আর্কাইভকবিতা

গুচ্ছকবিতা : রেজাউদ্দিন স্টালিন

পারদের পৃথিবী 

বাজপাখির ডিমে পারদ ভরে মুখে রাখলে মানুষ উড়তে পারে

মানুষ পাখির প্রতিদ্বন্দ্বী

তার চোখের মধ্যে দুটো বিমান

কানের ভেতর ক্ষেপণাস্ত্র

মুখের গর্ভে বারুদের বস্তা

মানুষের পছন্দ মাছের কঙ্কাল

নীলকণ্ঠ পাখির পালক

মৃত বাঘের চোখ

আর অনাথ ক্ষুদিরামের ফাঁসি

ধনীদের যুদ্ধ খুব অপছন্দ

ভোগের মাত্রা কমে যায়

গরিব যুদ্ধ ভালোবাসে

যুদ্ধ ভুলিয়ে দেয় ক্ষুধা

ভবিষ্যতে বারগুলোতে মদের সাথে পানি বিক্রি হবে পেগে

পাহাড় গলিয়ে ডিমের ওমলেট হবে

গাছের রোস্ট হবে উপাদেয়

মাটির নিচের পৃথিবীতে যারা বাস করে তাদের প্রিয় খাবার মানুষের মাংস

মানুষ পছন্দ করে পুরাতন

অপেক্ষা করে নতুনের

সুন্দরীরা বসে আছে যিশু পুনরুত্থিত

হলে তাকে বিয়ে করবে

পৃথিবীর সেটাই সবচে সুন্দর শহর

যে শহরে কেউ কখনও যায়নি

সবচে সুন্দর নারীকে কেউ কখনও

দেখেনি

সবচে সুন্দর কবিতা যা পড়া হয়নি

মানুষ উড়তে শিখলে আর পৃথিবীতে

ফিরবে না


সমীকরণ

দৌড়ায় সে

এগোয় না এক চুলও

পৌঁছায় না

লাগে না পায়ে ধুলো

পদচিহ্ন থাকে না  তার পথে

জিহ্বা বুলায় শূন্যের উপর ক্ষতে

দেখা যায় না পদক্ষেপ

দাগ থাকে না―করে না ভ্রƒক্ষেপ

তার আত্মবিসর্জন

রক্তনিমজ্জন

বেগের সূত্র তো স্থাণু

জড়িয়ে ধরে জানু

গোলকধাঁধার সংখ্যাটা কি আছে

তাকে খুঁজতে সে দৌড়ায়

তাকে ডাকতে সে দৌড়ায়

কিন্তু এগোয় না এক পাও

 সে পৌঁছে না কোত্থাও

তাকে শুষে নিচ্ছে ঘর

সে অন্যতে নির্ভর

সে এগোয় না এক চুলও

আংরাখা সব তুলো

সে হাঁটতে থাকে হাঁটে

ভাবে দৌড়াবে তল্লাটে

সে ছুটতে থাকে ছোটে

চোখে বিশ্বভুবন ফোটে

তার আটকে থাকে পা

সে কোত্থাও যায় না


জনক

প্রাতঃস্নান সারলো সূর্য

এরপর কর্মব্যস্ত অনেকেই

একজন নদীকে প্রণাম করে জলে নামলো

একজন স্রষ্টাকে স্মরণ করে পানিতে

মুণ্ডিত মস্তক নিমীলিত চোখ আরেকজন

একটু দূরে এলোমেলো নির্ঘুম চুল

থেঁতলে যাওয়া  বিষণ্ন সিঁদুর

ঝাঁপ দিল সূর্যের বুক চিরে জলে

রক্তাভায় ভরে উঠলো বুদ্বুদ

বিরতিচিহ্ন হাত উঁচু করে বোঝালো―

কেউ হারিয়ে যাচ্ছে মৎস্যকন্যা

তাকে অসহ্য অঙ্গার থেকে টেনে তুলতে হবে 

স্রষ্টা সহায় ভেবে যুবক ডুব দিলো হেডিসের পাতালরাজ্যে

যমুনার স্রোত অগ্রাহ্য করে ফিরিয়ে আনতে চায় তাকে

প্রতিরোধ ভেদ করে

তুলে আনলো হোরাসের নৈঃশব্দ্য

মেয়েটির ঠোঁটের দরজা দিয়ে

ছ্ুেড় দিলো অম্লজান

যতক্ষণ না ফিরে আসে বায়ু দেব

ততক্ষণে শোরগোলের শিখা উঠল

আকাশে

যুবককে অভিযুক্ত করল

জনতা ধর্ষণের দায়ে

গণরোষে ছিন্নভিন্ন সকাল

তাকে বাঁচাতে এলো মুণ্ডিত মস্তক বৌদ্ধভিক্ষু

এল প্রজাপতি ব্রহ্মার সাধক

ততক্ষণে আক্রোশের কহরদরিয়া

সহস্র ফণায় গর্জে উঠেছে

যুবকের নাক থেকে

বুক থেকে

পাঁজরের প্রতিটি গ্রন্থি থেকে

বেরুতে থাকল কুরুক্ষেত্র

মৃত্যুর আগে গর্ভনাড়ির

প্রতিরক্ষা ভেঙে

এফোঁড় ওফোঁড় হওয়া যুবকের আর্তস্বর―

ও আমার জননীর মতো

আমি ঠিক তার জনকের মতো


রাতের কালো কোকিল

রাতের কালো কোকিল

মুখর করে তোলে বসন্তের গান

মাতাল সব মানুষের ঘুম

লরিতে চড়ে নির্বাসনে যায় ভোর

চেকপোস্ট খতিয়ে দেখে শ্বাস-প্রশ্বাস

দেয়াল আর তার সাঙ্গপাঙ্গ পাথর

আরও উঁচু হয়ে ওঠে―

সূর্যের  মাথা ছাড়িয়ে

রাষ্ট্র বাড়িয়ে দেয় ট্যাক্স

 বিদ্যুতের বাহাদুরি

গ্যাসের গর্জন

অকটেনের খিঁচুনি

ক্ষিপ্রতা আর ঋষভ স্বর

রাতের কালো কোকিল

কাঁধে তার গিটারের মহীসোপান

যুবক যুবতী মেতে ওঠে অচেনা দীর্ঘ চুম্বনে

ঢেউ তোলে অজানা আতঙ্ক

মেঘেরা নেমে আসে মুখের কাছে

কানফাটা বজ্রের করতালি

সংবাদে সবকিছু স্বাভাবিক

সংকীর্তন আর মহিমাকীর্তন

মৃত্যু ক্ষুধা যন্ত্রণা অনিবার্য নিয়তি

সব গ্রন্থাগারের চোখ বাঁধা

সব কারাগারের  কণ্ঠ স্তব্ধ

রাতের কালো কোকিল গান গায় পৃথিবীর সব আইল্যান্ডে

মস্কো থেকে তেহরান

চিন থেকে ভারতবর্ষ

আমেরিকা থেকে ইউক্রেন

জুরিখ থেকে জেরুজালেম

ঠোঁটে তুলে নেয় বাঁশি

নদী এসে মেশে তার সাথে

বৃক্ষ মাথা দুলিয়ে সমর্থন দেয়

আগুন নাচে শিখা ছড়িয়ে

খুলে যায় সব দেয়াল

গলে যায় পাথরঘণ্টা

বাতাস অপেক্ষা করে বসন্তের

রাতের কালো কোকিল

কপালে  তার নক্ষত্র

কণ্ঠে আদিম আকাশ

দিগদিগন্ত ঝলকায় তার গানে

রাতের কালো কোকিল


দাঁড়াবার জায়গা নেই

দাঁড়াবার জায়গা নেই

প্রত্যেকের পা আকাশের দিকে

আতঙ্কে নক্ষত্রের চোখ বন্ধ 

শিশিরের পিংপং বল―থিতু হতে পারছে না ঘাসে

 দিগন্তে প্লাবনের অথৈ আক্রোশ

ডাইনিরা কাঁটা দিয়েছে পথে পথে

দশমুখ ভুজঙ্গের ফণা দুলছে বাতাসে

প্রজাপতি আগুনের বদলে

ঝাঁপ দিচ্ছে অশ্রুজলে

অগণিত স্বেচ্ছাসেবক দাহ করছে

বৃক্ষশিশুদের

ক্ষুধা বিবশ করেছে বীরবাহু

তৃষ্ণা তীরন্দাজের আজ্ঞাবহ

কষ্ট ছাড়া পদাবলি নেই

দুঃখ ছাড়া ভাটিয়ালি

নগরের বিপণি বিতানে

গঞ্জের হাটে বানরের আধিপত্য

সাইরেনকন্যাদের হুঙ্কারে স্তব্ধ 

নাবিকের কান

বিজ্ঞান বন্ধ্যা আর দর্শন আত্মকেন্দ্রিক

জ্ঞানরাজ্য দখল নিয়েছে পিপীলিকা

মাৎস্যন্যায়―সংবাদপত্র বলছে রেখে ঢেকে

যিশুও আকাশ থেকে নামতে পারছে না


আপেক্ষিকতত্ত্ব

মাথা এক প্রতিশ্রুতি

সেখানে বাস করে মহাকাশযান

এবং শূন্যতার এক জাদুঘর করোটি নির্মিত

প্রদর্শিত হয় প্রাগৈতিহাসিক হাড়গোড় আর হিম শিখাময় প্রস্তরযুগ

আগ্নেয় শিলায় খোদিত নক্ষত্র

পাথরের আকাশ―গাছপালা

সমুদ্রের ঢেউ―যার চূড়ায় কার্থেজ

মানুষের প্রতিমূর্তি চেনা যায়

রক্তের শিখায়

আরশোলার পায়ে আঁকা প্রতিপাদ্যে প্রমাণিত

―মৃত্যু আপেক্ষিক

প্রতিটি মহাযুদ্ধের পর

তৈরি  হয় বিখ্যাত জাদুঘর

উদ্বোধন করেন―হের আইনস্টাইন

—————————

সচিত্রকরণ : রজত

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button