আর্কাইভগল্প

গল্পের স্বর : কয়েকটি আদর্শ শরীর : ফজলুল কবিরী

রেজাউল গড়িয়ে পড়তেই জাকিয়া ক্লান্তির শ্বাস ছাড়ে; কিন্তু তখনও নির্জনতা রাতের আলস্যকে টিপ্পনী কাটছে—যদিও কয়েকটি ধারালো লাইট রাস্তার মোড়ে ঠায় দাঁড়িয়ে থেকে কয়েকজন তরুণের খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হেঁটে যাওয়া প্রত্যক্ষ করে।

একটু পর হয়তো রেজাউল-জাকিয়ার ভেতরের বারুদের আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না; তখনই একটা বেপরোয়া তেলাপোকা আচমকা রাতের নীরবতা ভেদ করে তাদের খাটের ওপর এসে পড়ে, জাকিয়া বিরক্তি চেপে রাখতে পারে না—মধুর সমাপ্তিটুকুতে জল ঢেলে দেওয়ার জন্য তেলাপোকার বাচ্চাটাই যথেষ্ট।

রেজাউল বলে, বিরক্ত হয়ো না। আজ ছত্রিশে জুলাই। তেলাপোকাটার পাখনা দুইটাতে রং লাগিয়ে দিতে পারলে দারুণ হতো।

জাকিয়া বলে, মন্দ হয় না।

দূরের রাস্তাগুলো সারা দিনের ক্লান্তি, হইচই ও শাসকদলের হত্যাযজ্ঞের সমূহ চিহ্ন বুকে নিয়ে ধীরে ধীরে সেরে উঠছে; ভোরের হাওয়ায় আরেক পশলা সিক্ত হলে ক্লান্তির ছাপ আর থাকবে না।

জাকিয়া ভাবে মানুষের অধিকারগুলো যারা হরণ করে তারা আদতে বানের জলের মতো—চোখের পলকে সবকিছু বিলীন করে দেয়। তারপর মানুষকে পুনরায় নিজেদের সংগ্রামের শেষ রক্তবিন্দুগুলো তিল তিল করে জমাতে হয়। পরাজয়ের গহ্বর থেকে মানুষ পুনরায় যেভাবে জেগে ওঠে, তা দেখার সুযোগ সব প্রজন্মের হয় না।

কেবল শাসকদলের বৈষম্যের বিরুদ্ধেই কি ছিল এই আন্দোলন ? জাকিয়া বুঝতে পারে না। বৈষম্যের কোনও সীমারেখা থাকে না সত্য, কিন্তু এটাই একমাত্র বেড়ি নয়। রাষ্ট্রের সকল স্তরে মানুষ যখন পদানত হয়, তখন সাম্যের পতাকা ছিনতাই হয় অনেকভাবে।

ছাত্রদের আন্দোলন কোটার প্রশ্নেই শুধু এগোয়নি, যে কোনও অনাচারের বিরুদ্ধে ভবিষ্যতের একটা স্বপ্ন এর ভেতর লুকিয়ে ছিল, তা সে বুঝতে পারে। সে এটুকু বোঝে রাষ্ট্রের জবাবদিহিতা সাধারণ মানুষের কাছে।

জাকিয়ার চোখে প্রশান্তির ঘুম খেলা করছে, কিন্তু তেলাপোকাটা উড়ছে বারবার। তারপর সে ভাবে মর্গে মর্গে মানুষের ছুটাছুটির খবরগুলো ধীরে ধীরে বাতাসে কম্পন তুলতে শুরু করবে। স্বজনহারা মানুষের কাছে দেবদূত এসে সান্ত্বনার বাণী শোনাবে। বলবে, সত্যের মৃত্যু নেই। বাতাসে মৃত্যুর ছায়া তবু ভেসে বেড়াবে।

শত শত লাশ পড়েছে পুলিশের গুলিতে। ছাত্রদের নাছোড় মানসিকতার বিপরীতে পুলিশের প্রশিক্ষিত হাত যতবার গুলি ছুড়েছে, ততবারই প্রশস্ত রাস্তায় ছাত্র-জনতার বুকের আগুন ও রক্ত একসাথে গড়িয়ে পড়েছে।

মস্ত ভুল করে ফেলেছে এই রেজিম। ধরা খেয়েছে। ইতিহাসের পতিত রাজাদের কাতারভুক্ত হয়ে বিশ^াসঘাতকতা করেছে সাধারণ মানুষের সাথে। সীমাহীন অপচয়।

জাকিয়া এসব যখন ভাবে তখন রেজাউলের নাক ডাকার শব্দ ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। স্বামীর দিকে একবার মায়াভরা দৃষ্টিতে তাকায় সে। একটা অদ্ভুত নিদ্রাহীন রাত তাকে আলিঙ্গন করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। একটু আগের তন্দ্রাচ্ছন্ন ভাবটা কোথায় মিলিয়ে গেল বুঝতে পারে না সে।

তাদের কিশোরী মেয়েটা সব সমীকরণ উলটপালট করে দিয়েছে। এ কয়টা দিন বাবা-মা হিসেবে তাদের জীবনটা দড়ির ওপর ঝুলে ছিল।

আমাকে তোমরা আটকে রাখতে চাও কেন ? তোমরাও কি স্বৈরাচারী রেজিমের দোসর নও ?

মেয়ের এমন প্রশ্নবাণে তারা বেশ আহতই বোধ করে। রেজাউল ও জাকিয়া দুজনের কেউই এদেশের রাজনৈতিক মতাদর্শ নিয়ে কখনও ভাবিত হয়নি। নিজেদের পেশাগত জীবনের কঠিন বাস্তবতা সামাল দিয়ে এসব নিয়ে বাড়তি কিছু ভাববার মতো সময়ও তাদের হয় না। এমনকি ছাত্রদের এই বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন যখন শুরুর দিকে ছিল, তখনও তারা বুঝে উঠতে পারছিল না আসলে কী ঘটতে যাচ্ছে। কোনও রাজনৈতিক দলের প্রতি তাদের সাপোর্টারদের যে ধরনের অন্ধ আনুগত্য থাকে, তা থেকে তারা দুজন ছিল মুক্ত।

তবু নিজেদেরকে সামলে নিয়ে ক্লান্ত স্বরে মেয়েকে বোঝানোর চেষ্টা করে এই মুহূর্তে বাইরে বের হওয়াটা নিরাপদ নয়। নিজেদের ভেতরের আপসকামী ছাপোষা সত্তাকে বেরিয়ে আসতে দেখেও তারা সন্তানবাৎসল্য উপেক্ষা করতে পারেনি। মেয়েকে আটকাতে নিজেদেরকে ছোট করতেও পিছপা হয়নি।

চোখের পলকে এভাবে অবাধ্য একটা মাস কাটাবে মেয়েটি, দু জনের কেউই ভাবতে পারেনি। প্রায় প্রতিদিন রাস্তায় নেমেছে। শত বারণ ও বাবা-মায়ের অভিমান উপেক্ষা করে সতীর্থদের সাথে মিছিলে যোগ দিয়েছে দিনের পর দিন। খাওয়া নেই, ঘুম নেই—বাবা-মায়ের জন্য অসহনীয় অনেকগুলো দিন যেন কলেজের ইউনিফর্মের ভেতর লুকিয়ে রেখেছিল।

ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী উন্মত্ত ঢেউটা যখন সবদিকে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে, তখন তারা দেখে রাস্তায়-রাস্তায় শুধু নয়, অলিগলি থেকে শুরু করে পতিত শাসকদলের পলাতক নেতার বাড়ি কিংবা অফিসেও সে ঢেউ আছড়ে পড়ে ভয়ঙ্কর গতি নিয়ে। ছাত্র-জনতার সারা দিনের বাধভাঙা উল্লাস, ক্ষোভ, আনন্দ ও প্রতিবাদের হাওয়া এক মুহূর্তের জন্যও বন্ধ হয়নি।

কিন্তু জাকিয়া টিভিতে যখন দেখে প্রবল প্রতাপ নিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিগুলো মানুষের ক্ষোভের আগুনে পুড়ে ছারখার হয়ে যাচ্ছে একের পর এক, তখন তার দু চোখে আচমকা ক ফোটা অশ্রু জমে।

সে বারবার চোখ বন্ধ করে সেসব দৃশ্য না দেখার চেষ্টা করে। স্বামীর দিকে তাকিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে, এই লোকটা কী করেছে ?

রেজাউল উত্তর দেয়, যা ঘটার তা ঘটেই।

পরাজিত সরকারের সীমাহীন অনাচার, মিথ্যাচার, গুম ও হত্যাযজ্ঞের বিরুদ্ধে জাকিয়ার সমস্ত ক্ষোভ আছড়ে পড়ে, একটা ড্রাকুলা মহিলা সব শেষ করে দিয়ে পালিয়ে গেল।

রেজাউল তাকে সান্ত্বনা দেয়, কিছুই শেষ হয় না। একই ন্যারেটিভ অনেকবার অনেক জনের হাত বদল হয়।

তাই বলে এমন অসম্মান করতে হবে কেন ? স্বামীর কথা জাকিয়ার পছন্দ হয় না।

সে ভাবে, বিজেতা ও বিজিতের গল্প সবসময় পরিবর্তন হয়। নিজের শৈশবের সাথে মেয়ের শৈশবকে পাশাপাশি রেখে কল্পনা করে—যেন আলাদা গল্প, আলাদা গন্তব্য, আলাদা পরিণতি।

শৈশবের কৌতূহল ও বিবিধ বিধি-নিষেধের বেড়ি টপকে খুব বেশিদূর বিস্তৃত ছিল না তাদের দিগন্ত। তবু অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে একদিন পরাজয়ের মুখোমুখি হতে দেখেছিল এক স্বৈরাচারকে। সেই এরশাদের পতনের মুহূর্তের সাক্ষী হতে পেরেছিল তারা। কিন্তু সেই গল্প নিজেদের শৈশব-কৈশোরের স্মৃতিতে তেমন দাগ কাটতে পারেনি। কারণ সেসব গল্পে তাদের নিজেদের কোনও অংশগ্রহণ ছিল না।

তার মনে হতে থাকে হাসিনা রেজিমের গল্পটাও তাদের শৈশব-কৈশোর থেকে উঠে আসা নিকট অতীতেরই অন্য প্রতিরূপ। এই চক্র শেষ হবার নয়। একই গল্প বারবার ফিরে আসে কয়েক দশকের বিরতি নিয়ে।

এসব ভাবতে ভাবতে জাকিয়া মেয়ের কক্ষের দিকে যাওয়ার তাড়া অনুভব করে। মেয়ের গল্প তার গল্পের মতো নয়। এই যুদ্ধে তারা বিজয়ী। তাদের অংশগ্রহণই এই যুদ্ধের সারাৎসার।

আদরের মেয়েটির সকল ক্লান্তি, উচ্ছ্বাস ও আনাড়িপনার ভেতর এ-কদিনে যে আত্মবিশ^াস যুক্ত হয়েছে, তা তার সারা জীবনের প্রাপ্তি। 

আড়মোড়া ভেঙে উঠতে গিয়ে জাকিয়া খেয়াল করে বাইরে প্রচণ্ড হইচইয়ের শব্দ হচ্ছে।

রতিসুখের তৃপ্তি ও ক্লান্তি ভুলে গিয়ে দ্রুতই সে জানালার পাশে এসে দাঁড়ায়। তারপর তার দৃষ্টি হইচইয়ের মধ্যে স্থির হতে শুরু করে।

দমবন্ধ হওয়া অনভূতি তাকে গিলে ফেলার মুহূর্তে সে দেখে ক্ষুব্ধ জনতা রাস্তার মোড়ের ল্যাম্পপোস্টের ধারালো লাইটের আলোতে কয়েকটি অর্ধমৃত দেহ ঘৃণাভরে ঝুলিয়ে দিচ্ছে।

সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button