আর্কাইভবিশেষ আয়োজনসাক্ষাৎকার

সাহিত্য-সমালোচনাটাও একধরনের সাহিত্যচর্চা : ―সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

বিশেষ আয়োজন : দুটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার

[অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর জন্ম ঢাকার বিক্রমপুরে ২৩ জুন ১৯৩৬ সালে।

পিতার চাকরি সূত্রে তাঁর শৈশব কেটেছে কলকাতা ও রাজশাহীতে। রাজশাহীর লোকনাথ হাইস্কুলে কিছুদিন পড়ার পর কলকাতার সেন্ট বার্নাবাস স্কুলে পড়েন এরপর ঢাকার সেন্ট গ্রেগরি স্কুলে ভর্তি হন। এখান থেকে ম্যাট্রিক পাশের পর নটরডেম কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর অর্জন করেন। উচ্চতর শিক্ষালাভের জন্য যুক্তরাজ্যের লিডস ও লেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ে গমন করেন।

দেশে ফিরে ১৯৫৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগে যোগদান করেন। খুব দ্রুত তিনি একজন পরিচ্ছন্ন আদর্শবাদী ব্যক্তিত্বের মর্যাদা লাভ করেন।

তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট কর্তৃক দুবার উপাচার্য হওয়ার জন্য মনোনীত হয়েছিলেন। কিন্তু তিনি তা বিনয়ের সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করেন।

২০০৩ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত দুই মেয়াদে ইউজিসির অধ্যাপক হিসেবে মনোনীত হন।

বর্তমানে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ইমেরিটাস অধ্যাপক হিসেবে আছেন।

শৈশব থেকেই সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর মধ্যে লেখক হওয়ার বাসনা ছিল। কিন্তু লেখালেখি করতে গিয়ে সাহিত্যের সৃজনশীলতার পথটির চেয়ে সামাজিক ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের বিষয় তাঁর সামনে অধিক মনযোগের বিষয় হয়ে পড়ে।

ফলে প্রবন্ধ হয়ে ওঠে তার মূল বিষয়! দৈনিক এবং সাহিত্যপত্রে অসংখ্য প্রবন্ধ লিখেছেন!

এ যাবতকাল তাঁর প্রায় শতাধিক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। লেখালেখির জন্য ১৯৭৬ সালে পেয়েছেন বাংলা একাডেমি পুরস্কার,

১৯৯৬ সালে একুশে পদক।

তাঁর সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন বিশিষ্ট প্রকাশক ও মুক্তিযোদ্ধা মজিবর রহমান খোকা।]

মজিবর রহমান খোকা : স্যার, কেমন আছেন আপনি ?

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : হ্যাঁ, ভালো আছি।

মজিবর রহমান খোকা : স্যার, আমরা একটি কাজ করছি সেটি বাংলাদেশের জেলায় জেলায় যারা দীর্ঘদিন যাবত লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত আছেন। তাঁরা নিভৃতচারী, ঢাকার প্রতি আগ্রহ তাঁদের কম। আমরা তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছি এবং তাঁদের লেখালেখির বিষয়গুলো তুলে আনার চেষ্টা করছি। কাজটি শুরু করেছি এ বছর থেকে। গতবছরও আমরা অনলাইনে লেখক, পাঠকের সঙ্গে কথা বলেছি―যে পাঠকেরা প্রকাশনার মূল মাধ্যম। আমরা আশান্বিত হয়েছি যে খুব ভালো ভালো পাঠক তৈরি হয়েছে যারা সমালোচনা ও বিশ্লেষণ করতে পারে। উপন্যাস, প্রবন্ধ, গল্প তাঁরা খুব সুন্দরভাবে উপস্থাপন করতে পারে। আপনার কাছে কিছু বিষয় জানতে চাই যেমন, সম্প্রতি নজরুলচর্চায় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ আপনি বাংলা একাডেমি প্রবর্তিত নজরুল পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। আপনাকে অভিনন্দন জানাই। আমরা জানি, ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি শতবর্ষ অতিক্রম করল। আপনার কাছে আমরা জানতে চাই, নজরুলকে আপনি বিশ্বসাহিত্যের ঐতিহ্যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন ? তাঁকে আমরা কীভাবে গ্রহণ করতে পারি।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : বিশ্বসাহিত্য তো অনেক বড় একটা ব্যাপার। নজরুল যেটা করেছেন সেটা হলো তিনি আমাদের স্থানীয় সাহিত্যকে উচ্চপর্যায়ে নিয়ে গেছেন এবং তা বিশ্বসাহিত্যের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে। কিন্তু বিশ্বসাহিত্যে কত বড় স্থান সেটা বিবেচ্য বিষয় নয়। নজরুল তার কালকে এত সুন্দর ও এত গভীরভাবে তুলে ধরেছেন সেটা অসাধারণ। রবীন্দ্রনাথ তো অসামান্য। এক কথায় তাঁর সমতুল্য নেই। তারপরই নজরুলের অবস্থান। পুরো যুগের যে চেতনা, সেই চেতনাকে তিনি ধারণ করেছেন এবং সে চেতনাকে গভীরভাবে ধারণ করেছেন। অত্যন্ত আনন্দদায়ক এবং সৌন্দর্যসম্পন্নভাবে উপস্থাপন করেছেন যেগুলো সাহিত্যিক গুণ হিসেবে অসামান্য। যদিও এগুলোর তাৎক্ষণিকতা আছে, সমসাময়িক ঘটনাকে দেখেছেন। কিন্তু সমসাময়িক ঘটনার ভেতরেও চিরকালীন যে বিষয়টিও আছে। যেটি আপনি শুরুতেই বললেন বিদ্রোহী কবিতা প্রসঙ্গে, বিদ্রোহটা কিন্তু শুধু বিদ্রোহ নয় একটা বিপ্লবের চেতনা তার মধ্যে ছিল। ১৯১৭ সালে রুশ বিপ্লবের যে প্রভাব সেটি সারা বিশ্বে ছড়িয়েছে এবং আশ্চর্যজনকভাবে  তা এই ১৯ বছর বয়সি তরুণ কবিকে নাড়া দিয়েছে। তখন থেকে সেটিকে ধারণ করছেন, এই বিপ্লবী চেতনাটাকে তিনি পরবর্তীসময়ে তার সাহিত্য রচনার মধ্যে প্রবাহিত করেছেন। তিনি কবিতার বইয়ের নাম দিচ্ছেন সর্বহারা, সাম্যবাদী। সাম্যের গান গাই গেয়েছেন এবং নারী মুক্তির কথা বলছেন। বিষয়গুলো তখন এতভাবে আসেনি। বাংলা সাহিত্যে তো আসেইনি। এমনকি বিশ্বসাহিত্যের প্রসঙ্গে যে বললেন, সে বিশ্বসাহিত্যে তখন আসতে শুরু করেছে। বিশ্বসাহিত্যের সে আগমনী তা নজরুলের এই বিষয়গুলোর সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছে। নতুন জাগরণ, নতুন যুগ, সেই যুগের তিনি নিজেকে বলেছেন তুর্যবাদক, অগ্রগামীদের বার্তা তিনি দিচ্ছেন সেখানেই, তিনি বিশ্বের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছেন।

মজিবর রহমান খোকা : প্রসঙ্গ ধরেই জানতে চাই, প্রায় শতবর্ষ আগে নজরুলের যে অসাম্প্রদায়িক উচ্চারণ, সেটি আজ একবিংশ শতাব্দীতে এসেও কোনও কবি-লেখক করার সাহস দেখাতে পারছেন না। তখন শিক্ষিত বাঙালির সংখ্যা কম ছিল। এখন সে তুলনায় আমরা অনেক শিক্ষিত হয়েছি। শিক্ষা আমাদের মনন তৈরি করতে পারছে না কেন ? কেন আমরা প্রতিক্রিয়াশীল অসহিষ্ণু হয়ে পড়েছি ?

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : এটা কিন্তু সাহিত্যের কারণে না। এটা আর্থসামাজিক এবং রাজনৈতিক কারণে। ঘটনা হলো নজরুল যে ব্যবস্থাটার বিরুদ্ধে লড়ছিলেন সেটা হচ্ছে আমরা যাকে বলি পুঁজিবাদী ব্যবস্থা। পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে তার সংগ্রাম এবং পুঁজিবাদী ব্যবস্থার যত রকম অনুষঙ্গ আছে, উপাদান আছে, ধারা আছে, দিকগুলো আছে, নজরুল তার বিরুদ্ধে দাঁড়াচ্ছেন। এবং তিনি বের করছেন অর্ধ-সাপ্তাহিক পত্রিকা ধূমকেতু, বের করছেন সাপ্তাহিক পত্রিকা লাঙ্গল। ধাপে ধাপে এগোচ্ছেন। সোভিয়েত ইউনিয়নে বিপ্লব হয়েছে। সেটাকে ধারণ করে চীনেও বিপ্লব হলো। পরবর্তীসময়ে দেখা গেল সোভিয়েত ইউনিয়ন তার বিপ্লবী যে পরিবর্তন হল সেটা ধরে রাখতে পারছে না। পুঁজিবাদ নানারকম স্বার্থ দিয়ে, নিপীড়ন দিয়ে, কৌশল দিয়ে, প্রচার দিয়ে, প্রলোভন দেখিয়ে একটা পরিবর্তনের যে ধারা তাকে প্রতিহত করছে। ফলে নজরুল সারাবিশ্বে যে বিপ্লব চাইছিলেন সেটি ছড়িয়ে গেল না। এবং তার নিজের দেশেও কোন সামাজিক বিপ্লব ঘটলো না। ফলে ঐ যে সামাজিক রোগগুলো ছিল, রোগের যেসব লক্ষণ ছিল সবগুলোই রয়ে গেছে। তার ফলে আমরা যেটা দেখছি পুঁজিবাদ একেবারে নিকৃষ্টতম পর্যায়ে চলে গেছে, নৃশংস রূপ ধারণ করছে। তাই নজরুলের বইতে যেসব লেখা সেই লেখাগুলো এখনও প্রাসঙ্গিক রয়ে গেছে, পরিবর্তনটা হয়নি। ওই লেখার যে আকাক্সক্ষাটা ছিল সে আকাক্সক্ষাটা বাস্তবে রূপান্তরিত হয়নি। সেই পুঁজিবাদী বাস্তবতাটা কিন্তু সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। সমাজতন্ত্র পিছিয়ে গেছে এবং পুঁজিবাদের দৌরাত্ম্য সর্বক্ষেত্রে বিস্তৃত হয়ে গেছে।

মজিবর রহমান খোকা : দেশে এখন অসংখ্য বিশ্ববিদ্যালয়। আপনি নিজে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ছিলেন। আপনাদের সময়ের শিক্ষার সঙ্গে এখনকার শিক্ষার তুল্যমাণ কেমন ? শিক্ষার উন্নয়নে আমরা কি ব্যর্থ হচ্ছি ?

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : না, যেটা হয়েছে সেটা হলো আগের চাইতে এখন কিন্তু ছেলেমেয়েরা অনেক খবর রাখে। ইন্টারনেটে বলেন, মেমোগ্রামে বলেন, যেভাবেই হোক তারা বইপত্রের খবর রাখে। এগুলো থেকে অনেক বেশি তথ্য সে পাচ্ছে। কিন্তু শিক্ষার সঙ্গে আপনি যদি জীবিকার সংযোগ ঘটাতে না পারেন তাহলে কিন্তু শিক্ষা আর এগুলো না। আমাদের দেশে আগে যে পরিস্থিতিটা ছিল সেটা হলো―আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার কথা বলছি―বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে গেলে একজন শিক্ষার্থী নিশ্চিত থাকতো যে কোনও না কোনও একটা চাকরি পাওয়া যাবে। বা কোনও না কোনও একটা ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হতে পারবে। কিন্তু এখন জীবিকার যে অনিশ্চিয়তা সেটা প্রকটভাবে দেখছি। আমরা এগিয়েছি, আমাদের অনেক উন্নতি হয়েছে কিন্তু কর্মসংস্থান বাড়েনি। কর্মসংস্থান না বাড়লে তো এই যে যারা বেরিয়ে যাচ্ছে তারা তো একটা অনিশ্চিত জীবনের দিকে চলে যাচ্ছে। তারা নিশ্চিত না ঐ জায়গায় গিয়ে তারা কোন্ অবস্থায় থাকবে। ফলে তাদের পক্ষে বিদ্যা অর্জনের জন্য যে আগ্রহটা তা সীমিত হয়ে আসছে। এটা একটা বড় ব্যাপার। আমরা যদি কর্মসংস্থান না বাড়াতে পারি তবে এই সুশিক্ষার মান কখনও বাড়বে না। আরও একটা জিনিষ যুক্ত করতে হবে, শিক্ষকরাও কিন্তু আগের মতো মনোযোগ দিচ্ছেন না। শিক্ষকরা এই যে একটা ব্যবস্থা যেখানে অর্থ দিয়ে মানুষের মর্যাদা নির্ণয় করা সেই জায়গাতে তারা রয়েছেন, তারা এসবের শিকার হচ্ছেন। ব্যক্তিগতভাবে না হলেও পারিবারিকভাবে চাপ আছে। কাজেই অখণ্ড মনোযোগ দিয়ে যে নিজেকে তিনি শিক্ষার কাজে নিয়োজিত রাখবেন সেটা সম্ভব হয়ে উঠছে না। প্রতিযোগিতামূলক জায়গাটাও দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। উন্নত শিক্ষক গোষ্ঠী না পেলে শিক্ষার মান উন্নত হতে পারে না। যোগ্য শিক্ষকের যে নিয়োগ সেটাও কিন্তু হচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রেই দলীয় বিবেচনা চলে আসে। এভাবে তো যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ করা যায় না।

মজিবর রহমান খোকা : সমাজ পরিবর্তনে কোনটা বেশি জরুরি ? অর্থনৈতিকভাবে উন্নত জনগোষ্ঠী নাকি সুশিক্ষিত জনগোষ্ঠী ?

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : সুশিক্ষিত জনগোষ্ঠী বেশি জরুরি। কেননা অর্থনৈতিক উন্নয়ন তো হচ্ছেই। কিন্তু অর্থনৈতিক উন্নয়নে সমাজ পরিবর্তন ঘটতে দেখা যায় না। সমাজ পরিবর্তনের জন্য চেতনার দরকার। এই চেতনা চাই যে বিদ্যমান ব্যবস্থাটা গ্রহণযোগ্য নয়। উন্নত জনগোষ্ঠী যদি আত্মকেন্দ্রিক হয় তাহলে তো কাজ হবে না। পরিবর্তনের জন্য সচেতনতা চাই। এর জন্য সচেতন মানুষ দরকার। কারণ শিক্ষিত মানুষ মানেই যে সচেতন মানুষ এটা কিন্তু নির্দিষ্ট করে বলা যাবে না। কাজেই মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। এই সচেতনতা সাংস্কৃতিকভাবে তৈরি করতে হবে। সেখানে শিক্ষা যোগ হবে, সেখানে সাহিত্য যোগ হবে, সেখানে আবৃত্তি, গান, নাটক, অভিনয়, নৃত্য সমস্ত কিছু যোগ হবে। বিতর্ক হতে হবে। মূলত উদ্দেশ্য হচ্ছে সচেতনতা সৃষ্টি করা। সচেতনতা না থাকলে মূল্যবোধ তৈরি হয় না।

মজিবর রহমান খোকা : আবার যদি একটু সাহিত্যে ফিরি, আপনি সাহিত্যের সমালোচকমূলক প্রবন্ধ লিখেছেন। বিশ্বসাহিত্য সম্পর্কে আপনার লেখা পড়ে আমরা অনেক কিছু জেনেছি। কিন্তু এখন আপনি সে ধরনের প্রবন্ধ খুব কম লেখেন। এর কারণটা কি ?

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : আমি প্রবন্ধ লিখেছি, মানে আমার যা যা লেখার তাই লিখেছি। আমি এখন যেটা করতে চাচ্ছি, সেটা হলো আমাদের সংস্কৃতি নিয়ে আলোচনা। সংস্কৃতির মধ্যে ইতিহাস আছে, অর্থনীতি আছে। সেই সংস্কৃতির বিষয়েই আমি লিখছি। সংস্কৃতির মানের উন্নয়ন চাই। আর উন্নয়নের কাজে সাহিত্যের চর্চ্চা অত্যাবশ্যক। আমি সেটা মনে করি যে, সাহিত্যের ওই চর্চাটুকু আমি করছি। এখন যা লিখছি সেগুলোও কিন্তু সাহিত্যিক রচনা। সাহিত্যিক রচনা মানে সেই রচনা যা আপনাকে বিচলিত করবে, আপনাকে চিন্তিত করবে এবং যা হৃদয়গ্রাহী হবে। আমি ওইভাবে লিখতে চেষ্টা করছি। লেখাগুলো সাংবাদিকতার মতন নয়। আমি সাহিত্যের গভীরে গিয়ে লেখার চেষ্টা করছি, এতে দর্শন, ইতিহাস আনতে চাই এবং হৃদয়গ্রাহী করাটা লক্ষ থাকে যাতে করে মানুষ পড়ে আনন্দ পায় এবং চিন্তিত হয়। লেখাটা পড়ে যেন পাঠক একটা ধাক্কা খায়। মনে রাখে, এটা হচ্ছে আমার লক্ষ্য। সেটা কতটা সম্ভব হচ্ছে দেখার বিষয়।

মজিবর রহমান খোকা : স্যার, সমাজ যখন এগোচ্ছে, দেশ যখন এগোচ্ছে, সমাজের সমস্যাগুলোও কিন্তু আরও বাড়ছে। আপনি যখন লিখেছেন তখন এক ধরনের সামাজিক সমস্যা ছিল এখন কিন্তু আরও বিস্তৃত হয়েছে। তাহলে কি আপনার লেখা আরও ধারালো হওয়া উচিত নয় ?

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : হ্যাঁ, লেখা তো ধারালো হতেই পারে, কিন্তু গভীর হওয়াও দরকার। আমি সংস্কৃতির কাছে যদি আসি তখন ধারালো হলে আওয়াজ হবে, হইচই এবং চিৎকার আসবে, শোনা যাবে, একধরনের চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে। কিন্তু ওটা গভীরে গিয়ে মানুষকে চিন্তিত না করে, ভাবিত না করে তাহলে ? সমস্যাগুলো রয়েই গেছে। সমস্যাগুলোকে ঐতিহাসিকভাবে, দার্শনিকভাবে দেখতে হবে।

মজিবর রহমান খোকা : সাহিত্যের বিকাশে সমালোচনা সাহিত্য কতটা জরুরি ? বাংলাদেশের সমকালীন সমালোচনা সাহিত্য সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন জানতে চাই।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : এটা খুবই জরুরি। সাহিত্য-সমালোচনাটাও একধরনের সাহিত্যচর্চা। আমরা লিখলাম, এই লেখাটা ঠিক হচ্ছে কিনা, পাঠক এটাকে কীভাবে নিচ্ছে, পাঠক কি চিন্তা করছে এ বিষয়ে, সেটা জানা জরুরি। এটা আসে ওই সমালোচনা থেকেই। সমালোচনা জিনিসটা আমাদের এখানে নাই। আগে যতটা ছিল এখন সেটা আরও ক্ষীণ হয়েছে। এতে খুব অসুবিধার জায়গা হচ্ছে, আমরা বুঝতে পারি না যে আমাদের লেখা পাঠক কীভাবে নিচ্ছে। বইয়ের কাটতির দিয়ে সেটা সম্ভব নয় বুঝতে হবে যে, পাঠক এটা কীভাবে নিচ্ছে। তার প্রতিক্রিয়া কি ? তার মধ্যে কি আলোড়ন সৃষ্টি করছে ? আরেকটি বিষয় হলো বিশ্বজুড়েই কিন্তু সাহিত্য অবমূল্যায়িত হচ্ছে। সাহিত্যকে আর ওভাবে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না এজন্য যে, বিনোদন এসেছে। আর সাহিত্য নিজেও গভীরে যেতে পারছে না। সাহিত্যকে জ্ঞান দিতে হবে। জ্ঞান ছাড়া সাহিত্যের চর্চা হবে না। সাহিত্য কোনও ভাসমান বিষয় নয়। সাহিত্য ইতিহাসের বিষয়, দর্শনের বিষয়, জ্ঞানের বিষয়। সেই জায়গাটাতে আমরা যেতে পারছি না। এটা বিশ্বব্যাপী একটা সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। জ্ঞানের মূল্য কিন্তু এখন কমে গেছে এই পুঁজিবাদী ব্যবস্থায়। জ্ঞানও পণ্যে পরিণত হয়েছে। কাজেই ব্যবস্থাটা বদলাতে হবে। পাঠাগারকে আগের মত শুধু বই পড়ার জায়গা করে রাখলে চলবে না। পাঠাগারগুলোকে সংস্কৃতিচর্চার কেন্দ্র করে তুলতে হবে। যেখানে বই সম্পর্কে আলোচনা হবে, অন্যান্য বিষয়ে বক্তৃৃতা হবে, বিতর্ক, গান, নাটক হবে। মানুষ পাঠাগারে বই পড়ার জন্য তো যাবেই কিন্তু আরও যাবে এটা জেনে যে ওখানে গেলে কোন না কোন অনুষ্ঠান সে পাবে এবং ঐসব অনুষ্ঠান তাকে আনন্দ দেবে। আমরা ঐ জায়গায় যেতে পারছি না। সাহিত্য যেটা চায় যে সেটা হলো সংলগ্ন করা। আর পুঁজিবাদী সমাজে যেটা ঘটছে সেটা হলো বিচ্ছিন্নতা বৃদ্ধি। তো এই বিচ্ছিন্নতা দূর করার জন্য সাহিত্যকেই আবার ফিরিয়ে আনতে হবে।

মজিবর রহমান খোকা : একটা সমাজে বুদ্ধিজীবীর ভূমিকা কী ? আমাদের সামাজিক অবক্ষয়ের অন্যতম কারণ জাতীয় বুদ্ধিজীবীর সংকট কি না ?

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : হ্যাঁ, বুদ্ধিজীবীদের তো একটা ভূমিকা থাকেই। বুদ্ধিজীবী কাকে বলব ? বুদ্ধিজীবী সেই মানুষ যিনি বুদ্ধি দিয়ে ব্যবস্থাটা বিশ্লেষণ করেন। শুধু বিশ্লেষণই করেন না, বিশ্লেষণকে তিনি অন্যের কাছে পৌঁছে দেন এবং একটা লক্ষ্য রাখেন যে পরিবর্তন আনতে হবে। এই যে তিনটি কাজ, ব্যাখ্যা করছেন, নিয়ে যাচ্ছেন এবং পরিবর্তনের পক্ষে কাজ করছেন এই বুদ্ধিজীবী না থাকলে তো সমাজ বদলাবে না। আমাদের দেশে সেই বুদ্ধিজীবী পাওয়া যাচ্ছে না। কেউ হয়তো ব্যাখ্যা করেন, কেউ করেনও না, কেউ পড়েন এবং নিজে যেটা বোঝেন সেটাকে অন্যের কাছে পৌছে দিতে চান না বা পরিবর্তনও চান না। এবং অন্যের কাছে পৌছে দেওয়ার জন্য যে মাধ্যম দরকার সেই মাধ্যমও কিন্তু নেই। আপনি দেখুন যে মাসিক পত্রিকা নেই, আপনি দেখুন টেলিভিশনে বা রেডিওতে যে ধরনের আলোচনা হওয়া দরকার, বিতর্ক হওয়া দরকার সেগুলো নেই। বইপত্র আগের মতো বিক্রি হয় না; তার বড় একটি কারণ প্রচারের অভাব। মাধ্যমটা নেই। পৌছে দিতে পারছি না আমরা। আমরা পরিষ্কারভাবে উপলব্ধি করতে পারছি না যে এই সমাজ বদলে আমরা কোন ধরনের সমাজ চাই। কেবল বদলানোর কথা বললে তো হবে না। যেটা উপলব্ধি করা দরকার আজকের পৃথিবীতে যে সংকট দেখা দিয়েছে সেটা পুঁজিবাদের সংকট। পুঁজিবাদ এই সংকটকে সমাধান করতে পারে না। পুঁজিবাদের মূল জায়গাটা হলো ব্যক্তি মালিকানা ও মুনাফা। এই জায়গা থেকে সরে এসে শুধু আমাদের না, সারা পৃথিবীকেই যেখানে যেতে হবে সেটা হলো সমষ্টিগত মালিকানা, যাকে আমরা সামাজিক মালিকানা বলি। যেটার লক্ষ্য মুনাফা থাকবে না। যেটার লক্ষ্য থাকবে উৎপাদনের প্রাচুর্য আনা, এবং উৎপাদিত দ্রব্যগুলো সকলের কাছে পৌঁছে দেওয়া। বুদ্ধিজীবীরা যখন এটা উপলব্ধি করবেন তখনই আমরা বর্তমানের সীমা থেকে বেরিয়ে আসতে পারব। পৃথিবীটা কিন্তু এখন একটা গভীর সংকটের মধ্যে আছে। এটা মনুষ্য বসবাসের উপযোগী থাকবে কি না, এখানে প্রকৃতির কী অবস্থা হবে, জীববৈচিত্র্য থাকবে কি না এসব প্রসঙ্গ কিন্তু এখন চলে এসেছে জলবায়ু পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে বিশেষ করে। এবং দেখা যাচ্ছে যে নৃশংসতা চলছে যুদ্ধ চলছে, অস্ত্র নিয়ে এখনও প্রতিযোগিতা চলছে, উৎপাদনের প্রতিযোগিতা, বিক্রয়ের প্রতিযোগিতা, মাদকাসক্তি বিপুল পরিমানে ছড়িয়ে গেছে, পর্নোগ্রাফির ব্যবসা চলছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আমরা ধ্বংস করে দিচ্ছি। মানুষ খুব উদাসীন হয়ে পড়ছে। ব্যক্তিগত হয়ে পড়ছে। ব্যক্তির স্বার্থ দেখছে। অন্যের দিকে তাকাচ্ছে না। যেন আদিম অবস্থা যেখানে কেউ কারও দিকে তাকায় না, সকলেই বেদনার দ্বারা আহত কিন্তু কেউ কাউকে সমবেদনা জানায় না। আদিম জায়গায় তো আমরা ফেরত যেতে চাই না। হাজার হাজার বছর ধরে সভ্যতা এগিয়েছে। কিন্তু এই অগ্রগতির সমস্তটাই ছিল ব্যক্তিমালিকানা ভিত্তিক। এখন এটাকে নিয়ে যেতে হবে সামাজিক মালিকানায়। আদিম সমাজে কিন্তু সামাজিক মালিকানা ছিল, ব্যক্তি মালিকানা ব্যবস্থা ছিল না। আমরা আদিম সমাজে যাব না, আমরা এই সভ্য সমাজেই থাকব। কিন্তু সম্পদের যে মালিকানা সেইটা ব্যক্তির হাতে ছেড়ে দেব না। সেটা আমরা সমাজের হাতেই রাখব এবং আমরা যেটা করব সেটা হলো একটা গণতান্ত্রিক সমাজের গঠন। যেখানে নাগরিকদের অধিকার এবং সুযোগের সাম্য থাকবে। ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ঘটবে। রাষ্ট্র ও সমাজের প্রত্যেক স্তরে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা শাসন করবে এবং তারা জবাবদিহিতার আওতায় থাকবে।

মজিবর রহমান খোকা : আমরাও তো একসময় বুদ্ধিজীবীদের গাইডলাইনগুলো দেখেছি। বুদ্ধিজীবীদের স্বতন্ত্র একটা ধারা ছিল। তারা দলমত নির্বিশেষে সার্বজনীন সমাধানের পথে এগোতেন। এখন কেন সেটি হচ্ছে না।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : এখন হচ্ছে না তার বেশকিছু কারণ আছে। রাষ্ট্র ও সমাজ এখন মানুষকে কিন্তু ব্যস্ত রেখেছে। ব্যবস্থাটাই এরকম যে প্রত্যেকেই ব্যস্ত। যাতায়াতের অসুবিধা, উপার্জনের অসুবিধা, দ্রব্যমূল্য। সুবিধা এত অল্প যে সুবিধাবাদী ভাব ঢুকে পড়েছে। যেখানে একটু সুবিধা পাওয়া যায় মনে হয় যে এটাই আমি নিয়ে নিই। এটা আমার প্রয়োজন। সুবিধাবাদিতা থেকে আপোষকামিতা আসছে, কাজেই ওই যে সমাজ পরিবর্তনের আন্দোলনের যে ধারাবাহিকতা বা সংঘবদ্ধতা বা যৌথ উদ্যোগ সেটা কমে যাচ্ছে। এটা খুব বিপদের কথা। এটা চলতে থাকলে তো সমাজ পরিবর্তিত হবে না। কিন্তু আমি আশাবাদী যে পরিবর্তন আসবে।

মজিবর রহমান খোকা : আমরা বলি প্রকৃত গণতন্ত্রের কথা। কিন্তু আমরা গত পঞ্চাশ বছরে দেখেছি, ক্ষমতায় যে দলই থাকুক, দুঃশাসন ও দুর্নীতি বন্ধ হয়নি। তাহলে গণতন্ত্র কি করে আমাদের বৈষম্যহীন সমাজ নিশ্চিত করবে ? আমাদের প্রধান সমস্যা কোথায় ?

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : আমরা ব্রিটিশ আমলে উপনিবেশে ছিলাম, পাকিস্তানিরা একটু উপনিবেশ করার চেষ্টা করল আমরা বেরিয়ে গেলাম। আমরা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করলাম। পঞ্চাশ বছর ধরে এই রাষ্ট্রের মধ্যেই আছি। কিন্তু রাষ্ট্রের অন্তর্গতর যে চরিত্র সেটা কিন্তু বদলায়নি। রাষ্ট্র ছোট হয়েছে, নামে বদলেছে, উন্নতি হয়েছে নানা রকমের। কিন্তু ঐ যে পুঁজিবাদের বিকাশ যা ব্রিটিশ আমলে শুরু হয়ে গেছে ঔপনিবেশিকতার মধ্য দিয়ে সেটা অবিরাম চলছে। তারা আমাদের সম্পদগুলো পাচার করে তাদের দেশে নিয়ে গেছে। পাকিস্তানিরা এখানে আরেকটা আভ্যন্তরীণ উপনিবেশ করতে চেয়েছিল। এখান থেকে সম্পদ তারা নিয়ে যাবে করাচিতে। এখন যেটা হচ্ছে, গত পঞ্চাশ বছর ধরে সেটা ঐ একই জিনিস। শাসক বদলেছে কিন্তু শাসন বদলায়নি। যে লুণ্ঠনটা ব্রিটিশ এবং পাকিস্তানিরা করেছিল সেই লুণ্ঠনটা কিন্তু চলছেই। কাজেই উপনিবেশ এখানেও তৈরি হয়েছে। এটা স্থানীয় লোকদের উপনিবেশ। এবং এই স্থানীয় লোকেরা কিন্তু মনে করে যে এই দেশটার ভবিষ্যৎ নাই। তাই এর থেকে যত সম্পদ পারা যায় বিদেশে পাচার করতে হবে এবং সেখানে তাদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা চাই। এই পাচার কিন্তু চলছেই। এজন্য আমরা উন্নতি করছি কিন্তু কিন্তু উন্নতিটা সকলে পাচ্ছে না। যত উন্নতি হচ্ছে তত কিন্তু বৈষম্য বাড়ছে। এখন গণতন্ত্র বলতে আমি কি বুঝি ? নির্বাচন হলো গণতন্ত্রের একটা অঙ্গ। এই নির্বাচনই তো আমাদের এখানে হচ্ছে না। নির্বাচনের মধ্য দিয়ে যারা শাসন করেন দেশ, তাদের মধ্যে ক্ষমতার আদান প্রদান ইত্যাদি হয়ে থাকে। তাতে তো দেশের মানুষের যে উন্নতি হবে তা নয়। তারা নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি এইটা সেইটা করবে, তাও তো পারছে না। একটু আগেই বললাম ওই যে অধিকার আর সুযোগের সাম্য থাকতে হবে। সেটা হচ্ছে গণতন্ত্রের মূল কথা। ভোট তো ওর অংশ একটা। এবং যারা প্রকৃত জনপ্রতিনিধি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হবেন তারাই শাসন করবেন। কিন্তু তাদের একটা জবাবদিহিতা থাকতে হবে। সেটা তো আমরা আনতে পারছি না। সেটা করতে হলে সামাজিক বিপ্লব দরকার হবে। যেটা নজরুল ইসলামের প্রসঙ্গে আমরা বলছিলাম। ওই সামজিক বিপ্লবের স্বপ্নই তিনি দেখছিলেন। কিন্তু সেই সামাজিক বিপ্লব আমাদের দেশে ঘটেনি।

মজিবর রহমান খোকা : বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় আমরা সফল হতে পারছি না কেন ? অর্থনৈতিক মুক্তির সঙ্গে জ্ঞানের মুক্তির সম্পর্কটা কোথায় ?

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : প্রথম কথাটা হল যে আমরা কিন্তু বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজ চাই না আসলে, আমরা একটি গণতান্ত্রিক সমাজ চাই। গণতান্ত্রিক সমাজ হলেই সেখানে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা হবে। শুধু বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা দিয়ে তো কাজ হবে না। এই বিদ্যমান ব্যবস্থার মধ্যে আপনি বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা করছেন, আপনার কথা কেউ শুনছে না। এটাতে কাজ হবে না। গণতান্ত্রিক সমাজ চাই। এবং দ্বিতীয় কথা হচ্ছে শুধু উন্নয়ন দিয়ে হবে না। উন্নয়নটা যেন বৈষম্যহীন হয় সেটা দেখতে হবে। অর্থাৎ উন্নয়নে সকলকে অংশীদার হতে হবে এবং সকলের কাছে এটা পৌছে যাবে। প্রাচুর্যে আসবে কিন্তু তা অল্প লোকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। প্রাচুর্যকে সর্র্বত্রগামী হতে হবে। তথাকথিত বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজ দিয়ে হবে না এই কথাটা কিন্তু আমি জোর দিয়েই বলব। বেঁচে থাকার পরেই তো আপনি চিন্তা প্রক্রিয়া বা জ্ঞানচর্চা করতে পারবেন। অর্থাৎ বস্তুগত চাহিদা পূরণ হলেই জ্ঞানের চর্চাটা মূল্যবান করতে পারব। আর এই ব্যবস্থার মধ্যে তো জ্ঞানের কোন প্রয়োজন নাই। টাকা উপার্জন করার জন্য তো জ্ঞানের দরকার নেই।

মজিবর রহমান খোকা : অনেকে বলে আপনি ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের কথা বলতে গিয়ে প্রায়শই বঙ্গবন্ধুর অবদানকে এড়িয়ে যান, এই অভিযোগ যারা করেন, তাদের কি বলার আছে আপনার ?

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : অবশ্যই বলার আছে। এটা খুবই ভুল কথা। আমাদের এই আলোচ্য ইতিহাসে দুইজন ব্যক্তি খুব গুরুত্বপূর্ণ। একজন মাওলানা ভাসানী আরেকজন শেখ মুজিবুর রহমান। এরা একসাথেই ছিলেন। একই সংগঠনের মধ্য দিয়েই তারা এগোচ্ছিলেন। কিন্তু তাদের মধ্যে একটা পার্থক্য তৈরি হয়েছিল এখানে যে বঙ্গবন্ধু যেটা চাচ্ছিলেন সেটা হলো জাতীয়তাবাদী একটা রাষ্ট্র। যদিও তার মধ্যে সমাজতান্ত্রিক উপাদান থাকবে। ভাসানী যেটা চাচ্ছিলেন সেটা হলো সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র। আমাদের এই রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন। উনসত্তরের অভ্যুত্থান, ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধÑসবকিছুর মধ্যেই শেখ মুজিব ছিলেন। কিন্তু তার পরবর্তী যে জায়গাটা সেটা হলো ব্যবস্থাটার পরিবর্তন করা। ওই জায়গায় তো তিনি আর থাকেন নাই। চার বছরও পার হলো না, তার মধ্যেই তিনি প্রাণ হারালেন। তাকে সরিয়ে দেওয়া হলো। কাজেই এর পরবর্তী ঘটনাগুলোর উপর আমাদের জোর দিতে হবে।

মজিবর রহমান খোকা : আপনি যে স্যার শৈশব-কৈশোর থেকেই একটি ভাবনায় একটি চিন্তায় একটি কল্পনায় একটি রাষ্ট্রীয় দিক দেখতে চেয়েছেন। যে রাষ্ট্রটি সমাজে বৈষম্য দূর করবে। সামাজিক বিপ্লবের মাধ্যমে আপনি একটি স্বপ্ন দেখছেন। জীবনের এই ছিয়াশি বছর বয়সে এসে কি সেরকম কোন লক্ষণ দেখতে পেয়েছেন ?

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : আমি নিজেও এই বিষয় সম্পর্কে আগে অত সচেতন ছিলাম না। আমাদের কৈশোরে আমরা পড়ালেখার পর্যাপ্ত বই পেতাম না, কিন্তু আমরা সাহিত্যের বই পড়তাম। আমি তো সাহিত্যের অনুরাগী, সাহিত্যচর্চা করছি, সাহিত্য পড়ছি। আমার যে নতুন উপলব্ধিটা এল সেটা ১৯৫৯ সালে। তখন গেলাম ইংল্যান্ডে। ওখানে গিয়ে আমি একটা নতুন জগতের খবর পেলাম। আমরা তো গ্রাম্য একটা সমাজে বাস করতাম। যেখানে বইপত্র ছিল না, আদান প্রদান ছিল না। তো আমি ইংল্যান্ডে যে শহরে গেলাম সে শহরে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা হয়, বামপন্থিরা আন্দোলন করে, বইপত্রের সন্ধান পেলাম, চিন্তার সন্ধান পেলাম। তখন পৃথিবীব্যাপী যেসব পরিবর্তন আসছে সে বিষয়ে অবহিত হলাম। তখনই আমার উপলব্ধিটা এল যে সাহিত্যকে কেবল সাহিত্য হিসেবে দেখলে চলবে না, এটা কেবল নান্দনিক একটা বিষয় নয়। এর ভেতরে গভীরতা আছে, দার্শনিকতা আছে এবং গভীরতা না থাকলে, দার্শনিকতা না থাকলে ইতিহাসের চেতনা না থাকলে কোনও সাহিত্যই সাহিত্য হয় না। এটা একটা ভাসমান জিনিস হয়। ওই উপলব্ধিটাই আমার সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্র। এটা আমার মনের মধ্যে পরিবর্তন আনলো এবং আমি নিজেও যে প্রবন্ধ লিখলাম সেগুলো কিন্তু একটা দৃষ্টিকোণ থেকে এসেছে। ধাপে ধাপে চিন্তাটা এগিয়েছে। সমাজে বিপ্লবের কথাটা আমি উপলব্ধি করেছি ধাপে ধাপে এগিয়ে। কিন্তু বিপ্লব তো ঘটেনি। ঘটেনি বলেই তো আমাদের এই দুর্দশা। তাই বলে আমি যে হতাশ হয়েছি সেটা না। মনে করি যে, এই জিনিসটা, এভাবে তো আমার ইচ্ছার উপর নির্ভর করে না। আমি আমার চেষ্টা যুক্ত করেছি এর সঙ্গে। বিপ্লব ঘটেনি কিন্তু তাই বলে যে ঘটবে না এটা আমি মনে করি না। যে জিনিসটা আমাকে আশাবাদী করে যে সেটা হচ্ছে তরুণদের মধ্যে খুব আগ্রহ আছে বই পড়ার জন্য, চিন্তা করার জন্য, এসব বিষয় ভাবার জন্য। তারা নেমে আসে। যেমন সড়ক আন্দোলনে নেমে এল। নিরাপদ সড়ক চাই। এবং সেখানে কেবল আওয়াজ তুলল যে, কেবল সড়কের যানবাহনের উন্নয়ন না, তারা জানালো যে রাষ্ট্রের মেরামত দরকার। উপলব্ধিটা কিন্তু তরুণদের মধ্যে আছে। ওটাই আমাদের ভরসার জায়গা। এই তরুণদেরকে যদি আমরা আরও সচেতন করতে পারি, তাদের সাংস্কৃতিক চাহিদা যদি আমরা মেটাতে পারি তাহলে পরিবর্তনটা ত্বরান্বিত হবে। পরিবর্তন হতেই হবে। পরিবর্তনের উল্টোটা হচ্ছে ধ্বংস। এই দুইয়ের মধ্যে কোন মধ্যবর্তী যায়গা নেই। এই ব্যবস্থা চলবে না। ধ্বংসের যে তাণ্ডব আমরা আশঙ্কা করছি, পদধ্বনি শুনতে পাচ্ছি, সেইটার মুখোমুখি হওয়ার জন্য তরুণদের কাছে আমাদের যেতে হবে। আমাদের সাহিত্য, আমাদের সংস্কৃতিচর্চা নিয়ে তাদের কাছে আমাদের যেতে হবে। আমি দেখছি, তাদের মধ্যে উপলব্ধিটা বাড়ছে। তারা চায় কিছু করতে এবং তাদের আগ্রহটা কমেনি, আগ্রহটা বাড়ছে। সেটা আমাকে আশাবাদী করে।

মজিবর রহমান খোকা : আমাদের দেশে তো এখন নেতৃত্বের সংকট চলছে। এটা আমরা সবাই উপলব্ধি করি। তরুণদের মধ্য থেকে নেতৃত্ব আসবে বলে কি আপনার মনে হয় ?

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : নেতৃত্ব যাতে না আসে তার বন্দোবস্ত আছে। যেমন ধরেন এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কোন ছাত্র সংসদ নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তো আমরা পড়াশোনা করেছি, শিক্ষকতাও করলাম। কিন্তু এই ইতিহাসে কখনওই ছাত্র সংসদ দীর্ঘকালের জন্য স্থগিত থাকবে এটা ঘটেনি। সামরিক শাসন এসছে, তারা থামিয়েছে কিন্তু তারপরও আন্দোলনের মুখে তারা অবস্থান থেকে সরে যেতে বাধ্য হয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশে যখন তথাকথিত গণতান্ত্রিক শাসন এল এরশাদের পতনের পর থেকে, তারপর থেকে কিন্তু ছাত্র সংসদ নেই। এই ছাত্র সংসদ যদি না থাকে তাহলে কিশোররা যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে তারাই তো ভবিষ্যতের নেতৃত্ব নেবে, তাদের যে বিকাশ, সাংস্কৃতিক বিকাশ সেটা কেমন করে ঘটবে ? তারা তো বিতর্ক করতে পারছে না, তারা তো আন্দোলনের মধ্যে যেতে পারছে না, তারা তো পড়তে পারছে না। বা যেটা ঘটা দরকার সেটা কিন্তু ঘটছে না। শিক্ষক তো শুধু ক্লাসরুমে পড়াবেন না। শিক্ষক ক্লাসরুমের বাইরে ছাত্রদের সঙ্গে আদান প্রদান করবেন, বিতর্ক করবেন, আলোচনা করবেন। সেই আদান প্রদানের জায়গাটা নেই। ছাত্ররা দেখবেন, হাজার হাজার ছেলে-মেয়ে উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরছে। তাদের সুস্থ বিনোদনেরও কোনও ব্যবস্থা নেই। তারা যে কোথায় যাবে সেটাও জানে না। তাড়াতাড়ি ঘুরাঘুরি করে আবার চলে যায় নিজের ঘরে। মোবাইলে, ইন্টারনেটে আবদ্ধ হয়ে যায়। কাজেই জায়গাটা, নেতৃত্ব সৃষ্টির যে রাস্তা, সেসব রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছে। এই ব্যবস্থাটাই বন্ধ করে দিয়েছে। কেননা ব্যবস্থাটা জানে, এই পুঁজিবাদী ব্যবস্থা জানে, যে এই রাস্তা খোলা রাখলে এই ব্যবস্থা টিকবে না। এই ব্যবস্থার সঙ্গে যারা সুবিধাভোগী, তাদের স্বার্থ জড়িত এবং স্বার্থ রক্ষা করার জন্য তারা চায় না যে নতুন নেতৃত্ব তৈরি হোক, যে নেতৃত্ব এই ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করবে। তারা চায় এমন তরুণ যারা এর সঙ্গে যুক্ত থাকবে, এর থেকে সুবিধা নেবে এবং সর্বসুবিধা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকবে বা বেকার থাকবে। চাই কি তারা যদি ড্রাগ এডিক্টও হয় তাতেও সমস্যা নেই। তারা যদি কিশোর গ্যাং হয়, হত্যাকাণ্ডে অপরাধে যুক্ত হয় তাতেও কোনও সমস্যা নেই। ব্যবস্থাটা তো টিকলো। কারণ ব্যবস্থাটার সঙ্গে তাদের টিকে থাকাটা জরুরি। এই ব্যবস্থা ভাঙলে তারাও থাকবে না।

মজিবর রহমান খোকা : আপনি তো দীর্ঘ ছয় দশকের বেশি লেখালেখির সঙ্গে সংযুক্ত। যদিও আপনার বয়স এখন ছিআশি বছর। আমরা চাইব আপনি লিখছেন, আরও লিখবেন। এই যে দীর্ঘ পথ আপনি পরিক্রমা করে এলেন লেখালেখিতে, আপনার যে একটা পাঠকশ্রেণি তৈরি হয়ে আছে বা হয়েছে তারা আপনার বই পড়ে এবং তরুণরাও পড়ছে। যারা পড়েছেন তারা জ্ঞানলব্ধ হয়েছেন, যারা এখন পড়ছেন তারা উপকৃত হচ্ছেন। নিশ্চয় তাদের জ্ঞানের বিস্তৃতি হচ্ছে। এই বিষয়টা আপনার কাছে কেমন লাগছে ?

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : এটাই তো লেখক হিসেবে আমাদের আনন্দের বিষয় যে পাঠক পড়ছে। পাঠকের জন্যই তো লিখি। নিজের আনন্দ তো আছেই। কিন্তু পাঠক যদি এটাকে গ্রহণ না করে, প্রতিক্রিয়া না জানায়, তাহলে তো লেখাই ব্যর্থ হয়ে গেল। তো ওই জায়গা থেকে ভালো লাগে যখন পাঠক প্রতিক্রিয়া জানায়, বা পাঠকের চিন্তার মধ্যে তা প্রকাশ পায়। এটাই তো সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

মজিবর রহমান খোকা : আপনার ছাত্রদের মাধমেই জানা যায় শিক্ষক হিসেবে আপনার সততার কথা। এটা অবশ্যই শিক্ষক হিসেবে একটা বড় পাওয়া।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : শিক্ষক হিসেবে আমি আমার দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করার চেষ্টা করেছি। তবে ছাত্রদের সঙ্গে আমার আদান-প্রদান আমি সবসময়ই বন্ধুত্বপূর্ণ রাখতে চেয়েছি। আগে শিক্ষকদের সঙ্গে ছাত্রদের একটা সম্পর্ক ছিল সেটা হল সামন্তবাদী। শিক্ষক ছাত্রকে ধমকাবে, শিক্ষককে দেখে ছাত্র ভয় পাবে। এই ব্যাপারটা আমার পছন্দ ছিল না। আমি ছাত্র শিক্ষকের মধ্যে একটা গণতান্ত্রিক সম্পর্কে বিশ্বাসী ছিলাম। আমি কখনই কোন ছাত্রকে ভয় পাইয়ে দিইনি। আমি যেমন তাদেরকে কিছু দিতে চেষ্টা করেছি, তাদের থেকেও আমি নিয়েছি, তাদের চিন্তা, তাদের উৎসাহ আমাকে অনেক অনুপ্রাণিত করেছে।

মজিবর রহমান খোকা : ধন্যবাদ স্যার আপনাকে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button