
ক্রোড়পত্র : সাহিত্য-বিশ্লেষণ
আমি চঞ্চল হে, সুদূরের পিয়াসী―রবীন্দ্রনাথের এই গানের বাণীকে হৃদয়ে ধারণ করে ‘মাভৈঃ’ মন্ত্রে এগিয়ে চলছে শব্দঘর। দশম বর্ষে পদার্পণ করা বাংলাদেশের সাহিত্য-সংস্কৃতি বিষয়ক মাসিক পত্রিকা শব্দঘর আক্ষরিক অর্থেই এখন, দেশসেরা তো বটেই, আন্তর্জাতিক মানের সাহিত্যপত্র। প্রকাশনা ও লেখার গুণেমানে সত্যিকার অর্থেই শব্দঘর শুদ্ধ শব্দের নান্দনিক গৃহ। করাল করোনাকালের কণ্টকাকীর্ণ পথে এর যাত্রা যদিও কিছুটা শ্লথ হয়ে গিয়েছিল তবে এখন আবার পূর্ণ যৌবনের উদ্দামতা নিয়ে পথ চলছে। নতুন পথান্বেষণে এবং সাহিত্যের মধুচক্র বিনির্মাণে শব্দঘর-এর আগস্ট-সেপ্টেম্বর ২০২২ সংখ্যাটি নতুনত্বের রোলমডেল। মধুসূদনের মধুক্ষরা কাব্যবাণী থেকে ঋণ করে বলা যায় : গৌড়জন যাহে আনন্দে করিবে পান সুধা নিরবধি।
সর্বদাই নতুনত্বের অন্বেষণ ও এষণা শব্দঘর-এর―হেথা নয়, হেথা নয়―অন্য কোথা, অন্য কোনখানে। এই অন্তর্গত প্রেরণায় বলীয়ান হয়ে এবার আগস্ট-সেপ্টেম্বর ২০২২ সংখ্যাটি শব্দঘর-এর বিশেষ গল্পসংখ্যা হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে। বিশেষ গল্পসংখ্যার তাৎপর্যটি বিষয় নির্বাচনে নতুনত্বের স্মারক। এ সংখ্যায় মুদ্রিত হয়েছে তিন দেশের সুনির্বাচিত গল্প―আফ্রিকা, বাংলাদেশ ও ভারতের। এর আগেও শব্দঘর বিশেষ গল্পসংখ্যা প্রকাশ করেছে এবং প্রায় প্রতিবছরই করে থাকে। তবে এ সংখ্যার বিশেষত্ব তিন দেশের গল্প সংকলনে। আমরা ত্রিদেশীয় ক্রিকেট টুর্নামেন্ট দেখেছি, রাজনৈতিক ও সীমান্ত-সমস্যা নিয়ে ত্রিদেশীয় বৈঠকের কথাও জানি। কিন্তু ত্রিদেশীয় গল্পের আয়োজন একটি সাহিত্যপত্রের জন্য সম্ভবত এদেশে এ-ই প্রথম।
ত্রিদেশীয় গল্পসংখ্যায় বিশেষত্বের ভিত্তিতে রচিত হয়েছে এর সম্পাদকীয়টিও। শব্দঘর-এর সম্পাদক বিশিষ্ট কথাশিল্পী মোহিত কামাল জানিয়েছেন, সংখ্যাটি দীর্ঘদিনের পরিশ্রম ও প্রচেষ্টার ফল। মধুমক্ষিকার মতো তিলে তিলে তিনি গড়ে তুলেছেন এই মধুচক্র। তাঁর ভাষায় : দীর্ঘ সময়ের পরিকল্পনা ও কাজের মধ্যে ডুবে থেকে নানা বাধা পেরিয়ে অবশেষে আমরা উপহার দিতে পারছি ‘বিশেষ গল্পসংখ্যা ২০২২ : আফ্রিকা, বাংলাদেশ ও ভারত’। সংখ্যাটি পাঠকের পাঠতৃষ্ণা কতটুকু মিটাবে, এর সামাজিক ও শৈল্পিক মূল্য কতটুকু, ভাষার উৎকর্ষে ও গল্পের গঠনকৌশলে কতটুকু শিল্পমান সম্পন্ন―এসব প্রশ্ন তিনি উত্থাপন করেছেন। নিজের সঙ্গে করেছেন বোঝাপড়া। এই জিজ্ঞাসা আত্মগত এবং নিজেকে স্বর্ণশিল্পীর মতো কষ্টিপাথরে যাচাই করে নেওয়া। এই আত্ম-জিজ্ঞাসা নিজের কর্মযজ্ঞের মাননির্ণয়ের একধরনের অগ্নিপরীক্ষা। সংখ্যাটি কতটুকু সার্থক, ভাবিকালের গবেষকরা সমাজতাত্ত্বিক বিবেচনায় কীভাবে গ্রহণ করবেন―এই সুদূরপ্রসারী মৌলিক প্রশ্নও তিনি উত্থাপন করেছেন।
শেষ পর্যন্ত এসব আত্মঘাতী প্রশ্নের উত্তর তিনি অনেকটা ঐশীবাণীর মতো নিজের অন্তর থেকে পেয়েছেন এবং এই উত্তর নেতিবাচক নয়―অবশ্যই ইতিবাচক। আত্মগত সদুত্তর পেয়েছেন বলেই তিনি আত্মপ্রত্যয়ী। তাই সাহিত্যশিল্প এবং ভাষিক সুকুমারবৃত্তির নিষ্ঠাবান সংগঠক হিসেবে মোহিত কামাল সম্পাদকীয়তে লিখতে পেরেছেন : এক মলাটের বিশেষ সংখ্যাটির ভেতর থেকে ভৌগোলিক বা সামাজিক কিংবা ধর্মীয় জীবনধারার ভিন্নতর শাসন-অনুশাসনসহ নিশ্চয়ই নানা বৈচিত্রময় উপাদান কিংবা অনুষদ খুঁজে বের করে বর্তমান/ভবিষ্যতে পাঠকদের উপহার দিতে পারবেন যেকোনও সাহিত্য-গবেষক, বিশ্বাস আমাদের। শতবর্ষ পরও সংখ্যাটি নিয়ে গবেষণা হবে―এটি আমাদের কাজের পেছনের অনুপ্রেরণা। গোপন আকাক্সক্ষাও। বুদ্ধিবৃত্তিক ও শৈল্পিক কর্মযজ্ঞের অন্তরে যে শৈল্পিক আশাবাদ ও আস্থা, তা সৃষ্টিকে দিতে পারে অমরত্বের আশিস। সম্পাদকীয়তে তা-ই সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
২.
লেখকের নামধাম, কৃতীর গুরুত্ব এবং বয়সে অনুজ-অগ্রজ―এসব বিতর্ক এড়ানোর জন্য সম্পাদক মহোদয় লেখা বিন্যাস করেছেন নামের বর্ণানুক্রমিকে। তাই লক্ষ্য করা যায় অগ্রজ হয়েও বাংলাদেশ পর্বে কথাশিল্পী হরিশংকর জলদাসের লেখা চলে গেছে পর্বের শেষে। নামের আদ্যাক্ষরের কারণে প্রাবন্ধিক যতীন সরকার বা বহুমাত্রিক জ্যোতির্ময় হুমায়ুন আজাদের অবস্থানও এমনই―বড়মাপের লিখিয়ে হয়েও এটি তাঁদের বিধিলিপি।
বিশেষ গল্পসংখ্যা―২০২২-এ মুদ্রিত হয়েছে সাতচল্লিশটি গল্প। এর মধ্যে আফ্রিকার পনেরো, বাংলাদেশের সতেরো এবং ভারতের পনেরোটি। দেশ হিসেবে অবশ্য ভারতের উল্লেখ যথার্থ তবে ভারত বহুভাষিক, বিচিত্র সংস্কৃতির দেশ হলেও এখানে আছে কেবল বাংলায় রচিত পশ্চিমবঙ্গের গল্প। যদি ভারতের অন্যান্য প্রাদেশিক ভাষার খ্যাতিমান লেখকদের দু-চারটি গল্প অনুবাদিত হয়ে মুদ্রিত হতো তবে নিশ্চয়ই বহুভাষিক ভারতের বৈচিত্র্যময় সভ্যতা-সংস্কৃতির পরিচয় পাওয়া যেত। যাক, ‘যা পাইনি তার হিসাব মিলাতে মন মোর নহে রাজি।’ তবে আশা করব, ভবিষ্যতে সম্পাদক মহোদয় বিষয়টি বিবেচনা করবেন।
৩.
অনুবাদ নিয়ে দুয়েকটি কথাও বলা প্রয়োজন। অনুবাদ সাহিত্যের ধারা বিশ্বব্যাপী এখন প্রবল থেকে প্রবলতর হচ্ছে। পৃথিবী ছোট হয়ে এসেছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত উন্নত যোগাযোগের ফলে আন্তর্জাতিক এবং আন্তঃদেশীয় সম্পর্কে সহজ হয়েছে। আন্তর্জালিক যোগাযোগের ফলে পৃথিবীর বহুজাতিক সাহিত্য-সংস্কৃতির বিনিময় সহজতর হয়েছে। ফলে বৈশ্বিক সাহিত্য-সংস্কৃতির খোঁজখবর তো আমরা পাচ্ছিই―পাশাপাশি অনুবাদের সাঁকো পেরিয়ে দ্রুত চলে আসতে পারছে বিশ্বসাহিত্যের সমৃদ্ধ ভাণ্ডার। তাতে আমরা জানতে পারছি মানবসভ্যতার বহুকৌণিক মানসসম্পদের আকর সম্পর্কে। তবে অনুবাদ সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের একটি মন্তব্য বিবেচনার দাবি রাখে―অনুবাদ হলো দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানো। তাঁর এই মন্তব্য চিন্তা-ভাবনার উদ্রেক ঘটায় একারণে যে, অনুবাদে মূলের স্বাদ কি পাওয়া যায় ? নাকি আমসত্ত্ব খেয়ে আমের স্বাদ গ্রহণ ? মূলত দুটি ভাষার ওপর অনুবাদকের দখল, চর্চা, শিল্পবোধ এবং লাগসই শব্দের মাধ্যমে প্রকাশের ওপর নির্ভর করে অনুবাদের সাফল্য―তবু শতভাগ নয়।
তাছাড়া অনুবাদিত বিষয়টি ভাবানুবাদ না আক্ষরিক অনুবাদ―তার ওপরও নির্ভর করে সার্থকতার মাত্রা। এই দুয়ের কোনটি কোন রচনার অনুবাদে প্রযুক্ত হলে লাগসই হবে তা নির্ভর করে অনুবাদকের রুচি, অভিজ্ঞতা ও বিষয়ের ওপর। তাত্ত্বিক বা তাথ্যিক অনুবাদ আক্ষরিক হলেই চলে। কিন্তু সাহিত্যের অনুবাদে কেবল কঙ্কালটি পেলে হয় না! তাতে রক্তমাংস সংযোগ করতে হয়। তাতেও পূর্ণতা পায় না―প্রাণের প্রতিষ্ঠা ছাড়া। প্রতিমায় যেমন নির্মাণের পর চক্ষুদান করতে হয়―অনেকটা তেমনই। অনুবাদের কঙ্কালে রক্তমাংস সংযোগে অর্ধেক সার্থকতা―বাকিটুকু নির্ভর করে প্রাণসঞ্চার অর্থাৎ সাবলীল ভাষাপ্রয়োগের মাধ্যমে শিল্পের লাবণ্যদানে। অনুবাদের কঙ্কালে ডিএনএ টেস্ট করে ঋদ্ধ পাঠক হয়ত তার পরিচয়টি পান কিন্তু সৌন্দর্য উপলব্ধি করতে পারেন না। অনুবাদ নীরস হলে পাঠকের মনোযোগ আকর্ষণ করে না―শুষ্কং কাষ্ঠং হলে তো নয়ই। এই দুর্বলতা দেখা দেওয়ার আশংকা তখনই প্রবল হয় যখন অনুবাদ থেকে অনুবাদ হয়―অর্থাৎ তস্য অনুবাদ। মূল ভাষা থেকে সরাসরি অনুবাদে তবু অনেকটা থাকে মূলানুগ ও শৈল্পিক সৌন্দর্য। কিন্তু যখন মূল থেকে ইংরেজি এবং ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদিত হয় তখন বিচ্যুতি ও বিভ্রান্তির আশঙ্কা থাকে বেশি। বিশেষত লৌকিক প্রবাদ-প্রবচন ও বাকধারার ক্ষেত্রে, যা কমবেশি সব ভাষাতেই আছে, অনুবাদে সমস্যা হয়। যেমন ঘরে আমার পাত পড়ে না বা দুদিন ধরে চুলোয় হাঁড়ি চড়ে না―যেকোনও ভাষাতেই এসবের অনুবাদ প্রায় অসম্ভব। তবু ভরসা রাখতে চাই সম্পাদকের কথায় : আফ্রিকা মহাদেশের জগৎবিখ্যাত কথাসাহিত্যিকদের গল্প বাংলায় অনুবাদ করেছেন এ সময়ের শ্রেষ্ঠ অনুবাদকগণ…।
আমাদের অনুবাদ সাহিত্যের ঐতিহ্য থাকলেও পরবর্তীকালে তা বিকশিত হয়নি, যথাযথভাবে রক্ষিতও হয়নি। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরই সম্ভবত বাংলা অনুবাদ সাহিত্যেরও জনক। কালিদাসের অভিজ্ঞান শকুন্তলম-এর বঙ্গানুবাদের মাধ্যমে তিনি সূচনা করেছিলেন অনুবাদের ধারা। অনুবাদ যে রচনার গুণে সার্থক ও শৈল্পিক হয়ে নতুন সাহিত্যসৃষ্টির মর্যাদায় অভিষিক্ত হতে পারে বিদ্যাসাগরের অনুবাদ তার প্রমাণ। কিন্তু পাশ্চাত্য বা বিশ্বসাহিত্যের অনুবাদের ক্ষেত্রে সাতচল্লিশোত্তর কালে এদেশে তেমন কোনও অগ্রগতি হয়নি। কবিতা যদিওবা সামান্য হয়েছে, কথাসাহিত্যের জমিন ছিল একেবারেই বন্ধ্যা। আফ্রিকান সাহিত্য অনুবাদের তো প্রশ্নই আসে না! তবে জানা যায়, পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক কালে সবে ধন নীলমণির মতো বিগত শতকের ষাটের দশকে লেখক সংঘের প্রকাশনায় বেরিয়েছিল আফ্রিকার কবিতা নামে একটিমাত্র অনুবাদগ্রন্থ। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর অনুবাদ সাহিত্যের অর্গল খুলে যায়―বিশেষত ইংরেজি, গ্রিক, উর্দু ও রুশসাহিত্যের। আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে স্বৈরশাসকের নির্যাতনে দেশত্যাগী লেখকদের রচনা তখন বিচ্ছিন্নভাবে অনুবাদ হতে থাকে। তবে এই ধারা এখন বহমান থাকলেও তেমন বেগবান নয়। কেবল সাহিত্য সাময়িকী ও দৈনিক পত্রিকার সাহিত্যপাতায় মাঝেমধ্যে প্রকাশিত হতে দেখা যায় আফ্রিকার গল্প। বিগত একযুগে ভাষান্তরিত হয়ে আফ্রিকার গল্পের যে কয়টি বই বেরিয়েছে তার মধ্যে মোস্তফা মীরের আফ্রিকার গল্প এবং ফজল হাসানের সমকালীন আফ্রিকার গল্প এবং আফ্রিকার শ্রেষ্ঠ গল্প অন্যতম। এই সূত্রে আফ্রিকান-আমেরিকান অনুবাদ গল্পের মালঞ্চ নির্মাণে শব্দঘর-এর সম্পাদক মোহিত কামাল ধন্যবাদার্হ। তাঁর সম্পাদনায় আরেকটু বৃহৎ কলেবরে এটি পুস্তকাকারে বের হলে আফ্রিকান কথাসাহিত্যের অনুবাদে এটি মাইলফলক হতে পারে।
৪.
আফ্রিকা মহাদেশের যে পনেরোটি গল্প ২০২২-এর বিশেষ গল্পসংখ্যায় অনুবাদিত হয়েছে সেগুলোর অনুবাদকেরা অনেকে প্রবাসী―ইউরোপ, আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ায় অভিবাসী। কেউ কেউ ভারতের―তিনজন বাংলাদেশের। আর সময়ের ফ্রেমে গল্পকারেরা শতবছরের সীমার ভেতর। তাই কেউকেউ প্রয়াতও। সবচেয়ে প্রবীণ গল্পকারদের মধ্যে আছেন পল লরেন্স ডানবার, যাঁর জন্ম বিগত উনিশ শতকে শেষপাদে (১৮৭২) আর নবীনতম হলেন চিমামান্দা নগুজি আদিচি, তাঁর জন্ম বিশশতকের শেষার্ধে (১৯৭৭)। সুতরাং প্রায় শতাব্দীর ব্যবধানে জন্মগ্রহণ করা লেখকদের গল্প মুদ্রিত হয়েছে এই সংখ্যায়। সময়ের এই বিস্তর ব্যবধানের কারণে গল্পগুলো মেজাজে, ভাষায়, উপস্থাপনায়, স্টাইলে এবং সময় ও সমাজচিত্রণে একরকম নয়। বরং কালিক তফাতের কারণে রূপান্তর ঘটেছে দৈশিক ও বৈশ্বিক আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার। একই সঙ্গে পরিবর্তন হয়েছে শিল্পতত্ত্বের, ভাষার প্রকাশভঙ্গির এবং উপস্থাপনার। এসব বিষয়-আশয়ই লক্ষণীয় অনুবাদিত আফ্রিকা মহাদেশের নির্বাচিত গল্পে।
এদিক থেকে বাংলাদেশ ও ভারতের গল্পশিল্পীরা অধিকাংশ নবীন, সমকালীন ও সাম্প্রতিক। তাঁদের সংক্ষিপ্ত লেখক-পরিচিতি না থাকলেও অনুমান করা যায়, দু-চারজন ছাড়া সবারই জন্ম আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের এপাশে-ওপাশে। সুতরাং কালের বিচারে তাঁরা একই কালের আসনে উপবিষ্ট―সমসময়ের সন্তান। প্রজন্মের ব্যবধান, বাহিত জীবন-সংস্কৃতির ভিন্নতা এবং অবস্থানের বেশি তফাৎ নেই বলে তাঁদের মানস-গঠনে খুব উচ্চতা-তুচ্ছতা নেই―দুয়েকজনের ব্যতিক্রম ছাড়া। বাংলাদেশের লেখকদের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী প্রজন্মের গল্পকারদের প্রাধান্যই বেশি―যদিও এদেশীয় লেখকদেরও সংক্ষিপ্ত পরিচিতি নেই। সামগ্রিকভাবে প্রবীণ ও নবীনদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এদেশের গল্পের গালিচায় কারুকাজ বেশ সমৃদ্ধ। গল্পশিল্পীর সংখ্যাও অঙ্গুলিমেয় নয়। তাই এ দেশের এ সময়ের গল্পের রূপচারিত্র অনুধাবনের জন্য সতেরোটি লেখা যথেষ্ট না হলেও এর মাধ্যমে এক টানে আঁকা বকের মতো একটি স্কেচ নিশ্চয়ই অবলোকন করা যায়। তবে সুনির্বাচিত এবং সীমিত পরিসরের মধ্যে এর চেয়ে বেশি আশা করাও অন্যায়। প্রসঙ্গত সম্পাদকীয়তে জানানো হয়েছে : অনেকে ব্যস্ততার কারণে অংশগ্রহণ করতে পারেননি। অনেকে অসুস্থতা কিংবা বিদেশে থাকার কারণে যথাসময়ে সাড়া দিতে পারেননি…। … অনেকের গল্প এর আগে প্রকাশিত বিশেষ গল্পসংখ্যায় স্থান পেয়েছে। তাঁদের অনেককে এই সংখ্যায় গল্প পাঠানোর জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। সম্পাদকের এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, তিনি ঘুরেফিরে বারবার একই লেখকগোষ্ঠীর লেখা ছেপে বৃত্তাবদ্ধ হতে চাননি। বরং আত্মবৃত্ত ভেঙে ভেঙে প্রসারিত হয়েছেন নতুনত্বের সন্ধানে এবং নবীন-প্রবীণের মেলবন্ধনে। নতুন লেখক আবিষ্কার এবং তৈরি করায় তিনি যে সিদ্ধহস্ত, সেক্ষেত্রে আমার চেয়ে বড় সাক্ষ্য বোধ হয় আর নেই।
লেখক : বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অধ্যাপক,
ব্রাহ্মণবাড়িয়া



