে ঐ গ্রামে কোনওদিন টাকার স্তূপ পুড়েছিল কি না সে কথা কেউ জানে না। কেন গ্রামের নাম টাকাপোড়া হল তা কেউ জানে না। এ বিষয়ে মাথা যে কেউ ঘামায়নি তাও নয়। তবে হদিস করতে পারেনি। যা পারে তা ভাসা ভাসা। তবে এখন হঠাৎ একটা কথা জাগন্ত হয়ে উঠল। টাকাপোড়া গ্রামের এক বৃদ্ধ হঠাৎ বলল―এটা কপাল-পোড়া গ্রাম। লোকটার কথা শুনে কেউ কেউ থমকে গেল। এর ওর মুখের দিকে তাকাল কেউ কেউ। কেউ কিছু বুঝল, কেউ আবার কিছুই বুঝল না। কেউ আবার বুঝতে চেষ্টাও করল না। তবে দুই একজন তাকিয়ে থাকল সেই বৃদ্ধের দিকে। আবার কেউ মনোদৃষ্টিতে তাকাল তোফাজ্জলের দিকে; তোফাজ্জলের কপালের দিকে। সত্যিই তোফাজ্জলের কপালে এখন শত শত পোড়াচিহ্ন।

সাগর আর নুশমি ভাই-বোন। সাগর বড়। বোন ছোট। পিঠাপিঠিও বলা চলে। নুশমি সাগরের বেশ গা-লাগা। মাঝে মাঝে ভাইবোনে ঠোকাঠুকি হলেও নুশমি সাগরের পিছু ছাড়ে না। ভাই-ন্যাওটা বোন। ভাই এখন কাছে থাকে না। দূরের শহরে থাকে। রাজধানী শহরে। নুশমির মনে ভাই না থাকার কষ্ট থাকলেও, একটা গর্ব পুষে রাখে। ভাই রাজধানীতে থাকে। মিরপুর সরকারি বাঙলা কলেজে অনার্সে পড়ে। আর কদিন বাদে তাকেও নিয়ে যাবে। কোচিং করাবে। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়েই ছাড়বে। ভাইয়ের খুব ইচ্ছা ছিল, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে পড়বার। পারেনি। নুশমিকে দিয়ে সেই সাধ মিটাবে। নুশমি ঘাসফড়িংয়ের মতো এ পাড়া ও পাড়া ঘোরে আর একে ওকে বলে বেড়ায় ভাইয়ের স্বপ্নের কথা। নুশমির কথা শুনে কেউ নাক সিটকায়, কেউ হাসে। নুশমি মনে মনে রাগে। বলে―তোমরা যতই হাসো কদিন পরেই টের পাবে, আমি নেই। ঠিকই চলে গেছি ঢাকা।

মন দিয়ে পড়ে নুশমি। যতটা নিজের জন্য তার অধিক ভাইয়ের জন্য। ভাইয়ের মুখ রক্ষা করতেই হবে। দরিদ্র বাবা মেয়েকে শহরে ভর্তি করাতে পারেননি। বেশ টানা-হেঁচড়া হয় সংসার চালাতে। তাই নুশমিকে দিয়েছেন গ্রামেরই এক কলেজে।

বারান্দায় খেতে বসেছে চারজন। সাগর, নুশমি আর বাবা-মা। সাগর গতকাল এসেছে ঢাকা থেকে। সাগর এভাবে সাধারণত আসে না। আসে দুই ঈদে। বাবা টাকা দিতে পারে না। প্রথম দুই তিন মাস দিলেও এখন আর দেয় না। দিতে পারে না। সাগর টিউশনি করে। এখন আবার পার্টটাইম একটা কাজ ধরেছে। ইচ্ছা করলেও আসতে পারে না। আজ হঠাৎ এল কোনও খবর না দিয়ে। মা-বাবা কিছুটা অবাক হয়েছে এতে। খুশি হয়েছে নুশমি।

বাড়ির লাল মোরগটা জবেহ করেছে আজ। সাগরের নিষেধ ছিল মোরগটা জবেহ করতে। বাড়িতে বড় মানানসই ছিল মোরগটা। কানে দুল দিয়ে দিয়েছিল নুশমি। এতে মোরগটাও খুব দেমাগি হয়েছিল। হাঁটত দুল ঝুঁকিয়ে ঝুঁকিয়ে। সাগর বাড়িতে এলে অনেকক্ষণ গোলাপি বেগম তাকিয়ে ছিলেন সাগরের মুখের দিকে। চোয়ালটা কেমন জেগে উঠেছে। মুখটা বেশ শুকনা। যেন কতদিন ছেলে তার ভালোমন্দ কিছুই খায়নি। মা বলেছিলেন―বাবা তুমি অনেক শুকিয়ে গেছ। সাগর এর উত্তরে কিছু বলেনি, তবে মুচকি হেসেছিল। নুশমি আর গোলাপি যুক্তি করে মোরগটা জবেহ করেছে। মা ছেলেকে আর বোন ভাইকে মোরগের মাংস খাওয়াবে। সাগর এ নিয়ে কিছু বললে কী উত্তর দিবে তাও ঠিক করে রেখেছে মা-মেয়ে।

স্বামী তোফাজ্জল ও ছেলে-মেয়ের প্লেটে গরম ভাত তুলে দিচ্ছেন গোলাপি। মাংসও তুলে দিলেন। নুশমি ও সাগরের প্লেটে দিলেন দুই রান। তোফাজ্জলের পাতে অন্য মাংস। সাগর অবাক হয়ে মায়ের মুখের দিকে তাকায়।―মা এটা কীসের মাংস ?

মোরগের। কিছুটা দ্বিধা নিয়ে বলেন মা।

মানে ? আমাদের মোরগটা জবেহ করেছ ?

আর বলিস না বাবা, মোরগটা ভিন্ন পাড়াতে যায়। মাঝে মাঝে বাড়িতেও আসে না। কে কখন খেয়ে নেয় তার ঠিক আছে। তার চেয়ে আমরাই খাই।

তাই বলে এটা ?

চোখ বুজে খা তো। মোরগ তো আরও আছে। সেখান থেকে একটা রেখে দিব। সাগর আর কথা বলল না। সে নুশমির দিকে তাকাল। সাগর ভেবেছিল নুশমি তার পক্ষ নিবে। কিন্তু নুশমির দিকে তাকিয়ে দেখে, সে মিনি বিড়ালের মত হাসছে। তার বুঝতে বাকি থাকে না, মা-মেয়ে মিলে এমনটি করেছে। সাগর প্লেটে হাত দিতেই নুশমি একটা কাণ্ড করল। তার প্লেট থেকে মোরগের রানটা তুলে সাগরের প্লেটে দিল।―ভাইয়া তুমি এটা খাও। সাগরের বুক হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল। চোখে বোধহয় পানিও এল। সেটা বুঝতে দিল না কাউকে। বরং খেঁকিয়ে উঠল নুশমির দিকে তাকিয়ে।―সব আমি গিলব না। মারব এক থাপ্পর। ঠিক হয়ে খা বলছি। বলেই রানটা আবার নুশমির পাতে ফিরিয়ে দিল।

ভাইয়া তোমার শরীরটা বেশ শুকিয়ে গেছে। চোখ-মুখ কালো হয়ে গেছে। তোমার একটু বেশি বেশি খাওয়া দরকার। কাঁদো কাঁদো মুখে বলল নুশমি।

হ্যাঁ, শরীর তো আমারই শুকিয়ে গেছে। তোর শরীর ধুমধুম করছে ? বেশি পাকামি করবি না, ঠিক হয়ে খা। বাবা মা, ভাই-বোনের এসব দেখে মনে মনে হাসে। তারা কিছু বলে না। সাগর তখনও মুখে ভাত তোলেনি। প্লেট থেকে ভাপ উঠছে। সাগর বাবার মুখের দিকে তাকায়। ভাতের ভাপে বাবার মুখ ঝাপসা দেখে। তবু তাকিয়ে থাকে সাগর। আজ দুপুরে ভালো করে খেয়াল করেছে বাপকে। রোদে পুড়ে বাপ তখন বাড়িতে ঢুকছিল। কালো ঘামার্ত শরীর তখন তামাটে। মাঠের আগুনে রোদের সঙ্গে ধ্বস্তাধ্বস্তি করে একটু জিরিয়ে নিতেই যেন বাড়িতে এল বাপ। আবার লড়াই হবে খানিক বাদে। রোদকে হারাতে পারলে তবেই না সোনা-ফসল ঘরে উঠবে। জোগাড় হবে বোনের পড়ার খরচ। শোধ হবে মুদি দোকানের বাকি, সারের দোকানের হালখাতা।―ও বাজান মুখে ভাত তোলো। পাতের ভাত নিয়ে এভাবে বসে থাকতে নেই। মায়ের কথাতে নড়ে উঠে সাগর। ভুলেই গিয়েছিল সে এখন সবার সঙ্গে দুপুরে খেতে বসেছে। ভাপ-ওঠা ভাত তখন কিছুটা ঠান্ডা। এতে বাপের মুখ আর ঝাপসা নেই। তোফাজ্জলের প্লেটের ভাত অর্ধেক প্রায় শেষ। তার তাড়া আছে। আবার মাঠে যেতে হবে। এই ফাঁকে সাগর তার প্লেট হতে রানটা তুলে বাবার পাতে দিয়ে দিল। চমকে উঠে তোফাজ্জল―আরে বাজান কী করো কী করো ? তুমি খাও তুমি খাও। ছেলের পাতে আবার রানটা তুলে দেন।

কেন, তুমি খেলে পাপ হবে ? সাগরের কথার মধ্যে একটা ক্ষোভ ফুটে উঠল।

আরে বাজান, তোমার এখন পড়াশোনার মেলা চাপ। ভালো ভালো খাওয়া দরকার। আমার বুড়া হাড়ে খেলেই কি না খেলেই কি ?

বেশি কথা বলবা না, তোমার আরও বেশি দরকার। মাঠে হাড়ভাঙা খাটো। ছেলের কথাতে না হেসে পারেন না। সে বাধ্য হয়ে রান থেকে এক চিমটি তুলে মুখে দেন।―এই হলো তো ? এবার তুমি খাও। তোফাজ্জল রানটা তুলে আবার ছেলের পাতে দেন। তবে ছেলের মুখের দিকে তাকাতে সাহস হলো না। এবার সাগর আর আপত্তি করল না। আরও কিছুক্ষণ বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল। বাবার কালো মুখে কালো দাড়ি। দাড়ির ফাঁক-ফোঁকর দিয়ে দেখা যায় শক্ত চোয়াল। গলার দুই পাশের দুই সৌন্দর্য-হাড় বেশ খানিকটা ওপরে ভেসে আছে। তাতে তৈরি দুই গর্তে দুটো কাপ রাখলেও যেন পড়বে না। ভাত গিলবার সময় গর্তটা আরও ফুটে উঠছে। কানের গর্তে তখনও কাদা। কাদা শুকিয়ে এখন সাদা হয়ে ফুটে উঠেছে। যেন আলো ছড়ায় ফোঁকর থেকে। ভেতরটা কেমন মোচড় দিয়ে উঠল সাগরের। ভাত খেতে গিয়েও পারছে না। গলাটা বড় শুকনো। গোলাপি বেগম তখন সেখানে ছিলেন না। রান্নাঘরে কী কাজে গেছেন। বাবার মুখের দিকে আবারও তাকাল সাগর।―বাবা তোমাকে আর রোদে পুড়তে দেব না। এই তো আর কটা দিন। পড়া শেষ করেই একটা না একটা চাকরি ঠিকই পেয়ে যাব। তখন তোমাকে আর রোদে পুড়তে হবে না। তোফাজ্জল এবার তাকিয়ে থাকে ছেলের দিকে। হাসে। এ কথা এর আগেও বলেছে সাগর। বাবার এমন হাড়ভাঙ্গা খাটুনি তার পছন্দ নয়। তবে নিষেধও করতে পারে না। সে টাকা না নিলেও সংসার তো চালাতে হবে। তোফাজ্জল ছেলের মাথায় বাম হাতটা রেখে হেসে বলে―না বাজান, যেনতেন চাকরি পেলে হবে না। তুমি না বলতে বিসিএস দিবে ? বড় চাকরি করবে ? আমার টাকা লাগবে না বাজান, সবাই যখন তোমাকে স্যার স্যার বলে ডাকবে, তখনই আমার সকল কষ্ট দূর হবে।

অবশ্যই বিসিএস দিব বাবা। তুমি দোয়া করো।

দোয়া করি বাজান, প্রাণ খুলে দোয়া করি। ছেলের মাথায় আবারও হাতটা তুলে দেন তোফাজ্জল। এবার পাশ থেকে নুশমি বাবার হাতটা জোর করে টেনে নিয়ে নিজের মাথায় রাখে। বলে―বাবা আমাকেও দোয়া করো। আমিও বড় চাকরি করব। তখন  গোলাপি বেগম এসেছেন। মা-বাবা দুজনেই হোহো করে হেসে উঠলেন।―হ্যাঁ মা তোকেও দোয়া করি। তুই অনেক বড় অফিসার হবি।

হবই তো। ভাইয়ার থেকেও বড় অফিসার হব। তবে এখনই একটা কথা দাও বাবা। আমাকে তাড়াতাড়ি বিয়ে দিতে পারবে না। আমি বড় চাকরি করে অনেক দিন তোমার বাড়িতে থাকব। আমি আর ভাইয়া মিলে তোমাকে বাবু বানাব। আর রোদে পুড়তে দিব না।

হ্যাঁ বাবা, নুশমি ঠিকই বলেছে। তোমাকে আর রোদে পুড়তে দেব না। সাগরের এবারের কথাতে হাসতে পারলেন না তোফাজ্জল। চোখ ভিজে এল। গোলাপিও চোখ ঢাকলেন আঁচলে।

কদিন থেকে তোফাজ্জলের মন ভালো নেই। মন ভালো নেই নুশমি আর তার মায়েরও। সারা দেশ এখন উত্তাল। চলছে ছাত্রদের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন। রংপুরের আবু সাইদকে দেখেছেন, কীভাবে বুক পেতে মরল। এই কদিনে আরও অনেক মারা গেছে বিভিন্ন সংঘর্ষে। ছেলের সঙ্গে কথাও হয় না ঠিক মতো। কখনও হলেও দু-এক মিনিট। কোনওদিন হয়ও না। চারদিকের বাতাস বেশ ভারী; আঠালো। বুক ভরে নিলেও বুক পাতলা হয় না। আবার বুক খালি করে ছাড়লেও যেন পরের বার ঐ বাতাসই ফিরতি হয়ে ফিরে আসে। বাতাসের ঘাটতি পড়ে বুকে। পনের দিন আগেই ছেলেটা এসেছিল। তোফাজ্জল এখন ভাবেন, তখন সাগরকে না যেতে দিলেই ভালো হতো। আবার মনে প্রবোধ দেয়, নিষেধ করলেও সাগর শুনত না। এমনই সাত পাঁচ ভাবছিলেন তোফাজ্জল। আজ জুম্মাবার। জুম্মার নামাজে অনেক কেঁদেছেন ছেলের জন্য। ছেলে যেন ভালোভাবে তার বুকে ফিরে আসে।

তখন বিকেল। গাছের নিচে বসে আছেন তোফাজ্জল। মোবাইলে সময় দেখলেন, সাড়ে পাঁচটা বাজে। আর তখনই ফোনটা বেজে উঠল। সাগরের ফোন। লাফ দিয়ে দাঁড়ালেন তিনি। বসে থাকলেও পারতেন। কেন দাঁড়ালেন তিনিই জানেন। ফোন কানে ধরতেই ওপাশ থেকে সাগর সালাম দিল। জিজ্ঞেস করল তুমি কেমন আছো, মা নুশমি কেমন আছো ? সাগরের কণ্ঠে যেন অস্থিরতা।―সবাই ভালো আছে বাজান, তুমি কেমন আছো ?

ভালো আছি বাবা, তোমরা চিন্তা কোরো না। আর পারলে এক হাজার টাকা বিকাশ কর।

হ্যাঁ বাজান, এখনই করছি। ওপাশ থেকে ফোন কেটে গেল। তোফাজ্জল আরও কিছু বলতেন। বলা হল না। তবে বিন্দু পরিমাণ দেরিও করলেন না। ছুটে গেলেন বাড়ির ভেতরে। এক হাজার টাকা নিয়েই ছুটলেন নারুয়া বাজারে। নিশ্চয়ই ছেলের টাকার দরকার খুবই। না হলে সে কখনই টাকা চাবে না। বরং মাঝে মধ্যে কিছু কিছু টাকা সে বাবাকে দিত। কোনও একদিন মায়ের কাছে টাকা না পেয়ে সাগর অভিমান করে বলেছিল―বাবাকে বলে দিও, আর কোনওদিন তোমাদের কাছ থেকে টাকা নিব না। আর নেয়ওনি। সেই দিনের ভুলে থাকা কথাও তোফাজ্জলের মনে পড়ল আজ। টাকা পাঠিয়ে আবার সময় দেখল। তখন বিকাল ছটা। না, টাকা পাঠাতে খুব দেরি হয়নি।

বাবার মন বড় অস্থির। মন মানল না। আবার ফোন দিলেন। ছেলে রাগ করলে করুক। অন্তত এটুকু জিজ্ঞাসা করুক, টাকাটা পেল কি না। না, ফোন বেজে বেজে বন্ধ হয়ে গেল। অস্থিরতা আরও বাড়ে। আবার ফোন দেন। আবার বেজে বেজে থেমে যায়। কয়েকবার ফোন দিলেন তোফাজ্জল। কিন্তু ওপাশ থেকে কেউ ফোন ধরল না। ডানে বামে তাকালেন এবার। কেউ পাশে থাকলে তার কাঁধে ভর দেবেন। না কেউ নেই। পেছনে তাকালেন কোনও খুঁটি বা গাছ পেলে হেলান দেবেন। না, সেটাও নেই। পড়ে যাবার আগেই বসে পড়লেন তোফাজ্জল। নির্বাক থাকলেন দশ মিনিট। এরই মাঝে দুই একজন তার পাশে এসেছে। দশ মিনিটে তোফাজ্জল কত কী যে ভাবলেন তা তিনিই জানেন। ছেলের জন্মদিনের আজান থেকে আজকের এই ফোন পর্যন্ত সব মুখস্ত নামতার মতো পড়ে ফেললেন নিমিষেই। একুশ বছর কতই না ছোট্ট সময়। দশ মিনিটেই পড়া যায়। না কাউকে ফোনটা দিয়ে বললেন না, সাগরকে একটা ফোন দিতে। শক্ত করলেন নিজেকে। নিজেকে ধমকালেনও। কী সব বাজে কথা ভাবছে তোফাজ্জল। সে নিজেই ফোন দেবে। এবার নিশ্চয়ই ধরবে সাগর। ফোন দিলেন। বাজল। দ্রুত ওপাশ থেকে রিসিভ হলো। তবে অচেনা কণ্ঠ। না না, সাগরেরই কণ্ঠ। কোথাও ভুল হচ্ছে তোফাজ্জলের। যত অশুভ কথার ভিড়ে নিজ ছেলের কণ্ঠও ভুলে গেলেন।―হ্যাঁ বাজান, টাকা পেয়েছ ?

না আঙ্কেল, আমি। সাগরের বন্ধু।

কী হয়েছে! কী হয়েছে আমার সাগরের!

আঙ্কেল শক্ত হন।

আমি অনেক অনেক শক্ত মানুষ বাবা, বলো কী হয়েছে আমার সাগরের ? নিশ্চয়ই গুলি লেগেছে ?

হ্যাঁ আঙ্কেল। সাগর আর নেই। সে মারা গেছে। ততক্ষণে অনেক মানুুষ জুটে গেছে সেখানে। দুপাশে দুজন ধরে আছে তোফাজ্জলকে। কারও মুখেই কোন সান্ত্বনার বাণী নেই। সবাই তখন তোফাজ্জল।

গোলাপি বেগম ছেলেকে নিয়ে যে এত কথা তার ছোট বুকটার মধ্যে লুকিয়ে রেখেছিলেন কে জানত। ছেলের চাওয়া না পাওয়া, মান-অভিমান, বোনকে নিয়ে স্বপ্ন আর বাড়ির দুঃখপাখিগুলোকে তাড়িয়ে সুখপাখি নিয়ে আসার স্বপ্ন; সব বলছেন একে ওকে ধরে। বলছেন মাতমের সুরে। বুক চাপড়ান। কোনও সান্ত্বনাই তার কাছে টেকে না। গাছ পাখি পশু সবাই সেখানে নির্বাক। পাখিরা যেন পালিয়েছে দূর দেশে। ভাষা হারিয়েছে তারা। ভাষা হারালে আর টেকা যায় না। মানুষ যদিও টেকে। তারা তো মানুষ নয়। থামছে না নুশমির কান্না। কান্না নয়, যেন বলছে ভাইকে নিয়ে তার শৈশব আর কৈশোরের সব গল্প। বলছে তাকে নিয়ে ভাইয়ের স্বপ্নগুলো। আবার হঠাৎ করে চুপ হয়ে যায় নুশমি। আর তখনই ক্ষরণ হয় বুকের মধ্যে। ক্ষরণের স্রোতধারা যেন বলে―তোর আর ঘুরতে বের হওয়া হবে না, এ পাড়া ও পাড়া। বলা হবে না ভাইকে নিয়ে অহংকারের কথা, বলা হবে না কদিন বাদেই ঢাকা যাবার কথা। কিন্তু এর আগেই তো বলে ফেলেছে অনেক কথা। সেগুলো মুছবে কী করে ?

গোলাপি বেগমের  গলা তখন কিনকিনে। কান্না আসে না। মূর্ছা যান বারবার। তোফাজ্জল এখন আর বেশি কথা বলছেন না। অনেকটাই পাথর। কেউ আবার জোর করে কাঁদাবার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। অনেকেই ভাবে, লোকটা বোধহয় পাগল হয়ে যাবেন। তার পাগলামি অনেকেই দেখেছে কবর কাটার সময়। তিন তিনবার স্থান বদলিয়েছেন তোফাজ্জল। তার একটাই কথা, কবরে যেন সব সময় ছায়া থাকে। কবর যেন রোদে না পোড়ে। তার বাজানের শরীরের তাপ লাগবে। বাজান যে সব সময় বলে এসেছিল―বাবা তোমাকে রোদে পুড়তে দিব না। আজ বাপ হয়ে সন্তানকে কী করে পুড়তে দিতে পারি। অবশেষে দুই গাছের নিচেই কবর হয়েছিল।

তোফাজ্জল এখন আবার মাঠে যায়। নুশমি যায় পড়তে। তার প্রতিজ্ঞা একটাই, ভাইয়ের স্বপ্ন তাকে পূরণ করতেই হবে। গোলাপি বেগমও রান্নাঘরে যান। তবে তরকারিতে এটা ওটা দিতে ভুলে যান কখনও কখনও। ভাতে পানি না দিয়েও জ¦াল দেন। শুধু পরিবারে শক্ত হয়ে থাকলেন একজন। পাথুরে শক্ত। শক্ত মানুষটা আবার মাঠে যান। জমির আলে খালি পায়ে শব্দ করে হাঁটেন। দেখে বা না দেখে শামুকের ওপরও পা দেন। কখনও কাটে কখনও কাটে না। রক্ত আর ভীত করে না তাকে। অনেক রক্ত দেখে ফেলেছেন এর আগেই। তাজা রক্ত মরা রক্ত। সাগরের বুকে যে তখন ছিল রক্তের মহাসাগর। চোখের সামনে বাড়িপোড়া দেখা মানুষের কাছে বাতির আগুন রাতের জোনাকি। ছুঁলেও তাপ লাগে না।

জমির আলে হাঁটছেন তোফাজ্জল। খালি পা খালি গা। আজ একটু ভালো লাগছে তাকে। তিনি সাগরকে বলেছিলেন, বড় অফিসার হতে। সবাই তার ছেলেকে স্যার স্যার করে ডাকবে। এখন বড় বড় স্যার তার বাড়িতেই আসছেন। বালিয়াকান্দি থেকে ইউএনও স্যার, ওসি স্যার; আরও কত স্যার আসছেন তাদের খোঁজখবর নিতে। আসছেন সাংবাদিক। চোখের সামনে ভাসে পোড়াগ্রাম ঈদগা মাঠের সেই দৃশ্য। সাগরের জানাজায় হাজার হাজার মানুষ। অনেক জানাজায় গেছেন এই জীবনে, এমন জনস্রোত এর আগে কখনই দেখেননি তোফাজ্জল। ছেলে তার বেহেস্তে আছে; বেহেস্তের পাখি হয়ে। কী মনে হয়ে তোফাজ্জলও দুই হাত প্রসারিত করে আকাশের দিকে তাকালেন। সূর্য ঠিক মাথার ওপর। শ্রাবণের সূর্যকে এত প্রখর আর ঝাঁঝালো এর আগে কমই দেখেছে মানুষ। সেই সূর্যের দিকেই তাকিয়ে আছেন তোফাজ্জল। সমস্ত শরীর ঘেমে জবজবে। রোদ পিছলে পিছলে যায় শরীর থেকে। দূর থেকে মানুষ দেখে, কে যেন খরার আগুনে ধিকিধিকি জ¦লছে। শুধু তোফাজ্জলই দেখছেন, তার ওপরে শান্তির ছায়া। সূর্য-ছায়া। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেন―মাঠে এলে এখন থেকে উদোম শরীরেই আসবেন। রোদের সঙ্গে লড়াই করবেন। রোদ বাধ্য হবে ছায়া হতে। তোফাজ্জল এবার সূর্যের দিকে তাকিয়ে চিল্লায়―বাজান ও বাজান, দেখো সূর্যটা আমার কিছুই করতে পারছে না। তুমি না বলতে―বাবা তোমাকে আর রোদে পুড়তে দিব না। দেখো দেখো, সূর্য কীভাবে আমার সারা শরীর জুড়ে ছায়া হয়ে আছে।

সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button