
তানভির সহজ সরল কিন্তু ঘাড়ত্যাড়া মানুষ। অত কিছু বোঝে না। তবে যেইটা বোঝে সেইটা থেকে তার বিশ্বাস সরানো কঠিন। তার কাছে যদি মনে হয় এইটা সত্য, সেই সত্যের সঙ্গে সে মইরা যাইতে রাজি। আর কোনও কিছু মিথ্যা মনে হইলে সেই মিথ্যার আর বাঁচন নাই। নিজ জ্ঞানে শনাক্ত সেই মিথ্যার জন্য তানভিরের মনে যে ঘৃণার জন্ম হবে তা গুলি মাইরাও দূর করা যাবে না।
কুড়িলে থাকে তানভির। যমুনা ফিউচার পার্কের উত্তর পাশে, কুড়িল প্রাইমারি স্কুল ঘেঁইষা টিনশেড একটা বাসায়। ছাত্রদের মেসে। সে বগুড়া আজিজুল হক কলেজের ডিগ্রি লাস্ট ইয়ারের ছাত্র। পরীক্ষা দেয় বছর বছর। ঘাটপারের একটা কম্পিউটারের দোকানে চুক্তিতে কাজ করে। যা ইনকাম হয় তার অর্ধেক সে পায়। বড় কোনও কাজ আসলে অবশ্য তাকে করতে দেয় না দোকানের মালিক। এ জন্য ইনকাম একটু কম। কোনওরকম খায়া পইরা ঢাকায় থাকতে পারে। পাশাপাশি চাকরি খোঁজে। যদিও মিনিমাম ডিগ্রি ছাড়া দারোয়ানের চাকরি পাওয়াও কঠিন। কিন্তু পাশ করতে করতে আরও হয়তো বছর খানেক লাগবে। এর ভেতর স্কিলও বাড়ানো যাবে।
অনেক জায়গায় যাওয়ার সুযোগ পাইলেও সে ঘাটপারেই থাকতে চায়। ওর খালাত ভাই চান্দুরায় এক গার্মেন্টসে ম্যানেজার না কী যেন। যাইতে বলে। কম্পিউটার অপারেটর পদে জব দিতে পারবে। কিন্তু বেতন খুব আহামরি না। এক দেড় হাজার টাকা বেশির জন্য সে ঘাটপার ছাড়তে চায় না। ঘাটপারের মূল আকর্ষণ নর্থসাউথ আর আইইউবির স্টুডেন্টদের আড্ডা। ওরা হইহুল্লোড় কইরা চা খায়। গিটার বাজায়া গান গায় দলে দলে। ওদের মতো হইতে মন চায় তানভিরের। কখনও কাছে যায় না তানভির। দূর থেকেই ওদের আড্ডা উপভোগ করে। ভার্সিটিতে যাওয়ার মতো ভাগ্য তানভিরের নাই। আজিজুল হক কলেজ অনেক বড় হলেও ভার্সিটি তো আর না। কয়েক দিন ক্লাস কইরাও তার ভার্সিটি ভার্সিটি ফিল আসে নাই। সেই ফিলটা কেমন তা অবশ্য তানভিরের কাছে পরিষ্কার না। কিন্তু একটা অন্যরকম ফিল যে হবে তাতে কোনও সন্দেহ নাই।
ঘাটপাড়ে থাকার আরেকটা বিষয় হইলো চোখ ধাঁধানো সৌন্দর্যে ভরা মেয়ে দেখার সুযোগ। দুনিয়াতে যে এত সুন্দর সুন্দর মেয়ে আছে, এবং তারা যে সবাই এই বসুন্ধরা এলাকায় থাকে তা ঘাটপারে না এলে জানত না তানভির। সারা দিন প্রজাপতির মতো সুন্দর সুন্দর মেয়েরা আসে যায়। একেকজনের চেহারা হলিউড বলিউডের নায়িকাদের থেকে কম না। এই আকর্ষণটা খুবই অদ্ভুত। এমন না যে তানভির মেয়ে পাগল মানুষ। বরং মুখচোরাই। ঠিকমতো কথাও বলতে পারে না। কখনও কখনও একটু ব্যতিক্রম হয়। কয়েক দিন আগে আসাইনমেন্ট প্রিন্ট করতে আসছে একটা মেয়ে, তার মুখের দিকে তাকায়া রীতিমতো ভড়কে যায় তানভির। এত সুন্দর মেয়ে হয় নাকি! চোখ সরাতে পারতেছিল না। অ্যাসাইনমেন্টের কভারে মেয়েটার নাম দেখল, শুভা জেরিন! অদ্ভুত ব্যাপার! জেরিন নামে আরেকটা মেয়েকে তার ভালো লাগছিল। হাইস্কুলে একসঙ্গেই পড়ত তারা। ক্লাস নাইনের শেষের দিকে আইসা হঠাৎ প্রেমও হয়। বছরখানেক প্রেমের পর মেয়েটার বিয়ে হয়া গেছে। এসএসসির রেজাল্ট বের হওয়ার আগেই। তানভিরকে বিয়ে করার কথা বলছিল জেরিন। কিন্তু আজীবন ভেতরগুপ্তা তানভির কিছু বলে নাই। আস্তে করে কাইটা পড়ছিল। কী ভয়ঙ্কর কাপুরুষের মতো সে মেয়েটাকে এড়ায়া গেছিল তা মনে পড়লে তার এখনও দুঃখ হয়।
শুভা জেরিনকে দেইখা তানভিরের আরও অনেক কথাই মনে পড়ে। এত দ্রুত মাথায় এইসব আসে যায় যে ভাবলে বিচলিত হইতে হয়। অ্যাসাইনমেন্ট বেশি বড় না। কিন্তু তানভির প্রিন্ট করতে একটু সময় নিলো। জিগাইলো আসির আরমানের ‘শীতের বাতাসে তোমার পালানোর আগাম নিশানা’ গানটা শুনছে কিনা। শুভা বলল শোনে নাই। তানভির শুধু বলল গানটা খুব ভালো। কিন্তু তাদের কথা বেশিদূর আগায় না। শুভার সঙ্গে আরেকটা মেয়ে ছিল। ওরা নিজেরাই কথা বলতেছিল। শুভার দিকে তাকায়া তানভিরের মনে হয় এমন একটা মেয়েকে জীবনসঙ্গী হিসাবে পাইলে জীবন ধন্য হয়া যাইত। একটা জীবন আনন্দে পার কইরা দেওয়া যাবে ওই মুখের দিকে তাকায়া।
তানভির জানে, কেয়ামত হইলেও সেইটা সম্ভব না।
ছাত্র খুব একটা ভালো না হলেও প্রচুর পরিশ্রম করতে পারে তানভির। অবসর সময়ে হয় পড়ে, না হয় এইটা সেইটা শেখে। কিন্তু পইড়া কি লাভ দেশে চাকরি নাই। বেকার দিয়া ভরা। সেদিন কোথায় যেন দেখল, ২৫ লাখ বেকার বাংলাদেশে। উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যাই নাকি ১০ লাখের মতো। একটা পদের জন্য এক হাজার লোক যুদ্ধ করে। টিইকা গেলেও কোটার জন্য চাকরি হওয়া আরও কঠিন। মামা চাচা নাস্তার টাকা ঘুষের কথা বলার আর দরকার আছে ?
একবার ভাবে বিদেশ যাবে। আবার ভাবে ভালো একটা চাকরি নিবে। কিন্তু বাপের অবস্থা অতটা ভালো না। বিদেশ যাওয়াটাও কঠিন। ছোট ভাইটাকে বিদেশ পাঠানো হইছে কয়দিন হলো ? তিন মাস হইছে মনে হয়। সংসারে সামান্য শান্তি ফিইরা আসছে। কিন্তু তার বেকারত্ব ঘুচতেছে না। যে সামান্য টাকা পায় তাতে নিজেরই চলে না। এইটা চাকরি বলতেও মুখে বাজে তার। প্রয়োজনে এখন আরও বাড়ি থেকে টাকা নেওয়া লাগে। জিনিসপাতির যে দাম বাড়ছে তাতে ঢাকায় টিকতে পারবে কিনা সন্দেহ।
এর ভেতর হঠাৎ কইরা বৈষম্যবিরোধী কোটা আন্দোলন শুরু হয়া গেল। গনগনা আগুনের মতো জুলাই। কোন ভূতের কিলে যে সরকার কোটা পদ্ধতি আবার ফিরায়া আনল তা তারাই ভালো বলতে পারবে। তবে অনেকে মনে করে ছাত্রদের ওপর সরকারের একটা গোপন ক্ষোভ আছে। ২০১৮ সালের কোটা আন্দোলনে সরকার ছাত্রদের আন্দোলন মাইনা নিছিল বেকায়দায় পইড়া। অতটা খারাবি করে নাই তখন। সেইটাকে পরাজয় মনে কইরা নতুন কইরা বিজয়ী হওয়ার জন্য ছাত্রদের একটু দেইখা নিতে কোটা ফিরাইরা আনার চেষ্টা আসলে।
শুরু থাইকাই তানভির কোটা সংস্কারের পক্ষে। কিন্তু প্রথম দিকে সে আসে নাই আন্দোলনে। আন্দোলন দেখলে তার ভালো লাগে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো মানুষ দেখলে তাদের মতো হতে মন চায়। মিছিলের স্লোগানে তার লোম খাড়া হয়া যায়। শুক্রবার ১৯ জুলাই সে প্রথম ও শেষবার আন্দোলনে যোগ দিতে আসে। ওইদিন আন্দোলনের জন্য যমুনা ফিউচার পার্কের সামনে দাঁড়ায় তানভির। হাজার হাজার মানুষ। এত মানুষ একসঙ্গে কখনও দেখে নাই সে। সবার মুখে আগুন। কেউ কেউ হাসতেছে। ছোট ছোট দলে ভাগ হয়া স্লোগান দিচ্ছে। তানভির স্লোগান দিতে চায়, কিন্তু জড়তায় পারে না। স্লোগান দিতে তার সময় লেগে যায়। কিন্তু স্লোগান শুনে তার মনপ্রাণ ভরে যায়। যেন প্রেমিকার বলা মধুর কোনও বাক্য। তানভিরের কান্না আসতে চায়। কতদিন ধরে সে স্বপ্ন দেখে, স্বৈরাচারের পতন হবে। বাংলাদেশের মানুষ আবারও স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারবে। স্বাধীনভাবে বাঁচতে পারবে।
স্লোগানে স্লোগানে শরীর গরম হতে থাকে তানভিরের। যদিও সব স্লোগান তার ভালো লাগে না। মনমতো স্লোগান আসলে সে আস্তে আস্তে বলার চেষ্টা করে। সবথেকে বেশি ভালো লাগে একটা স্লোগান, খুনি হাসিনার গদিতে, আগুন জ্বালো একসাথে।
এভাবে মিনিট দশেকের মতো কেটে যায়। এরপর হঠাৎ কইরাই মানুষের দিকে গুলি করতে শুরু করে পুলিশ আর বিজিবি। সঙ্গে সাদা পোশাকের কিছু হেলমেটধারীও গুলি করতে থাকে। ওরা মনে হয় আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী হবে। হাজার হাজার মানুষ যে যেদিক পারে ছুটতে থাকে প্রাণ বাঁচাইতে। কিন্তু স্বভাবমতোই তানভিরের বুঝতে একটু দেরি হয়। ছাত্ররা দৌড়াইতেছিল। সে বুঝতে পারল যে গুলি চালাইতেছে পুলিশ। বুঝলেও তার এখন কী করা উচিত তা বুঝতে না পাইরাও দৌড়াইতে থাকা ছাত্রদের সঙ্গে দৌড়ানো শুরু করল।
কিন্তু তার দৌড়ের গতি যথেষ্ট ছিল না। সে তখনও চিন্তাই করতেছিল। কী হচ্ছে আসলে। বুঝলেও বিস্ময় কাটতেছিল না। পুলিশ বিনা উস্কানিতে মানুষ হইয়াও এইভাবে বেসামরিক মানুষের উপরে গুলি চালায় কেমনে! যদিও ১৬ বছর ধইরা এইসব হয়াই আসতেছে।
তানভির দেরি কইরা ফেলে। পিছে পইড়া যায়। কয়েকটা রাবার বুলেট লাগে তার পিঠে। বুলেট লাগার পর আরও জোরে দৌড়ানো শুরু করে। যমুনা ফিউচার পার্কের পাশে ওয়ালটনের গলিতে গিয়া দাঁড়ায়। একজনকে বলে, ভাই দেখেন তো আমার পিঠে কী হইছে। সেই ভাই দেইখা কয়, তেমন কিছু হয় নাই। একটু পরেই তানভির বুঝতে পারবে, সেইখানে দাঁড়ানো ঠিক হয় নাই তার, আরও ভেতরে যাওয়া দরকার ছিল। কারণ তখনই সেকেন্ডের ভেতর ৩/৪টা পুলিশ দৌড়ে আসে লাঠিসোটা বন্দুক হাতে। সঙ্গে কয়েকজন ছাত্রলীগের পোলাপানও।
পেট মোটা এক পুলিশ তানভিরের কলার ধরে ফেলে। সে নিজের কলার ছাড়ায়া নেওয়ার জন্য চেষ্টা করে। তবে ভয়ে পুলিশের গায়ে হাত দিতে পারে না। পুলিশের হাত ছাড়ায়া নেওয়ার চেষ্টা না করলেও, নিজের শরীর সে দূরে সরায়া নিতে চাচ্ছিল। সঙ্গে যোগ দিল ছাত্রলীগের সঙ্গে আসা দুই টোকাই। তানভিরকে মাটিতে পাইড়া ফেলে। ফুটবলের মতো শটাইতে থাকে তারা। এদিকে ছাত্রদের ভেতর থাইকা দুয়েকজন আইসা তানভিরকে ছাড়ায়া নিতে চেষ্টা করল। তাদের চেষ্টা ব্যর্থ হইল লাঠি আর অস্ত্রের ভয়ে। তখন আবার আরেক পুলিশ আইসা কালো স্টিলের লাঠি দিয়া দিল ঠ্যাঙে বাড়ি। এক বাড়ি দিয়াই ক্ষ্যান্ত হইল না পুলিশটা। মনের ঝাল মিটাইতে আরও দুইটা মারল। একটা দিল পাছায়, আরেকটা হাঁটুতে।
পায়ে আর পাছার বাড়িতে শরীরে আগুন ধরে যায় প্রচণ্ড ব্যথায়। কিন্তু কান্দেনি তানভির। শকড্ হইছে। চোখে পানিও আসছে। কিন্তু মুখ দিয়া সেইরকম শব্দ হয় নাই। পুলিশটা যখন হাঁটুতে বাড়ি দিল, তখন তানভির অবুঝ শিশুর মতো শব্দ কইরা কান্দা শুরু কইরা দিল। প্রাণটা যেন বের হয়া যাবে তার। জীবনে কোনওদিন সে কারও সঙ্গে মারামারি করে নাই। বাপ মায়েরও মাইর খায় নাই। ছাত্র অতটাও খারাপ ছিল না যে ক্লাসে পড়া না পাওয়ার জন্য মাইর খাইতে হবে। দুই-একবার দুষ্টুমি করার জন্য যা মাইর খাইছে। এর বাইরে মাইর খাওয়ার আর ইতিহাস তার নাই।
একসময় অস্ত্রধারী পুলিশের হাতে নিজেকে অসহায় সমর্পণ কইরা তানভির কানতে থাকল। পুলিশ তানভিরের মাজার বেল্ট ধরে টাইনা যেদিক যেদিক নিয়া যাচ্ছিল, তানভিরকেও সেদিকেই যাইতে হচ্ছিল। তানভির বারবার বলতেছিল, আঙ্কেল আমারে নিয়েন না আঙ্কেল, আমার একটা ছোট বোন আছে।
তার কথা শোনার সময় পুলিশের নাই। আরও অনেক ষড়যন্ত্রকারীকে ধরতে হবে। এসব দেশদ্রোহীদের জন্য বিদেশে সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়া যাচ্ছে। এরা দেশের সম্পদ নষ্ট করতেছে। একটু পর তানভিরকে প্রিজন ভ্যানে নিয়া হাতকড়া পরাইল। জীবনের প্রথম নিজের হাতে হাতকড়া দেইখা সে অবাক হওয়ার কথা। কিন্তু হইল না। তাকায়া রইল নিজের হাতের দিকে। এই হাত সেই একই হাত না জন্মের পর থাইকা কয়েক মুহূর্ত আগ পর্যন্ত যা তার ছিল।
তানভিরের অভিজ্ঞতা যথেষ্ট ছিল না―সেইদিন সরকারের হুকুমে পুলিশ বিজিবি কীভাবে গুলি করতেছিল কোটা আন্দোলনের ছাত্রদের দিকে, যেন রাইফেলের জং ছাড়াইতে ছাত্রদের বুকে প্র্যাকটিস করতেছিল তারা। কতজনকে যে মারছে আল্লাই ভালো জানে। হয়তো এই ভাইবা খুশিই হইতেছিল অস্ত্রধারীরা, প্র্যাকটিস করার জন্য পুলিশ লাইন্সে বা পাহাড়ের থাইকা ছাত্রদের বুক বাইছা নেওয়াই ভালো। ছাত্রদের বুক তো পাহাড়ের থাইকা অনেক উঁচা। গুলি মিস হবে না। ওরাও নড়বে না। শালাদের একেকটার দেমাগ কত। সাহস দেইখা বাঁচি না। বুক চ্যাতায়া খাড়া হয়া কয়, স্বৈরাচার মানি না! পুলিশ মানার টাইম নাই! আবার কয়, বুকের ভেতর অনেক ঝড়, বুক পেতেছি গুলি কর।
পুলিশ ছাত্রলীগ গুলি করে আর বলে, নে খা গুলি। গুলিতে গুলিতে দেশদ্রোহীদের মাটিতে শোয়ায়া দেয় তারা।
২.
রাত ১০টা।
ভাটারা থানার ভেতর রাখা হইছে তানভিরকে। আরও অন্তত পঞ্চাশ জন ছাত্রকে তুলে আনা হইছে থানায়। দফায় দফায় গাড়ি আসতেছে ছাত্রদের নিয়া। অন্য ছাত্ররা কে কোথাকার তা জানে না তানভির। তবে কয়েকজন বোধহয় লোকাল। তাদের কারও কারও আত্মীয় স্বজন আইসা অলরেডি দেখা করছে। কান্নাকাটি করতেছে। ছাড়ানোর ব্যবস্থা করতেছে। কিন্তু তানভিরের কেউ আসে নাই। তার বাড়ি বগুড়ার সারিয়াকান্দি থানায়। যমুনা নদীর পাড়ে। নদী এলাকার মানুষ নাকি মাছ বেশি খায় এই জন্য তাদের সাহস বেশি। মাছেদের ভেতর একটা বড় অন্যায় প্রচলিত আছে। বড় মাছ তার থাইকা ছোট মাছকে খেয়ে ফেলে। এই অন্যায়কে মাৎস্যন্যায় বলে। আমাদের দেশের অবস্থাও তাই। ক্ষমতায় আর অন্যায় কইরা পার পাওয়ার শক্তিতে বড় মানুষগুলি তাদের থাইকা ছোট মানুষদের খায়া ফেলে। তাই অন্য আন্দোলনকারীদের মতো সেও কোটা সংস্কারের মতো দেশটারও সংস্কার জরুরি মনে করে। যদিও তাদের মূল ফোকাস কোটাতেই। জামাত শিবির আর রাজাকারের ট্যাগের ভয়ে তারা সেই কথা বলতে পারতেছে না মুখ ফুইটা।
এইবার এইসব ট্যাগ গায়ে মাখে নাই ছাত্ররা। বরং প্রধানমন্ত্রীর ছুইড়া দেওয়া রাজাকার ট্যাগ তার দিকেই দ্বিগুণ ঘৃণা ভরায়া ফিরায়া দিয়েছে। বুকের টনটনে ব্যথাটা টের পাওয়া যাইতো এই স্লোগানে। রাজাকার, জামাত শিবির ট্যাগ দিয়া কত মানুষকে যে ওরা গুম করছে, খুন করছে, কত মানুষের জীবন যে ওরা জাহান্নাম বানায়া দিছে তা কে জানে।
একটু আগে তানভিরের বাপকে ফোন দিছিল পুলিশ। কিন্তু এতদূর থাইকা আজ আসা তো সম্ভব না। এইদিকে গাড়িটাড়ি সব বন্ধ নাকি কইরা দিছে সরকার। কবে আসতে পারবে তারও ঠিক নাই। তানভিরের মামারা সবাই সরকারি দলের লোক। রাজনীতিতে সক্রিয়। থানা পর্যায়ের নেতা। তাদের কথা পুলিশকে বলে নাই সে। বললেও কাজ হবে বলে মনে হয় না। মামাদের ফোন দিলে হয়তো আসতে পারবে। কিন্তু আসবে কিনা কে জানে।
তানভির সেইরকম গুরুত্বপূর্ণ ভাইগ্না না যে তার মামারা দৌড়ায়া আইসা তাকে ছাড়ায়া নিবে। তাদের ভাইগনার অভাব নাই। তাছাড়া তানভির এখনও ছাত্র এবং তার সেইরকম কোনও সামাজিক অবস্থান দাঁড়ায় নাই। দাঁড়াইলেই যে আসত তাও মনে হয় না তানভিরের। একরকম অবজ্ঞা আর তাচ্ছিল্য তার মামাদের স্বভাবগত বৈশিষ্ট্য।
এমনিতেও তারা না আসারই কথা। কারণ তাদের দলের বিরুদ্ধে গিয়া আটক হইছে সে। তাকে ছাড়াইতে আসার যুক্তি নাই। রক্তের টানে আসতে পারে তবে চোখ রাঙানি দিতে ভুল করবে না। মায়ের গালিগালাজ তো বোনাস।
আত্মীয় স্বজনদের চোখ রাঙানি আর কটু কথাকেই বেশি ভয় পাইতে শুরু করে সে। এর থাইকা স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে গিয়া বীর হইয়া মরাও ভালো।
এদিকে শামসুল নামের এক পুলিশ আইসা বারবার চাপ দিচ্ছে বাড়ি থাইকা টাকা-পয়সা আনার জন্য যাতে সে দ্রুত মুক্তি পাইতে পারে। বিকাশে হইলেও যাতে পাঠায়। মনে হয় তানভিরকে হ্যান্ডেল করার দায়িত্ব সে পাইছে।
কিন্তু তানভির টাকার কথা বাড়িতে বলতে পারবে না। এক দুই হাজার না ৩/৪ লাখ টাকার কথা বলতেছে। এইটা তো অসম্ভব ব্যাপার তার জন্য। মাত্র তিন মাস আগেই ৬ লাখ টাকা খরচ কইরা ছোটটাকে মালয়েশিয়ায় পাঠাইছে। জমি বন্ধক রাখা লাগছে ৫ বিঘা। তানভিরের বাপ আবাদ করতে চায় না। সৌখিন মানুষ। আবাদের থাইকা মাছ মারতে তার বেশি ভালো লাগে। ২ বিঘা জমি ধান আবাদ করার জন্য রাইখা বাকিসব বন্ধক রাখছে। এখন এত টাকা কোত্থাইকা দিবে তার বাপ ?
টাকার কথা বললে তানভির কিছু বলে না। অনেক হুমকি ধামকি দেওয়ার পরে সে বলে যে তার পারিবারিক অবস্থা ভালো না। বাপ কৃষক মানুষ। এত টাকা দিতে পারবে না।
এই কথা শুইনা পুলিশ দৌড়ায়া লাঠি নিয়া আসল। লকাপে না ঢুইকাই শিকে বাড়ি দিয়া বলল, এইডা চিনছোস শুওরের বাচ্চা ? পুলিশ কি তোর বাপ লাগে ? থানায় আসছোস এমনি ছাড়া পাবি ?
তানভির ভয়ে পিছায়া যায়। সে কী বলবে বুঝতে পারে না। পুলিশ ফোন দিতে বলে আবার বাড়িতে। তখন রাত সাড়ে ১১টা। এতক্ষণে কবরের নীরবতা নামার কথা তানভিরের গ্রামে। কিন্তু আজকের রাতে তার বাপ মাও ঘুমাইতে পারবে বলে মনে হয় না। পুলিশ ফোন দেওয়ার আগেই একটা কল আসল কনস্টেবল সামসুলের ফোনে। সে ফোন ধরে তানভিরকে দেয়। তানভির বলল যে পুলিশ টাকা চায়। কিছু টাকা দিতে পারবা কিনা। টাকার পরিমাণ জানতে চাইলে নিজ থাইকাই ১০/১৫ হাজার টাকা পাঠাইতে বলল।
কিন্তু এই কথা শেষ হওয়ার সঙ্গেই কনস্টেবল সামসুল এক গুঁতা লাগাইল তানভিরের পেটে। তানভির একটু পিছায়া গিয়া থামল। তারপর বাপের উদ্দেশে বলল যে দেখ পারো কিনা। যা পারো তাই পাঠাও। তার মাও ফোন নিয়া কান্না শুরু কইরা দিলে কনস্টেবল সামসুল ফোন নিয়া কাইটা দিয়া তানভিরকে আরেক দফা ধমকানো শুরু করল।
কিন্তু তানভির নিরুপায়। সে ক্ষুধার্ত, বিধ্বস্ত। ব্যথায় বিষ হয়া আছে শরীর। দাঁড়াইতে না পাইরা বইসা পড়ল। অন্যরা তাকে এইটা সেইটা জিজ্ঞেস করতে শুরু করলে সংক্ষিপ্ত উত্তর দিয়া চুপ হয়া গেল।
তানভিরের বাপের জন্ম যুদ্ধের পরে। দাদা বা নানার কেউই যুদ্ধে যায় নাই। আদিবাসী বা নারীও না সে। আন্দোলনে গেছিল মেধার পক্ষ নিয়া। তানভিরের মেধা মাঝারি। সরকারি চাকরি পাওয়ার আশা কম থাকলেও অধিকারের বিষয় যেহেতু আন্দোলনে না যাওয়াটা কাপুরুষতাই। এই কয়দিনে তা-ই মনে হইছে তার। যদিও একইসঙ্গে মনে হইছে অনেকের জন্য আন্দোলন করা সম্ভব না। ফলে তারা কাপুরুষও না। পরিবারের অবাধ্য হওয়া ছাড়া তানভিরের নিজের আন্দোলনে না যাওয়ার বড় কোনও কারণ নাই। সে জাস্ট একটা ন্যায় অধিকারের দাবি নিয়া আন্দোলনে যোগ দিতে গেছে।
কিন্তু সরকার রাগ করল। তাদের নাকি বাপের দেশ। তাই অন্যদের কথা শোনার টাইম নাই। বেশি বাড়াবাড়ি করলে সব বন্ধ কইরা দিয়া বসে থাকবে। নানাভাবে ব্যঙ্গ-বিদ্রƒপ করল। তোরা এক সময় ভাত খাইতে পাইতি না, আজ আমি তোদের তিন বেলা ভাতের সঙ্গে মাছ মাংস পর্যন্ত খাওয়াই।
তোরা কি ভাবিস যে আমি ক্ষমতার লোভী ? আমি জাতির পিতার মেয়ে।
জনগণ না চাইলে ক্ষমতা ছেড়ে দিব। জনগণ চায় বলেই আমি এত উন্নয়ন করতে পেরেছি।
নানা উন্নয়নের গল্প বলে গেল। হাজারের মতো আবারও তার মরা বাপকে টাইনা নিয়া আইসা কুমিরের কান্দা কান্দিল।
কোটা বাতিলের কথা উঠলে বলল, কোটা মুক্তিযোদ্ধার নাতিরা পাবে না তো রাজাকারের নাতিরা পাবে ?
কত ধরনের ট্যাগ যে দিল। একবার বলে রাজাকার। যখন সেইটা দিয়া আর কাজ হইল না, তখন বলে জামাত শিবির। তাতেও কাজ না হওয়ায় দেশদ্রোহী বলল, সন্ত্রাসী বলল, দুর্বৃত্ত বলল, আরও কত কী।
রাত গভীর হইতে থাকলে কনস্টেবল সামসুলের মনও কিছুটা নরম হয়া আসল। অন্যরা যার যার মতো ধইরা কিছু খসানোর চেষ্টা করতেছে। এমনিতে ছোট পদের পুলিশের তেমন কোনও সুযোগ আসে না টাকা-পয়সা খাওয়ার। যা করে সব বড়রা করে। এই রকম সুযোগ কম আসে। কাজে লাগাইতেই হবে। অল্প কিছু হইলেও যদি পায়, খারাপ কী ?
কনস্টেবল সামসুল তানভিরের কাছে গিয়া বলল, দেখ, তোরে দেখে ভদ্র ঘরের ছেলেই মনে হচ্ছে। জামাত-বিএনপির ফাঁদে পড়ে আন্দোলনে আসছোস। তুই ভালো ছেলে সেটা আমরা বুঝতে পারছি। কিন্তু ঝামেলা হয়া গেছে। তোরে তো এইখানে রাখা যাবে না। জায়গা নাই। তুই তো বড় নেতাও না যে নিরাপত্তার খাতিরে তোরেও হারুন স্যারের ভাতের হোটেলে পাঠাব। খুব চাপ যাচ্ছে আজকাল, ভাত আইনা সারা যাচ্ছে না। এক কাজ কর। অল্প কিছু টাকা হইলেও পাঠাইতে বল।
আবারও কল দিয়া তানভিরের হাতে ফোন ধরায়া দেয় সামসুল। তানভির এবার ৫/১০ হাজার যা পারে তাই পাঠাতে বলে, এছাড়া তাকে ছেড়ে দিবে না। তার বাপ পাঠাইতে চায়। বলে আধা ঘণ্টার ভেতর পাঠাইতেছি।
এত কয়েদি দেইখা ঝামেলা মনে হইলেও সম্ভাবনার কথা ভাইবা পুলিশেরা খুশিই হয় । যদিও জেলখানাগুলি ভরা। এত মানুষ ধইরা রাখবেই বা কোথায়! কিশোরগঞ্জে নাকি হাজারের বেশি কয়েদি জেলখানা ভাইঙা পালাইছে। চাপ আরও বেশি। ভয়ও লাগে। যদি এতগুলি মানুষ একসঙ্গে হামলা করে তো হইছে!
এসআই রাজন কুমার সাহা আইসা ঘোষণাই দিয়া দিল, আজ তোরা যা পারোস হালকা পাতলা কামায়া নিলে নিস। না হইলে একটা ব্যবস্থা করিস। মাইরা হইলেও খালি করিস। হাজতে তো এত জায়গা নাই।
কনস্টেবল সামসুল খুব খুশি। তার জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় এখন। সরকারি দলের ছাত্র রাজনীতি থাইকা পুলিশে আসছে। ছাত্রলীগের সদস্য ছিল। দলের প্রতি প্রেম তার জাগ্রতই। ডাবল দায়িত্ব অনুভব করে সে। একে তো শৈশবের প্রথম প্রেম, তার উপর আবার আইনশৃঙ্খলা রক্ষার বড় দায়িত্ব। তাই এইসব জঞ্জাল সাফ করার ব্যাপারে তার আগ্রহ এবং প্রেম প্রশংসনীয়।
সে যখন টাকা-পাওয়ার নিশ্চয়তা পায়, তখন তানভিরকে নিয়া মাদানি এভিনিউয়ের দিকে যায়। ভাটারা থানার আশেপাশে কয়েকটা অ্যাম্বেসি। এইখানে গুলি চালাইলে খবর আছে।
তানভির ভয় পায়া জিজ্ঞেস করে, আমারে কই নিয়া যান ?
সময় খুবই কম। ১০ মিনিটের ভেতর ফেরত আসতে হবে। মেজাজ খারাপ হয়া যায় কনস্টেবল সামসুলের। বলে ভয় পাইস না ব্যাটা। বিকাশের দোকানে যাই। ৩০০ ফিটের দিকে একটা পরিচিত বিকাশের দোকান আছে অনেক রাতেও খোলা থাকে।
যাওয়ার পথে সামসুল মোটামুটি ঠাট্টা করা শুরু করে তানভিরের সঙ্গে। বলে, তুই ব্যাটা কোটার বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে আসছোস কেন ? কোটা কি খারাপ ? ধর তরে এখন পঙ্গু বানায়া দিলাম, তুই তো কোটার জন্য যোগ্য হয়া যাবি। চাকরিও পাইতে পারিস।
কনস্টেবল সামসুল সত্যিই খুশি হয়া ওঠে। সে অত মেধাবী না। কিন্তু পঙ্গু বানায়া দিয়া কোটার যোগ্য কইরা তুলতে পারার আইডিয়া তার মাথায় আসায় সে নিজেকে ধন্যবাদ দেয়। যাক একজন মানুষকে অন্তত সরকারি চাকরি পাইতে হেল্প করতে পারবে সে।
সাঈদ নগরের মোড়ে গিয়া দোকানটা বন্ধ দেখতে পায়া কনস্টেবল সামসুলের মেজাজ খারাপ হয়। আন্দোলনের জন্য বাট্টু ট্যাটুআলা শালা বোধহয় আজ তাড়াতাড়িই দোকান বন্ধ করছে। কাল দোকান খুলুক ট্যাটু তার পুটকি দিয়া ঢুকাবে সামসুল।
হাতখরচের টাকা হাতছাড়া হয়া যাবে ভাইবা নিজের নাম্বারই দেয় সামসুল। যদিও ভয় কাজ করতেছে মনের মধ্যে যে বিকাশ নাম্বারের সূত্র ধইরা আবার তার চাকরি যায় কিনা। কিন্তু নিজের দল ক্ষমতায়, সেই ভরসা তার মনে আছে। তাছাড়া এখন যে অবস্থা কত খুন খারাপির বিচার হবে না, আর মাত্র এই দুই পয়সার ভিক্ষার জন্য কী হবে!
যত ঝামেলা তত ইনকাম। কিন্তু এই শালার বেটার তো ঝামেলা নাই তেমন। পিটায়া উত্তর বাইর করতে পারে নাই কোনও রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ততা আছে কিনা। না, নাই। শালার চেহারা দেইখাই বোঝা যায়, সত্য কথা কইতেছে।
কনস্টেবল সামসুলের হালকা খারাপ লাগে। মানুষ নিজের জীবনের সবথাইকা করুণ মুহূর্তগুলাতে থানায় আসে। কিংবা তাদের বিনা অপরাধে ধইরা নিয়া আইসা তাদের জীবনের সবথাইকা করুণ মুহূর্ত বানায়া দিই আমরা।
ব্যাপারটা নিয়া ভাবলে মনে হয় মানুষগুলা অভিশাপ দিতেছে। না দেওয়ার তো কোনও কথা নাই। সরাসরি তো দিতে পারে না। দিলে জিব্বা কাইটা ফালামু!
আমরা তো পুলিশ। আইনের লোক। কত কষ্ট কইরা ইমানের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করি। মানুষের নিরাপত্তা দেওয়াই আমাদের কাজ। আমাদের অভিশাপ দিবে আর আমরা বইসা থাকমু ?―তারে কুইট্টালবাম, প্রিয় তারকা মোশাররফ করিমের মত ডায়লগ মনে পড়ে।
টাকা পাওয়ার মেসেজ চেক কইরা কনস্টেবল সামসুল ফোন পকেটে রাখে।
তানভিরকে বলে তুই এখন চইলা যা। তানভির তার হাতের প্লাস্টিক ওয়্যার কানেক্টর খুইলা দিতে বলে। সামসুল বলে থাক। কী দরকার। একা পায়া যদি আবার আমার ওপর হামলা করস ?
তানভির কিছু বলে না। দাঁড়ায়া থাকে।
তানভিরের দাঁড়ায়া থাকা দেইখা সামসুল তার আইডিয়ার কথাটা বলে।
তুই এক কাজ কর। শরীর আগায়া দে। তরে গুলি করি। আমরা তো তোর ভালো চাই। তোর মঙ্গলই চাই। গুলি করলে তুই পঙ্গু হবি আর কোটায় চাকরি পাবি।
কথা শুনে ভয়ে তানভিরের চোখ বড় বড় হয়া যায়। শরীরের লোম খাড়া হয়া যায়। সত্যি সত্যি যদি গুলি করে!
সামসুল বলে, তরে একটা গুলি মারি। বিশ্বাস কর, মাথায় বা বুকে মারব না। চোখে তো একেবারেই না। সরকারের অনেক দুর্নাম হচ্ছে এত এত মানুষ অন্ধ হয়া গেলে সরকারের পক্ষে এত ভাতা দেওয়া সম্ভব না। অনেকেই নাকি একবারে কানা হয়া যাবে। তর পায়েই গুলি করব। কী বলস ?
তানভির কিছু বলে না। এইসব মুহূর্তে তার আসলে কী বলা উচিত সে বুঝতে পারে না।
সামসুল বলে যা গুলি করব না। কিন্তু হাতও খুইলা দিব না। দৌড় দে। আর কোনওদিন আন্দোলনে আসবি না।
কনস্টেবল সামসুল ভাবে গুলি করা খুব এক্সপেন্সিভ ঘটনা। সরকার পইড়া গেলে তো তখন আবার ঝামেলা হইতে পারে। কিন্তু আবারও নিজ দলের ক্ষমতায় থাকার বরাভয় তাকে সাহসী কইরা তোলে। তাছাড়া এখন নাকি গুলির হিসাবও হবে না।
তানভির এইসব দৃশ্যের সঙ্গে পরিচিত। যতবার পুলিশ বা র্যাব ক্রসফায়ার দেয় ততবার এই নাটক করে। অনেক সিনেমাতেও এই জিনিস দেখছে সে।
তাই সে ভয়ে নড়তে পারে না। কিন্তু কনস্টেবল সামসুল ধমক লাগায়।
উপায় না পায়া তানভির দৌড় দেয়। ব্যথায় টনটনা পা নিয়া সে দৌড় দেয়। সেকেন্ডের ভেতর মনে হয় এইটাই তার জীবনের শেষ সময়। সে বোধহয় আর কোনওদিন বাপ মায়ের মুখ দেখতে পারবে না। ছোট বোনটার সঙ্গে খুনসুটি করতে পারবে না। আর বিয়াও করা হবে না। তার আর একটা ভালো চাকরিও হবে না।
তানভির দৌড় দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই কাঁধের বন্দুক হাতে নেয়। গুলি লোড করাই ছিল। সেমি-অটোমেটেড। তানভির ১৫/২০ হাত দূরে যাওয়ার আগেই সামসুল প্রথম গুলি চালায়। কিন্তু গুলিটা মিস হয়। এই সময় তানভির ভয়ে থমকে দাঁড়ায়। আবার গুলি চালায় সামসুল। এবার গুলি গিয়া তানভিরের বাম পায়ের গোড়ালির উপরে লাগে। মনে হয় পায়ের পাতা খইসা পড়ছে। সামসুলের মনে চায় আরেকটা গুলি মারতে। শালা ফকিন্নির বাচ্চা টাকা কম দিছে। সে দেরি না কইরা আরেক রাউন্ড গুলি ছোড়ে। আবারও মিস হয়। আবার গুলি ছোড়ে। তবে এইবারের গুলি আর মিস হয় না। গুলি গিয়া পায়েও লাগে না। একদম মাথায় গিয়া লাগে। প্রথম গুলি লাগার পর তানভির বসে পড়ছিল। আবার একটু দাঁড়ায়াই পা ছ্যাচড়া নিয়াই যাওয়ার চেষ্টা করতেছিল। শরীর নিচু হওয়ায় গুলি গিয়া মাথায় লাগে। মগজ বের হয়া পইড়া যায় রাস্তায়।
কনস্টেবল সামসুল কাছে গিয়া দেখে অবস্থা সুবিধার না। মগজ পইড়া গেছে রাস্তায়। তার মাথায় আবারও দুষ্টু কথা আসে। শালার মেধা এখন রাস্তায় পইড়া আছে, আরও আন্দোলন চোদাবি ? হালকা একটু হাইসা নিয়া দ্রুত স্থান ত্যাগ করে সামসুল।
গুলির শব্দ শুইনা কয়েকজন লোক বের হয়া অবস্থা বোঝার চেষ্টা করতেছিল। একটা আহত তড়পানো দেহ দেইখা তারা কাছে যায়। অবস্থা বেগতিক দেইখা কুর্মিটোলা হাসপাতালে নেয়। কিন্তু গুলিবিদ্ধ রোগী ভর্তি নেওয়া নিষেধ। উপর মহল থাইকা নিষেধ করা হইছে।
তানভিরের দেহের নড়নচড়ন বন্ধ হয়া গেছে। হাসপাতালে নেওয়া লোকজন বুঝতেছে না তাদের এখন করণীয় কী। এত বড় সরকারি হাসপাতালই যদি এই কথা বলে, তাইলে তারা আর কোথায় যাবে!
তারা অনুভব করে প্রতিটা সেকেন্ড যেন ঘণ্টার সমান হয়া গেছে। মিনিট দিনের সমান। লোকেরা অধৈর্য হয়া এমনকি খানিকটা রাগ কইরাই কর্তব্যরত ডাক্তারকে অনুরোধ করে অন্তত দেখতে যে লোকটা বেঁচে আছে না মরে গেছে। দেহের নড়নচড়ন নাই। তারা তাকাইতেও ভয় পাচ্ছে। ডাক্তার তাদের অনুরোধে সাড়া দিয়া পালস চেক কইরা মুখ হালকা শক্ত কইরা বলে, বেঁচে নাই।
লাশের পরিচয় তারা জানে না। লাশের সঙ্গে মোবাইলও নাই। মানিব্যাগ হাতায়া ঠিকানা খোঁজার চেষ্টা করে। কিন্তু ঠিকানা পায় না তারা।
এরই মধ্যে রোগীর সঙ্গে আসা তিন জনের ভেতর একজন রাত বেশি হওয়ার অজুহাত দেখায়া কাইটা পড়ে। বাকি দুইজন এখন এই লাশ নিয়া কোথায় যাবে ?
৩.
পাশেই গলিতে লুকায়া ট্যাটুআলা বাট্টু সেই বিকাশের এজেন্ট এই হত্যাকাণ্ডের দৃশ্য ভিডিও করছিল। সেই ভিডিও ছয় দিন বাদে নেট আসার পর সোস্যাল মিডিয়ায় ছাড়ে, মুহূর্তেই ভাইরাল হয়া যায়। শত শত মৃত্যুর ভেতর তানভিরের মৃত্যুও দেশের মানুষকে ভীষণভাবে ছুঁয়ে যায়। কোটি কোটি মানুষ তানভিরের মৃত্যুতে চোখের পানি ফেলে। নরপিশাচদের প্রতি মানুষের রাগ ঘেন্না আরও বাইড়া যায়। মানুষ আরও সংঘবদ্ধ হইতে থাকে। মিছিলের দৈর্ঘ্য প্রতিদিন লম্বা হইতে থাকে। জীবন মরণ বাজি রাইখা মানুষ স্বৈরাচারকে কবর দেওয়ার জন্য রাস্তায় নামতে থাকে।
স্বৈরাচারের পতনের পর, রক্তস্নাত নতুন বাংলাদেশে সেই কনস্টেবল সামসুল ধরা পড়ে। তাকে খুনের আসামি কইরা মামলা করা হয় এবং গ্রেফতার দেখানো হয়। পরে নিজের দোষ স্বীকার না কইরা যেই বয়ান দিছিল তা মিডিয়া এবং উন্মত্ত জনতার গায়ে আরও একবার আগুন ধরায়া দেয়।
কিন্তু এইটা হওয়ারই ছিল। তখনও পুলিশ বিভাগে সেইরকম সংস্কার হয় নাই। কয়জনকে সরাবে ? ঠক বাছতে গা উজাড়! ১৫/১৬ বছর ধইরা স্বৈরাচারী সরকারের আন্ডারে থাকলে যা হয় আর কি। পুলিশের তদন্ত পুলিশ করলে যেমন হয় কোনওরকম টুইস্ট ছাড়াই তেমনই হলো।
১৮ কোটি মানুষের ৩৬ কোটি চোখ তানভিরকে খুন করার দৃশ্য দেখল। কিন্তু মামলায় পুলিশ এই বিশাল সংখ্যার মানুষকে মিথ্যুক বানায়া দিল। কনস্টেবল সামসুলের বয়ানে মামলার তদন্তে লিখল,
‘ছাত্র আন্দোলনের উদ্ভুত পরিস্থিতিতে বিক্ষোভকারীরা পুলিশের দিকে বিভিন্ন দিক থেকে গুলি ছুড়তে থাকে এবং ইটের টুকরো নিক্ষেপ করতে থাকে। এক পর্যায়ে এক শিক্ষার্থীকে মাটিতে পড়ে যেতে দেখা যায়। পরে কিছু লোক তাকে হাসপাতালে নিয়া গেলে ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষণা করে। সে সময় কনস্টেবল সামসুল জনগণের নিরাপত্তার স্বার্থে নিজ দায়িত্ব পালন করছিল।’
সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ



